PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৮৫৭

জীবনচরিত (১৮৫৭)

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৫৭

জীবনচরিত।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর প্রণীত।

পঞ্চম বার মুদ্রিত

প্রথম বারের বিজ্ঞাপন।

জীবনচরিত পাঠে দ্বিবিধ মহোপকার লাভ হয়। প্রথমতঃ কোন কোন মহাত্মার অভিপ্রেতার্থসঙ্গনে কৃতকার্য্য হইবার নিমিত্ত যেরূপ অক্লিষ্ট পরিশ্রম, অবিচলিত উৎসাহ, মহীয়সী সহিষ্ণুতা ও দৃঢ়তর অধ্যবসায় প্রদর্শন করিয়াছেন এবং কেহ বহুতর দুর্ব্ব‌িষহ নিগ্রহ ও দারিদ্রনিবন্ধন অশেষ ক্লেশ ভোগ করিয়াও যে ব্যবসায় হইতে বিচলিত হয়েন নাই তৎসমুদায় আলোচনা করিলে এক কালে সহস্র উপদেশের ফল প্রাপ্ত হওয়া যায়। দ্বিতীয়তঃ আনুষঙ্গিক তত্তদ্দ‌েশের তত্তৎকালীন রীতি, নীতি, ইতিহাস ও আচার পরিজ্ঞান হয়। অতএব যে বিষয়ের অনুশীলনে এতাদৃশ মহার্থ লাভ সম্পন্ন হইতে পারে তাহাকে অবশ্যই শিক্ষা কর্মের এক প্রধান অঙ্গ বলিয়া অঙ্গীকার করিতে হইবেক।

রবর্ট ও উইলিয়ম চেম্বর্স‌, বহুসংখ্যক সুপ্রসিদ্ধ মহানুভব মহাশয়দিগের বৃত্তান্ত সঙ্কলন করিয়া ইঙ্গরেজী ভাষায় যে জীবনচরিত পুস্তক প্রকাশ করিয়াছেন তাহা বাঙ্গালা ভাষায় অনুবাদিত হইলে এতদ্দ‌েশীয় বিদ্যার্থি‌গণের পক্ষে বিশিষ্টরূপ উপকার দর্শিতে পারে এই আশয়ে আমি ঐ পুস্তকের অনুবাদে প্রবৃত্ত হইয়াছিলাম। কিন্তু সময়াভাব ও অন্যান্য কতিপয় প্রতিবন্ধক বশতঃ তন্মধ্যে আপাততঃ কেবল কোপর্নি‌কস্ গালিলিয়, নিউটন, হর্শে‌ল, গ্রোশ্যস্‌, লিনিয়স্, ডুবাল, জেস্কিন্স ও জোন্স এই কয়েক মহাত্মার চরিত অনুবাদিত ও প্রকাশিত হইল।

ইয়ুরোপীয় পদার্থবিদ্যা ও অন্যান্য বিদ্যা সংক্রান্ত অনেক কথার বাঙ্গালা ভাষায় অসঙ্গতি আছে; ঐ অসঙ্গতি পুরণার্থে

কোন কোন স্থানে দুরূহ সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগ ও স্থান বিশেষে তত্তৎ কথার অর্থ ও তাৎপর্য্য পর্য্যালোচনা করিয়া তৎপ্রতিরূপ নূতন শব্দ সঙ্কলন করিতে হইয়াছে; পাঠকগণের বোধ সৌকর্য্য‌ার্থে পুস্তকের শেষে তাহাদিগের অর্থ ও ব্যুৎপত্তিক্রম প্রদর্শিত হইল। কিন্তু সঙ্কলিত শব্দ সকল বিশুদ্ধ ও অবিম্বাদিত হইয়াছে কি না সে বিষয়ে আমি অপরিতৃপ্ত রহিলাম।

বাঙ্গালায় ইঙ্গরেজীর অবিকল অনুবাদ করা অত্যন্ত দুরূহ কর্ম্ম; ভাষাদ্বয়ের রীতি ও রচনা পরস্পর নিতান্ত বিপরীত; এই নিমিত্ত, অনুবাদক অত্যন্ত, সাবধান ও যত্নবান হইলেও অনুবাদিত গ্রন্থে রীতিবৈলক্ষণ্য, অর্থ প্রতীতির ব্যতিক্রম ও মূলার্থের বৈকল্য ঘটিয়া থাকে। অতএব আমি ঐ সমস্ত দোষ অতিক্রম করিবার আশয়ে অনেক স্থানে অবিকল অনুবাদ করি নাই; তথাপি এই অনুবাদে ঐ সকল দোষের ভূয়সী সম্ভাবনা আছে, সন্দেহ নাই। যাহা হউক, ইহা সাহস করিয়া বলা যাইতে পারে এই অনুবাদ বিদ্যার্থি‌গণের পক্ষে নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর হইবেক না।
পরিশেষে অবশ্যকর্ত্তব্য কৃতজ্ঞতাস্বীকারের অন্যথাভাবে অধর্ম্ম জানিয়া, অঙ্গীকার করিতেছি শ্রীযুত মদনমোহন তর্কালঙ্কার শ্রীযুত নীলমাধব মুখোপাধ্যায় প্রভৃতি কয়েক জন বিচক্ষণ বন্ধু এ বিষয়ে যথেষ্ট আনুকূল্য করিয়াছেন।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা।

কলিকাতা।
২৭ এ ভাদ্র। শকাব্দাঃ ১৭৭১।

দ্বিতীয় বারের বিজ্ঞাপন।

প্রায় দুই বৎসর অতীত হইল জীবনচরিত প্রথম মুদ্রিত ও প্রচারিত হইয়াছিল। যৎকালে প্রথম প্রচারিত হয় আমার এমন আশাছিলনা ইহা সৰ্বত্র পরিগৃহীত হইবেক। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে ছয় মাসের অনধিক কাল মধ্যেই প্রথম মুদ্রিত সমুদায় পুস্তক নিঃশেষিত হয়। সমুদায় পুস্তক নিঃশেষিত হয় কিন্তু গ্রাহকবর্গের আগ্রহ নিবৃত্তি হয় নাই। সুতরাং অবিলম্বে পুনমুদ্রিত করা অত্যাবশ্যক হইয়াছিল। কিন্তু নানা হেতুবশতঃ আমি অনেক দিন পর্যন্ত পুনর্মু‌দ্রিত করণ স্থগিত রাখিয়াছিলাম।

বাঙ্গালা ভাষায় ইঙ্গরেজী পুস্তকের অনুবাদ করিলে প্রায় সুস্পষ্ট ও অনায়াসে বোধগম্য হয় না এবং ভাষার রীতির ভূরি ভূরি ব্যতিক্রম ঘটে। আমি ঐ সমস্ত দোষ অতিক্রম করিবার নিমিত্ত বিস্তর প্রয়াস পাইয়াছিলাম এবং আমার পরম বন্ধু শ্রীযুত মদনমোহন তর্কালঙ্কারও আমার অভিপ্রেত সিদ্ধির নিমিত্ত যথেষ্ট পরিশ্রম করিয়াছিলেন। তথাপি মধ্যে মধ্যে অত্যন্ত দুৰ্বোধ ও অত্যন্ত অস্পষ্ট ছিল এবং স্থানে স্থানে ভাষার রীতিরও ব্যতিক্রম ঘটিয়াছিল।

প্রথম বারের মুদ্রিত সমুদায় পুস্তক নিঃশেষিত হইলে যখন জীবনচরিত পুনর্মু‌দ্রিত করিবার কল্পনা হয় আমি আদ্যন্ত পাঠ করিয়া স্থির করিয়াছিলাম পুনর্ব্বা‌র পরিশ্রম করিলেও ইহা পূর্ব্ব‌নির্দ্দ‌িষ্ট দোষ সমুদায় হইতে মুক্ত হওয়া দুর্ঘট। সুতরাং সঙ্কল্প কুরিয়াছিলাম আর কখন ইঙ্গরেজী পুস্তকের অনুবাদ করিব না এবং এই পুস্তকও পুনর্মু‌দ্রিত করিব না। এবং এই নিমিত্ত বাঙ্গালার এক নূতন জীবনচরিত পুস্তক সঙ্কলন করিবার বাসনা ও

উদ্যোগ করিয়াছিলাম। কিন্তু গত দুই বৎসর কোল বিষয়ান্তরে একান্ত ব্যাপৃত হইয় এমন অবকাশশূন্য হইয়াছি যে, সে বাসন সম্পন্ন করিতে পারি নাই এবং ত্বরায় সম্পন্ন করিতে পারিব এমন সম্ভাবনাও নাই।

কিন্তু যাবৎ নূতন জীবনচরিত পুস্তক প্রস্তুত না হইতেছে এই পুস্তক পুনর্মু‌দ্রিত করিলে নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর হইবেক না এই বিবেচনায় পুনর্মু‌দ্রিত করা আবশ্যক স্থির হওয়াতে দ্বিতীয় বার মুদ্রিত ও প্রচারিত হইল। কোন কোন অংশ একবারেই পরিত্যাগ করিয়াছি, স্থানে স্থানে অনেক পরিবর্ত্ত‌ করিয়াছি, এবং মূলগ্রন্থ বিশদ করিবার আশয়ে মধ্যে মধ্যে কিঞ্চিৎ টীকাও লিখিয়া দিয়াছি। ফলতঃ সুস্পষ্ট ও অনায়াসে বোধগম্য করিবার নিমিত্ত বিস্তর পরিশ্রম করিয়াছি। তথাপি আদ্যোপান্ত সুপষ্ট ও অনায়াসে বোধগম্য হইয়াছে কোন মতেই সম্ভাবিত নহে। যাহা হউক, ইহা অনায়ামে নির্দেশ করিতে পারা যায় জীবনচরিত প্রথম বার যেরূপ মুদ্রিত হইয়াছিল দ্বিতীয় বারে তদপেক্ষায় অনেক অংশে সুস্পষ্ট হইয়াছে।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্র শর্ম্মা।

কলিকাতা। সংস্কৃতকালেজ।
২০এ চৈত্র। শকাব্দাঃ‌ ১৭৭৩।

দুরূহ ও সঙ্কলিত নূতন শব্দের অর্থ।

অংশ, (Degree) অক্ষাংশ। ভূগোলবেত্তারা বিষুবরেখার উত্তর দক্ষিণ অথবা পূর্ব পশ্চিম ভূভাগ ৩৬০ ভাগে বিভক্ত করেন ইহার এক এক ভাগ এক এক অক্ষাংশ।

অযথাভূত, (Perverted) যেরূপ হওয়া উচিত সেরূপ নহে। অযথাভূত দর্শন শাস্ত্র, দর্শন শাস্ত্রের যাহা উদ্দেশ্য তাহ প্রতিপন্ন না করিয়া তদ্বিপরীতার্থ প্রতিপাদক।

অস্থিত পাটীগণিত, (Arithmetic of Infinites) এক প্রকার অঙ্ক শাস্ত্র।

আধিশ্রয়ণিক ব্যবধি, (Focal Distance) অধিশ্রয়ণ অগ্নিস্থান, চুল্লী। আলোকের কিরণ সকল দূরবীক্ষণের মুকুরের মধ্য দিয়া গমন করিয়া যে স্থানে মিলিত হয় তাহাকে অধিশ্রয়ন কহা যায়। মুকুরের সর্বাপেক্ষায় উচ্চভাগ ও অধিশ্রয়ণ এই উভ য়ের অন্তরকে আধিশ্রয়ণিক ব্যবধি কহে।

আভিজাতিক চিহ্ন, (অভিজাত কুল, বংশ) কুলপরিচায়ক চিহ্ন।

আবিষ্ক্রিয়া, (Discovery) অপ্রকাশিত অথবা অপরিজ্ঞাত বিষয়ের উদ্ভাবন।

উদ্ভিদবিদ্যা, (Botany) উদ্ভিদ তরু গুল্মাদি। তরু গুল্মাদির অবয়বসংস্থান, প্রত্যেক অবয়বের কার্য্য, উৎপত্তি স্থান, জাতি-বিভাগ ইত্যাদি যে শাস্ত্রে নির্ণীত আছে।

উপকূল (Coast) বেলাভূমি, সমুদ্রসন্নিহিত ভূপ্রান্তভাগ।

উপপ্লব, (Tumults) প্রভুশক্তির প্রতিকূলে প্রজাগণের অভ্যুত্থান।

ঔপনিবেশিক, (Colonial) উপনিবেশ কোন দূর দেশে কৃষিকর্ম্ম ও বাস করিবার নিমিত্ত জন্মভূমি হইতে যে সকল লোক লইয়া যাওয়া যায়; তৎসম্বন্ধীয় ঔপনিবেশিক।

কক্ষ, (Orbit) গ্রহগণের পরিভ্রমণপথ।

কীর্তিস্তম্ভ, (Monument) ঘটনাবিশেষের স্মরণার্থে অথবা ব্যক্তি বিশেষের নাম ও কীর্ত্তি রক্ষার্থে নির্মিত স্তম্ভাদি।

কুলাদর্শ, (Heraldry) বংশাবলী ও বংশপরিচায়ক চিহ্ন বিষয়ক শাস্ত্র।

কুসংস্কার, (Prejudice) সমুচিত বিবেচনা না করিয়া যে সিদ্ধান্ত করা হয়।

কেন্দ্র, (Centre) ঠিক মধ্যস্থান।

গণিত,(Mathematics) পরিমাণ ও অঙ্ক বিষয়ক শাস্ত্র।

গবেষণা, (Research) কোন বিষয়ের তত্ত্বানুসন্ধান।

গ্রহনীহারিকা, (Planetary Nebulae) যে সকল নীহারিকা, গ্রহের লক্ষণাক্রান্ত বোধ হয়।

চরণাবরণ, (Stocking) মোজা।

চরিতাখ্যায়ক, (Biographer) যে ব্যক্তি কোন লোকের জীবন বৃত্তান্ত লিপিবদ্ধ করে।

চিত্রশালিকা, (Museum) চিত্র অদ্ভুত বস্তুত; শালিকা আলয়। যে স্থানে প্রাকৃত ইতিবৃত্ত, পদার্থমীমাংসা ও সাহিত্য বিদ্যা সংক্রান্ত এবং শিল্পসাধিত কৌতুহলোদ্বোধক বস্তু সকল স্থাপিত থাকে।

ছায়াপথ, (Milky Way) নভোমণ্ডলে দৃশ্যমান জ্যোতির্ম্ময় তিরশ্চীন পথ।

জলোচ্ছ্বাস, (Tide) (জল-উচ্ছ্বাস) জলের স্ফীততা, জোয়ার।

জাতীয় বিধান, (National Law) বিভিন্ন জাতীয় লোকদিগের পরস্পর ব্যবহার ব্যবস্থাপক শাস্ত্র।

জ্যোতির্ব্বিদ্যা, (Astronomy) গ্রহ, নক্ষত্র, ধূমকেতু প্রভৃতি দিব্যপদার্থের স্বরূপ, সঞ্চার, পরিভ্রমণ কাল, গ্রহণ, শৃঙ্খলা, অন্তর ও সৎসম্বন্ধ সমস্ত ঘটনা নিরূপক শাস্ত্র।

জ্যোতিষ্ক, (Heavenly Bodies) গ্রহ নক্ষত্রাদি।

টঙ্কবিজ্ঞান, (Numismatics) টঙ্ক মুদ্রা, টাকা। নানা দেশীয় ও নানাকালীন টঙ্ক পরিজ্ঞানার্থক বিদ্যা।

তুলামান, (Libration) তুলাদণ্ডে পরিমাণ করণ। চন্দ্রের তুলামান শব্দে চন্দ্রমণ্ডলবৃত্তি পরীবর্ত্ত। এই পরীবর্ত্ত দ্বারা চন্দ্রমণ্ডলের প্রান্তসন্নিহিত কোন কোন অংশের পর্যায়ক্রমে আবির্ভাব ও তিরোভাব হয়।

তূর্য্যাচার্য্য, তূর্য্য (Music) বাদ্য; আচার্য্য উপদেশক। যে ব্যক্তি বাদ্য বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করে।

তূর্য্যাজীব, (Musician) তূর্য্য বাদ্য; আজীব জীবিকা; বাদ্যব্যবসায়ী।

দূরবীক্ষণ, (Telescope) দূর-বীক্ষণ। দুরস্থিত বস্তু দর্শনার্থ নলাকার যন্ত্র, দুরবীণ।

দৃষ্টিবিজ্ঞান, (Optics) আলোক ও দর্শন বিষয়ক বিদ্যা।

দ্বিপাদপ্রমিত, যাহার পরিমাণ দুই (ফুট) পা।

দেবালয়, (Church) দেব ঈশ্বর; আলয় স্থান; ঈশ্বরের উপাসনারস্থান, গির্জা।

ধাতুবিদ্যা, (Mineralogy) ধাতু ভূগর্ভে স্বয়মুংপন্ন নির্জীব পদার্থ; যেমন স্বর্ণ, লৌহ, প্রস্তর, পারদ, লবণ, অঙ্গার প্রভৃতি; এতদ্বিষয়ক বিদ্যা।

নক্ষত্রবিদ্যা, (Astrology) গ্রহ, নক্ষত্রাদির স্থিতি ও সঞ্চার অনুসারে শুভাশুভনির্বচন ও ভবিষ্যসংসুচক বিদ্যা।

নাড়ীমণ্ডল, (Equator) বিষুবরেখা। সূর্য্য এই রেখায় উপস্থিত হইলে দিবা রাত্রি সমান হয়।

নীহারিকা, (Nebulae) নীহার কুজ‍্ঝটিকা। যে সকল নক্ষত্র চক্ষুর গোচর নয় কিন্তু দূরবীক্ষণ দ্বারা অবলোকন করিলে কুজ‍্ঝটিকাবৎ প্রতীয়মান হয় তৎসমুদায়ের নাম নীহারিকা।

নৈসর্গিক বিধান, (Natural Law) নৈসর্গিক স্বাভাবিক; বিধান নিয়ম, ব্যবস্থা। মানবজাতির ঐশিক নিয়মানুসারী পরস্পর ব্যবহার ব্যবস্থাপক শাস্ত্র। যথা; কেহ কাহারও হিংসা করিবেক না ইত্যাদি।

নৈহারিক নক্ষত্র, (Nebulous Stars) যে সকল নীহারিকা নক্ষত্রের লক্ষণাক্রান্ত বোধ হয়।

পদার্থবিদ্যা, (Natural Philosophy) বিশ্বান্তর্গত সমস্ত পদার্থের তত্ত্ব নির্ণায়ক শাস্ত্র।

পরিপ্রেক্ষিত (Perspective) পরি সর্ব্বতোভাবে; প্রেক্ষিত দর্শন; বস্তু সকল বাস্তবিক সত্তা কালে যেরূপ প্রতীয়মান হয় আলেখ্যে তাহাদিগের তদনুরূপ বিন্যাস নিয়ামক বিদ্যা।

পর্য্যবেক্ষণ, (Observation) [পরি-অবেক্ষণ] অভিনিবেশ পূর্ব্বক অবলোকন।

পাঞ্চপাদিক, যাহার পরিমাণ পাঁচ [ফুট] পা।

পাটীগণিত (Arithmetic) অঙ্ক বিদ্যা।

পান্থনিবাস, (Inn) পথিকদিগের অবস্থিতি করিবার স্থান; যে স্থানে নবাগত ব্যক্তিরা ভাটক প্রদান পূর্ব্বক আপাততঃ অবস্থিতি করে।

পারিপার্শ্বিক, (Satellite) পাশ্ববর্ত্তী, পার্শ্বচর; উপগ্রহ কোন বৃহৎ গ্রহের চতুর্দ্দিকে পরিভ্রমণকারী ক্ষুদ্র গ্রহ; পৃথিবীর পারিপার্শ্বিক চন্দ্র।

পুরাগত

পূর্ব্বতন কালীন।

পৌরাণিক

প্রকৃতি, (Nature) ঈশ্বরসৃষ্ট যাবতীয় পদার্থের সাধারণ সংজ্ঞা।

প্রতিপোষক, (Patron) সহায়, আনুকুল্যকারী।

প্রতিভা, (Genius) অসাধারণ বুদ্ধিশক্তি।

প্রবেশিকা, (Ticket) যাহা দেখাইলে প্রবেশ করিতে পাওয়া যায়; টিকিট।

প্রস্তরফলক (Slatc) শেলেট।

প্রাতিফলিক দূরবীক্ষণ, (Reflecting Telescope) আলোকেরকিরণ সকল যে দূরবীক্ষণের মুকুরে প্রতিফলিত হইয়া সরলরেখায় গমন পূর্ব্বক প্রতিবিম্ব স্বরূপে পরিণত হয়।

প্রাকৃত ইতিবৃত্ত, (Natural History) প্রকৃতিবিষয়ক বৃত্তান্ত,অর্থাৎ পৃথিবী ও তদুৎপন্ন বস্তু সমুদয়ের বিবরণ। জন্তুবিদ্যা, ধাতুবিদ্যা, উদ্ভিদবিদ্যা, ভূবিদ্যা প্রভৃতি বিদ্যা সকল প্রাকৃত ইতিবৃত্তের অন্তর্গত।

বন্ধুর, (Rough) উচ নীচ, আবুড়া খাবুড়া।

মনোবিজ্ঞান, (Metaphysics) মন, বুদ্ধি প্রভৃতি নির্ণায়ক শাস্ত্র।

মণ্ডল, (State) প্রদেশ, রাজ্য।

মধূত্থবর্ত্তিকা, মোমবাতি।

মেরুদণ্ড, (Axis) ভূগোলের অন্তর্গত উভয় কেন্দ্রভেদী কাল্পনিকসরল রেখা। এই রেখা অবলম্বন করিয়া পৃথিবী পশ্চিম হইতে পুর্ব্বভিমুখে দৈনন্দিন পরিভ্রমণ করে।

রঙ্গভূমি, (Theatre) যেখানে নাটকের অভিনয় হয়।

রাজবিপ্লব, (Revolution) রাজ্য শাসনের প্রচলিত প্রণালীর পরিবর্ত্তন।

রোমীয় সম্প্রদায়, (Romish Church) রোম নগরীয় ধর্মালয়ের মতানুযায়ী খৃষ্টধর্ম্মাবলম্বী লোক।

বিজ্ঞান, (Science) পদার্থের তত্ত্ব নির্ণায়ক শাস্ত্র, যথা জ্যোতির্বিদ্যা।

বিজ্ঞাপনী, (Report)বাচিক অথবা লিপি দ্বারা কোন বিষয় আবেদন করা।

বিধানশাস্ত্র, (Law) ব্যবস্থা শাস্ত্র।

বিমিশ্র গণিত, (Mixed Mathematics) যাহাতে পদার্থ সম্বন্ধ রাশি নিরূপণ করা হয়।

বিশপ, (Bishop) ধর্মবিষয়ক অধ্যক্ষ।

বিশুদ্ধ গণিত, (Pure Mathematics) যাহাতে পদার্থের সহিতকোন সম্বন্ধ না রাখিয়া কেবল রাশির নিরূপণ মাত্র করা হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়, (University) [বিশ্ব বিদ্যা আলয়] সর্ব্ব প্রকারবিদ্যার আলোচনা স্থান।

ব্যবহারদর্শী, ধর্ম্মাধিকরণের বিধিজ্ঞ। ধর্ম্মাধিরণ আদালত।

ব্যবহারসংহিতা, (Law) ব্যবস্থা শাস্ত্র, আইন।

ব্যবহারাজীব, (Lawyer) ব্যবহার মোকদ্দমা; আজীব জীবিকা; যাহারা বাদী প্রতিবাদীর প্রতিনিধি স্বরূপ হইয়া মোকদ্দমা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্য্য নির্ব্বাহ করে। উকীল ইত্যাদি।

শঙ্কু, (Index) ঘড়ীর কাঁটা।

পঙ্কুপট্ট, (Dial-Plate) দণ্ড পলাদি চিহ্নিত শঙ্কুদণ্ডের আধার।

শতাব্দী, (Century) শত বৎসরাত্মক কাল; সংবৎ ১৯০১ অবধি ২০০০ পর্যন্ত কাল এক শতাব্দী;তদনুসারে ইহা কহা যাইতে পারে, এক্ষণে বিক্রমাদিত্যের বিংশ শতাব্দী চলিতেছে।

শিলিং, (Shilling) আধ টাকা।

সুকুমার বিদ্যা, (Polite Learning) সাহিত্যাদি শাস্ত্র।

স্থিতিস্থাপক, (Elasticity) আকুঞ্চন, প্রসারণ, অভিঘাতাদি কারুলেও বস্তু সকল যে নৈসর্গিক গুণ প্রভাবে পুনর্বার পর্ব্বতপ্রাপ্ত হয়।

স্বাত্মরক্ষা, (Fencing) আক্রমণ অথবা আত্মরক্ষার্থে তরবারি প্রয়োগ বিষয়ক নৈপুণ্যসাধন বিদ্যা।

গ্রোশ্যস

গ্রোশ্যস।

গ্রোশ্যস ১৫৮৩ খৃঃ অব্দে, হলণ্ডের অন্তঃপাতী ডেল্কট নগরে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি শৈশব কালেই অসাধারণ বিদ্যোপার্জ্জন দ্বারা অত্যন্ত খ্যাতি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। অষ্ট বর্ষ বয়ঃক্রম কালে লাটিন ভাষাতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র বাক্য রচনা করেন। চতুর্দ্দশ বৎসরের সময় পণ্ডিতসমাজে গণিত, ব্যবহারসংহিতা ও দর্শনশাস্ত্রের বিচার করিতে পারিতেন। ১৫৯৮ খৃঃ অব্দে হলণ্ডের রাজদূত বর্নিবেল্টের সমভিব্যাহারে পারিস রাজধানী গমন করেন। তথায় বুদ্ধিনৈপুণ্য ও সুশীলতা দ্বারা ফ্রান্সের অধিপতি সুপ্রসিদ্ধ চতুর্থ হেনরির নিকট ভূয়সী প্রতিষ্ঠা প্রাপ্ত হয়েন, এবং সর্ব্বত্রই অদ্ভুত পদার্থ বলিয়া পরিগণিত ও প্রশংসিত হইয়াছিলেন। হলণ্ড প্রত্যাগমনের পর ব্যবহারাজীবের ব্যবসায় অবলম্বন করিলেন এবং সতর বৎসরের অধিক নয় এমন বয়সে ধর্ম্মাধিকরণে প্রথম বারেই এমন অসাধারণ রূপে আত্মপক্ষ সমর্থন করিয়াছিলেন যে তদ্দ্বারা অতিপ্রভূত খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভ করিলেন এবং অল্প কালমধ্যেই প্রধান ব্যবহারাজীবের পদে অধিরূঢ় হইলেন।

বীরনগরের অধ্যক্ষের মেরি রিজর্সবর্গ নাম্নী এক কন্যা ছিল। গ্রোশ্যস ১৬০৮ খৃঃ অব্দে ঐ কামিনীর পাণিগ্রহণ করেন। এই রমণী রমণীয় গুণগ্রাম দ্বারা গ্রোশ্যসের যোগ্য ছিলেন এবং গ্রোশ্যসের সহধর্ম্মিণী হওয়াতে তাঁহার গুণের সমুচিত সমাদর হইয়াছিল। কি সম্পত্তি, কি বিপত্তি, সকল সময়েই তাঁহারা পরস্পর অবিচলিত সদ্ভাবে ও যৎপরোনাস্তি প্রণয়ে কাল যাপন করিয়াছিলেন। কিঞ্চিৎ পরেই দৃষ্ট হইবেক নিগৃহীত স্বামীর ক্লেশশান্তি বিষয়ে ঐ পতিপ্রাণ রমণীর ঐকান্তিক প্রণয়ের কি পর্য্যন্ত উপযোগিতা হইয়াছিল।

গ্রোশাস অত্যন্ত কুৎসিত সময়ে ভূমণ্ডলে আসিয়াছিলেন। ঐ কালে জনসমাজ, ধর্ম্ম ও দণ্ডনীতি বিষয়ক বিষম বিসংবাদ দ্বারা সাতিশয় বিসঙ্কুল ছিল। মনুষ্য মাত্রেই ধর্ম্মসংক্রান্ত বিবাদে উন্মত্ত এবং ভিন্ন ভিন্ন পক্ষের ঔদ্ধত্য ও কলহপ্রিয়তা দ্বারা সৌজন্য, দয়া ও দক্ষিণ্য একান্ত বিলুপ্ত হইয়াছিল। গ্রোশ্যস, আর্ম্মিনিয় সাম্প্রদারিকও সর্ব্বতন্ত্রপক্ষীয়ছিলেন। তিনি স্বীয় ব্যবসায়িক কার্য্যোপলক্ষে ত্বরায় এমন বিবাদবাগুরাতে পতিত হইলেন যে তাহা হইতে মুক্ত হওয়া অত্যন্ত দুরূহ। তাঁহার তুল্যমতাবলম্বী পুর্ব্বসহায় বর্নিবেল্ট অভিদ্রোহাভিযোগে ধর্ম্মাধিকরণে নীত হইলে, তিনি স্বীয় লেখনী ও আধিপত্য দ্বারা তাঁহার যথোচিত সহায়তা করেন। কিন্তু তাঁহার সমুদায় প্রয়াস বিফল হইল। ১৬১৯ খৃঃ অব্দে বর্নিবেল্টের প্রাণ দণ্ড হইল এবং গ্রোশ্যস দক্ষিণ হলণ্ডের অন্তঃপাতী লোবিষ্টিনের দুর্গ মধ্যে যাবজ্জীবন কারানিরুদ্ধ হইলেন। এইরূপ দারুণ অবিচারের পর তাঁহার সর্বস্বও হৃত হইল।

বিচারারম্ভের পূর্ব্বে গ্রোশ্যস কোন সংঘাতিক রোগে আক্রান্ত হইয়াছিলেন। তৎকালে তাঁহার সহধর্ম্মিণী তাঁহার সহিত সাক্ষাৎকার করিবার নিমিত্ত সাতিশয় উৎসুকা হইয়াও কোন ক্রমে তাঁহার নিকটে যাইতে পান নাই। কিন্তু তাঁহার দণ্ড বিধানের পর কারাধিবাসসহচরী হইবার প্রার্থনায় ব্যগ্রতা প্রদর্শন পুর্ব্বক আবেদন করিয়া তদ্বিষয়ে অনুমতি প্রাপ্ত হইলেন। গ্রোশ্যস তাঁহার এইরূপ অনির্ব্বচনীয় অনুরাগ দর্শনে মুগ্ধ ও প্রীত হইয়া এক স্বরচিত লাটিন কাব্যে তাঁহার ভূয়সী প্রশংসা লিখিয়াছেন এবং তাঁহার সন্নিধানাবস্থানকে কারাবাসক্লেশরূপ অন্ধতমসে সুর্য্যকরোদয় স্বরূপ বর্ণনা করিয়াছিলেন।

সমুদয় হলণ্ডের লোকেরা গ্রোশ্যসের গ্রাসাচ্ছাদন নির্ব্বাহার্থে আনুকূল্য করিবার প্রস্তাব করিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার পত্নী সমুচিত গর্ব্ব প্রদর্শন পূর্ব্বক উত্তর দিলেন আমার যাহা সংস্থান আছে তদ্দ্বারাই তাঁহার আবশ্যক ব্যয় নির্ব্বাহ করিতে পারিব, অন্যের আনুকুল্য আবশ্যক নাই। তিনি স্ত্রীজাতিসুলভ বৃথা শোক পরবশ না হইয়া সাধ্যানুসারে পতিকে সুখী ও সন্তুষ্ট করিতে চেষ্টা করিতেন। গ্রোশ্যসের অধ্যয়নানুরাগও এক বিলক্ষণ বিনোদনোপায় হইয়াছিল। বস্তুতঃ গুণবতীভার্য্যাসহায় ও প্রশস্তপুস্তকমগুলীপরিবৃত ব্যক্তির সাংসারিক সঙ্কটে বিষন্ন হইবার বিষয় কি। তথাহি, গ্রোশ্যস যাবজ্জীবন কারাবাসরূপ দণ্ডে নিগৃহীত হইয়াও তথায় অভিমত অধ্যয়ন দ্বারা প্রফুল্ল চিত্তে কাল যাপন করিয়াছিলেন।

কিন্তু তাঁহার পত্নী তদীয় উদ্ধার সাধনে একান্ত অধ্যবসায়িনী ছিলেন। যাঁহারা অসন্দিগ্ধ চিত্তে তাঁহাকে পতিসমভিব্যাহারে কারাগারে বাস করিবার অনুমতি দিয়াছিলেন, বোধ হয়, পতিপ্রাণা কামিনীর বুদ্ধিকৌশলে ও উদ্যোগে কি পর্য্যন্ত কার্য্য সাধন হইতে পারে তাঁহারা তদ্বিষয়ের বিশেষজ্ঞ ছিলেন না। তিনি এক মুহুর্ত্তের নিমিত্তেও এই অভিলষিত সমাধানের উপায় চিন্তনে বিরত হয়েন নাই; এবং যদ্দ্বারা এতদ্বিষয়ের আনুকূল্য হইবার সম্ভাবনা, এতাদৃশ ব্যাপার উপস্থিত হইলে, তদ্বিষয়ে কোন ক্রমেই উপেক্ষা করিতেন না। গ্রোশ্যস সন্নিহিত নগরবত্তী বন্ধুবর্গের নিকট হইতে পাঠার্থ পুস্তকানয়নের অনুমতি পাইয়াছিলেন। পাঠসমাপ্তির পর সেই সকল পুস্তক করণ্ডকমধ্যগত করিয়া প্রতিপ্রেরিত হইত। ঐ সমভিব্যাহারে তাঁহার মলিন বস্ত্রও ক্ষালনার্থে রজকালয়ে যাইত। প্রথমতঃ রক্ষকেরা তন্ন তন্ন করিয়া ঐ করণ্ডকের বিষয়ে অনুসন্ধান করিত; কিন্তু কোন বারেই সন্দেহোদ্বোধক বস্তু দৃষ্টিগোচর না হওয়াতে ক্রমে ক্রমে শিথিলপ্রযত্ন হয়। গ্রোশ্যসের পত্নী, রক্ষিগণের ক্রমে ক্রমে এইরূপ অযত্ন প্রাদুর্ভাব দেখিয়া, পতিকে সেই করণ্ডকমধ্যগত করিয়া স্থানান্তরিত করিবার উপায় কল্পনা করিতে লাগিলেন। বায়ু প্রবেশার্থে তাহাতে কতিপয় ছিদ্র প্রস্তুত করিলেন; এবং গ্রোশ্যস এইরূপ সংক্ষিপ্ত স্থানের মধ্যে রুদ্ধ হইয়া কতক্ষণ পর্য্যন্ত থাকিতে পারেন ইহাও পরীক্ষা করিতে লাগিলেন। অনন্তর এক দিবস দুর্গাধ্যক্ষের অসন্নিধানরূপ সুযোগ দেখিয়া তাঁহার সহধর্ম্মিণীর নিকটে গিয়া নিবেদন করিলেন আমার স্বামী অত্যধিক অধ্যয়নদ্বারা শরীরপাত করিতেছেন; অতএব আমি রাশীকৃত সমুদায় পুস্তক এককালে ফিরিয়া দিতে বাসনা করি।

এইরূপ প্রার্থনাদ্বারা তাঁহার সম্মতি লাভ হইলে, নিরূপিত সময়ে গ্রোশ্যস করণ্ডকমধ্যে প্রবেশ করিলেন। অনন্তর দুই জন সৈনিকপুরুষ অধিরোহণী দ্বারা অতি কষ্টে করণ্ডক অবতীর্ণ করিল। ঐ করণ্ডক সমধিকভারাক্রান্ত দেখিয়া তাহাদিগের অন্যতর পরিহাস পূর্ব্বক কহিল ভাই! ইহার ভিতরে অবশ্যই এক আর্ম্মিনিয় আছে। গ্রোশ্যসের পত্নী অব্যাকুল চিত্তে উত্তর করিলেন হাঁ ইহার মধ্যে কতকগুলি আর্ম্মিনিয় পুস্তক আছে বটে। যাহা হউক,সৈনিকপুরুষ করণ্ডকের অসম্ভব ভার দর্শনে সন্দিহান হইয়া উচিতবোধে অধ্যক্ষপত্নীর গোচর করিল। কিন্তু তিনি কহিলেন ইহার মধ্যে অধিক সংখ্যক পুস্তক আছে তাহতেই এত ভারী হইয়াছে; গ্রোশ্যসের শারীরিক স্বাস্থ্য রক্ষার্থে তাঁহার পত্নী ঐ সমুদায় পুস্তক এক কালে ফিরিয়া দিবার নিমিত্ত অনুমতি লইয়াছেন।

এক দাসী এই গোপনীয় পরামর্শের মধ্যে ছিল সে ঐ করণ্ডকের সঙ্গে সঙ্গে গমন করে। করণ্ডক এক বন্ধুর আলয়ে নীত হইলে গ্রোশ্যস অব্যাহত শরীরে তন্মধ্য হইতে নিৰ্গত হইলেন এবং রাজমিস্ত্রির বেশপরিগ্রহ ও করে কর্ণিক ধারণ পুর্ব্বক আপণের মধ্য দিয়া গমন করিয়া নৌকারোহণ করিলেন এবং তদ্দ্বারা ব্রাবণ্টে উপস্থিত হইয়া তথা হইতে শকট যানে এণ্টওয়ের্প প্রস্থান করিলেন। ১৬২১ খৃঃ অব্দের মার্চ্চ মাসে এই শুভ ব্যাপার নির্ব্বাহ হয়। গ্রোশ্যসের সহধর্ম্মিণীর যত দিন এরূপ দৃঢ় প্রত্যয় না জন্মিল, গ্রোশ্যস সম্পূর্ণ রূপে বিপক্ষবর্গের ক্ষমতার বহিভূত হইয়াছেন, তাবৎ তিনি এই সকলের বিশ্বাস জন্মাইয়া রাখিয়াছিলেন যে তাঁহার স্বামী অত্যন্ত রোগাভিভূত হইয়া শয্যাগত আছেন।

কিয়দ্দিন পরে এই বিষয় প্রকাশ হইলে তিনি পুর্ব্বাপর সমুদায় স্বীকার করিলেন। তখন দুর্গাধ্যক্ষ ক্রোধে অন্ধ হইলেন এবং তাঁহাকে দৃঢ় রূপে রুদ্ধ করিয়া যৎপরোনাস্তি ক্লেশ দিতে লাগিলেন। পরিশেষে, তিনি রাজপুরুষদিগের নিকট আবেদন করিয়া মুক্তিপ্রাপ্ত হইলেন। কতকগুলা পামর প্রস্তাব করিয়াছিল তাঁহাকে যাবজ্জীবন কারারুদ্ধ করা কর্ত্তব্য। কিন্তু অনেকেরি অন্তঃকরণে করুণাসঞ্চার হওয়াতে তাহা অগ্রাহ্য হইল। ফলতঃ সকলেই তাঁহার বুদ্ধিকৌশল, সহিষ্ণুতা ও পতিপরায়ণতা দর্শনে ভূয়সী প্রশংসা করিয়াছিলেন।

গ্রোশ্যস ফ্রন্সে গিয়া নির্ভয় ও নিশ্চিন্ত হইয়া বাস করিতে লাগিলেন। কিয়দ্দিবস পরে তাঁহার পরিবারও তথায় সমাগত হইলেন। পারিস রাজধানীতে বাস করা বহুব্যয়সাধ্য; অতএব গ্রোশ্যস প্রথমতঃ কিছু কাল অর্থের অসঙ্গতিনিবন্ধন অত্যন্ত ক্লেশ পাইয়াছিলেন। অবশেষে ফ্রান্সের অধিপতি তাঁহার বৃত্তি নিৰ্দ্ধারিত করিয়া দেন। তিনি অবিশ্রান্ত গ্রন্থ রচনা করিতে লাগিলেন; তাঁহার যশঃশশধর, সমুদায় ইয়ুরোপ মধ্যে বিদ্যোতমান হইতে লাগিল।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী কার্ডিনল রিশিলিযু গ্রোশাসকে কেবল ফ্রান্সের হিতচিন্তা বিষয়ে ব্যাসক্ত হইবার নিমিত্ত অনুরোধ করেন। কিন্তু গ্রোশ্যস, প্রাকৃত জনের ন্যায়, তাঁহার সমুদায় প্রস্তাবে সম্মত না হওয়াতে, তিনি তাঁহাকে অধীনতানিবন্ধন বিস্তর ক্লেশ দিয়াছিলেন। গ্রোশ্যস এইরূপে নিতান্ত হতাদর হইয়া স্বদেশ প্রত্যাগমনার্থে অতিশয় উৎসুক হইলেন। তদনুসারে ১৬২৭ খৃঃ অব্দে তাঁহার সহধর্ম্মিণী বন্ধুবর্গের সহিত পরামর্শ করিয়া কর্ত্তব্যাকর্ত্তব্য স্থিরীকরণার্থ হলণ্ড প্রস্থান করিলেন।

গ্রোশ্যস প্রত্যাগমন বিষয়ে প্রাড়্বিবাকদিগের অনুমতি লাভ করিতে পারিলেন না। কিন্তু তৎকালে দণ্ডনীতি বিষয়ে যে নিয়ম পরীবর্ত্ত হইয়াছিল, তাহার উপর নির্ভর করিয়া, স্বীয় সহধর্ম্মিণীর উপদেশানুসারে, সাহস পূর্ব্বক রটর্ডাম নগরে উপস্থিত হইলেন। যৎকালে তাঁহার নামে বিচারালয়ে অভিযোগ হইয়াছিল, তখন তিনি কোন প্রকারেই অপরাধ স্বীকার ও ক্ষমা প্রার্থনা করিতে চাহেন নাই; বিশেষতঃ, এমন দৃঢ় রূপে আত্মপক্ষ রক্ষা করিয়াছিলেন যে তাঁহার বিপক্ষেরা অত্যন্ত অপদস্থ ও অবমানিত হয়; অতএব তাহারা তৎকাল পর্য্যন্ত তাঁহার পক্ষে খড়্গহস্ত হইয়াছিল। কতকগুলি লোক তাঁহার প্রতি আনুকূল্য প্রদর্শন করিয়াছিলেন। কিন্তু প্রাড়্বিবাকের এই ঘোষণা করিয়া দিলেন,যে ব্যক্তি গ্রোশাসকে রুদ্ধ করিয়া দিতে পারিবেক সে উপযুক্ত পুরস্কার প্রাপ্ত হইবেক। গ্রোশ্যসের জন্মভূমি বলিয়া যে দেশের মুখ উজ্জ্বল হইয়াছে, তত্রত্য লোকেরা তাঁহার প্রতি এইরূপ নৃশংস ব্যবহার করিল। তিনি হলণ্ড পরিত্যাগ করিয়া,হম্বৰ্গ নগরে গিয়া দুই বৎসর অবস্থিতি করিলেন। তথায় অবস্থান কালে, সুইডেনের রাজ্ঞী ক্রিষ্টিনার অধিকারে বিষয় কর্ম্ম স্বীকারে সম্মত হওয়াতে, রাজ্ঞী তাঁহাকে ফ্রান্সের রাজসভায় দৌত্যকার্য্যে নিযুক্ত করিলেন। তিনি তথায় দশ বৎসর অবস্থিতি করেন। ঐ সময়ে কতিপয় উৎকৃষ্ট গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন। উক্ত কাল পরেই, নানা কারণ বশতঃ দৌত্যপদ দুরূহ ও কষ্টপ্রদ বোধ হওয়াতে, বিরক্ত হইয়া কর্ম্ম পরিত্যাগ প্রার্থনায় আবেদন করিলেন। তাঁহার প্রার্থনা গ্রাহ্য হইল। সুইডেনে প্রত্যাগমন কালে হলণ্ডে উপস্থিত হইলেন। তাঁহার দেশীয় লোকেরা পুর্ব্বে তাঁহার প্রতি অত্যন্ত অকৃতজ্ঞতা প্রকাশ করিয়াছিল; এক্ষণে বিশিষ্টরূপ সমাদর করিল।

তিনি সুইডেনে উপস্থিত হইয়া, ক্রিষ্টিনাকে সমস্ত কাগজ পত্র বুঝাইয়া দিয়া, লুবেক প্রত্যাগমনে প্রবৃত্ত হইলেন। কিন্তু পথিমধ্যে অত্যন্ত দুর্যোগ হওয়াতে প্রত্যাবৃত্ত হইতে হইল। পরিশেষে, নিতান্ত অধৈর্য্য হইয়া, ঝড় বৃষ্টি না মানিয়া,এক অনাবৃত শকটে আরোহণ পুর্ব্বক প্রস্থান করিলেন। এই অবিমৃষ্যকারিতাদোষেই তাঁহার আয়ুঃশেষ হইল। রষ্টক পর্যন্ত গমন করিয়া তাঁহাকে বিরত হইতে হইল। এবং ঐ স্থানেই, ১৬৪৫ খৃঃ অব্দে, আগষ্টের অষ্টাবিংশ দিবসে, ত্রিষষ্টি বৎসর বয়ঃক্রম কালে প্রিয়তমা পত্নী এবং ছয় পুত্ত্রের মধ্যে চারিটি রাখিয়া অকস্মাৎ কালগ্রাসে পতিত হইলেন।

গ্রোশ্যস নানাবিষয়ে নানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন। সকলে স্বীকার করেন তদীয় গ্রন্থ পরম্পরা দ্বারা বিজ্ঞান শাস্ত্রের সুচারুরূপ অনুশীলনের পথ পরিষ্কৃত হইয়াছিল। তাঁহার সন্দর্ভসমূহের মধ্যে অধিকাংশই নিরবচ্ছিন্ন শব্দবিদ্যাসম্বদ্ধ অর্থাৎ গ্রীক্ ও লাটিন ভাষার জ্ঞানসাপেক্ষ; সুতরাং তৎসমুদায় এক্ষণে এক প্রকার অকিঞ্চিৎকর হইয়া উঠিয়াছে; এবং তদ্রুপ হওয়াও অন্যায্য নহে। আর ঐ কারণ বশতই তাহার আলঙ্কারিক গ্রন্থ সকলও একান্ত উপেক্ষিত হইয়াছে। তিনি নৈসৰ্গিক ও জাতীয় বিধান বিষয়ে “সন্ধিবিগ্রহবিধি” নামক যে মহা গ্রন্থ লাটিন ভাষায় রচনা করিয়াছেন,অধুনাতন কালে তাহাতেই তাঁহার কীর্ত্তি পৃথ্বী মণ্ডলে দেদীপ্যমান রহিয়াছে। ঐ উৎকৃষ্ট গ্রন্থ দ্বারা ইউরোপীয় অধুনাতন বিধান শাস্ত্রের বিশিষ্টরূপ শ্রীবৃদ্ধি লাভ হইয়াছে।

ইঁহার প্রকৃত নাম হুগো গ্রূট্। গ্রূটশব্দ লাটিন ভাষায় সাধিত হইলে গ্রোশ্যস হয়। ইনি গ্রূট্ অপেক্ষা গ্রোশ্যস নামেই বিশেষ প্রসিদ্ধ।

খৃষ্টধর্মাবলম্বীদিগের মধ্যে আর্মিনিয়স্ নামে একব্যক্তি এক নূতন সম্প্রদায় প্রবর্ত্তিত করেন। প্রবর্ত্তকের নামানুসারে ইহার নাম আর্ম্মিনিয় সম্প্রদায় হইয়াছে অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকদিগের সহিত এই নূতন সম্প্রদায়ের অনুযায়ী লোকদিগের অত্যন্ত বিরোধ ছিল।

যেখানে রাজা নাই সর্ব্বসাধারণ লোকের মতানুসারে যাবতীয় রাজকার্য্য নিৰ্বাহ হয় তাহাকে সর্ব্বতন্ত্র বলে। সর্ব্ব সর্ব্বসাধারণ; তন্ত্র রাজ্যচিন্তা।

টামস জেঙ্কিন্স

টামস জেঙ্কিন্স।

এক্ষণে আমরা এমন এক অদ্ভুত ব্যাপার লিখিতে প্রবৃত্ত হইতেছি যে তাহা দূরদেশ বা অতীত কালে ঘটিলে তাহাতে বিশ্বাস জন্মাইবার সম্ভাবনা ছিল না; এবং বোধ হয় উক্ত হেতুবশতঃ আমরা এ বিষয় লিপিবদ্ধ ও প্রচা- রিত করিতে উদ্যত হইতাম না। কিন্তু বর্ণনীয় বিষয় অত্যন্ত সন্নিহিত দেশে ও সন্নিহিত কালে ঘটিয়াছে। অতএব কোন অংশ অপ্রমাণিক বোধ হইলে অনায়াসে প্রামাণ্য সংস্থাপন করা যাইতে পারিবে; এই নিমিত্ত আমরা অসঙ্কুচিত চিত্তে এ বিষয় প্রচার করিতেছি।

টামস জেঙ্কিন্স আফ্রিকাদেশীয় কোন রাজার পুত্র। তাহার আকার কাফরির সমুদায় লক্ষণোপেত ছিল। তাঁহার পিতা বহ্বায়ত গিনি উপকূলের অন্তর্গত লিটিল কেপ মৌণ্ট সংজ্ঞিত স্থান ও তৎপূর্ব্ববর্তী জনপদের অনেকাংশের অধিপতি ছিলেন। এই উপকূলে ব্রিটে- নীয় সাংযাত্রিকেরা দাস ক্রয়ার্থ সর্ব্বদা গতায়াত করিত। কাফরিরাজ শরীরগত কোন বৈলক্ষণ্য প্রযুক্ত ব্রিটেনীয় নাবিকদিগের নিকট কুক্কুটাক্ষ নামে বিখ্যাত ছিলেন। উয়ুরোপীয়েরা সভ্যতা ও বিদ্যার প্রভাবে বাণিজ্য বিষয়ে কাফরি জাতি অপেক্ষা অনেক উৎকৃষ্ট ইহা প্রত্যক্ষ করিয়া তিনি আপন জ্যেষ্ঠ পুত্রকে বিদ্যানুশীলনার্থে ব্রিটনে পাঠাইবার নিশ্চয় করিলেন। স্কটলণ্ডের অন্তর্গত হাউয়িক প্রদেশীয় কাপ্তেন স্বানষ্টন এই উপকূলে আসিয়া হস্তিদন্ত, স্বর্ণরেণু প্রভৃতি ক্রয় করিতেন। কাফরিরাজ তাঁহার সহিত এই নিয়ম স্থির করিলেন যে আপনি আমার পুত্রকে স্বদেশে লইয়া গিয়া কতিপয় বৎসরে সুশিক্ষিত করিয়া আনিয়া দিবেন; তাহা হইলে আমি এতদ্দেশোৎপন্ন পণ্য বিষয়ে আপনার পক্ষে বিশেষ বিবেচনা করিব।

এই বালক যে প্রকারে স্বনিষ্টনের হস্তে ন্যস্ত হইলেন তাহা তাঁহার অন্তঃকরণে কিছু কিছু জাগরূক ছিল। প্রস্থান দিবসে তাঁহার পিতামাতা কতিপয় কৃষ্ণকায় মহামাত্র সমভিব্যাহারে উপকূল সন্নিহিত এক উন্নত হরিত প্রদেশের প্রান্তভাগে উপস্থিত হইলেন। বালক যথাবিধানে পোতবণিকের হস্তে সমর্পিত হইলেন। তাঁহার জননী রোদন করিতে লাগিলেন। স্বানষ্টন ধর্ম্মপ্রমাণ অঙ্গীকার করিলেন আপনাদিগের পুত্র যত পারেন তত বিদ্যা শিখাইয়া কতিপয় বৎসরের পর আনিয়া দিব। অনন্তর ঐ বালক পোতপরি আনীত হইলেন এবং পোতপতি যদৃচ্ছা ক্রমে তাহার নাম টামস জেন্সি রাখিলেন।

স্বানষ্টন, জেন্সিকে হাউয়িকে আনয়ন করিয়া আপন প্রতিজ্ঞা পরিপালনের যথোচিত উপায় দেখিতেছেন এমন সময়ে দুর্দ্দৈববশতঃ কাল গ্রাসে পতিত হইলেন। এরূপ দুর্দৈব ঘটিলে কি হইবে তাহার কোন প্রতিবিধান করা না থাকাতে জেস্কিন্সের কেবল বিদ্যা শিক্ষারই প্রতিবন্ধ উপস্থিত হইল এমন নহে গ্রাসাচ্ছাদনাদিরূপ অত্যন্ত আবশ্যক বিষয়েও যৎপরোনাস্তি ক্লেশ হইতে লাগিল। হাউয়িকে টৌন ইন নামক পান্থনিবাসের অন্তর্গত এক গৃহে স্বানষ্টনের প্রাণত্যাগ হয়। তথায় জেকিন্স স্কটদেশীয় দুরন্ত হেমন্তের শীতে ম্রিয়মাণ হইয়াও সাধ্যানুসারে তাঁহার শুশ্রুষা করিতে ক্রটি করেন নাই। স্বানষ্টনের মৃত্যুর পর তিনি শীতে কি পর্যন্ত ক্লেশ পাইয়াছিলেন তাহা বর্ণনাতীত। পরিশেষে সেই স্থানের অধিকারিণী বিবি ব্রৌন রন্ধনাগারের রাশীকৃত প্রজ্বলিত জুলনসন্নিধানে তাঁহাকে আনয়ন করিলেন। সমুদায় বাটীর মধ্যে কেবল ঐ স্থানই তাহার সচ্ছান্দাবাসের যোগ্য ছিল। তিনি বিবি ব্রৌনের এই দয়ার কার্য চিরকাল স্মরণ করিতেন।

জেকিন্স সেই পান্থনিবাসে কিয়ৎকাল অবস্থিতি করিলেন। পরে মৃত স্বানষ্টর্নের অতি নিকট কুটুম্ব টিবিয়টহেডবাসী এক কৃষক তদীয় সমস্ত ভার গ্রহণ পূর্ব্বক তাঁহাকে স্বীয় আবাসে আনয়ন করিলেন। তথায় তিনি শূকরশাবক ও হংস কুক্কুটাদি গ্রাম্য বিহঙ্গম গণের রক্ষণাবেক্ষণ প্রভৃতি নিকৃষ্ট কর্ম্ম করিতে লাগিলেন। পান্থনিবাস হইতে প্রস্থান কালে তিনি কোন রূপে ইঙ্গরেজীর এক বর্ণও বুঝিতে পারিতেন না। কিন্তু এখানে আসিয়া অতি ত্বরায় সেই প্রদেশের প্রচলিত ভাষা উচ্চারণের সমুদায় নিয়ম সহিত শিক্ষা করিয়াছিলেন। ল-র বাটীতে যে কয়েক বৎসর অবস্থিতি করিয়াছিলেন তন্মধ্যে কিছুকাল রাখালের কর্ম্ম করেন। তৎপরে এক প্রকার তৃণ শকটপুর্ণ করিয়া হাউয়িকে বিক্রয় করিতে লইয়া যাইতেন। এই কর্ম্ম এমন উত্তমরূপে নির্ব্বাহ করিতেন যে গৃহস্বামী তাহার প্রতি অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন।

জেকিন্স দৃঢ়কায় হইলে পর, ফলনাসনিবাসী লেডল। নামক এক ব্যক্তি কোন অনির্ণীত হেতু বশতঃ তাঁহার প্রতি সদয় হইয়া সেই গৃহস্বামীর নিকট প্রার্থনাপূর্ব্বক আপন বাটীতে আনিয়া রাখিলেন। কৃষ্ণকায় জেকিন্স ফলনাসে আসিয়া সকল কর্মই করিতে লাগিলেন; কখন রাখাল হইতেন,কখন বা মন্দুরায় কর্ম্ম করিতেন; ফলতঃ তিনি কর্ম্মমাত্রেই হস্তার্পণ করিতে পারিতেন। তাঁহার বিশেষ কর্ম্ম এই নির্দিষ্ট ছিল যে, সর্ব্বপ্রকার সংবাদ লইয়া হাউয়িকে যাইতে হইত। অত্যন্ত মেধা থাকাতে তিনি এই কর্ম্মে বিশেষ উপযুক্ত ছিলেন। অনন্তর তিনি ঐ লেডলার এক জন প্রকৃত কৃষাণ হইয়া উঠিলেন।

এই সময়েই বিদ্যা শিক্ষা বিষয়ে তাঁহার প্রথম অনুরাগ জমে। তিনি প্রথম কিরূপে শিক্ষা করিয়াছিলেন সে বিষয় জ্ঞাত নহে। বোধ হয় এই বালকের বিদ্যা শিক্ষা বিষয়ে অবশ্যকর্ত্তব্যতা বোধ ছিল; এবং এইরূপ দুরবস্থায় যত দূর হইতে পারে পিতার মানস পূর্ণ করিবার নিমিত্ত তিনি নিতান্ত উৎসুক ছিলেন। ইহা সম্ভব বোধ হইতেছে লেড়লার সন্তানদিগের অথবা তাঁহার গৃহদাসী দিগের নিকট শিক্ষা আরম্ভ করেন।

লেডলা অতি অল্প দিন মধ্যেই জেঙ্কিন্সকে বর্ত্তিকার শেষ গ্রহণে বিশেষ ব্যগ্র দেখিয়া বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। জেঙ্কিন্স দশা ও বসার অবশেষ সম্মুখে দেখিলেই তৎক্ষণাৎ তাহা লইয়া মন্দুরার উপরিমঞ্চে লুকাইয়া রাখিতেন। এই সকল লইয়া তিনি কি করেন এ বিষয়ে সকলের অন্তঃকরণে নানা সন্দেহ উপস্থিত হইতে লাগিল। ত্বরায় তত্রত্যলোক সকল কৌতুহলপরতন্ত্র হইয়া,জেঙ্কিন্স বাসায় গিয়া কি করেন, এই বিষয়ে অনুসন্ধান করিতে আরম্ভ করিল। কিন্তু সকলেই দেখিয়া চমৎকৃত হইল যে ঐ দীন বালক এক পুস্তক ও প্রস্তরফলক লইয়া অক্ষর লিখিতে অভ্যাস করিতেছেন। দৃষ্ট হইল একটি পুরাতন বীণাষন্ত্রও তাঁহার নিকটে আছে। ঐ যন্ত্রের জন্যে অধঃস্থিত অশ্বদিগকে বহুসংখ্যক রাত্রি অসুখে যাপন করিতে হইত।

এই রূপে বিদ্যানুশীলনে তাঁহার অনুরাগ প্রকাশ হওয়াতে লেডলা তাঁহাকে কোন প্রতিবেশিসংস্থাপিত বৈকালিক পাঠশালায় অধ্যয়ন করিতে অনুমতি দিলেন। তিনি তথায় অল্প দিন মধ্যে এমন বিদ্যোপার্জ্জন করিলেন যে সেই প্রদেশের সমুদায় লোক শুনিয়া চমৎকৃত হইল। যেহেতু কখন কাহারও বোধ ছিল না যে কাফ্রিজাতি কোন কালে বিদ্যার্থী হইতে পারে। যাহা হউক, যদিও তাঁহাকে লেডলার ক্ষেত্রসংক্রান্ত নীচ কর্ম্মেই নিয়ত ব্যাপৃত থাকিতে হইত,তথাপি তিনি অবকাশমতে ক্রমে ক্রমে বিনা সাহায্যে আপনা আপনি লাটিন ও গ্রীক অধ্যয়ন করিতে আরম্ভ করিলেন।

এক বালকের সহিত তাঁহার বন্ধুতা ছিল। সেই বালক উক্ত ভাষাদ্বয়ের অধ্যয়নার্থ যে যে পুস্তক আবশ্যক তাহা তাহাকে পাঠ করিতে দিতেন। আমরা যে সকল বৃত্তান্ত লিখিতেছি ঐ বালক বন্ধুই অধিক বয়সে তৎ সমুদায় আমাদের নিকট প্রেরণ করেন। লেডলার স্ত্রী পুরুষে তাঁহার ইষ্টসিদ্ধি বিষয়ে যথাশক্তি আনুকুল্য করিয়াছিলেন; কিন্তু নিকটে লাটিন ও গ্রীক শিক্ষার বিদ্যালয় না থাকাতে তাঁহারা তাঁহার প্রকৃত রূপে শিক্ষা করিবার সদুপায় ও সুযোগ করিয়া দিতে পারেন নাই।

অনেকেই অনেক বার প্রত্যক্ষ করিয়াছেন যে লেডলারা স্ত্রীপুরুষে তাঁহার প্রতি যে সৌজন্য দর্শাইয়াছিলেন স্বমুখে তাহা বর্ণন করিতে তাঁহার হৃদয়কন্দর কৃতজ্ঞতা প্রবাহে উজ্জ্বলিত ও নয়নদ্বয় বিগলিত বাষ্প সলিলে প্লাবিত হইত। কিয়দ্দিন পরে লাটিন ও গ্রীক ভাষাতে এক প্রকার বোধাধিকার জন্মিলে, তিনি গণিত বিদ্যার অধ্যয়নে প্রবৃত্ত হইলেন।

জেঙ্কিন্স যে এক গ্রীক অভিধান ক্রয় করেন তাহা তাঁহার জীবনচরিতের মধ্যে একটা প্রধান ব্যাপার বলিয়া পরিগণিত হইয়াছে। হাউয়িকে কতকগুলি পুস্তক বিক্রয় হইবে শুনিয়া, তিনি পূর্ব্বনির্দিষ্ট বয়স্যের সহিত তথায় গমন করিলেন। তিনি যে বেতন পাইতেন তাহার মধ্যে ছয় টাকা বাঁচাইয়া রাখিয়াছিলেন। আর তাঁহার সহচরও স্বীকার করিলেন যদি কোন বিশেষ পুস্তক ক্রয় করিবার নিমিত্ত আর কিছু আবশ্যক হয় আমারও বার অনা সংস্থান আছে দিতে পারিব। এক্ষণে অধ্যয়ন বিষয়ে গ্রীকভাষার অভিধান অত্যন্ত উপযোগী জ্ঞান করিয়া বিক্রয় অবসরে জেঙ্কিন্স তাহার মূল্য ডাকিতে আরম্ভ করিলেন। যে পুস্তক কেবল বহুজ্ঞ বিদ্যার্থীর প্রয়োজনোপযোগী, অতি হীনবেশ এক জন কাফরিকে তৎক্রয়ার্থ প্রতিযোগিতা করিতে দেখিয়া,ব্যক্তিমাত্রেই বিস্ময়াপন্ন হইলেন।

মনক্রিফ নামক এক ব্যক্তির জেঙ্কিন্সের সহচরের সহিত আলাপ ছিল। তিনি ইঙ্গিত দ্বারা তাঁহাকে আহ্বন করিয়া কৌতুকাকুলিত চিত্তে এই অদ্ভুত ব্যাপারের রহস্য জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। বালক সবিশেষ সমুদায় নিবেদন করিলেন। তখন মনক্রিফ তাঁহাদের ছয় টাকা বার আনা মাত্র সংস্থান অবগত হইয়া কহিলেন তোমার যত দূর পর্য্যন্ত ইচ্ছা হয় মূল্য ডাকিবে। যাহা অকুলান পড়িবে আমি তাহার দায়ী রহিলাম।

জেঙ্কিন্স, মনক্রিফ মহাশয়ের এই সানুগ্রহ প্রস্তাবের বিষয় অবগত ছিলেন না; সুতরাং তিনি আপনাদের সঙ্গতি পর্যন্ত ডাকিয়া নিরাশ হইয়া বিষন্ন বদনে ক্ষান্ত হইবামাত্র, তাঁহার সহচর মূল্য ডাকিতে লাগিলেন। দীন কাফ্রিবালক তদ্দর্শনে অতিশয় ব্যাকুল হইয়া কহিলেন বয়স্য! কি কর তুমি ত জান আমাদিগের এত মূল্য ও শুল্ক উভয় দিবার সংস্থান নাই। কিন্তু ঐ বালক তাঁহার সেই নিষেধ না মানিয়া পুস্তক ক্রয় করিলেন এবং তৎক্ষণাৎ হৃষ্টচিত্তে বন্ধুহস্তে সমর্পণ করিয়া তাঁহার ক্ষোভ নিবারণ করিলেন। মনক্রিফ মহাশয়কে এ বিষয়ে কেবল আট আনা মাত্র সাহায্য করিতে হইয়াছিল। জেঙ্কিন্স আহ্লাদ সাগরে মগ্ন হইয়া পুস্তক লইয়া প্রত্যাগমন করিলেন। অনন্তর তিনি যে উহা সার্থক করিয়া ছিলেন তদুল্লেখ বাহুল্য মাত্র।

এক্ষণে ইহা জিজ্ঞাস্য হইতে পারে যে কাফ্রি জাতির বুদ্ধির অদ্ভুত আদর্শস্বরূপ সেই সুবোধ বালকের স্বভাৰ ও চরিত্র কিরূপ ছিল। ইহাতে আমরা একবারেই এই উত্তর দিতে পারি যত উৎকৃষ্ট হইতে পারে। জেস্কিন্স বিনীত নিরহঙ্কৃত ও দুষ্ক্রিয়াসক্তিশূন্য ছিলেন। তাঁহার আচরণ এমন অসামান্য সৌজন্য ব্যঞ্জক ছিল যে,পরিচিত ব্যক্তিমাত্রেই তাঁহার প্রতি স্নেহ ও অনুগ্রহ করিতেন। ফলতঃ, সমুদায় উচ্চ টিবিয়টহেড প্রদেশে অতিমাত্র লোকরঞ্জন বলিয়া যাঁহারা বিখ্যাত, ইনি তন্মধ্যে পরিগণিত ছিলেন।

তিনি আপন কার্য্য নির্ব্বাহ বিষয়ে কিঞ্চিম্মাত্রও আলস্য বা ঔদাস্য করিতেন না। এই নিমিত্ত তাঁহার নিযোগ্যেরা অত্যন্ত সমাদর করিতেন এবং জ্ঞানোপার্জ্জন বিষয়ে তাঁহার অদৃষ্টপূর্ব্ব উৎসাহ দর্শনে ব্যক্তিমাত্রেই মুগ্ধ ছিলেন। তাঁহার স্বদেশ ভাষার বিন্দুবিসর্গও মনে না থাকাতে স্কটলণ্ডের দক্ষিণাঞ্চলের সামান্য কৃষকদিগের সহিত শরীরের বর্ণ ব্যক্তিরিক্ত কোন বিষয়েই বিভিন্নতা ছিল না। কিন্তু এই মাত্র বিশেষ যে তিনি তাহাদিগের প্রায় সকল অপেক্ষা সমধিক বিদ্যাসম্পন্ন ছিলেন এবং বিদ্যানুশীলন দ্বারা সময় যাপন করিতেন। খৃষ্টোপদিষ্ট ধর্ম্মে তাঁহার দ্রঢ়ীয়সী শ্রদ্ধা ছিল এবং ধর্ম্মসংক্রান্ত প্রত্যেক বিধি প্রতিপালনে তিনি অত্যন্ত অবহিত ছিলেন। সমুদায় পর্য্যালোচনা করিলে বোধ হয় জেঙ্কিন্স অত্যুৎকৃষ্ট উপাদানে নির্ম্মিত। আর তিনি বিদ্যালাভের নিমিত্ত যে অশেষ প্রকার প্রয়াস পাইয়াছিলেন তাহা গণনা না করিলেও সর্ব্বত্র আদৃত ও প্রিয় হইতেন, সন্দেহ নাই।

জেঙ্কিন্সের বিংশতিবর্ষ বয়ঃক্রম কালে টিবিয়ট হেডের পাঠশালায় শিক্ষকের পদ শূন্য হয়। উক্ত কৃষকবহুল জনপদের নিবাসিগণের শিক্ষার্থে যে পাঠশালা ছিল ইহা তাহার শাখা স্বরূপ। এই বিষয়ে জেটবর্গের যাজকগণের উপর এই ভারার্পণ হইল যে তাঁহারা কোন এক দিন হাউয়িকে সমাগত হইয়া কর্ম্মাকাঙ্ক্ষীদিগের পরীক্ষা করিয়া অধ্যক্ষবর্গের নিকট বিজ্ঞাপনী প্রেরণ করিবেন। পরীক্ষা দিবসে ফলনাসের কৃষ্ণকায় কৃষকও পুস্তকরাশি কক্ষে করিয়া অতি হীনবেশে তথায় উপস্থিত হইয়া পরীক্ষা দানের অনুমতি প্রার্থনা করিলেন। পরীক্ষকেরা কাফরিকে পরীক্ষাদানার্থ উদ্যত দেখিয়া চমৎকৃত হইলেন; কিন্তু তাঁহার স্বভাব চরিত্র বিদ্যাদি বিষয়ক প্রশংসাপত্র দর্শনে অন্যান্য তিন চারি জন কর্ম্মাকাঙ্খীদিগের ন্যায় তাঁহারও যথা নিয়মে পরীক্ষা গ্রহণ করিতে হইল, অস্বীকার করিতে পারিলেন না। পরীক্ষাতে অন্যান্য ব্যক্তি অপেক্ষায় এমন উৎকৃষ্ট হইলেন যে পরীক্ষকদিগকে উপস্থিত ব্যাপারে তাঁহাকেই সর্ব্বাপেক্ষায় উপযুক্ত বলিয়া অধ্যক্ষবর্গের নিকট বিজ্ঞাপনী দিতে হইল। তখন জেস্কিন্স জয়প্রাপ্ত হইয়া হৰ্ষোৎফুল্ল লোচনে এই আলোচনা করিতে করিতে প্রত্যাগমন করিলেন যে এক্ষণে আমি যে পদে নিযুক্ত হইব তাহা পূর্ব্বতন সমুদায় কর্ম্মাপেক্ষা উত্তম এবং তাহাতে বিদ্যোপার্জ্জনের বিশিষ্টৰূপ সুযোগ ও সদুপায় হইবেক।

কিন্তু কিয়ৎকালের নিমিত্ত জেঙ্কিন্সের এই অভ্যুদয়াশা প্রতিহত হইয়া রহিল। পরীক্ষকদিগের বিজ্ঞাপনী যাজকমণ্ডলীর সম্মুখে উপস্থিত হইলে, তাঁহাদের মধ্যে অধিকাংশ ব্যক্তিই কাকরিকে উপস্থিত কর্ম্মে নিযুক্ত করা অযুক্ত বিবেচনা করিয়া, অন্য এক ব্যক্তিকে ঐ পদে নিযুক্ত করিলেন। তদনুসারে তিনি পরীক্ষাদানের সমুদায় ফলে বঞ্চিত হইয়া, জাতি ও অবস্থার অপকর্ষ নিমিত্তই এই সমস্ত দুরবস্থা ঘটিতেছে,এই মনস্তাপে ত্রিয়মাণ হইয়া রহিলেন। কিন্তু যাজকমণ্ডলীর এই অবিচারে তিনি যেরূপ বিষাদ ও ক্ষোভ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন সৌভাগ্যক্রমে বর্ত্তমান ব্যাপারের প্রধান উদ্যোগী ব্যক্তিবর্গ তদনুরূপ অসন্তুষ্ট ও বিরক্ত হইলেন।

অনন্তর ডিউক আব বক্লিয়ু প্রভৃতি ভূম্যধিকারীরা উপস্থিত বিষয়ে বিশিষ্ট রূপে উদ্ঘুক্ত হইয়া বিবেচনা করিয়া স্থির করিলেন যে পরীক্ষোর্ত্তীর্ণ জেঙ্কিন্সকে নিযুক্ত করা যাইবেক এবং এ পর্যন্ত যাজকমণ্ডলীর নিযুক্ত শিক্ষক যত বেতন পাইয়াছেন ইহাকে পুনরায় তাহা ধরিয়া দিতে হুইবেক। তদনন্তর অতি ত্বরায় এক কর্ম্মকারের পুরাণ বিপণিতে স্থান নিরূপণ করিয়া জেঙ্কিন্সকে শিক্ষকের পদে অভিষিক্ত করিলেন। তদ্দর্শনে সমুদায় বালক ও তাহাদের পিতা মাতারা পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হইলেন; সুতরাং অতি অল্প দিনের মধ্যেই সমুদায় ছাত্র পুর্ব্ব পাঠশালা পরিত্যাগ করিয়া জেঙ্কিন্সের নিকটেই অধ্যয়ন করিতে লাগিল। জেঙ্কিন্স কিয়দ্দিন পূর্বে শিক্ষা করিতে গিয়াছিলেন কিন্তু অল্পকালেই শিক্ষা দিতে আরম্ভ করিলেন। এমন বেতন পাইতে লাগিলেন যে তাহাতে আবশ্যক ব্যয় নির্ব্বাহ হইয়া কিঞ্চিৎকিঞ্চিৎ উদ্বৃত্ত হইতে লাগিল।

তিনি অতি ত্বরায় এক জন উৎকৃষ্ট শিক্ষক হইয়া উঠিলেন। তদ্দর্শনে তাঁহার বন্ধুবৰ্গ আনন্দ প্রবাহে মগ্ন হইলেন; আর তাঁহার প্রতিপক্ষ যাজকমণ্ডলীর মুখ মলিন হইল। তিনি শিক্ষা দিবার অত্যুৎকৃষ্ট ও ফলোপধায়ক প্রণালী জানিতেন; কোন প্রকার কার্কশ্য প্রকাশ না করিয়া কেবল কৌশলবলে কার্য্য নির্ব্বাহ করাতে স্বীয় ছাত্রবর্গের সাতিশয় প্রিয় ও নিযোগ্যগণের অত্যন্ত সমাদরণীয় ছিলেন। সপ্তাহে পাঁচ দিন পাঠশালার কার্য্য করিতেন এবং এই কয়েক দিবস স্বয়ং যাহা শিক্ষা করিতেন প্রতি শনিবার অবাধে হাউয়িকে গমন করিয়া তত্রত্য বিদ্যালয়ের অধ্যাপকের নিকট পরিচয় দিয়া আসিতেন। ইহাতে দৃষ্ট হইতেছে যে, তিনি শিক্ষক হইয়াও স্বয়ং শিক্ষা করিতে বিরত ও নিরুৎসাহ হয়েন নাই।

এইরূপে দুই এক বৎসর পাঠশালার কার্য্য সম্পাদন করিলে, জেঙ্কিন্সের দুই শত মুদ্রার সংস্থান হইল। তখন তিনি প্রতিনিধি দিয়া শীত কয়েক মাস কোন প্রধান বিদ্যালয়ে থাকিয়া লাটিন, গ্রীক ও গণিত শাস্ত্র বিশেষরূপে অধ্যয়ন করিবার নিমিত্ত অভিলাষী হইলেন। তিনি পাঠশালার অধ্যক্ষবর্গের অত্যন্ত আদরণীয় ছিলেন; অতএব তাঁহারা সন্তুষ্ট হইয়া তাঁহাকে বিদায় দিলেন। তখন তিনি উপস্থিত ব্যাপারে সৎপরামর্শ লইবার নিমিত্ত তাঁহার দয়ালু বন্ধু মনক্রিফ মহাশয়ের নিকট উপস্থিত হইলেন। এই দয়াবান্ ব্যক্তি তাঁহার গ্রীক অভিধান ক্রয় কালে সাহায্য করিয়াছিলেন এবং তৎপরেও আর আর অনেক উপকার করেন। মনক্রিফ পরিচয় দিবসাবধি জেঙ্কিন্সকে অদ্ভুত পদার্থ মধ্যে গণনা করিতেন। এক্ষণে তাঁহার এই অভিনব প্রস্তাব শ্রবণে আরও চমৎকৃত হইলেন; এবং সর্ব্বাগ্রে তাঁহার সংস্থানের বিষয় জিজ্ঞাসা করিয়া সবিশেষ অবগত হইয়া কহিলেন শুন জেঙ্কিন্স! ইহাতে কোন রূপেই তোমার অভিপ্রায় সিদ্ধ হইতে পারে না। যাহা সঞ্চয় করিয়াছ তদ্দ্বারা শুল্কদান নির্ব্বাহ হওয়াই কঠিন। তিনি শুনিয়া অত্যন্ত বিষণ্ণ ও ক্ষুব্ধ হইলেন। কিন্তু ঐ বদান্য বন্ধু তাঁহার ক্ষোভ শান্তি করিবার নিমিত্ত, তাঁহার হস্তে এক অনুমতি পত্র প্রদান করিয়া কহিলেন এডিনবরা নগরে অমুক বণিককে লিখিলাম, অতিরিক্ত যখন যাহা আবশ্যক হইবেক তাঁহার নিকট চাহিয়া লইবে।

তখন জেঙ্কিন্স অপরিসীম হর্ষ প্রাপ্ত হইয়া এডিনবরা প্রস্থান করিলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া, প্রথমতঃ লাটিনের অধ্যাপকের নিকটে গিয়া, তাঁহার শ্রেণীতে নিবিষ্ট হইবার নিমিত্ত প্রবেশিকা প্রার্থনা করাতে, তিনি তাঁহার দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া আপাততঃ কয়েক মুহূর্ত্ত অবাক হইয়া রহিলেন; অনন্তর জিজ্ঞাসা করিলেন তুমি লাটিনের কিছু শিখিয়াছ কি না। জেঙ্কিন্স বিনীতভাবে উত্তর করিলেন আমি বহু কাল লাটিন অধ্যয়ন করিয়াছি; এক্ষণে উক্ত ভাষায় সম্পূর্ণরূপ জ্ঞানলাভের আশয়ে এই স্থানে আসিয়াছি। উক্ত অধ্যাপক, জেঙ্কিন্স যাহা কহিলেন তাহা যথার্থ নিশ্চয় করিয়া, তৎক্ষণাৎ তাঁহাকে এক প্রবেশিকা প্রদান করিলেন,কিন্তু বদান্যতা প্রদর্শন পূর্ব্বক নিয়মিত শুক গ্রহণ করিলেন না।

অনন্তর জেঙ্কিন্স অন্য দুই জন অধ্যাপকের নিকট প্রার্থনা করাতে,তাঁহারাও উভয়ে প্রথমতঃ চমৎকৃত হইয়াছিলেন; পরিশেষে তাঁহাকে শিষ্যমণ্ডলী মধ্যে নিবেশিত করেন। তাঁহাদের মধ্যে কেবল এক ব্যক্তি শুল্ক গ্রহণ করিয়াছিলেন। তিনি, এইরূপে তিন শ্রেণীতে নিবিষ্ট হইয়া, শীত কয়েক মাস তথায় অবস্থিতি পুর্ব্বক অভিলাষানুরূপ অধ্যয়ন সমাধান করিলেন, অথচ পরম দয়ালু মনক্রিফ মহাশয়ের অনুমতি পত্রের উপরি অধিক নির্ভর করিতে হইল না। বসন্তকাল উপস্থিত হইলে, টিবিয়টহেডে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক তিনি পুনর্ব্বার যথা নিয়মে পাঠশালার কার্য্য করিতে আরম্ভ করিলেন।

এই অদ্ভুত আখ্যানের শেষ ভাগ যেরূপে উপসংহৃত হইলে সকলের মনোরঞ্জন হইত সেরূপ হয় নাই। আমাদিগের বোধে কোন লোকহিতৈষী সমাজের সাহায্যে জেঙ্কিন্সের স্বদেশে প্রতিপ্রেরিত হওয়াই উচিত ছিল। তাহা হইলে তিনি তথায় পৈতৃক প্রজাগণের সভ্যতা সম্পাদন ও শিক্ষা প্রদান করিতে পারিতেন।

প্রায় বত্রিশ বৎসর হইল, প্রতিবেশবাসী কোন সদাশয় ব্যক্তি, সদভিপ্রায়প্রণোদিত হইয়া, ঔপনিবেশিক দাসমণ্ডলীর উপযুক্ত ধর্ম্মোপদেষ্টা বলিয়া, জেঙ্কিন্সকে খৃষ্টধর্ম্মসঞ্চারিণী সভার নিকট বলিয়া দেন। উক্ত সভার অধ্যক্ষেরা জেঙ্কিন্সকে সম্মত করিয়া, উপদেশকতার ভার দিয়া, মরিশস্ উপদ্বীপে প্রেরণ করিয়াছেন। কিন্তু এই নিয়োগ তাঁহার পক্ষে কোন রূপেই উপযুক্ত হয় নাই।

নিকলাস কোপর্নি‌কস

জীবনচরিত।

নিকলাস কোপর্নি‌কস।

পূর্ব্বকালে কাল্ডি‌য়া, ইজিপ্ট, গ্রীস প্রভৃতি নানা জনপদে জ্যোতির্ব্বিদ্যার বিলক্ষণ অনুশীলন ছিল; কিন্তু খৃষ্টীয় শাকের ষোড়শ শতাব্দীর পূর্ব্বে, জ্যোতির্ম্মণ্ডলীর বিষয় বিশুদ্ধৰূপে বিদিত হয় নাই। পূর্ব্বকালীন পণ্ডিতগণের এই স্থির সিদ্ধান্ত ছিল যে, পৃথিবী স্থির এবং অন্তরিক্ষবিক্ষিপ্ত জ্যোতিষ্কসমুদায়ের মধ্যস্থিত; চন্দ্র, শুক্র, মঙ্গল, সুর্য্য, অন্যান্য গ্রহগণ ও নক্ষত্রমণ্ডল তাহার চতুর্দ্দ‌িকে এক এক মণ্ডলাকার পথে পরিভ্রমণ করে; আর তাহদের দূরত্ব ও বেগের বিভিন্নতা প্রযুক্ত, দিবসে ও রজনীতে নভোমণ্ডলের বিচিত্র আকার দেখিতে পাওয়া যায়। এই মত ইয়ুরোপে বহু কাল পর্য্য‌ন্ত প্রবল ও প্রচলিত ছিল।

খৃষ্টীয় শাক প্রারম্ভের ছয় শত বৎসর পূর্ব্বে, এনাক্সিমেণ্ড‌র, পিথাগোরস প্রভৃতি গ্রীসদেশীয় পণ্ডিতগণের মনে অনতিপরিস্ফুট রূপে এই বোধোদয় হইয়াছিল যে সূর্য্য‌ অচল পদার্থ; পৃথিবী একটি গ্রহ, অন্যান্য গ্রহবৎ যথা নিয়মে সূর্য্য‌ের চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করে। তাঁহারা সাহসপূর্ব্বক আপনাদিগের এই বিশুদ্ধ মত প্রচার করিয়াছিলেন; কিন্তু তৎকাল প্রচলিত ধর্ম্মশাস্ত্রের সহিত ঘোরতর বিসংবাদিতা প্রযুক্ত, সাধারণ লোকেরা যৎপরোনাস্তি বিদ্বেষ প্রদর্শন করাতে, বদ্ধমূল করিতে পারেন নাই।

চতুর্দ্দ‌শ ও পঞ্চদশ শতাব্দীতে ইটালি দেশে বিদ্যানুশীলনের পুনরারম্ভ হইলে, সমুদায় বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্যোতির্ব্বিদ্যার কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ আদর হইতে লাগিল। কিন্তু তৎকালে যে মত প্রচলিত ছিল তাহা অরিষ্টটল, টলেমি ও অপরাপর প্রাচীন জ্যোতির্ব্বিদগণের অনুমোদিত প্রণালী অপেক্ষা বিশুদ্ধ ছিল না। তাহাতে এই সিদ্ধান্ত প্রতিপন্ন ছিল যে, সূর্য্য‌ ও গ্রহমণ্ডল ভূমণ্ডলের চতুর্দিকে পরিভ্রমণ করে। যাহা হউক, পরিশেষে এনাক্সিমেণ্ডর ও পিথাগোরসের সঙ্কল্পিত বিশুদ্ধ মত পুনরুজ্জী‌বিত হইবার শুভ সময় উপস্থিত হইল।

যে অধুনাতন পণ্ডিত পূর্ব্বনির্দিষ্ট বিলুপ্তপ্রায় বিশুদ্ধ মত পুনরুজ্জীবিত করেন, তাহার নাম নিকলাস কোপর্নি‌কস। তিনি, ১৪৭৩ খৃঃ অব্দে ফেব্রুয়ারির উনবিংশ দিবসে, বিষ্টুলা নদীর তীরবর্ত্ত‌ী থরন নগরে জন্ম গ্রহণ করেন। উক্ত স্থান এক্ষণে প্রুসিয়ার রাজার অধিকারের অন্তর্গত। জর্ম্মনির অন্তঃপাতী ওয়েষ্টফেলিয়া প্রদেশ কোপর্নি‌কসের পিতার জন্মভূমি। তিনি থরন নগরে চিকিৎসকের কার্য্যে নিযুক্ত হইয়া তথায় বাস করেন। তৎপরে প্রায় দশ বৎসর অতীত হইলে কোপর্নিকসের জন্ম হয়।

কোপর্নি‌কস বাল্যকালে ক্রাকোর বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা বিদ্যা শিক্ষা করিয়াছিলেন। কিন্তু গণিত, পারপ্রেক্ষিত, জ্যোতিষ ও চিত্রকর্ম্ম এই কয়েক বিদ্যায় স্বভাবতঃ অতিশয় অনুরাগী ছিলেন। শৈশবকালেই জ্যোতিষ বিষয়ে বিশিষ্টরূপ প্রতিপত্তি লাভার্থে অত্যন্ত উৎসুক হইয়া, ইটালির অন্তর্ব্বর্ত্তী‌ বলগ্না নগরের বিশ্ববিদ্যালয়ে উক্ত শাস্ত্র অধ্যয়ন করিলেন। সকলে অনুমান করেন তাঁহার অধ্যাপক ডোমিনিক মেরিয়া পৃথিবীর মেরুদণ্ড পরিবর্ত্ত‌ বিষয়ে যে আবিস্কিয়া করেন তদ্দ্বা‌রাই তৎকাল প্রচলিত জ্যোতির্ব্বিদ্যা ভ্রান্তিসঙ্কুল বলিয়া তাঁহার প্রথম উদ্বোধ হয়। অনন্তর বলগ্না হইতে রোমনগরী প্রস্থান করিয়া তথায় কিয়দ্দি‌বস সুচারুরূপে গণিত শাস্ত্রের শিক্ষকতা কার্য্য সম্পাদন করিলেন।

কিয়দ্দি‌ন পরে কোপর্নি‌কস স্বদেশে প্রত্যাগমন করিলেন। তৎকালে তাঁহার মাতুল অর্স‌্ম‌িলণ্ডের বিশপ অর্থাৎ ধর্ম্মাধ্যক্ষ ছিলেন; তিনি তাঁহাকে ফ্রা‌য়েনবর্গে‌র প্রধান দেবালয়ে যাজকতা পদে নিযুক্ত করিলেন। সেই সময়ে থরন নগরের লোকেরাও তাঁহাকে আপনাদিগের এক দেবালয়ে দ্বিতীয় ধর্ম্মাধ্যক্ষের পদে নিরূপিত করেন। এক্ষণে তিনি এই সঙ্কল্প‌ করিলেন, দেবালয়সংক্রান্ত কর্ম্ম ও বিনা বেতনে দরিদ্র লোকের চিকিৎসা এবং অভিলষিত বিদ্যার অনুশীলন এই তিন বিষয় অবলম্বন করিয়া জীবন ক্ষেপণ করিব। প্রধান দেবালয়ের অদূরবর্ত্তী এক উন্নত ভূভাগের উপর ফ্রা‌য়েনবর্গের যাজকদিগের নিমিত্ত যে সমস্ত বাসস্থান নিয়োজিত ছিল, তথা হইতে অত্যুৎকৃষ্ট রূপে গ্রহ নক্ষত্রাদির পর্য্যবেক্ষণ করিতে পারা যায়। কোপর্নি‌কস তাহার অন্যতম স্থানে অবস্থিতি করিলেন।

অনুমান হয়, ১৫০৭ খৃঃ অব্দে, পিথাগোরসের মত উৎকৃষ্ট বলিয়া কোপর্নি‌কসের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে। কিন্তু তৎকালীন লোকের যেরূপ সংস্কার ছিল, উক্ত মত তাহার নিতান্ত বিপরীত। এই নিমিত্ত তিনি মনে মনে স্থির করিলেন এই মত অবলম্বন অথবা প্রচার বিষয়ে সাবধান হইতে হইবেক। তৎকালে দূরবীক্ষণের সৃষ্টি হয় নাই। তদ্ভিন্ন গণিতবিদ্যাসংক্রান্ত আর যে সকল যন্ত্র ছিল তাহাও অত্যন্ত অপকৃষ্ট ও অকর্ম্মণ্য। কোপর্নি‌কস পর্যবেক্ষণ সাধন নিমিত্ত যে দুইটি যন্ত্র পাইয়াছিলেন তাহা দেবদারু কাষ্ঠে অতি সামান্যরূপে নির্ম্মিত ও পরিমাণচিহ্ন স্থলে মসিরেখায় অঙ্কিত। এই মাত্র

উপকরণ সম্পন্ন হইয়া, স্বাবলম্বিত মত প্রমাণসিদ্ধ করিবার নিমিত্ত যে সমস্ত গবেষণা আবশ্যক, কয়েক বৎসর তৎসম্পাদন বিষয়ে মনোনিবেশ করেন। পরিশেষে ১৫৩০ খৃঃ অব্দে এক গ্রন্থ প্রস্তুত করিলেন; তাহাতে এই নূতন প্রণালী বিশেষ রূপে ব্যাখ্যাত হইল।

অন্যান্য লোক অপেক্ষা সমধিক জ্ঞানালোকসম্পন্ন বহুসংখ্যক বিদ্বান্‌ ব্যক্তিরা পূর্ব্বা‌বধি কোপর্নি‌কসের মত অবগত ছিলেন। এক্ষণে তাঁহারা সমুচিত সমাদর ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন পূর্ব্বক তাহা গ্রাহ্য করিলেন। এতদ্ভিন্ন সমুদায় লোক ও ধর্ম্মোপদেশকগণ অপেক্ষাকৃত অজ্ঞ ও কুসংস্কারাবিষ্ট ছিলেন; সুতরাং তাঁহাদের তদ্বিষয়ে শ্রদ্ধা জন্মিবার বিষয় কি।

পূর্ব্বকালীন লোকেরা বিচারের সময় চিরাগত কতিপয় নিৰ্দ্ধারিত নিয়মের অনুবর্তী হইয়া চলিতেন; সুতরাং স্বয়ং তত্ত্বনির্ণয় করিতে পারিতেন না, এবং অন্যে সুস্পষ্ট রূপে বুঝাইয়া দিলেও তাহা স্বীকার করিয়া লইতেন না। তৎকালীন লোকদিগের এই রীতি ছিল পূর্ব্বাচার্য্য‌েরা যাহা নির্দেশ করিয়া গিয়াছিলেন, কোন বিষয়, তাহার বিরুদ্ধ বা বিরুদ্ধবৎ আভাসমান হইলে, তাহা শুনিতে চাহিতেন না। বস্তুতঃ তাঁহারা কেবল প্রমাণ প্রয়োগেরই বিধেয় ছিলেন তত্ত্বনির্ণয়নিমিত্ত স্বয়ং অনুধ্যান বা বিবেচনা করিতেন না। ইহাতে এই ফল জম্মিয়াছিল নির্ম্মলমনীষাসম্পন্ন ব্যক্তিরা অভিজ্ঞতা বা অনুসন্ধান দ্বারা যে

নূতন নূতন তত্ত্ব উদ্ভাবিত করিতেন তাহা, চিরসেবিত মতের বিসংবাদী বলিয়া, অবজ্ঞা রূপ অন্ধকূপে নিক্ষিপ্ত হইত। এই এক সিদ্ধান্ত তাঁহাদের বিশ্বাসক্ষেত্রে বদ্ধমূল হইয়াছিল যে পৃথিবী অচল ও অপরিচ্ছিন্ন বিশ্বের কেন্দ্রভূত। এই মত পূর্ব্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ পণ্ডিতেরা প্রামাণিক বলিয়া অঙ্গীকার করিয়া গিয়াছেন, বহুকালাবধি প্রচলিত হইয়া আসিয়াছে, এবং বস্তু সকল স্থলদৃষ্টিতে আপাততঃ যেরূপ প্রতীয়মান হয় তাহার সহিতও আবিরুদ্ধ; বিশেষতঃ তৎকালীন লোকেরা বোধ করিত বাইবলেরও স্থানে স্থানে ইহার পোষকতা আছে। এই সকল পর্য্যালোচনা করিয়া কোপর্নি‌কস সেই অনেক বৎসরের আয়াসসম্পাদিত গ্রন্থ সহসা প্রচার করিতে পারিলেন না।

পরিশেষে রেটিকস নামে তাঁহার এক বান্ধব, সংক্ষেপে তদীয় গ্রন্থের মর্ম্ম সঙ্কলন পূর্ব্বক সাহস করিয়া, ১৫৪০ খৃঃ অব্দে, এক ক্ষুদ্র পুস্তক মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলেন; কিন্তু তাহাতে স্বীয় নাম নির্দ্দ‌েশ করিলেন না। ইহাতে কেহ বিদ্বেষ প্রকাশ না করাতে, সেই ব্যক্তিই পর বৎসর আপন নাম সমেত উক্ত পুস্তক পুনর্মু‌দ্রিত করিলেন। উভয় বারেই এই মত কোপর্নি‌কসের বলিয়া স্পষ্ট উল্লেখ ছিল। ঐ সময়ে ইরাস্ম‌স রেন্‌হোল্ড নামক এক পণ্ডিত এক খানি পুস্তক প্রচার করেন। তাহাতে তিনি এই নূতন মতের ভূয়সী প্রশংসা লিখিয়া, তৎপ্রব-

র্ত্ত‌ককে দ্বিতীয় টলেমি বলিয়া বর্ণনা করেন। সর্ব্বদা এরূপ ঘটিয়া থাকে, কোন লব্ধপ্রতিষ্ঠ ভ্রান্তিপ্রবর্তকের সহিত তুল্যমূল্য করিয়া গণনা করিলেই তত্ত্বপ্রদর্শকের যথেষ্ট প্রশংসা করা হয়।

তখন কোপর্নি‌কস, আত্মীয়বর্গের প্রবর্ত্ত‌নাপরতন্ত্র হইয়া আপন গ্রন্থ প্রচার করিতে সম্মত হইলেন। তদনুসারে, নরম্বৰ্গবাসী কতিপয় পণ্ডিতের অধ্যক্ষতায়, তন্নগরস্থ যন্ত্রে গ্রন্থ মুদ্রিত হইতে লাগিল। তৎকালে তিনি অত্যন্ত বৃদ্ধ হইয়াছিলেন; জীবিত থাকিয়া আপন গ্রন্থ প্রচারিত দেখা তাঁহার ভাগ্যে ঘটিয়া উঠিল না। গ্রন্থ মুদ্রিত হইবামাত্র, তাহার বন্ধু রেটিকস একখানি পুস্তক পাঠাইয়া দেন। কিন্তু ঐ পুস্তক তাহার তনুত্যাগের কয়েক দণ্ড মাত্র পূর্বে তাঁহার নিকট পহুছে। ১৫৪৩ খৃঃ অব্দে, মে মাসের ত্রয়োবিংশ দিবসে তিনি কলেবর পরিত্যাগ করেন।

এইরূপে, কোপর্নি‌কসের মত ভূমণ্ডলে প্রচারিত হইল। কিন্তু গ্রন্থকর্ত্তার মৃত্যু হইয়াছিল এই বলিয়াই হউক, কিংবা তাদৃশ প্রগাঢ় গ্রন্থ সচরাচর সকলের বুদ্ধিগম্য হইবার বিষয় নহে সুতরাং তদ্দ্বা‌রা সাধারণ লোকের বুদ্ধিব্যতিক্রম বা মতপরিবর্তের সম্ভাবনা নাই এই বোধ করিয়াই হউক,অথবা অন্য কোন অনির্ণীত হেতু বশতঃ, কোন সমাজ বা সম্প্রদায়ের লোক বিদ্বেষ প্রদর্শন করে নাই।

পূর্ব্বকালে গ্রীসদেশে ও রোমরাজ্যে বিদ্যার বিলক্ষণ অনুশীলন ছিল। পরে রোমরাজ্যের উচ্ছেদ হইলে ক্রমে ক্রমে বিদ্যানুশীলমের লোপ হইয়া যায়। অনন্তর এই সময়ে ইটালি দেশে পুনর্ব্বা‌র বিদ্যার অমুশীলন আরম্ভ হয়।

বলণ্টিন জামিরে ডুবাল

বলণ্টিন জামিরে ডুবাল।

এক্ষণে আমরা ডুবালের জীবনবৃত্ত লিখিতে প্রবৃত্ত হইলাম। এই মহানুভাব ১৬৯৫ খৃঃ অব্দে, ফ্রান্স রাজ্যের সাম্পেন প্রদেশের অন্তর্ব্বত্তী আর্র্টনি গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা অত্যন্ত দরিদ্র ছিলেন,সামান্যরূপ কৃষি কর্ম্ম মাত্র অবলম্বন করিয়া যথা কথঞ্চিৎ পরিবারের ভরণপোষণ নির্ব্বাহ করতেন। ডুবাল যখন দশমবর্ষীয়, তখন তাঁহার পিতা মাতা,আর কতক গুলি পুত্র ও কন্যা রাখিয়া পরলোক যাত্রা করেন। তাঁহাদের প্রতিপালনের কোন উপায় ছিল না; সুতরাং ডুবাল অত্যন্ত দুরবস্থায় পড়িলেন। কিন্তু এইরূপ দুরবস্থায় পড়িয়াও মহীয়সী উৎসাহশীলতা ও অবিচলিত অধ্যবসায় প্রভাবে সমস্ত প্রতিবন্ধক অতিক্রম করিয়া অসাধারণ বিদ্যোপার্জ্জনাদি দ্বারা পরিশেষে মনুষ্যমণ্ডলীতে অগ্রগণ্য হইয়াছিলেন। তিনি দুই বৎসর পরে এক কৃষকের আলয়ে পেরুশাবক সকলের রক্ষণাবেক্ষণার্থে নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু বালস্বভাবসুলভ কতিপয় গৰ্হিতাচার দোষে দূষিত হওয়াতে অল্প দিনের মধ্যেই তথা হইতে দূরীকৃত হইলেন। পরিশেষে ঐ কারণেই জন্মভূমিও পরিত্যাগ করিতে হইল।

অনন্তর ডুবাল ১৭০৯ খৃঃ অব্দের দুঃসহ হেমন্তের উপক্রমে লোরেন প্রস্থান করিলেন। পথিমধ্যে বিষম বসন্ত রোগে আক্রান্ত হইলেন। ঐ সময়ে যদি এক কৃষকের আশ্রয় না পাইতেন তাহা হইলে তাঁহার অকালে কালগ্রাসে পতিত হইবার কোন অসম্ভাবনা ছিল না। কিন্তু ভাগ্যক্রমে ঐ ব্যক্তি তাঁহার তাদৃশ দশা দর্শনে দয়ার্দ্র - চিত্ত হইয়া তাঁহাকে আপন মেষশালায় লইয়া গেল। তথায় মেষপুরীষরাশি ব্যতিরিক্ত অন্যবিধ শয্যার সঙ্গতি ছিল না। যাবৎ তাঁহার পীড়োপশম না হইল সেই কৃষক তাঁহাকে মেষপুরীষরাশিতে আকণ্ঠ মগ্ন করিয়া রাখিল এবং অতি কদর্য্য পোড়া রুটি ও জল এই মাত্র পথ্য দিতে লাগিল। এইরূপ চিকিৎসা ও এইরূপ শুশ্রুষাতেও তিনি সৌভাগ্যক্রমে এই ভয়ানক রোগের আক্রমণ হইতে রক্ষা পাইলেন এবং পরিশেষে কোন সন্নিবেশবাসী যাজকের আশ্রয় পাইয়া সম্পূর্ণরূপে মুস্থ হইয়া উঠিলেন।

ডুবাল, নান্সির নিকটে এক মেষপালকের গৃহে নিযুক্ত হইয়া, তথায় দুই বৎসর অবস্থিতি করিলেন। ঐ সময়ে ভূয়সী জ্ঞানবৃদ্ধি সম্পাদন করেন। ডুবাল শৈশবাবধি অনুসন্ধিৎসু ছিলেন। অতি শৈশবকালেই সর্প, ভেক প্রভৃতি অনেকবিধ জন্তু সংগ্রহ করিয়াছিলেন এবং প্রতিবেশী ব্যক্তিবর্গকে, এই সকল জন্তুর কিরূপ অবস্থা, ইহার এরূপে নির্ম্মিত হইল কেন, ইহাদিগের সৃষ্টির তাৎপর্য্যই বা কি, এবম্বিধ বহুতর প্রশ্ন দ্বারা সর্ব্বদাই বিরক্ত করিতেন। কিন্তু এই সকল প্রশ্নের যে উত্তর পাইতেন তাহা যে সন্তোষজনক হইত না ইহা বলা বাহুল্যমাত্র। সামান্যবৃদ্ধি লোকের সামান্য বস্তুকে সামান্য জ্ঞানই করিয়া থাকে। কিন্তু অসামান্যবৃদ্ধিসম্পন্নেরা কোন বস্তুকেই সামান্য জ্ঞান করেন না। এই নিমিত্তেই সর্ব্বদা এরূপ ঘটিয়া থাকে যে প্রাকৃত লোকের মহানুভাবদিগের বুদ্ধির প্রথম কার্য্য সকল দেখিয়া উন্মাদ জ্ঞান করে।

এক দিবস ডুবাল কোন পল্লীগ্রামস্থ বালকের হস্তে ঈসপ রচিত গল্পের পুস্তক অবলোকন করিলেন। ঐ পুস্তক পশু,পক্ষী, সৰ্প প্রভৃতি নানাবিধ জন্তুর প্রতিমূর্ত্তিতে অলঙ্কৃত ছিল। এ পর্যন্ত ডুবালের বর্ণ পরিচয় হয় নাই সুতরাং পুস্তকে কি লিখিত ছিল তাহার বিন্দু বিসর্গও অনুধাবন করিতে পারিলেন না। যে সকল জন্তু দেখিলেন তাহাদিগের নাম জানিতেও তত্তদ্বিষয়ে ঈসপ কি লিখিয়াছেন তাহা শুনিতে অত্যন্ত কৌতুহলাক্রান্ত ও ব্যগ্রচিত্ত হইয়া,আপন সমক্ষে সেই পুস্তক পাঠকরিবার নিমিত্ত স্বীয় সহচরকে অত্যন্ত অনুরোধ করিতে লাগিলেন। কিন্তু সেই বালক কোন ক্রমেই তাঁহার বাসনা পূর্ণ করিল না। ফলতঃ তাঁহাকে সর্ব্বদাই এইরূপে কৌতুহলাক্রান্ত ও পরিশেষে একান্ত বিষাদ প্রাপ্ত হইতে হইত।

এইরূপে যৎপরোনাস্তি ক্ষোভ প্রাপ্ত হইয়া,এতাদৃশ ক্ষুণ্ণ অবস্থায় থাকিয়াও, তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করি লেন যত কষ্টসাধ্য হউক না কেন, যেরূপে পারি, লেখা পড়া শিখিব। এইৰূপ অধ্যবসায়ারূঢ় হইয়া,যে কিছু অর্থ তাঁহার হস্তে আসিতে লাগিল, প্রাণপণে তাহা সঞ্চয় করিতে লাগিলেন; এবং তাহা দিয়া সন্তুষ্ট করিয়া বয়োধিক বালকদিগের নিকট বিদ্যা শিক্ষা আরম্ভ করিলেন।

ভুবাল, কিছু দিনের মধ্যেই অসম্ভব পরিশ্রম দ্বারা আপন অভিপ্রেত এক প্রকার সিদ্ধ করিয়া, ঘটনাক্রমে এক দিবস এক খানি পঞ্জিকা অবলোকন করিলেন। ঐ পঞ্জিকাতে জ্যোতিশচক্রের দ্বাদশ রাশি চিত্রিত ছিল। তিনি তদ্দর্শনে অনায়াসেই স্থির করিলেন যে এই সমস্ত আকাশমণ্ডলস্থিত পদার্থ বিশেষের প্রতিমূর্ত্তি হইবেক, সন্দেহ নাই। অনন্তর ঐ সকল প্রত্যক্ষ করিবার নিমিত্ত একদৃষ্টে নভোমণ্ডল নিরীক্ষণ করিতে লাগিলেন এবং সেই সমুদায় দেখিলাম বলিয়া যাবৎ তাঁহার অন্তঃকরণে দৃঢ় প্রত্যয় না জন্মিল তাবৎ তিনি কোন মতেই ক্ষান্ত হইলেন না।

কিয়দ্দিন পরে তিনি একদ কোন মুদ্রাযন্ত্রালয়ের গবাক্ষের নিকট দিয়া গমন করিতে করিতে তন্মধ্যে এক ভূগোল চিত্র দেখিতে পাইলেন। উহা পূর্ব্বদৃষ্ট সমস্ত বস্তু অপেক্ষায় উপাদেয় বোধ হওয়াতে তিনি তৎক্ষণাৎ ক্রয় করিয়া লইলেন; এবং কিয়দ্দিবস পর্য্যন্ত, অবসর পাইলেই, অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া কেবল তাহাই পাঠ করিতে লাগিলেন। নাড়ীমণ্ডলস্থিত অংশ সকল অবলোকন করিয়া প্রথমতঃ ঐ সমস্তকে ফ্রান্স প্রচলিত লীগ অর্থাৎ সাৰ্দ্ধক্রোশের চিহ্ণ বোধ করিয়াছিলেন। পরন্তু সাম্পেন হইতে লোরেনে আসিতে ঐরূপ অনেক লীগ অতিক্রম করিতে হইয়াছে কিন্তু ভূচিত্রে উহাদিগের অন্তর অতি অল্প লক্ষ্য হইতেছে এই বিবেচনা করিয়া সেই প্রথম সিদ্ধান্ত ভুল বলিয়া স্থির করিলেন। যাহা হউক এই ভূচিত্র ও অন্য অন্য ভূচিত্র সকল অভিনিবেশ পূর্ব্বক পাঠ করিয়া ক্রমে ক্রমে কেবল ঐ সকল চিহ্ণেরই স্বরূপ ও তাৎপর্য্য সূক্ষানুসূক্ষরূপে নিৰ্দ্ধারিত করিলেন এমন নহে ভূগোল বিদ্যা সংক্রান্ত প্রায় সমুদায় সংজ্ঞা ও সঙ্কেতের মর্ম্মগ্রহ করিতে পারিলেন।

ডুবাল এইরূপে গাঢ়তর অনুরাগ ও অভিনিবেশ সহকারে অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। কিন্তু অন্যান্য কৃষীবল বালকেরা অত্যন্ত ব্যাঘাত জন্মাইতে আরম্ভ করিল। অতএব তিনি বিজন স্থান লাভের নিমিত্ত নিতান্ত উৎসুক হইলেন। এক দিবস ঘটনাক্রমে ডিনিযুবরের নিকটে এক আশ্রম দর্শন করিয়া এমন প্রীতি প্রাপ্ত হইলেন যে তৎক্ষণাৎ মনে মনে সঙ্কল্প করিলেন যে তত্রত্য তপস্বী পালিমানের অনুবর্ত্তী হইয়া ধর্ম্ম চিন্তা বিষয়ে কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ মনোনিবেশ করিব। অনন্তর তপস্বী মহাশয়কে আপন প্রার্থনা জানাইলেন। পালিমান অনুগ্রহ প্রদর্শনপুর্ব্বক তাঁহার প্রার্থিত বিষয়ে সম্মত হইলেন এবং আপন অধিকারে যে এক পদ শূন্য ছিল তাহাতে তাঁহাকে নিযুক্ত করিলেন। কিন্তু অনতি চিরকাল মধ্যেই পালিমানের কর্তৃপক্ষীয়েরা ঐ পদে অন্য ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলেন।

লুনিবিলের প্রায় পাদোনক্রোশ অন্তরে, সেণ্ট এন নামে এক আশ্রম ছিল, তথায় কতকগুলি তপস্বী বাস করিতেন। পালিমান সাধ্যানুসারে ডুবালের ক্ষোভ শান্তি করিবার নিমিত্ত তাঁহাদিগের আশ্রমে তাঁহাকে এক অনুরোধ পত্র সমেত পাঠাইয়া দিলেন। সেই সতীর্থ তপস্বীদিগের আজীবনস্বরূপ যে ছয়টি ধেনু ছিল ডুবালের প্রতি তাঁহারা তাহাদিগের রক্ষণাবেক্ষণের ভার দিলেন। বোধ হয়, তপস্বী মহাশয়েরা ডুবাল অপেক্ষা অজ্ঞ ছিলেন কিন্তু তাঁহাদিগের কতকগুলি পুস্তক ছিল, তাঁহারা ডুবালকে তাহা পাঠ করিবার অনুমতি দিলেন। ডুবাল যে যে কঠিন বিষয় স্বয়ং বুঝিতে না পারিতেন তাহা আশ্রমদর্শনাগত ব্যক্তিগণের নিকট বুঝিয়া লইতেন। এখানেও পুর্ব্বের মত কষ্ট স্বীকার করিয়া যে কিছু অর্থ বাঁচাইতে পারিতেন অন্য কোন বিষয়ে ব্যয় না করিয়া তদ্দ্বারা কেবল পুস্তক ও ভুচিত্র মাত্র ক্রয় করিতেন। এই স্থলে বিস্তর ব্যাঘাত সত্ত্বেও লিখিতে ও অঙ্ক কষিতে শিখিলেন।

কোন কোন ভূচিত্রের নিম্নভাগে সন্ত্রান্ত লোক বিশেষের পরিচ্ছদ চিত্রিত ছিল তাহাতে গ্রিফিন, উৎক্রোশ পক্ষী,লাঙ্গুলদ্ধয়োপলক্ষিত কেশরী ও অন্যান্য বিকটাকার অদ্ভুত জন্তু নিরীক্ষণ করিয়া আশ্রমাগত কোন ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসা করিলেন পৃথিবীতে এবম্বিধ জীব আছে কিনা। তিনি কহিলেন কুলাদর্শ নামে এক শাস্ত্র আছে এই সমস্ত তাহার সঙ্কেত। শ্রবণ মাত্র ঐ শব্দটী লিখিয়া লইলেন এবং অতি সত্বর হইয়া নিকটবর্ত্তী নগর হইতে উক্ত বিদ্যার এক পুস্তক ক্রয় করিয়া আনিলেন এবং অবিলম্বে তদ্বিষয়ের বিশেষজ্ঞ হইয়া উঠিলেন।

জ্যোতির্ব্বিদ্যা ও ভূগোলবৃত্তান্ত অধ্যয়নে ডুবাল অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন। তিনি সর্ব্বদাই সন্নিহিত বিপিন মধ্যে নির্জ্জন প্রদেশ অন্বেষণ করিয়া লইতেন এবং একাকী তথায় অবস্থিত হইয়া নির্ম্মল নিদাঘরজনীর অধিকাংশ জ্যোতির্মগুল পর্য্যবেক্ষায় যাপন করিতেন ও মস্তকোপরি পরিশোভমান মৌক্তিকময় নভোমণ্ডলের বিষয় সমধিক রূপে জানিতে মনোরথ করিতেন—যেরূপ অবস্থা,মনোরথের অধিক আর কি ঘটিতে পারে। জ্যোতির্গণের বিষয় বিশিষ্ট রূপে জানিতে পারবেন এই বাসনায় অত্যুন্নত ওকবৃক্ষ শিখরোপরি বন্যদ্রাক্ষা ও উইলো শাখার পরস্পর সংযোজনা করিয়া সারসকুলায়সন্নিভ একপ্রকার বসিবার স্থান নির্ম্মাণ করিলেন।

ডুবালের ক্রমে ক্রমে যত জ্ঞান বৃদ্ধি হইতে লাগিল পুস্তক বিষয়েও তত আকাঙ্ক্ষা বৃদ্ধি হইতে লাগিল। কিন্তু পুস্তক ক্রয়ের যে নিৰ্দ্ধারিত উপায় ছিল তাহার সেরূপ বৃদ্ধি হইল না। অতএব তিনি আয় বৃদ্ধি করিবার নিমিত্ত ফাঁদ পাতিয়া জন্তু ধরিতে আরম্ভ করিলেন ও কিয়ৎকাল এই ব্যবসায় দ্বারা কিছু কিছু লাভও করিতে লাগিলেন আয় বৃদ্ধি সম্পাদন নিমিত্ত কখন কখন অত্যন্ত দুঃসাহসিক ব্যাপারেও প্রবৃত্ত হইতে পরাঙ্মুখ হইতেন না।

একদা তিনি কানন মধ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে বৃক্ষোপরি এক অতি চিক্কণলোমা অরণ্যমাৰ্জ্জার অবলোকন করিলেন। ইহা অনেক উপকারে আসিবে এই বিবেচনা করিয়া তৎক্ষণাৎ বৃক্ষোপরি আরোহণ পূর্ব্বক অতি দীর্ঘ যষ্টি দ্বারা মার্জ্জারকে অধিষ্ঠান শাখা হইতে অবতীর্ণ। করাইলেন। বিড়াল দৌড়িতে আরম্ভ করিল। তিনিও পশ্চাৎ পশ্চাৎ ধাবমান হইলেন। উহা এক তরুকোটরে প্রবেশ করিল; পরে তথা হইতে ত্বরায় নিষ্কাশিত করিবামাত্র তাঁহার হস্তোপরি ঝাঁপিয়া পড়িল। অনন্তর উভয়ের ঘোরতর যুদ্ধ আরম্ভ হইলে, কুপিত বিড়াল তাঁহার মস্তকের পশ্চাদ্ভাগে নখ প্রহার করিল। ডুবাল তথাপি উহাকে টানিতে লাগিলেন। বিড়াল আরো শক্ত করিয়া ধরিল; পরিশেষে খর নখর দ্বারা চর্ম্মের যত দূর আক্রমণ করিয়াছিল প্রায় সমুদায় অংশ উঠাইয়া লইল। অনন্তর ডুবাল নিকটবর্ত্তী বৃক্ষোপরি বারম্বার আঘাত করিয়া মার্জ্জারের প্রাণসংহার করিলেন এবং হর্ষোৎফুল্ললোচনে তাহাকে গৃহে আনিলেন। আর ইহা দ্বারা প্রয়োজনোপযোগী কিছু কিছু পুস্তক সংগ্রহ করিতে পারিব এই আহ্লাদে বিরালকৃত ক্ষতক্লেশ একবার মনেও করিলেন না।

ডুবাল বন্যজন্তুর উদ্দেশে সর্ব্বদাই এইরূপ সঙ্কটে প্রবৃত্ত হইতেন এবং লুনিবিলে গিয়া সেই সেই পশুর চর্ম্ম বিক্রয় দ্বারা অর্থ সংগ্রহ করিয়া পুস্তক ও ভূচিত্র ক্রয় করিয়া আনিতেন।

পরিশেষে এক শুভ ঘটনা হওয়াতে অনেক পুস্তক সংগ্রহ করিতে পারিলেন। এক দিবস শরৎকালে অরণ্য মধ্যে ভ্রমণ করিতে করতে সম্মুখবর্তী শুষ্ক পর্ণরাশিতে আঘাত করিবামাত্র ভূতলে কোন উজ্জ্বল বস্তু অবলোকন করিলেন এবং তৎক্ষণাৎ হস্তে লইয়া দেখিলেন উহা স্বর্ণময় মুদ্রা, উহাতে উত্তমরূপে তিনটি মুখ উৎকীর্ণ আছে। ডুবাল ইচ্ছা করিলেই ঐ স্বর্ণময় মুদ্রা আত্মসাৎ করিতে পারিতেন। কিন্তু তিনি পরের দ্রব্য অপহরণ করা গৰ্হিত ও অধর্ম্মহেতু বলিয়া জানিতেন অতএব পর রবিবারে লুনিবিলে গিয়া তত্রত ধর্ম্মাধ্যক্ষের নিকট নিবেদন করিলেন মহাশয়! অরণ্য মধ্যে আমি এক স্বর্ণ মুদ্রা পাইয়াছি। আপনি এই ধর্ম্মালয়ে ঘোষণা করিয়া দেন যে ব্যক্তির হারাইয়াছে তিনি সেণ্ট এনের আশ্রমে গিয়া আমার নিকটে আবেদন করিলেই আপন বস্তু প্রাপ্ত হইবেন।

কয়েক সপ্তাহের পর ইংলণ্ড দেশীয় ফরষ্টর নামে এক ব্যক্তি অশ্বারোহণে সেণ্ট এনের আশ্রমদ্বারে উপস্থিত হইয়া ডুবালের অন্বেষণ করিলেন এবং ডুবাল উপস্থিত হইলে জিজ্ঞাসিলেন তুমি কি এক মুদ্রা পাইয়াছ? ডুবাল কহিলেন হাঁ মহাশয়! তিনি কহিলেন আমি তোমার নিকট বড় বাধিত থাকিলাম সে আমার মুদ্রা। ডুবাল কহিলেন ক্ষণেক অপেক্ষা করিতে হইবেক অগ্রে আপনি অনুগ্রহ করিয়া কুলাদর্শানুযায়ী ভাষায় নিজ আভিজাতিক চিহ্ন বর্ণন করুন তবে আমি আপনাকে মুদ্রা দিব। তখন সেই আগন্তুক কহিলেন অহে বালক! তুমি আমাকে পরিহাস করিতেছ, কুলাদর্শের বিষয় তুমি কি বুঝিবে। ভুবাল কহিলেন সে যাহা হউক আপনি নিজ আভিজাতিক চিহ্নের বর্ণন না করিলে মুদ্রা পাইবেন না।

ডুবালের নির্ব্বন্ধাতিশয় দর্শনে চমৎকৃত হইয়া ফরষ্টর তাঁহার জ্ঞান পরীক্ষার্থে তাঁহাকে নানা বিষয়ে ভূরি ভূরি জিজ্ঞাসা করিতে লাগিলেন। পরিশেষে তৎকৃত উত্তর শ্রবণে সন্তুষ্ট হইয়া নিজ আভিজাতিক চিহ্ন বর্ণন দ্বারা তাঁহার প্রার্থনা সিদ্ধ করিয়া মুদ্রা গ্রহণ পূর্ব্বক দুই সুবর্ণ পুরস্কার দিলেন; এবং প্রস্থান কালে ডুবালকে, মধ্যে মধ্যে লুনিবিলে গিয়া সাক্ষাৎ করিতে কহিয়া দিলেন। পরে ভুবাল যখন যখন তাঁহার সহিত সাক্ষাৎ করিতেন প্রতিবারেই তিনি তাঁহাকে এক এক রজত মুদ্রা দিতেন। এইরূপে ফরষ্টরের নিকট মুদ্রা ও পুস্তক দান পাইয়া সেণ্ট এনের রাখালের পুস্তকালয়ে চারশত খণ্ড পুস্তক সংগৃহীত হইল। তণ্মধ্যে বিজ্ঞান শাস্ত্র ও পুরাবৃত্ত বিষয়ক বহুতর উৎকৃষ্ট গ্রন্থ ছিল।

এইরূপে ডুবাল দ্বাবিংশতি বর্ষ বয়ঃক্রম প্রাপ্ত হই-লেন; কিন্তু এপর্য্য়ন্ত আপনার হীন অবস্থা পরিবর্ত্তের চেষ্টা এক দিবসের নিমিত্তেও মনে আনেন নাই। ফলতঃ এখনও তিনি জ্ঞান ব্যতীত সর্ব্ব বিষয়েই রাখাল ছিলেন। প্রতিদিন গোচারণ কালে তরুতলে উপবিষ্ট হইয়া আপ-নার চারি দিকে ভুচিত্র ও পুস্তক সকল বিস্তৃত করেন এবং ধেনুগণের রক্ষণাবেক্ষণ বিষয়ে কিঞ্চিম্মাত্রও মনো-যোগ না রাখিয়া কেবল অধ্যয়ন বিষয়েই নিমগ্ন হইয়া থাকেন। ধেনু সকলও সচ্ছন্দ রূপে ইতস্ততঃ চরিতে থাকে।

একদা তিনি এইরূপে অবস্থিত আছেন এমন সময়ে সহসা এক সৌম্যমূর্ত্তি পুরুষ আসিয়া তাহার সম্মুখবর্ত্তী হইলেন। ডুবালকে দেখিয়া তাঁহার হৃদয়ে যুগপৎ কারুণ্য ও বিস্ময় রসের উদয় হইল। এই মহানুভাব ব্যক্তি লোরেনের রাজকুমারদিগের অধ্যাপক, নাম কৌণ্ট বিডাস্পিয়র। ইনি ও রাজকুমারগণ এবং অন্য এক অধ্যাপক মৃগয়া করিতে গিয়াছিলেন। সকলেই ঐ অরণ্যে পথহারা হন। কৌণ্ট মহাশয়, অসংস্কৃত বিরল-কেশ অতি হীনবেশ রাখালের চতুর্দ্দিকে পুস্তক ও ভুচি-ত্ররাশি প্রসারিত দেখিয়া এমন চমৎকৃত হইলেন যে ঐ অদ্ভূত ব্যাপার প্রত্যক্ষ করবার নিমিত্ত স্বীয় সহচরদি-গকে তথায় আনয়ন করিলেন।

এইৰূপে মৃগয়াবেশধারী দেশাধিপতনয়েরা ডবালকে চতুর্দ্দিকে বেষ্টন করিয়া দণ্ডায়মান হইলেন। এই স্থলে পাঠকদিগের স্মরণার্থে ইহা লিখিলে অসঙ্গত হইবেক না যে ঐ কুমারদিগের মধ্যে এক জন পরে মেরিয়া থেরিসার পাণিগ্রহণ করেন এবং জর্ম্মনি রাজ্যের সম্রাট্‌ হয়েন।

এই ব্যাপার নয়নগোচর করিয়া সকলেই একবারে মুগ্ধ হইলেন; পরিশেষে যখন কতিপয় প্রশ্ন দ্বারা তাঁহার বিদ্যা ও বিদ্যাগমের উপায় সবিশেষ অবগত হইলেন তখন তাঁহারা বাক্প‌থাতীত বিস্ময় ও সন্তোষ সাগরে মগ্ন হইলেন। সর্বজ্যেষ্ঠ রাজকুমার তৎক্ষণাৎ কহিলেন তুমি রাজসংসারে চল আমি তোমাকে এক উত্তম কর্ম্মে নিযুক্ত করিব। ডুবাল কোন কোন পুস্তকে পাঠ করিয়াছিলেন রাজসংসারের সংস্রবে মনুষ্যের ধর্ম্মভ্রংশ হয়; এবং নান্সিতেও দেখিয়াছিলেন বড় মানুষের অনুচরেরা প্রায় লম্পট ও কলহপ্রিয়। অতএব অকপট বাক্যে কহিলেন আমার রাজসেবায় অভিলাষ নাই; বরং চিরকাল অরণ্যে থাকিয়া গোচারণ করিয়া নিরুদ্বেগে জীবন ক্ষেপণ করিব; আমি এই অবস্থায় সম্পূর্ণ সুখী আছি। কিন্তু ইহাও কহিলেন যদি মহাশয় আমার অপুর্ব্ব অপুর্ব্ব পুস্তক পাঠ ও সমধিক বিদ্যা ও জ্ঞান লাভের সুযোগ করিয়া দেন তবে আমি আপনকার অথবা যে কোন ব্যক্তির সমভিব্যাহারে যাইতে প্রস্তুত আছি।

রাজকুমার এই উত্তর শ্রবণে অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইলেন; এবং রাজধানীতে প্রত্যাগমন পূর্ব্বক,ডুবালের যথানিয়মে সৎপণ্ডিত ও সদুপদেশকের নিকট বিদ্যাধ্যয়ন সমাধানের নিমিত্ত, নিজ পিতা ডিউককে সম্মত করিয়া, পোণ্টে মৌসলের জেসুটদিগের সংস্থাপিত বিদ্যালয়ে তাহাকে পাঠাইয়া দিলেন।

ডুবাল তথায় দুই বৎসর অবস্থিতি করিয়া জ্যোতিষ, ভূগোল, পুরাবৃত্ত ও পৌরাণিক বিষয় সকল অধিক রূপে অধ্যয়ন করিলেন। তদনন্তর ১৭১৮ খৃঃ অব্দের শেষভাগে ডিউকের পারিস যাত্রাকালে তদীয় সম্মতিক্রমে তৎসমভিব্যাহারে গমন করিলেন, এই অভিপ্রায়ে যে তত্রত্য অধ্যাপকদিগের নিকট শিক্ষা প্রাপ্ত হইতে পারিবেন। অনন্তর পর বৎসর তিনি তথা হইতে লুনিবিলে প্রত্যাগমন করিলে, ডিউক মহাশয় তাহাকে সহস্র মুদ্রা বেতনে আপনার পুস্তকালয়ের অধ্যক্ষ ও সাত শত মুদ্রা বেতনে বিদ্যালয়ে পুরাবৃত্তের অধ্যাপক নিযুক্ত করিলেন এবং কোন বিষয়ে কোন নিয়মে বদ্ধ না করিয়া সচ্ছন্দে রাজবাটীতে অবস্থিতি করিতে অনুমতি দিলেন।

তিনি পুরাবৃত্তে যে উপদেশ দিতে লাগিলেন তাহাতে এমন সুখ্যাতি হইল যে অনেকানেক বৈদেশিকেরাও শুশ্রূষাপরবশ হইয়া লুনিবিলে আসিয়াছিলেন।

ডুবাল স্বভাবতঃ অত্যন্ত বিনীত ও লোকরঞ্জন ছিলেন। তিনি, আপনার পূর্বতন হীন অবস্থার কথা উত্থাপন হইলে তদুপলক্ষে কিঞ্চিন্মাত্রও লজ্জিত বা ক্ষুব্ধ না হইয়া, এবং সেই অবস্থায় যে, মনের সচ্ছন্দে কালযাপন করিতেন ও ক্রমে ক্রমে জ্ঞানের উপচয় সহকারে অন্তঃকরণ মধ্যে যে নব নব ভাবাদয় হইত সেই সমস্ত বর্ণনা করিতে করিতে অপর্য্য়াপ্ত প্রীতি প্রাপ্ত হইতেন।

তিনি প্রথমসংগৃহীত বহুসংখ্যক অর্থ দ্বারা সেণ্ট এনের আশ্রম পুননির্ম্মাণ করিয়া দেন এবং তথায় আপনার নিমিত্তেও এক গৃহনির্ম্মাণ করান। অনন্তর,তরুতলে উপবিষ্ট হইয়া রাজকুমারগণ ও তাঁহাদিগের অধ্যাপক দিগের সহিত যেরূপে কথোপকথন করিয়াছিলেন,কোন নিপুণতর চিত্রকর দ্বারা,সেই অবস্থা ব্যঞ্জক এক আলেখ্য প্রস্তুত করাইলেন এবং ডিউকের সম্মতি লইয়া স্বপ্রত্যবেক্ষিত পুস্তকালয়ে স্থাপন করিলেন। কিয়ৎকাল পরে জন্মভূমি দর্শন বাসনা পরবশ হইয়া তথায় গমন করিলেন এবং যে ভবনে জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা তত্রত্য শিক্ষকের ব্যবহারার্থে প্রশস্তরূপে নির্ম্মাণ করাইলেন; আর গ্রামস্থ লোকের জলকষ্ট নিবারণার্থে নিজ ব্যয়ে অনেক কূপ খনন করাইয়া দিলেন।

১৭৩৮ খৃঃ অব্দে, ডিউকের মৃত্যুর পর তদীয় উত্তরাধিকারী লোরেনের বিনিময়ে টস্কানির আধিপত্য গ্রহণ করিলে,রাজকীয় পুস্তকালয় ফোরেন্স নগরে নীত হইল। ডুবাল তথায় পূর্ব্ববৎ পুস্তকাধ্যক্ষের কার্যনির্ব্বাহ করিতে লাগিলেন। তাঁহার অভিনব প্রভু, হঙ্গরির রাজ্ঞীর পাণি গ্রহণ দ্বারা অত্যুন্নত সম্রাট পদ প্রাপ্ত হইয়া, বিয়েনার পুরাতন ও নূতন টঙ্ক, পৃথিবীর অন্যান্য ভাগ প্রচলিত সমুদায় টঙ্ক সংগ্রহ করিবার বাসনা করিলেন। ডুবালের টঙ্কবিজ্ঞান বিদ্যা বিষয়ে অত্যন্ত অনুরাগ ছিল। অতএব তাঁহাকে উক্ত টঙ্কালয়ের অধ্যক্ষ নিযুক্ত করিলেন; এবং রাজপল্লী মধ্যে রাজকীয় প্রাসাদের অদূরে তঁহার বাস স্থান নির্দ্দিষ্ট করিয়া দিলেন। ডুবাল প্রায় সপ্তাহে এক দিন মহারাজ ও রাজমহিষীর সহিত ভোজন করিতেন।

এইৰূপে অবস্থার পরিবর্ত্ত হইলেও তাঁহার স্বভাব ও চরিত্রের কিঞ্চিন্মাত্র পরিবর্ত্ত হইল না। ইউরোপের এক অত্যন্ত বিষয়রস পরায়ণ নগরে থাকিয়াও, তিনি লোরেনের অরণ্যে যেৰূপ ঋজুস্বভাব ও বিদ্যোপার্জ্জনে একাগ্র ছিলেন, সেই ৰূপই রহিলেন। রাজা ও রাজ্ঞী তাঁহার রমণীয় গুণগ্রামের নিমিত্ত অত্যন্ত প্রীত ও প্রসন্ন ছিলেন; এবং তাহার প্রমাণ স্বৰূপ তাঁহাকে ১৭৫১ খৃঃ অব্দে, আপন পুত্রের উপাচার্য্য়ের পদ প্রদান করেন। কিন্তু তিনি কোন কারণ বশতঃ এই সম্মানের পদ অস্বীকার করিলেন। রাজসংসারে তাঁহার গতিবিধি এত অল্প ছিল যে, কোন কোন রাজকুমারীকে কখন নয়নগোচর করেন নাই, সুতরাং তিনি তাঁহাদিগকে চিনিতেন না। পরে সময় বিশেষে এই কথা উত্থাপন হইলে এক রাজকুমার কহিয়াছিলেন ডুবাল যে আমার ভগিনীদিগকে জানেন না ইহাতে আমি আশ্চর্য্য বোধ করি না, কারণ আমার ভগিণীরা পৌরাণিক পদার্থ নহেন।

এক দিবস তিনি অনুমতি গ্রহণ ব্যতিরেকে চলিয়া যাইতেছেন দেখিয়া, সম্রাট্‌ জিজ্ঞাসা করিলেন আপনি কোথায় যাইতেছেন। ডুবাল কহিলেন গাব্রিলির গান শুনিতে। নরপতি কহিলেন সেত ভাল গাইতে পারে না। কিন্তু বাস্তবিক সে ভাল গাইত, অতএব ডুবাল উত্তর দিলেন আমি মহারাজের নিকট বিনয় বাক্যে প্রার্থনা করিতেছি এ কথা উচ্চ স্বরে কহিবেন না। রাজা কহিলেন কেন। ডুবাল কহিলেন কারণ এই যে, মহারাজের পক্ষে ইহা অত্যন্ত আবশ্যক যে সকলে আপনকার কথায় বিশ্বাস করে; কিন্তু এই কথায় কোন ব্যক্তি বিশ্বাস করিবেক না। বাস্তবিক ডুবাল কোন কালেই প্রসাদাকাঙ্ক্ষী চাটুকার ছিলেন না।

এই মহানুভাব ধর্ম্মাত্মা, জীবনের শেষদশা সচ্ছন্দে ও সম্মানপূর্ব্বক যাপন করিয়া ১৭৭৫ খৃঃ অব্দে, একাশীতি বৎসর বয়ঃক্রমে কলেবর পরিত্যাগ করিলেন। যাঁহারা ডুবালকে বিশেষ রূপে জানিতেন এক্ষণে তাঁহারা সকলেই তাঁহার দেহাত্যয় বার্তা শ্রবণে শোকাভিভূত হইলেন। এম ডি রোশ নামক তাঁহার এক বন্ধু তাঁহার মৃত্যুর পর তল্লিখিত সমুদায় গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়া দুই খণ্ড পুস্তকে মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলেন। মাম্‌স‌ল এনষ্টেশিয়া সোলোফক্‌ নাম্নী সরকেশিয়া দেশীয় এক সুশিক্ষিত যুবতী,দ্বিতীয় কাথিরিনের শয়নাগার পরিচারিকা ছিলেন তাঁহার সহিত ডুবালের জীবনের শেষ ত্রয়োদশ বৎসর যে লেখালেখি চলিয়াছিল সে সমুদায়ও মুদ্রিত হইল। সকলে স্বীকার করেন তাহাতে উভয় পক্ষেরই অসাধারণ বুদ্ধিনৈপুণ্য প্রকাশ পাইয়াছে। বৃদ্ধবয়সে ৰূপবতী যুবতীদিগকে প্রিয় বিবি বলিয়া সম্বোধন করা দূষণাবহ নহে; এই নিমিত্ত তিনি পূর্ব্বোক্ত রমণী ও অন্যান্য যে যে গুণবতী কামিনীদিগকে ভাল বাসিতেন সকলকেই উক্ত বাক্যে সম্বোধন করিতেন।

এই সকল দেখিয়া যদিও নিশ্চিত বোধ হইতে পারে ডুবাল কামিনীগণ সহবাসে পরাঙ্মুখ ছিলেন না; কিন্তু তাহাদের অধিকতর মনোরঞ্জন হইবে বলিয়া কখন পরিচ্ছদ পরিপাটীর চেষ্টা করেন নাই। ফলতঃ অন্তিম কাল পর্য্য়ন্ত তাঁহার বেশ ও চলন প্রায় পূর্ব্বের ন্যায় গ্রাম্যই ছিল। কৃষকদিগের ন্যায় চলিতেন এবং সর্ব্বদা কৃষ্ণপিঙ্গল অঙ্গাবরণ, সামান্য পরিধান, ঘন উপকেশ, কৃষ্ণবর্ণ রোমজ চরণাবরণ পরিতেন এবং লৌহকণ্টকাবৃত স্থূল উপানহ ধারণ করিতেন। তিনি যে পরিচ্ছদ পরিপাটী বিষয়ে এৰূপ অনাদর করিতেন তাহা কোন ৰূপেই কৃত্রিম নহে। তাহার জীবনের পূর্ব্বাপর অবেক্ষণ করিলে, স্পষ্ট বোধ হয় যে কেবল নির্ম্মল জ্ঞানালোকসহকৃত ঋজ স্বভাব বশতই এৰূপ হইত। এই বিষয়ে এক উদাহরণ প্রদর্শিত হইলেই পর্য্য়াপ্ত হইতে পারিবেক। তাঁহার এক জন কর্ম্মকর ছিল তিনি তাহাকে ভৃত্য বোধ না করিয়া বন্ধুমধ্যে গণনা করিতেন। সে ব্যক্তি বিবাহিত পুরুষ; অতএব তিনি প্রতিদিন সকালরাত্রেই তাহাকে গৃহ গমনের অনুমতি দিতেন, এবং তৎপরে যথাকথঞ্চিৎ স্বহস্তেই সামান্য রূপ কিঞ্চিৎ আহার প্রস্তুত করিয়া লইতেন।

ডুবাল স্বীয় অসাধারণ পরিশ্রম ও অধ্যবসায় মাত্র সহায় করিয়া ক্রমে ক্রমে অনেকবিধ জ্ঞানোপার্জ্জন দ্বারা তৎকালীন প্রায় সমস্ত ব্যক্তি অপেক্ষা সমধিক বিদ্যাবান্ হইয়াছিলেন। আর রাজসংসারে ব্যাপক কাল অবস্থিতি করিলে মনুষ্যমাত্রই প্রায় আত্মশ্লাঘা ও দুষ্ক্রিয়াসক্তির পরতন্ত্র হয়; কিন্তু তিনি তথায় অর্দ্ধ শতাব্দীর অধিক কাল যাপন করিয়াছিলেন তথাপি অতিদীর্ঘ জীবনের অন্তিম ক্ষণ পর্য্য়ন্ত এক মূহুর্ত্তের নিমিত্তেও চরিত্রের নির্ম্মলতা বিষয়ে লোরেনাবস্থানকালের রাখাল ভাব পরিত্যাগ করেন নাই। তাহার পূর্ব্বতন হীন অবস্থার দুঃসহ ক্লেশ প্রপঞ্চমাত্র অতিক্রান্ত হইয়াছিল; সরলহৃদয়তা, যদৃচ্ছালাভসন্তোষ ও প্রশান্তচিত্ততা অন্তিম ক্ষণ পর্য্য়ন্ত অবিকৃতই ছিল।

লিনিয়স

লিনিয়স।

সুইডেন রাজ্যের অন্তর্গত স্মিলণ্ড প্রদেশে রাসল্ট নামে এক গ্রাম আছে। চার্লস লিনিয়স, ১৭০৭ খৃঃ অব্দে, তথায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার পিতা মাতা অতিদীন গ্রামপুরোহিত ছিলেন। লিনিয়স অত্যন্ত দরিদ্র ও অগণ্য হইয়াও অলোকসামান্য বুদ্ধিশক্তি, মহোৎসাহশীলতা.ও অবিচলিত অধ্যবসায় প্রভাবে বিজ্ঞানশাস্ত্র ও অন্যান্য বিদ্যা বিষয়ে মনুষ্যসমাজে অগ্রগণ্য হইয়াছেন। অতি শৈশবকালেই প্রকৃতির অনুশীলনে তাঁহার গাঢ় অনুরাগ জন্মে; তন্মধ্যে উদ্ভিদ বিদ্যার আলোচনায় তিনি সমধিক অনুরক্ত ছিলেন। বোধ হয়, বালককালে ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে পরিভ্রমণে ও প্রকৃতিরূপ প্রকাগু পুস্তকের অধ্যয়নে অধিকরত ছিলেন, পাঠশালার নিরূপিত পুস্তকে তাদৃশ মনোনিবেশ করিতেন না। সুতরাং তাঁহার প্রথম শিক্ষকের তদীয় অনাবেশ দর্শনে অতিশয় অসন্তুষ্ট হইয়াছিলেন। তাঁহার পিতা তাহাদিগের মুখে পাঠের গতিশ্রবণে বিরক্ত হইয়া তাঁহাকে উপানৎকারের ব্যবসায়ে নিযুক্ত করিবার সঙ্কল্প করিলেন। কিন্তু পরিশেষে বন্ধুবর্গের সবিশেষ অনুরোধ ও লিনিয়সের সাতিশয় বিনয় পরতন্ত্র হইয়া চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার্থে অনুমতি দিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে তাঁহার,না পুস্তক, না বস্ত্র, না আহারসামগ্রী, কিছুরই সঙ্গতি ছিল না; এমন কি অভীষ্ট উদ্ভিদবিদ্যার অনুশীলন সমাধানার্থে ক্ষেত্রে ক্ষেত্রে ভ্রমণ করিতে পারিবার নিমিত্ত, জীর্ণ চর্ম্মপাদুকাতে বল্কলের তালী দিয়া লইতে হইত। এরূপ দুরবস্থাতেও তিনি প্রতিপত্তি লাভ করিতে লাগিলেন।

লিনিয়স কেবল যৌবনদশায় অবতীর্ণ হইয়াছেন এমন সময়ে অপ্সালের বৈজ্ঞানিক বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষেরা তাঁহাকে এই অভিপ্রায়ে লাপ্লাণ্ডের অতি ভীষণ ভূভাগে পাঠাইবার নিমিত্ত স্থির করেন যে তিনি তত্রত্য নিসর্গোৎপন্ন বস্তু সমুদায়ের তত্ত্ব নিৰ্দ্ধারণ করিয়া আনিবেন। তিনিও অনুরাগ ও ব্যগ্রতা প্রদর্শন পুর্ব্বক পাথেয় মাত্র পর্য্যাপ্ত বেতনে উক্ত বহুপরিশ্রমসাধ্য ব্যাপার সমাধানার্থ এই প্রান্তর দেশে প্রস্থান করিলেন। তথা হইতে প্রত্যাগমনের পর অপ্সালের বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ ও ধাতু বিদ্যা বিষয়ে উপদেশ দিতে আরম্ভ করিলেন। উপদেষ্টব্য বিষয়ে সম্পূর্ণ অধিকার এবং উপদেশ প্রচারের চমৎকারত্ব ও অভিনবত্ব প্রযুক্ত চতুর্দ্দিকে ভূরি ভূরি শ্রোতৃ সমাগম হইল।

কিন্তু উদয়োন্মুখী প্রতিভার নিত্যবিদ্বেষিণী ঈর্ষা, তাঁহার অভ্যুদয়াশা ত্বরায় উচ্ছিন্ন করিল। ইহা উদ্ভাবিত হইল বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম আছে কোন ব্যক্তি অগ্রে উপাধিপত্র প্রাপ্ত না হইলে তথায় উপদেশ দিতে অধিকারী হয় না। দুর্ভাগ্যক্রমে লিনিয়সের বিদ্যালয়সম্পৰ্কীয় কোন প্রশংসাপত্রাদি ছিল না। এই বিষয় উপলক্ষে চিকিৎসা শাস্ত্রের অধ্যাপক ডাক্তর রোজিনের সহিত তাঁহার ঘোরতর বিবাদ উপস্থিত হইল। কিন্তু বন্ধুবর্গের মধ্যবর্ত্তী হইয়া তাঁহাকে সান্ত্বনা না করিলেন। অনন্তর তিনি কতিপয় শিষ্য সহিত অবিলম্বে অপ্সাল হইতে প্রস্থান করিলেন; এবং ধাতু ও উদ্ভিদ বিষয়ের তত্ত্বানুসন্ধানার্থে ডালিকার্লিয়া প্রদেশে পর্য্যটন করিতে লাগিলেন।

লিনিয়স, ডালিকার্লিয়ার রাজধানী ফহলন নগরে উপস্থিত হইয়া, তথাকার প্রধান চিকিৎসক ডাক্তর মোরিয়সের নিকট বিশিষ্টরূপে প্রতিপন্ন হইলেন। উক্ত ডাক্তর দয়াবান্ ও বিদ্যাবান্ ছিলেন। তাঁহার একটি বৃক্ষবাটিকা ছিল তাহাতে কতকগুলি তরু, লতা ও পুষ্প ছিল তদ্দর্শনে লিনিয়স অপরিসীম হর্ষ প্রাপ্ত হইলেন। কিন্তু তাঁহার সমধিকসৌন্দর্য্যাধার আর একটি রমণীয় পুষ্প ছিল। লিনিয়স কখন কোন উদ্যানে বা ক্ষেত্রে, তাদৃশ মনোহর পুষ্প অবলোকন করেন নাই। ফলতঃ আমাদিগের নবীন উদ্ভিদবেত্তা, ডাক্তর মোরিয়সের জ্যেষ্ঠা কন্যার প্রতি সাতিশয় অনুরক্ত হইয়াছিলেন। এবং সেই নবীনা কামিনীরও অন্তঃকরণে গাঢ়তর অনুরাগ সঞ্চার হয়। তখন লিনিয়স অন্তঃকরণের অনুরাগ ও ব্যগ্রতা পরতন্ত্র হইয়া নবপ্রণয়িনীর জনকসন্নিধানে পাণিগ্রহণের কথা উত্থাপন করিলেন। সুশীল ডাক্তর এই নবাগত বিদ্বান্ বাগ্মী যুবা ব্যক্তির ব্যবসায় ও সরলস্বভাব দর্শনে তাঁহার উপর অত্যন্ত সন্তুষ্ট ছিলেন। কিন্তু আপন কন্যাকেও অত্যন্ত ভাল বাসিতেন এবং নবানুরাগপরবশ যুবকজনের মত উর্দ্ধতও অবিমৃষ্যকারী ছিলেন না। অতএব বিবেচনা করিলেন যে, অগ্র পশ্চাৎ না ভাবিয়া, এরূপ সহায়সম্পত্তিহীন ও কোন প্রকার নিয়মিত ব্যবসায় ও বিষয় কর্ম্ম শূন্য অনাথ ব্যক্তিকে জামাতা করিলে কন্যাকে চিরদুঃখিনী করা হয়। অনন্তর তাঁহাকে বিবাহ বিষয়ে আর তিন বৎসর অপেক্ষা করিবার নিমিত্ত সম্মত করিয়া, চিকিৎসা বিদ্যা অধ্যয়নার্থ দৃঢ়রূপে পরামর্শ দিলেন এবং কহিলেন, ইতিমধ্যে আমি কন্যার বিবাহ দিব না; যদি তুমি এই সময় মধ্যে কিঞ্চিৎ সংস্থান করিতে পার, তাহা হইলে আমি, ক্ষণকালও বিলম্ব না করিয়া, প্রসন্নচিত্তে তোমাকে কন্যাদান করিব।

ইহা অপেক্ষা আর কি উৎকৃষ্ট প্রস্তাব হইতে পারে। লিনিয়স স্বীয় নির্ম্মল জ্ঞানের সহায়তা দ্বারা প্রীতিপ্রসার চঞ্চল চিত্তকে স্থিরীভূত করিয়া প্রশংসাপত্র লইবার নিমিত্ত অবিলম্বে লিডন নগরে প্রস্থান করিলেন। তাঁহার প্রস্থানের পূর্ব্বে, কুমারী মোরিয়স,বহুদিনের সংগৃহীত ব্যয়াবশিষ্ট এক শত মুদ্রা আনয়ন করিয়া,প্রণয়ব্রতের বরণও অকৃত্রিম অনুরাগের দৃঢ়তর প্রমাণ স্বরূপ, তাঁহার চরণে সমর্পণ করিলেন। তিনি তাঁহার কোমল করপল্লব মর্দ্দন ও ব্যগ্রচিত্তে বারম্বার মুখ চুম্বন করিলেন এবং অপরিমেয় প্রণয়রসাস্বাদে প্রফুল্লচিত্ত হইয়া অন্তঃকরণ মধ্যে তাঁহার অকৃত্রিম ঔদার্য্যের ভূয়সী প্রশংসা করিতে করিতে বিদায় লইলেন।

অনেকানেক রসজ্ঞ নায়কেরা এমন অবস্থায় মনে মনে কতপ্রকার কল্পনা করিতে করিতে প্রস্থান করেন; এবং মধ্যে মধ্যে নায়িকার উদ্দেশে,বিচ্ছেদ বেদনা নিবেদনদূতীস্বরূপ রসবতী গাথা রচনা করিয়া থাকেন; এবং দুর্ব্বিষহবিরহাধিকাতর হইয়া অনবরত বিলাপ ও পরিতাপ করেন। কিন্তু আমাদের জ্ঞানী নায়ক সেরূপ ছিলেন না। তিনি ইহাই ভাবিয়া প্রফুল্ল হৃদয়ে প্রস্থান করিলেন, ভাল, এক ব্যক্তি আমাকে যথার্থ রূপ ভাল বাসে ও আমার ব্যবসায়ের প্রশংসা করে, আমিও তাহার প্রণয়ের যোগ্য পাত্র হইবার নিমিত্ত বিদ্যা ও খ্যাতিলাভ বিষয়ে প্রাণপণে যত্ব ও পরিশ্রম করিতে ক্রটি করিব না।

অনন্তর তিনি লিডননগরে উপস্থিত হইয়া সাতিশয় যত্ব ও পরিশ্রম সহকারে অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। বোরহেব ও অন্যান্য বিজ্ঞানশাস্ত্রজ্ঞ বিখ্যাত পণ্ডিতদিগের নিকট প্রতিপন্ন হইলেন। এবং আমষ্টর্ডাম নগরের অধ্যক্ষের বাটীর চিকিৎসক হইলেন। যে দুই বৎসর এই কর্ম্মে নিযুক্ত থাকেন ঐ কালে বহুতর পরিশ্রম ও ষত্ব সহকারে কতিপয় উৎকৃষ্ট গ্রন্থ রচনা করেন। পরে সমধিক বিদ্যা লাভ প্রত্যাশায় ইংলণ্ড ও অন্যান্য দেশে ভ্রমণ করিলেন। ফলতঃ তিনি এই সময়ে বিদ্যোপার্জ্জন বিষয়ে যে রূপ অসাধারণ পরিশ্রম ও ষত্ব করিয়াছিলেন শুনিলে অসম্ভব বোধ হয়। বাস্তবিক, পদার্থ বিদ্যা সংক্রান্ত এমন কোন বিষয় ছিল না যে তিনি তাহার তত্ত্বানুসন্ধানে প্রবৃত্ত হয়েন নাই আর তাহা শৃঙ্খলাবদ্ধ করেন নাই। কিন্তু উদ্ভিদবিদ্যার অনুশীলনেই সর্ব্বাপেক্ষা অধিক রত ছিলেন এবং ঐ বিদ্যায় এমন প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছেন যে উহার লোপ না হইলে তাঁহার সেই প্রতিষ্ঠার অপক্ষয় সম্ভাবনা নাই।

লিনিয়স,১৭৩৮ খৃঃ অব্দে,কিছু দিনের জন্যে পারিস যাত্রা করেন। ঐ বৎসরের শেষে তিনি স্বদেশ প্রত্যাগমন পুর্ব্বক ষ্টকহলম নগরে চিকিৎসা ব্যবসায় আরম্ভ করিলেন। প্রথমে সকলে তাঁহাকে অবজ্ঞা করিত। কিন্তু পরিশেষে সৌভাগ্যোদয় বশতঃ রাজ্ঞী ইলিয়োনোরার কাসের চিকিৎসায় কৃতকার্য্য হওয়াতে তদবধি তন্নগরের অতি আদরণীয় চিকিৎসক হইয়া উঠিলেন, সামুদ্রিক সৈন্য সম্পৰ্কীয় চিকিৎসক এবং রাজকীয় উদ্ভিদবিদের পদে নিযুক্ত হইলেন। এইরূপে নিয়মিত আয় ব্যবস্থাপিত হইলে পরম্পরানুরাগসঞ্চারের পাঁচ বৎসর পরে সেই প্রিয়তমা কামিনীর পাণিপীড়ন করিলেন।

কিয়দ্দিবস পরেই লিনিয়স অপ্সলের বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়ুর্ব্বেদের অধ্যাপক নিযুক্ত হইলেন। ঐ সময়ে তাঁহার পূর্ব্বশত্রু রোজিন উক্ত বিদ্যালয়ে উদ্ভিদ বিদ্যার অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত হওয়াতে উভয়ে সদ্ভাব পুর্ব্বক পরম্পরের পদ বিনিময় করিয়া লইলেন। এইরূপে লিনিয়স চিরপ্রার্থিত উদ্ভিদবিদ্যাধ্যাপকপদে অধিরূঢ় হইয়া অতি সম্মান পূর্ব্বক ক্রমাগত সপ্তত্রিংশৎ বৎসর উক্ত কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়াছিলেন।

লিনিয়সের উদ্যোগে কয়েক জন নব্য পণ্ডিত নিসর্গোৎপন্ন পদার্থ গবেষণার্থ দেশে দেশে প্রেরিত হয়েন। কালম, অসবেক, হসল্কিষ্ট ও লোফ্লিং এই কয়েক ব্যক্তি প্রাকৃত ইতিবৃত্ত বিষয়ে যে নানা আবিষ্ক্রিয়া করিয়া গিয়াছেন, পদার্থবিদ্যার শ্রীবৃদ্ধি বিষয়ে লিনিয়সের যে প্রগাঢ় অনুরাগ ও আগ্রহাতিশয় ছিল তাঁহাই তাহার মূল কারণ। ড্রটনিংহলম নগরে সুইডেনের রাজমহিষীর যে চিত্রশালিকা ছিল, তিনি তাহার সবিশেষ বিবরণ প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত লিনিয়সের উপর ভারার্পণ করেন। তিনিও তদনুসারে তত্রত্য সমুদায় শঙ্খ শম্বূকাদির বিজ্ঞানশাস্ত্রানুযায়িনী নুতন শৃঙ্খলা স্থাপন করেন। বোধ হয়,১৭৫১ খৃঃ অব্দে, তিনি ফিলসফিয়া বোটানিকা অর্থাৎ উদ্ভিদমীমাংসা নামে গ্রন্থ প্রকাশ করেন। পরে ১৭৫৪ খৃঃ অব্দে, স্পিশিস প্লাণ্টেয়ম অর্থাৎ উদ্ভিদসংবিভাগ নামে গ্রন্থ রচনা ও প্রচার করেন। এই গ্রন্থে তৎকালবিদিত নিখিল তরু গুল্মাদির সবিশেষ বিবরণ লিখিত হইয়াছে। এই গ্রন্থ লিনিয়সের অন্যান্য গ্রন্থ অপেক্ষ উৎকৃষ্ট ও অবিনশ্বর। ১৭৫৩ খৃঃ অব্দে, এই মহীয়ান্‌ পণ্ডিত, নাইট আব দি পোলার ষ্টার এই উপাধি প্রাপ্ত হইলেন। এই মহতী মর্যাদা ইহার পুর্ব্বে কখন কোন পণ্ডিত ব্যক্তিকে প্রদত্ত হয় নাই। ১৭৬১ খৃঃ অব্দে, তিনি সন্ত্রান্তলোকশ্রেণী মধ্যে পরিগণিত হইলেন। অন্যান্য দেশীয় বৈজ্ঞানিক সমাজ হইতেও বিদ্যাসম্বদ্ধ নানা মর্য্যাদা প্রাপ্ত হয়েন। তিনি ক্রমে ক্রমে ঐশ্বর্য্যশালী হইয়া অপ্সাল সন্নিহিত হামার্ব্বি নগরে এক অট্টালিকা ও ভূম্যধিকার ক্রয় করিয়া জীবনের শেষ পঞ্চদশ বৎসর প্রায় তথায় অবস্থিতি করেন। ঐ স্থানে তাঁহার প্রাকৃত ইতিবৃত্ত সংক্রান্ত এক চিত্তশালিকা ছিল, তথায় উক্ত বিদ্যা বিষয়ে উপদেশ দিতে আরম্ভ করিলেন। পৃথিবীর নানাভাগস্থিত বিজ্ঞানশাস্ত্রজ্ঞ লোকও অধ্বনীনবর্গের সাহায্যে তাঁহার ঐচিত্তশালিকার সর্ব্বদাই বৃদ্ধি হইতে লাগিল।

লিনিয়স, জীবনের অধিকাংশ,শারীরিক মুস্থ ও পটু থাকাতে অতিশয় উৎসাহ ও পরিশ্রম স্বীকার পুর্ব্বক পদার্থবিদ্যাবিষয়িণী গবেষণা সম্পাদনে সমর্থ হইয়াছিলেন। কিন্তু ১৭৭৪ খৃঃ অব্দের মে মাসে, অপস্মার রোগে আক্রান্ত হইলেন। অতএব অধ্যাপনা সংক্রান্ত যে সকল কর্ম্মে গুরুতর পরিশ্রম করিতে হইত তৎসমুদায় পরিত্যাগ করিতে ও বিদ্যানুশীলনে ক্ষান্ত হইতে হইল। অনন্তর ১৭৭৬ খৃঃ অব্দে, দ্বিতীয় বার ও কিয়দ্দিন পরে আর এক বার ঐ রোগে আক্রান্ত হইলেন। পরিশেষে ১৭৭৮ খৃঃ অব্দে জানুয়ারির একাদশাহে তাঁহার প্রাণ ত্যাগ হয়।

লিনিয়স পূর্ব্বোক্ত গ্রন্থ সমূহ ব্যতিরিক্ত ভেষজনির্ণয় এবং রোগনির্ণয় বিষয়ে এক এক প্রণালীবদ্ধ গ্রন্থ রচনা করেন। তিনি যেরূপ অসাধারণ সাহস, উৎসাহ, পারশ্রম ও দক্ষতা প্রকাশ করিয়াছেন বিজ্ঞানশাস্ত্রের সমুদায় ইতিহাস মধ্যে অতি অল্প লোকের সেরূপ দেখিতে পাওয়া যায়। তিনি পদার্থবিদ্যা বিষয়ে যে নানা প্রণালী ব্যবস্থাপিত করিয়াছেন কালক্রমে তৎসমুদায় অন্যথা হইলেও হইতে পারে। তথাপি তাঁহা হইতে উক্ত বিদ্যার যেরূপ মহীয়সী শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছে তাহা বাকপথাতীত। সুইডেনের অধিপতি চতুর্দশ চার্লস, ১৮১৯ খৃঃ অব্দে, লিনিয়সের জন্মভূমিতে তাঁহার এক কীর্ত্তিস্তম্ভ নির্ম্মাণের আদেশ করিয়াছেন।

ইঁহার প্রকৃত নাম লিনি; কিন্তু লাটিন ভাষায় সাধিত হইলে লিনিয়স্ হয়। ইনি লিনিয়স্ নামেই বিশেষ প্রসিদ্ধ।

সর আইজাক নিউটন

১৮

সর আইজাক নিউটন

যে বৎসর গালিলিয় কলেবর পরিত্যাগ করেন সেই বৎসরেই আইজাক নিউটনের জন্ম হয়। তিনি, লিঙ্কলনসায়রের অন্তঃপাত,কোল্ট‌র্স‌ওয়ার্থ নামক গ্রামে ১৬৪২ খৃঃ অব্দের ২৫এ ডিসেম্বর, শরীর পরিগ্রহ করেন। তাঁহার পিতা তাদৃশ সঙ্গতিপন্ন ছিলেন না, কেবল যৎকিঞ্চিৎ ভূমি কর্ষণ দ্বারা জীবিকা সম্পাদন করিতেন। নিউটন সুবিখ্যাত কোপর্নি‌কস ও গালিলিয়ের উদ্ভাবিত বিষয় সমূহের প্রামাণ্য সংস্থাপনার্থেই জন্ম গ্রহণ করিয়া ছিলেন।

তিনি প্রথমতঃ মাতৃ সন্নিধানে কিঞ্চিৎ শিক্ষা করিয়া দ্বাদশবর্ষ বয়ঃক্রম কালে গ্রন্থাম নগরের লাটিন পাঠশালায় প্রেরিত হন। তথায় তাঁহার, শিল্প‌বিষয়ক নব নব কৌশল প্রকাশ দ্বারা, শৈশবকালেই অসাধারণ বুদ্ধির লক্ষণ প্রদর্শিত হয়। ঐ সকল শিল্পকৌশল দর্শনে তত্রত্য‌ লোকেরা চমৎকৃত হইয়াছিল। পাঠশালার সকল লোকেই, বিরামের অবসর পাইলে, খেলায় আসক্ত হইত; কিন্তু তিনি সেই সময়ে নিবিষ্টমনা হইয়া ঘরট্ট প্রভৃতি যন্ত্রের প্রতিরূপ নির্ম্মাণ করিতেন। একদা তিনি একটা পুরাণ বাক্স‌ লইয়া জলের ঘড়ী নির্ম্মাণ করিয়াছিলেন। ঐ ঘড়ীর শঙ্ক, বাক্স মধ্য হইতে অনবরত বিনির্গ‌ত জলবিন্দু পাত দ্বারা নিমগ্ন কাষ্ঠখণ্ড প্রতিঘাতে, পরিচালিত হইত; আর বেলাবোধনার্থ তাহাতে একটি প্রকৃত শঙ্কু‌পট্ট ব্যবস্থাপিত ছিল।

নিউটন পাঠশালা হইতে বহির্গত হইলে ইহাই স্থির হইয়াছিল যে, তাঁহাকে কৃষিকর্ম্ম অবলম্বন করিতে হইবেক। কিন্তু অতি ত্বরায় ব্যক্ত হইল তিনি এরূপ পরিশ্রমসাধ্য ব্যাপারে কোন ক্রমেই সমর্থ নহেন। সর্ব্বদাই এরূপ দেখা যাইত, যে সময়ে তাঁহার পশুরক্ষণ ও ভৃত্যগণের প্রত্যবেক্ষণ করিতে হইবেক তখন তিনি নিশ্চিন্তমনে তরুতলে উপবিষ্ট হইয়া অধ্যয়ন করিতেন। কৃষিলব্ধ দ্রব্যজাত বিক্রয়ার্থে গ্রন্থমের আপণে প্রেরিত হইলে, তিনি স্বসমভিব্যাহারী বৃদ্ধ ভূত্যের উপর সমস্ত কার্য্য নির্ব্বাহের ভার সমর্পণ করিয়া, পরিশুষ্ক তৃণরাশির উপর উপবেশন পূর্ব্বক গণিতবিষয়ক প্রশ্ন সমাধান করিতেন। জননী, তাঁহার বিদ্যাভ্যাস বিষয়ে এইরূপ স্বাভাবিক অতি প্রগাঢ় অনুরাগ দর্শনে, সমুৎসুক হইয়া পুনর্ব্বার আর কয়েক মাসের নিমিত্ত তাঁহাকে পাঠশালায় পাঠাইয়া দিলেন। পরে, ১৬৬০ খৃঃ অব্দের ৫ই জুন, তিনি কেম্ব্র‌িজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্তর্ব্বত্তী ত্রিনীতি নামক বিদ্যালয়ে বিদ্যার্থী রূপে পরিগৃহীত হইলেন।

নিউটন, পরিশ্রম প্রজ্ঞা সুশীলতা ও অহমিকাশূন্য সদাচরণ দ্বারা, আইজাক বারো প্রভৃতি অধ্যাপকবর্গের অনুগৃহীত ও সহাধ্যায়িগণের প্রশংসাভূমি ও প্রণয়ভাজন হইয়াছিলেন। তিনি কেম্ব্র‌িজে প্রবিষ্ট হইয়া প্রথমতঃ সর্গু‌সন রচিত ন্যায়শাস্ত্র, কেপ্লরপ্রণীত দৃষ্টিবিজ্ঞান, ওয়ালিস লিখিত অস্থিতপাটীগণিত, এই কয়েক গ্রন্থ পাঠ করেন; সাতিশয় পরিশ্রম সহকারে ডেকার্ট রচিত রেখাগণিত গ্রন্থও অধ্যয়ন করেন; আর তৎকালে নক্ষত্রবিদ্যারও কিছু কিছু চর্চা থাকাতে তাহারও অনুশীলন করিয়াছিলেন। তিনি ইউক্লিডের গ্রন্থ অত্যল্প‌মাত্র পাঠ করেন। এরূপ প্রসিদ্ধ আছে যে তিনি, প্রাচীন গণিতজ্ঞদিগের গ্রন্থ উত্তম রূপে পাঠ করা হয় নাই বলিয়া, উত্তর কালে অনুতাপ করিয়াছিলেন।

নিউটন, কেম্ব্র‌িজে অধ্যয়নকালে, আলোক পদার্থের তত্ত্বনির্ণয়ার্থ অত্যন্ত যত্নবান্ হইয়াছিলেন। ইহার পূর্ব্ব‌ে এই বিষয়ে লোকের অত্যল্প‌ জ্ঞান ছিল। বিখ্যাত পণ্ডিত ডেকার্ট এই সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন যে অন্তরিক্ষব্যাপী স্থিতিস্থাপক গুণোপেত অতি বিরল পদার্থবিশেষের সঞ্চালন বিশেষ দ্বারা আলোকের উৎপত্তি হয়। নিউটন এই মত খণ্ডন করিলেন। তিনি অন্ধকারাবৃত গৃহ মধ্যে প্রবেশ পূর্ব্বক বহুকোণবিশিষ্ট এক খণ্ড কাচ লইয়া কপাটের ক্ষুদ্র ছিদ্র দ্বারা তদুপরি সূর্য্য‌েরকিরণ পাতিত করিতে লাগিলেন। এইরূপ পরীক্ষা দ্বারা দেখিতে পাইলেন আলোক কাচের মধ্য দিয়া গমন করিয়া এ প্রকার ভঙ্গুর হইয়াছে যে, ভিত্তির উপর সপ্তবিধ বিভিন্ন বর্ণ প্রকাশ পাইয়াছে। অনন্তর অসাধারণ কৌশল পূর্ব্বক অশেষ প্রকারে পরীক্ষা করিয়া এই কয়েক মহোপকারক বিষয় নিৰ্দ্ধারিত করিলেন; আলোকপদার্থ কিরণাত্মক; ঐ সকল কিরণকে বিভক্ত করিয়া অণু করা যাইতে পারে; শুক্ল আলোকের প্রত্যেক কিরণে রক্ত, পীত, নীল, এই তিন মূলীভূত কিরণ আছে; এই ত্রিবিধ কিরণ অপেক্ষাকৃত ন্যূনাধিক ভঙ্গুর হইয়া থাকে। নিউটনের এই অসাধারণ অভিনব আবিষ্ক‌্র‌িয়াকে দৃষ্টিবিজ্ঞান শাস্ত্রের মূলসূত্র স্বরূপ গণনা করিতে হইবেক।

১৬৬৫ খৃঃ অব্দে, কেম্ব্র‌িজ নগরে অকস্মাৎ ঘোরতর মারী ভয় উপস্থিত হওয়াতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের সমুদায় ছাত্রকে স্থান ত্যাগ করিতে হইয়াছিল। নিউটনও ঐ সময়ে আত্মরক্ষার্থে আপন আলয়ে পলায়ন করিলেন। তথায় পুস্তকালয়ের অসদ্ভাব প্রযুক্ত ইচ্ছানুরূপ পুস্তক পাঠ করিতে পাইতেন না; এবং পণ্ডিতবর্গের অসন্নিধান প্রযুক্ত শাস্ত্রীয় আলাপেরও সুযোগ ছিল না। তথাপি, তিনি ঐ সময়ে গুরুত্বের নিয়ম অর্থাৎ বস্তুমাত্রের ভূতলাভিমুখে পাতপ্রবণতার বিষয় প্রথম প্রকাশ করিয়াছিলেন। উক্ত মহত্তর আবিষ্ক‌্র‌িয়া দ্বারা নিউটনের এই অনধ্যায় বৎসর সকল, তাঁহার জীবনের শ্লাঘ্যতম ভাগ ও বিজ্ঞানশাস্ত্রীয় ইতিবৃত্তেরও চিরস্মরণীয় ভাগ বলিয়া এক দিবস তিনি উপবন মধ্যে উপবিষ্ট আছেন; এমন সময়ে দৈবযোগে তাঁহার সম্মুখবর্তী আতাবৃক্ষ হইতে এক ফল পতিত হইল। তদ্দ‌র্শনে তিনি তৎক্ষণাৎ বস্তুমাত্রের পতননিয়ামক সাধারণ কারণ বিষয়ক পর্য্য‌ালোচনায় প্রবৃত্ত হইলেন। অনন্তর এই বিষয় পুনর্ব্ব‌ার আলোচনা করিয়া স্থির করিলেন, যে কারণানুসারে আতা ভূতলে পতিত হইল সেই কারণেই চন্দ্র ও গ্রহমগুলী স্ব স্ব কক্ষে ব্যবস্থাপিত আছে এবং তাহাই পরমাদ্ভুত শক্তি সহকারে অতি সহজে সমুদায় জ্যোতিষ্কমণ্ডলীর গতি নিয়মিত করিতেছে। এইরূপে গুরুত্বের নিয়ম প্রকাশিত হইল। এই নিয়মের জ্ঞান দ্বারা জ্যোতির্ব্বিদ্যার অপেক্ষাকৃত অনেক শ্রীবৃদ্ধি হইয়াছে।

নিউটন, ১৬৬৭ খৃঃ অব্দে, কেম্ব্র‌িজে প্রত্যাগমন করিয়া ত্রিনীতি বিদ্যালয়ের ছাত্রবৃত্তি প্রাপ্ত হইলেন। দুই বৎসর পরে, তাঁহার বন্ধু ডাক্তর বারো গণিত শাস্ত্রের অধ্যাপক পদ পরিত্যাগ করিলে, তিনি তাহাতে নিযুক্ত হইলেন। তিনি দৃষ্টিবিজ্ঞান বিষয়ে যে সকল অভিনব মহত্তর নিয়ম প্রকাশ করিয়াছিলেন প্রথমতঃ কিছুকাল তদ্বিষয়েই অধিকাংশ উপদেশ প্রদান করেন। আলোক ও বর্ণ বিষয়ে সম্পূর্ণ জ্ঞান থাকাতে আপনার নূতন মত এমন পরিষ্কার রূপে বুঝাইয়া দিলেন যে শ্রোতৃবর্গেরা সন্তুষ্ট চিত্তে ভূরি ভূরি প্রশংসা করিয়াছিলেন।

১৬৭১ খৃঃ অব্দে, রএল সোসাইটী নামক রাজকীয় সমাজের ফেলো অর্থাৎ সহযোগী হইলেন। কিন্তু প্রসিদ্ধ আছে অন্যান্য সহযোগীর ন্যায় সভার ব্যয় নিৰ্বাহার্থে প্রতি সপ্তাহে রীতিমত এক এক সিলিং দিতে অসমর্থ হওয়াতে তাঁহাকে অগত্যা অদানের অনুমতি প্রার্থনা করিতে হইয়াছিল। যেহেতু, তৎকালে বিদ্যালয়ের বৃত্তিও অধ্যাপকতার বেতন এতদ্ব্যতিরিক্ত তাঁহার আর কোন প্রকার অর্থাগম ছিল না। আর পৈতৃক বিষয় হইতে যে কিছু কিছু উৎপন্ন হইত তাহা তাঁহারর জননী ও অন্যান্য পরিবারের গ্রাসাচ্ছাদনেই পর্য্যবসিত হইত। তাহার ভোগভৃষ্ণা এত অল্প ছিল যে আবশ্যক পুস্তকের ও বৈজ্ঞানিক যন্ত্রের ক্রয় এবং অন্যের দারিদ্র্য দুঃখ বিমোচন এই উভয় সম্পন্ন হইলেই সন্তুষ্ট হইতেন, এতদ্ব্যতিরিক্তবিষয়ে অর্থাভাব জন্য ক্ষুণ্ণমনা হইতেন না।

১৬৮৩ খৃঃ অব্দে, তিনি প্রিন্সিপিয়া নামক অতি প্রধান গ্রন্থ রচনা করেন। ঐ পুস্তকে গণিত শাস্ত্রানুসারে পদার্থবিদ্যার মীমাংসা করা হইয়াছে। ১৬৮৮ খৃঃ অব্দে, যখন রাজবিপ্লব ঘটে কেম্ব্রি‌জ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিরূপ হইয়া পার্লি‌মেণ্টনামক সমাজে উপস্থিত হইবার নিমিত্ত সকলে তাঁহাকে মনোনীত করিয়াছিল; এবং ১৭৩১ খৃঃ অব্দেও ঐ মর্য্যাদার পদ পূনর্ব্বার প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। যে সকল ব্যক্তির যথার্থ উপকার ও পুরস্কার করিবার ক্ষমতা ছিল; নিউটনের অসাধারণ গুণ তাঁহাদের গোচর হওয়াতে তিনি তদীয় আনুকূল্য বলে টাকশালের অধ্যক্ষের পদে নিযুক্ত হইলেন। সূক্ষ্মানুসূক্ষ্ম অনুসন্ধান বিষয়ে অত্যন্ত সহিষ্ণুতা ও সবিশেষ নৈপুণ্য থাকাতে তিনিই সর্ব্বাপেক্ষায় ঐ পদের উপযুক্ত ছিলেন। নিউটন মৃত্যুকাল পর্যন্ত ঐ কার্য্য সম্পাদন করিয়া সর্ব্বত্র সূখ্যাতি প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

অতঃপর নিউটন বহুতর প্রশংসা ও পুরস্কার প্রাপ্ত হইতে লাগিলেন। লিবনিজ নামক এক জন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত, নিউটনের নব নব আবিষ্ক‌্র‌িয়ানিবন্ধন অসাধারণ সন্মান দর্শনে ঈর্ষ্যাপরবশ হইয়া তদ্বিলোপবাসনায় তাঁহার নিকট এক প্রশ্ন প্রেরণ করেন। তিনি মনে মনে সিদ্ধান্ত করিয়াছিলেন নিউটন কোন রূপেই ইহার সমাধান করিতে পারবেন না তাহা হইলেই আমার প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হইবেক। নিউটন টাকশালের সমস্ত দিনের পরিশ্রমের পর সায়াহ্নে ঐ প্রশ্ন পাইলেন এবং শয়নের পুর্ব্বেই তাহার সমাধান করিয়া রাখলেন। তৎপরে আর কোন ব্যক্তিই কখন নিউটনের কীর্ত্তিবিলোপের চেষ্টা করে নাই। ১৭০৫ খৃঃ অব্দে ইংলণ্ডেশ্বরী এন, নিউটনের মানবৰ্দ্ধনার্থে, তাহাকে নাইট্‌ উপাধি প্রদান করেন।

নিউটন উদারস্বভাবতা প্রযুক্ত সামান্য সামান্য লৌকিক ব্যাপারেও বিশেষ অবহিত ছিলেন। সর্ব্বদা আত্মীয়গণের সহিত সাক্ষাৎ করিতে যাইতেন এবং তাঁহারাও সাক্ষাৎ করিতে আসিলে সমুচিত সমাদর করিতেন। কথোপকথন কালে আত্মপ্রাধান্য প্রখ্যাপন করিতেন না। তিনি স্বভাবতঃ সুশীল, সরল ও প্রফুল্লচিত্ত ছিলেন; এই নিমিত্ত সকল ব্যক্তিই তাঁহার সহবাস বাসনা করিত। লোকের সর্ব্ব‌দা যাতায়াত দ্বারা মহার্ঘ‌্য‌ সময়ের অপক্ষয় হইলেও তিনি কিঞ্চিম্মাত্র বিরক্তভাব প্রকাশ করিতেন না। কিন্তু প্রত্যূষে গাত্রোত্থা‌নের নিয়ম এবং বিশেষ বিশেষ কার্য্যে বিশেষ বিশেষ সময় নিরূপিত থাকাতে, অধ্যয়ন ও গ্রন্থরচনার নিমিত্ত সময়াল্প‌তানিবন্ধন কোন ক্ষোভ থাকিত না। তিনি অবসর পাইলেই হস্তে লেখনী ও সম্মুখে পুস্তক লইয়া বসিতেন।

নিউটন অত্যন্ত দয়ালু ও দানশীল ছিলেন এবং কহিতেন যাহারা জীবদ্দশায় দান না করে তাহাদের দান দানই নয়। অত্যন্ত বৃদ্ধ বয়সেও তদীয় অদ্ভুত ধীশক্তির কিঞ্চিন্মাত্র বৈলক্ষণ জন্মে নাই। আর আহারনিয়ম সার্ব্বকালিক প্রফুল্লচিত্ততা ও স্বাভাবিক শরীরপটুতা প্রযুক্ত জরা তাঁহাকে পরাভূত করিতে পারে নাই। তিনি নাতিদীর্ঘ, নাতিখর্ব্ব, কিঞ্চিৎ স্থূলকায় ছিলেন। তাঁহার নয়নে সজীবতা, তীক্ষ্ণতা ও বুদ্ধিমত্তা স্পষ্ট প্রকাশ পাইত। দেখিলেই তাঁহার আকৃতি সজীবতা ও দয়ালুতাতে পরিপূর্ণ বোধ হইত। অন্তিম ক্ষণ পর্যন্ত তাঁহার দর্শনশক্তি অব্যাহত ছিল। কেশ সকল শেষ বয়সে তুষারের ন্যায় শুভ্র হইয়াছিল। চরম দশাতে তাঁহার অত্যন্ত অসহ্য দৈহিক যাতনা ঘটে। কিন্তু তিনি স্বভাবসিদ্ধ সহিষ্ণুতা প্রভাবে তাহাতে নিতান্ত কাতর হয়েন নাই। অনন্তর ১৭২৭ খৃঃ অব্দের ২০এ মার্চ্চ‌ চতুরশীতি বর্ষ বয়ঃক্রম কালে কলেবর পরিত্যাগ করিলেন।

নিউটনের চরিত্র সাধারণ লোকের চরিত্রের ন্যায় নহে। উহা এমন সুন্দর যে চরিতাখ্যায়ক ব্যক্তি লিখিতে লিখিতে পরম পরিতোষ প্রাপ্ত হন। এবং যে উপায়ে তিনি মনুষ্য মণ্ডলী মধ্যে অবিসংবাদিত প্রাধান্য প্রাপ্ত হইয়াছিলেন তাহা পর্য্যালোচনা করিলে মহোপকার ও মহার্থ লাভ হইতে পারে। নিউটন অত্যুৎকৃষ্ট বুদ্ধিশক্তি সম্পন্ন ছিলেন; কিন্তু তদপেক্ষায় স্থানবুদ্ধিরাও তদীয় জীবনবৃত্ত পাঠে পদে পদে উপদেশ লাভ করিতে পারেন। তিনি অলৌকিক বুদ্ধিশক্তি প্রভাবে গ্রহগণের গতি, ধূমকেতুদিগের কক্ষ, সমুদ্রের জলোচ্ছাস এই সকল বিষয়ের মীমাংসা করিয়াছেন। নিউটন আলোক ও বর্ণ এই উভয় পদার্থের স্বরূপ নির্ণয় করিয়াছেন। তাঁহার পুর্ব্বে এই বিষয় কোন ব্যক্তির মনেও উদয় হয় নাই। তিনি সাতিশয় পরিশ্রম ও দক্ষতা সহকারে অদ্ভুত বিশ্বরচনার যথার্থ তাৎপর্য্য ব্যাখ্যা করিয়াছেন; আর তাঁহার সমুদায় গবেষণা দ্বারাই সৃষ্টিকর্ত্তার মহিমা, প্রজ্ঞা, ও অনুকম্পা প্রকাশ পাইয়াছে। এইরূপ লোকোত্তর বুদ্ধি বিদ্যা সম্পন্ন হইয়াও তিনি স্বভাবতঃ এমন বিনীত ছিলেন যে আপন বিদ্যার কিঞ্চিন্মাত্র অভিমান করিতেন না। তাঁহার এই এক সুপ্রসিদ্ধ কথা ধরাতলে জাগরূক আছে যে আমি বালকের ন্যায় বেলাভূমি হইতে উপলখণ্ড সঙ্কলন করিতেছি; কিন্তু জ্ঞানমহার্ণব পুরোভাগে অক্ষুণ্ণ‌ রহিয়াছে।

ইংলণ্ডের অধীশ্বর দ্বিতীয় চালর্স্‌ পদার্থবিদ্যার উন্নতি নিমিত্ত, সপ্তদশ শতাব্দীতে, ইংলণ্ডের রাজধানী লণ্ডন নগরে এই সমাজ স্থাপন করেন। এই সমাজের লোকদিগকে ফেলো বলে। যাহার অসাধারণ বিদ্যাসম্পন্ন হয়েন তাঁহারাই এই সমাজের ফেলো হইতে পারেন। সমুদায়ে সমাজের ফেলে একুশ জন; তন্মধ্যে এক জন সভাপতি, এক জন সহকারী সভাপতি, এক জন ধনাধ্যক্ষ, এবং দুই জন সম্পাদক। এই রাজকীয় সমাজ দ্বারা পদার্থবিদ্যা সংক্রান্ত নানা বিষয়ে অশেষবিধ মহোপকার জন্মিয়াছে।

ইংলণ্ডের রাজকার্য্য কেবল রাজার ইচ্ছানুসারে সম্পন্ন হয় না; রাজা এই সমাজের মতানুসারে যাবতীয় রাজকার্য্য নির্ব্ব‌াহ করিয়া থাকেন। এই সমাজ দুই শ্রেণীতে বিভক্ত; এক শ্রেণীতে দেশের কতকগুলি সম্ভ্রান্ত লোক থাকেন, দ্বিতীয় শ্রেণীতে সামান্য লোকেরা। এক এক প্রদেশের সামান্য লোকেরা আপনাদিগের এক এক জন প্রতিনিধি প্রেরণ করেন। ইংলণ্ডের যাবতীয় বিশ্ববিদ্যালয় হইতেও এই সমাজে এক এক জন প্রতিনিধি প্রেরিত হইয়া থাকেন। সন্ত্রান্ত লোকেরা এবং সামান্য লোকদিগের এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োজিত প্রতিনিধিরা রাজকীয় আদেশানুসারে সময়ে সময়ে এই সমাজে সমাগত হইয়া রাজকার্য্য চিন্তা করিয়া থাকেন। ইঁহারা যে নিয়ম নিৰ্দ্ধারিত করেন রাজার সম্মতি হইলেই সমুদায় রাজ্য মধ্যে সেই নিয়ম প্রচলিত হয়।

বহুকাল পূর্ব্ব‌ে, ইয়ুরোপে যে সকল ব্যক্তিরা কোন সৈন্যসংক্রান্ত পদে অধিরূঢ় হইত, তাহাদিগকে নাইট্‌ বলিত। যাহার প্রধানবংশজাত ও ঐশ্বর্য্যশালী লোকের সন্তান, তাহারাই নাইট্‌ হইত। এই নিমিত্ত উহা এক্ষণে সন্ত্রম ও মর্য্য‌াদাসূচক উপাধি হইয়া উঠিয়াছে। যাঁহারা অসাধারণ গুণসম্পন্ন অথবা ক্ষমতাপন্ন হয়েন, তাঁহারাই অধুনা রাজপ্রসাদে এই মর্য্য‌াদার উপাধি পাইয়া থাকেন। এই উপাধি প্রাপ্ত ব্যক্তিরা আনুষঙ্গিক সর এই উপাধিও প্রাপ্ত হয়েন। এই উপাধি নাইটদিগের নামের পুর্বে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। যথা; সর আইজাক নিউটন, সর উইলিয়ম হর্শেল, সর উইলিয়ম জোন্স ইত্যাদি।

সর উইলিয়ম জোন্স

সর উইলিয়ম জোন্স।

উইলিয়ম জোন্স, ১৭৪৬ খৃঃ অব্দে ২০এ সেপ্টম্বর, লণ্ডন নগরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহার তৃতীয় বৎসর বয়ঃক্রম কালে পিতৃবিয়োগ হয়; সুতরাং তাঁহার শিক্ষার ভার তাঁহার জননীর উপর বর্ত্তে। এই নারী অসামান্যগুণসম্পন্না ছিলেন। জোন্স অতি শৈশব কালেই অদ্ভুত পরিশ্রম ও গাঢ়তর বিদ্যানুরাগে দৃঢ়তর প্রমাণ দর্শাইয়াছিলেন। ইহা বিদিত আছে, তিন চারি বৎসর বয়ঃক্রম কালে যদি কোন বিষয় জানিবার অভিলাষে আপন জননীকে কিছু জিজ্ঞাসা করিতেন, ঐ বুদ্ধিমতী নারী সর্ব্বদাই এই উত্তর দিতেন পড়িলেই জানিতে পরিবে। এইরূপে পুস্তক পাঠ বিষয়ে তাহার গাঢ় অনুরাগ জন্মে; এবং তাহা বয়োবৃদ্ধি সহকারে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়।

সপ্তম বৎসরের শেষে তিনি হারো নগরের পাঠশালায় প্রেরিত হয়েন; এবং ১৭৬৪ খৃঃ অব্দে, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়স্থিত অন্যান্য ছাত্রবর্গের ন্যায় বৃথা সময় নষ্ট না করিয়া, অধ্যয়ন বিষয়েই অনুক্ষণ নিমগ্নচিত্ত থাকিতেন, এবং যদৃচ্ছাপ্রবৃত্ত পরিশ্রম দ্বারা বিদ্যালয়ের নির্দিষ্ট পাঠ অপেক্ষা অনেক অধিক শিক্ষা করিতেন। বাস্তবিক তিনি পাঠশালায় এরূপ পরিশ্রমী ও বিদ্যানুরাগী ছিলেন যে তদ্দষ্টে তাঁহার এক অধ্যাপক কহিয়া ছিলেন এই বালক সালিসবরি প্রান্তরে নগ্ন ও নিঃসহায় পরিত্যক্ত হইলেও খ্যাতি ও সম্পত্তির পথ প্রাপ্ত হইবেক, সন্দেহ নাই।

এই সময়ে তিনি প্রায় সর্ব্বদাই নিদ্রা প্রতিরোধের নিমিত্ত কফি কিংবা চা খাইয়া সমস্ত রাত্রি অধ্যয়ন করিতেন। কিন্তু এই প্রকার অনুষ্ঠান প্রশংসনীয় নহে; ইহাতে অনায়াসেই রোগ জন্মিতে পারে। জোন্স অবকাশ কালে ব্যবহারশাস্ত্র অধ্যয়ন করিতেন। ইহা নির্দিষ্ট আছে যে তিনি কোকলিখিত ব্যবহার শাস্ত্রের সারসংগ্রহ অধ্যয়ন করিয়া তাহাতে এমন ব্যুৎপন্ন হইয়াছিলেন যে স্বীয় জননীর পরিচিত গৃহাগত ব্যবহারদর্শীদিগকে উক্ত গ্রন্থ হইতে সমুদ্ধৃত ব্যবহার বিষয়ক প্রশ্ন দ্বারা সর্ব্বদাই প্রীত ও চমৎকৃত করিতেন।

দৃষ্ট হইতেছে, জোন্স ভাষা শিক্ষা বিষয়ে স্বভাবতঃ অত্যন্ত নিপুণ ও অনুরাগী ছিলেন। সচরাচর দেখিতে পাওয়া যায়,যে সকল ব্যক্তির ভাষা শিক্ষায় বিশেষ অনুরাগ ও নৈপুণ্য থাকে,তাহাদের প্রায় অন্য কোন বিষয়ে বুদ্ধি প্রবেশ হয় না। কিন্তু জোন্সের বিষয়ে সেরূপ লক্ষ্য হইতেছে না। তিনি অত্যন্ত প্রয়োজনোপযোগী বহুতর জ্ঞানশাস্ত্রে ও সুকুমার বিদ্যাতেও বিশিষ্ট রূপ পারদর্শী ছিলেন। অক্সফোর্ডে অধ্যয়ন কালে তিনি এসিয়া খণ্ডের ভাষা সমূহ শিক্ষা বিষয়ে অত্যন্ত অভিলাষী হইয়াছিলেন এবং আরবির উচ্চারণ শিখাইবার নিমিত্ত স্বয়ং বেতন দিয়া এলিপোদেশীয় এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করেন। গ্রীক ও লাটিন ভাষাতে তৎপুর্ব্বেই বিলক্ষণ ব্যুৎপন্ন হইয়াছিলেন। বিদ্যালয়ের অনধ্যায় কাল উপস্থিত হইলে,তিনি অশ্বারোহণ ও স্বাত্মরক্ষা শিক্ষা করিতেন; এবং ইটালীয়, স্পানিশ, পোতুগীজ ও ফ্রেঞ্চ ভাষার অত্যুত্তম গ্রন্থ সকল পাঠ করিতেন; এবং ইহার মধ্যেই অবকাশক্রমে নৃত্য, বাদ্য খড়্গপ্রয়োগ এবং বীণাবাদন শিখিতেম।

ছাত্রবৃত্তি প্রাপ্ত হইলে জননীকে বিদ্যালয়ের বেতন দান রূপ ভার হইতে মুক্ত করিতে পারিবেন,এই আশয়ে তিনি পুর্ব্ব নির্দিষ্ট বহুবিধ অধ্যয়নে ব্যাপৃত থাকিয়াও, উক্ত অভিলষিত বৃত্তি প্রাপ্তি বিষয়ে কোন রূপে অমনোযোগী ছিলেন না। কিন্তু এই আকাঙ্ক্ষিত বিষয় সাধনে কৃতকার্য্য হইতে না পারিয়া, ১৭৬৫ খৃঃ অব্দে, লার্ড আলথর্পের শিক্ষকতা কার্য্য স্বীকার করিলেন এবং কিয়দিবস পরে অভিপ্রেত ছাত্রবৃত্তিও প্রাপ্ত হইলেন। ১৭৬৭ খৃঃ অব্দে,তাঁহাকে আপন ছাত্রের সহিত জর্ম্মনির অন্তর্ব্বত্তী স্পা নামক নগরে অবস্থিতি করিতে হইয়াছিল; এই সুযোগে তিনি জর্ম্মন ভাষা শিক্ষা করেন। তথা হইতে প্রত্যাগমন করিয়া নাদিরশাহের জীবনবৃত্ত ফ্রেঞ্চ ভাষায় অনুবাদিত করেন। এই জীবনবৃত্ত পারসী ভাষায় লিখিত ছিল। কিয়দ্দিনানন্তর তাঁহাকে আপন ছাত্র ও তদীয় পরিবারের সহিত মহাদ্বীপে গমন করিয়া ১৭৭০ খৃঃ অব্দ পর্য্যন্ত অবস্থিতি করিতে হয়। উক্ত অব্দে তাঁহার শিক্ষকতা কর্ম্ম রহিত হওয়াতে, ব্যবহারশাস্ত্র অধ্যয়নার্থে টেম্পল নামক বিদ্যালয়ে নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু এই রূপে বিষয়কর্ম্মের অনুসরণে প্রবৃত্ত হইয়াও,তিনি বিদ্যানুশীলন একবারেই পরিত্যাগ করেন নাই। মধ্যে মধ্যে নানা বিষয়ে নানা গ্রন্থ রচনা করিয়াছেন; সে সমুদায় অদ্যাপি বিদ্যমান আছে। তাহাতে তাঁহার বিদ্যা,বুদ্ধি, মনের উৎকর্ষ প্রদর্শিত হইয়াছে।

১৭৭৪ খৃঃ অব্দে,জোন্স বিচারালয়ে ব্যবহারাজীবের কার্য্যে নিযুক্ত হইলেন, এবং অবলম্বিত ব্যবসায় বিষয়ে ত্বরায় বিলক্ষণ খ্যাতি ও প্রতিপত্তি লাভ করিতে লাগিলেন।

কলিকাতার মুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির পদ বহুকালাবধি তাঁহার প্রার্থনীয় ছিল। পরে ১৭৮৩ খৃঃ অব্দের মার্চ মাসে উক্ত চিরপ্রার্থিত পদে নিযুক্ত হইলেন। ঐ সময়ে নাইট উপাধি প্রাপ্ত হইলেন। সুপ্রিম কোর্টের বহু পরিশ্রমসাধ্য কর্ম্মে অত্যন্ত ব্যাপৃত থাকিয়াও, তিনি পুর্ব্বাপেক্ষায় অধিকতর প্রযত্ন ও পরিশ্রম সহকারে সাহিত্য বিদ্যা ও দর্শন শাস্ত্রের অনুশীলন করিতে লাগিলেন। কলিকাতায় উপস্থিত হইয়াই,লগুন নগরের রয়েল সোসাইটী নামক সভাকে আদর্শ করিয়া স্বীয় অসাধারণ উৎসাহ ও উদ্যোগ দ্বারা এসিয়াটিক সোসাইট নামক সভা স্থাপন করিলেন। যত দিন জীবিত ছিলেন তাবৎ কাল পর্যন্ত তিনি তাহার সভাপতির কার্য্য নির্ব্বাহ করেন। এবং প্রতিবৎসর বহুতর পরিশ্রম স্বীকার পূর্ব্বক এতদ্দেশীয় শব্দ বিদ্যা ও পূর্ব্বকালীন বিষয় সকলের তত্ত্বানুসন্ধান দ্বারা উক্ত সভার কার্য্য উজ্জ্বল ও বিভূষিত করিয়াছিলেন।

অতঃপর বিচারালয় বন্ধ ব্যতিরেকে আর তাঁহার অধ্যয়নের অবকাশ ছিল না। ১৭৮৫ খৃঃ অব্দের দীর্ঘ বন্ধের সময় যেরূপে দিবস যাপন করিতেন, তাঁহার কাগজপত্রের মধ্যে তাহার এই বিবরণ দৃষ্ট হইয়াছে। প্রাতঃকালে প্রথমতঃ এক খানি পত্র লিখিয়া, কয়েক অধ্যায় বাইবল অধ্যয়ন করিতেন; তৎপরে সংস্কৃত ব্যাকরণ ও ধর্ম্মশাস্ত্র; মধ্যাহ্ণকালে ভারতবর্ষের ভূগোল বিবরণ; অপরাহ্ণে রোমরাজ্যের পুরাবৃত্ত; পরিশেষে দুই চারি বাজী শতরঞ্জ খেলিয়া ও আরিয়ষ্টোর কিয়দংশ পাঠ করিয়া দিবাবসান করিতেন।

তিনি এতদ্দেশীয় জল ও বায়ুর দোষে শারীরিক অসুস্থ হইতে লাগিলেন। বিশেষতঃ তাঁহার চক্ষু এমন নিস্তেজঃ হইয়া যায় যে মধূত্থ বর্ত্তিকার আলোকে লেখা রহিত করিতে হইয়াছিল। কিন্তু যাবৎ তাঁহার কিঞ্চিস্মাত্র সামর্থ্য থাকিত কিছুতেই তাঁহার অভিলষিত অধ্যয়নের ব্যাঘাত ঘটাইতে পারিত না। পীড়াভিভূত হইয়া শয্যাগত থাকিয়াও বিনা সাহায্যে উদ্ভিদ বিদ্যা অধ্যয়ন করেন। এবং চিকিৎসকের উপদেশানুসারে স্বাস্থ্যপ্রতিলাভার্থে যে কিয়ৎকাল পর্য্যটন করেন তাহাতে গ্রীশ, ইটালি ও ভারতবর্ষীয় দেবতাগণের বিষয়ে এক প্রশস্ত গ্রন্থ রচনা করেন। ইহাতে বোধ হইতেছে যে তিনি আপন মনকে এমন দৃঢ়ীভূত করিয়াছিলেন যে এইরূপ পরিশ্রম বিশ্রামভূমিতে গণনীয় হইত।

কিয়দ্দিবস পরে তিনি কিঞ্চিৎ মুস্থ হইয়া উঠিলেন এবং পুনর্ব্বার পুর্ব্বাপেক্ষায় সমধিক প্রযত্ন ও উৎসাহ সহকারে বিচারালয়ের কার্য্যে ও অধ্যয়নে মনোনিবেশ করিলেন। কিছুকাল তিনি কলিকাতার আড়াই ক্রোশ দূরে ভাগীরথীতীর সন্নিহিত এক ভবনে অবস্থিতি করেন। ঐ সময়ে তাঁহাকে কার্য্য বশতঃ প্রতিদিন বিচারালয়ে আসিতে হইত। তাঁহার জীবনবৃত্তলেখক সুশীল প্রজ্ঞাবান্ লার্ড টিনমৌথ কহেন যে তিনি প্রতিদিন সুর্য্যাস্তের পর এই স্থানে প্রত্যাগমন করিতেন; এবং এমন প্রত্যুষে গাত্রোত্থান করিতেন যে পদব্রজে আসিয়া অরুণোদয় কালে কলিকাতার আবাসে উপস্থিত হইতেন। তথায় উপস্থিতির পর ও বিচারালয়ের কার্য্যারম্ভ হইবার পূর্ব্ব যে সময় থাকিত তাহা রীতিমত পৃথক পৃথক্ অধ্যয়ন বিষয়ে নিয়োজিত ছিল। এই সময়ে তিনি, রাত্রি তিন চারিটার সময় শয্যা পরিত্যাগ করিতেন। বিচারালয়ের কর্ম্ম বন্ধ হইলেও তিনি কর্ম্মেই ব্যাসক্ত থাকিতেন। ১৭৮৭ খৃঃ অব্দের কর্ম্মবন্ধ সময়ে কৃষ্ণনগরে অবস্থিতি করেন। তথা হইতে লিখিয়াছিলেন “আমি এই গ্রাম্য কুটীরে বাস করিয়া অত্যন্ত প্রীতি প্রাপ্ত হইতেছি; এই তিন মাস কর্ম্মবন্ধ উপলক্ষে অবকাশ পাইয়াছি বটে, কিন্তু আমি এক দণ্ডের নিমিত্তেও কর্ম্মশূন্য নহি। ইচ্ছানুরূপ বিদ্যানুশীলনের সহিত স্বকীয় বিষয় কার্য্যের ভূয়িষ্ঠ সম্বন্ধ প্রায় ঘটিয়া উঠে না। কিন্তু সৌভাগ্য ক্রমে আমার পক্ষে তাহা ঘটিয়াছে। এই কুটীরে থাকিয়াও আমি আরবি ও সংস্কৃত অধ্যয়ন দ্বারা বিচারালয়েরই কার্য্য করিতেছি। এক্ষণে সাহস পূর্ব্বক বলিতে পারি মুসলমান ও হিন্দু ধর্ম্মশাস্ত্রজ্ঞেরা মিথ্যা ব্যবস্থা দিয়া আর আমাদিগকে ঠকাইতে পরিবেক না”। বাস্তবিক এইরূপ সার্ব্বক্ষণিক পরিশ্রমে ব্যাসক্ত থাকাতেই তাঁহার আনন্দে কালষাপন হইয়াছিল।

যে সকল মোকদ্দমা শাস্ত্রের ব্যবস্থা অনুসারে নিম্পত্তি করা আবশ্যক; সে সমুদায়, পণ্ডিত ও মৌলবীদিগের অপেক্ষা না রাখিয়াই, অনায়াসে নিষ্পত্তি করিতে পারা যাইবেক এই অভিপ্রায়ে তিনি হিন্দু ও মুসলমানদিগের ধর্ম্মশাস্ত্রের সারসংগ্রহ করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। এই গ্রন্থ তিনি সমাপন করিয়া যাইতে পারেন নাই। কিন্তু পরিশেষে অন্যান্য ব্যক্তি দ্বারা তাহার ষে সমাধান হইয়াছে তাহা এই মহানুভাবের পরামর্শ ও প্রাথমিক উদ্যোগ দ্বারাই হইয়াছে, সন্দেহ নাই।

১৭৮৯ খৃঃ অব্দে, তিনি শকুন্তলানামক সংস্কৃত নাটকের ইঙ্গরেজী ভাষাতে অনুবাদ প্রকাশ করেন। অনন্তর ১৭৯৪ খৃঃ অব্দের আরম্ভেই মনুপ্রণীত ধর্ম্মশাস্ত্রের অনুবাদ প্রকাশ হয়। যে সকল ব্যক্তি ভারতবর্ষের পুর্ব্বকালীন আচার ব্যবহার জানিবার বাসনা রাখেন এই গ্রন্থ তাঁহাদের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী। পরিশেষে এই সুবিখ্যাত প্রশংসিত ব্যক্তি, বিচারালয়ের কার্য্য নিম্পাদন ও বিদ্যানুশীলন বিষয়ে অবিশ্রান্ত এইরূপ অসঙ্গত পরিশ্রম করাতে, অকালে কালগ্রাসে পতিত হইলেন। ১৭৯৪ খৃঃ অব্দের এপ্রিল মাসে, কলিকাতাতে তাঁহার যকৃৎ স্ফীত হয়, এবং ঐ রোগেই উক্ত মাসের সপ্তবিংশ দিবসে অষ্টচত্বারিংশত্তম বর্ষ বয়ঃক্রম সময়ে কলেবর পরিত্যাগ করেন।

সর উইলিয়ম জোন্সের কতিপয় অতি সামান্য নিয়ম নিৰ্দ্ধারিত ছিল; তদ্বিষয়ে দৃঢ়তর মনোযোগ থাকাতেই তিনি এই সমস্ত গুরুতর কার্য্য নির্ব্বাহে সমর্থ হইয়া ছিলেন। তন্মধ্যে একটী এই যে, বিদ্যানুশীলনের সুযোগ পাইলে কখন উপেক্ষা করিবেক না। অন্য এক এই যে, অন্যেরা যে বিষয়ে কৃতকার্য্য হইয়াছে, আমিও অবশ্য তাহাতে কৃতকার্য্য হইতে পারিব; এবং সেই নিমিত্তে বাস্তবিক প্রতিবন্ধক দেখিয়া, অথবা প্রতিবন্ধকের সম্ভাবনা করিয়া, অভিপ্রেত বিষয় হইতে নিবৃত্ত হওয়া যুক্তিসিদ্ধ নহে, বরং তাহার সিদ্ধি বিষয়ে স্থিরনিশ্চয় হইতে হইবেক।

তাঁহার জীবনচরিতলেখক লার্ড টিনমৌথ কহেন যে ইহাও তাঁহার এক নিৰ্দ্ধারিত নিয়ম ছিল, যে সকল ব্যাঘাত অতিক্রম করতে পারা যায় তদ্দৃ‌ষ্টেবিবেচনাপূর্ব্বক হস্তার্পিত ব্যাপারের সমাধানবিষয়ে কোন ক্রমেই ভগ্নোৎসাহ হওয়া উচিত নহে। এই নিয়ম তিনি কখন স্বেচ্ছা পূর্ব্বক লঙ্ঘন করেন নাই। কিন্তু তিনি যে পৃথক্ পৃথক্ এক এক কর্ম্মের নিমিত্ত সময় নিরূপণ করিতেন এবং অতি সাবধান হইয়া সেই সেই নিৰ্দ্ধারিত সময়ে তত্তৎ কর্ম্মের সমাধান করিতেন, আমার বোধে এই মহাফলদায়ক নিয়ম দ্বারাই অব্যাঘাতে ও অনাকুলিতচিত্তে এই সমস্ত বিদ্যায় কৃতকার্য্য হইয়াছিলেন।

সর উইলিয়ম জোন্সের মৃত্যুতে সর্ব্বসাধারণের যেরূপ অসাধারণ মনস্তাপ ও ক্ষতিবোধ হইয়াছে অতি অল্প লোকের বিষয়ে সেরূপ দেখিতে পাওয়া যায়। ভাষাজ্ঞান বিষয়ে, বোধ হয়, প্রায় কোন ব্যক্তিই তাঁহা অপেক্ষা অধিক নিপুণ ছিলেন না। পুরাবৃত্ত, দর্শনশাস্ত্র, স্মৃতি, ধর্ম্মসংক্রান্ত গ্রন্থ, পদার্থবিদ্যা ও সর্ব্বজাতীয় আচার ব্যবহার বিষয়ে তাঁহার অসাধারণ জ্ঞান ছিল। আর যদি তিনি ভিন্নদেশীয় কাব্যের ভাব লইয়া স্বভাষায় সঙ্কলন করিবার নিমিত্ত এত অধিক অনুরক্ত না হইতেন এবং বহুবিস্তৃত বিষয়কর্ম্ম নিৰ্বাহ করিয়া আপন শক্ত্যনুযায়িনী রচনা বিষয়ে প্রযত্নবান্ হইবার নিমিত্ত উপযুক্তরূপ অবকাশ পাইতেন তাহা হইলে তাঁহার কবিত্ব বিষয়েও অসাধারণ খ্যাতিলাভের ভূয়সী সম্ভাবনা ছিল। তিনি পরিবার ও পোষ্যবর্গের প্রতি যেরূপ ব্যবহার করিতেন তাহা অতি প্রশংসনীয়। তিনি স্বভাবতঃ বদান্য ও তেজস্বী ছিলেন।

সর উইলিয়ম জোন্সের নাম চিরস্মরণীয় করিবার নিমিত্ত ভারতবর্ষে ও ইংলণ্ডে নানা উপায় নিৰ্দ্ধারিত হইয়াছে। ইষ্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির অধ্যক্ষেরা সেণ্টপালের কাথিড্রলে তাঁহার এক কীর্ত্তিস্তম্ভ নির্মাণ করিয়া দিয়াছেন; এবং বাঙ্গালাতে এক প্রস্তরময়ী প্রতিমূর্ত্তি প্রেরণ করিয়াছেন। কিন্তু তাহার সহধর্ম্মিণী ১৭৯৯ খৃঃ অব্দে তদীয় সমুদায় গ্রন্থ সংগ্রহ করিয়া ছয় খণ্ড পুস্তকে যে মুদ্রিত ও প্রচারিত করিয়াছিলেন তাহাই তাঁহার পক্ষে সর্ব্বাপেক্ষা সমধিক প্রশংসনীয় ও অবিনশ্বর কীর্তি স্তম্ভ। তদ্ব্যতিরিক্ত ঐ বিধবা নারী আপন ব্যয়ে তাহার এক প্রস্তরময় প্রতিমূর্ত্তি নির্ম্মাণ করাইয়া অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পার্শ্ববর্ত্তী গৃহে স্থাপিত করিয়াছেন।

সম্পূর্ণ।

সর উইলিয়ম হর্শেল

সর উইলিয়ম হর্শেল।

কোপর্নিকসের সময়াবধি টাইকো ব্রেহি, কেপ্লর, হিগিন্স, নিউটন, হেলি, ডিলাইল, লেলণ্ড‌ ও অন্যান্য সুপ্রসিদ্ধ জ্যোতির্ব্বিদবর্গের প্রযত্ন ও পরিশ্রম দ্বারা জ্যোতির্ব্বিদ্যার ক্রমে ক্রমে উন্নতি হইয়া আসিতেছিল। পরে যে চিরস্মরণীয় মহানুভাবের আবিষ্ক‌্র‌িয়া দ্বারা উক্ত বিদ্যার এককালে ভূয়সী শ্রীবৃদ্ধি হয় এক্ষণে তদীয় জীবনবৃত্ত লিখিতে প্রবৃত্ত হইতেছি।

উইলিয়ম হর্শেল, ১৭৩৮ খৃঃ অব্দের ১৫ই নবেম্বর, হানোবরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁহারা চারি সহোদর; তন্মধ্যে তিনি দ্বিতীয় ছিলেন। তাঁহার পিতা তূর্য্যাজীব ব্যবসায় দ্বারা জীবিকা নির্ব্বাহ করিতেন। সুতরাং তাঁহারাও চারি সহোদরে উত্তরকালে ঐ ব্যবসায়ে ব্রতী হইবার নিমিত্ত তাহাই শিক্ষা করেন। হর্শে‌লের অল্প‌ বয়সেই বিদ্যানুশীলন বিষয়ে সবিশেষ অনুরাগ প্রকাশ হওয়াতে, পিতা তাঁহাকে শিক্ষা দিবার নিমিত্ত এক শিক্ষক নিযুক্ত করেন। তিনি তাঁহার নিকট ন্যায়, নীতি ও মনোবিজ্ঞান বিষয়ক প্রথমপাঠ্য গ্রন্থ সকল অধ্যয়ন করিয়া উক্ত দুরূহ বিদ্যাত্রিতয়ে এক প্রকার ব্যুৎপন্ন হইয়া উঠিলেন।

কিন্তু পিতা মাতার অসঙ্গতি ও অন্যান্য কতিপয় প্রতিবন্ধক প্রযুক্ত ত্বরায় তাঁহার বিদ্যানুশীলনে ব্যাঘাত জন্মিল। তৎপরে চতুর্দশ বর্ষ বয়ঃক্রম কালে এক সৈনিক দলসংক্রান্ত বাদ্যকর সম্প্রদায়ে নিয়োজিত হইলেন; এবং ১৭৫৭, অথবা ১৭৫৯, খৃঃ অব্দে ঐ সৈনিক দল সমভিব্যাহারে ইংলণ্ড যাত্রা করিলেন। তাঁহার পিতাও সেই সঙ্গে ইংলণ্ড গমন করিয়াছিলেন; পরে কতিপয় মাসান্তে স্বদেশে প্রত্যাগমন করেন। কিন্তু হর্শেল,ইংলণ্ডে থাকিয়া ভাগ্য পরীক্ষা করিয়া দেখিবার নিমিত্ত পিতার সম্মতি লইয়া তথার অবস্থিতি করিলেন। এইরূপ অনেকানেক ধীসমৃদ্ধ বৈদেশিকের স্বদেশ পরিত্যাগ পূর্ব্বক ইংলণ্ডে বাস্তব্য করিয়া থাকেন।

হর্শে‌ল কোন সময়ে ও কি প্রকারে উক্ত সৈনিক দল সংক্রান্ত সম্প্রদায় পরিত্যাগ করেন আমরা তাহা অবগত নহি। কিন্তু তাঁহাকে যে প্রথমতঃ কিয়ৎকাল দুঃসহ ক্লেশ পরম্পরায় কালযাপন করিতে হইয়াছিল, এবং ইঙ্গরেজী ভাষায় বিশিষ্টরূপ জ্ঞান না থাকাতে যে অত্যন্ত বিরক্ত হইতে হইয়াছিল, তাহার সন্দেহ নাই। পরিশেষে সৌভাগ্যক্রমে অরল অব ডার্লিংটনের অনুগ্রহোদয় হওয়াতে তিনি তাঁহাকে এক সৈনিক বাদ্যকর সম্প্রদায়ের অধ্যক্ষতা ও উপদেশকতা কার্য্যে নিযুক্ত করিলেন। পরে এই কর্ম্ম সমাধান করিয়া ইয়র্কসরে তুর্য্যাচার্য্য‌ে‌র কার্য্যে নিযুক্ত হইয় কতিপয় বৎসর অতিবাহন করিলেন। তিনি প্রধান প্রধান নগরে শিষ্যদিগকে উপদেশ দিতেন; এবং দেবালয় সম্পৰ্কীয় তুর্য্যাজীব সম্প্রদায়ের অধ্য‌ক্ষের প্রতিনিধি হইয়া তদীয় কার্য্য নির্ব্বা‌হ করেন। এই কর্ম্মে জর্ম্ম‌ন জাতীয়েরা বিশেষ নিপুণ; যেহেতু তাঁহারা তুর্য্য‌ বিদ্যায় বিশেষ অনুরক্ত।

হর্শে‌ল এবম্বিধ অনিন্দিত পথ অবলম্বন করিয়া অন্ন চিন্তায় একান্ত ব্যাসক্ত হইয়াও আর আর চিন্তা একবারেই পরিত্যাগ করেন নাই। বিষয় কর্ম্মে অবসর পাইলেই, তিনি একচিত্ত হইয়া, আগ্রহাতিশয় সহকারে, ইঙ্গরেজী ও ইটালিক ভাষার অনুশীলন এবং বিনা সাহায্যে লাটিন ও গ্রীক ভাষা অভ্যাস করিতেন। তৎকালে তিনি এই মুখ্য অভিপ্রায়েই উক্ত সমস্ত বিদ্যার অনুশীলন করিতেন যে উহা নিজ ব্যবসায়িকী বিদ্যার আলোচনা বিষয়ে বিশেষ উপযোগিনী হইবেক; এবং উত্তর কালেও, এই উদ্দে‌শ্য‌েই ডাক্তর রবর্টস্মিথ রচিত তুর্য্যবিষয়ক গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন, সন্দেহ নাই। তৎকালে ইঙ্গরেজী ভাষাতে তুর্য্য বিদ্যা বিষয়ে যত গ্রন্থ প্রচলিত ছিল ইহা তাহার মধ্যে এক অতি উৎকৃষ্ট গ্রন্থ।

কিন্তু এই পুস্তকের অনুশীলন, অনতিবিলম্বে তাঁহার বর্তমান ব্যবসায় পরিত্যাগের এবং ব্যবসায়ান্তরাবলম্বনের কারণ হইয়া উঠিল। তিনি ত্বরায় বুঝিতে পারিলেন গণিত বিদ্যায় ব্যুৎপন্ন না হইলে ডাক্তর স্মিথের গ্রন্থের অনুশীলনে বিশেষ উপকার দর্শিবেক না। অতএব স্বীয় স্বভাবসিদ্ধ অনুরাগ ও অধ্যবসায় সহকারে এই নূতন বিদ্যার অনুশীলনে নিবিষ্টমনা হইলেন; এবং অল্প দিনের মধ্যেই তাহাতে এমন আসক্ত হইয়া উঠিলেন যে অবসর পাইলে অন্যান্য যে যে বিষয়ের আলোচনা করিতেন সে সমুদায় এই অনুরোধে এক বারেই পরিত্যক্ত হইল।

ইতিপূর্ব্বে হর্শেল, বেটস নামক এক ব্যক্তির নিকট বিশিষ্টরূপ পরিচিত হইয়াছিলেন। এক্ষণে তাঁহার প্রযত্নে ও আনুকূল্যে ১৭৬৫ খৃঃ অব্দের শেষ ভাগে হালিফাক্লের দেবালয়ে তূর্য্যাজীবের পদে নিযুক্ত হইলেন। পর বৎসর সামান্য রূপ তূর্য্য কর্ম্মের অনুরোধে জ্যেষ্ঠ সহোদরের সহিত বাথ নামক নগরে গমন করেন। তথায় অসাধারণ নৈপুণ্য প্রকাশ দ্বারা শুশ্রূষুদিগকে পরম পরিতোষ প্রদান করাতে, সেই নগরের এক দেবালয়ে তুর্য্যাজীবের পদ প্রাপ্ত হইলেন। অতএব তদবধি সেই স্থানে গিয়া অবস্থিতি করিলেন।

তিনি এক্ষণে যে পদে নিযুক্ত হইলেন তাহ নিতান্ত সামান্য নহে। এতদ্ব্যতিরিক্ত রঙ্গভূমি ও অন্যান্য স্থানে তুর্য্যপ্রয়োগ এবং শিষ্যমণ্ডলীকে শিক্ষাপ্রদানাদির উত্তম রূপ অবকাশ ও সুযোগ ছিল। অতএব অর্থে পার্জন যদি তাঁহার মুখ্য অভিপ্রায় হইত, তাহা হইলে, তিনি অবলম্বিত ব্যবসায় দ্বারা বিলক্ষণ সঙ্গতি করিতে পারিতেন। এইরূপে কর্ম্মের বাহুল্য হইলেও, বিদ্যানুশীলন বিষয়ে তাঁহার যে গাঢ়তর অনুরাগ ছিল, তাহার কিঞ্চিন্মাত্রও ব্যতিক্রম হইল না। প্রত্যহ তুর্য্য‌‌ বিষয়ে ক্রমাগত দ্বাদশ অথবা চতুর্দ্দ‌শ হোরা পরিশ্রম করিয়া অত্যন্ত ক্লান্ত হইতেন; কিন্তু তৎপরে এক মুহূর্ত্তও বিশ্রাম না করিয়া পুনর্ব্বার বিশুদ্ধ ও বিমিশ্র গণিত বিদ্যার অনুশীলন আরম্ভ করিতেন।

এইরূপে ক্রমে ক্রমে রেখাগণিতে ব্যুৎপন্ন হইয়া উঠিলেন এবং তখন আপনাকে পদার্থবিদ্যার অনুশীলনে সমর্থ জ্ঞান করিলেন। পদার্থবিদ্যার নানা শাখার মধ্যে জ্যোতিষ ও দৃষ্টিবিজ্ঞান এই দুই বিষয়ে তাঁহার সবিশেষ অনুরাগ জন্মে। ঐ সময়ে জ্যোতিষসংক্রান্ত কতিপয় অভিনব আবিস্ক্র‌িয়া দর্শনে তাঁহার অন্তঃকরণে অত্যন্ত কৌতুহল উদ্বুদ্ধ হইল। তদনুসারে তিনি অবকাশ কালে উক্ত বিদ্যাবিষয়ক গবেষণাতে মনোনিবেশ করিলেন।

গ্রহমণ্ডলীবিষয়ক যে যে অদ্ভুত ব্যাপার পুস্তকে পাঠ করিয়াছিলেন, সে সমস্ত স্বয়ং পর্য্যবেক্ষণ করিবার নিমিত্ত, কোন প্রতিবেশবাসীর সন্নিধান হইতে, একটি দ্বিপাদপ্রমিত দূরবীক্ষণ চাহিয়া আনিলেন। তদ্দ‌র্শনে অপরিসীম হর্ষ প্রাপ্ত হইয়া, ক্রয় করিবার বাসনায়, অবিলম্বে ইংলণ্ডের রাজধানী লণ্ডন নগর হইতে, তদপেক্ষায় অনেক বড় একটা আনাইবার উদ্যোগ করিলেন। কিন্তু তিনি যত অনুমান করিয়াছিলেন ও তাঁহার যত দিবার সঙ্গতি ছিল, তাহার মূল্য তদপেক্ষায় সমধিক হইবাতে ক্রয় করিতে পারিলেন না; সুতরাং যৎপরোনাস্তি ক্ষোভ পাইলেন। ক্ষোভ পাইলেন বটে; কিন্তু ভগ্নোৎসাহ হইলেন না—তৎক্ষণাৎ সেই অক্রেয় দূরবীক্ষণের তুল্যবল দূরবীক্ষণান্তর নির্ম্ম‌াণ স্বহস্তেই আরম্ভ করিলেন। এই বিষয়ে বারম্বার বিফলপ্রযত্ন হইয়াও তিনি পরিশেষে চরিতার্থতা লাভ করিলেন। প্রযত্ব বৈফল্য দ্বারা তাহার উৎসাহের উত্তেজনাই হইত।

যে পথে হর্শে‌লের প্রতিভা দেদীপ্যমান হইবেক, এক্ষণে তিনি সেই পথের পথিক হইলেন। ১৭৭৪ খৃঃ অব্দে, তিনি স্বহস্তে নির্ম্মিত প্রাতিফলিক পাঞ্চপাদিক দূরবীক্ষণ দ্বারা শনৈশ্চর গ্রহ নিরীক্ষণ করিয়া অনির্ব্বচনীয় আনন্দ প্রাপ্ত হইলেন। দূরবীক্ষণ নির্ম্মাণ ও জ্যোতিষসংক্রান্ত আবিষ্ক‌্র‌িয়া বিষয়ে যে এতাবতী সাধীয়সী সিদ্ধিপরম্পরা ঘটিয়াছে এই তার সূত্রপাত হইল। হর্শে‌ল অতঃপর, বিদ্যানুশীলন বিষয়ে পূর্ব্বাপেক্ষায় অধিকতর অনুরাগসম্পন্ন হইয়া সমধিক সময় লাভ বাসনায়, অর্থলাভপ্রতিরোধ স্বীকার করিয়াও, স্বীয় ব্যবসায়িক কর্ম্ম ও শিষ্যসংখ্যার ক্রমে ক্রমে সঙ্কোচ করিতে লাগিলেন; এবং সর্ব্ব প্রথম যাদৃশ যন্ত্র নির্মাণ করিয়াছিলেন, অবকাশ কালে ব্যাপারান্তর বিরহিত হইয়া, তদপেক্ষায় অধিকশক্তিক যন্ত্রনির্ম্মাণে ব্যাপৃত রহিলেন। এইরূপে অচির কালের মধ্যেই সপ্ত, দশ ও বিংশতি পাদ আধিশ্রয়ণিক ব্যবধি বিশিষ্ট কতিপয় দূরবীক্ষণ নির্ম্মিত হইল।

এইসকল যন্ত্রের মুকুর নির্ম্ম‌াণে তিনি অক্লিষ্ট অধ্যবসায় প্রদর্শন করিয়াছেন। সাপ্তপাদিক দূরবীক্ষণের জন্যে মনোমত একখানি মুকুর প্রস্তুত করিবার নিমিত্ত, তিনি ক্রমে ক্রমে অন্য‌ূন দুই শত খান গঠন ও একে একে তৎপরীক্ষণ অবিরক্ত চিত্তে করিয়াছিলেন। যখন তিনি মুকুর নির্ম্ম‌াণে বসিতেন ক্রমাগত দ্বাদশ চতুর্দশ হোর পরিশ্রম করিতেন, মধ্যে এক মুহর্ত্তের নিমিত্তেও বিরত হইতেন না। অন্য কথা দূরে থাকুক আহারানুরোধেও প্রারব্ধ কর্ম্ম হইতে হস্তোত্তোলন করিতেন না। ঐ কালে তাঁহার সহোদরা যৎকিঞ্চিৎ যাহা মুখে তুলিয়া দিতেন তন্মাত্রই আহার হইত। তিনি এই আশঙ্কা করিতেন যে কর্ম্ম আরম্ভ করিয়া মধ্যেক্ষণমাত্রও ভঙ্গ দিলে সম্যক্‌ সমাধানের ব্যতিক্রম ঘটিতে পারে। তিনি মুকুর নির্ম্ম‌াণ বিষয়ে প্রচলিত নিয়মের নিতান্ত অনুবর্ত্তী না হইয়া স্বীয় বুদ্ধিকৌশলেই অধিকাংশ সম্পাদন করিতেন।

হর্শে‌ল, ১৭৮১ খৃঃ অব্দের ১৩ই মার্চ, যে নুতন গ্রহের আবিষ্ক‌্রি‌য়া করেন বোধ হয় সর্ব্বাপেক্ষা তদ্দ্বা‌রাই লোক সমাজে সমধিক বিখ্যাত হইয়াছেন। তিনি ক্রমাগত প্রায় দেড় বৎসর রীতিমত নভোমণ্ডলের পর্য্যবেক্ষণে ব্যাপৃত ছিলেন। দৈবযোগে উল্লিখিত দিবসের সায়ং সময়ে সেই স্বহস্তবিনির্ম্মিত অত্যুৎকৃষ্ট সাপ্তপাদিক প্রাতিফলিক দূরবীক্ষণ নভোমণ্ডলৈকদেশে প্রয়োগ করিয়া এক নক্ষত্র দেখিতে পাইলেন। বোধ হইল, তৎসন্নিহিত সমুদায় নক্ষত্র অপেক্ষা তাহার প্রভা স্থিরতর। উক্ত হেতু প্রযুক্ত ও তদীয় আকারগত অন্যান্য বৈলক্ষণ্য দর্শনে, সংশয়ান হইয়া তদ্বিষয়ে সবিশেষ অভিনিবেশ পুর্ব্বক পর্যবেক্ষণ আরম্ভ করিলেন। কতিপয় হোরার পর পুনর্ব‌্ব‌ার পর্যবেক্ষণ করাতে উহা স্থান পরিত্যাগ করিয়াছে ইহা স্পষ্ট অনুভব করিয়া, তিনি সাতিশয় বিস্ময়াবিষ্ট হইলেন। পর দিন এই বিষয়ে অনেক সন্দেহ দূর হইল। প্রথমতঃ তাঁহার অন্তঃকরণে এই সংশয় উপস্থিত হইয়াছিল যে পূর্ব্ব পূর্ব্ব বারে যাহা দেখিয়াছি ইহা সেই নক্ষত্র কি না। কিন্তু ক্রমাগত আর কয়েক দিবস পর্য্যবেক্ষণ করাতে তদ্বিষয়ক সমুদায় দ্বৈধ অন্তৰ্হিত হইল।

অনন্তর এই সমুদায় ব্যাপার রাজকীয় জ্যোতির্ব্বিদ ডাক্তর মাস্কিলিনের গোচর করিলেন। তিনি আদ্যোপান্ত বিবেচনা করিয়া এই সিদ্ধান্ত করিলেন ইহা নূতন ধূমকেতু না হইয়া যায় না। কিন্তু আর কয়েক মাস ক্রমিক পর্য্যবেক্ষণ করাতে এই ভ্রান্তি নিরাকৃত হইল। এবং তখন স্পষ্ট বোধ হইল যে ইহা এক অনাবিষ্কৃতপূর্ব্ব নুতন গ্রহ, ধূমকেতু নহে। আমাদের অধিষ্ঠানভূতা পৃথিবী যে সৌর জগতের অন্তর্গত এই নূতন গ্রহও তদন্তর্ব্বর্ত্তী‌। তৎকালে তৃতীয় জর্জ ইংলণ্ডের অধীশ্বর ছিলেন। হর্শেল তাঁহার মর্য্যাদা নিমিত্ত তদীয় নামানুসারে স্বাবিষ্কৃত নক্ষত্রের নাম জর্জিয়ম সাইডস্
অর্থাৎ জর্জ নক্ষত্র রাখিলেন। কিন্তু ইয়ুরোপের প্রদেশান্তরীয় জ্যোতির্ব্বিদেরা ইহার যুরেনস্ এই নাম নির্দেশ করিয়াছেন। আর আবিষ্কর্ত্তার নামানুসারে এই গ্রহকে হর্শে‌লও বলিয়া থাকেন। তদনন্তর হর্শেল ক্রমে ক্রমে স্বাবিষ্কৃত নূতন গ্রহের ছয় পারিপাশ্বিক অর্থাৎ চন্দ্র প্রকাশ করিলেন।

জর্জিয়ম সাইডসের আবিষ্ক্র‌িয়া বার্তা প্রচার হইলে, হর্শে‌লের নাম একবারে জগদ্বিখ্যাত হইল। কয়েক মাসের মধ্যেই ইংলণ্ডেশ্বর এই অভিপ্রায়ে তাহার বার্ষিক ত্রিসহস্র মুদ্রা বৃত্তি নিৰ্দ্ধারিত করিয়া দিলেন, যে তিনি বাথ নগরীর কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া নিশ্চিন্ত মনে বিদ্যানুশীলনে রত থাকিতে পারবেন। হর্শেল তদনুসারে ঐ কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া উইণ্ডসর সন্নিহিত স্ল‌ো নামক স্থানে অবস্থিতি নিরূপণ করিলেন। অতঃপর তিনি অনন্যকর্ম্মা ও অনন্যমনা হইয়া কেবল পদার্থ বিদ্যার অনুশীলনেই রত হইলেন। বাস্তবিকও, ক্রমাগত দূরবীক্ষণ নির্ম্মাণ ও নভোমণ্ডলী পর্য্যবেক্ষণ দ্বারাই জীবনের শেষ ভাগ যাপন করিয়াছিলেন।

আমরা পূর্ব্বে‌ যে নূতন গ্রহের আবিষ্ক্র‌িয়া নির্দ্দে‌শ করিয়া আসিলাম তদ্ব্যতিরিক্ত নানাবিধ মহোপকারক অভিনব আবিষ্ক্র‌িয়া ও অতর্কিতচর বহুতর নিপূণ প্রগাঢ় কম্পনা দ্বারা জ্যোতির্ব্বিদ্যার বিশিষ্টরূপ শ্রীবৃদ্ধি সম্পাদন করিয়াছেন। তিনি পূর্ব্ব পূর্ব্ব অপেক্ষায় অধিকায়ত ও অধিকশক্তিক প্রাতিফলিক দূরবীক্ষণনির্ম্মণবিষয়ে কতিপয় মহোপকারিণী সুবিধা প্রদর্শন করেন। তিনি স্লো‌নামক স্থানে, ইংলণ্ডেশ্বরের নিমিত্ত চত্বারিংশৎ পাদ দীর্ঘ যে দূরবীক্ষণ প্রস্তুত করেন তাহাই সর্ব্বাপেক্ষায় বৃহৎ। ১৭৮৫ খঃ অব্দের শেষে, তিনি এই অতিবৃহৎ নল নির্ম্মাণ করিতে আরম্ভ করিয়াছিলেন। পরে, ১৭৮৯ খৃঃ অব্দে ২৭এ আগষ্ট, এক যন্ত্রোপরি সন্নিবেশিত হইয়া ব্যবহারযোগ্য হইল। ঐ যন্ত্র অতিশয় জটিল বটে কিন্তু প্রগাঢ়তর বুদ্ধিকৌশলে সম্পাদিত। উহা দ্বারা ঐ নলের সঞ্চালনাদি ক্রিয়া নিয়মিত হইত। শনৈশ্চরের ষষ্ঠ পারিপার্শ্বি‌ক বলিয়া যাহাকে সকলে অনুমান করিত সন্নিবেশ দিবসেই সেই দূরবীক্ষণ দ্বারা তাহা উদ্ভাবিত হইল। কিয়দ্দি‌নানন্তর ঐ নল দ্বারা শনৈশ্চরের সপ্তম পারিপার্শ্বিকও আবিষ্কৃত হয়। এক্ষণে ঐ নল স্বস্থান হইতে অপসারিত হইয়াছে এবং তৎপরিবর্তে হর্শে‌লের সুবিখ্যাত পুত্রের হস্তবিনির্ম্মিত অত্যুৎকৃষ্ট অন্য এক দূরবীক্ষণ তথায় স্থাপন করা গিয়াছে। ইহা দৈর্ঘ্যে পুর্ব্বযন্ত্রের অৰ্দ্ধেকের অধিক নহে।

ইহা নির্দিষ্ট আছে এই প্রধান জ্যোতির্ব্বিদ, স্বাভিলষিত বিদ্যার আলোচনা বিষয়ে এমন অনুরক্ত ছিলেন যে অনেক বৎসর পর্য্যন্ত নক্ষত্রদর্শনযোগ্য কালে কখনই শয্যারূঢ় থাকিতেন না; আর কি শীত কি গ্রীষ্ম, সকল ঋতুতেই নিজ উদ্যানে অনাবৃত প্রদেশে প্রায় একাকী অবস্থিত হইয়া সমুদায় পর্য্য‌বেক্ষণ সমাধান করেন। তিনি এই সমস্ত গবেষণা দ্বারা দূরতরবর্ত্তী‌ নক্ষত্র সমূহের ভাব অবগত হইয়। তদ্বিষয়ের সবিশেষ বিবরণ স্বাভিপ্রায় সহিত পত্রারূঢ় করিয়া প্রচার করেন।

হর্শে‌ল তৎকালজীবী প্রধান প্রধান জ্যোতির্জ্ঞ‌বর্গের মধ্যে গণনীয় হইয়াছিলেন এবং পণ্ডিতসমাজে ও রাজসন্নিধানে যথেষ্ট মর্য্যাদা পাইয়াছিলেন। ১৮১৬ খৃঃ অব্দে, যুবরাজ চতুর্থ জর্জ তাঁহাকে নাইটের পদ প্রদান করেন। হর্শেল, প্রথমে সেনাসম্পৰ্কীয় তুর্য্যসম্প্রদায়নিযুক্ত এক দরিদ্র বালকমাত্র ছিলেন; কিন্তু বহুমঙ্গলহেতুভূত জ্যোতির্ব্বিদ্যার শ্রীবৃদ্ধি বিষয়ে দীর্ঘ কাল পর্যন্ত গরীয়সী আয়াসপরম্পর স্বীকার করাতে, পরিশেষে এই রূপে পুরস্কৃত হইলেন। হর্শেল, মৃত্যুর কতিপয় বৎসর পূর্ব্ব পর্যন্তও জ্যৌতিষিক পর্য্যবেক্ষণে ক্ষান্ত হয়েন নাই। অনন্তর ১৮২২ খৃঃ অব্দে আগষ্ট মাসের ত্রয়োবিংশ দিবসে ত্র্য‌শীতি বর্ষ বয়ঃক্রম কালে লোকযাত্রা সম্বরণ করিলেন। তিনি যথেষ্ট বয়স্ ও যথেষ্ট মান প্রাপ্ত হইয়া এবং পরিবারের নিমিত্ত অপ্রমিত সম্পত্তি রাখিয়া তনুত্যাগ করিয়াছেন। ঐ পরিবার, তদীয় অপ্রমিত ধন সম্পত্তির ন্যায় তদীয় অদ্ভুত ধীসম্পত্তিরও উত্তরাধিকারী হইয়াছেন।

সূর্য্যসিদ্ধান্ত প্রভৃতির মতে পৃথিবী স্থিরা; আর সূর্য্য, চন্দ্র, মঙ্গল, বুধ প্রভৃতি গ্রহগণ তাহার চতুর্দ্দি‌কে পরিভ্রমণ করে। কিন্তু অধুনাতন ইয়ুরোপীয় পণ্ডিতেরা যে অখণ্ডনীয় অভ্রান্ত সিদ্ধান্ত করিয়াছেন, তাহা পূর্ব্ব‌োক্ত মতের নিতান্ত বিপরীত। তাঁহাদের মতে সূর্য্য সকলের কেন্দ্র অর্থাৎ মধ্যবর্তী আর গ্রহগণ তাহার চতুর্দ্দ‌িকে পরিভ্রমণ করে সূর্য্য গ্রহ মধ্যে পরিগণিত নহে; যাহারা সূর্য্যের চতুর্দ্দ‌িকে পরিভ্রমণ করে তাহারাই গ্রহ। পৃথিবীও বুধ, শুক্র প্রভৃতি গ্রহের ন্যায় যথা নিয়মে সূর্য্যের চতুর্দ্দ‌িকে পরিভ্রমণ করে; এই নিমিত্ত উহাও গ্রহ মধ্যে পরিগণিত। আর যাহারা কোন গ্রহের চতুর্দ্দ‌িকে পরিভ্রমণ করে, তাহাদিগকে উপগ্রহ ও সেই সেই গ্রহের পারিপার্শ্ব‌িক বলে। চন্দ্র পৃথিবীর চতুর্দ্দ‌িকে পরিভ্রমণ করে এই নিমিত্ত চন্দ্র স্বতন্ত্র গ্রহ নহে, ইহা এক উপগ্রহ, পৃথিবী গ্রহের পারিপার্শ্ব‌িক মাত্র। এক সূর্য্য ও তাহার চতুর্দ্দ‌িকে পরিভ্রমণকারী যাবতীয় গ্রহ, উপগ্রহ ও ধূমকেতুগণ লইয়া এক সৌর জগৎ হয়। সূর্য সকলের কেন্দ্র; আর বুধ, শুক্র, পৃথিবী, মঙ্গল, বেষ্টা, পল্লস্‌, জুনো, অস্‌ট্রিয়া, হীবি, আইরিস্‌, ফ্লো‌রা, ডায়েনা, বৃহস্পতি, শনৈশ্চর, যুরেনস্‌ ও নেপচুন এই সপ্তদশ গ্রহ সুর্য্যের চতুর্দ্দ‌িকে পরিভ্রমণ করে। পৃথিবীর একমাত্র পারিপার্শ্ব‌িক, বৃহস্প‌তির চারি, শনৈশ্চরের আট, যুরেনসের ছয়, আর নেপচুনের এপর্য্যন্ত একটা মাত্র বিজ্ঞাত হইয়াছে। এই সপ্তদশ ভিন্ন আরো অনেক গ্রহ আবিষ্কৃত হইবার সম্ভাবনা আছে। অনুমান হয়, এই সৌর জগতে বহু সহস্র ধূমকেতু আছে। গ্রহ উপগ্রহগণ নিজে তেজোময় নহে, তেজোময় সূর্য্যের আলোকপাত দ্বারা ঐরূপ প্রতীয়মান হয়। জ্যোতিৰ্বিদেরা ইহা প্রায় এক প্রকার স্থির করিয়াছেন, যে সকল নক্ষত্রের প্রভা চঞ্চল তাহারা এক এক সূর্য্য, নিজে তেজোময় এবং এক এক জগতের কেন্দ্র। এই অপরিচ্ছিন্ন বিশ্বমধ্যে আমাদের এই সৌর জগতের ন্যায় কত জগৎ আছে, তাহার ইয়ত্তা করা কাহারও সাধ্য নহে।