PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৮৬৯

চরিতাবলী

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৬৯

প্রকাশনা-তথ্য

চরিতাবলী

শ্রীঈশ্বরচন্দ্রবিদ্যাসাগরসঙ্কলিত।

চতুর্দশ সংস্করণ।

কলিকাতা

সংস্কৃত যন্ত্র।

সংবৎ ১৯২৫।

বিজ্ঞাপন

সংক্ষেপে ও সরল ভাষায় কতকগুলি মহানুভাবের বৃতান্ত সঙ্কলিত হইল। যে সকল অংশ পাঠ করিলে, বালকদিগের লেখা পড়ায় অনুরাগ জন্মিতে ও উৎসাহবৃদ্ধি হইতে পারে, এই পুস্তকে সেই সেই অংশমাত্র সঙ্কলিত হইয়াছে। সমগ্র বৃত্তান্ত লিখিতে গেলে, এরূপ অনেক বিষয় মধ্যে মধ্যে নিবেশিত হইত যে তৎসমুদায় এতদ্দেশীয় বালকদিগের অনায়াসে বোধগম্য হইত না, এবং ব্যাখ্যা করিয়া বালকদিগের বোধগম্য করিয়া দেওয়া শিক্ষক মহাশয়দিগের পক্ষেও নিতান্ত সহজ হইত না।

বালকদিগের নিমিত্ত পুস্তক লিখিতে প্রবৃত্ত হইয়া, যেরূপ যত্ন ও পরিশ্রম করা উচিত, নিতান্ত অনবকাশ ও শারীরিক অসুস্থতা বশতঃ, আমি সেরূপ করিতে পারি নাই। সুতরাং এই পুস্তকে অনেক অংশে অনেক দোষ ও ন্যূনতা লক্ষিত্ত হইবেক। বারান্তরে মুদ্রিত করণ কালে সেই সকল দোষের ও ন্যূনতার পরিহারে সাধ্যানুসারে যত্ন করিব।

শ্রীঈশ্বরচন্দ্রশর্ম্মা

কলিকাতা। সংস্কৃত কালেজ।
১লা শ্রাবণ। সংবৎ ১৯১৩।

সূচী

উইঙ্কিলমন

উইঙ্কিলমন

প্রসিয়ার অন্তঃপাতী ষ্টেণ্ডল নগরে উইঙ্কিলমনের জন্ম হয়। ইনি অতি দুঃখীর সন্তান। ইহার পিতা, চর্ম্মপাদুকা নির্মাণ ও বিক্রয় করিয়া, সংসারনির্বাহ করিতেন। উইঙ্কিলমনকে ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখাইবার নিমিত্ত, তাঁহার অত্যন্ত অভিলাষ ও যত্ন ছিল। এজন্য, নানা কষ্ট স্বীকার করিয়াও, তিনি তাঁহাকে এক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতে দিয়াছিলেন। কিন্তু, বৃদ্ধ ও রুগ্ন হইয়া,
তাঁহাকে হাঁসপাতালে গিয়া থাকিতে হইল। সুতরাং, পুত্ত্রর লেখা পড়ার ব্যয়নির্বাহ করিতে পারা দূরে থাকুক, আপনার চলাই ভার হইয়া উঠিল।

অতঃপর, উইঙ্কিলমন কিছু কিছু উপার্জ্জন করিতে না পারিলে, তাঁহার পিতার চলা ভার। বিদ্যালয় পরিত্যাগ করিয়া, উপার্জ্জনের চেষ্টা দেখা তাঁহার পক্ষে নিতান্ত আবশ্যক হইয়া উঠিল। কিন্তু, তাঁহার একান্ত অভিলাষ, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখেন। সুতরাং, তিনি কোন মতেই বিদ্যালয় পরিত্যাগ করিতে সম্মত ছিলেন না। তিনি সুশীল, পরিশ্রমী ও লেখা পড়ায় অতিশয় যত্নবান্ ছিলেন; এজন্য, তাঁহার অধ্যাপকেরা তাঁহাকে অতিশয় স্নেহ করিতেন। এই সময়ে তাঁহারা অনুগ্রহ করিয়া কিছু কিছু আনুকুল্য করিতে লাগিলেন। আর তিনি নিজেও, অল্পপাঠী বালকদিগকে শিক্ষা দিয়া, কিছু কিছু পাইতে লাগিলেন।

এই রূপে যাহা লাভ হইতে লাগিল, তদ্দ্বারা পিতার ও নিজের সমুদয় ব্যয় নির্বাহ হইয়া উঠে না। সুতরাং, আর কিছু লাভ না হইলে চলে না। কিন্তু, আর কিছু লাভেরও কোন সহজ উপায় দেখিতে পাইলেন না। পরিশেষে, অনেক ভাবিয়া, রাত্রিতে পথে পথে গান করিয়া ভিক্ষা করিতে আরম্ভ করিলেন। তাহাতে কিছু কিছু লাভ হইতে লাগিল এবং দিনের বেলায় বিদ্যালয়ে থাকিয়া নির্বিঘ্নে পড়া শুনাও চলিতে লাগিল। এই রূপে অধ্যাপকদিগের আনুকুল্য পাইয়া, ও স্বয়ং কিছু কিছু উপার্জ্জন করিয়া, আপনার ও পিতার ভরণপোষণনির্বাহ করিতে লাগিলেন। বোধ হয়, বিদ্যালয়ের বালকের পক্ষে ইহা অপেক্ষা অধিক কষ্টকর আর কিছুই হইতে পারে না। দেখ, বিদ্যাশিক্ষাবিষয়ে উইঙ্কিলমনের কেমন যত্ন! এত কষ্ট পাইয়াছিলেন, তথাপি লেখা পড়া ছাড়েন নাই। অবিশ্রান্ত ষত্ব ও পরিশ্রম করিয়া, পরিশেষে তিনি এক জন অতি প্রসিদ্ধ প্রধান পণ্ডিত হইয়াছিলেন।

উইলিয়ম গিফোর্ড

উইলিয়ম গিফোর্ড

ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী ডিবনশায়র প্রদেশে অশবর্টন নামে এক নগর আছে। তথায় গিফোর্ডের জন্ম হয়। গিফোর্ডের পিতা সভ্রান্ত ও সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন; কিন্তু উচ্ছৃঙ্খলতা ও অমিতব্যয়িত দ্বারা নিতান্ত নিঃস্ব হইয়া গিয়াছিলেন। চল্লিশ বৎসর বয়স না হইতেই, তাঁহার মৃত্যু হইল। এই সময়ে, গিফোর্ডের তের বৎসর মাত্র বয়স। তিনি অতিশয় দুঃখে পড়িলেন। তাঁহার পিতা সর্ব্বস্ব নষ্ট করিয়া গিয়াছিলেন; সুতরাং প্রতিপালনের কোন উপায় ছিল না, এবং এমন কোন আত্মীয় কুটুম্বও ছিলেন না যে, তাঁহার প্রতিপালনের ভার লয়েন।
কারলাইল নামে এক ব্যক্তি তাঁহাদের আত্মীয় ছিলেন। তিনি গিফোর্ডকে কহিলেন, আমি তোমার জননীকে কিছু টাকা ধার দিয়াছিলাম, তিনি তাহা পরিশোধ করিয়া যান নাই। তিনি, এই ছল করিয়া, অবশিষ্ট যা কিছু ছিল, সমুদয় লইলেন এবং গিফোর্ডকে আপন বাটতে লইয়া রাখিলেন। গিফোর্ড ইতিপূর্ব্বে কিছু লেখা পড়া শিখিয়াছিলেন; এক্ষণে কারলাইল তাঁহাকে অধ্যয়নার্থ বিদ্যালয়ে পাঠাইয়া দিলেন; কিন্তু আর খরচ যোগাইতে পারা যায় না, এই বলিয়া, তিন চারি মাস মধ্যেই, তাঁহাকে বিদ্যালয় হইতে ছাড়াইয়া লইলেন।

কারলাইল, এই রূপে গিফোর্ডকে পাঠশালা হইতে ছাড়াইয়া লইয়া, কৃষিকর্ম্মে নিযুক্ত করা স্থির করিলেন। কিন্তু পূর্ব্বে তাঁহার বক্ষঃস্থলে এক আঘাত লাগিয়াছিল; লাঙ্গলচালনপ্রভৃতি উৎকট পরিশ্রমের কর্ম্ম তাঁহা দ্বারা নির্বাহ হওয়া কঠিন। সুতরাং কারলাইল কৃষিকর্ম্মে নিযুক্ত করার পরামর্শ পরিত্যাগ করিলেন। পরে, তিনি তাঁহাকে এক ব্যক্তির নিকটে নিযুক্ত করিবার প্রস্তাব করিলেন। এই ব্যক্তি অতি দূর দেশান্তরে বাণিজ্য করিতেন। ইনি গিফোর্ডকে নিযুক্ত করিলে, ইঁহার বাণিজ্যস্থানে গিয়া তাঁহাকে থাকিতে হইত। কিন্তু ঐ ব্যক্তি গিফোর্ডকে নিতান্ত বালক দেখিয়া, কারলাইলের প্রস্তাবে সম্মত হইলেন না।

তৎপরে, কারলাইল তাঁহাকে ব্রিকসহম বন্দরের এক জাহাজে নিযুক্ত করিয়া দিলেন। গিফোর্ড কহিয়াছেন, “আমি জাহাজে নিযুক্ত হইয়া, যৎপরোনাস্তি ক্লেশ পাইয়াছিলাম; কিন্তু আমি যে লেখা পড়া করিতে পাইতাম না, সেই ক্লেশ সর্ব্বাপেক্ষায় অধিক বোধ হইয়াছিল।” কারলাইল, গিফোর্ডকে জাহাজে নিযুক্ত করিয়া দিয়া, এক বারও তাহার সংবাদ লইতেন না।

ব্রিকসহমের জেলের মেয়েরা, সপ্তাহে দুই বার, অশবর্টনে মৎস্য বিক্রয় করিতে যাইত। তাহারা গিফোর্ডের ক্লেশ দেখিয়া, দুঃখিত হইয়া, অশবর্টনে সকলের কাছে গল্প করিত। ঐ সকল গল্প শুনিয়া, গিফোর্ডের আত্মীয়েরা কারলাইলের অত্যন্ত নিন্দা করিতে লাগিলেন। তখন কারলাইল, তাঁহাকে আনিয়া, পুনরায় এক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতে দিলেন।

গিফোর্ড লেখা পড়ায় অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন; এক্ষণে বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, নিরতিশয় যত্ন ও পরিশ্রম সহকারে, অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। তিনি কহিয়াছেন, “আমি অল্প দিনের মধ্যেই এত শিখিয়া ফেলিলাম যে, বিদ্যালয়ের প্রধান ছাত্র বলিয়া গণ্য হইলাম, এবং আবশ্যক মতে মধ্যে মধ্যে শিক্ষকের সহকারিতা করিতে লাগিলাম। যখন যখন সহকারিতা করিতাম, শিক্ষক মহাশয় আমাকে কিছু কিছু দিতেন। আমি মনে মনে স্থির করিলাম, রীতিমত ইঁহার সহকারী নিযুক্ত হইব, এবং অন্য সময়ে অন্যান্য ছাত্রদিগকে শিক্ষণ দিতে আরম্ভ করিব। ইহাতে যাহা লাভ হইবেক, তাহাতেই খাওয়া, পরা, ও লেখা পড়ার ব্যয় নির্বাহ করিব। আর, আমার প্রথম শিক্ষক বৃদ্ধ ও রুগ্ন হইয়াছিলেন, সুতরাং তিনি ষে তিনি চারি বৎসরের অধিক বাঁচিবেন, এমন সম্ভাবনা ছিল না। আমি মনে মনে আশা করিয়াছিলাম, তাঁহার মৃত্যু হইলে, তদীয় পদে নিযুক্ত হইতে পারিব। এই সময়ে আমার বয়স পনরবৎসরমাত্র।

“আমি কারলাইলকে এই সকল কথা জানাইলাম; কারলাইল শুনিয়া অত্যন্ত অবজ্ঞাপ্রদর্শন করিয়া কহিলেন, তুমি ষথেষ্ট শিথিয়াছ; ষত শিক্ষা করা আবশ্যক, তাহা অপেক্ষা বরং অধিক শিথিয়াছ। আমার যাহা কর্ত্তব্য, করিয়াছি; এক্ষণে তোমায় এক পাদুকাকারের বিপণিতে নিযুক্ত করিয়া দিতেছি। তথায় থাকিয়া, মনোযোগ দিয়া কাজ শিখিলে, উত্তর কালে অনায়াসে জীবিকা নির্বাহ করিতে পরিবে। আমি শুনিয়া অত্যন্ত বিষন্ন হইলাম। এরূপ জঘন্য ব্যবসায় অবলম্বন করিতে আমার কোন মতেই ইচ্ছা ছিল না। কিন্তু তৎকালে সাহস করিয়া আপত্তি, বা অনিচ্ছাপ্রকাশ, করিতে পারিলাম না। সুতরাং, ছয় বৎসরের নিমিত্ত এক পাদুকাকারের বিপণিতে নিযুক্ত হইলাম।

“এই জঘন্য ব্যবসায়ের উপর আমার অত্যন্ত ঘৃণা ছিল; সুতরাং শিখিবার নিমিত্ত যত্ন ও প্রবৃত্তি হইত না; এবং ভাল করিয়া শিখিতেও পারিতাম না। প্রথম শিক্ষকের মৃত্যু হইলে, তাঁহার কর্ম্মে নিযুক্ত হইতে পারিব এই যে আশা করিয়াছিলাম, এখন আমার সে আশা যায় নাই। এজন্য, কর্ম্ম করিয়া অবসর পাইলেই লেখা পড়া করিতাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সর্ব্বদা অবসর পাইতাম না। আমি অবসর পাইলেই পড়িতে বসি দেখিয়া, প্রভু অত্যন্ত অসন্তুষ্ট হইতেন, এবং যাহাতে অবসর না পাই, এরূপ চেষ্টা করিতেন। কি অভিপ্রায়ে তিনি সেরূপ করেন, আমি প্রথমে তাহা বুঝিতে পারি নাই। অবশেষে অনুসন্ধান করিয়া জানিতে পারিলাম, আমি যে কর্ম্মের আকাঙ্ক্ষায় লেখা পড়ায় যত্ন করিতেছিলাম, তিনি আপন কনিষ্ঠ পুত্ত্রকে ঐ কর্ম্মে নিযুক্ত করিবার নিমিত্ত চেষ্টিত ছিলেন।

“এই সময়ে, এক স্ত্রীলোক অনুগ্রহ করিয়া আমায় একখানি বীজগণিত পুস্তক দিয়াছিলেন; আমার নিকট এতদ্ব্যতিরিক্ত আর কোন পুস্তক ছিল না। প্রথমে উপক্রমশিকা না পড়িলে, ঐ পুস্তক পড়িতে পারা যায় না। কিন্তু আমার নিকট বীজগণিতের উপক্রমণিকা ছিল না; আর এমন সঙ্গতিও ছিল না যে, ঐ পুস্তক ক্রয় করি। আমার প্রভু আপন পুত্ত্রকে একখানি উপক্রমণিকা ক্রয় করিয়া দিয়াছিলেন। কিন্তু তিনি সাবধানে গোপন করিয়া রাখিতেন; আমায় দেখিতে দিতেন না। তিনি যে স্থানে লুকাইয়া রাখিতেন, আমি তাহার সন্ধান পাইয়াছিলাম; সন্ধান পাইয়া, কয়েক দিন প্রায় সমস্ত রাত্রি জাগিয়া, তাঁহার অজ্ঞাতসারে ঐ পুস্তক পড়িয়া লইলাম।

“ঐ পুস্তক পাঠ করিয়া বীজগণিতপাঠে অধিকারী হইলাম এবং যত্নপূর্বক পাঠ করিতে আরম্ভ করিলাম। কিন্তু অত্যন্ত অসুবিধা ঘটিল। অঙ্ক কসিবার নিমিত্ত কালি কলম কাগজের অত্যন্ত প্রয়োজন। কিন্তু ঐ সময়ে আমার এক পয়সারও সঙ্গতি ছিল না, এবং এমন কোন আত্মীয়ও ছিলেন না যে, কিছু দিয়া সাহায্য করেন; সুতরাং ঐ সমুদয়ের সংযোগ ঘটিয়া উঠিত না। পরিশেষে অনেক ভাবিয়া, এক উপায় স্থির করিয়াছিলাম। চর্ম্মখণ্ডকে মন্থণ করিয়া কাগজ করিয়া লইতাম, এবং এক ভোঁতা আল লইয়া কলম করিতাম। এই রূপে, মসৃণ চর্ম্মখণ্ডের উপর অঙ্ক কসিতে আরম্ভ করিয়াছিলাম। কিন্তু ইহা অত্যন্ত গোপনে সম্পন্ন করিতে হইত। কারণ, আমার প্রভু সন্ধান পাইলে, নিঃসন্দেহ বন্ধ করিয়া দিতেন ও তিরস্কার করিতেন।”

এ পর্য্যন্ত, গিফোর্ড যৎপরোনাস্তি ক্লেশ ভোগ করিয়াছিলেন। অতঃপর, তাঁহার সে ক্লেশের কিঞ্চিৎ লাঘব হইয়াছিল। তাঁহার এক পরিচিত ব্যক্তি কতকগুলি শ্লোক রচনা করিয়াছিলেন। তদ্দৃষ্টে তাঁহারও শ্লোকরচনা করিতে ইচ্ছা হয়, এবং অবিলম্বে কতকগুলি শ্লোক রচনা করেন। তিনি আপন সহচরদিগকে ঐ শ্লোক শুনাইতেন। শুনিয়া সকলে প্রশংসা করিত। কেহ কেহ কিছু পুরস্কারও দিত। এক দিন, বিকাল বেলায়, তিনি চারি আনা পান। মধ্যে মধ্যে, তিনি এই রূপে কিছু কিছু পাইতে লাগিলেন। যাহার এক পয়সা পাইবার উপায় ছিল না, মধ্যে মধ্যে এরূপ প্রাপ্তি তাঁহার পক্ষে ঐশ্বর্য্যলাভ জ্ঞান হইত। এ পর্য্যন্ত, কালি, কলম, কাগজ ও পুস্তকের অভাবে তাঁহার লেখা পড়ার অত্যন্ত ব্যাঘাত হইত; এক্ষণে, আবশ্যকমত কিছু কিছু কিনিতে আরম্ভ করিলেন। শ্লোকরচনা ও শ্লোকপাঠ করিয়া, কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ লাভ অতি গোপনে সম্পন্ন করিতে হইত।

দুর্ভাগ্যক্রমে, এই বিষয় অধিক দিন গোপনে রহিল না; ক্রমে ক্রমে তাঁহার প্রভুর কর্ণগোচর হইল। আমার কাজ ক্ষতি করিয়া এই সকল করিয়া বেড়ায়, এই মনে ভাবিয়া তিনি তাঁহার রচিত শ্লোক সকল এবং কাগজ, কলম, কালি ও পুস্তক সমুদয় কাড়িয়া লইলেন এবং অত্যন্ত তিরস্কার করিয়া এক বারে তাঁহার লেখা পড়া বন্ধ করিয়া দিলেন। এই সময়েই তাঁহার প্রথম শিক্ষকের মৃত্যু হইল, এবং তাঁহার স্থলে অন্য এক ব্যক্তি নিযুক্ত হইলেন। এ পর্য্যন্ত, তিনি যে ঐ পদে নিযুক্ত হইবার আশা করিয়া ছিলেন, সে আশা এক বারে উচ্ছিন্ন হইয়া গেল। এই দুই ঘটনা দ্বারা তিনি যৎপরোনাস্তি দুঃখিত ও সর্ব্ব বিষয়ে নিতান্ত নিরুৎসাহ হইলেন। তিনি মনের দুঃখে কাহার নিকটে যাইতেন না, কর্মের সময় কর্ম্মমাত্র করিতেন, অবশিষ্ট সময়ে একাকী বিরস বদনে বসিয়া থাকিতেন। ফলতঃ, এই সময়ে তাহার মনোদুঃখের আর সীমা ছিল না।

গিফোর্ডের মনোদুঃখের বিষয় কর্ণপরম্পরায় কুকস্লিনামক এক ব্যক্তির গোচর হইল। তিনি গিফোর্ডের দুঃখের কথা শুনিয়া অতিশয় দুঃখিত হইলেন। গিফোর্ডের মুখে তদীয় অবস্থাসংক্রান্ত আদ্যোপান্ত সমস্ত বৃত্তান্ত অবগত হইয়া, তাঁহার অন্তঃকরণে অত্যন্ত দয়া উপস্থিত হইল। তখন, তিনি মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন, গিফোর্ডের দুঃখ দূর করিব এবং উহাকে ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখাইব। তদনুসারে তিনি, আত্মীয়বর্গের মধ্যে চাঁদা করিয়া, কিছু টাকা সংগ্রহ করিলেন।

যে নিয়মে গিফোর্ড পূর্ব্বোক্ত পাদুকাকারের বিপণিতে নিযুক্ত হন, তদনুসারে তাঁহাকে আর কিছু দিন তথায় থাকিতে হইত। কুকস্লি, তাঁহাকে ষাটি টাকা দিয়া, গিফোর্ডকে ছাড়াইয়া আনিলেন, অধ্যয়নের নিমিত্ত এক বিদ্যালয়ে নিযুক্ত করিয়া দিলেন, এবং তাঁহার সমুদয় ব্যয় নির্বাহ করিতে লাগিলেন। এই সময়ে, গিফোর্ডের বয়স কুড়ি বৎসর। বিদ্যাশিক্ষাবিষয়ে গিফোর্ডের অত্যন্ত যত্ন ছিল; কেবল সুযোগ ঘটে নাই বলিয়া, এ পর্য্যন্ত তিনি উত্তম রূপে শিক্ষা করিতে পারেন নাই। এক্ষণে দায়াশীল কুকসি ও তাঁহার আত্মীয়বর্গের অনুগ্রহে বিলক্ষণ শিক্ষা করিতে লাগিলেন। ফলতঃ, তিনি লেখা পড়া বিষয়ে এত যত্ন ও এত পরিশ্রম করিতে লাগিলেন যে, তাঁহার অনুগ্রাহকবর্গ দেখিয়া শুনিয়া অতিশয় প্রীত হইলেন।

এই রূপে আন্তরিক যত্ন সহকারে, দুই বৎসর দুই মাস অধ্যয়ন করিয়া, তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইবার উপযুক্ত হইলেন। কুক্‌স্লি তাঁহাকে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট করিয়া দিলেন। তিনি নিশ্চিত জানিয়াছিলেন, গিফোর্ড অনায়াসে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশংসাপত্র লাভ করিতে পারিবেন; এজন্য, স্থির করিয়াছিলেন, যত দিন গিফোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিয়া, পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, প্রশংসাপত্র না পান, তত দিন সমুদয় ব্যয় দিয়া তাঁহাকে অধ্যয়ন করাইবেন। কুক্‌স্লির নিতান্ত অভিলাষ, গিফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশংসাপত্র পান। কারণ, তাহা হইলেই, তাহাকে সকলে বিদ্বান বলিয়া গণনা করিবে।

গিফোর্ড বিশিষ্টরূপ বিদ্যালাভের নিমিত্ত যেমন ব্যগ্র ছিলেন, তাঁহার সৌভাগ্যক্রমে তেমনই সুযোগ ঘটিয়া উঠিল। তিনি কুক্‌স্লির অভিলাষ পূর্ণ করিবার নিমিত্ত প্রাণপণে যত্ন করিতে লাগিলেন। কিন্তু, আক্ষেপের বিষয় এই, গিফোর্ডের প্রশংসাপত্র পাইবার পূর্ব্বেই, কুক্‌স্লির মৃত্যু হইল। কিছু দিন পরে, গিফোর্ড প্রশংসাপত্র প্রাপ্ত হইলেন। কুক্‌স্লি এই সময়ে জীবিত থাকিলে, কি অনির্বচনীয় প্রীতিলাভ করিতেন, বলিতে পারা যায় না।

কুক্‌স্লি গিফোর্ডের প্রতি যেরূপ দয়া ও স্নেহ করিতেন এবং তাঁহার ভাল করিবার নিমিত্ত যেরূপ যত্নবান্ ছিলেন, অন্য ব্যক্তির সেরূপ হওয়া অসম্ভব। সুতরাং, কুক্‌স্লির মৃত্যু গিফোর্ডের পক্ষে বজ্রপাততুল্য হইল। কিন্তু কুক্‌স্লির মৃত্যু হওয়াতে, গিফোর্ড নিতান্ত নিঃসহায় হইলেন না। গ্রাসবিনরনামক এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি তাঁহার সহায় হইলেন। গিফোর্ডের ভাল করিবার বিষয়ে ইঁহার বরং কুক্‌স্লি অপেক্ষা অধিক ক্ষমতা ছিল। এই সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির সহায়তাতে, গিফোর্ডের উত্তরোত্তর ভাল হইতে লাগিল। তিনি ক্রমে ক্রমে পণ্ডিতসমাজে গণনীয় ও প্রশংসনীয় হইলেন, এবং বিদ্যাবলে ও কায়িক পরিশ্রমে বিস্তর ধন উপার্জন করিয়া, পরম সুখে কালযাপন করিতে লাগিলেন।

এই রূপে বিদ্যা, খ্যাতি ও বিপুল সম্পত্তি লাভ করিয়া, গিফোর্ড একাত্তর বৎসর বয়সে তনুত্যাগ করেন। তিনি এক মুহূর্ত্তর নিমিত্তে বিস্মৃত হন নাই যে, কেবল কুক্‌স্লির দয়া ও স্নেহই তাঁহার বিদ্যা, খ্যাতি, সুখ, সম্পত্তি সমুদয়ের মূল। এই নিমিত্ত, মৃত্যুকালে তিনি আপন সমস্ত সম্পত্তি সেই পরম দয়ালু মহাত্মার পুত্ত্রকে দান করিয়া যান। কৃতজ্ঞতার এরূপ দৃষ্টান্ত প্রায় দেখিতে পাওয়া যায় না।

অতি অন্প বয়সে গিফোর্ডের পিতৃবিয়োগ হয়। সহায় সম্পত্তি কিছুই ছিল না। তিনি বিংশতি বৎসর বয়স পর্য্যন্ত কত কষ্ট পাইয়াছিলেন। বাল্যকাল অবধি, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত তাঁহার অত্যন্ত যত্ন ছিল। কিন্তু, কারলাইল সে বিষয়ে অনুকুল না হইয়া বরং পূর্ব্বাপর প্রতিকূলতাচরণ করিয়াছিলেন। পরিশেষে, তিনি তাঁহাকে পাদুকাকারের বিপণিতে নিযুক্ত করিয়া দেন। তথায় তাঁহার দুরবস্থার সীমা ছিল না। বাস্তবিক, তিনি কুড়ি বৎসর বয়স পর্য্যন্ত যৎপরোনাস্তি ক্লেশে কাল যাপন করিয়াছিলেন। কিন্তু, বিদ্যাশিক্ষাবিষয়ে তাঁহার পূর্ব্বাপর সমান অনুরাগ ছিল। ভাল করিয়া লেখা পড়া শিথিবার নিমিত্ত তাঁহার যে আন্তরিক যত্ন ছিল, এক মুহূর্ত্তের নিমিত্ত তাঁহার সে যত্নের অণুমাত্র নূন্যতা হয় নাই। এই আন্তরিক যত্নের গুণেই, তিনি অসাধারণ বিদ্যা, খ্যাতি ও সম্পত্তি লাভ করিয়াছিলেন। ইহা যথার্থ বটে, কুক্‌স্লি তাঁহার যথেষ্ট আনুকুল্য করিয়া ছিলেন, এবং সেই আনুকূল্য না পাইলে, তিনি কখন এরূপ হইতে পারিতেন না; কিন্তু তাঁহার আন্তরিক যত্নই কুক্‌স্লির আনুকূল্যের মুল। লেখা পড়া বিষয়ে তাঁহার তাদৃশ আন্তরিক যত্ন না দেখিলে, কুক্‌স্লির কখনই তাঁহার প্রতি সেরূপ দয়া ও স্নেহ প্রদর্শন করিতেন না। অতএব, দেখ! আন্তরিক যত্ন থাকিলে বিদ্যা, খ্যাতি, সুখ, সম্পত্তি সকলই লাভ করা যাইতে পারে; অবস্থার বৈগুণ্য কদাচ প্রতিবন্ধক হইতে পারে না।

উইলিয়ম পষ্টেলস

উইলিয়ম পষ্টেলস

ফ্রান্সের অন্তঃপাতী মর্ম্মণ্ডি প্রদেশে ডলেরি নামে গ্রাম আছে। পষ্টেলস সেই গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। একে অতি দুঃখীর সন্তান; তাহাতে আবার নিতান্ত শৈশব অবস্থায় পিতৃবিয়োগ হয়; সুতরাং, ইঁহার প্রতিপালনের অথবা লেখা পড়া শিখিবার কোন উপায় ছিল না। যাহা হউক, সুযোগমতে কিঞ্চিৎ শিক্ষা করিয়া, ইনি লেখা পড়ায় এমন অনুরক্ত হইয়াছিলেন যে, পুস্তক লইয়া পড়িতে বসিলে ক্ষুধা তৃষ্ণ কিছুই থাকিত না; তিনি আহারের সময় আহার করিতে ভুলিয়া যাইতেন। কিন্তু, দুঃখীর সন্তান বলিয়া, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিবার সুবিধা হয় না। পারিস নগরে গেলে, লেখা পড়ার সুবিধা হইতে পারিবেক, এই ভাবিয়া তিনি পারিস যাত্রা করিলেন।

দুর্ভাগ্যক্রমে পথে দস্যুদলে আক্রমণ করিল, সঙ্গে যা কিছু ছিল, সমুদয় কাড়িয়া লইল এবং অত্যন্ত প্রহার করিল। শরীরে এত আঘাত লাগিয়াছিল যে, তাঁহাকে এক হাঁসপাতালে গিয়া আশ্রয় লইতে হইল। তিনি তথায় দুই বৎসর থাকিয়া সুস্থ হইলেন এবং সুস্থ হইয়া পুনরায় পারিস যাত্রা করিতে উদ্যত হইলেন। কিন্তু, কি খাইয়া ও কি পরিয়া পারিস যান, তাহার কোন ঠিকানা ছিল না। সেই সময়ে ক্ষেত্রের শস্য পাকিয়া উঠিয়া ছিল। শস্য কাটিবার নিমিত্ত, অনেকের ঠিকা লোক নিযুক্ত করিবার আবশ্যকতা দেখিয়া, তিনি ঐ ঠিকা কর্ম্ম করিতে লাগিলেন; এবং কয়েক দিন কর্ম্ম করিয়া, পাথেয়ের সংস্থান ও পরিধেয় বস্ত্র সংগ্রহ পূর্ব্বক পারিস যাত্রা করিলেন। তথায় উপস্থিত হইয়া, তিনি লেখা পড়া শিখিবার ভাল সুযোগ করিতে পারিলেন না; পরিশেষে, অন্য কোন উপায় না দেখিয়া, এক বিদ্যালয়ে পরিচারক নিযুক্ত হইলেন। এখানে থাকিলে লেখা পড়ার অনেক সুবিধা হইবেক, এই ভাবিয়া তিনি ঐ নীচ কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। ফলতঃ, তিনি ভাল করিয়া লেখা পড়া শিথিবার নিমিত্ত এত উৎসুক ছিলেন যে, ঐ নীচ কর্ম্ম পাইয়াও সৌভাগ্য জ্ঞান করিয়াছিলেন। তিনি যে কর্ম্মে নিযুক্ত হইলেন, তাহাতে অবসর পাওয়া দুর্ঘট। অত্যল্পমাত্র যে অবসর পাইতেন, তাহাতেই তিনি কিছু কিছু শিক্ষা করিতেন।

কিন্তু, লেখা পড়ায় আন্তরিক যত্ন থাকার এমনই গুণ যে, এই ব্যক্তি ক্রমে ক্রমে এক জন অতি প্রধান পণ্ডিত হুইয়া উঠিলেন। তাঁহার অসাধারণ বিদ্যার বিষয় ফ্রান্সের অধিপতি প্রথম ফ্রান্সিসের গোচর হইলে, তিনি তাঁহাকে, আরবী পারসী প্রভৃতি পুস্তক সংগ্রহের ভার দিয়া, লিবাণ্ট প্রদেশে প্রেরণ করিলেন। তিনি তদ্বিষয়ে সবিশেষ বিবেচন ও নৈপুণ্য প্রদর্শন করাতে, প্রধান রাজমন্ত্রী তাঁহার প্রতি অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন। তিনি, লিবাণ্ট হইতে প্রত্যাগমন করিয়া, ঐ রাজ মন্ত্রীর অনুগ্রহে, এক অতি প্রধান পদে নিযুক্ত হইলেন।

উইলিয়ম রস্কো

উইলিয়ম রস্কো

উইলিয়ম রস্কো দুঃখীর সন্তান ছিলেন। তাঁহার পিতা কৃষিকর্ম্ম করিয়া কষ্টে সংসার নির্বাহ করিতেন; পুত্রকে উত্তমরূপ লেখা পড়া শিখান, তাঁহার এমন সংস্থান ছিল না। সুতরাং রস্কো বাল্যকালে অতি সামান্যরূপ লেখা পড়া শিখিয়াছিলেন।

রস্কোর পিতার আলুর চাস ছিল। একাকী চাসের সমুদয় কর্ম্ম নির্বাহ করিতে পারেন না, এজন্য তিনি রস্কোকে, বার বৎসর বয়সের সময়,পাঠশালা ছাড়াইয়া, চাসের কর্ম্মে নিযুক্ত করিলেন। তদবধি কয়েক বৎসর পর্যন্ত, রস্কো চাসের কর্ম্মে নিযুক্ত ছিলেন। তিনি পিতার সঙ্গে চাসের কর্ম্ম করিতেন, এবং আলু প্রস্তুত হইলে আলুর বাজরা মাথায় করিয়া, বাজারে গিয়া বিক্রয় করিয়া আসিতেন।

রস্কো অতি সুশীল ও সুবোধ ছিলেন; অন্যান্য বালকদিগের মত দুষ্ট ও চঞ্চলস্বভাব ছিলেন না। তিনি লেখা পড়ায় এমন যত্নবান্ ছিলেন যে, চাসের কর্ম্ম করিয়া অবসর পাইলেই, অন্য দিকে মন না দিয়া, কেবল লেখা পড়া করিতেন। তিনি কখন খেলা বা গল্প করিয়া সময় নষ্ট করেন নাই। অসঙ্গতি প্রযুক্ত তাঁহার পিতা পুস্তক কিনিয়া দিতে পারিতেন না; সুতরাং দৈবযোগে যখন যে পুস্তক জুটিত, তিনি তাহাই পাঠ করিতেন। এই রূপে, অবসরকালে কিঞ্চিৎ কিঞ্চিৎ পাঠ করিয়া, লেখা পড়ায় তাহার এক প্রকার অধিকার জন্মিল। উপদেশ দিবার লোক ও ইচ্ছামত পড়িবার পুস্তক জুটিলে, তিনি এই সময়ে ইহা অপেক্ষা অনেক অধিক শিখিতে পারিতেন, সন্দেহ নাই।

সর্ব্বদা ইচ্ছামত পুস্তক পড়িতে পাইব, এই অভিপ্রায়ে রস্কো পুস্তকবিক্রয়ের কর্ম্ম করিবার ইচ্ছা প্রকাশ করাতে, তাঁহার পিতা তাঁহাকে এক প্রধান পুস্তকবিক্রেতার দোকানে রাখিয়া দিলেন। কিছু দিন কর্ম্ম করিয়া পুস্তকবিক্রয়ব্যবসায় তাঁহারে ভাল লাগিল না। তিনি ত্বরায় সে কর্ম্ম পরিত্যাগ করি লেন। অবশেষে, তাঁহার পিতা তাঁহাকে ওকালতী কর্ম্ম শিখাইবার নিমিত্ত, এক উকীলের নিকট রাখিয়া দিলেন।

এই সময়ে, সৌভাগ্যক্রমে, হোলডন নামক এক ব্যক্তির সহিত রস্কোর অতিশয় সৌহৃদ্য জন্মিল। হোলডন অতি সুশীল ও অতিশয় বুদ্ধিমান্‌ ছিলেন, এবং অল্প বয়সেই নানা ভাষায় ও নানা বিদ্যায় পণ্ডিত হইয়াছিলেন। রস্কো ও হোলডন উভয়ে প্রায় সমবয়স্ক; উভয়েই বিদ্যানুশীলনবিষয়ে অত্যন্ত অনুরক্ত ও অত্যন্ত যত্নবান। অবসরকালে উভয়ে একত্র হইয়া লেখা পড়ার চর্চ্চা করিতে আরম্ভ করিলেন।

এ পর্য্যন্ত রস্কো জাতিভাষা ইঙ্গরেজী ভিন্ন আর কোন ভাষা জানিতেন না। হোলডন, পরামর্শ দিয়া, রস্কোকে অন্যান্য ভাষা শিক্ষা করিতে আরম্ভ করাইয়া দিলেন এবং আপনি শিক্ষা দিতে লাগিলেন। এই সুযোগ পাইয়া রস্কো গ্রীক, লাটিন, ফরাসি ও ইটালীয় ভাষা শিক্ষা করিলেন। এই রূপে, তিনি ক্রমে ক্রমে নানা ভাষায় ও নানা বিদ্যায় নিপুণ হইয়া উঠিলেন। একুশ বৎসর বয়সে, তিনি ওকালতী কর্মে প্রবৃত্ত হইলেন, এবং কিছু দিন কর্ম করিয়া কিঞ্চিৎ সংস্থান হইলে পর, বিবাহ করিলেন।

রস্কো ক্রমে ক্রমে দুই উৎকৃষ্ট ইতিহাসগ্রন্থ রচনা করিয়া প্রচার করিলেন; তদ্দ্বারা তাঁহার নাম এক কালে দেশে বিদেশে বিখ্যাত হইল। এই দুই গ্রন্থের রচনাবিষয়ে তিনি বিস্তর পরিশ্রম করিয়াছিলেন। এই দুই গ্রন্থ এমন উৎকৃষ্ট হইয়াছে যে, তদ্দ্বারা তাঁহার নাম চিরস্থায়ী হইতে পারিবেক। ইহা ভিন্ন, তিনি আরও কতিপয় গ্রন্থ রচনা করিয়াছিলেন।

ক্রমে ক্রমে, রস্কো দেশের মধ্যে এক জন প্রধান লোক বলিয়া গণ্য হইলেন; সর্ব্বত্র মান্য হইলেন; এবং কি বিদ্বান্ কি সম্ভ্রান্ত লোক, সকলের নিকট সমান আদরণীয় হইলেন। রস্কো অতি ধর্ম্মশীল লোক ছিলেন; কখন অধর্ম্মপথে পদার্পণ করেন নাই।

দেখ! যিনি, পিতার অসঙ্গতি প্রযুক্ত, বাল্যকালে ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিতে পান নাই; যাঁহাকে, বার বৎসর বয়সের সময়, পাঠশালা ছাড়িয়া স্বহস্তে চাসের সমুদয় কর্ম্ম করিতে হইয়াছিল; যিনি, বাজরা মাথায় করিয়া, বাজারে গিয়া, আলু বিক্রয় করিয়া আসিতেন; সেই ব্যক্তি, কেবল আন্তরিক যত্ন ও পরিশ্রমের গুণে, নানা ভাষায় ও নানা বিদ্যায় পণ্ডিত হইয়াছিলেন, দেশের মধ্যে এক জন প্রধান লোক বলিয়া গণ্য ও সর্বত্র মান্য হইয়াছিলেন, এবং গ্রন্থরচনা করিয়া, সর্ব্বত্র বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয় হইয়া গিয়াছেন।

উইলিয়ম হটন

উইলিয়ম হটন

ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী ডর্বি নগরে হটনের জন্ম হয়। হটনের পিতা অতি দুঃখী ছিলেন। তিনি পশম পরিষ্করণকর্ম্ম করিয়া জীবিকা নির্বাহ করিতেন; সুতরাং অতি কষ্টে বৃহৎ পরিবারের ভরণ পোষণ নির্বাহ হইত। কষ্টের কথা অধিক কি বলিব, অনেক
দিন এরূপ ঘটিত যে, হটনের জননীকে, সমুদয় ছোট ছোট ছেলেগুলির সহিত, সমস্ত দিন উপবাসী থাকিতে হইত, ছেলেগুলি, ক্ষুধায় কাতর ও আহারের নিমিত্ত লালায়িত হইয়া, জননীকে নিতান্ত ব্যাকুল করিত। সায়ংকালে কিছু আহারের সামগ্রী উপস্থিত হইলে, তাহারা ক্ষুধার জ্বালায় কাড়াকড়ি করিয়া জননীর ভাগ পর্য্যন্ত খাইয়া ফেলিত; জননী সজল নয়নে হাত তুলিয়া বসিয়া থাকিতেন। সুতরাং তাঁহাকে অনেক দিন অনাহারেই থাকিতে হইত।

হটনের পিতা যাহা উপার্জ্জ‌ন করিতেন, তাহাতে অতি কষ্টেও তাঁহার স্ত্রী ও পুত্র কন্যা দিগের ভরণ পোষণ নির্বাহ হইত না। আবার, দুর্ভাগ্যক্রমে, তিনি সুরাপানে আসক্ত হইয়া উঠিলেন। সর্ব্বদা শুঁড়ির দোকানে পড়িয়া থাকিতেন; যাহা উপার্জ্জ‌ন করিতেন, তাঁহার অধিকাংশই সুরাপানে ব্যয়িত হইত। সুতরাং তাঁহার স্ত্রী ও পুত্র কন্যা দিগের আহারের ক্লেশ আরও অধিক হইয়া উঠিল। হটন কহিয়াছেন, “আমি এক দিন দিবারাত্রি উপবাসী ছিলাম; পর দিন বেলা দুই প্রহরের সময় ময়দা ও জল ফুটাইয়া কিঞ্চিৎ মাত্র আহার করিয়াছিলাম।”

এরূপ দুরবস্থায় যেরূপ লেখা পড়া হইতে পারে, তাহা অনায়াসে বোধগম্য হইতেছে। যাহা হউক, হটনের পিতা হটনকে, তাঁহার পাঁচ বৎসর বয়সের সময়, এক পাঠশালায় পাঠাইয়া দেন। ঐ পাঠশালার শিক্ষক আপন ছাত্রদিগকে লেখা পড়া যত শিখাইতে পারুন না পারুন, তাহাদিগকে বিলক্ষণ প্রহার করিতে পারিতেন। হটন কহিয়াছেন, “আমার শিক্ষক লেখা পড়া কিছুই শিখাইতেন না, সর্ব্বদা কেবল চুল ধরিয়া দিয়ালে মাথা ঠুকিয়া দিতেন।” তিনি, দুই বৎসর, এই পাঠশালায় ছিলেন; পরে তাঁহার পিতা তাঁহাকে সাত বৎসর বয়সের সময়, পাঠশালা ছাড়াইয়া, এক রেশমের বানকে নিযুক্ত করিয়া দিলেন।

এই স্থানে হটনের ক্লেশের সীমা ছিল না। তিনি কহিয়াছেন, “এই সময়ে আমাকে প্রতিদিন অতি প্রত্যুষে উঠতে হইত; বিশেষ ক্রটি হউক না হউক, মধ্যে মধ্যে প্রভুর বেত্রপ্রহার সহ করিতে হইত; আর, যত ছোট লোকের ছেলের সহিত বাস করিতে হইত। তাহারা লেখা পড়া কিছুই জানিত না, এবং লেখা পড়া শিখিতেও তাহদের ইচ্ছা ছিল না। এক দিনের বেত্রাঘাতে পৃষ্ঠের এক স্থান ক্ষত হইয়া গিয়াছিল। পরে, আর এক দিন প্রহারকালে, বেত্রের অগ্রভাগ লাগিয়া, ঐ ক্ষত এমন প্রবল হইয়া লঠিল যে, তদ্দৃষ্টে সকলে এই আশঙ্কা করিতে লাগিলেন, ঘা ভাল হওয়া কঠিন হইয়া উঠিবেক, আর, হয় ত, ক্রমে ক্রমে সমুদয় পীঠ পচিয়া যাইবেক।”

হটন, এই রূপে এই স্থানে সাত বৎসর কাটাইলেন। পরে, তাঁহার চৌদ্দ বৎসর বয়সের সময়, তাহার পিতা তাঁহাকে, তথা হইতে আনিয়া, আপন এক ভ্রাতার নিকট রাখিয়া দিলেন। এই ব্যক্তি নটিংহম নগরে মোজা বোনা ব্যবসায় করিতেন। হটন, পিতৃব্যের নিকট থাকিয়া, মোজা বোনা শিখিতে লাগিলেন। তাঁহার পিতৃব্য নিতান্ত মন্দ লোক ছিলেন না; কিন্তু পিতৃব্যপত্নী অতিশয় দুৰ্বৃত্ত‌া। তিনি আপন স্বামীকে, ও স্বামীর নিকট যাহারা কর্ম্ম করিত, তাহাদিগকে, অত্যন্ত আহারের ক্লেশ দিতেন।

এইরূপ ক্লেশ পাইয়াও, হটন পিতৃব্যের নিকট তিন বৎসর অবস্থিতি করিলেন। এক দিবস, তাঁহার পিতৃব্য তাঁহাকে কহিলেন, আজি তোমায় এই কর্ম্ম সমাপন করিতে হইবেক। সে দিবস, সেই কর্ম্ম সমাপ্ত হইয়া উঠিল না। এজন্য, তাঁহার পিতৃব্য, তাঁহাকে অলস ও অমনোযোগী স্থির করিয়া, প্রথমতঃ, যথোচিত তিরস্কার করিলেন; পরিশেষে, ক্রোধে অন্ধ ও নিতান্ত নিদয় হইয়া, অতিশয় প্রহার করিলেন। হটনের মনে অত্যন্ত ঘৃণা ও অপমান বোধ হইল। তখন, তিনি তথা হইতে পলায়ন করা স্থির করিলেন, এবং এক দিন সুযোগ পাইয়া আপনার কাপড়গুলি ও পিতৃব্যের বাক্স হইতে একটি টাকা পথখরচ লইয়া, পলায়ন করিলেন।

এই স্থান হইতে পলায়ন করিয়া, হটন যেরূপ কষ্ট পাইয়াছিলেন, তাহা শুনিলে, অত্যন্ত দুঃখ উপস্থিত হয়। তিনি, কোন আশ্রয় না পাইয়া, প্রথম রাত্রি এক মাঠে শয়ন করিয়া কাটাইলেন, এবং প্রভাত হইবামাত্র, পুনরায় প্রস্থান করিলেন। কিন্তু কোন দিকে যান, কি জন্যেই বা যান, যাইয়াই বা কি করিবেন, তাহার কিছুই ঠিকানা ছিল না।

তিনি কহিয়াছেন, “এই রূপে সমস্ত দিন ভ্রমণ করিয়া, সায়ংকালে লিচ্‌‌ফিল্‌ডের নিকট উপস্থিত হইলাম; নিকটে এক খামার দেখিয়া মনে করিলাম, আজি উহার মধ্যে থাকিয়া রাত্রি কাটাইব। কিন্তু খামারের দ্বার রুদ্ধ করা ছিল, সুতরাং উহার ভিতরে যাইতে পারিলাম না। তখন, পুটলী খুলিয়া কাপড় পরিলাম, এবং অবশিষ্ট কাপড় প্রভৃতি যাহা ছিল, সমুদয় বাঁধিয়া বেড়ার আড়ালে লুকাইয়া রাখিয়া, নগর দেখিতে গেলাম। দুই ঘণ্টা পরে ফিরিয়া আসিয়া কাপড় ছাড়িলাম। অল্প‌ দূরে আর একটি খামার ছিল, হয় ত, ঐ খানে থাকিবার জায়গা পাইব, এই মনে করিয়া, সেখানে গিয়া দেখিলাম, সেখানেও থাকিবার উপায় নাই; সুতরাং ফিরিয়া আসিলাম; ফিরিয়া আসিয়া দেখিলাম, আমার কাপড়ের পুটলী নাই। তখন, হতবুদ্ধি হইয়া, বিস্তর খেদ ও রোদন করিলাম। আমার খেদ ও রোদন শুনিয়া, কতকগুলি লোক সেই স্থানে উপস্থিত হইলেন। তাঁহারা, দেখিয়া শুনিয়া, একে একে সকলে চলিয়া গেলেন। আমি একাকী সেই স্থানে বসিয়া রোদন করিতে লাগিলাম।

“কোন ব্যক্তি কখন এমন বিপদে পড়ে না। বিদেশে আসিয়া সর্ব্বস্ব হারাইয়া, রাত্রি দুই প্রহরের সময়ে, একাকী মাঠে বসিয়া, গালে হাত দিয়া, কতই ভাবিতে লাগিলাম। এক কপর্দ্দ‌ক সম্বল নাই, কাহার সহিত আলাপ নাই, লাভের কোন উপায় নাই, শীঘ্র লাভের কোন উপায় হইবেক তাঁহারও সম্ভাবনা নাই, কালি কি খাইব তাহার সংস্থান নাই; কোথায় যাইব, কি করিব, কাহাকে কহিব, তাহার কোন ঠিকানা নাই। অনেক ক্ষণ ভাবিতে ভাবিতে নিদ্রাকর্ষণ হইল। তখন ভূতলে শয়ন করিয়া, রাত্রিযাপন করিলাম।”

পর দিন প্রভাত হইবামাত্র, হটন পুনরায় প্রস্থান করিয়া বরমিংহম্‌ নগরে উপস্থিত হইলেন। এই দিন অন্য কোন আহারসামগ্রী জুটিয়া উঠিল না, কেবল পথের ধারে যে সকল ক্ষেত্র ছিল, তাহা হইতে কিছু ফল মূল লইয়া, তিনি সে দিনের ক্ষুধানিবৃত্তি করিলেন। পরিশেষে, নিতান্ত নিরুপায় দেখিয়া, তিনি এই স্থির করিলেন, পুনরায় পিতার শরণাপন্ন হই, তিনি যা করেন। পিতার নিকট উপস্থিত হইলে, তিনি তাঁহাকে পুনরায় তাহার সেই নির্দয় পিতৃব্যের নিকটে পাঠাইয়া দিলেন। তাঁহাকে অগত্যা, তথায় গিয়া, ক্ষমাপ্রার্থনা করিতে হইল। পিতৃব্যও, ক্ষমা করিয়া, তাঁহাকে পূর্ববৎ কর্ম্ম করিতে দিলেন।

পিতৃব্যের আবাসে আসিয়া থাকিতে থাকিতে, তাঁহার ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিতে অতিশয় ইচ্ছা হইল। তিনি অবসরকালে মন দিয়া লেখা পড়া করিতে লাগিলেন, এবং যত্ন ও পরিশ্রমের গুণে, অল্প‌ দিনেই, বিলক্ষণ শিখিতে পারলেন। কিছু দিন পরেই, তিনি শ্লোকরচনা করিতে আরম্ভ করিলেন।

মোজা বোনা কর্ম্মে পরিশ্রম বিস্তর, লাভ তাদৃশ নাই, দেখিয়া, তিনি পিতৃব্যের আলয় পরিত্যাগ করলেন, এবং আপনি এক ভগিনীর বাটীতে গিয়া রহিলেন। এই ভগিনী আতিশয় সুশীল ছিলেন। তিনি ভ্রাতাকে অত্যন্ত স্নেহ করিলেন, এবং যাহাতে তিনি স্বচ্ছন্দে থাকেন, ও উত্তর কালে যাহাতে তাঁহার ভাল হয়, তদ্বিষয়ে বিশেষ যত্নবতী ছিলেন।

হটন পুস্তকবিক্রয়ের ব্যবসায় করিবার নিমিত্ত অত্যন্ত ইচ্ছুক হইলেন। নটিংহম্‌ নগরের সাত ক্রোশ দূরে, সৌথওএল নামে এক নগর আছে; তথায় তিনি পুস্তকের দোকান খুলিলেন। ইতিপূর্বে্ব‌, তিনি বই বাঁধা কর্ম্ম শিখিয়াছিলেন; সপ্তাহের মধ্যে, কেবল শনিবার সৌথওএলে গিয়া, বই বিক্রয় করিয়া আসিতেন, আর কয়েক দিন বই বাঁধিতেন। তিনি শনিবার প্রত্যুষে গাত্রোথ্থা‌ন করিতেন, পুস্তকের মোট মাথায় করিয়া, সৌথওএলে গিয়া, বেলা দশ ঘণ্টার সময় দোকান খুলিতেন, এবং সমস্ত দিন বিক্রয় করিয়া, রাত্রিতে নটিংহমে ফিরিয়া আসিতেন।

এই রূপে, হটন কিছু দিন অতি কষ্টে কাটাইলেন; পরে, অনেকগুলি পুরাণ পুস্তক শস্তা পাইয়া, সমুদয় ক্রয় করিলেন এবং সৌথওএলের দোকান এক বারে বন্ধ করিয়া, বরমিংহম্‌ নগরে আসিয়া, এক দোকান খুলিলেন। এই স্থানে কিছু দিন কর্ম্ম করিয়া, খরচ বাদে প্রায় দুইশত টাকা লাভ হইল। এই রূপে কিছু সংস্থান হওয়াতে, তিনি কর্মের বাহুল্য করিলেন। ন্যায়পথে চলিয়া, ও অবিশ্রান্ত পরিশ্রম করিয়া, চারি পাঁচ বৎসরে, তিনি বিলক্ষণ সঙ্গতিপন্ন হইয়া উঠিলেন এবং বিবাহ করিলেন।

ইতিপূর্ব্বে, তিনি নানা কর্ম্মে সবিশেষ ব্যস্ত থাকিয়াও, যত্ন ও পরিশ্রমের গুণে, বিলক্ষণ লেখা পড়া শিখিয়াছিলেন; এক্ষণে, নানা কর্ম্মে অতিশয় ব্যস্ত থাকিয়াও, গ্রন্থরচনা করিতে আরম্ভ করিলেন, এবং ক্রমে ক্রমে নানা গ্রন্থ রচনা করিয়া, পণ্ডিত সমাজে গণ্য ও আদরণীয় হইয়া উঠিলেন।

এই রূপে হটন, অশেষ কষ্ট ভোগ করিয়াও, আপন যত্নে ও পরিশ্রমে বিদ্যা, খ্যাতি ও সম্পত্তি লাভ করিয়া, নিরনব্বই বৎসর বয়সে দেহত্যাগ করেন।

দেখ! এই ব্যক্তি কেমন অদ্ভুত মনুষ্য; বিষম দুরবস্থায় পড়িয়াছিলেন, তথাপি আপন যত্নে ও পরিশ্রমে কেমন বিদ্যালাভ, কেমন খ্যাতিলাভ, কেমন সম্পত্তিলাভ করিয়া গিয়াছেন। ফলতঃ, যত্ন ও পরিশ্রম করিলে, সম্ভবমত বিদ্যা, খ্যাতি, সম্পত্তি, সকলই লাভ করা যাইতে পারে।

এড্রিয়ন

এড্রিয়ন

হলণ্ডের অন্তঃপাতী ইউট্রিক্ট নগরে এড্রিয়নের জন্ম হয়। ইঁহার পিতা অতি দুঃখী ছিলেন; নৌকানির্মাণের ব্যবসায় করিয়া, কষ্টে সংসারনির্বাহ করিতেন। তাঁহার নিতান্ত ইচ্ছা, পুত্ত্রকে ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখান। কিন্তু, লেখা পড়ার ব্যয় নির্বাহ করেন, এমন সংস্থান ছিল না। লুবেনের বিশ্ববিদ্যালয়ে কতকগুলি বালককে বিনা ব্যয়ে শিক্ষা দিবার নিয়ম ছিল, সুযোগ করিয়া তিনি এড্রিয়নকে তথায় প্রবিষ্ট করিয়া দিলেন।

এই স্থলে অধ্যয়নকালে, এড্রিয়নের রাত্রিতে প্রদীপ জ্বালিয়া পড়িবার সঙ্গতি ছিল না। কিন্তু, লেখা পড়ায় অত্যন্ত অনুরাগ ছিল বলিয়া, তিনি আলস্যে কালহরণ করিতেন
না। গিরজার দ্বারে ও পথের ধীরে সমস্ত রাত্রি আলোক জ্বলিত। তিনি পুস্তক লইয়া তথায় গিয়া, সেই আলোকে পাঠ করিতেন। এড্রিয়ন, এইরূপ কষ্টে থাকিয়াও কেবল আন্তরিক যত্নের গুণে অসাধারণ বিদ্যা উপার্জ্জন করিলেন এবং পাদরির কর্ম্মে নিযুক্ত হইলেন। উত্তরোত্তর তাঁহার পদবৃদ্ধি হইতে লাগিল। বিদ্বান্ ও সচ্চরিত্র বলিয়া, তিনি স্পেনের রাজকুমারের শিক্ষকতাকার্ষ্যে নিযুক্ত হইলেন, এবং সেই রাজকুমার সম্রাট্ হইলে পর, তাঁহার সহায়তায়, পরিশেষে পোপের সিংহাসনে অধিরূঢ় হইলেন।

লেখা পড়ায় আন্তরিক যত্ন থাকার কি অনির্বচনীয় গুণ! দেখ, যে ব্যক্তি অতি দুঃখীর সন্তান; যাঁহার রাত্রিতে প্রদীপ জ্বালিয়া পড়িবার সঙ্গতি ছিল না; সেই ব্যক্তি কেবল আন্তরিক ষত্ন ছিল বলিয়া, কেমন অসাধারণ বিদ্যা উপার্জন করিয়াছিলেন, এবং সেই অসাধারণ বিদ্যার বলে কেমন উচ্চ পদে অধিরূঢ় হইয়াছিলেন।

ওগিলবি

ওগিলবি

ওগিলবি বাল্যকালে অতি সামান্যরূপ লেখা পড়া শিখিয়াছিলেন। তাঁহার পিতা ঋণগ্রস্ত ছিলেন; ঋণপরিশোধ করিতে না পারাতে, উত্তমর্ণ‌, বিচারালয়ে অভিযোগ করিয়া, তাঁহাকে কারারুদ্ধ করেন। সুতরাং, নিজে কিছু কিছু উপার্জ্জ‌ন করিতে না পারিলে, ওগিলবির চলা ভার। কিন্তু তিনি তাদৃশ লেখা পড়া জানিতেন না; উপায়ান্তর দেখিতে না পাইয়া, অবশেষে নর্ত্তকের ব্যবসায় অবলম্বন করিলেন। এই ব্যবসায়ে তাঁহার বিলক্ষণ নৈপুণ্য জন্মিল। কিছু টাকা হস্তে হইবামাত্র, তিনি সর্ব্বাগ্রে পিতাকে কারাগার হইতে মুক্ত করিলেন।

কিছু দিন পরে, কোন কারণ উপস্থিত হওয়াতে, তাঁহাকে নর্তকের ব্যবসায় পরিত্যাগ করিতে হইল। সুতরাং, তিনি পুনরায় দুঃখে পড়িলেন। দুঃখে পড়িয়া, কিছু অর্থ ব্যয় করিয়া, তিনি পুনরায় ডবলিন নগরে একটি সামান্য নাট্যশালা স্থাপন করিলেন। এই নাট্যশালা দ্বারা তাঁহার কিছু কিছু লাভের উপক্রম হইল। কিন্তু সেই সময়ে রাজবিদ্রোহ উপলক্ষে যুদ্ধ উপস্থিত হওয়াতে, তাঁহার লাভের পথ রুদ্ধ হইয়া গেল। নাট্যশালার সমুদয় দ্রব্যসামগ্রী লুষ্ঠিত হইল, এবং তাঁহার নিজের প্রাণসংশয় পর্য্যন্ত ঘটিয়া উঠিল।

এই রূপে, যৎপরোনাস্তি দুঃখে পড়িয়া ও বিপদগ্রস্ত হইয়া, ওগিলবি লণ্ড‌নে প্রত্যাগমন করিলেন। তথায় তিনি কেম্ব্র‌িজ বিদ্যালয় সংক্রান্ত কোন ব্যক্তির বিশিষ্টরূপ সাহায্য পাইয়া, লাটিন শিখিতে আরম্ভ করিলেন। এই সময়ে, তাহার বয়স চল্লিশ বৎসরের অধিক। ইহার পূর্ব্ব‌ে তাঁহার ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখা হয় নাই। তিনি, এত বয়সে শিখিতে আরম্ভ করিয়াও, অল্প‌ দিনেই, লাটিন ভাষায় বিলক্ষণ বুৎপন্ন হইয়া উঠিলেন, এবং বর্জ্জ‌িলনামক সুপ্রসিদ্ধ লাটিন কবির রচিত কাব্যের ইঙ্গরেজী ভাষায় পদ্যে অনুবাদ করিলেন। এই গ্রন্থ, মুদ্রিত হইয়া, সর্ব্বত্র আদরপূর্ব্ব‌ক পরিগৃহীত হইল; এবং গ্রন্থকর্ত্ত‌ার বিলক্ষণ লাভ হইল। তদ্দ‌র্শনে তাঁহার অতিশয় উৎসাহবৃদ্ধি হইল।

গ্রীক ভাষায় হোমরনামক মহাকবির রচিত ঈলিয়ড ও অডিসি নামক দুই অত্যুৎকৃষ্ট কাব্য আছে। ইঙ্গরেজী ভাষায় পদ্যে ঐ দুই কাব্যের অনুবাদ করিবার নিমিত্ত, ওগিলবির অত্যন্ত,ইচ্ছা হইল। এ পর্য্যন্ত তিনি গ্রীক ভাষার বিন্দু বিসর্গও জানিতেন না। এক্ষণে তাঁহার বয়স চুয়ান্ন বৎসর; তথাপি তিনি গ্রীক পড়িতে আরম্ভ করিলেন, এবং কিছু দিনের মধ্যেই, গ্রীক ভাষায় বিলক্ষণ ব্যুৎপন্ন হইয়া, ঐ দুই কাব্যের অনুবাদ করিয়া, মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলেন। এই দুই গ্রন্থও আদরপূর্ব্ব‌ক পণ্ডিতসমাজে পরিগৃহীত হইল।

ইতিমধ্যে, ওগিলবি পুনরায় ডবলিন্‌ নগরে গিয়া, এক নূতন নাট্যশালা স্থাপন করিয়াছিলেন; এবং তদ্দ্বা‌রা বিলক্ষণ লাভও হইয়াছিল। বস্তুতঃ, এই সময়ে তিনি সম্যক্‌ সুখে ও সচ্ছন্দে ছিলেন; অর্থের অভাবজন্য কোন ক্লেশ ছিল না। অবশেষে, ডবলিন্‌ নগরে ভূমি আদি যে কিছু সম্পত্তি ছিল, সমুদয় বিক্রয় করিয়া, তিনি পুনরায় লণ্ড‌নে আসিয়া বাস করিলেন। তাঁহার বাস করিবার অব্যবহিত পরেই, লণ্ড‌নে বিষম অগ্নিদাহ হইল, তাহাতে তাঁহার সর্ব্ব‌স্ব দগ্ধ হইয়া গেল। অগ্নিদাহে সর্ব্বস্বান্ত হওয়াতে, তিনি পুনর্বার পূর্ব্ব‌ের ন্যায় বিষম দুঃখে পড়িলেন।

এই রূপে, তিনি বিষম দুঃখে পড়িলেন বটে, কিন্তু তাহাতে হতবুদ্ধি বা ভগ্নোৎসাহ হইলেন না; বরং উৎসাহ ও পরিশ্রম সহকারে নূতন নূতন গ্রন্থের অনুবাদ প্রভৃতি কর্ম্ম করিয়া ত্বরায় গুছাইয়া উঠিলেন; যৎকিঞ্চিৎ সংস্থান করিয়া, পুনরায় বসতিবাটী নির্মাণ করাইলেন; এবং একটি ছাপাখানা স্থাপন করিলেন। ছাপাখানা দ্বারা তিনি পুনরায় সঙ্গতিপন্ন হইয়া উঠিলেন। ছিয়াত্তর বৎসর বয়সে ওগিলবির মৃত্যু হয়।

দেখ! ওগিলবি কেমন লোক। তিনি কত বার কত বিপদে ও কত দুঃখে পড়িলেন; কিন্তু উৎসাহ ও পরিশ্রমের গুণে, প্রতিবারেই গুছাইয়া উঠিলেন। উৎসাহ ও পরিশ্রমের গুণে, চল্লিশ বৎসরের অধিক বয়সে লাটিন পড়িতে আরম্ভ করিয়া, তাহাতে ব্যুৎপন্ন হইলেন; উৎসাহ ও পরিশ্রমের গুণে, চুয়ান্ন বৎসর বয়সে গ্রীক পড়িতে আরম্ভ করিয়া, তাহাতেও ব্যুৎপন্ন হইলেন; অগ্নিদাহে সর্ব্বস্বাস্ত হইয়া গেল; কিন্তু উৎসাহ ও পরিশ্রমের গুণে, পুনরায় গৃহাদিনির্মাণ ও সংস্থান করিয়া, শেষ দশা সুখে ও সচ্ছন্দে যাপন করিলেন। ফলতঃ, কেবল উৎসাহ ও পরিশ্রমের গুণে, তিনি বৃদ্ধ বয়সে লেখা পড়া শিখিয়াছিলেন, এবং সুখে ও সচ্ছন্দে কালক্ষেপণ করিতে পারিয়াছিলেন। যদি তিনি উৎসাহহীন ও পরিশ্রমকাতর হইতেন, তাহা হইলে, অধিক বয়সে লেখা পড়াও হইত না, এবং দুঃখেরও সীমা থাকিত না।

অতএব, উৎসাহ ও পরিশ্রম বিদ্যা ও সম্পত্তির মূল, তাহার সন্দেহ নাই।

জিরোম ষ্টোন

জিরোম ষ্টোন

এই ব্যক্তি স্কট্‌ল‌ণ্ড দেশে জন্মগ্রহণ করেন। ইঁহার তিন বৎসর বয়সের সময় পিতৃবিয়োগ হয়। ষ্টোনের পিতা কিছুমাত্র সংস্থান করিয়া যাইতে পারেন নাই। তাঁহার জননী অতি কষ্টে আপনার ও পুত্রের ভরণপোষণ নির্বাহ করিতেন। তিনি পুত্রকে গ্রামস্থ
বিদ্যালয়ে সামান্যরূপ কিছু লেখা পড়া শিখাইয়াছিলেন।

যেরূপ অবস্থা, তাহাতে কিছু কিছু না আনিতে পারিলে কোন মতেই চলে না; সুতরাং ষ্টোনকে, উপার্জ্জনের চেষ্টায়, অল্প বয়সেই বিদ্যালয় পরিত্যাগ করিতে হইল। তিনি গ্রামে গ্রামে, নগরে নগরে, ভ্রমণ করিয়া ছুরী, কাঁচী, ছুঁচ, সুতা, ফিতা প্রভৃতি বিক্রয় করিতে আরম্ভ করিলেন। এই সামান্য ব্যবসায় দ্বারা যে অল্প লাভ হইতে লাগিল, তদ্দ্বারা জননীর কিছু কিছু আনুকুল্য করিতে লাগিলেন।

ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিতে ষ্টোনের অতিশয় বাসনা ছিল। জননী কোন রূপেই ভরণপোষণ নির্বাহ করিতে পারেন না, কেবল এই কারণে, নিতান্ত অনিচ্ছাপূর্ব্বক, তিনি বিদ্যালয় পরিত্যাগ করিয়াছিলেন। যে ব্যবসায় আরম্ভ করিলেন, তাহার সঙ্গে লেখা পড়ার কোন সম্পর্ক নাই। এই নিমিত্তে, ঐ ব্যবসায়ের উপযোগী যে সকল জিনিস পত্র কিনিয়াছিলেন, সমুদয় বিক্রয় করিলেন, এবং ব্যবসায় করিবার নিমিত্ত, ঐ মূল্যে কতকগুলি পুস্তক ক্রয় করিলেন। পুস্তকবিক্রয়ের ব্যবসায় অবলম্বন করিবার তাৎপর্য্য এই যে, ব্যবসায় দ্বারা যেমন কিছু কিছু লাভ হয়, তাহাও হইবেক, এবং সর্ব্বদা নানাবিধ পুস্তক নিকটে থাকিলে, ইচ্ছামত পড়াও চলিবেক।

তৎকালে স্কট্‌লণ্ডের স্থানে স্থানে যে মেলা হইত, তথায় জিনিস পত্র লইয়া গেলে, অনায়াসে বিক্রয় হইত। এই নিমিত্ত ষ্টোন, দোকান না খুলিয়া, কিংবা গ্রামে গ্রামে না বেড়াইয়া, কেবল মেলার সময় পুস্তক বিক্রয় করিতে যাইতেন, অবশিষ্ট সময়ে ক্রমাগত ইচ্ছামত পুস্তক পাঠ করিতেন।

এই রূপে পুস্তকবিক্রয়ব্যবসায় আরম্ভ করাতে, ষ্টোনের লেখা পড়া শিখিবার বিলক্ষণ সুযোগ হইয়া উঠিল। তিনি, লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত, এত যত্ন ও এত পরিশ্রম করিতে লাগিলেন যে, অল্প‌ দিনেই হিব্রু ও গ্রীক এই দুই ভাষায় বুৎপন্ন হইয়া উঠিলেন। তিনি, অন্যের সাহায্য ব্যতিরেকেই, এই দুই ভাষা শিক্ষা করিয়াছিলেন। পরে তাঁহার লাটিন শিখিতে অত্যন্ত ইচ্ছা হইল। তদনুসারে, তিনি লাটিন পড়িতে আরম্ভ করিলেন, এবং অল্প দিনের মধ্যেই এত দূর শিখিলেন যে, লোকে দেখিয়া শুনিয়া চমৎকৃত হইল।

ডাক্তর টলিডেল্ফ‌নামক এক ব্যক্তি স্কট্‌লণ্ডের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রধান অধ্যাপক ছিলেন। এই ব্যক্তি বিখ্যাত পণ্ডিত ও বিখ্যাত বুদ্ধিমান ছিলেন। ইনি, ষ্টোনের লেখা পড়া শিখিবার যত্ন এবং অসাধারণ বুদ্ধি ও ক্ষমতা দেখিয়া, তাঁহাকে, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখাইবার নিমিত্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাইলেন এবং তাহার সমুদয় খরচ পত্রের বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন।

এই রূপে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, ষ্টোন, অল্প‌ কালের মধ্যেই, নানা শাস্ত্রে অসাধারণ পণ্ডিত হইয়া উঠিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের, কি অধ্যাপক, কি ছাত্র, সকলেই তাঁহার বুদ্ধির ও বিদ্যার প্রশংসা করিতেন। তিনি ছাত্র ছিলেন, ইহাতে অধ্যাপকেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্লাঘা জ্ঞান করিতেন; আর তাঁহার সঙ্গে অধ্যয়ন করেন, ইহাতে সহাধ্যায়ীরা আপনাদিগের গৌরব জ্ঞান করিতেন।

ষ্টোন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রায় তিন বৎসর অধ্যয়ন করিলেন; এমন সময়ে, এক লাটিন বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য হইল। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদিগের অনুরোধে, ষ্টোন ঐ পদে নিযুক্ত হইলেন। দুই বৎসর পরে, তিনি প্রধান শিক্ষকের পদেও নিযুক্ত হইয়াছিলেন। আক্ষেপের বিষয় এই যে, অতি অল্প‌ বয়সেই তাঁহার মৃত্যু হইল। মৃত্যুকালে তাঁহার বয়ঃক্রম ত্রিশ বৎসর মাত্র হইয়াছিল।

জেঙ্কিন্স

জেঙ্কন্স

কাফরিজাতি অতি নির্বোধ, কিছুই লেখা পড়া জানে না। অনেকে মনে করেন, এই জাতির বুদ্ধি এত অল্প যে, এতজ্জাতীয় কেহ কখন লেখা পড়া শিখিতে পারিবেক না। কিন্তু, এক্ষণে যে বৃত্তান্ত লিখিত হইতেছে, তাহা পাঠ করিলে, এই ভ্রম দূর হইতে পারিবেক।

এক কাফরিরাজের রাজ্যে ইঙ্গরেজেরা বাণিজ্য করিতে যাইতেন। ইয়ুরোপীয় লোকেরা, লেখা পড়া জানেন বলিয়া, কাফরিজাতি অপেক্ষা সকল অংশে উৎকৃষ্ট, ইহা দেখিয়া, কাফরিরাজ আপন পুত্রকে লেখা পড়া শিখাইবার নিমিত্ত অত্যন্ত ব্যগ্র হইলেন, এবং স্কট্‌ল‌ণ্ডনিবাসী স্বানষ্টননামক এক জাহাজী কাপ্তেনের নিকট প্রস্তাব করিলেন, যদি আপনি আমার পুত্ত্রকে, স্বদেশে লইয়া গিয়া সুশিক্ষিত করিয়া আনিয়া দেন, তাহা হইলে, আমি আপনকার সবিশেষ পুরস্কার করিব। স্বানষ্টন রাজার প্রস্তাবে সম্মত হইলেন।

তিনি, কাফরিরাজের পুত্ত্র কে স্বদেশে লইয়া গিয়া, তাঁহার লেখা পড়া শিখিবার বন্দোবস্ত করিবার চেষ্টা দেখিতেছেন, এমন সময় হঠাৎ তাঁহার মৃত্যু হইল। কাফরিরাজের পুত্ত্র বিষম বিপদে পড়িলেন। যাঁহার সঙ্গে গিয়াছিলেন, তাঁহার মৃত্যু হইল; এখন তাঁহাকে খাওয়ায় পরায়, অথবা লেখা পড়া শিখায়, এমন আর কেহ নাই; তিনি কোথায় যাইবেন, কি করিবেন, কিছুই ভাবিয়া স্থির করিতে পারেন না।

এক পান্থনিবাসে স্বানষ্টনের মৃত্যু হয়। কাফরিরাজের পুত্ত্র সেই স্থানেই কিছু দিন থাকিলেন। সেই পান্থনিবাসের কর্ত্রী, এক বিবি, তাঁহাকে নিতান্ত নিরাশ্রম দেখিয়া, দয়া করিয়া, কয়েক দিন আহার দিয়াছিলেন।

কিছু দিন পরে, স্বানষ্টনের নিকটকুটুম্ব এক কৃষক, সেই পান্থনিবাসে আসিয়া, কাফরিরাজের পুত্ত্রকে আপন আলয়ে লইয়া গেলেন। এই স্থানে তিনি প্রথমতঃ কিছু কাল রাখালের কর্ম্ম করিলেন। রাজা নিজ পুত্রের কি নাম রাখিয়াছিলেন, তাহা পরিজ্ঞাত নহে। স্বানষ্টন তাঁহার নাম জেঙ্কিন্স রাখিয়াছিলেন; তদনুসারে, কাফরিরাজের পুত্ত্র জেঙ্কিন্স নামেই প্রসিদ্ধ হইয়াছেন। জেঙ্কিন্স দৃঢ়কায় হইলে পর, লেডলানামক এক ব্যক্তি, তাঁহার প্রতি সদয় হইয়া, তাঁহাকে আপন বাটতে লইয়া রাখিলেন। এই স্থানে তিনি সকল কর্ম্মই করিতে লাগিলেন; কখন রাখালের কর্ম্ম করিতেন, কখন কৃষকের কর্ম্ম করিতেন, কখন সইসের কর্ম্ম করিতেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন বলিয়া, তাঁহার বিশেষ কর্ম্ম এই নির্দিষ্ট ছিল, সর্ব্বপ্রকার সংবাদ লইয়া, হাউইকনামক স্থানে যাইতে হইত।

এই সময়েই, বিদ্যাশিক্ষাবিষয়ে তাঁহার প্রথম অনুরাগ জন্মে। তাঁহার বিলক্ষণ স্মরণ ছিল, পিতা তাঁহাকে বিদ্যাশিক্ষা করিবার নিমিত্ত পাঠাইয়াছিলেন। কিন্তু, বিদেশে আসিয়া, বিষম দুরবস্থায় পড়িয়া, তাঁহাকে বিদ্যাশিক্ষার আশা এক বারেই অরিত্যাগ করিতে হইয়াছিল। তথাপি, তিনি মনোমধ্যে স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন, যদি কখন সুযোগ পাই; ষত দূর পারি, পিতার মানস পূর্ণ করিব। এক্ষণে, লেডলার পুত্ত্রদিগকে লেখা পড়া করিতে দেখিয়া, তাঁহারও লেখাপড়া শিখিতে অত্যন্ত ইচ্ছা হইল। তিনি সুযোগক্রমে ঐ বালকদিগের নিকট, উপদেশ লইতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু, দিনের বেলায়, তাঁহার কিছুমাত্র অবসর ছিল না; এ নিমিত্ত, নিয়মিত কর্ম্ম সমাপন করিয়া, যখন শয়ন করিতে যাইতেন, সেই সময়ে অধিক রাত্রি পর্য্যন্ত, পাঠ অভ্যাস করিতেন, এবং লিখিতে শিখিতেন।

এই রূপে, বিদ্যাশিক্ষাবিষয়ে তাঁহার অনুরাগ প্রকাশ হইলে, লেডলা তাঁহাকে এক বৈকালিক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতে দিলেন। জেঙ্কিন্স, সমস্ত দিন কর্ম্ম করিয়া, বিকালে ঐ বিদ্যালয়ে পড়িতে যাইতেন। তিনি, অল্প দিনের মধ্যেই, এমন লেখা পড়া শিখিলেন যে, সকল লোক দেখিয়া শুনিয়া, চমৎকৃত হইল। এই সময়ে, এক সমবয়স্ক বালকের সহিত তাঁহার বন্ধুতা জন্মে। এই বালক বন্ধু তাঁহার লেখা পড়া শিখিবার বিষয়ে বিস্তর আনুকূল্য করিয়াছিলেন।

কিছু দিন পরে, জেঙ্কিন্স মনক্রিফনামক এক ব্যক্তির নিকট পরিচিত হইলেন। এই ব্যক্তি অতিশয় দয়ালু ও অতি সৎস্বভাব ছিলেন। ইনি, পরিচয়দিবস অবধি, জেঙ্কিসকে ষথেষ্ট স্নেহ এবং তাঁহার বিদ্যাশিক্ষাবিষয়ে বিস্তর আনুকূল্য করিতেন। এই রূপে, পূর্ব্বোক্ত বালক বন্ধুর ও এই দয়ালু ব্যক্তির সাহায্য পাইয়া, এবং ষৎপরোনাস্তি পরিশ্রম করিয়া, তিনি একপ্রকার কৃতবিদ্য হইয়া উঠিলেন।

এই সময়ে, কোন নিকটবর্ত্তী বিদ্যালয়ে, এক শিক্ষকের পদ শূন্য হইল। যাঁহাদের উপর শিক্ষক নিযুক্ত করিবার ভার ছিল, তাঁহারা, কর্ম্মাকাঙ্ক্ষীদিগের পরীক্ষার দিন নিরূপণপূর্বক, ঘোষণা করিয়া দিলেন। পরীক্ষাদিবসে, জেঙ্কিন্সও কর্ম্মাকাঙ্ক্ষায় পরীক্ষা দিতে উপস্থিত হইলেন। যত জন পরীক্ষা দিতে আসিয়াছিলেন, পরীক্ষকদিগের বিবেচনায়, তিনি সর্ব্বাপেক্ষায় উৎকৃষ্ট হইলেন। তখন তিনি, কর্ম্মে নিযুক্ত হইলাম স্থির করিয়া, প্রফুল্ল মনে গৃহ গমন করিলেন।

জেঙ্কিন্স পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেও, অধ্যক্ষেরা তাহাকে কর্ম্ম দিলেন না। তাঁহারা, কাফরিকে শিক্ষকের কর্ম্মে নিযুক্ত করা অযুক্ত বিবেচনা করিয়া, অন্য এক ব্যক্তিকে ঐ কর্ম্মে নিযুক্ত করিলেন। জেঙ্কিন্স মনস্তাপে ত্রিয়মাণ হইলেন। তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন, তথাপি কর্ম্ম পাইলেন না, ইহা দেখিয়া, সেই স্থানের সম্ভ্রান্ত লোকেরা অতিশয় বিরক্ত হইলেন, এবং জেঙ্কিন্সের মনস্তাপনিবারণার্থে, সেই বিদ্যালয়ের নিকটেই আর এক বিদ্যালয় স্থাপন করিয়া, তাঁহাকে শিক্ষক নিযুক্ত করিলেন। জেঙ্কিন্স এই বিদ্যালয়ে এমন সুন্দর শিক্ষা দিতে লাগিলেন যে, অল্প দিনের মধ্যেই সমুদয় ছাত্র, পূর্ব্ব বিদ্যালয় পরিত্যাগ করিয়া, তাহার নিকটে অধ্যয়ন করিতে আসিল। এই রূপে শিক্ষকের কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়াও, তিনি স্বয়ং শিক্ষা করিতে বিরত হইলেন না। কিঞ্চিৎ দূরে অন্য এক বিদ্যালয় ছিল; তথাকার অধ্যাপক অতিশয় পণ্ডিত ছিলেন। জেঙ্কিন্স যাহা শিক্ষা করিতেন, প্রতিশনিবার অবাধে সেই বিদ্যালয়ে গিয়া তথাকার অধ্যাপকের নিকট পরীক্ষা দিয়া আসিতেন। দুই এক বৎসর কর্ম্ম করিয়া, তিনি কিঞ্চিৎ সংস্থান করিলেন।

এ পর্য্যন্ত জেঙ্কিন্স যাহা শিক্ষা করিয়াছিলেন, তাহাতেই তাহাকে পণ্ডিত বলা যাইতে পারে। কিন্তু তিনি তাহাতে সন্তুষ্ট হইলেন না। তাঁহার আরও অধিক বিদ্যা শিখিবার বাসনা হইল। তিনি মনে মনে স্থির করিলেন, কিছু দিনের জন্যে প্রতিনিধি দিয়া ছুটী লইব, এবং কোন প্রধান বিদ্যালয়ে থাকিয়া, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিথিব।

অনন্তর, তিনি বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষদিগের নিকট আপন প্রার্থনা জানাইলেন। অধ্যক্ষেরা তাঁহাকে অতিশয় আদর ও সম্মান করিতেন। তাঁহারা সন্তুষ্ট চিত্তে তাঁহাকে বিদায় দিলেন। পরে, তাঁহার প্রধান সহায় পরম দয়ালু মনক্রিফ মহাশয়ের সহিত পরামর্শ করিয়া, তিনি এডিনবরা নগরে গমন করিলেন, এবং তথাকার বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, শীত কয়েক মাস, তথায় অবস্থিতিপূর্ব্বক, উত্তম রূপে নানা বিদ্যা শিক্ষা করিলেন।

বসন্তকাল উপস্থিত হইলে, তিনি তথা হইতে প্রত্যাগমন করিলেন, এবং পুনর্বার, পূর্ববৎ যথানিয়মে ও যথোপযুক্ত মনোযোগ সহকারে, বিদ্যালয়ের কর্ম্ম করিতে আরম্ভ করিলেন।

জেঙ্কিন্স স্বভাবতঃ অতি সুশীল ও সচ্চরিত্র, নম্র ও নিরহঙ্কার, এবং ধর্ম্মপরায়ণ ছিলেন। আপন কর্তব্য কর্ম্মে তাঁহার সম্পূর্ণ মনোযোগ ছিল। কি রাখাল, কি কৃষক, কি শিক্ষক, যখন যে কর্ম্মে নিযুক্ত হইয়াছেন, তিনি সেই কর্ম্মই যথোচিত যত্ন ও মনোযোগ পূর্ব্বক নির্বাহ করিয়াছেন; কখনই কিঞ্চিম্মাত্র আলস্য বা ঔদাস্য করেন নাই। এজন্য সকল লোকেই তাঁহাকে ভাল বাসিত।

সমুদয় বিবেচনা করিয়া দেখিলে, জেঙ্কিন্স অতি আশ্চর্য্য লোক। দেখ! লেখা পড়া শিথিবার নিমিত্ত পিতা তাহাকে বিদেশে পঠাইয়া দেন। যে ব্যক্তি তাঁহার ভার লইয়াছিলেন, সহসা সেই ব্যক্তির মৃত্যু হওয়াতে, তিনি এক বারে নিতান্ত নিরাশ্রয় হইয় পড়িলেন; কাহার সহিত পরিচয় নাই; কাহার কথা বুঝিতে পারেন না; অন্ন বস্ত্র দেয় এমন কেহ নাই; কোথায় যাইবেন, কি করিবেন, কিছুই বুঝিতে পারেন না। যাঁহারা দয়া করিয়া অন্ন বস্ত্র দিয়াছিলেন, তাঁহাদের বাটীতে রাখালের কর্ম্ম করেন ও চাসের কর্ম্ম করেন। ফলতঃ, রাজপুত্ত্র হইয়া কেহ কখন এমন দুঃখে পড়ে নাই; কিন্তু ইচ্ছা ও যত্ব ছিল বলিয়া, কেমন লেখা পড়া শিখিয়াছেন।

যাহারা মনে করে, দুঃখে পড়িলে লেখা পড়া হয় না, অথবা যাহারা দুঃখে পড়িয়া লেখা পড়া ছাড়িয়া দেয়, তাহাদের মন দিয়া জেঙ্কিন্সের বৃত্তান্ত পাঠ করা আবশ্যক।

ডাক্তর এডাম

ডাক্তর এডাম

স্কট্‌লণ্ডের অন্তঃপাতী মোরেনামক প্রদেশে রফোর্ড নামে এক গ্রাম আছে। ঐ গ্রামে এডামের জন্ম হয়। এই ব্যক্তি অতি দুঃখীর সন্তান; কিন্তু, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত তাঁহার অতিশয় ইচ্ছা ছিল। যৎকালে তিনি এডিনবরায় অধ্যয়ন করিতে যান, তখন তাঁহার অত্যন্ত দুঃখের দশা। তিনি, অল্প ভাড়ায় একটি ছোট ঘর লইয়া তাহাতেই অতি কষ্টে থাকিতেন; নিতান্ত অসঙ্গতি প্রযুক্ত আহারেরও অত্যন্ত ক্লেশ পাইতেন; প্রায়ই কাঁচা ময়দা গুলিয়া খাইয়া প্রাণধারণ করিতেন; তৈলের অভাবে রাত্রিতে প্রদীপ জ্বালিয়া পড়িতে পাইতেন না; সন্ধ্যার পর সহাধ্যায়ীদিগের আলয়ে গিয়া পাঠ করিতেন। স্কট্‌লণ্ডে শীতের অতিশয় প্রাদুর্ভাব; সুতরাং, রাত্রিতে পাথরিয়া কয়লার আগুন জ্বালিয়া, সেই উত্তাপে শীতনিবারণ করিতে হয়। কিন্তু, এডামের কয় কিনিবার সঙ্গতি ছিল না। অত্যন্ত শীতবোধ হইলে, তিনি কিয়ৎ ক্ষণ বেগে দৌড়িয়া বেড়াইতেন; তাহাতে শরীর গরম হইয়া, আপাততঃ শীতনিবারণ হইত। এত কষ্ট পাইয়াও, তিনি ক্ষণ কালের নিমিত্ত লেখা পড়ায় যত্ন করিতে ক্রটি করেন নাই; এবং সেই যত্নের গুণে, নানা বিদ্যায় পারদর্শী ও পরিশেষে এডিনবরার প্রধান বিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ হইয়াছিলেন।

ডুবাল

ডুবাল

ফ্রান্স দেশের অন্তঃপাতী আর্টনি গ্রামে ডুবালের জন্ম হয়। ডুবালের পিতা অতি দুঃখী ছিলেন, সামান্যরূপ কৃষিকর্ম্ম অবলম্বন করিয়া, সংসারনির্বাহ করিতেন। ডুবালের দশ বৎসর বয়স, এমন সময়ে তাঁহার পিতা মাতার মৃত্যু হয়। ডুবাল অত্যন্ত দুঃখে পড়িলেন। দুঃখে পড়িয়া, তিনি এক কৃষকের গৃহে রাখালী কর্ম্মে নিযুক্ত হইলেন। কিন্তু সামান্য দোষে কৃষক, কিছু দিন পরেই তাঁহাকে দূর করিয়া দিল।

ডুবাল, নিরুপায় হইয়া, দেশত্যাগ করিয়া, লোরেন চলিলেন। পথে বসন্ত রোগ হইল। এক কৃষক তাঁহাকে আপন বাটীতে লইয়া গেল, এবং চিকিৎসা করিয়া, পথ্য দিয়া, তাঁহার প্রাণরক্ষা করিল। কৃষক দয়া করিয়া আপন বাটীতে লইয়া না গেলে, হয় ত, এই রোগেই ডুবালের মৃত্যু হইত।

কিছু দিন পরে, ডুবাল এক মেষব্যবসায়ীর আলয়ে রাখাল নিযুক্ত হইলেন। এই সময়ে, এক দিন, তিনি কোন বালকের হস্তে একখানি পুস্তক দেখিলেন। ঐ পুস্তকে নানাবিধ পশু পক্ষীর ছবি ছিল। এ পর্য্যন্ত ডুবালের লেখাপড়া আরম্ভ হয় নাই; সুতরাং এ পুস্তক পড়িতে পারিলেন না; কিন্তু ইহা বুঝিতে পারিলেন, পুস্তকে যে সকল পশু পক্ষীর ছবি আছে, তাহাদেরই বৃত্তান্ত লিখিত হইয়াছে।

ঐ সমস্ত পশু পক্ষীর কথা কিরূপ লেখা আছে জানিবার নিমিত্ত তাঁহার অত্যন্ত কৌতুহল জন্মিল। তিনি সেই বালককে কহিলেন, ভাই! এই পুস্তকে পশু পক্ষীর কথা কি লেখা আছে, আমায় পড়িয়া শুনাও। সে শুনাইল না। ডুবাল বারংবার অনুরোধ করিতে লাগিলেন; কিন্তু সেই দুষ্ট বালক কিছুতেই সম্মত হইল না।

ডুবাল অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন এবং মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন, যে রূপে পারি, লেখা পড়া শিখিব। লেখা পড়া শিখিতে ইচ্ছা হইল বটে, কিন্তু শিখিবার কোন সুযোগ হয় না। তিনি, কার কাছে যাইবেন, কে শিখাইবে, কিছুই স্থির করিতে পারেন না। সমবয়স্ক বালকদিগের নিকটে গেলে, তাহারা শিখাইতে চায় না। এজন্য, তিনি রাখালী করিয়া যা কিছু পাইতেন, তাহা আর কোন বিষয়ে ব্যয় না করিয়া, যে সকল বালক লেখা পড়া জানিত, তাহ দিয়া সন্তুষ্ট করিয়া, তাহাদের নিকট লেখা পড়া শিখিতে আরম্ভ করিলেন।

এই রূপে, ডুবাল লেখা পড়া শিখিতে আরম্ভ করিলেন বটে, কিন্তু আর আর দুষ্ট বালকের বিলক্ষণ ব্যাঘাত জন্মাইতে লাগিল। এজন্য তিনি সর্ব্বদাই এই চিন্তা করেন, যেখানে কোন গোলমাল নাই, এমন স্থান না পাইলে, লেখা পড়ার সুবিধা হইবেক না; এরূপ স্থান কোথায় পাই।

এক দিন ভ্রমণ করিতে করিতে, তিনি একটি আশ্রম দেখিতে পাইলেন। ঐ আশ্রমে পালিমান নামে এক তপস্বী থাকিতেন। ডুবাল দেখিলেন, ঐ আশ্রম অতি নির্জন স্থান, কোন গোলমাল নাই। এজন্য, তিনি মনে মনে স্থির করিলেন, যদি তপস্বী মহাশয় অনুগ্রহ করিয়া আমায় আশ্রমে থাকিতে দেন, তাহা হইলে, এখানে থাকিয়া ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিব। পরে, তিনি তাঁহার নিকট আপন প্রার্থনা জানাইলেন। তপস্বী সম্মত হইলেন। ঐ সময়ে, আশ্রমে একটি ভৃত্য নিযুক্ত করিবার প্রয়োজন ছিল। পালিমান ভুবালকে নিযুক্ত করিলেন। ডুবাল, অতিশয় আহ্লাদিত হইয়া, মনের সুথে আশ্রমের কর্ম্ম করিতে ও লেখা পড়া শিখিতে লাগিলেন।

কিছু দিন পরেই, পালিমানের কর্ত্তৃপক্ষীয়েরা ঐ কর্ম্মে অন্য এক ব্যক্তিকে নিযুক্ত করিয়া পাঠাইলেন। সুতরাং ডুবালের সে কর্ম্ম গেল, এবং আশ্রমে থাকিয় নির্বিঘ্নে লেখা পড়া করিবার যে সুযোগ ঘটিয়াছিল, তাহাও গেল। ডুবাল অত্যন্ত দুঃখিত হইলেন। পালিমান অতিশয় দয়ালু ছিলেন। তিনি, ডুবালের দুঃখে দুঃখিত হইয়া, এক পত্র লিখিয়া, তাঁহাকে আর এক আশ্রমে পাঠাইয়া দিলেন। ঐ আশ্রমে কয়েক জন তপস্বী বাস করিতেন। তাঁহাদের কতিপয় ধেনু ছিল। তাঁহারা, পালিমানের পত্র পাইয়া, ডুবালকে সেই কয় ধেনুর রক্ষণাবেক্ষণে নিযুক্ত করিলেন।

এই তপস্বীরা বড় ভাল লেখা পড়া জানিতেন না। কিন্তু তাঁহাদের কতকগুলি পুস্তক ছিল। ডুবাল প্রার্থনা করাতে, ডুবাল তাঁহারকে ঐ সকল পুস্তক পড়িতে অনুমতি দিলেন। ডুবাল সেই সকল পুস্তক লইয়া পড়িতে লাগিলেন। কিন্তু আপনি সমুদায় বুঝিতে পারিতেন না। যে সকল স্থান কঠিন বোধ হইত, কেহ আশ্রম দেখিতে আসিলে, তাঁহার নিকট জিজ্ঞাসা করিয়া লইতেন। ডুবাল যে অল্প বেতন পাইতেন, খাওয়া পরার ক্লেশ স্বীকার করিয়া, তাহার অধিকাংশই বাঁচাইবার চেষ্টা পাইতেন, এবং যাহা বাঁচাইতে পারিতেন, তাহাতে আবশ্যকমত পুস্তক কিনিতেন। এক্ষণে তিনি অধিক পড়িতে পারিতেন, সুতরাং অধিক পুস্তক লাভের আকাঙ্ক্ষা হইয়াছিল; কিন্তু যে আয় ছিল, তাহাতে অধিক পুস্তক ক্রয় করিবার সম্ভাবনা ছিল না। তিনি, আয়বৃদ্ধি করিবার নিমিত্ত, ফাঁদ পাতিয়া বনের জন্তু ধরিতে আরম্ভ করিলেন। ঐ সকল জন্তু, অথবা উহাদের চর্ম্ম, বাজারে বিক্রয় করিতেন, এবং তাহাতে যাহা লাভ হইত, তাহা জমাইয়া, তদ্দ্বারা মনের মত পুস্তক কিনিতেন।

বনের জন্তু ধরিতে গিয়া, ডুবাল কখন কখন বিষম সঙ্কটে পড়িতেন, তথাপি ক্ষান্ত হইতেন না। তিনি এক দিন, বনমধ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে, এক গাছের ডালে একটা বন্য বিড়াল দেখিতে পাইলেন। বিড়ালের গাত্রের লোমগুলি অতি চিক্কণ দেখিয়া, তিনি বিবেচনা করিলেন, এই বিড়ালের চর্ম্ম বিক্রয় করিলে, কিছু অধিক পাওয়া যাইবেক; অতএব ইহাকে ধরিতে হইল। এই বলিয়া, গাছে চড়িয়া, ডুবাল তাড়াতাড়ি করিতে আরম্ভ করিলেন। বিড়াল তাড়া পাইয়া, খানিক এ ডাল ও ডাল করিয়া বেড়াইল; কিন্তু নিতান্ত পীড়াপাড়ি দেখিয়া, অবশেষে গাছ হইতে নামিয়া পড়িল। তিনিও সঙ্গে সঙ্গে নামিয়া পড়িলেন। বিড়াল দৌড়িতে আরম্ভ করিল; ডুবালও পশ্চাৎ পশ্চাৎ দৌড়িলেন। বিড়াল এক বৃক্ষের কোটরে প্রবেশ করিল। ডুবাল, পীড়াপীড়ি করিয়া, তাহার ভিতর হইতে যেমন বাহির করিলেন, অমনি বিড়াল তাঁহার হাতের উপর ঝাঁপিয়া পড়িল, আঁচড়াইয়া সর্ব্বাঙ্গ ক্ষতবিক্ষত করিল, এবং নখর দ্বারা ঘাড়ের কতক দূরের চামড়া উঠাইয়া লইল। ডুবাল তথাপি উহাকে ছাড়িলেন না; অবশেষে, উহার পা ধরিয়া, এক গাছে বারংবার আছাড় মারিয়া উহার প্রাণসংহার করিলেন। ঐ বিড়ালের চর্ম্ম বিক্রয় করিয়া পুস্তক কিনিতে পরিবেন, এই ভাবিয়া প্রফুল্লচিত্ত হইয়া, তিনি উহাকে গৃহে আনিলেন, বিড়ালের নখরপ্রহারে সর্বাঙ্গ যে ক্ষতবিক্ষত হইয়াছিল, সে ক্লেশকে এক বার ক্লেশ বলিয়া ভাবিলেন না।

এক দিন, ডুবাল, বনের মধ্যে ভ্রমণ করিতে করিতে, একটি সোনার সীল পড়িয়া আছে দেখিতে পাইলেন। ঐ সীলের অনেক মুল্য। ডুবাল, ইচ্ছা করিলে, ঐ সীল বিক্রয় করিয়া, লাভ করিতে পারিতেন। তিনি অতি দুঃখী ছিলেন বটে, কিন্তু সেরূপ লোক ছিলেন না। তিনি পরের দ্রব্য অপহরণ করা অন্যায় কর্ম্ম বলিয়া জানিতেন, এজন্য ঐ সীল আপনি লইব বলিয়া, এক বারও মনে করিলেন না; বরং তৎক্ষণাৎ প্রচার করিয়া দিলেন, আমি এইরূপ একটি সোনার সীল পাইয়াছি; যাঁহার হারাইয়াছে, তিনি আমার নিকট আসিয়া লইয়া যাইবেন। যাঁহার সীল হারাইয়াছিল, কয়েক দিন পরেই তিনি উপস্থিত হইলে, ডুবাল তাঁহাকে সেই সীল দিলেন। ঐ ব্যক্তি, সীল পাইয়া সন্তুষ্ট হইয়া, ডুবালের পরিচয় লইলেন, তাঁহার অবস্থা, লেখা পড়া শিখিবার যত্ন, ও কত শিক্ষা হইয়াছে, এই সমস্ত অবগত হইয়া, অত্যন্ত আহ্লাদিত হইলেন, এবং তাঁহাকে বিলক্ষণ পুরস্কার দিয়া, যাইবার সময়, বলিয়া গেলেন, তুমি মধ্যে মধ্যে আমার সহিত সাক্ষাৎ করিবে। ডুবাল যখন যখন সাক্ষাৎ করিতে যাইতেন, ঐ ব্যক্তি তাঁহাকে এক একটি টাকা দিতেন। ঐ টাকা ডুবাল অন্য কোন বিষয়ে ব্যয় করিতেন না, তদ্দ্বারা কেবল পুস্তক কিনিতেন; আর ঐ ব্যক্তিও তাঁহাকে মধ্যে মধ্যে পুস্তক দিতেন। এই সুযোগে, তাঁহার বিস্তর পুস্তক সংগ্রহ ও বিস্তর পুস্তক পাঠ করা হইল।

যখন ডুবাল তপস্বীদিগের গোরু চরাইতে যাইতেন, সে সময়েও পড়ায় ক্ষান্ত হইতেন না। তিনি বনে গোরু ছাড়িয়া দিয়া পড়িতে বসিতেন। পড়িবার সময় চারি দিকে পুস্তক ও ভূচিত্র সকল খোলা থাকিত। তিনি পড়ায় এমন মন নিবিষ্ট করিতেন যে, নিকটে লোক দাঁড়াইলে, অথবা নিকট দিয়া লোক চলিয়া গেলে, টের পাইতেন না। ডুবাল প্রতিদিন এইরূপ করেন।

এক দিবস, সেই দেশের রাজার পুত্রেরা মৃগয়া করিতে গিয়াছিলেন। তাঁহারা, পথ হারাইয়া, ইতস্ততঃ ভ্রমণ করিতে করিতে, ঐ স্থানে উপস্থিত হইলেন; দেখিলেন, এক দুঃখী রাখাল, গোরু ছাড়িয়া দিয়া, ভূচিত্র ও পুস্তকে বেষ্টিত হইয়া, নিবিষ্ট চিত্তে পাঠ করিতেছে। দেখিয়া চমৎকৃত হইয়া, রাজপুত্রেরা ডুবালের নিকটে উপস্থিত হইলেন, এবং তাঁহার পরিচয় লইয়া, কত দূর শিক্ষা হইয়াছে, তাহার পরীক্ষা করিলেন। রাখাল হইয়া কি রূপে এত লেখা পড়া শিখিল, ইহা জানিবার নিমিত্ত, তাঁহারা অত্যন্ত ব্যগ্র হইলেন এবং জিজ্ঞাসা করিয়া, সবিশেষ সমুদায় অবগত হইয়া, যেমন বিস্ময়াপন্ন হইলেন, তেমনই আহ্লাদিত হইলেন।

জ্যেষ্ঠ রাজকুমার, আপনার পরিচয় দিয়া, ডুবালকে কহিলেন, অহে রাখাল! আর তোমার গোরু চরাইয়া কাজ নাই; তুমি আমার সঙ্গে চল, আমি তোমায় উত্তম কর্ম্মে নিযুক্ত করিব। ডুবাল কোন কোন পুস্তকে পড়িয়াছিলেন, যাহারা রাজসংসারে চাকরি করে, তাহারা প্রায় দুশ্চরিত্র হয়; এজন্য কহিলেন আমি আপনকার সঙ্গে যাইব না; আমার রাজসংসারে চাকরি করিতে বাঞ্ছা নাই; যত দিন বাঁচিব, এই বনে গোরু চরাইব; সে আমার ভাল; আমি এ অবস্থায় বেস সুখে আছি। কিন্তু, যদি আপনি অনুগ্রহ করিয়া, আমার পড়া শুনার ভাল বন্দোবস্ত করিয়া দেন, তাহা হইলে, আমি আপনকার সঙ্গে যাই।

রাজকুমার, ডুবালের এই উত্তর শুনিয়া পূর্ব্ব অপেক্ষা অধিক সন্তুষ্ট হইলেন, এবং ডুবালকে রাজধানীতে লইয়া গিয়া তাঁহার বিদ্যাশিক্ষার উত্তম বন্দোবস্ত করিয়া দিলেন। ডুবাল ইতিপূর্ব্বেই, আপন যত্নে ও পরিশ্রমে, অনেক শিক্ষা করিয়াছিলেন; এক্ষণে উত্তম উত্তম অধ্যাপকের নিকট উপদেশ পাইয়া, অল্প কালেই বিলক্ষণ পণ্ডিত হইয়া উঠিলেন। রাজা, ডুবালকে বহু বিদ্যায় নিপুণ দেখিয়া, নিজ পুস্তকালয়ের অধ্যক্ষ ও পুরাবৃত্তের অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত করিলেন। তিনি এমন উত্তম রূপে পুরাবৃত্তের শিক্ষা দিতে লাগিলেন যে, দেশে বিদেশে তাঁহার নাম খ্যাত হইল।

এই রূপে, ডুবাল দুই প্রধান পদে নিযুক্ত হইলেন, রাজার প্রিয় পাত্র হইলেন, এবং ক্রমে ক্রমে ধনসঞ্চয় করিলেন, কিন্তু রাখাল অবস্থায় তাহার যেরূপ স্বভাব ও চরিত্র ছিল, তাহার কিছুমাত্র বৈলক্ষণ্য ঘটিল না। রাজসংসারে থকিলে ও রাজার প্রিয়পাত্র হইলে, মনুষ্যের যে সকল দোষ জন্মিবার সম্ভাবনা, ডুবালের তাহার কোন দোষ জন্মে নাই। হীন অবস্থায় থাকিয়া ভাল অবস্থা হইলে, অনেকের অহঙ্কার হয়, কিন্তু ডুবালের তাহা হয় নাই। তিনি দুঃখের অবস্থায় যেমন নম্র ও নিরহঙ্কার ছিলেন, সম্পদের অবস্থাতেও সেইরূপ নম্র ও নিরহঙ্কার রহিলেন। এই সকল গুণ থাকাতে, ডুবাল সকলের প্রিয় হইয়াছিলেন। ডুবালের মৃত্যু হইলে সকলেই যার পর নাই দুঃখিত হইয়াছিল।

যাহারা মনে করে, দুঃখে পড়িলে লেখাপড়া হয় না তাহাদের, মন দিয়া, ডুবালের বৃত্তান্ত পাঠ করা আবশ্যক। দেখ, ডুবাল অতি দুঃখীর সন্তান, অল্প বয়সে পিতৃহীন ও মাতৃহীন হন, পেটের ভাতের জন্য কত জায়গায় রাখালী করেন; তথাপি কেমন লেখা পড়া শিখিয়াছিলেন, ও কেমন সম্মান ও কেমন সম্পদ লাভ করিয়া, সুখে কালযাপন করিয়া গিয়াছেন। যদি তাঁহার লেখা পড়ায় অনুরাগ না জন্মিত, এবং যত্ন ও শ্রম করিয়া না শিখিতেন, তাহা হইলে রাখালী করিয়া যাবজ্জীবন দুঃখে কালযাপন করিতে হইত, সন্দেহ নাই।

প্রিডো

প্রিডো

ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী করনওয়াল প্রদেশে পডষ্টো নামে এক নগর আছে। ঐ নগরে প্রিডোর জন্ম হয়। ইঁহার পিতার এমন সঙ্গতি ছিল না যে, ইঁহাকে ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখান। কোন বিদ্যালয়ে রাথিয়া সামান্যরূপ কিছু শিখানও উহার পক্ষে দুঃসাধ্য হইয়াছিল। কিন্তু, প্রিডোর লেখা পড়ায় অত্যন্ত যত্ন ছিল। বাটীতে থাকিয়া লেখা পড়া শিখিবার কোন সুযোগ না হওয়াতে, তিনি অক্সফোর্ড নগরে গমন করিলেন; তথায় অন্য কোন উপায় না দেখিয়া, অবশেষে এক বিদ্যালয়ে পাচকের সহকারী নিযুক্ত হইলেন।

এই নীচ কর্ম্মে নিযুক্ত হইবার অভিপ্রায় এই যে, তদ্দ্বারা বাসাখরচ চলিয়া যাইবেক। তিনি এই রূপে বাসাখরচের সংস্থান করিলেন, এবং কর্ম্ম করিয়া যখন অবসর পাইতেন, সেই সময়ে কিছু কিছু অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন। ক্রমে ক্রমে এই রূপে অধ্যয়ন করিয়া সুযোগমতে অক্সফোর্ডে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, তিনি বিলক্ষণ বিদ্য উপার্জ্জন করিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকিতে থাকিতেই, তিনি এক গ্রন্থ রচনা করিলেন। ঐ গ্রন্থে তাঁহার বিলক্ষণ পাণ্ডিত্যপ্রকাশ হইয়াছিল। তদ্দৃষ্টে তাঁহার উপর রাজমন্ত্রীদিগের অনুগ্রহদৃষ্টি হইল। তাঁহাদের সহায়তায়, পরিশেষে, তিনি ওয়ারসেষ্টরের বিশপের পদে অধিরূঢ় হইলেন।

মেডক্‌স

মেডক্‌স

এই ব্যক্তি লণ্ডননগরে জন্মগ্রহণ করেন। ইনি অতি দুঃখীর সন্তান; অল্প বয়সেই পিতৃহীন ও মাতৃহীন হন। তাঁহার আত্মীয়েরা তাঁহাকে এই অভিপ্রায়ে এক রুটিওয়ালার দোকানে নিযুক্ত করিয়া দেন যে, তথায় থাকিয়া কর্ম্ম শিখিয়া, উত্তর কালে ঐ ব্যবসায় অবলম্বনপূর্বক, জীবিকা নির্বাহ করিতে পারিবেন। কিন্তু, লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত তাঁহার আন্তরিক ইচ্ছা ছিল। পুস্তক পাইলেই, তিনি সকল কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া পড়িতে বসিতেন। সুতরাং, তাঁহাকে রাখিয়া রুটিওয়ালার বিশেষ উপকার বোধ হইত না। তাঁহাকে পড়িতে দেখিলে, সে অতিশয় বিরক্ত হইত।

ফলতঃ উভয় পক্ষেরই অত্যন্ত অসুবিধা ঘটিয়া উঠিল। অবাধে মনের সাধে পড়িতে পাইতেন না বলিয়া, মেডকস মনে মনে অত্যন্ত বিরক্ত হইতেন; আর তিনি কর্ম্মের সময় কর্ম্ম না করিয়া পড়িতে বসিতেন, এজন্য রুটিওয়ালা তাঁহার উপর অত্যন্ত বিরক্ত হইত। পরিশেষে, রুটিওয়ালা তাঁহাকে দোকান হইতে তাড়াইয়া দিল। আত্মীয়েরা, লেখা পড়া বিষয়ে তাঁহার অসাধারণ যত্ন দেখিয়া, তাঁহাকে স্কটলণ্ডে পাঠাইলেন এবং এই অভিপ্রায়ে অবর্ডিন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিযুক্ত করিয়া দিলেন যে, যাহাতে উত্তর কালে পাদরির কর্ম্ম করিতে পারেন, তদুপযুক্ত বিদ্যা শিক্ষা করিবেন।

তথায়, কিছু দিন, তিনি উত্তম রূপে অধ্যয়ন করিলেন; কিন্তু, নানা কারণে বিরক্ত হইয়া, ঐ বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়া দিয়া, ইংলণ্ডে ফিরিয়া আসিলেন; এবং লণ্ডনের বিশপ গিবনসের সহায়তায় কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, বিশিষ্টরূপ বিদ্যা উপার্জ্জন করিলেন। এই রূপে অভিলাষানুরূপ বিদ্যা লাভ করিয়া, মেডকস পাদরির কর্ম্মে নিযুক্ত হইলেন। উত্তরোত্তর তাঁহার পদবৃদ্ধি হইতে লাগিল। পরিশেষে, তিনি বিশপের পদ প্রাপ্ত হইলেন। দেখ! লেখা পড়ায় আন্তরিক যত্ব থাকার কি গুণ! যে ব্যক্তি রুটিওয়ালার দোকানে থাকিয়া কর্ম্ম শিথিয়া, উত্তর কালে ঐ ব্যবসায় দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করিবেক বলিয়া স্থির হইয়াছিল, সেই ব্যক্তি বিশপের পদ প্রাপ্ত হইলেন।

রেমস

রেমস

ফ্র‌ান্সের অন্তর্বর্তী পিকার্ডি প্রদেশে রেমসের জন্ম হয়। রেমসের পিতা যার পর নাই দুঃখী ছিলেন। রেমস বাল্যকালে মেষচারণকর্ম্মে নিযুক্ত হইয়াছিলেন। কিছু দিনেই রাখালী কর্ম্মে তাঁহার বিরক্তি জন্মিল, এবং বিদ্যাশিক্ষা করিবার নিমিত্ত একান্ত অভিলাষ হইল। এখানে থাকিলে, রাখালীও ঘুচিবেক না এবং লেখা পড়াও শিখিতে পাইব না এই ভাবিয়া, তিনি, পিতার আলয় হইতে পলায়ন করিয়া, পারিস রাজধানীতে উপস্থিত হইলেন। এই সময়ে তাহার বয়স আটবৎসরমাত্র।

পারিসে উপস্থিত হইয়া, রেমস প্রথমতঃ কিছু দিন বিস্তর ক্লেশ পাইয়াছিলেন। তিনি ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত,
এত ব্যগ্র হইয়াছিলেন যে, অন্য কোন সুযোগ করিতে না পারিয়া, অবশেষে নেবারের বিদ্যালয়ে পরিচারকের কর্ম্মে নিযুক্ত হইলেন; দিবসে যে অবসর পাইতেন তাহাতে, এবং রাত্রিতে, সবিশেষ পরিশ্রম করিয়া, অল্প দিনের মধ্যেই, বিলক্ষণ শিক্ষা করিলেন। এ পর্য্যন্ত, তিনি শিক্ষাবিষয়ে প্রায় কাহার সাহায্য পান নাই।

পরিশেষে, তিন বৎসর ছয় মাস রীতিমত উপদেশ পাইয়া, এবং স্বয়ং প্রাণপণে পরিশ্রম করিয়া, তিনি এক জন অদ্বিতীয় বিদ্বান্ হইয়া উঠিলেন। বস্তুতঃ, তিনি এক জন বিখ্যাত পণ্ডিত ও বিখ্যাত গ্রন্থকর্তা ছিলেন, এবং ন্যায়শাস্ত্রবিষয়ে নূতন মত প্রচার করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু, লেখা পড়া বিষয়ে অত্যন্ত ইচ্ছা ও আন্তরিক যত্ন না থাকিলে, তিনি কখনই এরূপ হইতে পারিতেন না।

সম্পূর্ণ

লঙ্গোমণ্টেনস

লঙ্গোমণ্টেনস

এই ব্যক্তি ডেনমার্কের অন্তঃপাতী লঙ্গসবর্গ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ইঁহার পিতা প্রতিদিন জন খাটিয়া সংসারযাত্রা নির্বাহ করিতেন; সুতরাং, তাঁহার পুত্ত্রদিগকে লেখা পড়া শিখাইবার ক্ষমতা ছিল না। লঙ্গোমণ্টেনসের আট বৎসর বয়সের সময় পিতৃবিয়োগ হয়। সুতরাং, তিনি নিতান্ত নিরাশ্রয় হইয়া পড়িলেন। তাঁহার মাতুল তাঁহাকে, লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত নিতান্ত উৎসুক দেখিয়া, এক বিদ্যালয়ে পাঠা-
ইয়া দিলেন। তিনি তথায় অধ্যয়ন করিতে লাগিলেন।

লঙ্গোমণ্টেনসের আর কয়েক সহোদর ছিল। তাহারা লেখা পড়া শিখিতে পায় নাই। এক্ষণে, তাঁহাকে বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া লেখা পড়া করিতে দেখিয়া, তাহাদের অত্যন্ত ঈর্ষ্যা জন্মিল। আমরা লেখা পড়া শিখিতে পাইলাম না, ও কেন শিখিবে, এই হিংসাতে তাহারা তাঁহার উপর এত উৎপাত আরম্ভ করিল যে, তিনি বিরক্ত হইয়া দেশত্যাগ করিয়া ফিনলণ্ড প্রদেশের অন্তঃপাতী উইবর্গ নগরে গমন করিলেন।

কিছু দিন বিদ্যালয়ে থাকিয়া, তাঁহার ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত অতিশয় ইচ্ছা হইয়াছিল। এক্ষণে তিনি, এই স্থানে উপস্থিত হইয়া, লেখা পড়ার চেষ্টা দেখিতে লাগিলেন। কিন্তু, কোন সুযোগ ঘটিয়া উঠিল না। অন্ততঃ, খাওয়া, পরা ও পুস্তকক্রয়ের সংস্থান না হইলে, লেখা পড়া চলিতে পারে না। অনেক চেষ্টা দেখিয়াও, তিনি এই সমুদয়ের সংস্থান করিয়া উঠিতে পারিলেন না; অবশেষে, অনেক ভাবিয়া এক বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইলেন। তিনি দিবাভাগে তথায় থাকিয়া অধ্যয়ন করিতেন; রাত্রিতে অন্য স্থানে কর্ম্ম করিয়া, কিছু কিছু উপার্জন করিতেন; তাহাতেই কষ্টে আহারাদিনির্বাহ হইত।

ক্রমাগত এগার বৎসর এইরূপ কষ্ট পাইয়া, উইবর্গে থাকিয়া, তিনি আন্তরিক যত্ব সহকারে বিলক্ষণ লেখা পড়া শিথিলেন। কিছু দিন পরে, তিনি স্বদেশে প্রতিগমন করিলেন, এবং ডেনমার্কের রাজধানী কোপনহেগন নগরে ষে বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, তথায় গণিতশাস্ত্রের অধ্যাপক নিযুক্ত হইলেন। তিনি মৃত্যুর দুই বৎসর পূর্ব্ব পর্য্যন্ত ঐ কর্ম্ম করিয়াছিলেন। তদ্ব্যতিরিক্ত, তিনি নানা বিষয়ে নানা গ্রন্থ রচনা করিয়া গিয়াছেন।

দেখ! যে ব্যক্তির পিতা প্রতিদিন জন খাটিয়া কষ্টে সংসার নির্বাহ করিতেন, সেই ব্যক্তি, অত্যন্ত কষ্ট পাইয়াও, আন্তরিক যত্ন সহকারে বিদ্যা উপার্জন করিয়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হইয়াছিলেন।

লমনসফ

লমনসফ

রুসিয়ার অন্তঃপাতী আর্কেঞ্জল প্রদেশে কোলমগর নামে এক নগর আছে। এই নগরে লমনসফের জন্ম হয়। ইহার পিতা অতি দুঃখী ছিলেন; সমুদ্র হইতে মৎস্য ধরিয়া, বাজারে বিক্রয় করিয়া, জীবিকানির্বাহ করিতেন। লমনসফ কয়েক বার পিতার সঙ্গে শ্বেত ও উত্তর সাগরে মৎস্য ধরিতে
গিয়াছিলেন। তিনি উত্তর কালে পৈতৃক ব্যবসায় অবলম্বন করিতেন, তাহার সন্দেহ নাই। কিন্তু, সৌভাগ্যক্রমে লেখা পড়া বিষয়ে তাঁহার অতিশয় অনুরাগ ছিল। ঐ অনুরাগ ছিল বলিয়া, তিনি অবশেষে অদ্বিতীয় ও চিরস্মরণীয় হইয়া গিয়াছেন।

শীতকালে মৎস্য ধরিতে যাইতে হইত না। লমনসফ, সেই সময়ে, নিশ্চিন্ত হইয়া, আন্তরিক যত্ন সহকারে অধ্যয়ন করিতেন। এক পাদরি অনুগ্রহ করিয়া, তাঁহাকে শিক্ষা দিতেন। তাঁহার নিকট ব্যাকরণ, পাটীগণিত ও গীতাবলী এই তিনখানি মাত্র পুস্তক ছিল। তিনি, অজস্র পাঠ করিয়া ঐ তিন পুস্তক আদ্যন্ত কণ্ঠস্থ করিয়াছিলেন।

উক্ত তিনি পুস্তক পাঠ দ্বারা বিদ্যার কিঞ্চিৎ আস্বাদ পাইয়া, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত, তাঁহার অত্যন্ত যত্ন ও ইচ্ছা হইল। তখন তিনি মস্কো নগরে গমন করিলেন, এবং তথাকার এক বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, অলপ দিনের মধ্যেই এত শিক্ষা করিলেন যে, তদ্দৃষ্টে তাঁহার উপর অনেকের অনুগ্রহ হইল। সেই অনুগ্রহের বলে, নানা বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিয়া, তিনি বহু বিদ্যায় অদ্বিতীয় পণ্ডিত হইয়া উঠিলেন। প্রথমতঃ, তিনি এক অধ্যাপকের পদে নিযুক্ত হন; পরিশেষে, রাজমন্ত্রীর পদ পর্য্যন্ত প্রাপ্ত হইয়াছিলেন।

দেখ! লমনসফ ও তাঁহার পিতা উভয়ের কত অন্তর; লমনসফের পিতা মৎস্য ধরিয়া ও বিক্রয় করিয়া জীবন কাটাইয়া গিয়াছিলেন; কিন্তু লমনসফ নানা বিদ্যায় অদ্বিতীয় পণ্ডিত, অধ্যাপক, ও রাজমন্ত্রী পর্য্যন্ত হইয়াছিলেন। লমনসফের লেখাপড়ায় অত্যন্ত ষত্ব ও অত্যন্ত অনুরাগ ছিল বলিয়া, তিনি এরূপ হইতে পারিয়াছিলেন; নতুবা তাঁহাকেও নিঃসন্দেহ, পৈতৃক ব্যবসায় অবলম্বন করিয়া, জীবন কাটাইতে হইত।

লীডন

লীডন

স্কট্‌লণ্ডের দক্ষিণাংশে, রক্‌সবরশায়র প্রদেশে ডেন্‌হলমনামক এক গ্রাম আছে। তথায় লীডনের জন্ম হয়। লীডন অতি দুঃখীর সন্তান। তাঁহার পিতা জন খাটিয়া প্রতিদিন যাহা পাইতেন, তাহাতেই অতিকষ্টে সংসার নির্বাহ করিতেন।

লীডনের জন্মের এক বৎসর পরে, তাঁহার পিতা সপরিবারে, শ্বশুরালয়ে গিয়া, বাস করেন। তথায় তিনি ষোল বৎসর থাকেন। এই ষোল বৎসরের কিছু কাল মেষরক্ষকের কর্ম্ম করেন, আর কিছু কাল শ্বশুরের ক্ষেত্রসংক্রান্ত সমুদয় কর্ম্ম করেন। তাঁহার শ্বশুর অন্ধ হইয়াছিলেন; সুতরাং, তিনি নিজে ক্ষেত্রের কোন কর্ম্ম করিতে পারিতেন না।

এই স্থানে, লীডন তাঁহার মাতামহীর নিকটে লেখা পড়া শিখিতে আরম্ভ করিলেন। কিছু শিখিয়াই, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত, তাঁহার অত্যন্ত যত্ন হইল। অল্প‌ দিনের মধ্যেই তিনি অনেক শিখিয়া ফেলিলেন। কোন বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইতে না পারিলে, উত্তম রূপে লেখা পড়া শিখা হয় না; কিন্তু পিতা মাতার অসঙ্গতি প্রযুক্ত, কিছু কাল উহার সে সুযোগ ঘটিয়া উঠিল না। পরে, দশ বৎসর বয়সের সময়, তিনি এক বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইলেন।

কিছু দিন পরেই, ঐ পাঠশালার শিক্ষকের মৃত্যু হইল। সুতরাং, লীডনের লেখা পড়া শিখিবার যে সুযোগ ঘটিয়াছিল, তাহা গেল। কিন্তু ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিবার নিমিত্ত, তাঁহার আন্তরিক যত্ন ও অনুরাগ জন্মিয়াছিল। শিখিবার সুযোগ গেল বলিয়া, তিনি এক বারে লেখা পড়া পরিত্যাগ করি-

লেন না; অন্যের সাহায্য না পাইয়াও, স্বয়ং প্রাণপণ যত্ন করিয়া, বিলক্ষণ শিক্ষা করিতে লাগিলেন। ডেন্‌হলম গ্রামে ডস্কন নামে এক পাদরি ছিলেন। তিনি কিছু দিন লীডনকে লাটিন শিখাইলেন; আর, লীডন স্বয়ং পরিশ্রম করিয়া, বিন সাহায্যে, গ্রীক শিক্ষা করিলেন।

স্কট্‌লণ্ডের কৃষিজীবীরা যে বালককে বুদ্ধি মান ও লেখা পড়ায় যত্নবান্‌ দেখে, তাহাকে পাদরি করিবার নিমিত্ত যত্ন পায়। তাহার কারণ এই যে, অন্যান্য কর্ম্ম অপেক্ষা পাদরির কর্ম্ম অনায়াসে হইতে পারে। লীডনের পিতা, তাঁহার লেখা পড়ায় যত্ন ও শিখিবার ক্ষমতা দেখিয়া, মনে মনে বাসনা করিয়াছিলেন, তাঁহাকে পাদরি করিবেন। তদনুসারে তিনি, ঐ কর্ম্মের উপযোগী লেখা পড়া শিখাইবার নিমিত্ত, পুত্রকে এডিন্‌বরার কালেজে প্রবিষ্ট করিয়া দিলেন।

এ পর্য্যন্ত, লীডন ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিবার সুযোগ পান নাই; এক্ষণে কলেজে

প্রবিষ্ট হইয়া, প্রাণপণে পরিশ্রম করিয়া, মনের সাধে লেখা পড়া শিখিতে লাগিলেন। তিনি, কিছু কাল কলেজে থাকিয়া, অদ্ভুত পরিশ্রম সহকারে লাটিন, গ্রীক, ফরাসি, জর্ম্মন, স্পানিশ, ইটালীয়, প্রাচীন আইসলণ্ডিক, হিব্রু, আরবি, পারসী, এই দশ ভাষা, এবং ধর্ম্মনীতি ও গণিতবিদ্যা উত্তম রূপে শিথিলেন, এবং পদার্থবিদ্যা, চিকিৎসাবিদ্যা প্রভৃতি আর কয়েক বিদ্যাও একপ্রকার শিক্ষা করিলেন। যাহারা উত্তর কালে পাদরি হইবার নিমিত্ত বিদ্যা শিখিত, অধ্যাপকেরা তাহাদের নিকট কিছু না লইয়া, লেখা পড়। শিখাইতেন, এই নিমিত্ত, লীডন এত শিখিতে পারিয়াছিলেন।

এই রূপে, পাঁচ ছয় বৎসর কলেজে থাকিয়া, লীডন বিলক্ষণ বিদ্যা উপার্জন করিলেন। কিন্তু, তাঁহাকে অর্থের অসঙ্গতিনিবন্ধন বিস্তর ক্লেশ পাইতে হইয়াছিল। তিনি যে সকল পুস্তক পাঠ করিতেন, তাহার অধিকাংশই অন্যের নিকট হইতে চাহিয়া আনিতেন।

যে সকল পুস্তক চাহিয়া পাওয়া যাইত না, তাহা কিনিতে হইত; কিন্তু, কিনিবার সঙ্গতি ছিল না। যাহা কিছু তাঁহার হস্তে আসিত, আহারাদির ক্লেশ স্বীকার করিয়াও, তিনি তাহার অধিকাংশ দ্বারা পুস্তক ক্রয় করিতেন। লীডনের দুঃখ দেখিয়া, কালেজের এক অধ্যাপক, অনুগ্রহ করিয়া, তাঁহাকে এক পড়ান কর্ম্ম জুটাইয়া দেন। তাহাতে লীডনের বিস্তর আনুকূল্য হয়। বালকদিগকে শিক্ষা দিয়া, যে সময় থাকিত, সে সময়ে তিনি অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া, স্বয়ং লেখা পড়া করিতেন।

লীডন অসাধারণ যত্নে ও অসাধারণ পরিশ্রমে যে অসাধারণ বিদ্যা উপার্জন করিয়াছিলেন, তদ্দ্বা‌রা তিনি বিখ্যাত হইয়া উঠিলেন। তাঁহার পরিশ্রমের ও বিদ্যালাভের কথা যে শুনিত, সেই চমৎকৃত হইত ও প্রশংসা করিত। ক্রমে ক্রমে, সেই প্রদেশের অনেক বিদ্বান্‌ ও বিদ্যানুরাগী সন্ত্রান্ত লোকের সহিত তাঁহার আলাপ হইল। তাঁহারা সকলেই যথেষ্ট স্নেহ ও সমাদর করিতেন,

এবং যাহাতে তাঁহার ভাল হয়, সে বিষয়ে যত্নবান্‌ ছিলেন।

কিছু দিন পরে, তিনি পাদরির কর্ম্মে নিযুক্ত হইলেন; কিন্তু সে কর্ম্ম, তাঁহার মনোনীত না হওয়াতে, অল্প‌ দিনের মধ্যেই, পরিত্যাগ করিলেন; এবং মনে মনে স্থির করিলেন, কাব্যরচনা করিব, এবং তাহা বিক্রয় করিয়া যাহা লাভ হইবেক, তাহাতেই জীবিকা নির্বাহ করিব। কিন্তু, এই ব্যবসায় দ্বারা যে লাভের সম্ভাবনা ছিল, তাহাতে চলা ভার। এজন্য, তাঁহার আত্মীয়েরা তাঁহাকে কোন লাভকর বিষয়কর্ম্মে নিযুক্ত করিবার চেষ্টা দেখিতে লাগিলেন। তাহারা, বোর্ড‌ অব কণ্ট্র‌োলের এক মেম্বরের নিকট লীডনের বিদ্যা, বুদ্ধি ও স্বভাবের পরিচয় দিয়া, তাঁহাকে ভারতবর্ষে কোন কর্ম্মে নিযুক্ত করিয়া পাঠাইতে অনুরোধ করিলেন।

এই সময়ে, ভারতবর্ষে ডাক্তরি ভিন্ন অন্য কর্ম্মের সুবিধা ছিল না। কিন্তু, চিকিৎসাবিদ্যায় পরীক্ষা দিয়া, উত্তীর্ণ হইয়া, প্রশংসা-

পত্র না পাইলে, কেহ ডাক্তরিকর্ম্ম‌ পাইতে পারে না। ইতিপূর্ব্ব‌ে লীডন কলেজে চিকিৎসাবিদ্যাও কিছু শিখিয়াছিলেন; এক্ষণে তিনি, অনন্যমনা ও অনন্যকর্ম্মা হইয়া, উক্ত বিদ্যা শিখিতে আরম্ভ করিলেন; এবং অদ্ভুত পরিশ্রম করিয়া, অল্প‌ দিনের মধ্যেই, ঐ বিদ্যায় সুশিক্ষিত ও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইলেন। তিনি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া, প্রশংসাপত্র পাইবামাত্র, ডাক্তরিকর্ম্মে নিযুক্ত হইয়া, ভারতবর্ষে আসিলেন।

লীডন, মান্দ্রাজে উপস্থিত হইয়া, কর্ম্ম করিতে আরম্ভ করিলেন। কিন্তু, সেখানকার জল বায়ু তাঁহার পক্ষে অসহ্য হইয়া উঠিল। তিনি অবিলম্বে নানা রোগে আক্রান্ত হইলেন; এজন্য, মান্দ্রাজ পরিত্যাগ করিয়া, তাঁহাকে কিছু দিন মালাকা উপদ্বীপে থাকিতে হইল। তিনি এই স্থানে থাকিয়া, স্বাস্থ্যলাভ করিয়া, কলিকাতায় উপস্থিত হইলেন। তৎকালীন গবর্ণর জেনেরল লার্ড মিণ্টো, তাঁহার গুণের পরিচয় পাইয়া, আহ্লা‌দিত হইয়া, তাঁহাকে

ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে অধ্যাপক নিযুক্ত করিলেন। কিছু দিন পরেই, তিনি চব্বিশ পরগনার জজের পদে নিযুক্ত হইলেন।

এই পদে অধিক বেতন ছিল। অধিক টাকা পাইলে, অনেকে বাবুগিরি করিয়া থাকেন। কিন্তু লীডন সেপ্রকার লোক ছিলেন না। তিনি বাবুগিরিতে এক পয়সাও ব্যয় করিতেন না; ন্যায্য খরচ করিয়া, বেতনের যাহা অবশিষ্ট থাকিত, তাহার অধিকাংশই এতদ্দে‌শীয় ভাষা ও বিদ্যা শিক্ষা এবং এতদ্দে‌শীয় পুস্তক সংগ্রহ বিষয়ে ব্যয় করিতেন। তিনি এতদ্দ‌েশীয় ভাষা ও বিদ্যা শিক্ষা বিষয়ে অত্যন্ত যত্নবান্‌ হইয়াছিলেন। যত্নের কথা অধিক কি বলিব, তিনি এক মুহূর্ত্তও বৃথা নষ্ট না করিয়া, ঐ বিষয়েই নিবিষ্ট থাকিতেন। এই সময়ে, তিনি এক আত্মীয়কে এই মর্ম্মে পত্র লিখিয়াছিলেন, যদি আমি সর উইলিয়ম জোন্স অপেক্ষা শতগুণ অধিক না শিখিয়া মরি, তাহা হইলে, যেন আমার জন্যে কেহ অশ্রুপাত না করে।

কিছু দিন পরেই, গবর্ণর জেনেরল, সৈন্য লইয়া, জাবাদ্বীপ জয় করিতে গেলেন। লীডন সেই দেশের ভাষা, বিদ্যা ও রীতি নীতি অবগত হইবার মানসে, ঐ সঙ্গে গমন করিলেন। সেখানকার জল বায়ু অত্যন্ত মন্দ। কয়েক দিন পরেই, তাহার কম্পজ্বর হইল। তিনি শয্যাগত হইলেন, এবং তিন দিনের জ্বরেই প্রাণত্যাগ করিলেন। এই সময়ে, তাঁহার ছত্রিশ বৎসর মাত্র বয়ঃক্রম হইয়াছিল|

লীডন অতি দুঃখীর সন্তান। পিতা মাতার এমন সঙ্গতি ছিল না, তাঁহাকে ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখান। কিন্তু তিনি কত ভাষা ও কত বিদ্যা শিখিয়াছিলেন। অনুধাবন করিয়া দেখ, কেবল অসাধারণ যত্ন ও অসাধারণ পরিশ্রম লীডনের এই সমস্ত ভাষা ও এই সমস্ত বিদ্যা শিক্ষার মূল।

সিমসন

সিমসন

ইংলণ্ড‌ দেশে লীষ্টরশায়র নামে এক প্রদেশ আছে। ঐ প্রদেশের অন্তঃপাতী মার্কেট বসওয়ার্থনামক গ্রামে সিমসনের জন্ম হয়। সিমসনের পিতা তন্তুবায়ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি, প্রথমতঃ, সিমসনকে এক বিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করিতে পাঠাইয়া দেন। কিন্তু তিনি বিদ্যার গৌরব করিতেন না, এবং বিদ্যা উপার্জন মনুষ্যের পক্ষে নিতান্ত আবশ্যক বলিয়া তাঁহার বোধ ছিল না। এই নিমিত্ত, পুত্রের যৎকিঞ্চিৎ লেখা পড়া শিক্ষা হইবামাত্র, তিনি তাঁহাকে বিদ্যালয় হইতে ছাড়াইয়া লইলেন, এবং তন্তুবায়ের ব্যবসায়ে নিযুক্ত করিয়া দিলেন।

অধিক লেখা পড়া শিখায় কোন লাভ নাই, এই বিবেচনা করিয়া, সিমসনের পিতা তাঁহার লেখা পড়া রহিত করিলেন। কিন্তু সিমসন কিছু দিন বিদ্যালয়ে থাকিয়া, বিদ্যার আস্বাদ পাইয়াছিলেন। সুতরাং, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিতে তাঁহার অত্যন্ত অনুরাগ জন্মিয়াছিল। পিতার ইচ্ছানুসারে, বিদ্যালয় ছাড়িয়া, তন্তবায়ের কর্ম্মে প্রবৃত্ত হইলেন বটে, কিন্তু মনে মনে প্রতিজ্ঞা করিলেন, আমার ভাগ্যে যাহা ঘটুক, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিব। তিনি কর্ম্ম করিয়া অবসর পাইলেই, পড়িতে বসিতেন; কোন নুতন পুস্তক কোন রূপে পাইলে, ব্যগ্র চিত্তে তাহা পাঠ করিতেন। ফলতঃ, তিনি লেখা পড়ায় এত অনুরক্ত হইয়াছিলেন যে, কেবল অবসরকালে পাঠ করিয়া তাহার তৃপ্তি হইত না। কখন কখন, কর্ম্মের সময় কর্ম্ম না করিয়া, তিনি পুস্তক পাঠ করিতেন।

পুত্রের লেখা পড়ায় অনুরাগ দেখিলে, পিতা কত সন্তুষ্ট হন, কত ভাল বাসেন, কত উৎসাহ দেন। কিন্তু সিমসনের পিতা অতি আশ্চর্ষ্য লোক ছিলেন। তিনি লেখা পড়ায় পুত্রের এইরূপ অনুরাগ দেখিয়া, অতিশয় বিরক্ত হইলেন। উৎসাহ দেওয়া দূরে থাকুক, যাহাতে সিমসন লেখা পড়া ছাড়েন, সাধ্যানুসারে তাহার চেষ্টা দেখিতে লাগিলেন। তিনি লেখা পড়া শিখাকে অলসের কর্ম্ম বিবেচনা করিতেন; সুতরাং লেখা পড়ায় অধিক যত্ন করাতে, তাঁহার মতে, সিমসন অলস ও অকর্ম্মণ্য হইয়া যাইতেছিলেন। এই নিমিত্ত, তিনি তাঁহাকে সর্ব্ব‌দা ভৎর্স‌না করিতেন। সিমসন ভৎর্স‌নায় ক্ষান্ত না হওয়াতে, অবশেষে তাঁহার পিতা অতিশয় কুপিত হইয়া কহিলেন, যদি তুমি ভাল চাও, বই খুলিতে পাইবে না, সারা দিন তাঁতের কর্ম্ম করিতে হইবেক।

যে উদ্দেশ্যে‌‌ সিমসনের পিতা এই অন্যায় আজ্ঞা প্রদান করিয়াছিলেন, তাহা সফল হয় নাই। সিমসন লেখা পড়ায় যেরূপ অনুরক্ত হইয়াছিলেন, তাহাতে তিনি এক বারে লেখা পড়া ছাড়িয়া দিতে পারিবেন কেন। তিনি, কর্ম্ম করিয়া অবসর পাইলেই, পড়িতে বসিতেন; তাঁহার পিতাও, পড়িতে দেখিলে, অত্যন্ত ক্রোধ করিতেন ও গালাগালি দিতেন। ফলতঃ, এই উপলক্ষে পিতা পুত্রে অত্যন্ত বিরোধ ঘটিয়া উঠিল। অবশেষে, তাঁহার পিতা অতিশয় কুপিত হইয়া কহিলেন, তুমি আমার কথা শুন না, আমি যা বারণ করি তাই কর; তোমায় স্পষ্ট কহিতেছি, যদি তুমি পড়ায় ক্ষান্ত না হও, আমি তোমায় বাড়ীতে থাকিতে দিব না।

সিমসন, বাটী হইতে বাহির হইয়া যাইবেন তাহাও স্বীকার, তথাপি লেখা পড়া ছাড়িবেন না; সুতরাং পিতার আলয় হইতে বহিস্কৃত হইলেন, এবং নিকটবর্তী কোন গ্রামে গিয়া, এক গৃহস্থের বাটীতে বাসা করিলেন।

এই স্থানে তিনি, তাঁতের কর্ম্ম করিয়া, আপনার অন্ন বস্ত্র সংগ্রহ করিতেন, এবং কাহার নিকট পুস্তক চাহিয়া পাইলে, তাহাই পাঠ করিতেন। কিছু দিন এই রূপে থাকেন।

এক দিন, সেই গৃহস্থের বাটীতে এক গণক উপস্থিত হইল। এই ব্যক্তির সহিত আলাপ হওয়াতে, সিমসন তাহার নিকট অঙ্কবিদ্যা ও গণনা শিখিতে আরম্ভ করিলেন। অল্প‌ দিনেই, গণনাতে এমন নিপুণ হইয়া উঠিলেন যে, সেই প্রদেশের সকল লোক তাঁহার নিকট ভাল মন্দ গণাইতে আসিত। এই নূতন ব্যবসায় দ্বারা তাঁহার বিলক্ষণ লাভ হইতে লাগিল। তখন তিনি, তাঁতবোনা ছাড়িয়া দিয়া, গণকের ব্যবসায় অবলম্বন করিলেন। এই সময়ে তিনি বিবাহ করেন।

এই রূপে, গণকের ব্যবসায় অবলম্বন করাতে, সিমসনের অন্ন বস্ত্রের ক্লেশ দুর হইল বটে, কিন্তু বিশিষ্টরূপ বিদ্যা উপার্জ‌্জ‌নের বিলক্ষণ ব্যাঘাত জন্মিল। গণক হইয়া পণ্ডিতসমাজে যাইবার পথ ছিল না। পণ্ডিতেরা গণকদিগকে প্রতারক বলিয়া জানিতেন, সুতরাং, অত্যন্ত ঘৃণা করিতেন। সিমসন অন্ন বস্ত্রের নিমিত্ত অত্যন্ত ক্লেশ পাইয়াছিলেন, এজন্য, অগত্যা ঐ ব্যবসায় অবলম্বন করেন। এক্ষণে তিনি মনস্থ করিলেন, কিছু কিছু লাভ হয় এমন কোন ব্যবসায় অবলম্বন করিতে পারিলেই, এ জঘন্য ব্যবসায় পরিত্যাগ করিব। অবশেষে, এরূপ এক কাণ্ড‌ উপস্থিত হইল যে, তাঁহাকে এক বারে গণকের ব্যবসায় ছাড়িয়া দিতে ও স্থানত্যাগ করিতে হইল।

এক দিন, একটি স্ত্রীলোক সিমসনের নিকট কোন বিষয় গণাইতে আসিয়াছিল। ঐ গণনাতে চণ্ড নামাইবার আবশ্যকতা ছিল। সিমসন এই অভিপ্রায়ে এক ব্যক্তিকে, বিকট বেশ ধারণ করাইয়া, নিকটবর্তী খড়ের গাদার পাশে বসাইয়া রাখিয়াছিলেন যে, চণ্ডকে আহ্বা‌ন করিলেই, ঐ ব্যক্তি উপস্থিত হইবেক। গণনা আরম্ভ হইল; সিমসন আর আর অনুষ্ঠান করিয়া, চণ্ডকে আহ্বা‌ন করিবামাত্র, ঐ ব্যক্তি বিকট বেশে উপস্থিত হইল। দেখিতে এমন ভয়ানক হইয়াছিল যে, সেই স্ত্রীলোক অবলোকনমাত্র ভয়ে অভিভূত ও অচেতন হইল। এ উপলক্ষে তাহার উৎকট রোগ জন্মিল, এবং বুদ্ধিভ্রংশ হইয়া গেল। এই ব্যাপার ঘটাতে, সমস্ত লোক সিমসনের উপর এত কুপিত হইল যে, তাঁহাকে ঐ স্থান পরিত্যাগ করিয়া পলাইতে হইল।

এই রূপে, ঐ প্রদেশ হইতে পলায়ন করিয়া, সিমসন তথা হইতে পনর ক্রোশ দূর ডর্বিনগরে গিয়া অবস্থিতি করিলেন; প্রতিজ্ঞা করিলেন, আর কখন চণ্ড নামাইব না। কিছু কিছু উপার্জ্জ‌ন না হইলে, সংসার চলে না, এজন্য পুনরায় তন্তবায়বৃত্তি অবলম্বন করিলেন। তিনি দিনের বেলায় তাঁতের কর্ম্ম করিতেন, রাত্রিতে বালকদিগকে শিক্ষা দিতেন। এই রূপে, দিবারাত্র শ্রম ও কষ্ট করিয়া, যৎ, কিঞ্চিৎ যাহা লাভ হইতে লাগিল, তিনি তদ্দ্বা‌রা কষ্টে আপনার ও পরিবারের ভরণ পোষণ নির্বাহ করিতে লাগিলেন। ফলতঃ, এই সময়ে তিনি অত্যন্ত কষ্টভোগ করিয়াছিলেন। পূর্বে একাকী মাত্র ছিলেন, এক্ষণে বিবাহ করিয়া বিপদগ্রস্ত হইয়াছিলেন।

যাহা হউক, তিনি এই সময়ে অন্ন বস্ত্রের নিমিত্ত যত পরিশ্রম করিতেন, বিদ্যা উপার্জ্জ‌ন বিষয়ে তদধিক পরিশ্রম করিতেন। এই পরিশ্রম দ্বারা, অল্প‌ দিনের মধ্যে, তিনি অঙ্কশাস্ত্রে ও পদার্থবিদ্যায় বিলক্ষণ ব্যুৎপন্ন হইয় উঠিলেন; এবং অঙ্কশাস্ত্রের একখানি গ্রন্থ রচনা করিলেন। ঐ গ্রন্থ মুদ্রিত করেন এমন ক্ষমতা নাই; এজন্য ডর্বি‌ নগরে পরিবার রাখিয়া, ইংলণ্ডের রাজধানী লণ্ডন নগরে গমন করিলেন। এই সময়ে তাঁহার বয়ঃক্রম পঁচিশ ছাব্বিশ বৎসর।

সিমসন, লণ্ডনে উপস্থিত হইয়া, এক অতি সামান্য বাসা ভাড়া করিলেন; এবং দিননির্বাহের জন্য, দিনে তাঁতের কর্ম্ম ও রাত্রিতে বালকদিগকে অঙ্কবিদ্যা শিখাইতে লাগিলেন। অঙ্কবিদ্যা অতি দুরূহ বিদ্যা। কিন্তু শিক্ষাদানবিষয়ে সিমসনের এমন অসধারণ ক্ষমতা ছিল যে, তিনি বালকদিগকে অতিসহজে ও সুন্দর রূপে বুঝাইয়া দিতেন। এজন্য, ত্বরায় তাঁহাকে সকলে জানিতে পারিল এবং অনেকে তাঁহার আত্মীয় হইল। ফলতঃ, অল্প‌ দিনের মধ্যেই, শিক্ষকতাকর্ম্ম দ্বারা তাঁহার এরূপ লাভ হইতে লাগিল যে, তথায় আপন পরিবার পর্য্যন্ত আনিতে পারিলেন। এই সময়েই, তিনি অঙ্কবিদ্যার গ্রন্থও মুদ্রিত ও প্রচারিত করিলেন। এই গ্রন্থ প্রচার অবধি, তাঁহার সৌভাগ্যের দশা উপস্থিত হইল। কিছু দিন পরে, উলউইচের বিদ্যালয়ে গণিতবিদ্যার অধ্যাপক নিযুক্ত হইলেন। অতঃপর, উত্তরোত্তর তাঁহার খ্যাতি ও সম্পত্তি বৃদ্ধি হইতে লাগিল। কিন্তু খ্যাতি ও সম্পত্তি লাভ করিয়াও, তিনি পরিশ্রমে বিমুখ হয়েন নাই; অহোরাত্র অধ্যয়নে ও গ্রন্থরচনাতে নিবিষ্ট থাকিতেন। তিনি অঙ্কবিদ্যা ও পদার্থবিদ্যা বিষয়ে অনেক গ্রন্থ রচনা করিয়া গিয়াছেন। এই রূপে তিনি খ্যাতি, সম্পত্তি ও সম্মান লাভ করিয়া একান্ন বৎসর বয়সে দেহত্যাগ করেন।

আন্তরিক যত্ন থাকিলে, ও পরিশ্রম করিলে, অবশ্যই বিদ্যালাভ হয়। দেখ! সিমসনের পিতা তাঁহাকে দিন কয়েক মাত্র বিদ্যালয়ে রাখিয়া ছাড়াইয়া লইলেন; কিন্তু তিনি লেখা পড়া ছাড়িলেন না; তাঁহার পিতা সর্ব্বদা বারণ ও ভর্ৎসনা করিতে লাগিলেন, তিনি তথাপি লেখা পড়া ছাড়িলেন না; অবশেষে, তাঁহার পিতা ক্রুদ্ধ হইয়া তাঁহাকে বাটী হইতে বাহির করিয়া দিলেন, তিনি তথাপি লেখা পড়া ছাড়িলেন না; তৎপরে কত স্থানে কত কষ্ট পাইলেন, তিনি তথাপি লেখা পড়া ছাড়িলেন না। ফলতঃ, লেখা পড়ায়, আন্তরিক যত্ন ছিল ও অত্যন্ত পরিশ্রম করিয়াছিলেন বলিয়া, তিনি মনের মত বিদ্যালাভ করিতে পারিয়াছিলেন, এবং সেই বিদ্যার বলে বিলক্ষণ খ্যাতিলাভ, সম্পত্তিলাভ ও সম্মানলাভ করিয়া গিয়াছেন, এবং চিরস্মরণীয় হইয়াছেন।

হণ্টর

হণ্টর

ইংলণ্ডের অন্তঃপাতী লেনৰ্কশায়র প্রদেশে হণ্টরের জন্ম হয়। তাঁহারা ভাই ভগিনীতে
দশটি ছিলেন; তন্মধ্যে তিনি সর্ব্বকনিষ্ঠ। বৃদ্ধ বয়সের ও সর্ব্ব শেষের পুত্র বলিয়া, তিনি পিতার আদরের ছেলে ছিলেন। তাঁহার পিতা, আদর দিয়া, তাঁহাকে এক বারে নষ্ট করিয়াছিলেন। হণ্টর যা খুসী হইত তাই করিতেন; কোন বিষয়ে কাহার উপদেশ অথবা বারণ শুনিতেন না। কোনপ্রকার শাসনে থাকা তাঁহার পক্ষে অত্যন্ত ক্লেশকর হইয়া উঠিয়াছিল। সর্ব্বদা আপন ইচ্ছা অনুসারে চলিয়া, এমন বিষম দোষ জন্মিয়া গিয়াছিল যে, তিনি কোন বিষয়ে অধিক ক্ষণ মনোযোগ করিতে পারিতেন না। সুতরাং বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, তথাকার নিয়ম অনুসারে চলিয়া, মনোযোগপূর্ব্ব‌ক লেখা পড়া শিখা তাঁহার অসাধ্য হইয়া উঠিয়াছিল। তাঁহার কর্ত্তৃপক্ষীয়েরা অনেক কষ্টে তাঁহাকে অতি সামান্য লেখা পড়া শিখাইয়াছিলেন। সে সময়ে সকলেই লাটিন শিখিত; তদনুসারে তাঁহাকেও লাটিন শিখাইবার জন্যে বিস্তর চেষ্টা হইয়াছিল। কিন্তু তিনি কোন মতেই শিখিলেন না। অনেক বয়স পর্য্যন্ত তিনি খেলা, তামাসা ও আমোদ অহ্লাদে কাটাইলেন, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখা, অথবা বিষয়কর্মে্ম‌র চেষ্টা দেখা, কিছুই করিলেন না।

হণ্টরের পিতা সঙ্গতিপন্ন লোক ছিলেন। ইংলণ্ড দেশের প্রথা এই, জ্যেষ্ঠ পুত্রই পৈতৃক বিষয়ের অধিকারী হয়। তদনুসারে সর্ব্বজ্যেষ্ঠ সমস্ত পিতৃধন অধিকার করিলেন। হণ্টর বাপের আদরের ছেলে ছিলেন বটে, কিন্তু তিনি মৃত্যুকালে তাহার জন্যে কোন বন্দোবস্ত করিয়া যান নাই। সুতরাং, কোন বিষয়কর্ম্ম না করিলে, তাঁহার চলা ভার। দুর্ভাগ্যক্রমে, তিনি ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখেন নাই; সুতরাং যে সকল বিষয়কর্ম্মে লেখা পড়া জানা আবশ্যক, তাঁহার সেরূপ বিষয়কর্ম্ম করিবার ক্ষমতা ছিল না। তাঁহার এক ভগিনীপতি কাঠরার কর্ম্ম করিতেন; তাঁহার নিকট নিযুক্ত হইয়া, তিনি মেজ ও কেদারা গড়া শিখিতে লাগিলেন। নানা প্রকারে দায়গ্রস্ত হওয়াতে, তাঁহার ভগিনী পতির ব্যবসায় বন্ধ হইয়া গেল; সুতরাং হণ্ট‌রেরও কর্ম্ম গেল। তিনি নিজে এরূপ কর্ম্ম চালান, তাঁহার এমন উপায় ছিল না; সুতরাং অতঃপর কি করিবেন, কিছুই স্থির করিতে পারিলেন না।

এই সময়ের কিছু পূর্ব্ব‌ে‌ই, তাহার এক অগ্রজ লণ্ডন রাজধানীতে চিকিৎসাব্যবসায় আরম্ভ করিয়াছিলেন। ইনি শারীরস্থান বিদ্যা বিষয়ে উপদেশ দিতেন। শরীরের কোন্‌ স্থানে কিরূপ আছে, শব কাটিয়া ছাত্রদিগকে দেখাইয়া দিতে হইত। উপদেষ্টা স্বয়ং সেই সমস্ত নির্বাহ করিতে পারেন না, এজন্য তাঁহার সহকারী থাকিত। হণ্ট‌র, অনেক ভাবিয়া চিন্তিয়া, অবশেষে আপন অগ্রজের নিকট পত্র দ্বারা এই প্রার্থনা করিয়া পাঠাইলেন, আপনি আমাকে আপন সহকারী নিযুক্ত করুন; যদি না করেন, আমি সৈনিক দলে প্রবিষ্ট হইব। তাঁহার ভ্রাতা সম্মত হইলেন এবং তাঁহাকে লণ্ডনে আসিতে লিখিয়া পাঠাইলেন। হণ্ট‌র, অগ্রজের পত্র পাইয়া, অতিশয় আহ্লাদিত হইলেন, এবং অবিলম্বে লণ্ড‌নে আসিয়া কর্ম্মে নিযুক্ত হইলেন। প্রথম দিনেই, তিনি আপন কর্ম্মে এমন নৈপুণ্য দেখাইলেন যে, তাছার ভ্রাতা অত্যন্ত সন্তুষ্ট হইয়া কছিলেন, কালক্রমে তুমি এ বিষয়ে অদ্বিতীয় লোক হইবে, তখন তোমার চাকরীর আর কোন ভাবনা থাকিবেক না। হণ্ট‌র, কিছু দিন পরেই, শারীরস্থানবিদ্যা অধ্যয়ন করিতে আরম্ভ করিয়া, অতি ত্বরায় এমন ব্যুৎপন্ন হইয়া উঠিলেন যে, লণ্ড‌নে আসার পর এক বৎসর না যাইতেই, উক্ত বিদ্যায় শিক্ষা দিবার উপযুক্ত হইয়া উঠিলেন, এবং কতকগুলি ছাত্রকে শিক্ষা দিতে আরম্ভ করিলেন।

অনন্তর তিনি, অল্প‌ দিনের মধ্যেই, চিকিৎসাবিদ্যায় বুৎপন্ন হইয়া, চিকিৎসাব্যবসায় আরম্ভ করিলেন। তদ্ব্যতিরিক্ত, তাঁহাকে শিষ্যদিগকে শিক্ষাদানপ্রভৃতি অনেক কর্ম্ম করিতে হইত। এই সমস্ত কর্ম্ম করিয়া অবসর পাইলেই, তিনি বিদ্যার অনুশীলন করিতেন। তৎকালে যে সকল ব্যক্তি শারীরস্থানবিদ্যায় বিশারদ ছিলেন, তিনি তাঁহাদের সকলের প্রধান বলিয়া গণ্য হইয়াছিলেন। তাঁহার দ্বারা অস্ত্রচিকিৎসা ও শারীরস্থানবিদ্যার যেরূপ উন্নতি হইয়াছিল, আর কাহার দ্বারা সেরূপ হয় নাই। বস্তুতঃ, এই সকল বিদ্যার উন্নতির নিমিত্ত, তিনি বিস্তুর যত্ন, বিস্তর পরিশ্রম ও বিস্তর অর্থব্যয় করিয়াছিলেন। তিনি নানা কর্ম্মে ব্যাপৃত ছিলেন, সুতরাং দিবাভাগে অবসর পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। অধিক অবসর লাভের নিমিত্ত, তিনি নিদ্রার সময় সঙ্কোচ করিয়াছিলেন। রাত্রিতে সমুদয়ে চারি ঘণ্টা, ও দিবসে আহারের পর এক ঘণ্টা, এইমাত্র নিদ্রা যাইতেন।

দেখ! হণ্টর কেমন আশ্চর্য্য লোক। বাল্যকালে পিতা মাতার আদরের ছেলে ছিলেন, অত্যন্ত আদর পাইয়া এক বারে নষ্ট হইয়া গিয়াছিলেন, কিছুই লেখা পড়া শিখেন নাই। লেখা পড়া জানিতেন না, এজন্য, উদরের অন্নের নিমিত্ত, অবশেষে ছুতরের কর্ম্ম আরম্ভ করিয়াছিলেন। যদি তাঁহার ভগিনীপতির কর্ম্ম‌, বন্ধ হইয়া না গিয়া, উত্তরোত্তর উত্তম রূপে চলিত, তাহা হইলে তিনি ঐ ব্যবসায়ে পরিপক্ক হইয়াই জন্ম কাটাইতেন। তাঁহার ভগিনীপতির কর্ম্ম বন্ধ হইয়া যাওয়াতে, তিনি নিঃসন্দেহ, অনুপায় ভাবিয়া, আপনাকে হতভাগ্য বোধ করিয়াছিলেন। কিন্তু তাঁহার ভগিনীপতির কর্ম্ম বন্ধ হওয়া তাঁহার ও জগতের সৌভাগ্যের হেতু হইয়াছিল। তাঁহার কর্ম্ম বন্ধ হইল, আর কোন উপায় নাই, এই ভাবিয়া, হণ্টর আপন ভ্রাতার নিকট প্রার্থনা করেন। ঐ সময়ে তাঁহার বয়স কুড়ি বৎসর। কুড়ি বৎসর বয়সে লেখা পড়া আরম্ভ করিয়া, তিনি জগদ্বিখ্যাত ও চিরস্মরণীয় হইয়া গিয়াছেন।

হীন

হীন

ইয়ুরোপের অন্তর্বর্ত্তী সাক্সনিপ্রদেশে শেমনিজ নামে এক নগর আছে। ঐ নগরে হীনের জন্ম হয়। হীনের পিতা অতি দুঃখী ছিলেন; তন্তুবায়ের ব্যবসায় অবলম্বন করিয়া, অতি কষ্টে বহু পরিবারের ভরণপোষণ নির্বাহ করিতেন।
পুত্রকে লেখা পড়া শিখান, তাঁহার এমন সঙ্গতি ছিল না। শেমনিজ নগরের নিকট একটি সামান্য বিদ্যালয় ছিল, হীনের পিতা তাঁহাকে সেই বিদ্যালয়ে পাঠাইয়া দিলেন। হীন কিছু দিন তথায় থাকিয়া, সেখানে যত দূর হইতে পারে, লেখা পড়া শিখিলেন।

অনন্তর, তাঁহার লাটিন পড়িতে অত্যন্ত ইচ্ছা হইল। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষকের পুত্র লাটিন জানিতেন। তিনি হীনকে কছিলেন, যদি তুমি আমায় কিছু কিছু দিতে পার, আমি তোমায় লাটিন শিখাই। হীনের পিতার এমন সঙ্গতি ছিল না যে, তিনি পুত্রের লেখা পড়ার নিমিত্ত মাসে মাসে কিছু কিছু দিতে পারেন। সুতরাং হীনের লাটিন শিখার সুযোগ হইল না। তিনি যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইলেন।

এই সময়ে, এক দিন, তাঁহার পিতা তাঁহাকে, কোন প্রয়োজনে, এক আত্মীয়ের নিকট পাঠাইয়া দেন। লাটিন শিখিবার সুযোগ হইল না বলিয়া, হীন সর্বদাই দুঃখিত মনে ও ম্লান বদনে থাকেন। ঐ আত্মীয় ব্যক্তি হীনকে অতিশয় ভাল বাসিতেন। তিনি হীনের মুখ ম্লান দেখিয়া কারণ জিজ্ঞাসা করিলেন, এবং তাঁহার মুখে সমুদয় শুনিয়া কহিলেন, তুমি লাটিন পড়িতে আরম্ভ কর; মাসে মাসে শিক্ষককে যাহা দিতে হইবেক, তাহা আমি দিব। এই কথা শুনিয়া, হীনের আর আহ্লাদের সীমা রহিল না।

এই রূপে, ঐ আত্মীয় ব্যক্তির সাহায্য পাইয়া, হীন দুই বৎসর লাটিন শিক্ষা করিলেন। পরে তাহার শিক্ষক কহিলেন, আমি যত দূর জানিতাম, তোমায় শিখাইয়াছি; আমার আর অধিক বিদ্যা নাই; আমি তোমায় অতঃপর শিখাইতে পারিব না। সুতরাং আপাততঃ হীনের লাটিনপাঠ রহিত হইল।

এই সময়ে, হীনের পিতা তাঁহাকে কোন বিষয়কর্ম্মে প্রবৃত্ত করিবার নিমিত্ত অত্যন্ত ব্যগ্র হইলেন। কিন্তু হীনের নিতান্ত মানস, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখেন। তাঁহার পিতার যেরূপ দুঃখের অবস্থা, তাহাতে তিনি পুত্রের লেখা পড়ার ব্যয় নির্বাহ করিতে পারেন না। ভাগ্যক্রমে তাঁহাদের আর এক আত্মীয় ছিলেন। তিনি, লেখা পড়ায় হীনের কেমন যত্ন ও হীন কেমন শিখিতে পারেন ও কত দূর শিখিয়াছেন, হীনের শিক্ষকের নিকট এই সমুদয় অবগত হইয়া, অতিশয় সন্তুষ্ট হইলেন; এবং সেই নগরে যে প্রধান বিদ্যালয় ছিল, হীনকে তথায় প্রবিষ্ট করিয়া দিলেন; কহিলেন, হীনের লেখা পড়া শিখিবার যে ব্যয় হইবেক, সে সমুদয় আমি দিব।

হীন, এই রূপে প্রধান বিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, লেখা পড়া শিখিতে লাগিলেন। কিন্তু অত্যন্ত অসুবিধা ঘটিতে লাগিল। তাঁহাদের আত্মীয়, সমুদয় ব্যয় দিবার অঙ্গীকার করিয়াও, কৃপণ স্বভাব বশতঃ দিবার সময়ে বিস্তর গোলযোগ করিতেন। হীন পড়িবার পুস্তক পাইতেন না; সহাধ্যায়ীদিগের নিকট হইতে পুস্তক চাহিয়া লইয়া, স্বহস্তে লিখিয়া লইতেন, এবং ঐ লিখিত পুস্তক দেখিয়া পাঠ করিতেন। এই রূপে, অতি কষ্টে, ঐ স্থানে থাকিয়া, তিনি কিছু দিন লেখা পড়া করিলেন। পরিশেষে, ঐ নগরের এক সম্পন্ন ব্যক্তি তাঁহাকে আপন পুত্রের শিক্ষক নিযুক্ত করিলেন। তখন, হীনের কিছু কিছু আয় হইতে লাগিল। তদ্দ্বারা তাঁহার লেখা পড়ার ব্যয়ের বিস্তর আনুকূল্য হইয়াছিল।

এই রূপে এই বিদ্যালয়ে কিছু দিন থাকিয়া, হীন দেখিলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইতে না পারিলে, মনের মত লেখা পড়া শিখা হইবেক না। অতএব, তিনি স্থির করিলেন, লিপ্সিক নগরে গিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইব। আর, তাঁহাদের পূর্বোক্ত আত্মীয়ও স্বীকার করিলেন, আমিও কিছু কিছু আনুকুল্য করিব। তিনি, এই প্রতিশ্রুত আনুকূল্যের উপর নির্ভর করিয়া, দুইটিমাত্র টাকা সম্বল লইয়া, লিপ্সিক নগরে গমন করিলেন, এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবিষ্ট হইয়া, লেখা পড়া করিতে লাগিলেন।

কিন্তু, তাঁহার আত্মীয়, স্বীকার করিয়াও, যথাসময়ে না পাঠাইয়া, অনেক বিলম্ব ও বিস্তর বিরক্তি প্রকাশ করিয়া, খরচ পাঠাইতেন এবং খরচের সঙ্গে, হীনকে অলস ও অমনোযোগী বলিয়া ভৎর্সনা করিয়া পাঠাইতেন। তাহাতে হীনের অত্যন্ত কষ্ট ও মনে অত্যন্ত অসুখ হইত। তিনি যে বাটীতে বাসা করিয়াছিলেন, ঐ বাটীর এক দাসী, দয়া করিয়া, তাঁহার বিস্তর আনুকূল্য করিত। এই দাসীর আনুকূল্য না পাইলে, তাঁহাকে অত্যন্ত ক্লেশ পাইতে হইত। বোধ হয়, পুস্তকের অভাবে পাঠ বন্ধ হইত, এবং অনেক দিন অনাহারে থাকিতে হইত।

এইরূপ কষ্টে পড়িয়াও, তিনি, ক্ষণ কালের নিমিত্ত, লেখা পড়ায় আলস্য বা ঔদাস্য করেন নাই। এত দুঃখে পড়িয়াও, যে তাঁহার উৎসাহভঙ্গ হয় নাই, তাহার কারণ এই যে, তিনি ভাবিয়াছিলেন, আমি যথেষ্ট কষ্ট পাইতেছি বটে; কিন্তু লেখা পড়া ছাড়িয়া দিলে, আমার কষ্ট দূর হইবেক না; লাভের মধ্যে জন্মের মত মূর্খ হইব; মূর্খ হইলে চির কাল দুঃখ পাইব; চির কাল সকল লোকে মূর্খ বলিয়া ঘৃণা করিবেক। অতএব, যত কষ্ট হউক না কেন, ভাল করিয়া লেখা পড়া শিখিব। তিনি যত কষ্ট পাইতেন, লেখা পড়ায় তত অধিক যত্ন করিতেন। যত্নের কথা কি বলিব, দুই মাস কাল সপ্তাহে দুই রাত্রি মাত্র নিদ্রা যাইতেন, আর পাঁচ দিবস সমস্ত রাত্রি অধ্যয়ন করিতেন।

ক্রমে ক্রমে, তাঁহার কষ্ট এত অধিক হইয়া উঠিল যে, আর সহ্য হয় না। এই সময়ে কোন সম্পন্ন ব্যক্তির বাটীতে এক শিক্ষকের প্রয়োজন হইল। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক, হীনের দুঃখ দেখিয়া দয়া করিয়া, তাঁহাকে ঐ কর্ম্ম দিতে চাহিলেন। ঐ কর্ম্ম স্বীকার করিলে, হীনের এক কালে সকল কষ্ট দূর হইত। কিন্তু, ঐ সম্পন্ন ব্যক্তির বাটী বিশ্ববিদ্যালয় হইতে অনেক দূর। তাঁহার বাটীতে কর্ম্ম করিতে গেলে, বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়িয়া যাইতে হয়; তাহা হইলে তাঁহার পড়া শুনার সকল সুবিধা যায়। এজন্য তিনি ঐ কর্ম্ম অস্বীকার করিলেন। তিনি মনে মনে স্থির করিয়া রাখিয়াছিলেন, যত কষ্ট পাই না কেন, লিপ্সিক পরিত্যাগ করিয়া যাইব না।

কিছু দিন পরে, ঐ অধ্যাপক লিপ্সিক নগরেই এরূপ আর এক কর্ম্ম উপস্থিত করিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকিয়া পড়া শুনা চলিবেক, অথচ কষ্ট দূর হইবেক, এই বিবেচনায় তিনি ঐ কর্ম্ম স্বীকার করিলেন। এই কর্ম্ম স্বীকার করাতে, আপাততঃ তাঁহার অনেক কষ্ট দূর হইল। কিন্তু ছাত্রদিগকে শিক্ষা দেওয়াতে, এবং স্বয়ং অহোরাত্র অধ্যয়ন করাতে, অতি উৎকট পরিশ্রম হইতে লাগিল। এই কারণে, তাঁহার এমন উৎকট পীড়া জন্মিল যে, ঐ কর্ম্ম পরিত্যাগ করিতে হইল। এ কর্ম্ম করিয়া, যৎকিঞ্চিৎ যাহা তাঁহার হস্তে হইয়াছিল, রোগের সময় সমুদয় নিঃশেষ হইয়া গেল। যখন সুস্থ হইয়া উঠিলেন, তখন তাঁহার এক কপর্দকও সম্বল ছিল না। সুতরাং পুনর্বার তিনি পূর্বের মত কষ্টে পড়িলেন এবং ঋণগ্রস্তও হইলেন।

ইতিপূর্ব্বে, তিনি লাটিনভাষায় কতকগুলি শ্লোক রচনা করিয়াছিলেন। ঐ শ্লোক দেখিয়া, ড্রেসডেনের রাজমন্ত্রীরা প্রশংসা করাতে, তাঁহার আত্মীয়েরা এই বলিয়া তথায় যাইতে পরামর্শ দিলেন যে, সেখানে গেলে, রাজমন্ত্রীরা সহায়তা করিয়া, তোমার যথেষ্ট উপকার করিতে পারেন। তদনুসারে, তিনি, ঋণ করিয়া পথখরচ লইয়া, ড্রেসডেনে গমন করিলেন। কিন্তু যে আশায় ঋণগ্রস্ত হইলেন এবং কষ্ট করিয়া ড্রেসডেনে গেলেন, তাহা সফল হইল না। রাজমন্ত্রীরা প্রথমতঃ তাঁহাকে আশ্বাস দিয়াছিলেন, কিন্তু সে আশ্বাস পরিশেষে কথামাত্র হইল।

অবশেষে, তিনি, নিতান্ত নিরুপায় হইয়া, তত্রত্য কোন সভ্রান্ত ব্যক্তির পুস্তকালয়ে লেখকের কর্ম্মে নিযুক্ত হইলেন। এই কর্ম্ম করিয়া যাহা পাইতেন, তাহাতে তাঁহার আহারের ক্লেশও ঘুচিত না। কিন্তু তিনি পরিশ্রমে কাতর ছিলেন না, পুস্তকের অনুবাদ প্রভৃতি অন্যান্য কর্ম্ম করিতে আরম্ভ করিলেন। এই সকল করিয়া, তাহার কিছু কিছু লাভ হইতে লাগিল; তিনি ঐ লাভ দ্বারা পূর্ব্ব ঋণ পরিশোধ করিলেন। পুস্তকালয়ে দুই বৎসর কর্ম্ম করিলে পর, তাঁহার বেতন দ্বিগুণ হইল। কিন্তু ঐ প্রদেশে, রাজায় রাজায় যুদ্ধ ঘটাতে, নানা উপদ্রব উপস্থিত হইল। এজন্য তাঁহাকে, কর্ম্ম পরিত্যাগ করিয়া, পলায়ন করিতে হইল।

যুদ্ধ উপস্থিত হওয়াতে, ড্রেসডেনে যে সকল উপদ্রব ঘটিয়াছিল, যুদ্ধশেষ হইলে ঐ সকল উপদ্রবের নিবারণ হইল। তখন তিনি ড্রেসডেনে প্রতিগমন করিলেন। তাঁহার পঁহুছিবার কিছু পূর্ব্বে, গটিঞ্জনের বিশ্ববিদ্যালয়ে এক অধ্যাপকের পদ শূন্য হয়। তৎকালে রঙ্কিন নামে এক অতি প্রধান পণ্ডিত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষীয়েরা প্রথমতঃ তাঁহাকে মনোনীত করেন। কিন্তু তিনি অস্বীকার করিয়া লিখিয়া পাঠান, হীন নামে এক ব্যক্তি আছেন, তিনি এই কর্মের সম্পূর্ণ যোগ্য পাত্র; আমার মতে ঐ ব্যক্তি সর্ব্বাপেক্ষা অধিক উপযুক্ত। রঙ্কিনের সহিত হীনের আলাপ ছিল না। কিন্তু তিনি তাঁহার বিদ্যা বুদ্ধির বিষয় সবিশেষ অবগত ছিলেন; এই নিমিত্ত, স্বেচ্ছাপ্রবৃত্ত হইয়া, ঐ কথা লিখিয়া পাঠান।

রঙ্কিন এইরূপ লিখিয়া পাঠাইবামাত্র, বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষীয়েরা হীনকে ঐ প্রধান পদে নিযুক্ত করিলেন। তিনি এত দিন, নানা কষ্ট ভোগ ও উৎকট পরিশ্রম করিয়া, যে বিদ্যা উপার্জ্জন করিয়াছিলেন, এক্ষণে তাহার ফললাভ হইল। তিনি যেমন পণ্ডিত, তেমনই সৎস্বভাব ছিলেন। তাঁহার ছাত্রেরা, ও যাবতীয় নগরবাসী লোকেরা, তাঁহাকে স্ব স্ব পিতার ন্যায় স্নেহ ও ভক্তি করিতেন। তিনি পঞ্চাশ বৎসর, অতিশয় সম্মানপূর্বক, বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপকের কর্ম্ম করেন। তাঁহার মৃত্যু হইলে, সকল লোকই অত্যন্ত দুঃখিত হইয়াছিলেন।

দেখ! হীন অতি দুঃখীর সন্তান। তাঁহার পিতা, তন্তুবায়ের ব্যবসায় করিয়া, কষ্টে জীবিকানির্বাহ করিতেন। কিন্তু হীন, যত্ন ও পরিশ্রম করিয়া লেখা পড়া শিখিয়াছিলেন বলিয়া, বিনা চেষ্টায় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হইলেন। যদি তিনি ও পরিশ্রম করিয়া লেখা পড়া না শিখিতেন, তাহা হইলে কেহ তাঁহার নামও জানিত না। কিন্তু তিনি, যার পর নাই কষ্টে পড়িয়াও, যে বিদ্যা উপার্জ্জন করিয়াছিলেন, কেবল সেই বিদ্যার বলে চিরস্মরণীয় হইয়াছেন। যত দিন পৃথিবীতে লেখা পড়ার চর্চ্চা থাকিবেক, তত দিন তাঁহার নাম দেদীপ্যমান থাকিবেক।