একেই কি বলে সভ্যতা?
মাইকেল মধুসূদন দত্ত
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৬২
একেই কি বলে সভ্যতা?
(প্রহসন)।
শ্রীমাইকেল মধুসূদন দত্ত
প্রণীত।
দ্বিতীয়বার মুদ্রিত।
কলিকতা।
শ্রীযুত ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং বহুবাজারস্থ ১৮২ সংখ্যক ভবনে
ষ্ট্যানহোপ যন্ত্রে যন্ত্রিত।
সন ১২৬৯ সাল।
নাট্যোল্লিখিত ব্যক্তিগণ।
কর্ত্তা মহাশয়
নব বাবু
কালী বাবু
বাবাজী
বৈদ্যনাথ
গৃহিণী
প্রসন্নময়ী
হরকামিনী
নৃত্যকালী
কমলা
পয়োধারী
নিতম্বিনী
খেম্টাওয়ালী
বাবুদল, সারজন, চৌকিদার, যন্ত্রীগণ, খানসামা, বেহারা, দরওয়ান, মালী, বরফওয়ালা, মুটিয়াদ্বয়, মাতাল, বারবিলাসিনীদ্বয় ইত্যাদি।
দ্বিতীয় অঙ্ক · দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক
দ্বিতীয় গর্তাঙ্ক।
নবকুমার বাবুর শয়ন মন্দির।
প্রসন্নময়ী, নৃত্যকালী, কমলা, এবং হরকামিনী, আসীন।
প্রসন্ন। এই নেও—
নৃত্য। কি খেল্লে ভাই?
প্রসন্ন। চিড়িতনের দহলা।
নৃত্য। আরে মলো, চিড়িতন যে রঙ, ত্রুপ খেল্লি কেন?
প্রসন্ন। তুই, ভাই, মিছে বকিস্ কেন? হাতে রঙ না থাকে পাব সে মা।
নৃত্য। এই এলো, আমি টেক্কা মারলেম।
হর। এই নেও।
নৃত্য ও কিও, পাষ দিলে যে?
হর। হাতে ত্রুপ না থাকলে পাষ দেবো না তো কি করবো।
নৃত্য। এস কমল, এবার ভাই তোমার খেলা।
কমল। আমি ভাই বিবি দিলাম।
নৃত্য। মর, ও যে আমাদের পিট, তুই বিবি দিলি কেন?
কমল। বাঃ বিবি দেবে না তে কি? সায়েব কোথা?
নৃত্য। এই যে সাহেব আমার হাতে রয়েচে-।
কমল। আমি তো ভাই আর জান নই।
নৃত্য। মর ছুঁড়ি, খেলার ইসরায় বুঝিতে পারিস্ নে? তোর মোতন বোকা মেয়ে তে, আর দুটী নাই লা, তুই যদি তাস্ না খেলতে পারিস, তবে খেলতে অসিস্ কেন?
কমল। কেন, খেলতে পারবে না কেন?
নৃত্য। একে কি কেউ খেলা বলে? তুই আমার টেক্কার উপর বিবি দিলি।
কমল। কেন? বিবিটে ধরণ গেলে বুঝি ভাল হতো?
হর। আর ভাই, মিছে গোল করিস্ কেন?
নৃত্য। (কমলার প্রতি) কি আপোদ, যখন সায়েৰ আমার হাতে আছে তখন তোর আর ভয় কি?
কমল। বস্, তুই পাগল হলি না কি লো? তোর হাতে সাহেব তা আমি টের পাব কেমন করে লা?
নৃত্য। তুই ভাই যদি তাল খেলা কাকে বলে তা জানতিস্ তৰে অবিশ্যি টের পেতিস্।
কমল। ও প্রলয়, শুনলি তো ভাই, এমন কি কখন হয়? বিবি ধরা গেমে, বিবি পালাবার বাগ পেলে কি কেউ তা ছাড়ে?
নেপথ্যে। ও প্রসন্ন-
প্রসন্ন। চুপ্ কর্ লো, চুপ্ কর্, ঐ শোন্, মা ডাকচেন-
নেপথ্যে। ও বোউ-
প্রসন্ন (উচ্চস্বরে) কি, মা-
নেপথ্যে। ওলো, তোরা ওখানে কি করচিস্ লা।
প্রসন্ন। (উচ্চস্বরে) আমরা মা, দাদার বিছানা পাড়চি।
হর। ও ঠাকুরঝি, তাস ষোডাটা ভাই, নুকোও, ঠাকরুণ দেখতে পেলে আর রক্ষে থাকবে না।
প্রসন্ন। (তাস বালিশের নিচে গোপন করিয়া) আয় ভাই আমরা সকলে এই চাদর খানা ধরে ঝাড়তে থাকি, তা হলে মা কিছু টের পাবেন না।
নৃত্য। আরে মলো—আবার টেক্কা—
কমল। আরে তাতে বয়ে গেল কি? সায়েব কি বিবি ধরতে পারে না?
হর। তোদের পায়ে পড়ি ভাই চুপ কর্, ঐ দেখ ঠাকরুণ উপরে অসচেন। ধর্, সকলে মিলে এই চাদর খানা ধর।
(গৃহিণীর প্রবেশ)।
গৃহিণী। ওলো, তোরা এখানে কি করচিস লা।
প্রসন্ন। এই যে মা, আমরা দাদার বিছানা পাড়চ্যি।
গৃহিণী। ওমা, তোদের কি সন্ধ্য অবধি একটা বিছানা পাড়তে গেল? তা হবে না কেন? তোরা এখন সব কলিকালের মেয়ে কি না।
নৃত্য। কেন জেঠাইমা, আমার কলিকালের মেয়ে কেন?
গৃহিণী। আর তোরা দেখচি একবারে কাজের সদ্দার হয়ে পড়েচিস। ভাগ্যে অজ নব বাড়ী নেই, তা হলে তো সে এতক্ষন শুতে আসতো।
প্রসন্ন। হ্যাঁ মা, দাদা আজ কোথায় গেছেন গা?
গৃহিণী। ঐ যে রামমোহন রায়—না—কার কি সভা আছে—?
কমলা। ছোটদাদা কি তবে তাঁর জ্ঞানতরঙ্গিণী সভায় গেছেন?
হর। (জনান্তিকে প্রসম্নের প্রতি) তবেই হয়েচে! ও ঠাকুরঝি, আজ দেখচি্ তোর ভারি আহ্লাদের দিন। দেখ্, হয় তো তোর দাদা আজ আবার এসে তোকে নিয়ে সেই রকম রঙ্গ বাধায়।
গৃহিণী। বউ মা কি বলছে, প্রসন্ন?
নেপথ্যে। ও বেমোল, মা ঠাকরুণ কোথায় গো? কত্তা মশায় বৈটকখান থেকে উঠেছেন।
গৃহিণী। তবে আমি যাই, তোরা মা বিছান করে শীঘ্র নীচে আয়।
[প্রস্থান।
হর। (সহাস্য বদনে) ও ঠাকুরঝি? বল না রে সে দিন তোর ভাই কি করেছিল?
প্রসন্ন। আ., ছি।
নৃত্য। কেন, কেন, কি করেছিল? বলনা কেন, ভাই?
হর। (সহাস্য বদনে) বল না ঠাকুরঝি?
প্রসন্ন। না, ভাই, তুই যদি আমাকে এত বিরক্ত করিস্, তবে এই আমি চললেম।
নৃত্য। কেন? বল না কি হয়েছিল। ও ছোট বউ, তা তুই ভাই বল।
হর। তরে বলবো? সে দিন বাবু জ্ঞানতরঙ্গিণী সভা থেকে ফিরে এসে ঠাকরঝিকে দেখেই অমনি ধরে ওর গালে একটা চুমো খেলেন; ঠাকুরঝি তো ভাই পালাবার জন্যে ব্যস্ত, তা তিনি বললেন যে কেন? এতে দোষ কি? সায়েবরা যে বোনের গালে চুমো খায়, আর আমরা কল্লেই কি দোষ হয়?
প্রসন্ন। ছি, যাও মেনে, বউ।
নৃত্য। ও মা, ছি। ইংরিজী পড়লে কি লোক এত বেহায় হয় গা।
হর। আরও শোন্ না, আবার বাবু বলেন কি?—
প্রসন্ন। তোর দাদা মদ খেয়ে কি করে লো?
হর। কেন ভাই, সে জ্ঞানতরঙ্গিণী সভাতেও যায় না, অণর বনের গায়েও হাত দেয় না, আর যা করুক, সে যাহউক ঠাকুরঝি, তুই ভাই তোর দাদকে নে না কেন? আমি না হয় বাপের বাড়ী গিয়ে থাকি; তোর ভাতার তে তোকে একবার মনেও করে না। তা নে, তুই ভাই, তোর দাদাকে নে।
প্রসন্ন। হ্যাঁ, আর তুই গিয়ে তোর দাদাকে নে থাক্।
নেপথ্যে। ছেড়ে দেও হামকো।
নেপথ্যে। তোমাব পায়ে পড়ি, দাদাবাবু, এত চেচঁয়ে কথা কয়ো না, কত্তা মশায় ঐ ঘরে ভাত খাচ্চেন।
নেপথ্যে। ডেম কত্তা মশায়! আমি কি কারো তক্কা রাখি?
কমলা। ঐ যে ছোটদাদা আসচেন।
নৃত্য। আর, ভাই, আমরা লুকয়ে একটু তামাসা দেখি।
হর। (দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) না ভাই, আমার আর ওসব ভাল লাগে না। আঃ, সমস্ত রাতটা মুখ থেকে প্যাঁজ অপর মদের গন্ধ ভক্ ভক্ করো বেরোবে এখন, আর এমন নাক্ ডাকুনি-বোধ করি মরা মানুষও শুনলে জেগে উঠে! ছি!
কমলা। আয় লো আয়। (সকলের গুপ্তভাবে অবস্থিতি)।
(নব বাবুকে লইয়া বৈদ্যনাথের প্রবেশ)।
নব। (প্রমত্তভাবে) বোদে—মাই গুড ফেলো—তোকে আমি রিফরম্ কত্যে চাই। তুই বুঝলি?
বোদে। যে আজ্ঞে।
নব। বোদে—একটা বিয়ার—না, ঐ ব্রাণ্ডি ল্যাও।
বৈদ্য। যে অজ্ঞে, আপনি যেয়ে ঐ বিছানায় বসুন। আমি ব্রাণ্ডি এনে দিচ্ছি। (স্বগত) দাদাবাবু যদি শীঘ্র ঘুমিয়ে না পড়ে, তবেই দেখছি আজ একটা কাণ্ড হবে এখন। কত্তা এঁকে এমন দেখলে কি আর কিছু বাকী রাখবেন।
নব। (শষ্যোপরি উপবিষ্ট হইয়া) ল্যাও—ব্রাণ্ডি ল্যাও—জলদি।
বৈদ্য। আজ্ঞে, এই যাই।
[প্রস্থান।
নব। (স্বগত) ড্যাম কত্তা –ওলড ফুল আর কদ্দিন বাঁচবে? আমি প্রাণ থাকতে এ সভা কখনই এবলিশ কর্ত্তে পারবো না। বুড়ো একবার চখ্ বুজলে হয়, তা হলে অপর আমাকে কোন্ শালার সাধ্য যে কিছু বলতে পাবে? হা হা হা, ওণ্ট আই এঞ্জয় মিসেলফ্? (উচ্চস্বরে) ল্যাও—মদ্ ল্যাও।
হর। (কিঞ্চিৎ অগ্রসর হইয়া) কি সর্ব্বনাশ। ওলো ঠাকুরঝি—
প্রসন্ন। (ঐ) কি?
হর। ঐ দেখচিস্ কত্তা। ঠাকরুণের ঘরে ভাত খেতে বসেছেন।
প্রসন্ন। তা আমি কি করবো?
হর। তুই, ভাই, কাছে গিয়ে তোর দাদাকে চুপ করতে বল না।
প্রসন্ন। (সভয়ে) ওমা, তা তে ভাই আমি পারবে না।
হর। (সহাস্যে বদনে) আঃ, তার দোষ কি? তুই তে ভাই আর কচি মেয়েটী নোস, যে বেটাছেলের মুখ দেখলে ডরাবি? ষানালা।
নব। ল্যাও-মদ ল্যাও।
হর। ওমা? কি সর্ব্বনাশ। (অগ্রসর হইয়া) কর কি? কর্ত্তা বাড়ীয় ভেতরে ভাত খাচ্ছেন, তা জান?
নব। (সচকি) একি? পয়োধরী যে? আরে এসো, এসো। এ অভাজনকে কি ভাই তুমি এত ভাল বাস, ষে এরজন্যে ক্লেশ স্বীকার করে এত রাত্রে এই নিকুঞ্জ বনে এসেছ—হা, হা, হা, এসো, এসো। (গাত্রোত্থান)।
হর। ও ঠাকুবঝি, কি বকচে বুঝতে পারিস ভাই?
প্রসন্ন। (সহস্য বদনে) ও,ভাই, তোদের কথা, আমি আর ওর কি বুঝবো।
নব। (পরিক্রমণ করিতে করিতে) এসো ভাই, আমি তোমার ডেম্ড স্লেভ্। এসো-(ভূতলে পতন)।
হর, প্রসন্ন, ইত্যাদি। (অগ্রসর হইয়া) ওমা, একি হলো? (ক্রন্দন)।
নেপথ্যে। কেন, কেন, কি হয়েছে?
(গৃহিণীর পুনঃ প্রবেশ)।
গৃহিণী। (নবকুমারকে অবলোকন করিয়া) একি, একি? এ আমার সোণার চাঁদ যে মাটিতে গড়াচ্চে? ওমা, কি হলো? (ক্রন্দন করিতে করিতে) ওঠো বাবা, ওঠো। ওমা, আমার কি হলো! ওমা, আমার কি হলো! ও প্রসন্ন, তুই ওঁকে একবার শীঘ্র ডেকে আনত লা। (প্রসন্নের প্রস্থান) ওমা, ওমা, আমার কি হলো! (ক্রন্দন)।
নৃত্য। উঃ জেঠাই মা, দেখ্ দাদার মুখদিয়ে কেমন একটা বদগন্ধ বেরুচ্ছে।
গৃহিণী। উঁঃ, ছি! তাইতো লো। ওমা, একি সর্ব্বনাশ! আমার দুধের বাছাকে কি কেউ বিষ্ টিষ্ খাইয়ে দিয়েছে না কি? ওমা, আমার কি হবে! (ক্রন্দন)।
(প্রসন্নের সহিত কর্ত্তার প্রবেশ)।
কর্ত্তা। এ কি?
গৃহিণী। এই দেখ, আমার নব কেমন হয়ে পড়েছে। ওমা, আমার কি হবে!
কর্ত্তা। (অবলোকন করিয়া সরোষে) কি সর্ব্বনাশ, রাধেকৃষ্ণ! হা দুরাচার! হা নবাধম! হা কুলোঙ্গার।
গৃহিণী। (সরোষে) একি? বুড়ো হলে লোক পাগল হয় না কি? যাও, তুমি আমার সোনার নবকে অমন কব্যে বকচো কেন?
কর্ত্তা। (সরোষে) ষোনাব নব! হ্যা। ওকে যখন প্রসব করেছিলে, তখন নুন্ খাইয়ে মেরে ফেলতে পার নি?
নব। হিয়র, হিয়র, হুরে।
গৃহিণী। ওমা আমার কি হলে। এমন এলো মেলো বকচে কেম? ওমা, ছেলেটিকে তো ভূতে টূতে পায়নি?
কর্ত্তা। তোমার কি কিছুমাত্র জ্ঞান নাই? তুমি কি দেখতে পাচ্চ না যে ও লক্ষীছাড়া মাতাল হয়েছে।
{gap}}নব। হিয়র, হিয়র।
কর্ত্তা। (সরোষে) চুপ্, বেহায়া, তোর কি কিছুমাত লজ্জা নাই?
নব। ড্যাম লজ্জা, মদ্ ল্যাও।
কর্ত্তা। শুললে তো?
গৃহিণী। আমার এ দুধের বাছাকে এসব্ কে শেখালে গা?
কর্ত্তা। আর শেখাবে কে? এ কলকাতা মহালাপ নগর-কর্জি রাজধানী, এখানে কি কোন ভদ্র লোকের বসতি করা উচিত?
গৃহিণী। ওমা, তাইতো, এত কে জানে, না?
কর্ত্তা। কাল প্রাতেই আমি তোমাদের সকলকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীবৃন্দাবনে যাত্রা করবো। এ লক্ষীছাড়াকে আর এখানে রেখে কাজ নেই। চল, এখন আমরা যাই। এ বানরটা একটু ঘুমুক-
নব। হিয়র, হিয়র, আই সেকেণ্ড দি বেজোলুসন।
কর্ত্তা। হায় আমার বংশেও এমন কুলাঙ্গার জন্মেছিল?
গৃহিণী। ও প্রসন্ন, ও কমলা, ওলো তোরা মা এখানে একটু থকে আয়
[কর্ত্তা এবং গৃহিণীর প্রস্থান।
হর। (অগ্রসর হইয়া) ও ঠাকুরঝি, এই ভাই তোর দাদার দশা দেখ্। হায়, এই কলকেতায় যে অজ্ কাল কত অভাগা স্ত্রী আমার মতন এইরূপ যন্ত্রনা ভোগ করে তার সীমা নাই। হে বিধাতা! তুমি আমাদের উপর এত বাম হলে কেন?
প্রসন্ন। তা এ অজ আর নতুন দেখিলি না কি? জ্ঞান তরঙ্গিণী সভাতে এই রকম জ্ঞানই হয়ে থাকে।
হর। তা বই আর কি ভাই? আজ কাল কলকেতায় যাঁরা লেখা পড়া শেখেন, তাদের মধ্যে অনেকেরই কেবল এই জ্ঞানটী ভাল জন্মে। তা ভাই দেখ্ দেখি, এমন স্বামী থাকলিই বাকি আর না থাকলিই বা কি। ঠাকুরঝি তোকে বলতে কি ভাই, এই সব দেখে শুনে আমার ইচ্ছে করে যে গলায় দড়ি দে মরি। (দীর্ঘ-নিশ্বাস) ছি, ছি, ছি। (চিন্তা করিয়া) বেহায়ারা আবার বলে কি যে আমরা সায়েবদের মতো সভ্য হয়েচি। হা আমার পোড়া কপাল! মদ্ খাস করেই কি সভ্য হয়?—একেই কি বলে সভ্যতা?
ববদিকা পতন
প্রথম অঙ্ক · দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক
দ্বিতীয় গর্ভাঙ্ক।
সিক্দার পাড়া ষ্ট্রীট।
(বাবাজীর প্রবেশ।)
বাবাজী। (স্বগত) এই তো সিক্দার পাড়ার গলি, তা কই? নব বাবুর সভাভবন কই? রাধেকৃষ্ণ। (পরিক্রমণ)। তা, দেখি, এই বাড়ীটাই বুঝি হবে। (দ্বারে আঘাত)
নেপথ্যে। তুমি কে গা? কাকে খুঁজ্চো গা?”
বাবাজী! ওগো, এই কি জ্ঞানতরঙ্গিণীসভার বাড়ী?
নেপথ্যে। ও পুঁটী দেক্তো লা, কোন্ বেটা মাতাল এসে বুঝি দরজায় ঘা মাচ্চে? ওর মাথায় খানিক জল ঢেলে দে তো।
বাবাজী। (স্বগত) প্রভো, তোমারি ইচ্ছে। হায়, এত দিনের পর কি মাতাল হলেম্!
নেপথ্যে। তুই বেটা কে রে? পালা, নইলে এখনি চৌকীদার ডেকে দেবো।
বাবাজী। (বেগে পরিক্রমণ করিয়া সরোষে) কি আপদ। রাধেকৃষ্ণ! কর্ত্ত মহাশয়ের কি আর লোক ছিল না, যে তিনি আমাকেই এ কর্ম্মে পাঠালেন? (পরিক্রমণ)। এই দেখ্চি একজন ভদ্রলোক এ দিকে আস্চে, তা একেই কেন জিজ্ঞাসা করিনে।
(একজন মাতালের প্রবেশ।)
মাতাল। (বাবাজীকে অবলোকন করিয়া) ওগো, এখানে কোথা যাত্রা হচ্চে গা?
বাবাজী। তা বাবু, আমি কেমন করে বল্বো?
মাতাল। সে কি গো? তুমি না সং সেজেচ?
বাবাজী। রাধেকৃষ্ণ!
মাতাল। তবে, শালা, তুই এখানে কচ্চিস্ কি? হাঃ শালা।
[প্রস্থান।
বাবাজী। কি সর্ব্বনাশ! বেটা কি পাষণ্ড গা? রাধেকৃষ্ণ! এ গলিতে কি কোন ভদ্রলোক বসতি করে গা?—এ আবার কি? (অবলোকন করিয়া) আহাহা, স্ত্রীলোক দুটি যে দেখ্তে নিতান্ত কদাকার তা নয়। এঁরা কে?—হরেকৃষ্ণ, হরেকৃষ্ণ। (একদৃষ্টে অবলোকন)।
(দুইজন বারবিলাসিনীর পশ্চাতে দৃষ্টি করিতে করিতে প্রবেশ।)
প্রথম। ওলো বামা, গুরো পোড়ারমুখের আক্কেল দেখ্লি? আমাদের সঙ্গে যাচ্চি বলে আবার কোথায় গেল?
দ্বিতীয়। তবে বুঝি আস্ত্যে আস্ত্যে পদার বাড়ীতে ঢুকেচে। ভোর যেমন পোড়া কপাল, তাই ও হতোভাগাকে রেখেচিস। আমি হলে এতদিনে কুলোর বাতাস দিয়ে বিদায় কর্ত্তুম।
প্রথম। দাঁড়া না, বাড়ী যাই আগে। আজ মুড়ো খেঙ্গরা দে বিষ ঝাড়্বো। আমি তেমন বান্দা নই, বাবা। এই বয়েসে কত শত বেটার নাকের জলে, চক্ষের জলে করে ছেড়েচি। চল্না, আগে মদনমোহন দেখে আসি; এসে ওর শ্রাদ্ধ করবো এখন।
দ্বিতীয়। তুই যদি তাই পারবি তা হলে আর ভাবনা কি—ও থাকি, ঐ মোল্লার মতন কাচা খোলা কে একটা দড়িয়ে রয়েছে, দেখ্?
প্রথম। হ্যাঁ তো, হ্যাঁ তো। এই ষে আমাদের দিকে আসচে। ওলো বামা, ওটা মোল্লা নয় ভাই, রসের বৈরিগী ঠাকুর। ঐ খে কুঁড়োজালি হাতে আছে। (হাস্য করিয়া) আহাহা, মিনষের রকম দেখ্ না—যেন তুলসীবনের বাঘ।
বাবাজী। (নিকটে আসিয়া) ওগো, তোমরা বলতে পার, এখানে জ্ঞানতরঙ্গিনী সভা কোথা?
দ্বিতীয়। তরঙ্গিণী আবার কে? (থাকি ধারণ করা হাস্য)। বাবাজী, তরঙ্গিণী তোমার বষ্টুমীর নাম বুঝি?
প্রথম। আহা, বাবাজী, তোমার কি বষ্ট্মী হারয়েচে? তা পথে পথে কেঁদে বেড়ালে কি হবে? যা হবার তা হয়েচে, কি করবে ভাই? এখন আমাদের সঙ্গে আসবে তো বল?—কেমন বামা, ভেক নিতে পারবি?
দ্বিতীয়। কেন পারব না? পাঁচসিকে পেলিই পারি। কি বল, বাবাজী।
প্রথম। বাবাজী আর বলবেন কি? চল্ আমরা বাবাজীকে হরিবোল দিয়ে নিয়ে যাই। বল হরি, হরিবোল।
বাবাজী। (স্বগত) কি বিপদ্! রাধেকৃষ্ণ। (প্রকাশে) না বাছা, তোমরা যাও, আমার ঘাট্ হয়েছে।
দ্বিতীয়। হ্যেঁ, আমরা যাব বই কি? তোমার তো সেই তরঙ্গিণী বই আর মন উঠবে না? তা, আমরা যাই, আর তুমি এইখানে দাঁড়্য়ে দাঁড়য়ে কাঁদ। (বাবাজীর মুখের নিকট হস্ত নাড়িয়া) “সাধের বষ্টুমী প্রাণ হারয়েছে আমার”।
[দুইজন বারবিলাসিনীর প্রস্থান।
বাবাজী। আঃ, কি উৎপাৎ! এত যন্ত্রণাও জাজ কপালে ছিল!—কোথাই বা সভা আর কোথাই বা কি? লাভের মধ্যে কেবল আমারি যন্ত্রণ সার। (পরিক্রমণ করিয়া) যদি আবার ফিরে যাই তা হলে কর্ত্তাটী রাগ করবেন আমি যে ঘোর দায়ে পড়লেম্! এখন করি কি? (চিন্তাভাবে অবস্থিতি, পরে সম্মুখে অবলোকর করিয়া) হ্যেঁ, ভাল হয়েচে, এই একটা মুস্কিলআসান আস্চে, ওর পিছনের আলোয় আলোয় এই বেলা প্রস্থান করি—না— ওমা, এজে সারজন সাহেব, রোঁদ ফিরতে বেরয়েচে দেখচি, এখানে চুপ করে দাঁড়য়ে থাকলে কি জানি যদি চোর বল্যে ধরে? কিন্তু এখন যাই কোথা? (চিন্তা) তাই ভাল, এই আড়ালে দাঁড়াই—ওমা, এই যে এসে পড়লো। (বেগে পলায়ন)।
(সারজন ও চৌকীদারের আলোক লইয়া প্রবেশ।)
সার। হাল্লো! চওকীডার! এক আডমী ওঢার ডৌড়কে গিয়া নেই?
চৌকী। নেই ছাব, হামতো কুচ নেহি দেখা।
সার। আলবট্ গিয়া, হাম্ ডেকা। টোম্ জলডী ডওড়কে যাও, উষ্টরফ ডেকো, যাও—যাও—জলডী যাও, ইউ সুওর।
চৌকী। (বেগে অন্যদিকে গমন করিতে করিতে) কোন হেয় রে, খাড়া রও।
সার। ড্যাম ইওর আইজ—ইঢার, ইউ ফুল।
চৌকী। হাঁ ছাব, ইধর্। (বেগে প্রস্থান)।
সার। (ক্রোধে) আ! ইফ আই ক্যেন ক্যেচ হিম—
নেপথ্যে। (উচ্চৈঃস্বরে) পাকড়ো। পাকড়ো—উহুহুহুহু—
নেপথ্যে। আমি যাচ্চি বাবা, আর মারিস নে বাবা, দোহাই বাবা, তোর পায়ে পড়ি বাবা।
নেপথ্যে। শালা চোট্টা, তোমারা ওয়াস্তে দৌউড়কে হামারা জন গীয়া।
নেপথ্যে। উহুঁহুঁহুঁহুঁ—বাবা, আমি চোর নই বাবা, আমি ভেকধারী বৈষ্ণব, বাবা।
(বারাজীকে লইয়া চৌকীদারের প্রবেশ।)
সার। আ ইউ, টোম্ চোট্টা হেয়।
বাবাজী। (সত্রাসে) না সাহেব বাবা, আমি কিছু জানি নে, আমি—গ্যে, গ্যে, গ্যে—
সার। হ্যেং ইওর গ্যে, গ্যে, গ্যে,—চুপরাও, ইউ ব্লডী নিগর্, ডেকলাও টোমারা ব্যেগ মে কিয়া হেয়। (বলপূর্ব্ববক মালা গ্রহণ করিয়া আপনার গলায় পরিধান) হা, হা, হা, হা! বাপ রে বাপ,—হাম বড়া হিণ্ডু হুয়া-রাঢ়ে কিস্ ডে। হা, হা, হা!
বাবাজী। (সত্রাসে) দোহাই সাহেব মহাশয়, আমি গরিব বৈষ্ণব, আমি কিছু জানি নে, দোহাই বাবা, আমাকে ছেড়ে দেও।—(গমনোদ্যত)।
চৌকী। খাড়া রও, শালা।
বাবাজী। দোহাই কোম্পানির—দোহাই কোম্পানির।
সার। হোল্ড ইউর টং, ইউ ব্ল্যাক্রূট্। ইয়েহ্ ব্যেগমে আওর কিয়া হেয় ডেকে গা। (ঝুলি বলপূর্ব্বক গ্রহণ এবং চারি টাকা ভূতলে পতন)।
সার। দেট্স্ রাইট্! ইউ সুটি ডেভল্। কেঙ্কা চোরি কিয়া? (চৌকীদারের প্রতি) ওস্কো ঠানে মে লে চলো।
বাবাজী। দোহাই সাহেবের, আমি চুরি করি নি, আমাকে ছেড়ে দেও—দোহাই ধর্ম্মঅবতার, আমি ও টাকা চাই নে।
সার। সে নেই হোগা, টোম্ ঠানেমে চলো—কিয়া? টোম্ যাগে নেই? আল্বট যানে হোগা।
চৌকী। চল্বে, থানে মে চল্।
বাবাজী। দোহাই কোম্পানির—আমি টাকা কড়ি কিছুই চাই নে; তুমি বরঞ্চ টাকা নিয়ে যা ইচ্ছে হয় কর বাবা, কিন্তু আমাকে ছেড়ে দেও, বাবা।
সার। (হাস্য মুখে) কিয়া? টোম্ নেই মাংটা! আপন জেবে টাকা রাখিয়া চৌকীদারের প্রতি) ওয়েল্ দেন্, হাম্ ডেক্টা ওস্কা কুচ্ কসুর নেই, ওস্কো ছোড় ডেও।
বাবাজী। (সোল্লাসে) জয় মহাপ্রভু।
চৌকী। (বাবাজীর প্রতি জনান্তিকে) তোম্ হামকো তো কুচ্ দিয়া নেহি—আচ্ছা যাও, চলা যাও।
বাবাজী। না দাদা, আমি একবার জ্ঞানতরঙ্গিণী সভায় যাব।
চৌকী। হাঁ হাঁ, ঐ বাড়ীমে—ও বড়া মজাকি জাগ্গা হেয়।
সার। ডেকো চোকীডার, রোপেয়াকা বাট্—(ওষ্ঠে অঙ্গুলি প্রদান)।
চোকী। যো হুকুম, খাবিন্।
সার। মম্! ইজ দি ওয়ার্ড, মাই বয়। আবি চলো।
[সারজন ও চৌকীদারের প্রস্থান।
বাবাজী। রাধেকষ্ণ! আঃ বাঁচলেম্, আজ্ কি কুলগ্নেই বাড়ী থেকে বের্য়েছিলেম। ভাগ্যে টাকা কটা সঙ্গে ছিল, আর সারজন্ বেটারও হাতপাতা রোগ আছে, তাই রক্ষে—নইলে আজ্কে কি হাজতেই থাক্তে হতো, না কি হতো, কিছু বলা যায়না।
(হোটেল্ বাক্স লইয়া দুই জন মুটীয়ার প্রবেশ।)
এ আবার কি? রাধেকৃষ্ণ—কি দুর্গন্ধ! এ বেটারা এখানে কি আন্ছে? (অন্তে অবস্থিতি।)
প্রথম। ইঃ, আজ্ যে কত চিজ্ পেটিয়েচে তার হিসাব নাই, মোর গর্দান্টা যেন বেঁকে যাচ্চে।
দ্বিতীয়। দেখ্ মামু, এই হেঁদু বেটারাই দুনিয়াদারির মজা করে ন্যেলে। বেটারগো কি আরামের দীন, ভাই।
প্রথম। মর বেকুফ্ ও হারাম্খোর বেটারগো কি আর দীন আছে? ওরা না মানে আল্লা, না মানে দ্যেবতা।
দ্বিতীয়। লেকীন্ ক্যেবল এই গৰুখেগো বেটারগো দৌলতেই মোগর পোচঘর এত ফেঁপে ওট্তেচে; সাম হলেই বেটারা বাদুড়ের মাফিক ঝাঁকে ঝাঁকে আসে পড়ে; আর কত যে খায়, কত যে পিয়ে যায়, তা কে বল্তি পারে।
প্রথম। ও কাদের মেঁয়া, মোদের কি সরিারাত এহানে দেঁড়য়ে থাক্তি হবে? দরয়ানজীকে ডাক না। ও দরওয়ানজী। এ মাড়ুয়াবাদি শালা গেল কোহানে?—ও দরওয়ানজী; দরওয়ানজী।
নেপথ্যে। কোন হেয় রে।
প্রথম। মোরা পোচঘরের মুটে গো।
নেপথ্যে। আও, ভিতর চলে আও।
[মুটিয়া গণের প্রস্থান।
বাবাজী। (অগ্রসর হইয়া স্বগত) কি আশ্চর্য্য! এসব কিসের বাক্স? উঃ, থু, থু, রাধেকৃষ্ণ! আমি তো এ জ্ঞানতরঙ্গিণী সভার বিষয় কিছুই বুঝ্তে পাচ্চি না।
নেপথ্যে। বেল ফুল।
নেপথ্যে। চাই বরোফ্।
(মালি এবং বরোফ্ওয়ালার প্রবেশ)।
মালী। বেলফুল,—ও দরওয়ানজী, বাবুরো এসেচে।
নেপথ্যে। না, আবি আয়া নেহি, থোড়া বাদ আও।
বরফ। চাই বরফ—কি গো দরওয়ানজী।
নেপথ্যে। তোম্বি থোড়া বাদ আও।
[মালি এবং বরফওয়ালার প্রস্থান।
বাবাজী। (স্বগত) কি সর্ব্বনাশ, আমি তো এর কিছুই বুঝতে পাচ্চি না।
নেপথ্যে দূরে। বেল ফুল—চাই বরোফ।
(যন্ত্রীগণ সহিত নিতম্বিনী আর পয়োধরীর প্রবেশ)।
নিত। কাল্ যে ভাই কালীবাবু আমাকে ব্র্যেণ্ডি খাইয়েছিল—উঃ, আমার মাথাটা যেন এখনো ঘুচ্চে। আজ যে ভাই আমি কেমন করে নাচ্বো তাই ভাব্চি।
পয়ো। আমার ওখানেও সদানন্দ বাবু কাল ভারি ধুম লাগিয়েছিল। আজ্ কাল্ সদানন্দ ভাই খুব্ তোয়ের হয়ে উঠেছে। এমন ইয়ার মানুষ আর দুটী পাওয়া ভার।
যন্ত্রী। চল, ভিতরে যাওয়া যাউক্। ও দরওয়ানজী।
নেপথ্যে। কোন্ হ্যায়?
পয়ো। বলি আগে দুয়র খোলো, তার পরে কোন্ হ্যায় দেখ্তে পাবে এখন।
নেপথ্যে। ওঃ, আপলোক হ্যায়, আইয়ে।
[যন্ত্রীগণ ইত্যাদির প্রস্থান।
বাবাজী। (অগ্রসর হইয়া স্বগত) একি চমৎকার ব্যাপার? এরা তে কশ্বী দেখ্তে পাচ্চি। কি সর্ব্বনাশ; আমি এতক্ষণে বুঝতে পাচ্চি কাণ্ডটা কি! নবকুমারটা দেখ্চি একবারে বয়ে গেছে। কর্ত্তা মহাশয় এসব কথা শুন্লে কি আর রক্ষে থাক্বে?
(নববাবু এবং কালীবাবুর প্রবেশ)।
নব। হা, হা, হা—শ্রীমতী ভগবতীর গীত! তোমার ভাই কি চমৎকার মেমরি। হা, হা, হা।
কালী। আরে ও সব লক্ষীছাড়া বই কি আমি কখন খুলি না পড়ি, যে মনে থাক্বে।
নব। (বাবাজীকে অবলোকন করিয়া) একি, এজে বাবাজী হে। কেমন্ ভাই কালী, আমি বলেছিলাম কি না যে কর্ত্তা একজন না একজনকে অবশ্যই আমার পেছনে পেছনে পাঠাবেন; যা হৌক, একে যে আমরা দেখ্তে পেলেম এই আমাদের পরমভাগ্য বলতে হবে।
কালী। বল তো ও বৈষ্ণব শালাকে ধরে এনে একটু ফাউল কট্লেট্ কি মটন চপ খাইয়ে দি—শালার জন্মটা সার্থক হউক।
নব। চুপকর হে, চুপকর। এ ভাই ঠাট্টার কথা নয়। (অগ্রসর হইয়া) কি গো, বাবাজী যে? তা আপ্নি এখানে কি মনে করে?
বাবা। না, এমন কিছু না, তবে কি না একটা কর্ম্ম বশতঃ এই দিগ দিয়ে যাচ্ছিলেম, তাই ভাবলেম যে নববাবুদের সভা ভবনটি একবার দেখে যাই।
নব। বটে বটে; চলুন, তবে ভিতরে চলুন।
কালী। (জনান্তিকে নবকুমারের প্রতি) আরে করিস্ কি, পাগল? এটাকে এর ভিতরে নেগেলে কি হবে? আমরা তো আর হরিবাসর কত্যে যাচ্চি নে।
নব। (জনান্তিকে কালীর প্রতি) আঃ, চুপ করনা। (প্রকাশে বাবাজীর প্রতি) বাবাজী, একবার ভিতরে পদার্পণ কল্যে ভাল হয় না।
বাবা। না বাবু, আমার অন্যত্তরে কর্ম্ম আছে, তোমরা যাও।
[প্রস্থান।
কালী। বল তো শালাকে ধাঁ করে ধরে এনে না হয় ঘা দুই লাগিয়ে দি!
নব। দরওয়ান।
(দৌবারিকের প্রবেশ)।
দৌবা। মহারাজ।
নব। ও লোগ সব আয়া?
দৌবা। জী, মহারাজ।
নব। আচ্ছা, তোম যাও।
দৌবা। জো হুকুম, মহারাজ।
[প্রস্থান।
নব! আজ ভাই দেখচি এই বাবাজী বেটা একটা ভারি হেঙ্গাম করে বস্বে এখন। বোধ করি ও ঐ মাগীদের ভিতরে ঢুক্তে দেখেছে।
কালী। পুঃ, তুমি তো ভারি কাউয়ার্ড হে! তোমার যে কিছু মরাল করেজ নেই। ও বেটাকে আবার ভয়?—চল।
নব। না হে না, তুমি ভাই এ সব বোঝ না। চল দেখি গে বেটার হাতে কিছু ও কর্ম্ম করে দিয়া যদি মুখ্ বন্দ কত্ত্যে পারি।
কালী। নন্সেন্স! তার চেয়ে শালাকে গোটকত কিক্ দিয়ে একেবারে বৈকুণ্ঠে পাঠাও না কেন। ড্যাম্ দি ব্রুট্! ও শালাকে এ পৃথিবীতে কে চায়? ওর কি আর কোন মিসন্ আছে?
নব। দূর পাগল, এ সব ছেলেমানুষের কর্ম্ম নয়। চল, আমরা দুজনেই ওর কাছে যাই।
[উভয়ের প্রস্থান।
ইতি প্রথমাঙ্ক।
দ্বিতীয় অঙ্ক · প্রথম গর্ভাঙ্ক
দ্বিতীয় অঙ্ক
প্রথম গর্ভাঙ্ক।
সভা।
কতিপয় বাবুর প্রবেশ।
চৈতন। নব আর কালী যে আজ এত দেরি করছে এর কারণ কি?
বলাই। আমি তা কেমন করে বলবো? ওহে ওদের কথা ছেড়ে দেও, ওরা সকল কর্মেই লীড্ নিতে চায়, আর ভাবে যে আমরা না হলে বুঝি আর কোন কর্ম্মই হবে না।
শিবু যা বল ভাই, কিন্তু ওরা দুজনে লেখ পড়া বেস্ জানে।
বলাই। বিটুইন্ আওয়ার সেল্বস, এমন কি জানে?
মহেশ। হাঁ, হাঁ, সকলেরি বিদ্যা জান আছে! সে দিন যে নব এক খানা চিঠি লিখেছিল, তা তো দেখিইছো, তাতে লিগুলি মরের্ যে দুর্দ্দশা তা তো মনে আছে?
বলাই। এতেও আবার প্রাইড্ টুকু দেখেছো! কালী আবার ও চেয়ে এক কাটী সরেস্।
চৈতন। আঃ, তারা ফ্রেণ্ড মানুষ, ও সকল কথায় কাজ্ কি? বিশেষ ওরা আছে বলে তাই আজ্ও সভ চলছে—তা জান?
মহেশ। তা টুরূখ্ বলবো তার আর ফ্রেণ্ড কি?
বলাই। আচ্ছা, সে কথা যাউক; আমরাও তো মেম্বর বটে, তবে তাদের দুজনের জন্যে আমাদের ওএট্ করবার আবশ্যক কি?
শিবু। তাইতো। আমাদের তো কোরম্ হয়েছে, তবে এখন্ সভার কর্ম্ম আরম্ভ করা যাউক না কেন?
মহেশ। হিয়র্, হিয়র্, আমি এ মোসন্ সেকেণ্ড করি।
বলাই। হা, হা হা, এতে দেখছি করে। অবজেকসন নাই, একবারে নেম্ কল্―ব্রাভো। হা, হা, হা।
মহেশ। (ঘড়ী দেখিয়া) নটা বাজ্তে কেবল পাঁচ মিনিট বাকী আছে, বোধ কবি নব আর কালী আজ এলো না, তা আমি চৈতন বাবুকে চ্যারম্যান্ প্রোপোজ্ করি।
সকলে। হিয়র, হিয়র!
চৈতন। (গাত্রোথান করিয়া) জেণ্টেল্মেন্, আপনারা অনুগ্রহ করে আমাকে যে পদে নিযুক্ত করেন, তার কর্ম্ম আমি যত দূব পারি প্রাণপণে চালাতে কসুর করবো না,—নাউ টু বিজ্নেস্।
সকলে। হিয়র, হিয়র। (করতালি)।
চৈতন। (উচ্চস্বরে) খানসামা―বেয়ারা―
নেপথ্যে। জি, আজ্ঞে।
চৈতন। গোটা দুই ব্রাণ্ডি অব তামাক নে আয়। (উপবিষ্ট হইয়া) যদি কারো বিয়ার খেতে ইচ্ছে হয় তো বল।
বলাই। এমন সময়ে কোন্ শালা বিয়ার খায়।
সকলে। হিয়র, হিয়র।
(খানসামা এবং বেয়ারার মদ্য এবং তামাক লইয়া প্রবেশ।)
চৈতন। সব্ বাবু লোককে সরাব দেও, (সকলের মদ্য পান) আর বোতল গ্লাস সব হিঁয়া ধর্ দেও।
থান্। আচ্ছা বাবু।
[বোতল ইত্যাদি রাখিয়া প্রস্থান।
চৈতন। বেয়ারা—ঐ খেমটা ওয়ালিদের ডেকে দেতো। আর দেখ্, খানিকটে বরফ্ আন্।
বেয়ারা। যে অজ্ঞে।
[প্রস্থান।
বলাই। আমি আমাদের নতুন চেয়ারমেনের হেলথ দিতে চাই।
সকলে। হিয়ার, হিয়ার (মদ্যপান করিয়া) হিপ্, হিপ্, হুরে, হুরে।
[নিতম্বিনী, পয়োধরী এবং যস্ত্রীগণের প্রবেশ।
চৈতন। আরে এসো, বসো। কেমন ভাই, চিন্তে পার? তবে ভাল আছ তো? (সকলের উপবেশন)।
নিত। যেমন রেখেছেন।
চৈতন। আমি আর তোমাকে রেখেছি কই? আমার কি তেমন কপাল?
সকলে। ব্রাভো, হিয়ার, (করতালি)।
চৈতন। ও পয়োধরি, একটু এদিকে সরে বসো না।
পয়ো। না, আমি বেস আছি।
চৈতন। (দ্বিতীয়ের প্রতি) বলাই বাবু, এঁদের একটু কিছু খাওয়াও না।
চৈতন। এই এসো (সকলের মদ্যপান)।
শিবু। (চতুর্থের প্রতি) ও শালা, তুই ঘুমুচ্চিস না কি?
মহেশ। (হাই তুলিয়া) না হে তা নয়, ঘুমবো কেন?—নব আসেমি বটে?
সকলে। (হাস্য করিয়া) ব্রাভো, ব্রাভো।
চৈতন। (পয়োধরীর হস্ত ধারণ করিয়া) একটি গাওনা ভাই।
পয়ো। এর পর হলে ভাল হয় না?
চৈতন। না না, পরে আবার কেন? শুভকর্ম্মে বিলম্বে কাজ কি।
পয়ো। আচ্ছ। তবে গাই, (যন্ত্রী দিগের প্রতি) আড় খেম্টা।
গীত।
রাগিণী শঙ্করা, তাল খেমটা।
এখনকি আর্ নাগর্ তোমার্
আমার্ পুতি, তেমন্ আছে।
নূতন পেয়ে পুরাতনে
তোমার্ সে যতন্ গিয়েছে।
তখনকার ভাব থাকতো যদি,
তোমায়্ পেতেম্ নিরবধি,
এখন্, ওহে গুণনিধি,
আমায় বিধি বাম হয়েছে।
যা হবার্ আমার হবে,
তুমি তো হে সুখে রবে,
বল দেখি শুনি তবে,
কোন নতুনে মন মজেছে॥
সকলে। কিয়াবাৎ, সাবাস্, বেঁচে থাক বাবা, জীতা রাও বাবা।
চৈতন। ও বলাই বাবু, তুমি কেমন সাকী হে?
বলাই। সাকী আবার কি?
চৈতন। যে মদ দেয় তাকে পারসীতে সাকী বলে।
শিবু। (গাইয়া) “গর্ ইয়ার নহো সাকী”।—
তা, এসো, (সকলের মদ্য পান)।
চৈতন। চুপ কর তো, কে যেন উপরে আসছে না?
বলাই। বোধ করি নব আর কালী—
(নব এবং কালীর প্রবেশ)।
সকলে। (সকলে গাত্রোথ্থান করিয়া) হিপ্ হিপ্, হুরে।
কালী। (প্রমত্ত ভাবে) হুরে, হুরে।
নব। বসো, ভাই, সকলে বসো, (সকলের উপবেশন) দেখ ভাই, আজ আমাদের এক্সকিউজ কর্ত্তে হবে, আমাদের একটু কর্ম্ম ছিল বলে তাই আসতে দেরি হয়ে গেচে।
শিবু। (প্রমত্তভাবে) দ্যাটস এ লাই।
নব। (ক্রুদ্ধভাবে) হোয়াট, তুমি আমাকে লায়র বল? তুমি জান না আমি তোমাকে এখনি সুট করবো?
চৈতন। (নবকে ধরিয়া বলাইয়া) হাঃ, যেতে দেও, যেতে দেও, একটা ট্রাইফ্লীং কথা নিয়ে মিছে ঝকড়া কেন?
নব। ট্রাইফ্লীং —ও আমাকে লাইয়র বললে—আবার ট্রাইফ্লীং? ও আমাকে বাঙ্গালা করে বল্লে না কেন? ও আমাকে মিথ্যাবাদী বললে না কেন? তাতে কোন্ শাল রাগতো? কিন্তু —লাইয়র—এ কি বরদাস্ত হয়।
চৈতন। আরে যেতে দেও, ও কথার আর মেন্সন্ করোনা। (উপবেশন করিয়া)।
নব। কি গো পয়োধরি, নিতম্বিনি, তোমারা ভাল আছ তো।
পয়ো। হাঁ, আমরা তো আছি ভাল, কিন্তু তোমায় যে বড়ভাল দেখচি নে—এখন তোমাকে ঠাণ্ডা দেখলে বাচি।
নব। আমি তো ঠাণ্ডাই আছি, তবে এখন গরম হবে।—ওহে বলাই, একটু ব্র্যেণ্ডি দেও তো।
সকলে। ওহে আমাদের ভুলো না হে। (সকলের মদ্য পান)
নব। ওহে কালী, তুমি যে চুপ করে রয়েচো।
কালী। আমি ঐ বৈষ্ণৰ শালার ব্যবহার দেখে একবারে অবাক্ হয়েচি। শাল এদিকে মাল। ঠক্ ঠক্ করে, আবার ঘুশ খেয়ে মিথ্যা কথা কইতে স্বীকার পেলে? শালা কি হিপক্রীট।
নব। মঞ্চক, সে থাক্। ও পয়োধরি, তোমরা একবার ওঠ না, নাচটা দেখা যাক।
সকলে। না না, আগে তোমার ইস্পীচ।
নব। (গাত্রোথান করিয়া) আচ্ছা; জেণ্টেলম্যেন, আপনারা সকলে এই দেয়ালের প্রতি একবার চেয়ে দেখুন; এই যে কয়েকটি অক্ষর দেখচেন, এই সকল একত্র করে পড়লে “জ্ঞানতরঙ্গিণী সভা” পাওয়া যায়।
সকলে। হিয়ার, হিয়ার।
নব। জেণ্টেলম্যেন, এই সভার নাম জ্ঞানতরঙ্গিণী সভা—আমরা সকলে এর মেম্বর—আমরা এখানে মীট করো যাতে জ্ঞান জন্মে তাই করে থাকি-এণ্ড উই আর জলি গুড ফেলোজ্।
সকলে। হিয়ার, হিয়ার, উই আর জলি গুড ফেলোজ্।
নব। জেণ্টেলম্যেন, আমাদের সকলের হিন্দুকুলে জন্ম, কিন্তু আমরা বিদ্যাবলে সুপরষ্টিসনের শিকলি কেটে ফ্রী হয়েচি; আমরা পুত্তলিক। দেখে হাঁটু নোয়াতে আর স্বীকার করি নে, জ্ঞানের বাতির দ্বারা আমাদের অজ্ঞান অন্ধকার দুর হয়েছে; এখন আমার প্রর্থনা এই যে, তোমরা সকলে মাথ মন এক করে, এদেশের সোসীয়াল রিফরমেসন যাতে হয় তার চেষ্টা কর।
সকলে। হিয়ার, হিয়ার।
নব। জেণ্টেলম্যেন, তোমাদের মেয়েদের এজুকেট কর, —তাদের স্বাধীনতা দেও—জাত ভেদ তফাৎ কর—আর বিধবা-দের বিবাহ দেও—তা হলে এবং কেবল তা হলেই, আমাদের প্রিয় ভারতভূমি ইংলণ্ড প্রভৃতি সভ্য দেশর সঙ্গে টক্কর দিতে পারবে—নচেৎ নয়!
সকলে। হিয়ার, হিয়ার।
নব। কিন্তু জেণ্টেলম্যেন, এখন এ দেশ আমাদের পক্ষে যেন এক মস্ত জেলখানা; এই গৃহ কেবল আমাদের লিবরটী হল্—অর্থাৎ আমাদের স্বাধীনতার দালান; এখানে যার যে খুসি, সে তাই কর জেণ্টেলম্যেন, ইন্ দি নেম্ অব ফ্রীডম, লেট্ অস এঞ্জয় আওরসেলভস্! (উপবেশন)।
সকলে। হিয়ার, হিয়ার,—হিপ, হিপ, হুরে, হু—রে; লিবরটা হল—বি ফ্রী—লেট অল এঞ্জয় আওরসেলভস্।
নব। ওহে বলাই, একবার সকলকে দেও না।
বলাই। আচ্ছা,— এই এসো, (সকলের মদ্যপান)।
নব। তবে এইবার নাচ আরম্ভ হোক। কম্, ওপেন্ দি বল্, মাই বিউটিস।
পয়ো, নিত। নৃত্য এবং গীত।
নব। কিয়াবৎ, জীতা রও। বেঁচে থাক, ভাই।
কালী। হুরে, জ্ঞান তরঙ্গিণী সভা ফর এভর।
সকলে। জ্ঞানতরঙ্গিণী সভা ফর এভর (করতালি)।
নব। চল ভাই, এখন সপর টেবিলে যাওয়া যাউক।
চৈতন। (গাত্রোত্থান করিয়া)—থ্রী চিয়ার্স ফর আমাদের চ্যারম্যান্—
সকলে। হিপ, হিপ্, হিপ—হুরে! হু——রে-হুরে।
নব। ও পয়োধরি, তুমি, ভাই, আমার আরম্ নেও।
পয়ো। তোমার কি নেবো, ভাই?
নব। এসো, আমার হাত ধর।
কালী। ও নিতম্বিনি, তুমি তাই, আমাকে ফেভর কর। আহা! কি সফ্ট হাত।
সকলে। ব্বাভো।(করতালি)।
[ যন্ত্রীগণ ব্যতীত সকলের প্রস্থান।
তবলা। ও ভাই, দেখে তো ও বোতলটায় আর কিছু আছে কিনা।
বেহালা। কৈ দেখি? হ্যা ঁআছে। এই নেও,(উভয়ের মদ্যপান)।
তবলা। আঃ, খাসা মাল যে হে।
নেপথ্যে। হিপ, হিপ, হুরে।
বেহালা। চল ভাই এক ছিলিম গাঁজার চেষ্টা দেখি গিয়ে— এ ব্রাণ্ডিতে আমাদের সানে না।
[সকলের প্রস্থান।
প্রথম অঙ্ক · প্রথম গর্ভাঙ্ক
একেই কি বলে সভ্যতা?
(প্রহসন)।
প্রথমাঙ্ক।
প্রথম গর্ভাঙ্ক
নবকুমার বাবুর গৃহ।
নবকুমার এবং কালীনাথ বাবু—আসীন।
কালী। বল কি?
নব। আর ভাই বল্বো কি। কর্ত্তা এত দিনের পর বৃন্দাবন হতে ফিরে এসেছেন। এখন আমার আর বাড়ী থেকে বেরনো ভার।
কালী। কি সর্ব্বনাশ; তবে এখন এর উপায় কি?
নব। আর উপায় কি? সভাটা দেখচি এবলিশ্ কত্ত্যে হলো।
কালী। বাঃ, তুমি পাগল হলে না কি? এমন সভা কি কেউ কখন এবলিশ্ কর্যে থাকে? এত তুফানে নৌকা বাঁচিয়ে এনে, ঘাটে এসে কি হাল্ ছেড়ে দেওয়া উচিত? যখন আমাদের সবস্ক্রিপ্সন্ লিস্ট অতি পুয়র ছিল, তখন আমরা নিজে থেকে টাকা দিয়ে সভাটি সেভ্ করেছিলেম্, এখন—
নব। আরে ও সব্ কি আমি আর জানিনে, যে তুমি আমাকে আবার নতুন করে বল্তে এলে? তা আমি কি ভাই সাধ করে সভা উঠ্য়ে দিতে চাচ্চি? কিন্তু করি কি? কর্ত্তা এখন কেমন হয়েচেন যে দশ মিনিট্ যদি আমি বাড়ী ছাড়া হই তা হলে তখনি তত্ত্ব করেন। তা ভাই, আমার কি এখন সেথায় এটেণ্ড দেবার উপায় আছে। (দীর্ঘ নিশ্বাস)
কালী। কি উৎপাৎ! তোমার কথা শুনে, ভাই, গলাটা একবারে যেন শুখিয়ে উঠ্লো। ওহে নব, বলি কিছু আছে?
নব। হষ্! অত চেঁচিয়ে কথা কয়ো না, বোধ করি একটা ব্রাণ্ডি আছে।
কালি (সহর্ষে) জষ্ট দি থিং। তা আনো না দেখি।
নব। রসো দেখ্চি। (চতুর্দ্দিগ অবলোকন করিয়া) কর্ত্তা বোধ করি এখনো বাড়ীর ভিতর থেকে বেরোন্ নি। (উচ্চস্বরে) ওরে বোদে।
নেপথ্যে। আজ্ঞে যাই।
কালী। আজ রাত্রে কিন্তু, ভাই, একবার তোমাকে যেতেই হবে। (স্বগত) হাঃ, এ বুড়ো বেটা কি অকালের বাদল হয়ে আমাদের প্লেজর নষ্ট কত্ত্যে এলো? এই নব আমাদের সদ্দার, আর মনি ম্যাটারে এই বিশেষ সাহায্য করে; এ ছাড়্লে যে আমাদের সর্ব্বনাশ হবে, তার সন্দেহ নাই।
(বোদের প্রবেশ।)
নব। কর্ত্তা কোথায় রে?
বৈদ্য। আজ্ঞে দাদাবাবু, তিনি এখন বাড়ীর ভিতর থেকে বেরোন্ নি।
নব। তবে সেই বোতল্টা আর একটা গ্লাশ্ শীঘ্র করে আন্ তো।
[বোদের প্রস্থান।
কালী। ভাল নব, তোমাদের কর্ত্তা কি খুব বৈষ্ণব হে?
নব। (দীর্ঘ নিশ্বাস পরিত্যাগ করিয়া) ও দুঃখের কথা ভাই আর কেন জিজ্ঞাস কর? বোধ করি কল্কাতায় আর এমন ভক্ত দুটী নাই।
(বোতল ইত্যাদি লইয়া বোদের পুনঃপ্রবেশ)।
কালী। এদিকে দে।
নব। শীঘ্র নেও ভাই, এখন আর সে রাবণও নাই, সে সোণার লঙ্কাও নাই।
কালী। না থাক্লো তো বোয়ে গেল কি! এ তে আছে? (বোতল প্রদর্শন)। হা, হা, হা! (মদ্যপান)।
নব। আরে করো কি, আবার?
কালী। রসো ভাই, আরো এক্টুখানি খেয়ে নি। দেখ, যে গুড্ জেনেরেল হয়, সে কি সুযোগ পেলে তার গ্যেরিসনে প্রোবিজন্ জমাতে কশুর করে? হা, হা, হা। (পুনর্ম্মদ্যপান)।
নব। (বোদের প্রতি) বোতল্ আর গ্লাশটা নিয়ে যা, আর শীগ্গীর গোটকতক্ পান্ নিয়ে আয়।
[বোদের প্রস্থান।
কালী! এখন চল ভাই, তোমাদের কর্ত্তার সঙ্গে একবার দেখা করা যাগ্গে। আজ্ কিন্তু তোমাকে যেতেই হবে, আজ্ তোমাকে কোন্ শালা ছেড়ে যাবে।
নব। তোমার পায়ে পড়ি, ভাই, একটু আস্তে আস্তে কথা কও।
(পান লইয়া বোদের পুনঃ প্রবেশ)।
কালী। দে, এ দিকে দে।
নেপথ্যে। ও বৈদ্যনাথ।
[বোদের প্রস্থান।
নব। এই যে কর্ত্তা বাইরে আস্চেন। নেও আর একটা পান নেও।
কালী। আমি ভাই পান তো খেতে চাইনে, আমি পান কত্ত্যে চাই। সে যাহউক তবে চল না, কর্ত্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করি গিয়ে।
নব। (সহাস্য বদনে) তোমার, ভাই, আর অতো ক্লেশ স্বীকার কত্তে হবে না। কর্ত্তা তোমার গাড়ী দরোজায় দেখ্লেই আপনি এখানে এসে উপস্থিত হবেন এখ্ন।
কালী। বল কি? আই সে, তোমার চাকর বেটাকে, ভাই, আর এক্টু ব্রাণ্ডি দিতে বলো তো; আমার গলাটা আবার যেন শুখয়ে উঠ্ছে।
নর। কি সর্ব্বনাশ! এম্নিই দেখ্ছি তোমার একটু যেন নেশা হয়েছে; আবার খাবে?
কালী। আচ্ছা, তবে থাকুক্। ভাল, কর্ত্তা এখানে এলে কি বল্বো বল দেখি?
নব। আর বল্বে কি? একট প্রণাম করে আপনার পরিচয় দিও।
কালী। কি পরিচয় দেবো বলো দেখি, ভাই? তোমাদের কর্ত্তাকে কি বলবো যে আমি বিএরের—মুখটি—স্বকৃতভঙ্গ—সোণাগাছিতে আমার শত শ্বশুর—না না শ্বশুর নয়—শত শাশুড়ির আলয়, আর উইল্সনের আখড়ায় নিত্য মহাপ্রসাদ পাই—হা, হা, হা!
নব। আঃ, মিছে তামাসা ছেড়ে দেও, এখন সত্তি কি বল্বে বল দেখি? এক কর্ম্ম কর, কোন একটা মস্ত বৈষ্ণব ফ্যামিলির নাম ঠাওরাতে পার? তা হলে আর কথাটি কইতে হয় না।
কালী। তা পার্বো না কেন? তবে এক্টু মাটি দেও, উড়ে বেয়ারাদের মতন নাকে তিলক কেটে আগে সাধু হয়ে বসি।
নব। না হে না। (চিন্তা করিয়া) গরাণহাটার কোন্ ঘোষ না পরম বৈষ্ণব ছিল?—তার নাম তোমার মনে আছে?—ঐ যে যার ছেলে আমাদের সঙ্গে এক ক্লাশে পড়্তো?
কালী। আমি ভাই গরাণহাটার প্যারী আর তার ছুকরি বিন্দি ছাড়া আর কাকেও চিনি না।
নব। কোন্ প্যারী হে?
কালী। আরে, গোদা প্যারী। সে কি? তুমি কি গোদা প্যারীকে চেন না? ভাই, একদিন আমি আর মদন যে তার বাড়ীতে যেয়ে কত মজা করেছিলেম তার আর কি বল্বো। সে যাক্, এখন কি বল্বো তাই ঠাওরাও।
নব। (চিন্তা করিয়া) হাঁ—হয়েছে। দেখ, কালী, তোমার কে একজন খুড়ো পরম বৈষ্ণব ছিলেন্ না? যিনি বৃন্দাবনে গিয়ে মরেন্।
কালী। হাঁ, একটা ওল্ড ফুল ছিল বটে, তার নাম কৃষ্ণপ্রসাদ ঘোষ।
নব। তবে বেশ হয়েছে। তুমি তাঁরি পরিচয় দিও, বাপের নামটা চেপে যাও।
কালী। হা, হা, হা!
নব। দুর পাগল, হাসিস্ কেন?
কালী। হা, হা, হা! ভাল ত যেন হলো, এখন বৈঞ্চব বেটাদের দুই এক খানা পুঁথির নাম তো না শিখলে নয়।
নব। তবেই যে সার্লে। আমি তো সে বিষয়ে পরম পণ্ডিত। রসো দেখি। (চিন্তা করিয়া) শ্রীমদ্ভগব্দগীতা—গীত গোবিন্দ—
কালী! গীত কি?
নব! জয়দেবের গীত গোবিন্দ।
কালী। ধর—শ্রীমতী ভগবতীর গীত, আর-বিন্দাদূতীর গীত—
নব। হা, হা, হা! ভায়ার কি চমৎকার মেমরি।
কালী। কেন, কেন?
নব। হষ্! কর্ত্তা আস্ছেন। দেখ, ভাই, যেন একটা বেস করে প্রণাম করো।
(কর্ত্তা মহাশয়ের প্রবেশ।)
কালী। (প্রণাম)
কর্ত্তা। চিরজীবী হও বাপু, তোমার নাম কি?
কালী। আজ্ঞে, আমার নাম শ্রীকালীনাথ দাস ঘোষ। মহাশয়, আপনি—৺কষ্ণপ্রসাদ ঘোষ মহাশয়কে বোধ করি জান্তেন। আমি তারি ভ্রাতুষ্পুত্র—
কর্ত্তা। কোন্ কৃষ্ণপ্রসাদ ঘোষ?
কালী। আজ্ঞে, বাঁশবেড়ের—
কর্ত্তা। হাঁ, হাঁ, হাঁ। তুমি স্বর্গীয় কষ্ণপ্রসাদ ঘোষজ মহাশয়ের ভ্রাতুষ্পুত্র, যিনি শ্রীবৃন্দাবনধাম প্রাপ্ত হন্।
কালী। আজ্ঞে হাঁ।
কর্ত্তা। বেঁচে থাক, বাপু। বসো। (সকলের উপবেশন)। তুমি এখন কি কর, বাপু?
কালী। অজ্ঞে, কলেজে নবকুমার বাবুর সঙ্গে এক ক্লাশে পড়া হয়েছিল, এক্ষণে কর্ম্ম কাজের চেষ্টা করা হচ্যে।
কর্ত্তা। বেশ বাপু! তোমার স্বর্গীয় খুড়া মহাশয় আমার পরম মিত্র চিলেন্। বাবা, আমি তোমার সম্পর্কে জ্যেঠা হই, তা জান?
কালী। আজ্ঞে।
কর্ত্তা। (স্বগত) আহা, ছেলেটি দেখতে শুনতে ও যেমন, আর তেমনি সুশীল। আর না হবেই বা কেন? কৃষ্ণপ্রসাদের ভ্রাতুষ্পুত্র কি না?
কালী। জ্যেঠা মহাশয়, আজ্ নবকুমার দাদাকে আমার সঙ্গে একবার যেতে আজ্ঞা করুন্—
কর্ত্তা। কেন বাপু, তোমরা কোথায় যাবে?
কালী। আজ্ঞে আমাদের জ্ঞানতরঙ্গিণী নামে একটা সভা আছে সেখানে আজ্ মিটীং হবে।
কর্ত্তা। কি সভা বল্লে বাপু?
কালী। আজ্ঞে জ্ঞানতরঙ্গিণী সভা।
কর্ত্তা। সে সভায় কি হয়?
কালী। আজ্ঞে, আমাদের কলেজে থেকে কেবল ইংরাজী চর্চ্চা হয়েছিল, তা আমাদের জাতীয় ভাষা তো কিঞ্চিৎ জানা চাই তাই এই সভাটি সংস্কৃতবিদ্যা আলোচনাব জন্যে সংস্থাপন করেছি। আমরা প্রতি শনিবার এই সভায় একত্র হয়ে ধর্ম্মশাস্ত্রের আন্দোলন করি।
কর্ত্তা। তা বেশ কর। (স্বগত) আহা, কষ্ণপ্রসাদের ভ্রাতুষ্পুত্র কি না! আর এ নবকুমারেরও তো আমার ঔরসে জন্ম। (প্রকাশে) তোমাদের শিক্ষক কে বাপু?
কালী। আজ্ঞে, কেন রাম রণচম্পতি মহাশয়, যিনি সংস্কুত কালেজের প্রধান অধ্যাপক—
কর্ত্তা। ভাল, বাপু, তোমরা কোন্ সকল পুস্তক অধ্যয়ন কর, বল দেখি?
কালী। (স্বগত) আ মলো! এতক্ষণের পর দেখ্ছি সাল্লে। (প্রকাশে) আজ্ঞে—শ্রীমতী ভগবতীর গীত আর—বোপ্দেবের বিন্দাদূতী।
কর্ত্তা! কি বল্লে, বাপু?
নব। আজ্ঞে, উনি বল্ছেন শ্রীমদ্ভগবদীতা আর জয়দেবের গীতগোবিন্দ।
কর্ত্তা। জয়দেব? আহা, হা, কবিকুল-তিলক, ভক্তিরস-সাগর।
কালী। জ্যেঠা মহাশয়, যদি আজ্ঞে হয় তবে এক্ষণে আমরা বিদায় হই।
কর্ত্তা। কেন, বেলা দেখ্ছি এখনো পাঁচটা বাজে নি, ত। তোমরা বাপু, এত সকালে যাবে কেন?
কালী। আজ্ঞে, আমরা সকাল সকাল কর্ম্ম নির্ব্বাহ করবো বলে সকালে যেতে চাই, অধিক রাত্রি জাগ্লে পাছে বেমো টেমো হয়, এই ভয়ে সকালে মীট্ করি।
কর্ত্তা। তোমাদের সভাটা কোথায়, বাপু?
কালী। আজ্ঞে, সীক্দার পাড়ার গলিতে।
কর্ত্তা। আচ্ছা বাপু, তবে এসো গে। দেখো যেন অধিক রাত্রি করো না।
নব এবং কালী। আজ্ঞে না।
[উভয়ের প্রস্থান।
কর্ত্তা। (স্বগত) এই কলিকাতা সহর বিষম ঠাঁই, তাতে করে ছেলেটিকে কি এক্লা পাঠ্য়ে ভাল কল্যেম্? (চিন্তা করিয়া) একবার বাবাজীকে পাঠ্য়ে দি না কেন, দেখে আসুক ব্যাপারটাই কি? আমার মনে যেন কেমন সন্দেহ হচ্ছে যে নবকে যেতে দিয়ে ভাল করি নাই।
[প্রস্থান।