PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৯২৫

প্রবাহিণী

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯২৫

প্রকাশনা-তথ্য

প্রবাহিনী

শ্রীরবীন্দ্র নাথ ঠাকুর

বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়

কলিকাতা

বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়

প্রকাশক—শ্রীকরুণাবিন্দু বিশ্বাস। ১•, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

প্রথম সংস্করণ—অগ্রহায়ণ, ১৩৩২

মূল্য—১৷৷৹; বাঁধাই—২৲; মোট এণ্টিক কাগজে—২৲ ও ২৷৷৹

আর্ট প্রেসে শ্রীনরেন্দ্রনাথ মুখাজী কর্তৃক মুদ্রিত

১নং ওয়েলিংটন স্কোয়ার, কলিকাতা

প্রবাহিণীতে যে সমস্ত রচনা প্রকাশ করা হইল তাহার সব গুলিই গান, সুরে বসানো। এই কারণে কোনো কোনো পদে ছন্দের বাঁধন নাই। তৎসত্ত্বেও এগুলিকে গীতিকাব্যরূপে পড়া যাইতে পারে বলিয়া আমার বিশ্বাস।

শ্রী রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর

প্রবাহিণী

অবসান · ১

অবসান

অবসান

কোথা হতে শুনতে যেন পাই

আকাশে আকাশে বলে, যাই॥

পাতায় পাতায় ঘাসে ঘাসে

জেগে ওঠে দীর্ঘশ্বাসে

হায়, তা’রা নাই, তা’রা নাই॥

কতদিনের কত ব্যথা

হাওয়ায় ছড়ায় ব্যাকুলতা।

চলে যাওয়ার পথ যে দিকে

সে দিক্ পানে অনিমিখে

আজ ফিরে চাই ফিরে চাই॥

ঋতুচক্র · ১

ঋতু-চক্র

ঋতু-চক্র

প্রখর তপন তাপে আকাশ তৃষায় কাপে,

বায়ু করে হাহাকার।

দীর্ঘপথের শেষে ডাকি মন্দিরে এসে

খোলো খোলো খোলো দ্বার॥

বাহির হয়েছি কবে

কা’র আহবান রবে,

এখনি মলিন হবে প্রভাতের ফুলহার॥

বুকে বাজে আশাহীন।

ক্ষীণ-মর্ম্মর বীণা,

জানিনা কে আছে কিনা, সাড়া তো না পাই তার

আজি সারাদিন ধ’রে

প্রাণে সুর ওঠে ভ’রে,

একেলা কেমন ক’রে বহিব গানের ভার॥

গীতগান · ১

গীতগান

গীতগান

আকাশ হ’তে আকাশ পথে হাজার স্রোতে

ঝর্‌চে জগৎ ঝর্‌ণা ধারার মতো।

আমার মনের অধীর ধারা তা’রি সাথে বইচে অবিরত

দুই প্রবাহের ঘাতে ঘাতে

গান উথলায় দিনে রাতে,

গানে গানে আমার প্রাণে ঢেউ নাড়া দেয় কত।

চিত্ত-তটে চূর্ণ সে গান ছড়ায় শত শত;

আকাশ-ডোবা ধারার দোলায় দুলি অবিরত॥

নৃত্য-পাগল ব্যাকুলতা বিশ্ব পরাণে

নিত্য আমায় জাগিয়ে রাখে শান্তি না মানে॥

চিরদিনের কান্নাহাসি

ফেনিয়ে ওঠে রাশি রাশি,

তা’র পানে কোন নিদ্রাহারা নয়ন অবনত।

সেই নয়নে নয়ন আমার হোক্‌ না নিমেষহত।

আকাশ ভরা দেখার সাথে দেখ্‌ব অবিরত॥

পূজা · ১

পূজা

পূজা।

নমি নমি চরণে।

নমি কলুষহরণে।

সুধারসনির্ঝর হে

নমি নমি চরণে॥

নমি চিরনির্ভর হে

মোহ-গহন-তরণে॥

নমি চিরমঙ্গল হে

নমি চিরসম্বল হে।

উদিল তপন গেল রাত্রি,

জাগিল অমৃতপথযাত্রী

নমি চির পথসঙ্গী,

নমি নিখিলশরণে॥

নমি সুখে দুঃখে ভয়ে

নমি জয়পরাজয়ে

অসীম বিশ্বতলে

নমি চিত-কমলদলে

নিবিড় নিভৃত নিলয়ে,

নমি জীবনে মরণে।

প্রত্যাশা · ১

প্রত্যাশা

প্রত্যাশা

তোর গোপন প্রাণে এক‍্লা মানুষ যে,

তা’রে কাজের পাকে জড়িয়ে রাখিস‍্নে।৷

তা’র এক‍্লা ঘরের ধেয়ান হ’তে

উঠুক্ না গান নানা স্রোতে,

তা’র আপন সুরের ভুবনমাঝে তা’রে থাক্‌তে দে।৷

তোর প্রাণের মাঝে এক‍্লা মানুষ যে,

তা’রে দশের ভিড়ে ভিড়িয়ে রাখিস‍্নে।

কোন আরেক একা ওরে খোঁজে,

সেই তো ওরি দরদ বোঝে,

যেন পথ খুঁজে পায় কাজের ফাঁকে ফিরে না যায় সে।

বিবিধ · ১

কালের মন্দিরা যে সদাই বাজে ডাইনে বাঁয়ে দুইহাতে;

সুপ্তি ছুটে নৃত্য উঠে নিত্য নূতন সংঘাতে।৷

বাজে ফুলে বাজে কাঁটায়,

আলোছায়ার জোয়ার ভাঁটায়,

প্রাণের মাঝে ঐ যে বাজে দুঃখে সুখে শঙ্কাতে।৷

তালে তালে সাঁঝ-সকালে রূপ-সাগরে ঢেউ লাগে।

শাদাকালোর দ্বন্দ্বে যে ঐ ছন্দে নানান্ রং জাগে।৷

এই তালে তোর গান বেঁধে নে,

কান্না-হাসির তান সেধে নে,

ডাক দিল শোন্ মরণ বাঁচন নাচন-সভার ডঙ্কাতে।৷

অবসান · ২

যেদিন সকল মুকুল গেল ঝ’রে

আমায় ডাক্‌লে কেন এমন ক’রে॥

যেতে হবে যে-পথ বেয়ে

শুক্‌নে। পাতা আছে ছেয়ে,

হাতে আমার শূন্য ডালা কী ফুল দিয়ে দেব ভ’রে॥

গান হারা মোর হৃদয়তলে

তোমার ব্যাকুল বাঁশি কী যে বলে।

নেই আয়োজন নেই মম ধন,

নেই আভরণ, নেই আবরণ,

রিক্ত বাহু এই তো আমার বাঁধবে তোমায় রাহু ডোরে

ঋতুচক্র · ২

বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদু মন্দ।

আনে আমার মনের কোণে সেই চরণের ছন্দ॥

স্বপ্নশেষের বাতায়নে

হঠাৎ আসে ক্ষণে ক্ষণে

আধো-ঘুমের প্রান্ত-ছোঁওয়া বকুলমালার গন্ধ॥

বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া বহে কিসের হর্ষ।

যেনরে সেই উড়ে-পড়া এলোকেশের স্পর্শ।

চাঁপাবনের কাঁপন-ছলে

লাগে আমার বুকের তলে

আরেকদিনের প্রভাত হতে হৃদয়-দোলার স্পন্দ॥

গীতগান · ২

কোন সুদূর হ’তে আমার মনােমাঝে

বাণীর ধারা বহে। (আমার প্রাণে প্রাণে)

কখন শুনি কখন শুনি না যে

কখন কী যে কহে॥ (আমার কানে কানে)

আমার ঘুমে, আমার কোলাহলে,

আমার আঁখি জলে,

তাহারি সুর জীবন গুহাতলে

গােপন গানে রহে॥ (আমার কানে কানে)

ঘন গহন বিজন তীরে তীরে

তাহার ভাঙা গড়া; (ছায়ার তলে তলে)

জানি না কোন দক্ষিণ সমীরে

তাহার ওঠা পড়া; (ঢেউয়ের ছলছলে)

ধরণীরে গগন-পারের ছাঁদে

তারার সাথে বাঁধে,

সুখের সাথে দুখ মিলায়ে কাঁদে

“এ নহে এই নহে।” (কাঁদে কানে কানে)।

পূজা · ২

জীবনমরণের সীমানা ছাড়ায়ে,

বন্ধু হে আমার, রয়েছ দাঁড়ায়ে॥

এ মোর হৃদয়ের বিজন আকাশে

তোমার মহাসন আলোতে ঢাকা সে,

গভীর কী আশায় নিবিড় পুলকে

তাহার পানে চাই দু’বাহু বাড়ায়ে।

নীরব নিশি তব চরণ নিছায়ে

আঁধার-কেশভার দিয়েছে বিছায়ে।

আজি এ কোন গান নিখিল প্লাবিয়া

তোমার বীণা হ’তে আসিল নাবিয়া;

ভুবন মিলে যায় সুরের রণনে,

গানের বেদনায় যাই যে হারায়ে॥

প্রত্যাশা · ২

খেলাঘর বাঁধ্‌তে লেগেছি

মনের ভিতরে।

কত রাত তাই তো জেগেছি,

ব’লব কী তোরে॥

প্রভাতে পথিক ডেকে যায়,

অবসর পাইনে আমি, হায়,

বাহিরের খেলায় ডাকে যে,

যাব কী ক’রে॥

যা’ আমার সবার হেলাফেলা,

যাচ্চে গড়াগড়ি,

পুরানো ভাঙা দিনের ঢেল।

তাই দিয়ে ঘর গড়ি

যে আমার নিত্য খেলার ধন,

তা’রি এই খেলার সিংহাসন,

ভাঙারে জোড়া দেবে সে

কিসের মন্তরে॥

বিবিধ · ২

ফিরে চল্ মাটির টানে;

যে মাটি আঁচল পেতে চেয়ে আছে মুখের পানে॥

যার বুক ফেটে এই প্রাণ উঠেছে,

হাসিতে যার ফুল ফুটেছে রে,

ডাক দিল যে গানে গানে॥

দিক্ হতে ঐ দিগন্তরে কোল রয়েছে পাতা,

জন্মমরণ ওরি হাতের অলখ সুতোয় গাঁথা।৷

ওর হৃদয়-গলা জলের ধারা

সাগর পানে আত্মহারা রে,

প্রাণের বাণী ব’য়ে আনে।

অবসান · ৩

তোমার হ’ল সুরু, আমার হ’ল সারা,

তোমায় আমায় মিলে এম্‌নি বহে ধারা

তোমার জ্বলে বাতি,

তোমার ঘরে সাথী,—

আমার তরে রাতি,

আমার তরে তারা।৷

তোমার আছে ডাঙা, আমার পারাবার;

তোমার ব’সে থাকা, আমার খেয়া পার;

তোমার হাতে রয়,

আমার হাতে ক্ষয়,

তোমার মনে ভয়,

আমার ভয় হারা॥

ঋতুচক্র · ৩

বৈশাখ হে, মৌনী তাপস কোন অতলের বাণী এমন

কোথায় খুঁজে পেলে?

তপ্ত ভালের দীপ্তি ঢাকি মন্থর মেঘখানি এলো

গভীর ছায়া ফেলে॥

রুদ্র তপের সিদ্ধি একি ঐ যে তোমার বক্ষে দেখি

ওরি লাগি আসন পাতো হোমহুতাশন জ্বেলে॥

নিঠুর তুমি তাকিয়েছিলে মৃত্যুক্ষুধার মতো তোমার

রক্তনয়ন মেলে।

ভীষণ তোমার প্রলয়সাধন প্রাণের বাঁধন যত যেন

হানবে অবহেলে।

হঠাৎ তোমার কণ্ঠে এযে আশার ভাষা উঠ্লো‌ বেজে,

দিলে তরুণ শ্যামলরূপে করুণ সুধা ঢেলে॥

গীতগান · ৩

এই ত ভালো লেগেছিল আলোর নাচন পাতায় পাতায়,

শালের বনে ক্ষ্যাপা হাওয়া এই ত আমার মনকে মাতায়॥

রাঙা মাটির রাস্তা বেয়ে

হাটের পথিক চলে ধেয়ে,

ছোট মেয়ে ধূলায় ব’সে খেলার ডালি একলা সাজায়,—

সামনে চেয়ে এই যা দেখি চোখে আমার বীণা বাজায়॥

আমার এযে বাঁশের বাঁশী মাঠের সুরে আমার সাধন,

আমার মনকে বেঁধেছে রে এই ধরণীর মাটির বাঁধন।

নীল আকাশের আলোর ধারা

পান করেছে নতুন যা’রা

সেই ছেলেদের চোখের চাওয়া নিয়েছি মোর দু’চোখ পুরে,

আমার বীণায় সুর বেঁধেছি ওদের কচি গলার সুরে॥

দূরে যাবার খেয়াল হ’লে সবাই মোরে ঘিরে থামায়,

গাঁয়ের আকাশ সজনে-ফুলের হাতছানিতে ডাকে আমায়।

ফুরায়নি ভাই কাছের সুধা,

নাই যে রে তাই দূরের ক্ষুধা;

এই যে এ-সব ছোটে-খাটো পাইনি এদের কূল-কিনারা,

তুচ্ছ দিনের গানের পালা আজো আমার হয়নি সারা॥

লাগলো ভালো মন ভোলালো এই কথাটাই গেয়ে বেড়াই;

দিনে রাতে সময় কোথা, কাজের কথা তাইতো এড়াই॥

মজেছে মন মজলো আঁখি,

মিথ্যে আমায় ডাকাডাকি;

ওদের আছে অনেক আশা ওরা করুক অনেক জড়ো,

আমি কেবল গেয়ে বেড়াই চাইনে হ’তে আরো বড়ো॥

পূজা · ৩

যারা কথা দিয়ে তোমার কথা বলে

তারা কথার বেড়া গাঁথে কেবল দলের পরে দলে।৷

একের কথা আরে

বুঝ‍্তে নাহি পারে,

বোঝায় যত, কথার বোঝা ততই বেড়ে চলে।৷

যারা কথা ছেড়ে বাজায় শুধু সুর,

তাদের সবার সুরে সবাই মেলে নিকট হ’তে দূর

বোঝে কি নাই বোঝে

থাকে না তা’র খোঁজে,

বেদন তাদের ঠেকে গিয়ে তোমার চরণতলে॥

প্রত্যাশা · ৩

দুয়ার মোর পথপাশে

সদাই তা’রে খুলে রাখি

কখন তার রথ আসে

ব্যাকুল হ’য়ে জাগে আঁখি॥

শ্রাবণে শুনি দূর মেঘে

লাগায় গুরু গরগর,

ফাগুনে শুনি বায়ুবেগে

জাগায় মৃদু মরমর;

আমার বুকে উঠে জেগে

চমক তা’র থাকি থাকি॥

সবাই দেখি যায় চ’লে

পিছন পানে নাহি চেয়ে।

উতলরোলে কল্লোলে

পথের গান গেয়ে গেয়ে।

শরৎ মেঘ যায় ভেসে

উধাও হ’য়ে কত দূরে,

যেথায় সব পথ মেশে

গোপন কোন স্থর-পুরে।

স্বপনে ওড়ে কোন দেশে

উদাস মোর মন-পাখী॥

বিবিধ · ৩

অবেলায় যদি এসেছ আমার বনে

দিনের বিদায় ক্ষণে

গেয়োনা গেয়োনা চঞ্চল গান

ক্লান্ত এ সমীরণে।৷

ঘন বকুলের ম্লান বীথিকায়

শীর্ণ যে-ফুল ঝরে ঝরে যায়

তাই দিয়ে হার কেন গাঁথ হায়

লাজ বাসি তায় মনে,

চেয়োনা চেয়োনা মোর দীনতায়

হেলায় নয়নকোণে।৷

এসো এসো কালি রজনীর অবসানে

প্রভাত-আলোক-দ্বারে।

যেয়োনা যেয়োনা অকালে হানিয়া

সকালের কলিকারে।

এসো এসো যদি কভু সুসময়

নিয়ে আসে তার ভরা সঞ্চয়,

চির নবীনের যদি ঘটে জয়,

সাজি ভরা হয় ধনে।

নিয়োনা নিয়োনা মোর পরিচয়

এ ছায়ার আবরণে॥

অবসান · ৪

তোমার শেষের গানের রেশ নিয়ে কানে

চ’লে এসেছি,

কেউ কি তা জানে॥

তোমার আছে গানে গানে গাওয়া,

আমার কেবল চোখে চোখে চাওয়া,

মনে মনে মনের কথাখানি

ব’লে এসেছি,

কেউ কি তা জানে॥

ওদের তখন নেশা ধ’রেছিল,

রঙীন রসে প্যালা ভ’রেছিল ৷

তখনো ত কতই আনাগোনা,

নতুন লোকের নতুন চেনাশোনা;

আমি কেবল ফিরে আসার আশা

দ’লে এসেছি,

কেউ কি তা জানে॥

ঋতুচক্র · ৪

দারুণ অগ্নিবাণে

হৃদয় তৃযায় হানে॥

রজনী নিদ্রাহীন,

দীর্ঘ দগ্ধ দিন,

আরাম নাহি যে জানে।

শুষ্ক কানন শাখে

ক্লান্ত কপোত ডাকে

করুণ কাতর গানে॥

ভয় নাহি, ভয় নাহি।

গগনে রয়েছি চাহি।

জানি ঝঞ্ঝার বেশে

দিবে দেখা তুমি এসে

একদা তাপিত প্রাণে॥

গীতগান · ৪

আকাশভরা সূর্য্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ,

তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান,

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান॥

অসীম কালের যে-হিল্লোলে

জোয়ার ভাঁটায় ভুবন দোলে,

নাড়ীতে মোর রক্ত-ধারায় লেগেছে তা’র টান,

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।

ঘাসে ঘাসে পা ফেলেছি বনের পথে যেতে,

ফুলের গন্ধে চমক লেগে উঠেছে মন মেতে।

ছড়িয়ে আছে আনন্দেরি দান,

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান।

কান পেতেছি, চোখ মেলেছি,

ধরার বুকে প্রাণ ঢেলেছি,

জানার মাঝে অজানারে ক’রেছি সন্ধান,

বিস্ময়ে তাই জাগে আমার গান॥

পূজা · ৪

তোমায় কিছু দেবো ব’লে চায় যে আমার মন,

নাইবা তোমার থাকল প্রয়োজন॥

যখন তোমার পেলাম দেখা

অন্ধকারে একা একা

ফিরতেছিলে বিজন গভীর বন—

ইচ্ছা ছিল একটি বাতি জ্বালাই তোমার পথে

নাইবা তোমার থাকল প্রয়োজন॥

দেখেছিলেম হাটের লোকে তোমারে দেয় গালি,

গায়ে তোমার ছড়ায় ধূলাবালি।

অপমানের পথের মাঝে

তোমার বীণা নিত্য বাজে,

আপন সুরে আপনি নিমগন।

ইচ্ছা ছিল বরণমালা পরাই তোমার গলে

নাইবা তোমার থাকল প্রয়োজন

দলে দলে আসে লোকে রচে তোমার স্তব,

নানা ভাষায় নানান কলরব।

ভিক্ষা লাগি’ তোমার দ্বারে

আঘাত করে বারে বারে,

কত যে শাপ কত যে ক্রন্দন।

ইচ্ছা ছিল বিনাপণে আপনাকে দিই পায়ে,

নাইবা তোমার থাকল প্রয়োজন॥

প্রত্যাশা · ৪

অনেক পাওয়ার মাঝে মাঝে কবে কখন একটুখানি পাওয়া,

সেইটুকুতেই জাগায় দখিন হাওয়া॥

দিনের পর দিন চ’লে যায় যেন তা’রা পথের স্রোতেই ভাসা,

বাহির হ’তেই তাদের যাওয়া-আসা;

কখন আসে একটি সকাল সে যেন মোর ঘরেই বাঁধে বাসা,

সে যেন মোর চিরদিনের চাওয়া॥

হারিয়ে-যাওয়া আলোর মাঝে কণা কণা কুড়িয়ে পেলাম যারে

রইল গাঁথা মোর জীবনের হারে।

সেই যে আমার জোড়া-দেওয়া ছিন্ন দিনের খণ্ড আলোর মাল৷

সেই নিয়ে আজ সাজাই আমার থালা।

এক পলকের পুলক যত, এক নিমেষের প্রদীপখানি জ্বালা,

একতারাতে আধখান। গান গাওয়া॥

বিবিধ · ৪

আমারে বাঁধবি তোরা সেই বাঁধন কি তোদের আছে?

আমি যে বন্দী হতে সন্ধি করি সবার কাছে॥

সন্ধ্যা আকাশ বিনা ডোরে বাঁধূলো মোরে গো;

নিশিদিন বন্ধহারা নদীর ধারা আমায় যাচে॥

যে-কুসুম আপ্‌নি ফোটে আপ্‌নি ঝরে রয়না ঘরে গো

তারা যে সঙ্গী আমার বন্ধু আমার চায় না পাছে॥

আমারে ধরবি ব’লে মিথ্যে সাধা;

আমি যে নিজের কাছে নিজের গানের সুরে বাঁধা।

আপ্‌নি যাহার প্রাণ দুলিল মন ভুলিল গো,

সে মানুষ আগুন ভরা, পড়লে ধরা সে কি বাঁচে?

সে যে ভাই হাওয়ার সখা, ঢেউয়ের সাথী দিবারাতি গো

কেবলি এড়িয়ে চলার ছন্দে তাহার রক্ত নাচে॥

অবসান · ৫

যে পথ দিয়ে গেলরে তোর বিকেল বেলার যুঁই,

পথিক পরাণ চল্ সে পথে তুই॥

সে পথ দিয়ে গেছেরে তোর সন্ধ্যা মেঘের সোনা,

প্রাণের ছায়াবীথি তলে প্রাণের আনাগোনা

রইল না কিছুই॥

যে পথে তার পাপড়ি দিয়ে বিছিয়ে গেল ভুঁই

পথিক পরাণ চল্ সে পথে তুই।

অন্ধকারে সন্ধ্যাযূথীর স্বপনময়ী ছায়া

উঠবে ফুটে তারার মত কায়াবিহীন মায়া

ছুঁই তারে না ছুঁই।

পথিক পরাণ চল্‌ সে পথে তুই॥

ঋতুচক্র · ৫

হে তাপস, তব শুষ্ক কঠোর রূপের গভীর রসে

মন আজি মোর উদাস বিভোর কোন্ সে ভাবের বশে

তব পিঙ্গল জটা

হানিছে দীপ্ত ছটা,

তব দৃষ্টির বহ্ণিবৃষ্টি অন্তরে গিয়ে পশে॥

বুঝি না, কিছু না জানি

মর্ম্মে আমার মৌন তোমার কী বলে রুদ্র বাণী।

দিগদিগন্ত দহি’

দুঃসহ তাপ বহি’

তব নিশ্বাস আমার বক্ষে রহি রহি নিশ্বসে॥

সারা হয়ে এলে দিন

সন্ধ্যামেঘের মায়ার মহিমা নিঃশেষে হবে লীন।

দীপ্তি তোমার তবে

শান্ত হইয়া র’বে,

তারায় তারায় নীরব মন্ত্রে ভরি দিবে শূন্য সে॥

গীতগান · ৫

তোমার নয়ন আমায় বারে বারে

ব’লেছে গান গাহিবারে॥

ফুলে ফুলে তারায় তারায়,

ব’লেছে সে কোন ইসারায়,

দিবস রাতির মাঝ কিনারায়

ধূসর আলোয় অন্ধকারে॥

গাইনে কেন কী কব তা’,

কেন আমার আকুলতা,

ব্যথার মাঝে লুকায় কথা,

সুর যে হারাই অকূল পারে॥

যেতে যেতে গভীর স্রোতে

ডাক দিয়েছ তরী হ’তে।

ডাক দিয়েছ ঝড় তুফানে,

বোবা মেঘের বজ্র-গানে,

ডাক দিয়েছ মরণ পানে

শ্রাবণ রাতের উতল ধারে॥

যাইনে কেন জান না কি?

তোমার পানে মেলে আঁখি

কুলের ঘাটে ব’সে থাকি,

পথ কোথা পাই পারাবারে॥

পূজা · ৫

আমি তা’রেই খুঁজে বেড়াই যে রয় মনে, আমার মনে।

সে আছে ব’লে

আমার আকাশ জুড়ে ফোটে তারা রাতে,

প্রাতে ফুল ফুটে রয় বনে আমার বনে॥

সে আছে ব’লে চোখের তারার আলোয়

এত রূপের খেলা রঙের মেলা অসীম শাদায় কালোয়;

সে মোর সঙ্গে থাকে ব’লে

আমার অঙ্গে অঙ্গে হরষ জাগায় দখিন সমীরণে॥

তা’রি বাণী হঠাৎ উঠে পুরে

আন্‌মনা কোন তানের মাঝে আমার গানের সুরে।

দুখের দোলে হঠাৎ মোরে দোলায়,

কাজের মাঝে লুকিয়ে থেকে আমারে কাজ ভোলায়।

সে মোর চির দিনের ব’লে—

তারি পুলকে মোর পলকগুলি ভরে ক্ষণে ক্ষণে॥

প্রত্যাশা · ৫

ব্যাকুল বকুলের ফুলে

ভ্রমর মরে পথ ভুলে॥

আকাশে কী গোপন বাণী

বাতাসে করে কানাকানি,

বনের অঞ্চলখানি

পুলকে উঠে দুলে দুলে

বেদনা সুমধুর হ’য়ে

ভুবনে আজি গেল ব’য়ে।

বাঁশিতে মায়া তান পুরি

কে আজি মন করে চুরি,

নিখিল তাই মরে ঘুরি

বিরহ সাগরের কূলে

বিবিধ · ৫

তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার

কত রঙে রঙ্ করা।

মোর সাথে ছিল দুখের ফলের ভার

অশ্রুর রসে ভরা।৷

সহসা আসিল কহিল সে সুন্দরী,

“এস না বদল করি”,

মুখ পানে তার চাহিলাম মরি মরি

নিদয়া সে মনোহরা।৷

সে লইল মোর ভরা বাদলের ডালা,

চাহিল সকৌতুকে।

আমি লয়ে তার নব ফাগুনের মালা

তুলিয়া ধরিনু বুকে।

“মোর হ’ল জয়” যেতে যেতে কয় হেসে,

দূরে চলে গেল ত্বরা,

সন্ধ্যায় দেখি তপ্ত দিনের শেষে

ফুলগুলি সব ঝৱা।৷

অবসান · ৬

নাই বা এলে সময় যদি নাই,

ক্ষণেক এসে বোলো না গো যাই যাই যাই

আমার প্রাণে আছে জানি

সীমাবিহীন গভীর বাণী,

সেই চিরদিনের কথাখানি বল্‌তে যেন পাই॥

যখন দখিন হাওয়া কানন ঘিরে

এক কথা কয় ফিরে ফিরে,

পূর্ণিমা চাঁদ কা’রে চেয়ে

একতানে দেয় আকাশ ছেয়ে,

যেন সময়হারা সেই সময়ে

চরম সে গান গাই॥

ঋতুচক্র · ৬

নাই রস নাই, দারুণ দাহনবেলা।

খেল’ খেল’ তব নীরব ভৈরব খেলা॥

যদি ঝ’রে পড়ে পড়ুক পাতা,

ম্লান হয়ে যাক্ মালা গাঁথা,

থাক্ জনহীন পথে পথে মরীচিকা জাল ফেলা॥

শুষ্কধূলায় খ’সে-পড়া ফুলদলে

ঘূর্ণী আঁচল উড়াও আকাশতলে।

প্রাণ যদি কর’ মরুসম,

তবে তাই হোক্, হে নির্ম্মম,

তুমি একা আর আমি একা, কঠোর মিলন মেলা॥

গীতগান · ৬

তুমি খুসি থাকে। আমায় চেয়ে

তোমার আঙিনাতে বেড়াই যখন গেয়ে গেয়ে॥

তোমার পরশ আমার মাঝে

সুরের নাচে বুকে বাজে,

পুলকে তা’র ঝলক লাগে সকল ভুবন ছেয়ে ছেয়ে॥

ফিরে ফিরে চিত্তবীণায় দাও যে নাড়া,

গুঞ্জরিয়া দেয় সে সাড়া।

তোমার আঁধার তোমার আলো

দুই আমারে লাগলো ভালো,

আমার হাসি বেড়ায় ভাসি তোমার হাসি বেয়ে বেয়ে॥

পূজা · ৬

আজ আলােকের এই ঝরণা ধারায় ধুইয়ে দাও-

আপনাকে এই লুকিয়ে-রাখা

ধূলার-ঢাকা।

ধুইয়ে দাও॥

যে জন আমার মাঝে জড়িয়ে আছে ঘুমের জালে

আজ এই সকালে ধীরে ধীরে তার কপালে

অরুণ আলাের সােনার কাঠি ছুঁইয়ে দাও॥

বিশ্ব-হৃদয় হ’তে ধাওয়া

আলােয় পাগল প্রভাত হাওয়া,

সেই হাওয়াতে হৃদয় আমার নুইয়ে দাও॥

আজ নিখিলের আনন্দ ধারায় ধুইয়ে দাও

মনের কোণের সব দীনতা মলিনতা ধুইয়ে দাও।

আমার পরাণ বীণায় ঘুমিয়ে আছে অমৃত গান

তার নাইক বাণী নাইক ছন্দ নাইক তান।

তারে আনন্দের এই জাগরণী ছুঁইয়ে দাও।

বিশ্ব-হৃদয় হ’তে ধাওয়া

প্রাণে পাগল গানের হাওয়া,

সেই হাওয়াতে হৃদয় আমার নুইয়ে দাও॥

প্রত্যাশা · ৬

দূর-দেশী সেই রাখাল ছেলে

আমার বাটে বটের ছায়ায় সারা বেলা গেল খেলে’॥

গাইল কি গান সেই তা জানে,

সুর বাজে তার আমার প্রাণে,

বলো দেখি তোমরা কি তা’র কথার কিছু আভাস পেলে

আমি তারে শুধাই যবে—“কী তোমারে দিব আনি”,

সে শুধু কয়,—“আর কিছু নয়, তোমার গলার মালাখানি”।

দিই যদি ত কী দাম দেবে,—

যায় বেলা সেই ভাবনা ভেবে

ফিরে এসে দেখি,—ধূলায় বাঁশিটি তার গেছে ফেলে।

বিবিধ · ৬

এক‍্লা বসে একে একে অন্যমনে

পদ্মের দল ভাসাও জলে অকারণে॥

হায়রে বুঝি কখন তুমি গেছ ভুলে

ও যে আমি এনেছিলেম আপনি তুলে,

রেখেছিলেম প্রভাতে ঐ চরণ মূলে

অকারণে,

কখন তুলে নিলে হাতে যাবার ক্ষণে

অন্যমনে॥

দিনের পরে দিনগুলি মোর এমনি ভাবে

তোমার হাতে ছিঁড়ে ছিঁড়ে হারিয়ে যাবে।

সবগুলি এই শেষ হবে যেই তোমার খেলায়

এম্‌নি তোমার আলসভরা অবহেলায়,

হয়তো তখন বাজ্‌বে ব্যথা সন্ধ্যেবেলায়

অকারণে,

চোখের জলের লাগ্‌বে আভাস নয়ন কোণে

অন্যমনে॥

অবসান · ৭

দ্বারে কেন দিলে নাড়া, ওগো মালিনী।

কার কাছে পাবে সাড়া, ওগো মালিনী

তুমি তো তুলেছ ফুল, গেঁথেছ মালা,

আমার আঁধার ঘরে লেগেছে তালা,

খুঁজে তো পাই নি পথ, দীপ জ্বালিনি

ঐ দেখ গোধূলীর ক্ষীণ আলোতে

দিনের শেষের সোনা ডোবে কালোতে।

আঁধার নিবিড় হ’লে আসিয়ো পাশে,

যখন দূরের আলো জ্বালে আকাশে

অসীম পথের রাতি দীপশালিনী॥

ঋতুচক্র · ৭

মধ্যদিনের বিজন বাতায়নে

ক্লাস্তিভরা কোন বেদনার মায়া

স্বপ্নাভাসে ভাসে মনে মনে॥

কৈশোরে যেই সলাজ কানাকানি

খুঁজেছিল প্রথম প্রেমের বাণী

আজ কেন তাই তপ্ত হাওয়ায় হাওয়ায়

মর্ম্মরিছে গহন বনে বনে॥

যে-নৈরাশা গভীর অশ্রুজলে

ডুবেছিল বিস্মরণের তলে

আজ কেন সে বনযূথীর বাসে

উচ্ছ্বসিল মধুর নিশ্বাসে,

সারাবেলা চাঁপার ছায়ায় ছায়ায়

গুঞ্জরিয়া ওঠে ক্ষণে ক্ষণে॥

গীতগান · ৭

তোমার সুরের ধারা ঝরে যেথায় তারি পারে

দেবে কিগো বাসা আমায় একটি ধারে॥

আমি শুনব ধ্বনি কানে,

আমি ভ’রব ধ্বনি প্রাণে,

সেই ধ্বনিতে চিত্তবীণায় তার বাঁধিব বারে বারে॥

আমার নীরব বেলা সেই তোমারি সুরে সুরে

ফুলের ভিতর মধুর মতো উঠবে পূরে।

আমার দিন ফুরাবে যবে

যখন রাত্রি আঁধার হবে,

হৃদয়ে মোর গানের তারা উঠবে ফুটে সারে সারে।

পূজা · ৭

মরণের মুখে রেখে দূরে দূরে যাও চ’লে,

আবার ব্যথার টানে নিকটে ফিরাবে ব’লে॥

আঁধার আলোর পারে

খেয়া দিই বারে বারে,

নিজেরে হারায়ে খুঁজি, দুলি সেই দোলে দোলে॥

সকল রাগিণী বুঝি বাজাবে আমার প্রাণে

কভু ভয়ে কভু জয়ে কভু অপমানে মানে।

বিরহে ভরিবে সুরে,

তাই রেখে দাও দূরে,

মিলনে বাজিবে বাঁশি, তাই টেনে আনো কোলে॥

প্রত্যাশা · ৭

কেন যে মন ভোলে আমার মন জানে না।

তা’রে মানা করে কে, আমার মন মানে না।৷

কেউ বোঝে না তারে,

সে যে বোঝে না আপ্‌নারে,

সবাই লজ্জা দিয়ে যায়, সে ত কানে আনে না॥

তা’র খেয়া গেল পারে

সে যে রইল নদীর ধারে।

কাজ ক’রে সব সারা

এগিয়ে গেল কা’রা,

আনমনা-মন সে-দিক‍্পানে দৃষ্টি হানে না॥

বিবিধ · ৭

আমি সন্ধ্যাদীপের শিখা,

অন্ধকারের ললাটমাঝে পরানু রাজটীকা।

তার স্বপনে মোর আলোর পরশ

জাগিয়ে দিল গোপন হরষ,

অন্তরে তার রইল আমার

প্রথম প্রেমের লিখা॥

আমার নির্জ্জন উৎসবে

অস্বরতল হয়নি উতল পাখীর কলরবে।

যখন তরুণ রবির চরণ লেগে

নিখিল ভুবন উঠবে জেগে

তখন আমি মিলিয়ে যাব

ক্ষণিক মরীচিকা॥

অবসান · ৮

তুমি তো সেই যাবেই চ’লে কিছু তো না র’বে বাকি

আমায় ব্যথা দিয়ে গেলে জেগে র’বে সেই কথা কি॥

তুমি পথিক আপন মনে

এলে আমার কুসুম বনে,

চরণপাতে যা দাও দ’লে সে সব আমি দেব ঢাকি’॥

বেলা যাবে আঁধার হবে, একা ব’সে হৃদয় ভ’রে

আমার বেদনখানি আমি রেখে দেব মধুর ক’রে।

বিদায় বাঁশির করুণ রবে

সাঁঝের গগন মগন হ’বে,

চোখের জলে দুখের শোভা নবীন ক’রে দেব রাখি॥

ঋতুচক্র · ৮

হৃদয় আমার, ঐ বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে

বেড়া-ভাঙার মাতন নামে উদাম উল্লাসে॥

মোহন এল ভীষণ বেশে,

আকাশ-ঢাকা জটিল কেশে,

এল তোমার সাধন-ধন চরম সর্ব্বনাশে॥

বাতাসে তোর সুর ছিল না, ছিল তাপে ভরা।

পিপাসাতে বুক-ফাটা তোর শুষ্ক কঠিন ধরা।

জাগ্‌রে হতাশ, আয়রে ছুটে

অবসাদের বাঁধন টুটে,

এল তোমার পথের সাথী বিপুল অট্টহাসে॥

গীতগান · ৮

গানের সুরের আসনখানি পাতি পথের ধারে।

ওগো পথিক, তুমি এসে ব’সবে বারে বারে॥

ঐ যে তোমায় ভোরের পাখী

নিত্য করে ডাকাডাকি,

অরুণ আলোর খেয়ায় যখন আসো ঘাটের পারে,

মোর প্রভাতীর গানখানিতে দাঁড়াও আমার দ্বারে

আজ সকালে মেঘের ছায়া লুটিয়ে পড়ে বনে,

জল ভরেছে ঐ গগনের নীল নয়নের কোণে।

আজকে এলে নতুন বেশে

তালের বনে মাঠের শেষে,

অমনি চ’লে যেয়োনাকো গোপন সঞ্চারে,

দাঁড়িয়ে আমার মেঘলা গানের বাদল অন্ধকারে॥

পূজা · ৮

আমায় মুক্তি যদি দাও বাঁধন খুলে

আমি তোমার বাঁধন নেব তুলে॥

যে-পথে ধাই নিরবধি

সে-পথ আমার ঘোচে যদি

যাব তোমার মাঝে পথের ভুলে॥

যদি নেবাও ঘরের আলো,

তোমার কালো আঁধার বাসব ভালো

তীর যদি আর না যায় দেখা

তোমার আমি হ’ব একা

দিশাহারা সেই অকূলে॥

প্রত্যাশা · ৮

কেন সারাদিন ধীরে ধীরে

বালু নিয়ে শুধু খেলো তীরে।৷

চলে গেল বেলা, রেখে মিছে খেলা

ঝাঁপ দিয়ে পড়ো কালো নীরে।

অকূল ছানিয়ে যা’ পাও তা’ নিয়ে

হেসে কেঁদে চলো ঘরে ফিরে।৷

নাহি জানি মনে কী বাসিয়া

পথে বসে আছে কে আসিয়া?

কী কুসুম বাসে ফাগুন বাতাসে

হৃদয় দিতেছে উদাসিয়া।

চল ওরে এই ক্ষ্যাপা বাতাসেই

সাথে নিয়ে সেই উদাসীরে॥

বিবিধ · ৮

মাটির প্রদীপখানি আছে মাটির ঘরের কোলে,

সন্ধ্যা তারা তাকায় তারি আলো দেখবে ব’লে॥

সেই আলোটি নিমেষহত

প্রিয়ার ব্যাকুল চাওয়ার মতো,

সেই আলোটি মায়ের প্রাণের ভয়ের মতো দোলে॥

সেই আলোটি নেবে জ্বলে

শ্যামল ধরার হৃদয়তলে,

সেই আলোটি চপল হাওয়ায় ব্যথায় কাঁপে পলে পলে ৷

নামল সন্ধ্যা তারার বাণী

আকাশ হতে আশীষ আনি,

অমর শিখা আকুল হল মর্ত্ত্য শিখায় উঠতে জ্ব’লে॥

অবসান · ৯

ভরা থাক স্মৃতি সুধায়

বিদায়ের পাত্রখানি।

মিলনের উৎসবে তায়

ফিরায়ে দিয়ো আনি ৷

বিষাদের অশ্রুজলে

নীরবের মর্ম্মতলে

গোপনে উঠুক ফ’লে

হৃদয়ের নূতন বাণী॥

যে পথে যেতে হবে

সে পথে তুমি একা,

নয়নে আঁধার র’বে,

ধেয়ানে আলোক রেখা।

সারাদিন সঙ্গোপনে

সুধারস ঢাল্‌বে মনে

পরাণের পদ্মবনে

বিরহের বীণাপাণি॥

ঋতুচক্র · ৯

এস এস, হে তৃষ্ণার জল,

ভেদ কর’ কঠিনের ক্রূর বক্ষতল,

কলকল, ছলছল॥

এস এস উৎসস্রোতে গূঢ় অন্ধকার হতে,

এসহে নির্ম্মল,

কলকল, ছলছল॥

রবিকর রহে তব প্রতীক্ষায়।

তুমি যে খেলার সাথী সে তোমারে চায়।

তাহারি সোনার তান

তোমাতে জাগায় গান,

এস হে উজ্জ্বল,

কলকল, ছলছল॥

হাঁকিছে অশান্ত বায়

“আয়, আয়, আয়,” সে তোমায় খুঁজে যায়।

তাহার মৃদঙ্গ রবে

করতালি দিতে হবে,

এস হে চঞ্চল,

কলকল, ছলছল॥

মরুদৈত্য কোন্‌ মায়াবলে

তোমারে করেছে বন্দী পাষাণ শৃঙ্খলে

ভেঙে ফেলে দিয়ে কারা

এস বন্ধহীন ধারা,

এস হে প্রবল,

কলকল,ছলছল॥

গীতগান · ৯

গানের ভিতর দিয়ে যখন দেখি ভুবনখানি,

তখন তা’রে চিনি আমি তখন তা’রে জানি

তখন তা’রি আলোর ভাষায়

আকাশ ভরে ভালোবাসায়,

তখন তা’রি ধুলায় ধূলায় জাগে পরম বাণী।

তখন সে যে বাহির ছেড়ে অন্তরে মোর আসে,

তখন আমার হৃদয় কাঁপে তা’রি ঘাসে ঘাসে।

রূপের রেখা রসের ধারায়

আপন সীমা কোথায় হারায়,

তখন দেখি আমার সাথে সবার কানাকানি॥

পূজা · ৯

অকারণে অকালে মোর পড়ল যখন ডাক

তখন আমি ছিলেম শয়ন পাতি।

বিশ্ব তখন তারার আলোয় দাঁড়ায়ে নির্ব্বাক্

ধরায় তখন তিমির-গহন রাতি॥

ঘরের লোকে কেঁদে কইল মোরে

“আঁধারে পথ চিনবে কেমন ক’রে?”

আমি কইমু “চলব আমি নিজের আলো ধ’রে,

হাতে আমার এই যে আছে বাতি॥”

বাতি যতই উচ্চ শিখায় জ্বলে আপন তেজে,

চোখে ততই লাগে আলোর বাধা।

ছায়ায় মিশে চারিদিকে মায়া ছড়ায় সে যে,

আধেক-দেখা করে আমায় আঁধা।

গর্ব্বভরে যতই চলি বেগে

আকাশ তত ঢাকে ধূলার মেঘে,

শিখা আমার কেঁপে ওঠে অধীর হাওয়া লেগে,

পায়ে পায়ে সৃজন করে বাধা॥

হঠাৎ শিরে লাগল আঘাত বনের শাখাজালে,

হঠাৎ হাতে নিবল আমার বাতি ৷

চেয়ে দেখি পথ হারিয়ে ফেলেছি কোন্ কালে

চেয়ে দেখি তিমির-গহন রাতি

কেঁদে বলি, মাথা করে নীচু

“শক্তি আমার রইল না আর কিছু,”

সেই নিমেষে হঠাৎ দেখি কখন পিছু পিছু

এসেছে মোর চিরপথের সাথী॥

প্রত্যাশা · ৯

দীপ নিবে গেছে মম নিশীথ সমীরে,

ধীরে ধীরে এসে তুমি যেয়ো না গো ফিরে॥

এ পথে যখন যাবে

আঁধারে চিনিতে পাবে,

রজনীগন্ধার গন্ধ ভরেছে মন্দিরে॥

আমারে পড়িবে মনে কখন, সে লাগি

প্রহরে প্রহরে আমি গান গেয়ে জাগি।

ভয় পাছে শেষ রাতে

ঘুম আসে আঁখিপাতে,

ক্লান্ত কণ্ঠে মোর সুর ফুরায় যদিরে॥

বিবিধ · ৯

আজ তারায় তারায় দীপ্ত শিখার অগ্নি জ্বলে

নিদ্রাবিহীন গগনতলে॥

ঐ আলোক-মাতাল স্বর্গসভার মহাঙ্গন,

হোথায় ছিল কোন্ যুগে মোর নিমন্ত্রণ,

আমার লাগল না মন লাগল না,

তাই কালের সাগর পাড়ি দিয়ে এলেম চ’লে

নিদ্রাবিহীন গগনতলে॥

হেথায় মন্দমধুর কানাকানি জলেস্থলে

শ্যামল মাটির ধরাতলে।

হেথা ঘাসে ঘাসে রঙীন ফুলের আলিম্পন,

বনের পথে আঁধার আলোয় আলিঙ্গন,

হেথা লাগল রে মন লাগল রে,

তাই এইখানেতেই দিন কাটে মোর খেলার ছলে

নিদ্রাবিহীন গগনতলে॥

অবসান · ১০

১০

আমার শেষ রাগিণীর প্রথম ধূয়ো ধরলি রে কে তুই?

আমার শেষ পেয়ালা চোখের জলে ভরলি রে কে তুই॥

দূরে পশ্চিমে ঐ দিনের পারে

অস্ত-রবির পথের ধারে

রক্তরাগের ঘোমটা মাথায় পরলি রে কে তুই॥

সন্ধ্যাতারায় শেষ চাওয়া তোর রইল কি ঐ যে?

সন্ধ্যা হাওয়ায় শেষ বেদনা বইল কি ঐ যে?

তোর হঠাৎ-খসা প্রাণের মালা

ভরল আমার শূন্য ডালা,

মরণ পথের সাথী আমায় করলি রে কে তুই॥

ঋতুচক্র · ১০

১০

শুষ্কতাপের দৈত্যপুরে দ্বার ভাঙ্‌বে ব’লে

রাজপুত্র, কোথা হ’তে হঠাৎ এলে চলে॥

সাত সমুদ্র পারের থেকে বজ্রস্বরে এলে হেঁকে

দুন্দুভি যে উঠ্‌ল বেজে বিষম কলরোলে।

রাজপুত্র, কোথা হ’তে হঠাৎ এলে চ’লে॥

বীরের পদপরশ পেয়ে মূর্চছা হ’তে জাগে,

বসুন্ধরার তপ্তপ্রাণে বিপুল পুলক লাগে।

মরকতমণির থালা সাজিয়ে,গাঁথে বরণ মালা,

উতলা তার হিয়া আজি সজল হাওয়ায় দোলে।

রাজপুত্র, কোথা হ’তে হঠাৎ এলে চ’লে।

গীতগান · ১০

১০

গানের ভেলায় বেলা-অবেলায়

প্রাণের আশা

ভোলা মনের স্রোতে ভাসা॥

কোথায় জানি ধায় সে বাণী;

দিনের শেষে

কোন ঘাটে যে ঠেকে এসে

চিরকালের কাঁদা-হাসা॥

এমনি খেলার ঢেউয়ের দোলে

খেলার পারে যাবি চ’লে।

পালের হাওয়ার ভরসা তোমার;

করি্সনে ভয়

পথের কড়ি না যদি রয়;

সঙ্গে আছে বাঁধন-নাশা॥

পূজা · ১০

১০

আকাশ জুড়ে শুনিনু ঐ বাজে

তোমারি নাম সকল তারার মাঝে॥

সে নামখানি নেমে এল ভুয়ে

কখন আমার ললাট দিল ছুঁয়ে,

শান্তিধারায় বেদন গেল ধুয়ে,

আপন আমার আপনি মরে লাজে॥

মন মিলে যায় আজ ঐ নীরব রাতে

তারায় ভরা ঐ গগনের সাথে।

অমনি করে আমার এ হৃদয়

তোমার নামে হোকনা নামময়।

আঁধারে মোর তোমার আলোর জয়

গভীর হয়ে থাক্‌ জীবনের কাজে॥

প্রত্যাশা · ১০

১০

হায় গো,

ব্যথায় কথা যায় ডুবে যায় যায় গো,

সুর হারালেম অশ্রুধারে॥

তরী তোমার সাগর নীরে,

আমি ফিরি তীরে তীরে,

ঠাঁই হল না তোমার সোনার নায় গো,

পথ কোথা পাই অন্ধকারে॥

হায় গো,

নয়ন আমার মরে দুরাশায় গো,

চেয়ে থাকি দাঁড়িয়ে দ্বারে।

যে ঘরে ঐ প্রদীপ জ্বলে

তার ঠিকানা কেউ না বলে,

বসে থাকি পথের নিরালায় গো,

চিররাতের পাথার পারে॥

বিবিধ · ১০

১০

মাটির বুকের মাঝে বন্দী যে জল মিলিয়ে থাকে,

মাটি পায়না তাকে॥

কবে কাটিয়ে বাঁধন পালিয়ে যখন যায় সে দূরে

আকাশ পুরে,

তখন কাজল মেঘের সজল ছায়া শূন্যে আঁকে,

মাটি পায়না তাকে॥

শেষে বজ্র তারে বাজায় ব্যথা বহ্ণি জ্বালায়,

ঝঞ্ঝা তারে দিগ্বিদিকে কাঁদিয়ে চালায়।

তখন কাছের ধন যে দূরের থেকে কাছে আসে

বুকের পাশে।

তখন চোখের জলে নামে সে যে চোখের জলের ডাকে,

মাটি পায়রে তাকে॥

অবসান · ১১

১১

যদি হ’ল যাবার ক্ষণ,

তবে যাও দিয়ে যাও শেষের পরশন॥

বারে বারে যেথায় আপন গানে

স্বপন ভাসাই দূরের পানে,

মাঝে মাঝে দেখে যেয়ো শূন্য বাতায়ন,

সে মোর শূন্য বাতায়ন॥

বনের প্রান্তে ঐ মালতীর লতা

করুণ গন্ধে কয় কী গোপন কথা।

ওরি ডালে আর-শ্রাবণের পাখী

স্মরণখানি আনবে না কি,

আজ-শ্রাবণের সজল ছায়ায় বিরহ মিলন,

আমাদের বিরহ মিলন॥

ঋতুচক্র · ১১

১১

পূব সাগরের পার হ’তে কোন এল’ পরবাসী।

শূন্যে বাজায় ঘন ঘন

হাওয়ায় হাওয়ায় সনসন

সাপ খেলাবার বাঁশী॥

সহসা তাই কোথা হ’তে

কুলুকুলু কলস্রোতে

দিকে দিকে জলের ধারা ছুটেছে উল্লাসী।

আজ দিগন্তে ঘন ঘন গভীর গুরু গুরু

ডমরুরব হয়েছে ঐ সুরু।

তাই শুনে আজ গগনতলে

পলে পলে দলে দলে

অগ্নিবরণ নাগনাগিনী ছুটেছে উদাসী॥

গীতগান · ১১

১১

আমার যে-গান তোমার পরশ পাবে

থাকে কোথায় গহন মনের ভাবে॥

সুরে সুরে খুঁজি তা’রে

অন্ধকারে;

যে-আঁখি জল তোমার পায়ে নাবে

থাকে কোথায় গহন মনের ভাবে॥

যখন শুষ্ক প্রহর বৃথা কাটাই

চাহি গানের লিপি তোমায় পাঠাই।

কোথায় দুঃখ সুখের তলায়

সুর যে পলায়;

যে-শেষ বাণী তোমার দ্বারে যাবে

থাকে কোথায় গহন মনের ভাবে

পূজা · ১১

১১

তোমারি ঝরনাতলার নির্জ্জনে

মাটির এই কলস আমার ছাপিয়ে গেল কোন্ ক্ষণে।৷

রবি ঐ অস্তে নামে শৈলতলে,

বলাকা কোন্ গগনে উড়ে চলে;

আমি এই করুণ ধারার কল কলে

নীরবে কান পেতে রই আনমনে;

তোমারি ঝরনাতলার নির্জ্জনে।

দিনে মোর যা প্রয়োজন বেড়াই তারি খোঁজ ক’রে,

মেটে বা নাই মেটে তা ভাব‍্ব না আর তার তরে।

সারাদিন অনেক ঘুরে দিনের শেষে

এসেছি সকল চাওয়ার বাহির-দেশে,

নেব আজ অসীম ধারার তীরে এসে

প্রয়োজন ছাপিয়ে যা দাও সেই ধনে;

তোমারি ঝরনা-তলার নির্জ্জনে॥

প্রত্যাশা · ১১

১১

সবার সাথে সেই অজানা চল্‌ছিল এই পথের অন্ধকারে,

কোন্ সকালের হঠাৎ আলোয় পাশে আমার দেখতে পেলেম তারে॥

এক নিমিষেই রাত্রি হোলো ভোর,

চিরদিনের ধন যেন সে মোর,

পরিচয়ের অন্ত যেন কোনখানেই নাইক একেবারে;

চেনা কুসুম ফুটে আছে না-চেনা এই গহন বনের ধারে,

অজানা এই পথের অন্ধকারে॥

জানি আমি দিনের শেষে সন্ধ্যা তিমির নামবে পথের মাঝে,

আবার কখন পড়বে আড়াল, দেখা-শোনার বাঁধন রবে না যে।

তখন আমি পাব মনে মনে

পরিচয়ের পরশ ক্ষণে ক্ষণে,

জানব চিরদিনের পথে আঁধার আলোয় চলচি সারে সারে;

হৃদয়মাঝে দেখব খুঁজে একটি মিলন সব-হারানোর পারে

অজানা এই পথের অন্ধকারে॥

বিবিধ · ১১

১১

অগ্নিশিখা এসো এসো আনো আনো আলো।

দুঃখে সুখে ঘরে ঘরে গৃহদীপ জ্বালো ৷

আনো শক্তি, আনো দীপ্তি,

আনো শান্তি, আনো তৃপ্তি,

আনো স্নিগ্ধ ভালোবাসা আনো নিত্য ভালো

এস পুণ্যপথ বেয়ে এস হে কল্যাণী।

শুভ সুপ্তি শুভ জাগরণ দেহ আনি।

দুঃখরাতে মাতৃবেশে

জেগে থাকো নির্ণিমেষে,

আনন্দ উৎসবে, তব শুভ্র হাসি ঢালো॥

অবসান · ১২

১২

কেন আমায় পাগল করে যাস্

ওরে চলে-যাওয়ার দল॥

আকাশে বয় বাতাস উদাস

পরাণ টলমল॥

প্রভাত তারা দিশাহারা,

শরৎ মেঘের ক্ষণিক ধারা,

সভা-ভাঙার শেষ বীণাতে তান লাগে চঞ্চল,

ওরে চলে যাওয়ার দল॥

নাগ-কেশরের ঝরা কেশর ধূলার সাথে মিতা।

গোধূলি সে রক্ত আলোয় জ্বালে আপন চিতা।

শীতের হাওয়ায় ঝরায় পাতা,

আমূলকী বন মরণ-মাতা’,

বিদায় বাঁশির সুরে বিধুর সাঁঝের দিগঞ্চল,

ওরে চলে যাওয়ার দল॥

ঋতুচক্র · ১২

১২

আকাশ তলে দলে দলে মেঘ-যে ডেকে যায়,

আয় আয় আয়।

জামের বনে আমের বনে রব উঠেছে তাই,

যাই, যাই, যাই।

উড়ে যাওয়ার সাধ জাগে তার পুলক-ভরা ডালে

পাতায় পাতায়॥

নদীর ধারে বারে বারে মেঘ-যে ডেকে যায়—

আয় আয় আয়,

কাশের বনে ক্ষণে ক্ষণে রব উঠেছে তাই

যাই, যাই, যাই।

মেঘের গানে তরীগুলি তান মিলিয়ে চলে

পাল-তোলা পাখায়॥

গীতগান · ১২

১২

ওরে,আমার হৃদয় আমার, কখন তোরে প্রভাতকালে

দীপের মত গানের স্রোতে কে ভাসালে॥

যেনরে তুই হঠাৎ বেঁকে

শুকনো ডাঙায় যাসনে ঠেকে,

জড়াসনে শৈবালের জালে॥

তীর যে হোথায় স্থির র’য়েছে,

ঘরের প্রদীপ সেই জ্বালালো,

অচল রহে তাহার আলো।

গানের প্রদীপ তুই যে,—গানে

চলবি ছুটে অকূল পানে

চপল ঢেউয়ের আকুল তালে॥

পূজা · ১২

১২

তোমার দ্বারে কেন আসি

ভুলেই যে যাই—

কতই কি চাই,

দিনের শেষে ঘরে এসে লজ্জা যে পাই॥

সে সব চাওয়া সুখে দুখে

ভেসে বেড়ায় কেবল মুখে,

গভীর বুকে

যে চাওয়াটি গোপন তাহার কথা যে নাই॥

বাসনা সব বাঁধন যেন কুঁড়ির গায়ে,

ফেটে যাবে ঝরে যাবে দখিন বায়ে ৷

একটি চাওয়া ভিতর হতে

ফুট্‌বে তোমার ভোর আলোতে—

প্রাণের স্রোতে

অন্তরে সেই গভীর আশা বয়ে বেড়াই॥

প্রত্যাশা · ১২

১২

আমি এলেম তারি দ্বারে

ডাক দিলেম অন্ধকারে॥

আগল ধ’রে দিলেম নাড়া

প্রহর গেল পাইনি সাড়া,

দেখতে পেলেম না যে তারে॥

তবে যাবার আগে এখান থেকে

এই লিখনখানি যাব রেখে:—

দেখা তোমার পাই বা না পাই

দেখতে এলেম জেনো গো তাই

ফিরে যাই সুদূরের পারে॥

বিবিধ · ১২

১২

যে কাঁদনে হিয়া কাঁদিছে

সে কাঁদনে সেও কাঁদিল,

যে বাঁধনে মোরে বাঁধিছে

সে বাঁধনে তারে বাঁধিল॥

পথে পথে তারে খুঁজিনু,

মনে মনে তারে পূজিনু,

সে পূজার মাঝে লুকায়ে

আমারেও সে যে সাধিল

এসেছিল মন হরিতে

মহা পারাবার পারায়ে।

ফিরিল না আর তরীতে,

আপনারে গেল হারায়ে।

তারি আপনারি মাধুরী

আপনারে করে চাতুরী,

ধরিবে কি ধরা দিবে সে

কি ভাবিয়। ফাঁদ ফাঁদিল॥

অবসান · ১৩

১৩

আমার জীর্ণ পাতা যাবার বেলায় বারে বারে

ডাক দিয়ে যায় নতুন পাতার দ্বারে দ্বারে॥

তাইতো আমার এই জীবনের বনচ্ছায়ে

ফাগুন আসে ফিরে ফিরে দখিন বায়ে;

নতুন সুরে গান উড়ে যায় আকাশপারে,

নতুন রঙে ফুল ফুটে তাই ভারে ভারে॥

ওগো আমার নিত্য নতুন দাড়াও হেসে,

চলব তোমার নিমন্ত্রণে নবীন বেশে।

দিনের শেষে নিলে। যখন পথের আলো,

সাগর তীরে যাত্রা আমার যেই ফুরালো,

তোমার বাঁশি বাজে সাঁঝের অন্ধকারে,

শূন্যে আমার উঠলো তারা সারে সারে ৷

ঋতুচক্র · ১৩

১৩

আজ নবীন মেঘের সুর লেগেছে আমার মনে।

আমার ভাবনা যত উতল হল অকারণে॥

কেমন ক’রে যায় যে ডেকে

বাহির করে ঘরের থেকে,

ছায়াতে চোখ ফেলে ছেয়ে ক্ষণে ক্ষণে।

বাঁধন-হারা জলধারার কলরোলে

আমারে কোন্‌ পথের বাণী যায় যে ব’লে।

সে পথ গেছে নিরুদ্দেশে

মানসলোকে গানের শেষে,

চিরদিনের বিরহিণীর কুঞ্জবনে॥

গীতগান · ১৩

১৩

খেলার ছলে সাজিয়ে আমার গানের বাণী

দিনে দিনে ভাসাই দিনের তরীখানি॥

স্রোতের লীলায় ভেসে ভেসে

সুদূরে কোন অচিন্ দেশে

কোনো ঘাটে ঠেকবে কিনা নাহি জানি॥

না-হয় ডুবে গেলই না-হয় গেলই বা।

না-হয় তুলে লও গো না-হয় ফেলই বা।

হে অজানা, মরি মরি

উদ্দেশে এই খেলা করি,—

এই খেলাতেই আপন মনে ধন্য মানি॥

পূজা · ১৩

১৩

জয় হোক্ জয় হোক্ নব অরুণোদয়।

পূর্ব্ব দিগঞ্চল হোক্ জ্যোতির্ম্ময়॥

এসো অপরাজিত বাণী

অসত্য হানি,

অপহত শঙ্কা অপগত সংশয়॥

এসো নব জাগ্রত প্রাণ

চির যৌবন জয়গান।

এসো মৃত্যুঞ্জয় আশা

জড়ত্বনাশা,

ক্রন্দন দূর হোক্ বন্ধন হোক্ ক্ষয়॥

প্রত্যাশা · ১৩

১৩

জ্বলে নি আলো অন্ধকারে,

দাও না সাড়া কি তাই বারে বারে

তোমার বাঁশি আমার বাজে বুকে,

কঠিন দুখে গভীর সুখে,

যে জানে না পথ কাঁদাও তারে॥

চেয়ে রই রাতের আকাশ পানে,

মন যে কী চায় তা মনই জানে ৷

আশা জাগে কেন অকারণে

আমার মনে ক্ষণে ক্ষণে

ব্যথার টানে তোমায় আনবে দ্বারে॥

বিবিধ · ১৩

১৩

অলকে কুসুম না দিয়ো,

শুধু শিথিল কবরী বাঁধিয়ো॥

কাজলবিহীন সজল নয়নে

হৃদয়-দুয়ারে ঘা দিয়ো॥

আকুল আঁচলে পথিক-চরণে

মরণের ফাঁদ ফাঁদিয়ো।

না করিয়া বাদ মনে যাহা সাধ

নিদয়া নীরবে সাধিয়ো॥

এস এস বিন। ভূষণেই,

দোষ নেই তাহে দোষ নেই।

যে আসে আসুক, ঐ তব রূপ

অযতন-ছাঁদে ছাঁদিয়ো।

শুধু হাসিখানি আঁখি কোণে হানি

উতলা হৃদয় ধাঁধিয়ো॥

অবসান · ১৪

১৪

দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না,

(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥)

কান্নাহাসির বাঁধন তারা সইলো না,

(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি)॥

আমার প্রাণের গানের ভাষা

শিখবে তারা ছিল আশা,

উড়ে গেল, সকল কথা কইলো না।

(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥)

স্বপন দেখি যেন তারা কার্ আশে

ফেরে আমার ভাঙা খাঁচার চার পাশে

(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥)

এত বেদন হয় কি ফাঁকি?

ওরা কি সব ছায়ার পাখী?

আকাশ পারে কিছুই কি গো বইলো না?

(সেই যে আমার নানা রঙের দিনগুলি॥)

ঋতুচক্র · ১৪

১৪

বহুযুগের ওপার হতে আষাঢ় এল আমার মনে,

কোন্ সে কবির ছন্দ বাজে ঝরঝর বরিষণে॥

যে-মিলনের মালাগুলি

ধূলায় মিশে হ’ল ধূলি

গন্ধ তারি ভেসে আসে আজি সজল সমীরণে॥

সেদিন এমনি মেঘের ঘটা রেবা নদীর তীরে,

এমনি বারি ঝরেছিল শ্যামল শৈলশিরে।

মালবিক অনিমিখে

চেয়ে ছিল পথের দিকে,

সেই চাহনি এল ভেসে কালো মেঘের ছায়ার সনে।

গীতগান · ১৪

১৪

কুল থেকে মোর গানের তরী দিলেম খুলে,—

সাগরমাঝে ভাসিয়ে দিলেম পালটি তুলে॥

যেখানে ঐ কোকিল ডাকে ছায়াতলে—

সেখানে নয়।

যেখানে ঐ গ্রামের বধু আসে জলে—

সেখানে নয়।

যেখানে নীল মরণ-লীলা উঠছে দুলে

সেখানে মোর গানের তরী দিলেম খুলে॥

এবার বীণা তোমায় আমায় আমরা একা।

অন্ধকারে নাইবা কারে গেল দেখা।

কুঞ্জবনের শাখা হ’তে যে ফুল তোলে

সে ফুল এ নয়।

বাতায়নের পাতা হ’তে যে ফুল দোলে

সে ফুল এ নয়।

দিশাহারা আকাশভরা সুরের ফুলে,

সেই দিকে মোর গানের তরী দিলেম খুলে॥

পূজা · ১৪

১৪

আমার হৃদয় তোমার আপন হাতের দোলে দোলাও

কে আমারে কী যে বলে ভোলাও ভোলাও॥

ওরা কেবল কথার পাকে

নিত্য আমায় বেঁধে রাখে,

বাঁশির ডাকে সকল বাঁধন খোলাও॥

মনে পড়ে কত না দিন রাতি

আমি ছিলেম তোমার খেলার সাথী।

আজকে তুমি তেমনি ক’রে

সামনে তোমার রাখ ধ’রে,

আমার প্রাণে খেলার সে ঢেউ তোলাও॥

প্রত্যাশা · ১৪

১৪

ও আমার ধ্যানেরি ধন,

তোমায় হৃদয়ে দোলায় যে হাসি রোদন॥

আসে বসন্ত, ফোটে বকুল,

কুঞ্জে পূর্ণিমা চাঁদ হেসে আকুল,

তা’রা তোমায় খুঁজে না পায়

প্রাণের মাঝে আছ গোপন স্বপন॥

আঁখিরে ফাঁকি দাও, এ কী ধারা৷

অশ্রুজলে তা’রে করো সারা।

গন্ধ আসে, কেন দেখিনে মালা,

পায়ের ধ্বনি শুনি, পথ নিরালা,

বেলা যে যায়, ফুল যে শুকায়,

অনাথ হয়ে আছে আমার ভুবন॥

বিবিধ · ১৪

১৪

যখন ভাঙ‍্ল মিলন মেলা

ভেবেছিলেম ভুল‍্বনা আর চক্ষের জল ফেলা॥

দিনে দিনে পথের ধূলায়

মালা হ’তে ফুল ঝ’রে যায়,

জানিনে ত কখন এল বিস্মরণের বেলা॥

দিনে দিনে কঠিন হ’ল কখন্ বুকের তল,

ভেবেছিলেম ঝরবেনা আর আমার চোখের জল।

হঠাৎ দেখা পথের মাঝে

কান্না তখন থামে না যে

ভোলার তলে তলে ছিল অশ্রুজলের খেলা॥

অবসান · ১৫

১৫

আমার সকল দুখের প্রদীপ জ্বেলে, দিবস গেলে করব নিবেদন

আমার ব্যথার পূজা হয়নি সমাপন॥

যখন বেলা শেষের ছায়ায় পাখীরা যায় আপন কুলায় মাঝে,

সন্ধ্যা পূজার ঘণ্টা যখন বাজে,

তখন আপন শেষ শিখাটি জ্বালবে এ জীবন,

ব্যথার পূজা হবে সমাপন॥

অনেক দিনের অনেক কথা, ব্যাকুলতা, বাঁধা বেদন ডোরে

মনের মাঝে উঠেছে আজ ভ’রে।

যখন পূজার হোমানলে উঠবে জ্বলে’ একে একে তা’রা

আকাশ-পানে ছুটবে বাঁধন-হারা,

অস্ত-রবির ছবির সাথে মিল্‌বে আয়োজন,

ব্যথার পূজা হবে সমাপন॥

ঋতুচক্র · ১৫

১৫

এ কী গভীর বাণী এল ঘন মেঘের আড়ালে ধ’রে

সকল আকাশ আকুল ক’রে॥

সেই বাণীর পরশ লাগে,

নবীন প্রাণের বাণী জাগে,

হঠাৎ দিকে দিগন্তরে ধরার হৃদয় ওঠে ভ’রে॥

কে সে বাঁশি বাজিয়েছিল কবে প্রথম সুরে তালে,

প্রাণেরে ডাক দিয়েছিল সুদূর আঁধার আদিকালে।

তার বাঁশির ধ্বনিখানি

আজ আষাঢ় দিল আনি,

সেই অগোচরের তরে তামার হৃদয় নিল হ’রে॥

গীতগান · ১৫

১৫

যায় নিয়ে যায় আমায় আপন গানের টানে

ঘরছাড়া কোন পথের পানে॥

নিত্যকালের গোপন কথা

বিশ্বপ্রাণের ব্যাকুলতা

আমার বাঁশী দেয় এনে দেয় আমার কানে॥

মনে যে হয় আমার হৃদয় কুসুম হ’য়ে ফোটে

আমার হিয়া উচ্ছলিয়া সাগরে ঢেউ ওঠে।

পরাণ আমার বাঁধন হারায়

নিশীথ রাতের তারায় তারায়

আকাশ আমায় কয় কী যে কয় কেই বা জানে॥

পূজা · ১৫

১৫

রজনীর শেষ তারা, গোপনে আঁধারে আধঘুমে

বাণী তব রেখে যাও প্রভাতের প্রথম কুসুমে॥

সেই মত যিনি এই জীবনের আনন্দরূপিণী

শেষক্ষণে দেন যেন তিনি

নব জীবনের মুখ চুমে॥

এই নিশীথের স্বপ্নরাজি

নবজাগরণক্ষণে নবগানে উঠে যেন বাজি।

বিরহিণী যে ছিলরে মোর হৃদয়ের মর্ম্মমাঝে

বধুবেশে সেই যেন সাজে

নব দিনে চন্দনে কুঙ্কুমে॥

প্রত্যাশা · ১৫

১৫

আমার যদিই বেলা যায় গো ব’য়ে

জেনো জেনো মন রয়েচে তোমায় ল’য়ে

পথের ধারে আসন পাতি,

তোমায় দেবার মালা গাঁথি,

জেনো জেনো তাইতে আছি মগন হ’য়ে॥

চলে গেল যাত্রী সবে

নানান পথে কলরবে।

আমার চলা এমনি ক’রে

আপন হাতে সাজি ভ’রে

জেনো জেনো আপন মনে গোপন র’য়ে॥

বিবিধ · ১৫

১৫

না হয় তোমার যা হয়েচে তাই হ’ল;

আরো কিছু নাই হ’ল, নাই হ’ল, নাই হ’ল

কেউ যা কভু দেয় না ফাঁকি

সেইটুকু তোর থাক্ না বাকি;

পথেই না হয় ঠাঁই হ’ল,

আরো কিছু নাই হ’ল, নাই হ’ল, নাই হ’ল

চলরে সোজা বীণার তারে ঘা দিয়ে

ডাইনে বাঁয়ে দৃষ্টি তোমার না দিয়ে ৷

হারিয়ে চলিস্ পিছনেরে,

সামনে যা পাস কুড়িয়ে নেরে—

খেদ কিরে তোর যা’ই হ’ল—

আরো কিছু নাই হ’ল, নাই হ’ল, নাই হ’ল॥

অবসান · ১৬

১৬

কেনরে এই দুয়ারটুকু পার হ’তে সংশয়?

জয় অজানার জয়।

এই দিকে তোর ভরসা যত, ঐ দিকে তোর ভয়

জয় অজানার জয়॥

জানা-শোনার বাসা বেঁধে

কাটল তো দিন হেসে কেঁদে,

এই কোণেতেই আনাগোনা নয় কিছুতেই নয়;

জয় অজানার জয়॥

মরণকে তুই পর করেছিস্, ভাই,

জীবন যে তোর ক্ষুদ্র হল তাই।

দু’দিন দিয়ে ঘেরা ঘরে

তাইতে যদি এতই ধরে

চিরদিনের আবাসখানা সেই কি শূন্যময়?

জয় অজানার জয়॥

ঋতুচক্র · ১৬

১৬

কদম্বেরি কানন ঘেরি আষাঢ় মেঘের ছায়া খেলে,

পিয়ালগুলি নাটের ঠাটে হাওয়ায় হেলে॥

বরষণের পরশনে

শিহর লাগে বনে বনে,

বিরহী এই মন-যে আমার সুদূর পানে পাখা মেলে॥

আকাশপথে বলাকা ধায় কোন্ সে অকারণের বেগে,

পূব হাওয়াতে ঢেউ খেলে যায় ডানার গানের তুফান লেগে

ঝিল্লিমুখর বাদল সাঁঝে

কে দেখা দেয় হৃদয় মাঝে,

স্বপনরূপে চুপে চুপে ব্যথায় আমার চরণ ফেলে॥

গীতগান · ১৬

১৬

যতখন তুমি আমায় বসিয়ে রাখো বাহির বাটে

ততখন গানের পরে গান গেয়ে মোর প্রহর কাটে॥

যবে শুভক্ষণে ডাক পড়ে সেই ভিতর সভার মাঝে

এ গান লাগ্‌বে বুঝি কাজে,

তোমার সুরের রঙের রঙীন নাটে॥

তোমার ফাগুন দিনের বকুল চাঁপা, শ্রাবণ দিনের কেয়া,

তাই দেখে ত বুঝি তোমার কেমন যে তান দেয়া।

আমি উতল প্রাণে আকাশ পানে হৃদয়খানি তুলি

বীণায় বেঁধেচি গানগুলি

তোমার সাঁঝ-সকালের সুরের ঠাটে॥

পূজা · ১৬

১৬

আমায় দাওগো ব’লে

সেকি তুমি আমায় দাও দোলা অশান্তি দোলে॥

দেখতে না পাই পিছে থেকে

আঘাত দিয়ে হৃদয়ে কে

ঢেউ যে তোলে॥

মুখ দেখিনে তাই লাগে ভয়

জানি না যে এ কিছু নয়।

মুছব আঁখি উঠব হেসে,

দোলা যে দেয় সেই তো এসে

ধরবে কোলে॥

প্রত্যাশা · ১৬

১৬

আমি জ্বালব না মোর বাতায়নে প্রদীপ আনি।

আমি শুনব ব’সে আঁধার-ভরা গভীর বাণী॥

আমার এ-দেহ মন মিলায়ে যাক্ নিশীথ রাতে,

আমার লুকিয়ে ফোটা এই হৃদয়ের পুষ্পপাতে

থাক্ না ঢাকা মোর বেদনার গন্ধখানি॥

আমার সকল হৃদয় উধাও হ’বে তারার মাঝে

যেখানে ঐ আঁধার বীণায় আলো বাজে।

আমার সকল দিনের পথ খোঁজা এই হ’ল সারা,

এখন দিগ্‌বিদিকের শেষে এসে, দিশাহারা

কিসের আশায় ব’সে আছে অভয় মানি।৷

বিবিধ · ১৬

১৬

সে কোন বনের হরিণ ছিল আমার মনে

কে তারে বাঁধল অকারণে॥

গতি-রাগের সে ছিল গান, আলো ছায়ার সে ছিল প্রাণ,

আকাশকে সে চম্‌কে দিত বনে ৷

কে তারে বাঁধল অকারণে॥

মেঘলা দিনের আকুলতা বাজিয়ে যেত পায়ে

তমাল ছায়ে ছায়ে।

ফাগুনে সে পিয়াল তলায় কে জানিত কোথায় পলায়

দখিনহাওয়ার চঞ্চলতার সনে।

কে তারে বাঁধল অকারণে॥

অবসান · ১৭

১৭

যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে,

বাইব না মোর খেয়া তরী এই ঘাটে,

চুকিয়ে দেব বেচা-কেনা,

মিটিয়ে দেব লেনা-দেনা,

বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে;

আমায় তখন নাইবা মনে রাখলে,

তারার পানে চেয়ে চেয়ে

আমায় ডাকলে॥

যখন জম্‌বে ধূলা তানপুরাটার তারগুলায়—

কাঁটালতা উঠবে ঘরের দ্বারগুলায়,

ফুলের বাগান, ঘন ঘাসের

পরবে সজ্জা বনবাসের,

শ্যাওলা এসে ঘিরবে দীঘির ধারগুলায়,

আমায় তখন নাইবা মনে রাখলে,

তারার পানে চেয়ে চেয়ে

নাইবা আমায় ডাকূলে॥

তখন এমনি করেই বাজবে বাঁশী এই নাটে,

কাট্‌বে গো দিন যেমন আজো দিন কাটে।

ঘাটে ঘাটে খেয়ার তরী

এমনি সেদিন উঠবে ভরি,

চরবে গোরু, খেল্‌বে রাখাল ঐ মাঠে।

আমায় তখন নাইবা মনে রাখলে,

তারার পানে চেয়ে চেয়ে

নাইবা আমায় ডাকলে॥

তখন কে বলে গো সেই প্রভাতে নেই আমি।

সকল খেলায় করবে খেলা এই আমি।

নতুন নামে ডাকবে মোরে

বাঁধবে নতুন বাহু ডোরে,

আসব যাব চিরদিনের সেই-আমি।

আমায় তখন নাইবা মনে রাখলে ৷

তারার পানে চেয়ে চেয়ে

নাইবা আমায় ডাকলে॥

ঋতুচক্র · ১৭

১৭

আষাঢ় কোথা হ’তে আজি পেলি ছাড়া?

মাঠের শেষে শ্যামল বেশে ক্ষণেক দাঁড়া॥

জয়ধ্বজা ওই যে তোমার গগন জুড়ে

পূব হ’তে কোন পশ্চিমেতে যায়রে উড়ে,

গুরু গুরু ভেরী কারে দেয় যে সাড়া॥

নাচের নেশা লাগ্‌ল তালের পাতায় পাতায়,

হাওয়ার দোলায় দোলায় শালের বনকে মাতায়

আকাশ হ’তে আকাশে কা’র ছুটোছুটি,

বনে বনে মেঘের ছায়ায় লুটোপুটি,

ভরা নদীর ঢেউয়ে ঢেউয়ে কে দেয় নাড়া॥

গীতগান · ১৭

১৭

আমি কান পেতে রই আমার আপন হৃদয় গহন দ্বারে;

কোন গোপনবাসীর কান্নাহাসির গোপন কথা শুনিবারে

ভ্রমর সেথায় হয় বিরাগী

নিভৃত নীল পদ্ম লাগি যে,

কোন রাতের পাখী গায় একাকী সঙ্গিবিহীন অন্ধকারে॥

কে সে আমার কেই বা জানে, কিছু বা তা’র দেখি আভা।

কিছু বা পাই অনুমানে কিছু তাহার বুঝি না বা।

মাঝে মাঝে তা’র বারতা

আমার ভাষায় পায় কী কথা রে,

ওসে আমায় জানি পাঠায় বাণী আমার গানে লুকিয়ে তা’রে॥

পূজা · ১৭

১৭

বুঝেছি কি বুঝি নাইবা সে তর্কে কাজ নাই,

ভালো আমার লেগেছে যে রইল সেই কথাই ৷

ভোরের আলোয় নয়ন ভরে

নিত্যকে পাই নূতন ক’রে

কাহার মুখে চাই॥

প্রতিদিনের কাজের পথে করতে আনাগোনা,

কানে আমার লেগেছে গান করেছে আনমনা।

হৃদয়ে মোর কখন জানি

পড়ল পায়ের চিহ্নখানি

চেয়ে দেখি তাই॥

প্রত্যাশা · ১৭

১৭

আমায় থাকতে দে না আপন মনে।

সেই চরণের পরশখানি মনে পড়ে ক্ষণে ক্ষণে॥

কথার পাকে কাজের ঘোরে

ভুলিয়ে রাখে কে আর মোরে?

তার স্মরণের বরণমালা গাঁথব বসে গোপন কোণে

এই যে ব্যথার রতনখানি

আমার বুকে দিল আনি—

এই নিয়ে আজ দিনের শেষে

একা চলি তার উদ্দেশে,

নয়নজলে সামনে দাঁড়াই তারে সাজাই তারি ধনে

বিবিধ · ১৭

১৭

আমার এ পথ তোমার পথের থেকে

অনেক দূরে গেছে বেঁকে॥

আমার ফুলে আর কি কবে,

তোমার মালা গাঁথা হবে,

তোমার বাঁশি দূরের হাওয়ায় কেঁদে বাজে কারে ডেকে।৷

শ্রান্তি লাগে পায়ে পায়ে,

বসি পথের তরুছায়ে।

সাথীহারার গোপন ব্যথা

বল্‌ব যারে সেজন কোথা,

পথিকরা যায় আপন মনে, আমারে যায় পিছে রেখে।৷

অবসান · ১৮

১৮

ঐ বুঝি কালবৈশাখী

সন্ধ্যা আকাশ দেয় ঢাকি॥

ভয় কিরে তোর ভয় কারে

দ্বার খুলে দিস্ চারধারে,

শোন্ দেখি ঘোর হুঙ্কারে

নাম তোরি ঐ যায় ডাকি॥

তোর সুরে আর তোর গানে

দিস্ সাড়া তুই ওর পানে।

যা নড়ে তায় দিক্ নেড়ে,

যা যাবে তা যাক্ ছেড়ে,

যা ভাঙা তাই ভাঙবেরে

যা রবে তাই থাক্ বাকি॥

ঋতুচক্র · ১৮

১৮

ছায়া ঘনাইছে বনে বনে,

গগনে গগনে ডাকে দেয়া।

কবে নব ঘন বরিষণে

গোপনে গোপনে এলি কেয়া॥

পূরবে নীরব ইসারাতে

একদা নিদ্রাহীন রাতে

হাওয়াতে কী পথে দিলি খেয়া

যে-মধু হৃদয়ে ছিল মাখা

কাঁটাতে কী ভয়ে দিলি ঢাকা।

বুঝি এলি যার অভিসারে

মনে মনে দেখা হল তারে

আড়ালে আড়ালে দেয়া-নেয়া।

গীতগান · ১৮

১৮

গানের ঝরণা-তলায় তুমি সাঁঝের বেলায় এলে।

দাও আমারে সোনার বরণ সুরের ধারা ঢেলে॥

যে-সুর গোপন গুহা হ’তে,

ছুটে’ আসে আকুল স্রোতে,

কান্না-সাগর পানে যে যায় বুকের পাথর ঠেলে॥

যে-সুর উষার বাণী ব’য়ে আকাশে যায় ভেসে।

রাতের কোলে যায় গো চ’লে সোনার হাসি হেসে।

যে-সুর চাঁপার পেয়ালা ভ’রে,

দেয় আপনায় উজাড় ক’রে,

যায় চ’লে যায় চৈত্র-দিনের মধুর খেলা খেলে॥

পূজা · ১৮

১৮

দিন অবসান হ’ল।

আমার আঁখি হতে অস্তরবির আলোর আড়াল তোলো॥

অন্ধকারের বুকের কাছে

নিত্য আলোর আসন আছে,

সেথায় তোমার দুয়ারখানি খোলো॥

সব কথা সবকথার শেষে

এক হয়ে যাক মিলিয়ে এসে।

স্তব্ধ বাণীর হৃদয় মাঝে

গভীর বাণী আপনি বাজে,

সেই বাণীটি আমার কানে বোলো॥

প্রত্যাশা · ১৮

১৮

যুগে যুগে বুঝি আমায় চেয়েছিল সে।

সেই যেন মোর পথের ধারে রয়েছে ব’সে॥

আজ কেন মোর পড়ে মনে

কখন যেন চোখের কোণে

দেখেছিলেম অফুট প্রদোষে—

সেই যেন মোর পথের ধারে রয়েছে ব’সে॥

আজ ঐ চাঁদের বরণ হবে আলোর সঙ্গীতে।

রাতের মুখের আঁধারখানি খুলবে ইঙ্গিতে ৷

শুক্লরাতে সেই আলোকে

দেখা হবে এক পলকে,

সব আবরণ যাবে যে খ’সে;

সেই যেন মোর পথের ধারে রয়েছে ব’সে॥

বিবিধ · ১৮

১৮

সে আমার গোপন কথা

শুনে যা, ও সখি।

ভেবে না পাই বল্‌ব কি॥

প্রাণ আমার বাঁশি শোনে

নীল গগনে,

গান হয়ে যায় নিজের মনে যাহাই বকি॥

সে যেন আসবে আমার মন বলেছে,

হাসির পরে তাই তো চোখের জল গলেছে।

দেখ‍্লো তাই দেয় ইসারা

তারায় তারা,

চাঁদ হেসে ঐ হল সারা তাহাই লখি’॥

অবসান · ১৯

১৯

যে আমি ঐ ভেসে চলে

কালের ঢেউয়ে আকাশতলে,

দূরে রেখে দেখ্‌চি তারে চেয়ে

ধূলার সাথে, জলের সাথে,

ফুলের সাথে, ফলের সাথে,

সবার সাথে চল্‌চে ও যে ধেয়ে॥

ও যে সদাই বাইরে আছে,

দুঃখে সুখে নিত্য নাচে,

ঢেউ দিয়ে যায়, দোলে যে ঢেউ খেয়ে;

একটু ক্ষয়ে ক্ষতি লাগে,

একটু ঘায়ে ক্ষত জাগে,

ওরি পানে দেখচি আমি চেয়ে॥

এই যে আমি ঐ আমি নই,

আপন মাঝে আপনি যে রই,

যাইনে ভেসে মরণধারা বেয়ে—

মুক্ত আমি, তৃপ্ত আমি,

শান্ত আমি, দীপ্ত আমি।

ওরি পানে দেখ্‌চি আমি চেয়ে॥

ঋতুচক্র · ১৯

১৯

কাঁপিছে দেহলতা থরথর,

চোখের জলে আঁখি ভরভর॥

দোদুল তমালেরি বনছায়া

তোমারি নীলবাসে নিল কায়া,

বাদল নিশীথেরি ঝরঝর

তোমার আঁখি পরে ভরভর॥

যে-কথা ছিল তব মনে মনে

চমকে অধরের কোণে কোণে।

নীরব হিয়া তব দিল ভরি

কী মায়া-স্বপনে যে মরি মরি,

আঁধার কাননের মরমর

বাদল নিশীথের ঝরঝর॥

গীতগান · ১৯

১৯

আমার সুরে লাগে তোমার হাসি।

যেমন ঢেউয়ে ঢেউয়ে রবির কিরণ দোলে আসি॥

দিবানিশি আমিও যে

ফিরি তোমার সুরের খোঁজে

হঠাৎ এমন ভোলায় কখন তোমার বাঁশি॥

আমার সকল কাজই রইল বাকি,

সকল শিক্ষা দিলেম ফাঁকি।

আমার গানে তোমায় ধ’র্‌ব ব’লে

উদাস হ’য়ে যাই যে চ’লে,

তোমার গানে ধরা দিতে ভালবাসি॥

পূজা · ১৯

১৯

আজি বিজন ঘরে নিশীথ রাতে আসবে যদি শূন্য হাতে

আমি তাইতে কি ভয় মানি?

জানি জানি বন্ধু জানি

তোমার আছেতো হাতখানি॥

চাওয়া পাওয়ার পথে পথে দিন কেটেছে কোনো মতে

এখন সময় হ’ল তোমার কাছে আপনাকে দিই আনি॥

জানি জানি বন্ধু জানি

তোমার আছেতো হাতখানি॥

আঁধার থাকুক্ দিকে দিকে আকাশ-অন্ধ-করা,

তোমার পরশ থাকুক্ আমার হৃদয়-ভরা।

জীবন দোলায় দুলে দুলে আপনারে ছিলেম ভুলে

এখন জীবন মরণ দু’দিক দিয়ে নেবে আমায় টানি ৷

জানি জানি বন্ধু জানি

তোমার আছেতো হাতখানি॥

প্রত্যাশা · ১৯

১৯

আমার বেলা যে যায় সাঁঝ বেলাতে

তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে॥

আমার একতারাটির একটি তারে

গানের বেদন বইতে নারে,

তোমার সাথে বারে বারে

হার মেনেছি এই খেলাতে ৷

তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে॥

আমার এ তার বাঁধা কাছের সুরে,

ঐ বাঁশি যে বাজে দূরে।

তোমার গানের লীলার সেই কিনারে

যোগ দিতে কি সবাই পারে,

বিশ্ব-হৃদয়-পারাবারে

রাগ-রাগিণীর জাল ফেলাতে,

তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে॥

বিবিধ · ১৯

১৯

যেন কোন্ ভুলের ঘোরে

চাঁদ চলে যায় সরে সরে॥

পাড়ি দেয় কালো নদী,

আয় রজনী দেখবি যদি,

কেমনে তুই রাখবি ধরে,

দূরের বাঁশি ডাকূল ওরে॥

প্রহরগুলি বিলিয়ে দিয়ে

সর্ব্বনাশের সাধন কি এ?

মগ্ন হয়ে রইবে বসে

মরণ ফুলের মধুকোষে,

নতুন হয়ে আবার তোরে

মিল্‌বে বুঝি সুধায় ভ’রে॥

অবসান · ২০

২০

যাব, যাব, যাব তবে;

যেতে যদি হয় হবে।

লেগেছিল কত ভালো

এই যে আঁধার আলো,

খেলা করে শাদা কালো

উদার নভে ৷

গেল দিন ধরামাঝে

কত ভাবে কত কাজে,

সুখে দুখে কভু লাজে,

কভু গরবে।

যেতে যদি হয় হবে

প্রাণপণে কতদিন

শুধেছি কঠিন ঋণ,

কখনো বা উদাসীন

ভুলেছি সবে।

কভু ক’রে গেনু খেলা,

স্রোতে ভাসাইনু ভেলা,

আনমনে কত বেলা

কাটামু ভবে।

যেতে যদি হয় হবে

জীবন হয় নি ফাকি,

ফলে ফুলে ছিল ঢাকি’,

যদি কিছু রহে বাকি

কে তা’হা ল’বে

দেওয়া-নেওয়া যাবে চুকে,

বোঝা-খ’সে-যাওয়া বুকে

যাব চ’লে হাসিমুখে

যাব নীরবে।

যেতে যদি হয় হবে॥

ঋতুচক্র · ২০

২০

তিমির অবগুণ্ঠনে বদন তব ঢাকি’

কে তুমি মম অঙ্গনে দাঁড়ালে একাকী॥

আজি সঘন শর্ব্বরী মেঘমগন তারা,

নদীর জলে ঝর্ঝরি’ ঝরিছে জলধারা,

তমাল বন মর্ম্মরি’ পবন চলে হাঁকি।

যে-কথা মম অন্তরে আনিছ তুমি টানি

জানিনা কোন মন্তরে তাহারে দিব বাণী।

রয়েছি বাঁধা বন্ধনে, ছিঁড়িব, যাব বাটে,

যেন এ বৃথা ক্রন্দনে এ নিশি নাহি কাটে।

কঠিন বাধা-লঙ্ঘনে দিব না আমি ফাঁকি৷

গীতগান · ২০

২০

আমার মনের মাঝে যে গান বাজে শুনতে কি পাওগো

আমার চোখের পরে আভাস দিয়ে যখনি যাও গে।॥

রবির কিরণ নেয় যে টানি

ফুলের বুকের শিশির খানি

আমার প্রাণের সে গান তুমি তেম্‌নি কি নাও গো॥

আমার উদাস হৃদয় যখন আসে বাহির পানে,

আপনাকে যে দেয় ধরা সে সকলখানে।

কচিপাতা প্রথম প্রাতে

কী কথা কয় আলোর সাথে,

আমার মনের আপন কথা বলে যে তাও গো॥

পূজা · ২০

২০

তোমার ভুবনজোড়া আসনখানি

হৃদয় মাঝে বিছাও আনি॥

রাতের তারা, দিনের রবি,

আঁধার আলোর সকল ছবি,

তোমার আকাশ-ভর। সকল বাণী

হৃদয় মাঝে বিছাও আনি॥

তোমার ভুবন-বীণার সকল সুরে

হৃদয় পরাণ দাও না পূরে ৷

দুঃখসুখের সকল হরষ,

ফুলের পরশ, ঝড়ের পরশ,

তোমার করুণ শুভ উদার পাণি

হৃদয় মাঝে দিক্ না আনি॥

প্রত্যাশা · ২০

২০

আমার দিন ফুরালো ব্যাকুল বাদল সাঁঝে,

গহন মেঘের নিবিড় ধারার মাঝে॥

বনের ছায়ার জল-ছলছল সুরে,

হৃদয় আমার কানায় কানায় পূরে।

খনে খনে ঐ গুরুগুরু তালে তালে

গগনে গগনে গভীর মৃদঙ বাজে॥

কোন্ দূরের মানুষ যেন এল আজ কাছে,

তিমির আড়ালে নীরবে দাড়ায়ে আছে।

বুকে দোলে তার বিরহ ব্যথার মালা,

গোপন মিলন-অমৃতগন্ধ ঢালা;

মনে হয় তার চরণের ধ্বনি জানি,

হার মানি তার অজানা জনের সাজে॥

বিবিধ · ২০

২০

তুমি মোর পাও নাই পরিচয়।

তুমি যারে জানো সে যে কেহ নয়, কেহ নয়॥

মালা দাও তারি গলে,

শুকায় তা’ পলে পলে,

আলো তার ভয়ে ভয়ে রয়,

বায়ু পরশন নাহি সয়॥

এসো এসো, দুঃখ, জ্বালো শিখা,

দাও ভালে অগ্নিময়ী টিকা।

মরণ আসুক চুপে

পরম প্রকাশরূপে,

সব আবরণ হোক্ লয়,

ঘুচুক্ সকল পরাজয়।৷

অবসান · ২১

২১

কে বলে, “যাও যাও”—আমার

যাওয়া তো নয় যাওয়া॥

টুটবে আগল বারে বারে

তোমার দ্বারে

লাগবে আমায় ফিরে ফিরে ফিরে আসার হাওয়া॥

ভাসাও আমায় ভাঁটার টানে

অকূল পানে,

আবার জোয়ার জলে তীরের তলে ফিরে তরী বাওয়া॥

পথিক আমি পথেই বাসা,

আমার যেমন যাওয়া তেম্‌নি আসা।

ভোরের আলোয় আমার তারা

হোক্ না হারা,

আবার জ্বল্‌বে সাঁজে আঁধার মাঝে তা’রি নীরব চাওয়া

ঋতুচক্র · ২১

২১

এই সকাল বেলার বাদল-আঁধারে

আজি বনের বীণায় কী সুর বাঁধা রে॥

ঝরঝর বৃষ্টি কলরোলে

তালের পাতা মুখর ক’রে তোলে,

উতল হাওয়া বেণুশাখায় লাগায় ধাঁদা রে॥

ছায়ার তলে তলে জলের ধারা ঐ

হের দলে দলে নাচে তাথৈ থৈ।

মন-যে আমার পথ-হারানো সুরে

সকল আকাশ বেড়ায় ঘুরে ঘুরে,

শোনে যেন কোন্‌ ব্যাকুলের করুণ কাঁদা রে॥

গীতগান · ২১

২১

আমার একটি কথা বাঁশি জানে, বাঁশিই জানে॥

ভ’রে রইল বুকের তলা,

কারো কাছে হয়নি বলা,

কেবল ব’লে গেলেম বাঁশির কানে কানে॥

আমার চোখে ঘুম ছিল না গভীর রাতে,

চেয়ে ছিলেম, চেয়ে-থাকা তারার সাথে

এম্‌নি গেল সারারাতি,

পাইনি আমার জাগার সাথী,

বাঁশিটিরে জাগিয়ে গেলেম গানে গানে॥

পূজা · ২১

২১

তোমার হাতের রাখী খানি বাঁধো আমার দখিন হাতে,

সূর্য্য যেমন ধরার করে আলোক রাখী জড়ায় প্রাতে।৷

তোমার আশিষ আমার কাজে

সফল হবে বিশ্ব মাঝে

জ্বল্‌বে তোমার দীপ্ত শিখা আমার সকল বেদনাতে।৷

কর্ম্ম করি যে-হাত লয়ে কর্ম্ম-বাঁধন তারে বাঁধে।

ফলের আশা শিকল হ’য়ে জড়িয়ে ধরে জটিল ফাঁদে।

তোমার রাখী বাঁধো আঁটি’,—

সকল বাঁধন যাবে কাটি’,

কর্ম্ম তখন বীণার মত বাজ্‌বে মধুর মূর্চ্ছনাতে॥

প্রত্যাশা · ২১

২১

সময় আমার নাই যে বাকি,

শেষের প্রহর পূর্ণ করে দেবে না কি।

বারে বারে কারা করে আনাগোনা,

কোলাহলে সুরটুকু আর যায় না শোনা,

ক্ষণে ক্ষণে গানে আমার পড়ে কঁকি

শেষের প্রহর পূর্ণ করে দেবে না কি॥

পণ করেছি তোমার হাতে আপনারে

শেষ করে আজ চুকিয়ে দেব একেবারে ৷

মিটিয়ে দেব সকল খোঁজা, সকল বোঝা,

ভোর বেলাকার একলা পথে চলব সোজা,

তোমার আলোয় ডুবিয়ে নেব সজাগ আঁখি;

শেষের প্রহর পূর্ণ ক’রে দেবে না কি॥

বিবিধ · ২১

২১

প্রাণ চায় চক্ষু না চায়

মরি একি তোর দুস্তর লজ্জা।

সুন্দর এসে ফিরে যায়

তবে কার লাগি মিথ্যা এ সজ্জ।

মুখে নাহি নিঃসরে ভাষ

দহে অন্তরে নির্ব্বাক বহ্নি।

ওষ্ঠে কি নিষ্ঠুর হাস,

তব মর্ম্মে যে ক্রন্দন, তন্বি।

মাল্য যে দংশিছে হায়,

তোর শয্যা যে কণ্টক-শয্যা।

মিলন-সমুদ্র-বেলায়

চির-বিচ্ছেদ-জর্জ্জর মজ্জা।৷

ঋতুচক্র · ২২

২২

আজ আকাশের মনের কথা ঝরঝর বাজে,

সারা প্রহর আমার বুকের মাঝে॥

দিঘির কালো জলের পরে

মেঘের ছায়া ঘনিয়ে ধরে,

বাতাস বহে যুগান্তরের প্রাচীন বেদন যে

সারা প্রহর আমার বুকের মাঝে॥

আঁধার বাতায়নে

একলা আমার কানাকানি ঐ আকাশের সনে।

ম্লান স্মৃতির বাণী যত

পল্লব মর্ম্মরের মত

সজল সুরে ওঠে জেগে ঝিল্লিমুখর সাঁঝে

সারা প্রহর আমার বুকের মাঝে॥

গীতগান · ২২

২২

গানগুলি মোর শৈবালেরি দল—

ওরা বন্যাধারায় পথ যে হারায় উদ্দাম চঞ্চল॥

ওরা কেনই আসে যায়বা চ’লে,

অকারণের হাওয়ায় দোলে,

চিহ্ন কিছুই যায় না রেখে পায় না কোনো ফল॥

ওদের সাধন ত নাই,

ওদের বাঁধন ত নাই।

উদাস ওরা উদাস করে

গৃহহারা পথের স্বরে,

ভুলে যাওয়ার স্রোতের পরে করে টলমল॥

পূজা · ২২

২২

ভেঙে মোর ঘরের চাবি নিয়ে যাবি কে আমারে।

না পেয়ে তোমার দেখা, একা একা দিন যে আমার কাটে না রে

বুঝি গো রাত পোহালো, বুঝি ঐ রবির আলো

আভাসে দেখা দিল গগন পারে—

সমুখে ঐ হেরি পথ, তোমার কি রথ

পৌঁছবেনা মোর দুয়ারে।৷

আকাশের যত তারা, চেয়ে রয় নিমেষহারা,

বসে রয় রাত-প্রভাতের পথের ধারে,

তোমারি দেখা পেলে সকল ফেলে

ডুববে আলোক-পারাবারে॥

প্রভাতের পথিক সবে এল কি কলরবে—

গেল কি গান গেয়ে ঐ সারে সারে।

বুঝিবা ফুল ফুটেছে

সুর উঠেছে

অরুণ বীণার তারে তারে॥

প্রত্যাশা · ২২

২২

এবার রঙিয়ে গেল হৃদয় গগন সাঁঝের রঙে।

আমার সকল বাণী হ’ল মগন সাঁঝের রঙে॥

মনে লাগে দিনের পরে

পথিক এবার আসবে ঘরে;

পূর্ণ হবে পুণ্য লগন সাঁঝের রঙে॥

অস্তাচলের সাগর কূলের এই বাতাসে

ক্ষণে ক্ষণে চক্ষে আমার তন্দ্রা আসে।

সন্ধ্যাযূথীর গন্ধ সনে

আসবে পথিক আপন মনে,

আপনি হবে নিদ্রা ভগন সাঁঝের রঙে॥

বিবিধ · ২২

২২

না-ব’লে যায় পাছে সে

আঁখি মোর ঘুম না জানে।

কাছে তার রই, তবুও

ব্যথা যে রয় পরাণে॥

যে-পথিক পথের ভুলে

এলো মোর প্রাণের কূলে

পাছে তার ভুল ভেঙে যায়

চ’লে যায় কোন্ উজানে

আঁখি মোর ঘুম না জানে॥

এলো যেই এলো আমার আগল টুটে’,

খোলা দ্বার দিয়ে আবার যাবে ছুটে।

খেয়ালের হাওয়া লেগে

যে-ক্ষ্যাপা ওঠে জেগে

সে কি আর সেই অবেলায়

মিনতির বাধা মানে॥

ঋতুচক্র · ২৩

২৩

বৃষ্টিশেষের হাওয়া কিসের খোঁজে

বইছে ধীরে ধীরে।

গুঞ্জরিয়া কেন বেড়ায় ও যে

বুকের শিরে শিরে॥

অলখ তারে বাঁধা অচিন্‌ বীণা

ধরার বক্ষে রহে নিত্য লীনা, এই হাওয়া,

কত যুগের কত মনের কথা

বাজায় ফিরে ফিরে॥

ঋতুর পরে ঋতু ফিরে আসে

বসুন্ধরার কূলে।

চিহ্ন পড়ে বনের ঘাসে ঘাসে

ফুলের পরে ফুলে।

গানের পরে গানে তারি সাথে

কত সুরের কত-যে হার গাঁথে, এই হাওয়া,

ধরার কণ্ঠ বাণীর বরণ-মালায়

সাজায় ঘিরে ঘিরে॥

গীতগান · ২৩

২৩

কান্না-হাসির দোল-দোলানো পৌষ-ফাগুনের পালা,

তারি মধ্যে চিরজীবন বইব গানের ডালা;

এই কি তোমার খুসী, আমায় তাই পরালে মালা

সুরের গন্ধ ঢালা॥

তাই কি আমার ঘুম ছুটেছে বাঁধ টুটেছে মনে,

ক্ষ্যাপা হাওয়ার ঢেউ উঠেছে চির-ব্যথার বনে;

কাঁপে আমার দিবা নিশার সকল আঁধার আলা।

এই কি তোমার খুসী, আমায় তাই পরালে মালা

সুরের গন্ধ ঢালা॥

রাতের বাসা হয়নি বাঁধা, দিনের কাজে ক্রটি,

বিনা কাজের সেবার মাঝে পাইনে আমি ছুটি।

শান্তি কোথায় মোর তরে হায় বিশ্বভুবন মাঝে,

অশান্তি যে আঘাত করে তাইতো বীণা বাজে

নিত্য র’বে প্রাণ পোড়ানো গানের আগুন জ্বালা,

এই কি তোমার খুসী, আমায় তাই পরালে মালা

সুরের গন্ধ ঢালা॥

পূজা · ২৩

২৩

তুমি একলা ঘরে ব’সে ব’সে কী সুর বাজালে

প্রভু আমার জীবনে।

তোমার পরশরতন গেঁথে গেঁথে আমায় সাজালে

প্রভু গভীর গোপনে॥

দিনের আলোর আড়াল টানি

কোথায় ছিলে নাহি জানি,

অস্ত-রবির তোরণ হ’তে চরণ বাড়ালে

আমার রাতের স্বপনে॥

আমার হিয়ায় হিয়ায় বাজে আকুল আঁধার যামিনী

সে যে তোমার বাঁশরী।

আমি শুনি তোমার আকাশ-পারের তারার রাগিণী

আমার সকল পাশরি।

কানে আসে আশার বাণী

খোলা পাব দুয়ারখানি

রাতের শেষে শিশির-ধোয়া প্রথম সকালে

তোমার করুণ কিরণে॥

প্রত্যাশা · ২৩

২৩

পাখী আমার নীড়ের পাখী অধীর হ’ল কেন জানি ৷

সে কি শোনে আকাশ-কোণে ভোরের আলোর কানাকানি॥

ডাক উঠেছে মেঘে মেঘে,

অলস পাখা উঠল জেগে,

লাগল তা’রে উদাসী ঐ নীল গগনের পরশখানি॥

আমার নীড়ের পাখী এবার উধাও হ’ল আকাশ মাঝে৷

যায় নি কারো সন্ধানে সে, যায় নি যে সে কোনো কাজে।

গানের ভরা উঠল ভ’রে,

চায় দিতে তাই উজাড় ক’রে

নীরব গানের সাগরমাঝে আপন প্রাণের সকল বাণী॥

বিবিধ · ২৩

২৩

আছ আকাশ পানে তুলে মাথা,

কোলে আধেকখানি মালা গাঁথা

ফাগুন বেলায় ব’হে আনে

আলোর কথা ছায়ার কানে,

তোমার মনে তারি সনে

ভাবনা যত ফেরে যা’-তা’॥

কাছে থেকে রইলে দূরে,

কায়া মিলায় গানের সুরে।

হারিয়ে যাওয়া হৃদয় তব

মূর্ত্তি ধরে নব নব,

পিয়াল বনে উড়ালো চুল

বকুল বনে আঁচল পাতা॥

ঋতুচক্র · ২৪

২৪

বাদল ধারা হ’ল সারা, বাজে বিদায় সুর,

গানের পালা শেষ ক’রে দে, যাবি অনেক দূর॥

ছাড়ল খেয়া ওপার হ’তে

ভাদ্রদিনের ভরা স্রোতে,

দুল্‌চে তরী নদীর পথে তরঙ্গ-বন্ধুর॥

কদমকেশর ঢেকেছে আজ বনতলের ধূলি,

মৌমাছিরা কেয়াবনের পথ গিয়েছে ভুলি।

অরণ্যে আজ স্তব্ধ হাওয়া,

আকাশ আজি শিশির-ছাওয়া,

আলোতে আজ স্মৃতির আভাস

বৃষ্টির বিন্দুর॥

গীতগান · ২৪

২৪

সময় কারো যে নাই, চলে ওরা দলে দলে,

গান হায় ডুবে যায় কোন কোলাহলে॥

পাষাণে রচিছে কত কীর্ত্তি ওরা সবে

বিপুল গরবে,

যায় আর বাঁশি পানে চায় হাসিছলে॥

বিশ্বের কাজের মাঝে জানি আমি জানি

তুমি শোনো মোর গান খানি,—

আঁধার মথন করি যবে লও তুলি

গ্রহতারাগুলি,

শোনো যে নীরবে তব নীলাম্বর তলে।

পূজা · ২৪

২৪

ঐ সাগরের ঢেউয়ে ঢেউয়ে বাজ্‌লো ভেরী, বালো ভেরী।

কখন আমার খুলবে দুয়ার নাইক দেরি, নাইক দেরি॥

তোমার তো নয় ঘরের মেলা

কোণের খেলা গো,

তোমার সঙ্গে বিষম রঙ্গে জগৎ জুড়ে ফেরাফেরী॥

মরণ তোমার পারের তরী, কাঁদন তোমার পালের হাওয়া,

তোমার বীণা বাজায় প্রাণে বেরিয়ে যাওয়া, হারিয়ে যাওয়া।

ভাঙল যাহা পড়ল ধুলায়

যাক্ না চুলায় গো।

ভরল যা তাই দেখনারে ভাই বাতাস ঘেরি আকাশ ঘেরি॥

প্রত্যাশা · ২৪

২৪

মোর বীণা ওঠে কোন্ সুরে বাজি’

কোন্ নব চঞ্চল-ছন্দে।

মম অন্তর কম্পিত আজি

নিখিলের হৃদয়-স্পন্দে॥

আসে কোন্ তরুণ অশান্ত,

উড়ে বসনাঞ্চল-প্রান্ত,

আলোকের নৃত্যে বনান্ত

মুখরিত অধীর আনন্দে

ঐ অম্বর-প্রাঙ্গণ মাঝে

নিঃস্বর মঞ্জীর গুঞ্জে।

অশ্রুত সেই তালে বাজে

করতালি পল্লবপুঞ্জে

কার পদ-পরশন-আশা

তৃণে তৃণে অর্পিল ভাষা;

সমীরণ বন্ধন হারা

উন্মন কোন্ বন-গন্ধে॥

বিবিধ · ২৪

২৪

না, না গো না,

কোরো না ভাবনা,

যদি বা নিশি যায় যাব না, যাব না॥

যখনি চ’লে যাই

আসিব ব’লে যাই,

আলো ছায়ার পথে করি আনাগোনা

দোলাতে দোলে মন মিলনে বিরহে।

বারে বারেই জানি তুমিত চির হে।

ক্ষণিক আড়ালে

বারেক দাঁড়ালে,

মরি ভয়ে ভয়ে পাব কি পাব না॥

ঋতুচক্র · ২৫

২৫

আজি হৃদয় আমার যায়-যে ভেসে

যার পায়নি দেখা তার উদ্দেশে॥

বাঁধন ভোলে, হাওয়ায় দোলে,

যায় সে বাদল মেঘের কোলে

কোন্‌ সে অসম্ভবের দেশ॥

সেথায় বিজন সাগর কূলে

শ্রাবণ ঘনায় শৈলমূলে।

রাজার পুরে তমাল গাছে

নূপুর শুনে ময়ুর নাচে

সুদুর তেপান্তরের শেষে॥

গীতগান · ২৫

২৫

আমার কণ্ঠ হ’তে গান কে নিলো ভুলায়ে,

তা’র বাসা ছিল নীরব মনের কুলায়ে॥

মেঘের দিনে শ্রাবণ মাসে

যুঁথী বনের দীর্ঘশ্বাসে

আমার প্রাণে সে দেয় পাখার ছায়া বুলায়ে॥

যখন শরৎ কাঁপে শিউলি ফুলের হরষে

নয়ন ভরে যে সেই গোপন গানের পরশে।

গভীর রাতে কী সুর লাগায়

আধো ঘুমে আধো জাগায়,

আমার স্বপন মাঝে দেয় যে কী দোল দুলায়ে

পূজা · ২৫

২৫

যারে নিজে তুমি ভাসিয়েছিলে দুঃখধারার ভরাস্রোতে

তারে ডাক দিলে আজ কোন্ খেয়ালে আবার তোমার ওপার হতে

শ্রাবণ রাতে বাদলধারে

উদাস ক’রে কাঁদাও যারে

আবার তারে ফিরিয়ে আনো ফুল-ফোটানো ফাগুন রাতে॥

এপার হতে ওপার ক’রে

বাটে বাটে ঘোরাও মোরে।

কুড়িয়ে আনা, ছড়িয়ে ফেলা

এই কি তোমার একই খেলা,

লাগাও ধাঁধা বারে বারে এই আঁধারে এই আলোতে॥

প্রত্যাশা · ২৫

২৫

বাজোরে বাঁশরী বাজো।

সুন্দরী, চন্দন মাল্যে

মঙ্গল সন্ধ্যায় সাজো॥

বুঝি মধু ফাল্গুন মাসে

চঞ্চল পান্থ সে আসে,

মধুকর পদভর-কম্পিত চম্পক

অঙ্গনে ফোটেনি কি আজো॥

রক্তিম অংশুক মাথে,

কিংশুক কঙ্কণ হাতে,

মঞ্জীর-ঝঙ্কৃত পায়ে

সৌরভ-মন্থর বায়ে

বন্দন-সঙ্গীত-গুঞ্জন-মুখরিত

নন্দন কুঞ্জে বিরাজো॥

বিবিধ · ২৫

২৫

পাগল যে তুই, কণ্ঠ ভ’রে,

জানিয়ে দে তাই সাহস ক’রে॥

দেয় যদি তোর দুয়ার নাড়া

থাকিস্ কোণে, দিসনে সাড়া,

বলুক্‌ সবাই, “সৃষ্টিছাড়া,”

বলুক সবাই “কী কাজ তোরে॥”

বলিস্ “আমি কেহই না গো,

কিছুই নহি যে-হই না গো।”

শুনে বনে উঠবে হাসি,

দিকে দিকে বাজবে বাঁশি,

বলবে বাতাস, “ভালোবাসি,”

বাঁধবে আকাশ অলখ-ডোরে॥

ঋতুচক্র · ২৬

২৬

ভোর হ’ল যেই শ্রাবণ-শর্ব্বরী

তোমার বেড়ায় উঠ্‌ল ফুটে হেনার মঞ্জরী॥

গন্ধ তারি রহি’ রহি’

বাদল বাতাস আনে বহি,

আমার মনের কোণে কোণে বেড়ায় সঞ্চরি’॥

বেড়া দিলে কবে তুমি তোমার ফুল-বাগানে,

আড়াল করে রেখেছিলে আমার বনের পানে।

কখন গোপন অন্ধকারে

বর্ষারাতের অশ্রুধারে

তোমার আড়াল মধুর হয়ে ডাকে মর্ম্মরি'॥

গীতগান · ২৬

২৬

আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান,

তা’র বদলে আমি চাইনে কোনো দান॥

ভুলবে সে গান যদি না হয় যেয়ে ভুলে

উঠবে যখন তারা সন্ধ্যাসাগর কুলে;

তোমার সভায় যবে ক’রব অবসান

এই ক’দিনের শুধু এই ক’টি মোর তান॥

তোমার গান যে কত শুনিয়েছিলে মোরে

সেই কথাটি তুমি ভুলবে কেমন ক’রে?

সেই কথাটি কবি প’ড়বে তোমার মনে

বর্ষা-মুখর রাতে ফাগুন-সমীরণে;

এইটুকু মোর শুধু রইল অভিমান,

ভুলতে সে কি পারে ভুলিয়েছ মোর প্রাণ॥

পূজা · ২৬

২৬

এবার দুঃখ আমার অসীম পাথার পার হোলো যে পার হোলো।

তোমার পায়ে এসে ঠেকল শেষে সকল সুখের সার হোলো ৷

এতদিন নয়নধারা

বয়েছে বাঁধন হারা,

কেন বয় পাইনি যে তার কূল কিনারা,

আজ গাঁথল কে সেই অশ্রুমালা, তোমার গলার হার হোলো॥

তোমার সাঁজের তারা ডাকল আমায় যখন অন্ধকার হোলো।

বিরহের ব্যথাখানি

খুঁজে তো পায়নি বাণী,

এতদিন নীরব ছিল সরম মানি'।

আজ পরশ পেয়ে উঠল গেয়ে তোমার বীণার তার হোলো॥

প্রত্যাশা · ২৬

২৬

দিন-শেষের রাঙা মুকুল জাগল চিতে।

সঙ্গোপনে ফুট্‌বে প্রেমের মঞ্জরীতে॥

মন্দবায়ে অন্ধকারে

দুলবে তোমার পাথের ধারে,

গন্ধ তাহার লাগবে তোমার আগমনীতে—

ফুটবে যখন মুকুল প্রেমের মঞ্জরীতে॥

রাত যেন না বৃথা কাটে প্রিয়তম হে,

এসো এসো প্রাণে মম গানে মম হে।

এসো নিবিড় মিলন-ক্ষণে

রজনীগন্ধার কাননে,

স্বপন হ’য়ে এসো আমার নিশীথিনীতে

ফুট্‌বে যখন মুকুল প্রেমের মঞ্জরীতে॥

বিবিধ · ২৬

২৬

ঐ মরণের সাগরপারে চুপে চুপে

এলে তুমি ভুবনমোহন স্বপনরূপে॥

কান্না আমার সারা প্রহর তোমায় ডেকে

ঘুরেছিল চারিদিকের বাধায় ঠেকে,

বন্ধ ছিলেম এই জীবনের অন্ধকূপে,

আজ এসেছ ভুবনমোহন স্বপনরূপে॥

আজ কী দেখি কালো চুলের আঁধার ঢালা,

স্তরে স্তরে সন্ধ্যাতারার মাণিক জ্বালা।

আকাশ আজি গানের ব্যথায় ভ’রে আছে,

ঝিল্লিরবে কাঁপে তোমার পায়ের কাছে,

বন্দনা তোর পুষ্পবনের গন্ধধূপে,

আজ এসেছ ভুবনমোহন স্বপনরূপে॥

ঋতুচক্র · ২৭

২৭

শ্রাবণমেঘের আধেক দুয়ার ঐ খোলা,

আড়াল থেকে দেয় দেখা কোন্‌ পথভোলা॥

ঐ যে পূরব গগন জুড়ে

উত্তরী তার যায়রে উড়ে,

সজল হাওয়ার হিন্দোলাতে দেয় দোল,॥

লুকাবে কি প্রকাশ পাবে কেই জানে,

আকাশে কি ধরায় বাসা কোন্‌খানে।

নানা বেশে ক্ষণে ক্ষণে

ঐ ত আমার লাগায় মনে

পরশখানি নানা সুরের ঢেউ তোলা॥

গীতগান · ২৭

২৭

সুর ভুলে যেই ঘুরে বেড়াই কেবল কাজে,

বুকে বাজে তোমার চোখের ভৎসনা যে॥

উধাও আকাশ, উদার ধরা

সুনীল শ্যামল সুধায় ভরা,

মিলায় দূরে, পরশ তাদের মেলে না যে,

বুকে বাজে তোমার চোখের ভৎসনা যে॥

বিশ্ব যে সেই সুরের পথের হাওয়ায় হাওয়ায়

চিত্ত আমার ব্যাকুল করে আসা যাওয়ায়।

তোমায় বসাই এ হেন ঠাঁই,

ভুবনে মোর আর কোথা নাই,

মিলন হবার আসন হারাই আপন মাঝে;

বুকে বাজে তোমার চোখের ভৎসনা যে॥

পূজা · ২৭

২৭

কোন্ ভীরুকে ভয় দেখাবি আঁধার তোমার সবই মিছে।

ভরসা কি মোর সামনে শুধু না হয় আমায় রাখবি পিছে॥

আমায় দূরে যেই তাড়াবি

সেই তো রে তোর কাজ বাড়াবি,

তোমায় নীচে নামতে হবে আমায় যদি ফেলিস্ নীচে॥

যাচাই ক’রে নিবি মোরে

এই খেলা কি খেলবি ওরে?

যে তোর হাত জানে না, মারকে জানে

ভয় লেগে রয় তাহার প্রাণে,

যে তোর মার ছেড়ে তোর হাতটি দেখে আসল জানা সেই জানিছে॥

প্রত্যাশা · ২৭

২৭

এই বুঝি মোর ভোরের তারা এলো সাঁঝের তারার বেশে?

অবাক-চোখে ঐ চেয়ে রয় চিরদিনের হাসি হেসে॥

দীর্ঘ বেলা পাইনি দেখা পাড়ি দিল কখন একা,

নামল আলোক-সাগর পারে অন্ধকারের ঘাটে এসে॥

সকাল বেলা আমার হৃদয় ভরিয়ে ছিল পথের গানে,

সন্ধ্যা বেলা বাজায় বীণা কোন্ সুরে যে কেইবা জানে ৷

পরিচয়ের রসের ধারা কিছুতে আর হয় না সারা,

বারে বারে নতুন করে চিত্ত আমার ভুলাবে সে॥

বিবিধ · ২৭

২৭

সারা নিশি ছিলেম শুয়ে

বিজন ভুঁয়ে

মেঠো ফুলের পাশাপাশি;

শুনেছিলেম তারার বাঁশি॥

সকাল বেলা খুঁজে দেখি,

স্বপ্নে-শোনা সে সুর এ কি

মেঠো ফুলের চোখের জলে উঠে ভাসি॥

এ সুর আমি খুঁজেছিলেম রাজার ঘরে

ধরা দিল শেষে ধরার ধূলির পরে।

এ যে ঘাসের কোলে আলোর ভাষা

আকাশ থেকে ভেসে-আসা,

এ যে মাটির কোলে মাণিক-খস। হাসিরাশি॥

ঋতুচক্র · ২৮

২৮

আসা-যাওয়ার মাঝখানে

একলা আছে চেয়ে কাহার পথপানে॥

আকাশে ঐ কালোয় সোনায়

শ্রাবণ মেঘের কোণায় কোণায়

আঁধার আলোয় কোন খেলা-যে কে জানে

আসা-যাওয়ার মাঝখানে॥

শুক্‌নো পাতা ধূলায় ঝরে,

নবীন পাতায় শাখা ভরে।

মাঝে তুমি আপন-হারা,

পায়ের কাছে জলের ধারা

যায় চলে ঐ অশ্রুভরা কোন্‌ গানে

আসা-যাওয়ার মাঝখানে॥

গীতগান · ২৮

২৮

নিদ্রাহারা’ রাতের এ গান বাঁধব আমি কেমন সুরে?

কোন রজনীগন্ধা হ’তে আনব সে তান কণ্ঠে পূরে॥

সুরের কাঙাল আমার ব্যথা—

ছায়ার কাঙাল রৌদ্র যথা,—

সাঁঝ সকালে বনের পথে উদাস হ’য়ে বেড়ায় ঘুরে॥

ওগো সে কোন বিহান বেলায় এই পথে কার পায়ের তলে

নাম-না-জানা তৃণকুসুম শিউরেছিল শিশির-জলে॥

অলকে তা’র একটি গুছি

করবীফুল রক্তরুচি;

নয়ন করে কী ফুলচয়ন নীল গগনে দূরে দূরে॥

পূজা · ২৮

২৮

আমার আঁধার ভালো; আলোর কাছে

বিকিয়ে দেবে আপনাকে সে।

আলোরে যে লোপ ক’রে খায়

সেই কুয়াসা সর্ব্বনেশে॥

অবুঝ শিশু মায়ের ঘরে

সহজ মনে বিহার করে;

অভিমানী জ্ঞানী তোমার

বাহির দ্বারে ঠেকে এসে॥

তোমার পথ আপনায় আপনি দেখায়

তাই বেয়ে মা চলব সোজা।

যা’রা পথ দেখাবার ভীড় করে গো

তা’রা কেবল বাড়ায় খোঁজা॥

ওদের সমারোহে ভুলিয়ে আনে,

এসে দেখি দেউল পানে,

আপন মনের বিকারটাকে

সাজিয়ে রাখে দেবতা-বেশে॥

প্রত্যাশা · ২৮

২৮

নিশি না পোহাতে জীবন-প্রদীপ জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া

তোমার অনল দিয়া॥

কবে যাবে তুমি সমুখের পথে দীপ্ত শিখাটি বাহি,

আছি তাই পথ চাহি॥

পুড়িবে বলিয়া রয়েছে আশায় আমার নীরব হিয়া

আপন আঁধার নিয়া॥

নিশি না পোহাতে জীবন-প্রদীপ জ্বালাইয়া যাও প্রিয়া॥

বিবিধ · ২৮

২৮

আজ সবার রঙে রঙ মিশাতে হবে।

ওগো আমার প্রিয়,

তোমার রঙীন উত্তরীয়

পর’ পর’ পর’ তবে॥

মেঘ রঙে রঙে বোনা,

আজ রবির রঙে সোনা,

আজ আলোর রঙ যে বাজল পাখীর রবে॥

আজ রঙ সাগরে তুফান ওঠে মেতে।

যখন তারি হাওয়া লাগে

তখন রঙের মাতন জাগে

কাঁচা সবুজ ধানের ক্ষেতে।

সেই রাতের স্বপন-ভাঙা

আমার হৃদয় হোকনা রাঙা

তোমার রঙেরি গৌরবে॥

ঋতুচক্র · ২৯

২৯

কখন্‌ বাদল ছোঁওয়া লেগে

মাঠে মাঠে ঢাকে মাটি সবুজ মেঘে মেঘ,॥

ঐ ঘাসের ঘন ঘোরে

ধরণীতল হল শীতল চিকণ আভায় ভ’রে;

ওরা হঠাৎ-গাওয়া গানের মত এল প্রাণের বেগে॥

ওরা-যে এই প্রাণের রণে মরুজয়ের সেনা।

ওদের সাথে আমার প্রাণের প্রথম যুগের চেনা।

তাই এমন গভীর স্বরে

আমার আঁখি নিল ডাকি ওদের খেলাঘরে।

ওদের দোল দেখে আজ প্রাণে আমার দোলা ওঠে জেগে॥

গীতগান · ২৯

২৯

পাছে সুর ভুলি এই ভয় হয়-

পাছে ছিন্ন তারের জয় হয়॥

পাছে উৎসবক্ষণ তন্দ্রালসে হয় নিমগন,

পুণ্য লগন

হেলায় খেলায় ক্ষয় হয়,

পাছে বিনা গানেই মিলন বেলা ক্ষয় হয়॥

যখন তাণ্ডবে মোর ডাক পড়ে

পাছে তা’র তালে মোর তাল না মেলে

সেই ঝড়ে ৷

যখন মরণ এসে ডাক্‌বে শেষে বরণ-গানে,

পাছে প্রাণে

মোর বাণী সব লয় হয়,

পাছে বিনা গানেই বিদায় বেলা লয় হয়॥

পূজা · ২৯

২৯

আঁধার রাতে একলা পাগল যায় কেঁদে।

বলে শুধু বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে॥

আমি যে তোর আলোর ছেলে,

আমার সামনে দিলি আঁধার মেলে;

মুখ লুকালি, মরি আমি সেই খেদে,

বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে॥

অন্ধকারে অস্ত-রবির লিপি লেখা,

আমারে তার অর্থ শেখা।

তোর প্রাণের বাঁশীর তান সে নানা,

সেই আমারই ছিল জানা,

আজ মরণ বীণার অজানা সুর নেব সেধে;

বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে, বুঝিয়ে দে॥

প্রত্যাশা · ২৯

২৯

অশ্রুনদীর সুদূর পারে

ঘাট দেখা যায় তোমার দ্বারে॥

নিজের হাতে নিজে বাঁধা, ঘরে আধা বাইরে আধা,

এবার ভাসাই সন্ধ্যাহাওয়ায় আপনারে॥

কাটল বেলা হাটের দিনে

লোকের কথার বোঝা কিনে।

কথার সে ভার নামা রে মন, নীরব হয়ে শোন্ দেখি শোন্

পারের হাওয়ায় গান বাজে কোন্ বীণার তারে॥

বিবিধ · ২৯

২৯

দুঃখ যে তোর নয়রে চিরন্তন,

পার আছেরে এই সাগরের বিপুল ক্রন্দন॥

এই জীবনের ব্যথা যত

এইখানে সব হবে গত,

চিরপ্রাণের আলয় মাঝে বিপুল সান্ত্বন॥

মরণ যে তোর নয়রে চিরন্তন,

দুয়ার তাহার পেরিয়ে যাবি ছিঁড়বেরে বন্ধন।

এ বেলা তোর যদি ঝড়ে

পূজার কুসুম ঝরে’ পড়ে,

যাবার বেলায় ভরবে থালায় মালা ও চন্দন॥

ঋতুচক্র · ৩০

৩০

বাদল-বাউল বাজায়রে একতারা

সারা বেলা ধ’রে ঝরঝরঝর ধারা।

জামের বনে ধানের ক্ষেতে

আপন তানে আপনি মেতে

নেচে নেচে হ’ল সারা॥

ঘন জটার ঘটা ঘনায় আঁধার আকাশ মাঝে,

পাতায় পাতায় টুপুর টুপুর নূপুর মধুর বাজে

ঘর-ছাড়ানো আকুল সুরে

উদাস হয়ে বেড়ায় ঘুরে

পূবে হাওয়া গৃহহারা॥

গীতগান · ৩০

৩০

আমি আছি তোমার সভার দুয়ার দেশে,

সময় হ’লেই বিদায় নেব কেঁদে হেসে॥

মালায় গেঁথে যে ফুলগুলি

দিয়েছিলে মাথায় তুলি,

পাপ্‌ড়ি তাহার প’ড়বে ঝ’রে দিনের শেষে

উচ্চ আসন না যদি রয় নামব নীচে,

ছোট ছোট গানগুলি এই ছড়িয়ে পিছে।

কিছুতো তা’র রইবে বাকি

তোমার পথের ধূলা ঢাকি,

সবগুলি কি সন্ধ্যা হাওয়ায় যাবে ভেসে॥

পূজা · ৩০

৩০

জয় জয় পরমা নিষ্কৃতি হে নমি নমি।

জয় জয় পরমা নির্ব্বিতি হে নমি নমি॥

নমি নমি তােমারে, হে অকস্মাৎ

গ্রন্থিচ্ছেদন খর সংঘাত,

লুপ্তি, সুপ্তি, বিস্মৃতি হে, নমি নমি॥

অশ্রু শ্রাবণ প্লাবন হে, নমি নমি।

পাপ ক্ষালন পাবন হে, নমি নমি।

সব ভয় ভ্রম ভাবনার

চরমা আবৃতি হে, নমি নমি

প্রত্যাশা · ৩০

৩০

পথিক হে, ঐ যে চলে, ঐ যে চলে

সঙ্গী তোমার দলে দলে॥

অন্য মনে থাকি কোণে,

চমক লাগে ক্ষণে ক্ষণে

হঠাৎ শুনি জলে স্থলে পায়ের ধ্বনি আকাশতলে॥

পথিক হে, যেতে যেতে পথের থেকে

আমায় তুমি যেয়ো ডেকে।

যুগে যুগে বারে বারে

এসেছিলে আমার দ্বারে,

হঠাৎ যে তাই জানিতে পাই তোমার চলা হৃদয়তলে॥

বিবিধ · ৩০

৩০

দেশ দেশ নন্দিত করি মন্ত্রিত তব ভেরী,

আসিল যত বীরবৃন্দ আসন তব ঘেরি॥

দিন আগত ঐ,

ভারত তবু কই?

সে কি রহিল লুপ্ত আজি সব জন পশ্চাতে?

লউক বিশ্বকর্ম্মভার, মিলি সবার সাথে।

প্রেরণ কর, ভৈরব তব দুর্জ্জয় আহ্বান হে,

জাগ্রত ভগবান হে॥

বিঘ্নবিপদ দুঃখ-দহন তুচ্ছ করিল যা’রা,

মৃত্যুগহন পার হইল, টুটিল মোহ-কারা।

দিন আগত ঐ,

ভারত তবু কই?

নিশ্চল নির্ব্বীর্য্য বাহু কর্ম্মকীর্ত্তিহীনে,

ব্যর্থ শক্তি নিরানন্দ জীবনধনদীনে,

প্রাণ দাও প্রাণ দাও, দাও দাও প্রাণ হে,

জাগ্রত ভগবান হে॥

নূতন-যুগ-সূর্য্য উঠিল ছুটিল তিমিররাত্রি,

তব মন্দির-অঙ্গন ভরি মিলিল সকল যাত্রী।

দিন আগত ঐ,

ভারত তবু কই?

গত-গৌরব হৃত-আসন নত-মস্তক লাজে,

গ্লানি তার মোচন কর, নর-সমাজ মাঝে।

স্থান দাও, স্থান দাও, দাও দাও স্থান হে,

জাগ্রত ভগবান হে॥

জনগণ-পথ তব জয়রথ-চক্র-মুখর আজি,

স্পন্দিত করি’ দিগ্-দিগন্ত শঙ্খ উঠিল বাজি'।

দিন আগত ঐ,

ভারত তবু কই?

দৈন্য জীর্ণ কক্ষ তা’র, মলিন শীর্ণ-আশা,

ত্রাস-রুদ্ধ চিত্ত তা’র, নাহি নাহি ভাষা।

কোটি-মৌন-কণ্ঠপূর্ণ বাণী কর দান হে;

জাগ্রত ভগবান হে॥

যারা তব শক্তি লভিল নিজ অন্তর মাঝে;

বর্জ্জিল ভয় অর্জিল জয় সার্থক হল কাজে।

দিন আগত ঐ,

ভারত তবু কই?

আত্ম-অবিশ্বাস তা’র নাশ’ কঠিন ঘাতে,

পুঞ্জিত অবসাদ-ভার হান’ অশনি-পাতে।

ছায়া-ভয়-চকিত-মূঢ় করহ পরিত্রাণ হে,

জাগ্রত ভগবান হে।

ঋতুচক্র · ৩১

৩১

এই শ্রাবণ-বেলা বাদলঝরা

যূথীবনের গন্ধে ভরা।

কোন্ ভোলা-দিনের বিরহিণী

যেন তারে চিনি চিনি

ঘন বনের কোণে কোণে

ফেরে ছায়ার ঘোমটা পরা॥

কেন বিজনবাটের পানে

তাকিয়ে আছি কে তা জানে।

যেন হঠাৎ কখন অজানা সে

আস্‌বে আমার দ্বারের পাশে,

বাদল সাঁঝের আঁধার মাঝে

গান গাবে প্রাণ-পাগল-করা॥

গীতগান · ৩১

৩১

আসা-যাওয়ার পথের ধারে গান গেয়ে মোর কেটেছে দিন।

যাবার বেলায় দেবো কারে বুকের কাছে বাজল যে-বীণ॥

সুরগুলি তা’র নানাভাগে

রেখে যাব পুষ্পরাগে,

মীড়গুলি তা’র মেঘের রেখায় স্বর্ণলেখায় ক’রব বিলীন॥

কিছু বা সে মিলন-মালায় যুগল গলায় রইবে গাঁথা,

কিছু বা সে ভিজিয়ে দেবে দুই চাহনির চোখের পাত।

কিছুবা কোন চৈত্র মাসে

বকুল-ঢাকা বনের ঘাসে

মনের কথার টুকরো আমার কুড়িয়ে পাবে কোন উদাসীন॥

প্রত্যাশা · ৩১

৩১

তরীতে পা দিইনি আমি পারের পানে যাইনি গো ৷

ঘাটেই ব’সে কাটাই বেলা আর কিছুতো চাইনি গো॥

তোরা যাবি রাজার পুরে

অনেক দূরে,

তোদের রথের চাকার সুরে আমার সাড়া পাইনি গো॥

আমার এ যে গভীর জলে খেয়া বাওয়া,

হয়ত কখন নিসুত রাতে উঠবে হাওয়া।

আসবে মাঝি ওপার হতে উজান স্রোতে,

সেই আশাতেই চেয়ে আছি, তরী আমার বাইনি গো॥

বিবিধ · ৩১

৩১

মাতৃমন্দির পুণ্য-অঙ্গন কর মহোজ্জ্বল আজ হে,

বরপুত্রসঙ্ঘ বিরাজ’ হে।

শুভ শঙ্খ বাজহ বাজহে॥

ঘন তিমির রাত্রির চির প্রতীক্ষা

পূর্ণ কর’, লহ জ্যোতি-দীক্ষা,

যাত্রিদল সব সাজহে,

শুভ শঙ্খ বাজহ বাজহে;

বল’ জয় নরোত্তম পুরুষ-সত্তম

জয় তপস্বী রাজ হে॥

এস’ বজ্র-মহাসনে মাতৃ-আশীর্ভাষণে,

সকল সাধক এস’ হে, ধন্য কর’ এ দেশ হে।

সকল যোগী সকল ত্যাগী এস’ দুঃসহ দুঃখভাগী,

এস’ দুর্জ্জয় শক্তি-সম্পদ্ মুক্তবন্ধ সমাজ হে।

এস’ জ্ঞানী এস’ কর্মী নাশ ভারত-লাজ হে॥

এস’ মঙ্গল, এস’ গৌরব,

এস’ অক্ষয় পুণ্য-সৌরভ,

এস’ তেজঃসূর্য্য উজ্জ্বল কীর্ত্তি-অম্বর মাঝ হে।

বীরধর্ম্মে পুণ্যকর্ম্মে বিশ্ব-হৃদয়ে রাজ’ হে।

শুভ শঙ্খ বাজহ বাজহে।

জয় জয় নরোত্তম পুরুষ-সত্তম

জয় তপস্বী রাজ হে॥

ঋতুচক্র · ৩২

৩২

শ্রাবণ বরিষণ পার হ’য়ে

কী বাণী আসে ওই র’য়ে র’য়ে॥

গোপন কেতকীর পরিমলে,

সিক্ত বকুলের বনতলে,

দূরের আঁখি জল ব’য়ে ব’য়ে

কী বাণী আসে ওই র’য়ে র’য়ে॥

কবির হিয়াতলে ঘুরে ঘুরে

আঁচল ভ’রে লয় সুরে সুরে।

বিজনে বিরহীর কানে কানে

সজল মল্লার গানে গানে

কাহার নাম খানি ক’য়ে ক’য়ে—

কী বাণী আসে ওই র’য়ে র’য়ে॥

গীতগান · ৩২

৩২

এই কথাটি মনে রেখে তোমাদের এই হাসি খেলায়

আমি ত গান গেয়েছিলেম জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়॥

শুকনো ঘাসে শূন্য বনে, আপন মনে,

অনাদরে অবহেলায়

আমি যে গান গেয়েছিলেম জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়॥

দিনের পথিক মনে রেখে আমি চলেছিলেম রাতে সন্ধ্যা প্রদীপ নিয়ে হাতে।

যখন আমায় ওপার থেকে গেলো ডেকে

ভেসেছিলেম ভাঙা ভেলায়;

আমি যে গান গেয়েছিলেম জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায়।

প্রত্যাশা · ৩২

৩২

ফিরবে না তা জানি;

আহা তবু তোমার পথ চেয়ে

জ্বলুক প্রদীপ খানি॥

গাঁথবেনা মালা জানি মনে

আহা তবু ধরুক মুকুল আমার বকুল বনে

প্রাণে ঐ পরশের পিয়াস আনি॥

কোথায় তুমি পথ ভোলা

তবু থাক্ না আমার দুয়ার খোলা।

রাত্রি আমার গীতহীনা,

আহা তবু বাঁধুক সুরে বাঁধুক তোমার বীণা,

তারে ঘিরে ফিরুক কাঙাল বাণী॥

বিবিধ · ৩২

৩২

মনের মধ্যে নিরবধি শিকল-গড়ার কারখানা।

একটা বাঁধন কাটে যদি বেড়ে ওঠে চারখানা॥

কেমন করে নামবে বোঝা,

তোমার আপদ নয় যে সোজা,

অন্তরেতে আছে যখন ভয়ের ভীষণ ভারখানা॥

রাতের আঁধার ঘোচে বটে বাতির আলো যেই জ্বালো।

মূর্চ্ছাতে যে আঁধার ঘটে রাতের চেয়ে ঘোর কালো।

ঝড় তুফানে ঢেউয়ের মারে

তবু তরী বাঁচতে পারে,

সবার বড় মার যে তোমার ছিদ্রটার ঐ মারখানা॥

পর তো আছে লাখে লাখে কে তাড়াবে নিঃশেষে?

ঘরের মধ্যে পর যে থাকে পর ক’রে দেয় বিশ্বে সে।

কারাগারের দ্বারী গেলে

তখনি কি মুক্তি মেলে?

আপনি তুমি ভিতর থেকে চেপে আছ দ্বারখানা।

শূন্য ঝুলির নিয়ে দাবী রাগ করে রোস্ কার পরে?

দিতে জানিস্ তবেই পাবি পাবিনে ত ধার ক’রে।

লোভে ক্ষোভে উঠিস্ মাতি,

ফল পেতে চাস্ রাতারাতি,

মুঠোরে তোর করবে ফুটো আপন খাঁড়ার ধারখানা॥

ঋতুচক্র · ৩৩

৩৩

আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার,

দিনের আকাশ মেঘে অন্ধকার—হায় রে॥

মনে ছিল আস্‌বে বুঝি,

আমায় সে কি পায়নি খুঁজি,

না-বলা তার কথাখানি জাগায় হাহাকার॥

সজল হাওয়ায় বারে বারে

সকল আকাশ ডাকে তারে।

বাদল দিনের দীর্ঘশ্বাসে

জানায় আমায় ফিরবে না সে,

বুক ভরে সে নিয়ে গেল বিফল অভিসার॥

গীতগান · ৩৩

৩৩

পূর্ব্বাচলের পানে তাকাই অস্তাচলের ধারে আসি।

ডাক দিয়ে যার সাড়া না পাই তা’র লাগি আজ বাজাই বাঁশি॥

যখন এ-কুল যাব ছাড়ি’,

পারের খেয়ায় দেব পাড়ি,

মোর ফাগুনের গানের বোঝা বাশির সাথে যাবে ভাসি॥

সেই যে আমার বনের গলি রঙীন ফুলে ছিল আঁকা,

সেই ফুলেরি ছিন্ন দলে চিহ্ন যে তা’র প’ড়ল ঢাকা।

মাঝে মাঝে কোন বাতাসে

চেনা দিনের গন্ধ আসে,

হঠাৎ বুকে চমক লাগায় আধ-ভোলা সেই কান্না হাসি॥

প্রত্যাশা · ৩৩

৩৩

আয় আয়রে পাগল ভুলবি রে চল আপনাকে।

তোর একটুখানির আপ্‌নাকে।

তুই ফিরিস্‌নে আর এই চাকাটার ঘুরূপাকে॥

কোন্ ঠাৎ হাওয়ার ঢেউ উঠে

তোর ঘরের আগল যায় টুটে,

ওরে সুযোগ ধরিস্ বেরিয়ে পড়িস্ সেই ফাঁকে,

তোর দুয়ার-ভাঙার সেই ফাঁকে॥

নানান্ গোলে তুফান তোলে চারদিকে,

বুঝিস্‌নে মন ফিরবি কখন কার দিকে।

তোর আপন বুকের মাঝখানে

বাজায় কে যে সেই জানে,

ওরে পথের খবর মিলবে রে তোর সেই ডাকে ৷

তোর আপন বুকের সেই ডাকে।

বিবিধ · ৩৩

৩৩

জয় যাত্রায় যাওগো,

ওঠ’ জয় রথে তব।

মোরা জয় মালা গেঁথে

আশা চেয়ে বসে র’ব।

আঁচল বিছায়ে রাখি

পথ-ধূলা দিব ঢাকি,

ফিরে এলে হে বিজয়ী হৃদয়ে বরিয়া ল’ব।

আঁকিয়ো হাসির রেখা

সজল আঁখির কোণে,

নব বসন্ত শোভা

এনো এ কুঞ্জ বনে।

সোনার প্রদীপে জ্বালো

আঁধার ঘরের আলো,

পরাও রাতের ভালে চাঁদের তিলক নব॥

ঋতুচক্র · ৩৪

৩৪

ওগো আমার শ্রাবণ মেঘের খেয়াতরীর মাঝি,

অশ্রুভরা পূরব হাওয়ায় পাল তুলে দাও আজি।

উদাস হৃদয় তাকায়ে রয়,

বোঝা তাহার নয় ভারী নয়,

পুলক-লাগা এই কদম্বের একটি কেবল সাজি॥

ভোরবেলা যে খেলার সাথী ছিল আমার কাছে

মনে ভাবি তার ঠিকানা তোমার জানা আছে।

তাই তোমারি সারি গানে

সেই আঁখি তার মনে আনে,

আকাশভরা বেদনাতে রোদন উঠে বাজি॥

গীতগান · ৩৪

৩৪

কণ্ঠে নিলেম গান আমার শেষ পারাণীর কড়ি,

একলা ঘাটে রইব না গো পড়ি॥

আমার সুরের রসিক নেয়ে,

তা’রে ভোলাব গান গেয়ে,

পারের খেয়ায় সেই ভরসায় চড়ি।

পার হব কি নাই হব তা’র খবর কে রাখে,

দূরের হাওয়ায় ডাক দিল এই স্বরের পাগলাকে।

ওগো তোমরা মিছে ভাব,

আমি যাবই যাবই যাব,

ভাঙল দুয়ারকাট্ল দড়া দড়ি॥

ঋতুচক্র · ৩৫

৩৫

এই শ্রাবণের বুকের ভিতর আগুন আছে।

সেই আগুনের কালোরূপ-যে আমার চোখের পরে নাচে॥

শিখার জটা ছড়িয়ে পড়ে

দিক্ হতে ঐ দিগন্তরে,

কালো আভার কাঁপন দেখ তালবনের ঐ গাছে গাছে॥

বাদল হাওয়া পাগল হ’ল সেই আগুনের হুহুঙ্কারে।

দুন্দুভি তার বাজিয়ে বেড়ায় মাঠ হতে কোন্ মাঠের পারে।

সেই আগুনের পুলক ফুটে

কদম্ববন রঙিয়ে উঠে,

সেই আগুনের বেগ লাগে আজ আমার গানের পাখার পাছে॥

গীতগান · ৩৫

৩৫

আমার ঢাল গানের ধারা সেইতে তুমি পিয়েছিলে।

আমার গাঁথা স্বপন মালা কখন চেয়ে নিয়েছিলে।

মন যবে মোর দূরে দূরে

ফিরেছিল আকাশ ঘুরে

তখন আমার ব্যথার সুরে আভাস দিয়ে গিয়েছিলে॥

যবে বিদায় নিয়ে যাব চ’লে

মিলন পালা সাঙ্গ হ’লে

শরৎ আলোয় বাদল মেঘে

এই কথাটি রইবে লেগে

এই শ্যামলে এই নীলিমায় আমায় দেখা দিয়েছিলে॥

ঋতুচক্র · ৩৬

৩৬

মেঘের কোলে কোলে যায় রে চ’লে বকের পাঁতি।

ওরা ঘরছাড়া মোর মনের কথা যায় বুঝি ঐ গাঁথি গাঁথি॥

সুদূরের বীণার স্বরে

কে ওদের হৃদয় হরে,

দুরাশার দুঃসাহসে উদাস করে—

সে কোন্ উধাও হাওয়ার পাগ্‌লামিতে পাখা ওদের উঠে মাতি॥

ওদের ঘুম ছুটেচে ভয় টুটেচে একেবারে

অলক্ষ্যেতে লক্ষ্য ওদের,—পিছন পানে তাকায় না রে।

যে বাসা ছিল জানা

সে ওদের দিল হানা,

না-জানার পথে ওদের নাইরে মানা;

ওরা দিনের শেষে দেখেছে কোন্ মনোহরণ আঁধার রাতি॥

ঋতুচক্র · ৩৭

৩৭

ঐ যে ঝড়ের মেঘের কোলে

বৃষ্টি আসে মুক্তকেশে, আঁচল খানি দোলে॥

ওরি গানের তালে তালে

আমে জামে শিরীষ শালে

নাচন লাগে পাতায় পাতায় আকুল কল্লোলে॥

আমার দুই আঁখি ঐ সুরে

যায় হারিয়ে সজল ধারায় ঐ ছায়াময় দূরে।

ভিজে হাওয়ায় থেকে থেকে

কোন্ সাথী মোর যায় যে ডেকে,

এক্‌লা দিনের বুকের ভিতর ব্যথার তুফান তোলে॥

ঋতুচক্র · ৩৮

৩৮

অনেক কথা বলেছিলেম কবে তোমার কানে কানে,

কত নিশীথ অন্ধকারে কত গোপন গানে গানে॥

সে কি তোমার মনে আছে,

তাই শুধাতে এলেম কাছে,

রাতের বুকের মাঝে তা’রা মিলিয়ে আছে সকল খানে,

কত নিশীথ অন্ধকারে কত গোপন গানে গানে॥

ঘুম ভেঙে তাই শুনি যবে দীপ-নেভা মোর বাতায়নে

স্বপ্নে-পাওয়া বাদল হাওয়া ছুটে আসে ক্ষণে ক্ষণে।

বৃষ্টি ধারার ঝরঝরে

ঝাউবাগানের মরমরে

ভিজে মাটির গন্ধে হঠাৎ সেই কথা সব মনে আনে

কত নিশীথ অন্ধকারে কত গোপন গানে গানে॥

ঋতুচক্র · ৩৯

৩৯

আজি বর্ষারাতের শেষে

সজল মেঘের কোমল কালোয় অরুণ আলো মেশে॥

বেণুবনের মাথায় মাথায়

রং লেগেছে পাতায় পাতায়,

রঙের ধারায় হৃদয় হারায় কোথা যে যায় ভেসে॥

এই ঘাসের ঝিলিমিলি

তার সাথে মোর প্রাণের কাঁপন এক-তালে যায় মিলি।

মাটির প্রেমে আলোর রাগে

রক্তে আমার পুলক লাগে,

বনের সাথে মন-যে মাতে ওঠে আকুল হেসে॥

ঋতুচক্র · ৪০

৪০

বাদল মেঘে মাদল বাজে

গুরু গুরু গগন মাঝে॥

তারি গভীর রোলে

আমার হৃদয় দোলে,

আপন সুরে আপ্‌নি ভোলে॥

কোথায় ছিল গহন প্রাণে

গোপন ব্যথা গোপন গানে,—

আজি সজল বায়ে

শ্যামল বনের ছায়ে

ছড়িয়ে গেল সকল খানে

গানে গানে॥

ঋতুচক্র · ৪১

৪১

গহনরাতে শ্রাবণ ধারা পড়িছে ঝ’রে,

কেন গো মিছে জাগাবে ওরে?

এখনো দুটী আঁখির কোণে যায় যে দেখা,

জলের রেখা,

না-বলা বাণী রয়েছে যেন অধর ভ’রে॥

না হয় যেয়ো গুঞ্জরিয়া বীণার তারে

মনের কথা শয়ন দ্বারে।

না হয় রেখো মালতী-কলি শিথিল কেশে

নীরবে এসে,

না হয় রাখী পরায়ে যেয়ো ফুলের ডোরে।

কেন গো মিছে জাগাবে ওরে॥

ঋতুচক্র · ৪২

৪২

যেতে দাও গেল যারা,

তুমি যেয়োনা যেয়োনা,

আমার বাদলের গান হয়নি সারা॥

কুটীরে কুটীরে বন্ধ দ্বার,

নিভৃত রজনী অন্ধকার,

বনের অঞ্চল কাঁপে চঞ্চল,

অধীর সমীর তন্দ্রাহারা॥

দীপ নিবেছে নিবুক নাকো,

আঁধারে তব পরশ রাখো।

বাজুক কাঁকন তোমার হাতে,

আমার গানের তালের সাথে,

যেমন নদীর ছল ছল জলে

ঝরে ঝর ঝর শ্রাবণ ধারা॥

ঋতুচক্র · ৪৩

৪৩

সখি, আঁধারে একেলা ঘরে মন মানে না।

কিসেরি পিয়াসে কোথা যে যাবে সে

পথ জানে না॥

ঝর ঝর নীরে নিবিড় তিমিরে

সজল সমীরে গো

যেন কার বাণী কভু কানে আনে,

কভু আনে না॥

ঋতুচক্র · ৪৪

৪৪

ভেবেছিলেম আসবে ফিরে

তাই ফাগুন শেষে দিলেম বিদায়।

তুমি গেলে ভাসি নয়ন নীরে

এখন শ্রাবণ দিনে মরি দ্বিধায়॥

এখন বাদল সাঁঝের অন্ধকারে

আপনি কাঁদাই আপনারে,

একা ঝর ঝর বারি ধারে

ভাবি কী ডাকে ফিরাব তোমায়॥

যখন থাক আঁখির কাছে

তখন দেখি ভিতর বাহির সব ভরে আছে।

সেই ভরা দিনের ভরসাতে

চাই বিরহের ভয় ঘোচাতে,

তবু তোমাহারা বিজন রাতে

কেবল হারাই হারাই বাজে হিয়ায়॥

ঋতুচক্র · ৪৫

৪৫

হৃদয়ে ছিলে জেগে,

দেখি আজ শরৎ মেঘে।

কেমনে আজ্‌কে ভোরে

গেল গো গেল স’রে

তোমার ঐ আঁচলখানি

শিশিরের ছোঁওয়া লেগে॥

কী-যে গান গাহিতে চাই,

বাণী মোর খুঁজে না পাই।

সে-যে ঐ শিউলিদলে

ছড়াল কাননতলে,

সে-যে ঐ ক্ষণিক ধারায়

উড়ে যায় বায়ুবেগে॥

ঋতুচক্র · ৪৬

৪৬

দেওয়া-নেওয়া ফিরিয়ে-দেওয়া তোমায় আমায়,

জনম জনম এই চলেছে মরণ কি আর তা’রে থামায়॥

তোমার গানে আমি জাগি,

আকাশে চাই তোমার লাগি,

একতারাতে আমার গানে মাটির পানে তোমায় নামায়॥

তোমার সোনার আলোর ধারা প্রাণ ভ’রে পাই,

কালে। মাটির ফুল ফুটিয়ে শোধ করি তাই।

শরৎ রাতের শেফালি বন

সৌরভেতে মাতে যখন,

পাল্‌টা সে তান লাগে তব শ্রাবণ রাতের প্রেম বরিষায়॥

ঋতুচক্র · ৪৭

৪৭

আমারে ডাক দিল কে ভিতর পানে?

ওরা যে ডাক্‌তে জানে॥

আশ্বিনে ঐ শিউলি শাখে

মৌমাছিরে যেমন ডাকে

প্রভাতে সৌরভের গানে॥

ঘর-ছাড়া আজ ঘর পেল যে,

আপন মনে রইল মজে’।

হাওয়ায় হাওয়ায় কেমন করে’

খবর যে তা’র পৌঁছল রে,

ঘরছাড়া ঐ মেঘের কানে॥

ঋতুচক্র · ৪৮

৪৮

তোমরা যা বল’ তাই বল’, আমার লাগেন। মনে।

আমার যায় বেল। যায় বয়ে, কেমন বিনা কারণে॥

এই পাগল হাওয়া

কী গান গাওয়া

ছড়িয়ে দিয়ে গেল আজি শরৎ গগনে॥

সে গান আমার লাগল যে গো লাগল মনে,

আমি কিসের মধু খুঁজে বেড়াই ভ্রমর গুঞ্জনে।

ঐ আকাশ ছাওয়া

কাহার চাওয়া

এমন করে লাগে আজি আমার নয়নে॥

ঋতুচক্র · ৪৯

৪৯

শিউলি-ফোটা ফুরোলো যেই শীতের বনে,

এলে-যে সেই শূন্যক্ষণে॥

তাই গোপনে সাজিয়ে ডালা

দুখের সুরে বরণ মালা

গাঁথি মনে মনে

শূন্যক্ষণে॥

দিনের কোলাহলে

ঢাকা সে-যে রইবে হৃদয়তলে।

রাতের তারা উঠবে যবে

সুরের মালা বদল হবে

তখন তোমার সনে

মনে মনে॥

ঋতুচক্র · ৫০

৫০

হেমন্তে কোন্ বসন্তেরি বাণী

পূর্ণ শশী ঐ-যে দিল আনি॥

বকুল ডালের আগায়

জ্যোৎস্না যেন ফুলের স্বপন লাগায়।

কোন্ গোপন কানাকানি

পূর্ণ শশী ঐ-যে দিল আনি॥

আবেশ লাগে বনে

শ্বেত করবীর অকাল-জাগরণে।

ডাক্‌চে থাকি থাকি

ঘুমহারা কোন্ নাম-না-জানা পাখী।

কার মধুর স্মরণখানি

পূর্ণ শশী ঐ যে দিল আনি॥

ঋতুচক্র · ৫১

৫১

শীতের হাওয়ার লাগ্‌ল নাচন আম্‌লকির এই ডালে ডালে।

পাতাগুলি শির্‌শিরিয়ে ঝরিয়ে দিল তালে তালে॥

উড়িয়ে দেবার মাতন এসে

কাঙাল তারে করল শেষে,

তখন তাহার ফলের বাহার রইল না আর অন্তরালে॥

শূন্য ক’রে ভ’রে দেওয়া যাহার খেলা

তারি লাগি রইনু বসে সকল বেলা।

শীতের পরশ থেকে থেকে

যায় বুঝি ঐ ডেকে ডেকে

সব খোয়াবার সময় আমার হবে কখন্ কোন্ সকালে॥

ঋতুচক্র · ৫২

৫২

সেদিন আমায় বলেছিলে

আমার সময় হয় নাই—

ফিরে ফিরে চলে গেলে তাই।

তখনো খেলার বেলা

বনে মল্লিকার মেলা

পল্লবে পল্লবে বায়ু উতলা সদাই॥

আজি এল হেমন্তের দিন

কুহেলি-বিলীন ভূষণ বিহীন।

বেলা আর নাই বাকি

সময় হয়েছে নাকি?

দিন শেষে দ্বারে বসে পথপানে চাই॥

ঋতুচক্র · ৫৩

৫৩

এল যে শীতের বেলা বরষ পরে,

এবার ফসল কাটো লও গো ঘরে॥

কর’ ত্বরা, কর’ ত্বরা,

কাজ আছে মাঠ ভরা,

দেখিতে দেখিতে দিন আঁধার করে॥

বাহিরে কাজের পালা হইবে সারা,

আকাশে উঠিবে যবে সন্ধ্যা তারা।

আসন আপন হাতে

পেতে রেখো আঙিনাতে

যে-সাথী আসিবে রাতে তাহারি তরে॥

ঋতুচক্র · ৫৪

৫৪

পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে চ’লে

আয় আয় আয়।

ডালা যে তার ভরেছে আজ পাকা ফসলে

মরি হায় হায় হায়।

হাওয়ার নেশায় উঠল মেতে

দিগ্‌বধূরা ধানের ক্ষেতে,

রোদের সোনা ছড়িয়ে পড়ে মাটির আঁচলে,

মরি হায় হায় হায়॥

মাঠের বাঁশি শুনে শুনে আকাশ খুসি হ’ল।

ঘরেতে আজ কে রবে গো খোলো দুয়ার খোলো।

আলোর হাসি উঠ্‌ল জেগে,

ধানের শীষে শিশির লেগে,

ধরার খুসি ধরে না গো, ঐ যে উথলে,

মরি হায় হায় হায়॥

ঋতুচক্র · ৫৫

৫৫

আয়রে মোরা ফসল কাটি।

মাঠ আমাদের মিতা, ওরে, আজ তারি সওগাতে

ঘরের আঙন সারাবছর ভরবে দিনে রাতে।

নেব তারি দান

তাই-যে কাটি ধান,

তাই-যে গাহি গান,

তাই-যে সুখে খাটি॥

বাদল এসে রচেছিল ছায়ার মায়াঘর,

রোদ এসেছে সোনার যাদুকর

শ্যামে সোনায় মিলন হল মোদের মাঠের মাঝে,

ভালবাসার মাটি যে তাই সাজল এমন সাজে।

নেব তারি দান,

তাই-যে কাটি ধান,

তাই-যে গাহি গান,

তাই-যে সুখে খাটি॥

ঋতুচক্র · ৫৬

৫৬

আজ তালের বনের করতালি কিসের তালে

পূর্ণিমা চাঁদ মাঠের পরে ওঠার কালে॥

না-দেখা কোন্ বীণা বাজে

আকাশ মাঝে,

না-শোনা কোন্ রাগ রাগিণী শূন্যে ঢালে॥

ওর খুসীর সাথে কোন্ খুসীর আজ মেলা মেশা,

কোন্ বিশ্ব-মাতন গানের নেশায় লাগল নেশা।

তারায় কাঁপে রিনি ঝিনি

যে কিঙ্কিণী

তারি কাঁপন লাগ্‌ল কি ওর মুগ্ধ ভালে॥

ঋতুচক্র · ৫৭

৫৭

নীল দিগন্তে ঐ ফুলের আগুন লাগল।

বসন্তে সৌরভের শিখা জাগল।

আকাশের লাগে ধাঁদা

রবির আলো ঐ কি বাঁধা?

বুঝি ধরার কাছে আপনাকে সে মাগ্‌ল

শর্ষে ক্ষেতে ফুল হয়ে তাই জাগল।

নীল দিগন্তে মোর বেদনখানি লাগ্‌ল।

অনেক কালের মনের কথা জাগল।

এল আমার হারিয়ে-যাওয়া

দূর ফাগুনের দখিন হাওয়া,

বুঝি এই-ফাগুনে আপনাকে সে মাগ্‌ল,

শর্ষে ক্ষেতে ঢেউ হয়ে তাই জাগল॥

ঋতুচক্র · ৫৮

৫৮

আঁধার কুঁড়ির বাঁধন টুটে

চাঁদের ফুল উঠেছে ফুটে॥

তার গন্ধ কোথায় গন্ধ কোথায় রে?

গন্ধ আমার গভীর ব্যথায়

হৃদয় মাঝে লুটে॥

ও কখন যাবে স’রে,

আকাশ হ’তে পড়বে ঝ’রে।

ওরে রাখব কোথায় রাখব কোথায় রে?

রাখ্‌ব ওরে আমার ব্যথায়

গানের পত্রপুটে॥

ঋতুচক্র · ৫৯

৫৯

এ কী সুধারস আনে

আজি মম মনে প্রাণে॥

সে যে চিরদিবসেরি,

নূতন তাহারে হেরি,

বাতাস সে-মুখ ঘেরি

মাতে গুঞ্জন গানে॥

পুরাতন বীণাখানি

ফিরে পেল হারা বাণী।

নীলাকাশ শ্যাম ধরা

পরশে তাহারি ভরা,

ধরা দিল অগোচরা

নব নব সুরে তানে॥

ঋতুচক্র · ৬০

৬০

বসন্ত তার গান লিখে যায় ধূলির পরে

কী আদরে॥

তাই সে ধূলা ওঠে হেসে

বারে বারে নবীন বেশে,

বারে বারে রূপের সাজি আপনি ভরে

কী আদরে॥

তেমনি পরশ লেগেছে মোর হৃদয় তলে,

সেযে তাই ধন্য হ’ল মন্ত্রবলে।

তাই প্রাণে কোন্ মায়া জাগে,

বারে বারে পুলক লাগে,

বারে বারে গানের মুকুল আপনি ধরে

কী আদরে॥

ঋতুচক্র · ৬১

৬১

পূর্ণ চাঁদের মায়ায় আজি ভাবনা আমার পথ ভোলে।

যেন সিন্ধুপারের পাখী তারা

যায় যায় যায় চ’লে॥

আলোছায়ার সুরে

অনেক কালের সে-কোন্ দূরে

ডাকে আয় আয় আয় ব’লে॥

যেথায় চ’লে গেছে আমার হারা ফাগুন রাতি,

সেথায় তারা ফিরে ফিরে খোঁজে আপন সাথী,

আলোছায়ায় যেথা

অনেক দিনের সে-কোন্ ব্যথা

কাঁদে হায় হায় হায় ব’লে॥

ঋতুচক্র · ৬২

৬২

ফাগুনের সুরু হতেই শুকনো পাতা ঝরল যত

তারা আজ কেঁদে শুধায়

“সেই ডালে ফুল ফুটল কিগো?

ওগো কও ফুটল কত॥”

তারা কয়, “হঠাৎ হাওয়ায় এল ভাসি

মধুরের সুদূর হাসি—হায়,

ক্ষ্যাপা হাওয়ায় আকুল হয়ে ঝরে গেলেম শত শত।

তারা কয়, “আজ কি তবে এসেছে সে

নবীন বেশে?

আজ কি তবে এতক্ষণে জাগ্‌ল বনে

যে গান ছিল মনে মনে?

সেই বারতা কানে নিয়ে যাই চলে এইবারের মত॥”

ঋতুচক্র · ৬৩

৬৩

ফাগুনের পূর্ণিমা এল কার লিপি হাতে?

বাণী তার বুঝিনারে, ভরে মন বেদনাতে।

উদয়-শৈল মূলে জীবনের কোন কূলে

এই বাণী জেগেছিল কবে কোন্ মধুরাতে॥

মাধবীর মঞ্জরী মনে আনে বারে বারে

বরণের মালা গাঁথা স্মরণের পরপারে।

সমীরণে কোন মায়া ফিরিছে স্বপন কায়া

বেণুবনে কাঁপে ছায়া অলখচরণ পাতে॥

ঋতুচক্র · ৬৪

৬৪

অনেক দিনের মনের মানুষ এলে কে

কোন ভুলে-যাওয়া বসন্ত থেকে॥

যা-কিছু সব গেছ ফেলে

খুঁজতে এলে (হৃদয়ে),

পথ চিনেছ চেনা ফুলের

চিহ্ন দেখে॥

বুঝি মনে তোমার আছে আশা

আমার ব্যথায় মিলবে তোমার বাসা।

দেখতে এলে সেই যে বীণা

বাজে কিনা (হৃদয়ে)

তারগুলি তার ধূলায় ধূলায়

গেছে কি ঢেকে॥

ঋতুচক্র · ৬৫

৬৫

এনেছ ঐ শিরীষ বকুল আমের মুকুল

সাজিখানি হাতে ক’রে।

কবে যে সব ফুরিয়ে দেবে

চলে যাবে দিগন্তরে॥

পথিক তোমায় আছে জানা, কর্‌বনাগো তোমায় মানা

যাবার বেলায় যেয়ো যেয়ো বিজয় মাল। মাথায় পরে॥

তবু তুমি আছ যতক্ষণ

অসীম হয়ে ওঠে হিয়ায় তোমারি মিলন।

যখন যাবে তখন প্রাণে বিরহ মোর ভরবে গানে,

দূরের কথা বাজ্‌বে সুরে সকল বেলা ব্যথায় ভরে॥

ঋতুচক্র · ৬৬

৬৬

বসন্তে আজ ধরার চিত্ত হল উতলা।

বুকের পরে দোলেরে তার পরাণ-পুতলা।

আনন্দেরি ছবি দোলে দিগন্তেরি কোলে কোলে,

গান দুলিছে, নীলাকাশের হৃদয়-উথলা॥

আমার দুটি মুগ্ধ নয়ন নিদ্রা ভুলেছে।

আজি আমার হৃদয়-দোলায় কেগো দুলিছে।

দুলিয়ে দিল সুখের রাশি লুকিয়ে ছিল যতেক হাসি,

দুলিয়ে দিল জনমভরা ব্যথা-অতলা॥

ঋতুচক্র · ৬৭

৬৭

ওরে বকুল, পারুল ওরে, শাল পিয়ালের বন,

কোন্‌খানে আজ পাই

এমন মনের মত ঠাঁই

যেথায় ফাগুন ভ’রে দেব দিয়ে সকল মন॥

সারা গগন তলে

তুমুল রঙের কোলাহলে

মাতামাতির নেই হেন ফাঁক কোথাও অণুক্ষণ,

যেথায় ফাগুন ভ’রে দেব দিয়ে সকল মন॥

ওরে বকুল, পারুল ওরে, শাল পিয়ালের বন,

আকাশ নিবিড় ক’রে

তোরা দাঁড়াস্‌নে ভিড় ক’রে,

চাইনে এমন গন্ধ রঙের বিপুল আয়োজন।

অকূল অবকাশে

যেথায় স্বপ্নকমল ভাসে

দে আমারে একটি এমন গগন-জোড়া কোণ

যেথায় ফাগুন ভ’রে দেব দিয়ে সকল মন॥

ঋতুচক্র · ৬৮

৬৮

পুরাতনকে বিদায় দিলে না যে,

ওগো নবীন রাজা॥

শুধু বাঁশি তোমার বাজালে তার

পরাণ মাঝে॥

মন্ত্র যে তার লাগল প্রাণে

মোহন গানে, হায়,

বিকশিয়া উঠল হিয়া নবীন সাজে,

ওগো নবীন রাজা॥

তোমার রঙে দিলে তুমি রাঙিয়া

তার আঙিয়া,

ওগো নবীন রাজা॥

তোমার মালা, দিলে গলে

খেলার ছলে, হায়,

তোমার সুরে সুরে তাহার বীণা বাজে

ওগো নবীন রাজা॥

ঋতুচক্র · ৬৯

৬৯

ও মঞ্জরী, ও মঞ্জরী,

আমের মঞ্জরী,

আজ হৃদয় তোমার উদাস হয়ে

পড়চে কি ঝরি॥

আমার গান যে তোমার গন্ধে মিশে

দিশে দিশে

ফিরে ফিরে ফেরে গুঞ্জরি।

পূর্ণিমা চাঁদ তোমার শাখায় শাখায়

তোমার গন্ধ সাথে আপন আলো মাখায়,

ঐ দখিন বাতাস গন্ধে পাগল

ভাঙ্‌ল আগল

ঘিরে ঘিরে ফিরে সঞ্চরি॥

ঋতুচক্র · ৭০

৭০

ঝর ঝর ঝরে রঙের ঝর্‌না।

আয় সে রসের সুধায় হৃদয় ভর্ না॥

মুক্ত বন্যাধারায় ধারায়

চিত্ত মৃত্যু-আবেশ হারায়,

রসের পরশ পেয়ে ধরা নিত্য নবীন-বর্ণা॥

কলধ্বনি দখিন হাওয়ায় ছড়ায় গগনময়,

মর্ম্মরিয়া আসে ছুটি নবীন কিশলয়।

বনের বীণায় ছন্দ জাগে,

বসন্ত পঞ্চমের রাগে,

সুরে সুরে সুর মিলিয়ে আনন্দ গান ধর্ না॥

ঋতুচক্র · ৭১

৭১

কার যেন এই মনের বেদন চৈত্র মাসের উতল হাওয়ায়;

ঝুম্‌কো লতার চিকন পাতা কাঁপেরে কার চম্‌কে-চাওয়ায়

উতল হাওয়ায়॥

হারিয়ে-যাওয়া কার সে বাণী,

কার সোহাগের স্মরণখানি,

আমের বোলের গন্ধে মিশে কাননকে আজ কান্না পাওয়ায়

উতল হাওয়ায়॥

কাঁকন দুটির রিনিঝিনি কার বা এখন মনে আছে?

সেই কাঁকনের ঝিকিমিকি পিয়াল বনের শাখায় নাচে

উতল হাওয়ায়॥

যার চোখের ঐ আভাস দোলে

নদী-ঢেউয়ের কোলে কোলে

তার সাথে মোর দেখা ছিল সেই সেকালের তরী-বাওয়ায়

উতল হাওয়ায়॥

ঋতুচক্র · ৭২

৭২

আকাশে আজ কোন্ চরণের আসা যাওয়া।

বাতাসে আজ কোন পরশের লাগে হাওয়া॥

অনেক দিনের বিদায় বেলার ব্যাকুল বাণী

আজ উদাসীর বাঁশীর সুরে কে দেয় আনি,

বনের ছায়ায় তরুণ চোখের করুণ চাওয়া॥

কোন্ ফাগুনে যে ফুল-ফোটা হ’ল সারা

মৌমাছিদের পাখায় পাখায় কাঁদে তারা।

বকুলতলায় কাজ-ভোলা সেই কোন্ দুপুরে

যে-সব কথা ভাসিয়ে দিলেম গানের সুরে

ব্যথায় ভরে ফিরে আসে সে গান-গাওয়া॥

ঋতুচক্র · ৭৩

৭৩

এক-ফাগুনের গান সে আমার আর-ফাগুনের কূলে কূলে

কার খোঁজে আজ পথ হারালো নতুন কালের ফুলে ফুলে॥

শুধায় তারে বকুল হেনা

“কেউ আছে কি তোমার চেনা?”

সে বলে, “হায়, আছে কি নাই

না বুঝে তাই বেড়াই ভুলে

নতুন কালের ফুলে ফুলে”॥

এক-ফাগুনের মনের কথা আর-ফাগুনের কানে কানে

গুঞ্জরিয়া কেঁদে শুধায় “মোর ভাষা আজ কেউ কি জানে।”

আকাশ বলে, “কে জানে সে

কোন্ ভাষা-যে বেড়ায় ভেসে,”

“হয়তো জানি, হয়তো জানি,”

বাতাস বলে দুলে দুলে

নতুন কালের ফুলে ফুলে॥

ঋতুচক্র · ৭৪

৭৪

নিশীথ রাতের প্রাণ

কোন্ সুধা-যে চাঁদের আলোয় আজ করেছে পান

মনের সুখে তাই

গোপন কিছু নাই,

আঁধার ঢাকা ভেঙে ফেলে সব করেছে দান॥

দখিন হাওয়ায় তার

সব খুলেছে দ্বার।

তারি নিমন্ত্রণে

ফিরি বনে বনে,

সঙ্গে করে এনেছি এই রাত-জাগা মোর গান॥

ঋতুচক্র · ৭৫

৭৫

রুদ্র বেশে কেমন খেলা, কালো মেঘের ভ্রূকুটি।

সন্ধ্যাকাশের বক্ষ যে ঐ বজ্রবাণে যায় টুটি॥

সুন্দর হে, তোমায় চেয়ে

ফুল ছিল সব শাখা ছেয়ে,

ঝড়ের বেগে আঘাত লেগে ধূলায় তারা যায় লুটি।

মিলন দিনে হঠাৎ কেন লুকাও তোমার মাধুরী।

ভীরুকে ভয় দেখাতে চাও এ কী দারুণ চাতুরী।

যদি তোমার কঠিন ঘায়ে

বাঁধন দিতে চাও ঘুচায়ে

কঠোর বলে টেনে নিয়ে বক্ষে তোমার দাও ছুটি॥

ঋতুচক্র · ৭৬

৭৬

তার বিদায় বেলার মালাখানি আমার গলে রে

দোলে দোলে বুকের কাছে পলে পলে রে॥

গন্ধ তাহার ক্ষণে ক্ষণে

জাগে ফাগুন সমীরণে

গুঞ্জরিত কুঞ্জতলে রে॥

দিনের শেষে যেতে যেতে পথের পরে

ছায়াখানি মিলিয়ে দিল বনান্তরে,

সেই ছায়া এই আমার মনে,

সেই ছায়া ঐ কাঁপে বনে,

কাঁপে সুনীল দিগঞ্চলে রে॥

ঋতুচক্র · ৭৭

৭৭

একদা তুমি প্রিয়ে আমারি এ তরুমূলে

বসেছ ফুল সাজে সে কথা যে গেছ ভুলে॥

সেথা যে বহে নদী নিরবধি, সে ভোলেনি,

তারি যে স্রোতে আঁকা বাঁকা বাঁকা তব বেণী,

তোমারি পদরেখা আছে লেখা তারি কুলে;

আজি কি সবি ফাঁকি? সে কথা কি গেছ ভুলে॥

গেঁথেছ যে রাগিণী একাকিনী দিনে দিনে

আজিও যায় ব্যেপে কেঁপে কেঁপে তৃণে তৃণে।

গাঁথিতে যে আঁচলে ছায়াতলে ফুলমালা

তাহারি পরশন হরষণ-সুধা ঢালা

ফাগুন আজো যেরে খুঁজে ফেরে চাঁপাফুলে;

আজি কি সবি ফাঁকি? সে কথা কি গেছ ভুলে।৷

ঋতুচক্র · ৭৮

৭৮

পাখী বলে, “চাঁপা, আমারে কও,

কেন তুমি হেন নীরবে রও॥

প্রাণ ভ’রে আমি গাহি যে-গান

সারা প্রভাতের সুরের দান,

সে কি তুমি তব হৃদয়ে লও?

কেন তুমি তবে নীরবে রও॥”

চাঁপা শুনে বলে, “হায় গো হায়,

যে আমার গাওয়া শুনিতে পায়

নহ নহ, পাখী, সে তুমি নও।”

পাখী বলে, “চাঁপা, আমারে কও,

কেন তুমি হেন গোপনে রও৷

ফাগুনের প্রাতে উতলা বায়

উড়ে যেতে সে-যে ডাকিয়া যায়,

সে কি তুমি তব হৃদয়ে লও?

কেন তবে হেন গোপনে রও॥”

চাঁপা শুনে বলে, “হায় গো হায়,

যে আমার ওড়া দেখিতে পায়

নহ নহ পাখী সে তুমি নও॥”

ঋতুচক্র · ৭৯

৭৯

“আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি।

সন্ধ্যাবেলার চামেলি গো, সকাল বেলার মল্লিকা,

আমায় চেন’ কি?”

“চিনি তোমায় চিনি নবীন পান্থ,

বনে বনে ওড়ে তোমার

রঙীন বসন প্রান্ত।

ফাগুন প্রাতের উতলা গো, চৈত্র রাতের উদাসী,

তোমার পথে আমরা ভেসেছি॥”

“পথভোলা এক পথিক এসেছি।

ঘর-ছাড়া এই পাগলটাকে

এমন ক’রে কেগো ডাকে

করুণ গুঞ্জরি

যখন বাজিয়ে বীণা বনের পথে

বেড়াই সঞ্চরি?”

“আমি তোমায় ডাক্‌ দিয়েছি, ওগো উদাসী,

আমি আমের মঞ্জরী।

তোমায় চোখে দেখার আগে

তোমার স্বপন চোখে লাগে,

বেদন জাগে গো,—

না চিনিতেই ভাল বেসেছি॥”

“পথভোলা এক পথিক এসেছি।

যখন ফুরিয়ে বেলা চুকিয়ে খেলা

তপ্ত ধূলার পথে

যাব ঝরা ফুলের রথে—

তখন সঙ্গ কে ল’বি?”

“লব আমি মাধবী।”

“যখন বিদায়-বাঁশির সুরে সুরে

শুক্‌নো পাতা যাবে উড়ে;

সঙ্গে কে র’বি?”

“আমি র’ব, উদাস হ’ব ওগো উদাসী

আমি তরুণ করবী।”

“বসন্তের এই ললিত রাগে

বিদায় ব্যথা লুকিয়ে জাগে,

ফাগুন দিনে গো

কাঁদন-ভরা হাসি হেসেছি।

আমি পথভোলা এক পথিক এসেছি।”

ঋতুচক্র · ৮০

৮০

মাধবী হঠাৎ কোথা হতে

এল ফাগুন দিনের স্রোতে

এসে হেসেই বলে “যাই যাই যাই”।

পাতারা ঘিরে দলে দলে

তারে কানে কানে বলে

“ন। না না”

নাচে তাই তাই তাই॥

আকাশের তারা বলে তারে

“তুমি এসো গগন পারে

তোমায় চাই চাই চাই।”

পাতারা ঘিরে দলে দলে

তারে কানে কানে বলে

"না না না"

নাচে তাই তাই তাই॥

বাতাস দখিন হ’তে আসে,

ফেরে তারি পাশে পাশে,

বলে “আয় আয় আয়!”

বলে “নীল অতলের কুলে

সুদূর অস্তাচলের মূলে

বেলা যায় যায় যায়।”

বলে “পূর্ণ শশির রাতি

ক্রমে হবে মলিন ভাতি

সময় নাই নাই নাই।”

পাতারা ঘিরে দলে দলে

তারে কানে কানে বলে

“না না না”

নাচে তাই তাই তাই॥

ঋতুচক্র · ৮১

৮১

ক্লান্ত বাঁশির শেষ রাগিণী বাজে শেষের রাতে।

শুক্‌নো ফুলের মালা এখন দাও তুলে মোর হাতে

সুরখানি ঐ নিয়ে কানে

পাল তুলে দিই পারের পানে,

চৈত্র রাতের মলিন মালা রইবে আমার সাথে॥

পথিক আমি এসেছিলেম তোমার বকুলতলে,

পথ আমারে ডাক দিয়েছে, এখন যাব চ’লে।

ঝরা যুঁথীর পাতায় ঢেকে

আমার বেদন গেলেম রেখে,

কোন্‌ ফাগুনে মিলবে সে যে তোমার বেদনাতে॥

ঋতুচক্র · ৮২

৮২

তোমার বীণায় গান ছিল আর আমার ডালায় ফুল ছিল গো।

একই দখিন হাওয়ায় সেদিন দোঁহায় মোদের দুল দিল গো॥

সেদিন সেতো জানেনা কেউ

আকাশ ভ’রে কিসের সে ঢেউ,

তোমার সুরের তরী, আমার রঙীন ফুলে কূল নিল গো॥

সেদিন আমার মনে হ’ল তোমার গানের তান ধ’রে

আমার প্রাণে ফুল-ফোটানো রইবে চিরকাল ধ’রে॥

গান তবু তো গেল ভেসে

ফুল ফুরালো দিনের শেষে,

ফাগুন বেলার মধুর খেলায় কোন্‌খানে হায় ভুল ছিল গো॥

ঋতুচক্র · ৮৩

৮৩

চৈত্র পবনে মম চিত্ত-বনে

বাণী-মঞ্জরী সঞ্চলিত

ওগো ললিতা॥

যদি বিজনে দিন ব’হে যায়,

খর তপনে ঝ’রে পড়ে হায়,

অনাদরে হ’বে ধূলি-দলিতা,

ওগো ললিতা॥

তোমার লাগিয়া আছি পথ চাহি,

বুঝি বেলা আর নাহি, নাহি।

বন-ছায়াতে তারে দেখা দাও,

করুণ হাতে তুলে নিয়ে যাও,

কণ্ঠহারে কর’ সঙ্কলিতা

ওগো ললিতা॥