ভগ্নহৃদয়
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৮১
ভগ্নহৃদয়।
(গীতি-কাব্য)
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রণীত।
কলিকাতা
বাল্মীকিযন্ত্রে
শ্রীকালীকিঙ্কর চক্রবর্ত্তী দ্বারা মুদ্রিত ও প্রকাশিত।
শকাব্দ।১৮০৩।
ভূমিকা।
এই কাব্যটিকে কেহ যেন নাটক মনে না করেন। নাটক ফুলের গাছ। তাহাতে ফুল ফুটে বটে, কিন্তু সেই সঙ্গে মূল, কাণ্ড, শাখা, পত্র, এমন কি কাঁটাটি পর্য্যন্ত থাকা চাই। বর্ত্তমান কাব্যটি ফুলের মালা, ইহাতে কেবল ফুলগুলি মাত্র সংগ্রহ করা হইয়াছে। বলা বাহুল্য, যে, দৃষ্টান্ত স্বরূপেই ফুলের উল্লেখ করা হইল।
কাব্যের পাত্রগণ।
কবি।
অনিল।
মুরলা।
অনিলের ভগ্নী ও কবির বাল্য-সহচরী।
ললিতা।
অনিলের প্রণয়িনী।
নলিনী।
এক চপল-স্বভাবা কুমারী।
চপলা।
মুরলার সখী।
লীলা
সুরুচি
মাধবী প্রভৃতি
নলিনীর সখীগণ।
সুরেশ
বিজয়
বিনোদ প্রভৃতি
নলিনীর বিবাহ বা প্রণয়াকাঙ্ক্ষী।
উপহার।
শ্রীমতী হে ————————————,
হৃদয়ের বনে বনে সূর্য্যমুখী শত শত
ওই মুখ পানে চেয়ে ফুটিয়া উঠেছে যত।
বেঁচে থাকে বেঁচে থাক, শুকায় শুকায়ে যাক্,
ওই মুখ পানে তারা চাহিয়া থাকিতে চায়,
বেলা অবসান হবে, মুদিয়া আসিবে যবে
ওই মুখ চেয়ে যেন নীরবে ঝরিয়া যায়!
জীবন-সমুদ্রে তব জীবন তটিনী মোর
মিশায়েছি একেবারে আনন্দে হইয়ে ভোর,
সন্ধ্যার বাতাস লাগি ঊর্ম্মি যত উঠে জাগি,
অথবা তরঙ্গ উঠে ঝটিকায় আকুলিয়া,
জানে বা না জানে কেউ, জীবনের প্রতি ঢেউ
মিশিবে—বিরাম পাবে—তোমার চরণে গিয়া।
হয়ত জান না, দেবি, অদৃশ্য বাঁধন দিয়া
নিয়মিত পথে এক ফিরাইছ মোর হিয়া।
গেছি দুরে, গেছি কাছে, সেই আকর্ষণ আছে,
পথভ্রষ্ট হইনাক’ তাহারি অটল বলে,
নহিলে হৃদয় মম ছিন্ন ধূমকেতু সম
দিশাহারা হইত সে অনন্ত আকাশ তলে।
আজ সাগরের তীরে দাঁড়ায়ে তোমার কাছে;
পর পারে মেঘাচ্ছন্ন অন্ধকার দেশ আছে;
দিবস ফুরাৰে যবে সে দেশে যাইতে হবে,
এ পারে ফেলিয়া যাব আমার তপন শশি,
ফুরাইবে গীত গান, অবসাদে ম্ৰিয়মান,
সুখ শান্তি অবসান কাঁদিব আঁধারে বসি!
স্নেহের অরুণালোকে খুলিয়া হৃদয় প্রাণ,
এ পারে দাঁড়ায়ে, দেবি, গাহিনু যে শেষ গান,
তোমারি মনের ছায় সে গান আশ্রয় চায়,
একটি নয়ন জল তাহারে করিও দান।
আজিকে বিদায় তবে, আবার কি দেখা হবে,
পাইয়া স্নেহের আলো হৃদয় গাহিবে গান?
অষ্টবিংশ সর্গ
অষ্টবিংশ সর্গ।
নলিনী।
ভাল ক’রে সাজায়ে দে মোরে।
বুঝি রূপ পড়িতেছে ঝোরে!
করিতে করিতে খেলা, জীবনের সন্ধ্যাবেলা
বুঝি আসে তিল তিল কোরে!
বড় ভয় হয় প্রতিক্ষণ
নলিনী হ’তেছে পুরাতন,
একে একে সবে তারে তেয়াগি যেতেছে হা রে,
কেন সখি, হতে’ছে এমন!
ভূলে যে আমার কাছে আসে
তখনি ত যাই তার পাশে,
দ্বিগুণ আদরে ডাকি, হাসি, গাই, কাছে থাকি,
তবুও কেন লো থাকেনা সে!
ছিল ত আমার রূপ রাশ
একেবারে পেলে কি বিনাশ?
সংসারে কেবলি তবে রূপের কাঙাল সবে?
কচি মুখানির সবে দাস?
ভালবাসা বলে কিছু নাই?
স্বার্থপর পুরুষ সবাই?
চির আত্ম-বিসর্জ্জন করে যে ভক্ত মন
হন মন কোথ। সখি পাই?
মুখেরি রাজত্ব যদি ভবে
এ মুখ সাজায়ে দেলো তবে!
অষ্টম সর্গ
অষ্টম সর্গ।
মুরলা ও চপলা।
চপলা।—দেখ্, সখি মাের, সত্য কহি তোরে,
প্রাণে বড় ব্যথা বাজে,
চপলার কেহ সখী নাই হেথা
এত বালিকার মাঝে!
তোদের ও মুখ হেরিলে মলিন
হৃদয় কাঁদিয়া উঠে,
আকুল হইয়া শুধাবার তরে
তাড়াতাড়ি আমি ছুটে;
শতবার কোরে শুধাই তোদের
কথা না কহিস্ তবু,
ভাবিস্, চপলা অবোধ বালিকা
কিছু সে বুঝেনা কভু!
চোখের জলের কাহিনী বুঝেনা,
বুঝেনা সে ভালবাসা,
পড়িতে পারেনা প্রাণের লিখন
দুখের সুখের ভাষা!
ভাল, সখি, ভাল, নাইবা বুঝিল,
তাহাতে কি যায় আসে?
চপলা কি শুধু হাসিতেই জানে;
কাঁদিতে কি জানে না সে?
মুরলা আমার, তোরে আমি এত
ভাল বাসি প্রাণ ভোরে,
তবু একদিন তোর তরে, সখি,
কাঁদিতে দিবিনে মোরে?
মুরলা।—চপলাটি মাের, হাসি-রাশি মোর,
আমার প্রাণের সখি!
নিজের হৃদয় নিজেই বুঝিনা
অপরে তা’ বুঝাব’ কি?
যাহাদের সুখে আমি সুখে র’ই
সকলেই সুখী তারা;
তবে কেন আমি একেলা বসিয়া
ফেলি এ নয়ন ধারা?
সকলেই যদি সুখে থাকে সখি,
আমি থাকিব না কেন?
প্রমোদ তেয়াগি বিজনে আসিয়া
কেনবা কাঁদিব হেন।
নিজের মনেরে বুঝানু কতই
কিছুই না পেনু সাড়া;
মুরলার কথা শুধাস্নে আর,
মুরলা জগত-ছাড়া!
চপলা।—এত দিনে দেখি কবির অধরে
হরষ কিরণ জ্বলে,—
যেন আঁখি তার ডুবিয়া গিয়াছে
সুখের স্বপন তলে!
জোছনা উদিলে কুসুম-কাননে,
একেলা ভ্রমিয়া ফিরে,
ভাবে মাতোয়ারা, আপনার মনে
গান গাহে ধীরে ধীরে;
নয়নে অধরে মলয়-আকুল
বসন্ত বিরাজ করে,
মধুর অথচ উদাস হরষ
ঘুমায় মুখের পরে!
হেন ভাব কেন হেরিলো তাহার
শুধাইব তোর কাছে!
বড়ই সে সুখে আছে!
মুরলা।—চপলা, সখিলো, দেখেছিস্ তারে?
বড় কি সে সুখে আছে?
কেমনে বুঝিলি, বল্ তাহা বল্,
বল্ সখি মোর কাছে!
বড় কি সে সুখে আছে?
চপলা।—হাঁলো সখি হাঁলাে;—শোন্ বলি তোরে,
আয়, সখি, মোর পাশে,
কবি আমাদের, নলিনী বালারে
মনে মনে ভালবাসে।
সত্য কহি তোরে, নলিনীরে বড়
ভাল নাহি লাগে মোর,
শুনিয়াছি নাকি পাষাণ হ’তেও
মন তার সুকঠোর!
মুরলা।—সে কি কথা বালা! মুখ খানি তার
নহে কি মধুর অতি?
নয়নে কি তার দিবস রজনী
খেলে না মধুর জ্যোতি?
চপলা।—শুনেছি সে জ্যোতি আলেয়ার চেয়ে
কপট, চপল না কি,
পথিকের পথ ভূলাবারি তরে
জ্বলি উঠে থাকি থাকি!
শুনেছি সে বালা, সারাটি জীবন
চড়িয়া পাষাণ-রথে,
চাকায় দলিয়া চলিবারে চায়
হৃদয়-বিছানো পথে!
শুনেছি সে নাকি একটি একটি
হৃদয় গণিয়া রাখে,
কি কুখণে, কবি আমাদের
ভাল বাসিয়াছে তাকে!
মুরলা।—চপলা, চপলা, পায়ে ধরি তাের,
ক’স্নে অমন কোরে।
তুই লো বালিকা, হৃদয় তাহার
চিনিবি কেমন কোরে?
চপলা।—কে জানে সজনি, বুঝিতে পারিনে
কেন যে হইল হেন,
তাহারে হেরিলে মুখ ফিরাইতে
সাধ যায় মোর যেন?
সেদিন যখন দেখিনু নলিনী
বসিয়া কবির সাথে,
সরমের বেশে লাজহীন হাসি
খেলিছে আঁখির পাতে;
দেখিনু কপোল ঢাকিয়া তাহার
আলক প’ড়েছে ঝুলি,
আঁচলেতে গাঁঠ বাঁধি শতবার
শতবায় ফেলে খুলি;
কে জানে আমার ভাল না লাগিল
চোলে এনু ত্বরা কোরে,
কপট সরম দেখিলে সজনি
সরমেতে যাই মোরে!
মুরলা আমার, অমন করিয়া
কেন লো রহিলি বসি,
দেখিতে দেখিতে মলিন হইয়া
এসেছে ও মুখ-শশি!
ভাবিস্নে সখি, কমলা ক’য়েছে
কাল মোর কাছে এসে,
পাষাণ-হৃদয়া নলিনীও নাকি
ভালবাসে কবিরে সে।
শুনেছি নলিনী কবিরে দেখিতে
নদীতীরে যায় নাকি!
কবিরে দেখিলে ঢ’লে পড়ে তার
অনুরাগ-নত আঁখি!
মুরলা।—নলিনী-বালারে ভালবেসে যদি
কবি মোর সুখে থাকে,
তাহা হ’লে, সখি, বল্ দেখি মোরে,
কেন না বাসিবে তাকে?
মোরা তাহা ল’য়ে ভাবি কেন এ?
চপলা লো আমরা কে?
চপলার গান।
যে ভাল বাসুক্—সে ভাল বাসুক্,
সজনি লো আমরা কে!
দীনহীন এই হৃদয় মোদের
কাছেও কি কেহ ডাকে?
তবে কেন বল ভেবে মরি মোরা
কে কাহারে ভাল বাসে,
আমাদের কি আসে যায় বল’
কেবা কাঁদে, কেবা হাসে!
আমাদের মন কেহই চাহে না,
তবে মন খানি লুকান’ থাক্,
প্রাণের ভিতরে ঢাকিয়া রাখ্
যদি, সখি, কেহ ভূলে
মন খানি লয় তুলে,
উলটি পালটি দুদণ্ড ধরিয়া
পরখ করিয়া দেখিতে চায়,
তখনি ধুলিতে ছুঁড়িয়া ফেলিবে
নিদারুণ উপেখায়।
কাজ কি লো, মন লুকান’ থাক্,
প্রাণের ভিতরে ঢাকিয়া রাখ্
হাসিয়া খেলিয়া ভাবনা ভুলিয়া
হরষে প্রমোদে মাতিয়া থাক্!
অষ্টাদশ সর্গ
অষ্টাদশ সর্গ।
ললিতা।
আদর করিয়া কেন না পাই আদর?
লজ্জা নাই কিছু নাই—না ডাকিতে কাছে যাই
সঙ্কোচে চরণ যেন করে থর থর,
ধীরে ধীরে এক পাশে বসি পদতলে,
বড় মনে সাধ যায়—মুখ খানি তুলে চায়
বারেক হাসিয়া কাছে বসিবারে বলে!
বড় সাধ কাছে গিয়ে, মুখ খানি তুলে নিয়ে
চাপিয়া ধরিগো এই বুকের মাঝার,
মুখ পানে চেয়ে চেয়ে কাঁদি একবার!
সে কেন বারেক চেয়ে কথাও না কয়,
পাষাণে গঠিত যেন, স্থির হোয়ে রয়!
যেনরে ললিতা তার কেহ নয়—কেহ নয়—
দাসীর দাসীও নয়—পথের পথিকো নয়!
যেন একেবারে কেহ—কেহ নাই কাছে,
ভাবনা লইয়া তার একেলা সে আছে!
কি যেন দেখিছে ছবি আকাশের পটে,
মুহূর্ত্তের তরে যেন—মনে মনে ভাবে হেন
“ললিতা এসেছে বুঝি, বোসেছে নিকটে,
সে এমন মাঝে মাঝে এসে থাকে বটে!”
মাঝে মাঝে আসে বটে, পারে না যে নাথ,
সখাগো নিতান্ত তাই কথাটি শুধাতে নাই?
বারেক করিতে নাই স্নেহনেত্র পাত?
নিতান্তই পদতলে পোড়ে থাকে বটে!
সখা তাই কিগো তারে তুলিয়া উঠাবে না রে,
বারেক রাখিবে নাকি বুকের নিকটে!
লতা আজ লুটাইয়া আছে পদমুলে,
মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখে—আপনারে ভুলে—
প্রাণপণে ভালবেসে জড়ায়ে জড়ায়ে শেষে
একদিন উঠিবে সে বুকে মাথা তুলে;
শাখাটি বাঁধিতে দিবে আলিঙ্গনে তার;
দুখিনীর সে আশা কি বড় অহঙ্কার?
কি কোরেছি অপরাধ বুঝিতে না পারি,
দিন রাত্রি সখা আমি রোয়েছি তোমারি;
কিসে তুমি ভাল রবে, কিসে তুমি সুখী হবে,
দিন রাত সে ভাবনা জাগিছে অন্তরে;
মুহূর্ত ভাবিনা আমি আপনার তরে।
তারি বিনিময়ে কিগো এত অনাদর!
শতখানা ফেটে যায় বুকের ভিতর।
সখা আমি অভিমান কভু করি নাই,
মনে করিতেও তাহা লাজে মরে যাই।
ধীরে ধীরে এসে কাছে মনে মনে হাস’ পাছে
“দুখিনী ললিতা সেও অভিমান করিয়াছে!”
তাই অভিমান কভু মনেও না ভার,
অশ্রু জল হেরে পাছে হাসি তব পায়!
বুকে বড় ব্যথা বাজে, তাই ভাবি মাঝে মাঝে
ভিক্ষুকের মত গিয়া পড়ি তব পায়;—
কেঁদে গিয়ে ভিক্ষা করি করিয়া বিনয়—
“সর্বস্ব দিয়েছি ওগো—পরাণ হৃদয়—
হৃদয় দিয়েছি বোলে হৃদয় চাহিনা ভুলে,
একটু ভালবাসিও—আর কিছু নয়।”
পাছেগো চাহিলে ভিক্ষা ধরিলে চরণে
বিরক্ত বা হও তাই ভয় করি মনে।
তবেগো কি হবে মোর? জানাব’ কি কোরে?
এমন ক’দিন আর রব’ প্রাণ ধোরে?
হা দেবি! হা ভগবতি! জীবন দুর্ভর অতি;
কিছুতে কি পাবনাক’ ভালবাসা তাঁর?
তবে নে মা—কোলে নে মা’—কোথাও আশ্রয় দে মা
একটু স্নেহের ঠাঁই দেখা, মা আমার!
চপলার প্রবেশ।
চপলা।—ললিতাও হলি নাকি মুরলার মত!
তেমনি বিষাদময় আঁখি দুটি নত।
তেমনি মলিন মুখে আছিস্ কিসের দুখে,
তোদের একি এ হ’ল ভাবিলো কেবল,
চপলারে তোরা বুঝি করিবি পাগল!
ছেলেবেলা বেশ ছিলি ছিলনা ত জ্বালা,
সদা মৃদুহাস্যময়ী লাজময়ী বালা।
একদিন—মনে পড়ে?—সরসীর তীরে,
ব’সেছিলি নিরিবিলি, কেবল দেখিতেছিলি
নিজের মুখের ছায়া প’ড়েছিল নীরে।
বুঝি মেতে গিয়েছিলি রূপে আপনার!
(তোর মত গরবিনী দেখিনি ত আর!)
সহসা পিছন হ’তে ডাকিলাম তোরে,
কি দারুণ সরমেতে গিয়েছিলি মোরে?
আজ তোর হ’ল কিলো ললিতা আমার?
সে সব লাজের ভাব নাই যেনো আর!
শুধু বিষাদের হাসি, মুরলার মত!
বল্ তোরা হলি একি? পৃথিবীর মাঝে দেখি
কেবল চপলা সুখী, দুঃখী আর যত!
মোরে কিছু বলবিনে?—আহা ম’রে যাই!—
অনিল সে কত ক’রে, আদর করে যে তোরে,
লুকায়ে লুকায়ে আমি যেন দেখি নাই!
ভাল, ভাল, বলিস্নে, আমার কি তায়?
চল্ তুই, ললিতা লো, মুরলা যেথায়!
যাহা তোর মনে আছে কহিস্ তাহারি কাছে,
তাহ’লে ঘুচিয়া যাবে হৃদয়ের ভার।
ত্বরা করে চল্ তবে, ললিতা আমার!
কবির প্রবেশ।
চপলা।—(কবির প্রতি)—
চল কবি মুরলার কাছে,
বড় সে মনের দুঃখে আছে!
তুমি, কবি, তারে দেখো, সদা কাছে কাছে রেখো,
তুমি তারে ভাল ক’রে করিও যতন,
তুমি ছাড়া কে তাহার আছে বা স্বজন!
কবি।—মুরলার মুখ দেখে প্রাণে বড় বাজে,
কিসের যে দুঃখ তার শুধায়েছি কতবার
কিছুতে আমার কাছে প্রকাশে না লাজে!
কত দিন হ’তে মোরা বাঁধা এক ডোরে,
যাহা কিছু থাকে কথা, যাহা কিছু পাই ব্যথা,
দুজনে তখনি তাহা বলি দুজনেরে।
কিছু দিন হ’তে একি হ’ল মুরলার!
আমারে মনের কথা বলে না সে আর;
মাঝে মাঝে ভাবি তাই, বড় মনে ব্যথা পাই,
বুঝি মোর পরে নাই প্রণয় তাহার!
এত কথা বলি তারে এত ভালবাসি,
সে কেন আমারে কিছু কহেনা প্রকাশি?
ঊনত্রিংশ সর্গ
উনত্রিংশ সর্গ।
ললিতা।
সংসারের পথে পথে মরীচিকা অন্বেষিয়া
ভ্রমিয়া হয়েছি ক্লান্ত নিদারুণ কোলাহলে—
তাই বলি একবার আমারে ঘুমাতে দাও—
শীতল করি এ হৃদি বিরামের স্নিগ্ধ জলে!
শ্রান্ত এ জীবনে মোর আসুক্ নিশীথ কাল;
বিস্মৃতি-আঁধারে ডুবি ভূলি সব দুখ জ্বালা;
নিঃস্বপ্ন নিদ্রার কোলে ঘুমাতে গিয়াছে সাধ,
মিশাতে মহা সমুদ্রে জীবনের স্রোত মালা!
শরীর অবশ অতি—নয়ন মুদিয়া আসে,
মৃত্যুর দ্বারের কাছে বসিয়া সন্ধ্যার বেলা,
চৌদিকে সংসার পানে মাঝে মাঝে চেয়ে দেখি—
আধ স্বপ্নে আধ’ জেগে দেখি গো মায়ার খেলা!
কত শত লোক আছে—কেহ কাঁদে—কেহ হাসে—
কেহ ঘৃণা করে, কেই প্রাণপণে ভালবাসে,
একটি কথার তরে কেহবা কাঁদিয়া মরে—
একটি চাহনি তরে চেয়ে আছে কত মাস—
একটি হাসির ঘায়ে কেহবা কঁদিয়া উঠে,
একটি হেরিয়া অশ্রু কারো মুখে ফুটে হাস!
কেহ বসে, কেহ ওঠে—কেহ থাকে, কেহ যায়—
জীবনের খেলা দেখি মরণের ঘরে শুয়ে—
হাসি নাই, অশ্রু নাই—সুখ নাই, দুঃখ নাই
হাসি অশ্রু সুখ দুখ দেখিতেছি চেয়ে চেয়ে।
শুধু শ্রান্তি-শুধু শ্রান্তি—আর কিছু—কিছু নহে,
নহে তৃষা—নহে শোক—নহে ঘৃণা, ভালবাসা,
দারুণ শ্রান্তির পরে আসে যে দারুণ ঘুম
সেই ঘুম ঘুমাইব—আর কোন নাই আশা!
ঊনবিংশ সর্গ
ঊনবিংশ সর্গ।
অনিল।
উঁহু, কি না করিলাম হৃদয়ের সাথ!
ঘোর উন্মত্তের মত সবলে যুঝিনু কত,
অশান্তির বিপ্লাবনে গেছে দিন রাত!
নিশীথে গিয়েছি ছুটে দারুণ অধীর,
নয়নেতে নিদ্রা নাই—চোখে না দেখিতে পাই
হাহা কোরে ভ্রমিয়াছি বিপাশার তীর!
কোরেছে দারুণ ঝড় বজ্রদন্ত কড়মড়,
চারিদিকে অন্ধকার সম্মুখে পশ্চাতে;
মাথার উপরে চাই একটিও তারা নাই,
সৃষ্টি যেন ঠাঁই নাহি পেতেছে দাঁড়াতে!
সাধ গেছে, ঝটিকার রুদ্রদেব গণ
বিশাল চরণ দিয়া দলি যায় এই হিয়া—
নিষ্পেষিত করি ফেলে কীটের মতন।
চূর্ণ হোয়ে একেবারে মিশে ধূলিরাশে,
উড়ে পড়ে চারিদিকে বাতাসে বাতাসে!
অশান্তির এক উপদেবহার মত
নিজের হৃদয় সাথে যুঝিয়াছি কত!
করি অশ্রুবারি পাত গেছে চলি দিনরাত
অবশেষে আপনি হলেম পরাভূত!
ইচ্ছা করে ছিঁড়ি ছিঁড়ি হৃদয় আমার
শকুনী গৃধিনীদের যোগাই আহার!
এহেন অসার, দীন, হৃদি অতি বলহীন,
যোগ্য শুধু শিশুর খেলেনা গড়িবার!
এ হৃদি কি বলবান পুরুষের মন—
সামান্য বহিলে বায়, সঘনে কাঁপিবে কায়
মাটিতে নোয়াবে মাথা লতার মতন!
কেন ধরা, কেন ওরে! জন্ম দিয়েছিলি মোরে?
এমন অসার লঘু দুর্ব্বল এ প্রাণ?
এখনি গো দ্বিধা হও, লও মোরে কোলে লও!
এ হীন জীবন-শিখা করগো নির্ব্বাণ!
আর একবার দেখি, যদি এ হৃদয়
পারি আমি বজ্রবলে করিবারে জয়!
কিন্তু হায় কে আমরা? ভাগ্যের খেলেনা,
প্রচণ্ড অদৃষ্ট স্রোতে ক্ষুদ্র তৃণ কণা!
অন্তরে দুর্দান্ত হৃদি পড়িছে উঠিছে,
বাহিরে চৌদিক হোতে ঝটিকা ছুটিছে;
যা কিছু ধরিতে চাই কিছুই খুঁজে না পাই,
স্রোতোমুখে ছুটিয়াছি বিদ্যুতের মত
দিগ্বিদিক হারাইয়া হোয়ে জ্ঞান হত।
চোখে না দেখিতে পাই, কানে না শুনিতে পাই,
তীব্রবেগে বহে বায়ু বধিরি শ্রবণ,
চারিদিকে টলমল—তরঙ্গের কোলাহল,
আকাশে ছুটিছে তারা উল্কার মতন;
ঘুরিতে ঘুরিতে শেষে পড়িগো আবর্ত্তে এসে,
চৌদিকে ফেনায়ে উঠে উর্ম্মির পর্ব্বত;
মস্তক ঘুরিয়া উঠে, সঘনে শোণিত ছুটে,
ঘুরিতে ঘুরিতে যাই—কোথায় ভেবে না পাই—
তলায়ে তলায়ে যাই পাতালের পথ;
আঁধারে দেখিতে নারি এনু কোন্ ঠাঁই—
ঊর্দ্ধে হাত তুলি কিছু ধরিতে না পাই—
ঘুরি ঘুরি রাত্রি দিন হোয়ে পড়ি জ্ঞান হীন,
নিম্নে কে চরণ ধরি করে আকর্ষণ!
কোথায় দাঁড়াব গিয়ে কে জানে তখন!
তবে আর কি করিব! যাই—যাই ভেসে—
পাষাণ বজ্রের মত অদৃষ্টের মুষ্টি শত
হৃদয়েরে আকর্ষিছে ধরি তার কেশে!
কি করিতে পারি বল আমি ক্ষুদ্র নর
অদৃষ্টের সাথে কভু সাজে কি সমর?
দিন রাত্রি তুষানলে মরি তবে জ্বোলে জ্বোলে,
হাসুক সমস্ত ধরা তীব্র ঘৃণা-হাসি,
সে মোরে করুক্ ঘৃণা যারে ভাল বাসি!
আপনার কাছে সদা হোয়ে থাকি দোষী,
হৃদয়ে ঘনাতে থাক্ কলঙ্কের মসী!
যার ভালবাসা তরে আকুল হৃদয়—
যার লাগি সহি জ্বালা তীব্র অতিশয়—
তারে ভালবাসি বোলে, তারি লাগি কাঁদি বোলে,
তারি লাগি সহি বোলে এতেক যাতনা—
সেই মোরে ঘৃণা কোরে ভাল বাসিবেনা!
তাই হোক্—তাই হোক্—ভাগ্য, তাই হোক্,
অভাগার কাছ হোতে সবে দুরে রোক্!
যাই যাই ভেসে যাই—যা হবার হবে তাই—
কে আছে আমার তরে করিবারে শোক?
ললিতার প্রবেশ।
এই যে, এই যে হেথা, ললিতা আমার,
আয়, আয়, মুখখানি দেখি একবার!
আসিবি কি ফিরে যাবি, তাই যেন ভাবি ভাবি
অতি ধীর মৃদুগতি সঙ্কোচে তোমার,—
আয় বুকে ছুটে আয় ভাবিস্নে আর!
কেনলো ললিতা রাণি, বিষণ্ন ও মুখখানি?
কেনলো অধরে নাই হাসির আভাস?
নয়ন এ মুখে কেন চাহিতে চাহেনা যেন,
কি কথা রোয়েছে মনে, বলিতে না চাস্!
অপরাধ কোরেছি কি প্রেয়সী আমার?
বল্লো কি শাস্তি মোরে দিতে চাস্ তার!
যা’ দিবি তাহাই সব,’ মাথায় পাতিয়া লব,’
তাহে যদি প্রায়শ্চিত্ত হয়লো তাহার!
সজনি, জানিস্ হা রে ভাল তু বাসিস্ যারে
মন তার অতি নীচ, অতি অন্ধকার!
অপরাধ করিবে সে, আশ্চর্য্য কি তার?
সখিলো, মার্জ্জনা তুই করিস্নে তারে,
চিরকাল ঘৃণা কর হৃদয় মাঝারে;
সখি, তুই কেন ভাল বাসিলি আমায়?
তাই ভেবে দিবানিশি মরি যাতনায়;
কেন সখি, দুজনের দেখা হোল আমাদের,
দারুণ মিলন হেন কেন হোল হায়?
জানি যে রে এ হৃদয়, দারুণ কলঙ্কময়!
কি বোলে দিব এ হৃদি চরণে তোমার!
চরণে ফেললো দলি হেন উপহার!
সতত সরমে বিঁধি লুকাতে চাহি এ হৃদি,
এ হৃদে বাসিলে ভাল মরে যাই লাজে,
হেন নীচ হৃদয়েরে ভাল বাসা সাজে!
ভাল আমি বাসি তোরে—চিরকাল বাসিবরে,
তবু চাহিনাকো আমি তোর ভালবাসা,
লোয়ে তোর নিজ মন সুখে থাক্ অনুক্ষণ,
হেন নীচ হৃদয়ের রাখিস্নে আশা!
বল্লো কিসের ব্যথা পেয়েছিস মনে?
থাক্, থাক্, কাজ নেই—থাক্ তা গোপনে—
হোয়েছেত যা হবার বোলে তা কি হবে আর!
হয় ত আমিই কিছু করিয়াছি দোষ!
কাজ কি সে কথা তুলে, সে সব যা’ না লো ভুলে,
একবার কাছে আয় এই খেনে বোস্।
আধেক অধর-ভরা দেখি সেই হাসি,
ঢাল্লো তৃষিত নেত্রে সুধা রাশি রাশি,
সখি মুখ তুলে চা’লো একটি কথা ক’ না লো!
ললিতা রে, মৌন হয়ে থাকিস্নে আর,
একবার দয়া কোরে কর্ তিরষ্কার!
সন্ধ্যা হোয়ে আসিয়াছে গেল দিনমান,
একটি রাখিবি কথা? গাহিবি কি গান?
ললিতার গান।
বুঝেছ বুঝেছি সখা, ভেঙ্গেছে প্রণয়,
ও মিছা আদর তবে না করিলে নয়?
ও শুধু বাড়ায় ব্যথা, সে সব পুরাণো কথা
মনে কোরে দেয় শুধু, ভাঙ্গে এ হৃদয়।
প্রতি হাসি প্রতি কথা প্রতি ব্যবহার
আমি যত বুঝি তব কে বুঝিবে আর!
প্রেম যদি ভূলে থাক,’ সত্য ক’রে বলনাক,’
করিব না মুহূর্ত্তের তরে তিরষ্কার!
আমি ত বোলেই ছিনু ক্ষুদ্র আমি নারী,
তোমার ও প্রণয়ের নহি অধিকারী।
আর কারে ভালবেসে সুখী যদি হও শেষে
তাই ভাল বেসো নাথ, না করি বারণ।
মনে কোরে মোর কথা মিছে পেয়োনাকো ব্যথা,
পুরাণো প্রেমের কথা কোর’ না স্মরণ!
অনিল (স্বগত)—কি! শেষে এই হােল, এই হােল হায়!
কি করেছি যার লাগি এ গান সে গায়?
তবে সে সন্দেহ করে প্রণয়ে আমার!
বিশ্বাস নাইক’ তবে মোর পরে আর!
বিশ্বাস নাইক তবে? তাই হবে, তাই হবে—
এত কোরে এই তার হোল পুরষ্কার!
সন্দেহ করিবে কেন? কি আমি কোরেছি হেন!
সন্দেহ করিতে তার কোন্ অধিকার?
আমি কি রে দিন রাত রহিনি তাহারি সাথ?
সতত করিনি তারে আদর যতন?
বাব বার তারে কিরে শুধাইনি ফিরে ফিরে
মুহূর্ত্তের তরে হেরি বিহ্বল মানস?
একটি কথার তরে কতনা শুধাই তারে—
একটি হেরিতে হাসি রজনী পোহাই!
তাই কি রে এই হোল? শেষে কি রে এই হোল?
তাইতে সংশয় এত? অবিশ্বাস তাই?
কল্পনায় অকারণে সে যদি কি করে মনে,
আমি কেন তার লাগি সব’ তিরস্কার?
তবে কি সে মনে করে ভাল বাসিনাকো তারে!
সকলি কপট তবে প্রণয় আমার?
না হয় ভাল না বাসি, দোষ তাহে কার?
কখনো সে কাছে এসে করেছে আদর?
কখনো সে মুছায়েছে অশ্রুবারি মোর?
আমি তারে যত্ন যত করেছি সতত
বিনিময় আমি তার পেয়েছি কি তত?
করেছিত আমার যা’ ছিল করিবার;
সহিতে হয়নি কভু অনাদর তার!
তবু সে কি করে আশা! হৃদয়ের ভালবাসা?
আদরেই ভালবাসা বাহিরে প্রকাশ,
তবু সে করিবে কেন মোরে অবিশ্বাস?
(প্রস্থান।)
ললিতা।—আর কেন অনুক্ষণ রহি তার পাশে
নিতান্তই যদি মোরে ভাল নাহি বাসে?
বিরক্তিতে ওষ্ঠ তার কঁপিতেছে বার বার
তবুও ললিতা তার পাশে পোড়ে আছে!
সঙ্গ তাঁর তেয়াগিয়া আছেন বিরলে গিয়া
সেথাও ললিতা ছুটে গেছে তাঁর কাছে!
এই মুখে হাসি ছিল তারে দেখি মিলাইল,
তবু সে রোয়েছে বসি পদতলে তাঁর!
যেখানেই তিনি যান্ সেথাই দেখিতে পান
এই এক পুরাতন মুখ ললিতার!
প্রমোদ আগারে বসি—সেথা এই মুখ!
বিরলে ভাবনা মগ্ন-সেথা এই মুখ!
বিজনে বিষাদ ভরে নয়নে সলিল ঝরে,
সেথাও সমুখে আছে এই—এই মুখ!
কি আছে এ মুখে তোর ললিতা অভাগী?
ওই মুখ—ওই মুখ—দিবানিশি ওই মুখ
যেথা যান্ সেথা লোয়ে যাস্রে কি লাগি?
ছিনু এই পদতলে প’ড়ে দিন রাত—
করেছিনু পথ-রোধ, দিয়েছে তাহার শোধ
ভালই কোরেছ সখা করেছ আঘাত!
মনে কোরেছি, সখা, প্রণয় আমার
ফুলময় পথ হবে, তোমারে বুকেতে লবে,
চরণে কঠিন মাটি বাজিবে না আর!
কিন্তু যদি ও পদের কাঁটা হোয়ে থাকি
এখনিই তুলে ফেল, এখনিই দোলে ফেল,
এমন পথের বাধা কি হবে গো রাখি?
আজ হেতে দিবানিশি রব’নাকো কাছে?
নিতান্তই ফাটে বুক, অশ্রুবারি আছে—
বিজনে কঁদিতে পারি—একেলা ভাবিতে পারি—
আর কি করিগো আশা? হবে যা’ হবার,
না ডাকিলে কাছে কভু যাবেনাকো আর!
এক দিন, দুই দিন, চোলে যাবে কত দিন,
তবু যদি ললিতারে না পান দেখিতে—
যে ললিতা দিন রাত রহিত গো সাথে সাথ,
সতত রাখিত তাঁরে আঁখিতে আঁখিতে,
বহু দিন যদি তারে না দেখেন আর
তবু কি তাহারে মনে পড়েনাকো তাঁর?
ভাবেন কি একবার—“তারে যে দেখিনা আর?
ললিতা কোথায় গেল? কোথায় সে আছে?”
হয়ত গো একবার ডাকিবেন কাছে;
দেখিবেন ললিতার মুখে হাসি নাই আর,
কেঁদে কেঁদে আঁখি গেছে জ্যোতিহীন হোয়ে;
একবার তবু কিরে আদর করেন মোরে
অতি শীর্ণ মুখ মোর বুকে তুলে লোয়ে?
তখন কঁদিয়া কব পা দুখানি ধোরে
“বড় কষ্ট পেয়েছিগো, আর সখা সহেনাকো!
মাঝে মাঝে একবার দেখা দিও মোরে।”
একত্রিংশ সর্গ
একত্রিংশ সর্গ।
অনিল ও কবি।
অনিল।—একবার এস তুমি—চলগো হোথায়
দেখে যাও কি হৃদয় দোলেছ দু’পায়!
যখন কোরক সবে—খোলে নাই আঁখি,
তখন হৃদয়ে তার বসিয়া একাকী—
দিনরাত—দিনরাত বিষদন্ত বিঁধি,
—আহা সেই সুকুমার কিশলয় হৃদি—
বিন্দু বিন্দু রক্ত তার করেছ শোষণ;
কথাটি সে বলে নাই—মুখটি সে তুলে নাই
হৃদয়-ঘতীরে হৃদে দিয়েছে আসন!
আজ সে যৌবনে যবে খুলিন নয়ন—
দেখিল হৃদয়ে তার নাই রক্ত-লেশ
যৌবনের পরিমল হয়েছে নিঃশেষ—
কথাটি সে বলিল না—মুখটি সে তুলিল না
দুর্ব্বল মাথাটি আহা পড়িল গো নুয়ে
মাটিতে মিশাবে কবে, চেয়ে আছে ভুঁয়ে!
এস তবে বিষকীট, দেখ’সে আসিয়া
—হলাহলময় হাসি মরিও হাসিয়া—
একটু একটু করি কি কোরে যেতেছে মরি
একটি একটি দল পড়িছে খসিয়া!
বিষাক্ত নিশ্বাসে তব বিষাক্ত চুম্বনে
কি রোগ পশিল তার সুকোমল মনে?
তার চেয়ে কেন তীব্র অশনি আসিয়া
দারুণ চুম্বনে তারে ফেলেনি নাশিয়া,
দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে জ্বরি জ্বরি হলাহলে
মর্মে মর্মে শিরে শিরে হতনা দহিতে,
মনের ব্যথার পরে দংশন সহিতে!
মুহূর্তের আলিঙ্গনে মরিত—ফুরাত—
মুহূর্ত জ্বলিয়া শেষে সকল জুড়াত!”
যে কৌশলে ধীরে ধীরে হৃদয়ের শিরে শিরে
দারুণ মৃত্যুর রস করেছ সঞ্চার—
সে কৌশল সফল যে হয়েছে তোমার।—
তাই একবার এস—দেখ’সে ত্বরায়
কেমন করিয়া তার জীবন ফুবায়!
নিদারুণ বিষ তব ফলে কি করিয়া,
জ্বরিয়া মরিতে হলে মরে কি করিয়া!
সে বালা, আসন্ন তার দেখিয়া মরণ,
কাঁদিয়া তোমার কাছে করেছে প্রেরণ!
এখনো চাওগো যদি—শেষ রক্তে তার
দিবে গো সে প্রক্ষালিয়া চরণ তোমার!
নিতান্ত দুর্ব্বল বুকে করিবে ধারণ
ওই তব নিরদয় কঠিন চরণ!
রক্তময় পদতলে বুক ফাটি গিয়া,
নিতান্ত মরিবে বালা কথা না কহিয়া!
তবে এস, তার কাছে এস একবার
আরম্ভ করিলে যাহা শেষ দেখ তার!
একবিংশ সর্গ
একবিংশ সর্গ।
অনিল।
কেমন? এখন তোর ঘুচেছে ত ভ্রম?
ভেঙ্গে দিলি হাল তুই, তুলে দিলি পাল তুই,
করিলি প্রবৃত্তি-স্রোতে আত্ম-বিসর্জন,
ভেবেছিল যাবি ভেসে কোন ফুলময় দেশে
চাঁদের চুম্বনে যেথা ঘুমায়ে গোলাপ
সুখের স্বপনে কহে সুরভি প্রলাপ!
কিন্তুরে ভাঙ্গিলি তরি কঠিন শৈলের পরি,
কিছুতেই পারিলিনে সামালিতে আর!
এখন কি করবিরে ভাব্ একবার!
ভগ্নকাষ্ঠ বুকে ধরি, উন্মত্ত সাগর পরি
উলটিয়া পালটিয়া যাবি ভেসে ভেসে;
নাই দ্বীপ, নাই তীর, উনমত্ত জলধির
ফেন-জটা উর্ম্মি যত নাচে অট্ট হেসে।
কেমন? এখন তোর ঘুচেছে ত ভ্রম?
এই ত নলিনী তোর? প্রাণের দেবতা তোর?
ছিছিরে কোথায় গিয়ে ঢাকিবি সরম?
নীচ হোতে নীচ অতি—হীন হোতে হীন—
পথের ধূলার চেয়ে অসার মলিন,
এই এক ধূলি-মুষ্টি কিনিয়া রাখিতে
সমস্ত জগৎ তোর চেয়েছিলি দিতে!
রাজ পথে মনের দোকান খুলিয়াছে—
রঙ্গ মাখাইয়া কত ঝুঁটা মন শত শত
সাজাইয়া রেখেছে সে দুয়ারের কাছে;
যে কোন পথিক আসে ডাকি তারে কয় পাশে,
হৃদয়ের ব্যবসায় করে সে রমণী—
আমারেও প্রতারণা কোরেছে এমনি!
যে মন কিনিয়াছিনু কিছুই সে নয়,
রঙ্গ-করা দুটা হাসি দুটা কথা-ময়!
প্রতি পিপাসিত আঁখি যে হাসি লুটিছে,
প্রতি শ্রবণের কাছে যে কথা ফুটিছে,
যে হাসির নাই বাস, নাই অন্তঃপুর,
চরণে যে বেঁধে রাখে মুখর নুপূর,
যে হাসি দিবস রাতি ভিক্ষার অঞ্জলি পাতি
প্রতি পথিকের কাছে নাচিয়া বেড়ায়,
অনিলরে! তারি তরে কেঁদেছিল হায়!
যে কথা, পথের ধারে পঙ্কের মতন,
জড়াইয়া ধরে প্রতি পান্থের চরণ,
সেই একটি কথা তরে হৃদয় আমার,
দিবানিশি ছিলি পোড়ে দুয়ারে তাহার!
হৃদয়ের হত্যা করা বার ব্যবসায়
সেই মহা পাপিষ্ঠার তুলনা কোথায়?
শরীর ত কিছু নয়, সে শুধু ধূলা—
ধুলির মুষ্টির সাথে হয় তার তুলা,
সমস্ত জগৎ তুল্য হৃদয়ের পাশে
সাথ কোরে হেন হৃদি যেন বিনাশে—
তোর মাথা পরশিল তাহারি চরণ!
তারেই দেবতা বোলে করিলি বরণ!
তারি পদতলে তুই সঁপিলি হৃদয়—
তোর হৃদি—যার কাছে কিছুই সে নয়!
শতেক সহস্র হেন নলিনী আসুক্ কেন
মনের পথের তোর ধূলিও না হয়।
বিধাতা, এ সৃষ্টি তব সব বিড়ম্বনা,
সত্য বোলে যাহা কিছু পরশিতে গেছি পিছু
ছুঁয়েছি যেমনি আর কিছুই রহেনা!
হৃদে হৃদে ভালবাসা কোরেছ সঞ্চার
অথচ দাওনি লোক ভাল বাসিবার!
সমস্ত সংসার এই খুঁজিয়া দেখিলে
দুটি হৃদি এক রূপ কেন নাহি মিলে?
ওই যে ললিতা হেথা আসিছে আবার।
কোরেছে সমস্ত মুখ বিষন্ন আঁধার!
কেন? তার হোয়েছে কি ভেবেত না পাই
যা’ লাগি বিষণ্ন হোয়ে রোয়েছে সদাই!
চায় কি সে দিন রাত্রি বুকে তারে রাখি,
অবাক্ মুখেতে তার তাকাইয়া থাকি?
দিবানিশি বলি তারে শত শত বার
“ভাল বাসি—ভাল বাসি প্রেয়সী আমার!”
তবেই কি মুখ তার হইবে উজ্জ্বল?
তবেই মুছিবে তার নয়নের জল?
এত ভাল কত জন বাসে এ ধরায়?
নিঃশব্দে সংসার তবু চোলে কি না যায়!
ঘরে ঘরে অশ্রুবারি ঝরিত নহিলে,
জগৎ ভাসিয়া যেত নয়ন সলিলে!
দিনরাত অশ্রুবারি আর ত সহিতে নারি;
দুর হোক-হেথা হোতে লইব বিদায়,
অদৃষ্টের অত্যাচার সহা নাহি যায়।
(অনিলের প্রস্থান।)
ললিতার প্রবেশ।
ললিতা।—এমনি করেই তোর কাটিবে কি দিন?
ললিতারে—আর ত সহেনা!
এ জীবন আর ত রহেনা!
বিধাতা, বিধাতা, তোর ধরিরে চরণ—
বল মোরে কবে মোর হইবে মরণ?
নাইক সুখের আশা—চাইনাকো ভালবাসা—
সুখ সম্পদের আশা দুরাশা আমার,—
কপালে নাইক যাহা চাইনা তা আর!
এক ভিক্ষা মাগি ওরে—তাও কি দিবিনে মোরে?
সে নহে সুখের ভিক্ষা–মরণ—মরণ!—
মরণ—মরণ দেরে—কিছু চাহিনেরে
আর কোন আশা নাই—মরণ মরণ!—
এখনি মুদিলে আঁখি যদিরে আর না থাকি,
অমনি বায়ুর স্রোতে মিশাইয়া যাই—
এখনি এখনি আহা হয় যদি তাই!
অনিলের প্রবেশ।
ললিতা।—কোথা যাও, কোথা যাও, সখা তুমি কোথা যাও—
একবার চেয়ে দেখ এই দিক পানে,
কহি গো চরণ ধোরে—ফেলিয়া যেওনা মোরে
আর ত যাতনা সখা সহেনা এ প্রাণে।
ভালবাসা চাইনা ত সখা গো তোমার,
একটুকু দয়া শুধু কোরো একবার!
একটুকু কোরো সখা মুখের যতন—
মুহূর্তের তরে সখা দিও দরশন,
নিতান্ত সহিতে নারি যবে পা দুখানি ধরি
আঘাত করি সখা ফেলিও না দূরে—
এই টুকু দয়া শুধু কোরো তুমি মোরে!
কোথা যাও বল বল, কোথা যাও চোলে!
যেতেছ কি হেথা হ’তে আমি আছি বোলে?
গভীর রজনী—এবে-ঘুমেতে মগন সবে
বল সখা কোথা যাও চাও কি করিতে?
অনিল।—মরিতে! মরিতে বালা! যেতেছি মরিতে!
ললিতা, বিধবা তুই আজ হোতে হলি,
ফেল্ অনিলের আশা মন হোতে দলি!
আর তুই সাথে সাথে আসিস্ নে মোর,
হেথা বহি যাহা ইচ্ছা করিস্রে তোর?
আবার——আবার।
থাক্ ওই খেনে তুই এগোস্নে আর!
শত শত বার করে বলিতে কি হবে তোরে?
বাড়া হোথা, এক পদ আসিসনে আর!
আসি নে, বলি তোরে বলি বার বার!
শান্তিতে মরিব যে রে তাও তুই দিবিনে রে?
মরিতে যেতেছি, তবু রাহুর মতন
পদে পদে সাথে সাথে করিবি গমম?
দাড়া হোথা, সাথে সাথে আসিসনে আর,
এই তোর পরে শেষ আদেশ আমার।
(অনিলের প্রস্থান ও ললিতার মুচ্ছিত হইয়া পতন।)
একাদশ সর্গ
একাদশ সর্গ।
অনিল।
অনিল।—কিছুইত হোল না!
সেই সব—সেই সব—সেই হাহাকার রব
সেই অশ্রু-বারিধারা, হৃদয়-বেদনা!
কিছুতে মনের মঝে শান্তি নাহি পাই,
কিছুই না পাইলাম যাহা কিছু চাই!
ভাল ত গো বাসিলাম—ভালবাসা পাইলাম,
এখনোত ভালবাসি—তবুও কি নাই!
তবুও কেনরে হৃদি শিশুর মতন
দিবানিশি নিরজনে করিছে রোদন!
মনোমত হয়নি বা যা’ কিছু পেয়েছে,
সকলেরি মাঝে বুঝি অভাব বোয়েছে!
আশ মিটাইয়া বুঝি ভালবাসি নাই,
ভালবাসা পাইনি বা যখন চাই!
যেন গো কাহার তরে মন ব্যগ্র আছে,
অশরীরী ছায়া তার দাঁড়াইয়া কাছে;
দুই বাহু বাড়াইয়া করি প্রাণপণ
তাড়াতাড়ি ছুট গিয়ে করি আলিঙ্গন—
ছায়া শুধু—ছায়া শুধু—হৃদয় না পুরে—
তা’ চেয়ে রহেনা কেন শত ক্রোশ দূরে?
আমার এ উৰ্দ্ধশ্বাস পিপাসিত মন
নাহি অনুভবে তার হৃদয়-স্পন্দন;
মন চায় হাতে তার রাখি মোর হাত
বুকে তার মাথা রাখি করি অশ্রুপাত;
সেই ত ধরিনু হাত বুকে মাথা রাখি,
দৃঢ় আলিঙ্গন তারে করি থাকি থাকি;
কিন্তু এ কি হোল দায়, এ কিসের মায়া?
কিছু না ছুঁইতে পাই, ছায়া সব ছায়া!
তাই ভাবি, মন মোর যা কিছু পেয়েছে
সকলেরি মাঝে বুঝি অভাব রোয়েছে!
তৃষিত হৃদয় চায় ভালবাসা যত
ললিতা ফিরায়ে বুঝি দেয়নাক’ তত!
আমি চাই এক সুরে দুই হৃদি বাজে,
আবরণ নাহি রয় দুজনার মাঝে!
সমুদ্র চাহিয়া থাকে আকাশের পানে,
আকাশ সমুদ্রে চায় অবাক নয়ানে,
তেমনি দোঁহার হৃদি হেরিবে দোঁহায়,
পড়িবে উভের ছায়া উভয়ের গায়!
কিন্তু কেন, ললিতার এত কেন লাজ!
এত কেন ব্যবধান দুজনার মাঝ?
মিলিবার তরে যাই হইয়া অধীর,
মাঝেতে কেনরে হেন লৌহের প্রাচীর?
আমি যাই তাড়াতাড়ি করিতে আদর,
তারে হেরে উল্লাসেতে নাচেগো অন্তর,
মিলিবারে অর্দ্ধপথে সে আসেনা ছুটে,
তার মুখে একটিও কথা নাহি ফুটে!
জানিগো ললিতা মোরে ভাল বাসে মনে,
যাতে আমি ভাল থাকি করে প্রাণপণে;
কিন্তু তাহে কিছুতেই তৃপ্ত নহে প্রাণ,
দুজনার মাঝে কেন এত ব্যবধান?
যেমন নিজের কাছে লাজ নাহি থাকে
তেমনিই মনে কেন করেনা আমাকে?
কিছুই গো হোল না!
সেই সব, সেই সব—সেই হাহাকার রব
সেই অশ্রুবারিধারা হৃদয় বেদনা!
ললিতার প্রবেশ।
ললিতা।—কেন গো বিষণ্ন হেরি নাথের বদন?
জেনে কি দোষ কিছু কোরেছি এমন?
একবার কাছে গিয়ে ধরি দুটি হাত
শুধাব কি—“হোয়েছে কি? অবোধ ললিতা সেকি
না বুঝে হৃদয়ে তব দিয়েছে আঘাত?”
সেদিন ত, শুধালেন নাথ যবে আসি—
“একবার বল্তরে—ভাল কি বাসিস মোরে?”
মুক্তকণ্ঠে বলেছিনু “নাথ, ভালবাসি!”
একেবারে সব লজ্জা দিনু বিসর্জন,
বুকে তাঁর মুখ রেখে কোরেছি রোদন—
কাঁদিয়ে কোহেছি কথা, জানায়েছি সব ব্যথা
যত কথা রুদ্ধ ছিল মরম তলেতে,
এত দিন বলি বলি পারিনি বলিতে!
সেদিন ত কোন লজ্জা ছিলনাকো আর;
কিন্তু গো আবার কেন উদিল আবার!
হেথায় দাঁড়ায়ে আমি রহি একধারে
এখনি দেখিতে নাথ পাবেন আমারে!
ডাকিলেই কাছে গিয়ে, সব লজ্জা বিসর্জ্জিয়ে
একেবারে পায়ে ধোরে কেঁদে গিয়ে কব’
“বল নাথ কি কোরেছি? কি হোয়েছে তব?”
অনিল।—এমন বিষন্ন হােয়ে বােসে আছি হেথা
তবুও সে দূরে আছে—তবু সে এলনা কাছে,
তবুও সে শুধালে না একটিও কথা!
পাষাণ বজ্রেতে গড়া এ লজ্জা তাহার,
প্রেম বরিষার নদী ভাঙ্গিতে নারিল যদি
দয়াতেও ভাঙ্গিবেনা হেরি অশ্রুধার?
লজ্জার একাধিপত্য যে নিষ্ঠুর মনে,
প্রেম দয়া যে হৃদয়ে বাস করে ভয়ে ভরে
চরণে শৃঙ্খল বাঁধা লজ্জার শাসনে—
অনিল কি করিবিরে লয়ে হেন মন?
তুই চাস মুখে তোর হেরিলে বিষাদ ঘোর
অশ্রুজলে অশ্রুজল করিবে বর্ষণ!
কতনা আদরে তোর মুছাবে নয়ন!
তুই কি চাস্রে হেন পাষাণ মুরতি
দূরে দাঁড়াইয়া রবে— একটি কথা না কবে,
সান্তনার তরে যবে তুই ব্যগ্র অতি?
হায়রে অদৃষ্ট মোর—কিছুই হোলনা—
সেই সব, সেই সব—সেই হাহাকার রব
সেই অশ্রুবারিধারা হৃদয় বেদনা!
অনিলের বেগে প্রস্থান।
ললিতা।—(স্বগত)
নয়নে আঁধার হেরি, ঘুরিছে সংসার,
মাগো মা—কোথায় মাগো—পারিনে মা আর!
(বৃক্ষতলে বসিয়া পড়িয়া)
গেলে তবে গেলে চলি নিষ্ঠুর—নিষ্ঠুর—
ললিতা যে এক ধারে দাঁড়ায়ে রোয়েছে হারে—
একটু আদর তরে হোয়ে তৃষাতুর!
কখন্ ডাকিবে বোলে আছে মুখ চেয়ে,
একটু ইঙ্গিতে পায়ে পড়িত গো ধেয়ে—
দেখেও, দেখেও তারে গেলে গো চলিয়া,
একবার ডাকিলে না ললিতা বলিয়া?
দোষ কি কোরেছি কিছু সখাগো আমায়?
তার লাগি কেন না করিলে তিরস্কার?
একবার চাহিলে না—ফিরেও গো দেখিলে না,
এমন কি অপরাধ পারি করিবারে?
তবে কেন, কেন নাথ, বলনি আমারে?
যদি সখা পায়ে ধোরে শত-শতবার কোরে
শুধাই গো, বলিবে কি, কি দোষ কোরেছি?
অভাগিনী যদি নাথ, যদি মোরে যাই,
মরণ শয্যায় শুয়ে শেষ ভিক্ষা চাই,
চরণ দুখানি ধুয়ে শেষ অশ্রুজলে,
দুখিনী ললিতা তব কেঁদে কেঁদে বলে,
তবুও কি ফিরিবে না? তবুও কি চাহিবে না?
তবুও কি বলিবে না কি দোষ কোরেছি!
তবুও কি সখা তুমি যাইবে চলিয়া?
একবার ডাকিবে না ললিতা বলিয়া?
চতুর্থ সর্গ
চতুর্থ সর্গ।
কবি।
(প্রথম গান।)
বিপাশার তীরে ভ্রমিবারে যাই,
প্রতিদিন প্রাতে দেখিবারে পাই
লতা-পাতা-ঘেরা জানালা মাঝারে
একটি মধুর মুখ।
চারিদিকে তার ফুটে আছে ফুল,
কেহবা হেলিয়া পরশিছে চুল,
দুয়েকটি শাখা কপাল ছুঁইয়া,
দুয়েকটি আছে কপোলে নুইয়া,
কেহবা এলায়ে চেতনা হারায়ে
চুমিয়া আছে চিবুক।
বসন্ত প্রভাতে লতার মাঝারে
মুখানি মধুর অতি!
অধর দুটির শাসন টুটিয়া
রাশি রাশি হাসি পড়িছে ফুটিয়া,
দুটি আঁখি পরে মেলিছে মিশিছে
তরল চপল জ্যোতি।
(দ্বিতীয় গান।
প্রতিদিন যাই সেই পথ দিয়া,
দেখি সেই মুখ খানি;
কুসুম মাঝারে রোয়েছে ফুটিয়া
কুসুমগুলির রাণী।
আপনাআপনি উঠে আঁখি মোর
সেই জানালার পানে,
আন-মন হোয়ে রহি দাঁড়াইয়া
কিছু খণ সেই খানে।
আর কিছু নহে, এ ভাব আমার
কবির সৌন্দর্য্য-তৃষা,
কলপনা-সুধা-বিভল কবির
মনের মধুর নেষা।
গোলাপের রূপ, বকুলের বাস,
পাপিয়ার বন-গান,
সৌন্দর্য্য-মদিরা দিবস রজনী
করিয়া করিয়া পান,
শিথিল হইয়া পোড়েছে হৃদয়,
নয়নে লেগেছে ঘোর,
বিকশিত রূপ বড় ভাল লাগে
মুগধ নয়নে মোর!
(তৃতীয় গান।)
প্রতিদিন দেখি তারে, কেন না দেখিনু আজি?
আলিঙ্গিতে গ্রীবা তার লতাগুলি চারিধার
আছে শত বাহু তুলি শত ফুল-হারে সাজি।
দূর-বন হোতে ছুটি আসিয়া প্রভাত-বায়
সে বয়ান না দেখিয়া, শূন্য বাতায়ন দিয়া
প্রবেশি আঁধার গৃহে করিতেছে হায় হায়!
কতখণ—কতখণ—কতখণ ভ্রমি একা,
গণিনু ফুলের দল, মাটিতে কাটিনু রেখা,
কতখণ—কতখণ—গেল চলি কতখণ
খণে খণে দেখি চাহি তবু না পাই দেখা!
ফিরিনু আলয় মুখে, চলিনু আপন মনে,
চলিতে চলিতে ধীরে ভূলে ভূলে ফিরে ফিরে
বার বার এসে পড়ি সেই—সেই বাতায়নে!
নিরাশ-আশার মোহে চেয়ে দেখি বারবার,
শূন্য—শূন্য—শূন্য সব বাতায়ন অন্ধকার,
ফুলময় বাহু দিয়া আঁধারকে বুকে নিয়া,
আঁধারকে আলিঙ্গিয়া রোয়েছে সে লতাগুলি,
তবু ফিরি ফিরি সেথা আসিলাম ভূলি ভূলি!
তেমনি সকলি আছে, বাতায়ন ফুলে সাজি,
দুলিছে তেমনি করি বাতাসে কুসুম-রাজি;
শুধু এ মনে আমার, এক কথা বার বার
এক সুরে মাঝে মাঝে উঠিতেছে বাজি বাজি—
“প্রতিদিন দেখি তারে কেননা দেখিনু আজি?”
“কেননা দেখিনু তারে কেননা দেখিনু আজি?”
অতিধীর পদক্ষেপে আলয়ে আসিনু ফিরি,
শতবার আন-মনে বলিলাম ধীরি ধীরি—
“প্রতিদিন দেখি তারে কেননা দেখিনু আজি?”
(চতুর্থ গান।)
কাল যবে দেখা হোল পথে যেতে যেতে চলি
মোরে হেরে আঁখি তার কেনগো পড়িল ঢলি?
অজানা পথিকে হেরি এত কি সরম হবে?
কি যেন গো কথা আছে, আটকিয়া রহিয়াছে,
আধ-মুদা দুটি আঁখি কি যেন রেখেছে ঢাকি,
খুলিলে আঁখির পাতা প্রকাশ তা হয় পাছে!
সরম না হয় যদি, এ ভাব কিসের তবে?
কাল তাই বোসে বোসে ভাবিয়াছি সারাক্ষণ,
স্বপনে দেখেছি তার ঢোলে-পড়া দুনয়ন!
প্রভাতে বসিয়া আজ ভাবিতেছি নিরিবিলি—
“মোরে হেরে আঁখি তার কেন গো পড়িল ঢলি?”
(পঞ্চম গান।)
সত্য কি তাহারে ভালবাসি?
ভুলি কি শুধু তার দেখে রূপরাশি?
স্বপনে জানি না তার হৃদয় কেমন,
সহসা আপনা ভুলে—শুধু কি রূপসী বোলে
জীবন্ত পুত্তলী পদে বিসর্জ্জিনু মন?
(ষষ্ঠ গান।)
মোর এ যে ভালবাসা রূপ-মোহ এ কি?
ভাল কি বেসেছি শুধু তার মুখ দেখি?
মুখেতে সৌন্দর্য্য তার হেরিনু যখনি
তখনি কি মন তার দেখিতে পাইনি?
মধুর মুখেতে তার আঁখি-দরপণে
মনচ্ছায়া হেরিয়াছি কল্পনা-নয়নে!
সেই সে মুখানি তার মধুর আকার
বেড়াতেছে খেলাইয়া হৃদয়ে আমার!
কত কথা কহিতেছে হরষে বিভোর,
কত হাসি হাসিতেছে গলা ধোরে মোর!
কি করিয়া হাসে আর কি কোরে সে কয়,
কি কোরে আদর করে ভালবাসাময়,
মুখানি কেমন হয় মৃদু অভিমানে,
সকলি হৃদয় মোর না জানিয়া জানে!
যেন তারে জানি কত বর্ষ অগণন,
এ হৃদয়ে কিছু তার নহে গো নূতন!
মুখ দেখে শুধু ভাল বেসেছি কি তারে?
মন তার দেখিনি কি মুখের মাঝারে?
(সপ্তম গান।)
দু জনে মিলিয়া যদি ভ্রমিগো বিপাশা-পারে!
কবিতা আমার যত সুধীরে শুনাই তারে!
দেহে মিলি এক প্রাণ গাহিতেছি এক গান,
দু জনের ভাবে ভাবে একেবারে গেছে মিশে,
দু জনে দুজন পানে চেয়ে থাকি অনিমিষে,
দু জনের আঁখি হোতে দু জনে মদিরা পিয়া
আসিবে অবশ হয়ে দোঁহার বিভল হিয়া!
মুখে কথা ফুটিবে না, আঁখি পাতা উঠিবে না,
আমার কাঁধের পরে নোয়াবে মাথাটি তার,
দু জনে মিলিয়া যদি ভ্রমি গো বিপাশা-পার!
(অষ্টম গান।)
শুনেছি—শুনেছি কি নাম তাহার—
শুনেছি—শুনেছি তাহা!
নলিনী—নলিনী—নলিনী—নলিনী—
কেমন মধুর আহা!
নলিনী—নলিনী—বাজিছে শ্রবণে
বাজিছে প্রাণের গভীর ধাম,
কভু আন-মনে উঠিতেছে মুখে
নলিনী—নলিনী—নলিনী নাম!
বালার খেলার সখীরা তাহারে
নলিনী বলিয়া ডাকে,
স্বজনেরা তার, নলিনী—নলিনী—
নলিনী বলে গো তাকে!
নামেতে কি যায় আসে?
রূপেতে কি যায় আসে?
হৃদয় হৃদয় দেখিবারে চায়
যে যাহারে ভালবাসে!
নলিনীর মত হৃদয় তাহার,
নলিনী যাহার নাম;
কোমল—কোমল—কোমল অতি
যেমন কোমল নাম!
যেমন কোমল, তেমনি বিমল
তেমনি সুরভ ধাম!
নলিনীর মত হৃদয় তাহার
নলিনী যাহার নাম!
চতুর্দশ সর্গ
চতুর্দ্দশ সর্গ।
মুরলা ও কবি।
কবি।—কত দিন দেখিয়াছি তােরে লো মুরলে,
একেলা কাঁদিতেছিস্ বসিয়া বিরলে।
করতনে রাখি মুখ—কি জানি কিসের দুখ—
বড় বড় আঁখি দুটি মগ্ন অশ্রুজলে!
বড়, সখি, ব্যথা লাগে হেরি তোর মুখ;
এমন করুণ আহা! ফেটে যায় বুক্।
ভাল কি বাসিস্ কারে? কতদিন বল্
পোষণ করিবি হৃদে হৃদয়-অনল?
যত তোর কথা আছে বলিস্ আমার কাছে,
এত স্নেহ কোথা পাবি—এত অশ্রুজল?
মুরলা।—কারে বা ভাল বাসিব কবিগাে আমার?
ভালবাসা সাজে কিগো এই মুরলার?
সখা, এত আমি দীন, এতই গো গুণ হীন,
ভালবাসিতে যে কবি, মরিগো লজ্জায়!
যদি ভূলি আপনারে, যদি ভালবাসি কারে,
সে জন ফিরেও কভু দেখে কি আমায়?
যদি বা সে দয়া কোরে আদর করে গো মোরে,
সঙ্কোচেতে দিবানিশি দহিনা কি তবু?
ভাই কবি বলি তাই—ভাল মে বাসিতে নাই,
ভালবাসা মুরলারে সাজে কিগো কভু?
দূর হোক্-মুরলার কথা দূর হোক্—
মুরলার দুখজ্বালা মুরলার হোক্—
বল কবি গেছিলে কি নলিনীর কাছে?
নলিনীর কথা কিছু বলিবার আছে?
কবি।—সখিলো, বড়ই মনে পাইয়াছি ব্যথা!
কাল আমি সন্ধ্যাকালে গিয়েছিনু সেথা;
পথ পার্শ্বে সেই বনে নীরবে আপন মনে
দেখিতে ছিলাম একা বসি কতক্ষণ
সন্ধ্যার কপোল হোতে সুধীরে কেমন
মিলায়ে আসিতেছিল সরমের রাগ;
একটি উঠেছে তারা, বিপাশা হরষে হারা
ছায়া বুকে লোয়ে কত করিছে সোহাগ!
কতক্ষণ পথ চেয়ে রোয়েছি বসিয়া—
এমন সময়ে হেরি—সখীদের সঙ্গে করি
আসিছে নলিনী বালা হাসিয়া হাসিয়া;
নাচিয়া উঠিল মন হরষে উল্লাসে,
রহিনু অধীর হোয়ে মিলনের আশে।
কিন্তু নলিনীর কেন চরণ উঠেনা যেন,
দুই পা চলিয়া যেন পারে না চলিতে,
কেহ যেন তার তরে বোসে নাই আশা কোরে,
সে যেন কাহারো সাথে আসেনি মিলিতে!
কোন কাজ নাই তাই এসেছে খেলিতে!
যেতে যেতে পথ মাঝে যদি হেরে ফুল
করতালি দিয়ে উঠে, তাড়াতাড়ি যায় ছুটে,
আনে তুলে, পরে চুলে, হেসেই আকুল!
কভু হেরি প্রজাপতি কৌতুহলে ব্যগ্র অতি
ধীরে ধীরে পা টিপিয়া যায় তার কাছে।
কভু কহে, “চল্ সখি সেই চাঁপা গাছে
আজিকে সকাল বেলা কুঁড়ি দেখেছিনু মেলা,
এতক্ষণে বুঝি তারা উঠিয়াছে ফুটে,
চল্ সখি একবার দেখে আসি ছুটে!”
কত না বিলম্ব পথে করিল এমন,
বড়ই অধীর হোয়ে উঠিল গো মন।
কতক্ষণ পরে শেষে গান গেয়ে হেসে হেসে
যেথা আমি বোসেছিনু আসিল সেথায়;
চলিয়া গেল সে যেন দেখেনি আমায়।
একেলা বসিয়া আমি রহিনু আঁধারে,
সমস্ত রজনী, সখি, সেই পথ ধারে।
কেন সখি, এত হাসি, এত কেন গান?
কিসের উল্লাসে এত পূর্ণ ছিল প্রাণ?
মন এক দলিবার আছেগো ক্ষমতা,
যখন তখন খুসী দিতে পারে ব্যথা,
তাই গর্ব্বে কোন দিকে ফিরেও না চায়?
তাই এত হাসি হাসে এত গান গায়?
কৃপান যে হাসি হাসে ঝলসি নয়ন,
বিদ্যুৎ যে হাসি হাসে অশনি-দশন!
অথবা হয়ত, সখি, আমারিই ভূল;
হয়ত সে মনে মনে কল্পনায় অকারণে
প্রণয়ে সন্দেহ করে হোয়েছে আকুল।
অভিমানে জানাইতে চায় মোর কাছে—
রাখেনা আমার আশা, নাই কিছু ভালবাসা,
ভাল না বেসেও মোরে বড় সুখে আছে!
যখন গাহিতেছিল মরমে দহিতে ছিল,
হাসি সে মুখের হাসি আর কিছু নয়,
গোপনে কঁদিতেছিল অশান্ত হৃদয়!
আজ আমি তার কাছে যাই একবার;
শুধাই,—অমন কোরে কেন সে নিষ্ঠুরা মোরে
দিয়াছে বেদনা, দলি হৃদয় আমার? (কবির প্রস্থান)
মুরলা।—আসিয়াছে সন্ধ্যা হোয়ে নিস্তব্ধ গভীর,
তারা নাহি দেখা যায় কুয়াশা ভিতরে,
একটি একটি কোরে পড়িছে শিশির
মুবলার মাথার শুকানো ফুল পরে!
জীর্ণ-শাখা শীত-বায়ে উঠে শিহরিয়া,
গাছের শুকনো পাতা পড়িছে ঝরিয়া;
ওঠ্লো মুরলা, ওঠ্, দিন হোল শেষ,
পর্লো মুরলা, পর্ সন্ন্যাসিনী বেশ!
মুরলা? মুরলা কোথা? গেছে সে মরিয়া;
সেই যে দুখিনী ছিল বিষণ্ন মলিন,
সেই যে ভাল বাসিত হৃদয় ভরিয়া,
সেই যে কাঁদিত বনে আসি প্রতিদিন,
সে বালা মরিয়া গেছে, কোথায় সে আর?
ছিন্ন বস্ত্র, ম্লান মুখ,লোয়ে দুঃখ ভার,
তাহার সে বুকের লুকানো কথা বোহে
মোরেছে সে বালা আজ সন্ধ্যায় উদরে!
তবে এ কাহারে হেরি নিশীথে শ্মশানে?
ও একটি উদাসিনী সন্যাসিনী যায়—
কারেও বাসেনা ভাল, কারেও না জানে
আপনার মনে শুধু ভ্রমিয়া বেড়ায়!
একটি ঘটনা ওর্ ঘটেনি জীবনে,
একটি পড়েনি রেখা ওর শূন্য মনে,
পথ ছাড়’ পান্থ, কিবা শুধাইছ আর?
জীবন কাহিনী কিছু নাই বলিবার!
মুরলা, সত্যই তবে হলি সন্যাসিনী?
সতাই ত্যজিলি তোর যত কিছু আশা?
তবেরে বিলম্ব কেন, বসিয়া আছিস্ হেন?
এখনো কি—এখনো কি সব ফুরায় নি?
এখনো কি মনে মনে চাস্ ভালবাসা?
বড় মনে সাধ ছিল রহিব হেথায়,
কষ্ট পাই দুঃখ পাই রব’ তাঁরি সাথ,
আজন্ম কালের তাঁর সহচরী হায়
আমরণ বেড়াইব ধরি তাঁরি হাত!
কিছুতে নারিনু অশ্রু করিতে দমন,
কিছুতে এল না হাসি বিষণ্ন বদনে,
সদাই এড়াতে হোত কবি নয়ন,
কাঁদিতে আসিতে হ’ত এ আঁধার বনে!
আজিকে সুখের দিন কবির আমার,
হৃদয়ে তিলেক নাই বিষাদ আঁধার,
নূতন প্রণয়ে মগ্ন তাঁহার হৃদয়
বিশ্ব চরাচর হেরে হাস্য-সুধাময়;
এখন, মুরলা আমি, কেন রহি আর?
যেখানেই যান্ কবি হর্ষে হাসি হাসি,
সেথাই দেখিতে পান্ এ মুখ আমার—
বিষাদের প্রতিমূর্তি অন্ধকার রাশি!
ওঠ্লো মুরলা তবে, দিন হোল শেষ,
পর্লো মুরলা তবে সন্যাসিনী বেশ!
বেড়াইবি তীর্থে তীর্থে, ত্যজিবি সংসার,
ভূলে যাবি যত কিছু আছে আপনার!
কত শত দিন, কত বর্ষ যাবে চলি—
তখন কপালে তোর পড়েছে ত্রিবলী,
নয়ন হইয়া তোর গেছে জ্যোতি হীন,
কত কত বর্ষ গেছে, গেছে কত দিন;
এই গ্রামে ফিরিয়া আসিবি একবার,
যাইবি মাগিতে ভিক্ষা কবির দুয়ার,
দেখিবি আছেন সুখে নলিনীরে লোয়ে
দুই জনে একমন এক প্রাণ হোয়ে!
কতনা শুনাইছেন কবিতা তাহারে!
কতনা সাজাইছেন কুসুমের হারে!
মোরে হেরে কবি মোর অবাক্ নয়নে
মোর মুখ পানে চেয়ে রহিবেন কত,
মনে পড়ি পড়ি করি পড়িবেনা মনে
নিশীথের ভূলে-যাওয়া স্বপনের মত!
কতক্ষণ মুখ পানে চেয়ে থেকে থেকে
সবিস্ময়ে নলিনীরে কহিবেন ডেকে—
“যেন হেন মুখ আমি দেখেছিনু প্রিয়া!
কিছুতেই মনে তবু পড়িছেনা আর!”
অমনি নলিনীবালা উঠিবে হাসিয়া
কহিবে “কল্পনা, কবি, কল্পনা তোমার!”
শুনিয়া হাসিবে কবি, ফিরাবে নয়ন,
নলিনীর পাখীটীরে করিবে আদর;
আমিও সেখান হোতে করিব গমন
ভ্রমিয়া বেড়াতে পুনঃ দূর দেশান্তর!
ওঠ্লো মুরলা তবে দিন হোল শেষ,
পর্লো মুরলা তবে সন্যাসিনী বেশ!
থাক্ থাক্, আজ থাক্, আজ থাক্ আর!
কবিরে দেখিতে হবে আরেকটি বার!
কাল হব সন্যাসিনী বরিব বিরাগে,
দেখি আরেকবার যাইবার আগে।
চতুর্বিংশ সর্গ
চতুর্ব্বিংশ সর্গ।
নলিনী।
সে জন চলিয়া গেল কেন?
কি আমি করেছি বল্ হেন!
সে মোরে দেছিল ভাল বাসা
আমি তারে দিয়েছিনু আশা।
হেসেছি তাহার পানে চেয়ে,
তুষেছি তাহারে গান গেয়ে!
এক সাথে ব’সেছি হেথায়
তবে বল’ আর কি সে চায়?
চায় কি সঁপিব তারে প্রাণ,
করিব জগত মোর দান?
মোর অশ্রুজল মোর হাসি,
আমার সমস্ত রূপ রাশি?
কে তার হৃদয় চেয়েছিল?
আপনি সে এনে দিয়েছিল।
পাছে তার মন ব্যথা পায়,
জ্ব’লে মরে প্রেম-উপেক্ষায়,
মা করে হেসেছি তাই
তাই তার মুখ পানে চাই।
দয়া ক’রে গান গেয়েছিনু,
দয়া ক’রে কথা ক’য়েছিনু।
একি তবে মন বিনিময়?
হৃদয়ের বিসর্জ্জন নয়?
সখি, তোরা বল্ দেখি, সত্য চ’লে গেল সে কি?
ফিরায়ে কি লইল হৃদয়?
এবার যদি সে আসে যাইব তাহার পাশে,
ভাল ক’রে কথা কব’ হেসে
গান গাব তার কাছে এসে?
এত দূরে গেছে তার মন,
গলাতে কি নারিব এখন?
চতুস্ত্রিংশ সর্গ
চতুস্ত্রিংশ সর্গ।
শয্যায় শয়ান ললিত-অনিলের প্রবেশ।
(ললিতার গান।)
বায়ু! বায়ু! কি দেখিতে আসিয়াছ হেথা?
কৌতুকে আকুল!
আমি—এক্টি জুঁই ফুল!
সারা রাত এ মাথায় পোড়েছে শিশির—
গণেছি কেবল!
প্রভাতে বড়ই শ্রান্ত ক্লান্ত হে সমীর!
অতি হীন বল!
ভাঙ্গা বৃন্তে ভর করি রয়েছি জীবন ধরি
জীবনে উদাস!
ওগো—উষার বাতাস!
শ্রান্ত মাথা পড়ে নুয়ে—চাহিয়া রোয়েছে ভূঁয়ে
মর’ মর’ এক্টি জুঁই ফুল।
কাছেতে এস’ না সোরে—এখনি পড়িবে ঝোরে
সুকুমার এক্টি জুঁই ফুল!
ও ফুল গোলাপ নয় (সুষমা সুরভিময়),
নহে চাঁপা নহে গো বকুল!
ও নহেগো মৃণালিনী—তপনের আদরিণী,
ও শুধু একটি জুঁই ফুল!
ওরে আসিয়াছ দিতে কি সংবাদ হায়—
হে প্রভাত বায়?
প্রভাতে নলিনী আজি কাঁদিছে রসে?
হাসুক্ সবসে!
শিশিরে গোলাপ গুলি কঁদিছে হরষে?
কাঁদুক্ হরষে!
ও এখনি বৃন্ত হোতে কঠিন মাটিতে
পড়িবে ঝরিয়া,
শান্তিতে মরেগো যেন মরিবার কালে
যাওগো সরিয়া!
মুখ খানি ধীরে ধীরে দেখিতেছ তুলে
দাঁড়াইয়া কাছে—
দেখিবারে—ক্ষুদ্র জুঁই মুখ নত করি
অভিমান কোরে বুঝি আছে!
নয় নয়—তাহা নয়—সে সকল খেলা নয়—
ফুরায় জীবন!—
তবে যাও—চোলে যাও—আর কোন ফুলে যাও
প্রভাত পবন!
ওরে কি শুধাতে আছে প্রেমের বারতা?
মর’ মর’ যবে?
একটি কহেনি কথা অনেক সহেছে—
মরমে মরমে কীট অনেক বহেছে—
আজ মরিবার কালে শুধাইছ কেন?
কথা নাহি ক’বে?
ও যখন মাটি পরে পড়িবে ঝরিয়া
ওরে লোয়ে খেলাস্নে তুই!
উড়ায়ে যাস্নে লোয়ে হেথা হোতে হোথা!
ক্ষুদ্র এক জুঁই!
যেথাই খসিয়া পড়ে—সেথা যেন থাকে পোড়ে
ঢেকে দিস্ শুকানো পাতার!
ক্ষুদ্র জুঁই ছিল কিনা—কেহই ত জানিত না
মরিলেও জানিবে না তায়!
কাননে হাসিত চাঁপা হাসিত গোলাপ
আমি যবে মরিতাম কাঁদি,
আজো হাসিবেক তারা শাখায় শাখায়
হাতে হাতে বাঁধি!
সে অজস্র হাসি মাঝে—সে হরষ রাশি মাঝে
ক্ষুদ্র এই বিবাদের হইবে সমাধি!
সমাপ্ত।
তৃতীয় সর্গ
তৃতীয় সর্গ।
মুরলা ও অনিল।
অনিল।—ও হাসি কোথায় তুই শিখেছিলি বোন?
বিষন্ন অধর দুটি অতি ধীরে ধীরে টুটি
অতি ধীরে ধীরে ফুটে হাসির কিরণ।
অতি ঘন মেঘমালা ভেদি স্তরে স্তরে, বালা,
সায়াহ্ন জলদ প্রান্তে দেয় যথা দেখা
ম্লান তপনের মৃদু কিরণের রেখা।
কত ভাবনার স্তর ভেদ করি পর পর
ওই হাসি টুকু আসি পঁহুছে অধরে!
ও হাসি কি অশ্রুজলে সিক্ত থরে থরে?
ও হাসি কি বিষাদের গোধূলির হাস?
ও হাসি কি বরষার সুকুমারী লতিকার
ধৌতরেণু ফুলটির অতি মৃদু বাস?
মুরলারে, কেন আহা, এমন তু’ হলি!
এত ভালবাসা কারে দিলি জলাঞ্জলি?
যে জন রেখেছে মন শূন্যের উপরে,
আপনারি ভাব নিয়া উলটিয়া পালটিয়া
দিনরাত যেই জন শূন্যে খেলা করে,
শূন্য বাতাসের পটে শত শত ছবি
মুছিতেছে, আঁকিতেছে—শতবার দেখিতেছে,
সেই এক মোহময় স্বপ্নময় কবি—
সদা যে বিহ্বল প্রাণে চাহিয়া আকাশ পানে,
আঁখি যার অনিমিষ আকাশের প্রায়,
মাটিতে চরণ তবু মাটিতে না চায়—
ভাবের আলোকে অন্ধ তারি পদতলে
অভাগিনী, লুটাইয়া পড়িলি কি বোলে?
সেকিরে, অবোধ মেয়ে, বারেক দেখিবে চেয়ে?
জানিতেও পারিবে না যাইবে সে চোলে,
যুঁথিকা-হৃদয় তোর ধূলি সাথে দোলে।
এত ভালবাসা তারে কেন দিলি হায়?
সাগর-উদ্দেশগামী তটিনীর পায়
ভাবিয়া না চিন্তিয়া যথা অবহেলে
ক্ষুদ্র নির্ঝরিণী দেয় আপনারে ঢেলে।
নিশীথের উদাসীন পথিক সমীর
শূন্য হৃদয়ের তাপে হইয়া অধীর,
কুসুম-কানন দিয়া যায় যবে কোয়ে,
আকুলা রজনীগন্ধা কথাটি না কোয়ে,
প্রাণের সুরভি সব দিয়া তার পায়,
পর দিন বৃন্ত হোতে ঝোরে পোড়ে যায়।
মেঘের দুঃস্বপ্নে মগ্ন দিনের মতন
কাঁদিয়া কাটিবে কিরে সারাটি যৌবন?
কেঁদে কেঁদে শ্রান্ত হোয়ে দীন অতিশয়—
আপনার পানে তবে চাহিয়া দেখিবি যবে
দেখিবি জীবন দিন সন্ধ্যা হয় হয়!
যে মেঘ মাঝারে থাকি উদিলি প্রভাতে
সেই মেঘ মাঝে থাকি অস্ত গেলি রাতে।
মুরলা।—কি জানি কেমন!
মুরলার সুখের কি দুঃখের জীবন!
সুখ দুঃখ দিনরাত মিলিয়া উভয়ে
রেখেছে সায়াহ্ণ করি এ শান্ত হৃদয়ে।
হেন আলিঙ্গনে তারা রয়েছে সদাই
যেন তারা দুটি সখা, যেন দুটি ভাই।
জোছনা ও যামিনীতে প্রণয় যেমন
তেমনি মিলিয়া তারা রোয়েছে দুজন।
সুখের মুখেতে থাকে দুখের কালিমা,
দুখের হৃদয়ে জাগে সুখের প্রতিমা।
একা যবে বসে থাকি স্তব্ধ জোছনায়,
বহে বাতায়ন পানে নিশীথের বায়,
বড় সাধ যায় মনে যারে ভালবাসি
একবার মুহূর্ত সে বসে কাছে আসি,
দুটি শুধু কথা কহে—একটু আদর—
সেই স্তব্ধ জোছনায় কাঁদিয়া কাঁদিয়া হায়
মরিয়া যাইগো তারি বুকের উপর।
যখনি কবিরে দেখি সব যাই ভূলে,
কিছুই চাহিনা আর—কিছুই ভাবি না আর—
শুধু সেই মুখে চাই দুটি আঁখি তুলে।
দেখি দেখি—কি যে দেখি, কি বলিব কি সে!
হৃদয় গলিয়া যায় জোছনায় মিশে।
জোছনার মত, সেই বিগলিত হিয়া
প্রাণের ভিতরে ধরি একবারে মগ্ন করি
কবিরে চৌদিকে যেন থাকে আবরিয়া।
মনে মনে মন যেন কাঁদিয়া দু’করে
কবির চরণ দুটি জড়াইয়া ধরে;
আঁখি মুদি “কবি—কবি” বলে শতবার,
শতবার কেঁদে বলে “আমার-আমার;”
“আমার আমার” যেন বলিতে বলিতে
চাহে মন একেবারে জীবন ত্যজিতে;
সুখেতে কি দুখে যেন ফেটে যায় বুক,
সুখ বলে দুখ আমি, দুখ বলে সুখ।
কোথা কবি কোথা আমি, সে যেগো দেবতা,
তারে কি কহিতে পারি প্রণয়ের কথা?
কবি যদি ভূলে কভু মোরে ভালবাসে
তা’ হোলে যে ম’রে যাব সঙ্কোচে উল্লাসে।
চাইনা, চাইনা আমি প্রণয় তাঁহার,
যাহা পাই তাই ভাল স্নেহ সুধা-ধার।
শুকতারা স্নেহ-মাখা করুণ নয়ানে
চেয়ে থাকে অস্তমান যামিনীর পানে,
তেমনি চাহেন যদি কবি স্নেহ ভরে
মুরলার ক্ষুদ্র এই হৃদয়ের পরে,
তাহা হোলে নয়নের সামনে তাঁহার
হাসিয়ে ফুরায়ে যাবে জীবন আমার।
অনিল।—স্বার্থপর, আপনারি ভাবভরে ভাের,
আজিও সে দেখিল না হৃদয়টি তোর?
সর্বস্ব তাহারি পদে দিয়া বিসর্জ্জন
কাঁদিয়া মরিছে এক দীন-হীন মন,
ইহাও কি পড়িল না নয়নে তাহার?
আপনারে ছাড়া কেহ নাহি দেখিবার?
নিশ্চয় দেখেছে, তবু দেখেও দেখেনি,
দেখেছে সে—নিরুপায়, নিতান্তই অসহায়
ভালবাসিয়াছে এক অভাগা রমণী,
দেখেছে—হৃদয় এক ফাটিয়া নীরবে,
একান্ত মরিবে তবু কথা নাহি কবে;
দেখেও দেখেনি তবু, পশু সে নির্দ্দয়!
ভাঙ্গিয়া দেখিতে চাহে রমণী হৃদয়।
শতধা করিতে চায় মন রমণীর,
দেখিবারে হৃদয়ের শির উপশির।
এমন সুন্দর মন মুরলা তোমার,
এমন কোমল, শান্ত, গভীর, উদার;
ও মহান্ হৃদয়েতে প্রেম জলধির
নাইরে দিগন্ত বুঝি, নাই তার তীর।
করিস্নে, করিস্নে ও হৃদি বিনাশ,
যৌবনেই প্রণয়েতে হোস্নে উদাস।
কহিগে প্রণয় তোর কবির সকাশে,
শুধাইগে ভাল তোরে বাসে কি না বাসে।
ভাল যদি নাই বাসে কেন সেই জন
মিছা স্নেহ দেখাইয়া বেঁধে রাখে মন?
না যদি করিতে পারে তোরে আপনার,
আপনার মত কেন করে ব্যবহার?
কথা নাহি কহে যেন, না করে আদর,
পরের মতন থাকে, দেখে তোরে পর!
নিরদয়-দয়া তোরে নাইবা করিল!
শত্রুতার ভালবাসা নাইবা বাসিল।
মুহূর্ত্ত সুখের তোরে দিয়া প্রলোভন
অসুখী করিবে কেন সারাটি জীবন?
দুদণ্ডের আদরেতে কভু ভুলিস্না!
আধেক সুখেতে কভু পূরে না বাসনা।
এখনি চলিনু তবে তার কাছে যাই,
ভাল বাসে কি না বাসে শুধাইতে চাই।
মুরলা।—মনে কোরেছিনু, ভাই, এ প্রাণের কথা
কাহারেও বলিব না যত পাই ব্যথা।
সেদিন সায়াহ্ণ কালে উচ্ছসি উঠিয়া
বড় নাকি কেঁদে মোর উঠেছিল হিয়া,
তাই আমি পাগলের মত একেবারে
ছুটিয়া তোমারি কাছে গেনু কাঁদিবারে।
উচ্ছ্বসি বলি যত কাহিনী আমার!
কেন রে বলিলি হা-রে, দুর্ব্বল, অসার?
ভালবাসিতেই যদি করিলি সাহস,
লুকাতে নারিস্ তাহা হা হৃদি অবশ?
পরের চোখের কাছে না ফেলিলে জল
আশ কি মেটেনা তোর রে আঁখি দুর্ব্বল?
মুরলারে, অভাগীরে,—কেন ভাল বাসিলিরে?
যদি বা বাসিলি ভাল কেন তোর মন
হোল হেন নীচ হীন, দুর্ব্বল এমন?
একটি মিনতি আজি রাখ গো আমার!
সহস্র যাতনা পাই আর কখনত ভাই
ফেলিব না তব কাছে অশ্রুবারি-ধার।
যেওনা কবির কাছে ধরি তব পায়,
ভূলে যাও যত কথা কহেছি তোমায়।
দয়া কোরে আরেকটি কথা মোর রাখ,’
যদি গো কবির পরে রোষ কোরে থাক’
মোর কাছে কভু আর কোরনাক’ নাম তাঁর
সে নাম ঘৃণার স্বরে কভু সহিব না,
জানালেম এই মোর প্রাণের প্রার্থনা!
অনিল।—তবে কি এমনি শুধু মিছে ভালবেসে
শূন্য এ জীবন তোর ফুরাইবে শেষে!
মুরলা।—যায় যদি যাক্ ভাই, ফুরায় ফুরাক্,
প্রভাতে তারার মত মিশায় মিশাক্;
মুরলার মত ছায়া কত আসে কত যায়,
কি হ’য়েছে তায়!
অবোধ বালিকা আমি, মিছে কষ্ট পাই,
এ জীবনে মুরলার কোন কষ্ট নাই।
স্নেহের সমুদ্র সেই কবি গো আমার,—
অনন্ত স্নেহের ছায়ে আমারে বেঁখেছে পায়ে,
তাই যেন চিরকাল থাকে মুরলার!
সে মেহের কোলে শুয়ে কাটায় জীবন!
সে স্নেহের কোলে প্রাণ করে বিসর্জ্জন!
কুসুমিত সে অনন্ত স্নেহ-রাজ্য পরে।
তিল স্থান থাকে যেন মুরলার তরে!
যত দিন থাকে প্রাণ-ব্যাপি সেই টুকু স্থান
মাটিতে মিশারে রবে হৃদয় আমার।
কোন-কোন-কোন সুখ নাহি চাহি আর।
ত্রয়স্ত্রিংশ সর্গ
ত্রয়স্ত্রিংশ সর্গ।
পর্ণ শয্যায় শয়ান মুরলা; চপলা।
চপলা।—কি করিয়া এত তুই হলিরে নিষ্ঠুর,
ললিতা সে, এত ভাল বাসিতিস যারে,
কি করিয়া ফেলি তারে যাবি দূর—দূর—
এতদিনকার প্রেম ছিঁড়ি একেবারে!
কবি তোরে এত ভাল বাসে যে মুরলে,
তা’রেও কি তুই, সখি, ফেলে যাবি চ’লে?
কবি ও অনিলের প্রবেশ।
কবি।—কি করিলি বল্ দেখি? কি করেছি তোর?
মুরলারে—মুরলারে—মুরলা আমার, হা—রে
কি ক’রেছি এত তুই হলি যে কঠোর?
প্রাণ মোর, মন মোর, হৃদয়ের ধন মোর,
সমস্ত হৃদয় মোর, জগৎ আমার—
একবার বল্ বালা-বল্ একবার
ছাড়িয়ে যাবিনে মোরে ফেলি এ সংসার—ঘোরে,
নিতান্ত এ হৃদয়েরে রাখি অসহায়।
আয়, সখি, বুকে থাক্, এই হেথা মাথা রাখ্,
হৃদয়ের রক্ত ফেটে বাহিরিতে চায়।
মুরলা, এ বুক্ তুই ত্যজিস্নে আর,
চিরদিন থাক্ সখি হৃদয়ে আমার?
মুরলা।—লও কবি—এই লও—এই মাথা তুলে লও—
অবসন্ন এ মাথা যে পারিনে তুলিতে,
একবার রাখ সখা, রাখ ও কোলেতে!
নিতান্তই স্বার্থপর হৃদয় আমার—
অতি নীচ হীন হৃদি এই মুরলার—
নির্দ্দয়—নির্দ্দয় বড়—পাষাণ হতেও দড়
ধূলি হতে লঘুতর হৃদয় আমার!
নহিলে কি করে আমি—কবি—কবি মোর—
(হৃদয়ে ঘনায়ে ছিল কি মোহের ঘোর!)
স্নেহময় তোমারেও ত্যজি অনায়াসে
কি করে আইনু চলি এ দূর প্রবাসে?
ও করুণ নয়নের অশ্রুবারি ধার
একবারো মনে নাহি পড়িল আমার?
অমন স্নেহের পানে ফিরে না চাহিয়ে
পারিনু আঘাত দিতে ও কোমল হিয়ে?
মার্জনা করিও এই অপরাধ তার—
কবি মোর—শেষ ভিক্ষা এই মুরলার!
এমন দুর্বল হৃদি—এত নীচ, হীন—
এমন পাষাণে গড়া—এতই সে দীন,
এযে চিরকাল ধ’রে ছিল তব কাছে—
এ অপরাধের, কবি, মার্জ্জনা কি আছে?
সখা, অপরাধ সারা অস্তিত্ব তাহার—
মরণে করিবে আজ প্রায়শ্চিত্ত তার!
কেন আজ মুখখানি শীর্ণ ও মলিন—
বড় যেন শান্ত দেহ—অতি বলহীন—
রাখ কবি মাথা রাখ’-এই বুকে মাথা রাখ’
একটু বিশ্রাম কর হৃদয়ে আমার!—
ছিছি সখা কেঁদোনাকো—মুরলার কথা রাখো
ও মুখে দেখিতে নারি অশ্রু বারি ধার!
কবি।—এতদিন এত কাছে ছিনু এক ঠাঁই
মিলনের অবসর মোরা পাই নাই।
কে জানিত ভাগ্যে, সখি, ঘটিবে এমন
মরণের উপকূলে হইবে মিলন।
মুরলা।—কি যে সুখ পেতেছি তা’ বলিব কি কোরে—
বল সখা, এখনি কি যাব’ আমি মোরে?
এই মরণের দিন না যদি ফুরায়—
মরিতে মরিতে যদি বেঁচে থাকা যায়—
দিন যায় দিন যায়—মাস চোলে যায়
তবু মরণের দিন না যদি ফুরায়!—
সখা ওগো—দাও মোরে—দাও মোরে জল
সুখেতে হোয়েছি শ্রান্ত—অতি দুরবল।—
কবি।—বিবাহ হইবে, সখি, আজ আমাদের—
দারুণ বিরহ ওই আসিবার আগে, সই,
অনন্ত মিলন হোক্ এই দুজনের!
আকাশেতে শত তারা চাহিয়া নিমেষ হারা,—
উহারা অনন্ত সাক্ষী রবে বিবাহের!—
আজি এই দুটি প্রাণ হইল অভেদ,
মরণে সে জীবনের হবেনা বিচ্ছেদ।
হোক্ তবে, হোক্, সখি, বিবাহ সুখের—
চিতায় বাসর শয্যা হোক্ আমাদের!—
মুরলা।-তবে তুলে আন ত্বরা রাশি রাশি ফুল!
চিতাশয্যা হোক্ আজি কুসুমে আকুল!
রজনী গন্ধার মালা গাঁথগো ত্বরায়,—
সে মালা বদল করি দিও এ গলায়,—
সেই মালা পোরে আমি তোমার সমুখে স্বামি—
করিব শয়ন সুখে সুখের চিতায়,
সেই মালা পোরে যেন দগ্ধ হয় কায়!
(অনিলের ফুল আনিতে প্রস্থান)
কবি গো, বড়ই সাধ ছিল মনে মনে
এক দিন কেঁদে নেব ধরি ও চরণে,—
দেখি, কবি, পা দুখানি দেখি একবার,
বড় সাধ গেছে মনে সুখে কঁদিবার!
কই, ফুল এল’ না তো আসিবে কখন?
এখনি ফুরায়ে পাছে যায় এ জীবন!
আরো কাছে এস কবি, আরো কাছে মোর,
রাখ হাত দুই খানি হাতের উপর!
কবিগো, স্বপ্নেও আমি ভাবি নাই কভু
শেষদিনে এত সুখ হবে মোর প্রভু!
এখনো এলনা ফুল! সখাগো আমার
বড় যে হোতেছি শ্রান্ত পারিনে যে আর!
(ফুল লইয়া অনিলের প্রবেশ।)
(অনিলের প্রতি) ললিতা, কেমন আছে বল ভাই বল।
অনিল।—ললিতা কেমন আছে? সে আছেরে ভাল!
মুরলা।—চিরকাল ভাল যেন থাকে আদরিণী
চিরকাল পতি সুখে থাকে সোহাগিনী!
কথা ক’ চপলা, সখি, মাথা খা আমার,
নীরবে নীরবে বসি কাঁদিস্ না আর!
মরণের দিনে দুঃখ র’য়ে গেল চিতে
হাসি খুশি মুখ তোর পেনুনা দেখিতে।
সুখে থাক্, সখি তুই চির সুখে থাক্,
হাসিয়া খেলিয়া তোর এ জীবন যাক্।
ওই যে এসেছে মালা, কবিগো ত্বরায়
পরায়ে দাওগো তাহা এ মোর গলায়।
এই লও হাত মোর রাখ তব হাতে,
ছেলেবেলা হোতে মোরে কত দয়া স্নেহ কোরে
রেখেছ এ হাত ধরি তব সাথে সাথে,
আবার মোদের যবে হইবে মিলন
এ হাত আমার, কবি, করিও গ্রহণ,
যেথা যাবে সেথা রব দুই জনে এক হব,
অনন্ত বাঁধনে রবে অনন্ত জীবন!
কবি।—বিবাহ মোদের আজ হোল এই তবে,
ফুল যেথা না শুকায় সদা ফুটে শোভা পায়
সেথায় আরেক দিন ফুল শয্যা হবে!
মুরলা (কবিকে) এস কবি বুকে এস,
(অনিলকে) এস ভাই কাছে বস,
(চপলাকে) একটি চুম্বন সখি, বুঝি প্রাণ যায়,
এই শেষ দেখা এই দুখের ধরায়,
আসিছে আঁধার ঘোর, কবি, কোথা তুমি মোর!
আরো কাছে, আরো কাছে, এসগো হেথায়!
আজ তবে বিদায়, বিদায়।
স্বামি, প্রভু, কবি, সখা,
আবার হইৰে দেখা,
আজ তবে বিদায় বিদায়!
ত্রয়োদশ সর্গ
ত্রয়ােদশ সর্গ।
অনিল ললিতা।
ললিতা।—ভেঙ্গেছে ভেঙ্গেছে যত লজ্জা ললিতার!
মুক্তকণ্ঠে শুধাইছে, সখা, বার বার,—
কি করিব বল দেখি তোমার লাগিয়া?
কি করিলে জুড়াইতে পারিব ও হিয়া?
এই পেতে দিনু বুক রাখ সখা রাখ’ মুখ
ঘুমাও তুমি গো, আমি রহিব জাগিয়া!
খুলে বল, বল সখা, কি দুঃখ তোমার!
অশ্রুজলে মিশাইৰ অশ্রুজল ধার।
এক দিন বোলেছিলে মোর ভালবাসা
পেলেই পূরিবে তব প্রণয় পিপাসা;
বোলেছিলে সব তব করিছে নির্ভর
পৃথিবীর সুখ দুঃখ আমারি উপর।
কই সখা? প্রাণ মন করেছিত সমৰ্পণ,
দিয়েছি ত যাহা কিছু ছিল আপনার,
তবু কেন শুকাল না অশ্রুবারি ধার?
অনিল।—ললিতারে, ললিতারে, আমার কিসের দুখ
হৃদয়ে জাগিছে যবে ওই তোর মধু মুখ!
জীবন নিশীথ মোর ও রবি কিরণে তোর
একেবারে মিশায়েছি আপনাকে পাশরিয়া;
মাঝে মাঝে হৃদাকাশে যদিও বা মেঘ আসে,
ভিতরে তবুও হাসে সে রবি-কিরণ প্রিয়া!
ওই স্মিত আঁখি দুটি হৃদয়ে রহিয়া ফুটি
রেখেছে ফুল ফুটায়ে প্রাণের বিজন বনে!
তব প্রেম সুধাধারা ঝরিয়া নির্ঝর পারা
তুলেছে হরিত করি এই মরুভূমি মনে!
তব হাসি জ্যোৎস্না সম এ মুগ্ধ নয়নে মম
সারা জগতের মুখে ফুটায়ে রেখেছে হাসি।
তুমি সদা আছ কাছে তাই দিবালোক আছে,
নাহিলে জগতে মোর কাঁদিত আঁধার রাশি;—
আয় সখি—বুকে আয়—উলসি উঠেছে প্রাণ—
ত্বরা কোরে যালো বালা—বাঁশি আন্-বীণা আন্—
আজি এ মধুর সাঁঝে—রাখি এ বুকের মাঝে
মধুর মুখানি তোর—ধীরে ধীরে কর্ গান?
ললিতা।—না সখা, মনের ব্যথা কোর’ না গােপন;
যবে অশ্রুজল হায় উচ্ছ্বসি উঠিতে চায়,
রুধিয়া রেখোনা তাহা আমারি কারণ।
চিনি সখা, চিনি তব ও দারুণ হাসি,
ওর চেয়ে কত ভাল অশ্রুজল রাশি।
মাথা খাও—অভাগীরে কোরনা বঞ্চনা,
ছদ্মবেশে আবরিয়া রেখোনা যন্ত্রণা;
মমতার অশ্রুজলে নিভাইব সে অনলে
ভাল যদি বাস’ তবে রাখ’ এ প্রার্থনা!
ত্রয়োবিংশ সর্গ
ত্রয়োবিংশ সর্গ।
কবি।
মুরলা কোথায়?
সে বালা কোথায় গেল? কোথায়? কোথায়?
সন্ধ্যা হয়ে এল ওই, কিন্তুরে মুরলা কই?
খুঁজে খুঁজে ভ্রমি তারে হেথায় হোথায়?
সে মোর সন্ধ্যার দীপ, কোথা গেল বল্!
একটি আঁধার ঘরে একাকী সে জ্বলিত রে
সন্ধ্যার দীপের মত বিষণ্ন উজ্জ্বল।
সন্ধ্যা হোলে ধীরে ধীরে আসিতাম ঘরে ফিরে
শান্ত পদক্ষেপে অতি মৃদু গান গেয়ে,
সুদূর প্রান্তর হ’তে দেখিতাম চেয়ে—
মোর সে বিজন ঘরে শূন্য বাতায়ন পরে
একটি সন্ধ্যার দীপ আলো কোরে আছে,
আমারি—আমার তরে পথ চেয়ে আছে—
আমারেই স্নেহ ভরে ডাকিতেছে কাছে।
হা মুরলা, কোথা গেলি, মুরলা আমার?
ওই দেখ্ ক্রমশই বাড়িছে আঁধাব!
সমস্ত দিনের পরে কবি তোর এল ঘরে—
প্রশান্ত মুখানি কেন দেখিনা তোমার!
ওই ঘরের কাছে দীপটি জ্বালানো আছে,
আসন আমার ওই রেখেছিস্ পেতে—
আমি ভালবাসি বোলে যতনে আনিয়া তুলে
রজনীগন্ধার মালা দিয়েছিস্ গেঁথে!
কিন্তুরে দেখিনা কেন তোর মুখ খানি?
শত শত বার ক’রে ভ্রমিতেছি ঘরে ঘরে—
কোথাও বসিতে নারি—শান্তি নাহি মানি!
হুহু করি উঠিতেছে সন্ধ্যার বাতাস,
প্রতি ঘরে ভ্রমিতেছে করি হাহুতাশ!
কাঁপে দীপ শিখা তাহে, নিভিয়া যাইতে চাহে,
প্রাচীরে চমকি উঠে ছায়ার আঁধার।
সে মুখ দেখিনে কেন? সে স্বর শুনিনে কেন,
প্রাণের ভিতরে কেন করে হাহাকার?
জানি না হৃদয় খানা ফাটিয়া কেনরে
আঁখি হ’তে শতধারে অশ্রুবারি ঝরে?
কে যেন প্রাণের কাছে কি-জানি-কি বলিতেছে,
কি জানি কি ভাবিতেছি ভাবিয়া না পাই!
কোথা যাই—কোথা যাই—বল্ কোথা যাই!
মুরলারে—মুরলা, কোথায়?
কোথায় গেলিরে বালা? কোথায়? কোথায়?
চপলার প্রবেশ।
চপলা।—কবিগো, কোথায় গেল মুরলা আমায়?
দারুণ মনের জ্বালা আর সহিল না বালা
বুঝি চ’লে গেল তাই ফিরিবে না আর!
বুঝি সে মুরলা মোর, সমস্ত হৃদয়
তোমারে সঁপিয়াছিল, আর কারে নয়,
বুঝিবা সে ভাল করে পেলে না আদর,
কঁদিয়া চলিয়া গেল দূর দেশান্তর।
চল কবি, মুরলারে খুঁজিবারে যাই,
আরেকটি বার যদি তার দেখা পাই,
ভাল ক’রে তারে তুমি করিও যতন,
কবি গো কহিও তারে স্নেহের বচন।
করুণ মুখানি তার বুকে তুলে নিও,
অশ্রুজল ধারা তার মুছাইয়া দিও!
ত্রিংশ সর্গ
ত্রিংশ সর্গ।
নলিনী।
বড় সাধ গেছে মনে ভাল বাসিবারে,
সখি তোর বল্ দেখি, ভালবাসি কারে?
বসন্তে নিকুঞ্জ বনে, বেষ্টিত সহস্র মনে
নলিনী প্রাণের খেলা শুধু খেলিয়াছে,
খেলা ছাড়া সত্যকার জীবন কি আছে?
সে জীবন দেখিবারে বড় সাধ গেছে!
মনেতে মিশায়ে মন সচেতনে অচেতন,
জগত হইয়া আসে মৃদু ছায়াময়,
দুটি মন চেয়ে থাকে দোঁহে দোঁহা ঢেকে রাখে,
সজনি লো, সে বড় সুখের মনে হয়!
সে সুখ কি পাই যদি ভালবাসি কারে?
বড় সাধ যায় সখি ভাল বাসিবারে!
এত যে হৃদয় আছে, ভ্রমে নলিনীর কাছে,
নলিনীর নহে কিগো একটি ও তার?
যদি কারো দ্বারে যাই, কাঁদিয়া আশ্রয় চাই,
কেহই কি খুলিবে না হৃদয়ের দ্বার।
হৃদয়ের দুয়ারের বাহিরে বসিয়া
খেলেছি মনের খেলা সকলে মিলিয়া,
সিংহাসন নিয়মিত’ আমারে বসায়ে দিত’
পদতলে ফুল তুলে দিত সবে আনি,
গরবে উন্মত্ত-হিয়া, আপনারে বিসরিয়া,
তাবিতাম আমি বুঝি হৃদয়ের রাণী?
চারিদিকে আমার হৃদয়-রাজধানী!
দিবস সায়াহ্ন হ’ল, বসন্ত ফুরায়,
খেলাবার দিন যবে অবসান—প্রায়,
মাথায় পড়িল বাজ, সহসা দেখিনু আজ,
আমি কেহ নই, শুধু খেলাবার রাণী,
বালুকার পরে গড়া খেলা-রাজধানী!
নিতান্ত ভিখারী আজি, দীনহীন বেশে সাজি
দুয়ায়ে দুয়ারে ভ্রমি আশ্রয়ের তরে,
সবাই ফিরায় মুখ উপেক্ষার ভরে।
খেলা যবে ফুরাইল কে কোথায় চ’লে গেল,
তাই বড় সাধ যায় ভাল বাসিবারে।
সখি তোরা, বল্ দেখি, ভাল বাসি কারে?
দশম সর্গ
দশম সর্গ।
মুরলা।
যার কোন রূপ নাই, যার কোন গুণ নাই,
তবুও যে হতভাগ্য ভালবাসে মনে,
দুই দিন বেঁচে থাকে, কেহ নাহি জানে তাকে
ভাল বাসে, দুঃখ সহে, মরেগো বিজনে!
ক্ষুদ্র তৃণ-ফুল এক জন্মে অন্ধকারে,
দুই দণ্ড বেঁচে থাকে কীটের আগার;
শুকায়ে পড়ে সে নিজ কাঁটার মাঝারে,
নিজেরি কাঁটার মাঝে সমাধি তাহার।
কি কথা কোস্রে তুই অকৃতজ্ঞ মন!
স্নেহময় দয়াময় কবি সে আমার,
এই তৃণ ফুলেরে কি করেনি যতন?
এরেও কি রাখে নাই হৃদয়ে তাহার?
ছেলেবেলা হোতে মোরে রেখেছেন পাশে!
যখনি পূরিত মন নব গীতোচ্ছ্বাসে
আমারেই তাড়াতাড়ি শুনাতেন তিনি,
এত তাঁর ছিল সঙ্গী আছিল সঙ্গিনী!
এত যে পাইনু, তাঁরে কি পারিনু দিতে?
মুরলার যাহা কিছু ছিল;—ভালবাসা—
ক্ষুদ্র এই হৃদয়ের সুখ দুঃখ আশা!
একটু পারেনি তাঁরে সান্ত্বনা করিতে,
মুছাইনি এক বিন্দু নয়নের ধার—
যাহা কিছু সাধ্য ছিল কোরেছি আমার!
আমি যদি না হতেম বাল্য-সখী তাঁর,
নলিনী বালারে যদি পেতেন সঙ্গিনী,
করিতে হোতনা তাঁরে এত হাহাকার—
কতইনা সুখী আহা হতেন গো তিনি!
বিধাতা! বিধাতা! যদি তাই গো করিতে!
মুরলা জন্মিল কেন নলিনী থাকিতে!
এখনো কে গো তার হয়না মবণ?
এসংসারে মুরলারে কার প্রয়োজন?
ওই আসিছেন কবি!— এস কবি!—এস কবি
একবার অতি কাছে এস মুরলার!
তুমি যবে কাছে থাক কবি গো আমার—
আপনারে ভূলে যাই—ওই মুখ পানে চাই
তোমা ছাড়া কিছু মনে নাহি থাকে আর!
তুমি যবে দূরে থাক’ কবিগো, তখন—
আপনারি ক্ষুদ্র দুঃখে থাকি অচেতন!
বড় যে দুর্বল দীন মুরলা তোমার!
যুঝিতে মনের সাথে পারে না সে আর!
থেকোনা, থেকোনা দূরে থেকোনা গো প্রভু,
মুরলারে ত্যাগ কোরে যেওনা গো কভু!
শ্রান্ত ক্লান্ত অতি দীন—বলহীন রক্তহীন
ধূলায় লুণ্ঠিত এই অতি ক্ষুদ্র প্রাণ,
তোমার মনের ছায়ে দেহ’ এরে স্থান!
আমারে লুকায়ে রাখ’ প্রসারিয়া পাখা,
তোমার বুকের কাছে রব’ আমি ঢাকা!
নহিলে দুর্ব্বল এই দীন অসহায়
পথ হারাইয়া কোথা ভ্রমিয়া বেড়ায়?
তুমি কবি ছিলেনাকো, একেলা বিজনে
নিজ হাতে—বসি হেথা—দুঃখের কণ্টকলতা
রোপিতেছিলাম, কবি, আপনারি মনে,
তাই নিয়ে অনুক্ষণ—যেন আদরের ধন—
আত্মদাহী কল্পনায় খেলায়েছি কত,
যতনে ঢেলেছি তায় অশ্রুধারা শত,
এবে প্রতি মুল তার হৃদয়ের চারিধার
দংশে শত বাহু মেলি বৃশ্চিকের মত!
তুমি সখা এস কাছে, মরিতেছি জ্বলি,
ও চরণ দিয়ে কবি ফেল সব দলি!
প্রতি শাখা—প্রতি পত্র—প্রতি মূল তার
এস’ কবি বল দাও—এ হৃদয়ে বল দাও—
আর কভু বর্ষিব না অশ্রুবারি ধার!
কবির প্রবেশ।
কবি।—সকাল হইতে, মুরলা সখিলো,
খুঁজিয়া বেড়াই তোরে,
বড়ই অধীর-হরষে আমার
হৃদয় গিয়েছে ভোরে।
পারিনে রাখতে প্রাণের উচ্ছ্বাস,
আকুল ব্যাকুল করিতে প্রকাশ,
অধীর হইয়া সকাল হইতে
খুজিয়া বেড়াই তোরে।
তোরে না কহিলে হৃদয়ের কথা
মন শান্তি নাহি মানে;
কেন, সখি, তুই বসে র’য়েছিস্
একা একা এই খানে?
দেখ্, সখি, আজ গিযেছিনু আমি
প্রমোদ-কাননে তার,
গাছের ছায়াতে আপনার মনে
ব’সেছিনু একধার।
মুরলা, হেথায় অন্ধকার ঘোর,
দেখিতে পাইনে মুখ খানি তোর
এত অন্ধকার ভাল নাহি লাগে
ওই খানে যাই উঠে।
ওখানে প’ড়েছে ববির কিরণ,
সমুখে সরসী হাসিছে কেমন,
গাছের উপরে শাখা শাখা ভোরে
বকুল র’য়েছে ফুটে।
এই খানে আয়, এই খানে বোস্,
শোন সখি তার পরে;—
গাছের তলায় ছিলাম বসিয়া
মগন ভাবনা তরে।
গীতস্বর শুনি চমকি উঠিনু,
শুনিনু মধুর বাঁশরী বাজে,
গীতের প্লাবনে আকাশ পাতাল
ডুবিয়া গেল গো নিমেষ মাঝে।
আকাশ-ব্যাপিনী জোছনার, সখি,
মরমে মরমে পশিল গান,
পৃথিবী-ডুবান’ জোছনারে, সখি,
ডুবায়ে দিল সে মধুর তান।
একটি একটি করি কথা তার
পশিতে লাগিল শ্রবণে যত,
শোণিত লাগিল উঠিতে পড়িতে,
হৃদয় হইল পাগল-মত।
একটি একটি একটি করিয়া
গাঁথিতে লাগিনু কথা,
গান গাওয়া তার ফুরাল’ যখন
ফুরাল’ আমার গাঁথা।
মুরলা, সখিলো, বল্ দেখি মোরে
কি গান গাহিতেছিল মধু-স্বরে
বিশ্ব করি বিমোহিত?
আমারি রচিত—আমারি রচিত—
আমারি রচিত গীত!
মুরলা, সখিলো, বল্ দেখি মোরে
কে গান গাহিতেছিল মধু-স্বরে,
উনমাদ করি মন,
আমারি নলিনী—আমারি নলিনী—
আমারি হৃদয়-ধন।
সখি, মোর সেই মনের কথা,
সখি, মোর সেই গানের কথা,
দিয়াছে মাজিয়া তার স্বর দিয়া,
প্রতি কথা তার উঠে উজলিয়া
মেঘে রবি-কর যথা।
শুনিবি, কি গান গাহিতে ছিল সে
অমৃত-মধুর রবে?
শোন্, মন দিয়ে তবে।
গান।
কে তুমি গো খুলিয়াছ স্বর্গের দুয়ার?
ঢালিতেছ এত সুখ, ভেঙ্গে গেল—গেল বুক—
যেন এত সুখ হৃদে ধরে না গো আর!
তোমার সৌন্দর্য্য-ভারে দুর্ব্বল-হৃদয় হা—রে
অভিভূত হ’য়ে যেন প’ড়েছে আমার!
এস তবে হৃদয়েতে, রেখেছি আসন পেতে,
ঘুচাও এ হৃদয়ের সকল আধার!
তোমার চরণে দিনু প্রেম-উপহার,
মা যদি চাওগো দিতে প্রতিদান তার,
নাইবা দিলে তা’ বালা, থাক’ হৃদি করি আলা
হৃদয়ে থাকুক জেগে সৌন্দর্য্য তোমার!
দ্বাত্রিংশ সর্গ
দ্বাত্রিংশ সর্গ।
নলিনী।
আজ আমি নিতান্ত একাকী,
কেহ নাই, কেহ নাই হায়!
শূন্য বাতায়নে বসি পথ পানে চেয়ে থাকি,
সকলেই গৃহ মুখে চ’লে যায়—চ’লে যায়!
নলিনীর কেহ নাই হায়!
পুরাণো প্রণয়ী সাথে চোখে চোখে দেখা হ’লে,
সরমে আকুল হ’য়ে তাড়াতাড়ি যায় চোলে!
প্রণয়ের স্মৃতি শুধু অনুতাপ রূপে জাগে,
ভূলিবারে চাহে যেন ভাল যে বাসিত আগে।
বিবাহ করেছে তারা, সুখেতে রয়েছে কিবা,
ভাই বন্ধু মিলি সবে কাটাইছে নিশি দিবা।
সকলেই সুখে আছে যে দিকে ফিরিয়া চাই,
আমি শুধু করিতেছি কেহ নাই—কেহ নাই।
তাদের প্রেয়সী যদি মোরে দেখিবারে পায়,
হাসিয়া লুকান’ হাসি মোর মুখ পানে চায়,
অবাক হইয়া তারা ভাবে কত মনে মনে,
“এই কি নলিনী সেই—মুখে যার হাসি নেই,
বিষাদ-আঁধার জাগে জ্যোতিহীন দুনয়নে!
এই কি নাথের মন হ’য়েছিল একেবারে!”
কিছুতে সে কথা যেন বিশ্বাস করিতে নারে!
হয়ত সে অভিমানে তুলিয়া পুরানো কথা,
নাথের হৃদয়ে তার দিতে চায় মনোব্যথা।
অমনি সে সসঙ্কোচে যেন অপরাধী মত,
মরমে মরিয়া গিয়া বুঝাইতে চায় কত!
সেদিন খেলিতেছিল নীরদের ছেলে দুটি,
কচি মুখে আধ’ আধ’ কথা পড়িতেছে ফুটি,
অযতনে কপালেতে পড়ে আছে চুল গুলি,
চুপি চুপি কাছে গিয়ে কোলেতে লইনু তুলি।
বুকেতে ধরিনু চাপি, হৃদয় ফাটিয়া গিয়া
পড়িতে লাগিল অশ্রু দর দব বিগলিয়া,
ডাগর নয়ন তুলি মুখ পানে চেয়ে চেয়ে,
কিছুপণ পরে তারা চলিয়া গেল গো ধেয়ে!
আজ মোর কেহ নাই হায়,
সকলেরি গৃহ আছে, গৃহ মুখে চ’লে যায়—
নলিনীর কিছু নাই হায়!
দ্বাদশ সর্গ
দ্বাদশ সর্গ।
নলিনী। বিজয়, বিনােদ, প্রমোদ, অশােক, সুরেশ,
নীরদ, ও অনিল।
সুরেশ।—যাইতে বলিছ বালা, কোথা যাব আর?
দিগ্বিদিক হারাইয়া, ও রূপ-অনলে গিয়া
এ পতঙ্গ পাখা দুটি পুড়ায়েছে তার!
রূপসী, ক্ষমতা আর নাই উড়িবার!
নলিনী।—রূপ কিছু মোর না যদি থাকিত
বড় হইতাম সুখী,
দেখিতাম যত পতঙ্গ তোমরা
আসিতে কি লোভ দেখি!
রূপ—রূপ—রূপ—পোড়া রূপ ছাড়া
আর কিছু মোর নাই?
তোমাদের মত পতঙ্গের দল
চারিদিকে ঘিরে করে কোলাহল,
দিবস রজনী করে জ্বালাতন,
ঝাঁপায়ে পড়ে গো না মানে বারণ;
পোড়া রূপ থেকে এই যদি হোল
হেন রূপ নাহি চাই!
হেন কেহ নাই হায়—
শুধু ভালবাসে নলিনী বালারে
আর কিছু নাহি চায়!
(অশােকের প্রতি)
এই যে অশোক! ওই দেখ সখা—
দিবে কি আমারে দিবে কি তুলে
বক্ষ হোতে মোর ফুল উড়ে গিয়ে
পোড়েছে তোমার চরণ-মূলে!
যদি সখা ওটি রাখিতে চাও
তোমারি কাছেতে রাখিয়া দাও;—
দুদণ্ডেই ওটি যাইবে শুকায়ে
শুকায়ে গেলেই দিওগো ফেলে,
যতখণ ওটি নাহি পড়ে ঝোরে
ততখণো যদি মনে রাখ মোরে,
ততখনো যদি না থাক’ ভুলে,
তা’হোলেও সখা বড় ভাগ্য মানি
চিরকাল মনে সে কথা রবে;—
যদি সখা নাহি লইতে চাও
এখনি ভূতলে ফেলিয়া দাও,
চরণে দলিয়া ফেল গো তবে!
কত শত হেন অভাগা কুসুম
আপনি পোড়েছে চরণে আসি,
কত শত লোক চেয়েও দেখেনি,
চরণে দলিয়া গিয়াছে হাসি,
তবে আর কেন, ফেলগো দলিয়া
কিসের সরম আমার কাছে?
যে কুসুম, সখা, শাখা হোতে ঝোরে
চরণের নীচে পড়ে সাধ কোরে,
কে না জানে বল তাহার কপালে
চরণে দলিয়া মরণ আছে!
(নীরদের প্রতি)
এই যে নীরদ, এনেছ গাঁথিয়া
গোলাপ ফুলের হার!
ভূলে গেছ কেন বাছিয়া ফেলিতে
কাঁটা গুলি, সখা, তার?
তবে গো পরায়ে দাও—
না হয় কাঁটায় ছিঁড়িবে হৃদয়,
না হয় এ বুক হবে রক্তময়,
এনেছ গাঁথিয়া গোলাপ যখন
তবে গো পরায়ে দাও!
কতই না কাঁটা বিঁধিয়াছে হেথা
রাখিতে গোলাপ বুকের কাছে,
জ্বলুক হৃদয়—বহুক্ শোণিত,
তা’ বোলে গোলাপ ফেলিতে আছে?
(প্রমােদের প্রতি)
চাইনে তোমার ফুল উপহার,
যাও—হেথা হোতে যাও!
দুটি ফুল দিয়ে, ফুল বিনিময়ে
হাসি কিনিবারে চাও!
নলিনি, নলিনি, কেনরে হলিনি
পাষাণ-কঠিন মন?
দুটো কথা শুনে—দুটো ফুল পেয়ে
ভাঙ্গে কেন তোর পণ?
পলকে পলকে ভাঙ্গিস্ গড়িস্,—
ভেঙ্গে যায় মৃদু শ্বাসে,
যার পরে তুই করিস্লো মান
সেই মনে মনে হাসে!
দেখি আজ তুই কেমন পারিস্
থাকিবারে অভিমানে?
কহিনে কথা-হাসিনে হাসি—
চাহিনে তার পানে!
বিনােদ।—একটি কথাও কহিল না মােরে,
পাশ দিয়া গেল চলি!
গর্ব্ব-ভার-গুরু প্রতি পদক্ষেপে
মরমে মরমে দলি।
কেন গো—কেন গো কি আমি কোরেছি—
কিছুত না পড়ে মনে,
কহেছে ত কথা প্রমোদের সাথে
অশোক—নীরদ সনে!
গেল যে হৃদয়—কত দিন আর
রবে সে এমন করি।
কখনো উঠিয়া আকাশের পরে
কখনো পাতালে পড়ি!
অনিল।—(দূর হইতে দেখিয়া)
না জানি কিসের জ্যোতি নয়নে আছে গো বালা!
যেদিকে চাহিয়া দেখ সেদিক করিছ আলা।
অন্ধকার-ভেদী এক হাসিময় তারা সম—
প্রাণের ভিতর পানে চাহিয়া রোয়েছ মম!
ফিরায়ে লইনু মুখ তবুও কেনগো দেখি
চাহিছে হৃদয় পানে দুটি হাসিমাখা আঁখি!
আঁখি মুদি, তবু কেন হেরিগো প্রাণের কাছে
দুটি আঁখি চেয়ে আছে এক দৃষ্টে চেয়ে আছে!
হেথা না পাইবি ঠাঁই—দূর হ’ তুইরে তারা—
চন্দ্রমা জোছনা করি এ হৃদি রেখেছে ভরি,
তুই তারা সে আলোকে হইবি আপনা-হারা!
দূর হ’রে—দূর হ’রে-দূর হ’রে ক্ষুদ্র তারা!
কিন্তু কি মধুর মুখ ভাব ভরে ঢল ঢল!
কোমল কুসুম সম সমীরণে টল মল।
দেখিনি এহেন মুখ সুমধুর ভাব ময়,
কেন? ললিতার মুখ এ হোতে কি ভাল নয়?
আহা সে মধুর বড় ললিতার মুখ খানি,
আঁখি কত কথা কয়, মুখেতে নাইক বাণী;—
বাহির হইতে চায় তার সেই মৃদু হাসি,
অধরের চারিধারে কতবার উঁকি মারে,
লজ্জায় মরিয়া যায় কেবল দুই পা আসি!
তার মুখ পূর্ণ-রাকা সরমের মেঘে ঢাকা,
মধুর মুখানি তার আমি বড় ভালবাসি!
ললিতার চেয়ে কি গো মুখ খানি ভাল এর?
উভেরি মধুর মুখ-দুই ভাব দুজনের—
ললিতা সে লাজময়ী মুখেতে নাইক কথা
মাটি পানে চেয়ে আছে যেন লজ্জাবতী লতা।
নলিনী, নলিনী সম কেমন রোয়েছে ফুটি,
বরষার নদী জল করিতেছে টলমল
হেলি দুলি লহরীতে পড়িতেছে লুটি লুটি।—
উভেরি মধুর মুখ ললিতার, নলিনীর,
অধীর সৌন্দর্য্য-কারো, কারো বা প্রশান্ত স্থির!
কিন্তু নলিনীর মুখ ভাবের খেলার গেহ
সেথা ভাব-শিশু গুলি করিতেছে কোলাকুলি,
কেহবা অধরে হাসে, নয়নে নাচিছে কেহ,
এই যে অধরে ছিল এই সে নয়নে গেছে,
দুদণ্ড খেলায়ে কেহ ঘুমাইয়া পড়িয়াছে!
কভুবা দু’তিন জনে নাচিতেছে এক সনে,
পলক পড়িতে চোখ আরত তাহারা নাই;
নলিনীর মুখখানি ভাবের খেলার ঠাই!
নলিনীর মুখ পানে যতই চাহিয়া থাকি
নূতন নূতন শোভা দেখিতে পায়যে আঁখি;
কিন্তু ললিতার মুখ কখনো এমন নয়।
এত সে কয়না কথা, এত ভাব নাই সেথা,
নহেগো এমনতর অধীর মাধুর্য্য ময়!
নাইবা এমন হোল তাহাতে কি আছে হানি।
না হয় দেথিতে ভাল নলিনীর মুখখানি!
তবু ললিতারে মোর ভাল আমি বাসি ত রে!
তবু ত সৌন্দর্য্য তার এ হৃদি রোয়েছে ভোরে!
রূপেতে কি যায় আসে? রূপ কেবা ভাল বাসে?
ললিতা নলিনী কাছে না হয় রূপেতে হারে—
ভালবাসি—ভালবাসি—তবু আমি ললিতারে!
নলিনী।—(বিনােদের কাছে পুনর্ব্বার ফিরিয়া আসিয়া)
কেন হেন আহা মলিন আনন,
আঁখি নত মাটি পানে!
তোমারে বিনোদ পাইনি দেখিতে
দাঁড়াইয়া এই খানে!
শিথিল হইয়া পড়েছে ঝুলিয়া
ফুলের বলয় মোর,
দাওনাগো সখা দাওনা তুলিয়া
বাঁধগো আঁটিয়া ডোর!
(নলিনীর গান)
এস মন, এস, তোমাতে আমাতে
মিটাই বিবাদ যত!
আপনার হোয়ে কেন মোরা দোঁহে
রহিগো পরের মত?
আমি যাই এক দিকে, মন মোর!
তুমি যাও আর দিকে,
যার কাছ হোতে ফিরাই নয়ন
তুমি চাও তার’দিকে!
তার চেয়ে এস দুজনে মিলিয়ে
হাত ধোরে যাই এক পথ দিয়ে,
আমারে ছাড়িয়ে অন্য কোন খানে
যেওনা কখনো আর!
পারিনা কি মোরা দুজনে থাকিতে,
দোঁহে হেসে খেলে কাল কাটাইতে?
তবে কেন তুই না শুনে বারণ
যাস্রে পরের দ্বার?
তুমি আমি মোর থাকিতে দুজন,
বল্ দেখি, হৃদি, কিবা প্রয়োজন
অন্য সহচরে আর?
এত কেন সাধ বল্ দেখি, মন,
পর ঘরে যেতে যখন তখন,
সেথা কিরে তুই আদর পা’স?
বল্ত কতনা সহিস্ যাতনা?
দিবানিশি কত সহিস্ লাঞ্ছনা?
তবু কিরে তোর মিটেনি আশ?
আয়, ফিরে আয়—মন, ফিরে আয়—
দোঁহে এক সাথে করিব বাস!
অনাদর আর হবেনা সহিতে,
দিবস রজনী পাষাণ বহিতে,
মরমে দহিতে, মুখে না কহিতে,
ফেলিতে দুখের শ্বাস!
শুনিলিনে কথা? আসিলিনে হেথা?
ফিরিলিনে একবার?
সখিলো, দুরন্ত হৃদয়ের সাথে
পেরে উঠিনেত আর!
“নয়রে সুখের খেলা ভালবাসা!”
কত বুঝালেম তায়,—
হেরিয়া চিকণ সোণার শিকল
খেলাইতে যায় হৃদয় পাগল—
খেলাতে খেলাতে না জেনে না শুনে
জড়ায় নিজের পায়!
বাহিরিতে চায় বাহিরিতে নারে,
করে শেষে হায় হায়!
শিকল ছিঁড়িয়ে এসেছে ক’বার
আবার কেন রে যায়?
চরণে শিকল বাঁধিয়া কঁদিতে
না জানি কি সুখ পায়!
তিলেক রহেনা আমার কাছেতে
যতই কাঁদিয়া মরি,
এমন দুরন্ত হৃদয় লইয়া
স্বজনি, বল্ কি করি?
অনিল।—ওঠ্ হেথা হােতে—চল্ চল্ যাই,
কি কারণে হেথা আছিস্ আর!
মুদিয়া আসিছে মনের নয়ন,
মনের চরণে পড়িছে ভার!
ললিতা আমার! না থাকুক্ রূপ
নাইবা গাহিতে পারিলি গান,
ভাল বাসি তোরে, ভাল বাসিব রে
যত দিন দেহে রহিবে প্রাণ!
(নলিনী ব্যতীত আর সকলের প্রস্থান)
নলিনী।—পারিনে ত আর, বসি এই খানে,
ওই যে এদিকে আসিছে কবি!
কথা আজ মোরে কহিতে হইবে,
র’বনা বসিয়া অচল ছবি!
কি কথা বলব? ভাবিতেছি মনে,
কিছুই ত ভেবে নাহিক পাই;
বলিব কি তারে—“তোমরা কবিগো,
তোমাদের ভাল বাসিতে নাই!
বুঝিতে পারনা আপনার মন,
দিবা নিশি বৃথা করগো শোক,
ভাল বাসা তরে আকুল হৃদয়
ভাল বাসিবার পাওনা লোক!
মনে তোমাদের সৌন্দর্য্য জাগিছে
ধরায় তেমন পাওনা খুঁজে,
তবুও ত’ভাল বাসিতেই হবে
নহিলে কিছুতে মন না বুঝে!
অবশেষে কারে পাও দেখিবারে
নেশায় আপনা ভুলি,
সাজাইয়া দেয় কলপনা তারে
নিজের গহনা খুলি।
আসি কলপনা কুহকিনী বালা
নয়নে কি দেয় মায়া,
কলপনা তারে ঢেকে রাখে নিজে
দিয়ে নিজ জ্যোতি ছায়া।
কল্পনা-কুহকে মায়া মুগ্ধ চোকে
কি দেখিতে দেখ কিবা,
অপরূপ সেই প্রতিমা তাহার
পূজ মনে নিশি দিবা!
যত যায় দিন, যত যায় দিন,
যত পাও তারে পাশে
দেবীর জ্যোতি সে হারায় তাহার
মানুষ হইয়া আসে!
ভাল বাসা যত দূরে চলি যায়
হাহাকার কর মনে,
কলপনা কাঁদে ব্যথিত হইয়া
আপনার প্রতারণে!
আমি গো অবলা-কবির প্রণয়
অত নাহি করি আশা,
আমি চাই নিজ মনের মানুষ
শাদাশিদে ভালবাসা!”
এমনি করিয়ে বাতাসের পরে
মিছে অভিমান বাঁধি
অকারণে তার করিব লাঞ্ছনা
অভিমানে কাঁদি কাঁদি।
কিছুতে সান্ত্বনা না আমি মানিব,
দূরেতে যাইব চোলে
কাছেতে আসিতে করিব বারণ
করুণ চোখের জলে।
দ্বাবিংশ সর্গ
দ্বাবিংশ সর্গ।
(নলিনীর প্রতি বিনোদের গান।)
তুই রে বসন্ত সমীরণ,
তোর নহে সুখের জীবন।
কিবা দিবা কিবা রাতি, পরিমল মদে মাতি
কাননে করিস্ বিচরণ,
নদীরে জাগায়ে দিস্, লতারে গায়ে দিস্
চুপি চুপি করিয়া চুম্বন!
তোর নহে সুখের জীবন।
যেথা দিয়া তুই যাস্, পদতলে চারি পাশ
ফুলেরা খুলিয়া দেয় প্রাণ,
বুকের উপর দিয়া যাস্ তুই মাড়াইয়া
কিছু না করিস্ অবধান।
শুনিতে মুখের কথা আকুল হইয়া লতা
কত তোরে সাধাসাধি করে,
দুটা কথা শুনিলি বা, দুটা কথা বলিলি বা,
চোলে যাস্ দূর দূরান্তরে!
পাখীরা খুলিয়া প্রাণ করে তোর গুণ গান,
চারি দিকে উঠে প্রতিধ্বনি;
বকুলের বালিকারা হইয়া আপনা-হারা
ঝরি পড়ে সুখেতে অমনি!
তবুরে বসন্ত সমীরণ,
তোর নহে সুখের জীবন!
আছে যশ, আছে মান, আছে শত মন প্রাণ,
শুধু এ সংসারে তোর নাই
এক তিল দাঁড়াবার ঠাঁই!
তাইরে জোছনা রাতে অথবা বসন্ত প্রাতে
গাস্ যবে উল্লাসের গান,
সে রাগিণী মনোমাঝে বিষাদের সুরে বাজে,
হাহাকার করে তাহে প্রাণ!
শোন্ বলি বসন্তের বায়,
হৃদয়ের লতাকুঞ্জে আয়,
শ্যামল বাহুর ডোরে বাঁধিয়া রাখিব তোরে
ছোট সেই কুঞ্জটির ছায়!
তুই সেথা র’স্ যদি, তবে সেথা নিরবধি
মধুর বসন্ত জেগে রবে,
প্রতি দিন শত শত নব নব ফুল যত
ফুটিবেক, তোরি সব হবে।
তোরি নাম ডাকি ডাকি একটি গাহিবে পাখী,
বাহিরে যাবে না তার স্বর!
সে কুঞ্জেতে অতি মৃদু মাণিক ফুটাবে শুধু
বাহিরের মধ্যাহ্নের কর।
নিভৃত নিকুঞ্জ ছায় হেলিয়া ফুলের গায়,
শুনিয়া পাখীর মৃদু গান,
লতার হৃদয়ে হারা সুখে অচেতন পারা
ঘুমায়ে কাটায়ে দিবি প্রাণ;
তাই বলি বসন্তের বায়
হৃদয়ের লতাকুঞ্জে আয়!
অতৃপ্ত মনের আশ লুটিয়া সুখের রাশ,
কেনরে করিস্ হায় হায়!
দ্বিতীয় সর্গ
দ্বিতীয় সর্গ।
ক্রীড়া কানন। নলিনী ও সখীগণ।
নলিনী।—সখি! অলক-চিকুরে কিশলয় সাথে
একটি গোলাপ পরায়ে দে।
চারু! দেখি ও আরশী খানি;
বালা! সিঁথিটি দে ত লো আনি;
লীলা! শিথিল কুন্তল দেখ্ বার বার
কপোল দুলিয়া পড়িছে আমার
একটু এপাশে সরায়ে দে।
সুরুচি।—মাধবী! বল্ত মােরে একবার
আজিকে হোল কি তোর!
কতখণ ধ’রে গাঁথিছিস্ মালা
এখনো কি শেষ হোল না তা’ বালা?
এক মালা গেঁথে করিবি না কি লো
সারাটি রজনী ভোর?
অনিলের হবে ফুলশয্যা আজ,
সাঁঝের আগেই শেষ করি সাজ
সব সখী মিলি যেতে হবে সেথা
তা কি মনে আছে তোর?
অলকা।—মরি মরি কিবা সাজাবার ছিরি,
চেয়ে দেখ্ একবার!
সখীর অমন ক্ষীণ দেহ মাঝে
কমল ফুলের মালা কিলো সাজে?
বিনোদিনী দেখ্ গাঁথিছে বসিয়া
কমলের ফুল হার!
নলিনী।—ওই দেখ সখি, দাঁড়ের উপরে,
মাথাটি গুঁজিয়া পাখার ভিতরে
শ্যামাটি আমার—সাধের শ্যামাটি
কেমন ঘুমায়ে আছে!
আন্ সখি ওরে কাছে।
গান গেয়ে গেয়ে, তালি দিয়ে দিয়ে,
ঘিরে বসি ওরে সকলে মিলিয়ে,
দেখিব কেমন ফিরে ফিরে ফিরে
তালে তালে তালে নাচে।
(শ্যামার প্রতি গান)
নাচ্ শ্যামা, তালে তালে।
বাঁকায়ে গ্রীবাটি, তুলি পাখা দুটি,
এপাশে ওপাশে করি ছুটাছুটি
নাচ্ শ্যামা, তালে তালে।
রুণু রুণু ঝুনু বাজিছে নুপূর,
মৃদু মৃদু মধু উঠে গীত সুর,
বলয়ে বলয়ে বাজে ঝিনি ঝিনি,
তালে তালে উঠে করতালি ধ্বনি,
নাচ্ শ্যামা, নাচ্ তবে!
নিরালয় তোর বনের মাঝে
সেথা কি এমন নূপুর বাজে?
বনে তোর পাখী আছিল যত
গাহিত কি তারা মোদের মত
এমন মধুর গান?
এমন মধুর তান?
কমল-করের করতালি হেন
দেখিতে পেতিস্ কবে?
নাচ শ্যামা নাচ্ তবে!
বন্দী বোলে তোর কিসের দুখ?
বনে বল্ তোর কি ছিল সুখ?
বনের বিহগ কি বুঝিবি তুই,
আছে লোক কত শত,
যারা শ্যামা তোর মত
এমনি সোনার শিকলি পরিয়া
সাধের বন্দী হইতে চায়!
এই গীত-রবে হোয়ে ভরপূর,
শুনি শুনি এই চরণ-নূপুর
জনম জনম নাচিতে চায়!
সাধ কোরে ধরা দেয় গো তারা,
সাথে সাথে ভ্রমি হয় গো সারা,
ফিরেও দেখিনে—ফিরেও চাহিনে—
বড় জ্বালাতন করেগো যখন
অশরীরী বাজ করি বরিষণ—
উপেখা বাণের ধারা!
তবে দেখ্ পাখী তোর
কেমন ভাগ্যের জোর!
বড় পুণ্য ফলে মিলেছে বিহগ
এমন সুখের কারা!
আয় পাখী, আয় বুকে!
কপোলে আমার মিশায়ে কপোল
নাচ্ নাচ্ নাচ্ সুখে!
বড় দুখ মনে, বনের বিহগ,
কিছু তুই বুঝিলি না!
এমন কপোল অমিয়-মাখা
চুমিলি, তবুও ঝাপটি পাখা
উড়িতে চাহিস্ কি না!
প্রতি পাখা তোর উঠেনি শিহরি?
পুলকে হরষে মরমেতে মরি
ঘুরিয়া ঘুরিয়া চেতনা হারায়ে
পদতলে পড়িলি না?
নাচ্ নাচ্ তালে তালে!
বাঁকায়ে গ্রীবাটি তুলি পাখা দুটি
এ পাশে ও পাশে করি ছুটাছুটি
নাচ্ শ্যামা তালে তালে!
দামিনী।—শুনেছিস সখি, বিবাহ-সভায়
বিনোদ আসিবে আজ!
ভালো কোরে কর্ সাজ!
নলিনী।—আহা মােরে যাই কি কথা বলিলি!
শুনিয়া যে হয় লাজ!
বিনোদ আসিবে আজ?
এ বারতা দিয়ে কেন লো স্বজনি,
মাথায় হানিলি বাজ?
সারাখণ মোর সাথে সাথে ফিরে
ক্ষান্ত নহে একটুক,
মুখখানা তার দেখিবারে পাই।
যে দিকে ফিরাই মুখ!
এক-দৃষ্টে হেন রহে সে তাকায়ে
থেকে থেকে ফেলে শ্বাস,
মুখেতে আঁচল চাপিয়া চাপিয়া
রাখিতে পারিনে হাস!
লীলা।—শুনেছি প্রমােদ আসিবে, যাহারে
ভ্রমর বলিয়া ডাকি,
যাহারে হেরিলে হরষে তোমার
উজলিয়া উঠে আঁখি।
নলিনী।—গা ছুঁয়ে আমার বল্লো স্বজনি,
সত্য সে আসিবে নাকি?
দেখ দেখি সখি, অভাগীর তরে
কোথাও নিস্তার নাই,
মরি মরি কিবা ভ্রমর আমার!
ভ্রমরের মুখে ছাই!
সে ছাড়া ভ্রমর আর কি নাই?
তা হোলে এখুনি—সখিরে, এখনি
নলিনি-জনম ঘুচাতে চাই!
চারুশীলা।—লুকাস্নে মােরে, আমি জানি সখি,
কে তোমার মনোচোর।
বলিব? বলিব? হেথা আয় তবে,
বলি কানে কানে তোর!
(কানে কানে কথা)
নলিনী।—জ্বালাস্নে চারু, জ্বালাস্নে মােরে
করিস্নে নাম তার!
সুরেশ?—তাহার জ্বালায় স্বজনী,
বেঁচে থাকা হোল ভার!
কে জানিত আগে বলত সখিলো,
রূপের যাতনা অতি?
সাধ যায় বড় কুরূপা হইয়া
লতি শান্তি এক রতি!
(লীলার প্রতি জনান্তিকে)
মাধবী।—শােন্ বলি লীলা, জানি কারে সখি
মনে মনে ভাল বাসে।
দেখিনু সে দিন বিজয়ের সাথে
বসি আছে পাশে পাশে।
মৃদু হাসি হাসি কত কহে কথা,
কভু লাজে শির নত,
কভু ল’য়ে কেশ বেণী ফেলি খুলে,
জড়ায়ে জড়ায়ে মৃণাল আঙ্গুলে
অনি-মনে খেলে কত!
কখন বা শুনে অতি এক মনে
বিজয়ের কথাগুলি,
শুনিতে শুনিতে শির নত করি
তুলি কুঁড়ি এক, কতখণ ধরি
খুলি খুলি দেয় মুদিত পাপড়ি,
ফুটাইয়া তারে তুলি।
কভু বা সহসা উঠিয়া যায়—
কভু বা আবার ফিরিয়া চায়—
মৃদু মৃদু স্বরে গুন্ গুন্ কোরে
উঠে এক গান গেয়ে;
এমন মধুর অধীরতা তার!
এমন মোহিনী মেয়ে!
বিনো।—সখীলাে, তা’ নয়, কতবার আমি
দেখিয়াছি লুকাইয়া,
অশোকের সাথে বসি আছে এক
প্রমোদ কাননে গিয়া!
জানি আমি তারে হেরিলে সখীর
সুখে নেচে উঠে হিয়া।
নলিনী।—হেথা আয় তােরা, দে দেখি সাজায়ে
শ্যামা পাখীটিরে মোর!
দুটি ফুল বসা দুইটি ডানায়;
বেলকুঁড়ি মালা কেমন মানায়
সুগোল গলায় ওর!
ওই দেখ্ সখি! দেখিনি কখনো
এমন দুরন্ত পাখী!
যত গুলি ফুল দিলেম পরায়ে
সব গুলি দেখ্ ফেলেছে ছড়ায়ে,
শত শত ভাগে ছিঁড়িয়া ছিঁড়িয়া
একটি রাখেনি বাকী!
ভাল, পাখী যদি না চায় সাজিতে
আমারে সাজালো তবে।
চারু।—তাের সাজ ফুরাইবে কবে?
লীলা।—সখি, আবার কিসের সাজ!
সুরুচি।—দেখ, এসেছে হইয়া সাঁঝ।
নলিনী।—দেখলাে সুরুচি, লীলা ভাল কোরে
বাঁধিতে পারেনি চুল;
এই দেখ্ হেথা পরায়ে দিয়াছে
অলকে শুকানো ফুল;
বেণী খুলে চুল বেঁধে দে আবার
কানে দে পরায়ে দুল।
সুরুচি।—না লাে সখী, দেখ, আঁধার হােতেছে
দেরি হোয়ে যায় ঢের—
চল ত্বরা কোরে, যাই দেখিবারে
ফুলশয্যা অনিলের।
অলকা।—এত খণে সখি, এসেছে সেখায়
যতেক গ্রামের লোক।
দামিনী।—(হাসিয়া) এসেছে বিনােদ!
লীলা।—(হাসিয়া) এসেছে প্রমােদ!
বিনো।—(হাসিয়া) এসেছে সেথা অশােক!
মাধবী।—হাসিয়া) এসেছে বিজয়!
চারু।—(চিবুক ধরিয়া) সুরেশ রয়েছে
পথ চেয়ে তোর তরে!
অলকা।—আয় তবে ত্বরা কোরে!
নলিনী।—ভাল, সখি, ভাল, চল্ তবে চল্
জ্বালাস্নে আর মোরে!
নবম সর্গ
নবম সর্গ।
নলিনী ও সখিগণ।
নলিনী।—(গাহিতে গাহিতে)
কি হোল আমার? বুঝিবা সজনি
হৃদয় হারিয়েছি!
প্রভাত-কিরণে সকাল বেলাতে
মন লোয়ে সখি গেছিনু খেলাতে,
মন কুড়াইতে, মন ছড়াইতে,
মনের মাঝারে খেলি বেড়াইতে,
মন-ফুল দলি চলি বেড়াইতে,
সহসা সজনি, চেতনা পাইয়া
সহসা সজনি দেখনু চাহিয়া,
রাশি রাশি ভাঙ্গা হৃদয় মাঝারে
হৃদয় হারিয়েছি!
পথের মাঝেতে খেলাতে খেলাতে
হৃদয় হারিয়েছি!
যদি কেহ, সখি দলিয়া যায়!
তার পর দিয়া চলিয়া যায়!
শুকায়ে পড়িবে, ছিঁড়িয়া পড়িবে,
দলগুলি তার ঝরিয়া পড়িবে,
যদি কেহ সখি দলিয়া যায়!
আমার কুসুম-কোমল হৃদয়
কখনো সহেনি রবির কর,
আমার মনের কামিনী-পাপড়ি
সহেনি ভ্রমর চরণ-ভর!
চিরদিন সখি বাতাসে খেলিত,
জোছনা আলোকে নয়ন মেলিত,
হাসি পরিমলে অধর ভরিয়া,
লোহিত রেণুর সিঁদুর পরিয়া,
ভ্রমরে ডাকিত হাসিতে হাসিতে
কাছে এলে তারে দিতনা বসিতে,
সহসা আজ সে হৃদয় আমার
কোথায় হারিয়েছি!
এখনো যদি গো খুঁজিয়া পাই
এখনো তাহারে কুড়ায়ে আনি।
এখনো তাহারে দলে নাই কেহ,
আমার সাধের কুসুম খানি;
এখনো, সজনি, একটি পাপড়ি
ঝরেনি তাহার, জানিলো জানি।
শুধু হারায়েছে,—খুঁজিয়া পাইলে
এখনি তাহারে কুড়ায়ে আনি।
ত্বরা কর্ তবে, ত্বরা কর্ তোরা,
হৃদয় খুঁজিতে যাই;
ওড়াবার আগে—ছিঁড়িবার আগে
হৃদয় আমার চাই!
(সখীদের প্রতি) বিপাশা-তীরের পথে সখি আয়
আয় ত্বরা কোরে আয়!
জানিস্ কি সখি, নদীতীরে কবি
কখন বেড়াতে যায়?
জানিস্ত সখি, পথের ধারেতে
একটি অশোক আছে,
বনলতা কত ফুলে ফুলে ভরা
উঠিয়াছে সেই গাছে—
সেই খানে সখি—সেই গাছ তলে
বসিয়া থাকিতে হবে;
সেই পথ দিয়া যাইবে ত কবি?
আয় ত্বরা কোরে তবে।
বল্ দিকি তোরা, হোল কি আমার?
যখন কবির সুমুখে থাকি—
একটি কথাও পারিনে বলিতে
পারিনে তুলিতে আনত আঁখি!
কতবার, সখি, করিয়াছি মনে
পরিহাস করি কহিব কথা—
নিদারুণ হাসি হাসিয়া হাসিয়া
হৃদয়ে তাহারে দিব গো ব্যথা;—
কৃষ্ণ-হীরা সম কৃষ্ণ আঁখি-তারা
আঁধার আগার হোতে আলো—ধারা
হানিবে হেথায়, হানিবে হোথায়
আকুলিয়া দশ দিশ;
মূরছিয়া তার পড়িবেক মন,
মুদিয়া আসিবে অবশ নয়ন,
যতই ঢালিব এ অধর হোতে
মিষ্ট সুধাময় বিষ!
কিন্তু কি কোরে সে চেয়ে থাকে, সখি,
না জানি নয়নে কি আছে জ্যোতি!
এমন সে গান গায় ধীরে ধীরে,
কথা কয় সখি মৃদুল অতি;
মুখেতে আমার কথা নাহি ফুটে,
চাহিতে পারিনে আঁখির পানে,
হাসির লহরী খেলেনা অধরে
নয়নে তড়িৎ নাহিক হানে!
আয় ত্বরা কোরে—বেলা হোয়ে এল
অস্তাচলে যায় রবি,
পথের ধারেতে বসি রব’ মোরা
সেই পথে যাবে কবি!
পঞ্চদশ সর্গ
পঞ্চদশ সর্গ।
কবি ও মুরলা।
মুরলা।—কবিগাে আমার, যদি আমি মােরে যাই
তা হোলে কি বড় কষ্ট হয়গো তোমার?
কবি।—ওকি কথা মুরলা লো বলিতে যে নাই!
তুই ছেলেবেলাকার সঙ্গিনী আমার!
কাদিস্ না, কাঁদিস্ না, মোছ অশ্রুধার।
আহা, সখি, বড় সুখী হই আমি মনে
যদি দেখি প্রেমে তুই পোড়েছিস্ কার,
সুখেতে আছিস্ তোরা মিলি দুইজনে!
নিরাশ্রয় মনে আসে কত কি ভাবনা,
কিছুতে অধীর হৃদি মানেনা সান্ত্বনা;
সজনি, অমন সব ভাবনা আঁধার
ভাবিস্নে কখনো লো ভাবিস্নে আর!
মুরলা।—কবিগো, রজনীগন্ধা ফুটেছিল গাছে,
তুমি ভালবাস’ বোলে আপনি এনেছি তুলে,
নেবে কি এ ফুল গুলি, রাখিৰে কি কাছে?
কবি।—সখিলো, নলিনী কাল দুটি চাঁপা তুলে
পরায়ে দেছিল মোর দুই কর্ণ মূলে;
পরশিতে দল গুলি পড়িছে ঝরিয়া
এখনো সুবাস তার যায় নি মরিয়া!
মুরলা।—দেখি সখা, একবার দেখি হাত খানি,
এ হাত কাহারে কবি করিবে অৰ্পণ?
কত ভাল তোমারে সে বাসিবে না জানি।
না জানি, তোমারে কত করিবে যতন!
কিসে তুমি রবে সুখী সকলি সে জানিবে কি?
দেখিবে কি প্রতি ক্ষুদ্র অভাব তোমার?
তোমার ও মুখ দেখি, অমনি সে বুঝিবে কি
কখন পোড়েছে হৃদে একটু আঁধার!
অমনি কি কাছে গিয়ে কতনা সান্তনা দিয়ে
দূর করি দিবে সব বিষাদ তোমার?
তাই যেন হয় কবি আর কিবা চাই।
তা হোলেই সুখী হব রহি না যেথাই।
কবি।-মুরলা, সখিলাে,
কেন আজ মন মোর উঠিছে কাঁদিয়া?
বিষাদ ভুজঙ্গ সম কেন রে হৃদয় মম
দলিতেছে, চারিদিকে বাঁধিয়া বাঁধিয়া?
ছেলেবেলা হোতে যেন কিছুই হোলনা,
যত দিন বেঁচে রব’ কিছুই হবে না,
এমনি কোরেই যেন কাটিবেক দিন,
কাঁদিয়া বেড়াতে হবে সুখ শান্তি হীন!
কেহ যেন নাই মোর, রবেনাকো কেহ,
ধরায় নাইক যেন বিশ্রামের গেহ।
কিছু হারাইনি তবু খুঁজিয়া বেড়াই,
কিছুই চাই না তবু কি যেন কি চাই!
কোন আশা না করিয়া নৈরাশ্যেতে দহি,
কোন কষ্ট না পাইয়া তবু কষ্ট সহি!
কেন রে এমন কেন হোল আজ মন?
দিয়েছিত, পেয়েছিত ভালবাসা ধন!
তুই কাছে আয় দেখি, আয় একবার,
মুখ তোর রাখ্ দেখি বুকেতে আমার!
দেখি তাহে এ হৃদয় শান্তি পায় যদি!
কে জানে উচ্ছ্বসি কেন উঠিতেছে হৃদি।
দেখি তোর মুখ খানি, সখি তোর মুখখানি,
বুকে তোর মুখ চাপি, কেন, সখি, কেন
সহসা উচ্ছ্বসি কাঁদি উঠিলিরে হেন?
যেন বহুক্ষণ হোতে যুঝিয়া যুঝিয়া
আর পারিল না, হৃদি গেল গো ভাঙ্গিয়া।
কি হোয়েছে বল্ মোরে, বল্ সখি বল্,
লুকাস্নে, লুকাস্নে দুখ অশ্রুজল!
পৃথিবীতে কেহ যদি নাহি থাকে তোর
এই হেথা এই আছে এই বক্ষ মোর!
এ আশ্রয় চিরকাল রহিবে তোমার
এ আশ্রয় কখনই হারাবিনে আর!
কাঁদিবি, যখন চাস্, হেথা মুখ ঢাকি,
তোর সাথে বরষিবে অশ্রু মোর আঁখি!
মুরলা।—তুমি সুখী হও কবি এই আমি চাই,
তুমি সুখী হোলে মোর কোন দুঃখ নাই!
কবি।—আমি সুখী নই সখি, সুখী কেবা আর?
বল্ দেখি মুরলালো কি দুঃখ আমার!
অমন নলিনী মোর হৃদয়ের ধন
সে আমার—সে আমার আছেগো যখন,
পেয়েছি যখন আমি তার ভালবাসা,
তখন আমার আর কিসের বা আশা?
পেয়েছি যখন আমি তোর মত সখী—
দুখে মোর দুখ পায় সুখে মোর সুখী,
তবে বল্ দেখি সখি কি দুঃখ আমার?
তবে যে উঠেছে মনে বিষাদ আঁধার
শরতের মেঘ সম দুদণ্ডে মিলাবে,
কোথা হোতে আসিয়াছে কোথায় বা যাবে।
এখনি নলিনী কাছে যাই একবার,
এখনি ঘুচিবে এই বিষাদের ভার!
মুরলা সখিলো তুই থাকিস্ হেথাই,
ফিরে এসে পুনঃ যেন দেখিবারে পাই! (কবির প্রস্থান)
মুরলা।—ফিরে এসে মুরলারে পাবেনা দেখিতে,
কবি মোর, আরেকটু যদিগো থাকিতে!
নলিনীত চির জন্ম রহিবে তোমার,
আমি যে ও মুখ কভু হেরিব না আর!
ও মুখ কি আর কভু পাবনা দেখিতে
যত দিন হবে মোরে বাঁচিয়া থাকিতে?
পল যাবে, দণ্ড যাবে, দিন যাবে, মাস যাবে,
বর্ষ বর্ষ করি যাবে জীবন আমার,
ও মুখ দেখিতে তবু পাবনাকো আর?
মুরলা, পারিবি তুই? পারিবি থাকিতে?
দারুণ পাষাণে মন বাঁধিয়া রাখিতে?
না, না, না, মুরলা তুই যাইবি কোথায়?
অসীম সংসারে তোর কে আছে রে হায়
হবে যা অদৃষ্টে আছে, থাকিস্ কবির কাছে,
কবি তোর সুখ শান্তি হৃদয়ের ধন,
থাকিস্ জড়ায়ে ধরি কবির চরণ,
কবির চরণে শেষে ত্যজিস্ জীবন!
কিন্তু স্বার্থপর তুই কি করিয়া র’বি?
বিষণ্ন ও মুখ তোর নিরখিয়া কবি
এখনো কাঁদেন যদি, এখনো তাঁহার হৃদি
পুরানো বিষাদ যদি করেগো স্মরণ?
সেই ছেলেবেলাকার বিষাদ যন্ত্রণা ভার
আমি যদি তাঁর মনে জাগাইয়া রাখি—
তবেরে হতভাগিনী কি বলিয়া থাকি!
তবে আমি যাই, তবে যাই, তবে যাই,
কেহ মোর ছিলনাকো, কেহ মোর নাই।
মুরলা বলিয়া কেহ আছে কি ভুবনে?
মুরলা বলিয়া যারে ভাবিতেছি মনে
সে একটি নিশীথের স্বপ্ন মোহময়,
দেখিব স্বপন ভাঙ্গি মুরলা সে নয়!
নাই তার সুখ দুখ, নাই ভালবাসা,
নাই কবি—নাই কেহ—নাই কোন আশা,
কেহই সে নয়, আর কেহ তার নাই,
তবে কি ভাবনা আর যেথা ইচ্ছা যাই!
কিন্তু কবি মোর, আহা ভালবাসাময়,
আমারে না দেখে যদি তাঁর কষ্ট হয়?
থাম্ থাম্ মুরলারে—কেন মিছে বারে বারে
মনেরে প্রবোধ দিস্ ও কথা বলিয়া,
শুনিলে জগৎ যেরে উঠিবে হাসিয়া!
চল্ তুই চল্ তুই—যেথা ইচ্ছা চল্ তুই
কেহ নাই তোর লাগি কঁদিবার তরে।
তবে চলিলাম কবি দূর দেশান্তরে;
অন্তর্যামী দেবতা গো, শুন একবার,
যদি আমি ভালবাসি কবিরে আমার
কবি যেন সুখী হয়, নলিনী সে সুখে রয়,
সখারে আমার আমি ভালবাসি যত
নলিনী বালাও যেন ভালবাসে তত!
নলিনী বালার যত আছে দুখ জ্বালা
সব যেন মোর হয়, সুখে থাক্ বালা!
তবে চলিলাম কবি, আমি চলিলাম,
মুরলা করিছে এই বিদায় প্রণাম!
পঞ্চবিংশ সর্গ
পঞ্চবিংশ সর্গ।
মুরলা।
ওই ধীরে সন্ধ্যা হয় হয়!
গ্রামের কানন হ’ল অন্ধকার ময়!
যতই ঘনায়ে আসে সন্ধ্যার আঁধার—
কাঁদিয়া ওঠে গো কেন হৃদয় আমার?
দুঃখ যেন অতিশয় ধীরে ধীরে আসে
পা টিপিয়া পা টিপিয়া বসে মোর পাশে!
মরমেতে আঁখি রাখে, এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে,
কি মন্ত্র পড়িতে থাকে বুকের উপরে!
কেন গো এমন হয় প্রাণের ভিতরে?
সন্ধ্যাদীপ ঘরে ঘরে উঠিল জ্বলিয়া—
বাহিরে যেদিকে চাই—কিছু না দেখিতে পাই—
আঁধার বিশাল-কায়া আছে ঘুমাইয়া!
ভিতরে কুঁড়ের বুকে নিভৃতে মনের সুখে
ছোট ছোট আলো গুলি রয়েছে জাগিয়া!
আমার আলয় নাই—ভাই নাই, বন্ধু নাই,
কেহ নাই এক তিল করিবারে স্নেহ,—
দিবস ফুরায়ে এলে মোর তরে কেহ
জ্বালায়ে রাখেনা কভু প্রদীপটি ঘরে—
পথ পানে চেয়ে কেহ নাই মোর তরে!
দিবসের শ্রমে ক্লান্ত—সন্ধ্যা যবে হয়
কোথায় যে যাব—নাই স্নেহের আলয়।
বিরাম বিশ্রাম নাই—আদর যতন নাই—
পথ প্রান্তে ধূলি পরে করিগো শয়ন,
চেয়ে দেখিবার লোক নাই এক জন।
অন্ধকার শাখা মেলি শুধু বৃক্ষ যত
কি কোরে যে চেয়ে থাকে অবাকের মত!
তারকার স্নেহ-শূন্য লক্ষ লক্ষ আঁখি
এক দৃষ্টে চেয়ে থাকে দূরাকাশে থাকি।
স্নেহের অভাব মনে জেগে উঠে কেন?
আশ্রয়ের তরে মন হুহু করে যেন!
এত লক্ষ লক্ষ আছে সুখের কুটীর
একটিও নহে ওর এই অভাগীর!
সারাদিন নিরাশ্রয় ঘুরিয়া বেড়াই
সন্ধ্যায় যে কোথা যাব তারো নাই ঠাঁই!
কত শত দিন হল ছেড়েছি আলয়—
আজো কেন ফিরে যেতে তবু সাধ হয়?
ঘুরে ঘুরে পথ-শ্রান্ত নাই দিগ্বিদিক—
আকাশ মাথার পরে চেয়ে অনিমিখ!
লক্ষ্য নাই—আশা নাই—কিছু নাই চিতে
এমন ক’দিন এ ও পারব থাকিতে?
আহা সে মোর থাকিত সে কাছে।
হয়ত তাহার মনে ব্যথা লাগিয়াছে!
আমি কোথা হতে এক আসিয়া আঁধার
মলিন করিয়া দিনু হৃদয় তাহার।
সদাই সে থাকে আহা প্রমোদের ভরে
মুহূর্ত্ত সে মোর তবে কাঁদিবে কেনরে?
এতক্ষণে কবি মোর এসেছে ভবনে
কে র’য়েছে তাঁর তরে বসি বাতায়নে?
পদশব্দ শুনি তাঁর ত্বরায় অমনি
দিতেছে দুয়ার খুলি কেগো সে রমণী!
প্রতিদিন মালা গেঁথে দিতাম যেমন
আজো কি তেমন কেহ করে গো রচন?
হয়ত আলয় তাঁর রয়েছে আঁধার
হয়ত কেহই নাই বাতায়নে তার।
হয়ত গো কবি মোর ম্রিয়মান মন
কেহ নাই যার সাথে কথাটি ও কন!
হয়ত গো মুরলার তরে মাঝে মাঝে
করুণ হৃদয়ে তাঁর ব্যথা বড় বাজে!
হা নিষ্ঠুর মুরলারে—কেন ছেড়ে এলি তাঁরে
নিতান্ত একেলা ফেলি কবিরে আমার,
হয়ত রে তোর তরে প্রাণ কাঁদে তাঁর!
বড় স্বার্থপর তুই, নয় দুঃখে তোর
কঁদিয়া কাটিয়া হোত এ জীবন ভোর,
তাই কি ফেলিয়া আসে কবিরে একেলা!
ফিরে চল্ মুরলারে, চল্ এই বেলা।
হা অভাগী, সন্ন্যাসিনী, আবার, আবার?
কোথা কবি? কোন্ কবি? কেগো সে তোমার।
মাঝে মাঝে দেখিস্রে একি স্বপ্ন মিছে!
স্বপনের অশ্রুজল ত্বরা ফেল্ মুছে!
জীবনের স্বপ্ন তোর ভাঙ্গিবে ত্বরায়—
জীবনের দিন তোর ফুরায় ফুরায়!
ওই দেখ্ মৃত্যু তোর সমুখে বসিয়া
কঙ্কালের ক্রোড় তার আছে প্রসারিয়া!
সম্বন্ধ হোয়েছে তোর মরণের সাথে,—
দেরে তোর হাত তার অস্থিময় হাতে!
এ সংসারে কেহ যদি তোরে ভালবাসে
সে কেবল ওই মৃত্যু—ওইরে আকাশে!
গুরুভার রক্তহীন হিম-হস্তে তার
আলিঙ্গন কোরেছে সে হৃদয় তোমার!
হে মরণ! প্রিয়তম—স্বামীগো—জীবন মম,
কবে আমাদের সেই সম্মিলন হবে?
জীবনের মৃত্যু শয্যা তেয়াগিব কবে?
পঞ্চম সর্গ
পঞ্চম সর্গ।
কানন।
রাত্রি।
অনিল, ললিতা; নলিনী সখীগণ; বিজয়, সুরেশ, বিনােদ,
প্রমােদ, অশােক, নীরদ।
(কাননের একপাশে ললিতার প্রতি অনিলের গান)
বউ! কথা কও!
সারাদিন বনে বনে ভ্রমিছি আপন মনে,
সন্ধ্যাকালে শ্রান্ত বড়—বউ, কথা কও!
শুনলো, বকুল ডালে লুকায়ে পল্লব জালে
পিক সহ পিক-বধূ মুখে মুখ মিলায়ে
দুজনেতে এক প্রাণ গাহিতেছে এক গান,
রাশি রাশি স্বর-সুধা বাতাসেরে বিলায়ে।
সারাদিন তপনের কিরণেতে তাপিয়া
সন্ধ্যাকালে নীড়ে ফিরে আসিয়াছে পাপিয়া।
প্রিয়ারে না দেখি তার ঢালিতেছে স্বর-ধার,
অধীর বিলাপ তার লতাপাতা ভিতরে,
গলি সে আকুল ডাকে বসি অতি দূর-শাখে
প্রাণের বিহগী তার “যাই যাই” উতরে।
অতি উচ্চ শাখে উঠি দেখলো কপোত দুটি
মুখে মুখে কানে কানে কত কথা বলিছে,
বুকে বুক মিলাইয়া—চঞ্চুপুট বুলাইয়া,
কপোতী সে কপোতের আদরেতে গলিছে!
এস প্রিয়ে, এস তবে, মধুর—মধুর রবে
জুড়াও শ্রবণ মোর—বউ! কথা কও!
যদি বড় হয় লাজ, আমার বুকের মাঝ
পাখার ভিতরে মুখ লুকাও তোমার!
অতি ধীরে মৃদু-মধু বুকের কাছেতে, বধু,
দুচারিটি কথা শুধু বল একবার!
(কিছুক্ষণ থামিয়া) তবে কি কবেনা কথা পূরাবেনা আশা?
ভাল ভাল, কোয়োনাকো, মুখ ফিরাইয়া থাকো,
বুঝিনু আমার পরে নাই ভালবাসা।
ললিতা।—(স্বগত) কি কহিব কথা সখা? কহিতে না জানি!
বুদ্ধি নাই—ক্ষুদ্র নারী—ফুটেনাকো বাণী।
মনে কত ভাব যুঝে, হৃদয় নিজে না বুঝে,
প্রকাশ করিতে গিয়া কথা না যোগায়।
হৃদয়ে যে ভাব উঠে হৃদয়ে মিলায়।
তবে কি কহিব কথা—ভেবে নাহি পাই—
কথা কহিবার, সখা, ক্ষমতা যে নাই!
কি এমন কথা কব, ভাল যা’ লাগিবে তব?
তুমি গো শুনাও মোরে কাহিনী বিরলে,
একমনে শুনি আমি বসি পদতলে।
মাথার উপর দিয়া তারাগুলি যত
একটি একটি করি হবে অস্তগত।
শ্রান্তি তৃপ্তি নাহি জানি ও মুখের প্রতি বাণী
তৃষিত শ্রবণে মোর শুনিতে শুনিতে
কখন্ প্রভাত হোল নারিব জানিতে।
অনিল।—জানত—জানত সখি, মানুষের মন?
যে কথা সে ভালবাসে শত শতবার তা’সে
ঘুরে ফিরে শুনিবারে চায় প্রতিক্ষণ।
জানি, ভালবাস’ তুমি, ললিতা, আমারে,
তবু সখি প্রতিক্ষণে বড় সাধ যায় মনে
বাহিরে সে প্রেমের প্রকাশ দেখিবারে।
দুদিনে নীরব-প্রেম হয় পুরাতন।
বিচিত্রতা নাহি তায়, শ্রান্ত হয় মন।
আদর তরঙ্গ-মালা নিয়ত যে করে খেলা,
তাইতে দেখায় প্রেম নিয়ত-নূতন।
নিত্য নব নব উঠি আদরের নাম
নিয়ত নবীন রাখে প্রণয়ের ধাম।
আদর প্রেমের, সখি, বরষার জল—
না পেলে আদর-ধারা হয় সে যে বলহারা,
ভুমে নুয়াইয়া পড়ে মুমূর্ষু বিকল।
ওকি বালা, কেন হেন কাতর নয়ানে
এক দৃষ্টে চেয়ে আছ ভুমি-তল পানে!
হাসিতে হাসিতে, সখি; দুটা ক্ষুদ্র কথা
কহিনু, তা’তেই মনে পেয়েছ কি ব্যথা?
ললিতা।—(স্বগত) একা বােসে ভাবিয়াছি কত—কতবার,
কোন গুণ নাই মোর, কি হবে আমার?
হা ললিতা! কি করিস্—দেখিস্ না চেয়ে?
শুধু দুটা কথা হা—রে—পারিস্ না কহিবারে?
দুটা আদরের কথা—বুদ্ধিহীন মেয়ে!
দেখিস্ না—দুটা কথা কহিলি না বোলে,
আদরের ধন তোর—প্রাণের সর্বস্ব তোর
হারায়—হারায় বুঝি—যায় বুঝি চোলে!
শুধু দুটা কথা তুই কহিলি না বোলে?
কি কহিবি? হা অবোধ! ভাবনা কি তায়?
মুক্তকণ্ঠে বল্—মন যা’ বলিতে চায়?
মনের গোপন ধামে ডাকিস্ যে শত নামে
সেই নামে মুখ ফুটে ডাক্রে তাহায়!
একবার প্রাণ খুলে বল্ প্রাণেশ্বরে—
“মোর প্রেম, চিন্তা, আশা সব তোমা পরে;
নির্ব্বোধ—নির্গুণ বোলে—নাথ—স্বামী–প্রভু,
অসহায় অবলারে ত্যজিওনা কভু!”
দিবস রজনী ভূলি বুকে তারে রাখ্ তুলি,
“ভালবাসি” “ভালবাসি” বল্ শতবার,
আলিঙ্গনে বেঁধে বেঁধে হৃদয় তাঁহার!
কিন্তু লজ্জা?—দূর হ’রে—লজ্জা, দূর হ’রে—
বিষময় বাহু তোর বাঁধি বাঁধি শত ডোর
জীর্ণ করিয়াছে মোর মন স্তরে স্তরে!
আর না—আর না লজ্জা—দুর হ’ এখন!
চূর্ণ চূর্ণ ভেঙ্গে আর ফেলিস্ না মন!
শিথিল কোরে দে তোর শতেক বন্ধন ডোর,
মুহূর্ত্তের তরে মুখ তুলি একবার;
বন্ধন-জর্জর মন শুধুরে মুহূর্ত্ত ক্ষণ
বাহিরে বাতাসে গিয়া বাঁচুক আবার!
অনিল।—আজি শুভদিনে ওকি অশ্রুবারি পাত?
অশ্রুজলে কাটাবে কি ফুলশয্যা রাত?
(কাননের অপর পার্শ্বে অভিমান করিয়া বিজয়ের প্রতি)
নলিনী।—মিছে বােলােনাকো মােরে ভালবাস’ ভালবাস’!
নয়নেতে ঝরে বারি হৃদয়ে হৃদয়ে হাস’!
সারহীন—ভাবহীন দুটা লঘু কথা বোলে,
হেসে দুটা মিষ্টহাসি, দুই ফোঁটা অশ্রু ফেলে,
শূন্য রসিকতা করি দুই দণ্ড কাল হরি,
সরল-হৃদয় চাহ’ লভিবারে অবহেলে!
অবশেষে আড়ালেতে কহ হাসি হাসি কত
রমণীর ক্ষুদ্র মন লঘু তৃণটির মত!
ভালবাসা খেলা নয়, খেলেনা নহেগো হৃদি,
নারী বোলে, মন তার দলিতে সৃজেনি বিধি!
ভাল যদি বাস’, তবে ভালবাস’ প্রাণপণে—
ক্ষুদ্র মনে কোরে খেলা করিওনা মোর সনে!
হৃদয়ের অশ্রু ফেল’ দিবানিশি পদতলে,
মিছ হাসিওনা হাসি—কথা কহিওনা ছলে!
বিজয়।—কেন বালা, আমিত লাে দিনরাত্রি ভূলে
অশ্রু ঢালিয়াছি তব প্রেমতরু মূলে,
আজিও ত কিছু তার হয়নিকো ফল,
ব্যর্থ হইয়াছে মোর এত অশ্রুজল!
নলিনী।—ওই যে সুরুচি হােথায় আছে,
যাই একবার তাহার কাছে!
(দূরে গিয়া ফিরিয়া আসিয়া) দেখিনি এমন জ্বালা!
হাত হোতে খসি পোড়েছে কোথায়
বেল ফুলে গাঁথা বালা!
(সহসা উপরে চাহিয়া) ওই দেখ হােথা কামিনী-শাখায়
ফুটেছে কামিনীগুলি—
পাতাগুলি সাথে দুচারিটি, সখা,
দাওনা আমারে তুলি!
বিজয়।—কি পাইব পুরস্কার?
নলিনী।—পুরষ্কার? মরি লাজে!
একটি কুসুম যদি ঠাঁই পায়
আমার অলক মাঝে,—
একটি কুসুম নুয়ে পড়ে যদি
এ মোর কপোল পরে,
একটি পাপ্ড়ি ছিঁড়ে পড়ে পায়ে
শুধু মুহূর্ত্তের তরে,
ভূলে যদি রাখি একটি কুসুম
রচিতে এ কণ্ঠহার—
তার চেয়ে বল আছে ভাগ্যে তব
আর কিবা পুরষ্কার!
(বিজয়ের ফুল তুলিয়া দেওন ও তাহা চরণে দলিয়া)
নলিনী।—এই তব পুরষ্কার!
অনুগ্রহ করি এ চরণ দিয়া
ফুলগুলি তব দিলাম দলিয়া,
এই তব পুরষ্কার!
বিজয়।—আহা! আমি যদি হােতেম সজনি
একটি কুসুম ওর,—
ওই পদতলে দলিত হইয়া
ত্যজিতাম দেহ মোর!
(গাছের দিকে চাহিয়া নলিনীর মৃদুস্বরে গান)
খেলা কর্-খেলা কর্—
(তোরা) কামিনী-কুসুম গুলি,
দেখ্, সমীরণ লতাকুঞ্জে গিয়া
কুসুম গুলির চিবুক ধরিয়া
ফিরায়ে এ ধার—ফিরায়ে ও ধার
দুইটি কপোল চুমে বার বার
মুখানি উঠায়ে তুলি!
তোরা খেলা কর্—তোরা খেলা কর্
কামিনী কুসুম গুলি!
কভু পাতা মাঝে লুকারে মুখ,
কভু বায়ু কাছে খুলেদে বুক—
মাথা নাড়ি নাড়ি নাচ্ কভু নাচ্
বায়ু কোলে দুলি দুলি!
দুদণ্ড বাঁচিবি—খেলা’ তবে খেলা,’
প্রতি নিমেষেই ফুরাইছে বেলা,
বসন্তের কোলে খেলা-শ্রান্ত প্রাণ
ত্যেজিবি ভাবনা ভুলি!
অশােক।—(দূর হইতে দেখিয়া) ওই যে হােথায় নলিনী রােয়েছে
বসি বিজয়ের সাথে!
কত কাছাকাছি!—কত পাশাপাশি!
হাত রাখি তার হাতে!
অসার-হৃদয়, লঘু, হীন-মন
কোন গুণ নাই যা’র—
শুধু ধন দেখে বিকাবি, নলিনী,
তারে দেহ আপনার?
কতবার প্রেম! যাস্ পলাইয়া
ভয়ে ফুল-ডোর দেখি,
ধনের সোণার শিকল হেরিয়া
আজ ধরা দিলি একি?
সুরেশ।—খুঁজিয়া খুঁজিয়া পাইনা দেখিতে
নলিনী কোথায় আছে।
ওই যে হোথায় লতা-কুঞ্জতলে
বসিয়া বিজয় কাছে!
কি ভয় হৃদয়! জানি গো নিশ্চয়
সে আমারে ভালবাসে,
মন তার আছে আমারি কাছেতে
থাকুক্ সে যার পাশে!
বিনোদ।—কথা শুনে তার—ভাব দেখে তার
কতবার ভাবি মনে—
নলিনী আমার—আমারেই বুঝি
ভালবাসে সঙ্গোপনে!
সত্য হয় যদি আহা!
সে আশ্বাস বাণী, সে হাসি মধুর
সত্য যদি হয় তাহা!
নীরদ।—কে আমার সংশয় মিটায়?
কে বলি দিবে সে ভালবাসে কি আমায়?
তার প্রতি দৃষ্টি হাসি তুলিছে তরঙ্গ রাশি
এক মুহূর্ত্তের শান্তি কে দিবে গো হায়!
পারিনে পারিনে আর বহিতে সংশয় ভার,
চরণে ধরিয়া তার শুধাইব গিয়া,
হৃদয়ের এ সংশয় দিব মিটাইয়া!
কিন্তু এ সংশয়ো ভাল, পাছে গো সত্যের আলো
ভাঙ্গে এ সাধের স্বপ্ন বড় ভয় গণি;
হানে এ আশার শিরে দারুণ অশনি!
(নলিনীর নিকট হইতে বিজয়ের দূরে গমন, ও নলিনীর নিকটে
গিয়া প্রমোদের গান)
আঁধার শাখা উজল করি,
হরিত পাতা ঘোমটা পরি’
বিজন বনে, মালতী বালা,
আছিস্ কেন ফুটিয়া?
শুনাতে তোর মনের ব্যথা,
শুনিতে তোর মনের কথা,
পাগল হোয়ে মধুপ কভু
আসেনা হেথা ছুটিয়া;
মলয় তব প্রণয় আশে
ভ্রমেনা হেথা আকুল শ্বাসে,
পায়না চাঁদ দেখিতে তোর
সরমে-মাখা মুখানি;
শিয়রে তোর বসিয়া থাকি
মধুর স্বরে বনের পাখী
লভিয়া তোর সুরভি-শ্বাস
যায় না তোরে বাখানি!
নলিনী।—(হাসিয়া) শুনিয়া ধীরে মালতী বালা
কহিল কথা সুরভি-ঢালা,—
“আঁধার বনে আছিগো ভাল
অধিক আশা রাখি না!
তোদের চিনি চতুর অলি,
মনো-ভুলানো বচন বলি
ফুলের মন হরিয়া লোয়ে
রাখিয়া যাস্ যাতনা!
অবলা মোরা কুসুম-বালা
সহিব মিছা মনের জ্বালা
চিরটি কাল তাহার চেয়ে
রহিব হেথা লুকায়ে!
আঁধার বনে রূপের হাসি
ঢালিব সদা সুরভি রাশি,
আঁধার এই বনের কোলে
মরিব শেষে শুকায়ে!
নলিনী।—(অশােকের নিকটে গিয়া) অশোক, হোথায় দূরে কেন তুমি
দাঁড়াইয়া এক ধার?
কত দিন হোল আমার কাছেতে
আস’নিত একবার!
ভূলেছ যে প্রেম, ভূলেছ যে মোরে
তোমার কি দোষ আছে?
এ মুখ আমার এ রূপ আমার
পুরাতন হইয়াছে?
ভাল, সখা, ভাল, প্রেম না থাকিলে
আসিতে নাই কি কাছে?
যেচে প্রেম কভু পাওয়া নাহি যায়
বন্ধুত্বে কি দোষ আছে?
যদি সারাদিন রহিয়া তোমার
প্রাণের রূপসী সাথে
কোন সন্ধ্যাবেলা মুহূর্ত্তের তরে
অবকাশ পাও হাতে,
আমাদের যেন পড়ে গো স্মরণে
এসো একবার তবে!
দু চারিটা গান গাব’ সবে মিলি
দু চারিটা কথা হবে!
অশােক।—(স্বগত) পাষাণে বাঁধিয়া মন মনে করি যতবার
কাছে তার যাবনাকো মুখ দেখিব না আর,
তার মুখ হোতে তিল আঁখি ফিরায়েছি যবে—
দূরে যেতে এক পদ শুধু বাড়ায়েছি সবে,
অমনি সে কাছে ঢেলে দু একটি কথা বোলে
পাষাণ প্রতিজ্ঞা মোর ধূলিসাৎ করিয়াছে;
শুধু দুটি কথা বোলে, একবার এসে কাছে!
জানিনা কি শুধু সেগো মন ভোলাবার কথা?
সে হাসি—সে মিষ্টহাসি—নিদারুণ কপটতা?
জানে জানে সব জানে—তবু মন নাহি মানে,
প্রতিবার ঘুরে ফিরে তবুও সে যায় তথা;
জেনে শুনে তবু তার ভাল লাগে কপটতা,
সেই মিষ্ট হাসি, সেই মন ভূলাবার কথা!
যবে ভূলাবার তরে কপট আদর করে,
মোর মুখ পানে চেয়ে গাহে প্রণয়ের গীত,
সাধ কোরে মন যেন হোতে চায় প্রতারিত!
হা হৃদয়! লঘু, নীচ, হীন—হীন অতি—
খেলেনার পরে তোর এতই আরতি?
কখনো না—কখনো না—হোক্ যা হবার,
এই যে ফিরানু মুখ ফিরিব না আর!
ধিক্—ধিক্—শিশু-হৃদি! ধিক্ ধিক্ তোরে—
লজ্জার পাথারে আর ডুবাসনে মোরে!
কপট রমণী এক, অধম, চপল,
নির্দ্দয়, হৃদয় হীন, অসার, দুর্ব্বল—
দুর্ব্বল হাতে সে তার যেথা ইচ্ছা সেই ধার
টলাইবে নুয়াইবে এ মোর হৃদয়?
তৃণ—শুষ্ক পত্র এক, দুর্ব্বলতা-ময়?
কাঁদাইবে, হাসাইবে—দূরে যেতে নাহি দিবে—
নিশ্বাসে উড়ায়ে দেবে প্রতিজ্ঞা আমার!
ইচ্ছা, সাধ, চিন্তা, আশা—দুঃখ, সুখ, ভালবাসা
সমস্ত রাখিবে চাপি পদতলে তার—
শিকলি, পশুর সম—বাঁধিবে গলায় মম
মুহূর্ত্ত নহিবে শক্তি মাথা তুলিবার,
ধূলিতে পড়িবে লুটি এ মাথা আমার!
হা হৃদয়, কি করিলি? তুই কি উন্মাদ হলি?
সমস্ত সংসার তুই দিলি বিসর্জ্জন,
ধন, মান, যশ, আশা—সখাদের ভালবাসা,
লুটিতে শুধু কি এক নারীর চরণ?
নিশ্বাসে প্রশ্বাসে তার উঠিতে পড়িতে?
কাঁদিতে হাসিতে তার কটাক্ষে ইঙ্গিতে?
খেলেনা হইতে তার ভ্রূকুটি হাসির?
কেন এত গেলি গোলে! শুধু রূপ আছে বোলে?
ক্ষণ—স্থায়ী জড়রূপ গঠিত মাটির!
কুঞ্চিত—কুন্তল তার, আরক্ত-কপোল,
সুদীর্ঘ নয়ন তার কটাক্ষ-বিলোল,
তাই কি ত্যজিলি তুই সমস্ত সংসার?
জীবনের উদ্দেশ্য করিলি ছারখার?
সমস্ত জগৎ হাসে ধিক্ ধিক্ বলি—
প্রতি ক্ষণে আত্মগ্লানি উঠে জ্বলি জ্বলি—
তবু তার পদতলে লুটাইবি গিয়া
শুধু তার আঁখি দুটি সুদীর্ঘ বলিয়া?
কি মদিরা আছে বালা নয়নে তোমার!
ফেলেছ বিহ্বল করি হৃদয় আমার!
ফিরাও—ফিরাও আঁখি—পাতা দিয়া ফেল ঢাকি—
হৃদয়েরে দূরে যেতে দাও একবার!—
কোরেছি দারুণ পণ করিবারে পলায়ন,
নিষ্ঠুর মধুর বাক্যে ফিরায়োনা আর!
ও অনল হোতে সাধ দূরে থাকিবার—
ফিরায়োনা মোরে সখি ফিরায়োনা আর!
প্রথম সর্গ
ভগ্নহৃদয়।
প্রথম সর্গ।
দৃশ্য—বন। চপলা ও মুরলা।
চপলা।—সখি, তুই হলি কি আপনা-হারা?
এ ভীষণ বনে পশি, একেলা আছিস্ বসি
খুঁজে খুঁজে হোয়েছি যে সারা!
এমন আঁধার ঠাঁই—জনপ্রাণী কেহ নাই,
জটিল-মস্তক বট চারিদিকে ঝুঁকি!
দুয়েকটি রবি-কর সাহসে করিয়া ভর
অতি সন্তর্পণে যেন মারিতেছে উঁকি।
অন্ধকার, চারিদিক হ’তে, মুখ পানে
এমন তাকায়ে রয়, বুকে বড় লাগে ভয়,
কি সাহসে রোয়েছিস বসিয়া এখানে?
মুরলা।—সখি, বড় ভালবাসি এই ঠাঁই!
বায়ু বহে হুহু করি, পাতা কাঁপে ঝর ঝরি,
স্রোতস্বিনী কুলু কুলু করিছে সদাই!
বিছায়ে শুকানো পাতা, বট-মূলে রাখি মাথা,
দিনরাত্রি পারি সখি শুনিতে ও ধ্বনি।
বুকের ভিতরে গিয়া কি যে উঠে উথলিয়া
বুঝায়ে বলিতে তাহা পারিনা স্বজনী!
যা সখি, একটু মোরে রেখে দে একেলা,
এ বন আঁধার ঘোর, ভাল লাগিবেনা তোর,
তুই কুঞ্জ-বনে সখি কর গিয়ে খেলা!
চপলা।—মনে আছে, অনিলের ফুল-শয্যা আজ?
তুই হেথা বোসে র’বি, কত আছে কাজ!
কত ভোরে উঠে বনে গেছি ছুটে,
মাধবীরে লোয়ে ডাকি,
ডালে ডালে যত ফুল ছিল ফুটে
একটি রাখিনি বাকি!
শিশিরে ভিজিয়ে গিয়েছে আঁচল,
কুসুম-রেণুতে মাখা,
কাঁটা বিঁধে সখি হোয়েছিনু সারা
নোয়াতে গোলাপ-শাখা!
তুলেছি করবী, গোলাপ গরবী,
তুলেছি টগর গুলি,
যুঁই কুঁড়ি যত বিকেলে ফুটিবে
তখন আনিব তুলি।
আয়, সখি, আয়, ঘরে ফিরে আয়,
অনিলে দেখ্সে আজ;
হরষের হাসি অধরে ধরেনা,
কিছু যদি আছে লাজ!
মুরলা।—আহা সখি, বড় তারা ভালবাসে দুইজনে!
চপলা।—হ্যাঁ সখি, এমন আর দেখিনিত বর-কোনে!
জানিস্ত সখি, ললিতার মত
অমন লাজুক মেয়ে,
অনিলের সাথে দেখা করিবারে
প্রতি দিন যায় বিপাশার ধারে,
সরমের মাথা খেয়ে!
কবরীতে বাঁধি কুসুমের মালা,
নয়নে কাজল রেখা;
চুপি চুপি যায়, ফিরে ফিরে চায়,
বন-পথ দিয়ে একা!
দূর হোতে দেখি অনিলে, অমনি
সরমে চরণ সরে না যেন!
ফিরিবে ফিরিবে মনে মনে করি
চরণ ফিরিতে পারেনা যেন!
অনিল অমনি দূর হোতে আসি
ধরি তার হাত খানি,
কহে যে কত কি হৃদয়-গলানো
সোহাগে মাখানো বাণী
আমি ছিনু সখি লুকিয়ে তখন
গাছের আড়ালে আসি,
লুকিয়ে লুকিয়ে দেখিতেছিলেম
রাখিতে পারিনে হাসি!
কত কথা ক’য়ে, কত হাত ধরি,
কত শত বার সাধাসাধি করি,
বসাইল যুবা ললিতা বালারে
বকুল গাছের ছায়,
মাথার উপরে ঝরে শত ফুল;
যেন গো করুণ তরুণ বকুল,—
ফুল চাপা দিয়ে লাজুক মেয়েরে
ঢাকিয়া ফেলিতে চায়!
ললিতার হাত কাঁপে থর থর,
আঁখি দুটি নত মাটির উপর,
ভূমি হোতে এক কুসুম তুলিয়া
ছিঁড়িতেছে শত ভাগে।
লাজ-নত মুখ ধরিয়া তাহার
অনিল রাখিল বুকের মাঝার,
অনিমিষ আঁখি মেলিয়া যুবক
চাহি থাকে মুখ বাগে!
আদরে ভাসিয়া ললিতার চোখে
বাহিরে সলিল-ধার,
সোহাগে, সরমে, প্রণয়ে গলিয়া
আঁখি দুটি তার পড়িল ঢলিয়া,
হাসি ও নয়ন-সলিলে মিলিয়া
কি শোভা ধরিল মুখানি তার!
আমি সখি আর নারিনু থাকিতে
সুমুখে পড়িনু আসি,
করতালি দিয়ে উপহাস কত
করিলাম হাসি হাসি!
ললিতা অমনি চমকি উঠিল,
মুখেতে একটি কথা না ফুটিল,
আকুল ব্যাকুল হইয়া সরমে
লুকাতে ঠাঁই না পায়,
ছুটিয়ে পলায়ে এলেম অমনি
হেসে হেসে আর বাঁচিনে সজনি,
সে দিন হইতে আমারে হেরিলে
ললিতা সরমে মরিয়া যায়!
মুরলা।—আহা, কেন বাধা দিতে গেলি তাহাদের কাছে?
চপলা।—বাধা না পাইলে সখি সুখেতে কি সুখ আছে?
মুরলা।—সূর্য্যমুখী ফুল সখি আমি ভালবাসি বড়,
দু চারিটি তুলে এনে আজিকে করিস জড়!
মনে বড় সাধ তার দেখে রবি-মুখ পানে,
রবি যেথা, মাথা তার লোয়ে যায় সেইখানে;
তবু মনোআশা হায়, মনেই মিশায়ে যায়,
মুখানি তুলিতে নারে সরমেতে জড়সড়!
সে ফুলে সাজাবি দেহ লাজময়ী ললিতার,
লজ্জাবতী পাতা দিয়ে ঢাকিবি শয়ন তার;
কমল আনিয়া তুলি, লাজে-রাঙা পাপ্ড়ি গুলি
গাঁথি গাঁথি নিরমিয়া দিবি ঘোমটার ধার!
পাতা-ঢাকা আধ-ফুটো লাজুক গোলাপ দুটো
আনিস, দুলায়ে দিবি সুচারু অলকে তার!
সহসা রজনী-গন্ধা প্রভাতের আলো দেখে
ভাবিয়া না পায় ঠাঁই কোথা মুখ রাখে ঢেকে,
আকুল সে ফুল গুলি যতনে আনিস তুলি,
তাই দিয়ে গেঁথে গেঁথে বিরচিবি কণ্ঠহার।
চপলা।—তুই সখি আয়, একেলা আমার
ভাল নাহি লাগে বালা!
দুটি সখি মিলি হাসিতে হাসিতে,
গুণ গুণ গান গাহিতে গাহিতে
মনের মতন গাঁথিব মালা!
বল্ দেখি সখি হ’ল কি তোর?
হাসিয়া খেলিয়া কুসুম তুলিয়া
করিবি কোথায় ভাবনা ভুলিয়া
কুমারী-জীবন ভোর—
ত না, একি জ্বালা? মরমে মিশিয়া
আপনার মনে আপনি বসিয়া,
সাধ কোরে এত ভাল লাগে সখি
বিজনে ভাবনা-ঘোর!
তা’ হবেনা সখি, না যদি আসিস
এই কহিলাম তোরে—
যত ফুল আমি আনিয়াছি তুলি
আঁচল ভরিয়া ল’ব সব গুলি,
বিপাশার স্রোতে দিবলো ভাসায়ে
একটি একটি কোরে!
মুরলা।—মাথা খা, চপলা, মোরে জ্বালাসনে আর!
চপলা।—ভাল সই, জ্বালাবনা চলিনু এবার!
(গমনোদ্যম; পুনর্ব্বার ফিরিয়া আসিয়া)
না না সখি, এই আঁধার কাননে
একেলা রাখিয়া তোরে
কোথায় যাইব বল্ দিখি তুই,
যাইব কেমন কোরে?
তোরে ছেড়ে আমি পারি কি থাকিতে?
ভালবাসি তোরে কত!
আমি যদি সখি, হোতেম তোমার
পুরুষ মনের মত,
সারাদিন তোরে রাখিতাম ধোরে,
বেঁধে রাখিতাম হিয়ে,
একটুকু হাসি কিনিতাম তোর
শতেক চুম্বন দিয়ে!
অমিয়া-মাখানো মুখানি তোমার
দেখে দেখে সাধ মিটিতনা আর,
ও মুখানি লোয়ে কি যে করিতাম,
বুকের কোথায় ঢেকে রাখিতাম,
ভাবিয়া পেতাম তা’ কি?
সখি, কার তুমি ভালবাসা তরে
ভাবিছ অমন দিনরাত ধোরে,
পায়ে পড়ি তব খুলে বল তাহা
কি হবে রাখিয়া ঢাকি?
মুরলা।—ক্ষমা কর মোরে সখি, শুধায়োনা আর!
মরমে লুকানো থাক্ মরমের ভার!
যে গোপন কথা সখি, সতত লুকারে রাখি,
ইষ্ট-দেব-মন্ত্র সম পূজি অনিবার,
তাহা মানুষের কানে ঢালিতে যে লাগে প্রাণে,
লুকানো থাক্ তা সখি হৃদয়ে আমার!
ভালবাসি, শুধায়োনা কারে ভালবাসি!
সে নাম কেমনে সখি কহিব প্রকাশি!
আমি তুচ্ছ হোতে তুচ্ছ, সে নাম যে অতি উচ্চ,
সে নাম যে নহে যোগ্য এই রসনার!
ক্ষুদ্র ওই কুসুমটি পৃথিবী-কাননে,
আকাশের তারকারে পূজে মনে মনে—
দিন দিন পূজা করি শুকায়ে পড়ে সে ঝরি,
আজন্ম নীরব প্রেমে যায় প্রাণ তার—
তেমনি পূজিয়া তারে, এ প্রাণ যাইবে হা-রে
তবুও লুকানো রবে একথা আমার!
চপলা।—কে জানে সজনি, বুঝিতে না পারি
এ তোর কেমন কথা!
আজিও ত সখি না পেনু ভাবিয়া
এ কি প্রণয়ের প্রথা!
প্রণয়ীর নাম রসনার, সখি,
সাধের খেলেনা মত,
উলটি পালটি সে নাম লইয়া
রসনা খেলায় কত!
নাম যদি তার বলিস্, তা’হলে
তোরে আমি অবিরাম
শুনাব’ তাহারি নাম—
গানের মাঝারে সে নাম গাঁথিয়া
সদা গাব সেই গান!
রজনী হইলে সেই গান গেয়ে
ঘুম পাড়াইব তোরে,
প্রভাত হইলে সেই গান তুই
শুনিবি ঘুমের ঘোরে!
ফুলের মালায় কুসুম আখরে
লিখি দিব সেই নাম;
গলায় পরিবি—মাথায় পরিবি,
তাহারি বলয়, কাঁকন করিবি—
হৃদয়-উপরে যতনে ধরিবি
নামের কুসুম দাম!
যখনি গাহিবি তাহার গান,
যখনি কহিবি তাহার নাম,
সাথে সাথে সখি আমিও গাহিব,
সাথে সাথে সখি আমিও কহিব,
দিবারাতি অবিরাম—
সারা জগতের বিশাল আখরে
পড়িবি তাহারি নাম!
যখনি বলিবি তোর পাশে তারে
ধরিয়া অনিয়া দিব—
সুমুখ হইতে পলাইয়া গিয়া
আড়ালেতে লুকাইব।
দেখিব কেমন দুখ না ছুটে,
ওই মুখে তোর হাসি না ফুটে,—
ভূলিবি এ বন, ভূলিবি বেদন,
সখীরেও বুঝি ভূলিয়া যাবি!
বল্ সখি, প্রেমে পড়েছিস্ কার,
বল্ সখি বল্ কি নাম তাহার,
বলিবিনি কিলো? না যদি বলিস্
চপলার মাথা খাবি!
মুরলা।—(নেপথ্যে চাহিয়া) জীবন্ত স্বপ্নের মত, ওই দেখ্, কবি
একা একা ভ্রমিছেন আঁধার অটবী।
ওই যেন মূর্ত্তিমান ভাবনার মত,
নত করি দুনয়ন শুনিছেন একমন
স্তব্ধতার মুখ হোতে কথা কত শত!
(কবির প্রবেশ)
কবি।–বন-দেবীটির মত এইযে মুরলা,
প্রভাতে কাননে বসি ভাবনা-বিহ্বলা!
প্রকৃতি আপনি আসি লুকায়ে লুকায়ে,
আপনার ভাষা তোরে দেছে কি শিখায়ে?
দিনরাত কলস্বরে তটিনী কি গান করে
তাহা কি বুঝিতে তুই পেরেছিস্ বালা?
তাই হেতা প্রতিদিন আসিস্ একালা!
মুরলা! আজিকে তোরে বনবালা মত কোরে
চপলা সাজায়ে দিক্ দেখি একবার।
এলোখেলো কেশপাশে লতা দে বাঁধিয়া
অলক সাজায়ে দেলো তৃণফুল দিয়া—
ফুলসাথে পাতা গুলি, একটী একটী তুলি
অযতনে দেলো তাহা আঁচলে গাঁথিয়া!
হরিণ শাবক যত ভূলিবে তরাস,
পদতলে বসি তোর চিবাইবে ঘাস।
ছিঁড়ি ছিঁড়ি পাতাগুলি মুখে তার দিবি তুলি,
সবিস্ময়ে সুকুমার গ্রীবাটী বাঁকায়ে
অবাক্ নয়নে তারা রহিবে তাকায়ে!
আমি হোয়ে ভাবে ভোর দেখিব মুখানি তোর,
কল্পনার ঘুমঘোর পশিবে পরাণে!
ভাবিব, সত্যই হবে, বনদেবী আসি তবে
অধিষ্ঠান হইলেন কবির নয়ানে!
চপলা।—বল দেখি মোরে কবিগো, হ’ল কি
তোমাদের দুজনার?
সখিরে আমার কি গুণ করেছ
বল দেখি একবার!
সখির আমার খেলাধূলা নেই
সারাদিন বসি থাকে বিজনেই,
জানিনা ত কবি এত দিন আছি
কিসের ভাবনা তার!
ছেলেবেলা হোতে তোমরা দুজনে
বাড়িয়াছ এক সাথে,
আপনার মনে ভ্রমিতে দুজনে
ধরি ধরি হাতে হাতে!
তখন না জানি কি মন্ত্র, কবি গো,
দিলে মুরলার কানে!
কি মায়া না জানি দিয়েছিলে পড়ি
সখীর তরুণ প্রাণে!
বেলা হোয়ে এল সজনি এখন,
করিয়াছে পান প্রভাত-কিরণ
ফুল-বধূটীর অধর হইতে
প্রতি শিশিরের কণা।
তুই থাক্ হেথা আমি যাই ফিরে,
অমনি ডাকিয়া লব মালতীরে,
একেলা ত বালা, অত ফুলমালা
গাঁথিবারে পারিবনা!
প্রস্থান।
কবি।—মুরলা, তোমার কেন, ভাবনার ভাব হেন?
কতবার শুধায়েছি বলনি আমারে!
লুকায়োনা কোন কথা, যদি কোন থাকে ব্যথা
রুধিয়া রেখোনা তাহা হৃদয় মাঝারে!
হয়ত হৃদয়ে তব কিসের যাতনা
আপনি মুরলা তাহা জানিতে পারনা!
হয়ত গো যৌবনের বসন্ত সমীরে
মানস-কুসুম তব ফুটেছে সুধীরে,
প্রণয় বারির তরে তৃষায় আকুল
ম্ৰিয়মান হ’য়ে বুঝি পোড়েছে সে ফুল?
পেয়েছ কি যুবা কোন মনের মতন?
ভালবাসো, ভালবাসা করহ গ্রহণ;
তাহ’লে হৃদয় তব পাইবে জীবন নব,
উচ্ছ্বাসে উচ্ছ্বাসময় হেরিবে ভুবন।
মুরলা।—(স্বগত) বুঝিলেনা—বুঝিলেনা,—কবিগো এখনো
বুঝিলেনা এ প্রাণের কথা!
দেবতা গো বল দাও, এ হৃদয়ে বল দাও,
পারি যেন লুকাতে এ ব্যথা।
জানি, কবি, ভাল তুমি বাস’নাক মোরে,
তা’ হ’লে এ মন তুমি চিনিবে কি কোরে?
একটুকু ভাল যদি বাসিতে আমারে,
তা’ হ’লে কি কোন কথা, এ মনের কোন ব্যথা
তোমার কাছেতে কবি লুকায়ে থাকিতে পারে?
তাহা হ’লে প্রতি ভাবে, প্রতি ব্যবহারে,
মুখ দেখে, আঁখি দেখে, প্রত্যেক নিশ্বাস থেকে
বুঝিতে যা’ গুপ্ত আছে বুকের মাঝারে।
প্রেমের নয়ন থেকে প্রেম কি লুকানো থাকে?
তবে থাক্, থাক্ সব, বুকে থাক্ গাঁথা—
বুক যদি ফেটে যায়—ভেঙ্গে যায়—চূরে যায়—
তবু রবে লুকানো এ কথা,
দেবতাগো বল দাও—এ হৃদয়ে বল দাও
পারি যেন লুকাতে এ ব্যথা!
কবি।—বহুদিন হ’তে, সখি, আমার হৃদয়
হোয়েছে কেমন যেন অশান্তি-আলয়।
চরাচর-ব্যাপী এই ব্যোম-পারাবার
সহসা হারায় যদি আলোক তাহার,
আলোকের পিপাসায় আকুল হইয়া
কি দারুণ বিশৃঙ্খল হয় তা’র হিয়া!
তেমনি বিপ্লব ঘোর হৃদয় ভিতরে
হ’তেছে দিবস নিশা, জানিনা কি তরে!
নব-জাত উল্কা-নেত্র মহাপক্ষ গরুড় যেমন
বসিতে না পায় ঠাঁই চরাচর করিয়া ভ্রমণ,
উচ্চতম মহীরুহ পদভরে ভূমিতলে লুটে,
ভূধরের শিলাময় ভিত্তিমূল বিদারিয়া উঠে,
অবশেষে শূন্যে শূন্যে দিবারাত্রি ভ্রমিয়া বেড়ায়,
চন্দ্র সুর্য্য গ্রহ তারা ঢাকি ঘোর পাখার ছায়ায়;
তেমনি এ ক্লান্ত-হৃদি বিশ্রামের নাহি পায় ঠাঁই,
সমস্ত ধরায় তা’র বসিবার স্থান যেন নাই;
তাই এই মহারণ্যে অমারাত্রে আসিগো একাকী,
মহান্-ভাবের ভারে দুরন্ত এ ভাবনারে
কিছুক্ষণ তরে তবু দমন করিয়া যেন রাখি।
চন্দ্রশূন্য আঁধারের নিস্তরঙ্গ সমুদ্র মাঝারে
সমস্ত জগৎ যবে মগ্ন হ’য়ে গেছে একেবারে,
অসহায় ধরা এক মহামন্ত্রে হোয়ে অচেতন
নিশীথের পদতলে করিয়াছে আত্ম-সমৰ্পণ,
তখন অধীর হৃদি অভিভূত হোয়ে যেন পড়ে,
অতি ধীরে বহে শ্বাস, নয়নেতে পলক না নড়ে।
* * * *
প্রাণের সমুদ্র এক আছে যেন এ দেহ মাঝারে,
মহা উচ্ছ্বাসের সিন্ধু রুদ্ধ এই ক্ষুদ্র কারাগারে;
মনের এ রুদ্ধস্রোত দেহ খানা করি বিদারিত
সমস্ত জগৎ যেন চাহে সখি করিতে প্লাবিত!
অনন্ত আকাশ যদি হ’ত এ মনের ক্রীড়া-স্থল,
অগণ্য তারাকারাশি হ’ত তার খেলেনা কেবল,
চৌদিকে দিগন্ত আসি রুধিত না অনন্ত আকাশ,
প্রকৃতি জননী নিজে পড়াত কালের ইতিহাস,
দুরন্ত এ মন-শিশু প্রকৃতির স্তন্ত-পান করি
আনন্দ-সঙ্গীত স্রোতে ফেলিত গো শুন্যতল ভরি,
উষার কনক-স্রোতে প্রতিদিন করিত সে স্নান,
জ্যোছনা-মদিরা ধারা পূর্ণিমায় করিত সে পান,
ঘূর্ণ্যমান ঝটিকার মেঘমাঝে বসিয়া একেলা
কৌতুকে দেখিত যত বিদ্যুত-বালিকাদের খেলা,
দুরন্ত ঝটিকা হোথা এলোচুলে বেড়াত নাচিয়া
তরঙ্গের শিরে শিরে অধীর-চরণ বিক্ষেপিয়া।
হরষে বসিত গিয়া ধূমকেতু পাখার উপরে
তপনের চারিদিকে ভ্রমিত সে বর্ষ বর্ষ ধোরে |
চরাচর মুক্ত তার অবারিত বাসনার কাছে,
প্রকৃতি দেখাত তারে যেথা তার যত ধন আছে;
কুসুমের রেণুমাখা বসন্তের পাখায় চড়িয়া
পৃথিবীর ফুলবনে ভ্রমিত সে উড়িয়া উড়িয়া;
সমীরণ, কুসুমের লঘু পরিমল-ভার বহি
পথশ্রমে শ্রান্ত হোয়ে বিশ্রাম লভিছে রহি রহি,
সেই পরিমল সাথে আমনি সে যাইত মিলায়ে,
ভ্রমি কত বনে বনে, পরিমল রাশি সনে
অতি দূর দিগন্তের হৃদয়েতে যাইত মিশায়ে।
তটিনীর কলস্বর, পল্লবের মরমর,
শত শত বিহগের হৃদয়ের আনন্দ উচ্ছ্বাস,
সমস্ত বনের স্বর মিশে হ’ত একত্তর,
একপ্রাণ হোয়ে তারা পরশিত উন্নত আকাশ,
তখন সে সঙ্গীতের তরঙ্গে করিয়া আরোহন,
মেঘের সোপান দিয়া অতি উচ্চ শূন্যে গিয়া
উষার আরক্ত-ভাল পারিত গো করিতে চুম্বন!
কল্পনা, থাম গো থাম, কোথায়—কোথায় যাও নিয়ে?
ক্ষুদ্র এ পৃথিবী, দেবী, কোন্ খেনে রেখেছি ফেলিয়ে,
মাটীর শৃঙ্খল দিয়ে বাঁধা যে গো রোয়েছে চরণ,
যত উচে আরোহিব, তত হবে দারুণ পতন!
কল্পনার প্রলোভনে নিরাশার বিষ ঢাকা,
শূন্য অন্ধকার মেঘে সন্ধ্যার কিরণ মাখা;
সেই বিষ প্রাণ ভোরে সখিলো করিনু পান,
মন হ’য়ে গেল, সখি, অবসন্ন—ম্রিয়মান।
মুরলা।-কবিগো, ও সব কথা ভেবোনাকো আর,
শ্রান্ত মাথা রাখ’ এই কোলেতে আমার।
কবি –সখি, আর কত দিন সুখ হীন, শান্তি হীন,
হাহা কোরে বেড়াইব, নিরাশ্রয় মন লোয়ে!
পারিনে, পারিনে আর—পাষাণ মনের ভার
বহিয়া, পড়েছি সখি, অতি শ্রান্ত ক্লান্ত হোয়ে।
সম্মুখে জীবন মম হেরি মরুভূমি সম,
নিরাশা বুকেতে বসি ফেলিতেছে বিষশ্বাস।
উঠিতে শকতি নাই, যেদিকে ফিরিয়া চাই
শূন্য—শূন্য—মহাশূন্য নয়নেতে পরকাশ।
কে আছে, কে আছে, সখি, এ শ্রান্ত মস্তক মম
বুকেতে রাখিবে ঢাকি যতনে জননী সম!
কে আছে, অজস্র স্রোতে প্রণয় অমৃত ভরি
অবসন্ন এ হৃদয় তুলিবে সজীব করি!
মন, যতদিন যায়, মুদিয়া আসিছে হায়,
শুকায়ে শুকায়ে শেষে মাটীতে পড়িবে ঝরি।
মুরলা।—(স্বগত) হা কবি, ও হৃদয়ের শূন্য পূরাইতে
অভাগিনী মুরলাগো কি না পারে দিতে!
কি সুখী হোতেম, যদি মোর ভালবাসা
পূরাতে পারিত তব হৃদয় পিপাসা!
শৈশবে ফুটেনি যবে আমার এ মন,
তরুণ প্রভাত সম, কবিগো, তখন
প্রতিদিন ঢালি ঢালি দিয়েছ শিশির,
প্রতিদিন যোগায়েছ শীতল সমীর,
তোমারি চোখের পরে করুণ কিরণে
এ হৃদি উঠেছে ফুটি তোমারি যতনে;
তোমারি চরণে কবি দেছি উপহার,
যা কিছু সৌরভ এর তোমারি—তোমার।
(প্রকাশ্যে) তােল কবি, মাথা তােল, ভেবোনা এমন,
দুজনে সরসী তীরে করিগে ভ্রমণ।
ওই চেয়ে দেখ, কবি, তটিনীর ধারে
মধ্যাহ্ন কিরণ লোয়ে, বন-দেবী স্তব্ধ হোয়ে
দিতেছে বিবাহ দিয়া আলোকে আঁধারে।
সাধের সে গান তব শুনিবে এখন?
তবে গাই, মাথা তোেল, শোন দিয়ে মন।
গান।
কত দিন একসাথে ছিনু ঘুম ঘোরে,
তবু জানিতাম নাকো ভালবাসি তোরে।
মনে আছে ছেলেবেলা কত খেলিয়াছি খেলা,
ফুল তুলিয়াছি কত দুইটি আঁচল ভোরে!
ছিনু সুখে যত দিন দুজনে বিরহ হীন
তখন কি জানিতাম ভালবাসি তোরে?
অবশেষে এ কপাল ভাঙ্গিল যখন,
ছেলেবেলাকার যত ফুরাল’ স্বপন,
লইয়া দলিত মন হইনু প্রবাসী,
তখন জানিনু, সখি, কত ভালবাসি।
বিংশ সর্গ
বিংশ সর্গ।
নলিনী।
গান।
সখিলো, শোন্ লো তোরা শোন,
আমি যে পেয়েছি এক মন!
সুখ দুঃখ হাসি অশ্রুধার,
সমস্ত আমার কাছে তার;
পেয়েছি পেয়েছি আমি সখি
একটি সমগ্র মন প্রাণ;
লাজ ভয় কিছু নাই তার
নাই তার মান অভিমান!
রয়েছে তা’ আমারি মুঠিতে,
সাধ গেলে পারি তা’ টুটিতে,
যা’ ইচ্ছা করিতে পারি তাই,
সাধ গেলে হাসাই কাঁদাই,
সাধ গেলে ফেলে তা’রে দিই,
সাধ গেলে তুলে তা’রে রাখি,
ইচ্ছা হয় তাড়াইতে পারি,
ইচ্ছা হয় কাছে তারে ডাকি!
জানে না সে রোষ করিবারে,
ফিরে যেতে নাহি পারে আর,
শুধু জানে হাসিতে কাঁদিতে,
আর কিছু সাধ্য নাই তার!
সখিলো এমন মন এক
পেয়েছি—পেয়েছি তোরা দেখ্!
আমি কভু চাইনি এ মন
ইহাতে মোর কি প্রয়োজন?
পথিক সে, পথে যেতে যেতে
দেখা হ’ল চোখেতে চোখেতে,
মনখানা হতে ক’রে নিয়ে
আপনি সে রেখে গেল পায়,
চোলে গেল দূর দুরান্তরে
মন পোড়ে রহিল ধূলায়!
দুদণ্ড চাহিয়া দেখিলাম,
ভাবিনু “মোর কি প্রয়োজন!”
আঁখি দুটি লইনু তুলিয়া,
দূরে যেতে ফিরানু বদন!
অমনি সে নুপূরের মত
চরণ ধরিল জড়াইয়া,
সাথে সাথে এল সারা পথ
রুণু ঝুনু কাঁদিয়া কাঁদিয়া।
সখি আমি, শুধাই তোদের
সত্য কোরে মেরে বল্ দেখি,
পায়ে স্বর্ণ ভূষণের চেয়ে
হৃদয়ের নুপূর শোভে কি?
কি করিব বল্ দেখি তাহা
আপনি সে গেল যদি রেখে!
আমিত চাই নি তারে ডেকে!
আমারেই দিলে কেন আসি
রূপসীত ছিল রাশি রাশি।
সুহাসি কমলা ছিল না কি?
শুনেছি মধুর তার আঁখি!
বিনোদিনী ছিল ত সেথায়
রূপ তার ধরেনা ধরায়!
তবে কেন মন খানি তার
আমারে সে দিল উপহার?
দেব কি ইহারে দূরে ফেলে,
অথবা রাখিব কাছে কোরে,
ভাই ভাবিতেছি মনে মনে
কি করিব, বল্ তাই। মোরে!
ষড়্বিংশ সর্গ
ষড়্বিংশ সর্গ।
নলিনী।
আজ তার সাথে দেখা হ’ল,
মুখ ফিরাইয়া চ’লে গেল।
হা অদৃষ্ট, কাল মোরে হেরিয়া যে জন,
নলিনী নলিনী বলি হ’ত অচেতন,
নিমেষ ভূলিত আঁখি, পূরিত না আশ,
আমার সৌন্দর্য্য রাশি করিত যে গ্রাস,
মোর রাঙ্গা চরণের ধূলি হইবার
হৃদয়ের একমাত্র সাধ ছিল যার,
ধূলিতে যে পদচিহ্ন করিত চুম্বন,
মুখ ফিরাইয়া আজ গেল সেই জন!
আঁখির পিপাসা তার, হৃদয়ের আশা তার
নলিনীরে দেখে সেও ফিরালে নয়ন!
পাশ দিয়া চ’লে গেল স্পর্দ্ধিত-গমন?
বিশ্বাসঘাতক যদি কাল পুন আসে
নলিনী নলিনী বলি ফিরে পাশে পাশে,
ভালবাসা ভালবাসা করে দিন রাত,
তাহার পানে কি আর ফিরে চাই একবার!
করিনা কি বজ্র সম কটাক্ষ নিপাত।
হাসির ছুরিকা দিয়ে বিঁধি তার মন
দারুণ ঘৃণার বিষে করি অচেতন।
ভিখারী বালক সেই, দিবস রজনী যেই
একটি হাসির তরে ছিল মুখ চেয়ে
একটি ইঙ্গিত পেলে আসিত যে ধেয়ে,
আজ মোরে—নলিনীরে—হেরি সেই জন
চলে গেল একে বারে ফিরায়ে নয়ন!
যেন আজ আমিরে নলিনী নই আর,
কাল যাহা ছিল আজ কিছু নাই তার!
এ হৃদে আঘাত দিবে মনে করে সে কি!
সে যদি ফিরে না চায়, সে যদি চলিয়া যায়,
তাহ হলে নলিনী এ কেঁদে মরিবে কি!
এই যে উড়াই ধূলা চরণের ঘায়
বায়ুভরে এওত পশ্চাতে চ’লে যায়,
তাই নলিনীর আঁখি অশ্রু বরষিবে নাকি!
হা কপাল, এও সে কি ছিল মনে ক’রে,
কথা না কহিয়া সেও ব্যথা দিবে মোরে!
এ যে হাসিবার কথা, সেও মোরে দিবে ব্যথা,
কাল যারে নিতান্ত ক’রেছি অবহেলা,
কৃপা ক’রে দেখিতাম যার প্রেম খেলা,
সেও আজ ভাবিয়াছে ব্যথিবে এ মন
শুধু কথা না কহিয়া, ফিরায়ে নয়ন!
ষষ্ঠ সর্গ
ষষ্ঠ সর্গ।
কবি ও মুরলা।
কবি।—উন্মাদিনী, কল্লোলিনী—ক্ষুদ্র এক নির্ঝরিণী
শিলা হোতে শিলান্তরে লুটিয়া লুটিয়া,
নেচে নেচে, অট্ট হেসে, ফেনময় মুক্তকেশে
প্রশান্ত হ্রদের কোলে পড়ে ঝাঁপাইয়া;
শুধু মুহূর্ত্তের তরে তিল বিচলিত করে
সে প্রশান্ত সলিলের শুধু এক পাশ,
উনমত্ত কোলাহল—অধীর তরঙ্গদল
মুহূর্ত্তের মাঝে সব পায় গো বিনাশ!
দেখ সখি গৃহ মাঝে দেখগো চাহিয়া,
নাচ, গান, বাদ্য, হাসি—আমোেদ কল্লোলরাশি—
নিশীথ—প্রশান্তি মাঝে পড়িছে ঝাঁপিয়া!
আলোকে আলোকে গৃহ উঠেছে মাতিয়া,
স্ফটিকে স্ফটিকে আলো নাচে বিদ্যুতিয়া,
শত রমণীর পদ পড়ে তালে তালে;
চরণের আভরণ নেচে নেচে প্রতিক্ষণ
শত আলোকের বাণ হাণে এককালে;
মূর্চ্ছিয়া পড়িছে আলো হীরকে হীরকে;
শতকৃষ্ণ আঁখিতারা হানিছে আলোকধারা—
শত হৃদে পড়ে গিয়া ঝলকে ঝলকে!
চারি দিকে ছুটিতেছে আলোকের বাণ,
চারিদিকে উঠিতেছে হাসি বাদ্য গান।
কিন্তু হেথা চেয়ে দেখ কি শান্ত যামিনী!
কি শুভ্র জোছনা ভায়! কি শান্ত বহিছে বায়!
কেমন ঘুমন্ত আছে প্রশান্ত তটিনী!
বল সখি, পূর্ণিমা কি আমোদের রাত?
এস তবে দুই জনে বসি হেথা এক সনে,
করি আপনার মনে রজনী প্রভাত!
(গান)
নীরব রজনী দেখ মগ্ন জোছনায়।
ধীরে ধীরে অতিধীরে—অতিধীরে গাও গো!
ঘুম-ঘোরমর গান বিভাবরী গায়,
রজনীর কণ্ঠ সাথে সুকণ্ঠ মিলাও গো!
নিশীথের সুনীরব শিশিরের সম,
নিশীথের সুনীরব সমীরের সম,
নিশীথের সুনীরব জোছনা সমান
অতি—অতি—অতিধীরে কর সখি গান!
নিশার কুহক বলে নীরবতা-সিন্ধুতলে
মগ্ন হয়ে ঘুমাইছে বিশ্ব চরাচর;
প্রশান্ত সাগরে হেন, তরঙ্গ না তুলে যেন
অধীর—উচ্ছাসময় সঙ্গীতের স্বর!
তটিনী কি শান্ত আছে! ঘুমাইয়া পড়িয়াছে
বাতাসের মৃদু হস্ত পরশে এমনি,
ভূলে যদি ঘুমে ঘুমে তটের চরণ চুমে
সে চুম্বন ধ্বনি শুনে চমকে আপনি!
তাই বলি অতি ধীরে—অতিধীরে গাও গো,
রজনীর কণ্ঠ সাথে সুকণ্ঠ মিলাও গো!
(মুরলার প্রতি) কেনলাে মলিন সখি, মুখানি তােমার?
কাছে এস, মোর পাশে বোস’ একবার!
কেন সখি, বল্ মোরে, যখনি দেখেছি তোরে
মাটি পানে নত দুটি বিষণ্ন নয়ান!
আননের দুই পাশ অবদ্ধ কুন্তল রাশ,
করুণ ও মুখ খানি বড় সখি ম্লান!
মুরলা।—সত্য ম্লান কিগো কবি এ মুখ আমার?
নিশীথ বাতাস লাগি মনে কত উঠে জাগি
নিস্তব্ধ জোছনা রাতে ভাবনার ভার!
(স্বগত) আহা কি করুণ সখা, হৃদয় তােমার!
কবি গো! বুক যে যায়—ভেঙ্গে যায়, ফেটে যায়,
অশ্রুজল রুধিবারে পরিনাক আর!
পারিনে—পারিনে সখা—পারিনে গো আর!
ভেঙ্গে বুঝি ফেলে তারা মর্ম্ম-কারাগার!
একবার পায়ে ধোরে কেঁদে নিই প্রাণ ভোরে,
একবার শুধু কবি, শুধু একবার!
যুঝিছে বুকের মাঝে শত অশ্রুধার!
কবি।—একটি প্রাণের কথা রােয়েছে গােপনে
বলিব বলিব তোরে করিতেছি মনে!
আজ জোছনার রাতে বিপাশার তীরে
কাছে আয়, সে কথাটি বলি ধীরে ধীরে!
মুরলা।—কি কথা সে? বল কবি! করহ প্রকাশ!
কবি।—কে জানে উঠেছে হৃদে কিসের উচ্ছ্বাস!
খেলিছে মর্ম্মের মাঝে অধীর উল্লাস।
অথচ, উল্লাস সেই সুকুমার হেন,
শিশিরের বাষ্প দিয়ে গঠিত সে যেন!
হৃদয়ে উঠেছে যেন বন্যা জোছনার,
মধুর অশান্তিময় হৃদয় আমার।
সূক্ষ্ম আবরণ, গাঁথা সন্ধ্যা-মেঘ-স্তরে,
পড়িয়াছে যেন মোর নয়নের পরে!
কিছু যেন দেখেও দেখেনা আঁখিদ্বয়,
সকলি অস্ফুট, যেন সন্ধ্যাবর্ণময়!
শোন্ বলি, মুরলা লো, আরে আয় কাছে,
শূন্য এ হৃদয় মোর ভাল বাসিয়াছে!
মুরলা।—ভালবাসে? কারে কবি? কারে সখা? কারে?
কবি।—মধুর নলিনী সম নলিনী বালারে!
মুরলা।—নলিনী? নলিনী সখা! নলিনী বালারে?
কবি মোর! সখা মোর! ভালবাস’ তারে?
কবি।—হাঁ মুরলা, সেই নলিনী বালারে,
তারে তুমি জান না কি?
এমন মধুর মুখ ভাব তার!
এমন মধুর আঁখি!
এত রাশি রাশি খেলাইছে হাসি
হৃদয়ের নিরালায়—
নয়ন অধর ভাসাইয়া দিয়া
উথলি পড়িয়া যায়!
যে দিকে সে চায় হাসিময় চোখে—
হাসি উঠে চারি ধার,
যে দিকে সে যায়—আঁধার মুছিয়া
চলে জ্যোতিছায়া তার!
তার সে নয়ন-নিঝর হইতে
হাসি সুধারাশি ঝরি,
এই হৃদয়ের আকাশ পাতাল
রেখেছে জোছনা করি।
মুরলা।—(স্বগত) দেবি গাে করুণাময়ী
কোথা পাই ঠাঁই মাগো—কোথা গিয়ে কাঁদি!
দুর্ব্বল এ মন দে মা পাষাণেতে বাঁধি!
(প্রকাশ্যে) আহা কবি তাই হােক্—সুখে তুমি থাক।
এ নব প্রণয়ে মন পূর্ণ কোরে রাখ’!
নয়নের জল তব কিছুতে মোছে নি,
হৃদয়-অভাব তব কিছুতে ঘোচে নি-
আজ, কবি, ভালবেসে সুখী যদি হও শেষে,
আজ যদি থামে তব নয়নে ধার,
দেবতা গো, তাই কর! চিরজন্ম সুখী কর
কবিরে আমার, বাল্য-সখারে আমার!
কবি।—মুছ’ অশ্রুজল সখি কেঁদোনা অমন;—
যে হাসির কিরণেতে পূর্ণ হ’ল মন
একেলা বিজনে বসি কবিরে তোমার
কাঁদিতে দেখিতে, সখি, হবেনাক আর!
আজ হোতে মিলাবে না হাসি এ অধরে,
বিষণ্ন হবেনা মুখ মুহূর্ত্তের তরে।
আয় সখি, আয় তবে, কাছে আয় মোর,
মুছাইয়া দিই আহা অশ্রুজল তোর!
মুরলা।—অশ্রু মুছায়ােনা আর—বহুক্ যা’ বহিবার,
এখনি আপনা হোতে থামিবে উচ্ছ্বাস;
এ অশ্রু মুছাতে কবি কিসের প্রয়াস!
ক্ষুদ্র হৃদয়ের কত ক্ষুদ্র সুখ দুখ
আপনি সে জাগি উঠে—আপনি শুকায় ফুটে,
চেয়েও দেখেনা কেহ উঠুক্ পড়ুক্!
এস সখা, ওই কাঁধে রাখি এই মুখ;
একে একে সব কথা কহগো আমারে—
বড় ভাল বাস’ কি সে নলিনী বালারে?
কবি।—শুধু যদি বলি সখি ভাল বাসি তায়
এ মনের কথা যেন তাহে না ফুরায়।—
ভালবাসা ভালবাসা সবাইত কয়,
ভালবাসা কথা যেন ছেলেখেলাময়;
প্রতি কাজে প্রতি পলে সবাই যে কথা বলে
তাহে যেন মোর প্রেম প্রকাশ না হয়!
মনে হয় যেন সখি, এত ভালবাসা
কেহ কারে বাসে নাই, কারো মনে আসে নাই,
প্রকাশিতে নারে তাহা মানুষের ভাষা!
মুরলা।—তাই হােক্, ভাল তারে বাস’ প্রাণপণে!
তারে ছাড়া আর কিছু না থাকুক্ মনে!
কবি।—সে আমার ভালবাসা না যদি পুরায়!
যেই প্রেম-আশা লোয়ে রয়েছি উন্মত্ত হোয়ে,
বিশ্ব দেখি হাস্যময় যাহার মায়ায়,
যদি সখি ফিরে নাহি পাই ভালবাসা—
ম্রিয়মান হোয়ে পড়ে সেই প্রেম-আশা,
মুমূর্ষু আশার সেই গুরু দেহ-ভার
সমস্ত জগৎ-ময় বহিয়া বেড়াতে হয়—
শান্ত হৃদি দিবানিশি করে হাহাকার!
অসুস্থ আশার সেই মুমূর্ষু-নিশ্বাসে
যদি এ হৃদয় হয় শূন্য মরুভূমি ময়,
হৃদয়ের সব বৃত্তি শুকাইয়া আসে,
দিনরাত্রি মৃত-ভার করিয়া বহন
ম্রিয়মাণ হোয়ে যদি পড়ে এই মন!
মুরলা।—ওকথা বােলােনা, কবি, ভেবােনাক আর;
নিশ্চয় হইবে পূর্ণ প্রণয় তোমার!
কি-জানি-কি-ভাবময় ওই তব মুখ—
ওই তব সুধাময়—প্রেমময়—স্নেহময়
সুকুমার—সুকোমল—করুণ ও মুখ—
হাসি আর অশ্রুজলে মাখান’ ও মুখ
রাখিতে প্রাণের কাছে—এমন কে নারী আছে
পেতে না দিবেক তার প্রেমময় বুক!
শত ভাব উথলিছে ওই আঁখি দিয়া—
শত চাঁদ ওই খানে আছে ঘুমাইয়া—
মুছাইতে ও মধুর নয়নের ধার
কোন্ নারী দিবেনাক’ আঁচল তাহার!
মধুময় তব গান দিবারাত করি পান
ঘুমাইয়া পড়িবে সে হৃদয়ে তোমার;
বসি ওই পদমূলে মুগ্ধ আঁখি-পাতা তুলে
দিন রাত্রি চেয়ে রবে ওই মুখ পানে
সূর্য্যমুখী ফুল সম অবাক্ নয়ানে!
হেন ভাগ্যবতী নারী কে আছে ধরায়—
যেজন কবির প্রেম না চাহিয়া পায়!
(স্বগত) মুরলারে—কোন আশা পূরিল না তাের—
কাঁদ্ তুই অভাগিনী এ জীবন ভোর!
এ জনমে তোর অশ্রু মুছাবেনা কেহ,
এ জনমে ফুটিবে না তোর প্রেম স্নেহ
কেহ শুনিবেনা আর তোর মর্ম্ম-ব্যথা,
ভালবেসে তোর বুকে রাখিবেনা মাথা!
বড় যদি শ্রান্ত হোয়ে পড়ে তোর মন
কেহ নাহি কহিবারে আশ্বাস-বচন;
মাতৃহারা শিশু মত কেঁদে কেঁদে অবিরত
পথের ধূলার পরে পড়িবি ঘুমায়ে,
একটি স্নেহের নেত্র দেখিবেনা চেয়ে!
(নলিনীর প্রবেশ)
কবি।—(দুর হইতে) পূর্ণিমা-রূপিণী বালা! কোথা যাও, কোথা যাও!
একবার এই দিকে মুখানি তুলিয়া চাও!
কি আনন্দ ঢেলেছ যে, কি তরঙ্গ তুলেছ যে
আমার হৃদয় মাঝে, একবার দেখে যাও!
দিবানিশি চায়, বালা, অধীর ব্যাকুল মন
ও হাসি-সমুদ্র মাঝে করে আত্ম বিসর্জন!
হেরি ওই হাসিময়, মধুময় মুখপানে
উন্মত্ত অধীর-হৃদি তিল দূর নাহি মানে;—
চায়, অতি কাছে গিয়া ওই হাত দুটি ধরি,
অচেতনে কাটাইয়া দেয় দিবা বিভাবরী;
একটি চেতনা শুধু জাগি রবে অনিবার—
সে চেতনা তুমি-ময়—ওই মিষ্ট হাসিময়—
ওই সুধা মুখ-ময়—কিছু—কিছু নহে আর!
আমার এ লঘু-পাখা কল্পনার মেঘগুলি
তোমার প্রতিমা, বালা, মাথায় লয়েছে তুলি;
তোমার চরণ-জ্যোতি পড়িয়া সে মেঘ পরে
শত শত ইন্দ্রধনু রচিয়াছে থরে থরে!
তোমার প্রতিমা লোয়ে কিরণে কিরণে ভরা
উড়েছে কল্পনা—কোথা ফেলিয়ে রেখেছে ধরা!
হরিত-আসন পরে নন্দন-বনের কাছে,
ফুল-বাস পান করি বসন্ত ঘুমায়ে আছে,
ঘুমন্ত সে বসন্তের কুসুমিত কোল পরে
তোমারে কল্পনা-রাণী বসায়েছে সমাদরে,
চারি দিকে জুঁই—ফুলচারি দিকে বেল ফুল,
ঘিরে ঘিরে রহিয়াছে অজস্র কুসুম কুল;
শাখা হোতে নুয়ে পোড়ে পরশিয়া এলো চুল
শতেক মালতী কলি হেসে হেসে ঢলাঢলি,
কপালে মারিছে উঁকি, কপোল পড়িছে ঝুঁকি,
ওই মুখ দেখিবারে কৌতুহলে সমাকুল;
অজস্র গোলাপ রাশি পড়িয়া চরণ তলে
না জানি কি মনেদুখে আকুল শিশির জলে!
তোমার প্রতিমা লোয়ে কল্পনা এমনি করি
খেলাইয়া বেড়াইছে নাহি দিবা বিভাবরী;
কভু বা তারার মাঝে, কভু বা ফুলের পরে,
কভু বা উষার কোলে, কভু সন্ধ্যা-মেঘ স্তরে;
কত ভাবে দেখিতেছে—কত ছবি আঁকিতেছে;
প্রফুল্ল-আনন কভু হরষের হাসিমাখা,
অভিমান-নত আঁখি কভু অশ্রুজলে ঢাকা।
কাছে এস’, কাছে এস’, একবার মুখ দেখি,
তোল গো, নলিনী বালা, হাসি ভারে নত আঁখি!
মর্ম্মভেদী আশা এক লুকানো হৃদয় তলে,
ওই হাতে হাত দিয়ে—প্রাণে প্রাণে মিশাইয়ে
বসন্তের বায়ু সেবি, কুসুমের পরিমলে,
নীরব জোছনা রাতে, বিপাশা তটিনী তীরে,
ফুল-পথ মাড়াইয়া দোঁহে বেড়াইব ধীরে;
আকাশে হাসিবে চাঁদ, নয়নে লাগিবে ঘোর,
ঘুমময় জাগরণে করিব রজনী ভোর!
আহা সে কি হয় সুখ! কল্পনায় ভাবি মনে
বিহ্বল আঁখির পাতা মুদে আসে দু-নয়নে!
মুরলা।—(স্বগত) হৃদয় রে—
এ সংসারে আর কেন রয়েছি আমরা?
তুচ্ছ হোতে তুচ্ছ আমাদেরো তরে আজ
তিল মাত্র স্থান কি রে রাখিয়াছে ধরা!
এখনো কি আমাদের ফুরায় নি কাজ?
হৃদয় রে! হৃদয় রে! ওরে দগ্ধ মন!
আমাদের তরে ধরা হয় নি সৃজন!
কবি।—মুরলা লাে! চেয়ে দেখ্—চেয়ে দেখ্ হােথা!
বল্ দেখি এত হাসি—এত মিষ্ট সুধারাশি,
হেন মুখ, হেন আঁখি দেখেছিস্ কোথা?
মুরলা।—এমন সুন্দরী আহা কভু দেখি নাই—
কবির প্রেমের যোগ্য আর কিবা চাই!
কবিতার উৎস সম ও নয়ন হোতে
করিবে কবিতা তব হৃদে শত-স্রোতে!
হাসিময় সৌন্দর্য্যের কিরণ পরশে
বিহঙ্গম-হৃদি তব গাহিবে হরষে;
মধুর সঙ্গীতে বিশ্ব করিবে প্লাবন;
সুখে থাক পূর্ণ মনে, ভালবাস’ প্রাণপণে
প্রেম-যোগ্য নারী যবে পেয়েছ এমন!
(স্বগত) কেন এত অশ্রু আজি করি বরিষণ?
কেনরে কিসের দুখ? কেন এত ফাটে বুক?
কিসের যন্ত্রণা মর্ম্ম করিছে দংশন?
কখনো ত কবির অমূল্য ভালবাসা
অভাগিনী মনে মনে করি নাই আশা!
জানিতাম চির দিন, রূপহীন, গুণহীন,
তুচ্ছ মুরলার এই ক্ষুদ্র ভালবাসা
পূরাতে মারিবে তার প্রণয় পিপাসা!
মোরে ভালবেসে কবি সুখী হইবে না;
তবু আজ কিসের গো—কিসের যাতনা!
আজ কবি মুচেছেন অশ্রুবারিধার,
বহুদিনকার আশা পূরেছে তাঁহার!
আহা কবি, সুখে থাক’—আর কিছু চাইনাকো,
এই মুছিলাম অশ্রু, আর কাঁদিব না,
কিসের যাতনা মোর, কিসের ভাবনা!
কবি।—ওই দেখ, ফুল তুলে আঁচলটি ভরি,
কামিনীর শাখা লোয়ে ওই দেখ ভয়ে ভয়ে
অতি যত্নে রাখিয়াছে নুয়াইয়া ধরি,
পাছে কুসুমের দল ভূঁয়ে পড়ে ঝরি!
ওই দেখ্—উচ্চ শাখে ফুটিয়াছে ফুল,
তুলিবার তরে আহা কতই আকুল!
কিছুতে তুলিতে নারে কত চেষ্টা করি,
শাখাটি ধরিয়া শেষে নাড়িছে মধুর রোষে,
কুসুম শতধা হোয়ে পড়িতেছে ঝরি;
বিফল হইয়া শেষে সখীদের কোলে
ওই দেখ্ হেসে হেসে পড়িতেছে ঢোলে!
মুরলা।—(স্বগত)
আমি যদি হইতাম হাস্যোল্লাসময়!
নির্ঝরিণী, বরষার নবোচ্ছ্বাস ময়!
হরষেতে হেসে হেসে কবির কাছেতে এসে
ডুবাতেম ভালবেসে আদরে আদরে!
যদি কভু দেখিতাম মুহুর্ত্তের তরে
বিষাদ ছাইছে পাখা কবির অধরে,
হাসিয়া কত না হাসি—ঢালিয়া সঙ্গীত রাশি,
মৃদু অভিমান করি, মৃদু রোষ ভরে—
মৃদু হেসে, মৃদু কেঁদে—বাহুতে বাহুতে বেঁধে
দিতেম বিষাদ-ভার সব দুর কোরে!
কিন্তু আমি অভাগিনী ছেলেবেলা হোতে
এ গম্ভীর মুখে মম অন্ধকার ছায়া সম
রহিয়াছি সতত কবির সাথে সাথে!
আমি লতা গুরু-ভার মেলি শাখা অন্ধকার
হেন ঘন আলিঙ্গনে কোরেছি বেষ্টন,
উন্নত মাথায় তাঁর পড়িতে দিই না আর
চাঁদের হাসির আলো, রবির কিরণ!
হা মুরলা, মুরলারে—এমনি কোরেই হা রে
হারালি—হারালি বুঝি ভালবাসা ধন!
বুক, ফেটে যা’রে, অশ্রু কর্ বরিষণ,
কবি তোর অশ্রু-ধার দেখিতে পাবেনা আর,
যে কিরণে আছে ডুবি তাঁহার নয়ন!
দুর্ব্বল—দুর্ব্বল-হৃদি! আবার! আবার!
আবার ফেলিস তুই অশ্রু বারি—ধার?
আবার আবার কেন হৃদয় দুয়ারে হেন
পাষাণে পাষাণে গাঁথা—কে যেন হানিছে মাখা,
কে যেন উন্মাদ সম করে হাহাকার—
সমস্ত হৃদয়ময় ছুটিয়া আমার!
থাম্ থাম্, থাম্ হৃদি, মোছ অশ্রুধার!
কবি যদি সুখী হয় কি ভাবনা আর!
আহা কবি, সুখী হও! তুমি কবি সুখী হও!
আমি কে সামান্য নারী?—কি দুঃখ আমার!
তুমি যদি সুখী হও কি দুঃখ আমার!
ও চাঁদের কলঙ্কও হোতে নাহি পারি
এত ক্ষুদ্র হোতে ক্ষুদ্র, তুচ্ছ আমি নারী!
(চপলার প্রবেশ ও গান)
সখি, ভাবনা কাহারে বলে?
সখি, যাতনা কাহারে বলে?
তোমরা যে বল’ দিবস রজনী
ভালবাসা ভালবাসা,
সখি ভালবাসা কারে কয়?
সেকি কেবলি যাতনা ময়?
তাহে কেবলি চোখের জল?
তাহে কেবলি দুখের শ্বাস?
লোকে তবে করে কি সুখের তরে
এমন দুখের আশ?
জীবনের খেলা খেলিছে বিধাতা,
আমরা তাহার খেলেনা,
আমাদের কিবা সুখ!
সখি, আমাদের কিবা দুখ!
সখি, আমাদের কিবা যাতনা!
তোমাদের চোখে হেরিলে সলিল
ব্যথা বড় বাজে বুকে,
তবুত সজনি বুঝিতে পারিনে
কাঁদ যে কিসের দুখে!
আমায় চোখেতে সকলি শোভন,
সকলি নবীন, সকলি বিমল,
সুনীল আকাশ, শ্যামল কানন,
বিশদ জোছনা, কুসুম কোমল,
সকলি আমারি মত!
কেবলি হাসে, কেবলি গায়,
হাসিয়া খেলিয়া মরিতে চায়,
না জানে বেদন, না জানে রোদন,
না জানে সাধের যাতনা যত!
ফুল সে হাসিতে হাসিতে ঝরে,
জোছনা হাসিয়া মিলায়ে যায়,
হাসিতে হাসিতে আলোক-সাগরে
আকাশের তারা তেয়াগে কায়!
আমার মতন সুখী কে আছে!
আয় সখি, আয় আমার কাছে,
সুখী হৃদয়ের সুখের গান
শুনিয়া তোদের জুড়াবে প্রাণ,
প্রতিদিন যদি কাঁদিবি কেবল
একদিন নয় হাসিবি তোরা,
একদিন নয় বিষাদ ভুলিয়া
সকলে মিলিয়া গাহিব মোরা!
(মুরলার প্রতি) এই যে আমার সখীর অধরে
ফুটেছে মৃদুল হাসি,
আয় সখি, মোরা দুজনে মিলিয়া
ললিতারে দেখে আসি।
মালতী সেথায়–মাধবী সেথায়,
সখীরা এসেছে সবে,
এতখনে সেথা ফাটিছে আকাশ
কমলার হাসি-রবে।
মুরলা।—চল্ সখি, চল্ তবে।
ষোড়শ সর্গ
ষোড়শ সর্গ।
ললিতা।
কে জানে নাথের কেন হোল গো এমন?
জানিনা কি ভাবিয়ে যান বিপাশার ধারে,
ললিতার চেয়ে ভাল বাসেন বিজন!
কভুবা আছেন যবে বিরলে বসিয়া,
আমি যদি যাই কাছে হাসিয়া হাসিয়া,
বিরক্তিতে ভুরু কেন আকুঞ্চিয়া উঠে যেন,
বিরক্তি জাগিয়া উঠে অধর খানিতে,
আপনি যেন গো তাহা নারেন জানিতে!
সহসা চমকি উঠি কি যেন হোয়েছে ত্রুটি
আমারে কাছেতে এনে ডাকিয়া বসান্,
কি কথা ভাবিতেছেন বুঝাইতে চান্,
না পারেন বুঝাইতে—সরমে আকুল চিতে
কি কথা বলিতে হবে ভাবিয়া না পান্!
কেন ত্যজি ললিতারে এলেন বিপাশা পারে
শতেক সহস্র তার কারণ দেখান্,
তা’ লাগি কোরেছি যেন কত অভিমান!
আপনি বলেন আসি, ভালবাসি, ভালবাসি,
সন্দেহ কোরেছি যেন প্রণয়ে তাঁহার,
তা’ লাগি ক’রেছি যেন কত তিরস্কার!
সহসা কাননে এলে আমারে দেখিতে পেলে
লুকাইয়া দ্রুত পদে পালান চকিতে,
মনে ভাবি আমি তাঁরে পাইনি দেখিতে!
কি করি! কি হবে মোর! বড় হয় ভয়!
লজ্জা কোরে ললিতারে হারালি প্রণয়!
লজ্জা কই, ললিতার লজ্জা কোথা আজ?
ভেঙ্গেছেও ললিত সে ভেঙ্গেছেত লাজ!
(ক্রুদ্ধ হইয়া) ধিক্ রে! এই কি লজ্জা ভাঙ্গিবার কাল?
ভেঙ্গেছে সরম যবে ভেঙ্গেছে কপাল!
আর কিছু দিন আগে ঘটে নাই ভ্রম?
আর কিছু দিন আগে ভাঙ্গেনি শরম?
কাঁদিতে বসিলি আজ শিশুটির মত!
কিছু দিন আগে কেন ভাবিলিনে এত?
মিছা কি মনেরে তুই দিস্রে প্রবোধ?
দেখিনি তো হতে আর অধম অবোধ!
তুই যদি কষ্ট পাস্ দোষ দিব কার?
তোর মত অবোধের কষ্ট পুরস্কার!
যত কষ্ট আছে তুই সব কর ভোগ,
অশ্রুজলে তোর দিন অবসান হোক্!
নিজের চরণ দিয়া নিজ হৃদি বিদলিয়া
হৃদয়ের রক্তবিন্দু গোন্ দিন রাত!
হায়ায়ে সর্ব্বস্ব ধন কর্ অশ্রুপাত!
আগে কেন বুঝিলিনে, আগে কেন ভাবিলিনে,
কিছু দিন আগে লজ্জা নারিলি ভাঙ্গিতে!
মিছা হৃদয়েরে আজ চাস্ প্রবোধিতে!
যেমন করিলি কাজ, ফল ভোগ কর্ আজ,
পর হোক্ যেই জন ছিল আপনার,
তুই যদি কষ্ট পাস্ দোষ দিব কার?
সপ্তদশ সর্গ
সপ্তদশ সর্গ।
মুরলা।
(প্রান্তরে)
যার কেহ নাই তার সব আছে,
সমস্ত জগৎ মুক্ত তার কাছে;
তারি তরে উঠে রবি শশি তারা
তারি তরে ফুটে কুসুম গাছে।
একটি যাহার নাইক আলয়
সমস্ত জগৎ তাহারি ঘর,
একটি যাহার নাই সখা সখি
কেহই তাহার নহেক পর!
আর কি সে চায়? রয়েছে যখন
আপনি সে আপনার,
কিসের ভাবনা তার?
কিন্তু যে জনের প্রাণের মনের
একজন শুধু আছে,
রবিশশি তার সেই এক জন,
সেই তার প্রাণ, সেই তার মন,
সেই সে জগৎ তাহার কাছে,
জগৎ সে জন-ময়,
আর কেহ কেহ নয়;
পৃথিবীর লোক সেই এক জন;
যদি সে হারায় তা’কে
আর তার তরে রবি নাহি উঠে,
আর তার তরে ফুল নাহি ফুটে,
কিছু তার নাহি থাকে!
বহিছে তটিনী বহিছে তটিনী
তটিনী বহিছে না,
গাহিছে বিহগ গাহিছে বিহগ
বিহগ গাহিছে না।
সমস্ত জগৎ গেছে ধ্বংশ হোয়ে
নিভেছে তপন শশি,
সারা জগতের শ্মশান মাঝারে
সে শুধু একেলা বসি।
কি একটি বালু-কণার উপরে
তাহার সমস্ত জগৎ ছিল!
নিশ্বাস লাগিতে খসিল বালুকা,
নিমেষে জগৎ মিশায়ে গেল!
হা রে হা অবোধ, জীবন লইয়া
হেন ছেলে খেলা করিতে আছে,
ক্ষণস্থায়ী ওই তিলেকের পরে
সমস্ত জগৎ গড়িতে আছে,
মুহূর্ত কালের ক্ষীণ মুষ্টি মাঝে
তোর চিরকাল রাখিতে আছে?
রাখ্রে ছড়ায়ে হৃদয়টি তোর
সমস্ত জগৎময়!
জগৎ সাগরে বিম্ব যত আছে
কেহই কাহারো নয়!
সে বিম্বের পরে রাখিস্নে তুই
কোন আশা,মন মোর!
সহসা দেখিবি বিম্বটির সাথে
ভেঙ্গেছে সর্ব্বস্ব তোর।
ওরে মন, তোর অগাধ বাসনা
সমস্ত জগৎ করুক গ্রাস!
সমস্ত জগৎ ঘেরিয়া রাখ্রে
হৃদয়রে, তোর সুখের আশ।
সন্ন্যাসিনী তুই, কঁদিস্রে কেন?
কেন রে ফেলি দুখের শ্বাস?
গেছে ভেঙ্গে তোর একটি জগৎ
আরেক জগতে করিবি বাস।
সে জগৎ তোর তরে হয়নি রে
অদৃষ্টের ভুলে গেছিলি সেথা,
সেথায় আলয় খুঁজিয়া খুঁজিয়া
কতই না তুই পাইলি ব্যথা!
তোর নিজ দেশে এসেছিস্ এবে
কেহ নাই তোরে কহিতে কথা,
আদর কাহারো পাস্নে কখনো,
আদর কাহারো চাস্নে হেথা।
এখনো ত এই নূতন জীবনে
সুখ দুখ কিছু ঘটেনি তোর—
দিবসের পরে আসিছে দিবস
রজনীর পরে রজনী ভোর!
দিবস রজনী নীরব চরণে
যেমন যেতেছে তেমনি যাক্—
কাঁদিস্নে তুই, হাসিস্নে তুই
যেমন আছিস্ তেমনি থাক্।
সে জগতে ছিল কাহারো বা দুখ
কারো বা সুখের রাশি—
এ জগতে যত নিবাসী জনের
নাহিক রোদন হাসি!—
সকলেই চায় সকলের মুখে
শুধায় না কেহ কথা—
নাইক আলয়, চোলেছে সকলে
মন যার যায় যেথা!
সপ্তবিংশ সর্গ
সপ্তবিংশ সর্গ।
কবি।
মুরলারে—মুরলা, কোথায়?
দেশে দেশে ভ্রমিতেছি কোথায়—কোথায়?
সম্মুখে বিশাল মাঠ ধুধু কবিতেছে,
সে মাঠেতে অন্ধকার—বিস্তারিয়া বাহু তার—
ভূমিতে রাখিয়া মুখ কেঁদে মরিতেছে!
কোথা তুই—কোথা মুরলারে—
কোথা তুই গেলি বল্—শুধাইব কারে?
উদিল সন্ধ্যার তারা ওইরে গগনে!
ওই তারা কত দিন দেখেছি দুজনে!
তা’কি তোর মুরলারে মনে আর পড়েনারে?
সে সকল কথা তুই ভূলিলি কেমনে?
কত দিন—কত কথা—কত সে ঘটনা—
মনের ভিতরে কি রে আকুলি ওঠেনা?
তবে তুই কি পাষাণে বেঁধেছিলি হিয়া?
কেমনে কবিরে তোর গেলি তেয়াগিয়া?
বিজন আকাশে মোর ছিলিরে সতত
স্থির-জ্যোতি ওই সন্ধ্যা তারাটির মত;—
যদিবে মুহূর্ত্ত তরে আপনারে ভূলে
মেঘ খণ্ড রেখে থাকি এহৃদয়ে তুলে
তাই কিরে অভিমানে অস্ত যেতে হয়?
এ জনমে আর কিরে হবিনে উদয়?
আজ আমি লক্ষ্যহীন দিক্ হারাইয়া!
অসীম সংসারে কোথা বেড়াই ভাসিয়া!
দেখিতে যে পাবনাক’ তোরে একেবারে—
সে কথা পারিনে কভু মনে করিবারে!
শব্দ কোন শুনিলেই আপনারে ছলি—
মুদিয়া নয়ন দুটি মনে মনে বলি—
“যদি এই শব্দ তারি পদশব্দ হয়!
যদি খুলিলেই আঁখি—অমনি তাহারে দেখি!
সুমুখে সে মুখ আসি হয় রে উদয়।”
কোথায় মুরলা! দেখা দেরে একবার,
খুঁজিয়া বেড়াতে হবে কত দূর আর?
মুরলারে—মুরলা কোথায়!
একেলা ফেলিয়া মোরে গেলিরে কোথায়।
সপ্তম সর্গ
সপ্তম সর্গ।
অনিল, ললিতা।
অনিল।—(গাহিতে গাহিতে)
কাছে তার যাই যদি কত যেন পায় নিধি,
তবু হরষের হাসি ফুটে ফুটে ফুটেনা!
কখনো বা মৃদু হেসে আদর করিতে এসে
সহসা সরমে বাধে মন উঠে উঠে না!
রোষের ছলনা করি দূরে যাই, চাই ফিরি,
চরণ বারণ তরে উঠে উঠে উঠে না;
কাতর নিশ্বাস ফেলি, আকুল নয়ন মেলি
চাহি থাকে, লাজ বাঁধ তবু টুটে টুটে না!
যখন ঘুমায়ে থাকি মুখ পানে মেলি আঁখি
চাহি থাকে, দেখি দেখি সাধ যেন মিটেনা,
সহসা উঠিলে জাগি, তখন কিসের লাগি
সরমেতে ম’রে গিয়ে কথা যেন ফটে না।
লাজময়ি! তোর চেয়ে দেখিনি লাজুক মেয়ে,
প্রেম বরিষার স্রোতে লাজ তবু টুটেনা!
ললিতা।—(স্বগত)
পাষাণে বাঁধিয়া মন আজ কোরেছিনু পণ
কাছে যাব—কথা কব-যাচিব আদর আজ!
ওরে মন, ওরে মন, কার কাছে তোর লাজ?
আপনার চেয়ে যারে কোরেছিস্ আপনার
তার কাছে বল দেখি কিসের সরম আর?
অনিল।—ফুল তুলিবার ছলে ওই সে ললিতা আসে,
মনে মনে জানা আছে এলেই আমার কাছে
অমন হাতটি ধরি বসাব’ আমার পাশে।
অন্য দিক পানে আমি চাহিয়া রহিব আজ,
দেখিব কেমন করি কোথা তার থাকে লাজ?
ললিতা।—(ফুল তুলিতে তুলিতে
না-হয় বসিনু কাছে— কি তাহাতে দোষ আছে?
বসিব নাথের পাশে তাহাতে কি আসে যায়?
আর, লজ্জা—লজ্জা নয়–লজ্জারে করিব জয়—
না হয় বসিনু কাছে কিসের সরম তার!
কোথা লজ্জা—লজ্জা কোথা? এইত বসিনু হেথা—
এইত করিনু জয়, এইত বসিনু কাছে—
বসিব নাথের পাশে কি তাহাতে দোষ আছে?
এখনো—এখনো মোরে দেখিতে পান নি তবে—
তবে কিগো আরো কাছে—আরো কাছে যেতে হবে?
আর নয়—আরো কাছে যাইব কেমন কোরে?
হেথা তবে বোসে থাকি, মালা গুলি গেঁথে রাখি
এখনি ভাবনা ভাঙ্গি দেখিতে পাইবে মোরে!
যদিবা দেখিতে পায় কি তবে করিবে মনে?
যদিগো বুঝিতে পারে দেখিতে এসেছি তারে,
মিছে মালা গাঁথা হলে বোসে আছি এই খানে?
অনিল।—এই যে ললিতা হােথা—ফুরালো কি মালা গাঁথা?
আরেকটু এসে না হয় গাঁথিতে মালা!
এই হেথা কাছে আয়—কিসের সরম তায়?
কেমন গাঁথিলি ফুল একবার দেখি বালা!
আদরিণী—আদরিণী—দেখি হাতখানি তোর,
এমনি করিয়া সখি বাঁধ্লো হৃদয় মোর!
একবার দেখি সখি, কাছে আন্ মুখখানি,
এমনি করিয়া রাখ্ বুকের মাঝারে আনি!
কেন, লাজ এত কেন—আঁখি দুটি নত কেন?
কি কোরেছি? একটি শুধু চুম্বন বইত নয়!
আরেকটি এই লও—আরেকটি এই লও—
আর নয় করিব না বড় যদি লাজ হয়!
না হয় কুন্তল দিয়ে ঢেকে দিই মুখ খানি!
দেখিতে আনন তোর ওই চন্দ্র ভাবে—ভোর
এক দৃষ্টে চেয়ে, সখি, রোয়েছে অবাক্ মানি!
ওই দেখ্ তারা গুলি সহস্র নয়ন খুলি
ওই মুখটির তরে খুঁজিছে সমস্ত ধরা,
উচিত কি সখি তাদের নিরাশ করা?
নয়নে নয়ন রাখি একবার মেল আঁখি,
মিশাও কপোলে মোর ললিত কপোল তব;
কথা কও কানে কানে—মৃদু প্রণয়ের গানে
জাগাও ঘুমন্ত হৃদে সুখ-স্বপ্ন নব নব!
মনে আছে সেই রাত্রে কত সাধনার পরে
একটি সঙ্গীত, সখি, গিয়াছিলে গাহিবারে,
আরম্ভ কোরেই সবে অমনি থামালে গীত,
নিজের কণ্ঠের স্বরে নিজে হোয়ে সচকিত!
সেই কাজের কথা এখনো রোয়েছে কানে,
সেই আরম্ভের সুর এখনো বাজিছে প্রাণে!
সে আরম্ভ শেষ, বালা, আজিকে করতে চাই।
বড় কি হোতেছে লাজ? ভাল সখি কাজ নাই!
ললিতা।—(স্বগত)
কি কহিব? বড়, সখা, মনে মনে পাই ব্যথা,
না জানি গাহিতে গান, না জানি কহিতে কথা!
কত আজ বেছে বেছে তুলেছি কুসুম-ভার,
কতখণ হোতে আজ ভেবেছি ভুলিয়া লাজ
নিশ্চয় এ ফুল গুলি দিব তাঁরে উপহার!
হাতটি এগিয়ে আজ গিয়েছিনু কতবার,
অমনি পিছনে হাত লইয়াছি শতবার;
সহস্র হউক লাজ, এ কুসুম গুলি আজ
নিশ্চয় দিবগো তাঁরে না হবে অন্যথা তার!
কিন্তু কি বলিয়া দিব?—কি কথা বলিতে হবে?
বলিব কি—“ফুল গুলি যতনে এনেছি তুলি
যদি গো গলায় পর’ মালা গেঁথে দিই তবে”?
ছি ছি গো বলি কি কোরে—সরমে যে যাব’ মোরে
নাইবা বলিনু কিছু, শুধু দিই উপহার,—
দিই তবে? দিই তবে?—দিই তবে এইবার?
দুর হোক্—কি করিব?—বড় যেগো লজ্জা করে!
থাক্গো এখন থাক্—দিব আরেকটু পরে।
অনিল।—কি হােয়েছে? দিতে কি লাে চাস্ ফুল-উপহার?
দে না লো গলায় গেঁথে, কিসের সরম তার?
একটি দাওত সখি, পরাই তোমার চুলে,
আর দুটি দাও সখি পরাইব কর্ণ-মূলে।
মোরে দাও সব গুলি গাঁথিব ফুলের বালা,
গলায় দুলায়ে দিব গাঁথিয়া চাঁপার মালা;
আসন রচিয়া দিব দিয়ে শত শতদল,
তা’ হেলে কি দিবি মোরে—বল্ সখি, বল্ বল—
যত গুলি ফুল গাঁথি যত তার দল আছে
ততেক চুম্বন আমি লইব তোমার কাছে;
যত দিন না পারিবি শুধিতে চুম্বন—ধার
এ ভুজে রহিবি বদ্ধ এই বক্ষ কারাগার!
দিবানিশি সজনি লো রেখে দেব চোখে চোখে,
বল্ তবে—ফুলসাজে সাজায়ে দেব কি তোকে?
বলিবি না? ভাল সখি দুইটি চুম্বন দাও—
না হয় একটি দিও, মহার্ঘ তেল কি তাও?
ললিতা।—(স্বগত)
আরেকটি বার সখা করগো চুম্বন মোরে,
আরেকটি বার সখা, রাখগো বুকেতে ধোরে!
জান’ আমি মুখ ফুটে সরমে বলিতে নারি,
তাই কি সহিতে হবে? এত শান্তি সখা তারি?
আদরে হৃদয়ে যদি রাখ’ এ মাথাটি মোর,
আদরে চুম’ গো যদি আঁখির পাতাটি মোর,
তাহাতে আমার, সখা, অসাধ কি হেতে পারে!
তবে কেন ব্যথা দিতে শুধাইছ বারে বারে?
আকুল ব্যাকুল হৃদি মিলিবারে তব পাশে
শতবার ধায়, সখা, শতবার ফিরে আসে!
দীন আপনারে হেরে এমন সে লাজ পায়
তোমায় কাছেতে সখা সঙ্কোচে না যেতে চায়,
সখা তারে ডেকে নাও—তুমি তারে ডেকে নাও,
তোমারি সে মুখ চেয়ে দাঁড়াইয়া একধার,
একটু আদর পেলে স্বর্গ হাতে পাবে তার!
অনিল।—ডুবিছে চতুর্থী চাঁদ বিপাশার নীরে,
আয় সখি, আয় মোরা ঘরে যাই ফিরে।
আঁধারে কানন-পথ দেখা নাহি যায়,
আয় তবে আরো কাছে—আরো কাছে আয়।
হাত খানি রাখ্ মোর হাতের উপর,
শ্রান্ত যদি হোস্ মোর কাঁধে দিস্ ভর।
দেখিস্, বাধে না যেন চরণ লতায়—
আঁচল না ছিঁড়ে যায় গাছের কাঁটায়!
চমকি উঠিলি কেন? কিছু নাই ভয়—
বাতাসের শব্দ শুধু, আর কিছু নয়!
এই দিকে পথ, বালা, এই দিকে আয়,
বাম পাশে বিপাশার স্রোত ব’হে যায়।
শ্রান্তি কি হতেছে বোধ? লজ্জা কেন প্রিয়ে?
বেষ্টন করনা মোর স্কন্ধ বাহ দিয়ে!
কিসের তরাস এত—ওকি বালা ওকি?
ঝরিয়া পড়েছে শুধু শুষ্ক পত্র সখি!
ওই গেল গেল চাঁদ ওই ডোবে ডোবে—
একটু জোছনা-রেখা এখনো যেতেছে দেখা,
আর নাই—আর নাই—ওই গেল ডুবে!