PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৯১৩

গীতাঞ্জলি (১৯১৩)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১৩

প্রকাশনা-তথ্য

গীতাঞ্জলি

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

তৃতীয় সংস্করণ

ইণ্ডিয়ান প্রেস, এলাহাবাদ

১৩২০

মূল্য ১৲ এক টাকা

প্রকাশক- শ্রীসতীশচন্দ্র মিত্র

এলাহাবাদ-ইণ্ডিয়ান্‌ প্রেস্‌

ইণ্ডিয়ান্‌ পাব্‌লিশিং হাউস

কলিকাতা

এলাহাবাদ,‘ইণ্ডিয়ান প্রেসে’ শ্রীঅপূর্ব্বকৃষ্ণ বসু দ্বারা মুদ্রিত।

বিজ্ঞাপন

এই গ্রন্থের প্রথম কয়েকটি গান পূর্ব্বে অন্য দুই একটি পুস্তকে প্রকাশিত হইয়াছে।

কিন্তু অল্প সময়ের ব্যবধানে যে সমন্ত গান পরে পরে রচিত হইয়াছে তাহাদের পরস্পরের মধ্যে একটি ভাবের ঐক্য থাকা সম্ভবপর মনে করিয়া তাদের সকলগুলিই এই পুস্তকে একত্রে বাহির করা হইল।

শান্তিনিকেতন, বোলপুর

৩১শে শ্রাবণ, ১৩১৭ শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

সূচী

আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার

চরণ-ধূলার তলে।

সকল অহঙ্কার হে আমার

ডুবাও চোখের জলে।

নিজেরে করিতে গৌরব দান,

নিজেরে কেবলি করি অপমান,

আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া

ঘুরে মরি পলে পলে।

সকল অহঙ্কার হে আমার

ডুবাও চোখের জলে।

আমারে না যেন করি প্রচার

আমার আপন কাজে;

তোমারি ইচ্ছা কর হে পূর্ণ

আমার জীবন মাঝে।

যাচি হে তোমার চরম শান্তি,

পরাণে তোমার পরম কান্তি,

আমারে আড়াল করিয়া দাঁড়াও

হৃদয়-পদ্ম-দলে।

সকল অহঙ্কার হে আমার

ডুবাও চোখের জলে।

১৩১৩

আমি বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই

বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে!

এ কৃপা কঠোর সঞ্চিত মোর

জীবন ভরে’।

না চাহিতে মোরে যা করেছ দান,

আকাশ আলোক তনু মন প্রাণ,

দিনে দিনে তুমি নিতেছ আমায়

সে মহা দানেরই যোগ্য করে,

অতি ইচ্ছার সঙ্কট হ’তে

বাঁচায়ে মোরে!

আমি কখনো বা ভুলি, কখনো বা চলি,

তোমার পথের লক্ষ্য ধরে;

তুমি নিষ্ঠুর সম্মুখ হতে

যাও যে সরে!

এ যে তব দয়া জানি জানি হায়,

নিতে চাও বলে ফিরাও আমায়

পূর্ণ করিয়া লবে এ জীবন

তবে মিলনেরই যোগ্য করে,

আধা-ইচ্ছার সঙ্কট হ’তে

বাঁচায়ে মোরে!

১৩১৩

কত অজানারে জানাইলে তুমি,

কত ঘরে দিলে ঠাঁই,

দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,

পরকে করিলে ভাই।

পুরানো আবাস ছেড়ে যাই যবে,

মনে ভেবে মরি কি জানি কি হবে,

নূতনের মাঝে তুমি পুরাতন,

সে কথা যে ভুলে যাই।

দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,

পরকে করিলে ভাই।

জীবনে মরণে নিখিল ভুবনে,

যখনি যেখানে লবে,

চির জনমের পরিচিত ওহে

তুমিই চিনাবে সবে।

তোমারে জানিলে নাহি কেহ পর

নাহি কোনো মানা, নাহি কোনো ডর,

সবারে মিলায়ে তুমি জাগিতেছ

দেখা যেন সদা পাই!

দূরকে করিলে নিকট, বন্ধু,

পরকে করিলে ভাই।

১৩১৩

বিপদে মোরে রক্ষা কর,

এ নহে মোর প্রার্থনা,

বিপদে আমি না যেন করি ভয়।

দুঃখ-তাপে ব্যথিত চিতে

নাই বা দিলে সান্ত্বনা,

দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।

সহায় মোর না যদি জুটে

নিজের বল না যেন টুটে,

সংসারেতে ঘটিলে ক্ষতি

লভিলে শুধু বঞ্চনা

নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।

আমারে তুমি করিবে ত্রাণ

এ নহে মোর প্রার্থনা,

তরিতে পারি শকতি যেন রয়।

আমার ভার লাঘব করি

নাই বা দিলে সান্ত্বনা,

বহিতে পারি এমনি যেন হয়।

নম্র শিরে সুখের দিনে

তোমারি মুখ লইব চিনে,

দুঃখের রাতে নিখিল ধরা

যে দিন করে বঞ্চনা

তোমারে যেন না করি সংশয়।

১৩১৩

অন্তর মম বিকশিত কর

অন্তরতর হে।

নির্ম্মল কর, উজ্জ্বল কর

সুন্দর কর হে।

জাগ্রত কর, উদ্যত কর,

নির্ভয় কর হে।

মঙ্গল কর, নিরলস নিসংশয় কর হে।

অন্তর মম বিকশিত কর

অন্তরতর হে।

যুক্ত কর হে সবার সঙ্গে,

মুক্ত কর হে বন্ধ,

সঞ্চার কর সকল কর্ম্মে

শান্ত তোমার ছন্দ।

চরণপদ্মে মম চিত নিঃস্পন্দিত কর হে,

নন্দিত কর, নন্দিত কর

নন্দিত কর হে।

অন্তর মম বিকশিত কর

অন্তরতর হে!

২৭ অগ্রহায়ণ ১৩১৪

প্রেমে প্রাণে গানে গন্ধে আলোকে পুলকে

প্লাবিত করিয়া নিখিল দ্যুলোক ভূলোকে

তোমার অমল অমৃত পড়িছে ঝরিয়া।

দিকে দিকে আজি টুটিয়া সকল বন্ধ

মুরতি ধরিয়া জাগিয়া উঠে আনন্দ,

জীবন উঠিল নিবিড় সুধায় ভরিয়া

চেতনা আমার কল্যাণ-রস-সরসে

শতদল সম ফুটিল পরম হরষে

সব মধু তার চরণে তোমার ধরিয়া।

নীরব আলোকে জাগিয়া হৃদয় প্রান্তে

উদার ঊষার উদয়-অরুণ-কান্তি,

অলস আঁখির আবরণ গেল সরিয়া।

অগ্রহায়ণ ১৩১৪

তুমি নব নব রূপে এস প্রাণে

এস গন্ধে বরণে, এস গানে।

এস অঙ্গে পুলকময় পরশে,

এস চিত্তে সুধাময় হরষে,

এস মুগ্ধ মুদিত দুনয়ানে

তুমি নব নব রূপে এস প্রাণে

এস নির্ম্মল উজ্জ্বল কান্ত,

এস সুন্দর স্নিগ্ধ প্রশান্ত,

এস এসহে বিচিত্র বিধানে।

এস দুঃখ সুখে এস মর্ম্মে,

এস নিত্য নিত্য সব কর্ম্মে;

এল সকল কর্ম্ম অবসানে।

তুমি নব নব রূপে এস প্রাণে।

অগ্রহায়ণ ১৩১৪

আজ ধানের ক্ষেতে রৌদ্র ছায়ায়

লুকোচুরি খেলা।

নীল আকাশে কে ভাসালে

শাদা মেঘের ভেলা।

আজ ভ্রমর ভোলে মধু খেতে

উড়ে বেড়ায় আলোয় মেতে;

আজ কিসের তরে নদীর চরে

চখাচখির মেলা।

ওরে যাব না আজ ঘরে রে ভাই

যাব না আজ ঘরে,

ওরে আকাশ ভেঙে বাহিরকে আজ

নেব রে লুঠ করে।

যেন জোয়ার জলে ফেনার রাশি

বাতাসে আজ ছুটচে হাসি,

আজ বিনা কাজে বাজিয়ে বাঁশি

কাটবে সকল বেলা।

আনন্দেরি সাগর থেকে

এসেছে আজ বান।

দাঁড় ধরে আজ বস্ রে সবাই,

টান্‌ রে সবাই টান্‌।

বোঝা যত বোঝাই করি

করবরে পার দুখের তরী,

ঢেউয়ের পরে ধরব পাড়ি

যায় যদি যাক্‌ প্রাণ।

আনন্দেরি সাগর থেকে

এসেছে আজ বান।

কে ডাকে রে পিছন হতে

কে করে রে মানা,

ভয়ের কথা কে বলে আজ

ভয় আছে সব জানা।

কোন্‌ শাপে কোন্‌ গ্রহের দোষে

সুখের ডাঙায় থাকব বসে,

পালের রসি ধরব কসি

চলব গেয়ে গান৷

আনন্দেরি সাগর থেকে

এসেছে আজ বান।

১৩১৪

১০

১০

তোমার সোনার থালায় সাজাব আজ

দুখের অশ্রুধার।

জননী গো, গাঁথব তোমার

গলার মুক্তাহার।

চন্দ্রসূর্য্য পায়ের কাছে

মালা হয়ে জড়িয়ে আছে,

তোমার বুকে শোভা পাবে আমার

দুখের অলঙ্কার!

ধন ধান্য তোমারি ধন,

কি করবে তা কও!

দিতে চাও ত দিও আমায়

নিতে চাও ত লও!

দুঃখ আমার ঘরের জিনিষ

খাঁটি রতন তুই ত চিনিস্,

তোর প্রসাদ দিয়ে তারে কিনিস্‌,

এ মোর অহঙ্কার।

১১

আমরা বেঁধেছি কাশের গুচ্ছ, আমরা

গেঁথেছি শেফালি-মালা।

নবীন ধানের মঞ্জরী দিয়ে

সাজিয়ে এনেছি ডালা।

এসগো শারদলক্ষ্মী, তোমার

শুভ্র মেঘের রথে,

এস নির্ম্মল নীল পথে,

এস ধৌত শ্যামল

আলো-ঝলমল

বনগিরি পর্ব্বতে,

এস মুকুটে পরিয়া শ্বেত শতদল

শীতল শিশির-ঢালা।

ঝরা মালতীর ফুলে

আসন-বিছানো নিভৃত কুঞ্জে

ভরা গঙ্গার কূলে,

ফিরিছে মরাল ডানা পাতিবারে

তোমার চরণমূলে।

গুঞ্জরতান তুলিয়ো তোমার

সোনার বীণার তারে

মৃদু মধু ঝঙ্কারে,

হাসিঢালা সুর গলিয়া পড়িবে

ক্ষণিক অশ্রুধারে।

রহিয়া রহিয়া যে পরশমণি

ঝলকে অলককোণে,

পলকের তরে সকরুণ করে

বুলায়ো বুলায়ো মনে!

সোনা হয়ে যাবে সকল ভাবনা,

আঁধার হইবে আলা।

১৩১৪

১২

লেগেছে অমল ধবল পালে

মন্দ মধুর হাওয়া।

দেখি নাই কভু দেখি নাই

এমন তরণী বাওয়া।

কোন্‌ সাগরের পার হতে আনে

কোন্‌ সুদূরের ধন।

ভেসে যেতে চায় মন,

ফেলে যেতে চায় এই কিনারায়

সব চাওয়া সব পাওয়া।

পিছনে ঝরিছে ঝর ঝর জল

গুরু গুরু দেয়া ডাকে,

মুখে এসে পড়ে অরুণ কিরণ

ছিন্ন মেঘের ফাঁকে।

ওগো কাণ্ডারী, কেগো তুমি, কার

হাসিকান্নার ধন।

ভেবে মরে মোর মন

কোন্‌ সুরে আজ বাঁধিবে যন্ত্র

কি মন্ত্র হবে গাওয়া।

১৩

১৩

আমার নয়ন-ভুলানো এলে।

আমি কি হেরিলাম হৃদয় মেলে।

শিউলিতলার পাশে পাশে,

ঝরা ফুলের রাশে রাশে,

শিশির-ভেজা ঘাসে ঘাসে

অরুণরাঙা চরণ ফেলে

নয়ন-ভুলানো এলে।

আলোছায়ার আঁচলখানি

লুটিয়ে পড়ে বনে বনে,

ফুলগুলি ঐ মুখে চেয়ে

কি কথা কয় মনে মনে।

তোমায় মোরা করব বরণ,

মুখের ঢাকা কর হরণ,

ঐটুকু ঐ মেঘাবরণ

দু হাত দিয়ে ফেল ঠেলে।

নয়ন-ভুলানো এলে।

বনদেবীর দ্বারে দ্বারে

শুনি গভীর শঙ্খধ্বনি,

আকাশবীণার তারে তারে

জাগে তোমার আগমনী।

কোথায় সোনার নূপুর বাজে,

বুঝি আমার হিয়ার মাঝে,

সকল ভাবে, সকল কাজে

পাষাণ-গালা সুধা ঢেলে—

নয়ন-ভুলানো এলে!

১৩১৪

১৪

১৪

জননী, তোমার করুণ চরণখানি

হেরিনু আজি এ অরুণ-কিরণ রূপে।

জননী, তোমার মরণহরণ বাণী

নীরব গগনে ভরি উঠে চুপে চুপে।

তোমারে নমি হে সকল ভুবন মাঝে,

তোমারে নমি হে সকল জীবন কাজে;

তনু মন ধন করি নিবেদন আজি

ভক্তি পাবন তোমার পূজার ধূপে।

জননী, তোমার করুণ চরণখানি

হেরিনু আজি হে অরুণ-কিরণ রূপে।

১৩১৫

১৫

১৫

বাঁচান বাঁচি মারেন মরি।

বল ভাই ধন্য হরি।

ধন্য হরি ভবের নাটে,

ধন্য হরি রাজ্য পাটে,

ধন্য হরি শ্মশান ঘাটে

ধন্য হরি ধন্য হরি।

সুধা দিয়ে মাতান যখন

ধন্য হরি ধন্য হরি,

ব্যথা দিয়ে কাঁদান যখন

ধন্য হরি ধন্য হরি।

আত্মজনের কোলে বুকে

ধন্য হরি হাসি মুখে,

ছাই দিয়ে সব ঘরের সুখে

ধন্য হরি ধন্য হরি।

আপনি কাছে আসেন হেসে

ধন্য হরি ধন্য হরি,

ফিরিয়ে বেড়ান দেশে দেশে

ধন্য হরি ধন্য হরি।

ধন্য হরি স্থলে জলে,

ধন্য হরি ফুলে ফলে,

ধন্য হৃদয়-পদ্মদলে

চরণ আলোয় ধন্য করি।

১১ চৈত্র ১৩১৫

১৬

১৬

জগৎ জুড়ে উদার সুরে

আনন্দ গান বাজে,

সে গান কবে গভীর রবে

বাজিবে হিয়া মাঝে?

বাতাস জল আকাশ আলো

সবারে কবে বাসিব ভালো,

হৃদয়-সভা জুড়িয়া তারা

বসিবে নানা সাজে।

নয়ন দুটি মেলিলে কবে

পরাণ হবে খুসি,

যে পথ দিয়া চলিয়া যাব

সবারে যাব তুষি।

রয়েছ তুমি এ কথা কবে

জীবন মাঝে সহজ হবে,

আপনি কবে তোমারি নাম

ধ্বনিবে সব কাজে।

আষাঢ় ১৩১৬

১৭

১৭

মেঘের পরে মেঘ জমেছে,

আঁধার করে আসে,

আমায় কেন বসিয়ে রাখ

একা দ্বারের পাশে।

কাজের দিনে নানা কাজে

থাকি নানা লোকের মাঝে

আজ আমি যে বসে আছি

তোমারি আশ্বাসে

আমায় কেন বসিয়ে রাখ

একা দ্বারের পাশে।

তুমি যদি না দেখা দাও

কর আমায় হেলা,

কেমন করে কাটে আমার

এমন বাদল বেলা।

দূরের পানে মেলে আঁখি

কেবল আমি চেয়ে থাকি

পরাণ আমার কেঁদে বেড়ায়

দুরন্ত বাতাসে।

আমায় কেন বসিয়ে রাখ

একা দ্বারের পাশে।

আষাঢ় ১৩১৬

১৮

১৮

কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো!

বিরহানলে জ্বালোরে তীরে জ্বালো।

রয়েছে দীপ না আছে শিখা

এই কি ভালে ছিলরে লিখা!

ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো।

বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো।

বেদনা দূতী গাহিছে “ওরে প্রাণ,

তোমার লাগি জাগেন ভগবান!

নিশীথে ঘন অন্ধকারে

ডাকেন তোরে প্রেমাভিসারে,

দুঃখ দিয়ে রাখেন তোর মান।

তোমার লাগি জাগেন ভগবান।

গগনতল গিয়েছে মেঘে ভরি,

বাদল জল পড়িছে ঝরি ঝরি।

এ ঘোর রাতে কিসের লাগি

পরাণ মম সহসা জাগি

এমন কেন করিছে মরি মরি।

বাদল জল পড়িছে ঝরি ঝরি।

বিজুলি শুধু ক্ষণিক আভা হানে,

নিবিড়তর তিমির চোখে আনে

জানিনা কোথা অনেক দূরে

বাজিল গান গভীর সুরে,

সকল প্রাণ টানিছে পথ পানে;

নিবিড়তর তিমির চোখে আনে।

কোথায় আলো কোথায় ওরে আলো।

বিরহানলে জ্বালরে তারে জ্বালো।

ডাকিছে মেঘ, হাঁকিছে হাওয়া,

সময় গেলে হবেনা যাওয়া,

নিবিড় নিশা নিকষ-ঘন কালো।

পরাণ দিয়ে প্রেমের দীপ জ্বালো।

আষাঢ় ১৩১৬

১৯

১৯

আজি শ্রাবণ-ঘন গহন-মোহে

গোপন তব চরণ ফেলে

নিশার মত নীরব ওহে

সবার দিঠি এড়ায়ে এলে।

প্রভাত আজি মুদেছে আঁখি,

বাতাস বৃথা যেতেছে ডাকি,

নিলাজ নীল আকাশ ঢাকি

নিবিড় মেঘ কে দিল মেলে!

কূজনহীন কাননভূমি,

দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে,

একেলা কোন্‌ পথিক তুমি

পথিকহীন পথের পরে!

হে একা সখা, হে প্রিয়তম,

রয়েছে খোলা এ ঘর মম,

সমুখ দিয়ে স্বপন সম

যেয়োনা মোরে হেলায় ঠেলে।

আষাঢ় ১৩১৬

২০

২০

আষাঢ় সন্ধ্যা ঘনিয়ে এল,

গেলরে দিন বয়ে।

বাঁধন-হারা বৃষ্টি ধারা

ঝরছে রয়ে রয়ে।

একলা বসে ঘরের কোণে

কি ভাবি যে আপন মনে,

সজল হাওয়া যূথীর বনে

কি কথা যায় কয়ে!

বাঁধন-হারা বৃষ্টিধারা

ঝরছে রয়ে রয়ে।

হৃদয়ে আজ ঢেউ দিয়েছে

খুঁজে না পাই কুল;

সৌরভে প্রাণ কাঁদিয়ে তুলে

ভিজে বনের ফুল।

আঁধার রাতে প্রহরগুলি

কোন্‌ সুরে আজ ভরিয়ে তুলি,

কোন্‌ ভুলে আজ সকল ভুলি

আছি আকুল হয়ে!

বাঁধন-হারা বৃষ্টি ধারা

ঝরছে রয়ে রয়ে!

আষাঢ় ১৩১৬

২১

২১

আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার

পরাণসখা বন্ধু হে আমার।

আকাশ কাঁদে হতাশ সম,

নাই যে ঘুম নয়নে মম,

দুয়ার খুলি, হে প্রিয়তম,

চাই যে বারে বার।

পরাণসখা বন্ধু হে আমার!

বাহিরে কিছু দেখিতে নাহি পাই,

তোমার পথ কোথায় ভাবি তাই।

সুদূর কোন্ নদীর পারে,

গহন কোন্ বনের ধারে,

গভীর কোন্ অন্ধকারে

হতেছ তুমি পার,

পরাণসখা বন্ধু হে আমার!

আষাঢ় ১৩১৬

২২

২২

জানি জানি কোন আদি কাল হতে

ভাসালে আমারে জীবনের স্রোতে,

সহসা হে প্রিয় কত গৃহে পথে

রেখে গেছ প্রাণে কত হরষণ।

কতবার তুমি মেঘের আড়ালে

এমনি মধুর হাসিয়া দাঁড়ালে,

অরুণ কিরণে চরণ বাড়ালে,

ললাটে রাখিলে শুভ পরশন।

সঞ্চিত হয়ে আছে এই চোখে

কত কালে কালে কত লোকে লোকে

কত নব নব আলোকে আলোকে

অরূপের কত রূপ দরশন।

কত যুগে যুগে কেহ নাহি জানে

ভরিয়া ভরিয়া উঠেছে পরাণে

কত সুখে দুখে কত প্রেমে গানে

অমৃতের কত রস বরষণ।

১০ ভাদ্র ১৩১৬

২৩

২৩

তুমি কেমন করে গান কর হে গুণী

অবাক হয়ে শুনি, কেবল শুনি।

সুরের আলো ভুবন ফেলে ছেয়ে,

সুরের হাওয়া চলে গগন বেয়ে,

পাষাণ টুটে ব্যাকুল বেগে ধেয়ে

বহিয়া যায় সুরের সুরধুনী।

মনে করি অম্‌নি সুরে গাই,

কণ্ঠে আমার সুর খুঁজে না পাই।

কইতে কি চাই, কইতে কথা বাধে;

হার মেনে যে পরাণ আমার কাঁদে,

আমায় তুমি ফেলেছ কোন ফাঁদে

চৌদিকে মোর সুরের জাল বুনি।

১০ ভাদ্র ১৩১৬

২৪

অমন আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে

চল্‌বেনা।

এবার হৃদয় মাঝে লুকিয়ে বোসো

কেউ জানবেনা কেউ বলবেনা।

বিশ্বে তোমার লুকোচুরি,

দেশ বিদেশে কতই ঘুরি,

এবার বল আমার মনের কোণে

দেবে ধরা, ছলবেনা!

আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে

চল্‌বে না।

জানি আমার কঠিন হৃদয়

চরণ রাখার যোগ্য সে নয়,

সখা তোমার হাওয়া লাগলে হিয়ায়

তবু কি প্রাণ গলবেনা?

না হয় আমার নাই সাধনা!

ঝরলে তোমার কৃপার কণা

তখন নিমেষে কি ফুটবেনা ফুল

চকিতে ফল ফল্‌বেনা?

আড়াল দিয়ে লুকিয়ে গেলে

চলবেনা।

১১ ভাদ্র ১৩১৬

২৫

২৫

যদি তোমার দেখা না পাই প্রভু

এবার এ জীবনে,

তবে তোমায় আমি পাইনি যেন

সে কথা রয় মনে।

যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই,

শয়নে স্বপনে।

এ সংসারের হাটে

আমার যতই দিবস কাটে,

আমার যতই দুহাত ভরে ওঠে ধনে

তবু কিছুই আমি পাইনি যেন

সে কথা রয় মনে,

যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

শয়নে স্বপনে।

যদি আলস ভরে

আমি যদি পথের পরে,

যদি ধূলায় শয়ন পাতি সযতনে,

যেন সকল পথই বাকি আছে

সে কথা রয় মনে,

যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

শয়নে স্বপনে।

যতই উঠে হাসি,

ঘরে যতই বাজে বাঁশি,

ওগো যতই গৃহ সাজাই আয়োজনে,

যেন তোমায় ঘরে হয়নি আনা,

সে কথা রয় মনে

যেন ভুলে না যাই, বেদনা পাই

শয়নে স্বপনে।

২৬

২৬

হেরি অহরহ তোমারি বিরহ

ভুবনে ভুবনে রাজে হে।

কত রূপ ধরে কাননে ভূধরে

আকাশে সাগরে সাজে হে।

সারা নিশি ধরি তারায় তারায়

অনিমেষ চোখে নীরবে দাঁড়ায়,

পল্লবদলে শ্রাবণ ধারায়

তোমার বিরহ বাজে হে।

ঘরে ঘরে আজি কত বেদনায়

তোমারি গভীর বিরহ ঘনায়,

কত প্রেমে হায় কত বাসনায়

কত সুখে দুখে কাজে হে।

সকল জীবন উদাস করিয়া

কত গানে সুরে লাগিয়া ঝরিয়া

তোমার বিরহ উঠেছে ভরিয়া

আমার বিরহ মাঝে হে।

২৭

২৭

আর নাই রে বেলা, নামল ছায়া

ধরণীতে,

এখন চলরে ঘাটে কলসখানি

ভরে নিতে।

জলধারার কলস্বরে

সন্ধ্যাগগন আকুল করে,

ওরে ডাকে আমায় পথের পরে

সেই ধ্বনিতে।

চল্‌রে ঘাটে কলসখানি

ভরে নিতে।

এখন বিজন পথে করে না কেউ

আসা-যাওয়া,

ওরে প্রেম-নদীতে উঠেছে ঢেউ,

উতল হাওয়া।

জানি নে আর ফিরব কিনা,

কার সাথে আজ হবে চিনা,

ঘাটে সেই অজানা বাজায় বীণা

তরণীতে।

চল্‌ রে ঘাটে কলসখানি

ভরে নিতে।

১৩ ভাদ্র ১৩১৬

২৮

২৮

আজ বারি ঝরে ঝর ঝর

ভরা বাদরে।

আকাশ-ভাঙা আকুল ধারা

কোথাও না ধরে।

শালের বনে থেকে থেকে

ঝড় দোলা দেয় হেঁকে হেঁকে,

জল ছুটে যায় এঁকে বেঁকে

মাঠের পরে।

আজ মেঘের জটা উড়িয়ে দিয়ে

নৃত্য কে করে।

ওরে বৃষ্টিতে মোর ছুটেছে মন,

লুটেছে ওই ঝড়ে,

বুক ছাপিয়ে তরঙ্গ মোর

কাহার পায়ে পড়ে!

অন্তরে আজ কী কলরোল,

দ্বারে দ্বারে ভাঙল আগল,

হৃদয়-মাঝে জাগল পাগল

আজি ভাদরে!

আজি এমন করে কে মেতেছে

বাহিরে ঘরে!

১০ ভাদ্র ১৩১৬

২৯

২৯

প্রভু তোমা লাগি আঁখি জাগে;

দেখা নাই পাই

পথ চাই,

সেও মনে ভালো লাগে।

ধূলাতে বসিয়া দ্বারে

ভিখারী হৃদয় তারে

তোমারি করুণা মাগে!

কৃপা নাই পাই

শুধু চাই,

সেও মনে ভালো লাগে।

আজি এ জগত মাঝে

কত মুখে কত কাজে

চলে গেল সবে আগে।

সাথী নাই পাই

তোমায় চাই।

সেও মনে ভালো লাগে।

চারিদিকে সুধাভরা

ব্যাকুল শ্যামল ধরা

কাঁদায় রে অনুরাগে।

দেখা নাই পাই

ব্যথা পাই,

সেও মনে ভালো লাগে।

১৪ ভাদ্র ১৩১৬

৩০

৩০

ধনে জনে আছি জড়ায়ে হায়

তবু জান মন তোমারে চায়।

অন্তরে আছ হে অন্তর্যামী,

আমা চেয়ে আমায় জানিছ স্বামী,

সব সুখে দুখে ভুলে থাকায়

জান মম মন তোমারে চায়।

ছাড়িতে পারিনি অহঙ্কারে,

ঘুরে মরি শিরে বহিয়া তারে,

ছাড়িতে পারিলে বাঁচি যে হায়

তুমি জান, মন তোমারে চায়

যা আছে আমার সকলি কবে

নিজ হাতে তুমি তুলিয়া লবে।

সব ছেড়ে সব পাব তোমায়

মনে মনে মন তোমারে চায়।

১৫ ভাদ্র ১৩১৬

৩১

৩১

এই যে তোমার প্রেম ওগো

হৃদয়হরণ!

এই যে পাতায় আলো নাচে

সোনার বরণ।

এই যে মধুর আলস ভবে

মেঘ ভেসে যায় আকাশ পরে,

এই যে বাতাস দেহে করে

অমৃত ক্ষরণ।

এই ত তোমার প্রেম, ওগো

হৃদয়হরণ!

প্রভাত আলোর ধারায় আমার

নয়ন ভেসেছে!

এই তোমারি প্রেমের বাণী

প্রাণে এসেছে।

তোমারি মুখ ঐ নুয়েছে,

মুখে আমার চোখ থুয়েছে,

আমার হৃদয় আজ ছুঁয়েছে

তোমারি চরণ।

১৬ ভাদ্র ১৩১৬

৩২

৩২

আমি হেথায় থাকি শুধু

গাইতে তোমার গান,

দিয়ো তোমার জগৎ সভায়

এইটুকু মোর স্থান

আমি তোমার ভুবন মাঝে

লাগিনি নাথ কোন কাজে,

শুধু কেবল সুরে বাজে

অকাজের এই প্রাণ।

নিশায় নীরব দেবালয়ে

তোমার আরাধন,

তখন মোরে আদেশ কোরো

গাইতে হে রাজন!

ভোরে যখন আকাশ জুড়ে

বাজবে বীণা সোনার সুরে,

আমি যেন না রই দূরে

এই দিয়ো মোর মান।

১৬ ভাদ্র ১৩১৬

৩৩

৩৩

দাও হে আমার ভয় ভেঙে দাও।

আমার দিকে ও মুখ ফিরাও।

পাশে থেকে চিনতে নারি,

কোন্‌ দিকে যে কি নেহারি,

তুমি আমার হৃদ্‌বিহারী

হৃদয় পানে হাসিয়া চাও।

বল আমায় বল কথা

গায়ে আমার পরশ কর।

দক্ষিণ হাত বাড়িয়ে দিয়ে

আমায় তুমি তুলে ধর।

যা বুঝি সব ভুল বুঝি হে,

যা খুঁজি সব ভুল খুঁজি হে,

হাসি মিছে, কান্না মিছে

সাম্‌নে এসে এ ভুল ঘুচাও।

১৬ ভাদ্র ১৩১৬

৩৪

৩৪

আবার এরা ঘিরেছে মোর মন।

আবার চোখে নামে যে আবরণ।

আবার এ যে নানা কথাই জমে,

চিত্ত আমার নানা দিকেই ভ্রমে,

দাহ আবার বেড়ে ওঠে ক্রমে

আবার এ যে হারাই শ্রীচরণ।

তব নীরব বাণী হৃদয়তলে

ডোবেনা যেন লোকের কোলাহলে!

সবার মাঝে আমার সাথে থাক,

আমায় সদা তোমার মাঝে ঢাক,

নিয়ত মোর চেতনা পরে রাখ

আলোকে ভরা উদার ত্রিভুবন।

১৬ ভাদ্র ১৩১৬

৩৫

৩৫

আমার মিলন লাগি তুমি

আসচ কবে থেকে।

তোমার চন্দ্র সূর্য্য তোমায়

রাখবে কোথায় ঢেকে

কত কালের সকাল সাঁঝে,

তোমার চরণধ্বনি বাজে,

গোপনে দূত হৃদয় মাঝে

গেছে আমায় ডেকে।

ওগো পথিক আজকে আমার

সকল পরাণ ব্যেপে,

থেকে থেকে হরষ যেন

উঠচে কেঁপে কেঁপে।

যেন সময় এসেছে আজ,

ফুরালো মোর যা ছিল কাজ,

বাতাস আসে হে মহারাজ,

তোমার গন্ধ মেখে।

১৬ ভাদ্র ১৩১৬

৩৬

৩৬

এস হে এস সজল ঘন,

বাদল বরিষণে;

বিপুল তব শ্যামল স্নেহে

এস হে এ জীবনে।

এস হে গিরিশিখর চুমি,

ছায়ায় ঘিরি কানন ভূমি,

গগন ছেয়ে এস হে তুমি

গভীর গরজনে।

ব্যথিয়ে উঠে নীপের বন

পুলকভরা ফুলে।

উছলি উঠে কল রোদন

নদীর কূলে কূলে।

এস হে এস হৃদয়ভরা,

এস হে এস পিপাসাহরা,

এস হে আঁখি-শীতল-করা

ঘনায়ে এস মনে।

১৭ ভাদ্র ১৩১৬

৩৭

৩৭

পারবি না কি যোগ দিতে এই ছন্দেরে,

খসে যাবার ভেসে যাবার

ভাঙবারই আনন্দে রে!

পাতিয়া কান শুনিস না যে

দিকে দিকে গগন মাঝে

মরণ বীণায় কি সুর বাজে

তপন-তারা-চন্দ্রেরে

জ্বালিয়ে আগুন ধেয়ে ধেয়ে

জ্বলবারই আনন্দে রে!

পাগল-করা গানের তানে

ধায় যে কোথা কেই বা জানে,

চায় না ফিরে পিছন পানে

রয়না বাঁধা বন্ধেরে,

লুটে যাবার ছুটে যাবার

চলবারই আনন্দে রে।

সেই আনন্দ-চরণপাতে

ছয় ঋতু যে নৃত্যে মাতে,

প্লাবন বহে যায় ধরাতে

বরণ গীতে গন্ধেরে,

ফেলে দেবার ছেড়ে দেবার

মরবারই আনন্দে রে।

১৮ ভাদ্র ১৩১৬

৩৮

৩৮

নিশার স্বপন ছুটল রে, এই

ছুটল রে!

টুটল বাঁধন টুটল রে!

রইল না আর আড়াল প্রাণে,

বেরিয়ে এলেম জগৎ পানে,

হৃদয়-শতদলের সকল

দলগুলি এই ফুটল রে, এই

ফুটল রে!

দুয়ার আমার ভেঙে শেষে

দাড়ালে সেই আপনি এসে

নয়ন জলে ভেসে হৃদয়

চরণ-তলে লুটল রে

আকাশ হতে প্রভাত-আলো

আমার পানে হাত বাড়ালো,

ভাঙা-কারার দ্বারে আমার,

জয়ধ্বনি উঠল রে, এই

উঠল রে!

১৮ ভাদ্র ১৩১৬

৩৯

৩৯

শরতে আজ কোন অতিথি

এল প্রাণের দ্বারে!

আনন্দ গান গারে হৃদয়

আনন্দ গান গারে!

নীল আকাশের নীরব কথা,

শিশির-ভেজা ব্যাকুলতা,

বেজে উঠক আজি তোমার

বীণার তারে তারে।

শস্যক্ষেতের সোনার গানে

যোগ দেরে আজ সমান তানে,

ভাসিয়ে দে সুর ভরা নদীর

অমল জলধারে।

যে এসেছে তাহার মুখে

দেখরে চেয়ে গভীর সুখে

দুয়ার খুলে তাহার সাথে

বাহির হয়ে যারে।

১৮ ভাদ্র ১৩১৬

৪০

৪০

হেথা যে গান গাইতে আসা আমার

হয়নি সে গান গাওয়া,

আজো কেবলি সুর সাধা, আমার

কেবল গাইতে চাওয়া।

আমার লাগে নাই সে সুর, আমার

বাঁধে নাই সে কথা,

শুধু প্রাণেরই মাঝখানে আছে

গানের ব্যাকুলতা।

আজো ফোটে নাই সে ফুল, শুধু

বহেছে এক হাওয়া।

আমি দেখি নাই তার মুখ, আমি

শুনি নাই তার বাণী,

কেবল শুনি ক্ষণে ক্ষণে তাহার

পায়ের ধ্বনি খানি।

আমার দ্বারের সমুখ দিয়ে সেজন

করে আসা যাওয়া।

শুধু আসন পাতা হল আমার

সারাটি দিন ধরে,

ঘরে হয়নি প্রদীপ জ্বালা, তারে

ডাকব কেমন করে!

আছি পাবার আশা নিয়ে, তারে

হয়নি আমার পাওয়া।

২৭ ভাদ্র ১৩১৬

৪১

৪১

যা হারিয়ে যায় তা আগলে বসে

রইব কত আর।

আর পারিনে রাত জাগতে, হে নাথ,

ভাবতে অনিবার।

আাছি রাত্রি দিবস ধরে

দুয়ার আমার বন্ধ করে,

আসতে যে চায় সন্দেহে তায়

তাড়াই বারে বার।

তাইত কারো হয় না আসা

আমার একা ঘরে।

আনন্দময় ভুবন তোমার

বাইরে খেলা করে।

তুমিও বুঝি পথ নাহি পাও,

এসে এসে ফিরিয়া যাও,

রাখতে যা চাই রয়না তাও

ধূলায় একাকার।

১ আশ্বিন ১৩১৬

৪২

৪২

এই মলিন বস্ত্র ছাড়তে হবে,

হবে গো এইবার

আমার এই মলিন অহঙ্কার।

দিনের কাজে ধূলা লাগি

অনেক দাগে হল দাগী,

এমনি তপ্ত হয়ে আছে

সহ্য করা ভার

আমার এই মলিন অহঙ্কার।

এখন ত কাজ সাঙ্গ হল

দিনের অবসানে,

হল রে তাঁর আসার সময়

আশা হল প্রাণে।

স্নান করে আয় এখন তবে

প্রেমের বসন পরতে হবে,

সন্ধ্যাবনের কুসুম তুলে

গাঁথতে হবে হার,

ওরে আয় সময় নেই রে আর।

১৯ আশ্বিন ১৩১৬

৪৩

৪৩

গায়ে আমার পুলক লাগে,

চোখে ঘনায় ঘোর,

হৃদয়ে মোর কে বেঁধেছে

রাঙা রাখীর ডোর!

আজিকে এই আকাশ-তলে

জলে স্থলে ফুলে ফলে

কেমন করে মনোহরণ

ছড়ালে মন মোর!

কেমন খেলা হল আমার

আজি তোমার সনে!

পেয়েছি কি খুঁজে বেড়াই

ভেবে না পাই মনে!

আনন্দ আজ কিসের ছলে

কাঁদিতে চায় নয়ন জলে,

বিরহ আজ মধুর হয়ে

করেছে প্রাণ ভোর।

২৫ আশ্বিন ১৩১৬

৪৪

৪৪

প্রভু আজি তোমার দক্ষিণ হাত

রেখোনা ঢাকি!

এসেছি তোমারে, হে নাথ,

পরাতে রাখী।

যদি বাঁধি তোমার হাতে

পড়ব বাঁধা সবার সাথে,

যেখানে যে আছে, কেহই

রবে না বাকি!

আজি যেন ভেদ নাহি রয়

আপন পরে,

আমায় যেন এক দেখি হে

বাহিরে ঘরে।

তোমার সাথে যে বিচ্ছেদে

ঘুরে বেড়াই কেঁদে কেঁদে,

ক্ষণেক তরে ঘুচাতে তাই

তোমারে ডাকি।

২৭ আশ্বিন ১৩১৬

৪৫

৪৫

জগতে আনন্দ যজ্ঞে আমার নিমন্ত্রণ।

ধন্য হল ধন্য হল মানব-জীবন।

নয়ন আমার রূপের পুরে

সাধ মিটায়ে বেড়ায় ঘুরে,

শ্রবণ আমার গভীর সুরে

হয়েছে মগন।

তোমার যজ্ঞে দিয়েছ ভার

বাজাই আমি বাশি

গানে গানে গেঁথে বেড়াই

প্রাণের কান্না হাসি।

এখন সময় হয়েছে কি?

সভায় গিয়ে তোমায় দেখি

জয়ধ্বনি শুনিয়ে যাব

এ মোর নিবেদন

৩০ আশ্বিন ১৩১৬

৪৬

৪৬

আলোয় আলোকময় করেহে

এলে আলোর আলো।

আমার নয়ন হতে আঁধার

মিলালো মিলালো।

সকল আকাশ সকল ধরা

আনন্দে হাসিতে ভরা,

যে দিক পানে নয়ন মেলি

ভালো সবি ভালো।

তোমার আলো গাছের পাতায়

নাচিয়ে তোলে প্রাণ,

তোমার আলো পাখীর বাসায়

জাগিয়ে তোলে গান।

তোমার আলো ভালবেসে

পড়েছে মোর গায়ে এসে

হৃদয়ে মোর নির্ম্মল হাত

বুলালো বুলালো।

২০ আগ্রহায়ণ ১৩১৬

৪৭

৪৭

আসনতলের মাটির পরে লুটিয়ে রব।

তোমার চরণ-ধূলায় ধূলায় ধূসর হব।

কেন আমায় মান দিয়ে আর দূরে রাখো!

চিরজনম এমন করে ভুলিয়োনাক!

অসম্মানে আন টেনে পায়ে তব।

তোমার চরণ-ধূলায় ধূলায় ধূসর হব।

আমি তোমার যাত্রিদলের রব পিছে,

স্থান দিয়ো হে আমায় তুমি সবার নীচে।

প্রসাদ লাগি কত লোকে আসে ধেয়ে

আমি কিছুই চাইব না ত রইব চেয়ে;

সবার শেষে বাকি যা রয় তাহাই লব!

তোমার চরণ-ধূলায় ধূলায় ধূসর হব।

১০ পৌষ ১৩১৬

৪৮

৪৮

রূপসাগরে ডুব দিয়েছি

অরূপ রতন আশা করি;

বাটে ঘাটে ঘুরবনা আর

ভাসিয়ে আমার জীর্ণ তরী।

সময় যেন হয়রে এবার

ঢেউ গাওয়া সব চুকিয়ে দেবার,

সুধায় এবার তলিয়ে গিয়ে

অমর হয়ে রব মরি।

যে গান কানে যায়না শোনা

সে গান যেথায় নিত্য বাজে

প্রাণের বীণা নিয়ে যাবো

সেই অতলের সভা মাঝে।

চিরদিনের সুরটি বেঁধে

শেষ গানে তার কান্না কেঁদে,

নীরব যিনি তাঁহার পায়ে

নীরব বীণা দিব ধরি

১২ পৌষ ১৩১৬

৪৯

দশদিকেতে আঁচল পেতে

কোল দিয়েছে মাটি।

রয়েছে জীব যে যেখানে

সকলকে সে ডেকে আনে,

সবার হাতে সবার পাতে

অন্ন দেয় সে বাঁটি।

ভরেছে মন গীতে গন্ধে,

বসে আছি মহানন্দে,

আমায় ঘিরে আঁচল পেতে

কোল দিয়েছে মাটি।

আলো, তোমায় নমি, আমার

মিলাক অপরাধ।

ললাটেতে রাখ আমার

পিতার আশীর্ব্বাদ।

বাতাস তোমায় নমি,আমার

ঘুচুক অবসাদ,

সকল দেহে বুলায়ে দাও

পিতার আশীর্ব্বাদ।

মাটি তোমায় নমি, আমার

মিটুক সর্ব্বসাধ।

গৃহ ভরে ফলিয়ে তোলো

পিতার আশীর্ব্বাদ।

পৌষ ১৩১৬

৫০

৫০

হেথায় তিনি কোল পেতেছেন

আমাদের এই ঘরে

আসনটি তাঁর সাজিয়ে দে ভাই

মনের মতো করে।

গান গেয়ে আনন্দ মনে

ঝাঁটিয়ে দে সব ধূলা

যত্ন করে দূর করে দে

আবর্জ্জনাগুলা।

জল ছিটিয়ে ফুলগুলি রাখ

সাজিখানি ভরে—

আসনটি তাঁর সাজিয়ে দে ভাই

মনের মতো করে।

দিন রজনী আছেন তিনি

আমাদেব এই ঘরে,

সকাল বেলায় তাঁরি হাসি

আলোক ঢেলে পড়ে

যেমনি ভোরে জেগে উঠে

নয়ন মেলে চাই

খুসি হয়ে আছেন চেয়ে

দেখ্তে মোরা পাই।

তাঁরি মুখের প্রসন্নতায়

সমস্ত ঘর ভরে

সকাল বেলায় তাঁরি হাসি

আলোক ঢেলে পড়ে।

একলা তিনি বসে থাকেন

আমাদের এই ঘরে

আমরা যখন অন্য কোথাও

চলি কাজের তরে।

দ্বারের কাছে তিনি মোদের

এগিয়ে দিয়ে যান;—

মনের সুখে ধাইরে পথে,

আনন্দে গাই গান।

দিনের শেষে ফিরি যখন

নানান কাজের পরে,

দেখি তিনি একলা বসে

আমাদের এই ঘরে।

তিনি জেগে বসে থাকেন

আমাদের এই ঘরে,

আমরা যখন অচেতনে

ঘুমাই শয্যা’পরে।

জগতে কেউ দেখ‍্তে না পায়

লুকানো তার বাতি,

আঁচল দিয়ে আড়াল করে

জ্বালান সারা বাতি।

ঘুমের মধ্যে স্বপন কতই

আনাগোনা করে,

অন্ধকারে হাসেন তিনি

আমাদের এই ঘরে।

পৌষ ১৩১৬

৫১

৫১

নিভৃত প্রাণের দেবতা

যেখানে জাগেন একা,

ভক্ত, সেথায় খোল দ্বার,

আজ লব তাঁর দেখা।

সারা দিন শুধু বাহিরে

ঘুরে ঘুরে কারে চাহিরে,

সন্ধ্যাবেলার আরতি

হয়নি আমার শেখা৷

তব জীবনের আলোতে

জীবন-প্রদীপ জ্বালি

হে পূজারি, আজ নিভৃতে

সাজাব আমার থালি।

যেথা নিখিলের সাধনা

পূজা-লোক করে রচনা,

সেথায় আমিও ধরিব

একটি জ্যোতির রেখা।

১৭ পৌষ ১৩১৬

৫২

৫২

কোন আলোতে প্রাণের প্রদীপ

জ্বালিয়ে তুমি ধরায় আস!

সাধক ওগো, প্রেমিক ওগো

পাগল ওগো ধরায় আস!

অকূল সংসারে

দুঃখ আঘাত তোমার প্রাণে বীণা ঝঙ্কারে।

ঘোর বিপদ মাঝে

কোন জননীর মুখের হাসি দেখিয়া হাস।

তুমি কাহার সন্ধানে

সকল সুখে আগুন জ্বেলে বেড়াও কে জানে!

এমন ব্যাকুল করে

কে তোমারে কাঁদায় যারে ভালবাস।

তোমার ভাবনা কিছু নাই—

কে যে তোমার সাথের সাথী ভাবি মনে তাই।

তুমি মরণ ভুলে

কোন অনন্ত প্রাণসাগরে আনন্দে ভাস।

১৭ পৌষ ১৩১৬

৫৩

৫৩

তুমি আমার আপন, তুমি আছ আমার কাছে,

এই কথাটি বলতে দাও হে বলতে দাও!

তোমার মাঝে মোর জীবনের সব আনন্দ আছে

এই কথাটি বল‍্তে দাও হে বলতে দাও।

আমায় দাও সুধাময় সুর,

আমার বাণী কর সুমধুর,

আমার প্রিয়তম তুমি এই কথাটি

বল‍্তে দাও হে বলতে দাও!

এই নিখিল আকাশ ধরা

এ যে তোমায় দিয়ে ভরা,

আমার হৃদয় হতে এই কথাটি

বল‍্তে দাও হে বল‍্তে দাও।

দুখী জেনেই কাছে আস

ছোট বলেই ভালবাস

আমার ছোট মুখে এই কথাটি

বল‍্তে দাও হে বল‍্তে দাও।

মাঘ, ১৩১৬

৫৪

৫৪

নামাও নামাও আমায় তোমার

চরণ-তলে,

গলাও হে মন, ভাসাও জীবন

নয়ন-জলে।

এক আমি অহঙ্কারের

উচ্চ অচলে,

পাষাণ আসন ধূলায় লুটাও

ভাঙ সবলে।

নামাও নামাও আমায় তোমার

চরণ-তলে।

কি লয়ে বা গর্ব্ব করি

ব্যর্থ জীবনে!

ভরা গৃহে শূন্য আমি

তোমা বিহনে।

দিনের কর্ম্ম ডুবেছে মোর

আপন অতলে

সন্ধ্যাবেলার পূজা যেন

যায় না বিফলে!

নামাও নামাও আমায় তোমার

চরণ-তলে।

মাঘ, ১৩১৬

৫৫

৫৫

আজি গন্ধবিধুর সমীরণে

কার সন্ধানে ফিরি বনে বনে?

আজি ক্ষুব্ধ নীলাম্বর মাঝে

এ কি চঞ্চল ক্রন্দন বাজে;

সুদুর দিগন্তের সকরুণ সঙ্গীত

লাগে মোর চিন্তায় কাজে

আমি খুঁজি কারে অন্তরে মনে

গন্ধবিধুর সমীরণে।

ওগো জানিনা কি নন্দনরাগে

সুখে উৎসুক যৌবন জাগে।

আজি আম্রমুকুল-সৌগন্ধ্যে,

নব- পল্লব-মর্ম্মর ছন্দে,

চন্দ্র-কিরণ-সুধা-সিঞ্চিত অম্বরে

অশ্রু-সরস মহানন্দে

আমি পুলকিত কার পরশনে

গন্ধবিধুর সমীরণে।

ফাল্গুন, ১৩১৬

৫৬

৫৬

আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে।

তব অবগুণ্ঠিত কুণ্ঠিত জীবনে

কোরোনা বিড়ম্বিত তারে।

আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,

আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো,

এই সঙ্গীত-মুখরিত গগনে

তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ে।

এই বাহির ভুবনে দিশা হারায়ে

দিয়ো ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে।

অতি নিবিড় বেদন বনমাঝেরে

আজি পল্লবে পল্লবে বাজে রে,—

দূরে গগনে কাহার পথ চাহিয়া

আজি ব্যাকুল বসুন্ধরা সাজেরে।

মোর পরাণে দখিন বায়ু লাগিছে,

কারে দ্বারে দ্বারে কর হানি মাগিছে,

এই সৌরভ-বিহবল রজনী

কার চরণে ধরণীতলে জাগিছে?

ওগো সুন্দর, বল্লভ, কান্ত,

তব গম্ভীর আহবান কারে?

২৭ চৈত্র, ১৩১৬

৫৭

৫৭

তব সিংহাসনের আসন হতে

এলে তুমি নেমে,

মোর বিজন ঘরের দ্বারের কাছে

দাঁড়ালে নাথ থেমে।

একলা বসে আপন মনে

গাইতেছিলেম গান,

তোমার কানে গেল সে সুর

এলে তুমি নেমে,—

মোর বিজন ঘরের দ্বারের কাছে

দাঁড়ালে নাথ থেমে।

তোমার সভায় কত না গান

কতই আছেন গুণী;

গুণহীনের গানখানি আজ

বাজ‍্ল তোমার প্রেমে।

লাগ‍্ল বিশ্ব তানের মাঝে

একটি করুণ স্বর,

হাতে লয়ে বরণমালা

এলে তুমি নেমে,

মোর বিজন ঘরের দ্বারের কাছে

দাঁড়ালে নাথ থেমে॥

২৭ চৈত্র, ১৩১৬

৫৮

৫৮

তুমি এবার আমায় লহ হে নাথ, লহ।

এবার তুমি ফিরোনা হে—

হৃদয় কেড়ে নিয়ে রহ।

যে দিন গেছে তোমা বিনা

তারে আর ফিরে চাহিনী,

যাক‍্ সে ধূলাতে!

এখন তোমার আলোয় জীবন মেলে

যেন জাগি অহরহ॥

কি আবেশে, কিসের কথায়

ফিরেছি হে যথায় তথায়

পথে প্রান্তরে,

এবার বুকের কাছে ও মুখ রেখে

তোমার আপন বাণী কহ॥

কত কলুষ কত ফাঁকি

এখনো যে আছে বাকি

মনের গোপনে,

আমার তার লাগি আর ফিরায়ে না,

তারে আগুন দিয়ে দহ॥

২৮চৈত্র, ১৩১৬

৫৯

৫৯

জীবন যখন শুকায়ে যায়

করুণা-ধারায় এসো।

সকল মাধুরী লুকায়ে যায়,

গীতসুধারসে এসো।

কর্ম্ম যখন প্রবল আকার

গরজি উঠিয়া ঢাকে চারিধার,

হৃদয়প্রাস্তে হে নীরব নাথ

শাস্ত চরণে এসো।

আপনারে যবে করিয়া কৃপণ

কোণে পড়ে থাকে দীনহীন মন,

দুয়ার খুলিয়া, হে উদার নাথ,

রাজ-সমারোহে এসো।

বাসনা যখন বিপুল ধূলায়

অন্ধ করিয়া অবোধে ভুলায়

ওহে পবিত্র, ওহে অনিদ্র,

রুদ্র আলোক এসো॥

২৮ চৈত্র, ১৩১৬

৬০

৬০

এবার নীরব করে দাওহে তোমার

মুখর কবিরে।

তার হৃদয়-বাঁশি আপনি কেড়ে

বাজাও গভীরে।

নিশীথ রাতের নিবিড় সুরে,

বাঁশিতে তান দাওহে পূরে,

যে তান দিয়ে অবাক কর

গ্রহ শশীরে।

যা কিছু মোর ছড়িয়ে আছে

জীবন মরণে

গানের টানে মিলুক এসে

তোমার চরণে

বহুদিনের বাক্যরাশি

এক নিমেষে যাবে ভাসি,

একলা বসে শুনব বাঁশি

অকুল তিমিরে।

৩০ চৈত্র, ১৩১৬

৬১

৬১

বিশ্ব যখন নিদ্রাগমন

গগন অন্ধকার;

কে দেয় আমার বীণার তারে

এমন ঝঙ্কার।

নয়নে ঘুম নিল কেড়ে,

উঠে বসি শয়ন ছেড়ে,

মেলে আঁখি চেয়ে থাকি

পাইনে দেখা তার।

গুঞ্জরিয়া গুঞ্জরিয়া

প্রাণ উঠিল পূরে

জানিনে কোন বিপুল বাণী

বাজে ব্যাকুল সুরে।

কোন বেদনায় বুঝিনারে

হৃদয় ভরা অশ্রুভারে,

পরিয়ে দিতে চাই কাহারে

আপন কণ্ঠহার।

৪ বৈশাখ ১৩১৭

৬২

৬২

সে যে পাশে এসে বসেছিল

তবু জাগি নি।

কি ঘুম তোরে পেয়েছিল

হতভাগিনী!

এসেছিল নীরব রাতে,

বীণাখানি ছিল হাতে,

স্বপনমাঝে বাজিয়ে গেল

গভীর রাগিণী।

জেগে দেখি দখিন হাওয়া

পাগল করিয়া

গন্ধ তাহার ভেসে বেড়ায়

আঁধার ভরিয়া।

কেন আমার রজনী যায়

কাছে পেয়ে কাছে না পায়,

কেন গো তার মালার পরশ

বুকে লাগে নি।

১২ বৈশাখ ১৩১৭

৬৩

৬৩

তোরা শুনিস্ নি কি শুনিস্ নি তার পায়ের ধ্বনি,

ঐ যে আসে, আসে, আসে!

যুগে যুগে পলে পলে দিনরজনী

সে যে আসে, আসে, আসে।

গেয়েছি গান যখন যত

আপন মনে ক্ষ্যাপার মত

সকল সুরে বেজেছে তার

আগমনী—

সে যে আসে, আসে, আসে।

কত কালের ফাগুন দিনে বনের পথে

সে যে আসে, আসে, আসে।

কত শ্রাবণ অন্ধকারে মেঘের রথে

সে যে আসে, আসে, আসে।

দুখের পরে পরম দুখে

তারি চরণ বাজে বুকে,

সুখে কখন বুলিয়ে সে দেয়

পরশমণি!

সে যে আসে, আসে, আসে।

৩ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৬৪

৬৪

মেনেছি, হার মেনেছি।

ঠেলতে গেছি তোমায় যত

আমায় তত হেনেছি।

আমার চিত্তগগন থেকে

তোমায় কেউ যে রাখ্‌বে ঢেকে,

কোনোমতেই সইবে না সে

বারেবারেই জেনেছি

অতীত জীবন ছায়ার মত

চল্‌চে পিছে পিছে,

কত মায়ার বাঁশির সুরে

ডাক্‌চে আমায় মিছে।

মিল ছুটেছে তাহার সাথে,

ধরা দিলেম তোমার হাতে,

যা আছে মোর এ জীবনে

তোমার দ্বারে এনেছি!

৭ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৬৫

৬৫

একটি একটি করে তোমার

পুরানো তার খোলো,

সেতারখানি নূতন বেঁধে তোলো।

ভেঙে গেছে দিনের মেলা,

বসবে সভা সন্ধ্যা বেলা,

শেষের সুর যে বাজাবে তার

আসার সময় হলো—

সেতারখানি নূতন বেঁধে তোলো

দুয়ার তোমার খুলে দাওরে

আঁধার আকাশ পরে,

সপ্ত লোকের নীরবতা

আসুক তোমার ঘরে।

এতদিন যে গেয়েছে গান

আজকে তারি হোক্‌ অবসান,

এ যন্ত্র যে তোমার যন্ত্র

সেই কথাটাই ভোলো!

সেতারখানি নূতন বেঁধে তোলো।

৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৬৬

৬৬

কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে—

সে ত আজকে নয় সে আজকে নয়।

ভুলে গেছি কবে থেকে আসচি তোমায় চেয়ে

সে ত আজকে নয় সে আজকে নয়।

ঝরণা যেমন বাহিরে যায়,

জানেনা সে কাহারে চায়

তেমনি করে ধেয়ে এলেম

জীবনধারা বেয়ে—

সে ত আজকে নয় সে আজকে নয়

কতই নামে ডেকেছি যে,

কতই ছবি এঁকেছি যে,

কোন আনন্দে চলেছি, তার

ঠিকানা না পেয়ে—

সে ত আজকে নয় সে আজকে নয়।

পুষ্প যেমন আলোর লাগি

না জেনে রাত কাটায় জাগি,

তেমনি তোমার আশায় আমার

হৃদয় আছে ছেয়ে—

সে ত আজকে নয় সে আজকে নয়।

৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৬৭

৬৭

তোমার প্রেম যে বইতে পারি

এমন সাধ্য নাই।

এ সংসারে তোমার আমার

মাঝখানেতে তাই

কৃপা করে রেখেছ নাথ

অনেক ব্যবধান—

দুঃখ সুখের অনেক বেড়া

ধনজন মান।

আড়াল থেকে ক্ষণে ক্ষণে

আভাসে দাও দেখা—

কাল মেঘের ফাঁকে ফাঁকে

রবির মৃদু রেখা।

শক্তি যারে দাও বহিতে

অসীম প্রেমের ভার

একেবারে সকল পর্দ্দা

ঘুচায়ে দাও তার।

না রাখ তার ঘরের আড়াল,

না রাখ তার ধন,

পথে এনে নিঃশেষে তায়

কর অকিঞ্চন।

না থাকে তার মান অপমান,

লজ্জা সরম ভয়,

একলা তুমি সমস্ত তার

বিশ্ব ভুবনময়।

এমন করে মুখোমুখি

সামনে তোমার থাকা,

কেবলমাত্র তোমাতে প্রাণ

পূর্ণ করে রাখা,

এ দয়া যে পেয়েছে, তার

লোভের সীমা নাই—

সকল লোভ সে সরিয়ে ফেলে

তোমায় দিতে ঠাঁই॥

১০ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৬৮

৬৮

সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে

অরুণ বরণ পারিজাত লয়ে হাতে।

নিদ্রিত পুরী, পথিক ছিল না পথে,

একা চলি গেলে তোমার সোনার রথে,

বারেক থামিয়া, মোর বাতায়ন পানে

চেয়েছিলে তব করুণ নয়নপাতে।

সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে।

স্বপন আমার ভরেছিল কোন গন্ধে,

ঘরের আঁধার কেঁপেছিল কি আনন্দে,

ধূলায় লুটানো নীরব আমার বীণা

বেজে উঠেছিল অনাহত কি আঘাতে।

কতবার আমি ভেবেছিনু উঠি-উঠি,

আলস ত্যজিয়া পথে বাহিরাই ছুটি,

উঠিনু যখন তখন গিয়েছ চলে

দেখা বুঝি আর হলনা তোমার সাথে।

সুন্দর, তুমি এসেছিলে আজ প্রাতে॥

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৬৯

৬৯

আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে

তখন কে তুমি তা কে জানত!

তখন ছিলনা ভয় ছিলনা লাজ মনে

জীবন বহে যেত অশান্ত।

তুমি ভোরের বেলা ডাক দিয়েছ কত,

যেন আমার আপন সখার মত,

হেসে তোমার সাথে ফিরেছিলেম ছুটে

সেদিন কতনা বন-বনান্ত।

ওগো সেদিন তুমি গাইতে যে সব গান

কোনো অর্থ তাহার কে জানত!

শুধু সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ,

সদা নাচ‍্ত হৃদয় অশান্ত।

হঠাৎ খেলার শেষে আজ কি দেখি ছবি,

স্তব্ধ আকাশ, নীরব শশী রবি,

তোমার চরণ পানে নয়ন করি নত

ভুবন দাঁড়িয়ে আছে একান্ত

১৭ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৭০

৭০

ঐরে তরী দিল খুলে।

তোর বোঝা কে নেবে তুলে!

সাম‍্নে যখন যাবি ওরে

থাক‍্না পিছন পিছে পড়ে,

পিঠে তারে বইতে গেলি,

একলা পড়ে রইলি কূলে।

ঘরের বোঝা টেনে টেনে

পারের ঘাটে রাখলি এনে,

তাই যে তোরে বারে বারে

ফিরতে হল গেলি ভুলে।

ডাকরে আবার মাঝিরে ডাক্‌,

বোঝা তোমার যাক্ ভেসে যাক্

জীবনখানি উজাড় করে

সঁপে দে তার চরণ-মূলে।

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৭১

৭১

চিত্ত আমার হারাল আজ

মেঘের মাঝখানে,

কোথায় ছুটে চলেছে সে

কোথায় কে জানে।

বিজুলি তার বীণার তারে

আঘাত করে বারে বারে,

বুকের মাঝে বজ্র বাজে

কি মহা তানে!

পুঞ্জ পুঞ্জ ভারে ভারে

নিবিড় নীল অন্ধকারে

জড়ালরে অঙ্গ আমার

ছড়াল প্রাণে।

পাগল হাওয়া নৃত্যে মাতি

হল আমার সাথের সার্থী

অট্টহাসে ধায় কোথা সে

বারণ না মানে।

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৭২

৭২

ওগো মৌন, না যদি কও

নাই কহিলে কথা।

বক্ষ ভরি বইব আমি

তোমার নীরবতা।

স্তব্ধ হয়ে রইব পড়ে,

রজনী রয় যেমন করে

জ্বালিয়ে তারা নিমেষ-হারা

ধৈর্য্যে অবনত।

হবে হবে প্রভাত হবে

আঁধার যাবে কেটে।

তোমার বাণী সোনার ধারা

পড়বে আকাশ ফেটে।

তখন আমার পাখীর বাসায়

জাগবে কি গান তোমার ভাষায়!

তোমার তানে ফোটাবে ফুল

আমার বনলতা।

১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৬

৭৩

৭৩

যতবার আলো জ্বালাতে চাই

নিবে যায় বারে বারে।

আমার জীবনে তোমার আসন

গভীর অন্ধকারে।

যে লতাটি আছে শুকায়েছে মূল,

কুঁড়ি ধরে শুধু নাহি ফোটে ফুল,

আমার জীবনে তব সেবা তাই

বেদনার উপহারে।

পূজাগৌরব পুণ্যবিভব

কিছু নাহি, নাহি লেশ,

এ তব পূজারি পরিয়া এসেছে

লজ্জার দীন বেশ।

উৎসবে তার আসে নাই কেহ,

বাজে নাই বাঁশি সাজে নাই গেহ,

কাঁদিয়া তোমায় এনেছে ডাকিয়া

ভাঙা মন্দির-দ্বারে।

২১ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৭৪

৭৪

সবা হতে রাখব তোমায়

আড়াল করে

হেন পূজার ঘর কোথা পাই

আমার ঘরে!

যদি আমার দিনে রাতে,

যদি আমার সবার সাথে

দয়া করে দাও ধরা, ত

রাখব ধরে।

মান দিব যে তেমন মানী

নই ত আমি,

পূজা করি সে আয়োজন

নাই ত স্বামী।

যদি তোমায় ভালবাসি,

আপনি বেজে উঠবে বাঁশি

আপনি ফুটে উঠবে কুসুম

কানন ভরে।

২১ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৭৫

৭৫

বজ্রে তোমার বাজে বাঁশি,

সে কি সহজ গান?

সেই সুরেতে জাগব আমি

দাও মোরে সেই কান ৷

ভুলব না আর সহজেতে,—

সেই প্রাণে মন উঠবে মেতে

মৃত্যু মাঝে ঢাকা আছে

যে অন্তহীন প্রাণ।

সে ঝড় যেন সই আনন্দে

চিত্ত বীণার তারে

সপ্ত সিন্ধু দশ দিগন্ত

নাচাও যে ঝঙ্কারে।

আরাম হতে ছিন্ন করে

সেই গভীরে লও গো মোরে

অশাস্তির অস্তরে যেথায়

শাস্তি সুমহান॥

২১ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৭৬

৭৬

দয়া দিয়ে হবে গো মোর

জীবন ধুতে।

নইলে কি আর পারব তোমার

চরণ ছুঁতে।

তোমায় দিতে পূজার ডালি

বেরিয়ে পড়ে সকল কালী,

পরাণ আমার পারিনে তাই

পায়ে থুতে।

এতদিন ত ছিল না মোর

কোনো ব্যথা,

সর্ব্ব অঙ্গে মাখা ছিল

মলিনতা।

আজ ঐ শুভ্র কোলের তরে

ব্যাকুল হৃদয় কেঁদে মরে,

দিয়োনা গো দিয়োনা আর,

ধূলায় শুতে।

২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৭৭

৭৭

সভা যখন ভাঙবে তখন

শেষের গান কি যাব গেয়ে?

হয় ত তখন কণ্ঠহারা

মুখের পানে রব চেয়ে।

এখনো যে সুর লাগে নি

বাজবে কি আর সেই রাগিণী,

প্রেমের ব্যথা সোনার তানে

সন্ধ্যাগগন ফেলবে ছেয়ে?

এতদিন যে সেধেছি স্বর

দিনেরাতে আপন মনে

ভাগ্যে যদি সেই সাধনা

সমাপ্ত হয় এই জীবনে—

এ জনমের পূর্ণ বাণী

মানস বনের পদ্মখানি

ভাসাব শেষ সাগর পানে

বিশ্বগানের ধারা বেয়ে।

২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৭৮

৭৮

চিরজনমের বেদনা,

ওহে চিরজীবনের সাধনা৷

তোমার আগুন উঠক হে জ্বলে’,

কৃপা করিয়ো না দুর্ব্বল বলে’,

যত তাপ পাই সহিবারে চাই,

পুড়ে হোক ছাই বাসনা

অমোঘ যে ডাক সেই ডাক দাও

আর দেরি কেন মিছে?

যে আছে বাঁধন বক্ষ জড়ায়ে

ছিড়ে পড়ে যাক পিছে।

গরজি গরজি শঙ্খ তোমার

বাজিয়া বাজিয়া উঠুক্‌ এবার,

গর্ব্ব টুটিয়া নিদ্রা ছুটিয়া

জাগুক তীব্র চেতনা।

২৬ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৭৯

৭৯

তুমি যখন গান গাহিতে বল

গর্ব্ব আমার ভরে ওঠে বুকে;

দুই আঁখি মোর করে ছলছল,

নিমেষহারা চেয়ে তোমার মুখে।

কঠিন কটু যা আছে মোর প্রাণে

গলিতে চায় অমৃতময় গানে,

সব সাধনা আরাধনা মম

উড়িতে চায় পাখীর মত সুখে।

তৃপ্ত তুমি আমার গীতরাগে,

ভাল লাগে তোমার ভাল লাগে,

জানি আমি এই গানেরি বলে

বসি গিয়ে তোমারি সম্মুখে

মন দিয়ে যার নাগাল নাহি পাই,

গান দিয়ে সেই চরণ ছুঁয়ে যাই,

সুরের ঘোরে আপনাকে যাই ভুলে,

বন্ধ বলে ডাকি মোর প্রভুকে।

২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৮০

৮০

ধায় যেন মাের সকল ভালবাসা

প্রভু, তােমার পানে, তােমার পানে, তােমার পানে।

যায় যেন মাের সকল গভীর আশা।

প্রভু, তােমার কানে, তােমার কানে, তােমার কানে।

চিত্ত মম যখন যেথায় থাকে

সাড়া যেন দেয় সে তােমার ডাকে,

যত বাঁধা সব টুটে যায় যেন

প্রভু, তােমার টানে, তােমার টানে, তােমার টানে।

বাহিরের এই ভিক্ষা ভরা থালি,

এবার যেন নিঃশেষে হয় খালি,

অন্তর মাের গােপনে যায় ভরে

প্রভু, তােমার দানে, তােমার দানে, তােমার দানে।

হে বন্ধু মাের, হে অন্তরতর,

এ জীবনে যা কিছু সুন্দর

সকলি আজ বেজে উঠুক সুরে

প্রভু, তােমার গানে, তােমার গানে, তােমার গানে।

২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৮১

৮১

তারা দিনের বেলা এসেছিল

আমার ঘরে,-

বলেছিল, একটি পাশে

রইব পড়ে।

বলেছিল, দেবতা সেবায়

আমরা হব তােমার সহায়,-

যা কিছু পাই প্রসাদ লব

পূজার পরে।

এমনি করে দরিদ্র ক্ষীণ

মলিন বেশে

সঙ্কোচেতে একটি কোণে

রৈল এসে।

রাতে দেখি প্রবল হয়ে

পশে আমার দেবালয়ে

মলিন হাতে পূজার বলি

হরণ করে॥

২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৮২

৮২

তারা তােমার নামে বাটের মাঝে

মাশুল লয় যে ধরি।

দেখি শেষে ঘাটে এসে।

নাইক পারের কড়ি।

তারা তােমার কাজের ভানে

নাশ করে গাে ধনে প্রাণে,

সামান্য যা আছে আমার

লয় তা অপহরি।

আজকে আমি চিনেছি সেই

ছদ্মবেশী দলে।

তারাও আমায় চিনেছে হায়

শক্তিবিহীন বলে।

গােপন মূর্তি ছেড়েছে তাই,

লজ্জাসরম আর কিছু নাই,!

দাঁড়িয়েছে আজ মাথা তুলে

পথ অবরােধ করি॥

২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৮৩

৮৩

এই জ্যোৎস্না রাতে জাগে আমার প্রাণ;

পাশে তোমার হবে কি আজ স্থান?

দেখ্‌তে পাব অপূর্ব্ব সেই মুখ,

রইবে চেয়ে হৃদয় উৎসুক,

বারে বারে চরণ ঘিরে ঘিরে

ফিরবে আমার অশ্রুভরা গান?

সাহস করে তোমার পদমূলে

আপ্‌নারে আজ ধরি নাই যে তুলে,

পড়ে আছি মাটিতে মুখ রেখে,

ফিরিয়ে পাছে দাও এ আমার দান।

আপ্‌নি যদি আমার হাতে ধরে

কাছে এসে উঠতে বল মোরে,

তবে প্রাণের অসীম দরিদ্রতা

এই নিমেষেই হবে অবসান।

২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৮৪

৮৪

কথা ছিল এক-তরীতে কেবল তুমি আমি

যাব অকারণে ভেসে কেবল ভেসে;

ত্রিভুবনে জানবেনা কেউ আমরা তীর্থগামী

কোথায় যেতেছি কোন্ দেশে সে কোন্ দেশে?

কূলহারা সেই সমুদ্রমাঝখানে

শােনাব গান একলা তােমার কানে,

ঢেউয়ের মতন ভাষা-বাঁধন হারা

আমার সেই রাগিণী শুনবে নীরব হেসে।

আজো সময় হয়নি কি তার, কাজ কি আছে বাকি?

ওগাে ঐ যে সন্ধ্যা নামে সাগরতীরে।

মলিন আলােয় পাখা মেলে সিন্ধুপারের পাখী

আপন কুলায় মাঝে সবাই এল ফিরে।

কখন তুমি আসবে ঘাটের পরে

বাঁধনটুকু কেটে দেবার তরে?

অস্তরবির শেষ আলােটির মত

তরী নিশীথমাঝে যাবে নিরুদ্দেশে!

৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৩১৭

৮৫

৮৫

আমার একলা ঘরের আড়াল ভেঙে

বিশাল ভবে

প্রাণের রথে বাহির হতে

পারব কবে?

প্রবল প্রেমে সবার মাঝে

ফিরব ধেয়ে সকল কাজে,

হাটের পথে তােমার সাথে

মিলন হবে,

প্রাণের রথে বাহির হতে

পারব কবে?

নিখিল-আশা-আকাঙ্ক্ষাময়

দুঃখে সুখে,

ঝাঁপ দিয়ে তার তরঙ্গপাত

ধরব বুকে।

মন্দভালাের আঘাত-বেগে

তােমার বুকে উঠবে জেগে,

শুনব বাণী বিশজনের

কলরবে।

প্রাণের রথে বাহির হতে

পারব কবে?

১ আষাঢ় ১৩১৭

৮৬

৮৬

একা আমি ফিরব না আর

এমন করে-

নিজের মনে কোণে কোণে

মােহের ঘােরে।

তােমার একলা বাহুর বাধন দিয়ে

ছােট করে ঘিরতে গিয়ে

শুধু এ আপনারেই বাঁধি

আপন ডােরে।

যখন আমি পাব তােমায়

নিখিল মাঝে

সেইখানে হৃদয়ে পাব

হৃদয়-রাজে।

এই চিত্ত আমার বৃন্ত কেবল,

তারি পরে বিশ্বকমল;

তারি পরে পূর্ণ প্রকাশ

দেখাও মােরে॥

২ আষাঢ় ১৩১৭

৮৭

৮৭

আমারে যদি জাগালে আজি নাথ,

ফিরােনা তবে ফিরােনা, কর

করুণ আঁখিপাত।

নিবিড় বন-শাখার পরে

আষাঢ় মেঘে বৃষ্টি ঝরে,

বাদলভরা আলস ভরে

ঘুমায়ে আছে রাত।

ফিরােনা তুমি ফিরােনা, কর

করুণ আঁখিপাত।

বিরামহীন বিজুলিঘাতে

নিদ্রাহারা প্রাণ

বরষা জলধারার সাথে

গাহিতে চাহে গান।

হৃদয় মাের চোখের জলে

বাহির হল তিমির তলে,

আকাশ খোঁজে ব্যাকুল বলে

বাড়ায়ে দুই হাত।

ফিরােনা তুমি ফিরােনা, কর

করুণ আঁখিপাত।

৩ আষাঢ় ১৩১৭

৮৮

৮৮

ছিন্ন করে লও হে মােরে

আর বিলম্ব নয়।

ধূলায় পাছে ঝরে পড়ি

এই জাগে মাের ভয়

এ ফুল তােমার মালার মাঝে

ঠাঁই পাবে কি, জানি না যে,

তবু তােমার আঘাতটি তার

ভাগ্যে যেন রয়।

ছিন্ন কর ছিন্ন কর

আর বিলম্ব নয়।

কখন যে দিন ফুরিয়ে যাবে,

আসবে আঁধার করে,

কখন্ তােমার পূজার বেলা।

কাটবে অগােচরে।

যেটুকু এর রং ধরেছে,

গন্ধে সুধায় বুক ভরেছে,

তােমার সেবায় লও সেটুকু

থাকতে সুসময়।

ছিন্ন কর ছিন্ন কর

আর বিলম্ব নয়॥

৩ আষাঢ় ১৩১৭

৮৯

৮৯

চাই গো আমি তোমারে চাই

তোমায় আমি চাই—

এই কথাটি সদাই মনে

বল‍্তে যেন পাই।

আর যা কিছু বাসনাতে

ঘুরে বেড়াই দিনে রাতে

মিথ্য সে সব মিথ্যা, ওগো

তোমায় আমি চাই।

রাত্রি যেমন লুকিয়ে রাখে

আলোর প্রার্থনাই—

তেমন গভীর মোহের মাঝে

তোমায় আমি চাই।

ঝড় যখন শান্তিরে হানে

তবু শান্তি চায় সে প্রাণে,

তেম‍্নি তোমায় আঘাত করি

তবু তোমায় চাই।

৩ আষাঢ় ১৩১৭

৯০

৯০

আমার এ প্রেম নয় ত ভীরু,

নয় ত হীনবল,

শুধু কি এ ব্যাকুল হয়ে

ফেলবে অশ্রজল?

মন্দমধুর সুখে শোভায়

প্রেমকে কেন ঘুমে ডোবায়?

তোমার সাথে জাগ‍্তে সে চায়

আনন্দে পাগল।

নাচে যখন ভীষণ সাজে

তীব্র তালে আঘাত বাজে,

পালায় ত্রাসে পালায় লাজে

সন্দেহ বিহ্বল।

সেই প্রচণ্ড মনোহরে

প্রেম যেন মোর বরণ করে,

ক্ষুদ্র আশার স্বৰ্গ তাহার

দিক‍্ সে রসাতল।

৪ আষাঢ় ১৩১৭

৯১

৯১

আরাে আঘাত সইবে আমার

সইবে আমারো।

আরাে কঠিন সুরে জীবনতারে ঝঙ্কারো।

যে রাগ জাগাও আমার প্রাণে

বাজে নি তা চরমতানে,

নিঠুর মূর্চ্ছনায় সে গানে

মুর্তি সঞ্চারো

লাগে না গাে কেবল যেন

কোমল করুণা,

মৃদু সুরের খেলায় এ প্রাণ

ব্যর্থ কোরােনা।

জ্বলে উঠুক সকল হুতাশ,

গর্জ্জি উঠুক সকল বাতাস,

জাগিয়ে দিয়ে সকল আকাশ

পূর্ণতা বিস্তারো।

৪ আষাঢ় ১৩১৭

৯২

৯২

এই করেছ ভালাে, নিঠুর

এই করেছ ভালাে।

এমনি করে হৃদয়ে মাের

তীব্র দহন জ্বালো।

আমার এ ধূপ না পােড়ালে

গন্ধ কিছুই নাহি ঢালে,

আমার এ দীপ না জ্বালালে

দেয় না কিছুই আলাে

যখন থাকে অচেতনে

এ চিত্ত আমার

আঘাত সে যে পরশ তব

সেই ত পুরস্কার।

অন্ধকারে মােহে লাজে

চোখে তােমায় দেখি না যে,

রন্ধ্রে তােলো আগুন করে

আমার যত কালাে।

৪ আষাঢ় ১৩১৭

৯৩

৯৩

দেবতা জেনে দূরে রই দাঁড়ায়ে,

আপন জেনে আদর করিনে।

পিতা বলে প্রণাম করি পায়ে,

বন্ধু বলে দু হাত ধরিনে।

আপনি তুমি অতি সহজ প্রেমে

আমার হয়ে এলে যেথায় নেমে

সেথায় সুখে বুকের মধ্যে ধরে

সঙ্গী বলে তােমায় বরি নে।

ভাই তুমি যে ভাইয়ের মাঝে প্রভু,

তাদের পানে তাকাইনা যে তবু,

ভাইয়ের সাথে ভাগ করে মাের ধন

তােমার মুঠা কেন ভরিনে।

ছুটে এসে সবার সুখে দুখে।

দাঁড়াইনে ত তােমারি সম্মুখে,

সঁপিয়ে প্রাণ ক্লান্তিবিহীন কাজে

প্রাণসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়িনে!

৫ আষাঢ় ১৩১৭

৯৪

৯৪

তুমি যে কাজ করচ, আমায়

সেই কাজে কি লাগাবে না?

কাজের দিনে আমায় তুমি

আপন হাতে জাগাবে না?

ভালমন্দ ওঠাপড়ায়,

বিশ্বশালার ভাঙাগড়ায়

তােমার পাশে দাড়িয়ে যেন

তােমার সাথে হয় গাে চেনা?

ভেবেছিলেম বিজন ছায়ায়

নাই যেখানে আনাগােনা

সন্ধ্যাবেলায় তােমায় আমায়

সেথায় হবে জানাশােনা।

অন্ধকারে একা একা,

সে দেখা যে স্বপ্ন দেখা,

ডাকো তােমার হাটের মাঝে

চল্‌চে যেথায় বেচাকেনা।

৬ আষাঢ় ১৩১৭

৯৫

৯৫

বিশ্বসাথে যােগে যেথায় বিহারো

সেইখানে যােগ তােমার সাথে আমারো

নয়ক বনে, নয় বিজনে,

নয় আমার আপন মনে,

সবার যেথায় আপন তুমি, হে প্রিয়,

সেথায় আপন আমারো।

সবার পানে যেথায় বাহু পসারো,

সেই খানেতেই প্রেম জাগিবে আমারো

গােপনে প্রেম রয় না ঘরে,

আলাের মত ছড়িয়ে পড়ে,

সবার তুমি আনন্দধন, হে প্রিয়,

আনন্দ সেই আমারো॥

৭ আষাঢ় ১৩১৭

৯৬

৯৬

ডাক ডাক ডাক আমারে,

তোমার স্নিগ্ধ শীতল গভীর

পবিত্র আঁধারে।

তুচ্ছ দিনের ক্লান্তি গ্লানি

দিতেছে জীবন ধূলাতে টানি,

সারাক্ষণের বাক্যমনের

সহস্র বিকারে।

মুক্ত কর হে মুক্ত কর আমারে,

তোমার নিবিড় নীরব উদার

অনন্ত আঁধারে।

নীরব রাত্রে হারাইয়া বাক্‌

বাহির আমার বাহিরে মিশাক‍্,

দেখা দিক্ মম অন্তরতম

অখণ্ড আকারে।

৭ আষাঢ় ১৩১৭

৯৭

৯৭

যেথায় তােমার লুট হতেছে ভুবনে

সেইখানে মাের চিত্ত যাবে কেমনে!

সােনার ঘটে সূর্য্য তারা

নিচ্চে তুলে আলাের ধারা,

অনন্ত প্রাণ ছড়িয়ে পড়ে গগনে।

সেইখানে মাের চিত্ত যাবে কেমনে।

যেথায় তুমি বস দানের আসনে,

চিত্ত আমার সেথায় যাবে কেমনে।

নিত্য নূতন রসে ঢেলে

আপ্‌নাকে যে দিচ্চ মেলে,

সেথা কি ডাক পড়বে না গাে জীবনে!

সেইখানে মাের চিত্ত যাবে কেমনে!

৮ আষাঢ় ১৩১৭

৯৮

৯৮

ফুলের মতন আপনি ফুটাও গান,

হে আমার নাথ এই ত তােমার দান।

ওগাে সে ফুল দেখিয়া আনন্দে আমি ভাসি

আমার বলিয়া উপহার দিতে আসি,

তুমি নিজ হাতে তারে তুলে লও স্নেহে হাসি,

দয়া করে প্রভু রাখ মাের অভিমান।

তার পরে যদি পূজার বেলার শেষে

এ গান ঝরিয়া ধরার ধূলায় মেশে,

তবে ক্ষতি কিছু নাই,—তব করতল পুটে

অজস্ৰধন কত লুটে কত টুটে,

তারা আমার জীবনে ক্ষণকাল তরে ফুটে,

চিরকাল তরে সার্থক করে প্রাণ॥

৯ আষাঢ় ১৩১৭

৯৯

৯৯

মুখ ফিরায়ে রব তােমার পানে

এই ইচ্ছাটি সফল কর প্রাণে।

কেবল থাকা, কেবল চেয়ে থাকা,

কেবল আমার মনটি তুলে রাখা,

সকল ব্যথা সকল আকাঙ্ক্ষায়

সকল দিনের কাজেরি মাঝখানে।

নানা ইচ্ছা ধায় নানাদিক পানে,

একটি ইচ্ছা সফল কর প্রাণে।

সেই ইচ্ছাটি রাতের পরে রাতে

জাগে যেন একের বেদনাতে,

দিনের পরে দিনকে যেন গাঁথে

একের সূত্রে এক আনন্দগানে।

১০ আষাঢ় ১৩১৭

১০০

১০০

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে,

আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে।

এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি

পুলকে দুলিয়া উঠেছে আবার বাজি,

নুতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে।

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।

রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের পরে

নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে।

“এসেছে এসেছে” এই কথা বলে প্রাণ,

“এসেছে, এসেছে” উঠিতেছে এই গান,

নয়নে এসেছে, হৃদয়ে এসেছে ধেয়ে।

আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।

১০ আষাঢ় ১৩১৭

১০১

১০১

আজ বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে;

চলেছে গরজি, চলেছে নিবিড় সাজে।

হৃদয়ে তাহার নাচিয়া উঠিছে ভীমা,

ধাইতে ধাইতে লোপ ক’রে চলে সীমা,

কোন্‌ তাড়নায় মেঘের সহিত মেঘে,

বক্ষে বক্ষে মিলিয়া বজ্র বাজে।

বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।

পুঞ্জে পুঞ্জে দূর সুদূরের পানে

দলে দলে চলে, কেন চলে নাহি জানে।

জানে না কিছুই কোন্‌ মহাদ্রিতলে

গভীর শ্রাবণে গলিয়া পড়িবে জলে,

নাহি জানে তার ঘনঘোর সমারোহে

কোন্‌ সে ভীষণ জীবন-মরণ রাজে।

বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।

ঈশান কোণেতে ওই যে ঝড়ের বাণী

গুরু গুরু রবে কী করিছে কানাকানি।

দিগন্তরালে কোন্‌ ভবিতব্যতা

স্তব্ধ তিমিরে বহে ভাষাহীন ব্যথা,

কালো কল্পনা নিবিড় ছায়ার তলে

ঘনায়ে উঠিছে কোন্‌ আসন্ন কাজে।

বরষার রূপ হেরি মানবের মাঝে।

১০২

১০২

হে মাের দেবতা, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ

কি অমৃত তুমি চাহ করিবারে পান!

আমার নয়নে তােমার বিশ্ব ছবি

দেখিয়া লইতে সাধ যায় তব কবি!

আমার মুগ্ধ শ্রবণে নীরব রহি

শুনিয়া লইতে চাহ আপনার গান!

হে মাের দেবতা, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ,

কি অমৃত তুমি চাহ করিবারে পান!

আমার চিত্তে তােমার সৃষ্টিখানি

রচিয়া তুলিছে বিচিত্র এক বাণী।

তারি সাথে প্রভু মিলিয়া তােমার প্রতি

জাগায়ে তুলিছে আমার সকল গীতি,

আপনারে তুমি দেখিছ মধুর রসে

আমার মাঝারে নিজেরে করিয়া দান।

হে মাের দেবতা, ভরিয়া এ দেহ প্রাণ

কি অমৃত চাহ তুমি করিবারে পান।

১৩ আষাঢ় ১৩১৭

১০৩

১০৩

এই মাের সাধ যেন এ জীবন মাঝে

তব আনন্দ মহাসঙ্গীতে বাজে।

তােমার আকাশ, উদার আলােক ধারা

দ্বার ছোট দেখে ফেরে না যেন গাে তারা,

ছয় ঋতু যেন সহজ নৃত্যে আসে

অন্তর মাের নিত্য নূতন সাজে।

তব আনন্দ আমার অঙ্গে মনে

বাধা যেন নাহি পায় কোন আবরণে।

তব আনন্দ পরম দুঃখে মম।

জ্বলে ওঠে যেন পুণ্য আলােকসম,

তব আনন্দ দীনতা চূর্ণ করি

ফুটে উঠে ফেটে আমার সকল কাজে।

১৩ আষাঢ় ১৩১৭

১০৪

১০৪

একলা আমি বাহির হলেম

তােমার অভিসারে,

সাথে সাথে কে চলে মাের

নীরব অন্ধকারে;

ছাড়াতে চাই অনেক করে

ঘুরে চলি, যাই যে সরে,

মনে করি আপদ গেছে,-

আবার দেখি তারে।

ধরণী সে কাঁপিয়ে চলে,

বিষম চঞ্চলতা!

সকল কথার মধ্যে সে চায়

কইতে আপন কথা।

সে যে আমার আমি প্রত,

লজ্জা তাহার নাই যে কভু,

তারে নিয়ে কোন্ লাজে বা

যাব তােমার দ্বারে!

১৪ আষাঢ় ১৩১৭

১০৫

১০৫

আমি চেয়ে আছি তােমাদের সবাপানে।

স্থান দাও মোরে সকলের মাঝখানে।

নীচে সব নাচে এ ধূলির ধরণীতে

যেথা আসনের মূল্য না হয় দিতে,

যেথা রেখা দিয়ে ভাগ করা নেই কিছু,

যেথা ভেদ নাই মানে আর অপমানে,

স্থান দাও সেথা সকলের মাঝখানে।

সেথা বাহিরের আবরণ নাহি রয়,

যেথা আপনার উলঙ্গ পরিচয়।

আমার বলিয়া কিছু নাই একেবারে

এ সত্য যেথা নাহি ঢাকে আপনারে,

সেথায় দাড়ায়ে নিলাজ দৈন্য মম

ভরিয়া লইব তাহার পরম দানে।

স্থান দাও মােরে সকলের মাঝখানে

১৫ আষাঢ় ১৩১৭

১০৬

১০৬

আর আমায় আমি নিজের শিরে

বইব না।

আর নিজের দ্বারে কাঙাল হয়ে

রইব না।

এই বােঝা তােমার পায়ে ফেলে

বেরিয়ে পড়ব অবহেলে,

কোনাে খবর রাখব্ না ওর

কোন কথাই কইব না।

আমায় আমি নিজের শিরে

বইব না।

বাসনা মাের যারেই পরশ

করে সে,

আলোটি তার নিবিয়ে ফেলে

নিমেষে।

ওরে সেই অশুচি, দুই হাতে তার

যা এনেছে চাইনে সে আর,

তােমার প্রেমে বাজবে না।

সে আর আমি সইব না

আমায় আমি নিজের শিরে

বইব না।

১৫ আষাঢ় ১৩১৭

১০৭

১০৭

হে মাের চিত্ত, পুণ্য তীর্থে

জাগরে ধীরে-

এই ভারতের মহা-মানবের

সাগর-তীরে।

হেথায় দাঁড়ায়ে দু বাহু বাড়ায়ে

নমি নর-দেবতারে,

উদার ছন্দে পরমানন্দে

বন্দন করি তাঁরে।

ধ্যান-গম্ভীর এই যে ভূধর,

নদী-জপমালা-ধৃত প্রান্তর,

হেথায় নিত্য হের পবিত্র

ধরিত্রীরে,

এই ভারতের মহামানবের

সাগরতীরে।

কেহ নাহি জানে কার আহ্বানে

কত মানুষের ধারা

দুর্বার স্রোতে এল কোথা হতে

সমুদ্রে হল হারা।

হেথায় আর্য, হেথা অনার্য্য

হেথায় দ্রাবিড়, চীন,-

শক হুন-দল পাঠান মােগল

এক দেহে হল লীন।

পশ্চিম আজি খুলিয়াছে দ্বার

সেথা হতে সবে আনে উপহার,

দিবে আর নিবে, মিলাবে মিলিবে

যাবে না ফিরে,

এই ভারতের মহামানবের

সাগরতীরে।

রণধারা বাহি, জয়গান গাহি

উন্মাদ কলরবে

ভেদি মরুপথ গিরি-পৰ্বত

যারা এসেছিল সবে,

তারা মাের মাঝে সবাই বিরাজ

কেহ নহে নহে দূর,

আমার শােণিতে রয়েছে ধ্বনিতে

তার বিচিত্র সুর।

হে রুদ্রবীণা, বাজো, বাজো, বাজো,

ঘৃণা করি দূরে আছে যারা আজো,

বন্ধ নাশিবে তারাও আসিবে

দাড়াবে ঘিরে,-

এই ভারতের মহামানবের

সাগরতীরে।

হেথা একদিন বিরামবিহীন

মহা ওঙ্কারধ্বনি

হৃদয়তন্ত্রে একের মন্ত্রে

উঠেছিল রণরণি।

তপস্যা-বলে একের অনলে

বহুরে আহুতি দিয়া

বিভেদ ভুলিল, জাগায়ে ভুলিল

একটি বিরাট হিয়া।

সেই সাধনার সে আরাধনার

যজ্ঞশালায় খােল আজি দ্বার,

হেথায় সবারে হবে মিলিবারে

আনত শিরে,-

এই ভারতের মহামানবের

সাগরতীরে।

সেই হােমানলে হের আজি জ্বলে

দুখের রক্ত শিখা,

হবে তা সহিতে মর্ম্মে দহিতে

আছে সে ভাগ্যে লিখা।

এ দুখ বহন কর মাের মন,

শােনরে একের ডাক।

যত লাজ ভয় কর কর জয়

অপমান দূরে যাক্।

দুঃসহ ব্যথা হয়ে অবসান

জন্ম লভিবে কি বিশাল প্রাণ!

পােহায় রজনী, জাগিছে জননী

বিপুল নীড়ে,

এই ভারতের মহামানবের

সাগরতীরে।

এস হে আর্য্য, এস অনার্য্য,

হিন্দু মুসলমান।

এস এস আজ তুমি ইংরাজ,

এস এস খৃষ্টান।

এস ব্রাহ্মণ, শুচি করি মন

ধর হাত সবাকার,

এস হে পতিত, কর অপনীত

সব অপমানভার।

মার অভিষেকে এস এস ত্বরা,

মঙ্গলঘট হয়নি যে ভরা

সবার পরশে পবিত্র-করা

তীর্থনীরে

আজি ভারতের মহামানবের

সাগরতীরে।

১৮ আষাঢ় ১৩১৭

১০৮

১০৮

যেথায় থাকে সবার অধম দীনের হতে দীন

সেইখানে যে চরণ তােমার রাজে

সবার পিছে, সবার নীচে,

সব-হারাদের মাঝে।

যখন তােমায় প্রণাম করি আমি,

প্রণাম আমার কোন্‌খানে যায় থামি,

তােমার চরণ যেথায় নামে অপমানের তলে

সেথায় আমার প্রণাম নামে না যে

সবার পিছে, সবার নীচে,

সব-হারাদের মাঝে।

অহঙ্কার ত পায়না নাগাল যেথায় তুমি ফের

রিক্তভূষণ দীনদরিদ্র সাজে-

সবার পিছে, সবার নীচে,

সব-হারাদের মাঝে।

সঙ্গী হয়ে আছ যেথায় সঙ্গিহীনের ঘরে

সেথায় আমার হৃদয় নামে না যে

সবার পিছে, সবার নীচে,

সব-হারাদের মাঝে '

১৯ আষাঢ় ১৩১৭

১০৯

১০৯

হে মোর দুর্ভাগা দেশ যাদের কারেছ অপমান,

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

মানুষের অধিকারে

বঞ্চিত করেছ যারে,

সম্মুখে দাঁড়ায়ে রেখে তবু কোলে দাও নাই স্থান,

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

মানুষের পরশেরে প্রতিদিন ঠেকাইয়া দূরে

ঘৃণা করিয়াছ তুমি মানুষের প্রাণের ঠাকুরে।

বিধাতার রুদ্ররােষে

দুর্ভিক্ষের দ্বারে বসে

ভাগ করে’ খেতে হবে সকলের সাথে অন্নপান।

অপমানে হতে হবে তাহাদের সবার সমান।

তােমার আসন হতে যেথায় তাদের দিলে ঠেলে

সেথায় শক্তিরে তব নির্ব্বাসন দিলে অবহেলে।

চরণে দলিত হয়ে।

ধূলায় সে যায় বয়ে,

সেই নিম্নে নেমে এস নহিলে নাহিরে পরিত্রাণ।

অপমানে হতে হবে আজি তােরে সবার সমান।

১১০

১১০

ছাড়িস্‌নে, ধরে থাক্‌ এঁটে,

ওরে হবে তোর জয়!

অন্ধকার যায় বুঝি কেটে,

ওরে আর নেই ভয়।

ওই দেখ পূর্ব্বাশার ভালে

নিবিড় বনের অন্তরালে

শুকতারা হয়েছে উদয়

ওরে আর নেই ভয়!

এরা যে কেবল নিশাচর—

অবিশ্বাস আপনার পর

হতাশ্বাস, আলস্য, সংশয়,

এরা প্রভাতের নয়।

ছুটে আয়, আয়রে বাহিরে

চেয়ে দেখ্, দেখ্, উর্দ্ধশিরে

আকাশ হতেছে জ্যোতির্ম্ময়

ওরে আর নেই ভয়।

২১ আষাঢ় ১৩১৭

১১১

১১

আছে আমার হৃদয় আছে ভরে

এখন তুমি যা খুসি তাই কর।

এম্‌নি যদি বিরাজ অন্তরে

বাহির হতে সকলি মোর হর।

সব পিপাসার যেথায় অবসান

সেথায় যদি পূর্ণ কর প্রাণ,

তাহার পরে মরুপথের মাঝে

উঠে রৌদ্র উঠুক্‌ খরতর।

এই যে খেলা খেলচ কত ছলে

এই খেলা ত আমি ভালবাসি।

একদিকেতে ভাসাও আঁখিজলে

আরেক দিকে জাগিয়ে তোল হাসি।

যখন ভাবি সব খোয়ালেম বুঝি,

গভীর করে পাই তাহারে খুঁজি,

কোলের থেকে যখন ফেল দূরে

বুকের মাঝে আবার তুলে ধর।

২১ আষাঢ় ১৩১৭

১১২

১১২

গর্ব্ব করে নিইনে ও নাম, জান অন্তর্যামী,

আমার মুখে তোমার নাম কি সাজে?

যখন সবাই উপহাসে তখন ভাবি আমি

আমার কণ্ঠে তোমার গান কি বাজে?

তোমা হতে অনেক দূরে থাকি

সে যেন মোর জানতে না রয় বাকি,

নামগানের এই ছদ্মবেশে দিই পরিচয় পাছে

মনে মনে মরি যে সেই লাজে।

অহঙ্কারের মিথ্যা হতে বাঁচাও দয়া করে

রাখ আমায় যেথা আমার স্থান।

আর সকলের দৃষ্টি হতে সরিয়ে দিয়ে মোরে

কর তোমার নত নয়ন দান।

আমার পূজা দয়া পাবার তরে,

মান যেন সে না পায় কারে ঘরে,

নিত্য তোমায় ডাকি আমি ধূলার পরে বসে

নিত্যনূতন অপরাধের মাঝে।

২২ আষাঢ় ১৩১৭

১১৩

১১৩

কে বলে সব ফেলে যাবি

মরণ হাতে ধরবে যবে—

জীবনে তুই যা নিয়েছিস

মরণে সব নিতে হবে।

এই ভরা ভাণ্ডারে এসে

শূন্য কি তুই যাবি শেষে

নেবার মত যা আছে তোর

ভাল করে নে তুই তবে।

আবৰ্জ্জনার অনেক বোঝা

জমিয়েছিস যে নিরবধি,—

বেঁচে বাবি, যাবার বেলা

ক্ষয় করে সব যাস্‌রে যদি

এসেছি এই পৃথিবীতে,

হেথায় হবে সেজে নিতে,

রাজার বেশে চলরে হেসে

মৃত্যুপারের সে উৎসবে।

১৩ আষাঢ় ১৩১৭

১১৪

১১৪

নদীপারের এই আষাঢ়ের

প্রভাত খানি

নেরে, ও মন, নেরে আপন

প্রাণে টানি।

সবুজ নীলে সােনায় মিলে

যে সুধা এই ছড়িয়ে দিলে,

জাগিয়ে দিলে আকাশ তলে

গভীর বাণী-

নেরে, ও মন, নেরে আপন

প্রাণে টাণি।

এমনি করে চলতে পথে

ভবের কূলে

দুই ধারে যা ফুল ফুটে সব

নিস্‌রে তুলে।

সে গুলি তাের চেতনাতে,

গেথে তুলিস্‌ দিবস রাতে,

প্রতিদিনটি যতন করে

ভাগ্য মানি,

নেরে, ও মন, নেরে আপন

প্রাণে টানি।

২৫ আষাঢ় ১৩১৭

১১৫

১১৫

মরণ যেদিন দিনের শেষে আসবে তোমার দুয়ারে

সে দিন তুমি কি ধন দিবে উহারে?

ভরা আমার পরাণখানি

সম্মুখে তার দিব আনি,

শূন্য বিদায় করবনাত উহারে—

মরণ যেদিন আসবে আমার দুয়ারে।

কত শরৎ বসন্তরাত,

কত সন্ধ্য, কত প্রভাত

জীবনপাত্রে কত যে রস বরষে;

কতই ফলে কতই ফুলে

হৃদয় আমার ভরি তুলে

দুঃখ সুখের আলো ছায়ার পরশে।

যা কিছু মোর সঞ্চিত ধন

এত দিনের সব আয়োজন

চরমদিনে সাজিয়ে দিব উহারে

মরণ যেদিন আসবে আমার দুয়ারে।

২৫ আষাঢ় ১৩১৭

১১৬

১১৬

দয়া করে ইচ্ছা করে আপনি ছােট হয়ে

এস তুমি এ ক্ষুদ্র আলয়ে।

তাই তােমার মাধুর্য সুধা

ঘুচায় আমার আঁখির ক্ষুধা,

জলে স্থলে দাও যে ধরা

কত আকার লয়ে।

বন্ধু হয়ে পিতা হয়ে জননী হয়ে।

আপনি তুমি ছােট হয়ে এস হৃদয়ে।

আমিও কি আপন হাতে

করব ছােট বিশ্বনাথে?

জানাব আর জানব তােমায়

ক্ষুদ্র পরিচয়ে?

২৬ আষাঢ় ১৩১৭

১১৭

১১৭

ওগো আমার এই জীবনের শেষ পরিপূর্ণতা

মরণ, আমার মরণ, তুমি কও আমারে কথা

সারাজনম তােমার লাগি

প্রতিদিন যে আছি জাগি,

তােমার তরে বহে বেড়াই

দুঃখসুখের ব্যথা;

মরণ, আমার মরণ, তুমি

কও আমারে কথা।

যা পেয়েছি, যা হয়েছি,

যা কিছু মাের আশা

না জেনে ধায় তােমার পানে

সকল ভালবাসা।

মিলন হবে তােমার সাথে,

একটি শুভ দৃষ্টিপাথে,

জীবনবধূ হবে তােমার

নিত্য অনুগত্য,

মরণ, আমার মরণ, তুমি

কও আমারে কথা।

বরণমালা গাথা আছে

আমার চিত্তমাঝে,

কবে নীরব হাস্যমুখে

আসবে বরের সাজে!

সেদিন আমার রবেনা ঘর,

কেই বা আপন, কেই বা অপর

বিজন রাতে পতির সাথে

মিলবে পতিব্রতা

মরণ, আমার মরণ, তুমি

কও আমারে কথা।

২৬ আষাঢ় ১৩১৭

১১৮

১১৮

যাত্রী আমি ওরে।

পারবেনা কেউ রাখতে আমায় ধরে।

দুঃখসুখের বাঁধন সবই মিছে,

বাঁধা এ ঘর রইবে কোথায় পিছে,

বিষয়বােঝা টানে আমায় নীচে,

ছিন্ন হয়ে ছড়িয়ে যাবে পড়ে।

যাত্রী আমি ওরে।

চলতে পথে গান গাহি প্রাণ ভরে।

দেহ-দুর্গে খুলবে সকল দ্বার,

ছিন্ন হবে শিকল বাসনার,

ভাল মন্দ কাটিয়ে হব পার

চল্তে‌ রব লােকে লােকান্তরে!

যাত্রী আমি ওরে।

যা কিছু ভার যাবে সকল সরে।

আকাশ আমায় ডাকে দূরের পানে

ভাষাবিহীন অজানিতের গানে

সকাল সাঁঝে পরাণ মম টানে

কাহার বাঁশি এমন গভীর স্বরে!

যাত্রী আমি ওরে-

বাহির হলেম না জানি কোন ভােরে।

তখন কোথাও গায়নি কোনাে পাখী,

কি জানি রাত কতই ছিল বাকি,

নিমেষহারা শুধু একটি আঁখি

জেগে ছিল অন্ধকারের পরে।

যাত্রী আমি ওরে।

কোন দিনান্তে পৌছব কোন ঘরে।

কোন তারকা দীপ জ্বালে সেইখানে

বাতাস কঁদে কোন কুসুমের ঘ্রাণে,

কে গো সেথায় স্নিগ্ধ দুনয়নে,

অনাদিকাল চাহে আমার তরে।

২৬ আষাঢ় ১৩১৭}}

১১৯

১১৯

উড়িয়ে ধ্বজা অভ্রভেদী রথে

ঐ যে তিনি, ঐ যে বাহির পথে।

আয়রে ছুটে, টানতে হবে রসি,

ঘরের কোণে রইলি কোথায় বসি?

ভিড়ের মধ্যে ঝাপিয়ে পড়ে গিয়ে

ঠাই করে তুই নেরে কোনােমতে।

কোথায় কি তাের আছে ঘরের কাজ,

সে সব কথা ভুলতে হবে আজ।

টানরে দিয়ে সকল চিত্তকায়া,

টানরে ছেড়ে তুচ্ছ প্রাণের মায়া,

চরে টেনে আলােয় অন্ধকারে

নগর গ্রামে অরণ্যে পৰ্বতে।

ঐ যে চাকা ঘুরছে ঝনঝনি,

বুকের মাঝে শুনচ কি সেই ধ্বনি?

রক্তে তােমার দুলচে না কি প্রাণ?

গাইচে না মন মরণজয়া গান?

আকাক্ষা তাের বন্যাবেগের মত

ছুটচে না কি বিপুল ভবিষ্যতে?

৬ আষাঢ় ১৩১৭

১২০

১২০

ভজন পূজন সাধন আরাধনা

সমস্ত থাক পড়ে

রুদ্ধদ্বারে দেবালয়ের কোণে

কেন আছিস্ ওরে?

অন্ধকারে লুকিয়ে আপন মনে

কাহারে তুই পূজিস্‌ সঙ্গোপনে,

নয়ন মেলে দেখ্‌, দেখি তুই চেয়ে

দেবতা নাই ঘরে।

তিনি গেছেন যেথায় মাটি ভেঙে

করচে চাষা চাষ,-

পাথর ভেঙে কাট্চে‌ যেথায় পথ

খাট্ চে‌ বারাে মাস।

রৌদ্রে জলে আছেন সবার সাথে,

ধূলা তাঁহার লেগেছে দুই হাতে;

তাঁরি মতন শুচি বসন ছাড়ি

আয়রে ধূলার পরে।

মুক্তি? ওরে মুক্তি কোথায় পাবি,

মুক্তি কোথায় আছে?

আপ্‌নি প্রভু সৃষ্টিবাঁধন পরে’

বাঁধা সবার কাছে।

রাখােরে ধ্যান, থাকরে ফুলের ডালি,

ছিঁড়ুক বস্ত্র, লাগুক্‌ ধূলাবালি,

কর্ম্মযােগে তাঁর সাথে এক হয়ে

ঘর্ম্ম পড়ুক্‌ ঝরে॥

২৭ আষাঢ় ১৩১৭

১২১

১২১

সীমার মাঝে, অসীম, তুমি

বাজাও আপন সুর।

আমার মধ্যে তােমার প্রকাশ

তাই এত মধুর।

কত বর্ণে কত গন্ধে,

কত গানে কত ছন্দে,

অরূপ, তােমার রূপের লীলায়

জাগে হৃদয়-পুর।

আমার মধ্যে তােমার শােভা

এমন সুমধুর।

তোমায় আমায় মিলন হলে

সকলি যায় খুলে,-

বিশ্বসাগর ঢেউ খেলায়ে।

উঠে তখন দুলে।

তােমার আলােয় নাই ত ছায়া,

আমার মাঝে পায় সে কায়া,

হয় সে আমার অশ্রুজলে

সুন্দর বিধুর।

আমার মধ্যে তােমার শােভা

এমন সুমধুর।

২৭ আষাঢ় ১৩১৭

১২২

১২২

তাই তােমার আনন্দ আমার পর

তুমি তাই এসেছ নীচে।

আমায় নইলে, ত্রিভূবনেশ্বর,

তােমার প্রেম হত যে মিছে

আমায় নিয়ে মেলেছ এই মেলা,

আমার হিয়ায় চলচে রসের খেলা,

মাের জীবনে বিচিত্ররূপ ধরে

তােমার ইচ্ছা তরঙ্গিছে

তাইত তুমি রাজার রাজা হয়ে

তবু আমার হৃদয় লাগি

ফিরচ কত মনােহর-বেশে,

প্রভু নিত্য আছ জাগি।

তাই ত, প্রভু, যেথায় এল নেমে

তােমারি প্রেম ভক্ত প্রাণের প্রেমে,

মত্তি তােমার যুগল-সম্মিলনে

সেথায় পূর্ণ প্রকাশিছে।

২৮ আষাঢ় ১৩১৭

১২৩

১২৩

মানের আসন, আরাম শয়ন

নয় ত তােমার তরে

সব ছেড়ে আজ খুসি হয়ে

চল পথের পরে।

এস বন্ধু তােমরা সবে

এক সাথে সব বাহির হবে,

আজকে যাত্রা করব মােরা

অমানিতের ঘরে।

নিন্দা পরব ভূষণ করে

কাঁটার কণ্ঠহার,

মাথায় করে তুলে লব

অপমানের ভার;

দুঃখীর শেষ আলয় যেথা।

সেই ধূলাতে লুটাই মাথা,

ত্যাগের শূন্যপাত্রটি নিই

আনন্দরস ভরে।

২৯ আষাঢ় ১৩১৭

১২৪

১২৪

প্রভুগৃহ হতে আসিলে যে দিন

বীরের দল

সেদিন কোথায় ছিল যে লুকানাে

বিপুল বল!

কোথায় বর্ম্ম, অস্ত্র কোথায়,

ক্ষীণ দরিদ্র অতি অসহায়,

চারিদিক হতে এসেছে আঘাত

অনর্গল,

গৃহ হতে আসিলে যে দিন

বীরের দল॥

প্রভুগৃহমাঝে ফিরিলে যেদিন

বীরের দল

সে দিন কোথায় লুকালো আবার

বিপুল বল!

ধনুশর অসি কোথা গেল খসি,

শন্তির হাসি উঠিল বিকশি;

চলে গেলে রাখি সারা জীবনের

সকল বল,

প্রভুগৃহ মাঝে ফিরিলে যে দিন

বীরের দল॥

৩১ আষাঢ় ১৩১৭

১২৫

১২৫

ভেবেছিনু মনে যা হবার তারি শেষে

যাত্রা আমার বুঝি থেমে গেছে এসে।

নাই বুঝি পথ, নাই বুঝি আর কাজ,

পাথেয় যা ছিল ফুরিয়েছে বুঝি আজ,

যেতে হবে সরে নীরব অন্তরালে

জীর্ণ জীবনে ছিন্ন মলিন বেশে।

কি নিরখি আজি, একি অফুরান লীল,

এ কি নবীনতা বহে অন্তঃশীলা!

পুরাতন ভাষা মরে এল যবে মুখে,

নবগান হয়ে গুমরি উঠিল বুকে,

পুরাতন পথ শেষ হয়ে গেল যেথা

সেথায় আমারে আনিলে নূতন দেশে।

৩১ আষাঢ় ১৩১৭

১২৬

১২৬

আমার এ গান ছেড়েছে তার

সকল অলঙ্কার

তােমার কাছে রাখেনি আর

সাজের অহঙ্কার!

অলঙ্কার যে মাঝে পড়ে,

মিলনেতে আড়াল করে,

তােমার কথা ঢাকে যে তার

মুখর ঝঙ্কার।

তােমার কাছে খাটে না মাের

কবির গরব করা,

মহাকবি, তােমার পায়ে

দিতে চাই যে ধরা

জীবন লয়ে যতন করি

যদি সরল বাঁশি গড়ি,

আপন সুরে দিবে ভরি

সকল ছিদ্র তার।

১ শ্রবণ ১৩১৭

১২৭

১২৭

নিন্দা দুঃখে অপমানে

যত আঘাত খাই

তবু জানি কিছুই সেথা

হারাবার ত নাই।

থাকি যখন ধূলার পরে

ভাবতে হয় না আসন তরে,

দৈন্যমাঝে অসঙ্কোচে

প্রসাদ তব চাই।

লােকে যখন ভাল বলে,

যখন সুখে থাকি,

জানি মনে তাহার মাঝে

অনেক আছে ফাঁকি।

সেই ফাঁকিরে সাজিয়ে লয়ে

ঘুরে বেড়াই মাথায় বয়ে,

তােমার কাছে যাব এমন

সময় নাহি পাই।

২ শ্রাবণ ১৩১৭

১২৮

১২৮

রাজার মত বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে,

পরাও যারে মণি রতন হার,-

খেলাধূলা আনন্দ তার সকলি যায় ঘুরে,

বসন ভূষণ হয় যে বিষম ভার।

ছেঁড়ে পাছে আঘাত লাগি,

পাছে ধূলায় হয় সে দাগী,

আপনাকে তাই সরিয়ে রাখে সবার হতে দূরে

চলতে গেলে ভাবনা ধরে তার,-

বাজার মত বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে

পরাও যারে মণি রতন হার।

কি হবে মা অমনতর রাজার মত সাজে,

কি হবে ঐ মণিরতন হারে!

দুয়ার খুলে দাও যদি ত ছুটি পথের মাঝে

রৌদ্র বায়ু ধূলা কাদার পাড়ে।

যেথায় বিশ্বজনের মেলা,

সমস্ত দিন নানান খেলা,

চারিদিকে বিরাট গাথা বাজে হাজার সুরে,

সেথায় সে যে পায় না অধিকার,-

রাজার মত বেশে তুমি সাজাও যে শিশুরে

পরাও যারে মণি রতন হার।

২ শ্রাবণ ১৩১৭

১২৯

১২৯

জড়িয়ে গেছে সরু মােটা

দুটো তারে

জীবন বীণা ঠিক সুরে তাই

বাজে নারে।

এই বেসুরাে জটিলতায়

পরাণ আমার মরে ব্যথায়,

হঠাৎ আমার গান থেমে যায়

বারে বারে।

জীবন বীণা ঠিক সুরে আর

বাজে নারে।

এই বেদন; বহিতে আমি

পারি না যে,

তোমার সভার পথে এসে

মরি লাজে।

তােমার যারা গুণী আছে

বসতে নারি তাদের কাছে,

দাঁড়িয়ে থাকি সবার পাছে

বাহির দ্বারে।

জীবন বীণা ঠিক সুরে আর

বাজে নারে।

৩ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩০

১৩০

গাবার মত হয়নি কোন গান,

দেবার মত হয়নি কিছু দান।

মনে যে হয় সবি রইল বাকি

তােমায় শুধু দিয়ে এলাম ফাঁকি,

কবে হবে জীবন পূর্ণ করে

এই জীবনের পূজা অবসান!

আর সকলের সেবা করি যত

প্রাণপণে দিই অর্ঘ্য ভরি ভরি।

সত্য মিথ্যা সাজায়ে দিই কত

দীন বলিয়া পাছে ধরা পড়ি।

তােমার কাছে গােপন কিছু নাই,

তােমার পূজার সাহস এত তাই,

যা আছে তাই পায়ের পাছে আনি

অনাবৃত দরিদ্র এই প্রাণ।

৭ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩১

১৩১

আমার মাঝে তােমার লীলা হবে

তাই ত আমি এসেছি এই ভবে

এই ঘরে সব খুলে যাবে দ্বার,

ঘুচে যাবে সকল অহঙ্কার,

আনন্দময় তােমার এ সংসারে

আমার কিছু আর বাকি না রবে।

মরে গিয়ে বাঁচব আমি তবে,

আমার মাঝে তােমার লীলা হবে :

সব বাসনা যাবে আমার থেমে

মিলে গিয়ে তােমার এক প্রেমে,

দুঃখ সুখের বিচিত্র জীবনে

তুমি ছাড়া আর কিছু না রবে।

৭ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩২

১৩২

দুঃস্বপন কোথা হতে এসে

জীবনে বাধায় গণ্ডগােল।

কেঁদে উঠে জেগে দেখি শেষে

কিছু নাই, আছে মার কোল।

ভেবেছিনু আর কেহ বুঝি,

ভয়ে তাই প্রাণপণে বুঝি,

তব হাসি দেখে আজ বুঝি

তুমিই দিয়েছ মােরে দোল।

এ জীবন সদা দেয় নাড়া

লয়ে তার সুখদুখ ভয়;

কিছু যেন নাই গাে সে ছাড়া

সেই যেন মাের সমুদয়।

এ ঘাের কাটিয়া যাবে চোখে

নিমেষেই প্রভাত আলােকে,

পরিপূর্ণ তােমার সম্মুখে

থেমে যাবে সকল কল্লোল।

৮ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩৩

১৩৩

গান দিয়ে হে তােমায় খুঁজি

বাহির মনে

চির দিবস মাের জীবনে।

নিয়ে গেছে গান আমারে

ঘরে ঘরে দ্বারে দ্বারে,

গান দিয়ে হাত বুলিয়ে বেড়াই

এই ভুবনে।

কত শেখা সেই শেখালাে,

কত গােপন পথ দেখালাে,

চিনিয়ে দিল কত তারা

হৃদগগনে।

বিচিত্র সুখদুখের দেশে

রহস্যলােক ঘুরিয়ে শেষে

সন্ধ্যাবেলায় নিয়ে এল

কোন ভবনে।

৯ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩৪

১৩৪

তোমায় খোঁজা শেষ হবে না মাের,

যবে আমার জনম হবে ভাের।

চলে যাব নবজীবনলােকে

নূতন দেখা জাগবে আমার চোখে

নবীন হয়ে নূতন সে আলােকে

পরব তব নবমিলন ডাের।

তােমায় খোঁজা শেষ হবেনা মাের।

তােমার অন্ত নাই গাে অন্ত নাই,

বারে বারে নূতন লীলা তাই।

আবার তুমি জানিনে কোন বেশে

পথের মাঝে দাড়াবে নাথ হেসে,

আমার এ হাত ধরবে কাছে এসে,

লাগবে প্রাণে নূতন ভাবের ঘাের।

তােমায় খোঁজা শেষ হবেনা মোর।

১০ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩৫

১৩৫

যেন শেষ গানে মাের সব রাগিণী পূরে,-

আমার সব আনন্দ মেলে তাহার সুরে।

যে আনন্দে মাটির ধরা হাসে

অধীর হয়ে তরুলতায় ঘাসে,

যে আনন্দে দুই পাগলের মত

জীবন-মরণ বেড়ায় ভুবন ঘুরে-

সেই আনন্দ মেলে তাহার সুরে।

যে আনন্দ আসে ঝড়ের বেশে,

ঘুমন্ত প্রাণ জাগায় অট্ট হাসে।

যে আনন্দ দাঁড়ায় আঁখি জলে

দুঃখব্যথার রক্ত শতদলে,

যা আছে সব ধূলায় ফেলে দিয়ে

যে আনন্দে বচন নাহি ফুরে-

সেই আনন্দ মেলে তাহার সুরে

২২ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩৬

১৩৬

যখন আমায় বাঁধ আগে পিছে,

মনে করি আর পাবনা ছাড়া।

যখন আমায় ফেল তুমি নীচে

মনে করি আর হব না খাড়া।

আবার তুমি দাও যে বাঁধন খুলে,

আবার তুমি নাও আমারে তুলে,

চিরজীবন বাহুদোলায় তব

এমনি করে কেবলি দাও নাড়া

ভয় লাগায়ে তন্দ্রা কর ক্ষয়,

ঘুম ভাঙায়ে তখন ভাঙ ভয়।

দেখা দিয়ে ডাক দিয়ে যাও প্রাণে,

তাহার পরে লুকাও যে কোন খানে,

মনে করি এই হারালেম বুঝি,

কোথা কতে আবার যে দাও সাড়া।

১১ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩৭

১৩৭

যতকাল তুই শিশুর মত

রইবি বলহীন,

অন্তরেরি অন্তঃপুরে

থাকবে ততদিন।

অল্প ঘায়ে পড়বি ঘুরে,

অল্প দাহে মরবি পুড়ে,

অল্প গায়ে লাগবে ধূলা

করবে যে মলিন-

অন্তরেরি অন্তঃপুরে

থাকবে ততদিন॥

যখন তােমার শক্তি হবে

উঠবে ভরে প্রাণ,

আগুন-ভরা সুধা তাঁহার

করবি যখন পান,-

বাইরে তখন বাসাবে ছুটে,

থাকবি শুচি ধূলায় লুটে,

সকল বাঁধন অঙ্গে নিয়ে

বেড়াবি স্বাধীন,-

অন্তরেরি অন্তঃপুরে

থাকরে ততদিন॥

১৪ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩৮

১৩৮

আমার চিত্ত তােমায় নিত্য হবে

সত্য হবে-

ওগো সত্য, আমার এমন সুদিন

ঘট্‌বে কবে!

সত্য সত্য সত্য জপি,

সকল বুদ্ধি সত্যে সপি,

সীমার বাঁধন পেরিয়ে যাব

নিখিল ভবে

সত্য, তােমার পূর্ণ প্রকাশ

দেখ্ ব‌ কবে।

তােমায় দূরে সরিয়ে, মরি

আপন অসত্যে।

কি যে কাণ্ড করিগাে সেই

ভূতের রাজত্বে!

আমার আমি ধুয়ে মুছে,

তােমার মধ্যে যাবে ঘুচে,

সত্য, তােমায় সত্য হব

বাঁচব তবে,-

তােমার মধ্যে মরণ আমার

মরবে কবে।

১৫ শ্রাবণ ১৩১৭

১৩৯

১৩৯

তােমায় আমার প্রভু করে রাখি

আমার আমি সেইটুকু থাক্ বাকি।

তােমায় আমি হেরি সকল দিশি,

সকল দিয়ে তােমার মাঝে মিশি,

তোমারে প্রেম জোগাই দিবানিশি

ইচ্ছা আমার সেইটুকু থাক্ বাকি।

তােমায় আমার প্রভু করে রাখি।

তােমায় আমি কিছুতেই না ঢাকি

কেবল আমার সেইটুকু থাক্‌ বাকি।

তােমার লীলা হবে এ প্রাণ ভরে’

এ সংসারে রেখেছ তাই ধরে,

রইব বাঁধা তােমার বাহুডােরে

বাঁধন আমার সেইটুকু থাক্ বাকি।-

তােমায় আমার প্রভু করে রাখি॥

১৫ শাবণ ১৩১৭

১৪০

১৪০

যা দিয়েছ আমায় এ প্রাণ ভরি

খেদ রবেনা এখন যদি মরি।

রজনীদিন কত দুঃখে সুখে

কত যে সুর বেজেছে এই বুকে,

কত বেশে আমার ঘরে ঢুকে

কতরূপে নিয়েছ মন হরি’

খেদ রবেনা এখন যদি মরি॥

জানি তােমায় নিইনি প্রাণে বরি,

পাইনি আমার সকল পূর্ণ করি।

যা পেয়েছি ভাগ্য বলে মানি,

দিয়েছ ত তব পরশখানি,

আছ তুমি এই জানা ত জানি-

যাব ধরি সেই ভরসার তরী।

খেদ রবেনা এখন যদি মরি॥

১৬ শাবণ ১৩১৭

১৪১

১৪১

ওরে মাঝি ওরে আমার

মানবজন্মতরীব মাঝি,

শুনতে কি পাস দূরের থেকে

পারের বাঁশি উঠচে বাজি।

তরী কি তাের দিনের শেষে

ঠেকবে এবার ঘাটে এসে?

সেথায় সন্ধ্যা-অন্ধকারে

দেয় কি দেখা প্রদাপরাজি?

যেন আমার লাগচে মনে,

মন্দ মধুর এই পবনে

সিন্ধুপারের হাসিটি কার

আঁধার বেয়ে আচে আজি।

আসার বেলায় কুসুমগুলি

কিছু এনেছিলেম তুলি,

যে গুলি তার নবীন আছে

এই বেলা নে সাজিয়ে সাজি॥

১৮ শ্রাবণ ১৩১৭

১৪২

১৪২

মনকে, আমার কায়াকে,

আমি একেবারে মিলিয়ে দিতে

চাই, এ কালো ছায়াকে।

ঐ আগুনে জ্বলিয়ে দিতে,

ঐ সাগরে তলিয়ে দিতে,

ঐ চরণে গলিয়ে দিতে,

দলিয়ে দিতে মায়াকে,-

মনকে, আমার কায়াকে।

যেখানে যাই সেথায় একে,

আসন জুড়ে বসতে দেখে

লাজে মরি, লওগাে হরি’

এই সুনিবিড় ছায়াকে

মনকে, আমার কায়াকে।

তুমি আমার অনুভাবে

কোথাও নাহি বাধা পাবে,

পূর্ণ একা দেবে দেখা

সরিয়ে দিয়ে মায়াকে

মনকে, আমার কায়াকে॥

১৯ শ্রবণ ১৩১৭

১৪৩

১৪৩

আমার নামটা দিয়ে ঢেকে রাখি যারে।

মরচে সে এই নামের কারাগারে।

সকল ভুলে যতই দিবারাতি

নামটারে ঐ আকাশ পানে গাথি,

ততই আমার নামের অন্ধকারে।

হারাই আমার সত্য আপনারে॥

জড় করে ধূলির পরে ধূলি

নামটারে মাের উচ্চ করে তুলি,

ছিদ্র পাছে হয়রে কোনােখানে

চিত্ত মম বিরাম নাহি মানে,

যতন করি যতই এ মিথ্যারে

ততই আমি হারাই আপনারে॥

২১ শ্রাবণ ১৩১৭

১৪৪

১৪৪

নামটা যেদিন ঘুচাবে নাথ

বাচব সেদিন মুক্ত হয়ে—

আপন-গড়া স্বপন হতে

তোমার মধ্যে জনম লয়ে।

ঢেকে তোমার হাতের লেখা

কাটি নিজের নামের রেখা,

কতদিন আর কাটবে জীবন

এমন ভাষণ আপদ বয়ে।

সবার সজ্জা হরণ করে

আপনাকে সে সাজাতে চায়।

সকল সুরকে ছাপিয়ে দিয়ে

আপ্‌নাকে সে বাজাতে চায়।

আমার এ নাম যাকনা চুকে,

তোমারি নাম নেব মুখে,

সবার সঙ্গে মিলব সেদিন

বিনা-নামের পরিচয়ে

২১ শ্রাবণ ১৩১৭

১৪৫

১৪৫

জড়ায়ে আছে বাধা, ছাড়ায়ে যেতে চাই,

ছাড়াতে গেলে ব্যথা বাজে।

মুক্তি চাহিবারে তোমার কাছে যাই

চাহিতে গেলে মরি লাজে।

জানিহে তুমি মম জীবনে শ্রেয়তম,

এমন ধন আর নাহি যে তোমাসম,

তবু যা ভাঙাচোরা ঘরেতে আছে পোর;

ফেলিয়া দিতে পারি না যে।

তোমারে আবরিয়া ধূলাতে ঢাকে হিয়া

মরণ আনে রাশি রাশি,

আমি যে প্রাণ ভরি তাদের ঘৃণা করি

তবুও তাই ভালবাসি।

এতই আছে বাকি, জমেছে এত ফাঁকি,

কত যে বিফলতা, কত যে ঢাকাঢাকি,

আমার ভালো তাই চাহিতে যবে যাই

ভয় যে আসে মনোমাঝে।

২২ শ্রাবণ ১৩১৭

১৪৬

১৪৬

তোমার দয়া যদি

চাহিতে নাও জানি

তবুও দয়া করে

চরণে নিয়ো টানি।

আমি যা গড়ে তুলে

আরামে থাকি ভুলে

সুখের উপাসনা

করিগো ফলে ফুলে-

সে ধূলা-খেলাঘরে

রেখোনা ঘৃণা ভরে,

জাগায়ো দয়া করে

বহ্নি-শেল হানি।

সত্য মুদে আছে

দ্বিধার মাঝখানে;

তাহারে তুমি ছাড়া

ফুটাতে কেবা জানে।

মৃত্যু ভেদ করি

অমৃত পড়ে ঝরি,

অতল দীনতার

শূন্য উঠে ভরি

পতন ব্যথা মাঝে

চেতনা আসি বাজে,

বিরোধ কোলাহলে

গভীর তব বাণী।

২২ শ্রাবণ ১৩১৭

১৪৭

১৪৭

জীবনে যত পূজা

হল না সারা,

জানিহে জানি তাও

হয়নি হারা,

যে ফুল না ফুটিতে

ঝরেছে ধরণীতে,

যে নদী মরুপথে

হারাল ধরা

জানিহে জানি তাও

হয়নি হারা॥

জীবনে আজো যারা

রয়েছে পিছে,

জানিহে জানি তাও

হয়নি মিছে

আমার অনাগত,

আমার অনাহত

তোমার বীণা তারে

বাজিছে তারা,

জানিহে জানি তাও

হয়নি হারা॥

২৩ শ্রাবণ ১৩১৭

১৪৮

১৪৮

একটি নমস্কারে, প্রভু,

একটি নমস্কারে

সকল দেহ লুটিয়ে পড়ুক

তোমার এ সংসারে।

ঘন শ্রাবণ মেঘের মত

রসের ভারে নম নত

একটি নমস্কারে, প্রভু,

একটি নমস্কারে

সমস্ত মন পড়িয় থাক

তব ভবনদ্বারে।

নানা সুরের আকুল ধারা

মিলিয়ে দিয়ে, আত্মহাবা

একটি নমস্কারে, প্রভু,

একটি নমস্কারে

সমস্ত গান সমাপ্ত হোক্‌

নাবব পারাবারে।

হংস যেমন মানসযাত্রা,

তেম্‌নি সারা দিবস রাত্রি

একটি নমস্কারে, প্রভু,

একটি নমস্কারে

সমস্ত প্রাণ উড়ে চলুক

মহামরণ পারে।

২৩ শ্রাবণ ১৩১৭

১৪৯

১৪৯

জীবনে যা চিরদিন

বয়ে গেছে আভাসে

প্রভাতের আলোকে যা

ফোটে নাহি প্রকাশে,

জীবনের শেষ দানে

জীবনের শেষ গানে

হে দেবতা তাই আজি

দিব তব সকাশে,

প্রভাতের আলোকে যা

ফোটে নাই প্রকাশে।

কথা তারে শেষ করে

পারে নাই বাঁধিতে,

গান তারে সুর দিয়ে

পারে নাই সাধিতে।

কি নিভৃতে চুপে চুপে

মোহন নবীনরূপে

নিখিল নয়ন হতে

ঢাকা ছিল সখা সে।

প্রভাতের আলোকে ত

ফোটে নাই প্রকাশে।

ভ্রমেছি তাহারে লয়ে

দেশে দেশে ফিরিয়া

জীবনে যা ভাঙা গড়া

সবি তারে ঘিরিয়া

সব ভাবে সব কাজে

আমার সবার মাঝে

শয়নে স্বপনে থেকে

তবু ছিল এক সে

প্রভাতের আলোকে ত

ফোটে নাই প্রকাশে;

কতদিন কত লোকে

চেয়েছিল উহারে,

বৃথা ফিরে গেছে তারা

বাহিরের দুয়ারে!

আর কেহ বুঝিবে না,

তোমা সাথে হবে চেনা

সেই আশা লয়ে ছিল

আপনারি আকাশে,

প্রভাতের আলোকে ত

ফোটে নাই প্রকাশে

২৪ শ্রাবণ ১৩১৭

১৫০

১৫০

তোমার সাথে নিত্য বিরোধ

আর সহে না,—

দিনে দিনে উঠ্‌চে জমে

কতই দেনা।

সবাই তোমায় সভার বেশে

প্রণাম করে গেল এসে,

মলিন বাসে লুকিয়ে বেড়াই

মান রহে না।

কি জানাব চিত্ত বেদন

বোবা হয়ে গেছে যে মন,

তোমার কাছে কোনো কথাই

আর কহে না।

ফিরায়োনা এবার তাবে

লওগো অপমানের পারে,

কর তোমার চরণ তলে

চির-কেনা।

২৫ শ্রাবণ ১৩১৭

১৫১

১৫১

প্রেমের হাতে ধরা দেব

তাই রয়েছি বসে;

অনেক দেরী হয়ে গেল,

দোষী অনেক দোষে।

বিধি বিধান বাঁধন ডোরে

ধরতে আসে, যাই যে সরে,

তার লাগি যে শাস্তি নেবার

নেব মনের তোষে।

প্রেমের হাতে ধরা দেব

তাই রয়েছি বসে।

লোকে আমায় নিন্দা করে,

নিন্দা সে নয় মিছে,

সকল নিন্দা মাথায় ধরে

রব সবার নীচে।

শেষ হয়ে যে গেল বেলা,

ভাঙল বেচা কেনার মেলা,

ডাকতে যারা এসেছিল

ফিরল তারা রোষে।

প্রেমের হাতে ধরা দেব

তাই রয়েছি বসে |

২৫ শ্রাবন ১৩১০

১৫২

১৫২

সংসারেতে আর যাহারা

আমায় ভালবাসে

তারা আমায় ধরে রাখে

বেঁধে কঠিন পাশে

তোমার প্রেম যে সবার বাড়

তাই তোমারি নূতন ধারা,

বাঁধনাক, লুকিয়ে থাক

ছেড়েই রাখ দাসে

আর সকলে, ভূলি পাছে

তাই রাখে না একা

দিনের পরে কাটে যে দিন,

তোমারি নেই দেখা।

তোমায় ডাকি নাই বা ডাকি,

যা খুসি তাই নিয়ে থাকি;

তোমার খুসি চেয়ে আছে

আমার খুসির আশে

২৫ শ্রাবণ ১৩১৭

১৫৩

১৫৩

প্রেমের দূতকে পাঠাবে নাথ কবে?

সকল দ্বন্দ ঘুচবে আমার তবে।

আর যাহারা আসে আমার ঘরে

ভয় দেখায়ে তারা শাসন করে,

দুবন্ত মন দুয়ার দিয়ে থাকে,

তার মানে না, ফিরায়ে দেয় সবে

সে এলে সব আগল যাবে ছুটে

সে এলে সব বাধন যাবে টুটে,

ঘবে তখন রাখ্‌বে কে আর ধরে

তার ডাকে যে সাড়া দিতেই হবে।

আসে যখন একলা আসে চলে,

গলায় তাহার ফুলের মালা দোলে,

সেই মালাতে বাধবে যখন টেনে

হৃদয় আমার নীরব হয়ে রবে॥

২৫ শ্রাবণ ১৩১৭

১৫৪

১৫৪

গান গাওয়ালে আমায় তুমি

কতই ছলে যে,

কত সুখের খেলায়, কত

নয়ন জলে হে।

ধরা দিয়ে দাওনা ধরা

এস কাছে, পালাও ত্বরা,

পবাণ কর ব্যথায় ভরা

পলে পলে হে।

গান গাওয়ালে এমনি করে,

কতই ছলে যে!

কত তীব্র ভাবে, তোমার

বীণা সাজাও যে,

শত ছিদ্র করে জীবন

বাঁশি বাজাও হে।

তব সুরের লালাতে মোর

জনম যদি হয়েছে ভোর,

চুপ করিয়ে রাখ এবার

চরণ তলে হে।

গান গাওয়ালে চিরজীবন

কতই ছলে যে।

২৫ শ্রাবণ ১৩১৭

১৫৫

১৫৫

মনে করি এইখানে শেষ

কোথা বা হয় শেষ!

আবার তোমার সভা থেকে

আসে যে আদেশ।

নূতন গানে নূতন রাগে

নূতন করে হৃদয় জাগে,

সুরের পথে কোথা যে যাই

না পাই সে উদ্দেশ।

সন্ধ্যাবেলার সোনার আভায়

মিলিয়ে নিয়ে তান

পূরবীতে শেষ করেছি

যখন আমার গান—

নিশীথ রাতের গভীর সুরে

আবার জীবন উঠে পূরে,

তখন আমার নয়নে আর

রয়না নিদ্রালেশ॥

২৫ শ্রাবণ ১৩১৭

১৫৬

১৫৬

শেষের মধ্যে অশেষ আছে,

এই কথাটি, মনে

আজ্‌কে আমার গানের শেষে

জাগ্‌চে ক্ষণে ক্ষণে।

সুর গিয়েছে থেমে, তবু

থাম্‌তে যেন চায় না কভু,

নীরবতায় বাজ্‌চে বীণা

বিনা প্রয়োজনে।

তারে যখন আঘাত লাগে

বাজে যখন সুরে-

সবার চেয়ে বড় যে গান

সে রয় বহুদূরে

সকল আলাপ গেলে থেমে

শাস্ত বীণায় আসে নেমে,

সন্ধ্যা যেমন দিনের শেষে

বাজে গভীর স্বনে॥

২৬ শ্রাবণ ১৩১৭

১৫৭

১৫৭

দিবস যদি সাঙ্গ হল, না যদি গাহে পাখী,

ক্লান্ত বায় যদি না আর চলে,—

এবার তবে গভীর করে’ ফেলগো মোরে ঢাকি

অতি নিবিড় ঘন তিমির তলে।

স্বপন দিয়ে গোপনে ধীরে ধীরে

যেমন করে ঢেকেছ ধরণীরে,

যেমন করে ঢেকেছ তুমি মুদিয়া-পড়া আঁখি,

ঢেকেছ তুমি রাতের শতদলে।

পাথেয় যার ফুরায়ে আসে পথের মাঝখানে,

ক্ষতির রেখা উঠেছে যার ফুটে,

বসনভূষা মলিন হল ধূলায় অপমানে,

শকতি যার পড়িতে চায় টুটে,—

ঢাকিয়া দিক তাহার ক্ষতব্যথা

করুণাঘন গভীর গোপনতা,

ঘুচায়ে লাজ ফুটাও তারে নবীন উষা পানে

কুড়ায়ে তারে আঁধার সুধাজলে॥

১০ শ্রাবন ১৩১৭