সোনার তরী (১৮৯৩)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৯৩
প্রকাশনা-তথ্য
সােনার তরী।
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রণীত।
কলিকাতা;
১২ নং রামকৃষ্ণ দাসের লেন, সাহিত্য-যন্ত্রে,
শ্রীযজ্ঞেশ্বর ঘােষ কর্ত্তৃক মুদ্রিত
৬ নং দ্বারকানাথ ঠাকুরের লেন হইতে
শ্রীকালিদাস চক্রবর্ত্তী কর্ত্তৃক প্রকাশিত।
১৩০০।
কবি-ভ্রাতা শ্রীদেবেন্দ্রনাথ সেন
মহাশয়ের কর-কমলে
তদীয় ভক্তের এই
প্রীতি-উপহার
সাদরে সমর্পিত
হইল।
অক্ষমা
অক্ষমা।
যেখানে এসেছি আমি, আমি সেথাকার,
দরিদ্র সন্তান আমি দীন ধরণীর!
জন্মাবধি যা পেয়েছি সুখদুঃখভার
বহু ভাগ্য বলে তাই করিয়াছি স্থির।
অসীম ঐশ্বর্য্যরাশি নাই তাের হাতে
হে শ্যামলা সর্ব্বসহা জননী মৃণ্ময়ী!
সকলের মুখে অন্ন চাহিস্ যােগাতে,
পারিস্ নে কতবার,-কই অন্ন কই
কাঁদে তোর সন্তানেরা স্নান শুষ্ক মুখ;-
জানি মাগাে, তাের হাতে অসম্পূর্ণ সুখ,
যা-কিছু গড়িয়া দিস্ ভেঙ্গে ভেঙ্গে যায়,
সব তা’তে হাত দেয় মৃত্যু সর্ব্বভুক্,
সব আশা মিটাইতে পারিস্নে হায়
তা বলে’ কি ছেড়ে যাব তাের তপ্ত বুক!
অচল স্মৃতি
অচল স্মৃতি।
আমার হৃদয়-ভূমি-মাঝখানে
জাগিয়া রয়েছে নিতি
অচল ধবল শৈল সমান
একটি অচল স্মৃতি।
প্রতিদিন ঘিরি ঘিরি
সে নীরব হিমগিরি
আমার দিবস আমার রজনী
আসিছে যেতেছে ফিরি।
যেথানে চরণ রেখেছে, সে মোর
মর্ম্ম গভীরতম,
উন্নত শির বয়েছে তুলিয়া
সকল উচ্চে মম।
মোর কল্পনা শত
রঙীন্ মেঘের মত
তাহারে ঘেরিয়া হাসিছে কাঁদিছে
সোহাগে হতেছে নত।
আমার শ্যামল তরুলতাগুলি
ফুল পল্লব ভারে
সরস কোমল বাহু-বেষ্টনে
বাঁধিতে চাহিছে তারে,
শিখর গগন-লীন
দুর্গম জনহীন,
বাসনা-বিহগ একেলা সেথায়
ধাইতেছে নিশিদিন।
চারিদিকে তার কত আসা-যাওয়া
কত গীত কত কথা,
মাঝখানে শুধু ধ্যানের মতন
নিশ্চল নীরবতা।
দূরে গেলে তবু, একা
সে শিখর যায় দেখা,
চিত্ত-গগনে আঁকা থাকে তার
নিত্য-নীহার-রেখা!
১১ অগ্রহায়ণ, ১৩০০।
অনাদৃত
অনাদৃত।
তখন তরুণ রবি প্রভাত কালে
আনিছে ঊষার পূজা সোনার থালে।
সীমাহীন নীল জল
করিতেছে থলথল,
রাঙা রেখা জ্বলজ্বল
কিরণ মালে।
তখন উঠিছে রবি গগন ভালে।
গাঁথিতেছিলাম জাল বসিয়া তীরে।
বারেক অতল পানে চাহিনু ধীরে;
শুনিনু কাহার বাণী,
পরাণ লইল টানি’,
যতনে সে জালখানি
তুলিয়া শিরে
ঘুরায়ে ফেলিয়া দিনু সুদূর নীরে।
নাহি জানি কত কি যে উঠিল জালে!
কোনটা হাসির মত কিরণ ঢালে,
কোনটা বা টলটল
কঠিন নয়ন জল,
কোনটা সরম ছল
বধূর গালে!
সে দিন সাগর তীরে প্রভাত কালে!
বেলা বেড়ে ওঠে, রবি ছাড়ি’ পূরবে
গগনের মাঝখানে ওঠে গরবে।
ক্ষুধা তৃষ্ণা সব ভুলি’
জাল ফেলে টেনে তুলি,
উঠিল গোধূলি ধূলি
ধূসর নভে।
গাভীগণ গৃহে ধায় হরষ রবে।
লয়ে দিবসের ভার ফিরিনু ঘরে,
তখন উঠিছে চাঁদ আকাশ পরে।
গ্রামপথে নাহি লোক,
পড়ে’ আছে ছায়ালোক,
মুদে আসে দুটি চোখ
স্বপন ভরে;
ডাকিছে বিরহী পাখী কাতর স্বরে।
সে তখন গৃহকাজ সমাধা করি’
কাননে বসিয়াছিল মালাটি পরি’
কুসুম একটি দুটি
তরু হতে পড়ে টুটি’,
সে করিছে কুটিকুটি
নখেতে ধরি’;
আলসে আপন মনে সময় হরি’।
বারেক আগিয়ে যাই বারেক পিছু।
কাছে গিয়ে দাঁড়ালেম নয়ন নীচু।
যা ছিল চরণে রেখে
ভূমিতল দিমু ঢেকে;
সে কহিল দেখে’ দেখে’
“চিনিনে কিছু!”
শুনি’ রহিলাম শির করিয়া নীচু!
ভাবিলাম, সারাদিন সারাটি বেলা
বসে’ বসে’ করিয়াছি কি ছেলেখেলা!
না জানি কি মোহে ভুলে’
গেনু অকুলের কূলে,
ঝাঁপ দিয়ে কুতূহলে
আনিনু মেলা
অজানা সাগর হতে অজানা ঢেলা!
যুঝি নাই, খুঁজি নাই হাটের মাঝে,
এমন হেলার ধন দেওয়া কি সাজে?
কোন দুখ নাহি যার,
কোন তৃষা বাসনার,
এ সব লাগিবে তার
কিসের কাজে?
কুড়ায়ে লইনু পুন মনের লাজে!
সারাটি রজনী বসি দুয়ার দেশে
একে একে ফেলে দিনু পথের শেষে!
সুখহীন ধনহীন
চলে গেনু উদাসীন;
প্রভাতে পরের দিন
পথিকে এসে’
সব তুলে’ নিয়ে গেল আপন দেশে!
২২ ফাল্গুন, ১২৯৯।
আকাশের চাঁদ
আকাশের চাঁদ।
হাতে তুলে দাও আকাশের চাঁদ—
এই হ’ল তার বুলি।
দিবস রজনী যেতেছে বহিয়া,
কাঁদে সে দু’হাত তুলি’।
হাসিছে আকাশ, বহিছে বাতাস,
পাখীরা গাহিছে সুখে।
সকালে রাখাল চলিয়াছে মাঠে,
বিকালে ঘরের মুখে।
বালক বালিকা ভাই বোনে মিলে
খেলিছে আঙ্গিনা-কোণে,
কোলের শিশুরে হেরিয়া জননী
হাসিছে আপন মনে।
কেহ হাটে যায় কেহ বাটে যায়
চলেছে যে যার কাজে,
কত জনরব কত কলরব
উঠিছে আকাশ মাঝে।
পথিকেরা এসে তাহারে শুধায়
“কে তুমি কাঁদিছ বসি?”
সে কেবল বসে নয়নের জলে
—হাতে পাই নাই শশি!
সকালে বিকালে ঝরি পড়ে কোলে
অযাচিত ফুলদল,
দখিণ সমীর বুলায় ললাটে
দক্ষিণ করতল।
প্রভাতের আলো আশীষ-পরশ
করিছে তাহার দেহে,
রজনী তাহারে বুকের আঁচলে
ঢাকিছে নীরব স্নেহে।
কাছে আসি শিশু মাগিছে আদর
কণ্ঠ জড়ায়ে ধরি’,
পাশে আসি যুবা চাহিছে তাহারে
লইতে বন্ধু করি’।
এই পথে গৃহে কত আনাগোনা,
কত ভালবাসাবাসি,
সংসারসুখ কাছে কাছে তার
কত আসে যায় ভাসি’,
মুখ ফিরাইয়া সে রহে বসিয়া,
কহে সে নয়নজলে,—
তোমাদের আমি চাহি না কারেও,
শশি চাই করতলে।
শশি যেথা ছিল সেথাই রহিল,
সেও বসে এক ঠাঁই।
অবশেষে যবে জীবনের দিন
আর বেশি বাকি নাই,
এমন সময়ে সহসা কি ভাবি
চাহিল সে মুখ ফিরে’,
দেখিল ধরণী শ্যামল মধুর
সুনীল সিন্ধুতীরে।
সোনার ক্ষেত্রে কৃষাণ বসিয়া
কাটিতেছে পাকা ধান,
ঘোট ঘোট তরী পাল তুলে’ যায়
মাঝি বসে’ গায় গান।
দূরে মন্দিরে বাজিছে কাঁসর,
বধূরা চলেছে ঘাটে,
মেঠো পথ দিয়ে গৃহস্থ জন
আসিছে গ্রামের হাটে।
নিশ্বাস ফেলি’ রহে আঁখি মেলি’
কহে ম্রিয়মাণ মন,
শশি নাহি চাই, যদি ফিরে পাই
আরবার এ জীবন!
দেখিল চাহিয়া জীবনপূর্ণ
সুন্দর লোকালয়
প্রতিদিবসের হরষে বিষাদে
চির-কল্লোলময়।
স্নেহসুধা ল’য়ে গৃহের লক্ষ্মী
ফিরিছে গৃহের মাঝে,
প্রতি দিবসেরে করিছে মধুর
প্রতিদিবসের কাজে।
সকাল, বিকাল, দুটি ভাই আসে
ঘরের ছেলের মত,
রজনী সবারে কোলেতে লইছে
নয়ন করিয়া নত।
ছোট ছোট ফুল, ছোট ছোট হাসি,
ছোট কথা, ছোট সুখ,
প্রতি নিমেষের ভালবাসাগুলি,
ছোট ছোট হাসিমুখ
আপনা-আপনি উঠিছে ফুটিয়া
মানবজীবন ঘিরি’,
বিজন শিখরে বসিয়া সে তাই
দেখিতেছে ফিরি ফিরি’।
দেখে বহুদুরে ছায়াপুরীসম
অতীত জীবন-রেখা,
অস্তরবির সোনার কিরণে
নূতন বরণে লেখা।
যাহাদের পানে নয়ন তুলিয়া
চাহে নি কখনো ফিরে
নবীন আভায় দেখা দেয় তারা
স্মৃতিসাগরের তীরে।
হতাশ হৃদয়ে কাঁদিয়া কাঁদিয়া
পূরবী রাগিণী বাজে,
দু’বাহু বাড়ায়ে ফিরে যেতে চায়
এই জীবনের মাঝে।
দিনের আলোক মিলায়ে আসিল
তবু পিছে চেয়ে রহে;—
যাহা পেয়েছিল তাই পেতে চায়
তার বেশি কিছু নহে।
সোনার জীবন রহিল পড়িয়া
কোথা সে চলিল ভেসে!
শশির লাগিয়া কাঁদিতে গেল কি
রবিশশিহীন দেশে!
২২ আষাঢ়, ১২৯৯।
আত্মসমর্পণ
আত্মসমর্পণ।
তােমার আনন্দগানে আমি দিব সুর
যাহা জানি দুয়েকটি প্রীতি-সুমধুর
অন্তরের গাথা; দুঃখের ক্রন্দনে
বাজিবে আমার কণ্ঠ বিষাদ-বিধুর
তােমার কণ্ঠের সনে; কুসুমে চন্দনে
তােমারে পূজিব আমি; পরাব সিন্দুর
তােমার সীমন্তে ভালে; বিচিত্র বন্ধনে
তােমারে বাঁধিব আমি; প্রমােদ-সিন্ধুর
তরঙ্গেতে দিব দোলা নব ছন্দে তানে!
মানব-আত্মার গর্ব্ব আর নাহি মাের,
চেয়ে তাের স্নিগ্ধশ্যাম মাতৃমুখ পানে,
ভাল বাসিয়াছি আমি ধুলি মাটি তাের!
জন্মেছি যে মর্ত্ত্য-কোলে ঘৃণা করি তারে
ছুটিব না স্বর্গ আর মুক্তি খুঁজিবারে!
৫ অগ্রহায়ণ, ১৩০০।
খেলা
খেলা।
হােক খেলা, এ খেলায় যোগ দিতে হবে
আনন্দ কল্লোলাকুল নিখিলের সনে!
সব ছেড়ে মৌন হয়ে কোথা বসে র’বে
আপনার অন্তরের অন্ধকার কোণে!
জেনাে মনে শিশু তুমি এ বিপুল ভবে
অনন্ত কালের কোলে, গগন-প্রাঙ্গণে,
যত জান মনে কর কিছুই জান না;
বিনয়ে বিশ্বাসে প্রেমে হাতে লহ তুলি’
বর্ণগন্ধগীতময় যে মহা খেলনা
তােমারে দিয়াছে মাতা; হয় যদি ধূলি
হােক্ ধুলি, এ ধূলির কোথায় তুলনা!
থেকো না অকালবৃদ্ধ বসিয়া একেলা,
কেমনে মানুষ হবে না করিলে খেলা!
গতি
গতি।
জানি আমি সুখে দুঃখে হাসি ও ক্রন্দনে
পরিপূর্ণ এ জীবন, কঠোর বন্ধনে
ক্ষতচিহ্ণ পড়ে’ যায় গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে,
জানি আমি সংসারের সমুদ্র সন্ধিতে
কারাে ভাগ্যে সুধা ওঠে, কারাে হলাহল;-
জানি না কেন এ সব, কোন্ ফলাফল
আছে এই বিশ্বব্যাপী কর্ম্ম-শৃঙ্খলার,-
জানি না কি হবে পরে, সবি অন্ধকার
আদি অন্ত এ সংসারে; নিখিল-দুঃখের
অন্ত আছে কি না আছে, সুখ-বুভুক্ষের
মিটে কি না চির-আশা! পণ্ডিতের দ্বারে
চাহি না এ জনম-রহস্য জানিবারে!
চাহি না ছিঁড়িতে একা বিশ্বব্যাপী ডোর,
লক্ষ কোটী প্রাণী সাথে এক গতি মাের!
গানভঙ্গ
গানভঙ্গ।
গাহিছে কাশিনাথ নবীন যুবা
ধ্বনিতে সভাগৃহ ঢাকি’,
কণ্ঠে খেলিতেছে সাতটি সুর
সাতটি যেন পোষা পাখী।
শাণিত তরবারি গলাটি যেন
নাচিয়া ফিরে দশদিকে,
কখন্ কোথা যায় না পাই দিশা,
বিজুলি-হেন ঝিকিমিকে।
আপনি গড়ি’ তোলে বিপদজাল
আপনি কাটি’ দেয় তাহা।
সভার লোকে শুনে অবাক্ মানে
সঘনে বলে বাহা বাহা!
কেবল বুড়া রাজা প্রতাপ রায়
কাঠের মত বসি আছে।
বরজলাল ছাড়া কাহারো গান
ভাল না লাগে তার কাছে।
বালকবেলা হ’তে তাহারি গীতে
দিল সে এতকাল যাপি’,
বাদল দিনে কত মেঘের গান,
হোলির দিনে কত কাফি!
গেয়েছে আগমনী শরৎপ্রাতে,
গেয়েছে বিজয়ার গান,
হৃদয় উছসিয়া অশ্রুজলে
ভাসিয়া গেছে দুনয়ান।
যখনি মিলিয়াছে বন্ধুজনে
সভার গৃহ গেছে পূরে,
গেয়েছে গোকুলের গোয়াল-গাথা
ভূপালী মূলতানী সুরে।
ঘরেতে বারবার এসেছে কত
বিবাহ-উৎসব রাতি,
পরেছে দাসদাসী লোহিত বাস
জ্বলেছে শত শত বাতি,
বসেছে নব বর সলাজ মুখে
পরিয়া মণি-আভরণ,
করিছে পরিহাস কানের কাছে
সমবয়সী প্রিয়জন,
সামনে বসি তার বরজলাল
ধরেছে সাহানার সুর;—
সে সব দিন আর সে সব গান
হৃদয়ে আছে পরিপূর।
সে ছাড়া কারো গান শুনিলে তাই
মর্ম্মে গিয়ে নাহি লাগে,
অতীত প্রাণ যেন মন্ত্রবলে
নিমেষে প্রাণে নাহি জাগে।
প্রতাপ রায় তাই দেখিছে শুধু
কাশির বৃথা মাথানাড়া,
সুরের পরে সুর ফিরিয়া যায়
হৃদয়ে নাহি পায় সাড়া।
থামিল গান যবে, ক্ষণেক তরে
বিরাম মাগে কাশিনাথ।
বরজলাল পানে প্রতাপ রায়
হাসিয়া করে আঁখিপাত।
কানের কাছে তার রাখিয়া মুখ,
কহিল, “ওস্তাদ জি,
গানের মত গান শুনায়ে দাও,
এবে কি গান বলে, ছি!
এ যেন পাখী লয়ে বিবিধ ছলে
শিকারী বিড়ালের খেলা!
সেকালে গান ছিল একালে হায়
গানের বড় অবহেলা!”
বরজলাল বুড়া শুক্লকেশ
শুভ উষ্ণীষ শিরে,
বিনতি করি’ সবে, সভার মাঝে
আসন নিল ধীরে ধীরে।
শিরা-বাহির-করা শীর্ণ করে
তুলিয়া নিল তানপুর,
ধরিল নতশিরে নয়ন মুদি’
ইমনকল্যাণ সুর।
কাঁপিয়া ক্ষীণ স্বর মরিয়া যায়
বৃহৎ সভাগৃহকোণে,
ক্ষুদ্র পাখী যথা ঝড়ের মাঝে
উড়িতে নারে প্রাণপণে।
বসিয়া বামপাশে প্রতাপ রায়
দিতেছে শত উৎসাহ-
“আহাহা, বাহা বাহা!”-কহিছে কানে
“গলা ছাড়িয়া গান গাহ!”
সভার লোকে সবে অন্যমনা,
কেহ বা কানাকানি করে।
কেহ বা তোলে হাই, কেহ বা ঢোলে,
কেহ বা চলে’ যায় ঘরে।
“ওরে রে আয় লয়ে তামাকু পান”
ভৃত্যে ডাকি কেহ কয়।
সঘনে পাখা নাড়ি’ কেহ বা বলে
“গরম আজি অতিশয়।”
করিছে আনাগোনা ব্যস্ত লোক,
ক্ষণেক নাহি রহে চুপ;
নীরব ছিল সভা, ক্রমশ সেথা
শব্দ উঠে শতরূপ।
বুড়ার গান তাহে ডুবিয়া যায়,
তুফান মাঝে ক্ষীণ তরি;
কেবল দেখা যায় তানপুরায়
আঙ্গুল কাঁপে থরথরি।
হৃদয়ে যেথা হ’তে গানের সুর
উছসি উঠে নিজ সুখে
হেলার কলরব শিলার মত
চাপে সে উৎসের মুখে।
কোথায় গান আর কোথায় প্রাণ,
দু’দিকে ধায় দুইজনে,
তবুও রাখিবারে প্রভুর মান
বরজ গায় প্রাণপণে।
গানের এক পদ মনের ভ্রমে
হারায়ে গেল কি করিয়া!
আবার তাড়াতাড়ি ফিরিয়া গাহে
লইতে চাহে শুধরিয়া।
আবার ভুলে’ যায়, পড়ে না মনে,
সরমে মস্তক নাড়ি’
আবার শুরু হতে ধরিল গান
আবার ভুলি দিল ছাড়ি’।
দ্বিগুণ থরথরি কাঁপিছে হাত,
স্মরণ করে গুরুদেবে।
কণ্ঠ কাঁপিতেছে কাতরে, যেন
বাতাসে দীপ নেবে-নেবে।
গানের পদ তবে ছাড়িয়া দিয়া
রাখিল সুরটুকু ধরি’,
সহসা হাহা রবে উঠিল কাঁদি
গাহিতে গিয়ে হা-হা করি’!
কোথায় দূরে গেল সুরের খেলা,
কোথায় তাল গেল ভাসি’,
গানের সুতা ছিঁড়ি’ পড়িল খসি’
অশ্রু-মুকুতার রাশি।
কোলের সখী তানপুরার পরে
রাখিল লজ্জিত মাথা,
ভুলিল শেখা গান, পড়িল মনে
বাল্য ক্রন্দন-গাথা।
নয়ন ছলছল প্রতাপ রায়
কর বুলায় তার দেহে।
“আইস, হেথা হ’তে আমরা যাই,”
কহিল সকরুণ স্নেহে।
শতেক দীপজ্বালা’ নয়ন-ভরা
ছাড়ি সে উৎসব ঘর
বাহিরে গেল দু’টি প্রাচীন সখা
ধরিয়া দুঁহু দোঁহা কর।
বরজ করযোড়ে কহিল, প্রভু,
মোদের সভা হ’ল ভঙ্গ।
এখন আসিয়াছে নূতন লোক
ধরায় নব নব রঙ্গ।
জগতে আমাদের বিজন সভা
কেবল তুমি আর আমি।
সেথায় আনিয়োনা নূতন শ্রোতা,
মিনতি তব পদে স্বামি!
একাকী গায়কের নহে ত গান,
মিলিতে হবে দুইজনে!
গাহিবে এক জন খুলিয়া গলা,
আরেক জন গাবে মনে!
তটের বুকে লাগে জলের ঢেউ
তবে সে কলতান উঠে,
বাতাসে বন-সভা শিহরি’ কাঁপে
তবে সে মর্ম্মর ফুটে!
জগতে যেথা যত রয়েছে ধ্বনি
যুগল মিলিয়াছে আগে।
যেখানে প্রেম নাই বোবার সভা,
সেখানে গান নাহি জাগে।
২৪ আষাঢ়, ১৩০০।
ঝুলন
ঝুলন।
আমি পরাণের সাথে খেলিব আজিকে
মরণ খেলা
নিশীথ বেলা!
সঘন বরষা গগন আঁধার
হের বারিধারে কাঁদে চারিধার,
ভীষণ রঙ্গে ভব তরঙ্গে
ভাসাই ভেলা;
বাহির হয়েছি স্বপ্ন শয়ন
করিয়া হেলা,
রাত্রি বেলা!
ওগো পবনে গগনে সাগরে আজিকে
কি কল্লোল!
দে দোল্ দোল্!
পশ্চাৎ হতে হাহা করে’ হাসি’
মত্ত ঝটিকা ঠেলা দেয় আসি’
যেন এ লক্ষ বক শিশুর
অট্ট রোল!
আকাশে পাতালে পাগলে মাতালে
হট্ট গোল!
দে দোল্ দোল্!
আজি জাগিয়া উঠিয়া পরাণ আমার
বসিয়া আছে
বুকের কাছে।
থাকিয়া থাকিয়া উঠিছে কাঁপিয়া,
ধরিছে আমার বক্ষঃ চাপিয়া,
নিঠুর নিবিড় বন্ধনসুখে
হৃদয় নাচে,
ত্রাসে উল্লাসে পরাণ আমার
ব্যাকুলিয়াছে
বুকের কাছে!
হায়, এতকাল আমি রেখেছিনু তারে
যতন ভরে
শয়ন পরে।
ব্যথা পাছে লাগে, দুখ পাছে জাগে
নিশিদিন তাই বহু অনুরাগে
বাসর-শয়ন করেছি রচন
কুসুম থরে,
দুয়ার রুধিয়া রেখেছিনু তারে
গোপন ঘরে,
যতন ভরে।
কত সোহাগ করেছি চুম্বন করি
নয়ন পাতে
স্নেহের সাথে।
শুনায়েছি তারে মাথা রাখি পাশে
কত প্রিয় নাম মৃদু মধুভাষে,
গুঞ্জর তান করিয়াছি গান
জ্যোৎস্না রাতে,
যা কিছু মধুর দিয়েছিনু তার
দুখানি হাতে
মেহের সাথে!
শেষে সুখের শয়নে শ্রান্ত পরাণ
আলস রসে,
আবেশ বশে।
পরশ করিলে জাগে না সে আর
কুসুমের হার লাগে গুরুভার,
ঘুমে জাগরণে মিশি একাকার
নিশি দিবসে;
বেদনাবিহীন অসাড় বিরাগ
মরমে, পশে
আবেশ বশে।
ঢালি’ মধুরে মধুর বধূরে আমার
হারাই বুঝি,
পাইনে খুঁজি!
বাসরের দীপ নিবে নিবে আসে,
ব্যাকুল নয়নে হেরি চারি পাশে,
শুধু রাশি রাশি শুষ্ক কুসুম
হয়েছে পুঁজি!
অতল স্বপ্ন-সাগরে ডুবিয়া
মরি যে যুঝি
কাহারে খুঁজি!
তাই ভেবেছি আজিকে খেলিতে হইবে
নূতন খেলা
রাত্রি বেলা!
মরণ দোলায় ধরি রসিগাছি
বসিব দুজনে বড় কাছাকাছি,
ঝঞ্ঝা আসিয়া অট্ট হাসিয়া
মারিবে ঠেলা,
আমাতে প্রাণেতে খেলিব দুজনে
ঝুলন খেলা,
নিশীথ বেলা!
দে দোল্ দোল্!
দে দোল্ দোল্!
এ মহাসাগরে তুফান তোল্!
বধূরে আমার পেয়েছি আবার
ভরেছে কোল!
প্রিয়ারে আমার তুলেছে জাগায়ে
প্রলয় রোল!
বক্ষ শোণিতে উঠেছে আবার
কি হিল্লোল!
ভিতরে বাহিরে জেগেছে আমার
কি কল্লোল!
উড়ে কুন্তল উড়ে অঞ্চল,
উড়ে বনমালা বায়ু চঞ্চল,
বাজে কঙ্কণ বাজে কিঙ্কিণী
মত্ত বোল!
দে দোল্ দোল্!
আয় রে ঝঞ্ঝা, পরাণ বধূর
আবরণরাশি করিয়া দে দূর,
করি লুণ্ঠন অবগুণ্ঠন
বসন খোল্!
দে দোল্ দোল্!
প্রাণেতে আমাতে মুখোমুখি আজ
চিনি লব দোঁহে ছাড়ি ভয় লাজ,
বক্ষে বক্ষে পরশিব দোঁহে
ভাবে বিভোল!
দে দোল্ দোল্!
স্বপ্ন টুটিয়া বাহিরেছে আজ
দুটো পাগোল!
দে দোল্ দোল্!
১৫ চৈত্র, ১২৯৯।
তুলনায় সমালোচনা
তুলনায় সমালােচনা।
একদা পুলকে প্রভাত আলোকে
গাহিছে পাখী;
কহে কণ্টক বাঁকা কটাক্ষে
কুসুমে ডাকি’;—
তুমি ত কোমল বিলাসী কমল,
দুলায় বায়ু,
দিনের কিরণ ফুরাতে ফুরাতে
ফুরায় আয়ু;
এ পাশে মধুপ মধুমদে তোর,
ও পাশে পবন পরিমল-চোর,
বনের দুলাল, হাসি পায় তোর
আদর দেখে’!
আহা মরি মরি কি রঙীন্ বেশ,
সোহাগ হাসির নাহি আর শেষ,
সারাবেলা ধরি রসালসাবেশ
গন্ধ মেখে’!
হায় ক’দিনের আদর সোহাগ
সাধের খেলা!
ললিত মাধুরী, রঙীন্ বিলাস,
মধুপ-মেলা!
ওগো নহি আমি তোদের মতন
সুখের প্রাণী,
হাব ভাব হাস, নানা-রঙা বাস
নাহিক জানি!
রয়েছি নগ্ন, জগতে লগ্ন
আপন বলে,
কে পাবে তাড়াতে আমাকে মাড়াতে
ধরণী তলে!
তোদের মতন নহি নিমেষের,
আমি এ নিখিলে চির দিবসের,
বৃষ্টিবাদল ঝড়বাতাসের
না রাখি ভয়!
সতত একাকী, সঙ্গীবিহীন,
কারো কাছে কোন নাহি প্রেম ঋণ,
চাটুগান শুনি সারা নিশিদিন
করি না ক্ষয়।
আসিবেক শীত, বিহঙ্গগীত
যাইবে থামি’,
ফুলপল্লব ঝরে’ যাবে সব,
রহিব আমি!
চেয়ে দেখ মোরে, কোন বাহুল্য
কোথাও নাই,
স্পষ্ট সকলি, আমার মূল্য
জানে সবাই।
এ ভীরু জগতে যার কাঠিন্য
জগৎ তারি।
নখের আঁচড়ে আপন চিহ্ন
রাখিতে পারি!
কেহ জগতেরে চামর ঢুলায়,
চরণে কোমল হস্ত বুলায়,
নত মস্তকে লুটায়ে ধূলায়
প্রণাম করে।
ভুলাইতে মন কত করে ছল,
কাহারো বর্ণ, কারো পরিমল,
বিফল বাসরসজ্জা, কেবল
দু দিন তরে।
কিছুই করি না, নীরবে দাঁড়ায়ে
তুলিয়া শির
বিঁধিয়া রয়েছি অন্তর মাঝে
এ পৃথিবীর।
আমারে তোমরা চাহ না চাহিতে
চোখের কোণে,
গরবে ফাটিয়া উঠেছ ফুটিয়া
আপন মনে।
আছে তব মধু, থাক্ সে তোমায়,
আমার নাহি।
আছে তব রূপ,—মোর পানে কেহ
দেখে না চাহি।
কারো আছে শাখা, কারো আছে দল,
কারো আছে ফুল, কারো আছে ফল,
আমারি হস্ত রিক্ত কেবল
দিবসযামী!
ওহে তরু তুমি বৃহৎ প্রবীণ,
আমাদের প্রতি অতি উদাসীন,
আমি বড় নহি, আমি ছায়াহীন,
ক্ষুদ্র আমি।
হই না ক্ষুদ্র, তবুও ক্ষুদ্র
ভীষণ ভয়,
আমার দৈন্য সে মোর সৈন্য
তাহারি জয়।
২৯ কার্ত্তিক, ১৩০০।
তোমরা এবং আমরা
তোমরা এবং আমরা।
তোমরা হাসিয়া বহিয়া চলিয়া যাও
কুলুকুলুকল নদীর স্রোতের মত।
আমরা তীরেতে দাঁড়ায়ে চাহিয়া থাকি,
মরমে গুমরি মরিছে কামনা কত।
আপনা আপনি কানাকানি কর সুখে,
কৌতুকছটা উছলিছে চোখে মুখে,
কমলচরণ পড়িছে ধরণী মাঝে,
কনক নূপুর রিনিকি ঝিনিকি বাঝে।
অঙ্গে অঙ্গ বাঁধিছ রঙ্গপাশে,
বাহুতে বাহুতে জড়িত ললিত লতা।
ইঙ্গিতরসে ধ্বনিয়া উঠিছে হাসি,
নয়নে নয়নে বহিছে গোপন কথা।
আঁখি নত করি একেলা গাঁথিছ ফুল,
মুকুর লইয়া যতনে বাঁধিছ চুল।
গোপন হৃদয়ে আপনি করিছ খেলা,
কী কথা ভাবিছ, কেমন কাটিছে বেলা!
চকিতে পলকে অলক উড়িয়া পড়ে,
ঈষৎ হেলিয়া আঁচল মেলিয়া যাও—
নিমেষ ফেলিতে আঁখি না মেলিতে, ত্বরা
নয়নের আড়ে না জানি কাহারে চাও!
যৌবনরাশি টুটিতে লুটিতে চায়,
বসনে শাসনে বাঁধিয়া রেখেছ তায়।
তবু শতবার শতধা হইয়া ফুটে,
চলিতে ফিরিতে ঝলকি চলকি উঠে!
আমরা মূর্খ কহিতে জানিনে কথা,
কি কথা বলিতে কি কথা বলিয়া ফেলি!
অসময়ে গিয়ে লয়ে আপনার মন
পদতলে দিয়ে চেয়ে থাকি আঁখি মেলি!
তোমরা দেখিয়া চুপিচুপি কথা কও,
সখীতে সখীতে হাসিয়া অধীর হও!
বসন আঁচল বুকেতে টানিয়া লয়ে
হেসে চলে’ যাও আশার অতীত হ’য়ে।
আমরা বৃহৎ অবোধ ঝড়ের মত
আপন আবেগে ছুটিয়া চলিয়া আসি।
বিপুল আঁধারে অসীম আকাশ ছেয়ে
টুটিবারে চাহি আপন হৃদয়রাশি।
তোমরা বিজুলি হাসিতে হাসিতে চাও,
আঁধার ছেদিয়া মরম বিধিয়া দাও,
গগনের গায়ে আগুনের রেখা আঁকি
চকিত চরণে চলে’ যাও দিয়ে ফাঁকি।
অযতনে বিধি গড়েছে মোদের দেহ,
নয়ন অধর দেয়নি ভাষায় ভরে’,
মোহন মধুর মন্ত্র জানিনে মোরা,
আপনা প্রকাশ করিব কেমন করে’?
তোমরা কোথায় আমরা কোথায় আছি!
কোন সুলগনে হব না কি কাছাকাছি!
তোমরা হাসিয়া বহিয়া চলিয়া যাবে,
আমরা দাঁড়ায়ে রহিব এমনি ভাবে!
১৬ই জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯।
দরিদ্রা
দরিদ্রা।
দরিদ্রা বলিয়া তােরে বেশি ভালবাসি
হে ধরিত্রী, স্নেহ তাের বেশি ভাল লাগে,
বেদনা-কাতর মুখে সকরুণ হাসি
দেখে’ মাের মর্ম্ম মাঝে বড় ব্যথা জাগে!
আপনার বক্ষ হতে রস রক্ত নিয়ে
প্রাণটুকু দিয়েছিস্ সন্তানের দেহে,
অহর্নিশি মুখে তার আছিস্ তাকিয়ে
অমৃত নারিস্ দিতে প্রাণপণ স্নেহে!
কত যুগ হতে তুই বর্ণ গন্ধ গীতে
সৃজন করিতেছিস্ আনন্দ আবাস,
আজো শেষ নাহি হল দিবসে নিশীথে,
স্বর্গ নাই, রচেছিস্ স্বর্গের আভাস!
তাই তাের মুখখানি বিষাদ-কোমল,
সকল সৌন্দর্য্যে তাের ভরা অশ্রুজল!
দুই পাখী
দুই পাখী।
খাঁচার পাখী ছিল সোনার খাঁচাটিতে
বনের পাখী ছিল বনে।
একদা কি করিয়া মিলন হল দোঁহে,
কি ছিল বিধাতার মনে!
বনের পাখী বলে, খাঁচার পাখী ভাই
বনেতে যাই দোঁহে মিলে।
খাঁচার পাখী বলে, বনের পাখী আয়
খাঁচায় থাকি নিরিবিলে।
বনের পাখী বলে—না,
আমি শিকলে ধরা নাহি দিব!
খাঁচার পাখী বলে-হায়
আমি কেমনে বনে বাহিরিব!
বনের পাখী গাহে বাহিরে বসি বসি
বনের গান ছিল যত।
খাঁচার পাখী পড়ে শিখানো বুলি তার
দোঁহার ভাষা দুই মত।
বনের পাখী বলে, খাঁচার পাখী ভাই
বনের গান গাও দিখি।
খাঁচার পাখী বলে বনের পাখী ভাই
খাঁচার গান লহ শিখি।
বনের পাখী বলে—না
আমি শিখানো গান নাহি চাই,
খাঁচার পাখী বলে—হায়
আমি কেমনে বন-গান গাই!
বনের পাখী বলে আকাশ ঘননীল
কোথাও বাধা নাহি তার।
খাঁচার পাখী বলে খাঁচাটি পরিপাটী
কেমন ঢাকা চারিধার।
বনের পাখী বলে—আপনা ছাড়ি দাও
মেঘের মাঝে একেবারে।
খাঁচার পাখী বলে নিরালা সুখকোণে
বাঁধিয়া রাখ আপনারে।
বনের পাখী বলে—না,
সেথা কোথায় উড়িবারে পাই!
খাঁচার পাখী বলে—হায়
মেঘে কোথায় বসিবার ঠাঁই!
এমনি দুই পাখী দোঁহারে ভালবাসে
তবুও কাছে নাহি পায়।
খাঁচার ফাঁকে ফাঁকে পরশে মুখে মুখে
নীরবে চোখে চোখে চায়।
দুজনে কেহ কারে বুঝিতে নাহি পারে
বুঝাতে নারে আপনায়।
দুজনে একা একা ঝাপটি মরে পাখা
কাতরে কহে কাছে আয়!
বনের পাখী বলে—না,
কবে খাঁচায় রুধি দিবে দ্বার।
খাঁচার পাখী বলে—হায়
মোর শকতি নাহি উড়িবার!
১৯ আষাঢ়, ১২৯৯।
দুর্ব্বোধ
দুর্ব্বোধ।
তুমি মোরে পার না বুঝিতে?
প্রশান্ত বিষাদ তরে
দুটি আঁখি প্রশ্ন করে’
অর্থ মোর চাহিছে খুঁজিতে,
চন্দ্রমা যেমন ভাবে স্থির নত মুখে
চেয়ে দেখে সমুদ্রের বুকে।
কিছু আমি করিনি গোপন।
যাহা আছে, সব আছে
তোমার আঁখির কাছে
প্রসারিত অবারিত মন।
দিয়েছি সমস্ত মোর করিতে ধারণা,
তাই মোরে বুঝিতে পার না?
এ যদি হইত শুধু মণি,
শত খণ্ড করি তারে
সযত্নে বিবিধাকারে,
একটি একটি করি’ গণি’
একখানি সূত্রে গাঁখি একখানি হায়
পরাতেম গলায় তোমার!
এ যদি হইত শুধু ফুল,
সুগোল সুন্দর ছোটো,
ঊষালোকে ফোটো-ফোটো,
বসন্তের পবনে দোদুল,
বৃন্ত হতে সযতনে আনিতাম তুলে,
পরায়ে দিতে কালো চুলে!
এ যে সখি সম হৃদয়!
কোথা জল, কোথা কূল,
দিক হয়ে যায় ভুল,
অন্তহীন রহস্য-নিলয়।
এ রাজ্যের আদি অন্ত নাহি জান রাণী,
এ তবু তোমার রাজধানী!
কি তোমারে চাহি বুঝাইতে?
গভীর হৃদয় মাঝে
নাহি জানি কি যে বাজে
নিশিদিন নীরব সঙ্গীতে!
শব্দহীন স্তব্ধতায় ব্যাপিয়া গগন
রজনীর ধ্বনির মতন।
এ যদি হইত শুধু সুখ,
কেবল একটি হাসি
অধরের প্রান্তে আসি
আনন্দ করিত জাগরূক।
মুহূর্ত্তে বুঝিয়া নিতে হৃদয়-বারতা
বলিতে হত না কোন কথা!
এ যদি হইত শুধু দুখ,
দুটি বিন্দু অশ্রুজল
দুই চক্ষে ছল ছল,
বিষন্ন অধর ম্লান মুখ,
প্রত্যক্ষ দেখিতে পেতে অন্তরের ব্যথা,
নীরবে প্রকাশ হত কথা!
এ যে সখি হৃদয়ের প্রেম!
সুখ দুঃখ বেদনার
আদি অন্ত নাহি যার
চির দৈন্য চির পূর্ণ হেম!
নব নব ব্যাকুলতা জাগে দিবা রাতে
তাই আমি না পারি বুঝাতে!
নাই বা বুঝিলে তুমি মোরে!
চিরকাল চোখে চোখে
নূতন নূতনালোকে
পাঠ কর রাত্রি দিন ধরে।
বুঝা যায় আধ প্রেম, আধ খানা মন,
সমস্ত কে বুঝেছে কখন্!
১১ চৈত্র, ১২৯৯।
দেউল
দেউল।
রচিয়াছিনু দেউল একখানি
অনেক দিনে অনেক দুখ মানি’।
রাখি নি তার জানালা দ্বার,
সকল দিক অন্ধকার,
ভূধর হ’তে পাষাণ ভার
যতনে বহি’ আনি’
রচিয়াছিনু দেউল একখানি।
দেবতাটিরে বসায়ে মাঝখানে
ছিলাম চেয়ে তাহারি মুখপানে।
বাহিরে ফেলি এ ত্রিভুবন
ভুলিয়া গিয়া বিশ্বজন
ধেয়ান তারি অনুক্ষণ
করেছি এক প্রাণে,
দেবতাটিরে বসায়ে মাঝখানে।
যাপন করি অন্তহীন রাতি
জ্বালায়ে শত গন্ধময় বাতি।
কনক-মণি-পাত্রপুটে,
সুরভি ধূপ-ধুম্র উঠে,
গুরু অগুরু-গন্ধ ছুটে,
পরাণ উঠে মাতি’।
যাপন করি অন্তহীন রাতি।
নিদ্রাহীন বসিয়া এক চিতে
চিত্র কত এঁকেছি চারি ভিতে।
স্বল্প সম চমৎকার
কোথাও নাহি উপমা তার,
কত বরণ, কত আকার
কে পারে বরণিতে,
চিত্র যত এঁকেছি চারি ভিতে!
স্তম্ভগুলি জড়ায়ে শত পাকে
নাগবালিকা গ্রীবা তুলিয়া থাকে।
উপরে ঘিরি চারিটি ধার
দৈত্যগুলি বিকটাকার,
পাষাণময় ছাদের ভার
মাথায় ধরি রাখে।
নাগবালিকা গ্রীবা তুলিয়া থাকে।
সৃষ্টিছাড়া সৃজন কত মত!
পক্ষীরাজ উড়িছে শত শত।
ফুলের মত লতার মাঝে
নারীর মুখ বিকশি রাজে,
প্রণয়ভরা বিনয়ে লাজে
নয়ন করি’ নত,
সৃষ্টিছাড়া সৃজন কত মত।
ধ্বনিত এই ধরার মাঝখানে
শুধু এ গৃহ শব্দ নাহি জানে।
ব্যাঘ্রাজিন আসন পাতি’
বিবিধরূপ ছন্দ গাঁথি’
মন্ত্র পড়ি দিবস রাতি
গুঞ্জরিত তানে,
শব্দহীন গৃহের মাঝখানে।
এমন করে গিয়েছে কত দিন
জানি নে কিছু আছি আপন-লীন।
চিত্ত মোর নিমেষ-হত
উৰ্দ্ধমুখী শিখার মত,
শরীর খানি মূর্চ্ছাহত
ভাবের তাপে ক্ষীণ।
এমন করে গিয়েছে কত দিন।
একদা এক বিষম ঘোর স্বরে
বজ্র আসি পড়িল মোর ঘরে।
বেদনা এক তীক্ষ্ণতম
পশিল গিয়ে হৃদয়ে মম
অগ্নিময় সর্প সম
কাটিল অন্তরে।
বজ্র আসি পড়িল মোর ঘরে।
পাষাণরাশি সহসা গেল টুটি’,
গৃহের মাঝে দিবস উঠে ফুটি।
নীরব ধ্যান করিয়া চুর
কঠিন বাঁধ করিয়া দূর
সংসারের অশেষ সুর
ভিতরে এল ছুটি’,
পাষাণরাশি সহসা গেল টুটি’।
দেবতাপানে চাহিমু একবার,
আলোক আসি পড়েছে মুখে তাঁর।
নূতন এক মহিমারাশি
ললাটে তাঁর উঠেছে ভাসি’,
জাগিছে এক প্রসাদ হাসি
অধর চারিধার।
দেবতাপানে চাহিনু একবার।
সরমে দীপ মলিন একেবারে
লুকাতে চাহে চির অন্ধকারে।
শিকলে বাঁধা স্বপ্নমত
ভিত্তি-আঁকা চিত্র যত
আলোক দেখি লজ্জাহত
পালাতে নাহি পারে,
সরমে দীপ মলিন একেবারে।
যে গান আমি নারিনু রচিবারে
সে গান আজি উঠিল চারিধারে।
আমার দীপ জ্বালিল রবি,
প্রকৃতি আসি আঁকিল ছবি,
গাঁথিল গান শতেক কবি
কতই ছন্দ হারে,
কি গান আজি উঠিল চারিধারে!
দেউলে মোর দুয়ার গেল খুলি’,
ভিতরে আর বাহিরে কোলাকুলি,
দেবের কর-পরশ লাগি’,
দেবতা মোর উঠিল জাগি’
বন্দী নিশি গেল সে ভাগি’
আঁধার পাখা তুলি’।
দেউলে মোর দুয়ার গেল খুলি’।
২৩ ফাল্গুন, ১২৯৯।
নদী পথে
নদী পথে।
গগন ঢাকা ঘন মেঘে,
পবন বহে খর বেগে।
অশনি ঝনঝন
ধ্বনিছে ঘনঘন
নদীতে ঢেউ উঠে জেগে,
পবন বহে ধর বেগে!
তীরেতে তরুরাজি দোলে
আকুল মর্ম্মর রোলে।
চিকুর চিকিমিকে
চকিয়া দিকে দিকে
তিমির চিরি’ যায় চলে’।
তীরেতে তরুরাজি দোলে।
ঝরিছে বাদলের ধারা
বিরাম বিশ্রামহারা।
বারেক থেমে আসে,
দ্বিগুণ উচ্ছ্বাসে
আবার পাগলের পার
ঝরিছে বাদলের ধারা।
মেঘেতে পথরেখা লীন,
প্রহর তাই গতিহীন।
গগন পানে চাই,
জানিতে নাহি পাই
গেছে কি নাহি গেছে দিন;
প্রহর তাই গতিহীন।
তীরেতে বাঁধিয়াছি তরী,
রয়েছি সারাদিন ধরি’।
এখনো পথ নাকি
অনেক আছে বাকি,
আসিছে ঘোর বিভাবরী।
তীরেতে বাঁধিয়াছি তরী।
বসিয়া তরণীর কোণে
একেলা ভাবি মনে মনে
মেঝেতে শেজ পাতি’
সে আজি জাগে রাতি
নিদ্রা নাহি দু নয়নে।
বসিয়া ভাবি মনে মনে।
মেঘের ডাক শুনে কাঁপে,
হৃদয় দুই হাতে চাপে।
আকাশ পানে চায়
ভরসা নাহি পায়,
তরাসে সারা নিশি যাপে,
মেঘের ডাক শুনে কাঁপে!
কভু বা বায়ুবেগভরে
দুয়ার ঝন্ঝনি’ পড়ে।
প্রদীপ নিবে আসে,
ছায়াটি কাঁপে ত্রাসে,
নয়নে আঁখিজল ঝরে,
বক্ষ কাঁপে থর থরে।
চকিত আঁখি দুটি তার
মনে আসিছে বার বার।
বাহিরে মহা ঝড়,
বজ্র কড় মড়,
আকাশ করে হাহাকার।
মনে পড়িছে আঁখি তার।
গগন ঢাকা ঘন মেঘে,
পবন বহে খর বেগে।
অশনি ঝন ঝন
ধ্বনিছে ঘন ঘন
নদীতে ঢেউ উঠে জেগে।
পবন বহে আজি বেগে।
২৩ ফাল্গুন, ১২৯৯।
নিদ্রিতা
নিদ্রিতা।
রাজার ছেলে ফিরেছি দেশে দেশে,
সাত সমুদ্র তেরো নদীর পার।
যেখানে যত মধুর মুখ আছে
বাকি ত কিছু রাখি নি দেখিবার।
কেহ বা ডেকে কয়েছে দুটো কথা,
কেহ বা চেয়ে করেছে আঁখি নত,
কাহারো হাসি ছুরির মত কাটে
কাহারো হাসি আঁখি জলেরি মত!
গরবে কেহ গিয়েছে নিজ ঘর
কাঁদিয়া কেহ চেয়েছে ফিরে ফিরে।
কেহ বা কারে কহে নি কোন কথা,
কেহ বা গান গেয়েছে ধীরে ধীরে।
এমনি করে ফিরেছি দেশে দেশে;
অনেক দূরে তেপান্তর-শেষে
ঘুমের দেশে ঘুমায় রাজবালা,
তাহারি গলে এসেছি দিয়ে মালা!
একদা রাতে নবীন যৌবনে
স্বপ্ন হতে উঠিনু চমকিয়া,
বাহিরে এসে দাঁড়ানু একবার
ধরার পানে দেখিনু নিরখিয়া।
শীর্ণ হ’য়ে এসেছে শুকতারা,
পূর্ব্ব তটে হ’তেছে নিশি ভোর।
আকাশ কোণে বিকাশে জাগরণ,
ধরণীতলে ভাঙ্গে নি ঘুম-ঘোর।
সমুখে পড়ে’ দীর্ঘ রাজপথ,
দু’ধারে তারি দাঁড়ায়ে তরুসার,
নয়ন মেলি’ সুদূর পানে চেয়ে
আপন মনে ভাবি একবার,—
আমারি মত আজি এ নিশি শেষে
ধরার মাঝে নুতন কোন্ দেশে,
দুগ্ধফেনশয্যা করি’ আলা
স্বপ্ন দেখে ঘুমায়ে রাজবালা।
অশ্ব চড়ি’ তখনি বাহিরিনু
কত যে দেশ-বিদেশ হনু পার!
একদা এক ধূসর সন্ধ্যায়
ঘুমের দেশে লভিনু পুরদ্বার!
সবাই সেথা অচল অচেতন,
কোথাও জেগে নাইক জনপ্রাণী,
নদীর তীরে জলের কলতানে
ঘুমায়ে আছে বিপুল পুরীখানি।
ফেলিতে পদ সাহস নাহি মানি,
নিমেষে পাছে সকল দেশ জাগে!
প্রাসাদ মাঝে পশিনু সাবধানে
শঙ্কা মোর চলিল আগে আগে।
ঘুমায় রাজা, ঘুমায় রাণী-মাতা,
কুমার সাথে ঘুমায় রাজভ্রাতা;
একটি ঘরে রত্ন-দীপ জ্বালা,
ঘুমায়ে সেথা রয়েছে রাজবালা।
কমলফুল-বিমল শেজখানি,
নিলীন তাহে কোমল তনুলতা।
মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে
বাজিল বুকে সুখের মত ব্যথা!
মেঘের মত গুচ্ছ কেশরাশি
শিথান ঢাকি পড়েছে ভারে ভারে।
একটি বাহু বক্ষপরে পড়ি’
একটি বাহু লুটায় একধারে।
আঁচলখানি পড়েছে খসি’ পাশে,
কাঁচলখানি পড়িবে বুঝি টুটি’,
পত্রপুটে রয়েছে যেন ঢাকা
অনাঘ্রাত পূজার ফুল দুটি!
দেখিনু তারে উপমা নাহি জানি;
ঘুমের দেশে স্বপন একখানি;
পালঙ্কেতে মগন রাজবালা
আপন ভয় লাবণ্যে নিরালা!
ব্যাকুল বুকে চাপি দুই বাহু,
না মানে বাধা হৃদয় কম্পন!
ভূতলে বসি আনত করি’ শির
মুদিত আঁখি করি চুম্বন!
পাতার ফাঁকে আঁখির তারা দুটি,
তাহারি পানে চাহিনু এক মনে,
দ্বারের ফাঁকে দেখিতে চাহি যেন
কি আছে কোথা নিভৃত নিকেতনে!
ভূর্জ্জপাতে কাজলমসী দিয়া
লিখিয়া দিনু আপন নাম ধাম।
লিখিনু “অয়ি নিদ্রানিমগনা,
আমার প্রাণ তোমারে সঁপিলাম!”
যতন করি কনকসুতে গাঁথি
রতন হারে বাঁধিয়া দিনু পাঁতি।
ঘুমের দেশে ঘুমায় রাজবালা,
তাহারি গলে পরায়ে দিনু মালা!
১৪ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯।
নিরুদ্দেশ যাত্রা
নিরুদ্দেশ যাত্রা।
আর কত দূরে নিয়ে যাবে মোরে
হে সুন্দরি?
বল কোন্ পার ভিড়িবে তোমার
সোনার তরী?
যখনি শুধাই, ওগো বিদেশিনী,
তুমি হাস শুধু মধুরহাসিনী,
বুঝিতে না পারি, কি জানি কি আছে
তোমার মনে?
নীরবে দেখাও অঙ্গুলি তুলি’
অকুল সিন্ধু উঠিছে আকুলি’,
দূরে পশ্চিমে ডুবিছে তপন
গগন-কোণে।
কি আছে হোথায়—চলেছি কিসের
অন্বেষণে?
বল দেখি মোরে শুধাই তোমায়,
অপরিচিতা,—
ওই যেথা জ্বলে সন্ধ্যার কূলে
দিনের চিতা,
ঝলিতেছে জল তরল অনল,
গলিয়া পড়িছে অম্বরতল,
দিক্বধু যেন ছলছল আঁখি
অশ্রুজলে,
হোথায় কি আছে আলয় তোমার
উর্ম্মিমুখর সাগরের পার,
মেঘচুম্বিত অন্তগিরির
চরণতলে?
তুমি হাস শুধু মুখপানে চেয়ে
কথা না বলে’!
হুহু ক’রে বায়ু ফেলিছে সতত
দীর্ঘশ্বাস!
অন্ধ আবেগে করে গর্জ্জন
জলোচ্ছ্বাস!
সংশয়ময় ঘননীল নীর
কোন দিকে চেয়ে নাহি হেরি তীর,
অসীম রোদন জগৎ প্লাবিয়া
দুলিছে যেন;
তারি পরে ভাসে তরুণী হিরণ,
তারি পরে পড়ে সন্ধ্যা-কিরণ,
তারি মাঝে বসি এ নীরব হাসি
হাসিছ কেন?
আমি ত বুঝি না কি লাগি তোমার
বিলাস হেন?
যখন প্রথম ডেকেছিলে তুমি
“কে যাবে সাথে?
চাহি বারেক তোমার নয়নে
নবীন প্রাতে।
দেখালে সমুখে প্রসারি কর
পশ্চিম পানে অসীম সাগর,
চঞ্চল আনো আশার মতন
কাঁপিছে জলে।
তরীতে উঠিয়া শুধানু তখন
আছে কি হোথায় নবীন জীবন,
আশার স্বপন ফলে কি হোথায়
সোনার ফলে?
মুখপানে চেয়ে হাসিলে কেবল
কথা না বলে’!
তারপরে কভু উঠিয়াছে মেঘ,
কখনো রবি,
কখনো ক্ষুব্ধ সাগর, কখনো
শান্ত ছবি।
বেলা বহে’ যায়, পালে লাগে বায়,
সোনার তরণী কোথা চলে’ যায়,
পশ্চিমে হেরি নামিছে তপন
অস্তাচলে।
এখন বারে শুধাই তােমায়
স্নিগ্ধ মরণ আছে কি হােথায়,
আছে কি শান্তি, আছে কি সুপ্তি
তিমির তলে?
হাসিতেছ তুমি তুলিয়া নয়ন
কথা না বলে!
আঁধার রজনী আসিবে এখনি
মেলিয়া পাখা,
সন্ধ্যা-আকাশে স্বর্ণ-শালােক
পড়িবে ঢাকা।
শুধু ভাসে তব দেহ-সৌরভ,
শুধু কানে আসে জল-কলরব,
গায়ে উড়ে পড়ে বায়ুভরে, তব
কেশের রাশি।
বিকল হৃদয় বিবশ শরীর
ডাকিয়া তােমারে কহিব অধীর-
“কোথা আছ ওগাে করহ পরশ
নিকটে আসি”
কহিবে না কথা, দেখিতে পাব না
নীরব হাসি।
২৭ অগ্রহায়ণ, ১৩০০।
পরশ-পাথর
পরশ-পাথর।
ক্ষ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ-পাথর।
মাথায় বৃহৎ জটা ধূলায় কাদায় কটা,
মলিন ছায়ার মত ক্ষীণকলেবর।
ওষ্ঠে অধরেতে চাপি’ অন্তরের দ্বার ঝাঁপি
রাত্রিদিন তীব্র জ্বালা জ্বেলে রাখে চোখে।
দুটো নেত্র সদা যেন নিশার খদ্যোৎ হেন
উড়ে’ উড়ে’ খুঁজে কারে নিজের আলোকে।
নাহি যার চাল চুলা গায়ে মাখে ছাই ধুলা,
কটিতে জড়ানো শুধু ধূসর কৌপীন,
ডেকে কথা কয় তারে। কেহ নাই এ সংসারে,
পথের ভিখারী হতে আরো দীনহীন,
তার এত অভিমান, সোণারূপা তুচ্ছজ্ঞান,
রাজসম্পদের লাগি’ নহে সে কাতর,
দশা দেখে’ হাসি পায়, আর কিছু নাহি চায়
একেবারে পেতে চায় পরশ-পাথর!
সম্মুখে গরজে সিন্ধু অগাধ অপার।
তরঙ্গে তরঙ্গ উঠি’ হেসে হল কুটিকুটি
ছাড়া পাগলের দেখিয়া ব্যাপার!
আকাশ রয়েছে চাহি, নয়নে নিমেষ নাহি,
হুহু করে’ সমীরণ ছুটেছে অবাধ।
সুর্য্য ওঠে প্রাতঃকালে পূর্ব্ব গগনের ভালে
সন্ধ্যাবেলা ধীরে ধীরে উঠে আসে চাঁদ।
জলরাশি অবিরল করিতেছে কলকল
অতল রহস্য যেন চাহে বলিবারে;—
কাম্যধন আছে কোথা জানে যেন সব কথা,
সে ভাষা যে বোঝে সেই খুঁজে নিতে পারে।
কিছুতে ভ্রূক্ষেপ নাহি, মহাগাথা গান গাহি’
সমুদ্র আপনি শুনে আপনার স্বর।
কেহ যায়, কেহ আসে, কেহ কাঁদে, কেহ হাসে,
ক্ষ্যাপা তীরে খুঁজে’ ফিরে পরশ-পাথর!
একদিন, বহুপূর্ব্বে, আছে ইতিহাস—
নিকষে সোনার রেখা সবে যেন দিল দেখা—
আকাশে প্রথম সৃষ্টি পাইল প্রকাশ;
মিলি’ যত সুরাসুর কৌতূহলে ভরপুর
এসেছিল পা টিপিয়া এই সিন্ধুতীরে,
অতলের পানে চাহি নয়নে নিমেষ নাহি
নীরবে দাঁড়ায়ে ছিল স্থির নতশিরে;
বহুকাল স্তব্ধ থাকি’ শুনেছিল মুদে’ আঁখি
এই মহাসমুদ্রের গতি চিরন্তন;
তার পরে কৌতুহলে ঝাঁপায়ে অগাধ জলে
করেছিল এ অনন্ত রহস্য মন্থন।
বহুকাল দুঃখ সেবি নিরখিল, লক্ষ্মীদেবী
উদিলা জগৎমাঝে অতুল সুন্দর।
সেই সমুদ্রের তীরে শীর্ণদেহে জীর্ণচীরে
ক্ষ্যাপা খুঁজে’ খুঁজে’ ফিরে পরশ-পাথর!
এতদিনে বুঝি তার ঘুচে গেছে আশ।
খুঁজে’ খুঁজে’ ফিরে তবু বিশ্রাম না জানে কভু,
আশা গেছে, যায় নাই খোঁজার অভ্যাস।
বিরহী বিহঙ্গ ডাকে সারানিশি তরুশাখে,
যারে ডাকে তার দেখা পায় না অভাগা!
তবু ডাকে সারাদিন আশাহীন শ্রান্তিহীন
একমাত্র কাজ তার ডেকে ডেকে জাগা’।
আর সব কাজ ভুলি’ আকাশে তরঙ্গ তুলি’
সমুদ্র না জানি কারে চাহে অবিরত!
যত করে হায় হায়, কোন কালে নাহি পায়
তবু শূন্যে তোলে বাহু, ওই তার ব্রত।
কারে চাহি ব্যোমতলে গ্রহতারা লয়ে চলে,
অনন্ত সাধনা করে বিশ্বচরাচর!
সেই মত সিন্ধুতটে ধূলিমাখা দীর্ঘজটে
ক্ষ্যাপা খুঁজে খুঁজে ফিরে পরশ-পাথর!
একদা শুধাল তারে গ্রামবাসী ছেলে
“সন্ন্যাসীঠাকুর এ কি! কাঁকালে ওকিও দেখি!
সোনার শিকল তুমি কোথা হতে পেলে?”
সন্ন্যাসী চমকি ওঠে, শিকল সোনার বটে,
লোহা সে হয়েছে সোনা জানে না কখন।
একি কাণ্ড চমৎকার, তুলে দেখে বারবার,
আঁখি কচালিয়া দেখে, এ নহে স্বপন!
কপালে হানিয়া কর ব’সে পড়ে ভূমিপর,
নিজেরে করিতে চাহে নির্দ্দয় লাঞ্ছনা,—
পাগলের মত চায়— কোথা গেল, হায় হায়,
ধরা দিয়ে পলাইল সফল বাঞ্ছনা!
কেবল অভ্যাসমত নুড়ি কুড়াইত কত
ঠন্ করে’ ঠেকাইত শিকলের পর,
চেয়ে দেখিত না, নুড়ি দূরে ফেলে’ দিত ছুঁড়ি’
কখন্ ফেলেছে ছুঁড়ে’ পরশ-পাথর!
তখন যেতেছে অস্তে মলিন তপন।
আকাশ সোণার বর্ণ, সমুদ্র গলিত স্বর্ণ,
পশ্চিম দিগ্বধূ দেখে সোনার স্বপন!
সন্ন্যাসী আবার ধীরে পূর্ব্বপথে যায় ফিরে
খুঁজিতে নুতন করে’ হারানো রতন।
সে শকতি নাহি আর নুয়ে পড়ে দেহভার
অন্তর লুটায় ছিন্ন তরুর মতন।
পুরাতন দীর্ঘপথ পড়ে’ আছে মৃতবৎ
হেথা হতে কতদূর নাহি তার শেষ!
দিক্ হতে দিগন্তরে মরুবালি ধুধু করে,
আসন্ন রজনী-ছায়ে স্নান সর্ব্বদেশ।
অর্দ্ধেক জীবন খুঁজি’ কোন্ ক্ষণে চক্ষু বুজি’
স্পর্শ লভেছিল যার এক পলভর,
বাকি অর্দ্ধ ভগ্ন প্রাণ আবার করিছে দান
ফিরিয়া খুঁজিতে সেই পরশ-পাথর!
১৯ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯।
পুরস্কার
পুরস্কার।
সে দিন বরষা ঝরঝর ঝরে
কহিল কবির স্ত্রী—
“রাশি রাশি মিল করিয়াছ জড়,
রচিতেছে বসি’ পুঁথি বড় বড়,
মাথার উপরে বাড়ি পড়-পড়
তার খোঁজ রাখ কি!
গাঁথিছ ছন্দ দীর্ঘ হ্রস্ব,
মাথা ও মুণ্ড, ছাই ও ভস্ম,
মিলিবে কি তাহে হস্তী অশ্ব,
না মিলে শস্যকণা!
অন্ন জোটে না, কথা জোটে মেলা,
নিশিদিন ধরে’ এ কি ছেলেখেলা,
ভারতীরে ছাড়ি ধর এই বেলা
লক্ষ্মীর উপাসনা!
ওগো ফেলে দাও পুঁথি ও লেখনী,
যা করিতে হয় করহ এখনি,
এত শিখিয়াছ এটুকু শেখনি
কিসে কড়ি আসে দুটো!”
দেখি সে মূরতি সর্ব্বনাশিয়া
কবির পরাণ উঠিল ত্রাসিয়া,
পরিহাস ছলে ঈষৎ হাসিয়া
কহে জুড়ি করপুট,—
“ভয় নাহি করি ও মুখ-নাড়ারে,
লক্ষ্মী সদয় লক্ষ্মীছাড়ারে,
ঘরেতে আছেন নাইক ভাঁড়ারে
এ কথা শুনিবে কেবা!
আমার কপালে বিপরীত ফল,
চপলা লক্ষ্মী মোরে অচপল,
ভারতী না থাকে থির এক পল
এত করি তাঁর সেবা!
তাই ত কপাটে লাগাইয়া খিল
স্বর্গে মর্ত্তে খুঁজিতেছি মিল,
আনমনা যদি হই এক তিল
অমনি সর্ব্বনাশ!”
মনে মনে হাসি মুখ করি ভার
কহে কবিজায়া “পারিনেক আর
ঘর সংসার গেল ছারেখার
সব তা’তে পরিহাস!”
এতেক বলিয়া বাঁকায়ে মুখানি
শিঞ্জিত করি কাঁকন দুখানি
চঞ্চল করে অঞ্চল টানি’
রোষ দুলে যায় চলি।
হেরি সে ভুবন-গরব-দমন
অভিমান-বেগে অধীর গমন,
উচাটন কবি কহিল “অমন
যেয়ো না হৃদয় দলি’!
ধরা নাহি দিলে ধরিব দু’পায়
কি করিতে হবে বল সে উপায়,
ঘর ভরি’ দিব সোনায় রূপায়
বুদ্ধি যোগাও তুমি!
একটুকু ফাঁকা যেখানে যা পাই
তোমারি মুরতি সেখানে চাপাই,
বুদ্ধির চাষ কোনখানে নাই,
সমস্ত মরুভূমি!”
“হয়েছে, হয়েছে, এত ভাল নয়"
হাসিয়া কষিয়া গৃহিণী ভনয়
“যেমন বিনয় তেমনি প্রণয়
আমার কপাল গুণে!
কথার কখনো ঘটেনি অভাব,
যখনি বলেছি পেয়েছি জবাব,
একবার ওগো বাক্য-নবাব
চল দেখি কথা শুনে!
শুভ দিন ক্ষণ দেখ পাঁজি খুলি’,
সঙ্গে করিয়া লহ পুঁথি গুলি,
ক্ষণিকের তরে আলস্য ভুলি’,
চল রাজসভা মাঝে!
আমাদের রাজা গুণীর পালক
মানুষ হইয়া গেল কত লোক,
ঘরে তুমি জমা করিলে শোলোক
লাগিবে কিসের কাজে!”
কবির মাথায় ভাঙ্গি পড়ে বাজ,
ভাবিল “বিপদ দেখিতেছি আজ,
কখনো জানিনে রাজা মহারাজ
কপালে কি জানি আছে!”
মুখে হেসে বলে “এই বই নয়!
আমি বলি আরো কি করিতে হয়।
প্রাণ দিতে পারি, শুধু জাগে ভয়
বিধবা হইবে পাছে!
যেতে যদি হয় দেরিতে কি কাজ!
ত্বরা করে’ তবে নিয়ে এস সাজ!
হেম কুণ্ডল, মণিময় তাজ,
কেয়ুর, কনক হার!
বলে’ দাও মোর সারথীরে ডেকে
ঘোড়া বেছে নেয় ভাল ভাল দেখে’
কিঙ্করগণ সাথে যাবে কে কে
আয়োজন কর তার!”
ব্রাহ্মণী কহে “মুখাগ্রে যার
বাধে না কিছুই, কি চাহে সে আর,
মুখ ছুটাইলে রথাশ্বে আর
না দেখি আবশ্যক!
নানা বেশভুষা হীরা রূপা সোন
এনেছি পাড়ার করি’ উপাসনা,
সাজ করে লও পূরায়ে বাসনা,
রসনা ক্ষান্ত হোক্।”
এতেক বলিয়া ত্বরিত চরণ
আনে বেশ বাস নানান্ ধরণ,
কবি ভাবে মুখ করি বিবরণ
আজিকে গতিক মন্দ!
গৃহিণী স্বয়ং নিকটে বসিয়া
তুলিল তাহারে মাজিয়া ঘষিয়া,
আপনার হাতে যতনে কসিয়া
পরাইল কটিবন্ধ!
উষ্ণীষ আনি মাথায় চড়ায়,
কণ্ঠী আনিয়া কণ্ঠে জড়ায়,
অঙ্গদ দুটি বাহুতে পরায়,
কুণ্ডল দেয় কানে।
অঙ্গে যতই চাপায় রতন,
কবি বসি থাকে ছবির মতন,
প্রেয়সীর নিজ হাতের যতন
সেও আজি হার মানে!
এই মতে দুই প্রহর ধরিয়া
বেশভূষা সব সমাধা করিয়া,
গৃহিণী নিরখে ঈষৎ সরিয়া
বাঁকায়ে মধুর গ্রীবা!
হেরিয়া কবির গম্ভীর মুখ
হৃদয়ে উপজে মহা কৌতুক,
হাসি’ উঠি’ কহে ধরিয়া চিবুক
আ মরি সেজেছ কিবা!
ধরিল সমুখে আরশি আনিয়া,
কহিল বচন অমিয় ছানিয়া,
“পুরনারীদের পরাণ হানিয়া
ফিরিয়া আসিবে আজি,
তখন দাসীরে ভুলোনা গরবে,
এই উপকার মনে রেখো তবে,
মোরেও এমনি পরাইতে হবে
রতন ভূষণ রাজি!”
কোলের উপরে বসি, বাহু পাশে
বাঁধিয়া কবিরে সোহাগে সহাসে
কপোল রাখিয়া কপোলর পাশে
কানে কানে কথা কয়।
দেখিতে দেখিতে কবির অধরে
হাসি রাশি আর কিছুতে না ধরে,
মুগ্ধ হৃদয় গলিয়া আদরে
ফাটিয়া বাহির হয়।
কহে উচ্ছ্বসি, “কিছু না মানিব,
এমনি মধুর শ্লোক বাখানিব,
রাজভাণ্ডার টানিয়া আনিব
ও রাঙা চরণতলে!”
বলিতে বলিতে বুক উঠে ফুলি’
উষ্ণীবপরা মস্তক তুলি’
পথে বাহিরায় ‘গৃহদ্বার খুলি
দ্রুত রাজগৃহে চলে!
কবির রমণী কুতূহলে ভাসে,
তাড়াতাড়ি উঠি’ বাতায়ন পাশে
উঁকি মারি’ চায়, মনে মনে হাসে,
কালো চোখে আলো নাচে!
কহে মনে মনে বিপুল পুলকে,
“রাজপথ দিয়ে চলে এত লোকে
এমনটি আর পড়িল না চোখে
আমার যেমন আছে!”
এদিকে কবির উৎসাহ ক্রমে
নিমেষে নিমেষে আসিতেছে কমে’
যখন পশিল নৃপ-আশ্রমে
মরিতে পাইলে বাঁচে!
রাজসভাসদ সৈন্য পাহারা
গৃহিণীর মত নহে ত তাহারা
সারি সারি দাড়ি করে দিশাহারা,
হেথা কি আসিতে আছে!
হেসে ভালবেসে দুটো কথা হয়
রাজসভাগৃহ হেন ঠাঁই নয়,
মন্ত্রী হইতে দ্বারী মহাশয়
সবে গভীর মুখ!
মানুষে কেন যে মানুষের প্রতি
ধরি’ আছে হেন যমের মুরতি,
তাই ভাবি কবি না পায় ফুরতি
দমি যায় তার বুক!
বসি মহারাজ মহেন্দ্র রায়
মহোচ্চ গিরি শিখরের প্রায়,
জন-অরণ্য হেরিছে হেলায়
অচল অটল ছবি।
কৃপা নির্ঝর পড়িছে ঝরিয়া
শত শত দেশ সরস করিয়া,
সে মহা মহিমা নয়ন ভরিয়া
চাহিয়া দেখিল কবি।
বিচার সমাধা হল যবে, শেষে
ইঙ্গিত পেয়ে মন্ত্রী-আদেশে
যোড় করপুটে দাঁড়াইল এসে
দেশের প্রধান চর!
অতি সাধুমত আকার প্রকার,
এক তিল নাহি মুখের বিকার,
ব্যবসা যে তাঁর মানুষ-শীকার
নাহি জানে কোন নর!
ব্রত নানামত সতত পালয়ে,
এক কানা কড়ি মূল্য না লয়ে
ধর্ম্মোপদেশ আলয়ে আলয়ে
বিতরিছে যাকে তাকে!
চেরা কটাক্ষ চকে ঠিকরে,
কি ঘটিছে কার, কে কোথা কি করে,
পাতায় পাতায় শিকড়ে শিকড়ে
সন্ধান তার রাখে!
নামাবলী গায়ে বৈষ্ণব রূপে
যখন সে আসি প্রণমিল ভূপে,
মন্ত্রী বাজারে অতি চুপে চুপে
কি করিল নিবেদন!
অমনি আদেশ হইল রাজার
“দেহ এঁরে টাকা পঞ্চ হাজার”
“সাধু, সাধু” কহে সভার মাঝার
যত সভাসদ জন!
পুলক প্রকাশে সবার গাত্রে,
“এ যে দান ইহা যোগ্যপাতে,
দেশের আবাল বনিতা মাত্রে
ইথে না মানিবে দ্বেষ!”
সাধু নুয়ে পড়ে নম্রতা ভরে,
দেখি সভাজন আহা আহা করে,
মন্ত্রীর শুধু জাগিল অধরে
ঈষৎ হাস্য লেশ!
আসে গুটি গুটি বৈয়াকরণ
ধূলিভরা দুটি লইয়া চরণ,
চিহ্ণিত করি রাজাস্তরণ
পবিত্র পদ-পঙ্কে!
ললাটে বিন্দু বিন্দু ঘর্ম্ম,
বলি অঙ্কিত-শিথিল চর্ম্ম,
প্রখর মূর্ত্তি অগ্নিশর্ম্ম,
ছাত্র মরে আতঙ্কে!
কোন দিকে কোন লক্ষ্য না করে’
পড়ি’ গেল শ্লোক বিকট হাঁ করে’
মটর কড়াই মিশায়ে কাঁকরে
চিবাইল যেন দাঁতে!
কেহ তার নাহি বুঝে আগু পিছু,
সবে বসি থাকে মাথা করি নীচু,
রাজা বলে “এঁরে দক্ষিণা কিছু
দাও দক্ষিণ হাতে।”
তার পরে এল গণৎকার,
গণনায় রাজা চমৎকার,
টাকা ঝন্ ঝন্ ঝনৎকার
বাজায়ে সে গেল চলি’!
আসে এক বুড়া গণ্য মান্য
করপুটে লয়ে দুর্ব্বাধান্য,
রাজা তাঁর প্রতি অতি বদান্য
ভরিয়া দিলেন থলি!
আসে নট ভাট রাজপুরোহিত,
কেহ একা কেহ শিষ্য সহিত,
কারো বা মাথায় পাগ্ড়ি লোহিত,
কারো বা হরিৎবর্ণ।
আসে দ্বিজগণ পরমারাধ্য,
কন্যার দায়, পিতার শ্রাদ্ধ,
যার যথামত পায় বরাদ্দ,
রাজা আজি দাতাকর্ণ।
যে যাহার সবে যায় স্বভবনে,
কবি কি করিবে ভাবে মনে মনে,
রাজা দেখে তারে সভাগৃহকোণে
বিপন্ন মুখছবি!
কহে ভূপ “হোথা বসিয়া কে ওই,
এস ত মন্ত্রী সন্ধান লই”
কবি কহি উঠে “আমি কেহ নই
আমি শুধু এক কবি!”
রাজা কহে “বটে! এস এস তবে,
আজিকে কাব্য আলোচনা হবে।”
বসাইলা কাছে মহা গৌরবে
ধরি তার কর দুটি!
মন্ত্রী ভাবিল—যাই এই বেলা,
এখন ত শুরু হবে ছেলেখেলা!-
কহে “মহারাজ, কাজ আছে মেলা,
আদেশ পাইলে উঠি!”
রাজা শুধু মৃদু নাড়িলা হস্ত,
নৃপ ইঙ্গিতে মহা তটস্থ
বাহির হইয়া গেল সমস্ত
সভাস্থ দলবল!-
পাত্র মিত্র অমাত্য আছি,
অর্থী প্রার্থী বাদী প্রতিবাদী,
উচ্চ তুচ্ছ বিবিধ উপাধি
বন্যার যেন জল!
চলি গেল যবে সভ্যসুজন,
মুখোমুখী করি বসিলা দুজন,
রাজা বলে “এবে কাব্যকূজন
আরম্ভ কয় কবি!”
কবি তবে দুই কর যুড়ি বুকে
বাণীবন্দনা করে নতমুখে,
“প্রকাশো জননী নয়ন সমুখে
প্রসন্ন মুখচ্ছবি!
বিমল মানস-সরসবাসিনী
শুক্লবসনা শুভ্রহাসিনী,
বীণাগঞ্জিত মঞ্জুভাষিণী
কমলকুঞ্জাসনা!
তোমারে হৃদয়ে করিয়া আসীন
সুখে গৃহকোণে ধনমানহীন
ক্ষ্যাপার মতন আছি চিরদিন
উদাসীন আনমনা!
চারিদিকে সবে বাঁটিয়া দুনিয়া
আপন অংশ নিতেছে গুণিয়া,
আমি তব স্নেহ বচন শুনিয়া
পেয়েছি স্বরগ সুধা!
সেই মোর ভাল-সেই বহু মানি,
তবু মাঝে মাঝে কেঁদে ওঠে প্রাণী,
সুরের খাদ্যে জান ত মা বাণী
নরের মিটে না ক্ষুধা!
যা হবার হবে, সে কথা ভাবি না,
মাগো, একবার ঝঙ্কারো বীণা,
ধরহ রাগিণী বিশ্ব-প্লাবিনা
অমৃত উৎস ধারা!
যে রাগিণী শুনি নিশি দিনমান
বিপুল হর্ষে দ্রব ভগবান
মলিন মর্ত্ত্যমাঝে বহমান
নিয়ত আত্মহারা!
যে রাগিণী সদা গগন ছাপিয়া
হোমশিখা সম উঠিছে কাঁপিয়া,
অনাদি অসীমে পড়িছে ঝাঁপিয়া
বিশ্বতন্ত্রী হতে।
যে রাগিণী চির জন্ম ধরিয়া
চিত্তকুহরে উঠে কুহরিয়া
অশ্রু হাসিতে জীবন ভরিয়া
ছুটে সহস্র স্রোতে!
কে আছে কোথায়? কে আসে, কে যায়,
নিমেষে প্রকাশে, নিমেষে মিলায়,
বালুকা লইয়া কালের বেলায়
ছায়া আলোকের খেলা!
জগতের যত রাজা মহারাজ
কাল ছিল যারা কোথা তারা আজ,
সকালে ফুটিছে সুখ দুখ লাজ,
টুটিছে সন্ধ্যাবেলা!
শুধু তার মাঝে ধ্বনিতেছে সুর
বিপুল বৃহৎ গভীর মধুর,
চিরদিন তাহে আছে ভরপুর,
মগন গগনতল।
যে জন শুনেছে সে অনাদিধ্বনি
ভাসায়ে দিয়েছে হৃদয়তরণী,
জানে না আপনা জানে না ধরণী,
সংসার কোলাহল!
সে জন পাগল, পরাণ বিকল,
ভবকুল হতে ছিঁড়িয়া শিকল
কেমনে এসেছে ছাড়িয়া সকল
ঠেকেছে চরণে তব!
তোমার অমল কমলগন্ধ
হৃদয়ে ঢালিছে মহা আনন্দ,
অপুর্ব্ব গীত, অলোক ছন্দ
শুনিছে নিত নব!
বাজুক্ সে বীণা, মজুক্ ধরণী,
বারেকের তরে ভুলাও জননী
কে বড় কে ছোট কে দীন কে ধনী
কেবা আগে কেবা পিছে,
কার জয় হল, কার পরাজয়,
কাহার বৃদ্ধি, কার হল ক্ষয়,
কেবা ভাল, আর কেবা ভাল নয়,
কে উপরে কেবা নীচে!
গাঁথা হয়ে যাক্ এক গীত রবে,
ছোট জগতের ছোট বড় সবে,
মুখে পড়ে’ রবে পদপল্লবে
যেন মালা একখানি!
তুমি মানসের মাঝখানে আসি
দাঁড়াও মধুর মুরতি বিকাশি’,
কুন্দবরণ সুন্দর হাসি
বীণা হাতে বীণাপাণি!
ভাসিয়া চলিবে রবি শশি তারা,
সারি সারি যত মানবের ধারা
অনাদিকালের পান্থ যাহারা
তব সঙ্গীত স্রোতে!
দেখিতে পাইব ব্যামে মহাকাল
ছন্দে ছন্দে বাজাইছে তাল,
দশ দিক্বধু খুলি কেশজাল
নাচে দশ দিক্ হতে!”
এতেক বলিয়া ক্ষণপরে কবি
করুণ কথায় প্রকাশিল ছবি
পুণ্যকাহিনী রঘুকুলরবি
রাঘবের ইতিহাস।
অসহ দুঃখ সহি নিরবধি
কেমন জনম গিয়েছে দগধি’,
জীবনের শেষ দিবস অবধি
অসীম নিরাশ্বাস!
কহিল, বারেক ভাবি’ দেখ মনে
সেই একদিন কেটেছে কেমনে
যেদিন মলিন বাকল বসনে
চলিলা বনের পথে,
ভাই লক্ষ্মণ বয়স নবীন,
স্নান ছায়াসম বিষাদ-বিলীন,
নববধূ সীতা আভরণহীন
উঠিলা বিদায় রথে।
রাজপুরী মাঝে উঠে হাহাকার,
প্রজা কাঁদিতেছে পথে সারেসার,
এমন বজ্র কখনো কি আর
পড়েছে এমন ঘরে?
অভিষেক হবে, উৎসবে তার
আনন্দময় ছিল চারিধার,
মঙ্গলদীপ নিবিয়া আঁধার
শুধু নিমেষের ঝড়ে।
আর এক দিন ভেবে দেখ মনে
যে দিন শ্রীরাম লয়ে লক্ষ্মণে
ফিরিয়া নিভৃত কুটীর ভবনে
দেখিলা জানকী নাহি,—
জানকী জানকী আর্ত্ত রোদনে
ডাকিয়া ফিরিলা কাননে কাননে,
মহা অরণ্য আঁধার আননে
রহিল নীরবে চাহি।
তার পরে দেখ শেষ কোথা এর,—
ভেবে দেখ কথা সেই দিবসের;
এত বিষাদের এত বিরহের
এত সাধনের ধন,—
সেই সীতাদেবী রাজসভামাঝে
বিদায় বিনয়ে নমি’ রঘুরাজে,
বিধা ধরাতলে অভিমানে লাজে
হইলা অদর্শন।
সে সকল দিন সেও চলে যায়,
সে অসহ শোক, চিহ্ন কোথায়,
যায় নি ত এঁকে ধরণীর গায়ে
অসীম দগ্ধ রেখা!
দ্বিধা ধরাভূমি জুড়েছে আবার,
দণ্ডক বনে ফুটে ফুলভার,
সরযূর কূলে তুলে তৃণসার
প্রফুল্ল শ্যাম-লেখা।
শুধু সে দিনের একখানি সুর
চির দিন ধরে বহু বহু দূর .
কাঁদিয়া হৃদয় করিছে বিধুর
মধুর করুণ তানে;
সে মহাপ্রাণের মাঝখানটিতে
যে মহা রাগিণী আছিল ধ্বনিতে
আজিও সে গীত মহা সঙ্গীতে
বাজে মানবের কানে!
তার পরে কবি কহিল সে কথা,
কুরু পাণ্ডব সমর-বারতা;—
গৃহবিবাদের ঘোর মত্ততা
ব্যাপিল সর্ব্ব দেশ,
দুইটি যমজ তরু পাশাপাশি,
ঘর্ষণে জলে হুতাশন রাশি,
মহা দাবানল ফেলে শেষে গ্রাসি
অরণ্য-পরিবেশ!
এক গিরি হতে দুই স্রোত পারা
দুইটি শীর্ণ বিদ্বেষধারা
সরীসৃপগতি মিলিল তাহারা
নিষ্ঠুর অভিমানে-
দেখিতে দেখিতে হল উপনীত
ভারতের যত ক্ষত্র শোণিত,
ত্রাসিত ধরণী করিল ধ্বনিত
প্রলয়-বন্যা-গানে!
দেখিতে দেখিতে ডুবে গেল কূল,
আত্ম ও পর হয়ে গেল ভুল,
গৃহবন্ধন করি নির্ম্মূল
ছুটিল রক্তধারা,
ফেনায়ে উঠিল মরণাম্বুধি,
বিশ্ব রহিল নিশ্বাস রুধি’,
কাঁপিল গগন শত আঁখি মুদি’
নিবায়ে সূর্য্য তারা!
সমর-বন্যা যবে অবসান
সোনার ভারত বিপুল শ্মশান,
রাজগৃহ যত ভূতল-শয়ান
পড়ে আছে ঠাঁই ঠাঁই,—
ভীষণা শান্তি রক্ত নয়নে
বসিয়া শোণিত-পঙ্কশয়নে,
ধরা পানে চাহি আনত বয়নে
মুখেতে বচন নাই।
বহু দিন পরে ঘুচিয়াছে খেদ,
মরণে মিটেছে সব বিচ্ছেদ,
সমাধা যজ্ঞ মহা নরমেধ
বিদ্বেষ-হুতাশনে!
সকল কামনা করিয়া পূর্ণ,
সকল দম্ভ করিয়া চূর্ণ,
পাঁচ ভাই গিয়া বসিলা শূন্য
স্বর্ণ-সিংহাসনে!
স্তব্ধ প্রাসাদ বিষাদ-আঁধার,
শ্মশান হইতে আসে হাহাকার,
রাজপুর-বধূ যত অনাথার
মর্ম্ম-বিদার রব!
“জয় জয় জয় পাণ্ডুতনয়”
সারি সারি দ্বারী দাঁড়াইয়া কয়,
পরিহাস বলে’ আজি মনে হয়,
মিছে মনে হয় সব!
কালি যে ভারত সারা দিন ধরি’
অট্ট গরজে অম্বর ভরি’
রাজার রক্তে খেলেছিল হোরি
ছাড়ি কুলভয় লাজে
পরদিনে চিতাভস্ম মাখিয়া
সন্ন্যাসী বেশে অঙ্গ ঢাকিয়া
বসি একাকিনী শোকার্ত্ত হিয়া
শূন্য শ্মশান মাঝে;
কুরু পাণ্ডব মুছে গেছে সব,
সে রণরঙ্গ হয়েছে নীরব,
সে চিত-বহ্ণি অতি ভৈরব
ভস্মও নাহি তার;
যে ভূমি লইয়া এত হানাহানি
সে আজি কাহার তাহাও না জানি,
কোথা ছিল রাজা, কোথা রাজধানী
চিহ্ণ নাহিক আর!
তবু কোথা হতে আসিছে সে স্বর,—
যেন সে অমর সমর সাগর
গ্রহণ করেছে নব কলেবর
একটি বিরাট গানে;
বিজয়ের শেষে সে মহা প্রয়াণ
সফল আশার বিষাদ মহান,
উদাস শান্তি করিতেছে দান
চির-মানবের প্রাণে!
হায়, এ ধরায় কত অনন্ত
বরষে বরষে শীত বসন্ত
সুখে দুখে ভরি দিক্ দিগন্ত
হাসিয়া গিয়াছে ভাসি;
এমনি বরষা আজিকার মত
কত দিন কত হয়ে গেছে গত,
নব মেঘভারে গগন আনত
ফেলেছে অশ্রুরাশি!
যুগে যুগে লোক গিয়েছে এসেছে,
দুখীরা কেঁদেছে, সুখীরা হেসেছে,
প্রেমিক যে জন ভাল সে বেসেছে
আজি আমাদেরি মত;
তারা গেছে শুধু তাহাদের গান
দু হাতে ছড়ায়ে করে গেছে দান,
দেশে দেশে, তার নাহি পরিমাণ,
ভেসে ভেসে যায় কত!
শ্যামলা বিপুলা এ ধরার পানে
চেয়ে দেখি আমি মুগ্ধ নয়ানে;
সমস্ত প্রাণে কেন যে কে জানে
ভরে আসে আঁখি জল,
বহু মানবের প্রেম দিয়ে ঢাকা,
বহু দিবসের সুখে দুখে আঁকা,
লক্ষ যুগের সঙ্গীতে মাখা
সুন্দর ধরাতল!
এ ধরার মাঝে তুলিয়া নিনাদ
চাহি নে করিতে বাদ প্রতিবাদ,
যে ক’ দিন আছি মানসের সাধ
মিটাব আপন মনে;
যার যাহা আছে তার থাক্ তাই,
কারো অধিকারে যেতে নাহি চাই,
শান্তিতে যদি থাকিবারে পাই
একটি নিভৃত কোণে!
শুধু বাঁশিখানি হাতে দাও তুলি
বাজাই বসিয়া প্রাণমন খুলি’,
পুষ্পের মত সঙ্গীতগুলি
ফুটাই আকাশ ভালে।
অন্তর হতে আহরি বচন
আনন্দলোক করি বিরচন,
গীতরসধারা করি সিঞ্চন
সংসার-ধূলিজালে!
অতি দুর্গম সৃষ্টি-শিখরে
অসীম কালের মহা কন্দরে
সতত বিশ্ব নির্ঝর ঝরে
ঝর্ঝর সঙ্গীতে,
স্বর-তরঙ্গ যত গ্রহ তারা
ছুটিছে শূন্যে উদ্দেশহারা,—
সেথা হতে টানি লব গীতধারা
ছোট এই বাঁশরীতে।
ধরণীর শ্যাম করপুটখানি
ভরি’ দিব আমি সেই গীত আনি,
বাতাসে মিশায়ে দিব এক বাণী
মধুর অর্থভরা।
নবীন আষাঢ়ে রচি’ নব মায়া
এঁকে দিয়ে যাব ঘনতর ছায়া,
করে’ দিয়ে যাব বসন্তকারী
বাসন্তীবাস পরা।
ধরণীর তলে, গগনের গায়,
সাগরের জলে, অরণ্য ছায়
আরেকটুখানি নবীন আভায়
রঙীন্ করিয়া দিব।
সংসার মাঝে দুয়েকটি সুর
রেখে দিয়ে যাব করিয়া মধুর,
দুয়েকটি কাঁটা করি দিব দূর
তার পরে ছুটি নিব!
সুখহাসি আরো হবে উজ্জ্বল,
সুন্দর হবে নয়নের জল,
স্নেহ-সুধামাখা বাসগৃহতল
আরো আপনার হবে!
প্রেয়সী নারী নয়নে অধরে
আরেকটু মধু দিয়ে যাব ভরে’,
আরেকটু স্নেহ শিশুমুখ পরে
শিশিরের মত র’বে!
না পারে বুঝাতে আপনি না বুঝে
মানুষ ফিরিছে কথা খুঁজে খুঁজে,
কোকিল যেমন পঞ্চমে কূজে
মাগিছে তেমনি সুর;
কিছু ঘুচাইব সেই ব্যাকুলতা,
কিছু মিটাইব প্রকাশের ব্যথা,
বিদায়ের আগে দু চারিটা কথা
রেখে যাব সুমধুর!
খাক হৃদাসনে জননী ভারতী,
তোমারি চরণে প্রাণের আরতি,
চাহিনা চাহিতে আর কারো প্রতি,
রাখি না কাহারো আশা!
কত সুখ ছিল হয়ে গেছে দুখ,
কত বান্ধব হয়েছে বিমুখ,
ম্লান হয়ে গেছে কত উৎসুক
উন্মুখ ভালবাসা!
শুধু ও চরণ হৃদয়ে বিরাজে,
শুধু ওই বীণা চিরদিন বাজে,
স্নেহসুরে ডাকে অন্তর মাঝে
—আয় রে বৎস আয়,—
ফেলে রেখে আয় হাসি ক্রন্দন,
ছিঁড়ে আয় যত মিছে বন্ধন,
হেথা ছায়া আছে চির নন্দন
চির বসন্ত বায়!-
সেই ভালো মাগো, যাক্ যাহা যায়,
জন্মের মত বরিনু তোমায়,
কমল গন্ধ কোমল দু’পায়
বার বার নমো নমঃ!-
এত বলি কবি থামাইল গান,
বসিয়া রহিল মুগ্ধ নয়ান,
বাজিতে লাগিল হৃদয় পরাণ
বীণা ঝঙ্কার সম!
পুলকিত রাজা, আঁখি ছলছল,
আসন ছাড়িয়া নামিলা ভূতল,
দু বাহু বাড়ায়ে পরাণ উতল
কবিরে লইলা বুকে’
কহিলা, ধন্য, কবিগো, ধন্য,
আনন্দে মন সমাচ্ছন্ন
তোমায় কি আমি কহিব অন্য,
চিরদিন থাক সুখে!
ভাবিয়া না পাই কি দিব তোমারে,
করি পরিতোষ কোন্ উপহারে,
যাহা কিছু আছে রাজভাণ্ডারে
সব দিতে পারি আনি!-
প্রেমোচ্ছ্বসিত আনন্দ জলে
ভরি দুনয়ন কবি তাঁরে বলে,—
কণ্ঠ হইতে দেহ মোর গলে
ওই ফুলমালা খানি!-
মালা বাঁধি কেশে কবি যায় পথে,
কেহ শিবিকায়, কেহ ধায় রথে,
নানাদিকে লোক যায় নানা মতে
কাজের অন্বেষণে;
কবি নিজ মনে ফিরিছে লুব্ধ,
যেন সে তাহার নয়ন মুগ্ধ
কল্পধেনুর অমৃত দুগ্ধ
দোহন করিছে মনে!
কবির রমণী বাঁধি কেশপাশ,
সন্ধ্যার মত পরি’ রাঙা বাস,
বসি’ একাকিনী বাতায়ন পাশ,
সুখ হাস মুখে ফুটে।
কপোতের দল চারিদিকে ঘিরে
নাচিয়া ডাকিয়া বেড়াইছে ফিরে,
যবের কণিকা তুলিয়া সে ধীরে
দিতেছে চঞ্চুপুটে!
অঙ্গুলি তার চলিছে যেমন
কত কি যে কথা ভাবিতেছে মন,
হেন কালে পথে ফেলিয়া নয়ন
সহসা কবিরে হেরি’
বাহু খানি নাড়ি’ মৃদু ঝিনি ঝিনি
বাজাইয়া দিল কর-কিঙ্কিণী,
হাসিজালখানি অতুলহাসিনী
ফেলিলা কবিরে ঘেরি’।
কবির চিত্ত উঠে উল্লাসি’
অতি সত্বর সম্মুখে আসি’
কহে কৌতুকে মৃদু মৃদু হাসি’
—দেখ কি এনেছি বালা!
নানা লোকে নানা পেয়েছে রতন,
আমি আনিয়াছি করিয়া যতন
তোমার কণ্ঠে দেবার মতন
রাজকণ্ঠের মালা!-
এত বলি মালা শির হতে খুলি’
প্রিয়ার গলায় দিতে গেল তুলি’,
কবি নারী নোষে কর দিল ঠেলি’
ফিরায়ে রহিল মুখ!
মিছে ছল করি’ মুখে করে রাগ,
মনে মনে তার জাগিছে সোহাগ,
গরবে ভরিয়া উঠে অনুরাগ,
হৃদয়ে উথলে সুখ।
কবি ভাবে, বিধি অপ্রসন্ন,
বিপদ আজিকে হেরি আসন্ন,
বসি থাকে মুখ করি বিষণ্ন,
শূন্য নয়ন মেলি!-
কবির ললনা আধ খানি বেঁকে,
চোরা কটাক্ষে চাহে থেকে থেকে,
পতির মুখের ভাবখানা দেখে’
মুখের বসন ফেলি’
উচ্চ কণ্ঠে উঠিল হাসিয়া,
তুচ্ছ ছলনা গেল সে ভাসিয়া,
চকিতে সরিয়া নিকটে আসিয়া
পড়িল তাহার বুকে,—
সেথায় লুকায়ে হাসিয়া কাঁদিয়া,
কবির কণ্ঠ বাহুতে বাঁধিয়া,
শতবার করি আপনি সাধিয়া
চুম্বিল তার মুখে!
বিস্মিত কবি বিহ্বল প্রায়;—
আনন্দে কথা খুঁজিয়া না পায়;—
মালা খানি লয়ে আপন গলায়
আদরে পরিলা সতী।
ভক্তি আবেগে কবি ভাবে মনে
চেয়ে সেই প্রেমপূর্ণ বদনে-
বাঁধা প’ল এক মাল্য বাঁধনে
লক্ষ্মী সরস্বতী।
১৩ শ্রাবণ, ১৩০০।
প্রতীক্ষা
প্রতীক্ষা।
ওরে মৃত্যু, জানি তুই আমার বক্ষের মাঝে
বেঁধেছিস্ বাসা,
যেখানে নির্জ্জন কুঞ্জে ফুটে আছে যত মোর
স্নেহ ভালবাসা,
গোপন মনের আশা, জীবনের দুঃখ সুখ,
মর্ম্মের বেদনা,
চির দিবসের যত হাসি-অশ্রু-চিহ্ণ আঁকা
বাসনা সাধনা;
যেখানে নন্দন ছায়ে নিঃশঙ্কে করিছে খেলা
অন্তরের ধন,
স্নেহের পুত্তলিগুলি, আজন্মের স্নেহস্মৃতি,
আনন্দ-কিরণ;
কত আলো, কত ছায়া, কত ক্ষুদ্র বিহঙ্গের
গীতিময়ী ভাষা,—
ওরে মৃত্যু, জানিয়াছি, তারি মাঝখানে এসে
বেঁধেছিস্ বাসা!
নিশিদিন নিরন্তর জগৎ জুড়িয়া খেলা
জীবন চঞ্চল!
চেয়ে দেখি রাজপথে চলেছে অশ্রান্ত গতি
যত পান্থ দল;
রৌদ্রপাণ্ডু নীলাম্বরে, পাখীগুলি উড়ে যায়
প্রাণপূর্ণ বেগে,
সমীরকম্পিত বনে নিশিশেষে নব নব
পুষ্প উঠে জেগে;
চারি দিকে কত শত দেখাশোনা আনাগোনা
প্রভাতে সন্ধ্যায়;
দিনগুলি প্রতি প্রাতে খুলিতেছে জীবনের
নূতন অধ্যায়;
তুমি শুধু এক প্রান্তে বসে আছ অহর্নিশি
স্তব্ধ নেত্র খুলি’,—
মাঝে মাঝে রাত্রিবেলা উঠ পক্ষ ঝাপটিয়া
বক্ষ উঠে দুলি’!
যে সুদূর সমুদ্রের পরপার রাজ্য হতে
আসিয়াছি হেথা,
এনেছ কি সেথাকার নূতন সংবাদ কিছু
গোপন বারতা!
সেথা শব্দহীন তীরে উর্ম্মিগুলি তালে তালে
মহামন্দ্রে বাজে,
সেই ধ্বনি কি করিয়া ধ্বনিয়া তুলিছ মোর
ক্ষুদ্র বক্ষ মাঝে!
রাত্রি দিন ধুক্ ধুক্ হৃদয়পঞ্জর তটে
অনন্তের ঢেউ,
অবিশ্রাম বাজিতেছে সুগম্ভীর সমতানে
শুনিছে না কেউ!
আমার এ হৃদয়ের ছোট খাট গীতগুলি,
স্নেহ-কলরব,
তারি মাঝে কে আনিল দিশাহীন সমুদ্রের
সঙ্গীত ভৈরব!
তুই কি বাসিস ভাল আমার এ বক্ষবাসী
পরাণ পক্ষীরে?
তাই এর পার্শ্বে এসে কাছে বসেছিস্ ঘেঁষে
অতি ধীরে ধীরে!
দিনরাত্রি নির্ণিমেষে চাহিয়া নেত্রের পানে
নীরব সাধনা,
নিস্তব্ধ আসনে বসি একাগ্র আগ্রহভরে
রুদ্র আরাধনা!
চপল চঞ্চল প্রিয়া ধরা নাহি দিতে চায়
স্থির নাহি থাকে,
মেলি নানাবর্ণ পাখা উড়ে উড়ে চলে যায়
নব নব শাখে;
তুই তবু একমনে মৌনব্রত একাসনে
বসি নিরলস।
ক্রমে সে পড়িবে ধরা, গীত বন্ধ হয়ে যাবে,
মানিবে সে বশ!
তখন কোথায় তারে ভুলায়ে লইয়া যাবি
কোন্ শূন্যপথে!
অচৈতন্য প্রেয়সীরে অবহেলে লয়ে কোলে
অন্ধকার রথে!
যেথায় অনাদি রাত্রী রয়েছে চির-কুমারী,—
আলোক পরশ
একটি রোমাঞ্চ রেখা আঁকেনি তাহার গাত্রে
অসংখ্য বরষ;
সৃজনের পরপ্রান্তে যে অনন্ত অন্তঃপুরে
কভু দৈববশে
দূরতম জ্যোতিষ্কের ক্ষীণতম পদধ্বনি
তিল নাহি পশে;
সেথায় বিরাট পক্ষ দিবি তুই বিস্তারিয়া
বন্ধন বিহীন,
কাঁপিবে বক্ষের কাছে নবপরিণীতা বধু
নূতন স্বাধীন!
ক্রমে সে কি ভুলে যাবে ধরণীর নীড় খানি
তৃণে পত্রে গাঁথা,
এ আনন্দ সূর্য্যালোক, এই স্নেহ, এই গেহ,
এই পুষ্পপাতা?
ক্রমে সে প্রণয়ভরে তোরেও কি করি লবে
আত্মীয় স্বজন?
অন্ধকার বাসরেতে হবে কি দুজনে মিলি
মৌন আলাপন?
তোর স্নিগ্ধ সুগম্ভীর অচঞ্চল প্রেমমূর্ত্তি,
অসীম নির্ভর,
নির্নিমেষ নীলনেত্র, বিশ্বব্যাপ্ত জটাজূট,
নির্ব্বাক্ অধর;
তার কাছে পৃথিবীর চঞ্চল আনন্দগুলি
তুচ্ছ মনে হ’বে,
সমুদ্রে মিশিলে নদী বিচিত্র তটের স্মৃতি
স্মরণে কি র’বে?
ওগো মৃত্যু, ওগো প্রিয়, তবু থাক্ কিছুকাল
ভুবন মাঝারে!
এরি মাঝে বধূবেশে অনন্ত বাসর দেশে
লইয়ো না তারে!
এখনো সকল গান করে নি সে সমাপন
সন্ধ্যায় প্রভাতে;
নিজের বক্ষের তাপে মধুর উত্তপ্ত নীড়ে
সুপ্ত আছে রাতে;
পান্থ পাখীদের সাথে এখনো যে যেতে হবে
নব নব দেশে,
সিন্ধুতীরে কুঞ্জবনে নব নব বসন্তের
আনন্দ উদ্দেশে;
ওগো মৃত্যু কেন তুই এখনি তাহার নীড়ে
বসেছিস্ এসে?
তার সব ভালবাসা আঁধার করিতে চাস্
তুই ভালবেসে?
এ যদি সত্যই হয় মৃত্তিকার পৃথ্বী পরে
মুহূর্ত্তের খেলা,
এই সব মুখোমুখী এই সব দেখাশোনা
ক্ষণিকের মেলা,
প্রাণপণ ভালবাসা সেও যদি হয় শুধু
মিথ্যার বন্ধন,
পরশে খসিয়া পড়ে, তার পরে দণ্ড দুই
অরণ্যে ক্রন্দন,
তুমি শুধু চিরস্থায়ী, তুমি শুধু সীমাশূন্য
মহা পরিণাম,
যত আশা যত প্রেম তোমার তিমিরে লভে
অনন্ত বিশ্রাম,
তবে মৃত্যু, দূরে যাও, এখনি দিয়োনা ভেঙ্গে
এ খেলার পুরী,
ক্ষণেক বিলম্ব কর, আমার দু’দিন হতে
করিয়ো না চুরী!
একদা নামিবে সন্ধ্যা, বাজিবে আরতি শঙ্খ
অদূর মন্দিরে,
বিহঙ্গ নীরব হবে, উঠিবে ঝিল্লির ধ্বনি
অরণ্য গভীরে,
সমাপ্ত হইবে কর্ম্ম, সংসার সংগ্রাম শেষে
জয় পরাজয়,
আসিবে তন্দ্রার ঘোর পান্থের নয়ন পরে
ক্লান্ত অতিশয়,
দিনান্তের শেষ আলো দিগন্তে মিলায়ে যাবে,
ধরণী আঁধার,
সুদূরে জ্বলিবে শুধু অনন্তের যাত্রাপথে
প্রদীপ তারার,
শিয়রে নয়ন-শেষে বসি যারা অনিমেষে
তাহাদের চোখে
আসিবে শ্রান্তির ভার নিদ্রাহীন যামিনীতে
স্তিমিত আলোকে,—
একে একে চলে যাবে আপন আলয়ে সবে
সখাতে সখীতে,
তৈলহীন দীপশিখা নিবিয়া আসিবে ক্রমে
অর্দ্ধ রজনীতে,
উচ্ছ্বসিত সমীরণ আনিবে সুগন্ধ বহি’
অদৃশ্য ফুলের,
অন্ধকার পূর্ণ করি আসিবে তরঙ্গধ্বনি
অজ্ঞাত কুলের,
ওগো মৃত্যু সেই লগ্নে নির্জ্জন শয়নপ্রান্তে
এসো বরবেশে,
আমার পরাণ বধূ ক্লান্ত হস্ত প্রসারিয়া
বহু ভালবেসে
ধরিবে তোমার বাহু; তখন তাহারে তুমি
মন্ত্র পড়ি নিয়ো;
রক্তিম অধর তার নিবিড় চুম্বন দানে
পাণ্ডু করি দিয়ো!
১৭ অগ্রহায়ণ, ১৩০০।
প্রত্যাখ্যান
প্রত্যাখ্যান।
অমন দীন-নয়নে তুমি
চেয়ো না!
অমন সুধা-করুণ সুরে
গেয়ো না!
সকাল বেলা সকল কাজে
আসিতে যেতে পথের মাঝে
আমারি এই আঙিনা দিয়ে
যেয়ো না!
অমন দীন-নয়নে তুমি
চেয়ো না!
মনের কথা রেখেছি মনে
যতনে;
ফিরিছ মিছে মাগিয়া সেই
রতনে!
তুচ্ছ অতি, কিছু সে নয়
দু চারি ফোঁটা অশ্রুময়
একটি শুধু শশাণিত-রাঙা
বেদনা!
অমন দীন-নয়নে তুমি
চেয়ো না!
কাহার আশে দুয়ারে কর
হানিছ?
না জানি তুমি কি মোরে মনে
মানিছ?
রয়েছি হেথা লুকাতে লাজ,
নাহিক মোর রাণীর সাজ,
পরিয়া আছি জীর্ণচীর
রাসনা।
অমন দীন-নয়নে তুমি
চেয়ে না!
কি ধন তুমি এনেছ ভরি’
দু’হাতে?
অমন করি’ যেয়ো না ফেলি’
ধূলাতে!
এ ঋণ যদি শুধিতে চাই,
কি আছে হেন, কোথায় পাই,
জনম তরে বিকাতে হবে
আপনা!
অমন দীন-নয়নে তুমি
চেয়ো না!
ভেবেছি মনে ঘরের কোণে
রহিব।
গোপন দুখ আপন বুকে
বহিব!
কিসের লাগি করিব আশা,
বলিতে চাহি, নাহিক ভাষা,
রয়েছে সাধ, না জানি তার
সাধনা!
অমন দীন-নয়নে তুমি
চেয়ো না!
যে সুর তুমি ভরেছ তব
বাঁশিতে
উহার সাথে আমি কি পারি
গাহিতে?
গাহিতে গেলে ভাঙ্গিয়া গান
উছলি উঠে সকল প্রাণ,
না মানে রোধ অতি অবোধ
রোদনা!
অমন দীন-নয়নে তুমি
চেয়ো না!
এসেছ তুমি গলায় মালা
ধরিয়া,
নবীন বেশ, শোভন ভূষা
পরিয়া।
হেথায় কোথা কনক থালা,
কোথায় ফুল, কোথায় মালা,
বাসর-সেবা করিবে কেবা,
রচনা?
অমন দীন-নয়নে তুমি
চেয়ো না!
ভুলিয়া পথ এসেছ সখা
এ ঘরে!
অন্ধকারে মালা-বাদল
কে করে!
সন্ধ্যা হতে কঠিন ভুঁয়ে
একাকী আমি রয়েছি শুয়ে,
নিয়ে দীপ জীবন-নিশি
যাপনা।
অমন দীন-নয়নে আর
চেয়ো না!
২৭ আষাঢ়, ১৩০০।
বন্ধন
বন্ধন।
বন্ধন? বন্ধন বটে, সকলি বন্ধন
মেই প্রেম সুখতৃষ্ণা; সে যে মাতৃপাি
স্তন হতে স্তনান্তরে লইতেছে টানি’,
নব নব রসস্রোতে পূর্ণ করি’ মন
সদা করাইছে পান! স্তন্যের পিপাসা
কল্যাণদায়িনীরূপে থাকে শিশু মুখে-
তেমনি সহজ তৃষ্ণা আশা ভালবাসা
সমস্ত বিশ্বের রস কত সুখে দুখে,
করিতেছে আকর্ষণ, জনমে জনমে
প্রাণে মনে পূর্ণ করি গঠিতেছে ক্রমে
দুর্লভ জীবন; পলে পলে নব আশ
নিয়ে যায় নব নব আস্বাদে আশ্রমে।
স্তন্যতৃষ্ণা নষ্ট করি মাতৃবন্ধপাশ
ছিন্ন করিবারে চাস্ কোন্ মুক্তিভ্রমে!
বর্ষা যাপন
বর্ষা যাপন।
রাজধানী কলিকাতা; তেতলার ছাতে
কাঠের কুঠরি এক ধারে;
আলাে আসে পূর্ব্ব দিকে প্রথম প্রভাতে
বায়ু আসে দক্ষিণের দ্বারে।
মেঝেতে বিছানা পাতা, দুয়ারে রাখিয়া মাথা,
বাহিরে আঁখিরে দিই ছুটি,
সৌধ-ছাদ শত শত ঢাকিয়া রহস্য কত,
আকাশেরে করিছে ভ্রূকুটি।
নিকটে জানালা গায় এক কোণে আলিশায়
একটুকু সবুজের খেলা,
শিশু অশথের গাছ আপন ছায়ার নাচ
সারাদিন দেখিছে একেলা।
দিগন্তের চারি পাশে আষাঢ় নামিয়া আসে,
বর্ষা আসে হইয়া ঘোরালো,
সমস্ত আকাশ যােড়া গরজে ইন্দ্রের ঘােড়া
চিক্মিকে বিদ্যুতের আলাে।
চারি দিকে অবিরল ঝর ঝর বৃষ্টি জল
এই ছােট প্রান্ত ঘরটিরে
দেয় নির্ব্বাসিত করি’— দশদিক অপহরি’,—
সমুদয় বিশ্বের বাহিরে।
বসে বসে সঙ্গীহীন ভাল লাগে কিছুদিন
পড়িবারে মেঘদূত কথা;—
—বাহিরে দিবস রাতি বায়ু করে মাতামাতি
বহিয়া বিফল ব্যাকুলতা;—
বহু পূর্ব্ব আষাঢ়ের মেঘাচ্ছন্ন ভারতের
নগ নদী নগরী বাহিয়া
কত শ্রুতিমধু নাম কত দেশ কত গ্রাম
দেখে’ যাই চাহিয়া চাহিয়া;
ভাল করে’ দোহে চিনি, বিরহী ও বিরহিণী
জগতের দু’পারে দু’জন,
প্রাণে প্রাণে পড়ে টান, মাঝে মহা ব্যবধান,
মনে মনে কল্পনা সৃজন;
যক্ষবধূ গৃহকোণে ফুল নিয়ে দিন গণে
দেখে শুনে ফিরে আসি চলি’।
বর্ষা আসে ঘন রোলে, যত্নে টেনে লই কোলে
গোবিন্দদাসের পদাবলী।
সুর করে’ বারবার পড়ি বর্ষা অভিসার;—
অন্ধকার যমুনার তীর,—
নিশীথে নবীনা রাধা নাহি মানে কোন বাধা,
খুঁজিতেছে নিকুঞ্জকুটীর;
অনুক্ষণ দর দর বারি ঝরে ঝর ঝর
তাহে অতি দূরতর বন,—
ঘরে ঘরে রুদ্ধ দ্বার, সঙ্গে কেহ নাহি আর
শুধু এক কিশোর মদন।
আষাঢ় হতেছে শেষ, মিশায়ে মল্লার দেশ
রচি “ভরা বাদরের” সুর।
খুলিয়া প্রথম পাতা, গীত গোবিন্দের গাথা
গাহি “মেঘে অম্বব মেদুর।”
স্তব্ধ রাত্রি দ্বিপ্রহরে ঝুপ্ ঝুপ্ বৃষ্টি পড়ে—
শুয়ে শুয়ে সুখ-অনিদ্রায়
“রজনী সাঙন ঘন ঘন দেয়া-গরজন”
সেই গান মনে পড়ে’ যায়।
“পালঙ্কে শয়ান রঙ্গে বিগলিত চীর অঙ্গে”
মন সুখে নিদ্রায় মগন,—
সেই ছবি জাগে মনে পুবাতন বৃন্দাবনে
রাধিকার নির্জ্জন স্বপন।
মৃদু মৃদু বহে শ্বাস, অধরে লাগিছে হাস
কেঁপে উঠে মুদিত পলক,—
বাহুতে মাথাটি থুয়ে, একাকিনী আছে শুয়ে,
গৃহ কোণে ম্লান দীপালোক;
গিরিশিরে মেঘ ডাকে, বৃষ্টি ঝরে তরু শাখে,
দাদুরী ডাকিছে সারারাতি,—
হেন কালে কি না ঘটে! এ সময়ে আসে বটে
একা ঘরে স্বপনের সাথী।
মবি মরি স্বপ্ন শেষে পুলকিত রসাবেশে
যখন সে জাগিল একাকী,
দেখিল বিজন ঘরে দীপ নিবু নিবু কবে
প্রহরী প্রহর গেল হাঁকি;—
বাড়িছে বৃষ্টির বেগ থেকে থেকে তাকে মেঘ,
ঝিল্লিরব পৃথিবী ব্যাপিয়া,
সেই ঘনঘোরা নিশি স্বপ্নে জাগরণে মিশি’
না জানি কেমন করে হিয়া!—
লয়ে পুঁথি দু’চারিটি নেড়ে চেড়ে ইটি সিটি
এই মত কাটে দিনরাত।
তার পরে টানি লই বিদেশী কাব্যের বই
উলটি পালটি দেখি পাত,—
কোথারে বর্ষার ছায়া, অন্ধকার মেঘ মায়া,
ঝর ঝর ধ্বনি অহরহ!
কোথায় সে কর্ম্মহীন একান্তে আপনে লীন
জীবনের নিগূঢ় বিরহ!
বর্ষার সমান সুরে অন্তর বাহির পূরে’
সঙ্গীতের মুষল ধারায়
পরাণের বহুদূর কূলে কূলে ভরপুর,—
বিদেশী কাব্যে সে কোথা হায়!
তখন সে পুঁথি ফেলি, দুয়ারে আসন মেলি’
বসি গিয়ে আপনার মনে,
কিছু করিবার নাই চেয়ে চেয়ে ভাবি তাই
দীর্ঘ দিন কাটিবে কেমনে!
মাথাটি করিয়া নিচু বসে’ বসে’ রচি কিছু
বহু যত্নে সারাদিন ধরে,—
ইচ্ছা করে অবিরত আপনার মনোমত
গল্প লিখি একেকটি করে’।
ছোট প্রাণ, ছোট ব্যথা, ছোট ছোট দুঃখ কথা
নিতান্তই সহজ সরল;
সহস্র বিস্মৃতিরাশি প্রত্যহ যেতেছে ভাসি
তারি দুচারিটি অশ্রুজল।
নাহি বর্ণনার ছটা, ঘটনার ঘনঘটা,
নাহি তত্ত্ব নাহি উপদেশ।
অন্তরে অতৃপ্তি র’বে সাঙ্গ করি’ মনে হবে
শেষ হয়ে হইল না শেষ।
জগতের শত শত অসমাপ্ত কথা যত,
অকালের বিচ্ছিন্ন মুকুল,
অজ্ঞাত জীবনগুলা, অখ্যাত কীর্ত্তির ধূলা,
কত ভাব, কত ভয় ভুল
সংসারের দশদিশি ঝরিতেছে অহর্নিশি
ঝর ঝর বরষার মত—
ক্ষণ-অশ্রু ক্ষণ-হাসি পড়িতেছে রাশি রাশি
শব্দ তার শুনি অবিরত।
সেই সব হেলাফেলা, নিমেষের লীলা খেলা
চারিদিকে করি’ স্তূপাকার
তাই দিয়ে করি সৃষ্টি একটি বিস্মৃতি বৃষ্টি
জীবনের শ্রাবণ নিশার।
১৭ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯
বসুন্ধরা
বসুন্ধরা।
আমারে ফিরায়ে লহ, অয়ি বসুন্ধরে,
কোলের সন্তানে তব কোলের ভিতরে,
বিপুল অঞ্চলতলে! ওগো মা মৃণ্ময়ি,
তোমার মৃত্তিকা মাঝে ব্যাপ্ত হয়ে রই;
দিগ্বিদিকে আপনারে দিই বিস্তারিয়া
বসন্তের আনন্দের মত; বিদারিয়া
এ বক্ষ-পঞ্জর, টুটিয়া পাষাণ-বন্ধ
সঙ্কীর্ণ প্রাচীর, আপনার নিরানন্দ
অন্ধ কারাগার, হিল্লোলিয়া, মর্ম্মরিয়া,
কম্পিয়া, স্খলিয়া, বিকীরিয়া, বিচ্ছুরিয়া
শিহরিয়া সচকিয়া আলোকে পুলকে
প্রবাহিয়া চলে যাই সমস্ত ভূলোকে
প্রান্ত হতে প্রান্তভাগে; উত্তরে দক্ষিণে,
পূরবে পশ্চিমে; শৈবালে শাদ্বলে তৃণে
শাখায় বল্কলে পত্রে উঠি সরসিয়া
নিগূঢ় জীবন-রসে; যাই পরশিয়া
স্বর্ণ-শীর্ষে আনমিত শস্যক্ষেত্রতল
অঙ্গুলির আন্দোলনে; নব পুষ্পদল
করি পূর্ণ সঙ্গোপনে সুবর্ণ-লেখায়
সুধগন্ধে মধুবিন্দু ভারে; নীলিমায়
পরিব্যাপ্ত করি দিয়া মহাসিন্ধু নীর
তীরে তীরে করি নৃত্য স্তব্ধ ধরণীর,
অনন্ত কল্লোল গীতে; উল্লসিত রঙ্গে
ভাষা প্রসারিয়া দিই তরঙ্গে তরঙ্গে
দিক্-দিগন্তরে; শুভ্র উত্তরীয় প্রায়
শৈলশৃঙ্গে বিছাইয়া দিই আপনায়
নিলয় নীহারের উত্তুঙ্গ নির্জ্জনে,
নিঃশব্দ নিভৃতে।
যে ইচ্ছা গোপন মনে
উৎস সম উঠিতেছে অজ্ঞাতে আমার
বহুকাল ধরে-হৃদয়ের চারিধার
ক্রমে পরিপূর্ণ করি বাহিরিতে চাহে
উদ্বেল উদ্দাম মুক্ত উদার প্রবাহে
সিঞ্চিতে তোমায়—ব্যথিত সে বাসনারে
বন্ধমুক্ত করি দিয়া শতলক্ষ ধারে
দেশে দেশে দিকে দিকে পাঠাব কেমনে
অন্তর ভেদিয়া। বসি’ শুধু গৃহকোণে
লুব্ধ চিত্তে করিতেছি সদা অধ্যয়ন
দেশে দেশান্তরে কারা করেছে ভ্রমণ
কৌতুহলবশে; আমি তাহাদের সনে
করিতেছি তোমারে বেষ্টন মনে মনে
কল্পনার জালে।—
সুদুর্গম দূর দেশ,
পথশূন্য তরুশূন্য প্রান্তর অশেষ,
মহা পিপাসার রঙ্গভূমি; রৌদ্রালোকে
জ্বলন্ত বালুকা রাশি সূচি বিঁধে চোখে;
দিগন্তবিস্তৃত যেন ধুলিশয্যা পরে
জরাতুরা বসুন্ধরা লুটাইছে পড়ে’
তপ্তদেহ, উষ্ণশ্বাস বহ্নিজ্বালাময়,
শুষ্ককণ্ঠ, সঙ্গহীন, নিঃশব্দ, নির্দ্দয়!
কতদিন গৃহপ্রান্তে বসি বাতায়নে
দূর দূরান্তের দৃশ্য আঁকিয়াছি মনে
চাহিয়া সম্মুখে;— চারিদিকে শৈলমালা,
মধ্যে নীল সরোবর নিস্তব্ধ নিরালা
স্ফটিক নির্ম্মল স্বচ্ছ; খণ্ড মেঘগণ
মাতৃস্তনপানরত শিশুর মতন
পড়ে আছে শিখর আঁকড়ি’; হিম-রেখা
নীলগিরিশ্রেণীপরে দূরে যায় দেখা
দৃষ্টি রোধ করি’; যেন নিশ্চল নিষেধ
উঠিয়াছে সারি সারি স্বর্গ করি ভেদ
যোগমগ্ন ধূর্জটীর তপোবন-দ্বার!
মনে মনে ভ্রমিয়াছি দূর সিন্ধুপারে
মহামেরু দেশে-যেখানে লয়েছে ধরা
অনন্তকুমারীব্রত, হিমবস্ত্র পরা,
নিঃসঙ্গ, নিস্পৃহ, সর্ব্ব আভরণহীন;
যেথা দীর্ঘ রাত্রি-শেষে ফিরে আসে দিন
শব্দ সঙ্গীতবিহীন; রাত্রি আসে,
ঘুমাবার কেহ নাই,অনন্ত আকাশে
অনিমেষ জেগে থাকে নিদ্রাতন্দ্রাহত
শূন্যশয্যা মৃতপুত্র জননীর মত!
নুতন দেশের নাম যত পাঠ করি,
বিচিত্র বর্ণনা শুনি, চিত্ত অগ্রসরি’
সমস্ত স্পর্শিতে চাহে; সমুদ্রের তটে
ছোট ছোট নীলবর্ণ পর্ব্বতসঙ্কটে
একখানি গ্রাম, তীরে শুকাইছে জাল,
জলে ভাসিতেছে তরী, উড়িতেছে পাল,
জেলে ধরিতেছে মাছ, গিরিমধ্যপথে
সঙ্কীর্ণ নদীটি চলি আসে, কোন মতে
আঁকিয়া বাঁকিয়া; ইচ্ছা করে সে নিভৃত
গিরিক্রোড়ে সুখাসীন উর্ম্মিমুখরিত
লোকনীড়খানি, হৃদয়ে বেষ্টিয়া ধরি
বাহুপাশে। ইচ্ছা করে, আপনার করি
যেখানে যা-কিছু আছে; নদীস্রোতোনীরে
আপনারে গলাইয়া দুই তীরে তীরে
নব নব লোকালয়ে করে যাই দান
পিপাসার জল, গেয়ে যাই কলগান
দিবসে নিশীথে; পৃথিবীর মাঝখানে
উদয়-সমুদ্র হতে অস্ত-সিন্ধুপানে
প্রসারিয়া আপনারে তুঙ্গগিরিরাজি
আপনার সুদুর্গম রহস্যে, বিরাজি;
কঠিন পাষাণ ক্রোড়ে তীব্র হিম বায়ে
মানুষ করিয়া-তুলি লুকায়ে লুকায়ে
নব নব জাতি। ইচ্ছা করে মনে মনে
স্বজাতি হইয়া থাকি সর্ব্বলোক সনে
দেশে দেশান্তরে; উষ্ট্রদুগ্ধ করি’ পান
মরুতে মানুষ হই আরব-সন্তান
দুর্দ্দম স্বাধীন; তিব্বতের গিরিতটে
নির্লিপ্ত প্রস্তরপুরী মাঝে, বৌদ্ধমঠে
করি বিচরণ! দ্রাক্ষাপায়ী পারসীক
গোলাপকাননবাসী, তাতার নির্ভীক
অশ্বারূঢ়, শিষ্টাচারী সহাস্য জাপান,
প্রবীণ প্রাচীন চীন নিশি দিনমান
কর্ম্ম অনুরত,সকলের ঘরে ঘরে
জন্মলাভ করে লই হেন ইচ্ছা করে।
অরুগ্ন বলিষ্ঠ হিংস্র নগ্ন বর্ব্বরতা-
নাহি কোন ধর্ম্মাধর্ম্ম, নাহি কোন প্রথা,
নাহি কোন বাধাবন্ধ,—নাহি চিন্তাজ্বর,
নাহি কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব, নাহি ঘর পর,
উন্মুক্ত জীবন-স্রোত বহে দিন রাত
সম্মুখে আঘাত করি’ সহিয়া আঘাত
অকাতরে; পরিতাপজর্জ্জর পরাণে
বৃথা ক্ষোভে নাহি চায় অতীতের পানে,
ভবিষ্যৎ নাহি হেরে মিথ্যা দুরাশায়-
বর্তমান তরঙ্গের চুড়ায় চুড়ায়
নৃত্য করে চলে ধায় আবেগে উল্লাসি’,—
উচ্ছৃঙ্খল সে জীবন সেও ভালবাসি-
কত বার ইচ্ছা করে সেই প্রাণঝড়ে
ছুটিয়া চলিয়া যাই পূর্ণপালভরে
লঘু তরী সম!
হিংস্র ব্যাঘ্র অটবীর-
আপন প্রচণ্ড বলে প্রকাণ্ড শরীর
বহিতেছে অবহেলে;—দেহ দীপ্তোজ্জল
অরণ্য মেঘের তলে প্রচ্ছন্ন-অনল
বজ্রের মতন-রুদ্র মেঘমন্দ্র স্বরে
পড়ে আসি অতর্কিত শীকারের পরে
বিদ্যুতের বেগে, অনায়াস সে মহিমা—
হিংসাতীব্র সে আনন্দ-সে দৃপ্ত গরিমা-
ইচ্ছা করে একবার লভি তার স্বাদ;—
ইচ্ছা করে বার বার মিটাইতে সাধ
পান করি’ বিশ্বের সকল পাত্র হতে
আনন্দমদিরা ধারা নব নব স্রোতে।
হে সুন্দরী বসুন্ধরে, তোমা পানে চেয়ে
কত বার প্রাণ মোর উঠিয়াছে গেয়ে
প্রকাও উল্লাসভরে; ইচ্ছা করিয়াছে
সবলে আঁকড়ি ধরি এ বক্ষের কাছে
সমুদ্রমেখলাপরা তব কটিদেশ;
প্রভাত রৌদ্রের মত অনন্ত অশেষ
ব্যাপ্ত হয়ে দিকে দিকে, অরণ্যে ভূধরে
প্রত্যেক কম্পায়মান পল্লবের পরে
করি নৃত্য সারা বেলা, করিয়া চুম্বন
প্রত্যেক কুসুম কলি, করি’ আলিঙ্গন
সঘন কোমল শ্যাম তৃণক্ষেত্র গুলি,
প্রত্যেক তরঙ্গ পরে সারাদিন দুলি’
আনন্দ দোলায়! রজনীতে চুপে চুপে
নিঃশব্দ চরণে, বিশ্বব্যাপী নিদ্রারূপে
তোমার সমস্ত পশু পক্ষীর নয়নে
অঙ্গুলি বুলায়ে দিই, শয়নে শয়নে
নীড়ে নীড়ে গৃহে গৃহে গুহায় গুহায়
করিয়া প্রবেশ, বৃহৎ অঞ্চল প্রায়
আপনারে বিস্তারিয়া ঢাকি বিশ্বভূমি
সুস্নিগ্ধ আঁধারে!
আমার পৃথিবী তুমি
বহু বরষের; তোমার মৃত্তিকা সনে
আমারে মিশায়ে লয়ে অনন্ত গগনে
অশ্রান্ত চরণে, করিয়াছ প্রদক্ষিণ
সবিতৃমণ্ডল, অসংখ্য রজনী দিন
যুগ যুগান্তর ধরি’,আমার মাঝারে
উঠিয়াছে তৃণ তব, পুষ্প ভারে ভারে
ফুটিয়াছে, বর্ষণ করেছে তরুরাজি
পত্রফুলফল গন্ধরেণু; তাই আজি
কোন দিন আনমনে বসিয়া একাকী
পদ্মাতীরে, সম্মুখে মেলিয়া মুগ্ধ আঁখি
সর্ব্ব অঙ্গে সর্ব্ব মনে অনুভব করি
তোমার মৃত্তিকা মাঝে কেমনে শিহরি’
উঠিতেছে তৃণাঙ্কুর; তোমার অন্তরে
কি জীবন-রসধারা অহর্নিশি ধরে’
করিতেছে সঞ্চরণ; কুসুমমুকুল
কি অন্ধ আনন্দভরে ফুটিয়া আকুল
সুন্দর বৃন্তের মুখে; নব রৌদ্রালোকে
তরুলতাতৃণগুল্ম কি গূঢ় পুলকে
কি মূঢ় প্রমোদ-রসে উঠে’ হরষিয়া—
মাতৃস্তনপানশান্ত পরিতৃপ্ত হিয়া
সুখস্বপ্নহাস্যমুখ শিশুর মতন!
তাই আজি কোন দিন,—শরৎ-কিরণ
পড়ে যবে পক্কশীর্ষ স্বর্ণক্ষেত্র পরে,
নারিকেলদলগুলি কাঁপে বায়ুভরে
আলোকে ঝিকিয়া, জাগে মহা ব্যাকুলতা,
মনে পড়ে বুঝি সেই দিবসের কথা
মন যবে ছিল মোর সর্ব্বব্যাপী হয়ে
জলে স্থলে, অরণ্যের পল্লব নিলয়ে,
আকাশের নীলিমায়! ডাকে যেন মোরে
অব্যক্ত আহ্বান রবে শতবার করে’
সমস্ত ভুবন; সে বিচিত্র সে বৃহৎ
খেলাঘর হতে, মিশ্রিত মর্ম্মরবৎ
শুনিবারে পাই যেন চিরদিনকার
সঙ্গীদের লক্ষবিধ আনন্দ খেলার
পরিচিত রব! সেথায় ফিরায়ে লহ
মোরে আরবার; দূর কর সে বিরহ
যে বিরহ থেকে থেকে জেগে ওঠে মনে
হেরি যবে সম্মুখেতে সন্ধ্যার কিরণে
বিশাল প্রান্তর, যবে ফিরে গাভীগুলি
দূর গোষ্ঠে—মাঠপথে উড়াইয়া ধূলি
তরু-ঘেরা গ্রাম হতে উঠে ধূম্র-লেখা
সন্ধ্যাকাশে; যবে চন্দ্র দূরে দেয় দেখা
শ্রান্ত পথিকের মত অতি ধীরে ধীরে
নদীপ্রান্তে জনশূন্য বালুকার তীরে;
মনে হয় আপনারে একাকী প্রবাসী
নির্ব্বাসিত; বাহু বাড়াইয়া ধেয়ে আসি
সমস্ত বাহিরখানি লইতে অন্তরে,—
এ আকাশ, এ ধরণী, এই নদী পরে
শুভ্র শান্ত সুপ্ত জ্যোৎস্নারাশি! কিছু নাহি
পারি পরশিতে, শুধু শূন্যে থাকি চাহি
বিষাদ-ব্যাকুল! আমারে ফিরায়ে লহ
সেই সর্ব্বমাঝে, যেথা হতে অহরহ
অঙ্কুরিছে মুকুলিছে মুঞ্জরিছে প্রাণ
শতেক সহস্ররূপে,—গুঞ্জরিছে গান
শতলক্ষসুরে, উচ্ছ্বসি উঠিছে নৃত্য
অসংখ্য ভঙ্গীতে, প্রবাহি যেতেছে চিত্ত
ভাবস্রোতে, ছিদ্রে ছিদ্রে বাজিতেছে বেণু;—
দাঁড়ায়ে রয়েছ তুমি শ্যাম কল্পধেনু,
তোমারে সহস্র দিকে করিছে দোহন
তরুলতা পশুপক্ষী কত অগণন
তৃষিত পরাণী যত, আনন্দের রস
কত রূপে হতেছে বর্ষণ, দিক্ দশ
ধ্বনিছে কল্লোল গীতে। নিখিলের সেই
বিচিত্র আনন্দ যত এক মুহূর্ত্তেই
একত্রে করিব আস্বাদন, এক হয়ে
সকলের সনে! আমার আনন্দ লয়ে
হবে না কি শ্যারতর অরণ্য তোমার,
প্রভাত-আলোক মাঝে হবে না সঞ্চার
নবীন কিরণকম্প? মোর মুগ্ধ ভাবে
আকাশ ধরণীতল আঁকা হয়ে যাবে
হৃদয়ের রঙে-যা দেখে কবির মনে
জাগিবে কবিতা,—প্রেমিকের দু’নয়নে
লাগিবে ভাবের ঘোর, বিহঙ্গের মুখে
সহসা আসিবে গান! সহস্রের সুখে
রঞ্জিত হইয়া আছে সর্ব্বাঙ্গ তোমার
হে বসুধে, জীবস্রোত কত বারম্বার
তোমারে মণ্ডিত করি আপন জীবনে
গিয়েছে ফিরেছে, তোমার মৃত্তিকাসনে
মিশায়েছে অন্তরর প্রেম, গেছে লিখে’
কত লেখা, বিছায়েছ কত দিকে দিকে
ব্যাকুল প্রাণের আলিঙ্গন, তারি সনে
আমার সমস্ত প্রেম মিশায়ে যতনে
তোমার অঞ্চল খানি দিব রাঙাইয়া
সজীব বরণে; আমার সকল দিয়া
সাজাব তোমারে! নদীজলে মোর গান
পাবে না কি শুনিবারে কোন মুগ্ধ কান
নদীকূল হতে? উষালোকে মোর হাসি
পাবে না কি দেখিবারে কোন মর্ত্ত্যবাসী
নিদ্রা হতে উঠি? আজ শতবর্ষ পরে
এ সুন্দর অরণ্যের পল্লবের স্তরে
কাঁপিবে না আমার পরাণ? ঘরে ঘরে
কত শত নরনারী চিরকাল ধরে’
পাতিবে সংসারখেলা, তাহাদের প্রেমে
কিছু কি রব না আমি? আসিব না নেমে
তাদের মুখের পরে হাসির মতন,
তাদের সর্ব্বাঙ্গ মাঝে সরস যৌবন,
তাদের বসন্ত দিনে অকস্মাৎ সুখ,
তাদের মনের কোণে নবীন উন্মুখ
প্রেমের অঙ্কুর রূপে? ছেড়ে দিবে তুমি
আমারে কি একেবারে ওগো মাতৃভূমি,
যুগযুগান্তের মহা মৃত্তিকা বন্ধন
সহসা কি ছিঁড়ে যাবে? করিব গমন
ছাড়ি লক্ষ বরষের স্নিগ্ধ ক্রোড় খানি?
চতুর্দ্দিক হতে মোরে লবে না কি টানি
এই সব তরু লতা গিরি নদী বন,
এই চিরদিবসের সুনীল গগন,
এ জীবনপরিপূর্ণ উদার সমীর,
জাগরণপূর্ণ আলো, সমস্ত প্রাণীর
অন্তরে অন্তরে গাঁথা জীবন-সমাজ?
ফিরিব তোমারে ঘিরি, করিব বিরাজ
তোমার আত্মীয় মাঝে; কীট পশু পাখী
তরু গুল্ম লতারূপে বারম্বার ডাকি
আমারে লইবে তব প্রাণতপ্ত বুকে;
যুগে যুগে জন্মে জন্মে স্তন দিয়ে মুখে
মিটাইবে জীবনের শত লক্ষ ক্ষুধা,
শত লক্ষ আনন্দের স্তন্যরসসুধা
নিঃশেষে নিবিড় স্নেহে করাইয়া পান।
তার পরে ধরিত্রীর যুবক সন্তান
বাহিরিব জগতের মহাদেশ মাঝে
অতি দুর দুরান্তরে জ্যোতিষ্কসমাজে
সুদুর্গম পথে!—এখনো মিটেনি আশা,
এখনো তোমার স্তন-অমৃত-পিপাসা
মুখেতে রয়েছে লাগি, তোমার আনন
এখনো জাগায় চোখে সুন্দর স্বপন,
এখন কিছুই তব করি নাই শেষ,
সকলি রহস্যপূর্ণ, নেত্র অনিমেষ
বিস্ময়ের শেষতল খুঁজে নাহি পায়,
এখনো তোমার বুকে আছি শিশু প্রায়
মুখপানে চেয়ে। জননী লহগো মোরে
সঘন বন্ধন তব বাহুযুগে ধরে’
আমারে করিয়া লহ তোমার বুকের,
তোমার বিপুল প্রাণ বিচিত্র মুখের
উৎস উঠিতেছে যেথা, সে গোপন পুরে
আমারে লইয়া যাও—রাখিয়ো না দুরে!
২৬ কার্ত্তিক, ১৩০০।
বিম্ববতী
বিম্ববতী।
(রূপকথা।)
সযত্নে সাজিল রাণী, বাঁধিল কবরী,
নবঘনস্নিগ্ধবর্ণ নব নীলাম্বরী
পরিল অনেক সাধে। তার পরে ধীরে
গুপ্ত আবরণ খুলি’ আনিল বাহিরে
মায়াময় কনক দর্পণ। মন্ত্র পড়ি’
শুধাইল তারে—কহ মােরে সত্য করি’
সর্ব্বশ্রেষ্ঠ রূপসী কে ধরায় বিরাজে।
ফুটিয়া উঠিল ধীরে মুকুরের মাঝে
মধুমাখা হাসি-আঁকা একখানি মুখ,
দেখিয়া বিদারি’ গেল মহিষীর বুক-
রাজকন্যা বিম্ববতী সতীনের মেয়ে
ধরাতলে রূপসী সে সবাকার চেয়ে!
তার পর দিন রাণী প্রবালের হার
পরিল গলায়। খুলি’ দিল কেশভার
আজানুচুম্বিত। গােলাপী অঞ্চলখানি,
লজ্জার আভাসসম, বক্ষে দিল টানি’।
সুবর্ণ মুকুর রাখি কোলের উপরে
শুধাইল মন্ত্র পড়ি’—কহ সত্য করে’
ধরামাঝে সব চেয়ে কে আজি রূপসী!
দর্পণে উঠিল ফুটে সেই মুখশশী।
কাঁপিয়া কহিল রাণী, অগ্নিসম জ্বালা—
পরালেম তারে আমি বিষফুলমালা,
তবু মরিল না জ্বলে’ সতীনের মেয়ে
ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে!
তার পরদিনে,—আবার রুধিল দ্বার
শয়নমন্দিরে। পরিল মুক্তার হার,
ভালে সিন্দুরের টিপ, নয়নে কাজল,
রক্তাম্বর পট্টবাস, সোনার আঁচল।
শুধাইল দর্পণেরে—কহ সত্য করি’
ধরাতলে সব চেয়ে কে আজি সুন্দরী।
উজ্জ্বল কনক পটে ফুটিয়া উঠিল
সেই হাসিমাখা মুখ। হিংসায় লুটিল
রাণী শয্যার উপরে। কহিল কাঁদিয়া—
বনে পাঠালেম তারে কঠিন বাঁধিয়া,
এখনো সে মরিল না সতীনের মেয়ে,
ধরাতলে রূপসী সে সবাকার চেয়ে!
তার পরদিনে,—আবার সাজিল সুখে
নব অলঙ্কারে; বিরচিল হাসিমুখে
কবরী নূতন ছাঁদে বাঁকাইয়া গ্রীবা।
পরিল যতন করি’ নবরৌদ্রবিভা
নব পীতবাস। দর্পণ সম্মুখে ধরে’
শুধাইল মন্ত্র পড়ি’—সত্য কহ মােরে
ধরামাঝে সব চেয়ে কে আজি রূপসী।
সেই হাসি সেই মুখ উঠিল বিকশি’
মােহন মুকুরে। রাণী কহিল জ্বলিয়া—
বিষফল খাওয়ালেম তাহারে ছলিয়া,
তবুও সে মরিল না সতীনের মেয়ে,
ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে!
তার পর দিনে রাণী কনক রতনে
খচিত করিল তনু অনেক যতনে।
দর্পণেরে শুধাইল বহু দর্পভরে—
সর্ব্বশ্রেষ্ঠ রূপ কার বল্ সত্য করে’।
দুইটি সুন্দর মুখ দেখা দিল হাসি’
রাজপুত্র রাজকন্যা দোঁহে পাশাপাশি
বিবাহের বেশে।—অঙ্গে অঙ্গে শিরা যত
রাণীরে দংশিল যেন বৃশ্চিকের মত।
চীৎকারি’ কহিল রাণী কর হানি’ বুকে,
মরিতে দেখেছি তারে আপন সম্মুখে
কার প্রেমে বাঁচিল সে সতীনের মেয়ে
ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে!
ঘষিতে লাগিল রাণী কনক মুকুর
বালু দিয়ে—প্রতিবিম্ব নাহি হল দূর।
মসী লেপি দিল তবু ছবি ঢাকিল না।
অগ্নি দিল, তবুও ত গলিল না সোনা।
আছাড়ি’ ফেলিল ভূমে প্রাণপণ বলে
ভাঙ্গিল না সে মায়া-দর্পণ। ভূমিতলে
চকিতে পড়িল রাণী, টুটি’ গেল প্রাণ;—
সর্ব্বাঙ্গে হীরকমণি অগ্নির সমান
লাগিল জ্বলিতে; ভূমে পড়ি’ তারি পাশে
কনক দর্পণে দুটি হাসিমুখ হাসে।
বিম্ববতী, মহিষীর সতীনের মেয়ে
ধরাতলে রূপসী সে সকলের চেয়ে।
ফাল্গুন, ১২৯৮।
বিশ্বনৃত্য
বিশ্বনৃত্য।
বিপুল গভীর মধুর মন্দ্রে
কে বাজাবে সেই বাজনা!
উঠিবে চিত্ত করিয়া নৃত্য
বিস্মৃত হবে আপনা।
টুটিবে বন্ধ, মহা আনন্দ,
নব সঙ্গীতে নূতন ছন্দ,
হৃদয় সাগরে পূর্ণচন্দ্র
জাগাবে নবীন বাসনা।
সঘন অশ্রুমগন হাস্য
জাগিবে তাহার বদনে।
প্রভাত-অরুণ-কিরণ-রশ্মি
ফুটিবে তাহার নয়নে।
দক্ষিণ করে ধরিয়া যন্ত্র
ঝনন-রণন স্বর্ণ তন্ত্র,
কাঁপিয়া উঠিবে মোহন মন্ত্র
নির্ম্মল নীল গগনে।
হাহা করি সবে উচ্ছল রবে
চঞ্চল কলকলিয়া,
চৌদিক হতে উন্মাদ স্রোতে
আসিবে তৃর্ণ চলিয়া।
ছুটিবে সঙ্গে মহা তরঙ্গে
ঘিরিয়া তাঁহারে হরষ রঙ্গে
বিঘ্নতরণ চরণ ভঙ্গে
পথকণ্টক দলিয়া।
দ্যুলোক চাহিয়া সে লোকসিন্ধু
বন্ধনপাশ নাশিবে,
অসীম পুলকে বিশ্ব-ভূলোকে
অঙ্কে তুলিয়া হাসিবে।
উর্ম্মি-লীলায় সূর্য্য কিরণ
ঠিকরি উঠিবে হিরণ বরণ,
বিঘ্ন বিপদ দুঃখ মরণ
ফেনের মতন ভাসিবে।
ওগো কে বাজায় (বুঝি শুনা যায়!)
মহা রহস্যে রসিয়া
চিরকাল ধরে’ গম্ভীর স্বরে
অম্বরপরে বসিয়া!
গ্রহমণ্ডল হয়েছে পাগল,
ফিরিছে নাচিয়া চিরচঞ্চল,
গগনে গগনে জ্যোতি অঞ্চল,
পড়িছে খসিয়া খসিয়া।
ওগো কে বাজায় (কে শুনিতে পায়!)
না জানি কি মহা রাগিণী।
দুলিয়া ফুলিয়া নাচিছে সিন্ধু
সহস্রশির নাগিনী।
ঘন অরণ্য আনন্দে দুলে,
অনন্ত নভে শত বাহু তুলে,
কি গাহিতে গিয়ে কথা যায় ভুলে’,
মর্ম্মরে দিন যামিনী!
নির্ঝর ঝরে উচ্ছ্বাস ভরে
বন্ধুর শিলা-সরণে।
ছন্দে ছন্দে সুন্দর গতি
পাষাণ হৃদয় হরণে!
কোমল কণ্ঠে কুলু কুলু সুর,
ফুটে অবিরল তরল মধুর,
সদা-শিঞ্জিত মাণিক নূপুর
বাঁধা চঞ্চল চরণে!
নাচে ছয় ঋতু না মানে বিরাম,
বাহুতে বাহুতে ধনিয়া।
শ্যামল, স্বর্ণ, বিবিধ বর্ণ,
নব সব বাস পরিয়া।
চরণ ফেলিতে কত বনফুল
ফুটে ফুটে টুটে হইয়া আকুল,
উঠে ধরণীর হৃদয় বিপুল
হাসি ক্রন্দনে ভরিয়া!
পশু বিহঙ্গ কীট পতঙ্গ
জীবনের ধারা ছুটিছে।
কি মহা খেলায় মরণ-বেলায়
তরঙ্গ তার টুটিছে!
কোনখানে আলো কোনখানে ছায়া,
জেগে জেগে ওঠে নব নব কায়া,
চেতনা পূর্ণ অদ্ভুত মায়া
বুদ্বুদ সম ফুটিছে।
ওই কে বাজায় দিবস নিশায়
বসি অন্তর আসনে
কালের যন্ত্রে বিচিত্র সুর,
কেহ শোনে কেহ না শোনে!
অর্থ কি তার ভাবিয়া না পাই,
কত গুণী জ্ঞানী চিন্তিছে তাই,
মহান্ মানব-মানস সদাই
উঠে পড়ে তারি শাসনে!
শুধু হেথা কেন আনন্দ নাই,
কেন আছে সবে নীরবে?
তারকা না দেখি পশ্চিমাকাশে,
প্রভাত না দেখি পূরবে।
শুধু চারিদিকে প্রাচীন পাষাণ
জগৎ-ব্যাপ্ত সমাধি সমান
গ্রাসিয়া রেখেছে অযুত পরাণ,
রয়েছে অটল গরবে।
সংসার-স্রোত জাহ্নবী সম
বহু দূরে গেছে সরিয়া।
এ শুধু ঊষর বালুকাধূসর
মরুরূপে আছে মরিয়া।
নাহি কোন গতি, নাহি কোন গান,
নাহি কোন কাজ, নাহি কোন প্রাণ,
বসে আছে এক মহা নির্ব্বাণ
আঁধার মুকুট পরিয়া!
হৃদয় আমার ক্রন্দন করে
মানব-হৃদয়ে মিশিতে।
নিখিলের সাথে মহা রাজপথে
চলিতে দিবস নিশীথে।
আজন্মকাল পড়ে আছি মৃত,
জড়তার মাঝে হয়ে পরাজিত,
একটি বিন্দু জীবন অমৃত
কে গো দিবে এই তৃষিতে।
জগৎমাতানো সঙ্গীত তানে
কে দিবে এদের নাচারে!
জগতের প্রাণ করাইয়া পান
কে দিবে এদের বাঁচায়ে!
ছিঁড়িয়া ফেলিবে জাতিজালপাশ,
মুক্ত হৃদয়ে লাগিবে বাতাস,
ঘুচায়ে ফেলিয়া মিথ্যা তরাস
ভাঙ্গিবে জীর্ণ খাঁচা এ!
বিপুল গভীর মধুর মন্দ্রে
বাজুক্ বিশ্ব বাজনা!
উঠুক্ চিত্ত করিয়া নৃত্য
বিস্মৃত হয়ে আপনা!
টুটুক্ বন্ধ, মহা আনন্দ!
নব সঙ্গীতে নূতন ছন্দ!
হৃদয় সাগরে পূর্ণচন্দ্র
জাগাক্ নবীন বাসনা!
২৬ ফাল্গুন, ১২৯৯।
বৈষ্ণব-কবিতা
বৈষ্ণব-কবিতা।
শুধু বৈকুণ্ঠের তরে বৈষ্ণবের গান!
পূর্বরাগ, অনুরাগ, মান অভিমান,
অভিসার, প্রেমলীলা, বিরহ মিলন,
বৃন্দাবন-গাথা,—এই প্রণয়-স্বপন
শ্রাবণের শর্ব্বরীতে কালিন্দীর কূলে,
চারি চক্ষে চেয়ে দেখা কদম্বের মূলে
সরমে সম্ভ্রমে, —এ কি শুধু দেবতার!
এ সঙ্গীত-রসধারা নহে মিটাবার
দীন মর্ত্তবাসী এই নরনারীদের
প্রতি রজনীর আর প্রতি দিবসের
তপ্ত প্রেম-তৃষা!
এ গীত-উৎসব মাঝে
শুধু তিনি আর ভক্ত নির্জ্জনে বিরাজে;—
দাঁড়ায়ে বাহির দ্বারে মোরা নরনারী
উৎসুক শ্রবণ পাতি’ শুনি যদি তারি
দুয়েকটি তান,—দূর হ’তে তাই শুনে’
তরুণ বসন্তে যদি নবীন ফাল্গুনে
অন্তর পুলকি’ উঠে; শুনি’ সেই সুর
সহসা দেখিতে পাই দ্বিগুণ মধুর
আমাদের ধরা;—মধুময় হ’য়ে উঠে
আমাদের বনচ্ছায়ে যে নদীটি ছুটে,
মোদের কুটীর-প্রান্তে যে কদম্ব ফুটে
বরষার দিনে;—সেই প্রেমাতুর তানে
যদি ফিরে চেয়ে দেখি মোর পার্শ্বপানে
ধরি মোর বামবাহু র’য়েছে দাঁড়ায়ে
ধরার সঙ্গিনী মোর, হৃদয় বাড়ায়ে
মোর দিকে, বহি নিজ মৌন ভালবাসা;
ওই গানে যদি বা সে পায় নিজ ভাষা,—
যদি তার মুখে ফুটে পূর্ণ প্রেমজ্যোতি,
তোমার কি তাঁর, বন্ধু, তাহে কার ক্ষতি?
সত্য করে’ কহ মোরে, হে বৈষ্ণব কবি,
কোথা তুমি পেয়েছিলে এই প্রেমছবি,
কোথা তুমি শিখেছিলে এই প্রেমগান
বিরহ-তাপিত? হেরি কাহার নয়ান,
রাধিকার অশ্রু-আঁখি পড়েছিল মনে?
বিজন বসন্তরাতে মিলন-শয়নে
কে তোমারে বেঁধেছিল দুটি বাহুডোরে,
আপনার হৃদয়ের অগাধ সাগরে
রেখেছিল মগ্ন করি! এত প্রেমকথা,
রাধিকার চিত্ত-দীর্ণ তীব্র ব্যাকুলতা,
চুরি করি’ লইয়াছ কার মুখ, কার
আঁখি হ’তে! আজ তার নাহি অধিকার
সে সঙ্গীতে! তারি নারী-হৃদয়-সঞ্চিত
তার ভাষা হ’তে তারে করিবে বঞ্চিত
চিরদিন!
আমাদেরি কুটীর-কাননে
ফুটে পুষ্প, কেহ দেয় দেবতা-চরণে,
কেহ রাখে প্রিয়জন তরে—তাহে তাঁর
নাহি অসন্তোষ! এই প্রেম-গীতি-হার
গাঁথা হয় নর-নারী-মিলন-মেলায়
কেহ দেয় তাঁরে, কেহ বঁধুর গলায়!
দেবতারে যাহা দিতে পারি, দিই তাই
প্রিয়জনে—প্রিয়জনে যাহা দিতে পাই
তাই দিই দেবতারে; আর পাব কোথা!
দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা!
বৈষ্ণব কবির গাঁথা প্রেম-উপহার
চলিয়াছে নিশিদিন কত ভারে ভার
বৈকুণ্ঠের পথে। মধ্যপথে নরনারী
অক্ষয় সে সুধারাশি করি কাড়াকাড়ি
লইতেছি আপনার প্রিয় গৃহতরে
যথাসাধ্য যে যাহার; যুগে যুগান্তরে
চিরদিন পৃথিবীতে যুবকযুবতী
নরনারী এমনি চঞ্চল মতিগতি।
দুই পক্ষে মিলে একেবারে আত্মহারা
অবোধ অজ্ঞান। সৌন্দর্য্যের দস্যু তারা
লুটে-পুটে নিতে চায় সব! এত গীতি,
এত ছন্দ, এত ভাবে উচ্ছ্বসিত প্রীতি,
এত মধুরতা দ্বারের সম্মুখ দিয়া
বহে’ যায়—তাই তারা পড়েছে আসিয়া
সবে মিলি কলরবে সেই সুধাস্রোতে।
সমুদ্রবাহিনী সেই প্রেমধারা হ’তে
কলস ভরিয়া তারা লয়ে যায় তীরে
বিচার না করি কিছু, আপন কুটীরে
আপনার তরে! তুমি মিছে ধর দোষ,
হে সাধু পণ্ডিত, মিছে করিতেছ রোষ!
যাঁর ধন তিনি ওই অপার সন্তোষে
অসীম স্নেহের হাসি হাসিছেন বসে’।
১৮ আষাঢ়, ১২৯৯।
ব্যর্থ যৌবন
ব্যর্থ যৌবন।
আজি যে রজনী যায় ফিরাইব তার
কেমনে?
কেন নয়নের জল ঝরিছে বিফল
নয়নে?
এ বেশ ভূষণ লহ সখি লহ,
এ কুসুমমালা হয়েছে অসহ,
এমন যামিনী কাটিল, বিরহ-
শয়নে!
আজি যে রজনী যায় ফিরাইব তার
কেমনে?
আমি বৃথা অভিসারে এ যমুনা পারে
এসেছি!
বহি’ বৃথা মনো-আশা এত ভালবাসা
বেসেছি!
শেষে নিশিশেষে বদন মলিন,
ক্লান্ত চরণ, মন উদাসীন,
ফিরিয়া চলেছি কোন্ সুখহীন
ভবনে?
হায়, যে রজনী যায় ফিরাইব তার
কেমনে?
কত উঠেছিল চাঁদ নিশীথ-অগাধ
আকাশে!
বনে দুলেছিল ফুল গন্ধ-ব্যাকুল
বাতাসে!
তরু-মর্ম্মর, নদী কলতান
কানে লেগেছিল স্বপ্ন সমান,
দুর হতে আসি পশেছিল গান
শ্রবণে,
আজি সে রজনী যায় ফিরাইব তায়
কেমনে?
মনে লেগেছিল হেন আমারে সে যেন
ডেকেছে।
যেন চির যুগ ধরে’ মোরে মনে করে’
রেখেছে!
সে আনিবে বহি ভরা অনুরাগ,
যৌবন নদী করিবে সজাগ,
আসিবে নিশীথে, বাঁধিবে সোহাগ-
বাঁধনে।
আহা, সে রজনী যায়, ফিরাইব তায়
কেমনে?
ওগো, ভোলা, ভাল তবে, কাঁদিয়া কি হবে
মিছে আর?
যদি যেতে হল হায়, প্রাণ কেন চায়
পিছে আর?
কুঞ্জদুয়ারে অবোধের মত
রজনী-প্রভাতে বসে রব কত!
এবারের মত বসন্ত-গত
জীবনে।
হায় যে রজনী যায় ফিরাইব তায়
কেমনে!
১৬ আষাঢ়, ১৩০০।
ভরা ভাদরে
ভরা ভাদরে।
নদী ভরা কূলে কূলে, ক্ষেতে ভরা ধান।
আমি ভাবিতেছি বসে কি গাহিব গান!
কেতকী জলের ধারে
ফুটিয়াছে ঝোপে ঝাড়ে,
নিরাকুল ফুলভারে
বকুল বাগান।
কানায় কানায় পূর্ণ আমার পরাণ।
ঝিলিমিলি করে পাতা, ঝিকিমিকি আলো।
আমি ভাবিতেছি কার আঁখি দুটি কালো!
কদম্বগাছের সার,
চিকন পল্লবে তার
গন্ধে ভরা অন্ধকার
হয়েছে যোরালো।
কারে বলিবারে চাহি কারে বাসি ভালো!
অম্লান-উজ্জ্বল দিন, বৃষ্টি অবসান।
আমি ভাবিতেছি আজি কি করিব দান!
মেঘখণ্ড থরে থরে
উদাস বাতাস ভরে
নানা ঠাঁই ঘুরে’ মরে
হতাশ সমান।
সাধ যায় আপনারে করি শত খান্।
দিবস অবশ যেন হয়েছে আলসে।
আমি ভাবি আর কেহ কি ভাবিছে বসে’!
তরুশাখে হেলাফেলা
কামিনী ফুলের মেলা,
থেকে থেকে সারাবেলা
পড়ে খসে’ খসে’।
কি বাঁশি বাজিছে সদা প্রভাতে প্রদোষে!
পাখীর প্রমোদগানে পূর্ণ বনস্থল।
আমি ভাবিতেছি চোখে কেন আসে জল!
দোয়েল দুলায়ে শাখা
গাহিছে অমৃতমাখা,
নিভৃত পাতায় ঢাকা
কপোত যুগল।
আমারে সকলে মিলে করেছে বিকল!
২৭ আষাঢ়, ১৩০০।
মানস-সুন্দরী
মানস-সুন্দরী।
আজ কোন কাজ নয়;—সব ফেলে দিয়ে
ছন্দ বন্ধ গ্রন্থ গীত—এস তুমি প্রিয়ে,
আজন্ম-সাধন-ধন সুন্দরী আমার
কবিতা, কল্পনা-লতা! শুধু একবার
কাছে বস! আজ শুধু কূজন গুঞ্জন
তোমাতে আমাতে; শুধু নীরবে ভুঞ্জন
এই সন্ধ্যা-কিরণের সুবর্ণ মদিরা,—
যতক্ষণ অন্তরের শিরা উপশিরা
লাবণ্য প্রবাহভরে ভরি’ নাহি উঠে,
যতক্ষণে মহানন্দে নাহি যায় টুটে’
চেতনা বেদনাবন্ধ, ভুলে যাই সব
কি আশা মেটে নি প্রাণে, কি সঙ্গীতরব
গিয়েছে নীরব হয়ে, কি আনন্দ সুধা
অধরের প্রান্তে এসে অন্তরের ক্ষুধা
না মিটায়ে গিয়াছে শুকায়ে। এই শান্তি,
এই মধুরতা, দিক্ সৌম্য ম্লান কান্তি
জীবনের দুঃখ দৈন্য অতৃপ্তির পর
করুণ কোমল আভা গভীর সুন্দর!
বীণা ফেলে দিয়ে এস, মানস সুন্দরী,
দুটি রিক্তহস্ত শুধু আলিঙ্গনে ভরি’
কণ্ঠে জড়াইয়া দাও,—মৃণাল-পরশে
রোমাঞ্চ অঙ্কুরি উঠে মর্ম্মান্ত হরষে,—
কম্পিত চঞ্চল বক্ষ, চক্ষু ছলছল,
মুগ্ধ তনু মরি যায়, অন্তর কেবল
অঙ্গের সীমান্ত প্রান্তে উদ্ভাসিয়া উঠে,
এখনি ইন্দ্রিয়বন্ধ বুঝি টুটে টুটে!
অর্দ্ধেক অঞ্চল পাতি’ বসাও যতনে
পার্শ্বে তব; সুমধুর প্রিয় সম্বোধনে
ডাক মোরে, বল, প্রিয়, বল, প্রিয়তম;—
কুন্তল-আকুল মুখ বক্ষে রাখি মম
হৃদয়ের কানে কানে অতি মৃদু ভাষে
সঙ্গোপনে বলে’ যাও যাহা মুখে আসে
অর্থহারা ভাবে-ভরা ভাষা! অয়ি প্রিয়া,
চুম্বন মাগিব যবে, ঈষৎ হাসিয়া
বাঁকায়ো না গ্রীবাখানি, ফিয়ো না মুখ,
উজ্জ্বল রক্তিমবর্ণ সুধাপূর্ণ সুখ
রেখো ওষ্ঠাধরপুটে, ভক্ত ভৃঙ্গ তরে
সম্পূর্ণ চুম্বন এক, হাসি স্তরে স্তরে
সরস সুন্দর;—নবস্ফুট পুষ্পসম
হেলায়ে বঙ্কিম গ্রীবা বৃন্ত নিরুপম
মুখখানি তুলে’ ধোরো; আনন্দ আভায়
বড় বড় দুটি চক্ষু পল্লব-প্রচ্ছায়
রেখো মোর মুখপানে প্রশান্ত বিশ্বাসে,
নিতান্ত নির্ভরে! যদি চোখে জল আসে
কাঁদিব দুজনে; যদি ললিত কপোল
মৃদু হাসি ভাসি উঠে, বসি’ মোর কোলে,
বক্ষ বাঁধি বাহুপাশে, স্কন্ধে মুখ রাখি
হাসিয়ো নীরবে অর্দ্ধ-নিমীলিত আঁখি;
যদি কথা পড়ে মনে তবে কলম্বরে
বলে যেয়ো কথা, তরল আনন্দ ভরে
নিঝরের মত, অর্দ্ধেক রজনী ধরি’
কত না কাহিনী স্মৃতি কল্পনা লহরী
মধুমাখা কণ্ঠের কাকলি; যদি গান
ভাল লাগে, গেয়ো গান; যদি মুগ্ধ প্রাণ
নিঃশব্দ নিস্তব্ধ শান্ত সম্মুখে চাহিয়া
বসিয়া থাকিতে চাও, তাই র’ব প্রিয়া!
হেরিব অদূরে পদ্মা, উচ্চ তটতলে
শ্রান্ত রূপসীর মত বিস্তীর্ণ অঞ্চলে
প্রসারিয়া তনুখানি, সায়াহ্ন-আলোকে
শুয়ে আছে; অন্ধকার নেমে আসে চোখে
চোখের পাতার মত; সন্ধ্যাতারা ধীরে,
সন্তর্পণে করে পদার্পণ, নদীতীরে
অরণ্যশিয়রে; যামিনী শয়ন অর
দেয় বিছাইয়া, এক খানি অন্ধকার
অনন্ত ভুবনে। দোঁহে মোরা রব চাহি’
অপার তিমিরে; আর কোথা কিছু নাহি,
শুধু মোর করে তব করতল খানি,
শুধু অতি কাছাকাছি দুটি জন প্রাণী
অসীম নির্জ্জনে; বিষন্ন বিচ্ছেদরাশি
চরাচরে আর সব ফেলিয়াছে গ্রাসি’
শুধু এক প্রান্তে তার প্রলয়-মগন
বাকি আছে একখানি শঙ্কিত মিলন,
দুটি হাত, ত্রস্ত কপোতের মত দুটি
বক্ষ দুরুদুরু, দুই প্রাণে আছে ফুটি’
শুধু এক খানি, ভয়, এক খানি আশা,
এক খানি অশ্রুভরে নম্র ভালবাসা।
আজিকে এমনি তবে কাটিবে যামিনী
আলস্য বিলাসে। অয়ি নিরভিমানিনী,
অয়ি মোর জীবনের প্রথম প্রেয়সী,
মোর ভাগ্য-গগনের সৌন্দর্য্যের শশি,
মনে আছে, কবে কোন্ ফুল্ল যুথী বনে,
বহু বাল্যকালে, দেখা হত দুই জনে
আধ চেনা-শোনা’? তুমি এই পৃথিবীর
প্রতিবেশিনীর মেয়ে, ধরার অস্থির
এক বালকের সাথে কি খেলা খেলাতে
সখি, আসিতে হাসিয়া, তরুণ প্রভাতে
নবীন বালিকা মূর্ত্তি, শুভ্রবস্তু পরি’
ঊষার কিরণ ধারে সামান্য করি’
বিকচ কুসুমদম ফুল্ল মুখখানি
নিদ্রাভঙ্গে দেখা দিতে, নিয়ে যেতে টানি’
উপবনে কুড়াতে শেফালি। বারে বারে
শৈশব-কর্ত্তব্য হতে তুলায়ে আমারে,
ফেলে দিয়ে পুঁথিপত্র, কেড়ে নিয়ে খড়ি,
দেখায়ে গোপন পথ দিতে মুক্ত করি
পাঠশালা কারা হতে; কোথা গৃহকোণে
নিয়ে যেতে নির্জ্জনেতে রহস্য-ভবনে;
জনশূন্য গৃহছাদে আকাশের তলে
কি করিতে খেলা, কি বিচিত্র কথা বলে’
ভুলাতে আমারে, স্বপ্নসম চমৎকার
অর্থহীন, সত্য মিথ্যা তুমি জান তার।
দুটি কর্ণে দুলিত মুকুতা, দুটি করে
সোনার বলয়, দুটি কপোলর পরে
খেলিত অলক, দুটি স্বচ্ছ নেত্র হতে
কাঁপিত আলোক, নির্ম্মল নির্ঝির স্রোতে
চূর্ণরশ্মিসম। দোঁহে দোঁহা ভাল করে’
চিনিবার আগে নিশ্চিন্ত বিশ্বাসভরে
খেলাধূলা ছুটাছুটি দুজনে সতত,
কথাবার্ত্তা বেশবাস বিথান বিতত।
তার পরে এক দিন—কি জানি সে কবে—
জীবনের বনে, যৌবন-বসন্তে যবে
প্রথম মলয় বায়ু ফেলেছে নিশ্বাস,
মুকুলিয়া উঠিতেছে শত নব আশ,
সহসা চকিত হয়ে আপন সঙ্গীতে
চমকিয়া হেরিলাম—খেলাক্ষেত্র হতে
কখন্ অন্তর-লক্ষ্মী এসেছ অন্তরে
আপনার অন্তঃপুরে গৌরবের ভরে
বসি আছ মহিষীর মত! কে তোমারে
এনেছিল বরণ করিয়া? পুরদ্বারে
কে দিয়াছে হুলুধ্বনি? ভরিয়া অঞ্চল
কে করেছে বরিষণ নব পুষ্পদল
তোমার আনম্ৰ শিরে আনন্দে আদরে?
সুন্দর সাহানা রাগে বংশীর সুস্বরে
কি উৎসব হয়েছিল আমার জগতে,
যে দিন প্রথম তুমি পুষ্পফুল্ল পথে
লজ্জামুকুলিত মুখে রক্তিম অম্বরে
বধূ হয়ে প্রবেশিলে চির দিন তরে
আমার অন্তর গৃহে—যে গুপ্ত আলয়ে
অন্তর্যামী জেগে আছে সুখ দুঃখ লয়ে,
যেখানে আমার যত লজ্জা আশা ভয়
সদা কম্পমান, পরশ নাহিক সয়
এত সুকুমার। ছিলে খেলার সঙ্গিনী,
এখন হয়েছ মোর মর্ম্মের গৃহিণী,
জীবনের অধিষ্ঠাত্রী দেবী। কোথা সেই
অমূলক হাসি অশ্রু, সে চাঞ্চল্য নেই,
সে বাহুল্য কথা। স্নিগ্ধদৃষ্টি সুগম্ভীর
স্বচ্ছনীলাম্বর সম; হাসিখানি স্থির
অশ্রু শিশিরেতে ধৌত; পরিপূর্ণ দেহ
মঞ্জরিত বল্লরীর মত; প্রতি স্নেহ
গভীর সঙ্গীত তানে উঠিছে ধ্বনিয়া
স্বর্ণ বীণা-তন্ত্রী হতে রনিয়া রনিয়া
অনন্ত বেদনা বহি। সে অবধি প্রিয়ে,
রয়েছি বিস্মিত হয়ে তোমারে চাহিয়ে
কোথাও না পাই অন্ত! কোন্ বিশ্বপার
আছে তব জন্মভূমি? সঙ্গীত তোমার
কত দূরে নিয়ে যাবে, কোন্ কল্পলোকে
আমারে করিবে বন্দী, গানের পুলকে
বিমুগ্ধ কুরঙ্গ সম? এই যে বেদনা
এর কোন ভাষা আছে? এই যে বাসনা
এর কোন তৃপ্তি আছে? এই যে উদার
সমুদ্রের মাঝখানে হয়ে কর্ণধার
ভাসায়েছ সুন্দর তরণী; দশ দিশি
অস্ফুট কল্লোল ধ্বনি চির দিবানিশি
কি কথা বলিছে কিছু নারি বুঝিবারে,
এর কোন কুল আছে? সৌন্দর্য্য পাথারে
যে বেদনা-বায়ু-ভরে ছুটে মনোতরী,
সে বাতাসে, কত বার মনে শঙ্কা করি
ছিন্ন হয়ে গেল বুঝি হৃদয়ের পাল,
অভয় আশ্বাস ভরা নয়ন বিশাল
হেরিয়া ভরসা পাই; বিশ্বাস বিপুল
জাগে মনে—আছে এক মহা উপকূল
এই সৌন্দর্য্যের তটে, বাসনার তীরে
মোদের দোঁহার গৃহ!
হাসিতেছ ধীরে
চাহি মোর মুখে, ওগো রহস্যমধুরা!
কি বলিতে চাহ মোরে প্রণয়বিধুরা
সীমন্তিনী মোর? কি কথা বুঝতে চাও?
কিছু বলে’ কাজ নাই—শুধু ঢেকে দাও
আমার সর্ব্বাঙ্গমন তোমার অঞ্চলে,
সম্পূর্ণ হরণ করি লহ গো সবলে
আমার আমারে; নগ্ন বক্ষে বক্ষ দিয়া
অন্তর-রহস্য তব শুনে নিই প্রিয়া!
তোমার হৃদয়কম্প অঙ্গুলির মত
আমার হৃদয়তন্ত্রী করিবে প্রহত,
সঙ্গীত তরঙ্গ ধ্বনি উঠিবে গুঞ্জরি’
সমস্ত জীবন ব্যাপি’ থর থর করি’!
নাই বা বুঝিনু কিছু, নাই বা বলিনু,
নাই বা গাঁথিনু গান, নাই বা চলিনু
ছন্দোবদ্ধ পথে, সলজ্জ হৃদয় খানি
টানিয়া বাহিরে! শুধু ভুলে গিয়ে বাণী
কাঁপিব সঙ্গীত ভরে, নক্ষত্রের প্রায়
শিহরি জ্বলিব শুধু কম্পিত শিখায়,
শুধু তরঙ্গের মত ভাঙ্গিয়া পড়িব
তোমার তরঙ্গ পানে, বাঁচিব মরিব
শুধু, আর কিছু করিব না! দাও সেই
প্রকাণ্ড প্রবাহ, যাহে এক মুহুর্ত্তেই
জীবন করিয়া পূর্ণ, কথা না বলিয়া
উন্মত্ত হইয়া যাই উদ্দাম চলিয়া!
মানসীরূপিনী ওগো, বাসনা-বাসিনী,
আলোকবসনা ওগগা, নীরবভাষিণী,
পরজন্মে তুমি কিগো মূর্ত্তিমতী হয়ে
জন্মিবে মানব গৃহে নারীরূপ লয়ে
অনিন্দ্য সুন্দরী? এখন ভাসিছ তুমি
অনন্তের মাঝে; স্বর্গ হতে মর্ত্ত্যভূমি
করিছ বিহার; সন্ধ্যার কনক বর্ণে
রাঙ্গিছ অঞ্চল; ঊষার গলিত স্বর্ণে
গড়িছ মেখলা; পূর্ণ তটিনীর জলে
করিছ বিস্তার, তলতল ছল ছলে
ললিত যৌবন খানি; বসন্ত বাতাসে
চঞ্চল বাসনা ব্যথা সুগন্ধ নিশ্বাসে
করিছ প্রকাশ; নিসুপ্ত পূর্ণিমা রাতে
নির্জ্জন গগনে, একাকিনী ক্লান্ত হাতে
বিছাইছ দুগ্ধশুভ্র বিরহ শয়ন!
শরৎ প্রত্যুষে উঠি করিছ চয়ন
শেফালি, গাঁথিতে মালা, ভুলে গিয়ে শেষে,
তরুতলে ফেলে দিয়ে আলুলিত কেশে
গভীর অরণ্য ছায়ে উদাসিনী হয়ে
বসে থাক; ঝিকিমিকি আলো ছায়া লয়ে
কম্পিত অঙ্গুলি দিয়ে বিকাল বেলায়
বসন বয়ন কর বকুল তলায়!
অবসন্ন দিবালোকে কোথা হতে ধীরে
ঘন পল্লবিত কুঞ্জে সরোবর তীরে
করুণ কপোত কণ্ঠে গাও মূলতান!
কখন্ অজ্ঞাতে আসি ছুঁয়ে যাও প্রাণ
সকৌতুকে; করি দাও হৃদয় বিকল,
অঞ্চল ধরিতে গেলে পালাও চঞ্চল
কলকণ্ঠে হাসি’, অসীম আকাঙ্ক্ষা রাশি
জাগাইয়া প্রাণে, দ্রুতপদে উপহাসি
মিলাইয়া যাও নভোনীলিমার মাঝে।
কখনো মগন হয়ে আছি যবে কাজে
স্খলিত-বসন তব শুভ্র রূপখানি
নগ্ন বিদ্যুতের আলো নয়নেতে হানি
চকিতে চমকি’ চলি যায়!—জানালায়
একেলা বসিয়া যবে আঁধার সন্ধ্যায়,—
মুখে হাত দিয়ে, মাতৃহীন বালকের
মত, বহুক্ষণ কাঁদি, স্নেহ আলোকের
তরে; ইচ্ছা করি, নিশার আঁধার স্রোতে
মুছে ফেলে দিয়ে যায় সৃষ্টিপট হতে
এই ক্ষীণ অর্থহীন অস্তিত্বের রেখা,
তখন করুণাময়ী দা! তুমি দেখা
তারকা-আলোক-জ্বালা স্তব্ধ রজনীর
প্রান্ত হতে নিঃশব্দে আসিয়া; অশ্রুনীর
অঞ্চলে মুছায়ে দাও; চাও মুখপানে
স্নেহময় প্রশ্নভরা করুণ নয়ানে;
নয়ন চুম্বন কর; স্নিগ্ধ হস্তখানি
ললাটে বুলায়ে দাও; না কহিয়া বাণী
সান্ত্বনা ভরিয়া প্রাণে কবিরে তোমার
ঘুম পাড়াইয়া দিয়া কখন্ আবার
চলে যাও নিঃশব্দ চরণে!
সেই তুমি
মুর্ত্তিতে দিবে কি ধরা? এই মর্ত্ত্যভূমি
পরশ করিবে রাঙা চরণের তলে?
অন্তরে বাহিরে বিশ্বে শূন্যে জলে স্থলে
সর্ব্ব ঠাঁই হতে, সর্ব্বময়ী আপনারে
করিয়া হরণ—ধরণীর এক ধারে
ধরিবে কি একখানি মধুর মুরতি?
নদী হতে লতা হতে আনি তব গতি
অঙ্গে অঙ্গে নানা ভঙ্গে দিবে হিল্লোলিয়া
বাহুতে বাঁকিয়া পড়ি’ গ্রীবায় হেলিয়া
ভাবের বিকাশ ভরে? কি নীল বসন
পরিবে সুন্দরী তুমি? কেমন কঙ্কণ
ধরিবে দুখানি হাতে? কবরী কেমনে
বাঁধিবে, নিপুণ বেণী বিনায়ে যতনে?
কচি কেশগুলি পড়ি’ শুভ্র গ্রীবাপরে
শিরীষ কুসুম সম সমীরণ ভরে
কাঁপিবে কেমন? শ্রাবণে দিগন্ত পারে
যে গভীর স্নিগ্ধদৃষ্টি ঘন মেঘভারে
দেখা দেয়—নব নীল অতি সুকুমার,
সে দৃষ্টি না জানি ধরে কেমন আকার
নারীচক্ষে! কি সঘন পল্লবের ছায়,
কি সুদীর্ঘ কি নিবিড় তিমির আভায়
মুগ্ধ অন্তরের মাঝে ঘনাইয়া আনে
সুখ বিভাবরী? অধর কি সুধাদানে
রহিবে উন্মুখ, পরিপূর্ণ বাণীভরে
নিশ্চল নীরব। লাবণ্যের থরে থরে
অঙ্গখানি কি করিয়া মুকুলি’ বিকশি’
অনিবার সৌন্দর্য্যেতে উঠিবে উচ্ছ্বসি’
নিঃসহ যৌবনে!
জানি, আমি জানি, সখি,
যদি আমাদের দোঁহে হয় চোখোচাখি
সেই পরজন্ম-পথে,–দাঁড়াব থমকি’,
নিদ্রিত অতীত কাঁপি’ উঠিবে চমকি’
লভিয়া চেতনা!–জানি মনে হবে মম
চির-জীবনের মোর ধ্রুবতারা সম
চিরপরিচয়-ভরা ঐ কালো চোখ!
আমার নয়ন হতে লইয়া আলোক,
আমার অন্তর হতে লইয়া বাসনা
আমার গোপন প্রেম করেছে রচনা
এই মুখখানি। তুমিও কি মনে মনে
চিনিবে আমারে? আমাদের দুই জনে
হবে কি মিলন? দুটি বাহু দিয়ে বালা
কখনো কি এই কণ্ঠে পরাইবে মালা
বসন্তের ফুলে? কখনো কি বক্ষ ভরি
নিবিড় বন্ধনে, তোমারে হৃদয়েশ্বরী
পারিব বাঁধিতে? পরশে পরশে দোঁহে
করি বিনিময়, মরিব মধুর মোহে
দেহের দুয়ারে? জীবনের প্রতিদিন
তোমার আলোক পাবে বিচ্ছেদবিহীন,
জীবনের প্রতি রাত্রি হবে সুমধুর
মাধুর্য্যে তোমার! বাজিবে তোমার সুর
সর্ব্ব দেহে মনে? জীবনের প্রতি সুখে
পড়িবে তোমার শুভ্র হাসি, প্রতি দুখে
পড়িবে তোমার অশ্রুজল! প্রতি কাজে
রবে তব শুভহস্ত দুটি। গৃহমাঝে
জাগায়ে রাখিবে সদা সুমঙ্গল জ্যোতি।
এ কি শুধু বাসনার বিফল মিনতি,
কল্পনার ছল? কার এত দিব্যজ্ঞান,
কে বলিতে পারে মোরে নিশ্চয় প্রমাণ—
পূর্ব্বজন্মে নারীরূপে ছিলে কি না তুমি
আমারি জীবন-বনে সৌন্দর্য্যে কুসুমি’
প্রণক্ষ বিকশি’? মিলনে আছিলে বাঁধা
শুধু এক ঠাঁই, বিরহে টুটিয়া বাঁধা
আজি বিশ্বময় ব্যাপ্ত হয়ে গেছ, প্রিয়ে,
তোমারে দেখিতে পাই সর্ব্বত্র চাহিয়ে!
ধূপ দগ্ধ হয়ে গেছে, গন্ধবাষ্প তার
পূর্ণ করি ফেলিয়াছে আজি চারি ধার!
গৃহের বনিতা ছিলে—টুটিয়া আলয়
বিশ্বের কবিতারূপে হয়েছ উদয়,—
তবু কোন্ মায়া-ডোরে চির-সোহাগিনী
হৃদয়ে দিয়েছ ধরা, বিচিত্র রাগিণী
জাগায়ে তুলিছ প্রাণে চিরস্মৃতিময়!
তাই ত এখনো মনে আশা জেগে রয়
আবার তোমারে পাব পরশ বন্ধনে!
এমনি সমস্ত বিশ্ব প্রলয়ে সৃজনে
জ্বলিছে নিবিছে, যেন খদ্যোতের জ্যোতি!
কখনো বা ভাবময়, কখনো মুরতি।
রজনী গভীর হল, দীপ নিবে আসে;
পর সুদূর পায়ে পশ্চিম আকাশে
কখন্ যে সায়াহ্নের শেষ স্বর্ণ-রেখা
মিলাইয়া গেছে, সপ্তর্ষি দিয়েছে দেখা
তিমির গগনে, শেষ ঘট পূর্ণ করে’
কখন্ বালিকা বধূ’ চলে গেছে ঘরে,—
হেরি’ কৃষ্ণপক্ষ রাত্রি একাদশী তিথি
দীর্ঘপথ শূন্যক্ষেত্র হয়েছে অতিথি
গ্রামে গৃহস্থের ঘরে পান্থ পরবাসী,—
কখন্ গিয়েছে থেমে কলরব রাশি
মাঠপারে কৃষি-পল্লি হতে, নদীতীরে
বৃদ্ধ কৃষাণের জীর্ণ নিভৃত কুটীরে
কখন্ জ্বলিয়াছিল সন্ধ্যা-দীপ খানি,
কখন্ নিভিয়া গেছে—কিছুই না জানি!
কি কথা বলিতেছিনু, কি জানি, প্রেয়সি,
অর্দ্ধ-অচেতন ভাবে মনোমাঝে পশি’
স্বপ্নমুগ্ধ মত! কেহ শুনেছিলে সে কি,
কিছু বুঝেছিলে প্রিয়ে, কোথাও আছে কি
কোন অর্থ তার? সব কথা গেছি ভুলে,
শুধু এই নিদ্রাপূর্ণ নিশীথের কুলে
অন্তরের অন্তহীন অশ্রু-পারাবার
উদ্বেলিয়া উঠিয়াছে হৃদয়ে আমার
গম্ভীর নিস্বনে!
এস সুপ্তি, এস শান্তি,
এস প্রিয়ে, মুগ্ধ মৌন সকরুণ কান্তি,
বক্ষে মোরে লহ টানি,—শোয়াও যতনে
মরণ-সুন্নিগ্ধ শুত্র বিস্মৃতি শয়নে!
৪ পৌষ, ১২৯৯।
মায়াবাদ
মায়াবাদ।
হারে নিরানন্দ দেশ, পরিজীর্ণ জরা,
বহি’ বিজ্ঞতার বােঝা, ভাবিতেছ মনে
ঈশ্বরের প্রবঞ্চনা পড়িয়াছে ধরা
সুচতুর সূক্ষ্ম দৃষ্টি তােমার নয়নে!
লয়ে কুশাঙ্কুর বুদ্ধি শাণিত প্রখরা
কর্ম্মহীন রাত্রিদিন বসি গৃহকোণে
মিথ্যা বলে জানিয়াছ বিশ্ব-বসুন্ধরা
গ্রহতায়াময় সৃষ্টি অনন্ত গগনে।
যুগযুগান্তর ধরে’ পশু পক্ষী প্রাণী
অচল নির্ভয়ে হেথা নিতেছে নিশ্বাস
বিধাতার জগতেরে মাতৃক্রোড় মানি;
তুমি বৃদ্ধ কিছুরেই কর না বিশ্বাস!
লক্ষ কোটী জীব লয়ে এ বিশ্বের মেলা
তুমি জানিতেছ মনে সব ছেলেখেলা!
মুক্তি
মুক্তি।
চক্ষু কর্ণ বুদ্ধি মন সব রুদ্ধ করি,
বিমুখ হইয়া সর্ব্ব জগতের পানে,
শুদ্ধ আপনার ক্ষুদ্র আত্মাটিরে ধরি
মুক্তি আশে সন্তরিব কোথায় কে জানে!
পার্শ্ব দিয়ে ভেসে যাবে বিশ্ব মহাতরী।
অম্বর আকুল করি যাত্রীদের গানে,
শুভ্র কিরণের পালে দশদিক্ ভরি’,
বিচিত্র সৌন্দর্য্যে পূর্ণ অসংখ্য পরাণে!
ধীরে ধীরে চলে যাবে দূর হতে দূরে
অথিল ক্রন্দন হাসি আঁধার আলােক,
বহে যাবে শূন্য পথে সকরুণ সুরে
অনন্ত জগৎভরা যত দুঃখ শােক।
বিশ্ব যদি চলে যায় কাঁদিতে কাঁদিতে
আমি একা বসে র’ব মুক্তি-সমাধিতে?
যেতে নাহি দিব
যেতে নাহি দিব।
দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর;
হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর;
জনশূন্য পল্লিপথে ধূলি উড়ে যায়
মধ্যাহ্ন বাতাসে; স্নিগ্ধ অশত্থের ছায়
ক্লান্ত বৃদ্ধা ভিখারিণী জীর্ণ বস্ত্র পাতি’
ঘুমায়ে পড়েছে; যেন রৌদ্রময়ী বাতি
ঝাঁ ঝাঁ করে চারিদিকে নিস্তব্ধ নিঃঝুম;—
শুধু মোর ঘরে নাহি বিশ্রামের ঘুম।
গিয়েছে আশ্বিন,—পূজার ছুটির শেষে
ফিরে যেতে হবে আজি বহু দূর দেশে
সেই কর্ম্মস্থানে। ভৃত্যগণ ব্যস্ত হয়ে
বাঁধিছে জিনিষপত্র দড়াদড়ি লয়ে,
হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি এঘরে ওঘরে।
ঘরের গৃহিণী, চক্ষু ছলছল করে,
ব্যথিছে বক্ষের কাছে পাষাণের ভার,
তবুও সময় তার নাহি কাঁদিবার
একদণ্ড তরে; বিদায়ের আয়োজনে
ব্যস্ত হয়ে ফিরে; যথেষ্ট না হয় মনে
যত বাড়ে বোঝা আমি বলি, “এ কি কাণ্ড!
এত ঘট এত পট হাঁড়ি সরা ভাণ্ড
বোতল বিছানা বাক্স রাজ্যের বোঝাই
কি করিব, লয়ে! কিছু এর রেখে যাই
কিছু লই সাথে!”
সে কথায় কর্ণপাত
নাহি করে কোন জন। “কি জানি দৈবাৎ
এটা ওটা আবশ্যক যদি হয় শেষে
তখন কোথায় পাবে বিঁভুই বিদেশে!-
সোনা-মুগ সরুচাল সুপারি ও পান;
ও হাঁড়িতে ঢাকা আছে দুই চারি খান
গুড়ের পাটালি; কিছু ঝুনা নারিকেল;
দুই ভাণ্ড ভাল রাই-শরিষার তেল;
আমসত্ব আমচুর; সের দুই দুধ;
এই সব শিশি কৌটা ওষুধ বিষুধ।
মিষ্টান্ন রহিল কিছু হাঁড়ির ভিতরে,
মাথা খাও, ভুলিয়োনা, খেয়ো মনে করে।”
বুঝিনু যুক্তির কথা বৃথা বাক্যব্যয়।
বোঝাই হইল উঁচু পর্ব্বতের ন্যায়।
তাকানু ঘড়ির পানে, তার পরে ফিরে
চাহি প্রিয়ার মুখে; কহিলাম ধীরে
“তবে আসি”। অমনি ফিরায়ে মুখখানি
নতশিরে চক্ষুপরে বস্ত্রাঞ্চল টানি
অমঙ্গল অশ্রুজল করিল গোপন।
বাহিরে দ্বারের কাছে বসি অন্যমন
কন্যা মোর চারি বছরের; এতক্ষণ
অন্য দিনে হয়ে যেত স্নান সমাপন,
দুটি অন্ন মুখে না তুলিতে আঁখিপাতা
মুদিয়া আসিত ঘুমে; আজি তার মাতা
দেখে নাই তারে; এত বেলা হয়ে যায়
নাই স্নানাহার। এতক্ষণ ছায়াপ্রায়
ফিরিতেছিল সে মোর কাছে কাছে ঘেঁসে,
চাহিয়া দেখিতেছিল মৌন নির্ণিমেষে
বিদায়ের আয়োজন। শ্রান্ত দেহে এবে
বাহিরের দ্বারপ্রান্তে কি জানি কি ভেবে
চুপিচাপি বসেছিল। কহিনু যখন
“মাগো, আসি,” সে কহিল বিষণ্ণ নয়ন
ম্লান মুখে “যেতে আমি দিব না তোমায়!”
যেখানে আছিল বসে’ রহিল সেথায়,
ধরিল না বাহু মোর, রুধিল না দ্বার,
শুধু নিজ হৃদয়ের স্নেহ-অধিকার
প্রচারিল—“যেতে আমি দিব না তোমায়!”
তবুও সময় হল শেষ, তবু হায়
যেতে দিতে হল।
ওরে মোর মূঢ় মেয়ে!
কে রে তুই, কোথা হতে কি শকতি পেয়ে
কহিলি এমন কথা, এত স্পর্দ্ধাভরে-
“যেতে আমি দিব না তোমায়।” চরাচরে
কাহারে রাখিবি ধরে’ দুটি ছোট হাতে,
গরবিনি, সংগ্রাম করিবি কার সাথে
বসি গৃহদ্বারপ্রান্তে শ্রান্ত ক্ষুদ্র দেহ
শুধু লয়ে ওইটুকু বুকভরা স্নেহ!
ব্যথিত হৃদয় হতে বহুভয়ে লাজে
মর্ম্মের প্রার্থনা শুধু ব্যক্ত করা সাজে
এ জগতে,—শুধু বলে রাখা “যেতে দিতে
ইচ্ছা নাহি!” হেন কথা কে পারে বলিতে
“যেতে নাহি দিব।” শুনি তোর শিশুমুখে
স্নেহের প্রবল গর্ব্ববাণী, সকৌতুকে
হাসিয়া সংসার টেনে নিয়ে গেল মোরে,
তুই শুধু পরাভূত চোখে জল ভোরে
দুয়ারে রহিলি বসে ছবির মতন,
আমি দেখে চলে’ এনু মুছিয়া নয়ন।
চলিতে চলিতে পথে হেরি দুইধারে
শরতের শস্যক্ষেত্র নত শস্যভরে
রৌদ্র পোহইছে। তরুশ্রেণী উদাসীন
রাজপথপাশে, চেয়ে আছে সারাদিন
আপন ছায়ার পানে। বহে খরবেগ
শরতের ভরা গঙ্গা। শুভ্র খণ্ডমেঘ
মাতৃদুগ্ধ-পরিতৃপ্ত সুখনিদ্রারত
সদ্যোজাত সুকুমার গোবৎসের মত
নীলাম্বরে শুয়ে।—দীপ্ত রৌদ্রে অনাবৃত
যুগযুগান্তরক্লান্ত দিগন্তবিস্তৃত
ধরণীর পানে চেয়ে ফেলিনু নিশ্বাস।
কি গভীর দুঃখে মগ্ন সমস্ত আকাশ,
সমস্ত পৃথিবী! চলিতেছি যতদুর
শুনিতেছি একমাত্র মর্মান্তিক সুর
“যেতে আমি দিব না তোমায়!” ধরণীর
প্রান্ত হতে নীলাভ্রের সর্ব্বপ্রান্ততীর
ধ্বনিতেছে চিরকাল অনাদ্যন্ত রবে
“যেতে নাহি দিব! যেতে নাহি দিব।” সবে
কহে “যেতে নাহি দিব!” তৃণ ক্ষুদ্র অতি
তারেও বাঁধিয়া বক্ষে মাতা বসুমতী
কহিছেন প্রাণপণে “যেতে নাহি দিব!”
আয়ুঃক্ষীণ দীপমুখে শিখা নিব’-নিব’
আঁধারের গ্রাস হতে কে টানিছে তারে,
কহিতেছে শতবার “যেতে দিব না রে!”
এ অনন্ত চরাচরে স্বৰ্গমর্ত্ত্য ছেয়ে
সব চেয়ে পুরাতন কথা, সব চেয়ে
গভীর ক্রন্দন “যেতে নাহি দিব।” হায়,
তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়!
চলিতেছে এমনি অনাদিকাল হতে।
প্রলয়-সমুদ্রবাহী সৃজনের স্রোতে
প্রসারিত ব্যগ্রবাহ জ্বলন্ত আঁখিতে
“দিবনা দিবনা যেতে” ডাকিতে ডাকিতে
হুহু করে’ তীব্রবেগে চলে যায় সবে
পূর্ণ করি বিশ্বতট আর্ত্ত কলরবে।
সম্মুখ উর্ম্মিরে ডাকে পশ্চাতের ঢেউ
“দিবনা দিবনা যেতে”-নাহি শুনে কেউ,
নাহি কোন সাড়া!
চারিদিক হতে আজি
অবিশ্রাম কর্ণে মোর উঠিতেছে বাজি
সেই বিশ্ব-মর্ম্মভেদী করুণ ক্রন্দন
মোর কন্যাকণ্ঠস্বরে। শিশুর মতন
বিশ্বের অবোধ বাণী। চিরকাল ধরে’
যাহা পায় তাই সে হারায়, তবু ত রে
শিথিল হল না মুষ্টি, তবু অবিরত
সেই চারি বৎসরের কন্যাটির মত
অক্ষুণ্ণ প্রেমের গর্ব্বে কহিছে সে ডাকি
“যেতে নাহি দিব”; ম্লানমুখ, অশ্রু-আঁখি,
দণ্ডে দণ্ডে পলে পলে টুটিছে গরব
তবু প্রেম কিছুতে না মানে পরাভব,—
তবু বিদ্রোহের ভাবে রুদ্ধ কণ্ঠে কয়
“যেতে নাহি দিব।” যতবার পরাজয়
ততবার কহে-“আমি ভালবাসি যারে
সে কি কভু আমা হতে দূরে যেতে পারে!
আমার আকাঙ্ক্ষাসম এমন আকুল,
এমন সকল-বাড়া, এমন অকুল,
এমন প্রবল, বিশ্বে কিছু আছে আর!”
এত বলি দর্পভরে করে সে প্রচার
“যেতে নাহি দিব!”—তখনি দেখিতে পায়
শুষ্ক তুচ্ছ ধূলিসম উড়ে’ চলে’ যায়
একটি নিশ্বাসে তার আদরের ধন,—
অশ্রুজলে ভেসে যায় দুইটি নয়ন,
ছিন্নমূল তরুসম পড়ে পৃথ্বীতলে
হতগর্ব্ব নতশির।—তবু প্রেম বলে
“সত্য ভঙ্গ হবে না বিধির। আমি তাঁর
পেয়েছি স্বাক্ষর-দেওয়া মহা অঙ্গীকার
চির-অধিকার লিপি!” তাই স্ফীতবুকে
সর্ব্বশক্তি মরণের মুখের সম্মুখে
দাঁড়াইয়া সুকুমার ক্ষীণ তনুলতা
বলে “মৃত্যু তুমি নাই।”—হেন গর্ব্বকথা!
মৃত্যু হাসে বসি! মরণ-পীড়িত সেই
চিরঞ্জীবী প্রেম আচ্ছন্ন করেছে এই
অনন্ত সংসার, বিষণ্ণ নয়ন পরে
অশ্রুবাষ্পসম, ব্যাকুল আশঙ্কাতরে
চির-কম্পমান। আশাহীন শ্রান্ত আশা
টানিয়া রেখেছে এক বিষাদ-কুয়াশা
বিশ্বময়। আজি যেন, পড়িছে নয়নে
দু’খানি অবোধ বাহু বিফল বাঁধনে
জড়ায়ে পড়িয়া আছে নিখিলেরে ঘিরে,
স্তব্ধ সকাতর। চঞ্চল স্রোতের নীরে
পড়ে’ আছে একখানি অচঞ্চল ছায়া,—
অশ্রুবৃষ্টিভরা কোন্ মেঘের সে মায়া!
তাই আজি শুনিতেছি তরুর মর্ম্মরে
এত ব্যাকুলতা; অলস ঔদাস্যভরে
মধ্যাহ্ণের তপ্তবায়ু মিছে খেলা করে
শুষ্ক পত্র লয়ে; বেলা ধীরে যায় চলে’
ছায়া দীর্ঘতর করি’ অশত্থের তলে।
মেঠো সুরে কাঁদে যেন অনন্তের বাঁশি
বিশ্বের প্রান্তর মাঝে; শুনিয়া উদাসী
বসুন্ধরা বসিয়া আছেন এলোচুলে
দূরব্যাপী শস্যক্ষেত্রে জাহ্নবীর কূলে
একখানি রৌদ্রপীত হিরণ্য-অঞ্চল
বক্ষে টানি দিয়া; স্থির নয়নযুগল
দূর নীলাম্বরে মগ্ন; মুখে নাহি বাণী।
দেখিলাম তাঁর সেই ম্লান মুখখানি
সেই দ্বারপ্রান্তে লীন, স্তব্ধ মর্ম্মাহত
মোর চারি বৎসরের কন্যাটির মত।
১৪ কার্ত্তিক, ১২৯৯।
রাজার ছেলে ও রাজার মেয়ে
রাজার ছেলে ও রাজার মেয়ে।
(রূপকথা।)
প্রভাতে।
রাজার ছেলে যেত পাঠশালায়,
রাজার মেয়ে যেত তথা।
দু’জনে দেখা হত পথের মাঝে,
কে জানে কবেকার কথা!
রাজার মেয়ে দূরে সরে’ যেত,
চুলের ফুল তার পড়ে’ যেত,
রাজার ছেলে এসে তুলে দিত
ফুলের সাথে বনলতা।
রাজার ছেলে যেৎ পাঠশালায়
রাজার মেয়ে যেত তথা।
পথের দুই পাশে ফুটেছে ফুল,
পাখীরা গান গাহে গাছে।
রাজার মেয়ে আগে এগিয়ে চলে,
রাজার ছেলে যায় পাছে।
মধ্যাহ্নে।
উপরে বসে’ পড়ে রাজার মেয়ে,
রাজার ছেলে নীচে বসে।
পুঁথি খুলিয়া শেখে কত কি ভাষা,
খড়ি পাতিয়া আঁক কষে।
রাজার মেয়ে পড়া যায় ভুলে’,
পুঁথিটি হাত হ’তে পড়ে খুলে’,
রাজার ছেলে এসে দেয় তুলে’,
আবার পড়ে’ যায় খসে’।
উপরে বসে’ পড়ে রাজার মেয়ে,
রাজার ছেলে নীচে বসে।
দুপুরে খরতাপ, বকুলশাখে
কোকিল কুহু কুহরিছে।
রাজার ছেলে চায় উপর পানে,
রাজার মেয়ে চায় নীচে।
সায়াহ্নে।
রাজার ছেলে ঘরে ফিরিয়া আসে,
রাজার মেয়ে যায় ঘরে।
খুলিয়া গলা হতে মোতির মালা
রাজার মেয়ে খেলা করে।
পথে সে মালাখানি গেল ভুলে’,
রাজার ছেলে সেটি নিল তুলে’
আপন মণিহার মনোভুলে
দিল সে বালিকার করে।
রাজার ছেলে ঘরে ফিরিয়া এল,
রাজার মেয়ে গেল ঘরে।
শ্রান্ত রবি ধীরে অস্ত যায়
নদীর তীরে এক শেষে।
সাঙ্গ হয়ে গেল দোঁহার পাঠ,
যে যার গেল নিজ দেশে।—
নিশীথে।
রাজার মেয়ে শোয় সোনার খাটে,
স্বপনে দেখে রূপরাশি।
রূপোর খাটে শুয়ে রাজার ছেলে
দেখিছে কার সুধা হাসি!
করিছে আনাগোনা সুখ দুখ,
কখনো দুরু দুরু করে বুক,
অধরে কভু কাঁপে হাসিটুক্,
নয়ন কভু যায় ভাসি।
রাজার মেয়ে কার দেখিছে মুখ,
রাজার ছেলে কার হাসি।
বাদর ঝর ঝর, গরজে মেঘ,
পবন করে মাতামাতি।
শিথানে মাথা রাখি বিথান বেশ,
স্বপনে কেটে যায় রাতি।
চৈত্র, ১২৯৯।
লজ্জা
লজ্জা।
আমার হৃদয় প্রাণ
সকলি করেছি দান,
কেবল সরম খানি রেখেছি।
চাহিয়া নিজের পানে
নিশিদিন সাবধানে
সযতনে আপনারে ঢেকেছি।
হে বঁধু, এ স্বচ্ছ বাস
করে মোরে পরিহাস,
সতত রাখিতে নারি ধরিয়া,
চাহিয়া আঁখির কোণে
তুমি হাস মনে মনে
আমি তাই লাজে যাই মরিয়া!
দক্ষিণ পবন ভরে
অঞ্চল উড়িয়া পড়ে,
কখন্ যে, নাহি পারি লখিতে,
পুলক ব্যাকুল হিয়া
অঙ্গ উঠে বিকশিয়া,
আবার চেতনা হয় চকিতে!
বদ্ধ গৃহে করি’ বাস
রুদ্ধ যবে হয় স্বাস,
আধেক বসন বন্ধু খুলিয়া
বসি গিয়া বাতায়নে
সুখসন্ধ্যা সমীরণে
ক্ষণতর আপনারে ভুলিয়া;
পূর্ণচন্দ্র কর রাশি
মূর্চ্ছাতুর পড়ে আসি
এই নব যৌবনের মুকুলে,
অঙ্গ মোর ভালবেসে
ঢেকে দেয় মৃদু হেসে
আপনার লাবণ্যের দুকূলে;
মুখে বক্ষে কেশপাশে
ফিরে বায়ু থেলা-আশে,
কুসুমের গন্ধ ভাসে গগনে,
হেন কালে তুমি এলে
মনে হয় স্বপ্ন বলে’
কিছু সার নাহি থাকে স্মরণে!
থাক্ বঁধু, দাও ছেড়ে,
ও টুকু নিয়ে না কেড়ে,
এ সরম দাও মোরে রাখিতে,
সকলের অবশেষ
এই টুকু লাজ লেশ,
আপনারে আধ খানি ঢাকিতে।
ছল ছল দুনয়ান
করিয়ো না অভিমান,
আমিও যে কত নিশি কেঁদেছি,
বুঝাতে পারিনে যেন
সব দিয়ে তবু কেন
সবটুকু লাজ দিয়ে বেঁধেছি,
কেন যে তোমার কাছে।
একটু গোপন আছে,
একটু রয়েছি মুখ হেলায়ে!
এ নহে গো অবিশ্বাস,
নহে সখা, পরিহাস,
নহে নহে ছলনার খেলা এ!
বসন্ত-নিশীথে বঁধু
লহ গন্ধ, সহ মধু,
সোহগে মুখের পানে তাকিয়ো!
দিয়ে দোল আশে পাশে,
কোয়ো কথা মৃদু ভাষে,
শুধু এর বৃন্তটুকু রাখিয়ে!
সে টুকুতে ভর করি
এমন, মাধুরী ধরি’
তোমা পানে আছি আমি ফুটিয়া,
এমন, মোহন ভঙ্গে
আমার সকল অঙ্গে
নরীন লাবণ্য যায় লুটিয়া,
এমন, সকল বেলা
পবনে চঞ্চল খেলা,
বসন্ত-কুসুম-মেলা দু’ধারি!
শুন বঁধু, শুন তবে,
সকলি তোমার হবে,
কেবল সরম থাক্ আমারি!
২৮ আষাঢ়, ১৩০০।
শৈশব সন্ধ্যা
শৈশব সন্ধ্যা।
ধীরে ধীরে বিস্তারিছে ঘেরি চারিধার
শ্রান্তি, আর শান্তি, আর সন্ধ্যা-অন্ধকার,
মায়ের অঞ্চলসম। দাঁড়ায়ে একাকী
মেলিয়া পশ্চিম পানে অনিমেষ আঁখি
স্তব্ধ চেয়ে আছি; আপনারে মগ্ন করি’
অতলের তলে, ধীরে লইতেছি ভরি’
জীবনের মাঝে—আজিকার এই ছবি,
জনশূন্য নদীতীর, অস্তমান রবি,
ম্লান মুর্চ্ছাতুর আলো—রোদন-অরুণ
ক্লান্ত নয়নের যেন দৃষ্টি সকরুণ
স্থির বাক্যহীন,—এই গভীর বিষাদ,
জলে স্থলে চরাচরে শ্রান্তি অবসাদ।
সহসা উঠিল গাহি’ কোন্খান্ হতে
বন-অন্ধকারঘন কোন্ গ্রামপথে
যেতে যেতে গৃহমুখী বালকপথিক।
উচ্ছ্বসিত কণ্ঠস্বর নিশ্চিন্ত নির্ভীক
কাঁপিছে সপ্তম সুরে; তীব্র উচ্চতান
সন্ধ্যারে কাটিয়া যেন করিবে দু’খান।
দেখিতে না পাই তারে; ওই যে সম্মুখে
প্রান্তরের সর্ব প্রান্তে, দক্ষিণের মুখে,
আখের ক্ষেতের পারে, কদলী সুপারি
নিবিড় বাঁশের বন, মাঝখানে তারি
বিশ্রাম করিছে গ্রাম,—হোথা আঁখি ধায়।
হোথা কোন্ গৃহপানে গেয়ে চলে’ যায়
কোন্ রাখালের ছেলে, নাহি ভাবে কিছু,
নাহি চায় শূন্যপানে, নাহি আগুপিছু।
দেখে শুনে মনে পড়ে সেই সন্ধেবেলা
শৈশবের; কত গল্প, কত বাল্যখেলা,
এক বিছানায় শুয়ে মোরা সঙ্গী তিন;
সে কি আজিকার কথা, হল কত দিন!
এখনো কি বৃদ্ধ হয়ে যায় নি সংসার!
ভোলে নাই খেলাধুলা, নয়নে তাহার
আসে নাই নিদ্রাবেশ শান্ত সুশীতল,
বাল্যের খেলনাগুলি করিয়া বদল
পায় নি কঠিন জ্ঞান! দাঁড়ায়ে হেথায়
নির্জ্জন মাঠের মাঝে, নিস্তব্ধ সন্ধ্যায়,
শুনিয়া কাহার গান পড়ি’ গেল মনে
কত শত নদীতীরে, কত আম্রবনে,
কাংস্যঘণ্টামুখরিত মন্দিরের ধারে,
কত শস্যক্ষেত্রপ্রান্তে, পুকুরের পাড়ে
গৃহে গৃহে জাগিতেছে নব হাসিমুখ,
নবীন হৃদয়ভরা নব নব সুখ,
কত অসম্ভব কথা, অপূর্ব্ব কল্পনা,
কত অমূলক আশা, অশেষ কামনা,
অনন্ত বিশ্বাস। দাঁড়াইয়া অন্ধকারে
দেখিনু নক্ষত্রালোকে, অসীম সংসারে
রয়েছে পৃথিবী ভরি বালিকা বালক,
সন্ধ্যাশয্যা, মার মুখ, দীপের আলোক।
ফাল্গুন, ১২৯৮।
সমুদ্রের প্রতি
সমুদ্রের প্রতি।
(পুরীতে সমুদ্র দেখিয়া।)
হে আদিজননী, সিন্ধু, বসুন্ধরা সন্তান তোমার,
একমাত্র কন্যা তব কোলে। তাই তন্দ্রা নাহি আর
চক্ষে তব, তাই বক্ষ জুড়ি’ সদা শঙ্কা, সদা আশা,
সদা আন্দোলন; তাই উঠে বেদমন্ত্রসম ভাষা
নিরন্তর প্রশান্ত অম্বরে, মহেন্দ্রমন্দিরপানে
অন্তরের অনন্ত প্রার্থনা, নিয়ত মঙ্গল গানে
ধ্বনিত করিয়া দিশি দিশি; তাই ঘুমন্ত পৃথ্বীরে
অসংখ্য চুম্বন কর আলিঙ্গনে সর্ব্ব অঙ্গ ঘিরে’
তরঙ্গবন্ধনে বাঁধি, নীলাম্বর অঞ্চলে তোমার
সযত্নে বেষ্টিয়া ধরি’ সন্তর্পণে দেহখানি তার
সুকোমল সুকৌশলে। এ কী সুগম্ভীর স্নেহখেলা
অম্বুনিধি, ছল করি’ দেখাইয়া মিথ্যা অবহেলা
ধীরি ধীরি পা টিপিয়া পিছু হটি’ চলি’ যাও দূরে,
যেন ছেড়ে যেতে চাও—আবার আনন্দপূর্ণ সুরে
উল্লসি’ ফিরিয়া আসি’ কল্লোলে ঝাঁপায়ে পড় বুকে
রাশি রাশি শুভ্রহাস্যে, অশ্রুজলে, স্নেহগর্ব্বসুখে
আর্দ্র করি’ দিয়ে যাও ধরিত্রীর নির্ম্মল ললাট
আশীর্ব্বাদে। নিত্য বিগলিত তব অন্তর বিরাট,
আদি অন্ত স্নেহরাশি,— আদি অন্ত তাহার কোথারে!
কোথা তার তল! কোথা কূল! বলো কে বুঝিতে পারে
তাহার অগাধ শান্তি, তাহার অপার ব্যাকুলতা,
তার সুগম্ভীর মৌন তার সমুচ্ছল কলকথা,
তার হাস্য, তার অশ্রুরাশি!—কখনো বা আপনারে
রাখিতে পার না যেন, স্নেহপূর্ণ স্ফীত স্তনভারে
উন্মাদিনী ছুটে’ এসে ধরণীরে বক্ষে ধর চাপি’
নির্দ্দয় আবেগে; ধরা প্রচণ্ড পীড়নে উঠে কাঁপি’,
রুদ্ধশ্বাসে উৰ্দ্ধশ্বাসে চীৎকারি’ উঠিতে চাহে কাঁদি’,
উন্মত্ত স্নেহক্ষুধায় রাক্ষসীর মত তারে বাঁধি’
পীড়িয়া নাড়িয়া যেন টুটিয়া ফেলিয়া একেবারে
অসীম অতৃপ্তি মাঝে গ্রাসিতে নাশিতে চাহ তারে
প্রকাণ্ড প্রলয়ে। পরক্ষণে মহা অপরাধীপ্রায়
পড়ে’ থাক তটতলে স্তব্ধ হয়ে বিষন্ন ব্যথায়
নিষণ্ণ নিশ্চল;—ধীরে ধীরে প্রভাত উঠিয়া এসে
শান্তদৃষ্টি চাহে তোমাপানে; সন্ধ্যাসখী ভালবেসে
স্নেহকরস্পর্শ দিয়ে সান্ত্বনা করিয়ে চুপে চুপে
চলে’ যায় তিমির-মন্দিরে; রাত্রি শোনে বন্ধুরূপে
গুমরি’-ক্রন্দন তব রুদ্ধ অনুতাপে ফুলে’ ফুলে’।
আমি পৃথিবীর শিশু বসে’ আছি তব উপকূলে,
শুনিতেছি ধ্বনি তব; ভাবিতেছি, বুঝা যায় যেন
কিছু কিছু মর্ম্ম তার—বোবার ইঙ্গিত-ভাষা হেন
আত্মীয়ের কাছে। মনে হয়, অন্তরের মাঝখানে
নাড়ীতে যে রক্ত বহে সেও যেন ওই ভাষা জানে
আর কিছু শেখে নাই। মনে হয়, যেন মনে পড়ে
যখন বিলীন ভাবে ছিনু ওই বিরাট জঠরে
অজাত ভুবন-ভ্রূণমাঝে,—লক্ষকোটি বর্ষ ধরে’
ওই তব অবিশ্রাম কলতান অন্তরে অন্তরে
মুদ্রিত হইয়া গেছে; সেই জন্ম-পূর্ব্বের স্মরণ,—
গর্ভস্থ পৃথিবীপরে সেই নিত্য জীবনস্পন্দন
তব মাতৃহৃদয়ের—অতি ক্ষীণ আভাসের মত
জাগে যেন সমস্ত শিরায়, শুনি যবে নেত্র করি’ নত
বসি’ জনশূন্য তীরে ওই পুরাতন কলধ্বনি।
দিক্ হতে দিগন্তরে যুগ হতে যুগান্তর গণি’
তখন আছিলে তুমি একাকিনী অথণ্ড অকুল
আত্মহারা; প্রথম গর্ভের মহা রহস্য বিপুল
বুঝিয়া! দিবারাত্রি গৃঢ় এক স্নেহব্যাকুলতা,
গর্ভিণীর পূর্ব্বরাগ, অলক্ষিতে অপূর্ব্ব মমতা,
অজ্ঞাত আকাঙ্ক্ষারাশি, নিঃসন্তান শূন্য বক্ষোদেশে
নিরন্তর উঠিত ব্যাকুলি’। প্রতি প্রাতে ঊষা এসে
অনুমান করি’ যেত মহা-সন্তানের জন্মদিন,
নক্ষত্র রহিত চাহি’ নিশি নিশি নিমেষবিহীন
শিশুহীন শয়ন-শিয়রে। সেই আদি জননীর
জনশূন্য জীবশূন্য স্নেহচঞ্চলতা সুগভীর,
আসন্ন প্রতীক্ষাপূর্ণ সেই তব জাগ্রত বাসনা,
অগাধ প্রাণের তলে সেই তব অজানা বেদনা
অনাগত মহা ভবিষ্যৎ লাগি, হৃদয়ে আমার
যুগান্তর-স্মৃতিসম উদয় হতেছে বারম্বার।
আমারো চিত্তের মাঝে তেমনি অজ্ঞাত ব্যথাভরে,
তেমনি অচেনা প্রত্যাশায়, অলক্ষ্য সুদূর তরে
উঠিছে মর্ম্মর স্বর। মানব-হৃদয়-সিন্ধুতলে
যেন নব মহাদেশ সৃজন হতেছে পলে পলে
আপনি সে নাহি জানে। শুধু অর্দ্ধ অনুভব তারি
ব্যাকুল করেছে তারে, মনে তার দিয়েছে সঞ্চারি’
আকারপ্রকারহীন তৃপ্তিহীন এক মহা আশা
প্রমাণের অগোচর, প্রত্যক্ষের বাহিরেতে বাসা।
তর্ক তারে পরিহাসে, মর্ম্ম তারে সত্য বলি’ জানে,
সহস্র ব্যাঘাত মাঝে তবুও সে সন্দেহ না মানে,
জননী যেমন জানে জঠরের গোপন শিশুরে,
প্রাণে যবে স্নেহ জাগে, স্তনে যবে দুগ্ধ উঠে পূরে’।
প্রাণভরা ভাষাহরা দিশাহারা সেই আশা নিয়ে
চেয়ে আছি তোমা পানে; তুমি সিন্ধু প্রকাণ্ড হাসিয়ে
টানিয়া নিতেছ যেন মহাবেগে কি নাড়ীর টানে
আমার এ মর্ম্মখানি তোমার তরঙ্গমাঝখানে
কোলের শিশুর মত!
হে জলধি, বুঝিবে কি তুমি
আমার মানব ভাষা? জান কি তোমার ধরাভূমি
পীড়ায় পীড়িত আজি ফিরিতেছে এপাশ ওপাশ,
চক্ষে বহে অশ্রুধারা, ঘন ঘন বহে উষ্ণশ্বাস,
নাহি জানে কি যে চায়, নাহি জানে কিসে ঘুচে তৃষা,
আপনার মনোমাঝে আপনি সে হারায়েছে দিশা
বিকারের মরীচিকা-জালে। অতল গম্ভীর তব
অন্তর হইতে কহ সান্ত্বনার বাক্য অভিনব
আষাঢ়ের জলদমন্ত্রের মত; স্নিগ্ধ মাতৃপাণি
চিন্তাতপ্ত ভালে তার তালে তালে বারম্বার হানি’
সর্ব্বাঙ্গে সহস্রবার দিয়া তারে স্নেহময় চুমা,
বল তারে “শান্তি! শান্তি!” বল তারে, “ঘুমা, ঘুমা, ঘুমা!”
১৭ চৈত্র, ১২৯৯।
সুপ্তোত্থিতা
সুপ্তোত্থিতা।
ঘুমের দেশে ভাঙ্গিল ঘুম,
উঠিল কলস্বর।
গাছের শাখে জাগিল পাখী
কুসুমে মধুকর।
অশ্বশালে জাগিল ঘোড়া
হস্তীশালে হাতী।
মল্লশালে মল্ল জাগি’
ফুলায় পুন ছাতি।
জাগিল পথে প্রহরী দল,
দুয়ারে জাগে দ্বারী,
আকাশে চেয়ে নিরখে বেলা
জাগিয়া নর নারী।
উঠিল জাগি’ রাজাধিরাজ,
জাগিল রাণীমাতা।
কচালি’ আঁখি কুমার সাথে
জাগিল রাজভ্রাতা।
নিভৃত ঘরে ধূপের বাস,
রতন দীপ জ্বালা,
জাগিয়া উঠি’ শয্যাতলে
সুধাল রাজবালা
—কে পরালে মালা!
খসিয়া-পড়া আঁচলখানি
বক্ষে তুলি’ দিল।
আপন-পানে নেহারি’ চেয়ে
সরমে শিহরিল!
ত্রস্ত হয়ে চকিত-চোখে
চাহিল চারিদিকে;
বিজন গৃহ, রতন দীপ
জ্বলিছে অনিমিখে!
গলার মালা খুলিয়া লয়ে
ধরিয়া দুটি করে
সোনার সুতে যতনে গাঁথা
লিখনখানি পড়ে।
পড়িল নাম, পড়িল ধাম,
পড়িল লিপি তার,
কোলের পরে বিছায়ে দিয়ে
পড়িল শতবার!
শয়নশেষে রহিল বসে’
ভাবিল রাজবালা—
—আপন ঘরে ঘুমায়ে ছিনু
নিতান্ত নিরালা
কে পরালে মালা!—
নূতন-জাগা কুঞ্জবনে
কুহরি উঠে পিক,
বসন্তের চুম্বনেতে
বিবশ দশ দিক্!
বাতাস ঘরে প্রবেশ করে
ব্যাকুল উচ্ছ্বাসে,
নব কুসুম মঞ্জরীর
গন্ধ লয়ে আসে।
জাগিয়া উঠি বৈতালিক
গাহিছে জয়গান,
প্রাসাদদ্বারে ললিত স্বরে
বাঁশিতে উঠে তান।
শীতল ছায়া নদীর পথে
কলসে লয়ে বারি—
কাঁকন বাজে নুপুর বাজে—
চলিছে পুরনারী।
কাননপথে মর্ম্মরিয়া
কাঁপিছে গাছপালা,
আধেক মুদি’ নয়ন দুটি
ভাবিছে রাজবালা—
কে পরালে মালা!
বারেক মালা গলায় পরে,
বারেক লহে খুলি’,
দুইটি করে চাপিয়া ধরে
বুকের কাছে তুলি’।
শয়ন পরে মেলায়ে দিয়ে
তৃষিত চেয়ে রয়,
এমনি করে’ পাইবে যেন
অধিক পরিচয়।
জগতে আজ কত-না ধ্বনি
উঠিছে কত ছলে,
একটি আছে গোপন কথা,
সে কেহ নাহি বলে!
বাতাস শুধু কানের কাছে
বহিয়া যায় হূহু,
কোকিল শুধু অবিশ্রাম
ডাকিছে কুহু কুহু।
নিভৃত ঘরে পরান মন
একান্ত উতালা,
শয়নশেষে নীরবে বসে’
ভাবিছে রাজবালা—
কে পরালে মালা!
কেমন বীর-মুরতি তার
মাধুরী দিয়ে মিশা!
দীপ্তিভরা নয়ন মাঝে
তৃপ্তিহীন তৃষা!
স্বপ্নে তারে দেখেছে যেন
এমনি মনে লয়,—
ভুলিয়া গেছে, রয়েছে শুধু
অসীম বিস্ময়!
পারশে যেন বসিয়াছিল,
ধরিয়াছিল কর,
এখনো তার পরশে যেন
সরস কলেবর!
চমকি’ মুখ দু’হাতে ঢাকে,
শরমে টুটে মন,
লজ্জাহীন প্রদীপ কেন
নিভে নি সেই ক্ষণ!
কণ্ঠ হতে ফেলিল হার
যেন বিজুলিজ্বালা,
শয়ন পরে লুটায়ে পড়ে’
ভাবিল রাজবালা—
কে পরালে মালা!
এমনি ধীরে একটি করে
কাটিছে দিন রাতি।
বসন্ত সে বিদায় নিল
লইয়া যূথী জাতি।
সঘন মেঘে বরষা আসে,
বরষে ঝর ঝর।
কাননে ফুটে নবমালতী
কদম্ব কেশর।
স্বচ্ছ হাসি শরৎ আসে
পূর্ণিমা-মালিকা।
সকল বন আকুল করে
শুভ্র শেফালিকা।
আসিল শীত সঙ্গে লয়ে
দীর্ঘ দুখ-নিশা।
শিশির-ঝরা কুন্দ ফুলে
হাসিয়া কাঁদে দিশা।
ফাগুন মাস আবার এল
বহিয়া ফুলডালা।
জানালা পাশে একেলা বসে
ভাবিছে রাজবালা—
কে পরালে মালা!
১৫ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯।
সোনার তরী
সােনার তরী।
সােনার তরী।
গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে’ আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হ’ল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খর-পরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।
একখানি ছোট ক্ষেত আমি একেলা,
চারিদিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাত বেলা।
এ পারেতে ছোট ক্ষেত আমি একেলা।
গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে!
দেখে’ যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোন দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙ্গে দু’ধারে,
দেখে’ যেন মনে হয় চিনি উহারে!
ওগো তুমি কোথা যাও কোন্ বিদেশে!
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে!
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুসি তারে দাও
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে!
যত চাও তত লও তরণী পরে।
আর আছে?—আর নাই, দিয়েছি ভরে’।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে’
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে
এখন আমারে লহ করুণা করে’!
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই! ছােট সে তরী
আমারি সােনার ধানে গিয়েছে ভরি’।
শ্রাবণ গগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি’,
যাহা ছিল নিয়ে গেল সােনার তরী।
ফাল্গুন, ১২৯৮।
সোনার বাঁধন
সােনার বাঁধন।
বন্দী হয়ে আছ তুমি সুমধুর স্নেহে,
অয়ি গৃহলক্ষ্মি, এই করুণ-ক্রন্দন
এই দুঃখ দৈন্যে ভরা মানবের গেহে;
তাই দুটি বাহু পরে সুন্দর-বন্ধন
সােনার কঙ্কণ দুটি বহিতেছ দেহে
শুভ চিহ্ন, নিখিলের নয়ন-নন্দন।
পুরুষেব দুই বাহু কিণাঙ্ক-কঠিন
সংসার সংগ্রামে, সদা বন্ধনবিহীন;
যুদ্ধ দ্বন্দ্ব যত কিছু নিদারুণ কাজে
বহ্ণিবাণ বজ্রসম সর্বত্র স্বাধীন।
তুমি বদ্ধ মেহ প্রেম করুণার মাঝে,—
শুধু শুভকর্ম্ম, শুধু সেবা নিশি দিন।
তােমার বাহুতে তাই কে দিয়াছে টানি,
দুইটি সােনার গণ্ডী, কাঁকন দু’খানি।
১৭ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯।
হিং টিং ছট্
হিং টিং ছট্।
(স্বপ্নমঙ্গল)
স্বপ্ন দেখেছেন রাত্রে হবুচন্দ্র ভূপ,—
তার ভাবি’ ভাবি’ গবুচন্দ্র চুপ!—
শিয়রে বসিয়া যেন তিনটে বাঁদরে
উকুন বাছিতেছিল পরম আদরে;
একটু নড়িতে গেলে গালে মারে চড়
চখে মুখে লাগে তার নখের আঁচড়।
সহসা মিলাল তা’রা এল এক বেদে,
“পাখী উড়ে গেছে” বলে’ মরে কেঁদে কেঁদে;
সম্মুখে রাজারে দেখি তুলি নিল ঘাড়ে,
ঝুলায়ে বসায়ে দিল উচ্চ এক দাঁড়ে।
নীচেতে দাঁড়ায়ে এক বুড়ি থুড়্থুড়ি,
হাসিয়া পায়ের তলে দেয় সুড়সুড়ি।
রাজা বলে “কি আপদ!” কেহ নাহি ছাড়ে,
পা দু’টা তুলিতে চাহে, তুলিতে না পারে।
পাখীর মতন রাজা করে ঝট্পট্,—
বেদে কানে কানে বলে—“হিং টিং ছট!”
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভণে, শুনে পুণ্যবান্!
হবুপুর রাজ্যে আজ দিন ছয় সাত
চখে কারো নিদ্রা নাই, পেটে নাই ভাত।
শীর্ণ গালে হাত দিয়ে নত করি’ শির
রাজ্যসুদ্ধ বালবৃদ্ধ ভেবেই অস্থির।
ছেলেরা ভুলেছে খেলা, পণ্ডিতেরা পাঠ,
মেয়েরা করেছে চুপ—এতই বিভ্রাট।
সারি সারি বসে’ গেছে কথা নাই মুখে,
চিন্তা যত ভারি হয় মাথা পড়ে ঝুঁকে।
ভুঁই ফোঁড়া তত্ত্ব যেন ভূমিতলে খোঁজে,
সবে যেন বসে’ গেছে নিরাকার ভোজে।
মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ছাড়িয়া উৎকট
হঠাৎ ফুকারি উঠে—“হিং টিং ছট্।”
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভণে, শুনে পুণ্যবান্।
চারিদিক হতে এল পণ্ডিতের দল,
অযোধ্যা কানোজ কাঞ্চী মগধ কোশল,
উজ্জয়িনী হতে এল বুধ-অবতংস—
কালিদাস কবীন্দ্রের ভাগিনেয়বংশ।
মোটা মোটা পুঁথি লয়ে উলটায় পাতা,
ঘন ঘন নাড়ে বসি’ টিকিসুদ্ধ মাথা!
বড় বড় মস্তকের পাকা শস্যক্ষেত
বাতাসে দুলিছে যেন শীর্ষ-সমেত!
কেহ শ্রুতি, কেহ স্মৃতি, কেহ বা পুরাণ,
কেহ ব্যাকরণ দেখে, কেহ অভিধান;
কোনখানে নাহি পায় অর্থ কোনরূপ,
বেড়ে ওঠে অনুস্বর বিসর্গের স্তূপ!
চুপ করে’ বসে’ থাকে বিষম সঙ্কট,
থেকে থেকে হেঁকে ওঠে –“হিং টিং ছট্।”
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভণে, শুনে পুণ্যবান্।
কহিলেন হতাশ্বাস হবুচন্দ্র রাজ—
ম্লেচ্ছদেশে আছে নাকি পণ্ডিতসমাজ।
তাহাদের ডেকে আন যে যেখানে আছে—
অর্থ যদি ধরা পড়ে তাহাদের কাছে।—
কটাচুল নীলচক্ষু কপিশ কপোল,
যবন পণ্ডিত আসে, বাজে ঢাক ঢোল।
গায়ে কালো মোটা মোটা ছাঁটাছোঁটা কুর্ত্তি,
গ্রীষ্মতাপে উষ্মা বাড়ে, ভারি উগ্রমূর্ত্তি!
ভূমিকা না করি’ কিছু ঘড়ি খুলি’ কয়—
“সতেরো মিনিট মাত্র রয়েছে সময়,
কথা যদি থাকে কিছু বল চট্পট্!”
সভাসুদ্ধ বলি’ উঠে “হিং টিং ছট্!”
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভযে, শুনে পুণ্যবান্!
স্বপ্ন শুনি ম্লেচ্ছমুখ রাঙা টক্টকে,
আগুন ছুটিতে চায় মুখে আর চখে!
হানিয়া দক্ষিণ মুষ্টি বাম করতলে
“ডেকে এনে পরিহাস” রেগেমেগে বলে!—
ফরাসী পণ্ডিত ছিল, হাস্যোজ্জ্বলমুখে
কহিল নোয়ায়ে মাথা, হস্ত রাখি বুকে—
“স্বপ্ন যাহা শুনিলাম রাজযোগ্য বটে;
হেন স্বপ্ন সকলের অদৃষ্টে না ঘটে!
কিন্তু তবু স্বপ্ন ওটা করি অনুমান
যদিও রাজার শিরে পেয়েছিল স্থান!
অর্থ চাই রাজকোষে আছে ভূরি ভূরি,
রাজস্বপ্নে অর্থ নাই, যত মাথা খুঁড়ি!
নাই অর্থ কিন্তু তবু কহি অকপট
শুনিতে কি মিষ্ট আহা—হিং টিং ছট্!”
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভণে, শুনে পুণ্যবান্!
শুনিয়া সভাস্থ সবে করে ধিক্ ধিক্—
কোথাকার গণ্ডমূর্খ পাষণ্ড নাস্তিক!
স্বপ্ন শুধু স্বপ্নমাত্র মস্তিষ্ক-বিকার,
এ কথা কেমন করে’ করিব স্বীকার!
জগৎ-বিখ্যাত মোরা “ধর্ম্মপ্রাণ” জাতি।
স্বপ্ন উড়াইয়া দিবে!—দুপুরে ডাকাতি!
হবুচন্দ্র রাজা কহে পাকালিয়া চোখ—
“গবুচন্দ্র, এদের উচিত শিক্ষা হোক!
হেঁটোয় কণ্টক দাও, উপরে কণ্টক,
ডালকুত্তাদের মাঝে করহ বণ্টক!”
সতেরো মিনিট কাল না হইতে শেষ,
ম্লেচ্ছ পণ্ডিতের আর না মিলে উদ্দেশ।
সভাস্থ সবাই ভাসে আনন্দাশ্রুনীরে,
ধর্ম্মরাজ্যে পুনর্ব্বার শান্তি এল ফিরে।
পণ্ডিতেরা মুখ চক্ষু করিয়া বিকট
পুনর্ব্বার উচ্চারিল “হিং টিং ছট্!”
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভণে, শুনে পুণ্যবান্!
অতঃপর গৌড় হতে এল হেন বেলা
যবন পণ্ডিতদের গুরুমারা চেলা।
নগ্নশির, সজ্জা নাই, লজ্জা নাই ধড়ে—
কাছা কোঁচা শতবার খসে’ খসে’ পড়ে।
অস্তিত্ব আছে আছে, ক্ষীণ খর্ব্বদেহ,
বাক্য যবে বাহিরায় না থাকে সন্দেহ!
এতটুকু যন্ত্র হতে এত শব্দ হয়
দেখিয়া বিশ্বের লাগে বিষম বিস্ময়।
না জানে অভিবাদন, না পুছে কুশল,
পিতৃনাম শুধাইলে উদ্যত মুষল।
সগর্ব্বে জিজ্ঞাসা করে “কি লয়ে বিচার!
শুনিলে বলিতে পারি কথা দুই চার;
ব্যাখ্যায় করিতে পারি উলট্পালট্!”
সমস্বরে কহে সবে—“হিং টিং ছট্!”
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভণে, শুনে পুণ্যবান্!
স্বপ্নকথা শুনি মুখ গম্ভীর করিয়া
কহিল গৌড়ীয় সাধু প্রহর ধরিয়া,
“নিতান্ত সরল অর্থ, অতি পরিষ্কার,
বহু পুরাতন ভাব, নব আবিষ্কার।
ত্র্যম্বকের ত্রিনয়ন ত্রিকাল ত্রিগুণ
শক্তিভেদে ব্যক্তিভেদ দ্বিগুণ বিগুণ।
বিবর্ত্তন আবর্ত্তন সম্বর্ত্তন আদি
জীবশক্তি শিবশক্তি করে বিসম্বাদী।
আকর্ষণ বিকর্ষণ পুরুষ প্রকৃতি
আণব চৌম্বক বলে আকৃতি বিকৃতি।
কুশাগ্রে প্রবহমান জীবাত্ম বিদ্যুৎ
ধারণা পরমা শক্তি সেথায় উদ্ভূত।
ত্রয়ী শক্তি ত্রিস্বরূপে প্রপঞ্চে প্রকট—
সংক্ষেপে বলিতে গেলে “হিং টিং ছট্!”
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভণে, শুনে পুণ্যবান্!
সাধু সাধু সাধু রবে কাঁপে চারিধার,
সবে বলে—পরিষ্কার—অতি পরিষ্কার!
দুর্ব্বোধ যা কিছু ছিল হয়ে গেল জল,
শূন্য আকাশের মত অত্যন্ত নির্ম্মল!
হাঁপ ছাড়ি উঠিলেন হবুচন্দ্র রাজ,
আপনার মাথা হতে খুলি লয়ে তাজ
পরাইয়া দিল ক্ষীণ বাঙ্গালীর শিরে,
ভারে তার মাথাটুকু পড়ে বুঝি ছিঁড়ে’!
বহুদিন পরে আজ চিন্তা গেল ছুটে,
হাবুডুবু হবু রাজ্য নড়ি চড়ি উঠে।
ছেলেরা ধরিল খেলা, বৃদ্ধেরা তামুক,
এক দণ্ডে খুলে গেল রমণীর মুখ।
দেশযোড়া মাথাধরা ছেড়ে গেল চট্,
সবাই বুঝিয়া গেল—হিং টিং ছট্!
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভণে, শুনে পুণ্যবান্!
যে শুনিবে এই সপ্নমঙ্গলের কথা,
সর্ব্বভ্রম ঘুচে যাবে নহিবে অন্যথা।
বিশ্বে কভু বিশ্ব ভেবে হবে না ঠকিতে,
সত্যেরে সে মিথ্যা বলি’ বুঝিবে চকিতে।
যা আছে তা নাই, আর, নাই যাহা আছে,
এ কথা জাজ্জ্বল্যমান হয়ে তার কাছে।
সবাই সরলভাবে দেখিবে যা কিছু,
সে আপন লেজুড় জুড়িবে তার পিছু।
এস ভাই, তোল হাই, শুয়ে পড় চিত,
অনিশ্চিত এ সংসারে এ কথা নিশ্চিত—
জগতে সকলি মিথ্যা সব মায়াময়
স্বপ্ন শুধু সত্য আর সত্য কিছু নয়।
স্বপ্নমঙ্গলের কথা অমৃত সমান,
গৌড়ানন্দ কবি ভণে, শুনে পুণ্যবান্।
১৮ জ্যৈষ্ঠ, ১২৯৯
হৃদয়-যমুনা
হৃদয়-যমুনা।
যদি ভরিয়া লইবে কুম্ভ, এস ওগো এস, মোর
হৃদয়-নীরে!
তলতল ছলছল
কাঁদিবে গভীর জল
ওই দুটি সুকোমল
চরণ ঘিরে।
আজি বর্ষা গাঢ়তম;
নিবিড় কুন্তল সম
মেঘ নামিয়াছে মম
দুইটি তীরে।
ওই যে শবদ চিনি,
নুপুর রিনিকিঝিনি,
কে গো তুমি একাকিনী
আসিছ ধীরে!
যদি ভরিয়া লইবে কুন্ত, এস ওগো এস, মোর
হৃদয়-নীরে!
যদি কলস ভাসায়ে জলে বসিয়া থাকিতে চাও
আপনা ভুলে;
হেথা শ্যাম দূর্ব্বাদল,
নবনীল নভস্তল,
বিকশিত বনস্থল
বিকচ ফুলে।
দুটি কালো আঁখি দিয়া
মন যাবে বাহিরিয়া,
অঞ্চল খসিয়া গিয়া
পড়িবে খুলে,
চাহিয়া বঞ্জুল বনে
কি জানি পড়িবে মনে,
বসি কুঞ্জে তৃণাসনে
শ্যামল কূলে।
যদি কলস ভাসায়ে জলে বসিয়া থাকিতে চাও
আপনা ভুলে!
যদি গাহন করিতে চাহ, এস নেমে এস, হেথা
গহন-তলে!
নীলাম্বরে কিবা কাজ,
তীরে ফেলে এস আজ,
ঢেকে দিবে সব লাজ
সুনীল জলে।
সোহাগ-তরঙ্গরাশি
অঙ্গখানি দিবে গ্রাসি’,
উচ্ছ্বসি পড়িবে আসি’
ঊরসে গলে।
ঘুরে ফিরে চারিপাশে
কভু কাঁদে কভু হাসে,
কুলুকুলু কলভাষে
কত কি ছলে!
যদি গাহন করিতে চাহ, এস নেমে এস হেথা
গহন-তলে!
যদি মরণ লভিতে চাও, এস তবে ঝাঁপ দাও
সলিল মাঝে!
স্নিগ্ধ, শান্ত, সুগভীর,
নাহি তল, নাহি তীর,
মৃত্যুসম নীল নীর
স্থির বিরাজে!
নাহি রাত্রি, দিনমান,
আদি অন্ত পরিমাণ,
সে অতলে গীত গান
কিছু না বাজে।
যাও সব যাও ভুলে,
নিখিল বন্ধন খুলে
ফেলে দিয়ে এস কূলে
সকল কাজে!
যদি মরণ লভিতে চাও, এস তবে ঝাঁপ দাও
সলিল মাঝে!
১২ আষাঢ়, ১৩০০।