PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৯১০

বাণী (১৯১০)

রজনীকান্ত সেন

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১০

প্রকাশনা-তথ্য

বাণী।

৺রজনীকান্ত সেন।

তৃতীয় সংস্করণ।

কলিকাতা,

২০১, কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট গুরুদাস লাইব্রেরী বা বেঙ্গল মেডিকেল

লাইব্রেরী হইতে শ্রী গুরুদাস চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক প্রকাশিত;

২ নং গোয়াবাগান ষ্ট্রীট্, “ভিক্টোরিয়া প্রেসে”

শ্রীপঞ্চানন বসাক দ্বারা মুদ্রিত।

১৯১০।

মূল্য৷৷৹ আনা।

প্রথম সংস্করণের ভূমিকা।

কাহারও বাণী গদ্যে, কাহারও পদ্যে, কাহারও বা সংগীতে অভিব্যক্ত। রজনীকান্তের কান্ত পদাবলী কেবল সংগীত। এই কথা বলিবার জন্যই এই সংক্ষিপ্ত নীরস গদ্যের অবতারণা।

শ্রীঅক্ষয়কুমার মৈত্রেয়।

নিবেদন।

‘বাণীর’ প্রথম সংস্করণ নিঃশেষিত হইয়াছে; এজন্য সাধারণের নিকট আমি চিরকৃতজ্ঞ।

এই সংস্করণে কয়েকটি নূতন সঙ্গীত সন্নিবিষ্ট করিলাম, কিন্তু পুস্তকের মূল্য বৃদ্ধি করি নাই।

এবার রাগিণী ও তাল সংযোগ করিয়া দিলাম, ভরসা করি সঙ্গীতপ্রিয় ব্যক্তিগণের স্বরযোগের সুবিধা হইবে।

আবশ্যকবোধে কয়েকটি সঙ্গীতের স্থানে স্থানে সংশোধন করা হইয়াছে।

রাজসাহী

১৩১২ সাল, মাঘ।

গ্রন্থকার।

অসময়ে

অসময়ে।

নয়নের বারি নয়নে রেখেছি,

হৃদয়ে রেখেছি জ্বালা।

শুকায়ে গিয়েছে প্রাণের হরষ,

শুকায়ে গিয়েছে মালা।

দেখা দিবে ব’লে কেন দিলে আশা,

আশা-পথ পানে চেয়ে রই;

(আমার) ভেঙ্গে গেছে বুক, ভেঙ্গেছে পরাণ,

সময় থাকিতে আসিলে কই!

এলে যদি, সখা, ব’স ভাঙ্গা-বুকে,

ভাঙ্গা হৃদয়ের যাতনা লও;

মুখ পানে চেয়ে, দুখ ভুলাইয়ে,

ভাল ক’রে আজ কথাটি কও।

মিশ্র ঝিঁঝিট—একতালা।

আমরা

আমরা।

আমরা, নেহাৎ গরীব, আমরা নেহাৎ ছোট;

তবু, আজি সাত কোটি ভাই, জে’গে ওঠ!

জু’ড়ে দে ঘরের তাঁত, সাজা’ দোকান;

বিদেশে না যায় ভাই, গোলারি ধান;

আমরা, মোটা খাব, ভাইরে প’র‍্ব মোটা,

মা’খব না ল্যাভেণ্ডার, চাইনে ‘অটো’।

নিয়ে যায় মায়ের দুধ পরে দু’য়ে,

আমরা, র’ব কি উপোসী ঘরে শুয়ে?

হারাস্‌নে ভাইরে আার এমন সুদিন;

মায়ের পায়ের কাছে এসে যোটো।

ঘরের দিয়ে, আমরা পরের মেঙ্গে,

কিন‍্বো না ঠুন্‌কো কাচ, যায় যে ভেঙ্গে;

থাক‍্লে, গরীব হয়ে, ভাইরে, গরীব চালে,

তাতে হবে নাকো মান খাটো।

মিশ্র বারোয়াঁ— কাওয়ালী।

আয়ুভিক্ষা

আয়ুভিক্ষা।

আজি, শিথিল সব ইন্দ্রিয়, চরণ-কর নিষ্ক্রিয়,

তিমিরময় প্রাণপ্রিয় গেহ;

কে, শান্তি-সুখ দূর করি’, বজ্র করে কেশ ধরি’,

বেগভরে শূন্যে তোলে দেহ!

হে, পুঞ্জ-অলি-গুঞ্জরণ-মঞ্জুল-নিকুঞ্জ-বন!

সজ্জিত-বিলাস-গৃহ রম্য!

দাস-গণ-জুষ্ট, পরিপূরিত সুগীত-রবে,

দীনঞ্জন-চির-অনধিগম্য।

হে হেমমুকুট! মণি-রঞ্জিত সুমঞ্চ শত!

দীপ্ত মতি-হীরক-প্রবালে;

চন্দন-প্রলিপ্ত-মৃগনাভি! হে কস্তুরী!

সুরভিত সুগন্ধি-ফুল-মালে।

কমল-কুল-মণ্ডিত, মধুপ-কল-গুঞ্জিত,

নির্ম্মল, প্রশান্ত, শতবাপি!

বন-ভবন-চারি-শুকসারী-পিক-পাপিয়া!

পুচ্ছধর সুন্দর কলাপি!

হে রাজছত্র! হে রাজপদ- গৌরব!

হে হর্ম্ম্য! রত্ন-গজ-রাজি!

(আজি) বিপলমিত আয়ু কর দান, চিরসেবিত

বন্ধু মম, হে বিভব-রাজি!

স্মরগরলখণ্ডনং-সুর।

আর চাহিব না

আর চাহিব না।

(আমি) দেখেছি জীবন ভ’রে চাহিয়া কত;

(তুমি) আমারে যা’ দাও, সবই তোমারি মত।

আকুল হইয়ে মিছে, চেয়ে মরি কত কি যে,

(কাঁদে) পদতলে নিম্ফল বাসনা শত।

কিসে মোর ভাল হয়, তুমি জান, দয়াময়,

(তবু) নির্ভর জানে না, এ অবিনত।

আমি কেন চেয়ে মরি, তুমি জান কিসে, হরি,

সফল হইবে মম জীবন-ব্রত।

চাহিব না কিছু আর, দিব শ্রীচরণে ভার,

হে দয়াল, সদা মম কুশল-রত।

হাম্বীর—কাওয়ালী।

আশা

আশা।

ধ’রে তোল, কোথা আছ কে আমার!

একি বিভীষিকাময় অন্ধকার!

কি এক রাক্ষসী মায়া, নয়নমোহন রূপে,

ভুলায়ে আনিয়া মোরে ফে’লে গেল মহাকূপে!

শ্রমে অবসন্ন কায়, কণ্টক বিঁধিছে তায়,

বৃশ্চিক দংশিছে, অনিবার।

পিপাসায় শুষ্ক কণ্ঠ, শরীর কর্দ্দমলীন,

আর যে উঠিতে নারি, হইয়াছি বলহীন;

এ বিপন্ন, পথভ্রান্ত, অন্ধ, দীন, নিরুপায়,

দেখিয়া, কাহারো দয়া হ’লনারে হায় হায়:

হীন-স্বার্থময় ধরা, সুধু নিঠুরতা-ভরা;

সুধু প্রবঞ্চনা, অবিচার।

আজ সুধু মনে হয়,শুনিয়াছি লোকমুখে,

আছে মাত্র একজন, চিরবন্ধু দুখে সুখে;

বিপন্নের ত্রাণকর্ত্তা, নিরাশ প্রাণের আশা,

পাপপথে পরিশ্রান্ত ভ্রান্ত পথিকের বাসা;

কাঁদিলে সে কোলে করে, মুছে অশ্রু নিজ করে,

(আজি) সেই যদি করে গো উদ্ধার!

মিশ্র ইমন—কাওয়ালী।

আশ্রয়

আশ্রয়।

কার কোলে ধরা লভে পরিণতি?

(সেই) অপার কারণসিন্ধু।

কার জ্যোতিঃ-কণা ব্রহ্মাণ্ড উজলে?

(সেই) চিরনির্ম্মল ইন্দু।

কার পানে ছোটে রবি-শশি-তারা?

নাহি পথ ভ্রান্তি, স্থির আঁখিতারা?

ভ্রমে মেঘ বায়ু হ’য়ে আত্মহারা?

(সে) সচ্চিদানন্দবিন্দু।

কার নাম স্মরি’ দুখে পাই শান্তি?

বিপদে পাই অভয়, মোহে যায় ভ্রান্তি?

কার মুখকান্তি, হরে ভব-শ্রান্তি?

(সেই) নিখিল-পরমবন্ধু।

গৌরী—একতালা।

আশ্রয়-ভিক্ষা

আশ্রয়-ভিক্ষা

নাথ, ধর হাত, চল সাথ, চিরসাথি হে!

ভ্রান্তচিত শ্রান্তপদ, ঘিরিল দুখরাতি হে!

শ্রমজ-জল-বিন্দু ঝরে, ব্যথিত এ ললাটে হে

ছিন্ন-রুধিরাক্ত পদ, কণ্টকিত বাটে হে!

ক্ষীণ হ’ল দৃষ্টি, অতিতীব্র তনুবেদনা;

ক্ষণে তোমারে পড়িছে মনে, ক্ষণে রহিত চেতনা!

ভগ্নহৃদে, কম্প্রবুকে পড়িয়া পথপাশে গো;

দূর হ’তে তীব্র পরিহাসে কেও হাসে গো!

ক্ষেমময়! প্রেমময়! তার নিরুপায়ে হে;

মরণদুখহরণ! চিরশরণ দেহ পায়ে হে।

কীর্ত্তনের সুর—ঝাঁপতাল।

উদ্বোধন

উদ্বোধন।

ভারতকাব্যনিকুঞ্জে,—

জাগ সুমঙ্গলময়ি মা!

মুঞ্জরি’ তরু, পিক গাহি’,

করুক প্রচারিত মহিমা।

তুলে’ লহ নীরব বীণা, গীত-হীনা;

অতি দীনা—

হের, ভারত চির-দুখ-শয়ন-বিলীনা;

নীতি-ধর্ম্ম-ময় দীপক মন্দ্রে,

জীবিত কর সঞ্জীবনমন্ত্রে,

জাগিবে রাতুল-চরণ-তলে,—

যত, লুপ্ত পুরাতন গরিমা।

ভৈরবী—কাওয়ালি।

উষা-বিকাশ

উষা-বিকাশ।

তব, শাস্তি-অরুণ-শান্ত-করুণ-

-কনক-কিরণ-পরশে,

জাগে প্রভাত হৃদি-মন্দিরে,

চরণে নমিয়া হরষে।

আরতি উঠে বাজিয়া ধীরে,

সৌরভ ছুটে মৃদু সমীরে,

প্রেম-কমল হাসে, ভাসে

শান্ত-মরম-সরসে।

সংশয়, দ্বিধা, তর্ক, দ্বন্দ্ব,

দূরে যায়, বিমলানন্দ

পানে, জ্ঞান-নয়ন, সফল,

প্রীতি-অশ্রু বরষে

বারোয়াঁ-একতালা।

একে পর্য্যবসান

একে পর্য্যবসান।

সে, এক বটে, তার শক্তি বহু, একাধারে;

তার, বিচিত্রতা কি বিপুল, ভে’বে দেখ‍্নারে!

জগতে কত কোটি লোক দেখ;―

আন্ বেছে তুই দুটো মানুষ,

সব রকমে এক;

লক্ষ প্রভেদ দেহ-মনে,

কার জানা আছে, কে রেখেছে গণে,

কোন্ দরশনে?

গোটা দুই ভেদ বুঝে তুই গর্ব্বে অধীর,

বৈজ্ঞানিক-বীর, একেবারে!

হাতে নে’ দুটো গোলাপ ফুল,

পাপড়ি, রঙ্গে, ওজন, ঢঙ্গে,

নয়কো সমতুল;

তু’লে আন দুটো বেল-পাতা,―

এক প্রণালীতে ঠিক দু’টো গাঁথা,

গোড়া থেকে মাথা;

তবু ঐ, ক্ষেত্রে, শিরায়, ভেদ কত তায়,

মিল‌বে না তার চারিধারে।

চেয়ে দেখ্, তড়িৎ, আলো, তাপ,

গ্রহের গতি, আকর্ষণ, আর

জড়ের আবির্ভাব;

ঐ, শক্তি নদীর ঢেউ গুলি,

ক’চ্ছে যেন গো সদা কোলাকুলি,

উঠ‍্ছে মাথা তুলি’;―

ওরা ঐ, এক হ’তে আসে, ভিন্ন বিকাশে,

মেশে গিয়ে এক পারাবারে!

মিশ্র খাম্বাজ—খেম্‌টা।

এস

এস।

বিবেকবিমলজ্যোতিঃ

জ্বেলেছিলে তুমি হৃদয়-কুটীরে;

তোমারি আলোকে তোমারে দেখেছি।

তোমারি চরণ ধ’রেছি শিরে।

যৌবনে, হরি, ছাইল ভীষণ

অবিশ্বাস-ঘনমেঘে;

বহিল প্রবল পাপ-পবন;

ডুবাইল ঘোর অন্ধ-তিমিরে।

আরো একবার এস, প্রভু এস,

দীপ্ত মিহির-রূপে;

পাপ-যামিনী পোহাইবে, উষা

উদিবে পুণ্য-কিরণে, ধীরে।

টৌরী ভৈরবী——একতালা।

করুণাময়

করুণাময়।

(আমি) অকৃতী অধম বলে’ও তো, কিছু

কম ক’রে মোরে দাওনি!

যা’ দিয়েছ তারি অযোগ্য ভাবিয়া,

কেড়েও তো কিছু নাওনি!

(তব) আশীষ কুসুম ধরি নাই শিরে,

পায়ে দ’লে গেছি, চাহি নাই ফিরে;

তবু দয়া ক’রে কেবলি দিয়েছ,

প্রতিদান কিছু চাওনি।

(আমি) ছুটিয়া বেড়াই জানিনা কি আশে,

সুধা পান ক’রে, মরি গো পিয়াসে;

তবু, যাহা চাই সকলি পেয়েছি;

তুমি তো কিছুই পাওনি।

(আমায়) রাখিতে চাও গো, বাঁধনে আঁটিয়া,

শত-বার যাই বাঁধন কাটিয়া,

ভাবি, ছেড়ে গেছ,—ফিরে চেয়ে দেখি,

এক পাও ছেড়ে যাওনি।

বেহাগ—একতালা।

কল্লোল-গীতি

কল্লোল-গীতি।

কুলু কুলু কুলু নদী ব’য়ে যায় রে ভাই!

তীরে ব’সে ভাব‍্ছ বুঝি কি বলে ছাই?

তা’নয়, তোরা ভাল ক’রে শুন্‌বি যদি, কাছে আয়,

ভারি একটা মজার গান নে’চে নে’চে গেয়ে যায়,

সবারি কি আছে কাণ? কেমন ক’রে শু’ন‍্বে গান?

যেমন নাচে, তেমনি গায় সে,―

কোথায় লাগে নাটক, যাত্রা, খেম‍্টা, বাই?

নদী বলে “আমি মস্ত গিরি-রাজার মেয়ে গো,

বাবা তো নামান না মাথা, কারো কাছে যেয়ে গো,

নিশি-দিন ঊর্দ্ধে চান, মেঘে তাঁরে করায় স্নান,

যোগি-ঋষিদের দেন স্থান,―

নিজে মহাযোগী, বাহ্যজ্ঞান তো নাই।

‘তরঙ্গিণী’ নামটি বাবা আদর ক’রে দিয়েছে,

একাগ্রত!, একনিষ্ঠা, যতনে শিখিয়েছে,

বাবার কাছে সাগরের, রূপগুণ শুনেছি ঢের

তাইতে স্বরস্বরা হ’তে―

সে প্রশান্ত সাগর পানে ছুটে’ যাই

কূলে তোরা সংসার পে’তে, মায়ায় ভু’লে রয়েছিস্,

কত ফল, আর ফুলের বাগান, দালান কোঠা করেছিস্,

আমি গিয়ে লাগাই গোল, পেতে দি’ এই নিঠুর কোল,

একটি মাত্র কূল রাখি, আর—

কাঁদিয়ে তোদের, আর এক কূলের মাথা খাই।

আমার সঙ্গে পার‍্বি তোরা? আমায় ধরে’ রাখ‍্বি কেউ?

কি টানে টে’নেছে আমায়, উঠ‍্ছে বুকে প্রেমের ঢেউ,

(আমার) প্রাণের গানে সুধা ঢে’লে

প্রাণের ময়লা নীচে ফে’লে,

বাধা ভে’ঙ্গে চূ’রে ঠে’লে,—

কেমন ক’রে যাচ্ছি চ’লে দেখ্‌ না তাই!”

বাউলের স্বর—কাহারোয়া।

কিছু হ’লো না!

কিছু হ’লো না!

আমি পার হ’তে চাই, ওরা আমায় দেয়না পারের কড়ি;

আমি বলি লিখব, ওরা দেয়না হাতে খড়ি;

কিছু হ’ল না।

ওরা খায় ক্ষীরনবনী, আমি বল্‌কা দুধ,

আমি করি তেজারতি, ওরা খায় সুদ;

কিছু হ’ল না।

আমার গাছে ফল ধরে, ওরা সবি খায় পেড়ে,

আমি একটি হাতে ক’ল্লেই, এসে নিয়ে যায় কেড়ে

কিছু হ’ল না।

আতি আনি বাজার ক’রে, ওরা খায় রেঁধে,

ওরা করে রং তামাসা, আমি মরি কেঁদে;

কিছু হ’ল না।

আমি নৌকা বাঁধি, ওরা বাহার দিয়ে চড়ে,

আমি করি কড়ার হিসাব, ওরা ধরে গড়ে,

কিছু হ’ল না।

হরি ভ’জ্‌ব ব’লে নয়ন মুদি, ওরা সবাই হাসে,

আমি চাই নিরালা, ওরা কাছে ব’সে কাসে;

কিছু হ’ল না।

আমি যদি প্রদীপ জ্বালি, ওরা মারে ফুঁ,

আমার যা’তে ‘না, না’, ওদের তা’তে ‘হুঁ’

কিছু হ’ল না।

আমি আনি মাছ মাংস, ওরা মারে ছোঁ,

আমি বলি বুঝে দেখ, ওরা ধরে গোঁ;

কিছু হ’ল না।

আমি করি ফুলের বাগান, ওরা তোলে ফুল,

আমি কিনি পাকা সোণা, ওরা পরে দুল;

কিছু হ’ল না।

আমি বলি ‘সময় গেল,’ ওরা বলে ‘আছে’,

(আমি) কাপড় কিনে দেই, ওরা ন্যাংটো হ’য়ে নাচে,

কিছু হ’ল না।

আমি বলি ‘বাপু সোণা’, ওরা মারে চড়,

আমি চাই ঝিরঝিরে বাতাস, ওরা বহায় ঝড়!

কিছু হ’ল না।

আমার যাত্রার সময়, ওরা ধোবা নাপিত ডাকে,

(আমি) কাণা কড়ি দাম বলি, ওরা লক্ষ টাকা হাঁকে;

কিছু হ’ল না।

তোমরা দশঠাকুরে মিলে, আমার কর একটা সালিশ,

কোন্ হুজুরের জুরিস্ডিক্‌সন্, কোথায় ক’রব্ নালিশ;

কিছু বুঝিনে।

‘কম্পেনসেসন’, ‘চীটিং’, কিম্বা, হবে স্বত্বের মাম‍্লা;

কোন্ আইনে কি বলে, ভাই, বড় বড় সাম্‌লা!

আমায় ব’লে দাও।

কত বারো বৎসর গেল, হ’ল বুঝি তমাদি,

কান্ত বলে বিচার হবে, হ’লে পরে সমাধি;

কিছু ভেব না।

মিশ্র বিভাস—কাওয়ালি।

খেলা-ভঙ্গ

খেলা-ভঙ্গ।

কোলের ছেলে, ধূলো ঝে’ড়ে, তু’লে নে কোলে,

ফেলিস নে মা, ধূলো-কাদা মেখেছি ব’লে।

সারা দিনটে ক’রে খেলা, ফিরেছি মা সাঁঝের বেলা,

(আমার) খেলার সাথী, যে যার মত, গিয়েছে চ’লে।

কত আঘাত লেগেছে গায়, কত কাঁটা ফুটেছে পায়,

(ত) প’ড়ে গেছি, গেছে সবাই, চরণে দ’লে।

কেউ তো আর চাইলেনা ফিরে, নিশার আঁধার

এল ঘিরে,

(তখন) মনে হ’ল মায়ের কথা, নয়নের জলে!

ভৈরবী—ঝাঁপতাল।

চির মিলন

চির মিলন।

আর কি আমারে দিতে পারে সে মনোবেদনা?

সখিরে, ভালবাসিতে, আসিতে, আর সেধনা।

নিশীথে মাধবীরনে, দেখা হ’ল সখা-সনে,

(অমনি) প্রাণে সে রহিয়া গেল, বিরহ আর হ’ল না।

দিও না তাহারে বাধা, ‘এস’ ব’লে কেন সাধা?

(আমার) চির-মিলনের দেশে, নাহি বিরহ-যাতনা;

আঁখি মুদি হিয়া-মাঝে, সে মধু-মাধুরী রাজে,

মানসে চরণ পূজি, পরশে নাহি বাসনা।

বেহাগ-কাওয়ালী।

ছিন্ন মুকুল

ছিন্ন মুকুল।

ফুটিতে পারিত গো, ফুটিল না সে।

মরমে ম’রে গেল, মুকুলে ঝ’রে গেল,

প্রাণ-ভরা-আশা-সমাধি-পাশে।

নীরসতা-ভরা, এ নিরদয় ধরা,

শুকা’য়ে দিল কলি, উষ্ণ শ্বাসে;

দু’দিন এসেছিল, দু’দিন হেসেছিল,

দু’দিন ভেসেছিল, সুখ-বিলাসে।

না হ’তে পাতা দু’টি, নীরবে গেল টুটি’,

বাসনা-ময় প্রাণ, সুধু পিয়াসে;

সুখ-স্বপন সম, তপ্ত বুকে মম,

বেদনা-বিজড়িত স্মৃতিটি ভাসে।

লাউনি—কাওয়ালি

জন্মভূমি

আলাপে।

জন্মভূমি।

জয় জয় জনমভূমি, জননি!

যাঁর, স্তন্যসুধাময় শোণিত ধমনী;

কীর্ত্তি-গীতিজিত, স্তম্ভিত, অবনত,

মুগ্ধ, লুব্ধ, এই সুবিপুল ধরণী!

উজ্জ্বল-কাঞ্চন-হীরক-মুক্তা—

-মণিময় হার-বিভূষণ-যুক্তা;

শ্যামল শস্য-পুষ্প-ফল-পূরিত,

সকল দেশ-জয়-মুকুটমণি!

সর্বব-শৈল-জিত, হিমগিরি শৃঙ্গে,

মধুর-গীতি-চির-মুখরিত ভৃঙ্গে,

সাহস-বিক্রম-বীর্য্য বিমণ্ডিত,

সঞ্চিত পরিণত-জ্ঞান-খনি।

জননী-তুল্য তব কে মর-জগতে?

কোটি কণ্ঠে কহ, “জয় মা! বরদে!”

দীর্ণ বক্ষ হ’তে, তপ্ত রক্ত তুলি’

দেহ পদে, তবে ধন্য গণি!

মিশ্র পরোজ- কাওয়ালী

জয় দেব!

জয় দেব!

জয় নিখিল-সৃজনলয়কারী, নিরাময়!

জয় এক জয় অনেক, অসীম-মহিমময়!

জয় সূক্ষ্ম, স্থূল, জয় অন্ত, মূল,

জয় ন্যায়নিয়মি, কৃত-কলুষ-কৃপাময়!

জয় হে ভয়ঙ্কর! জয় পরমসুন্দর!

জয় ভক্ত-হৃদয়-পরিপ্লাবি-সুষমাময়!

জয় হৃদয়রঞ্জন! জয় বিপদভঞ্জন!

জয় পাপহরণ! চিরশরণ! করুণাময়!

নট বেহাগ—ঝাঁপতাল।

জাতীয় উন্নতি

জাতীয় উন্নতি।

হয় নি’কি ধারণা, বুঝিতে পারনা,

ক্রমে উঠে দেশ উচ্চে!

যেহেতু, যে গুলো রুচিত না আগে,

এখন সে গুলো রুচ‍্ছে।

কেননা, আমাদের বেড়ে মাথা সাফ্,

‘গ্যানো’ খুলে পড়‍্ছি ‘বিদ্যুৎ’ ‘আলো’ ‘তাপ’,

মাপ‍্ছি স্কোয়ার ফুটে বায়ুরাশির চাপ,

(আর) মনের অন্ধকার ঘুচছে।

যেহেতু, বুঝেছি বিস্কুট কেমন মধুর,

কুক্কুট-অস্থি কেমন স্বাদু;

(আর) ক্রমে মদিরায় যার মতি যায়,

কেমনে সে হয় সাধু;

(আর) যে হেতু আমাদের মনে মুখে দুই,

(যাকে) বল‍্তে হবে ‘আপনি’ তাকে বলি ‘তুই’

চাক‍রি দেবে ব’ল্লে চরণ-তলে শুই,

আর ঘৃণা করি গরিব তুচ্ছে।

যেহেতু আমরা ‘হ্যাটে’ ঢাকি টিকি,

সদা জামা রাখি শরীরে;

(আর) ‘শ্যাণ্ট‍্পো’ বলি ‘শান্তিপুর’কে

‘হ্যারি’ ব’লে ডাকি ‘হরি’রে;

যেহেতু আমরা ছেড়েছি একান্ত,

কীট-দষ্ট বাতুলতা বেদ-বেদান্ত,

(মোদের) অস্থিমজ্জাগত সাহেবী, দৃষ্টান্ত

দেখনা অমুক বাড়ুয্যে।

(কারণ) ধর্ম্ম-হীনতাটা ধর্ম্ম আমাদের,

কোনও ধর্ম্মে নাই আস্থা,

কি হবে ও ছাই-ভস্ম গুলো ভেবে?

মস্তিষ্কটা নয় সস্তা;

অণুবীক্ষণ আর দূরবীক্ষণ ধ’রে,

বাইরের আঁখি দুটো ফুটোচ্ছি বেশ ক’রে,

মনশ্চক্ষু অন্ধ, তার খবর কে করে?

সে বেচারী আঁধারে ঘুর‍্ছে।

(আর) যেহেতু আমরা নেশা করি,

কিন্তু, প্রাইভেট্ ক্যারেক্টার দে’খনা;

কংগ্রেসে যা বলি তাই মনে রেখো,

আর কিছু মনে রেখো না;

বাপকে করি ঘৃণা, মাকে দেই না অন্ন,

বাইরের আবরণটা রাখি পরিচ্ছন্ন,

কোট্ পেণ্টালুনে ঢাকি কৃষ্ণ-বর্ণ;

যেন দাঁড় কাক ময়ূর-পুচ্ছে।

(আর) যেহেতু আমরা পত্নী-আজ্ঞাকারী,

প্রাণ-পণে যোগাই গহনা;

আর বাপরে! তার রুষ্ট আঁখি-তাপে,

শুকায় প্রেম-নদীর মোহনা।

(সে যে) মাকে বলে ‘বেটী’, হেসে দেই উড়িয়ে

(তার) পিতৃ-বংশ নিয়ে আসি সব কুড়িয়ে,

(মোদের) চিনিয়ে দিতে হয় ‘এ মাসী, খুড়ী এ

ভুলে প্রণাম করি না পূজ্যে।

(কারণ) খবরের কাগজ, সাইন বোর্ড, আর

বিজ্ঞাপনের বেজায় ছড়াছড়ি,

(তাতে) দেখবে্ যথাক্রমে ‘পঞ্চানন্দ,’ আর

‘তিনকড়ি কবিরেজ’, ‘প্রেম বড়ি’;

আর যেহেতু আমাদের সাহস অতুল,

সাহেব দেখ‍্লে, হয় পিতৃ-নামটা ভুল,

(দেশটা) সংক্রান্তি-পুরুষের হাত, পা, মাথা ছেড়ে,

ধ’রেছিল বুঝি, “”!

বসন্ত বাহার—জলদ একতালা।

জেনে রাখ

জেনে রাখ।

মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ সেই, যে পূরো পাঁচ হাত লম্বা;

সাধু সেই, যে পরের টাকা নিয়ে, দেখায় রম্ভা!

ধার্ম্মিক বটে সেই, যে দিন রাত ফোঁটা তিলক কাটে;

ভক্ত সেই, যে আজন্মকাল চৈতন নাহি ছাঁটে।

সেই মহাশয়, সংগোপনে যে মদটা আস‍্টা টানে;

নিষ্ঠাবান্, যে কুক্কুটমাংসের মধুর আস্বাদ জানে।

রসিক সেই, যার ষাট‍্বছরে আছে পঞ্চম পক্ষ;

সেই কাজের লোক, চব্বিশ ঘণ্টা হুঁকো যার উপলক্ষ্য।

সেই কপা’লে, বিয়ে ক’রে যে পায় বিশ হাজার পণ;

নারী মধ্যে সেই সুখী, যার কত্তে হয়না রন্ধন।

সেই নিরীহ, রামের কথা যে শ্যামের কাণে দেয় ব’লে;

সেই বাবু, যে বোঁচা হা’ত জামায় ফুঁ দিয়ে চলে!

ভদ্র সেই, যার ফরসা ধুতি ফুটফুটে যার জামা;

দেশহিতৈষী সেই, যার পায়ে “ডসনের” বিনামা।

মদ খেয়ে, যা ভুলে থাকতে হয় সেই আদৃত বিচ্ছেদ:

কালো ফিতে ধারণ আছে যার, তারেই বলি খেদ।

বেহুঁস হ’য়ে ড্রেনে প’ড়ে রয়, সে অতি সম্ভ্রান্ত;

সাদা কালোয় ভেদ না রাখে, সে হাকিম কি ভ্রান্ত!

‘এষ অর্ঘ্যং’ যে বলে, সেই দশকর্ম্মান্বিত;

সেই বেদজ্ঞ, ফলারের নামে যে ভারি আনন্দিত।

‘রাজ-লক্ষণ আছে আমার’, যে কয়, সেই জ্যোতিষী;

লম্বা-দাড়ী, গেরুয়া-ধারী, সেই তো আদত ঋষি;

‘সট-সাইটেড্’ চসমা নিলেই, বুঝ‍্বে, ছোকরা ভাল;

বাপ্‌কে যে কয় ‘ঈডিয়ট্’, তার গুণে বংশ আলো!

সেই গুরু, যিনি বৎসরান্তে আসেন বার্ষিক নিতে;

বদান্য, যে একদম্ লাখ্ দেয়—উপাধি কিনিতে।

আসল তন্ত্রী সেই, যে সদাই আওড়ায় মুখে ‘দ্রুমফট্’

সেই আদত বীর, সাহেব দেখলেই যে দেয় সোজা চম্পট!

সে কালের সব নিরেট বোকা এ সত্য কি জান‍্ত,―

যে লেখক বল্লেই, বুঝ‍্তে হবে, এই ধুরন্ধর ‘কান্ত’?

মিশ্র বিভাষ-কাওয়ালী।

তাঁতী-ভাই

তাঁতী-ভাই!

রে তাঁতী ভাই, একটা কথা মন লাগিয়ে শুনিস্;

ঘরের তাঁত যে ক’টা আছে রে,—

তোরা স্ত্রী পুরুষে বুনিস্।

এবার যে ভাই তোদের পালা,

ঘরে ব’সে, ক’সে মাকু চালা;

কলের কাপড় বিশ হবে রে,—

না হয় তোদের হবে ঊনিশ।

তোদের সেই পুরাণো তাঁতে,

কাপড় বু’নে দিবি নিজের হাতে;

আমরা মাথায় ক’রে নিয়ে যাব রে,

টাকা ঘরে ব’সে গুণিস্!

“রে গঙ্গামাই —প্রাতে দরশন দে”—সুর।

কাহারোয়া।

তাই ভালো

তাই ভালো।

তাই ভালো, মোদের

মায়ের ঘরের শুধু ভাত;

মায়ের ঘরের ঘি সৈন্ধব,

মার বাগানের কলার পাত।

ভিক্ষার চালে কাজ নাই, সে বড় অপমান;

মোটা হোক্, সে সোণা মোদের মায়ের ক্ষেতের ধান;

সে যে মায়ের ক্ষেতের ধান।

মিহি কাপড় পর‍্’ব না আর যেচে পরের কাছে;

মায়ের ঘরের মোটা কাপড় প’র‍্লে কেমন সাজে;

দেখ‍্তো প’র‍্লে কেমন সাজে।

ও ভাই চাষী, ও ভাই তাঁতী, আজকে সুপ্রভাত;

ক’সে লাঙ্গল ধর ভাইরে, ক’সে চালাও তাঁত,

ক’সে চালাও ঘরের তাঁত।

জংলা—কাহারোয়া।

তিনকড়ি শৰ্ম্মা

প্রলাপে।

তিনকড়ি শর্ম্মা।

(আমি) যাহা কিছু বলি,―সবি বক্তৃতা,

যাহা লিখি, ―মহাকাব্য

(আর) সূক্ষ্ম-তত্ত্ব-অনুপ্রাণিত-

দর্শন,―যাহা ভাব‍্ব।

(দেখ) আমি যেটা বলি মন্দ,

সেটা অতি বদ্, নাহি সন্দ,

(আর) আমি যা’র সনে বলিনে বাক্যি,

সে নয় কারো আলাপ্য।

(দেখ) আমি যেটা বলি সোজা,

সেটা জলবৎ যায় বোঝা,

(আর) আমি যেটা বলি ‘উঁহু না’, তা’র

মানে করা কি সম্ভাব্য?

(আমি) যা’ খাই সেইটে খাদ্য;

আর, যা’ বাজাই সেটা বাদ্য;

(আর) আমি যদি বলি ‘এইটে উহা’,

সেইখানে সেটা যাগ্য

(আমি) চেঁচিয়ে যা’ বলি, গান তাই,

তাতে পূরো অথারটি বান্দাই;

(আর) ক’ত্তে হয় না ওজন সেটাকে,

নিজহাতে যেটা মাপ‍্ব

(এই) মাথাটা কি প্রকাণ্ড,

(এটা) অসীম জ্ঞানের ভাণ্ড!

(দেখ) আমি যা’রে যাহা খুসী হ’য়ে দেই,

তাই তা’র নিট্‌ প্রাপ্য।

(আমি) করি যার হিত ইচ্ছে,

তারে পৃথিবীশুদ্ধ দিচ্ছে,

(দে’খো) কক্ষণো তার বংশ রবে না,

ঘরে ব’সে যারে শাপ‍্ব।

(আমি) যেটা ব’লে যাব মিথ্যে,

(তুমি) যতই ফলাও বিদ্যে,

(দে’খো) কক্ষণো সেটা সত্যি হবে না,

তর্কই হবে লভ্য।

(এই) দু’খানি রাতুল শ্রীচরণ,

দিয়ে, যেখানে করিব বিচরণ,

(দ্যাখো) সেটা যদি তুমি তোমার বলিবে,

ভূত হ’য়ে ঘাড়ে চাপ‍ব!

(দ্যাখে।) আমি তিনকড়ি শর্ম্মা,

(এই) ধরাধামে ক্ষণজন্মা

(দে’খো) তখনি সে নদী হবে ভাগীরথা,

আমি যার জলে নাব‍্ব।

(দীন) কান্ত বলিছে ভাইরে,

(অতি) তোফা! বলিহারি যাইরে!

(আমি) তোমার নামটা “হাম‍্বড়া” প্রেসে,

সোণার আখরে ছাপ্‌ব!

ভৈরবী—গড় খেমটা।

তোমারি

তোমারি।

তোমারি দেওয়া প্রাণে, তোমারি দেওয়া দুখ,

তোমারি দেওয়া বুকে, তোমারি অনুভব।

তোমারি দুনয়নে, তোমারি শোকবারি,

তোমারি ব্যাকুলতা, তোমারি হা হা রব।

তোমারি দেওয়া নিধি, তোমারি কেড়ে নেওয়া,

তোমারি শঙ্কিত আকুল পথ-চাওয়া,

তোমারি নিরজনে ভাবনা আনমনে,

তোমারি সান্ত্বনা, শীতলসৌরভ।

আমিও তোমারি গো, তোমারি সকলি ত,

জানিয়ে জানে না, এ মোহ-হত চিত,

আমারি ব’লে কেন, ভ্রান্তি হ’ল হেন,

ভাঙ্গ এ অহমিকা, মিথ্যা গৌরব।

আলেয়া মিশ্র—তেওরা।

নিরুত্তর

নিরুত্তর।

ডাক্ দেখি তোর বৈজ্ঞানিকে

দে’খ‍ব সে উপাধি নিলে,

ক’টা ‘কেন’র জবাব শিখে।

ধরা কেন কেন্দ্র-পানে, ছোট বড় সবকে টানে,

বোঁটা-ছেঁড়া কলটি যেন সে,

দেয় না যে’তে অন্য দিকে?

কোকিল কেন কুহু বলে, জোনাকীটে কেন জ্বলে,

রৌদ্র, বৃষ্টি, শিশির মিলে,

কেন ফুটায় কুসুমটিকে?

চিনি কেন মিষ্টি লাগে, চাতক কেন বৃষ্টি মাগে;

চাকারে চায় চন্দ্রমাকে,

কমল কেন চায় রবিকে?

বায়ু কেন শব্দ বহে, অনল-শিখা কেন দহে,

চুম্বক কেন লৌহ টানে,

টানেনা মণিমাণিকে?

ইক্ষু কেন সুরস এত, নিম‍্টে কেন এমন তেতো,

ময়ূর কেন মেঘের ডাকে,

মেলে মোহন পুচ্ছটিকে?

কান্ত বলে, আছে জে’নো, ‘কেন’র ‘কেন’, তথ্য ‘কেন’,

যাও, নিখিল ‘কেন’র মূল কারণে,

সে, রেখেছে কালের খাতায় লিখে।

তোর নাম রেখেছি হরিবোলা—সুর।

নির্ভর

নির্ভর।

তুমি, নির্ম্মল কর, মঙ্গলকরে

মলিন মর্ম্ম মুছা’য়ে;

তব. গুণাকিরণ দিয়ে যাক্, মোর

মোহকালিমা ঘুচা’য়ে।

লক্ষ্যশূন্য লক্ষ বাসনা

ছুটিছে গভীর আঁধারে,

জানিন; কখন ডুবে যাবে কোন্

অকূল-গরল-পাথারে!

প্রভু, বিশ্ববিপদহন্তা,

তুমি, দাঁড়াও রুধিয়া পন্থা,

তব, শ্রীচরণতলে নিয়ে এস, মোর

মত্ত-বাসনা গুছায়ে।

আছ, অনল-অনিলে, চিরনভোনীলে,

ভূধরসলিলে, গহনে,

আছ, বিটপিলতায়, জলদের গায়,

শশিতারকায়, তপনে;

আমি, নয়নে বসন বাঁধিয়া,

ব’সে, আঁধারে মরিগো কাঁদিয়া,

আমি, দেখি নাই কিছু, বুঝি নাই কিছু,

দাও হে দেখায়ে বুঝায়ে।

ভৈরবী জলদ—একতালা।

পদাঙ্ক

বিলাপে।

পদাঙ্ক।

প্রাণের পথ ব’য়ে গিয়েছে সে গো;

চরণ-চির-রেখা আঁকিয়ে যে গো।

লুটায়ে আশা-ধূলে, মোহন অঞ্চল,

নূপুর-মুখরিত চরণ চঞ্চল,

দুধারে ফুটাইয়ে, বাসনা-ফুল-রাশি,

আধেক প্রেম-গাথা শুনাইয়ে গো।

একটু সুধা-হাসি, আধেক প্রেমগান,

কামনা-ফুল দুটি, শুষ্ক হীন-প্রাণ,

এখনও প’ড়ে আছে, চরণ-রেখা-পাশে,

মুগ্ধ হ’য়ে আছি, তাই নিয়ে গো!

মিশ্র মল্লার— কাওয়ালি।

পরম দৈবত

পরম দৈবত।

(সে যে) পরম-প্রেম-সুন্দর,

জ্ঞান নয়ন-নন্দন;

পুণ্য-মধুর-নিরমল,

জ্যোতিঃ জগত-বন্দন।

নিত্য-পুলক-চেতন, শান্তি-চির-নিকেতন,

ঢাল চরণে, রে মন, ভকতি-কুসুম-চন্দন।

সুরট মল্লার—সুরফাঁক।

পরিণাম

পরিণাম।

যা হয়েছে, হচ্ছে যা’, আর যা’ হবে, সব জানিরে,

আমার, প্রাণের মাঝে, তোর কথা নিয়ে,

হ’চ্ছে কাণাকাণি রে।

যেমন ক’রেই হোক্,

আ’নব টাকা, লুট‍্’ব মজা, এই ছিল তোর রোখ্;

তা’, সিঁদ দিয়ে, কি পকেট কে’টে, ক’রে রাহাজানি রে।

বা’ড়‍্বে কিসে আয়,

খস‍্ড়া-পাকা জমাখরচ হিসেব সেরেস্তায়;

রোজ, সন্ধ্যে বেলা আধ‍্লা নিয়ে করিস্ টানাটানি রে।

তোর কি কসুরে জেল?

মাথার ঘাম, দুপায়ে ফে’লে, কেন ভাঙ্গিস্ তেল?

তুই, সারাজীবন টে’নে মলি, পরের তেলের ঘানি রে।

ঐ দেখ্ আস‍্ছে সে দিন,

যেদিন কফের নাড়ী উঠ‍্বে জে’গে, বায়ু-পিত্ত ক্ষীণ;

সেদিন কস্তুরীভৈরবে, হা’লে পাবে না আর পানি রে।

ব’স‍বে ঘি’রে মা’গ্ ছেলে;

ব’ল‍বে, “ব’লে যাও গো, কোন্ সিন্ধুকে

কি রে’খে গে’লে;”

শুন‍্বি ‘টাকা’, কাণে কেউ দেবেনা

তারক-ব্রহ্মবাণী রে।

বোধ হয়, বুঝ‍্তে পাচ্ছ বেশ,―

যে, তোমার জন্যে তোয়ের হচ্ছে

কেমন মজার দেশ!

সেথা, চাইবিনা তুই যে’তে, তবু

নিয়ে যাবে টানি’রে।

বাউলের সুর―খেম‍্টা।

পরিদেবনা

পরিদেবনা।

তব, করুণা-অমিয় করি’ পান,

যত, পাপ, তাপ, দুঃখ, মোহ, বিষণ্ণতা,

নিরাশা, নিরুদ্যম, পায় অবসান।

এই, পাপ-চিত্ত, সদা তাপ-লিপ্ত রহি’,

এনেছে দুরপনেয় মৃত্যুবিকার বহি,

দিতেছে দারুণ দাহ হৃদয়-দেহ দহি’,

দেবতা গো, দয়া করি’ কর পরিত্রাণ।

তব, অমৃতপানে এই বিকৃত প্রাণে মম,

স্থানভেদে হয় কালকূট-সম,

হৃদয়ে বহ্নিজ্বালা, নয়নে অন্ধ-তমঃ,

কোথা শান্তিনিদান, কর শান্তিবিধান।

নিপট কপট তুহুঁ শ্যাম—সুর।

পূর্ব্বরাগ

পূর্ব্বরাগ।

সখিরে! মরম পরশে তারি গান;

অধীর আকুল করে প্রাণ

জ্যোছনা উছলি’ ওঠে, মলয়া মূরছি’ পড়ে,

কুঞ্জে কুঞ্জে ফুল ফু’টে ওঠে থরে থরে,

বিশ্ব-বিমোহন তান।

আঁখি-জলে হাসি মাখা, কি করুণ বেদনা!

হে’সে কেঁ’দে, নে’চে নে’চে, বলে, ‘আর কেঁদনা’;

হৃদয় দিয়েছি প্রতিদান।

মিশ্র ভূপালি-কাওয়ালি

প্রার্থনা

প্রার্থনা।

(ওরা) —চাহিতে জানে না, দয়াময়!

চাহে ধন, জন, আয়ুঃ, আরোগ্য, বিজয়!

করুণার সিন্ধু-কূলে, বসিয়া, মনের ভুলে

এক বিন্দু বারি তু’লে, মুখে নাহি লয়;

তীরে করি’ ছুটাছুটি, ধূলি বাঁধে মুঠি মুঠি,

পিয়াসে আকুল হিয়া, আরো ক্লিষ্ট হয়।

কি চাই মাগিয়ে নিয়ে, কি ছাই করে তা’ দিয়ে,

দুদিনের মোহ, ভেঙ্গে চুরমার হয়;

তথাপি নিলাজ হিয়া, মহাব্যস্ত তাই নিয়া,

ভাঙ্গিতে গড়িতে, হয়ে পড়ে অসময়।

আহা! ওরা জানে না ত, করুণানির্ঝর নাথ,

না চাহিতে নিরন্তর ঝর ঝর বয়;

চির-তৃপ্তি আছে যাহে, তা’ যদি গো নাহি চাহে,

তাই দিও দীনে, যা’তে পিয়াসা না রয়।

বারোয়াঁ—ঠুংরি।

প্রেমারঞ্জন

প্রেমারঞ্জন।

যে দিন তোমারে হৃদয় ভরিয়া ডাকি,

শাসন-বাকা মাথায় করিয়া রাখি;—

কে যেন সেদিন আঁখি-তারকায়,

মোহন-তুলিকা বুলাইয়া যায়,

সুন্দর, তব সুন্দর সব,

যে দিকে ফিরাই আঁখি!

স্ফুটতর ঐ নভো-নীলিমায়,

উজ্জ্বলতর শশধর ভায়,

সুমধুরতর পঞ্চমে গায়

কুঞ্জভবনে পাখী।

দেহ হৃদয়ে পাই নব বল,

দূরে যায় ক্ষুদ্রতা ছল,

কে যেন বিশ্ব প্রেম সরল,

প্রাণ দিয়ে যায় মাখি’।

যেন তোমার পুণ্যপরশ,

ক’রে তোলে এই চিত্ত সরস,

উথলিয়া উঠে বক্ষে হরষ,

বিবশ হইয়া থাকি।

ভৈরবী-একতাল।

বঙ্গমাতা

বঙ্গমাতা।

নমো নমো নমো জননি বঙ্গ!

উত্তরে ঐ অভ্রভেদী,

অতুল, বিপুল, গিরি অলঙ্ঘ্য!

দক্ষিণে সুবিশাল জলধি,

চুম্বে চরণ-তল নিরবধি,

মধ্যে পূত-জাহ্নবী-জল-

-ধৌত শ্যাম-ক্ষেত্র-সঙ্ঘ।

বনে বনে ছুটে ফুল-পরিমল,

প্রতি সরোবরে লক্ষ কমল,

অমৃতবারি সিঞ্চে, কোটি

তটিনী, মত্ত, খর-তরঙ্গ;

কোটি কুঞ্জে মধুপ গুঞ্জে,

নব কিশলয় পুঞ্জে পুঞ্জে,

ফল-ভর-নত শাখি-বৃন্দে

নিত্য শোভিত অমল অঙ্গ

সুরট মল্লার—একতালা।

বরের দর

বরের দর।

কন্যাদায়ে বিব্রত হয়েছ বিলক্ষণ;

তাই বুঝে সংক্ষেপে কচ্ছি ফর্দ্দ সমাপন।

নগদে চাই তিনটি হাজার,

তাতেই আবার গিন্নী বেজার,

বলেন, এবার বরের বাজার কসা কি রকম!

(কিন্তু) তোমার কাছে চক্ষুলজ্জা লাগে যে বিষম!

(আর) পড়ার খরচ মাসে তিরিশ,

হয় না কমে, বলে ‘গিরিশ,’

কাজেই সেটা, হ্যাঁ হ্যাঁ, বেশি বলা অকারণ;

সোণার চেন্ ঘড়ী, আইভরি ছড়ি,

ডায়মণ্ডকাটা সোণার বোতাম,

দিও এক সেট্, কতই বা দাম?

বিলিতি বুট, ভাল শ্লিপার, বরের প্রয়োজন;

ফুল এষ্টকিং, রেসমী রুমাল, দিও দু’ডজন।

ছাতি, বুরুস, আয়না, চিরুণ,

ফুলকাটা সার্ট, কোট পেণ্টালুন,

দু’ জোড়া শাল, সার্জ্জের চাদর, গরদ সুচিকণ;

জম‍্কালো র‍্যাপার, আতর ল্যাভেণ্ডার,

খান পনের দিশি ধূতি, রেসমী না হয়, দিও সুতি

হ্যাদ্দ্যাখো ধরিনি ‘চস‍্মা’,—কেমন ভুলো মন!

ছেলে, ঠুসি পেলে খুসি, একটু খাটো-দরশন।

খাট, চৌকী, মশারি, গদি, এর মধ্যে নেই ‘পারি যদি’

তাকিয়া, তোষক, বালিশাদি, দস্তুর মতন;

হবে দু’ প্রস্ত, শয্যা প্রশস্ত,

(আর) টেবিল, চেয়ার, আলনা, ডেক্স,

হাতীর দাঁতের হাত-বাক্স,

ষ্টীলট্রাঙ্ক খুব বড় দু’টো, ষা’ দেশের চলন;

(আর) তারি সঙ্গে পূরো এক সেট রূপোরি বাসন।

গিন্নী বলেন বাউটী সুটে, রূপ লাবণ্য ওঠে ফু’টে,

একশ’ ভরি হ’লেই, হবে একটি সেট্‌ উত্তম;

যেন অলঙ্কার দে’খে, নিন্দে করে না লোকে,

দিও বাণারসী বোম্বাই, ফর্দ্দ কিছু হ’ল লম্বাই,

তা, তোমার মেয়ে, তোমার জামাই,

তোমার আকিঞ্চন;

আমার কি ভাই? আজ বাদে কা’ল মুদ‍্ব দুনয়ন!

(আর) দিও যাতায়াতের খরচ,

না হয় কিছু হবে করজ,

তা,—মেয়ের বিয়ে, তোমার গরজ, তোমার প্রয়োজন;

আবার আ’স‍্বে কুলীন-দল, তাদের চাই বিলিতি জল,

ডজন বিশেক ‘হুইস্কি’ রেখো,

নইলে বড় প্রমাদ, দে’খো!

কি ক’র‍্ব ভাই, দেশের আজ কা’ল এমনি চালচলন;

কেবল চক্ষু-লজ্জায়, বাধ’ বাধ’ ঠেকছে যে কেমন!

ছেলেটি মোর নব কাত্তিক,

ভাবটি আবার খাঁটি সাত্ত্বিক,

এই বয়সে ভার ভাত্তিক, কত্তাদের মতন;

যদি দিতেন একটী ‘পাশ’, তবে লাগিয়ে দিতেম ত্রাস,

ফেল্ ছেলে, তাই এত কম পণ,

এতেই তোমার উঠ‍্ল কম্পন?

কেবল তোমার বাজার যাচাই,—বকা’লে অকারণ;

দেশের দশা হেরে কান্ত করে অশ্রু বরিষণ!

ঝাঁকে ঝাঁকে লাখে লাখে ডাকে ঐ পাখী। সুর—মতিয়ার

বহিরন্তর

বহিরন্তর।

যেমন, তীব্র জ্যোতির আধার রবিরে,

প্রভাতে তুলিয়া ধর;—

আর, কিরণ ছটায় ভাসাইয়া দিয়া,

এ ধরণী আলো কর;

নিশার আঁধারে হইয়া আবৃত,

লুকায় ধরায় বঞ্চনা, তানৃত,

প্রভাতে তাদের নগ্নতা প্রকাশি,

লাজে কর জড়সর;

তেমনি, নিবিড় মোহের আঁধারে, আমার

হৃদয় ডুবিয়া আছে;

কত পাপ, কত দুরভিসন্ধি,

আঁধারে লুকায়ে বাঁচে;

দিব্য আলোক! প্রাণে এস, নাথ!

হউক আমার মঙ্গল-প্রভাত;—

তাদের লুকাবার স্থান, ভাঙ্গ, ভগবান,

তারা, লাজে হোক্ মরমর।

কীর্ত্তনের ভাঙ্গা সুর—গড় খেমটা

বিদায়

বিদায়।

আর আমি থা’ক‍্বোনারে, তল‍্পী তোল্;

সয় কি ভাই, দিবানিশি গণ্ডগোল?

খেয়ে বামণের রান্না, ভাই আমার আসে কান্না,

তবু পাক-ঘরে যান্ না, গিন্নির আগুন ছুঁলেই গোল;

(আবার) ডা’লের সঙ্গে জল মেশে না,

বেগুনপোড়া, নিমপটোল।

(হায় দুবেলা)

প’ড়েছি কি পাপফেরে, গিন্নিটি যে আব‍্দে’রে,

‘কাপড় দে, গয়না দেরে’ ফরমাসেতে হই পাগল;

‘পারিনে’ ব’ল্লে, চল্লেন বাপের বাড়ী,

ঘুরিয়ে স্বর্ণ-নথ সুগোল।

(মুখের কাছে)

গৃহ-দেব্ তার আদেশে, যদি বা দুঃখে ক্লেশে,

সোণা দেই, সর্ব্বনেশে কর্ম্মকারের নানান্ ভো’ল,

মজুরি ষোল আনাই; বাজার যাচাই

ক’রে দেখি সব পিতল!

ধৈর্য্য আর ক’দিন টেকে? সাদা রং বজায় রে’খে,

গোয়ালা মনের সুখে, জল ঢে’লে দুধ করে ঘোল,

করে নিত্য গুরুদেবের কিরে,

(আবার) আদায় করে সুদ আসল।

(হিসেব ক’রে।)

কাপুড়ে সা’ল্লে দফা, দামের নাই আপোস রফা,

টাকায় টাকা মুনাফা, মুখে বলেন “হরি বোল্”;

(আবার) সাঁচ্চা ঝুঁটা যায়না বোঝা,

হায়রে কি বজ‍্নিশ নকল।

(কার সাধ্য চিনে?)

ধোবা তিরিশ খান দরে, কাপড় দেয় দু’মাস পরে,

ভদ্রতা কেমন ক’রে রাখ‍্ব, ভাবি তাই কেবল;

(আবার) নাপ্তে নবীন, বর্ষে দু’দিন,

দেখা দিয়ে করেন প্রাণ শীতল।

কি সখ্য ঝি চাকরে, ডা’নে বাঁয়ে চুরি করে,

তাই আবার ব’ল্লে পরে, বাজায় অপযশের ঢোল;

(আবার) চৌকিদারী কি ঝক‍্মারি,

না দিলে কয় ‘ঘটী তোল্!’

(নবাবের বেটা।)

ছেলেদের জ্যাঠামিটে, দেখ‍্ লে দেই কড়া মিঠে,

প’ড়েছে কড়া পিঠে, তথাপি বেজায় বিটোল;

(আবার) পিঁউলি পরা, পান্‌না বাবা,

ওঁরা খাবেন রুই কাতোল।

(মর বাঁচ।)

সবাই নিজেরটি বোঝে, যা’পায় তাই ট্যাঁকে গোঁজে,

সুধু পরের খরচে পরের মাথায় ঢালে ঘোল;

কান্ত বলে সবাই মিলে, একবার কৃষ্ণানন্দে হরি বোল

(দু’বাহু তুলে।)

বাউলের সুর—গড় খেমটা।

বিশ্ব-রচনা

বিশ্ব-রচনা।

যবে, সৃজনবাসনা-কণা, ল’য়ে কৃপা-আঁথি-কোণে,

চাহিলে, হে রাজ-অধিরাজ!

অমনি, নিমেষে বিরাট বিশ্ব, চরণে করিয়া নতি,

মহাশূন্যে করিল বিরাজ!

মহালোক-সিন্ধু হ’তে এক বিন্দু ল’য়ে করে,

প্রক্ষেপ করিলে, বিভু, অন্ধকার চরাচরে;

অমনি চরণতলে, আলোকমণ্ডিত বিশ্ব,

সন্তরিল জোতিঃস্রোতোমাঝ;

মহাশক্তি-তূণ হ’তে হেলায় একটি বাণ

নিক্ষেপিলে, জড়বিশ্ব অমনি পাইল প্রাণ;

হ’ল, মহাবেগে ঘূর্ণ্যমান, আলোড়ি’ মহাবিমান,

অগণিত জ্যোতিষ্কসমাজ।

বেলা যায়

বেলা যায়।

আর কি ভাবিস্ মাঝি ব’সে?

এই বাতাসে পা’ল তু’লে দিয়ে,

হা’ল ধরে থাক্ ক’সে।

এই হাওয়া প’ড়ে গে’লে, স্রোতে যে ভাই নেবে ঠে’লে,

কুল পাবিনে, ভে’সে যাবি,

মরবি রে মনের আপ‍্শোসে।

মিছে বকিস্ আনাড়ি, এই বেলা ধররে পাড়ি,

“পাঁচপীর বদর” ব’লে, পূরো মনের খোসে;

এমন বাতাস আর ব’বেনা, পারে যাওয়া আর

হবেনা,

মরণ-সিন্ধু মাঝে গিয়ে,

পড়‍বিরে নিজ কর্ম্ম-দোষে।

বাউলের সুর—গড় খেমটা।

বেহায়া বেহাই

বেহায়া বেহাই।

(বেয়াই) কুটুম্বিতের স্থলে, বউ দেবোনা ব’লে,

বেশি কসাকসি ভাল নয়;

(বিশেষ) বউমাটি দিনরেতে, কাঁদেন নাইতে খেতে,

আহা! বালিকা, তার কত সয়!

তবে কিনা, ভাই, তুল্লে যখন কথা,

দায়ে প’ড়ে একটু দিতে হ’চ্ছে ব্যথা,

(তোমার) ব্যাভার মনে হ’লে, শরীরটে যায় জ্ব’লে,

ঝক‍্মারি ক’রেছি মনে হয়।

এসেছিল ছেলের দু’ হাজার সম্বন্ধ,

নেহাৎ পোড়ারমুখো বিধাতার নির্ব্বন্ধ,

নেশা খেয়ে কল্লেম এই বিয়ে পছন্দ,

গুক‍্খুরি ক’রেছি অতিশয়;

তোমার মতন জোচ্চোর, বদ‍্মায়েস, বাট‍্পাড়,

দাম‍্বাজ, এ দুনিয়ায় দেখিনিকো আর!

এত কথাবার্ত্তা সবই ফক্কিকার,

কুলের দোষের ওটা পরিচয়।

আগে যদি জান‍্তেম এমনতর হবে,

পাওয়া থোয়ার দফায় শূন্যি প’ড়ে যাবে,

ক’ত্তে যাই কি এমন আহাম্মকি তবে,

ফে’লে ভাল কার্য্য সমুদয়?

আগে জান‍্লে পরে, বেড়ে দেখে শুনে,

নিতাম ফর্দ্দের মত কড়ায় গণ্ডায় গুণে,

(এখন) শঠের পাল্লায় প’ড়ে পুড়ি মনাগুনে,

কি ঘোর কলির হয়েছে উদয়।

(তোমার) খাটে পুডিং দে’য়া, তোষক গদি খাটো,

টেবিল, চেয়ার হাল্কা, তক্তপোষ্ টি ছোট,

কলসী ঘটী দু’টো, বেজায়-রকম ফুটো,

‘সেকেণ্ডহ্যাণ্ড’ জিনিস সমুদয়;

বাঁধা হুঁকো ভাঙ্গা, শাল জোড়াটা রো’গো,

আলনা, বাক্স, ডেক্স, সবি মড়া-খে’কো,

এখানকার সমাজে, বে’র করিনে লাজে,

পাছে কাণ-মলা খেতে হয়।

এ সব ত’ ধরিনে হ’ক্‌গে যেমন তেমন,

বাছার চেন ছড়াটি হয়’নি মনের মতন,

সাড়ে চৌদ্দভরি দিলাম ফর্দ্দে ধরি,

ওজনে এক ভরি কম‍্তি হয়;

(আর) আন‍্তেই চায়ের সেট‍্টি পেয়ে গেছে গয়া,

ছিঁড়েছে মশারি, খাটের গেছে পায়া,

(এমন) চ’খের পর্দা -শূন্য বেহদ্দ বেহায়া,

(আর) আছে কিনা, সন্দ সে বিষয়!

গয়না দেখেই গিন্নীর অঙ্গ গেছে জ্ব’লে,

একশ’ ভরির কথা স্বীকার হ’য়ে গেলে,

ষোল টাকা ভরির সোণা সবাই বলে,

পিতল কি সে সোণা, চেনা দায়

সেই পিতলে আবার আধাআধি খা’দ,

ওজন ক’রে পেলাম ভরি দেড়েক বাদ,

চন্দ্রহার ছড়াটা, নয়কো ডায়মণ্ড কাটা,

কত বল্ব, পুঁথি বেড়ে যায়!

হীরের আংটী কোথা? ঝুঁটো মতি দেয়া!

(এসব) বিলিতি জোচ্চুরি কোথায় শিখ‍্লে ভায়া?

পয়সার মমতায়, না কল্পে মেয়ের মায়া,

(ও তার) দিবানিশি কথা শুনতে হয়;

নগদটাতেও রকম-ফেরি আছে, ভাই,

হাজারে দু’তিনটি মেকি দেখ‍্তে পাই,

বিশ্বাস ক’রে তখন বাজিয়ে নেই নি, তাই—

এমনি ক’রেই আক্কেল দিতে হয়!

(কন্যার পিতার অশ্রু-মোচন)

বাপ্ বেটীরই দেখ‍্ছি সাধা চোখের জল,

মনে করলেই ধারা বহে অবিরল,

তবু হয়নি শেষ; মেয়েটিও বেশ,

নাইক’ লাজ লজ্জা সরম ভয়;

(আর) তোমার মতন অষ্টাবক্র, হায়রে বিধি!

তারি কন্যা, কতই হ’বে রূপের নিধি!

রূপে গুণে সমা, লোকে বলে “ওমা,

এমন চাঁদেরো এমন পেত্নী হয়!”

(তোমার) মায়া-কান্নায় কিছু আসে যায় না আমার,

(আমি) বেশ বুঝেছি তুমি ভদ্র-বেশী চামার,

বাইরে যত জাঁক-জমক জুতো, জামার;

কিন্তু তুমি অতি নীচাশয়;

বারণ ক’ত্তে চাইনে, যাওহে মেয়ে নিয়ে,

রেখে যেয়ো আবার খরচ পত্র দিয়ে;

নইলে জেনো, চাঁদের আবার দিবো বিয়ে;

শুনে কান্ত অবাক্ হ’য়ে রয়!

মূলতান—একতালা।

বৈয়াকরণ―দম্পতির বিরহ

বৈয়াকরণ―

দম্পতির বিরহ।

(পত্র)

কবে হবে তোমাতে আমাতে সন্ধি;

যাবে বিরহের ভোগ, হ’বে শুভ-যোগ,

দ্বন্দ্ব সমাসে হইব বন্দী।

তুমি মূল ধাতু, আমি হে প্রত্যয়,

তোমাযোগে আমার সার্থকতা হয়,

কবে, ‘স্যতি, সতঃ, স্যন্তি’র ঘু’চে যাবে ভয়,

হবে বর্ত্তমানের ‘তিপ্ তস্ অন্তি!’

আমি অবলা-কবিতা, তুমি অলঙ্কার,

তোমা বিনে আমার কিসের অহঙ্কার,

করিছে অনঙ্গ, ছন্দোযতিভঙ্গ,

এসে সংশোধনের করছে ফন্দি।

কীর্ত্তনের সুর—জলদ একতালা।

(উত্তর)

প্রিয়ে, হ’য়ে আছি বিরহে হসন্ত;

সুধু আধখানা, কোনমতে রয়েছি জীবন্ত।

কি কব ধাতুর ভোগ, নানা উপসর্গ রোগ,

জীবনে কি লাগায়েছে বিসর্গ অনন্ত!

প্রেয়সী প্রকৃতি তুমি, প্রত্যয়ের লীলাভূমি,

তোমা বিনে কে আমারে ব্যাকরণে মান‍্ত?

অধ্যয়ন উঠেছে চাঙ্গে, রেতে যখন নিদ্রা ভাঙ্গে,

লুপ্ত “অ”কারের মত ম’রে থাকি জ্যান্ত।

এ যে, সন্ধি-বিচ্ছেদের রাজ্য, কবে হব কর্ত্তৃবাচ্য,

বিরহ অসমাপিকা ক্রিয়া, পাইনে অন্ত।

প্রিয়ে, তুমি আছ কুত্র, খেয়েছি সব মূল সূত্র,

পেয়ে তোমার প্রেমপত্র, কচ্ছি ‘হা, হা হন্ত!’

কালেংড়া—কাওয়ালী।

ব্যর্থ প্রতীক্ষা

ব্যর্থ প্রতীক্ষা।

রূপসি নগর-বাসিনি!

শূন্য-কক্ষে কেন একাকিনী, বিষাদিনী!

দীন-নয়নে বিফল-শয়নে, কার পথ চাহি’, মানিনি?

দীপ মলিন, শুষ্ক মালিকা,

মূক মুখর শুষ্ক-সারিকা,

যতন-হীনা, নীরব-বীণা, কর-পরশ-পিপাসিনী।

শিশির-সিক্ত আম্র-কাননে,

বাজিছে প্রভাতী বিহগ-কূজনে,

ধীরে ধীরে জাগে ঊষা, কনক-জলদ-কিরীটিনী;

তন্দ্রাহীন যুগল নয়নে,

মন্দাকিনী ঝরিছে সঘনে,

জীবন-মরণ, কার চরণ-আশে, বিফল যামিনী?

ভারতভূমি

ভারতভূমি।

শ্যামল-শস্য-ভরা!

(চির) শান্তি-বিরাজিত পুণ্যময়ী;

ফল-ফুল-পূরিত, নিত্য-সুশোভিত,

যমুনা-সরস্বতী-গঙ্গা-বিরাজিত।

ধুর্জ্জটি-বাঞ্ছিত-হিমাদ্রি-মণ্ডিত,

সিন্ধু-গোদাবরী-মাল্য-বিলম্বিত,

অলিকুল-গুঞ্জিত-সরসিজ-রঞ্জিত।

রাম-যুধিষ্ঠির-ভূপ-অলঙ্কৃত,

অর্জুন-ভীষ্ম-শরাসন-টঙ্কৃত,

বীরপ্রতাপে চরাচর শঙ্কিত।

সামগান-রত-আর্য্য-তপোধন,

শান্তি-সুখান্বিত কোটি তপোবন,

রোগ-শোক-দুখ-পাপ-বিমোচন।

ওই সুদূরে সে নীর-নিধি,—

যার, তীরে হের, দুখ-দিগ্ধ-হৃদি,

কাঁদে, ওই সে ভারত, হায় বিধি!

ভৈরবী—কাওয়ালী।

ভ্রান্তি

ভ্রান্তি।

লোকে বলিত তুমি আছ,

ভে’বে দেখিনি আছ কিনা,

তখন আমি বুঝিনি, প্রভু,

নাস্তি গতি তোম। বিনা।

তোমারি গৃহে বসতি করি

খেয়েছি তোমারি অন্ন,

তোমারি বায়ু দিতেছে আয়ু,

বেঁচে আছি তোমারি জন্য;

ক্ষুধা হরেছে তব ফলে,

পিপাসা গেছে তব জলে;

সেকি ভুল, যে ভুলে ভু’লে,

প্রভু, তোমারি নাম করিনা!

তোমারি মেঘে শস্য আনে,

ঢালি পীযূষজল-ধারা,

অবিরত দিতেছে আলো,

তোমারি রবি-শশি-তারা,

শীতল তব বৃক্ষচ্ছায়া,

সেবে নিয়ত, ক্লান্ত কায়া,

(তবু) তোমারি দেওয়া মন রয়েছে

ভু’লে তোমারি গুণ-গরিমা!

মিশ্র বিভাগ —ঝাঁপতাল।

মা

মা।

স্নেহবিহ্বল, করুণা-ছলছল,

শিয়রে জাগে কার আঁখিরে!

মিটিল সব ক্ষুধা, সঞ্জীবনী শুধা

এনেছে, অশৱণ লাগিরে।

শ্রান্ত অবিরত যামিনী-জাগরণে,

অবশ কৃশ তনু মলিন অনশনে;

আত্মহারা, সদা বিমুখী নিজ-সুখে,

তপ্ত তনু মম, করুণা-ভরা বুকে

টানিয়া লয় তুলি’, যাতনা-তাপ ভুলি’,

বদন-পানে চেয়ে থাকিরে।

করুণে বরষিছে মধুর সান্ত্বনা,

শান্ত করি’ মম গভীর যন্ত্রণা;

স্নেহ-অঞ্চলে মুছায়ে আঁখিজল,

ব্যথিত মস্তক চুম্বে অবিরল,

চরণ-ধূলি সাথে, আশীষ রাখে মাথে,

সুপ্ত হৃদি উঠে জাগিরে।

আপনি মঙ্গলা, মাতৃরূপে আসি’,

শিয়রে দিল দেখা পুণ্য-স্নেহ-রাশি,

বক্ষে ধরি’ চির-পীযূষ-নির্ঝর,

নিরাশ্রয়-শিশু-অসীম-নির্ভর;

নমো নমো নমঃ, জননি দেবি মম!

অচলা মতি পদে মাগিরে।

মিশ্র ইমন—তেওরা।

মানিনী

মানিনী।

পরশ লালসে, অবশ আলসে,

ঢলিয়া পড়িত আমারি অঙ্গে।

মিছে ভালবাসা, শুধু যাওয়া-আসা;

রূপমোহ গেছে রূপেরি সঙ্গে।

সে মধু-আদর, এই অযতন,

সে সুখ-স্বরগ, আজি এ পতন,

মনে হয়, সখি, সকলি স্বপন,

কে বাঁচে এমন ভরসা-ভঙ্গে?

চন্দন, সখি, হ’ল বিষতরু,

নন্দন-বন হ’ল ঘোর মরু,

উদাস-নয়নে, বিরহশয়নে,

ভাসিতেছি আঁখি-নীর-তরঙ্গে।

বেহাগ-একতালা।

মায়া

মায়া।

মাগো, আমার সকলি ভ্রান্তি।

মিথ্যা জগতে, মিথ্যা মমতা;

মরু-ভূমি শুধু, করিতেছে ধূ ধূ!

হেথা, কেবলি পিয়াসা, কেবলি শ্রান্তি।

যবে, অরুণ-কিরণে নব-দিবা জাগে,

ফোটে নব ফুল, নব অনুরাগে,

ভুলি মা তখন, কি কাল ভীষণ

আঁধারে, ডুবিবে কনক কান্তি!

পুত্র-পরিজ্ঞানে হ’য়ে পরিবৃত,

ভাবি, এ আনন্দ অনন্ত, অমৃত;

মনে নাহি হয়, মরণ-সময়

“হৃদয়বান্ধবা বিমুখা যান্তি।”

দিনে দিনে দীনের ফুরাইল দিন,

দীনতারা, ঘুচাও দীনের দুর্দ্দিন,

‘আশা’-রূপে মাগো, নিরাশ প্রাণে জাগো,

দিয়ে ও চরণ, অক্ষয়শান্তি।

বসস্ত বাহার - একতালা।

মিলন

মিলন।

আয় ছুটে ভাই, হিন্দু মুসলমান!

ঐ দেখ্ ঝ’র‍্ছে মায়ের দু’নয়ান।

আজ, এক ক’রে দে সন্ধ্যা নমাজ,

মিশিয়ে দে আজ, বেদ কোরাণ!

(জাতি ধর্ম্ম ভুলে গিয়েরে) (হিংসা বিদ্বেষ ভু’লে

গিয়েরে)

থাকি একই মায়ের কোলে, করি

একই মায়ের স্তন্য পান।

(এক মায়ের কোল জুড়ে আছিরে) (একমায়ের দুধ খেয়ে

বাঁচিরে)

আমরা পাশাপাশি, প্রতিবাসী,

দুই গোলারি একই ধান।

(একই ক্ষেতে সে ধান ফলেরে) (একই ভাতে একই

রক্ত ব’য়ে যায়)

এক ভাই না খেতে পেলে,

কাঁদেনা কোন্ ভায়ের প্রাণ?

(এমন পাষাণ কেবা আছে রে) (এমন কঠিন কেবা

আছেরে)

বিলেত ভারত দুটো বটে, দুয়েরি এক ভগবান্।

(দুই চখে যে দুদেশ দেখেনা) (তার কাছে তো সবাই

সমানরে)

সংকীর্ত্তন—গড় খেমটা

মুক্তি-কামনা

মুক্তি-কামনা।

ওই, বধির যবনিকা তুলিয়া, মোরে প্রভু,

দেখাও তব চির-আলোক-লোক।

ওপারে সবই ভাল, কেবল সুখ-আলো,

এ পারে সবই ব্যথা, আঁধার, শোক!

মাঝে দুস্তর কঠিন অন্তর,

শ্রান্ত পথিকেরে বলিছে ‘সর সর’,

ওই, তোরণপাদদেশে, পিপাসাতুর এসে,

ফিরে কি যাবে, লয়ে চির-বিয়োগ?

ওই, নিঠুর অর্গল, করুণ শুভ করে,

মুক্ত করি দেহ, অতুর-দীন-তরে;

পিপাসা দিলে তুমি, তুমিই দিলে ক্ষুধা,

তোমারি কাছে আছে শান্তি-সুখ-সুধা:

পাবে, অধীর ব্যাকুলতা, তোমাতে সফলতা,

হউক তব সনে অমৃতযোগ!

মিশ্র ইমন-তেওরা

মোহ

মোহ।

(মাগো) এ পাতকী ডুবে যদি যায়

অন্ধকারচিরমরণসিন্ধু-নীরে,

তোমার মহিমা কিছু বাড়িবে না তায়।

(কত) জ্ঞান, বুদ্ধি, বল, স্নেহ, করুণা, দেহ,

স্বাস্থ্য, সাধু-জন-সঙ্গ, বন্ধু, গেহ,

নিষ্কলঙ্ক মন, মধুময় পরিজন,

পুণ্য-চরণ-ধূলি দিয়েছ আমায়।

(মম) সুপ্তহৃদয়, করি নয়ন-নিমীলন,

না করিল তব করুণা-অনুশীলন;

মোহ ঘিরিল মোরে, রহি চির-ঘুম-ঘোরে,

ব্যর্থজীবন গেল ফুরাইয়ে, হায়!

(এস) দীনদয়াময়ি! রক্ষ রক্ষ, লহ

কোলে; ভীত, হেরি’ নরক ভয়াবহ;

দুষ্কৃত এ পতিতে, হবে গো স্থান দিতে,

অশরণের শরণ শ্রীচরণ-ছায়।

নিপট কপট তুঁহু শ্যাম - সুর।

যোগ

যোগ।

যোগ কর প্রাণ মনে;―

আর কাজ কি ভবের ভাগ-পূরণে?

হয়োনা কাতর বিয়োগে হা’স‍্বে লোকে,

দে’খে শুনে।

আগে নে’ মনকষা কসি,’

করিস‍্নে মন-কসাকসি,

সরল কররে জটিল রাশি; থাকিস‍্নে বসি,

ভবের, মিথ্যা-মিশ্র-সঙ্কলনে।

লঘিষ্ঠ-গরিষ্ঠ-ভেদে,

কেন মিছে মরিস্ কেঁদে,

ম’জে আছ ভগ্নাংশেতে, কোন্ রসেতে?

চল শুভঙ্করীর নিয়ম মে’নে।

কাজ কি রে তোর সের ছটাকে;

বেঁধে নে’ দেহের ছ’টাকে;

শিখে নেরে পরিমিতির নিয়মটাকে;

রাখ, চতুর্ভুজের গুণটি জে’নে।

কর হৃদি-ক্ষেত্র কালী,

সার ভবক্ষেত্রে, কালী;

তোর জ্ঞান-নেত্রে কালী কে দিলরে ঢালি;

তাইতে, ঠিকের ঘরটা ঠিক দেখিনে।

কাস্ত বলে ব্যাপার বিষম,

ভু’লে আদি যোগের নিয়ম,

পৌনঃপুনিক হচ্ছে জনম, ও মন অধম!

এবার, পরীক্ষাতে পাশ পাবিনে।

কালেংড়া—আড়খম‍্টা!

শুদ্ধ প্রেম

শুদ্ধ প্রেম।

প্রেমে জল হ’য়ে যাও গ’লে;

কঠিনে মেশে না সে, মেশেরে সে তরল হ’লে।

অবিরাম হ’য়ে নত, চ’লে যাও নদীর মত,

কল্‌কলে অবিরত ‘জয় জগদীশ’ ব’লে;

বিশ্বাসের তরঙ্গ তু’লে, মোহ পাড়ি ভাঙ্গ্ সমূলে,

চেওনা কোনও কূলে,

শুধু নে’চে গেয়ে যাওয়ে চ’লে।

সে জলে নাইবে যা’রা, থা’ক‍্বেনা মৃত্যু জরা,

পানে পিপাসা যাবে, ময়লা যাবে ধু’লে;

যা’রা সাঁতার ভু’লে নাম‍্তে পারে,

(তা’দের) টেনে নে’ যাও একেবারে,

ভেসে যাও, ভাসিয়ে নে’যাও,

সেই পরিণাম-সিন্ধু-জলে।

বাউলের সুর—গড়খেম‍্টা

শেষ দিন

শেষ দিন।

যেদিন উপজিবে শ্বাসকষ্ট;―

বায়ু-পিত্ত-কফের নাড়ী হয়ে ক্ষীণ,

হবে নিজ নিজ স্থান-ভ্রষ্ট।

ইচ্ছাশক্তির ক্রিয়া থাক‍্বে না হাত-পায়ে,

রসনা হবে আড়ষ্ট:

যকৃৎ, প্লীহা, হৃৎপিণ্ড, পাকস্থলী

মূত্রাশয় হবে দুষ্ট;

বাইরের প্রতিবিম্ব, প’ড়‍্বে না নয়নে,

হবি কাল-তন্দ্রাবিষ্ট;

কাণের কাছে কামান দা’গ‍্লে শুন‍্বি নারে,

প’ড়ে রইবি যেন সরল কাষ্ঠ।

গায়ে ঠে’সে ধ’র‍্লে জ্বলন্ত অঙ্গার,

‘উহু’ বল‍বি না নিশ্চেষ্ট;

কেবল, বুকের কাছে একটু থাক‍্‌বেরে ধুক‍্ধুকি;

আর, ঈষৎ নড়‍্‌বে শুষ্ক ওষ্ঠ।

মাথা চিরে দিবে সদ্য কালকূট,

কিন্তু হায়রে, বিধাতা রুষ্ট;

শেষ ঔষধের ক্রিয়া বিফল হ’লে, বৈদ্য

জবাব দিয়ে যাবে স্পষ্ট।

দাসদাসী-পত্নী-পুত্র-পুত্রবধূ―

আদি পরিজনজুষ্ট,―

মল-মূত্রে, কফে, জ’ড়ে প’ড়ে রবে,

এই, সোণার শরীর পরিপুষ্ট।

“ধনে প্রাণে বিনাশ ক’রে গেলে,” ব’লে,

কাঁদ‍্বেন পুত্র পিতৃনিষ্ঠ;

আর আমরণ বৈধব্যের ক্লেশ ভে’বে পত্নী,

কাঁদ‍্বেন পার্শ্ব-উপবিষ্ট।

পণ্ডিতেরা ব’ল‍্বেন, “প্রায়শ্চিত্ত করাও,

একটু, রক্ত হয়েছিল দৃষ্ট;

একটা গাভী এনে, ত্বরা করাও বৈতরণী,

বাঁচামরা সব অদৃষ্ট!”

ঘরে, তেল, চূর্ণ, চটি, পাচন, প্রলেপ, বটী,

কবল, ঘৃত, আর অরিষ্ট;

তুলসী, বেলের পাতা, মধু, পিঁপুল, আদা,

সবি বিফল, সবি নষ্ট।

কান্ত বলে, ভ্রান্ত মনরে, বলি শোন্,

এখন, লা’গছে না এ কথা মিষ্ট;

কিন্তু, সকল সত্যের চেয়ে, এইটে সত্যি কথা,

দিনতো গেল, ভাব রে ইষ্ট।

বসন্ত মিশ্র ― একতালা।

সংকল্প

সংকল্প।

মায়ের দেওয়া মোটা কাপড়

মাথায় তু’লে নেরে ভাই;

দীন-দুখিনী মা যে তোদের

তার বেশি আর সাধ্য নাই।

ঐ মোটা সুতোর সঙ্গে, মায়ের

অপার স্নেহ দে’খ‍্তে পাই;

আমরা, এমনি পাষাণ, তাই ফে’লে ঐ

পরের দোরে ভিক্ষা চাই।

ঐ দুঃখী মায়ের ঘরে, তোদের

সবার প্রচুর অন্ন নাই;

তবু, তাই বে’চে কাচ, সাবান, মোজা,

কি’নে কল্লি ঘর বোঝাই।

আয়রে আমিরা মায়ের নামে

এই প্রতিজ্ঞা ক’রব ভাই;

পরের জিনিস কিন‍্বো না, যদি

মা’য়ের ঘরের জিনিস পাই।

মুলতান—গড় খেম‍্টা।

সখা

সখা।

আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে,

তুমি অভাগারে চেয়েছ;

আমি না ডাকিতে, হৃদয়-মাঝারে

নিজে এসে দেখা দিয়েছ!

চির-আদরের বিনিময়ে, সখা,

চির-অবহেলা পেয়েছ;

(আমি)—দূরে ছু’টে যেতে, দু’হাত পসারি,

ধ’রে টে’নে কোলে নিয়েছ!

“ওপথে যে’ওনা ফিরে এস”, ব’লে

কানে কানে কত ক’য়েছ;

(আমি) তবু চ’লে গেছি; ফিরায়ে আনিতে

পাছে পাছে ছুটে গিয়েছ।

(এই) চির-অপরাধী পাতকীর বোঝা

হাসি-মুখে তুমি ব’য়েছ;

(আমার) নিজহাতে গড়া বিপদের মাঝে,

বুকে ক’রে নিয়ে রয়েছ!

মিশ্র কানেড়া—একতালা।

সফল মরণ

সফল মরণ।

এস এস কাছে, দূরে কি গো সাজে,

বিছায়ে রেখেছি হৃদয়-আসন!

চরণের ধুলি, দেহ মাথে তুলি’,

আজি অভাগীর কি সুখ-মরণ;

এস প্রাণ সাথী, আজি শেষ রাতি,

ভাল ক’রে আজি করি দরশন!

জীবন-নাথ! পূরিল সাধ,

ভুলেছি যত অনাদর অযতন;

পদে মাথা রাখি’, পদধূলি মাখি’,

সফল জনম আজি, সফল মরণ!

লাউনি-ঝাঁপতাল।

সফল-মুহর্ত্ত

সফল-মুহর্ত্ত।

কোন্ শুভগ্রহালোকে, কি মঙ্গল যোগে,

চকিতে যেন গো, পাই দরশন!

সেই, ক্ষুদ্র একপল, কৃতার্থ, সফল,

রোমাঞ্চিত তনু, ঝরে দুনয়ন।

আয়ুঃ যদি হ’ত সেই এক বিন্দু,

কে চাহিত দীর্ঘ-বিষাদের সিন্ধু?

তোমায় দেখিতে দেখিতে, ফুরা’ত চকিতে,

ভবের বিপদ, সম্পদ, হরষ, রোদন;

আঁখি মুদি’, আমার নিখিল উজল,

আঁখি মেলি’, আমার আঁধার সকল,

কোন্ পুণ্যে পাই, কি পাপে হারাই,

তুমি জান গো, সাধক-শরণ!

তব যাত্রা-সনে, যদি হয় লোপ

ধরণীর মায়া, নাহি রয় ক্ষোভ,

সবই ফিরে আসে, ভাঙ্গাহৃদিপাশে,

কেবল, হারাইয়া যায় সাধনার ধন;

দেবতা, আমারে কেন দুঃখ দাও,

‘দাঁড়াও’ বলিতে, দূরে চলে যাও,

ডেকে ডেকে মরি, ফিরে নাহি চাও,

দয়াময়! কেন নিদয় এমন?

বিভাষ—একতালা।

সিন্ধু-সঙ্গীত

সিন্ধু-সঙ্গীত।

নীল সিন্ধু ওই গর্জ্জে গভীর;

ভৈরব-রাগ-মুখর করি’ তীর!

অচল-উচ্চ-চল-ঊর্ম্মি মালশত-

—শুভ্র-ফেন-যুত, রঙ্গ অধীর;

ভীতি বিবর্দ্ধন, তাণ্ডব নর্ত্তন,

ভীম রোলে করি শ্রবণ বধির।

সিন্ধু কহে, “তব ভূমি খণ্ড কত

ক্ষুদ্র, হের মম বিপুল শরীর;

তীব্র হরষে, মম অঙ্গ পরশে,

কি তরঙ্গ তুলিয়া, চির-সঙ্গি-সমীর!

রত্ন-রাজি কত, যত্ন-সুরক্ষিত,

সঞ্চিত কোষ লুবধ ধরণীর;

সার্থকতা লভে মুগ্ধ তরঙ্গিণী,

আসি’ পদে মিলি’, পতি জলধির!

(আমি) ইন্দ্র-চাপ-নিভ-স্নিগ্ধ-মনোহর-

—বর্ণে সুরঞ্জিত, কিরণে রবির;

পারিজাত তরু, অমৃত, সুধাকর,

মন্থনে তুলিল সুরাসুর বীর।

(কত) অর্ণবপোত পণ্য ভরি’ ধাইছে,

কর্ণে সুপরিচিত নাবিক ধীর;

ভগ্ন-শেষ কত, করিছে প্রমাণিত,

ধ্রুব-পরিহাস নিঠুর নিয়তির।

(যবে) অমৃত-ধারে ভরি’ পিতৃবক্ষ, হয়

উদয় মনোরম পূর্ণ শশীর;

মত্ত-হরষে, যেন বীচি-হস্তে ধরি’,

আনি’ আলো করি হৃদয়-কুটীর।

চন্দ্র-বিরহে পুনঃ উদ্বেলিত চিত,

আবৃত করে ঘন-দুঃখ-তিমির;

করি, সজ্জিত, সুন্দর, প্রচুর-পুষ্প-ফল-

—শস্য-রাশি দিয়ে, দেহ মহীর

লক্ষ-পুরাতন-সন্ধি-সমর-ইতি-

—হাস-বিমিশ্রিত এ বিপুল নীর

দীনে দান কত করিনু অকাতরে,

সম্পদ লয়ে গর্ব্বি ত নৃপতির।

(তব) শক্তিপুঞ্জ মম মূর্ত্তি হেরি’,

হয় স্তম্ভিত, ভীত, পদানত-শির;

সর্ব্ব গর্ব্ব মম যাঁর কৃপাবলে,

নমি সে সুমঙ্গল-পদে প্রভুজীর।

মিশ্র গৌরী-কাওয়ালি।

সুখ দুঃখ

সুখ দুঃখ।

সম্পদের কোলে বসাইয়ে, হরি,

সুখ দিয়ে এ পরীক্ষে!

(আমি) সুখের মাঝে তোমায় ভুলে থাকি,

(অমনি) দুখ দিয়ে দাও শিক্ষে।

মত্ত হ’য়ে সদা পুত্র-পরিবারে,

ধন-রত্ন-মণি-মাণিক্যে,

(আমি) ধুয়ে মু’ছে ফেলি তোমার নামগন্ধ,

ম’জে তার চাক্‌চিক্যো।

নিলাজ হৃদয় ভেঙ্গে সব লও,

দুখ দিয়ে দাও দীক্ষে;

(আমার) বাধা গুলো নিয়ে, অভয় চরণ,

(আর) ভিক্ষার ঝুলি, দাও ভিক্ষে।

ভায়রোঁ—একতালা।

সেই মুখ খানি

সেই মুখ খানি।

মধুর সে মুখখানি কখনও কি ভোলা যায়!

জমা’য়ে চাঁদের সুধা, বিধি গ’ড়েছিল তায়।

মৃদু-সরলতা-মাখা, তূলিতে নয়ন আঁকা,

চাহিলে করুণে, ধরা চরণে বিকাতে চায়।

অধরে সারাটি বেলা, হাসি করে ছেলে-খেলা,

নীরবে নিশীথে ধীরে, অধরে পড়ি’ ঘুমায়;

যদি দুটি কথা কহে, প্রাণে সুধা-নদী বহে,

নিমেষে নিখিল ধরা, মোহন-সঙ্গীত-ময়।

মিশ্র বেহাগ—ঝাঁপতাল।

“মধুর সে মুখখানি কখনও কি ভোলা যায়,”—একটি প্রসিদ্ধ সঙ্গীত; এই গানটি তাহার পদপূরণ মাত্র।

স্বপ্ন-পুলক

স্বপ্ন-পুলক।

স্বপনে তাহারে কুড়ায়ে পেয়েছি,

রেখেছি স্বপনে ঢাকিয়া

স্বপনে তাহারি মু’খানি নিরখি,

স্বপন-কুহেলি মাখিয়া।

(তারে) বর-মালা দিনু স্বপনে,

(হ’ল) হৃদি-বিনিময় গোপনে,

স্বপনে দুজনে প্রেম-আলাপনে

যাপি সারা-নিশি জাগিয়া।

(করি) স্বপ্নে মিলন-সুখ-গান,

(করি) স্বপ্নে প্রণয়-অভিমান,

(হয়) স্বপ্নে প্রেম-কলহ, যায় গো

স্বপনেরি সনে ভাঙ্গিয়া;

যা’ কিছু আমার দিতে পারি সবি

সুখ-স্বপনেরি লাগিয়া

মিশ্র কানেড়া—একতালা।

হজ্‌মী গুলি

হজ্‌মী গুলি।

আঃ, যা কর, বাবা, আস্তে, ধীরে,―

ঘা কর কেন খুঁচিয়ে?

পাত‍্লা একটা যবনিকা আছে,

কাজ কি সেটাকে ঘুচিয়ে?

ফে’লোনা পৈতে কেটোনা টিকিটে,

সর্বব-বিভাগে প্রবেশ-টিকিট এ,

নেহাৎ পক্ষে টাকাটা সিকিটে

মেলেও ত’ ন্যাকা বুঝিয়ে।

কালিয়া কাবাব চপ, কাট‍্লেট্,

টিকি ঝাড়, আর খাও ভরপেট,

পৈতেটা কাণে তুলে নিয়ে ব’স,

নামাবলাখানা কুঁচিয়ে

মূর্খশাস্ত্র অতি বিদ‍্ঘু’টে!

অকারণ অভিশাপ কুক্কুটে,

বলা তো যায় না কিছু মুখ ফু’টে,―

যা’ কর নয়ন বুজিয়ে।

শঙ্খবটী বা নৃপবল্লভে

এমন হজম কখন কি হবে?

পাচকের সেরা পৈতেটা ছোঁড়া,

টিকি কাটা, কি কুরুচি এ!

কীর্ত্তন ভাঙ্গানুর—গড় খেমটা।

হৃদয়-কুসুম

হৃদয়-কুসুম।

তার, মঙ্গল আরতির বে’জে উঠে শাঁক!

সেই, প্রেম-অরুণের হেম-কিরণে ফু’টে থাক্।

দেখে শোভা, পিয়ে সুধা,

মিটে যাক্ নিখিলের ক্ষুধা,

আপনা বিলিয়ে দে রে,

সব তৃষাতুর (সে সুধা)

লু’টে খাক্।

স্নিগ্ধ মলয় ব’য়ে মন্দ,

ছড়িয়ে দিক্ তোর বিমল গন্ধ,

অরুণপানে চেয়ে’ চেয়ে’,

দলগুলি তোর, (ও হৃদি-ফুল) (ধীরে ধীরে)

টু’টে যাক্।

বাউলের সুর—গড় খেমটা।