অমৃত (রজনীকান্ত সেন)
রজনীকান্ত সেন
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১০
প্রকাশনা-তথ্য
অমৃত
শ্রীরজনীকান্ত সেন
অমৃত
শ্রীরজনীকান্ত সেন
প্রণীত।
দ্বিতীয় সংস্করণ
মূল্য ৷৹ আনা।
প্রথম সংস্করণ, বৈশাখ, ১৩১৭।
দ্বিতীয় সংস্করণ, আষাঢ়, ১৩১৭।
জয় জগদীশ।
বঙ্গ-সাহিত্য-শরণ,
শ্রীল শ্রীযুক্ত কুমার শরৎকুমার রায় বাহাদুর,
প্রশান্তোদারচরিতেষু।
নয়নের আগে মোর মৃত্যু-বিভীষিকা;
রুগ্ন, ক্ষীণ, অবসন্ন এ প্রাণ-কণিকা।
ধূলি হ’তে উঠাইয়া বক্ষে নিলে তারে,
কে ক’রেছে তুমি ছাড়া? আর কেবা পারে?
কি দিব, কাঙ্গাল আমি? রোগশয্যোপরি,
গেঁথেছি এ ক্ষুদ্র মালা, বহু কষ্ট করি’;
ধর দীন-উপহার; এই মোর শেষ;
কুমার! করুণানিধে! দে’খো, র’ল দেশ।
মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল,
কটেজ ওয়ার্ড।
কলিকাতা, ১৩১৬ সাল, চৈত্র।
চিরকৃতজ্ঞ
গ্রন্থকার।
নিবেদন।
গল্পচ্ছলে ও সরল ভাষায় বালক-বালিকাগণকে নীতি-শিক্ষা দিবার উদ্দেশ্যে “অমৃত” প্রকাশিত হইল। কবিতাগুলি যাহাতে যুগপৎ শিক্ষাপ্রদ ও হৃদয়গ্রাহী হয়, তাহার জন্য চেষ্টা করিয়াছি। কতদূর সফলকাম হইয়াছি, বলিতে পারি না।
‘অষ্টপদী’ নামে ইহার কয়েকটী কবিতা ইতঃপূর্ব্বে ‘দেবালয়’ নামক মাসিক পত্রিকায় প্রকাশিত হইয়াছিল।
পুস্তকের নাম দেখিয়া সাধারণে চমকিত না হন, এ জন্য দু’একটী কথা বলা আবশ্যক। যে সকল নীতিবাক্য সার্ব্বজনীন, ও সার্ব্বকালিক, যাহা জাতি বা সম্প্রদায়বিশেষের নিজস্ব নহে, যাহা অমরসতারূপে চিরদিন মানবসমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে ও অনন্তকাল করিবে, এই নীতি কবিতাগুলিতে সেই সকল সত্যের অবতারণা করা হইয়াছে বলিয়া গ্রন্থের নাম “অমৃত” রাখা হইল; অমৃতের ন্যায় স্বাদু হইয়াছে, এরূপ অর্থ করিলে সঙ্গত অর্থ করা হইবে না।
কয়েকটী সুপরিচিত সংস্কৃত নীতি-শ্লোক ও বাঙ্গালা ইংরাজী গল্প হইতে তিন চারিটী কবিতার ভাব গ্রহণ করিয়াছি; কর্ত্তব্য বিবেচনায় ইহার উল্লেখ করিলাম।
কবিতাগুলির পরিচ্ছদ যতই জীর্ণ ও মলিন হউক, প্রিয়-সুহৃদ্ শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন ও শ্রদ্ধাভাজন শ্রীযুক্ত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী, বঙ্গ-সাহিত্যনায়কদ্বয়ের করুণা-কিরীটি ভূষিত হইয়া উহারা মহিমা ও গৌরবে উজ্জ্বল হইয়াছে। আমি এজন্য তাঁহাদিগের নিকট বিশিষ্টভাবে কৃতজ্ঞ।
পরিশেষে নিবেদন, পুস্তকখানি যাহাতে স্কুলপাঠ্য হইতে পারে, তৎপ্রতি লক্ষ্য রাখিয়াছি।
মেডিক্যাল কলেজ হাঁসপাতাল,
কটেজ ওয়ার্ড।
কলিকাতা, ১৩১৬ সাল, চৈত্র।
বিনয়াবনত
গ্রন্থকার।
দ্বিতীয় সংস্করণে গ্রন্থকারের নিবেদন।
এক মাস মধ্যে অমৃতের প্রথম সংস্করণ নিঃশেষ হইয়াছে, ইহা আমার প্রতি শিক্ষিত জনমণ্ডলীর সাধারণ কৃপা নহে। দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হইল। এবার আর আটটী নূতন নীতি-কবিতা যুক্ত করিয়া দিলাম।
প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হইবার পর, স্বনামধন্য মহাপুরুষ শ্রীযুক্ত শরৎকুমার লাহিড়ী মহাশয়ের সহিত আমার সাক্ষাৎ হয়। তিনি আমার অবস্থা আনুপূর্ব্বিক অবগত হইয়া আমার প্রতি প্রসন্ন হয়েন, এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া আমার আনুকূল্যের নিমিত্ত অমৃতের মুদ্রণভার গ্রহণ করিয়া তাঁহার প্রসিদ্ধ সুবৃহৎ মুদ্রাযন্ত্রে অতি অল্পদিন মধ্যে পুস্তকখানি মুদ্রিত করিয়া দিয়াছেন। কেবল মুদ্রণের ন্যয় ব্যতীত কমিসন্ বা অন্য আকারে কপর্দ্দক আমার নিকট গ্রহণ করেন নাই ও করিবেন না। তাঁহার এই অসাধারণ করুণার জন্য, ও তাঁহার প্রেসের অধ্যক্ষ বন্ধুবর শ্রীযুক্ত অতুলচন্দ্র ঘটক বি, এ, মহাশয়ের অনুগ্রহের নিমিত্ত, আমি তাঁহাদের নিকট যে ঋণ-পাশে বদ্ধ রহিলাম, তাহা আমার এ জীবনে পরিশোধ করিবার উপায় নাই।
পরিশেষে নিবেদন, ভগবানের কৃপায় যদি অমৃতের আর এক সংস্করণ দেখিয়া যাইতে পারি, তবে অমৃতে আরও নীতি-কবিতা যোগ করিয়া উহাকে পুষ্ট করিবার সাধ রহিল; মূল ভগবানের ইচ্ছা। ইতি ——
মেডিক্যাল কলেজ হাঁসপাতাল,
কটেজ নং ১২।
কলিকাতা, আষাঢ়, ১৩১৭।
বিনয়াবনত
গ্রন্থকার।
সূচীপত্র।
‘অমৃত’ সম্বন্ধে অভিমত।
শ্রীযুক্ত দীনেশচন্দ্র সেন মহাশয়ের অভিমত।
বাণী ও কল্যাণীর লেখক নিদারুণ রোগ-শয্যা হইতে আমাদিগকে এই ক্ষুদ্র কবিতা-কুন্দ উপহার দিয়াছেন। যে রজনীকান্তকে লইরা আমরা কত রজনী আনন্দ সাগরে ভাসিয়াছি, যাঁহার প্রতিভা মূর্ত্তিমতী মতী শ্রীর ন্যায় উৎসবক্ষেত্রকে উজ্জ্বল করিয়াছে, যাঁহার রচিত ব্যঙ্গ ও তত্ত্ববহুল গীতি, রৌদ্রমিশ্র বৃষ্টির ন্যায় বন্ধু-সমাজে অজস্র কৌতুক ও রসধারা বিতরণ করিয়াছে, আজ সেই ভক্ত ও সুগায়ক কবি উৎকট রোগে বাক্-হীন। বসন্তের কোকিলকে কণ্ঠ-রুদ্ধ দেখিলে কাহার প্রাণ ব্যথিত না হয়? “আমি তো তোমারে চাহিনি জীবনে, তুমি অভাগারে চেয়েছ”, “তারে যে প্রভু বলিস্, দাস হলি তুই কবে?”— প্রভৃতি গান এখন বাঙ্গালার ঘরে ঘরে শুনিতে পাই। এই গানগুলি যখন রজনীকান্ত গাহিতেন, তখন মনে হইত, বঙ্গ-সাহিত্যের নব-যুগে ইনি দ্বিতীয় রামপ্রসাদ। তাঁহার উৎকট রোগের সংবাদে তদীয় সুবৃহৎ বন্ধু-সমাজে গুরুতর আশঙ্কার কারণ উপস্থিত হইয়াছে। আর কি এ সকল অপূর্ব্ব গান তাঁহার কণ্ঠে আমরা শুনিতে পাইব না? রোগশীর্ণ করে এই অমৃতবিন্দু লইয়া তিনি পাঠকের সম্মুখে উপস্থিত হইয়াছেন; আমরা তাঁহাকে এই অবস্থার সাহিত্য সেবায় নিযুক্ত দর্শনে বিস্মিত হইয়া, পুস্তক ভুলিয়া তাঁহারই কথা বলিতেছি। অপ্রাসঙ্গিক হইলেও ইহা স্বাভাবিক।
এই ‘অমৃত’ রবিবাবুর কণিকার আদর্শে রচিত। শুষ্কনীতির পিল শিশুদের গলাধঃকরণ করাইতে যাইয়া কত বেত্র চূর্ণ হইয়া গিয়াছে, কত কোমল পৃষ্ঠ ক্ষত-বিক্ষত হইয়াছে ও কত গুরু-চীৎকারে পাঠশালার জীর্ণ-গৃহ প্রকম্পিত হইয়াছে, তাহার ইয়ত্বা নাই। সেই তিক্ত পিলের পরিবর্ত্তে রজনীকান্ত বালকদের জন্য এই অমৃতের ব্যবস্থা করিয়াছেন; আমরা তাঁহার নিকট এই জন্য ঋণী রহিলাম। ভগবান্ তাঁহার আরোগ্য বিধান করুন।
১লা বৈশাখ, ১৩১৭,
১৯, কাঁটাপুকুর লেন,
বাগবাজার, কলিকাতা।
শ্রীদীনেশচন্দ্র সেন।
শ্রীযুক্ত রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মহাশয়ের
অভিমত।
সুকবি শ্রীযুক্ত রজনীকান্ত সেন মহাশয়ের বঙ্গদেশে নুতন করিয়া পরিচয় দেওয়া অনাবশ্যক। তাঁহার রচনায় যে বাঙ্গালী এ পর্য্যন্ত মুগ্ধ হইবার অবসর পায় নাই, সে দুর্ভাগ্য। তাঁহার কবিতা, তাঁহার গান বঙ্গসাহিত্যে যে উপাদেয় রসের সৃষ্টি করিয়াছে, তাহাতে যে বঞ্চিত আছে, তাহাকে হতভাগ্য না বলিব কিরূপে? বিশুদ্ধ হাস্যরসের ফেনিল উচ্ছ্বসিত তরঙ্গে তিনি সহৃদয়ের হৃদয়কে আন্দোলিত করিতে যেমন সমর্থ, গভীর রসের প্লাবনের মধ্যে নিমগ্ন করিয়া দিতেও তিনি তেমনি পটু। রজনীবাবুর মত সন্তানকে ক্রোড়ে করিয়া বঙ্গের ভারতী ধন্যা হইয়াছেন।
বিধাতার ইচ্ছায় রজনীবাবুর কণ্ঠ আজি নীরব। যে কণ্ঠোত্থিত সঙ্গীতের উন্মাদনায় এই কয় বৎসর ধরিয়া স্বদেশভক্তগণ মত্ত ছিলেন, সে কণ্ঠ হইতে সে সঙ্গীত আর রাহির হইবে না। ভারতী দেবী কতদিন তাঁহার প্রিয় পুত্রকে ক্রোড়ে ধরিয়া রক্ষা করিবেন, তাহা বিধাতা ভিন্ন অন্যে জানে না। কবি যে রোগ-শয্যায় শয়ন করিয়াছেন, তাহা হইতে উত্থিত হইবেন কি? তাঁহার কণ্ঠ নীরব হইয়াছে, কিন্তু লেখনী এখনও বিশ্রাম চাহিতেছে না! যে কয়েকটী ক্ষুদ্র কবিতার সমষ্টিকে তিনি “অমৃত” নামে অভিহিত করিয়াছেন, তাহা অমৃতের কণিকা, সন্দেহ নাই। রোগশয্যায় থাকিয়াও তাঁহার স্বদেশীগণকে এই অমৃত-কণিকা পানে তৃপ্ত করিতেছেন, ইহা তাঁহারই উপযুক্ত।
তাঁহার স্বদেশ তাঁহার নিকট কৃতজ্ঞতা-পাশে বদ্ধ আছে। কবির এই দুঃসময়ে সেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সময় আসিয়াছে। আশা করি, বঙ্গদেশ তাঁহার নিকট ঋণমোচনে সাধ্যমত প্রয়াস পাইবে।
শ্রীরামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।
বসুমতী, ৪ঠা আষাঢ়, ১৩১৭
কবির নব-রচিত “অমৃত” পান করিয়া আমরা অপূর্ব্ব আনন্দ লাভ করিয়াছি। কবি “নিবেদনে” লিখিয়াছেন,—“গল্পচ্ছলে ও সরল ভাষায় বালক-বালিকাগণকে নীতিশিক্ষা দিবার উদ্দেশ্যে ‘অমৃত’ প্রকাশিত হইল।” তাঁহার সে উদ্দেশ্য সিদ্ধ হইয়াছে। যে সকল নীতিবাক্য সার্ব্বজনীন ও সার্ব্বভৌমিক, তাহার সমাবেশে “অমৃতে”র অমৃতনাম সার্থক হইয়াছে। কবি এই ক্ষুদ্র খণ্ডকাব্যে যে সকল নীতির অবতারণা করিয়াছেন, তাহা সকল সম্প্রদায়ের উপজীব্য। অদূর-ভবিষ্যতে ইহার অনেকগুলি কবিতা ‘প্রবচনে’ পরিণত হইবে, সে বিষয়ে সন্দেহ করিবার কারণ নাই। শিশুরা এই অমৃতে নবজীবন লাভ করিবে;—— যাঁহারা শিশুর জনক-জননী হইয়াছেন, তাঁহারাও এই “অমৃতে” সঞ্জীবনী সুধা পান করিবার অবকাশ পাইবেন। “অমৃত” যদি বাঙ্গালার গৃহে গৃহে গৃহ-পঞ্জিকার ন্যায় বিরাজ না করে, তাহা হইলে বলিব, সে দুর্ভাগ্য কবির নয়, সে শোচনীয় দুর্ভাগ্য বাঙ্গালীর।
হিতবাদী, ৩রা আষাঢ়, ১৩১৭
* * * রজনীকান্ত শীর্ণ দেহে দীর্ণ মনে যে অমৃতের ধারা প্রচার করিয়াছেন, তাহা যে সত্যসত্যই অমৃত, সে কথা কি পাঠকগণকে খুলিয়া বলিতে হইবে? ভাষা প্রাঞ্জল, নীতি সিদ্ধান্তগুলি চিরপরিচিত, ছন্দোবন্ধ অতি সোজা, অথচ লেখার ভঙ্গী সুমধুর; মনে হয় সাধ করিয়া এমন প্যপুস্তক পুত্রকন্যার হাতে দিই। যাঁহারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক নির্ণয় করেন, তাঁহারা “অমৃতের” আদর করিলে, মনুষ্যত্বের সমাদর করিবেন, বাঙ্গালা সাহিত্যের মর্য্যাদা রাখিবেন, দুঃস্থ সাহিত্যসেবীর অন্নমুষ্টির সংস্থান করিবেন। আমাদের তাই সনির্ব্বন্ধ অনুরোধ যে এই পুস্তকখানি বাঙ্গালার সকল পাঠশালার পাঠ্য পুস্তক বলিয়া নির্ণীত হউক।
বঙ্গবাসী, ১৮ই জ্যৈষ্ঠ, ১৩১৭
* * * কবিতাগুলি বড় মিষ্ট। আজকাল ছাত্রদিগের যে সব পদ্য পাঠ্য আছে, তাহার আলোচনা করিলে বলিতে হয় ‘অমৃত’ পুস্তকখানি স্কুলের পাঠ্য হওয়া উচিত।
সঞ্জীবনী, ২রা আষাঢ়, ১৩১৭
‘অমৃত’ কয়েকটী ক্ষুদ্র কবিতার সমষ্টি। প্রত্যেক কবিতা আট লাইনে সম্পূর্ণ। * * * কবিতাগুলির মধ্যে যে সকল চিরন্তন নীতিবাক্য নিহিত রহিয়াছে, তাহা দ্বারা বালক বালিকাদিগের কোমল হৃদয় ও সরল মন শৈশব হইতেই সৎপথে পরিচালিত হইবে। যে সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র গল্পের মধ্যে এই নীতি-বাক্যগুলি সন্নিবেশিত হইয়াছে, তাহা শিশুদিগের নিকট নিতান্ত কৌতুকপ্রদ ও প্রীতিকর হইবে। লেখক এই কাব্য-কণিকার মধ্য দিয়াও তাঁহার অসামান্য কবিপ্রতিভা পরিস্ফুটিত করিয়াছেন; শিশুগণের কোমল অন্তঃকরণে এই কাব্যরসধারা এক নব আনন্দের সৃষ্টি করিবে। আমাদের জাতীয় সাহিত্যে এইরূপ নীতি পুস্তকের যত অধিক সৃষ্টি হয়, দেশের ততই মঙ্গল! আমরা এই পুস্তকের বহুল প্রচার প্রার্থনা করি।
অটল
অটল।
এ সংসার, মায়াজাল করিয়া বিস্তার,
সাধুর ঘটা’তে চায় চিত্তের বিকার;
সাধু কিন্তু নাহি ভোলে সংসার মায়ায়,
প্রকৃত পুণ্যের পথে সোজা চ’লে যায়।
মরু যথা, মরীচিকা-মায়া বিস্তারিয়া,
দিতে চায় উষ্ট্রের বিভ্রম জন্মাইয়া;
উষ্ট্র কিন্তু সে মায়ায় ভোলে না কখন,
প্রকৃত জলের দিকে করে সে গমন।
অতিপরিচয়ের দোষ
অতি পরিচয়ের দোষ।
সদা যেই বাস করে চন্দনের বনে,
চন্দনেরে সেজন ইন্ধন-তুল্য গণে।
যাহার বসতি পূত-ভাগীরথী-তীরে,
তা’র কাছে ভেদ নাই কূপ-গঙ্গা নীরে।
সুগন্ধি উদ্যানে যেই সদা করে বাস,
তার কাছে লোপ পায় পুষ্পের সুবাস।
গিরিশোভা নাহি হেরে গিরি-অধিবাসী;
অতি-পরিচয়, সম্মানীর মান-নাশী।
অদৃষ্টের পরিহাস
অদৃষ্টের পরিহাস।
দীন, বৃদ্ধ পঙ্গু এক ভিক্ষা করি’ খায়,
একদিন বিধাতার কাছে অশ্ব চায়।
দৈবযোগে এক পান্থ যান সেই পথে,
রুগ্ন অশ্বশিশু ল’য়ে পড়েন বিপদে;
যুক্তি করি’, সাবধানে বাঁধি’ ল’য়ে তারে,
তু’লে দেন বাহক পঙ্গুর পিঠে ঘাড়ে।
পঙ্গু বলে, “বিধি মোরে দিল বটে ঘোড়া,
উল্টা করিয়া দিল;—কপাল যে পোড়া।”
অধমাধম
অধমাধম।
রাখে না নিজের তরে, সব দান করে,
‘উত্তম’ বলিয়া তার খ্যাতি চরাচরে;
কিছু রাখে নিজ তরে, কিছু করে দান,
‘মধ্যম’ সে জন, তা’রো প্রচুর সম্মান;
দান নাই, সব যেই নিজ তরে রাখে,
‘অধম’ সে জন, সবে ঘৃণা করে তা’কে।
নিজে নাহি ভোগ করে, না দেয় অপরে,
বল দেখি, সেই জীব কোন্ সংজ্ঞা ধরে?
অসাধুর সঙ্গ
অসাধুর সঙ্গ।
সরল হৃদয় এক সাধু অকপট
হেরিয়া, করিল মৈত্রী, এক ধূর্ত্ত শঠ;
যুক্তি দিয়া, সাধুরে বিদেশে ল’য়ে যায়,
অতিথি হইল এক ধনীর বাসায়।
নিশায় করিয়া চুরি সেই দুষ্ট শঠ,
বহু অর্থ ল’য়ে দিল গোপনে চম্পট।
গৃহস্বামী প্রাতে উঠি,’ সাধুরে ধরিল,
চোর বলি’ বাঁধি,’ কত প্রহার করিল।
অসারতা
অসারতা।
আঘাত করিলে কাংস্যে, যত শব্দ হয়,
স্বর্ণে তার শতাংশের একাংশও নয়;
প্রচুর পল্লব পত্র যে বৃক্ষে জনমে,
বিধির বিধানে তার ফল যায় ক’মে;
মেদ, মাংস বে’ড়ে, যার দেহ স্থূল হয়,
শ্রমসাধ্য কর্ম্মে তার ধ্রুব পরাজয়;
বাহিরে দেখিবে যার বৃথা আড়ম্বর,
অন্তঃসার শূন্য সেই গুণ-হীন নর।
আপেক্ষিক তুলনা
আপেক্ষিক তুলনা।
সত্যের সমান বল নাহি ত্রিভুবনে;
সৎকার্য্য দানের তুল্য, না হেরি নয়নে।
ঈশ-সেবা-সম, নাই চিত্তের শোধক;
পরপীড়া তুল্য, নাই সদ্গতি-রোধক।
পর-উপকার-সম, পুণ্য নাহি আর;
পক্ষপাত-তুল্য, আর নাহি অবিচার।
স্বাস্থ্য-হীনতার সম, দুঃখ কিছু নাই;
অবাধ্য পুত্রের সম নাহিক বালাই।
আশ্রিত-সৎকার
আশ্রিত-সৎকার।
সহস্র আশ্রিত-লতা কহে অশ্বত্থেরে,
“বড় ব্যথা পাই, তরু, তব কষ্ট হে’রে;
আমরা দুর্ব্বল-লতা তব গলগ্রহ,
মোদের রক্ষিতে তুমি কি যাতনা সহ!
রোদ, বৃষ্টি, ঝড় লও নিজের মাথায়,
ব্যথা যেন নাহি লাগে আমাদের গায়।”
অশ্বত্থ কহিছে, “এই আশ্রিত-সৎকার,
এর সুখে, ক্লেশ-বোধ হয় না আমার।”
উচ্চ নীচ
উচ্চ নীচ।
উড়িয়া মেঘের দেশে চিল কহে ডাকি’,—
“কি কর, চাতক ভায়া, ধূলি-মাঝে থাকি?
কোথায় উঠেছি, চেয়ে দেখ একবার,
এখানে আসিতে পার সাধ্য কি তোমার?”
চাতক কহিছে, “তবু নীচদৃষ্টি তব;
সদা ভাব ‘কার কিবা ছোঁ মারিয়া ল’ব।’
মেঘবারি ভিন্ন, অন্য জল নাহি খাই,
তাই, আমি নীচে থেকে ঊর্দ্ধমুখে চাই।”
উদার প্রতিশোধ
উদার প্রতিশোধ।
প্রভু ভৃত্য দুইজনে নৌকা বাহি’ যায়,
প্রবল বাতাসে তরী হ’ল মগ্ন-প্রায়;
ভার কমাইয়া, তরী রক্ষা করিবারে,
ভৃত্যে ফে’লে দিল প্রভু তরঙ্গ-মাঝারে;
অমনি ডুবিল নৌকা, প্রভু পড়ে জলে,
“ভয় নাই, আমি আছি,” ভৃত্য ডে’কে বলে;
সাঁতার না জানে প্রভু, ক্ষুব্ধ মহাত্রাসে,
পৃষ্ঠে বহি’, ভৃত্য তারে তীরে নিয়ে আসে।
উপযুক্ত কাল
উপযুক্ত কাল।
শৈশবে সদুপদেশ যাহার না রোচে,
জীবনে তাহার কভু মূর্খতা না ঘোচে;
চৈত্র মাসে চাষ দিয়া না বোনে বৈশাখে,
কবে সেই হৈমন্তিক ধান্য পেয়ে থাকে?
সময় ছাড়িয়া দিয়া, ক’রে পণ্ডশ্রম,
ফল চাহে, সেও অতি নির্ব্বোধ, অধম;
খেয়া তরী চ’লে গেলে, বসে এসে তীরে,
কিসে পার হবে, তরী না আসিলে ফিরে?
উপযুক্ত মাত্রা
উপযুক্ত মাত্রা।
বায়ু কহে, “দীপ, তব আমিই সম্বল;”
দীপ বলে, “যতক্ষণ না হও প্রবল।”
বৃষ্টি বলে, “শস্য, আমি তোমার সহায়;”
শস্য বলে, “অতিরিক্ত হ’লে, প্রাণ যায়।”
বংশী কহে, “কর্ণ, তোমা পরিতৃপ্ত করি;”
কর্ণ কহে, “অতি তীক্ষ্ণ-স্বরে, প্রাণে মরি।”
বিষ কহে, “রোগি, আমি তোমার ঔষধি;”
রোগী কহে, “উচিত মাত্রায় রহ যদি।”
একতা
একতা।
বর্ণমালা কহে, “দেখ, সীসের অক্ষরে,
আমাদের রে’খে দেয় ভিন্ন ভিন্ন ঘরে।
শব্দের আকারে যবে মোদের সাজায়,
অর্থযুক্ত হই ব’লে শক্তি বে’ড়ে যায়;
বহু শব্দযোগে, ধরি বাক্যের আকার, .
আরো বৃদ্ধি পায় শক্তি, সন্দেহ কি তার?
বাক্যে বাক্যে যোগ করি’ সাজায় যখন,
গ্রন্থরূপে কত জ্ঞান করি বিতরণ।”
কথার মূল্য
কথার মূল্য।
নিতান্ত দরিদ্র এক চাষীর নন্দন,
উত্তরাধিকার-স্বত্বে পায় বহু ধন;
সে সংবাদ নিয়ে এল ব্যবহারজীবী,
বলে “চাষী, এত পেলি, আমারে কি দিবি?”
চাষী বলে, “অর্দ্ধভাগ দিব সুনিশ্চয়।”
গণনায় অর্দ্ধ অংশে কোটি মুদ্রা হয়,
সবে বলে, “কি দলিল? কেন দিতে যাস্?”
চাষী বলে, “কথা দিয়ে ফেলিয়াছি,—বাস্।”
করুণাময়
করুণাময়।
সংসারের দুঃখ, ব্যথা, বিপদের পাশে,
কাহার আদেশে সুখ-শান্তি পরকাশে?
তীরে তপ্ত বালি যেন প্রচণ্ড অনল,
পাশে বহাইল কেবা প্রবাহ শীতল?
সিন্ধুমাঝে দিক্হারা নাবিকের তরে,
কে রেখেছে ধ্রুবতারা বসায়ে উত্তরে?
ভূমিষ্ঠ হবার আগে স্তন্যপ সন্তান,
কে করেছে মাতৃস্তনে দুগ্ধের বিধান?
সমাপ্ত
কাচের শিশি ও মে’টে সরা
কাচের শিশি ও মে’টে সরা।
শিশি বলে, “মে’টে সরা, তুই শুধু মাটি,
নির্ম্মল আমার দেহ, স্বচ্ছ, পরিপাটি;
অনাদরে গৃহকোণে ফে’লে রাখে তোরে,
আমারে তুলিয়া রাখে কত যত্ন ক’রে!”
মেটে সরা কহে, “ভায়া, গর্ব্ব কর দূর,
হাত থেকে প’ড়ে গেলে দুজনাই চূর;
আরো এক কথা, ভাই, জেনে রে’খ খাঁটি,
আমি মাটি, তোমারও বুনিয়াদ মাটি!”
কৃতঘ্নতা
কৃতঘ্নতা।
নৌকা ডু’বে গেল ঝড়ে; দেখি’ তীর হ’তে
ভীত, অবসন্ন মাঝি ভে’সে যায় স্রোতে,
ঝাঁপায়ে সাহসী যুবা তরঙ্গে পড়িল,
অতি কষ্টে বিপন্নেরে উদ্ধার করিল।
মাঝি বলে, “প্রাণ দিলে, কি দিব তোমারে?
চল, ভৃত্য হ’য়ে র’ব, তোমার দুয়ারে।”
রাত্রি-যোগে যুবকের চুরি করি’ সব,
মাঝি-ভৃত্য পলাতক; —যুবক নীরব!
ক্রোধ ও লোভ
ক্রোধ ও লোভ।
ক্রোধ বলে, “লোভ ভাই, তুমি বড় খল,
তোমার কুহুকে পড়ি’ নিষ্ঠুরের দল,
পরের মাথায় করি’ লগুড় প্রহার,
পলায়ন করে, সব লু’ঠে নিয়ে তার।”
লোভ কহে, “যা” বলিলে করি তা’ স্বীকার,
কিন্তু, তুমি পূর্ণরূপে স্কন্ধে চাপ যা’র,
সে শুধু অন্যেরে মারি’ ক্ষান্ত নাহি হয়,
নিজের মাথায় শেষে প্রহরে নিশ্চয়।”
ক্ষমা
ক্ষমা।
দশবিঘা ভূঁয়ে ছিল আশি মণ ধান,
সারা বৎসরের আশা, কৃষকের প্রাণ,
খেয়ে গেছে প্রতিবাসী গোয়ালার গরু!
ক্ষেতগুলি প’ড়ে আছে, শ্মশান, কি মরু!
ক্ষেতের মালিক, আর গরুর মালিক,
কেহই ছিল না বাড়ী; চাষা বলে “ঠিক্,—
আহার পাইয়া পথে, পরম-সন্তোষ,
গরুতো বোঝেনা কিছু, ওদের কি দোষ?”
ঘৃণিতের প্রত্যুত্তর
ঘৃণিতের প্রত্যুত্তর।
অট্টালিকা কহে, জীর্ণ কুটীরেরে ডাকি’,
“বিপদ ঘটালি, কুঁড়ে, মোর কাছে থাকি’;
হঠাৎ আগুণ লে’গে গেলে, তোর গায়,
আমারো জানালা কড়ি, সব পু’ড়ে যায়;”
কুটীর কহিছে, “ভায়া, আমারো যে ভয়;
কাছে আছ, যদি কভু ভূমিকম্প হয়,
তুমি চূর্ণ হবে, আমি গরীব বেচারী,
চাপা প’ড়ে মারা যাব, ভয় দু’জনারি।”
চিত্রিত মানব
চিত্রিত মানব।
অর্থ আছে, কপর্দ্দক নাহি করে ব্যয়;
বিদ্যা আছে, কা’রো সনে কথা নাহি কয়;
বুদ্ধি আছে, ব’সে থাকে কাজ নাহি করে;
রূপ আছে, বদ্ধ থাকে গৃহের ভিতরে;
শক্তি আছে, নাহি করে পর-উপকার,
তেজঃ আছে, দাঁড়াইয়া দেখে অবিচার;
সে নর চিত্রিত এক ছবির মতন,—
গতি নাই, বাক্য নাই, জড়, অচেতন।
তুলনায় সুখ দুঃখ
তুলনায় সুখদুঃখ।
বসিয়া নদীর তীরে, চাহি’ নদীপানে,
কাঁদিতেছে এক নারী অবসন্ন প্রাণে;
পথিক জিজ্ঞাসে তা’রে শোকের কারণ,
নারী কহে, “ডু’বে গেছে সন্তান-রতন।”
পান্থ বলে, “এক ছেলে গেছে কাঁদ তাই?
আমার দুঃখের বার্ত্তা তোমারে শুনাই,—
আট পুত্র চারি কন্যা, ডুবেছে এ নীরে;
আমারে দেখিয়া, মাগো, বাড়ী যাও ফি’রে।”
দয়া
দয়া।
মাতৃশ্রাদ্ধে নিজহাতে কাঙ্গাল-বিদায়
করিছেন মহারাজ, প্রাচীন প্রথায়।
লইয়া দু’আনা, আর চাল অর্দ্ধসের,
ঘুরিয়া দুখিনী এক আসিয়াছে ফের।
দ্বারী ধ’রে ল’য়ে যায় রাজার সম্মুখে,
রাজা বলে, “এসেছিস্ ঘু’রে কোন্ মুখে?”
দীনা কেঁদে বলে, “পাঁচ শিশু, রুগ্ন স্বামী।”
রাজা বলে, “লক্ষ মুদ্রা তোরে দিব আমি।”
সমাপ্ত।
দাম্ভিকের পরাজয়
দাম্ভিকের পরাজয়।
গিরি কহে, “সিন্ধু, তব বিশাল শরীর,
আমার চরণে কেন লুটাইছ শির?
এ অভয়-পদে যদি লয়েছ শরণ,
কি প্রার্থনা, কহ আমি করিব পূরণ।”
সাগর হাসিয়া কহে, “আমি রত্নাকর,
আমার অভাব কিছু নাই, গিরিবর;
তব পিতৃ-পিতামহ ডু’বেছে এ নীরে,
সেই বার্ত্তা দিতে আমি আসি ঘু’রে ফিরে।”
দাম্ভিকের শিক্ষালাভ
দাম্ভিকের শিক্ষালাভ।
সিংহ বলে, “কালোমেঘ, এস দেখি কাছে,
যুদ্ধ ক’রে দেখি, কার কত বল আছে!
ক্রমাগত দূর থে’কে কর ডাকাডাকি,
সম্মুখসমরে, ভায়া, ভয় পাও নাকি?”
মেঘ বলে, “মৃত্যু ডে’কে আনিস্ নির্ব্বোধ!
আমার শকতি কেবা করে প্রতিরোধ?”
অদূরে পড়িল বজ্র, সিংহ মূর্চ্ছা যায়;
মূচ্ছার্ভঙ্গে, সভয়ে, মেঘের পানে চায়।
দ্বাদশ দান
দ্বাদশ দান।
অন্নহীনে অন্নদান, বস্ত্র বস্ত্রহীনে,
তৃষাতুরে জলদান, ধর্ম্ম ধর্ম্ম-দীনে,
মূর্খজনে বিদ্যাদান, বিপন্নে আশ্রয়,
রোগীরে ঔষধদান, ভয়ার্ত্তে অভয়,
গৃহহীনে গৃহদান, অন্ধেরে নয়ন,
পীড়িতে আরোগ্যদান, শোকার্ত্তে সান্ত্বন;
স্বার্থ-শূন্য হয় যদি এ দ্বাদশ দান,
স্বর্গের দেবতা নহে দাতার সমান।
পরার্থে আত্মত্যাগ
পরার্থে আত্মত্যাগ।
শির কহে, “ছত্র ভাই, মোর রক্ষা তরে,
নিজে দগ্ধ হও তীব্র তপনের করে;”
ছত্র বলে, “পর-অর্থে আত্মত্যাগ সম
নাহি সুখ এসংসারে, নাহিক ধরম।”
চরণ কহিছে দুখে ডাকি’ পাদুকারে,
“নিজে ক্ষত হয়ে, বন্ধু, বাঁচাও আমারে;
পাদুকা কহিছে, “দেখ, রক্ষিতে তোমায়,
নিজে ছিন্ন হই, কিন্তু কি আনন্দ তায়।”
পরিণতি
পরিণতি।
নির্ভীক্, স্বাধীন-চেতা, এক চিত্রকর,
আঁকিল শ্মশান-ভূমি, অতি ভয়ঙ্কর;
একটী কপাল, আর অস্থি এক খানি,
এক স্থানে দেখায়েছে, তুলি দিয়া টানি’;
হেরিয়া দেশের রাজা বলে, “চমৎকার!
কিন্তু এটা কার অস্থি? কপাল বা কার?”
চিত্রকর বলে, “অস্থি মম কুক্কুরের,
কপাল, পিতার তব, হে মত্ত কুবের!”
পরিহাসের প্রতিফল
পরিহাসের প্রতিফল।
পরিহাস-ভরে, নর কহে, “রে জোনাকি!
তিমির-বিনাশে চেষ্টা করিছিস্ নাকি?
কি আশ্চর্য্য! ভাগ্যে ওই আলোটুকু আছে,
তাই তোরে দেখা যায় অন্ধকার মাঝে;
তোর পক্ষে, ক্ষুদ্রজীব, এই তো প্রচুর;
তুই কি করিবি কীট, অন্ধকার দূর?”
জোনা কী বলিছে, “ভায়া, কিসের বড়াই?
তোমার দেহে তো আলো একটুও নাই!”
পরোপকার
পরোপকার।
নদী কভু পান নাহি করে নিজ জল,
তরুগণ নাহি খায় নিজ নিজ ফল;
গাভী কভু নাহি করে নিজ দুগ্ধ পান,
কাষ্ঠ, দগ্ধ হয়ে, করে পরে অন্নদান;
স্বর্ণ করে নিজরূপে অপরে শোভিত,
বংশী করে নিজস্বরে অপরে মোহিত;
শস্য জন্মাইয়া, নাহি খায় জলধরে,
সাধুর ঐশ্বর্য্য সুধু পরহিত-তরে।
প্রকৃত বন্ধু
প্রকৃত বন্ধু।
লেখনী বলিছে, দুখে ডাকি’ ছুরিকারে,
“কি দোষ করেছি? তুমি কাট যে আমারে?
সহজে দুর্ব্বল আমি তব তুলনায়,
সবল দুর্ব্বলে মারে, শোভা নাহি পায়।”
ছুরী হে’সে কহে, “ভাই, এ কেমন ভ্রম?
জীবের মঙ্গল হেতু তোমার জনম;
কার্য্য-উপযোগী করি, কাটিয়া তোমায়,
নতুবা জীবন তব বিফলে যে যায়।”
প্রাণীহিংসা ও পরপীড়া
প্রাণীহিংসা ও পরপীড়া।
সন্ন্যাসীরে দেখি’, এক রাজপুত্র কহে,
“আহারের ক্লেশ তব হেরি’ প্রাণ দহে;
মৎস্য, মাংস, দধি, দুগ্ধ, খাদ্যের প্রধান;
তোমার কপালে কেন শাকান্ন-বিধান?”
সন্ন্যাসী বলিছে, “জীবহিংসা নাহি করি,
এ কারণ মৎস্য-মাংস-আদি পরিহরি;
গোবৎসে বঞ্চিয়া যারা দধি দুগ্ধ খায়,
স্বার্থতরে পর-পীড়া তাহারা ঘটায়।”
বংশ-গৌরব
বংশগৌরব।
নীচবংশ ব’লে, ঘৃণা ক’রনা কখন,
তা’র মধ্যে জন্মে কত অমূল্য রতন;
কর্দ্দমাক্ত পুকুরের অপেয় যে জল,
তা’র মাঝে ফু’টে থাকে সুরভি কমল।
উচ্চ বংশ দে’খি, হেন ধারণা না হয়,—
শান্ত, ধীর, সুবিদ্বান্ জনমে নিশ্চয়;
বনিয়াদি বটবৃক্ষ, কত নাম তার!
অখাদ্য তাহার ফল, কাকের আহার!
বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ
বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মীঃ।
গঙ্গা-সাগরের স্নানে পুণ্য বাঞ্ছা করি,
মহামূল্য হীরকের অলঙ্কার পরি,’
নামিলেন শেঠপত্নী সাগরের জলে,
অকস্মাৎ অলঙ্কার প’ড়ে গেল তলে;
কাঁদি’ শেঠপত্নী কহে, “তুমি রত্নাকর,
ভূষণ ফিরা’য়ে দেহ, করুণাসাগর!”
সিন্ধু কহে, “সিন্ধু-পোতে উঠি’ তব স্বামী
দূরে যাক্, লক্ষগুণ ফি’রে দিব আমি।”
বাহ্য-বন্ধু বা গুপ্ত-শত্রু
বাহ্য-বন্ধু বা গুপ্ত-শত্রু।
ক্ষীণ বন্য-লতা এক, অতি ক্ষুদ্র-কায়,
বিশাল বটের তলে, ভূমিতে লুটায়;
বট বলে, “ছায়াময় বাহু প্রসারিয়া,
আশ্রয় দিয়েছি তোমা, করুণা করিয়া;
নতুবা তপন-তাপে শুষ্ক হ’ত দেহ;”
লতা বলে, “ফিরে লহ অযাচিত স্নেহ;
তোমার করুণা মোর হইয়াছে কাল,
রৌদ্র বিনা হ’য়ে আছি বিশীর্ণ, কঙ্কাল।”
বিনয়
বিনয়।
বিজ্ঞ দার্শনিক এক আইল নগরে,
ছুটিল নগরবাসী জ্ঞান-লাভতরে;
সুন্দর-গম্ভীর-মূর্ত্তি, শান্ত-দরশন,
হেরি’ সবে ভক্তি ভরে বন্দিল চরণ।
সবে কহে, “শুনি, তুমি জ্ঞানী অতিশয়,
দু’একটি তত্ত্ব-কথা কহ মহাশয়।”
দার্শনিক বলে, “ভাই, কেন বল জ্ঞানী?
‘কিছু যে জানিনা,’ আমি এইমাত্র জানি।”
বিহ্বলতা
বিহ্বলতা।
তুফানে পড়িয়া মাঝি হাল যদি ছাড়ে,
তা’র কাছে নদীর তরঙ্গ আরো বাড়ে;
নিরাশ হইয়া রোগী ঔষধ না খায়,
দিনে দিনে রোগ তার আরো বৃদ্ধি পায়;
সভাস্থলে, ভীত হ’লে দেখি’ গুণি-গণ,
বক্তার হয় না কভু বাক্য-নিঃসরণ;
গিরিশিরে উ’ঠে, যদি ভয়ে মাথা ঘোরে,
নিশ্চয় শিখর হ’তে নীচে যাবে প’ড়ে।
বৃথাদর্প
বৃথাদর্প।
নর কহে, “ধূলিকণা, তোর জন্ম মিছে,
চিরকাল প’ড়ে র’লি চরণের নীচে;”
ধূলিকণা কহে, “ভাই, কেন কর ঘৃণা?
তোমার দেহের আমি পরিণাম কি না?”
মেঘ বলে, “সিন্ধু, তব জনম বিফল,
পিপাসায় দিতে নার এক বিন্দু জল;”
সিন্ধু কহে, “পিতৃনিন্দা কর কোন্ মুখে?
তুমিও অপেয় হবে পড়িলে এ বুকে।”
ভালমন্দ
ভাল মন্দ।
এক কূল ভাঙ্গে নদী, অন্য কূল গড়ে;
দূষিত বায়ুরে লয় উড়াইয়া ঝড়ে।
তীব্র কালকূটে হয় শুদ্ধ রসায়ন,
কাক করে কোকিলের সন্তান-পালন।
দংশে বটে, মধুচক্র গড়ে মধুকর,
বজ্র হানে যদি, বারি ঢালে জলধর।
সুখ-দুখ-ভাল-মন্দ-জড়িত সংসার;
অবিমিশ্র কিছু নাই সৃষ্ট বিধাতার।
মনোরাজ্যে জড়ের নিয়ম
মনোরাজ্যে জড়ের নিয়ম।
পাপের টানেতে যদি, কোন(ও) উচ্চমতি,
ক্রমে নিম্নদিকে পায় অব্যাহত-গতি,
জড় জগতের চির-প্রথা-অনুসারে,
অধঃপতনের বেগ ক্রমে তার বাড়ে।
একবার নীচে যদি প’ড়ে যায় মন,
তারে ক্রমে ঊর্দ্ধে তোলা কঠিন কেমন
জড় জগতের চির-প্রসিদ্ধ প্রথায়,
ঊর্দ্ধমুখে তার গতি শত বাধা পায়।
মাতৃ-স্নেহ
মাতৃস্নেহ।
হুঙ্কারিয়া কহে বজ্র, কঠোর গর্জ্জন,
“চূর্ণ করি গিরিকুল, দগ্ধ করি বন;
মুহূর্ত্তে সংহার আমি করি জীব-গণে;
মম সম শক্তিশালী কে আছে ভুবনে?”
শুনিয়া ধরণী, দুখে কহে, “দুষ্ট ছেলে!
এত শক্তিগর্ব্ব তুমি কোথা হ’তে পেলে?
তুমি অতি উচ্ছৃঙ্খল, দাম্ভিক সন্তান,
তথাপি মায়ের বুকে এস, আছে স্থান।”
রূপ ও গুণ
রূপ ও গুণ।
প্রজাপতি বলে, “যূথি, তুই সুধু সাদা,
কেমনে বুঝিবি মোর রূপের মর্য্যাদা?
নানা বর্ণে মোর পাখা, কেমন রঞ্জিত!
রূপ হ’তে বিধি তোরে করেছে বঞ্চিত।”
যূথি বলে, “কিন্তু ভাই, রূপ কিছু নয়,
গুণের আদর দেখ চিরস্থায়ী হয়।
চিরদিন দিয়ে থাকি মধুর সৌরভ;
বংশক্রমে আছে মোর গুণের গৌরব!”
শিক্ষা ও প্রবৃত্তি
শিক্ষা ও প্রবৃত্তি।
আগুন লাগিয়া গেল ব্রাহ্মণের বাড়ী;
সর্ব্বস্ব পুড়িয়া যায়, দেখি,’ তাড়াতাড়ি,—
প্রবেশিল বিদ্যানিধি নিজপাঠাগারে,
যত্নের পাণিনিখানি ছিল একধারে,—
বাঁচাইল ব্যাকরণ; গেল আর সব;
হেনকালে শুনা গেল ‘হায় হায়’ রব;
বিপ্র বলে, “পু’ড়ে গেল বেদান্তের টীকা;”
ব্রাহ্মণী কাঁদিছে, “গেল হাঁড়ি, আর সিকা”
সাধু-প্রকৃতি
সাধুপ্রকৃতি।
যত জল শু’ষে লয় প্রখর তপন,
প্রতিবিন্দু বৃষ্টিরূপে করে প্রত্যর্পণ;
বায়ু, তেজঃ, ক্ষিতি হ’তে বৃক্ষ যাহা পায়,
ফল-পত্র-কাণ্ডরূপে ফি’রি দিয়ে যায়;
গাভী যে তৃণটী খায়, করে জল পান,
তার সার, দুগ্ধরূপে করে প্রতিদান;
পরদ্রব্য সাধু যদি করেন গ্রহণ,
জীবের মঙ্গল হেতু করেন অর্পণ।
সার্থকতা
অমৃত।
সার্থকতা।
মহাবীর শিখ এক পথ বহি’ যায়,
পথ-পার্শ্বে কুষ্ঠরোগী পড়িয়া ধরায়;
বেদনায় হতভাগ্য করিছে চীৎকার,
ক্ষত স্থান বহি’ তার পড়ে রক্তধার।
দেখিয়া বীরের মনে দয়া উপজিল,
শিরস্ত্রাণ খুলি’ তার ক্ষত বাঁধি’ দিল;
শিরস্ত্রাণ কহে, “মাথে ছিলাম নগণ্য,
কুষ্ঠীর চরণে প’ড়ে হইলাম ধন্য।”
স্বাধীনতার সুখ
স্বাধীনতার সুখ।
বাবুই পাখীরে ডাকি’, বলিছে চড়াই,—
“কুঁ’ড়ে ঘরে থে’কে কর শিল্পের বড়াই;
আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা’পরে,
তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”
বাবুই হাসিয়া কহে, “সন্দেহ কি তায়?
কষ্ট পাই, তবু থাকি নিজের বাসায়;
পাকা হো’ক, তবু ভাই, পরের ও বাসা;
নিজ হাতে গড়া মোর কাঁচা ঘর, খাসা।”
স্রষ্টার কৌশল
স্রষ্টার কৌশল।
গিরিশিরে বৃষ্টি পড়ি’, জন্মায় তুষার,
নিদাঘে গলিয়া, জল হয় পুনর্ব্বার;
প্রথমে নির্ঝর, পরে বেগবতী নদী,
সিন্ধুবক্ষে জলরাশি ঢালে নিরবধি;
সিন্ধুবারি বাষ্প হ’য়ে তপনের করে,
নির্ম্মাণ করিছে শূন্যে জলধর-স্তরে;
সেই মেঘ গিরিশিরে পুনঃ ঢালে জল,
ঘুরে ফিরে তাই হয়, বিধির কৌশল।
হিংসার ফল
হিংসার ফল।
পাখীরা আকাশে উড়ে, দেখিয়া, হিংসায়,
পিপীলিকা, বিধাতার কাছে পাখা চায়;
বিধাতা দিলেন পাখা; দেখ তার ফল,—
আগুনে পুড়িয়া মরে পিপীলিকা-দল।
মানবের গীত শুনি’, হিংসা উপজিল,
মশক, বিধির কাছে সুকণ্ঠ মাগিল;
গীত-শক্তি দিল বিধি; দেখ তার ফল,—
নর-করাঘাতে মরে মশক সকল।