PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৮৮৭

মিবাররাজ

স্বর্ণকুমারী দেবী

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৮৭

প্রকাশনা-তথ্য

মিবাররাজ।

ঐতিহাসিক উপন্যাস।

শ্রীস্বর্ণকুমারী দেবী

প্রণীত।

কলিকাতা

আদি ব্রাহ্মসমাজ যন্ত্রে

শ্রীকালিদাস চক্রবর্ত্তি দ্বারা মুদ্রিত।

৫৫ নং অপর চিৎপুর রোড।

জ্যৈষ্ঠ ১৮০৯ শক।

মূল্য আট আনা।

উপহার।

ভাই বকুল,

কোমল মাধুরী মাখা বিমল বকুল,

তুই সখি প্রমময়ি, বরষার ফুল,—

বিকশিত অশ্রুজলে, সুবাসিত শুষ্ক দলে

ম্লানমুখে হাসি রাশি উজল অতুল।

তুই সখি প্রেমময়ি বরষার ফুল।

যে তোমার কাছে আসে, জুড়াও মধুর বাসে,

ক্ষুদ্র হৃদে উথলিত প্রণয় অকূল।

যে যায় দলিত রেখে, সেও গন্ধ যায় মেখে,

স্বরগের পুণ্য তুমি ধরণীর ভুল।

মুখানি দেখিলে তোর, প্রাণে বহে অশ্রু-লোর,

কি জানি কি ভাব ঘোরে হৃদয় আকুল।

সেই অশ্রু সেই তানে, সেই সুরে বাঁধা গানে

উপহার সঁপে আজি বকুলে বকুল,

লহ ভাই ধর, তুমি বরষার ফুল।

অষ্টম পরিচ্ছেদ

অষ্টম পরিচ্ছেদ।

বিকাল বেলা, একলিঙ্গদেবের মন্দিরের পশ্চাতে একটা উচ্চ প্রশস্ত ভূমিতে পশ্চিমের এক খণ্ড লাল মেঘের আলোর মধ্যে দাঁড়াইয়া একটী বালিকা ভীল গ্রামের দিকে উৎসুক নেত্রে চাহিয়াছিল। হঠাৎ আকাশের সেই লাল মেঘখানার মত তাহার মুখখানি হাসি হাসি হইয়া উঠিল, সে তাড়াতাড়ি পাশের কামিনী গাছের ঝোপের আড়ালে আসিয়া দাঁড়াইল। একটু পরেই গুহা নদীর ধার দিয়া সেই উচ্চ ভূমিতে আসিয়া দিদি দিদি করিয়া ডাকিতে ডাকিতে চারিদিকে তাহাকে খুঁজিয়া বেড়াইতে লাগিল, অবশেষে কামিনী গাছের কাছে আসিয়া তাহার চোখ টিপিয়া ধরিল বলিল—“কেমন জব্দ” —দিদি খিল খিল করিয়া হাসিয়া চোখ ছাড়াইয়া লইয়া তাহার দিকে ফিরিয়া দাঁড়াইল, তাহার নূতন বেশ দেখিয়া বলিল—

“এ কি গুহা, একি ভাই?”

গুহা হাসিয়া বলিল “রাজবেশ। দেখছিস কি আমি রাজা হয়েছি”

“আমরি কি রাজ বেশেরই শ্রী।”

বালিকা হাসিয়া বঁচিল না। হাসিটা শেষ হইলে গুহার সাজটা ভালরূপে নিরীক্ষণ করিতে করিতে বলিল—

“গুহা সত্যি যদি তুই রাজা হ’স! এই ঘাসের মুকুটটা তাহলে সোনার মুকুট হয়ে পড়বে? এই সুন্দর দুধের শরীর জরির পোষাকে এঁটে চারি পাশের লোকজনের মধ্যে সোনার সিংহাসনে গ্রামভারী চালে বসে থাকবি? ওমা সে কি বিশ্রী”!

সে চেহারাটা সত্যবতীর বড়ই খারাপ লাগিল, চেহারাটাকে একেবারে ধ্যাঁচ করিয়া দিবার অভিপ্রায়ে আরো বার দুই তিন ধরিয়া ক্রমাগত সে ছিছি করিয়া উঠিল কিন্তু তাহাতেও মন না উঠায় শেষে গুহাকে আদর করিয়া, তাহার খালি বুকে আস্তে আস্তে হাত বুলাইতে বুলাইতে আবার বলিল “এ আমাদের কেমন গুহা, ছি সে কি বিশ্রী?” ইহার পর সে চেহারা খানির ভাল হইবার আর কোনই যেন সম্ভাবনা রহিল না।

কিন্তু গুহা বলিল “কেন বিশ্ব কেন! আমি রাজা হব তুই রাজার বোন হবি, মা রাজার মা হবেন সে কি বিশ্রী হল?”

দিদি বলিল “তা রাজা হয়ে যদি তুই আমাদের ভুলে যাস? এইত স্বয়ং ভগবান কৃষ্ণ রাজা হয়ে যশোদাকে ভুলে গিয়েছিলেন।”

বুঝি এই আশঙ্কাতেই গুহার রাজমূর্ত্ত টা সত্যবতীর এত থারাপ লাগিয়াছিল। এ কথায় গুহার হাসিমুখ গোমসা হইয়া গেল, সে বলিল।

“কি এক ঠাট্টা! ও কথা আমার একটুও ভাল লাগেনা।”

দিদি হাসিয়া গুহর দুই গাল ধরিয়া টিপিয়া দিল, তাহার পর মাথা নাড়িতে নাড়িতে বলিল “যেমন ভাই তেমনি বোন? তুই রাজাও হলি, আর আমাদের ভুলেও গেলি”?

গুহা গম্ভীরভাবে বলিল “সত্যিই আমি রাজা হইয়াছি। ভীলরাজ তার রাজ্য আজ হইতে আমাকে দিয়াছেন।”

সে সংক্ষেপে তখন সমস্ত ঘটনা বলিয়া গেল। বালিকার মুখ হঠাৎ কেমন মলিন হইয়া পড়িল, চোখ ছল ছল করিয়া উঠিল, তাহার চোখের জলের কুয়াশায় গুহার মাথার ঘাসের মুকুট, গলার পাতার মালা, কপালের রক্ত ফোঁটা, হাতের রাজদণ্ড ক্রমশ স্ফীত হইতে হইতে গুহার আকৃতি খানি তাহার মধ্যে অতি ক্ষুদ্র হইয়া পড়িল, ক্রমে অস্পষ্ট হইয়া গেল, ঢাকিয়া যাইতে লাগিল, শেষে একেবারে মিলাইয়া গেল, —সত্যবতী চমকিয়া চোখের পাতা বন্ধ করিয়া আবার চোখ খুলিয়া গুহার দিকে চাহিল, আস্তে আস্তে বলিল

“গুহা তুই রাজা হইয়াছিস, হয়ত আমাদের মত দীন হীন লোক আর তোর আপনার থাকিবে না। যদি তাই হয়—হোক; কিন্তু আশীর্ব্বাদ করি সুখে থাক; রামের মত ন্যায়বান হইয়া প্রজা পালন কর।”

গুহা ব্যথিত করুণ দৃষ্টিতে দিদির দিকে চাহিয়া বলিল “দিদি আমি কি এত অবিশ্বাসের কাজ করেছি —যে আমার স্নেহ মমতার উপর তোমার এই সন্দেহ—”

বালিকা কষ্টের স্বরে বলিল “সন্দেহ! না ভাই—কিন্তু সত্যি যদি”

কি বলিতে গিয়া বাধিয়া গেল, যুবক ব্যথিত হইয়া বলিল “সন্দেহ না—আমি সত্যই তোমাদের পর করিব?”

বালিকা বলিল “না না তা বলিতেছি না। আমি বলিতেছি তুই পর না করিলেও লোকেত পর বলিতে পারে—”

গুহা আশ্চর্য্য হইল, ক্রুদ্ধ হইল, গুহা রাজা হইয়াছে বলিয়া তাহার আপনার লোককে লোকে তাহার পর বলিবে? সে রোষকম্পিত স্বরে আরক্তিম লোচনে বলিল—“লোকে তোমাদিগকে পর বলিবে?”

কটীর বাণফলকে তাহার হাত পড়িল, বলিল—

“যদি আমি মানুষ হই ত এতদিন এই যে বাণ পশুবক্ষ বিদ্ধ করিয়াছে সে দিন ইহা সেই হতভাগ্যের শোণিত পান করিবে”

সত্যবতী বলিল “কিন্তু যদি—সত্যি”—

হঠাৎ থামিয়া গেল, কামিনীগাছের ঝোপের ওপিঠ হইতে দুইটা চক্ষু তাহার চোখে পড়িল—এস্তে সে বলিল

“কে আসিয়াছে?” গুহা সেই দিকে চাহিয়া বলিল— “কেও”

উত্তর হইল “মুইডা তালগাছ” ভীলপুত্র কিছু বেশী রকম লম্বা ছিল বলিয়া উহাকে সবাই বলে তালগাছ।

যুবক বলিল “তুই ডা এখন এখানে যে?”

‘ভীল পুত্র বলিল “কথাডা আছে এ দিকে আয় যুবক বলিল “একটু পরে শুনিব—এখন যা”

সে বলিল “উঁহু” তা হইবু না—এদিকে আয়’

সত্যবতী বুঝিলেন তাহার সাক্ষাতে সে বলিতে চাহে, আর তিনিও নির্জ্জনে গিয়া একবার প্রাণ খুলিয়া কাঁদিবার অবসর খুঁজিতেছিলেন,—যে কথা গুহাকে বলিতে চান তাহা বলিবার আগে, একাকী কাঁদিয়া সবল হইবার ইচ্ছা করিতেছিলেন। সত্যবতী আস্তে আস্তে চলিয়া গেলেন, গুহা ঝোপ ঘুরিয়া তালগাছের কাছে আসিয়া দাড়াইল।

উপসংহার

উপসংহার।

গুহ যে মালিককে মারিয়াছেন, তাহা রাষ্ট্র হইতে বাকী রহিল না, কিন্তু মন্দালিকের ন্যায় পিতৃতুল্য স্নেহশীল বন্ধুকে কেন যে তিনি মারিলেন, তাহার কারণ ভীলেরা ভাবিয়া পাইল না, চিরকালই তাহার কারণ অজ্ঞাতের গর্ভে লুক্কায়িত রহিয়া গেল। কলঙ্কের ডালি মাথায় লইয়া গুহা গ্রহাদিত্য নামে ইদরে রাজত্ব করিতে লাগিলেন। ইতিহাস এখন পর্য্যন্ত তাঁহার এই কলঙ্কের কথা ঘোষণা করিতেছে।

গুহাই মিবাররাজবংশের আদি-পুরুষ, তাই প্রকৃত প্রস্তাবে মিবাররাজ নাম ইঁহার প্রাপ্য না হইলেও (ইঁহার বংশধর বাপ্পাই এই নামের প্রকৃত অধিকারী।) আমরা ইঁহাকে মিবাররাজ আখ্যা প্রদান করিলাম। কেন না সমগ্র মিবারে ইনি আধিপত্য বিস্তার না করুন—মিবার সীমানায় ইনিই সর্ব্বাগ্রে সূর্য্যবংশীয় ধ্বজা উড্ডীন করেন। ইঁহার নাম হইতেই মিবারের রাজাগণ পরে “গুহলুট” এই আখ্যা পাইয়াছিলেন। ভীলের রক্তফোটা পরিয়া গুহা রাজপদে অভিষিক্ত হইয়াছিলেন, সেই হইতে রাজ্যাভিষেক কালে বনপুত্রের (ভীলের) কনিষ্ঠ অঙ্গুলির রক্তফোটা গ্রহণ করা মিবার-রাজদিগের একটি পদ্ধতি হইয়া পড়িয়াছে। যাহারা রক্তফোটা পরায়—তাহাৱা মিবাররাজদিগের নিকট জায়গীর পাইয়া থাকে।

একাদশ পরিচ্ছেদ

একাদশ পরিচ্ছেদ।

যখন বিষন্ন উৎসুক ভ্রাতার মুখের দিকে সজল দৃষ্টিতে চাহিয়া সত্যবতী কম্পিতকণ্ঠে বলিল—“ভাই সত্যই আমরা তোমার আপনার লোক নই” তখন মৃত্যুদণ্ডের মত যুবকের কর্ণে তাহা ধ্বনিত হইল, মুহূর্ত্তের জন্য তাহার জীবনের স্রোত যেন বন্ধ হইয়া গেল, ইন্দ্রিয় জ্ঞান লুপ্ত হইয়া পড়িল, কে যেন তাহাকে হঠাৎ পাষাণে অভিশপ্ত করিয়া রাখিয়া গেল। সত্যবতী বড় ভীত হইল, আকুল ভাবে গুহাকে কোলে টানিয়া কাঁদিয়া বলিল—“গুহা”—

ধীরে ধীরে গুহার মাথা দিদির কোলে লুটাইয়া পড়িল, —দিদির কোলে মুখ লুকাইয়া শিশুর মত গুহা কাঁদিতে লাগিল, সত্যবতীও কাঁদিতে লাগিলেন, ভাই বোনের অশ্রুজলে নিস্তব্ধ নিশাকাল সে দিন সিক্ত হইয়া উঠিল। সেই দিন সেই হৃদয় বেদনার মধ্যে, অশ্রুজলের মধ্যে গুহা তাহার জীবন কাহিনী শুনিতে পাইল। যাহা শুনিল তাহার সংক্ষেপ মর্ম্ম এই।

কনক সেন নব-কোটের (আধুনিক লাহোর। রামপুত্র নব কর্ত্তৃক প্রতিষ্ঠিত বলিয়া নব-কোট) সূর্য্যবংশোদ্ভব এক রাজপুরুষ। তিনি কোন কারণে (অনুমান ১৪৪ খৃষ্টাব্দে লাহোর হইতে সৌরাষ্ট্রে আগমন করিয়া এখানকার প্রমর বংশীয় এক রাজার রাজ্য গ্রহণ পূর্ব্বক সেই রাজ্যে বীরনগর রাজধানী স্থাপন করেন। ইহার প্রপৌত্র পুত্র বিজয় সেনের রাজ্যকালে কনক সেনের এই স্থাপিত রাজ্য আরো বিস্তৃতি লাভ করে। বিজয় সেন সমগ্র বিদর্ভ অধিকার করিয়া বিজয়পুর (বিজাপুর) বল্লভীপুর প্রভৃতি কয়েকটি নুতন রাজধানী স্থাপিত করেন। শেষে বীরনগরের পরিবর্ত্তে বল্লভীপুরই সুর্য্যবংশী রাজাদিগের রাজধানী হইয়া উঠে।

কমলাবতীর পিত্রালয় বীরনগর। তাঁহার পিতৃবংশ সুর্য্যবংশী রাজাদিগের কুলপুরোহিত ছিলেন।

সৌরাষ্ট্রের শেষ রাজা শিলাদিত্যের অন্তঃস্বত্ত্বা মহিষী প্রমর-বংশীয় রাজকন্যা পুষ্পবতী চতুর্দ্দশ বর্ষ পূর্ব্বে তাঁহার ভাবী পুত্রের মঙ্গলকামনায় অস্বাভবানীর পূজা দিতে পিত্রালয় চন্দ্রবতী গমন কালে, রাজপুরোহিত সপরিবারে— একমাত্র ভ্রাতৃকন্যা কমলাবতী, তাহার স্বামী ও একটি শিশুকন্যা—এই লইয়া মহিষীর সঙ্গে গমন করেন।

চন্দ্রবতী গিয়া রাণীর মনস্কামনা সিদ্ধ হইল, দেবী তাঁহার ভাবী পুত্রকে শুভ বর প্রদান করিলে, মহিষী হৃষ্ট চিত্তে অল্প দিনের মধ্যেই আবার শ্বশুরালয়মুখী হইলেন।

বল্লভীপুর হইতে চন্দ্রবতীর পথে পাহাড় শ্রেণী অতিক্রম করিতে হয়, একদিন বিকালে পাহাড়ের একস্থানে শিবিকা রাত্রের জন্য থামিলে মহিষী ও কমলাবতী সুখের দুঃখের নানা কথা কহিতে কহিতে পাহাড়ে একসঙ্গে বেড়াইতে লাগিলেন, সঙ্গে সঙ্গে লোক আসিতেছিল হুকুম পাইয়া তাহারা শিবিরে ফিরিয়া গেল, তাঁহারা দুই জনে একাকী শিবির ছাড়াইয়া খানিকটা দূরে আসিয়া পড়িলেন,—নিকটেই গাছ পালার মধ্যে একটা ভগ্ন মন্দির, দেখিয়া তাহার মধ্যে প্রবেশ করিলেন, মহিষী মন্দির দেখিলেই পুত্রের মঙ্গল কামনায় দেবতা উদ্দেশে সেখানে প্রণত হইতেন।

এই জরাজীর্ণ, অশ্বথশিকড় প্রবিষ্ট ভগ্ন মন্দিরের গুহা মাত্র অবশিষ্ট ছিল; এই গুহা প্রবেশ কালে তাঁহারা গুহার অপর পার্শ্বে ভগ্ন প্রাচীরের পর পারে কয়েক জন লোকের মস্তক দেখিতে পাইলেন, তাহাদের লক্ষ্য না করিয়া তাঁহারা মন্দিরে প্রবেশ করিয়া মহাদেবকে প্রণাম করিলেন, প্রণাম করিয়া মহিষী যখন বাহিরে আসিবেন হঠাৎ তাঁহার মুখ বিবর্ণ হইয়া গেল, সর্ব্বঙ্গ কঁপিয়া উঠিল,— অপর পার্শ্বের লোকদিগের কি কথা তাঁহার কাণে প্রবেশ করিল, তিনি সেই খানে মন্দিরের অশ্বখমুলে মাথা ধরিয়া বসিয়া পড়িলেন, কমলাবতীকে আস্তে আস্তে বলিলেন “উহারা কি বলিতেছে শোন দেখি” কমলাবতীও তাহাদের কথা কিছু কিছু শুনিয়াছিলেন, তিনি কম্পিতচরণে মন্দির ঘুরিয়া তাহাদের নিকটে গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“বংস তোমরা কোথা হইতে আসিতেছ? মহারাজ শিলাদিত্যের কথা কি বলিতেছিলে?

তাহারা যখন বুঝিল রমণী বীরনগরের লোক তখন তাঁহার কাছে কিছুই লুকাইল না, কিন্তু যাহা বলিল তাহাতে তাহার হৃদয় বিদীর্ণ হইল। শুনিলেন তাতাররা দেশ আক্রমণ করিয়া শিলাদিত্যকে বধ করিয়াছে, সৌরাষ্ট্র এখন তাহাদের, মহিষীগণ অগ্নি প্রবেশ করিয়াছেন, দেশের লোক পলায়নে প্রাণরক্ষা করিতেছে।”

অবসন্ন কমলাবতী প্রাণপণে গাছে ঠেশ দিয়া দাঁড়াইলেন, শোকাপন্না মহিষীকে রক্ষা করিতে হইবে—এই চিন্তামাত্র তাঁহাকে আসন্ন মুর্চ্ছার হাত হইতে রক্ষা করিল— এই বলে বলীয়ান হইয়া তাঁহার ঘূর্ণ্যমান মস্তক প্রাণপণে উন্নত রাখিয়া আকুল স্বরে বলিলেন “মহারাজ পরাজিত হইয়াছেন! তাহার সপ্তাশ্ব”?

উত্তর হইল “মহারাজের মন্ত্র নিষ্ফল হইয়াছে। তাঁহার আজ্ঞায় সপ্তাশ্ব উঠিল না; শত্রুরা সূর্যকুণ্ডে গোপনে গোরক্ত ঢালিয়াছিল।”

কথিত আছে, সূর্য্য-বরে বল্লভীপুরের দুর্গ মধ্যে এই কুণ্ডের উৎপত্তি হয়,—বর এই, বিপন্ন রাজা মন্ত্র উচ্চারণ করিয়া ডাকিলেই সূর্য্যদেব সপ্তাশ্ব রথে এই কুণ্ড হইতে উথিত হইয়া শত্রুকূল ধ্বংশ করিবেন, কিন্তু যে দিন একবিন্দু রক্ত এই কুণ্ডে পতিত হইবে সেই দিন মন্ত্র ব্যর্থ হইবে।

কমলাবতী সেখান হইতে যখন রাণীর নিকট কিরিয়া আসিলেন তখন রাণী সংজ্ঞাহীন, তিনি যে সমস্ত কথাই শুনিয়াছেন কমলাবতী বুঝিলেন। অল্পক্ষণের মধ্যে সেই গুহাতেই রাণীর সন্তান জন্মিল, নব শিশুকে কমলাদেবীর হস্তে সমর্পণ করিয়া তিনি প্রাণত্যাগ করিলেন, পর্ব্বতেই তাঁহার অগ্নিকার্য্য সমাধা হইল। পুরোহিত সপরিবারে চন্দ্রবতী-সন্নিহিত নিভৃত ইদর-অরণ্য প্রদেশে বসতি স্থাপন করিলেন।

সত্যবতীর কথা শেষ হইলে বড় বড় দুই ফোঁটা জল গুহার কপোল বাহিয়া মাটীতে পড়িল,—

গুহা বলিল “দিদি এ কথা তবে এতদিন লুকাইয়া রাখিয়াছিলি কেন?”

সত্যবতী বলিল “মৃত্যুকালে তোমার মা আমার মাকে দুই একটি অনুরোধ করিয়া যান, প্রধান এই, যেন কোন ক্ষত্রিয়ানীর সহিত তোমার বিবাহ হয়, আর তোমার চতুর্দশ বর্ষ বয়ঃক্রম পর্য্যন্ত তোমাকে যেন ব্রাহ্মণরূপে প্রতিপালন করা হয়। তোমার সামর্থ্য জন্মিবার আগে ক্ষত্রিয় বলিয়া জানিলে শত্রু কর্ত্তৃক পাছে তোমার কোন অনিষ্ট হয়—বোধ করি এই আশঙ্কায় মহিষী এই অনুরোধ করিয়া থাকিবেন। আমাকে পর্য্যন্ত মা এতদিন ইহা বলেন নাই, এবার এখানে আসিয়া মাত্র আমি এ কথা জনিয়াছি।”

দিদি এবার আসিয়া পর্য্যন্ত মাঝে মাঝে কেন যে এমন বিষন্ন হইয়া পড়িত—হাসিতে হাসিতে সহসা কেন তাহার হাসি শুকাইয়া যাইত, খেলা করিতে করিতে কেন অবসন্ন হইয়া ঘরে চলিয়া যাইত, আদর করিতে করিতে মাঝখানে কেন সে থামিয়া পড়িত—গুহা এখন তাহার কারণ বুঝিল। খানিকক্ষণ পরে বলিল—

“যদি এ কথা আর কেহ জানে না তবে ভীলপুত্র জানিল কি করিয়া?”

সত্যবতী বলিল “তোমাদের বংশের একটি কুলাচার এই, প্রথম অস্ত্র শিক্ষাকালে একজন রাজপুরুষ স্বহস্তে কুমারের কটিদেশে অসি বন্ধন করিয়া দেন, তাহা ধারণ করিয়া তখন তাহার অস্ত্র শিক্ষায় অধিকার জন্মে। তোমার অষ্টম বর্ষ স্বয়ঃক্রমে এই নিয়ম রক্ষা করিতে মহিষী মাকে বলিয়া যান। তাঁহার এই কথা পালন করিবার জন্য তোমার জন্মের কথা ভীলরাজকে মায়ের জানাইতে হয়, —কেননা ভীলরাজদিগের পবিত্র অভিষেক অস্ত্র রাজপুরুষের অঙ্গ ছাড়া সাধারণ অঙ্গ স্পর্শ করে না। তোমার, এয়োদশ বৎসর না গত হইলে এ কথা কাহাকে তিনি বলিবেন না প্রতিশ্রুত হইয়াছিলেন,—এখন সময় পূর্ণ হইয়াছে—তাই এ কথা তাঁহার পুত্রকে বলিয়া থাকিবেন”—

গুহা চুপ করিয়া রহিল —বুঝিল ভীলপুত্র দোষী নহে সে নিজেই দোষী।

চতুর্থ পরিচ্ছেদ

চতুর্থ পরিচ্ছেদ।

অন্য ভীলেরা যুবককে যেমন ভালবাসে, ভীলপুত্রও একদিন তাহাকে সেইরূপ ভাল বাসিত। যুবক যখন আট দশ বৎসরের বালক তখন হইতে ভীলদিগের সহিত তাহার আলাপ, তখন ভীলপুত্র কত আগ্রহভরে তাহাকে গৃহে লইয়া আসিত, কুন্তি শিখাইত, বাণ খেলা শিখাইত সঙ্গে লইয়া শীকার করিতে যাইত তাহাকে না পাইলে ভীল পুত্রের তখন খেলা করিয়া শীকার করিয়া আমোদই হইত না। কিন্তু তাহার পর—এখন? এখন যুধক আর
তাহার বন্ধু নহে, সে তাহার প্রতিদ্বন্দী। যুবকের জন্য নিজের সমাজে ভীলপুত্রের এখন আর তেমন আদর প্রতিপত্তি নাই, প্রভুত্ব নাই। ভীলযুবারা যুবককে যত চায় তাহাকে তত চায় না, যুবককে নেতা করিয়া এখন তাহারা যত সন্তুষ্ট ভীল পুত্রকে নেতা করিয়া তত নহে। এমন কি তাহাদের যে খেলায় ভীলরাজ মন্দালিক না থাকেন, সেই খেলাতেই যুবককে তাহার প্রধান করে, এরূপে ভীলযুবাদের নিকট যুবকের একটি নামই রাজা হইয়া গিয়াছে। এক কথায় ভীলপুত্রের সামাজিক অধিকার যুবক একরকম পূর্ণ মাত্রায় গ্রাস করিয়া বসিয়াছে।

কত সামান্য কারণ হইতে সংসারে অসামান্য ঘটনা উপস্থিত হয়, এক বিন্দু অগ্নিস্ফুলিঙ্গেও বহুদিনের যত্ন নির্ম্মিত নগর ধ্বংশ হইয়া যায়, একটি ছোট কথাতেও কতদিনকার বন্ধুতা ভাঙ্গিয়া যায়, সুতরাং ঐরূপ বিশেষ কারণে যদি ভীমপুত্র যুবকের প্রতি বিতৃষ্ণ হইয়া থাকে— তাহাতে আশ্চর্য্যের কিছুই নাই, বরঞ্চ এরূপ স্থলে তাহাই স্বাভাবিক। স্বাভাবিক—কেন না আমাদের চোখের উপর সর্ব্বদা যাহা ঘটে তাহাই স্বাভাবিক! আমাদের সুসভ্য সমাজে এরূপ ঘটনার অভাব নাই—সেই জন্যই ইহা স্বাভাবিক! কিন্তু হইলে কি হয়—উক্ত “গুরুতর” কারণেও ভীলপুত্রের বন্ধুত্ব ভাঙ্গিয়া যায় নাই।—(বুঝি বা সে এমনি অস্বাভাবিক!) শেষাশেষি যাই হৌক—প্রথমে ভীলপুত্রই যুবককে একরকম বাড়াইয়া ভুলিয়াছে, আগে আগে সেই সর্ব্বাগ্রে যুবকের হাতে বাণ তুলিয়া দিয়াছে, শীকারে যাইবার সময় তাহাকেই আগুয়ান করিয়া সাঁঁড় করাইয়াছে, এক দিন যখন তাহাদের দুই দলে কৃত্রিম যুদ্ধখেলা হইতেছিল—ভীলপুত্রই যুবকের হাতে রাজ যষ্ঠি আনিয়া দিয়াছিল; কিন্তু তাহার পর যে দিন ভীলপুত্রের অপেক্ষা করিয়াই যুধক সেই সকল অধিকার নিজের বলিয়া গ্রহণ করিল, যে দিন ভীলযুবারা একবার ভীলপুত্রকে জিজ্ঞাসা পর্য্যন্ত না করিয়া যুবককে রাজা করিল, সেই দিন ভীলপুত্র একটু ক্ষুন্ন হইয়া পড়িয়াছিল বটে কিন্তু শীঘ্রই সে ভাব তাহার মন হইতে চলিয়া গেল, শৌর্য্যে বীর্য্যে বুদ্ধিকৌশলে সকল বিষয়েই যুবক এক শ্রেষ্ঠ যে ক্রমে যুবকের প্রভুত্ব আপনা হইতে তাহারো সহিয়া গেল—দুর্ব্বলের প্রতি সবলের, অক্ষমের প্রতি ক্ষমতাশালীর এমনি প্রভাব! কিন্তু ক্ষমতার প্রভাব অসীম যেখানে ন্যায় প্রেম ইহার চালক; অন্যস্থলে ইহার প্রভাব প্রভূত হইলেও সে প্রভাবের সীমা আছে! ভীলপুত্রের এত সহিল—একটি সহিল না; যখন তাহার মনে হইল কেবল সামাজিক অধিকার নহে—তাহার পিতার স্নেহও যুবক আত্মসাৎ করিতেছে, তখন আর তাহার সহ্য হইল না। সে সব সহিতে পারে, পিতার স্নেহের উপেক্ষা সহিতে পারে না, আর সব অধিকার হইতে সে বঞ্চিত হইতে প্রস্তুত, কিন্তু তাহার এই স্বাভাবিক অধিকার আর কাহাকেও সে দিতে পারে না। ভীল অসভ্য, তাহার স্বাভাবিক, অবিকৃত হৃদয়ে প্রেমেরই একাধিপত্য, তাই সে ক্ষমতাকে তাচ্ছিল্য করিতে পারে প্রেমকে পারে না। সে যে এমন করিয়া ডাবিয়া চিন্তিয়া, তাহার অধিকার অনধিকার বুঝিয়া সুঝিয়া এরূপ নিষ্পত্তিতে আসে তাহা নহে, সে আর কিছুই বুঝে না— পিতার স্নেহের অভাব দেখিলে তাহার যে কষ্ট হয় সে কেবল তাহাই বুঝে; সে আর কিছু ভাবে না যুবকের প্রতি পিতার স্নেহ দেখিলে তাহার যে কষ্ট হয়—তাহাই শুধু সে ভাবে; ভাবিতে ভাবিতে অবশেষে এক রকম করিয়া সে কষ্টটা তখনকার মত তাহার মনে মিলাইয়া পড়ে, কিন্তু এইরূপে যুবকের উপর তাহার যে একটা রাগের ভাব আসিয়া পড়ে তাহা উত্তরোত্তর ক্রমশই তাহার মনের মধ্যে জমা হইতে থাকে।

এইরূপ মনের অবস্থায় মৃগয়া দিনের সমস্ত ঘটনাই তাহার কষ্টের কারণ হইয়া উঠিল—বিশেষতঃ যখন পিতা বলিলেন—“তুই কেন ওডার মত হইলিনে” তখন আর ভীল পুত্রের দুঃখ রাখিতে স্থান হইল না, —মনুষ্যের গর্ব্বে আঘাত লাগিলে বড় আঘাত লাগে, এতদিন কত ঘটনায় যাহা না হইয়াছে আজ ঐ সামান্য কথাটিতে তাহা সাধিত হইল। এইরূপই হইয়া থাকে; ধূঁয়াইতে অনেক সময় যায়—কিন্তু জ্বলিয়া উঠিতে মুহূর্তও লাগে না!

যদি পিতার ভালবাসায় আগে হইতে তাহার সন্দেহ না জন্মিত তাহা হইলে ঐ কথাগুলিরই সে অন্য অর্থ দেখিতে পাইত, ঐ কথাতে সে পিতার ভালবাসার ভাবই দেখিতে পাইত, কিন্তু এখন এইগুলিতে তাহার মর্ম্ম বিদ্ধ হইল, গর্ব্বে আঘাত লাগিল, ক্রমাগত ঐ কথাগুলি মনের মধ্যে তোলাপাড়া করিয়া তাহার দৃঢ়বিশ্বাস হইল যে “তাহাকে আর পিতার মনে লাগে না।” জনতার মেলা হইতে সে একাকী দূরে আসিয়া অনেকক্ষণ ধরিয়া কাঁদিল, তাহার পর স্থির করিল যুবক তাহার শত্রু।

চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ

চতুর্দ্দশ পরিচ্ছেদ।

চাঁদ উঠিয়াছে, জ্যোৎস্না হইয়াছে, তবু চারিদিক মলিন, চারিদিক আচ্ছন্ন, গাছ পালার মধ্যে, গাছ পালার ছায়ার মধ্যে, পাহাড়ের শারদীয় শেষ প্রহরের কুয়াসার মধ্যে জ্যোৎস্না যেন কাঁদিয়া কাঁদিয়া ফুটিয়া উঠিয়াছে, ভীলপুত্রের ম্রিয়মান বাষ্পাকুল দৃষ্টির দিকে চাহিয়াই যেন প্রকৃতির হাসিমুখ সহসা এমন মলিন হইয়া পড়িয়াছে, প্রভাতের তরুণ অরুণ জাগিয়া উঠিবার সঙ্গে সঙ্গে ভীলপুত্রের এ নয়ন বারি যখন শুকাইয়া যাইবে তখন ধরণীর মুখও আবার প্রফুল্ল হইয়া উঠিবে। নিরাশায় সতেজ, যন্ত্রণা ভারে উত্তেজিত, বিহ্বল ভীলপুত্র এই কুয়াসার মধ্য দিয়া দ্রুতপদে নির্দ্দিষ্ট গাছ তলায় আসিয়া থামিল। ইহার কিছু আগে হইতেই গুহা রাস্তার পরপারে পুকুরের ধারের বড় গাছের নীচে তাহার জন্য অপেক্ষা করিতেছিলেন, থামিবামাত্র তাঁহার অস্পষ্ট প্রতিকৃতি ভীলপুত্রের নজরে পড়িল, অমনি হঠাৎ একটা জ্বলন্ত আগুণ তাহার সর্ব্বাঙ্গে হুহু করিয়া ব্যাপ্ত হইল, ধনুক খুলিয়া হাতে উঠাইয়া ধরি-
বার সময় হাত টলমল করিয়া উঠিল। তালগাছকে দেথিয়া গুহা কথা কহিল, কিন্তু রণোদ্যত শত্রুর ক্রুদ্ধ কর্কশ স্বরের পরিবর্ত্তে গুহার স্বাভাবিক তেজস্বী স্বর তালগাছের কর্ণে প্রবিষ্ট হইল। গুহা বলিল—

“তালগাছ একটু অপেক্ষা কর—ধনুক ধরিবার আগে আমি যে কথা বলিতে আসিয়াছি শোন।”

এখনো আগেকার মত অনুজ্ঞা! কিন্তু এখন আর আগেকার সে ভীলপুত্র নহে। ভীলপুত্র আরো ভাল করিয়া ধনুর্ব্বাণ কসিয়া ধরিল,—তাহার পর তাহার ভাষায় কম্পমানকণ্ঠে বলিল—

“ধনুক উঠারে কাপুরুষ এখন কণার সময় নহে, তুই প্রাণভয়ে এত কাতর, আমি নির্ভয়ে তোর কাছে প্রাণ লইয়া আসিয়াছি।”

ভীলপুত্রের হস্ত তাহার প্রতি উন্মুখ হইল, গুহার ধনুক ধরিবার মাত্র অপেক্ষা। তখন গুহাও ধনুক উঠাইয়া বলিলেন তবে তাহাই হউক, এ হত্যার দোষ কিন্তু আমার নাই।”

বলিয়া তীর নিক্ষেপ করিলেন, কখনো যাহা হয় নাই আজ তাঁহার অটল হাত কাঁপিয়া গেল। সমকালে ভীলপুত্রের বাণও সবেগে নিক্ষিপ্ত হইল, হঠাৎ একটা আর্ত্তনাদ রাত্রের বিজনতা বিদীর্ণ করিয়া আকাশে উথলিয়া উঠিল, ভীলপুত্র হঠাৎ বজ্রাহত হইয়া মূর্চ্ছিত হইয়া পড়িল।

তৃতীয় পরিচ্ছেদ

তৃতীয় পরিচ্ছেদ।

দ্বিপ্রহর, সূর্য্য আকাশের মধ্য ভাগে—পাহাড়ের একটি উচ্চ শিখরের উপরে আসিয়া পড়িয়াছে—সেই শিখরকাশ খানিক দুর লইয়া এত উজ্জ্বল যে তাহার দিকে চাওয়া যায় না, আর সূর্য্যের পরিত্যক্ত পূর্ব্বাকাশ এত নীল যে দ্বিপ্রহরে সেখানে চন্দ্র দেখা যাইতেছে। সেই নীল আকাশচন্দ্রতপের গায়ে এক এক টুকরা শাদা শাদা মেঘ ভাসিতেছে, মেঘের নীচে ছোট ছোট পাখীগুলি বিন্দুর আকার ধরিয়াছে—বুঝি তাহারা চাতক পাখী—মেঘের সঙ্গে আপনাকে মিশাইয়া ফেলিতে যায়।—বড় বড় চীল দুই একটি পাতের মত সমান ভাবে পক্ষ বিস্তার করিয়া পলকহীন নিস্পন্দ গতিতে উড়িতেছে, আর মাঝে মাঝে কর্ক্কশ উচ্চ কণ্ঠে চিহিঁহিঁ করিয়া উঠিতেছে, সে চীৎকারে নিস্তব্ধ পাহাড় ঝাঁঝাঁ করিয়া উঠিতেছে, গাছের মধ্য হইতে কাকগুলা গম্ভীর ভাবে সাড়া দিয়া উঠিতেছে—তাহাদের কলরবে ঘুঘুর অবিশ্রান্ত ঘুঘুরব যেন চকিতের মত ঢাকিয়া পড়িতেছে!

এই সময় বৃদ্ধ ভীল ঘর্মাক্ত কলেবরে তাহাদের গ্রামের নিকটের একটি নির্দিষ্ট বৃক্ষ তলে আসিয়া স্কন্ধের বোঝা ভূমিতে নামাইয়া চারিদিকে চাহিয়া দেখিলেন। দেখিলেন তখনও সেখানে আর কেহ আসে নাই, তিনি বৃক্ষতলে বসিয়া বিশ্রাম করিতে লাগিলেন। কিছু পরেই দু একজন করিয়া অন্য শিকারীগণও সেখানে জমিতে আরম্ভ হইল। দুই তিন জন পিঠ হইতে কতকগুলা করিয়া পাখীর রাশ নামাইল, একজন দুইটা ছাগল পিঠে লইয়া উপস্থিত,—একজন কতকগুলা ভেড়ার বাচ্ছা আনিয়া ফেলিল,—৪৫ জনে মিলিয়া একটা মহিষ ঘাড়, হইতে নামাইল, একজন একরাশ খরগোশ পাইয়াছে, একজন কিছুই আনিতে পারে নাই—শেষে রিক্ত হস্তে ফিরিয়া আসিবার সময় একটা শৃগাল মারিয়া আনিয়াছে, তাহা দেখিয়া অন্যেরা তাহাকে সাবাস দিয়া মহা হাসির ধূম লাগাইয়াছে,—দুরে পৃষ্ঠ ভারে অবনত ভীল পুত্রকে দেখা গেল, সকলে উৎসুক হইয়া তাহার আগমন অপেক্ষা করিতে লাগিল, —ভীলপুত্র নিকটে আসিয়া বোঝাটা দুম করিয়া মাটিতে ফেলিল, সকলে করতালি দিয়া বলিয়া উঠিল—“আজ তুই জিতিলি রে—।” বোঝাটা আর কিছু নহে, একটা বরাহ। ভীলেদের নিকট বরাহ একটা বড় শীকার, ইহা তাহাদের একটি উপাদেয় খাদ্য। এরূপ শিকার এতক্ষণ আর কেহই আনে নাই, পরে যে আর কেহ আনিবে তাহারে সম্ভাবনা নাই—কেন না প্রায়ই একটার, অধিক বরাহ এক দিনের শিকারে পাওয়া যায় না। সকলেই শিকারীর প্রতি বিশেষ প্রশংসার দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল, আজকের দিন যেন তাহার জন্যই প্রভাত হইয়াছিল, ভীলরাজ পুত্রের জয়ে আহ্লাদে নির্ব্বাক হইয়া রহিলেন,—আত্ম-গৌরবে ভীলপুত্রের বুক ফুলিয়া উঠিল—পরিশ্রম ক্লান্তি সে সকল ভুলিয়া গেল—এই সময় আমাদের পূর্ধ্ব পরিচিত যুবক তাহাদের দিকে অগ্রসর হইতে লাগিলেন, তিনি না জানি কি আনেন! আর একবার সকলে কুতূহল হইয়া উঠিল,—ভীলপুত্রের হঠাৎ বুকটা একবার কাঁপিয়া উঠিল, মুহূর্ত্তের মধ্যেই সে ভাব চলিয়া গেল, আশ্বস্ত ভাবে তাহার আগমন প্রতীক্ষা করিতে লাগিল। যুবক নিকটে আসিয়া একটা বড় হরিণকে মাটিতে নামাইলেন। সকলে আহ্লাদে চীৎকার করিয়া উঠিল। বরাহ হইতেও হরিণ দুষ্প্রাপ্য শিকার, কদাচিৎ তাহা পাওয়া যায়। এত দ্রুত বেগে হরিণ দৌড়ে যে তাঁহার প্রতি লক্ষ্য ঠিক রাখিয়া বাণ ছোঁড়া বড় কঠিন কাজ। ভীলরাজ বলিয়া উঠিলেন “সাবাস বেটা সাবাস—” ভীলপুত্রের মুখ মলিন হইয়া গেল—ভীলরাজ তাহাকে কি এ কটা প্রশংসার কথা বলিতে পারিতেন না! আর কিছু না হউক সেত একটা বরাহ শিকার করিয়াছে, বরাহ শিকার করা হরিণ শিকার হইতে এতই কি সহজ! ভীলপুত্র গুম হইয়া রহিল, ভীলরাজ তাহার নিকটে আসিয়া বলিলেন—“বাপুটা তুই ওডার মত অমন শিকারী হইলি নে—ক্যান্ রে!

তিনি সান্ত্বনাচ্ছলে কথাটা বলিলেন, কিন্তু কি সান্ত্বনা ই দিলেন। ভীমপুত্রের মনে কষ্টের যতটুক বাকী ছিল ঐ কথায় তাহা পুরিয়া গেল।

অভিপ্রায় ভাল হইলেই সব সময় তাহার ফল ভাল হয় না। পৃথিবী ভ্রান্তিময়,—ভুল বুঝিবার অবকাশ পাইলে সে সত্য বুঝিতে চাহে না, কেন না ভুলই তাহার জীবনের অবলম্বন, ভুল লইয়াই সে বাঁচিয়া আছে—যে মুহূর্ত্তে পৃথিবী হইতে ভুল চলিয়া যাইবে, —সেই মুহূর্ত্তে পৃথিবীর মৃত্যু, পৃথিবীর স্বর্গলাভ হইবে,—তখন আর পৃথিবী পৃথিবী থাকিবে না।

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ

ত্রয়োদশ পরিচ্ছেদ।

পুত্রকে নিরুত্তর দেখিয়া মন্দালিক ভাল বুঝিলেন না, ব্যস্ত হইয়া বলিলেন—“চুপ কি লাগিন্ রে—কি হইলু বলরে বেটা”—

আর কতক্ষণ ভীলপুত্র পিতার জিজ্ঞাসায় নিরুত্তর থাকিবে? তাহার সকল সঙ্কল্প বৃথা হইল, দুই হাত সবলে বুকে আঁটিয়া নতদৃষ্টি উন্নত করিয়া সবল মুক্তকণ্ঠে তখন সে বলিল—“বাবা গুহাটা কালসপ্প, মুইডা তার মিত হইতে নারিল—শত্রু হয়ে আসছি। মোর শত্রু হইলে সব পারিত মুই—সেডা যে তোর শত্রু”

“তার শত্রু হয়ে আসছি”—অর্থাৎ তাহাকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিয়াছি। মন্দালিক হঠাৎ যেন আকাশ হইতে পড়িলেন—“তুইড তার শত্রু হ’য়ে আসিছিস্?”—

আবার দৃঢ়স্বরে উত্তর হইল—“হুঁই”—

মন্দালিক কাতর দৃষ্টিতে চাহিয়া একটু পরে বলিলেন—“মুইডার সে শত্রু কোনডা বলিল তোরে—

মন্দালিকের সে কথা বিশ্বাস হয় নাই। সে কথা এতই অসম্ভব। পুত্র বলিল—“তুই খাঁটি কথা বলিলি—সে লাগিন সেইডা তোরে মারিতে চাহিল—কালসপ্পডা জানিল না মোরে আগে না মারিলে তা হইবুর নয়”—

সে যাহা শুনিয়াছিল খুলিয়া বলিল। সমস্ত কথা মন্দ।— লিকের একটা ধূঁয়া—একটা অন্ধকার একটা যেন ভ্রান্তি বলিয়া বোধ হইল—গুহা তাঁহাকে মারিতে চাহিবে—একথা কেমন করিয়া তাঁহার বিশ্বাস হইবে, —অথচ পুত্রের প্রত্যেক কথা বৃশ্চিক হুলের ন্যায় তাঁহার হৃদয়ে বিদ্ধ হইল, শীতল হিমময় রাত্রে তাহার কপাল ঘর্ম্মসিক্ত হইয়া উঠিল—তিনি কম্পিত কণ্ঠে ধীরে ধীরে বলিলেন—

“মোরে মারিতে চাহিল গুহাডা! বেশ মুইকে তার শোধ নিতে দে —তুইডা কিছু করুস্ না —মোর কথাড। রাখ্”—

একবার দ্বন্দ্বযুদ্ধে আহ্বান করিয়া তাহাতে নিরস্ত হওযাই ত কাপুরুষতা, তাহার উপর সে থাকিতে কিনা পিতার অপমানের শোধ পিতা লইতে যাইবেন।

ভীলপুত্রের প্রদীপ্ত চক্ষু অন্ধকারের মধ্যেও জ্বলিয়া উঠিল—সে উত্তেজিত কণ্ঠে ঈষৎ তীব্রস্বরে বলিল—“বাবাডা মুই যে ধনু ধরিবার কথাডা দিয়ে আসিছি তা ভুললু নাকি? আর মুই থাকিতে তুইডা শোধ লইবি?”

এই যুদ্ধ হইতে পুত্রকে যে সহজে নিরস্ত করিতে পারিবেন না তাহা মন্দালিক জানিতেন—তিনি অনুনয়ের স্বরে আবার বলিলেন “বেটারে শোন তুইডা—তোর কথা ফিরাইতে হইবু না, সেইডাই কথা ফিরাইবে—তুইডা ক্ষমা কর শুধু। সেডা মোরে মারিতে চাহে নাই, কথার কথাডা কি বলিল—সে লাগিন সে ক্ষমা চাহিবে—তুইডা ক্ষমা কর”—

এখনো সেই স্নেহ। যে তাহাকে বধ করিতে চাহে—তাহার প্রতি এখনো এত স্নেহ এত ভালবাসা! আর ভীলপুত্র তাঁহার জন্য যে প্রাণ দিতে যাইতেছে—তাহার জন্য কি একটা মমতার কথাও নাই? একটা যন্ত্রণার বিদ্যুৎ তালগাছের হৃদয় যেন ভস্ম করিয়া দিয়া গেল,—একটুখানি আগে মরিবার জন্য তাহার যে কষ্ট হইয়াছিল তা আর বিন্দু মাত্র রহিল না, মরিবার আগেই সে মরিয়া গেল, তাহার প্রেতযোনী—তাহার প্রবৃত্তি মাত্র তাহার দেহ যেন অধিকার করিয়া রহিল।

হায়! মানুষ বাঁচিয়া থাকিতে থাকিতে কতবার মরিয়া যায়—কেহ কি জানিতে পারে?

তালগাছ তীব্রকণ্ঠে কম্পমান শরীরে বলিল—“মুইডা চলি, তুইডা মোরে ক্ষমা কর —কথাটা যা দিয়ে আসিছি— মুই ফিরাইতে নারিবু। মুইডা যা শুনিয়া আইল—ঠিক শুনিয়া আইল”।

আগেকার তালগাছ হইলে এমন করিয়া পিতার অমতে কথা কহিতে পারিত না—এমন করিয়া আর কখনো কথা কহে নাই। বলিয়াই সে তীরবেগে বাহির হইয়া গেল— মন্দালিক তাঁহার চিন্তাভার লইয়া সেইখানে দাঁড়াইয়া রহিলেন।

“সত্যই কি গুহা তাহাকে মারিতে চাহিয়াছে? যুবক—যাহাকে তিনি রাজ্য দিয়াছেন, স্নেহ দিয়াছেন—যাহার জন্য নিজের পুত্রের প্রতি তিনি সত্যই অন্যায় করিয়াছেন —সে তাঁহাকে মারিতে চাহিয়াছে? তাহার ভালবাসার, স্নেহের এই প্রতিশোধ?”

মর্মান্তিক কষ্টে তাঁহার বুক ফাটিয়া উঠিল। মন্দালিক গুহাকে যে পুত্রাপেক্ষাও ভাল বাসেন তাহা এখন সুস্পষ্ট রূপে বুঝিলেন, আগে তাঁহার নিজের মনের ভাব নিজের কাছেই লুকান ছিল তাই সে দিন না বুঝিয়া তালগাছকে আর এক রকম বলিয়াছিলেন। তিনি কাতর হইয়া এখন মনে মনে বলিলেন—

“গুহাটারে তুই আমাকে মারিবি, মার্ তবে, আমি নিজেই গিয়া তোকে বুক পাতিয়া দিতেছি, এ জন্য অন্যের সহিত যুদ্ধ করিয়া নিজের হানি করিবি কেন”—

এখনো তাঁহার সন্দেহে বিশ্বাস জড়িত, এখনো তাঁহার কষ্টে আশাপূর্ণ, এখনো তাঁহার মনে হইতে লাগিল—গুহা যদিই বা না বুঝিয়া কিছু বলিয়া থাকে মন্দালিককে দেখিলে অনুতপ্ত হৃদয়ে নিশ্চয়ই সে ক্ষমা চাহিবে,—তিনি বলিলে তাঁহার পুত্রের নিকটেও ক্ষমা চাহিয়া যুদ্ধ হইতে নিরস্ত হইবে।”

এই বিশ্বাস তাঁহার গভীর স্নেহের ফল—এই বিশ্বাস তাঁহার ক্রোধের অতীত, প্রতিশোধ স্পৃহার অতীত স্বার্থহীন পবিত্র ভালবাসার ফল, তাই তিনি যখন ভাবিলেন গুহা তাঁহাকে মারিতে চাহিয়াছে—তাঁহার দুঃখ হইল, অভিমান উথলিয়া উঠিল— রাগ হইল না, তিনি অভিমানের উচ্ছাসে—স্নেহের বিশ্বাসে নীত হইয়া দ্রুতবেগে যুবকের বাড়ীর দিকে গমন করিলেন।

দশম পরিচ্ছেদ

দশম পরিচ্ছেদ।

ভীলগ্রাম দূরে পড়িয়া গেল, উৎসবের কোলাহল স্তব্ধতায় মিলাইয়া পড়িল, ভীলপুত্র নিস্তব্ধ বিজন পথে আসিয়া পড়িয়া যখন আবার উপর দিকে চাহিল আর পিতাকে দেখিতে পাইল না, যে উচ্চ ভূমিতে পিতা দাঁড়াইয়াছিলেন—দেখিল তাহা অদৃশ্য হইয়া পড়িয়াছে। হঠাৎ বড় যেন তাহার একাকী বলিয়া মনে হইল, বড় যেন একটা শূন্যতা তাহার মনের মধ্যে আসিয়া পড়িল, যে উৎসাহরাশি, যে স্নেহ রাশি সঙ্গে লইয়া সে চলিতে আরম্ভ করিয়াছিল চারিদিকের বিজনতার মধ্যে সে সব যেন সে হারাইয়া হারাইয়া চলিতে লাগিল। অবসর পাইয়া নানা রূপ ভাবনা তাহাকে আক্রমণ করিল, পিতার সম্মুখে দাঁড়াইয়া, তাঁহার আলিঙ্গনে বদ্ধ হইয়া তাঁহার কথা গুলির যেরূপ স্নেহময় মূর্ত্তি দেখিয়াছিল, এই দুশ্চিন্তায় পেষিত হইয়া তাহারাও বিকৃত হইয়া পড়িতে লাগিল,—ক্রমশ ভীল পুত্রের মনে হইতে লাগিল, “গুহার সঙ্গে তাহার মিত্রতার জন্য পিতা যে এত উৎসুক তাহা কি গুহার মঙ্গল জন্যই নহে, এ
উপায়ে গুহার পথের কণ্টক দূর করাই কি তাঁহার অভিপ্রায় নহে?”—পিতার প্রতি কথা তলাইয়া তাহাতে এখন সে গুহার প্রতিই তাঁহার মেহের ভাব দেখিতে লাগিল।

যে হৃদয়ে একবার সন্দেহ প্রবেশ করিয়াছে, অবিশ্বাসের আঘাতে যে হৃদয় একবার ক্ষত হইয়া পড়িয়াছে, সে হৃদয় প্রতি মুহূর্ত্তে স্নেহের শীতল স্পর্শ অনুভব করিতে না পারিলে, অবিরত স্নেহের আশ্বাস বাণীরূপ ঔষধের প্রলেপ না পাইলে—একেবারে আরোগ্য লাভ করিতে চাহে না, সে ক্ষত পুনঃ পুনঃ ফিরিয়া দেখা দেয়।

পিতার স্নেহের বাঁধন হইতে দূরে আসিয়া পুত্রের ভাঙ্গন ধরা বিশ্বাস আস্তে আস্তে খসিয়া পড়িতে লাগিল, কিছুতেই সে তাহা ধরিয়া রাখিতে পারিল না, তাহার মনের মধ্যে একটা নৈরাশ্যের আগুণ হুহু করিয়া উঠিল। এই নৈরাশ্য লইয়া এই কষ্টের মন লইয়া কেমন করিয়া সে এখন গুহাকে আলিঙ্গন করে! যে প্রেমের ভাব হৃদয়ে ধরিয়া সে গুহাকে বন্ধু বলিতে আসিতেছিল —সে ভাব ত তাহার এখন নাই, তবে এখন সে কি করিবে? এই কথা বলিতে আবার কি পিতার নিকট সে ফিরিয়া যাইবে? ভীলপুত্র পীড়িত ক্লিষ্ট হইয়া পড়িল, তাহার চিন্তা ভার লইয়া সে যে একেবারে মন্দিরের নিকটে উপস্থিত হইয়াছে তাহা সে জানিতে পারে নাই, হঠাৎ গুহার কুপিত স্বর তাহার কানে প্রবেশ করিল—সে দাঁড়াইল,— শুনিল “লোকে তোমাদিগকে পর বলিবে?—যদি আমি মানুষ হই, ত এত দিন এই যে বাণ পশু বক্ষ বিদ্ধ করিয়াছে। ইহা সেই দিন সেই হতভাগার শোণিত পান করিবে—”

ভীলপুত্র আগুণ হইয়া উঠিল, এ কথা মন্দালিককে লক্ষ্য করিয়া যে বলা হইয়াছে এ বিষয়ে তাহার সন্দেহ মাত্র রহিল না। মন্দালিক এ কথা যখন তাহাকে বলিয়াছেন, নিঃসন্দেহ আর এক জনকেও বলিয়াছেন গুহা তাহা শুনিয়া এইরূপ বলিতেছে। তিনি ছাড়া এ কথা কেহ জানে না, কেহ বলিতেও সাহস করিবে না।

ভীলপুত্র যে জন্য আসিয়াছিল একেবারে ভুলিয়া গেল, এখন তাহার শত্রু তাহার পিতারও শত্রু, স্পষ্ট করিয়া তাহাকে শত্রু বলিয়া ডাকিতে আর তাহার সঙ্কোচ রহিল না। গুহা যখন তাহার নিকট আসিয়া দাঁড়াইল—তাহার ক্রুদ্ধ মুখ-ভঙ্গী দেখিয়া বুঝিল গতিক বড় ভাল নহে, রাজ্য পাইয়া সে যে তালগাছের শত্রু হইয়া দাঁড়াইয়াছে তাহা বুঝিল—বলিল—“কেন ডাকিলি, কথাটা কি?”

ভীলপুত্র উত্তর করিল “কথাডা—তুইটা কাল সপ্প কেউটা, গোখরা”!

যুবক ঠাট্টার ছলে কথাটা উড়াইতে গিয়া বলল “এই কথার জন্য এতদূর কষ্ট করিয়া আসিবার ত আবশ্যক ছিল না”

ভীলপুত্র বলিল “তুইডার মুণ্ডপাতের আবশ্যক ছিল?

যুবক বলিল “তালগাছটা, অত উঠিসনে, একটু খাট হ। তো হতেই আমি রাজা, এখন রাগ করিলে চলিবে কেন রে?”

ভীলপুত্র বলিল “আরে রাক্ষস ডা—যানাড়া তোমারে রাজা করিল মোর সেই বাবাডারে তুই মারিতে চাস! যেইডার খাও তুমি—সেইডারে ছোবল”।

এ কি কথা! মান্দলিককে যুবক মারিতে চাহে! যে তাহাকে রাজ্য দিয়াছে, পিতার স্নেহ দিয়াছে তাহাকে যুবক মারিবে! এ কি অপবাদ! যুবক বুঝিল এইরূপ অপবাদ তুলিয়া কৌশলে মন্দালিককে তাহার শত্রু করানই ভীলপুত্রের উদ্দেশ্য। সরোষে ঘৃণার স্বরে গুহা বলিল—

“পাষণ্ড মিথ্যাবাদী”

ভীলের সর্ব্বাঙ্গ কাঁপিয়া উঠিল,—এমন গালাগালি তাহাদের আর নাই, সে লাল জবাফুলের মত চক্ষু বাহির করিয়া বলিল—

“মুই ডা মিথ্যাবাদী! তুই বাবারে মারুতে চাহিলি মুই ডা মিথ্যাবাদী। কমলাবতী তুইডার কেউ না—তুই তানাডারে মিথ্যা মা কয়ে আসিলি—মুইডা মিথ্যাবাদী!”

যুবক বলিল “চুপকর বর্ব্বর, কমলাবতী আমার মা” ভীল পুত্র বলিল—“চুপ করিতে হয় তুই ডা চুপ কর, মুই ডা একশ বার বলিবু কুমলাদেখী তোর মা না, সত্যবতী তোর দিদি না—তুই ডা তানাদের কেউ না”

তাহার কথা একটু বাধিল না, স্পষ্ট স্পষ্ট কথায় সত্যের মূর্ত্তি যেন তাহার কণ্ঠ হইতে নিঃসৃত হইল, যুবক মুহূর্ত্তের জন্য নির্ব্বাক নিস্পন্দ হইয়া পড়িল, সেই কঠিন কথাগুলা তাহার মাথার মধ্যে ঘুরপাক দিয়া বেড়াইতে লাগিল, —সেই সঙ্গে দিদির শেষ কথাটিও মনে আসিয়া —পড়িল দিদি কি বলিতে বলিতে থামিল? “কি—সত্যি”—কি সত্যি? —ভীলপুত্র যাহা বলিতেছে তাহাই কি? যুবক কি যেন হইয়া পড়িল।

ভীলপুত্র বলিল “এই কথার লাগিন—তুইডা বাবারে মারিতে চাহিলি—মুইডা আসিছি—ধনুডা ধর—

যুবক আত্মস্থ হইয়া বলিল —“তুই মন্দালিকের পুত্র না হইলে অনেক আগে ধনুক ধরিতাম’— ভীলপুত্র তীব্র বিদ্রুপের হাসি হাসিয়া বলিল “বাবাডারে মারিতে পার—ছেলেডারে মারিতে নার? বড়ই ন্যাকা পাইছ! ধনু উটারে কালসপ্পডা!”

যুবক তাহার প্রতি অবজ্ঞার কটাক্ষপাত করিয়া বলিলেন “মরিতে এতই ইচ্ছা হইয়া থাকে শেষ প্রহরে জ্যোৎস্নার সময় ভীলগ্রামের দক্ষিণ মাঠের পুকুর তীরে বড় গাছের নীচে আমাকে পাইবি। এখন অন্ধকার— অন্ধকারে ন্যায়যুদ্ধ হয় না—

ভীলপুত্র বলিল “কথাডা বেশ। মুইড সামনে মাঝারি গাছটার তলায় থাকিব”—

ভীলপুত্রের কথা শুনিবার জন্য না দাঁড়াইয়া যুবক মন্দিরের দিকে দ্রুতপদে অগ্রসর হইল—দিদির শেষ কথাটা শুনিবার জন্য সে অত্যন্ত উৎসুক হইয়া পড়িয়াছিল—তাহার উপর যেন তাহার জীবন মৃত্যু নির্ভর করিতেছে।

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ

দ্বাদশ পরিচ্ছেদ।

আঁধার সন্ধ্যা, আকাশে চন্দ্র নাই, গাছ পালায় ঢাকাঢাকা ক্ষুদ্র ভীলগ্রাম কাল একটা ছায়া মণ্ডলীর মধ্যে লুকাইয়া পড়িয়াছে, অদূরে ঈষদুচ্চ শিখর প্রদেশে বসিয়া ভীমপুত্র সেই ছায়ার প্রতি একদৃষ্টে চাহিয়া আছে, তাহার আগ্রহপূর্ণ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিধার অন্ধকারের অবরণ যেন ভেদ করিয়া ভীলগ্রামের প্রত্যেক কুটীরগুলি প্রত্যেক গাছটি পর্য্যন্ত ভীলপুত্রের সম্মুখে উন্মুক্ত করিয়া দিয়াছে।

গ্রামের মধ্যস্থলে—বড় রাস্তার সম্মুখে, তরুশ্রেণীর মধ্যে তাহাদের পাতায় ছাওয়া কুটীরখানি; এতক্ষণ কুটীরে আলো জ্বলিয়াছে, এতক্ষণ তাহার সঙ্গীরা সারাদিনের আমোদ আহ্লাদের পর শ্রান্তসুরে গান গাহিতে গাহিতে বাড়ী ফিরিতেছে, পথিমধ্যে তাহাদের বাড়ীর কাছে আসিয়া পড়িয়া একবার করিয়া তাহার নাম ধরিয়া ডাকিতেছে, উত্তর না পাইয়া হয়ত বা তাহার মায়ের কাছে গিয়া তাহার খোঁজ লইয়া যাইতেছে। মা এতক্ষণ গৃহের
কাজকর্ম্ম সারিয়া তাহার বোনটির চুল বাঁধিতে বসিয়াছেন, অন্য ছেলেরা ভূতের গল্প শুনিবার জন্য তাঁহাকে অস্থির করিয়া তুলিতেছে, মাদলা মায়ের আঁচলটা ধরিয়া টানিতেছে, ভুলু বোনের বিনুনিটা ধরিয়াই নাড়িয়া দিতেছে, ছোটীয়া খেলা করিতে করিতে ‘বলনা’ করিয়া আচমকা মায়ের পিঠের উপর আসিয়া পড়িতেছে,—বোন খাপা হইয়া উঠিয়া মাঝে মাঝে তাহাদের মারিতে হাত উঠাইয়াছে। বাবা এই গোলমাল হইতে দূরে অস্ত্রশালার রোয়াকে বসিয়া এতক্ষণ অস্ত্রশস্ত্র পরিষ্কার করিয়া তুলি বার উদ্যোগ করিতেছেন, ভীলপুত্র আজ গৃহে নাই, তিনি একাকী, সে থাকিলে সে তাঁহার সহায়তা করিত! গৃহের এ সময়ের খুঁটিনাটি ব্যাপার—খুটিনাটি ছবি তাহার মনে পড়িতে লাগিল—একটা গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস তাহার মর্ম্মস্থল হইতে উথলিত হইল, সে দুই হাঁটুর উপর বাহুর মধ্যে মাথা রাখিয়া চোখ বুজিল। অনেকক্ষণ পরে যখন আবার চোখ খুলিয়া মুখ তুলিল তখন আর সন্ধ্যা নাই, তখন নূতন তারকা রাশিতে আকাশ ছাইয়া পড়িয়াছে, তখন দ্বিপ্রহরের অন্ধকারের বুকে একটা গম্ভীর আলোক জ্বল জ্বল করিয়া উঠিয়াছে, প্রকৃতি স্তব্ধ গাম্ভীর ঘুমন্ত, ভীলগ্রামের অস্পষ্ট কোলাহলও তখন আর এই নিভৃত প্রদেশকে তরঙ্গায়িত করিতেছে না। এই স্তব্ধ ঘুমন্ত নিশীথে দু একটা পেচক ও বাদুড় কেবল তাহাদের চীৎকার কোলাহল ও অশান্তি জাগরণ লইয়া ভীলপুত্রের মাথার উপর দিয়া চলিয়া গেল—আর ভীলপুত্র তাহার অশ্রুজল ও মর্ম্মবেদনা লইয়া এখনো জাগিয়া বসিয়া। নির্ব্বাণের পূর্ব্বে দীপ যেমন জ্বলিয়া উঠে তাহার এ জাগরণ বুঝি সেইরূপ অনন্ত ঘুমের পূর্ব্ব-জাগরণ!

ভীলপুত্র সাশ্রুনয়নে আবার ভীলগ্রামের দিকে চাহিল—একটা অদম্য বাসনায় সে আকুল হইয়া পড়িল—এখন বাড়ীর সকলে নিদ্রিত,—এখন একবার তাহাদের সে কি দেখিয়া আসিতে পারে না? তাহারা ত তাহা জানিতেও পারিবেন না। ভীলপুত্র শিখরদেশ হইতে নামিয়া তাহার পাদদেশে বিচরণ করিতে লাগিল, হঠাৎ চমক ভাঙ্গিয়া দেখিল গৃহের প্রাঙ্গনে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে, যেন কি একটা দুষ্কর্ম্ম করিয়াছে—থমকিয়া দাঁড়াইয়া চারিদিক ভয়ে ভয়ে নিরীক্ষণ করিয়া দেখিল, কিন্তু সম্মুখেই জল, তখন আর পিপাসা থামাইবার সাধ্য নাই, অতি সন্তর্পণে গৃহের নিকট আসিয়া ঝাঁপে হাত দিল, আস্তে টানিবা মাত্র ঝাঁপ খুলিয়া আসিল, বুঝিল তাহার জন্য এখনো ঝাঁপ বন্ধ হয় নাই। তখন পা টিপিয়া গৃহ মধ্যে প্রবেশ করিয়া নিস্তেজ দীপের আলোকে চারিদিক চাহিয়া দেখিল—মা ছোট ছেলেদের লইয়া গভীর নিদ্রায় মগ্ন, কিন্তু পিতা সেখানে নাই। নিরাশ হৃদয়ে, শয্যা পার্শ্বে আসিয়া— উথলিত, আবেগ বহুকষ্টে চাপিয়া নিস্তব্ধে মাকে প্রণাম করিয়া তাহার সর্ব্ব কনিষ্ঠ বড় স্নেহের ঘুমন্ত ভাইটির মুখ চুম্বন করিল, অমনি দুই বিন্দু অশ্রু তাহার গাল বাহিয়া শিশুর গালে পড়িল,—ঘুমাইয়া ঘুমাইয়া হঠাৎ শিশু সশব্দে হাসিয়া উঠিল, জানি না সে অশ্রুম্পর্শে শিশু হৃদয়ে কি স্বপ্ন জাগিয়া উঠিল। অন্য সময় হইলে ভীলপুত্র কত না আল্লাদে তাহাকে বুকে চাপিয়া ধরিত, আজ হাসি শুনিয়া সে ভীত হইল,ঘরে দাঁড়াইতে আর তাহার সাহস হইল না—ধীরে ধীরে দ্বারাভিমূখে সে পদ নিক্ষেপ করিল, এই সময় তাহার মা একবার অস্ফুটস্বরে ‘তালগাছ’ বলিয়া ডাকিয়া উঠিলেন—ভীলপুত্র চমকিয়া তাড়াতাড়ি ঘরের বাহির হইয়া পড়িল—বুঝি এইবার সে ধরা পড়ে। কিন্তু তখনি বুঝিল তাহার মা জাগিয়া ডাকেন নাই, তাহা তাঁহার ঘুমন্ত ডাক। বাহিরে আসিয়া আর সে নয়নজল রাখিতে পারিল না—তাহার বুকফাটা নিস্তব্ধ অশ্রুজলের মধ্যে সেই কুটীর, সেই কুটীরের মধ্যে যে সব স্নেহ মমতা ফেলিয়া আসিয়াছে সেই সব ভাসিতে লাগিল, আর সে ঘরের মধ্যে যাহাকে খুঁজিয়া পায় নাই যাহাকে দেখিবার জন্য বড় ব্যাকুল হইয়া আসিয়াছিল তাহাকে একবার দেখিবার জন্য অধীর হইয়া পড়িল।

পিতা কোথায়? তাঁহার ঘুমন্ত মুখখানি একবার শেষ বার দেখিতে পাইবে না? ভীলপুত্রের নয়নে অন্ধকার-হৃদয়ে মর্ম্ম যাতনা, সে অস্ত্রশালার দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করিয়া আস্তে আস্তে সেই দিকে গমন করিল, অনেক সময় মন্দালিক সেই ঘরেই শয়ন করিতেন। গৃহের প্রাঙ্গন পার হইয়া রোয়াক দিয়া অস্ত্রশালায় যাইতে হয়, ভীলপুত্র প্রাঙ্গন ছাড়াইয়া রোয়াকে আসিয়া দেখিল অস্ত্র শালার ঝাঁপও ঈষৎ খোল, গৃহ মধ্যে একটী দীপও মিটমিট করিতেছে, গৃহমধ্যে প্রবেশ করিতে যেন তাহার আর সাহস হইল না, খোলা ঝাঁপের মধ্য দিয়া একটু খানি মুখ বাড়াইয়া সে ঘরে উঁকি মারিল,—তাহার মুখের ছায়া গৃহমধ্যে পড়িল-মন্দালিক তখনো জাগিয়াছিলেন, আহলাদের স্বরে বলিয়া উঠিলেন—“তালগাছটা বুঝি এত্তটা দের কেন হইলু রে”।

তালগাছ চমকিয়া সোজা হইয়া দাঁড়াইল—মন্দালিক তাহার সম্মুখে আসিয়া পড়িলেন, আগ্রহে জিজ্ঞাসা করিলেন—“তালগাছটা” কি হইল রে—

এই উত্তর এড়াইবার জন্যই তালগাছ সমস্ত সন্ধ্যা এখানে আসে নাই। তাহার মনে ছিল পর দিন তাদের একজনের মৃতদেহই পিতাকে ইহার উত্তর দিবে; তাহার আগে একথা পিতাকে বলিতে তাহার সাহস নাই—এ কথা শুনিলে এ যুদ্ধে পিতা বাধা দিবেন এই তাহার ভয়, —ভীমপুত্র নিরুত্তর স্তব্ধ হইয়া রহিল।

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ

দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ।

নবাগত ধনুর্দ্ধারীর বেশভূষা ভীলদিগের মত কিন্তু তাহাকে দেখিতে ভীলদিগের মত নহে। তাহার বর্ণ গৌর, দেহ সুদীর্ঘ বলিষ্ঠ, প্রশস্ত বক্ষে ও জমাট মাংসপেশীযুক্ত হস্তে যেন বজ্রবল নিহিত, লৌহ গোলক তাহাতে পড়িলেও যেন চুরমার হইয়া যায়, অথচ সেই বিপুল বলশালী শরীরে ভীলদিগের মত একটা কঠোর কাঠিন্য ভাব নাই, তাহা সুঠাম সুগঠন। মাথার কাল কাল লম্বা লম্বা চুলের মধ্যে মুখখানি হাসি হাসি বালকের মত, ওষ্ঠাধরে এখনো শত্রুর রেখা পড়ে নাই, অথচ প্রশস্ত নয়নের দৃষ্টিতে এমন একটা প্রভুত্ব অঙ্কিত আছে, সমস্ত মূর্ত্তিতে এমন একটা বীরভাব ব্যাপ্ত হইয়া আছে—ষে তাহাকে দেখিলে বালক মনে হয় না, তাই আমরা তাহাকে যুবক বলি সম্বোধন করিয়াছি, কিন্তু বয়সে সে চতুর্দশ বর্ষের বালক মাত্র।

ধনুকছিলাস্কন্ধ, বাণফলক-হস্ত, কৌপীনধারী যুবক—মুক্তপত্রে মুক্তমস্তকে মুক্তগাত্রে স্বর্ণ-কান্তিময় দেহের বীর-
সৌন্দর্য্য প্রভাত-রৌদ্রে প্রকাশিত করিয়া যখন ভীলদিগের নিকট আসিয়া পোঁছিল—তখন—প্রকৃতির সৌন্দর্য্য দেখিয়া কবির হৃদয়ে যেরূপ আনন্দ জন্মে যুবকের সেই সুবর্ণ-সুঠামবলিষ্ঠ মূর্ত্তি দেখিয়া তাহাদের সেইরূপ আনন্দ হইল। তাহাদের মনে হইল তাহার কান্তি পাইয়াই যেন প্রভাতটা এত উজ্জ্বল হইয়া উঠিয়াছে। একজন কেবল সেরূপ আনন্দের ভাব প্রকাশ করিল না। বৃদ্ধ ভীল সস্নেহে অনন্দপূর্ণ-হৃদয়ে যুবকের পিঠে হাত দিয়া বলিলেন—“এতক্ষণে আইলি বাপুরে।” যুবক হাসিতে হাসিতে বলিল—“শেষ রাতে আমার দিদি শ্বশুরবাড়ী থেকে এসেছেন তাই আসিতে দেরী হয়ে গেল”—দিদি আসিয়াছেন—বলিতে যুবকের কত আনন্দ! বলিতে বলিতে সে আনন্দ যেন তাহার সর্বাঙ্গে ছাইয়া পড়িল; তাহার আনন্দ দেখিয়া ভীলেরাও মহা-আনন্দিত হইল-বলিল-“তবে চল রে চল-শিকারে চল—”

সকলে মিলিয়া আনন্দ-রব করিতে করিতে শিকারে গমন করিল। অরণ্যে প্রবেশ করিয়া গাছের ডাল ভাঙ্গিয়া, পাতা ছিঁড়িয়া, পাখী মারিয়া, পশু মারিয়া, ভয়বিহ্বল পলাতক পশুদিগের পশ্চাৎধাবিত হইয়া অরণ্য তোলপাড় করিতে লাগিল। এই সুপ্রভাতে অরণ্যবাসী নিরীহ পশু পক্ষীদিগের আকুল ক্রন্দন আর শিকারীদিগের পৈশাচিক উন্মত্ত চীৎকার ধ্বনি যতদুর গেল—বিদীর্ণ করিয়া তুলিল, কেবল মতি অরণ্য মহাকালের মত উদাস ভাবে এই সুখ দুঃখের প্রতি অবিচলিত দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল, —তাহার প্রাণে সে হাসি কান্না বিন্দুমাত্র স্পর্শ করিল না।

নবম পরিচ্ছেদ

নবম পরিচ্ছেদ।

এত শীঘ্র যে ভীলপুত্র আবার গুহার মুখামুখি হইয়া দাঁড়াইবে খানিকক্ষণ আগে তাহা সে জানিত না। খানিকক্ষণ আগে তাহার স্থিতি গতি সমস্তই একটা অন্ধকার অনিশ্চিতের মধ্যে নিহিত ছিল। পিতার আজ্ঞায় নবঅভিষিক্ত, গুহাকে প্রণাম করিয়া সে যখন অলক্ষ্যে উৎ-
সবের জনতা হইতে সরিয়া পড়িল, গভীর যন্ত্রণার একটা গুরুবলে চালিত হইয়া সে যখন দিগ্বিদিক লক্ষ্যহীন হইয়া চলিতে লাগিল, তখন সে জানিত না কোথায় গিয়া তাহার সে গতির অবসান। কেহ জানিতে পারে না; অদৃষ্টের তাড়নার কোথায় গিয়া শেষ কেহ জানিতে পারে না, যখন তারকা লক্ষ্যভ্রষ্ট হইয়া চলে—উল্কাপিণ্ড কক্ষচ্যুত হইয়া পড়ে, তখন কোথায় গিয়া তাহাদের শেষ তাহারা জানিতে পারে না—ভস্ম হইতে হইতে তবে তাহাদের সে চেতনা জন্মে।

ভীমপুত্রের যখন চেতনা জন্মিল তখন সে মৃত্যুর তীরে; সম্মুখেই পর্ব্বতের শেষ, আর একপদ অগ্রসর হইলে অনন্তের অস্তিত্বে সে তখন বিলীন হইয়া পড়িবে, ভীলপুত্র থমকিয়া দাঁড়াইল—কিন্তু কেন দাঁড়াইল?

সম্মুখের ঐ যে গহবর-চরাচর গ্রাস করিতে মুখ ব্যাদান করিয়া আছে, উহা কি তাহাকে আশ্রয় দিবার জন্য সস্নেহে আহ্বান করিতেছে না, তবে ও স্নেহের ডাক উপেক্ষা করিয়া দাঁড়াইয়া কেন সে? জীবনে আর তাহার কি আবশ্যক? তাহার পিতার স্নেহ যখন ফুরাইয়াছে—তথন জীবনে আর তাহার কি সুখ? জীবনে এখন যাহা পাইবার আশা নাই, বরঞ্চ মৃত্যুতে এক দিন সে তাহা পাইতে পারে, তাহার মৃতদেহ কোলে লইয়া পিতার এক দিন কাঁদিবার সম্ভাবনা আছে, মৃত্যুতে পিতার স্নেহ এক দিন, ফিরিতে পারে—জীবনে নহে। তবে কি জীবন অপেক্ষা মৃত্যুই তাহার প্রার্থনীয় নয়?

তাহার দুই চক্ষু ভাসিয়া জল পড়িতে লাগিল, সে পাশের গাছের একটা ডাল নুয়াইয়া ধরিয়া ঘূর্ণামান মস্তক তাহার উপর রাখিল; কতক্ষণ এইরূপে কাটিয়া গেল সে তাহা জানে না,—হঠাৎ কার স্পর্শে চমকিয়া—ফিরিয়া দাঁড়াইল, দেথিল মালিক তাঁহার সম্মুখে দাঁড়াইয়া। তাহার মনে হইল সে স্বপ্ন দেখিতেছে। মালিক স্নেহের স্বরে যখন বলিলেন “বাছাডা তোর কি হউছুরে?” তখন ভীলপুত্রের মনের আবেগ আর রহিল না, সে কাঁদিয়া বলিয়া উঠিল—বাবাডারে মুই তোর কি করুছি, কোন লাগিন মোরে তুই তেয়াগ করিলি?”

সে করুণ স্বর—সে কাতর ক্রন্দন মন্দালিকের হৃদয় বিদ্ধ করিল, তিনি বিচলিত হইয়া পড়িলেন—তিনিই যে পুত্রের কষ্টের কারণ তাহা বুঝিতে পারিলেন, অথচ তাহা হইয়াও যেন উপায় ছিল না, তাঁহার মনে হইল তিনি যেন একটা যন্ত্রমাত্র। তিনি কম্পিত কণ্ঠে অগেকার ভাষায় বলিলেন (আমরা সাদা ভাষাতেই এখন হইতে বলিয়া যাই) “বৎস পিতা হইয়া পুত্রকে কি কেহ ত্যাগ করিতে পারে”

পুত্র বলিল “তবে আমার এ দশা কেন?”

পিতা তাহাকে বুকের মধ্যে টানিয়া লইলেন, ছোট বেলায় যেমন আদর করিতেন সেইরূপ আদর করিয়া বলিলেন “ও আমার বাছল রে, তালগাছডারে, তোকে আমি ত্যাগ করিব! আপনার সন্তানকে আমি ত্যাগ করিব?” পিতার স্কন্ধে ব্যথিত মস্তক রাখিয়া ভীলপুত্র কাঁদিতে লাগিল, আগেও কাঁদিয়াছিল—এখনো কাঁদিল; এ কান্নায় আর সে কান্নায় কত তফাৎ! এইরূপ পিতার কাঁধে মাখা রাখিয়া, সুখের কান্না কাঁদিতে কাঁদিতে তাহার মরিতে ইচ্ছা হইল,—আর আগেও এক বার মরিতে চাহিয়াছিল, এই দুই রূপ মৃত্যুতে কত তফাৎ!

ভীলরাজ তাহার অশ্রু মুছাইতে মুছাইতে বলিলেন,

“তোর কি সিধু গোয়ালিনীকে মনে পড়ে, মা হইয়া সে সন্তানকে নদীর জলে বিসর্জ্জন দিয়াছিল মনে আছে কি? সন্তানের প্রতি তাহার কি মেহের অভাব ছিল বৎস! তাহাকে ভাসাইয়া সেই শোকে সেও কি প্রাণত্যাগ করে নাই? তবে সে এমন কাজ করিল কেন? সে জানিয়াছিল তাহা দেবতার কাজ, তাহা না করা তাহার ক্ষমতায় নাই, তাহা না করিলে তাহার সন্তানের মঙ্গল নাই। পুত্র, আমিও তোমাদের মঙ্গলের জন্যই, তোদের সত্য রক্ষার জন্যই—দেবতার কার্য্য জ্ঞানে তোমার স্থলে অন্যকে রাজ্য দিয়াছি। কিন্তু আমার হৃদয় আমার স্নেহ সে আর কাহারো নহে, তাহা তোমার জন্যই রহিয়াছে”

“সত্যই কি তবে পিতার স্নেহ তাহারি আছে, ভীলপুত্র কি এতক্ষণ তবে স্বপ্ন দেখিতেছিল—মিথ্যা একটা কুহকের মধ্যে ডুবিয়াছিল!”

পিতার সে স্নেহের কথায়, সেই স্নেহের আলিঙ্গনে, দীর্ঘকাল ব্যাপী একটা দুঃস্বপ্ন যেন তাহার হঠাৎ ভাঙ্গিয়া গেল, অনেক দিন পরে একটা মহাঘুম হইতে জাগিয়া উঠিয়া প্রগাঢ় শান্তিতে তাহার হৃদয় ডুবিয়া গেল, সে শিশু কালের নির্ভর ভাবে শিশু কালের বিশ্বাস ভরে পিতাকে জড়াইয়া ধরিয়া নিতান্ত শিশুটির মত বলিল “বাবা আমি রাজ্য চাহি না,—তোর এই বুক আমার থাকিলে আমি কিছুই চাই না আর —”

ভীলরাজ বলিলেন “ইহা ত চিরকাল তোরি আছে বৎস”

ভীমপুত্র পিতার, স্কন্ধ হইতে মুখ তুলিয়া তাঁহার আলিঙ্গন হইতে মুক্ত হইয়া এমনি দৃষ্টিতে তাঁহার দিকে চাহিল—যেন সে তাহার পিতার নিকট কত অপরাধই করিয়াছে—একটু পরে বলিল—

“এতদিন আমি তা বুঝি নাই—আমি মনে করিতাম গুহা আমার শত্রু”

ভীলরাজ একটু থামিয়া বলিলেন “আপনি আপনার শত্রু না হইলে জগতে কেহ কাহারো শত্রু নাই। বৎস এখন ত বুঝিয়াছ গুহা তোমার শত্রু নয়?”

পিতার সম্মুখে দাঁড়াইয়া, পিতার বুকে আশ্রয় পাইয়া, পিতার স্নেহে পূর্ণ হইয়া, তাহার আর তখন কাহাকেও শত্রু জ্ঞান ছিল না তাই সে বলিতে পারিয়াছিল “আমি মনে করিতাম গুহা আমার শত্রু” তাই সে আবার বলিল—“আমার কেহ আর শক্ত নাই বাবা”

মন্দালিক বলিলেন “বৎস তবে এই মুহূর্ত্তে তাহাকে মিত্র বলিয়া আলিঙ্গন করিয়া এস, সময় চলিয়া গেলে এ ভাব নাও থাকিতে পারে। এখন এ শুভ সময়ে যাহাকে মিত্র বলিবে, পরে আর তাহাকে শত্রু মনে হইবে না”

অনেক কষ্টের পর, অনেক দিনের পর ভীলপুত্রের হৃদয় প্রেমের সুখে পূর্ণ, উথলিত, বিশ্ব সংসারকে প্লাবিত করিতে যেন ব্যগ্র, গুহা সেই বিশ্ব সংসারের একজন, গুহাকে কেন সে তাহার প্রেমের ভাগ না দিবে, সে অকুণ্ঠিত চিত্তে আবার বলিল “সে আমার শত্রু নয় বাবা—আমি তাহাকে আলিঙ্গন করিব”

মন্দালিক বলিলেন “তবে এখনি যাও বৎস, এ মুহুর্ত্ত অবহেলা করিও না”

যাইবার আগে ভীলপুত্র পিতাকে আর একবার আলিঙ্গন করিল।

দুই এক পদ গিয়া সে আবার থামিয়া দাঁড়াইল—ফিরিয়া জিজ্ঞাসা কৱিল—“বাবা ডা একটা কথা মনে হইল, গুহা ত রাজা হইবার নয়”

ভীলরাজ বিস্মিত হইলেন—বলিলেন “এ কথা কেন পুত্র! তোমার কি এখনো রাজ্যলোভ আছে? আমি রাজ্য ছাড়িতে পারিলাম তোর এখনো রাজ্যে লোভ”!

সে ক্ষুন্ন হইয়া বলিল “তুই রাজ্য ছাড়িলি—আমি রাজ্য চাহিব! আমি কেবল শুধাই এই, গুহা ব্রাহ্মণ পুত্র, তবে সে রাজা হইবে কিরূপে? তুই ত বলিয়াছিস— রাজ পুরুষ না হইলে মোদের বংশে কেহ রাজা হইতে পারে না”—

ভীলরাজ একটু নিস্তব্ধ হইয়া থাকিয়া বলিলেন “তবে শোন। গুহা ব্রাহ্মণপুত্র নহে, রাজপুত্র। উহাকে রাজ। করিলে আমাদের নিয়ম ভাঙ্গে না।”

ভীলপুত্র বিস্মিত হইয়া পিতার প্রতিধ্বনির মত বলিল। “গুহা ব্রাহ্মণপুত্র নহে, রাজপুত্র”!

ভীলরাজ বলিলেন “হাঁ”

তবু যেন তার সন্দেহ ঘুচিল না—সে আবার বলিল “গুহা ব্রাহ্মণ পুত্র নহে? গুহা তবে কমলাবতীর সন্তান নহে?”

ভীলরাজ বলিলেন “না কমলাবতী উহার কেহই নহে, প্রতিপালিকা মাত্র”। ভীলপুত্র আর কোন কথা কহিল না, একবার চারিদিকে বিস্ময়নেত্রে চাহিয়া দেখিল,—চারিদিকে আর সব ঠিক আগেকার মত আছে কি না, বুঝি তাহার সন্দেহ জন্মিল; তাহার পর আস্তে আস্তে গন্তব্য পথে পদক্ষেপ করিল। মন্দালিক বলিলেন “গুহা ভীল গ্রামে নাই, মন্দিরের পথ ধর”

ভীলপুত্র মন্দিরের পথে নামিতে নামিতে, মাঝে মাঝে মুখ তুলিয়া সেই উচ্চ ভূমির দিকে চাহিয়া দেখিতে লাগিল —অনেক দূর পর্য্যন্ত তাহার পিতার স্থির মূর্ত্তি ছবির মত তাহার চোখে পড়িতে লাগিল।

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ

পঞ্চদশ পরিচ্ছেদ।

নিভ নিভ মলিন-জ্যোৎস্নাদীপ্ত কুয়াসার অন্ধকারের মধ্যে একটা আর্ত্তনাদ উঠিয়া হারাইয়া গেল, গুহা সেই হারান স্বর অনুসরণ করিয়া ধাবিত হইলেন। রাস্তার যেস্থল হইতে ধ্বনি উখিত হইয়াছিল—সেই স্থলে আসিয়া কাহাকেও দেখিলেন না, পথের এদিক ওদিক অন্বেষণ করিতে লাগিলেন। পার্ব্বত্যপথ, কোথায় উঁচু, কোথায় নীচু, কোথায় বিস্তৃত প্রান্তর, কোথায় ঘন তরু শ্রেণীর মধ্যে পাহাড়ের পাষাণ দেয়ালের মধ্যে আঁকাবাঁকা সঙ্কীর্ণ স্থান, যাহা দেখিতে নিকটে মনে হয়, ছুটিয়াও সেখানে অগ্রসর হওয়া যায় না, চীৎকার করিয়াও কাহারো সাড়া মিলে না, কেবল নিজের প্রতিধ্বনি দ্বিগুণ বেগে কাণে আসিয়া লাগে। এই অবস্থায় যুবক দ্রুতপদে আকুলহৃদয়ে পাহাড়ের এদিক ওদিক অনুসন্ধান করিয়া বেড়াইতে লাগিলেন, অবশেষে ফিরিয়া ঘুরিয়া পূর্ব্বোক্ত স্থলের নিকটে আসিয়া ছোট ছোট গাছড়ার জঙ্গলের মধ্যে একটি যেন অস্পষ্ট মনুষ্য কায়া দেখিতে পাইলেন, তাহা জঙ্গলের অন্ধকারে এত মিশাইয়া পড়িয়াছে, যে ইহার নিকট দিয়া পূর্ব্বে যাতায়াত করিয়াছেন, তবু ইহা নজরে পড়ে নাই। গুহা নিকটে আসিয়া দেখিবামাত্র সত্যই একটি রক্তমাখা মনুষ্যদেহ দৃষ্টিপথে পড়িল। সেই অস্ফুট চন্দ্রালোকেও গুহা মন্দালিকের অজ্ঞান মূর্ত্তি চিনিতে পারিলেন, আহত স্থান হইতে রক্ত উথলিয়া উঠিয়া তাঁহার সর্ব্বাঙ্গ আপ্লুত করিয়াছিল। তীব্র যাতনায় আহত হইয়া গুহা করুণ-কণ্ঠে চীংকার করিয়া সেইখানে বসিয়া পড়িলেন, কাতরভাবে নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিলেন—সাড়া পাইলেন না। তবু তখনো জীবন আছে বলিয়া মনে হইল—শীঘ্র যদি রক্তের উচ্ছাস বন্ধ করা যায় ত এখনো হয়ত বাঁচিতে পারেন। গুহা সব্যগ্রে নিজের পরিধেয় বস্ত্রের অর্দ্ধভাগ ছিঁড়িয়া যত দূর পারিলেন রক্ত মুছাইয়া, চর্ব্বিত দুর্ব্বাঘাস দিয়া ক্ষতস্থান বাঁধিয়া দিলেন, তাহার পর রাস্তার পারে যে পুষ্করিণী তলে দাঁড়াইয়া তিনি তীর ছুড়িয়াছিলেন, তীর বেগে সেইখানে ছুটিয়া চলিলেন। উঠিবার সময় ভীলরাজের নিকটে একটি তীর পতিত দেখিতে পাইলেন—দেখিলেন তাহা ভীলপুত্রের তীর, গুহা শিহরিয়া সেখান হইতে ছুটিয়া চলিয়া গেলেন। গুহার তীরে যে মালিক আহত হয়েন নাই, এই চিন্তায় তাঁহার পীড়িত ক্লিষ্ট হৃদয়েও শান্তির উদয় হইল—উথলিত হৃদয়ে অন্তরের সহিত বারবার করিয়া মনে মনে গুহা মহাদেবকে প্রণাম করিলেন।

পঞ্চম পরিচ্ছেদ

পঞ্চম পরিচ্ছেদ।

পরদিন ভীলেদের ভোজোৎসব। আজিকার শীকার মাংস রন্ধন করিয়া আহার উপলক্ষে কাল তাহাদের নৃত্যগীত আমোদ প্রমোদ। শীকারীরা শীকার লইয়া গ্রামে আসিলে বিকাল হইতে গ্রামের সমস্ত ভীলেরা মহা ব্যস্ত, রাত্রেও তাহাদের নিদ্রা নাই। বৃদ্ধ ও যুবকদিগের নৃত্যগীত ভোজের স্বতন্ত্র দুইটি স্থান নির্দ্দিষ্ট হইয়াছে, দুইটি নির্দ্দিষ্ট চক্রের মধ্যে শুষ্ক কাষ্ঠরাশির দুইটি আগুণ ধূ ধূ করিয়া জ্বলিতেছে, তাহার চারিপাশে লোক জমা হইয়া মেয়ে পুরুষে মিলিয়া উনুন খুড়িতেছে, শীকার কাটিতেছে, বাটনা বাটিতেছে, মাদল পিটিতেছে, গল্প করিতেছে, হাসিতেছে, চীৎকার করিতেছে, আর হাসিতে হাসিতে গল্প
করিতে করিতে মাঝে মাঝে অগ্নি কুণ্ডে শুষ্ক কাঠ ঠেলিয়া দিতেছে ও নূতন কাঠ কাটিয়া আনিয়া জমা করিবার জন্য তম্বি করিতেছে। যাহারা কাঠ আনিতে উঠিতেছে তাহারা দু এক পা গিয়া দু একটা মাদল টানিয়া লইয়া পিটিতে পিটিতে গান লাগাইয়া দিতেছে অবশেষে মেয়েদের চেঁচানির জ্বালায় মাদল গুলা ফেলিয়া চোঁচা দৌড় মারিতেছে।

এই সময় এই গোলমাল হইতে কিছু দূরে ভীলপুত্র একাকী বসিয়াছিল। কিছু পরে কয়েকটি ভীলযুবা নিকটে আসিয়া বলিল—“এক্কা কি করছুস রে—আয়না ওই দিকে” কিন্তু ভীলপুত্রের উঠিবার গতিক না দেখিয়া শেষে আপনারাই সেই খানে অডিডা গাড়িল, ক্রমে সেখানে ছোট্ট খাট্ট একটি দল জমিয়া, উৎসবেরই গল্প আরম্ভ করিয়া দিল; ভীলপুত্র চুপ করিয়া শুনিতে শুনিতে থাকিয়া থাকিয়া বলিয়া উঠিল—

“কাল রাজা হউবিরে কোন ডা?”

ভীলদের সকল কর্ম্মেই একজন অধিনায়ক আবশ্যক;—ইহা অসভ্য সমাজের একটা বিশেষ লক্ষণ, কাল ভীলরাজ মন্দালিক বৃদ্ধদিগের মধ্যেই থাকিবেন, সুতরাং কাল যুবাদের অধিনায়ক হয় কে—এই কথা? কিন্তু একথায় অন্যেরা যেন আশ্চর্য্য হইল, একজন বলিল—“ক্যানরে যেইডা রোজ হউছে।” ভীল পুত্র কাল ভুরুর গোচ্ছা কুঁকড়িয়া বলিল—

“সেইডারে রোজ মুইরা রাজা করিবু ক্যানরে? তানা কি মুদের রাজপুত্র! মুরা কি রাজা হইতে নারি নাকি?”

একজন ভীল বলিল—“সে রাজা বেটা বড্ডই লায়েক ভাই”—

ভীল পুত্র রাগিয়া বলিল “মোর লায়েক নই ক্যামনে,”

ভীল বলিল “দেখুছিস ত কাল ক্যামন হরিণডা অনিল”

ভীলপুত্র। “সে হরিণ আনিল মুই বরা আনিল না?”

একজন ভীল। “তাতু ব্যাটে, ত্যাবে হরিণডা”—ভীলপুত্র লালচক্ষু করিয়া বলিল—

“হরিণডা হরিণডা! মুইত আর একদিন হরিণডা নিয়ে এনু, তাতে ত এত কথা কেউ কইল না—বাবাত মোর পিঠটাও ধাবড়ালে না—আর আজ দিনভোর হরিণডা হরিণডা! বল না ক্যান্, মুই গোটা গোটা অমন হরিণ আনু দিউছি।”

আর একজন ভীল বলিল “চট্টিশ ক্যান্ ভাইডা— তানা রাজা না হউবু ত কোনডা হউবু?”

ভীলপুত্র। “যত দিন হউছিল কে? মুই না রাজার ছেলে—মুই হউব। সডা হইলে মুই থাকিবুই না”

ভীলপুত্রের যা মনে হইয়াছে স্পষ্টাপষ্টি বলিয়া গেল—সে অসভ্য ঘোর প্যাঁচ করিয়া ঢকিয়া ঢুকিয়া বলা তাহার কর্ম্ম নহে। একজন ভীল বলিল—“তানা” রোজ রাজা হউছে আজ সেডা ছাড়বে ক্যানরে?”

ভীলপুত্র। “ছাড়ুবে ক্যান! মুরা কি মানুষ নকি? মরা তাড়াউতে নারিব!

এ কথায় ভীলেদের প্রাণে ব্যথা বাজিল—তাহারা যুবককে বড়ই ভাল বাসে, অথচ, ভীলপুত্রের এতদূর অনিচ্ছার মধ্যে তাহাকে রাজা করিবার কোন উপায়ই দেখিল না, মহা মুস্কিলে পড়িল। একজন একটু পরে বলল—

“বেস্ মুরা তানারে রাজা করিব না; কাল চক্করে (চক্র খেলায়) যেইডা জিতুবে—সেই ডা রাজা”—

ভীলপুত্র ইহাতে আর কোন কথা কহিতে পারিল না, এ প্রস্তাবে অসম্মত হইলে ভীলেরা তাহাকে ঘৃণা করিবে। তাহাই ঠিক হইল। যুবক প্রাতঃকালে আসিয়াই এই বন্দোবস্তের কথা শুনিল—তাহারও ইহাতে কোন আপত্তি হইল না। কোন উত্তেজনার কাজে, সাহসের কাজে যুবক পিছপাউ নহে, বরঞ্চ তাহাতেই তাহার আনন্দ, সেইরূপ কাজই যুবক খুঁজিয়া বেড়ায়।

পরিশিষ্ট

পরিশিষ্ট।

আমরা ‘মিবাররাজে’ গুহাকেই মিবারের আদিরাজ করিয়াছি, —কিন্তু গুহা বা বাপ্পা কে মিবারের আদি রাজ এ সম্বন্ধে একটু গোল আছে।

মিবার রাজগণ ইরাণী বংশ-জাত কি না এই আলোচনা প্রসঙ্গে টড আবুল ফজলের এই উক্তি উদ্ধৃত করিতেছেন—

The Rana's family consider themselves to be descendents of noshirwan. They came to Berar (Berat) and became chiefs of pernalla which city being plundered eight-hundred years prior to the writing of this book (আকবর নামা) his mother fled to Mewer and was protected by Mandalica Bhil whom the infant Bappa slew, and seized his territory.

মর্ম্ম এই—

“রাণা-পরিবার আপনাদিগকে নসিরাণ-বংশ মনে করেন। তাঁহার বিরাটে আসিয়া পার্ণালা নগরের প্রধান হইয়া উঠেন, এই পুস্তক লেথার (আকবর নামা) আট শত বৎসর পূর্ব্বে উক্ত নগর যখন লুষ্ঠিত হয় সেই সময় বাপ্পার মাতা মিবারে আসিয়া মন্দালিক ভীলের আশ্রয়ে ছিলেন। পরে বাপ্পা মন্দালিককে নিহত করিয়া তাহার রাজ্য গ্রহণ করেন।”

এই উক্তিতে বাপ্পাই মিবারের আদিরাজ। অথচ টড যখন রাণদিগের ইতিহাস প্রদান করিতেছেন তখন গুহাকেই মন্দালিকের হন্তারক ইদর রাজ ধরিয়া উল্লেখ করিতেছেন। কেবল তাহাই নহে, এই উল্লেখস্থলে আবার আবুল ফজেলের দোহাই দিয়াছেন। অথচ আবুল ফজেল যে এ সম্বন্ধে কি বলেন তাহা পাঠকগণ আগেই দেখিয়াছেন তাহাতে বাপ্পা ছাড়া গুহার নাম নাই। সুতরাং এ সমস্যা ভাঙ্গে কিরূপে? বান্ধব পত্রিকার ‘বনপুত্র’ লেখকের ন্যায় যদি বলা যায় গুহা ও বাপ্পা একই ব্যক্তি—গুহাতে জন্ম বলিয়া গুহা—বাপ নামে সম্বোধিত বলিয়া বাপ্পা—তবেই ইহার একরূপ সমন্বয় হয়। কিন্তু তাহাও নহে, বাপ্পা ও গুহা যে দুই সময়ের স্বতন্ত্র দুই ব্যক্তি তাহা টড স্পষ্ট করিয়া বলিয়াছেন। তিনি গুহার জীবন স্বতন্ত্র লিখিতেছেন বাপ্পার জীবন স্বতন্ত্র লিখিতেছেন বাপ্পাকে গুহার নবম পুরুষ বলিয়। পরিচয় দিয়াছেন। এ পরিচয় অগ্রাহ্য করিবার যো নাই, কিরূপ ইতিহাসাদি হইতে ইহা সঙ্কলিত তাহা পূর্ব্বেই বলা হইয়াছে। টড পুরাতন আশাপুরের একখানি খোদিত প্রস্তর-লেখ্য পাইয়াছেন তাহাতেও গুহা ও বাপ্পার স্বাতন্ত্র্য সুপ্রমাণিত। রাজস্থানের মিবার ইতিহাসে গুহা ও বাপ্পার মধ্যে প্রায় দুইশত শতাব্দীর ব্যবধান। বল্লভীপুর আক্রমণের সময় ইহাতে ৫২৪ খৃষ্টাব্দ (এই সময়েই গুহার জন্ম) আর বাপ্পার চিতোর-সিংহাসন আরোহণ কাল ৭২০ খৃষ্টাব্দ নির্দ্দিষ্ট।

আবুল ফজেলের উক্তিতে তাঁহার পুস্তক লেখার আট শত বৎসর আগে বাপ্পার মাতা মিবার আগমন করেন। ষোড়শ শতাব্দীতে তাঁহার পুস্তক প্রণীত, তাহার আটশত বৎসর পূর্ব্ব হইলে ৮ শতাব্দী হয়।

কিন্তু অন্যান্য ইতিহাস হইতে টড যতদূর প্রমাণ পাইয়াছেন তাহাতে ৮ খৃষ্টাব্দ নহে, ৬ খৃষ্টাব্দেই বল্লভীপুর লুণ্ঠিত হয়, সুতরাং বাপ্পা শিলাদিত্যেরও সন্তান হইতে পারেন না, বিরাট হইতেও তাঁহার মাতার প্রথম আগমন নহে; তবে অষ্টম শতাব্দীতে বাপ্পা চিতোর সিংহাসন লাভ করেন এই পর্য্যন্ত ঠিক। সুতরাং গুহার জীবনী দিয়া যে আবুল ফজেল বাপ্পাকে সাজাইয়াছেন, তাহাই টড দেখাইয়াছেন, টডের কথায় গুহাকেই আমরা মিবারের আদি রাজ রূপে গ্রহণ করিয়াছি।

একটু অপ্রাসঙ্গিক হইলেও এইখানে আমরা আর একটি কথা বলিব।

ক্ষত্রিয় রাজাদিগের পাণ্ডু লেখ্য ইতিহাসাবলী, তাঁহাদের ভাটগ্রন্থ তাঁহাদের মন্দিরস্থ খোদিত লিপি প্রভৃতি হিন্দুদিগের যে সকল লেখা হইতে টড মিবার-রাণাগণের পরিচয় গ্রহণ করিয়াছেন সে সকলেই রাণাগণ সূর্য্যবংশ বলিয়া উক্ত। মাঝখান হইতে কোন কোন যাবনিকগ্রন্থ কি রূপ যুক্তিহীন কথায় রাণাদিগের এই সূর্য্য কুলে ইরাণীত্ব আরোপ করিয়া তাঁহাদের বংশগৌরব মলিন করিতে প্রয়াস পাইয়াছে পাঠকদিগকে আমরা তাহা না দেখাইয়া থাকিতে পারিলাম না।

“মাসার অল ওমরা” নামক গ্রন্থের উক্তি হইতেই প্রধানতঃ উক্তরূপ অনুমানের জন্ম।

শিবজির ইতিহাস ‘লেখক লক্ষ্মীনারায়ণ সুফিক আরঙ্গাবাদি’ (আরঙ্গাবাদের কাব্যলেখক) রাণা রংশ বলিয়া শিবজির পরিচয় প্রদান প্রসঙ্গে তাঁহার পুস্তকে উল্লিখিত গ্রন্থের উক্তি উদ্ধৃত করিয়াছেন। টড আবার এই উদ্ধৃতাংশ অনুবাদ করিয়া রাজস্থানে যাহা সন্নিবেশ করিয়াছেন—আমরা এইখানে সংক্ষেপে তাহার সার মর্ম্ম প্রকাশিত করিতেছি। পাঠকগণ এখন দেখুন উক্তরূপ অনুমানের ভিত্তি কতদূর দৃঢ়।

“হিন্দু রাজকুল প্রধান উদয়পুর রাণাগণ ‘নমিরান ই আদিলের’ (ন্যায়বান) (যিনি হিন্দুস্থানের অনেক প্রদেশ জয় করেন) বংশ বলিয়া পরিচিত। বৈজন্তিয়মের (আধুনিক কনষ্ট্যানটিনোপল) সম্রাট মরিসের কন্যা মেরিয়ানা পারস্যরাজ নসিরাণের এক মহিষী ছিলেন। তাঁহার গর্ভের সন্তান নাসজাদ পিতার ধর্ম্ম ত্যাগ করিয়া মাতার খৃষ্টান ধর্ম্ম গ্রহণ করেন, এবং সসৈন্য হিন্দুস্থানে আসিয়া সেখান হইতে পিতার বিরুদ্ধে ইরাণ যাত্রা করেন, সেইখানে তাহার মৃত্যু হয়—কিন্তু তাঁহার যে পুত্রকে তিনি হিন্দুস্থানে রাখিয়া যান তাহা হইতেই রাণা বংশের উৎপত্তি।”

এই এক কথা—আর এক—

“পিতৃ বিদ্রোহী নসিজাদ ইরাণে গিয়া যুদ্ধে নিহত হওয়ায় তাঁহার বৈমাত্র ভ্রাতা পিতৃ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হয়েন। এই ভ্রাতার বংশধর শেষ অগ্নিউপাসক রাজা এজিদ ১৭ হিজরা অব্দে মুসলমানগণ কর্ত্তৃক পরাভূত ও হৃত রাজ্য হয়েন। এজিদের তিন কন্যা ছিল। যুদ্ধের পর দ্বিতীয় কন্যা সাহার বানু ইমাম হোসেনের পত্নী হইলেন, তৃতীর কন্যা বানু একজন আরব কর্ত্তৃক বলপূর্ব্বক চিকিক অরণ্যে নীত হইয়া সেইখ়ানে ঈশ্বর শরণ করতঃ অদৃশ্য হইলেন। (এই জন্য পারসীদের ইহা একটি পুণ্য তীর্থ।) কিন্তু জ্যেষ্ঠা কন্যা মহাবানুর যে কি হইল ইরাণী পুস্তকে তাহার কোন উল্লেখ নাই, কিন্তু মহাবানু যে হিন্দুস্থানে আসিয়াছিলেন হিন্দু পুস্তক হইতে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়, মহাবানু হইতেই শশোদিয়া বংশের (রাণা বংশ) উৎপত্তি। এইরূপে যেদিক দিয়াই ধর মিবাররাজগণ হয় নসিরাণ-পুত্র নসিজাদের সন্তান না হয় এজিদ কন্যা মহাবানুর সন্তান।”

এই ত ‘মাসার অল ওমরার’ উক্তি, কিন্তু ইহার মধ্যে মুখের জোর কথা ছাড়া রাণাদের ইরাণীত্ব প্রতিপাদন করে এমন ঐতিহাসিক যুক্তি কই?

ইতিহাস বরঞ্চ ইহার বিপরীতেই যুক্তি প্রদান করে।

টড বলেন—পারস্য ইতিহাসে নসিজাদের সৌরাষ্ট্র আক্রমণ ও তাহার সিংহাসন আরোহণের সময় (৫৩১ খৃঃ) যা পাওয়া যায় তাহার সহিত হিন্দু ইতিহাসের বল্লভীপুর লুণ্ঠন কালের (৫২৪ খৃঃ) ঐক্য দেখা যায়।

আরো বলেন—

বল্লভীপুরের কাছে বৈজন্তিয়ম নামে একটি নগর ছিল। বৈজন্তিয়ম-সম্রাট-কন্যার গর্ভজাত পারস্য-রাজপুত্র নসিজাদ যে এইখানে যুদ্ধ করেন এই নামটিই তাহার প্রমাণ। যুদ্ধ জয়ের পর মাতার দেশের নামে এই নগরের নাম করণ করিয়াছেন।

টডের এই দ্বিতীয় কথাটির সম্বন্ধে আমাদের একটু বক্তব্য আছে।

টড যে নগরকে বৈজন্তিয়ম নাম দিতেছেন, যতদূর সম্ভব তাহার প্রকৃত নাম বৈজয়ন্তী। বৈজয়ন্তী একটি সংস্কৃত কথা সুতরাং এই নাম হইতেই নগরটি নসিজাদের স্থাপিত এমন প্রমাণ হয় না। বিজয় সেন যখন বল্লভীপুর বিজয়পুর প্রভৃতি স্থাপন করেন তখন বৈজয়ন্তী নামে আর একটি নগর তাঁহা কর্ত্তৃক স্থাপিত হইয়াছিল ইহাই অধিক সম্ভবপর।

টড যে সংস্কৃত ভাষা জানেন না—রাজস্থানের নানা স্থানে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়—ইহাও আর একটি প্রমাণ মাত্র।

কিন্তু যদি উক্ত নগর নসিজাদের স্থাপিত বৈজন্তিয়ম বলিয়াই মানিয়া লওয়া যায় তাহা হইলে টডের উল্লিখিত দুইটি কথা হইতে ইহাই প্রমাণ হয়—যে তাতারগণ নহে,
পারস্য-রাজপুত্র নসিজাদই বল্লভীপুর আক্রমণ করিয়া শিলাদিত্যের রাজ্য অধিকার করেন। রাণাগণ যে নসিজাদের বংশ উপরোক্ত ঐতিহাসিক ঘটনা হইতে তাহার প্রমাণ হয় না, বরঞ্চ পারস্যরাজপুত্রের সৌরাষ্ট্র আক্রমণ কাল ও শিলাদিত্যের পরাভব কালের ঐক্য হওয়ায় শিলাদিত্য যে পারস্যরাজের সন্তান নহেন তাহাই প্রমাণ হইতেছে।

এইখানে একটি কথা, সূর্য্য উপাসক ইরাণীদিগের সহিত রাণাদিগের পূজা পদ্ধতির অনেকটা সাদৃশ্য আছে। উভয়েই সূর্য্য পূজা করেন—উভয়ের পতাকায় সূর্য্যের মূর্ত্তি। রাণার নগরের প্রধান দ্বার সূর্য্যদ্বার নামে খ্যাত, ইত্যাদি। ইহা হইতে কি রাণাগণ পারস্য রাজবংশ বলিয়া প্রতিপন্ন হইতে পারেন না? না। ইরাণীগণ যে পুরাতন আর্য্যজাতির একটি শাখা—ইহা একটি সিদ্ধান্ত কথা, সুতরাং রাণাদিগের সহিত তাঁহাদের পূজা পদ্ধতির এই যে সাদৃশ্য তাহাতে কেবল সেই সিদ্ধান্তই অব্যর্থ রহিতেছে, রাণাগণ যে নসিজাদের সন্তান এ সাদৃশ্যে তাহার প্রমাণ হয় না।

এখন দেখা যাক ‘মাসার অল ওমরার’ দ্বিতীয় উক্তি অর্থাৎ রাণাগণ মহাবানুর সন্তান এই অনুমানটি কিরূপ যুক্তিসঙ্গত।

‘মাসার অল ওমরা’ লেখক বলিতেছেন বটে এজিদের জ্যেষ্ঠ কন্যা হিন্দুস্থানে আসিয়াছিলেন—হিন্দু পুস্তকে তাহার প্রমাণ পাওয়া যায়, কিন্তু কোন পুস্তক এ সম্বন্ধে কি বলিতেছে তাহা কিছুই বলেন নাই, সুতরাং তাহা না জানিলে এ কথার মূল্য আপাততঃ অতি সামান্য। তবে টডের মতে ‘মাসার অল ওমরার’ প্রথম অনুমানটি অপেক্ষা দ্বিতীয়টিতে কিছু সত্য থাকিতে পারে। মগধি ভাষায় ‘উপদেশ প্রধান’ নামক গ্রন্থে শিলাদিত্যের জন্ম সম্বন্ধে এইরূপ একটি প্রবাদ আছে—

গুজরাটের একটি নগরে দেবাদিত্য নামক এক ব্রাহ্মণ ছিলেন সুভগা নামে তাঁহার একমাত্র বালিকা বিধবা কন্যা ছিল। কন্যা পিতার নিকট সূর্য্য মন্ত্র শুনিয়া অসাবধানে তাহা উচ্চারণ করায় সূর্য্যদেব তাহার নিকট উপস্থিত হইলেন।

বিধবা কন্যাকে অন্তঃস্বত্তা দেখিয়া ব্রাহ্মণের ক্ষোভের সীমা রহিল না—কিন্তু যখন শুনিলেন সূর্য্যদেব তাহার জামাতা—তখন ব্রাহ্মণ অনেকটা শান্ত হইলেন—কিন্তু অন্যে কন্যাকে কলঙ্কিত বিবেচনা করিবে এই ভয়ে গর্ভিনী দুহিতাকে বল্লভীপুর প্রেরণ করিলেন। সেখানে তাহার যমজ সন্তান হইল—একটি পুত্র একটি কন্যা।

পুত্র বড় হইয়া পাঠশালায় যায়, সমপাঠীগণ তাহার পরিচয় জিজ্ঞাসা করে—সে বলিতে পারে না— সকলে তাহাকে উপহাস করে—এই উপহাসে এক দিন সে ক্রুদ্ধ হইয়া মাতাকে হত্যা-ভয় দেখাইয়া তাহার পিতার পরিচয় জিজ্ঞাসা করিল।

এই সময় সূর্যাদেব সন্তানের নিকট প্রকাশিত হইয়া আত্ম পরিচয় প্রদান পূর্ব্বক তাহাকে একটি শিলাখণ্ড প্রদান করিলেন, এই শিলা স্পর্শ করাইবা মাত্র তাহার উপহাসকারী সমপাঠীর মৃত্যু হওয়ায় বালক রাজ সমীপে আনীত হইল। রাজা তাহাকে দণ্ডভয় দেখাইলে বালক ক্রুদ্ধ হইয়া শিলাখণ্ড দ্বারা তাঁহাকে নিহত করিয়া তাঁহার সিংহাসন অধিকার করিল। শিলা হইতে তাঁহার নাম শিলাদিত্য।

টড এই প্রবাদটির সহিত মহাবানুকে এক করিতে চাহেন। তিনি বলেন মহাবানুর পিতা এজিদ রাজ্য হারাইবার পর সম্ভবতঃ মহাবানু হিন্দুস্থানে তাহার আত্মীয়গণের নিকট (পূর্ব্বেই বলা হইরাছে নসিজাদের পুত্র হিন্দুস্থানে বসতিস্থাপন করেন) আশ্রয় লইতে আসেন। মহাবানুই সুভগা নামে খ্যাত হইয়া থাকিবেন।

পারস্য রাজ দুহিতা-মহাবানুকে সৌরাষ্ট্র রাজ কেহ যে বিবাহ করিতে না পারেন তাহা নয়, তবে কি এ ঘটনাটি সত্য বলিয়া ধরিয়া লইতে গেলে ইতিহাস বেঠিক হইয়া পড়ে। এই মাত্র আমরা দেখিলাম নসিজাদ যখন সৌরাষ্ট্রে আসেন সেই সময়ে বল্লভীপুরের শেষ সূর্য্যবংশী রাজা শিলাদিতা নিহত হন। নসিজাদের আক্রমণের অনেক পরে এজিদ মুসলমানদিগের সহিত যুদ্ধে পরাস্ত হন সুতরাং মহাবানু তখন সৌরাষ্ট্রে আসিয়া কিছু আর শিলাদিত্যের মাতা হইতে পারেন না।

তার পর, রাণাদিগের বংশের ইতিহাসে এ প্রবাদের কোনই উল্লেখ নাই, তাহাতে কনকসেনের বংশ পরস্পরায় ধারাবাহীক্রমে—শিলাদিত্য সৌমাদিত্যের সন্তান বলিয়া উক্ত। (কোন কোন ইতিহাসে শিলাদিত্যের পিতার নাম সূরয রাও)।

টড এ সম্বন্ধে আবুল ফজেলের যে উক্তি উদ্ধৃত করিয়াছেন —তাহাও ঐরূপ মুখের কথা। “রাণা পরিবার আপনাদিগকে নসিরাণের বংশ মনে করেন”—(Rana’s Family consider themselves descendents of Noshirwan.) এই এক লাইনে তাঁহার উক্তি শেষ হইয়াছে।

সুতরাং কেবল এইরূপ কথা হইতে ভগবান শ্রীরামচন্দ্রের সন্তান কুলোদ্ভব বিখ্যাত সূর্য্য বংশ রাণাগণকে ইরাণী পিতা মাতার সন্তান বলিয়া অনুমান করা নিতান্তই অদ্ভুত বলিয়া মনে হয়। কিন্তু শিশু যখন প্রশংসা পূর্ণ নেত্রে উজ্জ্বল কিরণশালী চন্দ্রের দিকে চাহিয়া আছে তখন যদি তাহাকে বল—ঐ যে চন্দ্র দেখিতেছ উহার কিরণ, জ্যোতি সকলি মিথ্যা,—প্রকৃত প্রস্তাবে উহা একটা মৃৎপিণ্ড মাত্র—তখন সে কথা শিশুর ত নিতান্তই অদ্ভুত মনে হইতে পারে, তাই বলিয়া উহার মধ্যে সত্যের কি কিছু সম্ভাবনা নাই? কে অস্বীকার করিবে?

তবে সম্ভাবনা যাহা তাহা পণ্ডিতদিগের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতেই পৌঁছে, শিশু তাহার সহজ জ্ঞান ও সহজ বুদ্ধি দিয়া তাহা দেখিতে পায় না। যদি পণ্ডিতগণ, পণ্ডিত প্রবর টডের ন্যায় উপরোক্ত প্রমাণে আমাদের খৃষ্টান মহারাণীর সহিত সূর্য্য বংশ রাণাদিগের রক্ত সম্পর্কের সম্ভাবনা দেখিয়া আহ্লাদ প্রকাশ করেন—তাহাতে আমাদের আপত্তি নাই—কিন্তু অজ্ঞ আমাদের টডের এ আহ্লাদ দেখিয়া পিকুইকের পুরাতত্ত্ব আবিষ্কারটিই মনে আসিয়া পড়ে।

তবে গুহা ও বাপ্পা এই দুই জনেরই জীবনের বিলক্ষণ ঘটনা সাদৃশ্য দেখা যায়।
গুহার পিতা শিলাদিত্য যবন হস্তে নিহত হইয়াছিলেন, বাপ্পার পিতা নাগাদিত্যও ভীলদিগের হস্তে নিহত হইয়া ছিলেন। গুহা ব্রাহ্মণকন্যা কমলাবতী কর্ত্তৃক প্রতিপালিত হইয়া ভীলরাজ মন্দালিকের ইদর রাজ্যে অধিষ্ঠিত হইলেন, বাপ্পাও কমলাবতীর বংশ কর্ত্তৃক রক্ষিত হইয়া চিতোর-রাজ্য লাভ করিলেন। ভীলগণ ইদররাজ গুহাকে রক্ত ফোটা দিয়া অভিষিক্ত করিয়াছিল বাপ্পাও ভীলপুত্রের রক্ত ফোটা পরিয়া চিতোরের অধিপতি হইয়াছিলেন।

খোমান রস, রাজ রত্নাকর, রাজবল্লভ, জয়বল্লভ প্রভৃতি। এই সকল ইতিহাসাদি হইতে টড রাজাদিগের যে পরিচয় সঙ্কলন করিয়াছেন তাহার পৌরাণিক অংশ ছাড়িয়া দিলে কনকসেন হইতেই ইঁহাদের ইতিহাস আরম্ভ হয়, মিবাররাজে আমরা সংক্ষেপে গুহার পূর্ব্বেকার এই বংশ ইতিহাস প্রদান করিয়াছি।

গুহা হইতে প্রথমে রাণাগণ গুহলুট আখ্যা পাইয়া ছিলেন, পরে স্থানের নাম হইতে আহারিয়া ও শশোদিয়া এই নাম প্রাপ্ত হন।

প্রথম পরিচ্ছেদ

মিবাররাজ।

ঐতিহাসিক উপন্যাস।

প্রথম পরিচ্ছেদ।

আরাবলী পর্ব্বতের পাদদেশে মিবার রাজ্যের তোরণস্বরূপ কতকগুলি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শৈলশ্রেণী বিরাজিত; “ইদর” সেই শৈলময়-ভূমির একটি বন প্রদেশ।

আন্দাজ প্রায় চতুর্দ্দশ শত বৎসর পূর্ব্বে একদিন প্রভাত মা হইতে হইতে কতিপয় ধনুর্দ্ধারী ভীল শিকারী উক্ত অরণ্য প্রদেশের একটি গ্রাম পথ অতিক্রম করিয়া একটি বৃক্ষতলে আসিয়া দাঁড়াইল, যেন কাহার জন্য অপেক্ষা করিতে লাগিল।

ধীরে ধীরে পূর্ব্বাকাশে উচপাহাড় শৃঙ্গের গাত্রে উষার স্বচ্ছ শুভ্র মূর্ত্তি বিভাসিত হইল, সে মূর্ত্তি দেখিয়া স্তরবিন্যস্ত পাহাড় শ্রেণীর ছাত্র হইতে, জটাজুটধারী অরণ্যের মস্তক হইতে জমাট অন্ধকার রাশি বায়ুতাড়িত-কুঝঝ‍্টিকার ন্যায় সভয়ে দ্রুতবেগে পলায়ন করিতে লাগিল, সে মূর্ত্তি দেখিয়া অরণ্যের শত পাখী আনন্দে আগমনগীত গাহিয়া উঠিল; শিকারীরা সৌৎসুক দৃষ্টিতে একবার পুর্ব্বাকাশের দিকে একবার পথের দিকে চাহিতে লাগিল। ক্রমে উষার শতবর্ণ-রঞ্জিত-আকাশে সূর্য্য উদিত হই তাহার কনক-কিরণ হাসিতে পাহাড়ের সর্বাঙ্গ—নদী নির্ঝর গাছ পালা বন গ্রাম আনন্দে বিকশিত হইয়া উঠিল। কৃষকেরা বলদ লইয়া একঘেয়ে সুরে গান গাহিতে গাহিতে ক্ষেত্রের দিকে গমন করিতে লাগিল, গরু ঘোড়া মহিষ ভেড়ারা পাহাড়ে চরিতে লাগিল, দু একটা বন্য ছাগশিশু পাহাড়ের দুরারোহ্য শৃঙ্গে ছুটাছুটি করিতে লাগিল। একদল খরগোস গাছ পালার ভিতর হইতে রাঙ্গা রাঙ্গা চোখ বাহির করিয়া শিকারীদের দেখিয়া আবার বনের মধ্যে লুকাইয়া পড়িল— শিকারীরা ব্যস্ত হইয়া উঠিল, বারবার তাহারা নিকটের একটা উঁচু ঢিবিতে উঠিয়া চারিদিক দেখিতে লাগিল, একজন নিতান্ত অধীর হইয়া ধনুকটা কাঁধ হইতে হাতে লইয়া সজোরে তাহার প্রান্তভাগ মাটির উপর রাখিল— সেখানকার মাটিটা খুঁড়িয়া গেল—সে রাগের স্বরে বলিল—“মুই আর দাঁড়াইতে পারিবু না, ঝটপট চলিতে হয় ত চল, ‘তানা’ না এল ত বড্ডা বয়ে গেল।” দলপতি বৃদ্ধ-ভীল পুত্রের এই কথায় যেন ব্যতিব্যস্ত হইয়া পড়িলেন—কাচুমাচু করিয়া বলিলেন—“বাপ্পুরে সার টুকুনখানি সবুর কর, ‘তানা’ মুদের লায়েক লাকীন শিকারী, তানারে ছাড়তে আছে”—বৃদ্ধের অনুকরণ করিয়া সকলেই বলিয়া উঠিল— “আরে নানা নানা,—‘তানা’ মুদের লায়েক লাকীন শিকারী তানারে ছাড়া হইবু না”—ভীলরাজপুত্র (সংক্ষেপের জন্য ভীলপুত্র বলিয়াই আমরা সম্বোধন করিব) রাগিয়া কি একটা বলিতে যাইতেছিল—এমন সময় হঠাৎ হৈ হৈ শব্দ পড়িয়া গেল, যাহাৱা উঁচু ঢিবিতে উঠিয়া দেখিতেছিল—তাহা বলিয়া উঠিল—“ঐ যে ঐ ‘তানা’ আসিছে রে”— সকলের আহ্লাদের চীৎকার ধ্বনির মধ্যে একজন ধনুর্দ্ধারী যুবক দ্রুতপদে আসিয়া দাঁড়াইল।

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ

ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ।

একটি সমক্ষেত্রে শাখা-প্রশাখাচ্ছিন্ন কাছাকাছি দুইটি সমান মোটা গাছ; সেই গাছ দুইটি চক্রদ্বারা ভেদ করিতে
হইবে—যাহার চক্র বৃক্ষকায়ের অধিকদূর ভেদ করিবে তাহারি জয়। গাছ দুইটি আন্দাজ আধ ক্রোশ দূরে রাখিয়া মাদলধারী ভীলযুবকগণের অগ্রভাগে দুইজন প্রতিদ্বন্দী পাশাপাশি ঠিক হইয়া দাঁড়াইল—মাদল বাজিয়া উঠিল, চীৎকার ধ্বনি উঠিল, আবার নিমেষের মধ্যে সে গোলমাল থামিয়া গেল, চারিদিক একটা ঔৎসুক্যময় নিস্তব্ধতায় পরিণত করিয়া দুই জনের হস্ত নিক্ষিপ্ত চক্র বিদ্যুৎবেগে দুই গাছে আসিয়া লাগিল। দেখিতে দেখিতে ভীলপুত্রের গাছটি মড় মড় করিয়া নুইয়া পড়িল, যুবকের গাছ যেমন দাঁড়াইয়াছিল তেমনিই দাঁড়াইয়া রহিল। বাজনা বাজিয়া উঠিল, ভীল পুত্রের পক্ষীয়গণ আহ্লাদে লম্ফ দিয়া চীৎকার করিয়া উঠিয়া জয়ীকে ঘেরিয়া নৃত্য করিতে লাগিল,—নাচিতে নাচিতে পাহাড়ের একটা উঁচু ঢিবির উপর যেখানে পাতার সিংহাসন রচিত হইয়াছিল সেইখানে তাহাকে লইয়া চলিল! তাহাদের জয় জয়কারের মধ্যে ভীলপুত্র সেইখানে আসিয়া বসিলেন, এই সময় পশ্চাতের আর একটা কলরব দ্রুতবেগে সিংহাসনের দিকে আসিতে লাগিল—সিংহাসনের চারিপার্শ্বস্থ জয়ধ্বনি ডুবাইয়া দিয়া ক্রমে এই কথা গুলি ধ্বনিত হইয়া উঠিল—“যুবক জয়ী হইয়াছে, যুবকের চক্র গাছ ভেদ করিয়াছে” পাতার সিংহাসন কঁপিয়া উঠিল, জয়ধ্বনি থামিয়া গেল, জয়কারীগণ অবাকস্তব্ধ হইয়া চীৎকারকারীদের মুখের পানে ফিরিয়া চাহিল্—আবার শুনিল “যুবক জয়ী হইয়াছে, তাহার চক্র গাছ ভেদ করিয়াছে।” হঠাৎ চারিদিকে একটা ঠেলাঠেলি পড়িয়া গেল, ভীলপুত্রকে সিংহাসনে ফেলিয়া রাখিয়া অন্যেরা ছুটিয়া সেই গাছের দিকে দৌড়িতে আরম্ভ করিল, নিকটে আসিয়া দেখিল সত্যই যুবক জয়ী হইয়াছে। ভীলপুত্রের চক্রে গাছের অর্দ্ধভাগ ছেদিত হইয়াই গাছ নত হইয়া পড়িয়াছে, আর যুবকের গাছ আড়া আড়ি একেবারে দ্বিভাগ হইয়া মূলস্তম্ভের উপর ঠিক দাঁড়াইয়া আছে। আর কিছু নহে, যুবকের গাছটি ঠিক সোজা ভাবে উঁচু হইয়া উঠিয়াছিল—তাই কাটিতে কাটিতে তাহা একেবারে পড়িয়া যায় নাই। স্রোত ফিরিল, সকলে জয়জয়কার শব্দে যুবককে ভীলপুত্রের সিংহাসনে আনিয়া বসাইয়া, কেহ গলায় পাতার মালা পরাইতে লাগিল, কেহ মাথায় ঘাসের মুকুট বাঁধিয়া দিল, একজন একটা বংশ দণ্ড আনিয়া হাতে দিল, সকলি হইল,—কেবল বাকী রহিল একটি। অভিষেকের সময় ভীলদের রাজার কপালে লাল ফোঁটা দিতে হয়, তাহার আয়োজন ত কিছুই নাই, উপায় কি? একজন উৎসাহোন্মত্ত ভীলযুবা নিজের আঙ্গুল কাটিয়া সেই রক্ত লইয়া তাহার কপালে ফোঁটা পরাইয়া দিল—অমনি সকলে আমাদের রাজা রাজা করিয়া চারি পাশে নৃত্য আরম্ভ করিল, দলে দলে কাতারে কাতারে লোক আসিয়া দাঁড়াইতে লাগিল, সত্যকার রাজাকেও এত লোকে দেখিতে আসে না। সেই জনতা ঠেলিয়া বহু কষ্টে একজন লোক সিংহাসনের কাছে আসিয়া দাঁড়াইলেন। তাঁহাকে দেখিয়া হঠাৎ সকলে স্তব্ধ হইয়া পড়িল—তিনি তাঁহার ভাষায় জিজ্ঞাসা করিলেন “কি হইয়াছে কি? সকলে উত্তর করিল “আমাদের রাজা হইয়াছে।”

“রাজা হইয়াছে? সে আবার কি?”

যুবারা তখন খুলিয়া সব বলিল—খানিকক্ষণ মন্দালিকের মুখে কোন কথা সরিল না, তিনি স্তব্ধ হইয়া রহিলেন—কিছু পরে আত্মস্থ হইয়া বলিলেন—

“বৎসগণ শোন, আজ খেলাচ্ছলে যাহাকে রাজার অধিকার দিলে—সে অধিকার আবার ফিরাইয়া লইলে তোমাদের কথা মিথ্যা হইয়া যায়, তোমরা আমার সন্তান, তোমাদের সত্য ভঙ্গ হইলে তাহার দায়ী আমি, সুতরাং আজ তোমরা যাহাকে রাজা বলিয়া ডাকিলে সে চিরকালই তোমাদের রাজা হউক”—

বলিয়া বৃদ্ধ ভীলরাজ তাহার লৌহপাত-মণ্ডিত বংশদণ্ড যুবকের হাতে দিয়া বলিলেন—

“আজ হইতে তুমিই এই বন প্রদেশের রাজা হইলে, আমরা তোমার প্রজা,” যাহা বলিলেন তাহার সত্যতা পালনস্বরূপ স্বয়ং বৃদ্ধ তাহাকে অভিবাদন করিলেন—পরে একে একে ভীলগণ সকলেই অভিবাদন করিতে লাগিল—যুবকের কিছুই নূতন মনে হইল না,মনে মনে সে এত দিন সকলেরই প্রভু ছিল, আজ প্রকাশ্যে হইল মাত্র, যুবক রাজারই মত গট হইয়া বসিয়া রহিল। অভিবাদন এক রকম শেষ হইয়া আসিল —কিন্তু ভীলপুত্র অভিবাদন করিল না, দেখিয়া ভীলরাজ বলিলেন—

“বৎস প্রণাম কর ইনি তোমাদের রাজা”

এ অজ্ঞা পিতার আজ্ঞা, রাজার আজ্ঞা, রাজবিদ্রোহ কাহাকে বলে অসভ্যেরা জানে না,—এ আজ্ঞা অবহেলা করিতে ভীলপুত্রের সাধ্য নাই, ভীলপুত্র আস্তে আস্তে অনিচ্ছুক হৃদয়ে মস্তক অবনত করিল।

ষোড়শ পরিচ্ছেদ

ষোড়শ পরিচ্ছেদ।

মান্দলিক গুহাদের বাড়ী গিয়া সেখানে তাহার দেখা পাইলেন না, তিনি সেখানে পেঁছিবার আগেই গুহা গৃহের বাহির হইয়া গিয়াছে। সুতরাং তৎক্ষণাৎ তিনিও সেখান হইতে ফিরিলেন। ফিরিবার সময় দুর্ভাগ্যবশতঃ অন্য পথে না গিয়া উল্লিখিত বিজন পথ দিয়াই তিনি গমন করিতেছিলেন, হঠাৎ প্রতিদ্বন্দীদিগের মধ্যস্থলে আসিয়া বাণহত হইয়া, পার্শ্বের জঙ্গলে পড়িয়া গেলেন। পাঠকগণ এখন বুঝিয়াছেন, তালগাছ তাঁহার চীৎকার ধ্বনি শুনিয়াই মূর্চ্ছিত হইয়া পড়িয়াছিল। যখন তাহার সে মূর্চ্ছা ভাঙ্গিল, তথন সব কথা তাহার মনে নাই। এই নির্জ্জন স্থানে একাকী আপনাকে পড়িয়া দেখিয়া যেন অবাক হইয়া গেল, ক্রমে অল্পে অল্পে গুহার সহিত দ্বন্দযুদ্ধের কথা মনে পড়িল, ভাবিল বাণহত হইয়া এইখানে পড়িয়া আছে—উঠিয়া কোথায় আঘাত লাগিয়াছে—অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত হইল, কিন্তু যখন দেখিল তাহার সর্ব্বশরীর অক্ষত তখন আরো বিস্মিত হইয়া মনঃসংযম পূর্ব্বক আবার ভাবিতে আরম্ভ করিল। হঠাৎ সেই করুণ চীৎকার ধ্বনি তাহার কর্ণে যেন ধ্বনিত হইল, সমস্ত কথা মনে পড়িয়া গেল, আর সে দাঁড়াইল না, উন্মত্তের মত দ্রুতপদে চারি দিক অন্বেষণ করিতে করিতে সেই জঙ্গলে উপমীত হইয়া যখন রক্তাক্তদেহ, নীরব, দৃষ্টিহীন, অজ্ঞান পিতাকে ভূপতিত দেখিতে পাইল, তখন সমস্ত বিশ্বসংসার তাহার চতুর্দ্দিকে প্রচণ্ডবেগে যেন ঘুরিয়া উঠিল। সেই ঘূর্ণাপাকের মধ্যস্থলে দাঁড়াইয়া একটা জীবন্ত পাষাণ মূর্ত্তি— সবলে মর্ম্মে মর্ম্মে আলোড়িত বিদারিত হইতে লাগিল, তাহার জ্ঞান আছে অথচ সে অজ্ঞান, তাহার জীবন আছে, অথচ সে মৃত, তাহার অনুভবের ক্ষমতা আছে—অথচ সে বলহীন পাষাণের ন্যায় যন্ত্রণাকাতর হইয়া কাঁদিয়া বিদীর্ণ কণ্ঠে “বাবাডারে” বলিয়া ডাকিয়া অজ্ঞান মন্দালিকের গলা জড়াইয়া ধরিল—সে কাতরতায় আকাশ পাতাল নেন বিচলিত হইয়া পড়িল—কিন্তু মন্দালিক কেমন অবিচলিত, যেমন নিস্তব্ধ, তেমনি রহিলেন, পুত্র আজ কাঁদিয়া কাঁদিয়া ডাকিয়া ডাকিয়া পিতার ঘুম ভাঙ্গাইতে পারিল না! তিনি আজ অনন্ত নিদ্রায় নিদ্রিত। সহসা মন্দালিকের নিকটস্থ ভূমিন্যস্ততীর শোকোন্মত্ত পুত্রের চক্ষে পড়িল,—সে তীর তাহারি তীর—আপনার হাতে আপনার পিতাকে সে তবে বধ করিয়াছে! আর সে পারিল না, তাহার দীর্ণ বিদীর্ণ হৃদয়ভূমি সবেগউথিত আগ্নেয় বিপ্লবে চূর্ণ বিচূর্ণ খণ্ড বিখণ্ড হইয়া দূর দূরান্তরে যেন ছুটিয়া পড়িতে লাগিল—অনন্ত যাতনাভরে সে উঠিয়া দাঁড়াইল, অনন্ত যাতনায় উন্মাদ হইয়া দ্রুতবেগে ছুটিয়া পাহাড়-শিখর হইতে নিম্নে ঝাঁপাইয়া পড়িল। সহসা নিম্নোত্থিত মৃদু কোলাহলে এক— বার চারিদিক যেন ঈষৎ কাঁপিয়া উঠিল, সহসা গাছে গাছে পাখীগুলি একবার জাগিয়া উঠিয়া যেন শোকগীতি গাহিয়া উঠিল, তাহার পর আবার চারিদিক পূর্ব্বের নিস্তব্ধতার মগ্ন হইয়া গেল।

ভীল পুত্র যখন পিতার নিকটে আসিয়াছিল, গুহা তখন সেখানে ছিলেন না, তিনি উষ্ণীষ ভিজাইয়া ফিরিয়া আসিয়া আর তালগাছকে দেখিতে পাইলেন না, অল্পক্ষণের মধ্যেই সকল অবসান হইয়া গিয়াছে।

মন্দালিককে বাঁচাইবার জন্য গুহা যথাসাধ্য চেষ্টা করিলেন, প্রাণপণে শুশ্রুষা করিতে লাগিলেন, ক্ষীণ চাঁদ নিভিয়া গেলে, শ্যামল মধ্যস্থ লোহিত শতদলের ন্যায় কুয়াসার মধ্য দিয়া অরুণ-রেখা-রঞ্জিত পূর্ব্বগগণ যখন ফুটিয়া উঠিল, তখনো গুহা তাহার শুশ্রুষা করিতে ক্ষান্ত হইলেন না, তখনো আর্দ্র উষ্ণীয-জল নিঙড়িয়া মন্দালিকের মুখে দিতে লাগিলেন। কিন্তু যখন সূর্যালোক মন্দালিকের মৃত মুখের উপর পড়িল, তখন গুহার চমক ভাঙ্গিল, ধীরে ধীরে গভীর দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলিয়া আর্দ্র উষ্ণীষ ভূমিতে ফেলিয়া দিয়া হতাশ দৃষ্টিতে তাহার মুখপানে চাহিয়া রহিলেন—এক দিন আগে মালিক তাঁহাকে কত স্নেহের কথা বলিয়াছেন—আজ তিনি নীরব, —এক দিন আগে তিনি কি ছিলেন, আজ তাঁহার কি দশা! একটা তীব্র অনুতাপের ভাবে তাঁহার হৃদয় পূর্ণ হইল, তিনিই কি অনেকাংশে এই মৃত্যুর কারণ নহেন? তিনিই কি তালগাছকে দ্বন্দ যুদ্ধে উওেজিত করেন নাই? যদি উত্তেজিত করিলেন তবে থামাইতে পারিলেন না কেন? থামাইতে চেষ্টা করিয়াছিলেন সত্য—কিন্তু সে কি সেরূপ চেষ্টা! তেমন চেষ্টা করিলে কি তাহাকে দ্বন্দ যুদ্ধ হইতে থামাইতে পারিতেন না? না পারিতেন— নাই পারিতেন—তেমন চেষ্টা করিলেন না কেন? তালগাছের কথায় ধনুক উঠাইবার পরিবর্ত্তে কেন তাহা তাহার সম্মুখে ভূমে ফেলিয়া দিলেন না—শূন্য হস্ত হইয়া কেন তাহাকে বলিলেন না—“নিরস্ত্র আত্ম চেষ্টায় অক্ষম ব্যক্তিকে মারিতে তা মার— আমি ধনুক উঠাইব না”, তাহা হইলে কি আর তালগাছ তীর নিক্ষেপ করিতে পারিত? তাহা হইলে কি আর পুত্র হইয়া সে পিতার হন্তারক হইতে পারিত?

গুহা “আকুল হইয়া ভাবিতে লাগিলেন, “হায় হায়! কি করিলাম, তাহাকে উত্তেজিত করিলাম আর থামাইতে পারিলাম না? থামাইতে ইচ্ছা করিলাম—অথচ চেষ্টা করিলাম না, ধনুক উঠাইয়া ধরিলাম—কেন তাহার পরিবর্ত্তে তাহার পদতলে ভূমে তাহা ফেলিয়া দিলাম না? গুহা শিহরিয়া পিতৃ-হন্তারক তীরের দিকে আর একবার চাহিয়া দেখিলেন—চমকিয়া উঠিলেন, —অন্ধকারে যাহা দেখিতে পান নাই, প্রভাতালোকে তাহা সুস্পষ্ট দেখিলেন— দেখিলেন তীর রক্তহীন,—কম্পিত হস্তে তাহা হাতে উঠাইয়া নাড়িয়া চাড়িয়া দেখিতে লাগিলেন, সম্প্রতি দেহ বিদ্ধ করিবার লক্ষণ তাহাতে কিছুই দেখিলেন না। সংশয়ে গুহার মন পূর্ণ হইল, সংশয় ক্রমে দৃঢ় হইতে দৃঢ়তর হইতে লাগিল, গুহা উঠিয়া চতুর্দ্দিক অবলোকন করিলেন,—অদূরে আর একটি সূর্য্যালোক ঝলসিত তীর দেখিতে পাইলেন, নিকটে গিয়া দেখিগেন তাহা রক্তাক্ত,—নিজের তীর গুহা চিনিতে পারিলেন। কার হাতে, মন্দালিক মরিয়াছেন, আর সংশয় রহিল না। হায় হায়! কি করিলেন, নিজের হাতে নিজের পিতৃসম বন্ধুকে তিনি হত্যা করিলেন! গুহার সর্ব্বাঙ্গ থর থর করিয়া কাঁপিতে লাগিল।

সপ্তম পরিচ্ছেদ

সপ্তম পরিচ্ছেদ।

ভীলগ্রাম হইতে কিছু দূরে, ইদর অরণ্যের অপেক্ষা কত নিম্নাংশে সুহারমতী নদীতীরে একলিঙ্গদেবের মন্দির, এই মন্দিরের মৃত পুরোহিতের পত্নী কমলাবতী তাঁহার পুত্র কন্যা দুইটিকে লইয়া এইখানে বাস করেন। পুত্রটিই আমাদের যুবক। যুবকের নাম কি তাহা এখনো বলা হয় নাই, তাহার নাম গ্রহাদিত্য; কিন্তু তাহার মাতা কোন তীর্থ হইতে ফিরিয়া আসিবার সময় একটী পর্ব্বত-গুহায় তাহার জন্ম হইয়াছিল ইহা হইতে লোকে তাহাকে গুহা বলিয়াই ডাকে। ব্রাহ্মণ-সন্তান হইয়াও গুহার স্বভাব ছেলেবেলা হইতেই নেহাত ক্ষত্রিয়; ছেলে বেলা হইতে সে গ্রামের ভীল ও রাজপুত-সন্তানদিগের সহিত মিশিয়া খেলিয়া বেড়ায়,
পাহাড়ের দুরারাহ্য স্থানে ছুটিয়া উঠে, পর্ব্বতের সঙ্কীর্ণ ধার দিয়া, তরবারের মত লক্ লক্ করিতে করিতে শীকারের পশ্চাতে ছুটে; পুত্রের কীর্ত্তি দেখিলে কমলাবতী ভয়ে চেঁচামেচি করিয়া সারা হন, কিন্তু কিছুতেই তাহাকে আঁটিয়া উঠিতে পারেন না, কিছুতেই সে অন্যান্য ব্রাহ্মণসন্তানদিগের মত প্রতিদিন পাততাড়া হাতে বহিয়া, সারাদিন পড়া আওড়াইয়া, আর ভীলদিগের দুঃসাহসিক খেলার দিকে মাঝে মাঝে বিস্ময়পূর্ণ নেত্রে চাহিয়া থাকিয়াই যথেষ্ট সন্তোষ লাভ করে না, সে নিজে তাহাদের মধ্যে এক জন হইতে চায়।

অনেক বলিয়া কহিয়া কমলাদেবী দিনকতক তাহাকে পাঠশালায় দিয়াছিলেন; কিন্তু সমস্ত প্রভাতটা সঙ্গী বালকদিগকে ছাড়িয়া, ধনুর্ব্বাণ ছাড়িয়া, মুক্ত পাহাড় প্রদেশ ছাড়িয়া একটী সঙ্কীর্ণ স্থানে আবদ্ধ থাকিতে তাহার এতই কষ্টকর লাগিত যে তাহার মাতা বিশেষত দিদির অনুরোধের জন্য নহিলে গুরু মহাশয়েয় সহস্র শাস্তিতেও তাহাকে সেখানে রাখিতে পারি না। তবে এতটা কষ্ট করিয়া যে সে দিদিদের কথা রাখিত, যতটা পারে পাঠশালার নিয়ম ভঙ্গ করিয়া তাহার শোধ তুলিয়া লইত। দুই একটা দৃষ্টান্ত দিই।

একদিন গুরু মহাশয় ছাত্রদের জিজ্ঞাসা করিতেছেন কএ আকার দিলে কি হয়? সকলে বলিল ‘কা’। যুবক মাটী হইতে একটা চিল কুড়াইয়া সম্মুখের গাছের একটা কাকের প্রতি লক্ষ্য করিয়া মারিল, কাকটা কাকা করিয়া ভূমিতে পড়িল—যুবক তাহার প্রতি আঙ্গুল দিয়া দেখাইয়া দিল। গুরু মহাশয় রাগিয়া তাহাকে এক পায়ে দাঁড়াইতে আজ্ঞা করিলেন—কিন্তু ঐরূপ বে-আইনি কাজ করিয়া তখন তাহার এতটা আমোদ হইয়াছিল যে কিছুতেই সে দিন গুরুমহাশয় তাহাকে পাঠশালায় রাখিতে পারিলেন না, অনেক ছাত্রের হাত এড়াইয়া সে দিন সে পলাইয়া গেল।

এ ঘটনাটি গুহার হাতে-ঘড়ি অবস্থার ঘটনা, সুতরাং গুরুমহাশয় ভাবিলেন, ক্রমে পড়াশুনায় (সঙ্গে সঙ্গে শাস্তিতেও) তৈয়ার হইয়া আসিলে তাহার এ সব দোষ শুধরাইয়া যাইবে। গুরুমহাশয় নিতান্তই ভুল বুঝিয়াছিলেন—দোষে গুণে সে সমান রূপে তৈয়ার হইতে লাগিল। ব্যাকরণ পড়িতে পড়িতে একদিন সে উক্ত ঘটনা অপেক্ষাও গুরুতর অপরাধ করিয়া বসিল—একটী সূত্র মুখস্থ বলিবার সময় বলিবে—

রলয়োর্ডলয়োস্তদ্বৎ জযয়োর্ববয়োরপি”

তাহা না বলিয়া বলিল—

“রলয়োর্ডলয়োস্তদ্বং ব্রাহ্মণত্রয়োরপি”

গুরুমহাশয় প্রায়ই তাহাকে গালাগালি দিয়া বলিতেন, “হতভাগা, ব্রাহ্মণের ছেলে হয়ে ক্ষত্রিয় হলি”—তাই সে সুবিধামত নজীর দেখাইয়া দিল। গুরু মহাশয় মহাক্রুদ্ধ হইয়া পাঠশালার পাশের ঘরে তাহার হাতকড়ি লাগাইয়া দ্বার বন্ধ করিয়া দিলেন। খানিকক্ষণ পরে আসিয়া দেখেন—গুহা সেখানে নাই; পশ্চিম দিকের দেয়ালে যে অল্প একটু গর্ত্ত ছিল তাহা মস্ত হইয়াছে, দেয়ালের কতকগুলি বাখারি মেজেতে পড়িয়া আছে—তাহার মধ্যে ধনুকদশা-প্রাপ্ত একখানির গায়ে বাণ স্বরূপ একটা কলম ঝুলিতেছে। ঘরের টাঙ্গান কড়ির-দোলনায় একটিও কড়ি নাই, কড়িগুলা ঘরময় গড়াগড়ি যাইতেছে। বাখারির ধনুকে কলমের বাণ অর্পিত হইয়া যে তাহা এই কড়িগুলার প্রতি এতক্ষণ প্রযুজ্য হইয়াছিল তাহা বুঝিতে গুরুমহাশয়ের বাকী রহিল না—কড়ির উপর দিয়াই যে বাণের লক্ষ্যটা গিয়াছে, ইহাতে তিনি মনে মনে সৌভাগ্য জ্ঞান করিলেন। যাই হোক শাস্তি দিয়া গুহার যে কিছু হইবে না। সেই দিন গুরুমহাশয়ের হৃদয়ঙ্গম হইল। পরদিন গুহা আসিবামাত্র বলিলেন—

“বাবা উত্তম বলিয়াছ। ব্রাহ্মণ ক্ষত্রিয়ে কিছু মাত্র ভেদ নাই—তুমি স্বচ্ছন্দে গিয়া ক্ষত্রিয় হও, পড়াশুনা তোমার যথেষ্ট হইয়াছে।”

যুবকের এইরূপ স্বভাবের জন্য এখন পর্য্যন্ত সে উপবীত হয় নাই। কমলাবতী ক্রমাগতই বলেন “আরো কিছুদিন যাক্, ছেলে বুদ্ধিটা ঘুচিয়া বুদ্ধিশুদ্ধি একটু পাকুক তখন উহার পৈতা দেওয়া যাইবে।” কথাটা এই, উপবীত হইবার আগে যা কর তবু সাজে, কিন্তু তাহার পর যুবকের এরূপ ব্যবহার অমার্জ্জনীয় হইবে। এমনিতেই ত আত্মীয় স্বজনের কথার জ্বালায় কমলাবতী অস্থির, তাঁহার পুত্রের মন্দ বুদ্ধির জন্য তাহার যত না মাথা ব্যথা, তাঁহার জাতি কুটুম্ব দিগের ত তদোধিক। অধিক কথা কি, গ্রামের ব্রাহ্মণদিগের রজা সজা বেঁড়ে খুদে ব্যাং প্রভৃতি দুগ্ধপোষ্য যে শিশুগুলি আছে তাহারাও যুবককে দেখিলে আপনার লোকের মমতায় অধীর হইয়া ছিছি করিয়া উঠে, ও নানা রূপ ভঙ্গীতে সুপরামর্শের চোখা চোখা বাক্যবাণ গুলি তাহার উপর বর্ষণ করিতে ছাড়ে না;— সেই মমতার জ্বালায় শশব্যস্ত হইয়া গুহা অপনার লোক দেখিলে এক ক্রোশ দূর হইতে ছুটিয়া পলায়। আপনার লোকদিগের সহিত ত তাহার এইরূপ প্রাণের মিল। বলিতে গেলে, মা ও বোন ছাড়া তাহার আপনার লোকই নাই। অনেকের সঙ্গে সে খেলিয়া বেড়ায় বটে, কিন্তু দিদিই তাহার একমাত্র প্রাণের দোসর, দিদির মত সে কাহাকেও তাহার সুখের সুখী দুঃখের দুঃখী দেখে না, ভীলবালকদিগের সহিত খেলিলে দিদি তাহাকে কখনো বকেন না, শীকারে, খেলায় জয়ী হইয়া আসিলে তাহার অপেক্ষা যেন তাহার দিদির অধিক আনন্দ হয়, মা যদি রাগ করিয়া কখনো ধনুক ফেলিয়া দিতে বলেন, দিদি মাকে অনুনয় করিয়া তাঁহার কথা ফিরাইয়া লয়; দিদি তাহার বড় ভাল, দিদির মত কাহাকেও সে ভাল বাসে না;—দিদি কোন কথা বলিলে কষ্ট করিয়াও সে তাহা পালন করে; (তবে তাহার বিশেষ ভালর জন্য নহিলে কষ্টে রাখিতে হইবে এমন অনুরোধও দিদি করেন না।) তাহার যতটুকু লেখাপড়া হইয়াছে তাহা দিদির জন্যই হইয়াছে। দিদিকে সে এতই ভাল বাসে যে ছেলেবেলা যখন সে বড় দুষ্টুমি করিতেছে যদি কমলাবতী বলিলেন—তবে সত্যবতী তোর দিদি হইবে না—কিম্বা—তাহাকে শ্বশুর বাড়ী পাঠাইয়া দিব” অমনি গুহার খেলা ধূলা দুষ্টুমির শেষ। তাহাকে জব্দ করিবার এমন উপায় আর ছিল না। তবে কমলাবতী ছাড়া এরূপ কথা অন্যে বলিলে আর রক্ষা নাই। একবার অত শত না বুঝিয়া একজন ছেলে তাহাকে এইরূপে ক্ষেপাইতে গিয়া এমন শিক্ষা লাভ করিয়াছিল যে সেই হইতে কেহ কখনো এরূপ কথা কহিতে আর সাহস করে নাই।

এখন যে সে এত বড় হইয়াছে—এখনো এরূপ ঠাট্টা সহ্য করিতে পারে না, এত সবল হইয়াও এ সম্বন্ধে সে নেহাত দুর্ব্বল, নেহাত শিশু।

যখন তাহার দিদি প্রথম শ্বশুর বাড়ী যায় তাহার কি কষ্টই হইয়াছিল, দিদি বাড়ী আসিলে তেমনি আনন্দ।

এবার দিদি বাড়ী আসিয়া অবধি শীকারের ঝঞ্ঝাটে তাহার আনন্দ যে সে পূর্ণ মাত্রায় ভোগ করিতে পারে নাই, দিদির সহিত প্রাণ খুলিয়া গল্প করিতে পায় নাই ইহাতে তাহার বড়ই কষ্ট হইতেছে, শীকারের মধ্যে, উৎসবের মধ্যে —তাহার অভিষেকের মধ্যেও সে দিদিকে ভুলে নাই, তাহার কাছে ছুটিয়া আসিবার জন্য ব্যস্ত হইতেছে, যখনি তাহার অভিষেক অনুষ্ঠান শেষ হইল, সে যেন বাঁচিয়া গেল, তখনি ভীলদিগের আদর অভ্যর্থনা হইতে কষ্টে রেহাই লইয়া অধীর চিত্তে সে গৃহাভিমুখী হইল।