PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৮৭১

কবিতাবলী (হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়, ১৮৭১)

হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৭১

প্রকাশনা-তথ্য

কবিতাবলী।

শ্রীহেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় প্রণীত।

শ্রীবামাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়

কর্ত্তৃক

এডুকেশন গেজেট ও অবোধবন্ধু হইতে উদ্ধৃত ও

প্রকাশিত।

দ্বিতীয় সংস্করণ।

কলিকাতা।

শ্রীযুত ঈশ্বরচন্দ্র বসু কোং বহুবাজারস্থ ২৪৯ সংখ্যক ভবনে

ষ্ট্যান্‌হোপ যন্ত্রে মুদ্রিত

সন ১২৭৮ সাল।

সূচীপত্র।

শুদ্ধিপত্র।

পৃষ্ঠা

পংক্তি

যেরূপ আছে

সংশোধন

৯০
৯৩

৯৪


১২
১৭
১৩
১৪
১৫

করো না আর
হিন্দুকুললক্ষ্মী
কলঙ্ক পসরা
মোগল জাতি
কিরীটের ভাতি
করিতে দুর্গতি

করোনা আর
ভারত ঐশ্বর্য্য
কলঙ্কের ভরা
মোগল প্রভৃতি
কিরীটের জ্যোতিঃ
করিয়া দুর্গতি

অশোকতরু

অশোকতরু।

কে তোমারে তরুবর, করে এত মনোহর,

রাখিল এ ধরাতলে, ধরা ধন্য কর‍্যে?

এত শোভা আছে কি এ পৃথিবী ভিতরে!

দেখ দেখ কি সুন্দর, পুষ্পগুচ্ছ থরেথর,

বিরাজে শাখীর পর সদা হাস্যভরে—

সিন্দূরের ঝারা যেন বিটপী উপরে!

মরি কিবা মনোলোভা, ছড়ায়ে রয়েছে শোভা,

আভা যেন উথলিয়া পড়িছে অম্বরে।—

কে আনিল হেন তরু পৃথিবী ভিতরে?

বল বল তরুবর, তুমি যে এত সুন্দর

অন্তরও তোমার, কি হে, ইহারি মতন?

কিম্বা সুধু নেত্রশোভা মানব যেমন?

আমি দুঃখী তরুবর, তাপিত মম অন্তর,

না জানি মনের সুখ, সন্তোষ কেমন;

তরুবর তুমি বুঝি না হবে তেমন?

অরে তরু খুলে বল, শুনে হই সুশীতল,

ধরণীতে সদানন্দ আছে এক জন,—

না হয় সন্তাপে যারে করিতে ক্রন্দন।

জানিতাম, তরুবর, যদি হে তব অন্তর,

দেখাতাম একবার পৃথিবী তোমায়—

মানবের মনচিত্রে কি আছে কোথায়।

কত মরু, বালুস্তূপ, কত কাঁটা, শুষ্ক কূপ,

ধূ ধু করে নিরবধি অন্ধ ঝটিকায়—

সরসী নির্ঝর, নদী, কিছু নাহি তায়।

তা হ’লে বুঝিতে তুমি, কেন ত্যজি বাসভূমি,

নিত্য আসি কাঁদি বসি তোমার তলায়;

ত্যজে নর, ধরি কেন তোমার গলায়।

তুমি তরু নিরন্তর, আনন্দে অবনী পর,

বিরাজ বন্ধুর মাঝে, স্বজন সোহাগে;

তরুবর, কেহ নাহি তোমারে বিরাগে।

ধরণী করান পান, সুরস সুধা সমান,

দিবানিশি বার মাস সম অনুরাগে,—

পবন তোমার তরে যামিনীতে জাগে।

স্রোতোধারা ধরি পায়, কুলু কুলু করি ধায়,

আপনি বরষা নীর ডালে শিরোভাগে;—

তরু রে বসন্ত তোর স্নেহ করে আগে।

কলকণ্ঠ মধুমাসে, তোমারি নিকটে আসে,

শুনাতে আনন্দে বসে কুহু কুহু রব;

তরুবর, তোমার কি সুখের বিভব।

তলদেশে মখমল, তৃণ করে ঢল ঢল,

পতঙ্গ তাহাতে সুখে কেলি করে সব,

কতই সুখেতে তরু, শুন ঝিল্লীরব!

আসি সুখেপাঁতি পাঁতি, ছড়ায়ে বিমল ভাতি,

খদ্যোত যখন তব সাজায় পল্লব—

কি আনন্দ তরু তোর হয় অনুভব!

তরু রে আমার মন, তাপদগ্ধ অনুক্ষণ,

কেহ নাই শোকানলে ঢালে বারিধারা;

আমি, তরু, জগতের স্নেহ, সুখ হারা!

জায়া, বন্ধু, পরিবার, সকলি আছে আমার,

তবু এ সংসার যেন বিষতুল্য কারা;—

মনে ভাল, কেহ মোরে, বাসে না তাহারা!

এ দোষ কাহারো নয়, আমিই কলঙ্কময়,

আমারি অন্তর হয়, কঙ্কালেতে ভরা—

আমি, তরু, বড় পাপী, তাই ঠেলে তারা।

বড় দুঃখী তরু আমি, জানেন অন্তরষামী,

তোমার তলায় আসি ভাসি অশ্রুনীরে,

দেখিয়া জীবের সুখ ভবের মন্দিরে।

এই ভিন্ন সুখ নাই, তরু তাই ভিক্ষা চাই,

পাই যেন এই রূপে কাঁদিতে গম্ভীরে,

যত দিন নাহি যাই বৈতরণী তীরে।

এক ভিক্ষা আছে আর, অন্য যদি কেহ আর,

আমার মতন দুঃখী আসে এই স্থানে,

তরু, তারে দয়া করে তুষিও পরাণে।

ইন্দ্রের সুধাপান

কবিতাবলী।

ইন্দ্রের সুধাপান।

একদিন দেব দেবপুরন্দর,

বামে শচীসতী নন্দন ভিতর,

বলিল গন্ধর্ব্ব সখারে ডাকি;–

যাও চিত্ররথ, সুধাভাণ্ড ভরি

আন ত্বরা করি পীযূষ লহরী,

আন বাদিত্রবাদকে ডাকি।

আন বাদিত্র সুধাতরঙ্গে,

যত দেবগণ বলিল রঙ্গে,

অমর মাতিল সুরেশ সঙ্গে।

সুবর্ণ মঞ্চেতে সুর আখণ্ডল,

চারিদিকে যত অমরের দল,

বিজলীর মত করে ঝলমল,

শোভে পারিজাত হার গ্রীবাতে;

বামে দৈত্যবালা রূপে করে আল,

কোথা যে চঞ্চল তড়িত উজ্জ্বল,

কোথা বা উমার রূপ নিরমল?

পলকে পারে সে জগতে ভুলাতে।

আহা মরি মরি কিবা ভাগ্যধর,

যার কোলে হেন নারী মনোহর,

কত সুখ তার হয় রে।

বীর বিনা আহা রমণীরতন,

বীর বই আর রমণীরতন,

বীর বিনা আহা রমণীরতন,

কারে আর শোভা পায় রে!

(চিতেন)

আহা মরি মরি কিবা ভাগ্যধর,

গাহিল যতেক কিন্নরী কিন্নর,

কত সুখ তার হয় রে;

বীর বিনা আহা রমণীরতন,

বীর বই আর রমণীরতন,

বীর বিনা আহা রমণীরতন

কারে আর শোভা পায় রে।

এলো চিত্ররথ মনোরথ গতি,

স্বর্ণপাত্রে সুধা, সঙ্গে বিদ্যারথী,

উঠিল সুরব “জয় শচীপতি”

অমর মণ্ডলী মাঝেতে;

দেব পুরন্দর দেবদল সহ,

সুধা, সোমরস পিয়ে মুহমুহ,

গন্ধে আমোদিত মারুত প্রবাহ,

গগন কাঁপিল বেগেতে—

বায়ু মাতোয়ারা, রবি, শশী, তারা,

অরুণ, বরুণ, দিক্‌পাল যারা,

সবে মাতোয়ারা সুধা পানেতে।

হ’লো ভয়ঙ্কর কাঁপে চরাচর

আকাশ, পাতাল, মহী, মহীধর,

জলধি হুঙ্কারে বেগেতে।

(চিতেন)

বায়ু মাতোয়ারা রবি, শশী, তারা,

অরুণ, বরুণ, দিক্‌পাল যারা,

সবে মাতোয়ারা সুধা পানেতে।

বসিয়ে উন্নত আসন উপরে,

গুণী বিশ্বাবসু বীণা নিল করে,

মেঘের গরজে গভীর ঝঙ্কারে,

মোহিত করিল অমরগণে;

দেবাসুর রণ গাহিতে লাগিল,

কিরূপে অসুরে অমরে নাশিল,

কিরূপে ইন্দ্র দেবরাজ হ’লো,

শুনাইল বীণা বাজায়ে ঘনে।

“পুলোমদুহিতা তোমারি গৃহীতা,

ওহে দেবরাজ তুমিই দেবতা;

রণে পরাজয় করি বাহুবলে,

এ অমরপুরী নিলে করতলে,

সমুদ্র মথিয়া অমৃত লভিলে,—

অহে দেব তব অসাধ্য ক্ষমতা।”

হ’লে প্রতিধ্বনি—“পুলোমদুহিতা,

অহে দেবরাজ তোমারি গৃহীতা;”—

ঘন ঘন ঘোর সুগভীর স্বরে,

কাননে, বিপিনে, নদী, সরোবরে,

উঠিল নিনাদি যতেক দেবতা।

ভাবে গদ গদ মুদিত নয়ন,

উঠিয়া গরজি গরজি সঘন

ছাড়িল হুঙ্কার দনুজঘাতা।

(চিতেন)

হ’লো প্রতিধ্বনি,—“পুলোম দুহিতা,

অহে দেবরাজ তোমারি গৃহীতা”—

ঘন ঘন ঘোর সুগভীর স্বরে,

কাননে, বিপিনে, নদী, সরোবরে,

উঠিল নিনাদি যতেক দেবতা।

অতি সুললিত মৃদু মধুস্বরে,

আবার গাহক বীণা নিল করে,

মজাইল সুরললনা।

“দেখ দেখ চেয়ে নাগরের বেশে,

চোক্ ঢুলু ঢুলু আসে হেসে হেসে,

আড়ে আড়ে কথা নাহি অভিমান,

সদা আশুতোষ খুলে দেয় প্রাণ,

ওরে সুধা তোর নাই তুলনা।

সদা সেবে যারা সোমরস সুধা

ক্ষোভ লোভ শোক থাকে না ক্ষুধা,

রণজয়ী যেই সুধাপায়ী সেই,

শূর বিনে সুধা-স্বাদ জানে না।

(চিতেন)

“সুধার প্রেমেতে বাজ্‌রে বীণা,

বল্‌ সুধা বই ধন্‌ চাহিনা,

অমন মধুর নাই পিপাসা!

সুধা কিবা ধন সুধা সে কেমন,

সাধক বিনে কি জানিবে চাষা।”

(৬)

দৈত্য অরিদল দম্ভে কোলাহল

করে আস্ফালন করিল কত,

মত্ত মধুপানে দিতিসুতগণে

কি রূপে কোথায় করেছে হত।

তখন আবার বীণা-বাদ্যকর

বীণা নিল করে, সকরুণ স্বরে,

অমর দৰ্প করিল চূর;

আরক্ত লোচন ঘন গরজন;

ক্রমে ক্রমে সব হ’লো অদর্শন,

স্তব্ধ হইল অমরপুর।

সকরুণ স্বরে বীণা করে ধরে,

গাহিল,—“যখন প্রলয় হবে,

যখন ঈশান হর হর বোলে,

বাজাবে বিষাণ ঘন ঘোর রোলে,

জলে জলম্ময় হবে ত্রিভুবন,

না রবে তপন শশীর কিরণ,

জগত মণ্ডল কারণ বারিতে,

ছিঁড়িয়া পড়িবে ত্রিলোক সহিতে,

তখন কোথা এ বিভব রবে।

এই সুরপুরী এ সব সুন্দরী

এ বিপুল ভোগ কোথায় যাবে!”—

অতি ক্ষুণ্ণমন যত দেবগণ,

ঘন ঘন শ্বাস করে বিসর্জ্জন,

ভাবিয়ে অধীর প্রলয় যবে;

এই সুরপুরী এসব সুন্দরী

এ বিপুল ভোগ কোথায় রবে!

(চিতেন)

এ বিপুল ভোগ কোথায় রবে,

বলিয়া কিন্নর গাহিল সবে,

জগত মণ্ডল কারণ বারিতে,

ছিঁড়িয়া পড়িবে ত্রিলোক সহিতে,

তখন কোথা এ বিভব রবে!

গুণী বিশ্বাবসু সঙ্গীতের পতি,

বীণা যন্ত্রে পুনঃ মধুর ভারতী,

গাহিতে লাগিল প্রেমের গাথা;

বিলাপ ঘুচিল প্রেম উপজিল

রসে ডগমগ তনু শিহরিল।

একি সুত্রে প্রেম করুণ গাঁথা।

মৃদুল মৃদুল তাজ বে তাজ,

মৃদুল মৃদুল নও বে নও,

বাজিতে লাগিল মধুর বোলে;

শ্রবণে শীতল যতেক শ্রোতা।

“সংগ্রামে কি সুখ, সকলি অসুখ,

দিন রাত নাই প্রাণ ধুক ধুক্‌,

মান মর্য্যাদা কথার কথা।

ঘোড়া দড়বড়ি, অসি ঝনঝনি,

কাটাকাটি, গোল, তীর স্বন্‌স্বনি,

কাণে লাগে তালা করে ঝালাপালা,

দেহ হয় আলা সমর-স্রোতে;

গতি অবিরাম নাহিক বিরাম,

সমরে কি সুখ নারি বুঝিতে।

চির দিন আর দনুজ সংহার

করে কত ভার সহিবে দেব;

বামে শচীসতী হের সুরপতি,

কর সুখভোগ রাখ বুকেতে।”—

বাখানিল যত কিন্নর কিন্নরী,

বাখানিল যত স্বর্গ-বিদ্যাধরী,

বাখানিল দেবগণ পুলকে।

রতিপতি জয় হলো সুরপুরে

ললিত মধুর বীণার সুরে;

সঙ্গীতের জয় হলো ত্রিলোকে।

স্মরে জর জর দেহ থর থর,

হেরে ঘন ঘন দেব পুরন্দর,

হৃদয়ে বামারে রাখিতে চায়;

নিমেষে হেরিছে নিমেষে ফিরিছে

নিমেষে নিশ্বাস বহিছে তায়।

শেষে পরাজিত অচেতন চিত,

শচী বক্ষস্থলে ঘুমায়ে রয়।

(চিতেন)

গাহিল কিন্নর,—“স্মরে জর জর

দেব পুরন্দর হলো পরাজয়,

নিমেষে হেরিছে নিমেষে ফিরিছে,

নিমেষে নিশ্বাস বহিছে তায়।

শেষে পরাজিত অচেতন চিত

শচী বক্ষস্থলে ঘুমায়ে রয়।”

“বাজ্‌ রে বীণা বাজ্‌ রে আবার,

ঘন ঘোর রবে বাজ এইবার,

আরো উচ্চতর গভীর সুরে;

যাক্‌ দূরে যাক্‌ কামের কুহক

মেঘের ডাকে ডাক্ রে পূরে!

অহে সুররাজ ছিছি একি লাজ,

দেখ দেখ অই দনুজ সমাজ,

রণসাজ করে আসিছে ফিরে;

শিরে ফণীবাঁধা করে উল্কাপাত,

কর সুরনাথ দনুজ নিপাত,

দেখ চরাচর কাঁপিছে ডরে।

জলদ নিনাদে করে হুহুঙ্কার,

এ অমরপুরী করে ছারখার,

পূরণ আহুতি করিবে এবে।

কর দম্ভ চূর, বজ্র ধর শূর,

রাখ হে ব্রহ্মাণ্ড, বাঁচাও দেবে।”

শুনে বজ্রধর বেগে বজ্র ধরে,

কড় কড় ধ্বনি গরজে অম্বরে,

ভয়ে হিমগিরি টলিল।

তখন উল্লাসে, বিদ্যারথী হেসে,

বীণাযন্ত্র পাশে রাখিল।

(চিতেন)

“বেগে বজ্রধর,” গাহিল কিন্নর,

“কড় কড় নদে গরজে অম্বর,

ভয়ে হেমগিরি টলিল।

তখন উল্লাসে বিদ্যারথী হেসে

বীণাযন্ত্র পাশে রাখিল।”

ইংরাজিতে এইরূপ স্থলে কোরস্ বলে। ঐ শব্দের অনুরূপ ঠিক অন্য কোন শব্দ না পাওয়ায় চিতেন লেখা হইয়াছে।

এই অমর গায়কের আর একটী নাম বিশ্বাবসু।

দেবতারই সঙ্গীতের সৃষ্টিকর্ত্তা, সুতরাং এই লক্ষ্ণৌই সুরও দেবতাদিগের মধ্যে প্রচলিত থাকা সম্ভব।

উন্মাদিনী

উন্মাদিনী।

অঙ্গে মাখ ছাই বলিহারি যাই,

কে রমণী আই পথে পথে গাই

চলেছে মধুর কাকলী করে।

কিবা উষাকাল, কিবা দ্বিপ্রহর,

বীণা ধরে করে ফিরে ঘরে ঘর,

পরাণে বাঁধিয়া মিলায়ে সুতান,

গায় উচ্চস্বরে সুললিত গান,

উতলা করিয়া কামিনী নরে।

অঙ্গে মাখ ছাই বলিহারি যাই,

কে রমণী আই পথে পথে গাই,

চলেছে মধুর কাকলী করে।

নয়নের কোণে চপলা খেলিছে,

নিতম্বের নীচে চিকুর দুলিছে,

করুণা মাখান বদনের ছাঁদ,

যেন অভিনব অবনীর চাদ,

কটি কর পদে ছড়ান মাধুরী,

গেরুয়া বসনে তনুয়া আবরি,

চলেছে সুন্দরী ভাবনা ভরে।

বলিহারি যাই অঙ্গে মাখা ছাই,

কে রমণী অই পথে পথে গাই,

চলেছে মধুর কাকলী করে।

অই শুন গায়, প্রাণের জ্বালায়—

“পাবনা পাবনা পাবনা কি তায়?

নাহি কি বিশাল ধরণী ভিতরে,

যেখানে বসিয়া স্নেহের নির্ঝরে,

মিটাই পিপাসা জুড়াই পরাণ,

দেখাই কিরূপ নারীর পরাণ,

প্রণয়ের দাম হৃদয়ে পর‍্যে।

যেখানে বহে না কলঙ্কের শ্বাস

কাঁদাতে প্রণয়ী, ঘুচাতে উল্লাস,

বায়ুতে, তরুতে, মাটীতে, আকাশে,

যেখানে মনের সৌরভ প্রকাশে,

ঘরের, পরের, মনের ভাবনা,

লোকের গঞ্জনা, প্রাণের যাতনা,

যেখানে থাকে না সখীর তরে।

“কিবা সে বসন্ত শরত নিদাঘ,

নয়নে নয়নে নব অনুরাগ

ওঠে নিতি নিতি ফোটে অভিলাষ,

নিশিতে যেমন কাননে প্রকাশ

কলিকা কুসুমে ফুটাতে শশী।

দিবা, দণ্ড, পল, প্রভাত, যামিনী,

বার, তিথি, মাস, নক্ষত্র, মেদিনী

থাকে না প্রভেদ, প্রণয় প্রমাদে

হেরি পরস্পর মনের অবাধে;

জীবনে পরাণে মিশিয়া দুজনে

নেহারি আনন্দে মুখের স্বপনে—

নয়নে নয়ন, গণ্ডে গণ্ডতল,

করে করযুগ, কণ্ঠে কণ্ঠস্থল,

যেন পরিমল পবন হিল্লোলে,

যেন তরু লতা তরু শাখা কোলে,

যেমন বেণুতে বাণীর সুস্বর,

যেমন শশীর কিরণে অম্বর,

তেমনি অভেদ দুজনে মিশিয়া,

তনু মন প্রাণ তনু মনে দিয়া,

ভুলে বাহ্যজ্ঞান, ত্যজে নিদ্রা ক্ষুধা,

পান করি সুখে আনন্দের সুধা,

অগাধ প্রেমের সাগরে বসি।

“ত্যজে গৃহবাস, হয়ে সন্ন্যাসিনী,

ভ্রমি পথে পথে দিবস যামিনী,

আকাশের দিকে অবনীর পানে,

দেখি অনিমিষে আকুল পরাণে,

জবাসম রবি, শ্বেত সুধাকর,

মৃদু মৃদু আভা তারকা সুন্দর,

তরু, সরোরর, গিরি, বনস্থল,

বিহঙ্গ, পতঙ্গ, নদ, নদী, জল,

যদি কিছু পাই খুঁজিয়া তাহাতে,

স্নেহের অমিয়া হৃদয়ে মাখাতে,

যদি কিছু পাই তাহারি মতন,

হেরিতে নয়নে করিতে শ্রবণ,

দেবতা মানব নারী কি নরে।

সুখে থাকে তারা, সুখে থাকে ঘরে

পতি পদতল বক্ষঃস্থলে ধরে,

বিবাহিতা নারী—সখের খেলনা,

খায় দায় পরে নাহিক ভাবনা,

জানে না ভাবে না প্রণয় কেমন,

প্রাণের বল্লভ পতি কিবা ধন,

ইহারাই সতী—বিঘত প্রমাণ

আশা, রুচি, স্নেহ, ইহাদের প্রাণ —

নারীর মাহাত্ম্য, রমণীর মন

কত যে গভীর ভাবে কত জন,

প্রণয় কি ধন নারীর তরে?

“আমি মরি ঘুরে পৃথিবী ভিতরে,

প্রাণের মতন প্রাণনাথ তরে;

কই—কই পাই পূরাতে বাসনা?

পেয়ে নাহি পাই হায় কি যাতনা!

আরে মত্ত মন, সে অনিত্য আশা

ত্যজে ধৈর্য্য ধর, মুখে ভালবাসা

ধরে গৃহ কর, করে পরিণয়

না থাকিবে আর কলঙ্কের ভয়,

পাবি অনায়াসে পতি কোন জন,

পাবি অনায়াসে অন্ন আচ্ছাদন,

তবে মিছে কেন এত বিবাদ?

জ্বলিবে না হয় পুড়িয়া পুড়িয়া

পরাণ হৃদয় প্রণয়, স্মরিয়া,

সাহারার মরু তপনে যেমন;

কিম্বা অগ্নিগিরি গর্ভে হুতাশন,

জ্বলে জ্বলে পুড়ে উঠিবে যখন,

হৃদয় পাষাণে রাখিব চাপিয়া,

মরিব না হয় মরমে ফাটিয়া,

তবু ত পূরিবে লোকের সাধ।

সুখে থাকে তারা জানে না কেমন

প্রাণের বল্লভ সখা কিবা ধন,

মনের সুখেতে থাকে রে ঘরে।”

বলিতে বলিতে কাঁদিয়া কাঁদিয়া,

চলিল সুন্দরী নয়ন মুছিয়া;

গাহিয়া মধুর মৃদুল স্বরে।

“কেনই থাকিব কিসেরি তরে,

তনু বাঁধা দিয়ে গৃহের ভিতরে?

কারাবন্দী সম চির-হতাশ্বাস,

কেনই ত্যজিব এমন বাতাস,

এমন আকাশ, রবির কিরণ,

বিশাল ধরণী, রসাল কানন,

প্রাণী কোলাহল, বিহঙ্গের গান,

সাধের প্রমাদ—স্বাধীন পরাণ;

কেনই ত্যজিব, কাহার তরে?

ত্যজিতাম যদি পেতাম তাহায়,

যারে খুঁজে প্রাণ ভুবন বেড়ায়,

যাহার কারণে নারীর ব্যভার

করেছি বর্জ্জন, কলঙ্কের হার

পরেছি হৃদয়ে বাসনা করে।

কোথা প্রাণেশ্বর কই সে আমার,

কিসের কলঙ্ক—সুধার আধার—

সুধার মণ্ডলে সুধারি শশাঙ্ক,

এসো প্রাণনাথ—নহে ও কলঙ্ক

তোমা লয়ে সুখে থাকি হে কাছে!

তবু ও এলে না?—বুঝেছি বুঝেছি,

এ জনমে আর পাব না জেনেছি;

যখন ত্যজিব মাটীর শিকল,

ভ্রমিব শূন্যেতে হইয়া যুগল,

হরি হর রূপে তনু আধ আধ,

তখন মিটিবে মনের এ সাধ,

রবির মণ্ডলে, চাঁদের আলোকে,

কৈলাস শিখরে, শিব ব্রহ্ম লোকে,

বরুণের বারি, পবনের বায়ু,

এই বসুন্ধরা, প্রাণী, পরমায়ু,

হেরিব সুখেতে পলকে ভ্রমিয়া,

আধ আধ তনু একত্র মিশিয়া,

তখন মিটিবে মনের সাধ!—

তখন, পৃথিবী, সাধিস্ বাদ

তুলিস কলঙ্ক যতই আছে।”

আফ্রিকা খণ্ডস্থ স্বনাম প্রসিদ্ধ মরুভূমি।

কুলীন মহিলা বিলাপ

কুলীন মহিলা বিলাপ।

“এই না, ইংলণ্ডেশ্বরি, রাজত্ব তোমার?

তবে যেন ক্রীতদাস হয় গো উদ্ধার

তোমার পরশ মাত্র—সরস অন্তরে

ছিঁড়িয়া শৃঙ্খলমালা স্বাধীনতা ধরে?

তবে যেন রাজ্যেশ্বরি রাজ্যেতে তোমার

সকলে সমান স্নেহ উৎসাহ সবার?

নাহি যেন ভিন্নভাব কন্যাসুত প্রতি?

নাহি যেন তব রাজ্যে নারীর দুর্গতি?

শুনেছি না বৃটনের শ্বেতাঙ্গী মহিলা

পুরুষের সহচরী সঙ্গে করে লীলা?

সন্তান ধরেছ গর্ভে তুমি মা আপনি,

সন্তানের কত মায়া জান ত জননী।

তবে কেন আমাদের দুর্গতি এমন,

এখনো মা ঘুচিল না অশ্রুবিসর্জ্জন!”

আয় আয় সহচরী, ধরি গে বৃটনেশ্বরী,

করি গে তাঁহার কাছে দুঃখের রোদন;

এ জগতে আমাদের কে আছে আপন?

বিমুখ বান্ধব ধাতা, বিমুখ জনক ভ্রাতা,

বিমুখ নিষ্ঠুর তিনি পতি নাম যাঁর—

রাজ্যেশ্বরী বিনে ভবে কোথা যাব আর?

আয় আয় সহচরী, ধরি গে বৃটনেশ্বরী,

করি গে তাঁহার কাছে দুঃখের রোদন;

এ জগতে আমাদের কে আছে আপন?

“সাতশতবর্ষ, মাতঃ, পৃথিবী ভিতরে

এই রূপে অহরহঃ অশ্রুধারা ঝরে

মাতা মাতামহী চক্ষে জন্ম জন্মকাল,

আমাদেরো সে দুর্দ্দশা হায় রে কপাল!

কত রাজ্য হলো গেলো, কত ইন্দ্রপাত,

নক্ষত্র খসিল কত, ভূধর নিপাত,

হিন্দু বৌদ্ধ মুসলমান ম্লেচ্ছ অধিকার,

শাস্ত্র ধর্ম্ম মতামত কতই প্রকার

উঠিল ভারতভূমে, হইল পতন,

আমাদের দুঃখ আর হলো না মোচন!

সেই সে দিনান্তে দুটী পরান্ন আহার

নিশিতে কাঁদিয়া স্বপ্ন দেখি অনিবার।’’

আয় আয় সহচরী, ধরি গে বৃটনেশ্বরী,

করি গে তাহার কাছে দুঃখের রোদন;

এ জগতে আমাদের কে আছে আপন?

বিমুখ বান্ধব ধাতা, বিমুখ জনক ভ্রাতা,

বিমুখ নিষ্ঠুর তিনি পতি নাম যাঁর—

রাজ্যেশ্বরী বিনে ভবে কোথা যাব আর?

আয় আয় সহচরী, ধরি গে বৃটনেশ্বরী,

করি গে তাঁহার কাছে দুঃখের রোদন—

এ জগতে আমাদের কে আছে আপন?

‘‘ডেকেছি মা বিধাতারে কত শত বার,

পূজেছি কতই দেব সংখ্যা নাহি তার,

তবুও মা খণ্ডিল না কপালের মূল,

অমরাবতীতে বুঝি নাহি দেবকুল!

বারেক বৃটনেশ্বরি আয় মা দেখাই

প্রাণের ভিতরে দাহ কি করে সদাই;

কাজ নাই দেখায়ে মা, তুমি রাজ্যেশ্বরী,

হৃদয়ে বাজিবে তব ব্যথা ভয়ঙ্করী।

ছিল ভাল বিধি যদি বিধবা করিত,

কাঁদিতে হতো না পতি থাকিতে জীবিত!

পতি, পিতা, ভ্রাতা, বন্ধু ঠেলিয়াছে পায়,

ঠেলো না মা, রাজমাতা, দুঃখী অনাথায়।”

আয় আয় সহচরী, ধরি গে বৃটনেশ্বরী,

করি গে তাঁহার কাছে দুঃখের রোদন;

এ জগতে আমাদের কে আছে আপন?

বিমুখ বান্ধব ধাতা, বিমুখ জনক ভ্রাতা,

বিমুখ নিষ্ঠুর তিনি পতি নাম যাঁর—

রাজ্যেশ্বরী বিনে ভবে কোথা যাব আর?

“কি জানাব জননী গো হৃদয়ের ব্যথা—

কিঙ্করীরো হেন ভাগ্য না হয় সর্ব্বথা?

কি ষোড়শী বালা, আর প্রবীণারমণী,

প্রতিদিন কাঁদিছে মা দিন দণ্ড গণি।

কেহ কাঁদে অন্নাভাবে আপনার তরে,

শিশু কোলে কারো চক্ষে বারিধারা ঝরে।

কত পাপস্রোত মাতা প্রবাহিত হয়,

ভাবিতে রোমাঞ্চ দেহ, বিদরে হৃদয়।

হা নৃশংস অভিমান কৌলীন্য-আশ্রিত!

হা নৃশংস দেশাচার রাক্ষসপালিত!

আমাদের যা হবার হয়েছে, জননি—

কর রক্ষা এই ভিক্ষা এ সব নন্দিনী।”

আয় আয় সহচরী, ধরি গে বৃটনেশ্বরী,

করি গে তাঁহার কাছে দুঃখের রোদন—

এ জগতে আমাদের কে আছে আপন?

বিমুখ বান্ধব ধাতা, বিমুখ জনক ভ্রাতা

বিমুখ নিষ্ঠুর তিনি পতি নাম যাঁর—

রাজ্যেশ্বরী বিনে ভবে কোথা যাব আর?

আয় আয় সহচরী, ধরি গে বৃটনেশ্বরী,

করি গে তাঁহার কাছে দুঃখের রোদন—

এ জগতে আমাদের কে আছে আপন?

কোন একটি পাখীর প্রতি

কোন একটি পাখীর প্রতি।

ডাক্ রে আবার, পাখি, ডাক্ রে মধুর!

শুনিয়ে জুড়াক প্রাণ, তোর সুললিত গান

অমৃতের ধারা সম পড়িছে প্রচুর।

আবার ডাক্ রে পাখি, ডাক্ রে মধুর!

বলিয়ে বদন তুলে, বসিয়ে রসালমূলে,

দেখিনু উপরে চেয়ে আশায় আতুর।

ডাক্ রে আবার ডাক্‌ সুমধুর সুর।

কোথায় লুকায়ে ছিল নিবিড় পাতায়;

চকিত চঞ্চল আঁখি, না পাই দেখিতে পাখী,

আবার শুনিতে পাই সঙ্গীত শুনায়,

মনের আনন্দে বসে তরুর শাখায়।

কে তোরে শিখালে বল, এ সঙ্গীত নিরমল?

আমার মনের কথা জানিলি কোথায়?

ডাক্ রে আবার ডাক্‌ পরাণ জুড়ায়।

অমনি কোমল স্বরে সেও রে ডাকিত,

কখন আদর করেকভু অভিমান ভরে

অমনি ঝঙ্কার করে লুকায়ে থাকিত।

কি জানিবি পাখী তুই, কত সে জানিত!

নব অনুরাগে যবে, ডাকিত প্রাণবল্লভে,

কেড়ে নিত প্রাণ মন পাগল করিত;

কি জানিবি পাখী তুই কত সে জানিত।

ধিক্ মোরে ভাবি তারে আবার এখন!

ভুলিয়ে সে নব রাগ, ভুলে গিয়ে প্রেমযাগ,

আমারে ফকীর করে আছে সে যখন;

ধিক্ মোরে ভাবি তারে আবার এখন।

ভুলিব ভুলিব করি, তবু কি ভুলিতে পারি,

না জানি নারীর প্রেম মধুর কেমন,

তবে কেন সে আমারে ভাবে না এখন?

ডাক্ রে বিহগ তুই ডাক্ রে চতুর;

ত্যজে সুধু সেই নাম, পূরা তোর মনস্কাম,

শিখেছিস্ আর যত বল সুমধুর।

ডাক্ রে আবার ডাক্‌ মনোহর সুর!

না শুনে আমার কথা, ত্যজে কুসুমিত লতা,

উড়িল গগন-পথে বিহগ চতুর;—

কে আর শুনবে মোরে সে নাম মধুর।

গঙ্গার উৎপত্তি

গঙ্গার উৎপত্তি।

হরিনামামৃত পানে বিমোহিত

সদা আনন্দিত নারদঋষি,

গাহিতে গাহিতে অমরাবতীতে

আইল একদা উজলি দিশি।

হরষ অন্তরে মহা সমাদরে

স্বগণ সংহতি অমর পতি,

করি গাত্রোত্থান, করিয়া সম্মান

সাদর সম্ভাষে তোষে অতিথি।

পাদ্য অর্ঘ্য দিয়া মুনিরে পূজিয়া

চন্দ্রাগ্নি প্রভৃতি অমরগণ;

করিয়া মিনতি কহে ঋষিপতি

“কহ কৃপা করি করি শ্রবণ,

কি রূপে উৎপতি হলো ভাগীরথী

গাও তপোধন প্রাচীন কথা।

বেদের উকতি, তোমার ভারতী,

অমৃত লহরী সদৃশ গাথা।”

গুণী বিশারদ মুনি সে নারদ,

ললিত পঞ্চমে মিলায়ে তান,

আনন্দে ডুবিয়া নয়ন মুদিয়া।

তুম্ব বাজাইয়া ধরিল গান।

“হিমাদ্রি অচল দেবলীলাস্থল

যোগীন্দ্রবাঞ্ছিত পবিত্র স্থান;

অমর কিন্নর যাহার উপর

নিসর্গ নিরখি জুড়ায় প্রাণ।

যাহার শিখরে সদা শোভ করে

অসীম অনন্ত তুষার রাশি;

যাহার কটিতে ছুটিতে ছুটিতে

জলদকদম্ব জুড়ায় আসি।

যেখানে উন্নত মহীরুহ যত

প্রণত উন্নত শিখর কায়;

সহস্র বৎসর অজর অমর

অনাদি ঈশ্বর মহিমা গায়।

সেই হিমগিরি শিখর উপরি

অঙ্গিরাদি যত মহর্ষিগণ

আসিত প্রত্যহ, ভকতির সহ

ভজিতে ব্রহ্মাণ্ড আদিকারণ।

১০

হেরিত উপরে নীলকান্তি ধরে

শূন্য ধূ ধূ করে ছড়ায়ে কায়;

হেরিত অযুত অযুত অদ্ভুত

নক্ষত্র ফুটিয়া ছুটিছে তায়।

১১

মণ্ডলে মণ্ডলে শনি শুক্র চলে

ঘুরিয়া ঘেরিয়া আকাশময়;

হেরিত চন্দ্রমা অতুল উপমা

অতুল উপমা ভানু উদয়।

১২

চারি দিকে স্থিত দিগন্ত বিস্তৃত

হেরিত উল্লাসে তুষার রাশি;

বিস্ময়ে প্লাবিত বিস্ময়ে ভাবিত

অনাদি পুরুষে আনন্দে ভাসি।”

১৩

বলিতে বলিতে আনন্দ বারিতে

দেবর্ষি হইল রোমাঞ্চ কায়;

ঘনঘনস্বর গভীর, প্রখর

তান্‌পূরা ধ্বনি বাজিল তায়।

১৪

গাহিল নারদ, ভাবে গদগদ,

“এমন ভজন নাহি রে আর,

ভূধর শিখরে ডাকিয়া ঈশ্বরে

গাহিতে অনন্ত মহিমা তাঁর।

১৫

ইহার সমান ভজনের স্থান

কি আছে মন্দির জগত মাঝে;

জলদ-গর্জ্জন তরঙ্গ-পতন

ত্রিলোক চমকি যেখানে বাজে।

১৬

কিবা সে কৈলাস বৈকুণ্ঠ নিবাস

অলকা আমরা নাহিক চাই;

জয় নারায়ণ বলিয়া যেমন

ভুবনে ভুবনে ভ্রমিতে পাই।”

১৭

নারদের বাণী শুনি অভিমানী

অমর মণ্ডলী বিমর্ষ হয়;

আবার আহ্লাদে গভীর নিনাদে

সঙ্গীত তরঙ্গ বেগেতে বয়!

১৮

“ঋষি কয় জন সন্ধ্যা সমাপন

করি এক দিন বসিলা ধ্যানে;

দেবী বসুন্ধরা মলিনা কাতরা

কহিতে লাগিলা আসি সেখানে;”

১৯

‘রাখ ঋষিগণ—সমূলে নিধন

মানব সংসার হলো এবার;

হলো ছার খার ভুবন আমার

অনাবৃষ্টি তাপ সহে না আর।’

২০

শুনে ঋষিগণ করে দৃঢ় পণ

যোগে দিল মন একান্ত চিতে;

কঠোর সাধন ব্রহ্ম আরাধনা

করিতে লাগিলা মানব-হিতে।

২১

মানব মঙ্গলে ঋষির সকলে

কাতরে ডাকিছে করুণাময়;

মানবে রাখিতে নারায়ণ চিতে

হইল অসীম করুণোদয়।

২২

দেখিতে দেখিতে হলো আচম্বিতে

গগন-মণ্ডল তিমিরময়;

মিহির নক্ষত্র তিমিরে একত্র

অনল বিদ্যুৎ অদৃশ্য হয়।

২৩

ব্রহ্মাণ্ড ভিতর নাহি কোন স্বর,

অবনী অম্বর স্তম্ভিত প্রায়;

নিবিড় আঁধার জলধি হুঙ্কার

বায়ু বজ্রনাদ নাহি শুনায়।

২৪

নাহি করে গতি গ্রহদলপতি

অবনী-মণ্ডল নাহিক ছুটে;

নদ-নদী-জল হইল অচল

নির্ঝর না ঝরে ভূধর ফুটে।

২৫

দেখিতে দেখিতে পুনঃ আচম্বিতে

গগনে হইল কিরণোদয়;

ঝলকে ঝলকে অপূর্ব্ব আলোকে

পূরিল চকিতে ভুবনত্রয়!

২৬

শূন্যে দিল দেখা কিরণের রেখা

তাহাতে আকাশে প্রকাশ পায়—

ব্রহ্ম সনাতন অতুল চরণ

সলিল নির্ঝর বহিছে তায়।

২৭

বিন্দু বিন্দু বারি পড়ে সারি সারি

ধরিয়া সহস্র সহস্র বেণী;

দাঁড়ায়ে অম্বরে কমণ্ডলু করে

আনন্দে ধরিছে কমলযোনি।

২৮

হায় কি অপার আনন্দ আমার

ব্রহ্ম সনাতন চরণ হতে;

ব্রহ্মা কমুণ্ডলে জাহ্নবী উথলে

পড়িছে দেখিনু বিমানপথে।

২৯

গভীর গর্জ্জনে দেখিনু গগনে

ব্রহ্মা কমণ্ডলু হতে আবার

জলস্তম্ভ ধায়, রজতের কায়,

মহাবেগে বায়ু করি বিদার।

৩০

ভীম কোলাহলে নগেন্দ্র অচলে

সেই বারিরাশি পড়িল আসি;

ভূধর শিখর সাজিয়া সুন্দর

মুকুটে ধরিল সলিল রাশি।

৩১

রজত বরণ স্তম্ভের গঠন

অনন্ত গগন ধরেছে শিরে,

হিমানী আবৃত হিমাদ্রি পর্ব্বত

চরণে পড়িয়া রয়েছে ধীরে।

৩২

চারি দিকে তার রাশি স্তূপাকার

ফুটিয়া ছুটিছে ধবল ফেনা;

ঢাকি গিরি চুড়া হিমানীর গুঁড়া

সদৃশ খসিছে সলিল কণা।

৩৩

ভীষণ আকার ধরিয়া আবার

তরঙ্গ ধাইছে আচল কায়;

নীলিম গিরিতে হিমানী রাশিতে

ঘুরিয়া ফিরিয়া মিশায়ে যায়।

৩৪

হইল চঞ্চল হিমাদ্রী অচল

বেগেতে বহিল সহস্র ধারা;

পাহাড়ে পাহাড়ে তরঙ্গ আছাড়ে

ত্রিলোক কাঁপিল আতঙ্কে সারা।

৩৫

ছুটিল গর্ব্বেতে গোমুখী পর্ব্বতে

তরঙ্গ সহস্র একত্রে মিলি,

গভীর ডাকিয়া আকাশ ভাঙ্গিয়া

পড়িতে লাগিল পাষাণ ফেলি।

৩৬

পালকের মত ছিঁড়িয়া পর্ব্বত

কুঁদিয়া চলিল ভাঙ্গিয়া বাঁধ,

পৃথিবী কাঁপিল তরঙ্গ ছুটিল

ডাকিয়া অসংখ্য কেশরি-নাদ।

৩৭

বেগে বক্রকায় স্রোতঃস্তম্ভ ধায়

যোজন অন্তরে পড়িছে নীচে;

নক্ষত্রের প্রায় ঘেরিয়া তাহায়

শ্বেত ফেনরাশি পড়িছে পিছে।

৩৮

তরঙ্গনির্গত বারিকণা যত

হিমানী চূর্ণিত আকার ধরে;

ধূমরাশি প্রায় ঢাকিয়া তাহায়

জলধনু শোভা চিত্রিত করে।

৩৯

শত শত ক্রোশ জলের নির্ঘোষ

দিবস রজনী করিছে ধ্বনি;

অধীর হইয়া, প্রতিধ্বনি দিয়া

পাষাণ খসিয়া পড়ে অমনি।

৪০

ছাড়ি হরিদ্বার শেষেতে আবার

ছড়ায়ে পড়িল বিমল ধারা;

শ্বেত সুশীতল স্রোতস্বতীজল

বহিল তরল পারা পারা।

৪১

অবনীমণ্ডলে সে পবিত্র জলে

হইল সকলে আনন্দে ভোর;

‘জয় সনাতনী পতিতপাবনি’

ঘন ঘন ধ্বনি উঠিল ঘোর।”

চাতক পক্ষীর প্রতি

চাতক পক্ষীর প্রতি।

কে তুমি রে বল পাখি,

সোণার বরণ মাখি,

গগনে উধাও হয়ে

মেঘেতে মিশায়ে রয়ে,

এত সুখে সুধামাখা সঙ্গীত শুনাও।

বিহঙ্গ নহ ত তুমি;

তুচ্ছ করি মর্ত্ত্যভূমি

জ্বলন্ত অনল প্রায়

উঠিয়া মেঘের গায়,

ছুটিয়া অনিল-পথে সুস্বর ছড়াও।

অরুণ উদয় কালে

সন্ধ্যার কিরণ-জালে

দূর গগনেতে উঠি,

গাও সুখে ছুটি ছুটি,

সুখের তরঙ্গ যেন ভাসিয়া বেড়াও।

আকাশের তারাসহ

মধ্যাহ্নে লুকায়ে রহ,

কিন্তু শুনি উচ্চস্বরে

শূন্যেতে সঙ্গীত ঝরে;

আনন্দ প্রবাহ ঢেলে পৃথিবী জুড়াও।

একাকী তোমার স্বরে

জগত প্লাবিত করে,

শরতের পূর্ণশশি

বিমল আকাশে বসি

কৌমুদী ঢালিয়া যথা ব্রহ্মাণ্ড ভাষায়।

কবি যথা লুকাইয়ে,

হৃদয়ে কিরণ লয়ে,

উন্মত্ত হইয়ে গায়,

পৃথিবী মাতিয়ে তায়

আশা মোহ মায়া ভয় অন্তরে জড়ায়।

রাজার কুমারী যথা

পেয়ে প্রণয়ের ব্যথা,

গোপনে প্রাসাদ পরে

বিরহ সান্ত্বনা করে

মধুর প্রেমের মত মধুর গাথায়।

যেমন খদ্যোত জ্বলে

বিরলে বিপিন তলে,

কুসুম তৃণের মাঝে

আতোষী আলোক সাজে

ভিজিয়া শিশির নীরে আঁধার নিশায়।

পাতায় নিকুঞ্জ গাঁথা

গোলাপ অদৃশ্য যথা

সৌরভ লুকায়ে রয়,

যখনি পবন বয়,

সুগন্ধ উথলি উঠি বায়ুরে খেপায়।

১০

সেই রূপ তুমি, পাখি,

অদৃশ্য গগনে থাকি,

কর সুখে বরিষণ

সুধাস্বর অনুক্ষণ,

ভাসাইতে ভূমণ্ডল সুধার ধারায়।

১১

কেবা তুমি জানি নাই,

তুলনা কোথায় পাই;

জলধনু চূর্ণ হয়ে

পড়ে যদি শূন্য বয়ে,

তাহাও অপূর্ব্ব হেন নাহিক দেখায়।

১২

যত কিছু ভূমণ্ডলে

সুন্দর মধুর বলে—

নবীন মেঘের জল

মুক্ত মাখা তৃণদল—

তোমার মধুর স্বরে পরাজিত হয়।

১৩

পাখী কিম্বা হও পরি

বল রে প্রকাশ করি

কি সুখ চিন্তায় তোর

আনন্দ হয়েছে ভোর?

এমন আহলাদ আহা স্বপ্নে দেখি নাই।

১৪

সুধা প্রণয়ের গীত

প্রাণ করে পুলকিত—

তারো সুললিত স্বর

নহে এত মনোহর

এত সুধাময় কিছু না হেরি কোথাই।

১৫

বিবাহ উৎসব-রব

বিজয়ীর জয়-স্তব,

তোর স্বর তুলনায়

অসার দেখি রে তায়—

মেটেনা মনের সাধ পূর্ণ নাহি হয়।

১৬

তোর এ আনন্দময়

সুখ-উৎস কোথা রয়,

বন কিম্বা মাঠ গিরি

গগন হিল্লোল হেরি—

কারে ভালবেসে এত ভুল সমুদয়।

১৭

তুমিই থাক রে সুখে

জান না ঔদাস্য দুখে,

বিরক্তি কাহারে বলে

জান না রে কোন কালে

প্রেমের অরুচি ভোগে হলাহল কত।

১৮

আমরা এ মর্ত্ত্যবাসী

কভু কাঁদি কভু হাসি,

আগে পাছে দেখে যাই

যদি কিছু নাহি পাই,

অমনি হতাশ হয়ে ভাবি অবিরত।

১৯

যত হাসি প্রাণ ভরে

যাতনা থাকে ভিতরে,

এ দুঃখের ভূমণ্ডলে

শোকে পরিপূর্ণ হলে

মধুর সঙ্গীত হয় কতই মধুর।

২০

ঘৃণা ভয় অহঙ্কার

দূরে করি পরিহার,

পাখি রে তোমার মত

না যদি কাঁদিতে হত,

না জানি পেতেম কি না আনন্দ প্রচুর।

২১

গগন বিহারী পাখী

জগতে নাহি রে দেখি,

গীত বাদ্য মধুস্বর

হেন কিছু মনোহর

তুলনা তুলিতে পারি তোমার কথায়।

২২

যে আহ্লাদ চিত্তে তোর,

আমারে কিঞ্চিৎ ওর

আনন্দ কর রে দান,

তা হলে উন্মাদ প্রাণ

কবিতা তরঙ্গে ঢেলে প্রকাশি ধরায়।

শেলি বিরচিত স্কাইলার্কের অনুকরণ।

জীবন সঙ্গীত

জীবন সঙ্গীত।

বলো না কাতর স্বরে বৃথা জন্ম এ সংসারে

এ জীবন নিশার স্বপন;

দারাপুত্র পরিবার তুমি কার কে তোমার

বলে জীব করো না ক্রন্দন।

মানব-জনম সার এমন পাবে না আর

বাহ্য দৃশ্যে ভুলো না রে মন।

কর যত্ন হবে জয় জীবাত্মা অনিত্য নয়

অহে জীব কর আকিঞ্চন।

করোনা সুখের আশ পরো না দুখের ফাঁস

জীবনের উদ্দেশ তা নয়;

সংসারে সংসারী সাজ করো নিত্য নিজ কাজ

ভবের উন্নতি যাতে হয়।

দিন যায় ক্ষণ যায় সময় কাহারো নয়

বেগে ধায় নাহি রয় স্থির;

হয় সম্পদ বল্ সকলি ঘুচায় কাল

আয়ু যেন শৈবালের নীর।

সংসার সমরাঙ্গনে যুদ্ধ কর দৃঢ় পণে

ভয়ে ভীত হইও না মানব;

কর যুদ্ধ বীর্য্যবান যায় যাবে যাক্‌ প্রাণ

মহিমাই জগতে দুর্ল্লভ।

মনোহর মূর্ত্তি হেরে অহে জীব অন্ধকারে

ভবিষ্যতে করো না নির্ভর;

অতীত সুখের দিনে পুনঃ আর ডেকে এনে

চিন্তা করে হইও না কাতর।

সাধিতে আপন ব্রত স্বীয় কার্য্যে হও রত

এক মনে ডাক ভগবান;

সঙ্কল্প সাধন হবে ধরাতলে কীর্ত্তি রবে

সময়ের সার বর্ত্তমান।

মহাজ্ঞানী মহাজন যে পথে করে গমন

হয়েছেন প্রাতঃ স্মরণীয়,

সেই পথ লক্ষ্য করে স্বীয় কীর্ত্তি ধ্বজা ধরে

আমরাও হবো বরণীয়।

সময়-সাগর তীরে পদাঙ্ক অঙ্কিত করে

আমরাও হব হে অমর;

সেই চিহ্ন লক্ষ্য করে অন্য কোন জন পরে

যশোদ্বারে আসিবে সত্বর।

করো না মানবগণ বৃথা ক্ষয় এ জীবন

সংসার-সমরাঙ্গন মাঝে;

সংকল্প করেছ যাহা, সাধন করহ তাহা

রত হয়ে নিজ নিজ কাজে।

জীবন-মরীচিকা

জীবন-মরীচিকা।

জীবন এমন ভ্রম আগে কে জানিত রে।

হয়ে এত লালায়িত কে ইহা যাচিত রে।

প্রভাতে অরুণোদয়, প্রফুল্ল যেমন হয়,

মনোহরা বসুন্ধরা কুহেলিকা আঁধারে।

বারিদ, ভূধর, দেশ, ধরিয়ে অপূর্ব্ব বেশ,

বিতরে বিচিত্র শোভা ছায়াবাজী আকারে।

কুসুমিত তরুচয়, ব্রহ্মাণ্ড ভরিয়ে রয়,

ঘ্রাণে মুগ্ধ সমীরণ মৃদু মৃদু সঞ্চারে।

কুলায়ে বিহঙ্গদল, প্রেমানন্দে অনর্গল,

মধুময় কলনাদ করে কত প্রকারে।

সেইরূপ বাল্যকালে, মন মুগ্ধ মায়াজালে,

কত লুদ্ধ আশা আসি স্নিগ্ধ করে আত্মারে।

পৃথিবী ললামভূত, নিত্য সুখে পরিপ্লুত,

হয় নিত্য এই গীত পঞ্চভূত মাঝারে।

ব্রহ্মাণ্ড সৌরভময় মঞ্জু কুঞ্জ মনে হয়,

মনে হয় সমুদয় সুধাময় সংসারে।

মধ্যাহ্ণে তাহার পর, প্রচণ্ড রবির কর,

যেমন সে মনোহর মধুরতা সংহারে।

না থাকে কুহেলি অন্ধ, না থাকে কুসুমগন্ধ,

না ডাকে বিহগকুল সমীরণ ঝঙ্কারে।

সেই রূপ ক্রমে যত, শৈশব যৌবন গত,

মনোমত সাধ তত ভাঙে চিত্তবিকারে।

সুবর্ণ মেঘের মালা, লয়ে সৌদামিনী ডালা,

আশার আকাশে আর নিত্য নাহি বিহারে।

ছিন্ন তুষারের ন্যায়, বাল্য বাঞ্ছা দূরে যায়,

তাপদগ্ধ জীবনের ঝঞ্ঝাবায়ু প্রহারে।

পড়ে থাকে দূরগত জীর্ণ অভিলাষ যত,

ছিন্ন পতাকার মত ভগ্ন দুর্গ প্রাকারে।

জীবনেতে পরিণত এই রূপে হয় কত

মর্ত্ত্যবাসিমনোরথ, হা দগ্ধ বিধাতা রে!

ধর্ম্মনিষ্ঠাপরায়ণ, সুচারু পবিত্র মন,

বিমলস্বভাব সেই যুবা এবে কোথা রে।

অসত্য কলুষলেশ, বিঁধিলে শ্রবণদেশ,

কলঙ্কিত ভাবিত যে আপনার আত্মারে।

বামাশক্তি বামাচার, শুনিলে শত ধিক্কার,

জ্বলিত অন্তরে যার সে তপস্বী কোথারে?

কোথা সে দয়াদ্রচিত্ত, সঙ্কল্প যাহার নিত্য,

পরদুঃখ বিমোচন এ দুরন্ত সংসারে।

অত্যাচার উৎপীড়ন, করিবারে সংযমন,

না করিত যেইজন ভেদাভেদ কাহারে।

না মানিত অনুরোধ, না জানিত তোষামোদ,

সে তেজস্বী মহোদয় বাঞ্ছা এবে কোথা রে।

কত যুবা যৌবনেতে, চড়ি আশা বিমানেতে,

ভাবে ছড়াইবে ভবে যশঃপ্রভা আভারে।

তুলিবে কীর্ত্তির মঠ, স্থাপিবে মঙ্গলঘট,

প্রণত ধরণীতল দিবে নিত্য পূজা রে।

কেহ বা জগতে ধন্য, বীরবৃন্দে অগ্রগণ্য,

হয়ে চাহে চরণেতে বাঁধিবারে ধরারে।

স্বদেশ হিতৈষী কেহ, তাবিয়ে অসীম স্নেহ,

ব্রত করে প্রাণ দিতে স্বজাতির উদ্ধারে।

কার চিত্তে অভিলাষ, হবে শারদার দাস,

পীবে সুখে চিরদিন অমরতা সুধারে।

কালের করাল স্রোতে, ভাসে যবে জীবনেতে,

এই সব আশালুদ্ধ প্রাণী থাকে কোথা রে।

কিশোর গাণ্ডীবধারী, যামদগ্ন্য দৈত্যহারী,

ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কালিদাস কত ডোবে পাথারে।

কতই যুবতী বালা, গাঁথে মনোমত মালা,

সাজাইতে মনোমত প্রিয়তম সখারে।

হৃদয় মার্জ্জিত করে, আহা কত প্রেমভরে,

প্রিয়মূর্ত্তি চিত্র ক’রে রাখে চিত্ত-আগারে।

নব বিবাহিত কত, পেয়ে পতি মনোমত,

ভাবে জগতের সুখ ভরিয়াছে ভাণ্ডারে।

এই সব অবলার, কিছু দিন পরে আর

দেখ মর্ম্মভেদী শেল দেয় কত ব্যথারে।

দেখ গে কেহ বা তার, হয়েছে পঞ্জরসার,

শুষ্ক হয়ে মাল্যদাম শূন্যে আছে গাঁথা রে।

মনোমত নহে পতি, মরমে মরিয়ে সতী,

উদ্‌যাপন করিয়াছে পতিসুখ-আশারে।

কৃতান্তের আশীর্ব্বাদে, দিবানিশি কেহ কাঁদে,

বিষম বৈধব্য দশ নিগড়েতে বাঁধা রে।

দারুণ অপত্যতাপে, দেখ গে কেহ বিলাপে,

অন্নাভাবে জননীর কোথা বক্ষঃ বিদারে।

আগে যদি জানিতাম, পৃথিবী এমন ধাম,

তা হলে কি পড়িতাম আনায়ের মাঝারে।

কোথা গেল সে প্রণয়, বাল্যকালে মধুময়,

যে সখ্যতা পাশে মন বাঁধা ছিল সদা রে।

সহপাঠী কেলিচর, অভেদাত্মা হরিহর,

এবে তাহাদের সঙ্গে কতবার দেখা রে।

পতঙ্গপালের মত কর্ম্মক্ষেত্রে অবিরত,

স্বকার্য্য সাধনে রত, কে বা ভাবে কাহারে।

আহা পুনঃ কত জন করিয়াছে পলায়ন,

মর্ত্ত্যভূমি পরিহরি শমনের প্রহারে।

গগন-নক্ষত্রবৎ, তাহারাই অকস্মাৎ,

প্রকাশে ক্বচিৎ কভু মৃদুরশ্মি মাখারে।

আগে ছিল কত সাধ, হেরিতে পূর্ণিমা চাঁদ,

হেরিতে নক্ষত্র-শোভা নীলনভঃ মাঝারে।

দিনদিন কত বার, জাগ্রতে নিদ্রিতাকার,

স্বপ্নে স্বপ্নে ভ্রমিতাম নদহ্রদকান্তারে।

বসন্ত বরষাকালে, পিকরব, মেঘজালে,

হেরিতে দামিনীলতা, কি আনন্দ আহা রে।

সে সাধ তরঙ্গকুল, এবে কোথা লুকাইল,

কে ঘুচালে জীবনের হেন রম্য ধাঁধাঁ রে।

বিশুদ্ধ পবিত্র মন, স্বর্গবাসী সিংহাসন,

পঙ্কিল করিল কে রে দগ্ধচিতা অঙ্গারে।

পদ্মের মৃণাল

পদ্মের মৃণাল।

পদ্মের মৃণাল এক, সুনীল হিল্লোলে,

দেখিলাম সরোবরে ঘন ঘন দোলে—

কখন ডুবায় কায়, কভু ভাসে পুনরায়,

হেলেদুলে আশে পাশে তরঙ্গের কোলে—

পদ্মের মৃণাল এক সুনীল হিল্লোলে।

শ্বেত আভা স্বচ্ছ পাতা, পদ্ম শতদলে গাঁথা,

উলটিপালটি বেগে স্রোতে ফেলে তোলে—

পদ্মের মৃণাল এক সুনীল হিল্লোলে।

একদৃষ্টে কতক্ষণ, কৌতুকে অবশ মন,

দেখিতে শোকের বেগ ছুটিল কল্পোলে—

পদ্মের মৃণাল এক তরঙ্গের কোলে।

সহসা চিন্তার বেগ উঠিল উথলি;

পদ্ম, জল, জলাশয় ভুলিয়া সকলি,

অদৃষ্টের নিবন্ধন ভাবিয়া ব্যাকুল মন—

অই মৃণালের মত হায় কি সকলি!

রাজ রাজমন্ত্রীলীলা, বলবীর্য্য স্রোতশীলা,

সকলি কি ক্ষণস্থায়ী দেখিতে কেবলি?—

অই মৃণালের মত নিস্তেজ সকলি!

অদৃষ্ট বিরোধী যার, নাহি কি নিস্তার তার,

কিবা পশুপক্ষী আর মানব মণ্ডলী?—

লতা, পশু, পক্ষী সম মানবেরো পরাক্রম,

জ্ঞান, বুদ্ধি, যত্ন, বলে বাঁধা কি শিকলি?—

অই মৃণালের মত হায় কি সকলি!

কোথা সে প্রাচীনজাতি মানবের দল

শাসন করিত যারা অবনীমণ্ডল?

বলবীর্য্য পরাক্রমে ভবে অবলীলা ক্রমে,

ছড়াইত মহিমার কিরণ উজ্জ্বল—

কোথা সে প্রাচীনজাতি মানবের দল?

বঁধিয়ে পাষাণস্তুপ, অবনীতে অপরূপ,

দেখাইলা মানবের কি কৌশল বল—

প্রাচীন মিসরবাসী কোথা সে সকল?

পড়িয়া রয়েছে কূপ অবনীতে অপরূপ,

কোথা তারা, এবে কারা হয়েছে প্রবল

শাসন করিতে এই অবনীমণ্ডল।

জগতের অলঙ্কার আছিল যে জাতি;

জ্বালিল উন্নতিদীপ অরুণের ভাতি;

অতুল্য অবনীতলে এখনো মহিমা জ্বলে,

কে আছে সে নরধন্য কুলে দিতে বাতি?—

এই কি কালের গতি, এই কি নিয়তি।

ম্যারাথন্‌, থার্মপলি, হয়েছে শ্মশানস্থলী

গিরীস আঁধারে আজ পোহাইছে রাতি;—

এই কি কালের গতি এই কি নিয়তি!

যার পদচিহ্ন ধরে, অন্য জাতি দম্ভ করে,

আকাশ পয়োধিনীরে ছড়াইছে ভাতি—

জগতের অলঙ্কার কোথায় সে জাতি।

দোর্দ্দন্ত প্রতাপ যার কোথায় সে রোম?

কাঁপিত যাহার তেজে মহী, সিন্ধু, ব্যোম।

ধরণীর সীমা যার, ছিল রাজ্য অধিকার,

সহস্র বৎসরাবধি একাদি নিয়ম—

দোর্দ্দন্ত প্রতাপ আজি কোথায় সে রোম!

সাহস ঐশ্বর্য্যে যার, ত্রিভুবন চমৎকার—

সে জাতি কোথায় আজি, কোথা সে বিক্রম?

এমনি অব্যর্থ কি রে কালের নিয়ম!

কি চিহ্ন আছে রে তার, রাজপথ দুর্গে যার,

পৃথিবী বন্ধন ছিল কোথায় সে রোম?—

নিয়তির কাছে নর এত কি অক্ষম!

আরবের পারস্যের কি দশা এখন;

সে তেজ নাহিক আর, নাহি সে তর্জ্জন।

সৌভাগ্য কিরণজালে, উহারাই কোন কালে

করেছিল মহাতেজে পৃথিবী শাসন।—

আরবের পারস্যের কি দশা এখন!

পশ্চিমে হিস্পানীশেষ, পূবে সিন্ধু হিন্দুদেশ,

কাফর যবনবৃন্দে করিয়া দমন—

উল্কা সম অকস্মাৎ হইল পতন!

“দীন” ব’ল্যে মহীতলে, যে কাণ্ড করিলা বলে,

সে দিনের কথা এবে হয়েছে স্বপন—

আরবের উপন্যাস অদ্ভুত যেমন!

আজি এ ভারতে, হায়, কেন হাহাধ্বনি।

কলঙ্ক লিখিতে যার কাঁদিছে লেখনী।

তরঙ্গে তরঙ্গে নত পদ্মমৃণালের মত,

পড়িয়া পরের পায় লুটায় ধরণী।

আজি এ ভারতে কেন হাহাকার-ধ্বনি।

জগতের চক্ষু ছিল, কত রশ্মি ছড়াইল,

সে দেশে নিবিড় আজ আঁধার রজনী—

পূর্ণগ্রাসে প্রভাকর নিস্তেজ যেমনি!

বুদ্ধিবীর্য্য বাহুবলে, সুধন্য জগতী-তলে,

ছিল যারা আজি তারা অসার তেমনি।

আজি এ ভারতে কেন হাহাকার-ধ্বনি?

কোথা বা সে ইন্দ্রালয়, কোথা সে কৈলাস!

কোথা সে উন্নতি আশা, কোথা সে উল্লাস।

দম্ভে বসুধার পরে, বেড়াইত তেজোভরে,

আজি তারা ভয়ে ভীত হয়েছে হতাশ—

কোথা বা সে ইন্দ্রালয়, কোথা সে কৈলাস!

কত যত্নে কত যুগে, বনবাসে কষ্ট ভুগে,

কালজয়ী হলো বল্যে করিত বিশ্বাস—

হায় রে সে ঋষিদের কোথা অভিলাষ!

সে শাস্ত্র, সে দরশন, সে দেব কোথা এখন?

পড়ে আছে হিমালয় ভাবিয়া হতাশ—

কোথা বা সে ইন্দ্রালয়, কোথা সে কৈলাস!

নিয়তির গতিরোধ হবে না কি আর?

উঠিবে না কেহ কি রে উজলি আবার?

মিসর পারস্য ভাতি, গিরীক রোমীয় জাতি,

ভারত থাকিবে কি রে চির অন্ধকার?

জাপান জিলণ্ডে নিশি পোহাবে এবার!

যত্ন, আশা, পরিশ্রমে খণ্ডিয়া নিয়তি-ক্রমে,

উঠিয়া প্রবল হতে পাবে না কি আর;—

অই মৃণালের মত সহিবে প্রহার?

না জানি কি আছে ভালে, তাই গো মা এ কাঙ্গালে

:মিশাইছে অশ্রুধারা ভস্মেতে তোমার:—

ভারত কিরণময় হবে কি আবার?

১০

তোরো তরে কাঁদি আয় ফরাসী জননী,

কোমলকুসুম আভা প্রফুল্লবদনী।

এত দিনে বুঝি সতি, ফিরিল কালের গতি,

হল্যে বুঝি দশাহীন ভারত যেমনি!

সভ্যজাতি মাঝে তুমি সভ্যতার খনি।

হলো যবে মহীতলে রোম দগ্ধ কালানলে,

তুমিই উজ্জ্বল করে আছিলে ধরণী,

বীরমাতা প্রভাময়ী সুচিরযৌবনী।

ঐশ্বর্য্যভাণ্ডার ছিলে, কতই যে প্রসবিলে

শিল্প নীতি নৃত্যগীত চকিত অবনী—

তোরো তরে কাঁদি আয় ফরাসী জননী।

বুঝি বা পড়িলে এবে কালের হিল্লোলে,

পদ্মের মৃণাল যথা তরঙ্গের কোলে।

প্রভাত কাল

প্রভাত কাল।

যামিনী পোহায়ে যায়,

ভূষা পরি ঊষা ধায়,

আগেভাগে ছুটে গিয়া পথ সজ্জা করিছে।

অরুণে করিয়া সঙ্গে,

অলক্ত লেপিয়া রঙ্গে

দুই ধারে রাঙা রাঙা ঘন গুলি রাখিছে॥

সুধাকরে কোলে করি,

শ্বেত সাটী দিয়া ধিরি

মধুমাখা মুখ তার স্নেহ ভরে ঢাকিছে।

চন্দ্রের খেলনা গুনি—

তারাপুঞ্জ গুণি গুণি,

অঞ্চলের শেষভাগে একে একে বাঁধিছে॥

তুষিতে দিবার রাজা,

ভাল ভাল মুক্ত মাজা

শ্যাম ধরাতল বুকে সারি সারি গাঁথিছে।

রঞ্জিতে তাঁহারি মন,

প্রমুদিত পুষ্পবন,

তরু পরে থরে থরে ফুলমাল বাঁধিছে॥

বিহগ গাহক তায়,

দিবাকর গুণ গায়,

তার সনে তালে তালে সমীরণ নাচিছে।

জয় দিবাকর বলি,

ঊর্দ্ধমুখে পুটাঞ্জলি,

পূর্ব্বাননে দ্বিজগণ স্তবধ্বনি করিছে॥

বীরবাহু কাব্য হইতে উদ্ধৃত।

প্রলয়

প্রলয়।

ফিরে কি আসিছে প্রলয়ের কাল

নাশিতে পৃথিবী?—ফিরে কি করাল

বাজিবে বিষাণ ভীষণ নিনাদে?

জ্বলন্ত আকাশে বিপুল প্রমাদে

ফিরে কি উঠিবে দ্বাদশ রবি?

ভয়ঙ্কর কথা—ব্রহ্মাণ্ড বিনাশ

করিতে আসিছে প্রচণ্ড হুতাশ—

ভানুর মণ্ডলে তড়িতের শিখা

গিরি চুড়াকৃতি, বায়ু পথে দেখা

দিয়াছে অদ্ভুত অনল ছবি।

স্থিরবায়ু ভেদি তড়িত কিরণ

রাশি স্তূপাকার করিছে গমন

পৃথিবীর দিকে—আকৃতি ভীষণ

দেখিতে অদ্ভুত অনল ছবি।

জ্বলন্ত আকাশে বিপুল প্রমাদে

ফিরে কি উঠিবে দ্বাদশ রবি?

আসিছে অনল ব্রহ্মাণ্ড উজলি,

(দেখেছে শূন্যেতে পণ্ডিতমণ্ডলী)

জগত ব্রহ্মাণ্ড করিবে গ্রাস।

একি ভয়ঙ্কর—বিশ্ব চরাচর,

সোম, শুক্র, বুধ, মহী, শনৈশ্চর,—

বিদ্যুৎ অনলে হবে বিনাশ!

আকাশের গ্রহ, নক্ষত্র মণ্ডলী,

অনলে পুড়িয়া পড়িবে সকলি;

অখিল ব্রহ্মাণ্ড হবে শূন্যময়,

সমুদ্র, পবন, প্রাণী সমুচয়,—

এমন পৃথিবী হবে বিনাশ!

হবে কি বিনাশ এমন পৃথিবী?

অথবা যেমন চন্দ্রমার ছবি,

প্রাণীশূন্য মরু হয়ে চিরকাল,

ভ্রমিবে শূন্যেতে হিমানীর তাল—

মানব বিহঙ্গ কিছু না রবে?

না রবে জলধি, নদনদীজল,

অগাধ সাগর হবে মরুতল,

শীত গ্রীষ্ম ঋতু ফুরাবে সকল,

মানব পতঙ্গ কিছু না রবে?

না রবে মানব—বিপুল মহীতে

মানবের মুখ পাব না দেখিতে,

পাব না দেখিতে জগতের সার

রূপের প্রতিমা, সুখের আধার

রমণীর মুখ—ভবের ভূষণ

বিধাতার চারু মানস সৃজন—

চিরদিন তরে বিলীন হবে।

বিহঙ্গের স্বর, তরঙ্গ নির্ঝর,

কুসুমের আভা, ঘ্রাণ মনোহর,

বালকের হাসি, আধ আধ বোল,

ঘন ঘটাছটা, জলের কল্লোল,

চাঁদের কিরণ, তড়িতের খেলা,

ভানুর উদয়, ভূধরের মেলা,

দেখিতে শুনিতে পাব না আর।

এত যে সাধের এত যে বাসনা,

আশা, অভিলাষ, কিছুই রবে না,

আনন্দ, বিষাদ, ভাবনাকলাপ,

প্রণয়ের সুখ, প্রতাপের তাপ,

ধনের মর্য্যাদা, মানের গৌরব,

জ্ঞানের আস্বাদ, প্রেমের সৌরভ,

কিছু কি রবে না রবে না তার?

বিরলে বসিয়া এ মহীমণ্ডলে,

উজানে ভাসিয়া কালের হিল্লোলে,

আর কি পাব না সে ভাবে ভাবিতে,

আর কি পাব না সে সবে দেখিতে,

নয়নে কাঁদিয়া, স্বপনে ডুবিয়া,

মানসে ভাবিয়া পুলকে পূরিয়া,

যে সবে দেখিতে বাসনা হয়!

শিশু বাল্যকাল যৌবন সরল,

(কখন অমৃত কখন গরল)

কুটিল প্রবীণ মানবজীবন,

লহরী লুকায়ে হবে অদশন,

এ জীবপ্রবাহ—হবে প্রলয়!

এত যে সহস্র জীবের রতন—

দেবের সদৃশ মহামতিগণ

যুগে যুগে যুগে পরাণ সঁপিয়া

আকাশ, জলধি, পৃথিবী খুঁজিয়া

জ্ঞান সঞ্চারিল, মানব জাতিতে

আনন্দ নির্ঝর অজস্র করিতে,—

সকলি কি হায় বৃথায় যাবে?

তবে কি কারণ, বৃথা এ সকল

এ মানব জাতি, এ মহীমণ্ডল,

এমন তপন, তারা, শশধর,

এত সুখ দুঃখ, রূপ মনোহর—

বিধির স্বজন কেন, কি ভাবে?

নাহি কি কোনই অভিসন্ধি তার?—

জীবাত্মা, জীবন, সকলি অসার

এত যে যাতনা, যাতনাই সার—

সুধুই বিধির সাধের খেলা!

তবে ভস্মসাৎ হোক্ রে এখনি

দেহ, পরমায়ু, আকাশ, অবনী,

আঁধারে ডুবিয়া হোক্‌ ছার খার,

কিবা এ ব্রহ্মাণ্ড, জীব জন্তু আর—

চিরদিন তরে যাক্‌ এ বেলা!

এ মানব জাতি, এ মহীমণ্ডল

বৃথা এ সকল—সকলি নিস্ফল—

এই কি বিধির সাধের খেলা!

বিধাতা হে আর করো না সৃজন

এমন পৃথিবী, এমন জীবন;—

কর যদি প্রভূ ধরা পুনর্ব্বার,

মানব সৃজন করো না আর;

আর যেন, দেব, না হয় ভুগিতে

জীবাত্মার সুখ—না হয় আসিতে,

এ দেহ এ মন ধারণ করিতে,

এরূপ মহীতে কখন আর।

গত বৎসর সম্পূর্ণ সূর্য্যগ্রহণকালে ইউরোপীয় পণ্ডিতেরা দেখিয়ছিলেন যে সূর্য্যমণ্ডল হইতে এক অদ্ভুত বিদ্যুতাকৃতি জ্যোতিরেখা নিৰ্গত হইয়া পৃথিবীর দিকে আসিতেছে; প্রায় অৰ্দ্ধেক পথ অতিক্রম করিয়া আসিয়াছে, এবং যেরূপে বেগে আসিতেছে তাহাতে অনতিবিলম্বে পৃথিবীকে আচ্ছন্ন করা সম্ভব। সেই উপলক্ষে ইহা বিরচিত হইয়াছিল।

প্রিয়তমার প্রতি

প্রিয়তমার প্রতি।

প্রেয়সি রে অধীনেরে জনমে কি ত্যজিলে!

এত আশা ভালবাসা সকলি কি ভুলিলে!

অই দেখ নব ঘন গগনে আসিয়ে পুনঃ,

মৃদু মৃদু গরজন গুরু গুরু ডাকিছে।

দেখ পুনঃ চাঁদ আঁকা, ময়ুর খুলিয়ে পাখা,

কদম্বের ডালে ডালে কুতূহলে নাচিছে।

পুনঃ সেই ধরাতল, পেয়ে জল সুশীতল,

স্নেহ করে তৃণদল বুকে করে রাখিছে।

হের প্রিয়ে পুনরায়, পেয়ে প্রিয় বরষায়,

যমুনা-জাহ্ণবী-কায়া উথলিয়া উঠিছে।

চাতক তাপিতপ্রাণ, পুলকে করিয়ে গান,

দেখ রে জলদ কাছে পুনরায় ছুটিছে।

প্রেয়সি রে সুখোদয় অখিল ব্রহ্মাণ্ডময়,

কেবলি মনের দুখে এ পরাণ কাঁদিছে।

অই পুনঃ জলধরে বারিধারা ঝরিল!

লতায় কুসুমদলে, পাতায় সরসীজলে,

নবীন তৃণের কোলে নেচে নেচে পড়িল।

শ্যামল সুন্দর ধরা শোভা দিল মনোহরা,

শীতল সৌরভ ভরা বাসে বায়ু ভরিল,

মরাল আনন্দ মনে ছুটিল কমলবনে,

চঞ্চল মৃণালদল ধীরে ধীরে দুলিল।

বক হংস জলচর ধৌত করি কলেবর,

কেলি হেতু কলরবে জলাশয়ে নামিল।

দামিনী মেঘের কোলে, বিলাসে বসন খোলে,

ঝলকে ঝলকে রূপ আলো করে উঠিল।

এ শোভা দেখাব করে, দেখায়ে সন্তোষ যারে,

হায় সেই প্রিয়তমা অভাগারে ত্যজিল।

ত্যজিবে কি প্রাণসখি? ত্যজিতে কি পারিবে?

কেমনে সে স্নেহলতা এ জনমে ছিঁড়িবে।

সে যে স্নেহ সুধাময়, ঘেরিয়াছে সমুদয়,

প্রকৃতি পরাণ মন, কিসে তাহা ভুলিবে?

আবার শরত এলে, তেমনি কিরণ ঢেলে

হিমাংশু গগনে কিরে আর নাহি উঠিবে?

বসন্তের আগমনে, সেরূপে সন্ধ্যার সনে

আর কি দক্ষিণ হতে বায়ু নাহি বহিবে?

আর কি রজনীভাগে, সেইরূপ অনুরাগে,

কামিনী, রজনীগন্ধ, বেল নাহি ফুটিবে?

প্রাণেশ্বরি! পুনর্ব্বার, নিশীথে নিস্তব্ধ আর

ধরাতল সেইরূপে নাহি কি রে থাকিবে?

জীবজন্তু কেহ কবে, কখন কি কোন রবে,

ভুলে অভাগার নাম কণ্ঠেতে না আনিবে?

প্রেয়সি রে সুধাময়, স্নেহ ভুলিবার নয়,

কাঁদালি কাঁদিলি সুধু পরিণামে জানিবে!

অই দেখ প্রিয়তমে বারিধারা ধরিল।

শরতে সুন্দর মহী সুধা মাখি বসিল।

হরিত শস্যের কোলে, দেখ রে মঞ্জরী দোলে,

ভানুছটা তাহে কিবা শোভ দিয়া পড়েছে!

বহিলে মৃদুল বায়, ঢলিয়ে পড়িছে তায়,

তটিনীতরঙ্গলীলা অবনীতে ছুটেছে।

গোঠে গাভী বৃষ সনে, চরিছে আনন্দ মনে,

হরষিত তরুলতা ফলেফুলে সেজেছে।

সরোবরে সরোরুহ, কুমুদ কহ্লার সহ,

শরতে সুন্দর হয়ে শোভা দিয়ে ফুটেছে।

আচম্বিতে দরশন, ঘনঘন গরজন,

উড়িয়ে অম্বরে মেঘ ডেকে ডেকে চলেছে।

প্রেয়সি রে মনোহরা, এমন সুখের ধরা,

বিহনে তোমার আজি অন্ধকার হয়েছে!

আহা কি সুন্দর বেশ সন্ধ্যা অই আইল!

ভাঙা ভাঙা ঘনগুলি, ভানুর কিরণ তুলি

পশ্চিম গগনে আসি ধীরে ধীরে বসিল।

অস্তগিরি আলো করি, বিচিত্র বরণ ধরি,

বিমল আকাশে ছটা উথলিয়া পড়িল।

গোধূলিকিরণমাখা, গৃহচূড়া তরুশাখা,

প্রেয়সি রে মনোহর মাধুরীতে পূরিল।

কাদম্বিনী ধীরে ধীরি, হয়, তরু, গজ, গিরি,

আঁকিয়ে সুন্দর করি ছড়াইতে লাগিল!

দেখ প্রিয়ে শ্বেত আভা গঙ্গাজলে কিবা শোভা,

সুবর্ণের পাতা যেন ছড়াইয়া পড়িল।

কৃষক মঞ্চের পরে উঠিল আনন্দ ভরে,

চঞ্চুপুটে শস্য ধরে নভশ্চর ফিরিল।

এ সুখ সন্ধ্যায় প্রিয়ে, সাধে জলাঞ্জলি দিয়ে,

শূন্য দেহে নিরাসনে এ অভাগা রহিল।

আজি এ পূর্ণিমা নিশি প্রিয়ে কারে দেখাবে।

কার সনে প্রিয়ভাষে দেহ মন জুড়াবে!

এখনি যে সুধাকর, পূর্ণবিম্ব মনোহর,

পূর্ব্বদিকে পরকাশি সুধারাশি ছড়াবে।

এখনি যে নীলাম্বরে, শ্বেতবর্ণ থরে থরে,

আসিয়ে মেঘের মালা সুধাকরে সাজাবে।

তরুগিরি মহীতল শিশির আকাশ জল,

চাঁদের কৌমুদী মাখা কারে আজি দেখাবে!

প্রেয়সি অঙ্গুলি তুলি কুসুম কলিকাগুলি,

শিশিরে ফুটিছে দেখি কারে আজি সুধাবে—

“অই দেখ চক্রবাক, ডাকে অমঙ্গল ডাক’’

বলে সুধাইবে কারে, কে বাসনা পূরাবে!

তনু মন সমর্পণ, করেছিল সেই জন,

তারে কাঁদাইলে, হায়, প্রণয় কি জুড়াবে!

বিধবা রমণী

বিধবা রমণী।

ভারতের পতিহীনা নারী বুঝি অই রে!

না হলে এমন দশা নারী আর কই রে?

মলিন বসন-খানি অঙ্গে আচ্ছাদন,

আহা দেখ অঙ্গে নাই অঙ্গের ভূষণ!

রমণীর চির-সাধ চিকুর বন্ধন,

হ্যাদে দেখ সে সাধেও বিধি-বিড়ম্বন!

আহাঁ, কি চাঁচরকেশ পড়েছে এলায়ে!

আহা, কি রূপের ছটা গিয়েছে মিলায়ে!

কি নিতম্ব কিবা ঊরু, কিবা চক্ষু কিবা ভুরু,

কি যৌবন মরি মরি শোকে দগ্ধ হয় রে!

কুসুম চন্দনে আর নাহি অভিলাষ;

তাম্বুল কর্পূরে আর নাহি সে বিলাস;

বদনে সে হাসি নাই, নয়নে সে জ্যোতিঃ;

সে আনন্দ নাই আর মরি কি দুর্গতি!

হরিষ বিষাদ এবে তুল্য চিরদিন;

বসন্ত শরত ঋতু সকলি মলিন!

দিবানিশি একি বেশ, বারমাস সেই ক্লেশ;

বিধবার প্রাণে হায় এতই কি সয় রে!

হায় রে নিষ্ঠুর জাতি পাষাণ-হৃদয়,

দেখে শুনে এ যন্ত্রণা তবু অন্ধ হয়;

বালিকা যুবতী ভেদ করে না বিচার,

নারী বধ করে তুষ্ট করে দেশাচার।

এই যদি এ দেশের শাস্ত্রের লিখন,

এ দেশে রমণী তবে জন্মে কি কারণ?

পুরুষ দুদিন পরে, আবার বিবাহ করে,

অবল রমণী বলে এতই কি সয় রে?

কেঁদেছি অনেক দিন কাঁদিব না আর;

পূরাইব হৃদয়ের কামনা এবার।—

ঈশ্বর থাকেন যদি করেন বিচার

করিবেন এ দৌরাত্ম্য সমুলে সংহার;

অবিলম্বে হিন্দুধর্ম্ম ছারখার হবে

হিন্দুকুলে বাতি দিতে কেহ নাহি রবে!

দেখ্‌ রে দুর্ম্মতি যত চিরম্লেচ্ছপদানত—

বিধবার শাপে হায় এ দুর্গতি হয় রে।

হায় রে আমার যদি থাকিত সম্পদ,

মিটাতাম চিরদিন মনের যে সাধ;

সোণার প্রতিমা গড়ে বিধবা নারীর

রাখিতাম স্থানে স্থানে ভারতভূমির;

বিদেশের স্ত্রী পুরুষ এদেশে আসিত,

পতিব্রতা বলে কারে নয়নে হেরিত।

লিখিতাম নিম্নদেশে, “কি স্বদেশে কি বিদেশে,

রমণী এমন আর ধরাতলে নাই রে”

সে ধন সম্পদ নাই দরিদ্র কাঙ্গাল,

অনাথ-বিধবা-দুঃখ রবে চিরকাল

আমার অন্তরে গাঁথা; যখনি দেখিব

সুগন্ধ কুসুমে কীট তখনি কাঁদিব;

রাহুগ্রাসে শশধর, নক্ষত্র পতন

যখনি দেখিব, হায়, করিব স্মরণ

বিধবা নারীর মুখ! হায় রে বিদরে বুক,

ইচ্ছা করে জন্মশোধ দেশত্যাগী হই রে।

ভারতের পতিহীনা নারী বুঝি আই রে॥

ভারত কামিনী

ভারত কামিনী।

আরে কুলাঙ্গার হিন্দু দুরাচার—

এই কি তোদের দয়া, সদাচার?

হয়ে আর্য্যবংশ—অবনীর সার

রমণী বধিছ পিশাচ হয়ে!

এখনও ফিরিয়া দেখনা চাহিয়া

জগতের গতি ভ্রমেতে ডুবিয়া—

চরণে দলিয়া মাতা, সুতা, জায়া,

এখনো রয়েছ উন্মত্ত হয়ে?

বাঁধিয়া রেখেছ বামা রাশি রাশি

অনাথ করিয়া—গলে দিয়া ফাঁসি,

কাড়িয়া লয়েছ কবরী, কঙ্কণ,

হার, বাজু, বালা, দেহের ভূষণ—

অনন্ত দুখিনী বিধবা নারী।

দেখ রে নিষ্ঠুর, হাতে লয়ে মালা

কুলীন সধবা অনূঢ়া অবলা

আছে পথ চেয়ে পতির উদ্দেশে,

অসংখ্য রমণী পাগলিনী বেশে—

কেহ বা করিছে বরমাল্য দান

মুমূর্ষুর গলে হয়ে ম্রিয়মাণ

নয়নে মুছিয়া গলিত বারি!

চারিদিকে হেথা ভারত যুড়িয়া,

সরলীকমল যেন রে ছিঁড়িয়া—

কামিনীমণ্ডলী রেখেছ তুলিয়া—

কোমল হৃদয় করেছ হতাশ,

না দেখিতে দেও অবনী আকাশ—

করে কারাবাস জগতে রয়ে।

আরে কুলাঙ্গার, হিন্দু দুরাচার—

এই কি তোদের দয়া, সদাচার?

হয়ে আর্য্যবংশ, অবনীর সার

রমণী বধিছ পিশাচ হয়ে?

এখনও ফিরিয়া দেখনা চাহিয়া

জগতের গতি ভ্রমেতে ডুবিয়া—

চরণে দলিছ মাতা, সুতা, জায়া,

ছড়ায়ে কলঙ্ক পৃথিবী মাঝে।—

দেখ না কি চেয়ে জগত উজ্জ্বল

এই সে ভারত, হিমানী অচল,

এই সে গোমুখী, যমুনার জল,

সিন্ধু, গোদাবরী সরযূ সাজে?

জান না কি সেই অযোধ্যা, কোশল,

এই খানে ছিল, কলিঙ্গ পঞ্চাল,

মগধ, কনৌজ,—সুপবিত্র ধাম

সেই উজ্জয়িনী, নিলে যার নাম

ঘুচে মনস্তাপ কলুষ হরে?

এই রঙ্গভূমে করেছিল লীলা

আত্রেয়ী, জানকী, দ্রৌপদী সুশীলা,

খনা, লীলাবতী প্রাচীন মহিলা—

সাবিত্রী ভারত পবিত্র করে।

এই আর্য্যভূমে বাঁধিয়া কুন্তল

ধরিয়া কৃপাণ কামিনী সকল,

প্রফুল্ল স্বাধীন পবিত্র অন্তরে

নিঃশঙ্ক হৃদয়ে ছুটিত সমরে—

খুলে কেশপাশ দিত পরাইয়া

ধনুদণ্ডে ছিলা আনন্দে ভাসিয়া—

সমর-উল্লাসে অধৈর্য্য হয়ে—

কোথা সে এখন অসিভল্লধার

মহারাষ্ট্র বামা, রাজোয়ার নারী?

অরাতি বিক্রমে পরাজিত হলে

চিতানলে যারা তনু দিত ঢেলে

পতি, পিতা, সুত, সংহতি লয়ে।

বীরমাতা যার বীরাঙ্গনা ছিল,

মহিমা কিরণে জগত ভাতিল—

কোথা এবে তারা—কোথা সে কিরণ?

আনন্দ কানন ছিল যে ভুবন

নিবিড় অটবী হয়েছে এবে!

আর কি বাজে সে বীণা সপ্তস্বরা

বিজয় নিনাদে বসুন্ধরা ভরা?

আর কি আছে সে মনের উল্লাস,

জ্ঞানের মর্য্যাদা, সাহসবিভাস

সে সব রমণী কোথা রে এবে?

সে দিন গিয়াছে—পশুর অধম

হয়েছে ভারতে নারীর জনম;

নৃশংস আচার, নীচ দুরাচার

ভারত ভিতরে যত কুলাঙ্গার

পিশাচের হেয় হয়েছে সবে।

তবে কেন আজও আছে ঐ গিরি

নাম হিমালয়, শৃঙ্গ উচ্চে ধরি?

তবে কেন আজও করিছে হুঙ্কার

ভারত বেষ্টিয়া জলধি দুর্ব্বার?

কেন তবে আজও ভারত ভিতরে

হিন্দুবংশাবলী শুনে সমাদরে

ব্যাস বালমীকি, বারিধারা ঝরে

সীতা, দময়ন্তী, সাবিত্রী রবে?—

গভীর নিনাদে করিয়ে ঝঙ্কার,

বাজ্‌ রে বীণা বাজ্‌ একবার,

ভারতবাসীরে শুনায়ে সবে।

দেখ্‌ চেয়ে দেখ্‌ হোথা একবার—

প্রফুল্ল কোমল কুসুম আকার

য়ুনানী মহিলা হয় পারাপার

অকূল জলধি অকুতোভয়ে।

ধায় অশ্বপৃষ্ঠে অশঙ্কিত চিতে

কানন, কন্দর, উন্নত গিরিতে—

অপ্সরা আকৃতি পুরুষ সেবিতা

সাহিত্য, বিজ্ঞান, সঙ্গীতে ভূষিতা—

স্বাধীন প্রভাতে পবিত্র হয়ে।

আর কি ভারতে ওরূপে আবার

হবে রে অঙ্গনা-মহিমা প্রচার?—

পেয়ে নিজ মান, পরে নিজ বেশ

জ্ঞান, দত্ত তেজে পূরে নিজ দেশ,—

বীর বংশাবলী প্রসূতি হবে?

এহেন প্রকাণ্ড মহীখণ্ড মাঝে

নাহি কিরে কোন বীরাত্মা বিরাজে—

এখনি উঠিয়া করে খণ্ড খণ্ড

সমাজের জাল করাল প্রচণ্ড—

স্বজাতি উজ্জ্বল করিয়া ভবে?

চৈতন্য গৌতম নাহি কিরে আর,

ভারত সৌভাগ্য করিতে উদ্ধার?—

ঋষি বিশ্বামিত্র, রাঘব, পাণ্ডব,

কেন জন্মেছিলা মহাত্মা সে সব—

ভারত যদি না উন্নত হবে?

ধিক্ হিন্দুজাতি হয়ে আর্য্যবংশ,

নরকণ্ঠহার নারী কর ধংস!

ভুলে সদাচার, দয়া, সদাশয়,

কর আর্যভূমি পূতিগন্ধময়,

ছড়ায়ে কলঙ্ক পৃথিবী মাঝে!—

দেখ না কি চেয়ে জগত উজ্জ্বল

এই সে ভারত, হিমানী অচল,

এই সে গোমুখী, যমুনার জল,

সিন্ধু, গোদাবরী, সরযূ সাজে?

জান না কি সেই অযোধ্যা, কোশল

এই খানে ছিল কলিঙ্গ পঞ্চাল?

মগধ, কনৌজ,—সুপবিত্র ধাম

সেই উজ্জয়িনী—নিলে যার নাম

ঘুচে মনস্তাপ, কলুষ হরে?

এই রঙ্গভূমে করেছিল লীলা

আত্রেয়ী, জানকী, দ্রৌপদী সুশীলা,

খনা, লীলাবতী প্রাচীন মহিলা—

সাবিত্রী, ভারত পবিত্র করে?—

অরে কুলাঙ্গার হিন্দু দুরাচার—

এই কি তোদের দয়া, সদাচার?

হয়ে আর্য্যবংশ, অবনীর সার

রমণী বধিছ পিশাচ হয়ে?

এখনও ফিরিয়া দেখ না চাহিয়া

জগতের গতি ভ্রমেতে ডুবিয়া—

চরণে দলিয়া মাতা, সুতা, জায়া

এখনও রয়েছ উন্মত্ত হয়ে?

সমাপ্ত।

অর্থাৎ ইউরোপীয়

ভারত বিলাপ

ভারত বিলাপ।

ভানু অস্ত গেল, গোধুলি আইল;—

রবি-কর-জাল আকাশে উঠিল,

মেঘ হ’তে মেঘে খেলিতে লাগিল,

গগন শোভিল কিরণজালে;—

কোথা বা সুন্দর ঘন কলেবর

সিন্দূরে লেপিয়া রাখে থরেথর,

কোথা ঝিকি ঝিকি হীরার ঝালর

যেন বা ঝুলায় গগন ভালে।

সোণার বরণ মাখিয়া কোথায়

জলধর জ্বলে—নয়ন জুড়ায়,

আবার কোথায় তুলারাশি প্রায়

শোভে রাশি রাশি মেঘের মালা।

হেনকালে একা গিয়া গঙ্গাতীরে

হেরি মোনহর সে তট উপরে

রাজধানী এক, নব শোভা ধরে,

রয়েছে কিরণে হয়ে উজলা।

দ্বিতালা ত্রিতালা চৌতালা ভবন,

সুন্দর সুন্দর বিচিত্র গঠন,

রাজবর্ত্ম পাশে আছে সুশোভন—

গোধূলি রাগেতে রঞ্জিত কায়।

অদূরে দুর্জ্জয় দুর্গ গড়খাই,

প্রকাণ্ড মুরতি, জাগিছে সদাই,

বিপক্ষ পশিবে হেন স্থান নাই—

চরণ প্রক্ষালি জাহ্নবী ধায়।

গড়ের সমীপে আনন্দউদ্যান,

যতনে রক্ষিত অতি রম্যস্থান,

প্রদোষে প্রত্যহ হয় বাদ্যগান,

নয়ন, শ্রবণ, তনু জুড়ায়।

জাহ্ণবী সলিলে এদিকে আবার

দেখ জলযান কাতারে কাতার

ভাসে দিবানিশি—গুণবৃক্ষ যার

শালবৃক্ষ ছাপি ধ্বজা উড়ায়।

অহে বঙ্গবাসি জান কি তোমরা?

অলকা জিনিয়া হেন মনোহরা

কার রাজধানী? কি জাতি ইহারা?—

এ সুখ সৌভাগ্য ভোগে ধরায়।

নাহি যদি জান, এসো এই খানে,

চলেছে দেখিবে বিচিত্র বিমানে

রাজপুরুষের বিবিধ বিধানে—

গরবে মেদিনী ঠেকে না পায়।

অদূরে বাজিছে। “রুল বৃট্যানিয়া,”

শকটে শকটে মেদিনী ছাইয়া

চলেছে দাপটে বৃটনবাসীয়া—

ইন্দ্রের ইন্দ্রত্ব আছে কোথায়!

হায় রে কপাল, ওদেরি মতন

আমরাই কেন করিতে গমন

না পারি সতেজে—বলিতে আপন

যে দেশে জনম, যে দেশে বাস?

ভয়ে ভয়ে যাই, ভয়ে ভয়ে চাই,

গৌরাঙ্গ দেখিলে ভূতলে লুটাই,

ফুটিয়ে ফুকারি বলিতে না পাই—

এমনি সদাই হৃদয়ে ত্রাস।

কি হবে বিলাপ করিলে এখন,

হিন্দুকুললক্ষ্মী গিয়াছে যখন,

মনের মাহাত্ম্য হয়েছে নিধন—

তখনি সে সাধ ঘুচে গিয়াছে।

সাজে না এখন অভিলাষ করা—

আমাদের কাজ সুধু পায়ে ধরা—

শিরেতে ধরিয়া কলঙ্ক পসরা

ছুটিতে হইবে ওদেরি পাছে!

হায় বসুন্ধরা তোমার কপালে

এই কি ছিল মা, উদয়ের কালে

জগত কাঁদায়ে কিরণ ডুবালে—

পূরাতে নারিলে মনের আশা।

রূপে অনুপম নিখিল ধরায়

করিয়া বিধাতা সৃজালা তোমায়—

দিলা সাজাইয়া অতুল ভূষায়—

তোর কি না আজি এ হেন দশা!

হায় রে বিধাতা, কেন দিয়াছিলি

হেন অলঙ্কার? কেন না গঠিলি

মরুভূমি করে—অরণ্যে রাখিলি,

এ হেন যাতনা হতো না তায়!

পারস্য পাঠান মোগল জাতি

হরিতে ভারত কিরীটের ভাতি

আসিত না হেথা, করিতে দুর্গতি—

অভাগা হিন্দুরে দলিতে পায়!

এই যে দেখিছ পুরী মনোহর

শতগুণ আরো শোভিত সুন্দর,

এই ভাগীরথী করে থরে থর

ধাইত তখন কতই সাধে!

গাইত তখন কতই সুস্বরে

এই সব পাখী তরু শোভা করে,

কতই কুসুম পরিমল ভরে

ফুটিয়া থাকিত কত আহ্লাদে।

আগেকার মত উঠিত তপন,—

আগেকার মত চাঁদের কিরণ

ভাসিত গগনে—গ্রহ তারাগণ

ঘুরিত আনন্দে ঘেরিয়া ধরা;—

যখন ভারতে অমৃতের কণা

হতো বরিষণ, বাজাইত বীণা

ব্যাস বাল্‌মীকি—বিপুল বাসনা

ভারত হৃদয়ে আছিল ভরা।

যখন ক্ষত্রিয় অতীব সাহসে

ধাইত সমরে মাতি বীর-রসে,

হিমালয়চুড়া গগন পরশে

গাইত যখন ভারত নাম।

ভারতবাসীরা প্রতি ঘরে ঘরে

গাইত যখন স্বাধীন অন্তরে

স্বদেশ মহিমা পুলকিত স্বরে,—

জগতে ভারত অতুল ধাম।

ধন্য বৃট্যানিয়া ধন্য তোর বল,

এ হেন ভূভাগ করে করতল,

রাজত্ব করিছ ইঙ্গিতে কেবল—

তোমার তেজের নাহি উপমা।

এখন কিঙ্কর হয়েছি তোমার

মনের বাসনা কি কহিব আর,

এই ভিক্ষা চাই করো গো বিচার—

অথর্ব্ব দাসীরে করে গো ক্ষমা।

দেখ্‌ চেয়ে দেখ্‌ প্রাচীন বয়েসে

তোর পদতলে পড়িয়ে কি বেশে

কঁদিছে সে ভূমি, পূজিত যে দেশে

কত জনপদ গাহি মহিমা।

আগে ছিল রাণী—ধরা রাজধানী,

স্মরণে যেন গো থাকে সে কাহিনী,

এবে সে কিঙ্করী হয়েছে দুখিনী

বলিয়ে দম্ভ করো না গরিমা।

তোমারো ত বুকে কত কত বার

রিপু পদাঘাত করেছে প্রহার

কালেতে না জানি কি হবে আবার

এই কথা সদা করো গো মনে।

পেয়েছ অমূল্য রতন ধরার

করো না ইহারে চরণে প্রহার—

দিও না যাতনা ভারত প্রাণে।

মদনপারিজাত

মদনপারিজাত।

[একাদশ খৃষ্টাব্দে ফরাসীদেশে আবেলার্ড নামক একজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত ছিলেন। তিনি তর্কশাস্ত্র অধ্যাপনা করাইয়া প্রভূত যশস্বী হন। অন্যান্য শিষ্যের ন্যায় ইলইজা নাম্নী এক সম্ভ্রান্ত কন্যা তাহার নিকট অধ্যয়ন করিতেন। এই কামিনী অত্যন্ত রূপবতী এবং বুদ্ধিমতী ছিলেন। ক্রমে গুরুশিষ্যের ভাবান্তর হইয়া উভয়ের প্রতি উভয়ের আসক্তি জন্মে, এবং সেই কলঙ্ক দেশমধ্যে প্রচারিত হয়। তাহাতে ইলইজার পিতৃব্য অসহ্য রোষপরতন্ত্র হইয়া ইলইজাকে একটী কনভেণ্টে আবদ্ধ করিয়া রাখেন, এবং আবেলার্ডকে ক্ষতদেহ করিয়া অবমানিত করেন। রোমান কাথলিকদিগের মধ্যে সংসারবিরাগী-ধর্ম্মাকাঙ্ক্ষী স্ত্রীপুরুষগণ যে আশ্রমে বাস করে, তাহার নাম কনভেণ্ট। ইলইজা সেই আশ্রমে অবরুদ্ধ হইয়া বহু কষ্টে দিনপাত করিত। এবং আবেলার্ডও প্রাগুক্ত রূপে অবমানিত হইবার পর সংসারে বিরাগী হইয়া অন্য এক আশ্রমে প্রস্থান করেন। ইহাদিগের পরস্পরের প্রণয়ঘটিত উপাখ্যান ইউরোপীয় নানা ভাষায় আছে। আলেকজন্দর পোপ নামক একজন ইংরাজী কবি এই উপাখ্যান অবলম্বনে একটী কবিতা লেখেন; তদ্দৃষ্টে “মদনপারিজাত” নাম দিয়া নিম্নোক্ত কবিতা লিখিত হইয়াছে।]

ত্যজিয়ে সংসারধর্ম্ম তপস্বিনী হয়েছি,

মায়ামোহ আশাতৃষ্ণা বিসর্জ্জন দিয়েছি!

পরিয়ে বল্‌কল সাজ কমণ্ডলু করে,

ধরেছি কঠোর ব্রত কানন ভিতরে।

দিবাসন্ধ্যা পূজা ধ্যান দেব-আরাধনা

করি, তবু মনে কেন হয় সে ভাবনা?

যার জন্যে দেশত্যাগী কেন পুনরায়

অশান্ত হৃদয় হেন তারি দিকে ধায়?

কেন রে উন্মাদমন কেন দিলি তুলে

যে বাসনা এত দিন আছিলাম ভুলে?

জ্বালাতে নির্ব্বাণ বহ্নি কেন দিলি দেখা

অরে সুধাময় লিপি দয়িতের লেখা?

আয় তোরে বুকে রাখি বহু দিন পরে

পেয়েছি নাথের লেখা অমৃত অক্ষরে!

এজগতে ভালবাসা ভুলিবার নয়,

মদনের পারিজাত ব্রহ্মাণ্ড ঘোষয়!

ক্ষমা কর যোগী ঋষি জিতেন্দ্রিয় জন,

ক্ষমা কর সতী সাধ্বী তপস্বিনীগণ!

অয়ি শান্ত সুপবিত্র আশ্রমমণ্ডল,

তরু, বারি, লতা, পত্র যথায় নির্ম্মল,

নিষ্পাপ নিষ্কাম চিন্তা যথায় নিয়ত

পরমার্থ ধ্যানে মুগ্ধ আনন্দে জাগ্রত,

ক্ষমা কর এ দাসীরে, কলুষচিন্তায়

কলুষিত করিলাম তোমা সবাকায়।

আসিলাম যবে হেথা করে মহাব্রত

ভাবিলাম হব শীঘ্র তোমাদেরি মত;

ধবল শিলার সম স্বেদক্লেদহীন,

ধবল শিলার সম মমতাবিহীন।

কই হলো? অসাধ্য সে পবিত্র কামনা;

জীবিত থাকিতে, নাথ, যাবে না বাসনা।

অর্দ্ধেক দিয়াছি প্রাণ ঈশ্বর সেবিতে,

অর্দ্ধেক রেখেছি, হায়, নাথেরে পূজিতে।

অনাহার জাগরণে হলো দেহ ক্ষয়,

তবু দেখ স্বভাবের গতিরোধ নয়।

কাটালাম এতকাল সন্তাপে সস্তাপে,

সে নাম দেখিবামাত্র তবু চিত্ত কাঁপে।

কাঁপিতে কাঁপিতে নাথ খুলি এ লিখন;

প্রতি ছত্রে করিতেছি অশ্রু বিসর্জ্জন।

যেখানে তোমার নাম দেখি, প্রাণেশ্বর,

সেইখানে কেঁদে উঠে আমার অন্তর!

কতই আনন্দ আর কতই বিষাদ

আছে ও মধুর নামে কে জানে আস্বাদ।

কত বার ধীরে ধীরে করি উচ্চারণ,

কত বার ফিরে ফিরে করি নিরীক্ষণ।

ফেলি কত দীর্ঘশ্বাস সে সব স্মরিয়ে

আছি হেথা একাকিনী সে সব ত্যজিয়ে।

যেখানে আমার নাম দেখিবারে পাই,

সেইখানে, প্রাণনাথ, আতঙ্কে ডরাই।

পাছে কোন অমঙ্গল সঙ্গে থাকে তার,

অমঙ্গল হেতু, নাথ, আমি হে তোমার।

না পারি পড়িতে আর, সহে না হৃদয়;

শোকের সমুদ্র হেরি চতুর্দ্দিকময়।

অদৃষ্টে কি এই ছিল সেই ভালবাসা

এইরূপে হলো শেষ, শেষে এই দশা!

সে যশ-পিপাসা আর সে হেন প্রণয়

পত্রের কুটীরে হলো এইরূপে লয়।

যত পার হেন লিপি লিখ তবু নাথ,

করিব তোমার সঙ্গে শোক-অশ্রুপাত,

মিশাইব দীর্ঘশ্বাস তোমার নিশ্বাসে,

কাঁদিব তোমার সঙ্গে চিত্তের উন্নাসে;

ঘুচাইতে এ যন্ত্রণা সাধ্য নাই কার,

তাই নিবেদন করি লিখ যত পার।

অনাথা দুঃখীর দুঃখ করিতে সাত্ত্বনা

হয়েছে লিপির সৃষ্টি বিধির বাসনা।

বুঝি কোন নির্ব্বাসিত পুরুষপ্রেমিক,

অথবা রমণী কোন প্রেমের পথিক,

ঘুচাতে বিচ্ছেদজ্বালা আরাধনা করে

শিখেছিল এ কৌশল বিধাতার বরে।

প্রাণভোরে অন্তরের কথা প্রকাশিতে

এমন উপায় আর নাই এ মহীতে।

নাসা, কণ্ঠ, চক্ষু কিম্বা ওষ্ঠে যাহা নয়,

লিপির অক্ষরে ব্যক্ত হয় সমুদয়।

খুলে দেয় একেবারে প্রাণের কপাট,

ধারে না লজ্জার ধার, থাকে না ঝঞ্ঝাট।

উদয়-ভূধর হতে অস্তাচলে যায়,

প্রণয়ী জনের কথা গোপনে জানায়।

জান ত হে প্রিয়তম! প্রথমে কেমন

সখাভাবে কত ভক্তি করেছি যতন।

জানি নাই প্রথম সে প্রেমের সঞ্চার

ভাবিতাম যেন কোন দেবের কুমার;

ঈশ্বর আপনি যেন স্বহস্তে করিয়া

নির্ম্মাণ করিলা তোমা নিজ রশ্মি দিয়া;

সুধাংশুর অংশু যেন করে একত্রিত,

সহাস্য নয়নে তব করিলা স্থাপিত।

নেত্রে নেত্রে মিলাইয়া স্থিরদৃষ্টি হয়ে

দেখিয়াছি কতবার পবিত্র হৃদয়ে।

গাহিতে যখন তুমি অমর শুনিত

কি মধুর শাস্ত্রালাপ বদনে ক্ষরিত!

সে সুস্বরে কার মনে না হয় প্রত্যয়—

প্রেমেতে নাহিক পাপ ভাবিনু নিশ্চয়।

ভক্তি ছিঁড়ে পড়িলাম ইন্দ্রিয়কুহকে

ভজিনু নাগর ভাবে প্রাণের পুলকে।

দেবপুত্র ভাবিতাম, তা হোতে অধিক

প্রিয়তম হলে নাথ হইয়ে প্রেমিক।

তোমা হেন কান্ত যদি মর্ত্তভূমে পাই,

ঋষি হয়ে স্বর্গসুখ ভুঞ্জিতে না চাই।

যে ভাবে অধিক সুখ সে যাক সেখানে,

আমি যেন তোমা লয়ে থাকি এ ভুবনে।

অয়ি নাথ! কত জন, আছে ত স্মরণ,

বলেছিল পতিভাবে করিতে বরণ;

তখনি দিয়াছি শাপ হোক্‌ বজ্রাঘাত,

পরিণয় সংস্কার যাক্‌ রে নিপাত।

হাতে সুতো বেঁধে কভু প্রেমে বাধা যায়?

বন্ধন দেখিলে প্রেম তখনি পলায়।

স্বাধীন মকরকেতু, স্বাধীন প্রণয়,

না বুঝে অবোধ লোক চাহে পরিণয়।

পরিণয়ে ধন হয়, নাম হয়, যশ,

প্রণয় নহেক ধন বিভবের বশ।

ভূমণ্ডলপতি যদি চরণে আমার

ধরে দেয় ভূমণ্ডল, সিংহাসন তার,

তুচ্ছ করে দূরে ফেলি; মনে যদি ধরে

ভিকারীর দাসী হয়ে থাকি তার ঘরে।

যে রমণী সে সৌভাগ্য ভুঞ্জে চিরকাল

কত ভাগ্যবতী সেই, হায় রে কপাল!

কিবা সুধাময় সেই সুখের সময়,

সুখের সাগর যেন উচ্ছসিত হয়।

পরাণে পরাণ বাঁধা প্রণয়ের ভরে,

পরিপূর্ণ পরিতোষ প্রেমীর অন্তরে।

আশার থাকে না ক্ষোভ, ভাষার যোজনা

হৃদয়ে হৃদয়ে কথা প্রকাশে আপনা।

সেই সুখ—সুখ যদি থাকে মহীতলে—

পারিজাত মদনের ছিল কোন কালে।

সে সুখের দিন এবে কোথায় গিয়েছে,

কোথা পারিজাত কোথা মদন রয়েছে!

কি হলো কি হলো হয় একি সর্ব্বনাশ,

নাথের দুর্দ্দশা এত, কোরে নগ্নবাস

কে করিল অস্ত্রাঘাত! কোথায় তখন

ছিল দাসী পারিজাত অভাগী দুর্জন?

সেই দণ্ডে, প্রাণনাথ, তীক্ষ্ণ অস্ত্র ধরে

নিবারণ করিতাম পাষণ্ড বর্ব্বরে।

দুজনে করেছি পাপ দুজনে সহিব

লজ্জা করে, প্রাণনাথ, কি আর বলিব।

অশ্রু বিসর্জ্জনে এবে মিটাই সে সাধ;

দগ্ধ বিধি ঘটাইলি ঘোর পরমাদ!

আনিল আমায় হেথা যে বিষম দিনে,

বসাইল ধরাতলে পবিত্র অজিনে,

পরাইল বৃক্ষছাল দণ্ড দিল হাতে,

ভাব কি সে দিন আমি ভুলেছিনু নাথে?

প্রাণেশ্বর, চারিদিকে ঋষিগণ যত

করে মন্ত্র উচ্চারণ আমি ভাবি তত

তোমার বদন-ইন্দু, তোমার লোচন,

মনে মনে করি তব গুণেরি কীর্ত্তন;

নয়নের কোণে মাত্র বেদী পানে চাই

মনে সুধু কিসে পুনঃ ফিরে কাছে যাই।

যৌবন রূপের ঘটা তখনো অতুল,

হেরে চমৎকৃত হলো যত ঋষিকুল;

সংশয়ে বিস্ময়ে ভাবে এ হেন বয়সে

রমণী ইচ্ছায় কভু আশ্রমে কি আসে?

সত্য ভেবেছিলা তারা মিথ্যা কথা নয়—

যুবতীর যোগ ধর্ম্ম মিথ্যা সমুদয়।

যাই হোক্‌, নাই হবে গতি মুক্তি মম

বারেক নিকটে এস অহে প্রিয়তম।

সেই রূপে নয়নের বিষাক্ত অমৃত

করি পান মনসাধে হব বিমোহিত,

অধরে অধর দিয়ে হয়ে অচেতন

মূর্চ্ছাভাবে বক্ষঃস্থলে দেখিব স্বপন।

না না না, দুরন্ত আশা হও রে অন্তর,

এসো নাথ ধর্ম্মপথে লও হে সত্বর,

পুণ্যধামে পুণ্যজন যে আনন্দ পায়

শিখাও এ অভাগীরে, স্নিগ্ধ কর কায়।

আহা এই শুদ্ধ শান্ত আশ্রম ভিতরে

কতই পুণ্যাত্মা জীব আনন্দে বিহরে;

তরু লতা আদি হেথা সকলি নির্ম্মল,

সকলেই ভক্তিরসে সদাই বিহ্বল।

পর্ব্বত শিখর গুলি সুন্দর কেমন

উঠিয়াছে চারিধারে মেঘের বরণ;

শাল, তাল, তমালের তরু সারি সারি

শুনাইছে মৃদুস্বর দিবস শর্ব্বরী;

সুর্য্যকরে দীপ্ত হয়ে স্রোতকুল যত

শিখরে শিখরে আহা ভ্রমে অবিরত;

করে কুলুকুলু ধ্বনি গিরিপ্রস্রবণ,

গুহার ভিতরে আহা মধুর শ্রবণ।

সন্ধ্যা সমীরণে এই হ্রদের উপরে

তরঙ্গ খেলায় যবে কিবা শোভা ধরে।

হেন স্নিগ্ধ তপোবন ভিতরে আমার

ঘুচিল না এ জনমে ইন্দ্রিয় বিকার।

হে বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডপতি করুণা নিদান,

করুণা কটাক্ষপাতে কর পরিত্রাণ।

দেও, দেব, দেখাইয়ে মুক্তির আলয়,

ভক্তি ভাবে লইলাম তোমারি আশ্রয়।

যমুনাতটে

যমুনাতটে।

আহা কি সুন্দর নিশি, চন্দ্রমা উদয়,

কৌমুদীরাশিতে যেন ধৌত ধরাতল

সমীরণ মৃদু মৃদু ফুলমধু বয়,

কল কল করে ধীরে তরঙ্গিণী জল!

কুসুম, পল্লব, লতা নিশার তুষারে

শীতল করিয়া প্রাণ শরীর জুড়ায়,

জোনাকির পাঁতি শোভে তরু শাখাপরে,

নিরবিলি ঝিঁ ঝিঁ ডাকে, জগত ঘুমায়;—

হেন নিশি একা আসি, যমুনার তটে বসি,

হেরি শশী ভুলে ভুলে জলে ভাসি যায়।

কে আছে এ ভূমগুলে, যখন পরাণ

জীবন-পিঞ্জরে কাঁদে যমের তাড়নে,

যখন পাগল মন ত্যজে এ শ্মশান

ধায় শূন্যে দিবানিশি প্রাণ অন্বেষণে,

তখন বিজন বন, শান্ত বিভাবরী,

শান্ত নিশানাথজ্যোতি বিমল আকাশে,

প্রশস্ত নদীর তট, পর্ব্বত উপরি,

কার না তাপিত মন জুড়ায় বাতাসে।

কি সুখ যে হেনকালে, গৃহ ছাড়ি বনে গেলে,

সেই জানে প্রাণ যার পুড়েছে হুতাশে।

ভাসায়ে অকুল নীয়ে ভবের সাগরে

জীবনের ধ্রুবতারা ডুবেছে যাহার,

নিবেছে সুখের দীপ ঘোর অন্ধকারে,

হু হু করে দিবা নিশি প্রাণ কাঁদে যার,

সেই জানে প্রকৃতির প্রাঞ্জল মূরতি,

হেরিলে বিরলে বসি গভীর নিশিতে,

শুনিলে গভীর ধ্বনি পবনের গতি,

কি সাত্ত্বনা হয় মনে মধুর ভাবেতে।

না জানি মানব মন, হয় হেন কি কারণ,

অনন্ত চিন্তার গামী বিজন ভূমিতে।

হায় রে প্রকৃতি সনে মানবের মন,

বাঁধা আছে কি বন্ধনে বুঝিতে না পারি,

নতুবা যামিনী দিবা প্রভেদে এমন,

কেন হেন উঠে মনে চিন্তার লহরী?

কেন দিবসেতে ভুলি থাকি সে সকলে

শমন করিয়া চুরি নিয়াছে যাহায়?

কেন রজনীতে পুনঃ প্রাণ উঠে জ্বলে,

প্রাণের দোসর ভাই প্রিয়ার ব্যথায়?

কেন বা উৎসবে মাতি, থাকি কভু দিব রাতি,

আবার নির্জনে কেন কাঁদি পুনরায়?

বসিয়া যমুনাতটে হেরিয়া গগন,

ক্ষণে ক্ষণে হলো মনে কত যে ভাবনা,

দাসত্ব, রাজত্ব, ধর্ম্ম, আত্ম্যবন্ধুজন,

জরা, মৃত্যু, পরকাল, যমের তাড়না!

কত আশা, কত ভয়, কতই আহ্লাদ,

কতই বিষাদ আসি হৃদয় পূরিল,

কত ভাঙি, কত গড়ি, কত করি সাধ,

কত হাসি, কত কাঁদি, প্রাণ জুড়াইল।

রজনীতে কি আহ্লাদ, কি মধুর রসাস্বাদ,

বৃন্তভাঙা মন যার সেই সে বুঝিল!

লজ্জাবতীলতা

লজ্জাবতীলতা।

ছুঁইও না ছুঁইও না উটি লজ্জাবতীলতা।

একান্ত সঙ্কোচ করে, এক ধারে আছে সরে,

ছুঁইও না উহার দেহ, রাখ মোর কথা।

তরু লতা যত আর, চেয়ে দেখ চারি ধার,

ঘেরে আছে অহঙ্কারে—উটি আছে কোথা!

আহা অই খানে থাক, দিও না ক ব্যথা।

ছুঁইলে নখের কোণে, বিষম বাজিবে প্রাণে,

যেইও না উহার কাছে খাও মোর মাথা;

ছুঁইও না ছুঁইও না উটি লজ্জাবতীলতা।

লজ্জাবতীলতা উটি অতি মনোহর।

যদিও সুন্দর শোভা নাহি তত মনোলোভা,

তবুও মলিন বেশ মরি কি সুন্দর।

যায় না কাহার পাশেমান মর্যাদার আশে,

থাকে কাঙ্গালির বেশে এক নিরন্তর—

লজ্জাবতী লতা উটি মরি কি সুন্দর!

নিশ্বাস লাগিলে গায়, অমনি শুকায়ে যায়,

না জানি কতই ওর কোমল অন্তর।

এ হেন লতার হয়, কে জানে আদর!

হায় এই ভূমণ্ডলে, কত শত জন,

দণ্ডে দণ্ডে ফুটে উঠে, অবনী মণ্ডল লুঠে,

শুনায় কতই রূপ যশের কীর্ত্তন!

কিন্তু হেন ম্রিয়মাণ, সদা সঙ্কুচিত প্রাণ,

পুরুষ রমণী হেরে কে করে যতন?

স্বভাব মৃদুল ধীর, প্রকৃতিটী সুগম্ভীর,

বিরলে মধুরভাষী মানসরঞ্জন;

কে জিজ্ঞাসি তাহাদের করে সম্ভাষণ?

সমাজের প্রান্ত ভাগে তাপিত অন্তরে জাগে,

মেঘে ঢাকা আভাহীন নক্ষত্র যেমন।

ছুঁইও না উহার দেহ করি নিবারণ;

লজ্জাবতী লতা উটি মানসরঞ্জন।

হতাশের আক্ষেপ

হতাশের আক্ষেপ।

(১)

আবার গগনে কেন সুধাংশু উদয় রে!

কাঁদাইতে অভাগারে, কেন হেন বারে বারে,

গগন মাঝারে শশী আসি দেখা দেয় রে।

তারে যে পাবার নয়, তবু কেন মনে হয়,

জ্বলিল যে শোকানল, কেমনে নিবাই রে।

আবার গগনে কেন সুধাংশু উদয় রে!

(২)

অই শশী অই খানে, এই স্থানে দুই জনে,

কত আশা মনে মনে কত দিন করেছি!

কত বার প্রমদার মুখচন্দ্র হেরেছি!

পরে সে হইল কার, এখনি কি দশা তার,

আমারি কি দশা এবে কি আশ্বাসে রয়েছি!

(৩)

কৌমার যখন তার, বলিত সে বারম্বার,

সে আমার আমি তার অন্য কারো হবো না।

অরে দুষ্ট দেশাচার, কি করিলি অবলার,

কার ধন করে দিলি, আমার সে হলো না!

(৪)

লোক-লজ্জা মান ভয়ে, মা বাপ নিদয় হয়ে,

আমার হৃদয়-নিধি অন্য কারে সঁপিল,

অভাগার যত আশা জন্ম-শোধ ঘুচিল।

(৫)

হারাইনু প্রমদায়, তৃষিত চাতক প্রায়,

ধাইতে অমৃত আশে বুকে বজ্র বাজিল;—

সুধাপান অভিলাষ অভিলাষি থাকিল।

চিন্তা হলো প্রাণাধার, প্রাণত্যুল্য প্রতিমার

প্রতিবিম্ব চিত্তপটে চিরাঙ্কিত রহিল,

হায়, কি বিচ্ছেদ-বাণ হৃদয়েতে বিঁধিল।

(৬)

হায়, সরমের কথা, আমার স্নেহের লতা,

পতিভাবে অন্য জনে প্রাণনাথ বলিল;

মরমের ব্যথা মম মরমেই রহিল।

(৭)

তদবধি ধরাসনে, এই স্থানে শূন্যমনে

থাকি পড়ে, ভাবি সেই হৃদয়ের ভাবনা;

কি যে ভাবি দিবানিশি তাও কিছু জানি না।

সেই ধ্যান সেই জ্ঞান, সেই মান অপমান—

অরে বিধি, তারে কি রে জন্মান্তরে পাব না?

(৮)

এ যন্ত্রণা ছিল ভালো, কেন পুনঃ দেখা হলো,

দেখে বুক বিদারিল, কেন তারে দেখিলাম।

ভাবিতাম আমি দুখে, প্রেয়সী থাকিত সুখে,

সে ভ্রম ঘুচিল, হায়, কেন চখে দেখিলাম!

(৯)

এই রূপে চন্দ্রোদয়, গগন তারকাময়,

নীরব মলিনমুখী অই তরুতলে রে;

এক দৃষ্টে মুখপানে, চেয়ে দেখে চন্দ্রাননে,

অবিরল বারিধারা নয়নেতে ঝরে রে;

কেন সে দিনের কথা পুনঃ মনে পড়ে রে?

(১০)

সে দেখে আমার পানে, আমি দেখি তার পানে,

চিতহারা দুই জনে বাক্য নাহি সরে রে;

কতক্ষণে অকস্মাৎ, “বিধবা হয়েছি নাথ”

বলে প্রিয়তমা ভূমে লুটাইয়ে পড়ে রে।

(১১)

বদন চুম্বন করে, রাখিলাম ক্রোড়ে ধরে,

শুনিলাম মৃদু স্বরে ধীরে ধীরে বলে রে—

“ছিলাম তোমারি আমি, তুমিই আমার স্বামী,

ফিরে জন্মে, প্রাণনাথ, পাই যেন তোমারে।”—

কেন শশী পুনরায় গগনে উঠিলি রে!