PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৯১২

কথা (১৯১২)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১২

প্রকাশনা-তথ্য

কথা

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

কথা

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

মূল্য আট আনা

প্রকাশক

শ্রীঅপূর্ব্বকৃষ্ণ বসু

ইণ্ডিয়ান পাব্লিশিং হাউস

২২, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

কান্তিক প্রেস

২০, কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা

শ্রীহরিচরণ মান্না দ্বারা মুদ্রিত।

সূচী

অপমান-বর

অপমান-বর

( ভক্তমাল )

ভক্ত কবীর সিদ্ধপুরুষ খ্যাতি রটিয়াছে দেশে,

কুটীর তাহার ঘিরিয়া দাঁড়াল লাখো নরনারী এসে।

কেহ কহে মাের রােগ দূর করি মন্ত্র পড়িয়া দেহ,

সন্তান লাগি করে কাঁদাকাটি বন্ধ্যা রমণী কেহ।

কেহ বলে তব দৈবক্ষমতা চক্ষে দেখাও মােরে,

কেহ কয় ভবে আছেন বিধাতা বুঝাও প্রমাণ করে।

কাঁদিয়া ঠাকুরে কাতর কবীর কহে দুই ষোড়করে—

দয়া করে হরি জন্ম দিয়েছ নীচ যবনের ঘরে,—

ভেবেছিনু কেহ আসিবে না কাছে অপার কৃপায় তব,

সবার চোখের আড়ালে কেবল তােমায় আমায় রব।

একি কৌশল খেলেছ মায়াবী, বুঝি দিলে মােরে ফাঁকি!

বিশ্বের লােক ঘরে ডেকে এনে তুমি পালাইবে না কি?

ব্রাহ্মণ যত নগরে আছিল উঠিল বিষম রাগি’

লােক নাহি ধরে যবন জোলার চরণধূলার লাগি।

চারিপােওয়া কলি পূরিয়া আসিল পাপের বােঝায় ভরা,

এর প্রতিকার না করিলে আর রক্ষা না পায় ধরা।

ব্রাহ্মণদল যুক্তি করিল নষ্ট নারীর সাথে,

গোপনে তাহারে মন্ত্রণা দিল, টাকা দিল তার হাতে।

বসন বেচিতে এসেছে কবীর একদা হাটের বারে,

সহসা কামিনী সবার সামনে কাঁদিয়া ধরিল তারে।

কহিল, রে শঠ নিঠুর কপট, কহিনে কাহারো কাছে

এমনি করে কি সরলা নারীরে ছলনা করিতে আছে?

বিনা অপরাধে আমারে ত্যজিয়া সাধু সাজিয়াছ ভালো,

অন্নবসনবিহনে আমার বরণ হয়েছে কালো।

কাছে ছিল যত ব্রাহ্মণদল করিল কপট কোপ—

ভণ্ড তাপস, ধর্মের নামে করিছ ধর্ম্মলােপ!

তুমি সুখে বসে ধূলা ছড়াইছ সরল লােকের চোখে,

অবলা অখলা পথে পথে আহা ফিরিছে অন্নশােকে।

কহিল কবীর—অপরাধী আমি, ঘরে এস, নারী, তবে,

আমার অন্ন রহিতে কেন বা তুমি উপবাসী রবে?

দুষ্টা নারীরে আনি গৃহমাঝে বিনয়ে আদর করি

কবীর কহিল-দীনের ভবনে তােমারে পাঠাল হরি।

কাঁদিয়া তখন কহিল রমণী লাজে ভয়ে পরিতাপে

লােভে পড়ে আমি করিয়াছি পাপ, মরিব সাধুর শাপে।

কহিলা কবীর, ভয় নাই মাতঃ, লইব না অপরাধ;—

এনেছ আমার মাথার ভূষণ অপমান অপবাদ।

ঘুচাইল তার মনের বিকার, করিল চেতনা দান,

সঁপি দিল তার মধুর কণ্ঠে হরিনামগুণগান।

রটি গেল দেশে কপট কবীর, সাধুতা তাহার মিছে।

শুনিয়া কবীর কহে নতশির আমি সকলের নীচে।

যদি কুল পাই, তরণী-গরব রাখিতে না চাহি কিছু,

তুমি যদি থাক আমার উপরে, আমি রব সব-নীচু।

রাজার চিত্তে কৌতুক হল শুনিতে সাধুর গাথা,

দূত আসি তাঁরে ডাকিল যখন, সাধু নাড়িলেন মাথা।

কহিলেন, থাকি সবা হতে দূরে, আপন হীনতা মাঝে;

আমার মতন অভাজনজন রাজার সভায় সাজে?

দূত কহে, তুমি না গেলে ঘটিবে আমাদের পরমাদ,—

যশ শুনে তব হয়েছে হাজার সাধু দেখিবার সাধ।

রাজা বসে ছিল সভার মাঝারে, পারিষদ সারি সারি,

কবীর আসিয়া পশিল সেথায় পশ্চাতে লয়ে নারী।

কেহ হাসে কেহ করে ভুরুকুটী, কেহ রহে নতশিরে,

রাজা ভাবে এটা কেমন নিলাজ, রমণী লইয়া ফিরে!

ইঙ্গিতে তাঁর, সাধুরে, সভার বাহির করিল দ্বারী,

বিনয়ে কবীর চলিল কুটিরে সঙ্গে লইয়া নারী।

পথমাঝে ছিল ব্রাহ্মণদল, কৌতুকভরে হাসে;

শুনায়ে শুনায়ে বিদ্রুপবাণী কহিল কঠিন ভাষে।

তখন রমণী কাঁদিয়া পড়িল সাধুর চরণমূলে—

কহিল, পাপের পঙ্ক হইতে কেন নিলে মােরে তুলে?

কেন অধমারে রাখিয়া দুয়ারে সহিতেছ অপমান?

কহিল কবীর, জননী তুমি যে, আমার প্রভুর দান।

২৮শে আশ্বিন, ১৩০৬

অভিসার

অভিসার

(বােধিসত্ত্বাবদান-কল্পলতা )

সন্যাসী উপগুপ্ত

মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে

একদা ছিলেন সুপ্ত;—

নগরীর দীপ নিবেছে পবনে,

দুয়ার রুদ্ধ পৌর ভবনে,

নিশীথের তারা শ্রবণ-গগনে

ঘন মেঘে অবলুপ্ত।

কাহার নূপুরশিঞ্জিত পদ

সহসা বাজিল বক্ষে।

সন্যাসীবর চমকি জাগিল,

স্বপ্নজড়িমা পলকে ভাগিল,

রূঢ় দীপের আলােক লাগিল

ক্ষমা-সুন্দর চক্ষে।

নগরীর নটী চলে অভিসারে

যৌবনমদে মত্তা।

অঙ্গে আঁচল সুনীল বরণ,

রুনুঝুনু রবে বাজে আভরণ;

সন্যাসী গায়ে পড়িতে চরণ

থামিল বাসবদত্তা।

প্রদীপ ধরিয়া হেরিল তাঁহার

নবীন গৌর-কান্তি।

সৌম্য সহাস তরুণ বয়ান,

করুণা কিরণে বিকচ নয়ান,

শুভ্র ললাটে ইন্দু সমান

ভাতিছে স্নিগ্ধ শান্তি।

কহিল রমণী ললিত কণ্ঠে,

নয়নে জড়িত লজ্জা;—

ক্ষমা কর মােরে কুমার কিশাের,

দয়া কর যদি গৃহে চল মাের,

এ ধরণীতল কঠিন কঠোর,

এ নহে তোমার শয্যা।

সন্যাসী কহে করুণ বচনে,

অয়ি লাবণ্যপুঞ্জে!

এখনাে আমার সময় হয়নি,

যেথায় চলেছ, যাও তুমি ধনী,

সময় যেদিন আসিবে, আপনি

যাইব তােমার কুঞ্জে।

সহসা ঝঞ্ঝা তড়িৎশিখায়

মেলিল বিপুল আস্য।

রমণী কাঁপিয়া উঠিল তরাসে,

প্রলয়শঙ্খ বাজিল বাতাসে,

আকাশে বজ্র ঘাের পরিহাসে

হাসিল অট্টহাস্য।

বর্ষ তখনো হয় নাই শেষ,

এসেছে চৈত্রসন্ধ্যা।

বাতাস হয়েছে উতলা আকুল,

পথ-তরুশাখে ধরেছে মুকুল,

রাজার কাননে ফুটেছে বকুল।

পারুল রজনীগন্ধা।

অতি দূর হতে আসিছে পবনে

বাঁশির মদির-মন্দ্র।

জনহীন পুরী, পুরবাসী সবে

গেছে মধুবনে ফুল-উৎসবে,

শূন্য নগরী নিরখি নীরবে

হাসিছে পূর্ণচন্দ্র।

নির্জন পথে জ্যোৎস্না আলােতে

সন্যাসী একা যাত্রী।

মাথার উপরে তরুবীথিকার

কোকিল কুহরি উঠে বারবার,

এতদিন পরে এসেছে কি তাঁর

আজি অভিসার রাত্রি?

নগর ছাড়ায়ে গেলেন দণ্ডী

বাহির প্রাচীর প্রান্তে।

দাঁড়ালেন আসি পরিখার পারে,

আম্রবনের ছায়ার আঁধারে,

কে ওই রমণী পড়ে এক ধারে

তাঁহার চরণােপান্তে!

নিদারুণ রােগে মারী-গুটিকায়

ভরে গেছে তার অঙ্গ।

রােগমসী ঢালা কালী তনু তার

লয়ে প্রজাগণে, পুর-পরিখার

বাহিরে ফেলেছে, করি পরিহার

বিষাক্ত তার সঙ্গ।

সন্যাসী বসি আড়ষ্ট শির

তুলি নিল নিজ অঙ্কে।

ঢালি দিল জল শুষ্ক অধরে,

মন্ত্র পড়িয়া দিল শিরপরে,

লেপি দিল দেহ আপনার করে

শীত চন্দনপঙ্কে।

ঝরিছে মুকুল, কূজিছে কোকিল,

যামিনী জোছনামত্তা।

“কে এসেছ তুমি ওগো দয়াময়”

শুধাইল নারী, সন্যাসী কয়

“আজি রজনীতে হয়েছে সময়

এসেছি বাসবদত্তা।”

১৯শে আশ্বিন, ১৩০৬

দেবতার গ্রাস

দেবতার গ্রাস

গ্রামে গ্রামে সেই বার্তা রটি গেল ক্রমে

মৈত্র মহাশয় যাবে সাগরসঙ্গমে

তীর্থস্নান লাগি। সঙ্গীদল গেল জুটি

কত বালবৃদ্ধ নরনারী; নৌকা দুটি

প্রস্তুত হইল ঘাটে।

পুণ্যলােভাতুর

মোক্ষদা কহিল আসি “হে দাদাঠাকুর,

আমি তব হব সাথী!”—বিধবা যুবতী,

দু’খানি করুণ আঁখি মানে না যুকতি,

কেবল মিনতি কবে,—অনুরােধ তার

এড়ান কঠিন বড়!—“স্থান কোথা আর”

মৈত্র কহিলেন তারে। “পায়ে ধরি তব”,

বিধবা কহিল কাঁদি “স্থান করি লব

কোনমতে এক ধারে।” ভিজে গেল মন

তবু দ্বিধাভরে তারে শুধাল ব্রাহ্মণ

“নাবালক ছেলেটির কি করিবে তবে?”

উত্তর করিলা নারী-“রাখাল? সে র’বে

আপন মাসীর কাছে। তার জন্মপরে

বহুদিন ভুগেছিনু সূতিকার জ্বরে

বাঁচিব ছিল না আশা; অন্নদা তখন

আপন শিশুর সাথে দিয়ে তারে স্তন

মানুষ করেছে যত্নে,সেই হতে ছেলে

মাসীর আদরে আছে মার কোল ফেলে।

দুরন্ত মানে না কারে, করিলে শাসন

মাসী আসি অশ্রুজলে ভরিয়া নয়ন

কোলে তারে টেনে লয়। সে থাকিবে সুখে

মার চেয়ে আপনার মাসীমার বুকে।

সম্মত হইল বিপ্র। মোক্ষদা সত্বর

প্রস্তুত হইল— বাঁধি জিনিষপত্তর,

প্রণমিয়া গুরুজনে,—সখীদলবলে

ভাসাইয়া বিদায়ের শোকঅশ্রুজলে।

ঘাটে আসি দেখে, সেথা আগেভাগে ছুটি

রাখাল বসিয়া আছে তরী পরে উঠি'

নিশ্চিন্ত নীরবে। “তুই হেথা কেন ওরে!”

মা শুধাল,—সে কহিল, “যাইব সাগরে।”

“যাইবি সাগরে, আরে, ওরে দস্যু ছেলে!

নেমে আয়!”—পুনরায় দৃঢ় চক্ষু মেলে’

সে কহিল দুটি কথা –“যাইব সাগরে।”

যত তার বাহু ধরি টানাটানি করে

রহিল সে তরণী আঁকড়ি। অবশেষে।

ব্রাহ্মণ করুণ স্নেহে কহিলেন হেসে

“থাক থাক্‌ সঙ্গে যাক।” মা রাগিয়া বলে

“চল্ তােরে দিয়ে আসি সাগরের জলে।”

যেমনি সে কথা গেল আপনার কানে

অমনি মায়ের বক্ষ অনুতাপবাপে

বিঁধিয়া কাঁদিয়া উঠে। মুদিয়া নয়ন

“নারায়ণ নারায়ণ” করিল স্মরণ।

পুত্রে নিল কোলে তুলি,—তার সর্ব্বদেহে

করুণ কল্যাণ হস্ত বুলাইল স্নেহে।

মৈত্র তারে ডাকি ধীরে চুপি চুপি কয়

“ছি ছি ছি, এমন কথা বলিবার নয়।”

রাখাল যাইবে সাথে স্থির হল কথা,—

অন্নদা লােকের মুখে শুনি সে বারতা,

ছুটে আসি বলে “বাছা, কোথা যাবি ওরে!”

রাখাল কহিল হাসি “চলিনু সাগরে,

আবার ফিরিব মাসী।” পাগলের প্রায়

অন্নদা কহিল ডাকি “ঠাকুর মশায়,

বড় যে দুরন্ত ছেলে রাখাল আমার,—

কে তাহারে সামালিবে? জন্ম হতে তার

মাসী ছেড়ে বেশিক্ষণ থাকেনি কোথাও,

কোথ। এরে নিয়ে যাবে! ফিরে দিয়ে যাও।”

রাখাল কহিল—“মাসী যাইব সাগরে

আবার ফিরিব আমি।” বিপ্র স্নেহস্বরে

কহিলেন—“যতক্ষণ আমি আছি ভাই,

তােমার রাখাল লাগি কোন ভয় নাই।

এখন শীতের দিন শান্ত নদীনদ,

অনেক যাত্রীর মেলা,—পথের বিপদ

কিছু নাই,—যাতায়াতে মাস দুই কাল,—

তােমারে ফিরায়ে দিব তােমার রাখাল।”

শুভক্ষণে দুর্গাস্মরি’ নৌকা দিল ছাড়ি।

দাঁড়ায়ে রহিল ঘাটে যত কুলনারী

অশ্রুচোখে। হেমন্তের প্রভাত-শিশিরে

ছলছল করে গ্রাম চূর্ণী নদীতীরে।

যাত্রীদল ফিরে আসে; সাঙ্গ হল মেলা।

তরণী তীরেতে বাঁধা অপরাহ্ন বেলা

জোয়ারের আশে। কৌতুহল অবসান,

কাঁদিতেছে রাখালের গৃহগত প্রাণ

মাসীর কোলের লাগি।— জল শুধু জল

দেখে দেখে চিত্ত তার হয়েছে বিকল।

মসৃণ চিক্কণ কৃষ্ণ কুটিল নিষ্ঠুর,

লােলুপ লেলিহজিহ্ব সর্পসম ক্রুর

খল জল ছলভরা, তুলি লক্ষ্য ফণা

ফুঁসিছে গর্জ্জিছে নিত্য করিছে কামনা

মৃত্তিকার শিশুদের, লালায়িত মুখ।

হে মাটি, হে স্নেহময়ী, অয়ি মৌনমুক,

অয়ি স্থির, অয়ি ধ্রুব, অয়ি পুরাতন,

সর্ব্ব-উপদ্রবসহা আনন্দভবন

শ্যামল কোমলা! যেথা যে কেহই থাকে

অদৃশ্য দুবাহু মেলি টানিছ তাহাকে

অহরহ, অয়ি মুগ্ধে, কি বিপুল টানে

দিগন্ত বিস্তৃত তব শান্ত বক্ষপানে।

চঞ্চল বালক আসি প্রতি ক্ষণে ক্ষণে

অধীর উৎসুককণ্ঠে শুধায় ব্রাহ্মণে

“ঠাকুর, কখন আজি আসিবে জোয়ার?”

সহসা স্তিমিত জলে আবেগ সঞ্চার

দুই কূল চেতাইল আশার সংবাদে।

ফিরিল তরীর মুখ; মৃদু আর্ত্তনাদে

কাছিতে পড়িল টান,কলশব্দগীতে

সিন্ধুর বিজয়রথ পশিল নদীতে,—

আসিল জোয়ার।—মাঝি দেবতারে স্মরি।

ত্বরিত উত্তরমুথে খুলে দিল তরী।

রাখাল শুধায় আসি ব্রাহ্মণের কাছে

“দেশে পঁহুছিতে আর কতদিন আছে?”

সূর্য অস্ত না যাইতে, ক্রোশ দুই ছেড়ে

উত্তর বায়ুর বেগ ক্রমে উঠে বেড়ে।

রূপনারাণের মুখে পড়ি বালুচর

সঙ্কীর্ণ নদীর পথে বাধিল সমর

জোয়ারের স্রোতে আর উত্তরসমীরে

উত্তাল উদ্দাম। তরণী ভিড়াও তীরে

উচ্চকণ্ঠে বারম্বার কহে যাত্রীদল।

কোথা তীর! চারিদিকে ক্ষিপ্তোন্মত্তজল

আপনার রুদ্রনৃত্যে দেয় করতালি

লক্ষ লক্ষ হাতে। দিগন্তরে যায় দেখা।

অতি তট প্রান্তে নীল বনরেখা;—

অন্য দিকে লুব্ধ ক্ষুব্ধ হিংস্র বারিরাশি

প্রশান্ত সূর্য্যাস্ত পানে উঠিছে উচ্ছাসি

উদ্ধত বিদ্রোহভরে। নাহি মানে হাল,

“ঘুরে টলমল তরী অশান্ত মাতাল

মুঢ়সম। তীব্র শীতপবনের সনে

মিশিয়া ত্রাসের হিম নরনারীগণে

কাঁপাইছে থরহরি। কেহ হতবাক,

কেহ বা ক্রন্দন করে ছাড়ি ঊর্দ্ধডাক,

ডাকি আত্মজনে। মৈত্র শুষ্ক পাংশুমুখে

চক্ষুমুদি’ করে জপ। জননীর বুকে

রাখাল লুকায়ে মুখ কাঁপিছে নীরবে।

তখন বিপন্ন মাঝি ডাকি কহে সবে-

“বাবারে দিয়েছে ফাঁকি তােমাদের কেউ,

যা মেনেছে দেয় নাই তাই এত ঢেউ,

অসময়ে এ তুফান! শুন এই বেলা,

করহ মানৎ রক্ষা—করিয়ো না খেলা,

ক্রুদ্ধ দেবতার সনে।”- যার যত ছিল

অর্থ বস্ত্র যাহা কিছু জলে ফেলি দিল

না করি বিচার। তবু তখনি পলকে

তরীতে উঠিল জল দারুণ ঝলকে।

মাঝি কহে পুনর্ব্বার-“দেবতার ধন

কে যায় ফিরায়ে লয়ে এই বেল শােন্।”

ব্রাহ্মণ সহসা উঠি কহিল। তখনি

মােক্ষদারে লক্ষ্য করি—“এই সে রমণী

দেবতারে সঁপি দিয়া আপনার ছেলে

চুরি করে নিয়ে যায়!”—“দাও তারে ফেলে”

একবাক্যে গর্জ্জি উঠে তরাসে নিষ্ঠুর

যাত্রী সবে। কহে নারী “হে দাদাঠাকুর

রক্ষা কর, রক্ষা কর।” দুই দৃঢ় করে

রাখালের প্রাণপণে বক্ষে চাপি ধরে।

ভৎসিয়া গর্জ্জিয়া উঠি কহিলা ব্রাহ্মণ

“আমি তাের রক্ষাকর্তা! রোষে নিশ্চেতন

মা হয়ে আপন পুত্র দিলি দেবতারে,

শেষকালে আমি রক্ষা করিব তাহারে!

শােধ দেবতার ঋণ! সত্য ভঙ্গ করে

এতগুলি প্রাণী তুই ডুবাবি সাগরে!”

মােক্ষদা কহিল “অতি মূর্খ নারী আমি,

কি বলেছি রােষবশে,—ওগো অন্তর্যামী

সেই সত্য হল? সে যে মিথ্যা কতদূর

তখনি শুনে কি তুমি বােঝনি ঠাকুর?

শুধু কি মুখের বাক্য শুনেছ দেবতা?

শােননি কি জননীর অন্তরের কথা?”

বলিতে বলিতে যত মিলি মাঝি দাঁড়ি

বল করি রাখালেরে নিল ছিঁড়ি কাড়ি

মার বক্ষ হতে। মৈত্র মুদি দুই আঁখি

ফিরায়ে রহিল মুথ কানে হাত ঢাকি,

দন্তে দন্ত চাপি বলে। কে তাঁরে সহসা

মর্ম্মে মর্ম্মে আঘাতিল বিদ্যুতের কশা,

দংশিল বৃশ্চিকদংশ।–“মাসী, মাসী, মাসী”

বিন্ধিল বহ্নির শলা রুদ্ধ কর্ণে আসি

নিরুপায় অনাথের অন্তিমের ডাক।

চীৎকারি উঠিলা বিপ্র—“রাখ, রাখ, রাখ!”

চকিতে হেরিলা চাহি মূর্চ্ছি আছে পড়ে

মােক্ষদা চরণে তাঁর।—মুহূর্তের তরে

ফুটন্ত তরঙ্গ মাঝে মেলি আর্ত্ত চোখ

মাসী বলি ফুকারিয়া মিলাল বালক

অনন্ত তিমির তলে;—শুধু ক্ষীণ মুঠি

বারেক ব্যাকুলবলে উৰ্দ্ধপানে উঠি

আকাশে আশ্রয় খুঁজি ডুবিল হতাশে।

“ফিরায়ে আনিব তােরে” কহি ঊর্ধ্বশ্বাসে

ব্রাহ্মণ মুহূর্ত্তমাঝে ঝাঁপ দিল জলে।

আর উঠিল না। সূর্য্য গেল অস্তাচলে।—

১৩ই কার্তিক, ১৩০৪

নকল গড়

নকল গড়

(রাজস্থান )

জলস্পর্শ করব না আর-

চিতাের-রাণার পণ—

বুঁদির কেল্লা মাটির পরে

থাকবে যতক্ষণ।

কি প্রতিজ্ঞা, হায় মহারাজ,

মানুষের যা’ অসাধ্য কাজ

কেমন করে সাধবে তা আজ!

কহেন মন্ত্রীগণ।

কহেন রাজা, সাধ্য না হয়

সাধব আমার পণ।

বুঁদির কেল্লা চিতাের হতে

যােজন তিনেক দূর।

সেথায় হারাবংশী সবাই

মহা মহা শূর।

হামু রাজা দিচ্চে থানা

ভয় কারে কয় নাইক জানা,

তাহার সদ্য প্রমাণ রাণ।

পেয়েছেন প্রচুর।

হারাবংশীর কেল্লা বুঁদী।

যােজন তিনেক দূর।

মন্ত্রী কহে যুক্তি করি-

আজকে সারারাতি

মাটি দিয়ে বুঁদির মত

নকল কেল্লা পাতি।

রাজা এসে আপন করে

দিবেন ভেঙে ধূলির পরে,

নইলে শুধু কথার তরে

হবেন আত্মঘাতী।—

মন্ত্রী দিল চিতাের মাঝে

নকল কেল্লা পাতি।

কুম্ভ ছিল রাণার ভৃত্য

হারাবংশী বীর

হরিণ মেরে আসচে ফিরে

স্কন্ধে ধনু তীর।

খবর পেয়ে কহে-কেরে

নকল বুঁদি কেল্লা মেরে

হরাবংশী রাজপুতেরে

করবে নতশির?

নকল বুঁদী রাখব আমি

হারাবংশী বীর।

মাটির কেল্লা ভাঙতে আসেন

রাণা মহারাজ।

দূরে রহ-কহে কুম্ভ,

গর্জ্জে যেন বাজ।

বুঁদীর নামে করবে খেলা,

সইব না সে অবহেলা,—

নকল গড়ের মাটির ঢেলা

রাখব আমি আজ।

কহে কুম্ভ—দুরে রহ

রাণা মহারাজ!

ভূমির পরে জানু পাতি

তুলি’ ধনুঃ শর

একা কুম্ভ রক্ষা করে

নকল বুঁদীগড়।

রাণার সেনা ঘিরি তারে

মুণ্ড কাটে তরবারে,

খেলা গড়ের সিংহদ্বারে

পড়ল ভূমিপর।

রক্তে তাহার ধন্য হল

নকল বুঁদীগড়

৭ই কার্তিক, ১৩০৬

নগর লক্ষ্মী

নগর লক্ষ্মী

(কল্পদ্রুমাবদান্)

দুর্ভিক্ষ শ্রাবন্তিপুরে যবে

জাগিয়া উঠিল হাহারবে,—

বুদ্ধ নিজ ভক্তগণে শুধালেন জনে জনে।

ক্ষুধিতেরে অন্নদানসেবা

তােমরা লইবে বল কেবা!

শুনি তাহা রত্নাকর শেঠ

করিয়া রহিল মাথা হেঁট।

কহিল সে কর বুড়ি— ক্ষুধার্ত বিশালপুরী,

এর ক্ষুধা মিটাইব আমি

এমন ক্ষমতা নাই স্বামী!

কহিল সামন্ত জয়সেন -

যে আদেশ প্রভু করিছেন

তাহা লইতাম শিরে যদি মাের বুক চিরে

রক্ত দিলে হত কোন কাজ,

মাের ঘরে অন্ন কোথা আজ?

নিশ্বাসিয়া কহে ধর্ম্মপাল

কি কব, এমন দগ্ধ ভাল,—

আমার সােনার ক্ষেত শুষিছে অজন্ম প্রেত,

রাজকর যােগান কঠিন,

হয়েছি অক্ষম দীনহীন।

রহে সবে মুখে মুখে চাহি,

কাহারো উত্তর কিছু নাহি।

নির্ব্বাক্ সে সভাঘরে, ব্যথিত নগরীপরে

বুদ্ধের করুণ আঁখি দুটি

সন্ধ্যাতারাসম রহে ফুটি।

তখন উঠিল ধীরে ধীরে

রক্ত ভাল লাজনম্র শিরে

অনাথ-পিণ্ডদ-সুতা বেদনায় অশ্রুপ্লতা

বুদ্ধের চরণরেণু লয়ে

মধুকণ্ঠে কহিল বিনয়েঃ-

ভিক্ষুণীর অধম সুপ্রিয়া

তব আজ্ঞা লইল বহিয়া।

কাঁদে যারা খাদ্যহারা আমার সন্তান তারা;

নগরীরে অন্ন বিলাবার

আমি আজি লইলাম ভার।

বিস্ময় মানিল সবে শুনি:—

ভিক্ষুকন্যা তুমি যে ভিক্ষুণী-

কোন্ অহঙ্কারে মাতি লইলে মস্তক পাতি

এ হেন কঠিন গুরু কাজ!

কি আছে তােমার, কহ আজ!

কহিল সে নমি সব কাছে—

শুধু এই ভিক্ষাপাত্র আছে।

আমি দীনহীন মেয়ে অক্ষম সবার চেয়ে,

তাই তােমাদের পাব দয়া

প্রভু আজ্ঞা হইবে বিজয়া।

আমার ভাণ্ডার আছে ভরে

তোম সবাকার ঘরে ঘরে।

তােমরা চাহিলে সবে এ পাত্র অক্ষয় হবে,

ভিক্ষা-অন্নে বাঁচাব বসুধা-

মিটাইব দুর্ভিক্ষের ক্ষুধা।

২৭শে আশ্বিন, ১৩০৬

পণরক্ষা

পণরক্ষা

“মারাঠা দস্যু আসিছে রে ঐ,

কর কর সবে সাজ।”

আজমীর গড়ে কহিলা হাঁকিয়া

দুর্গেশ দুমরাজ।

বেলা দু-পহরে যে-যাহার ঘরে

সেঁকিছে জোয়ারী-রুটি,

দুর্গ তােরণে নাকাড়া বাজিতে

বাহিরে আসিল ছুটি'।

প্রাকারে চড়িয়া দেখিল চাহিয়া

দক্ষিণে বহুদূরে

আকাশ জুড়িয়া উড়িয়াছে ধুলা

মারাঠি অশ্বখুরে।

“মারাঠার যত পতঙ্গপাল

কৃপাণ অনলে আজ

ঝাঁপ দিয়া পড়ি ফিরেনাক যেন”—

গর্জ্জিলা দুমরাজ।

মাড়োয়ার হতে দূত আসি বলে—

“বৃথা এ সৈন্যসাজ।

হের এ প্রভুর আদেশপত্র,

দুর্গেশ দুমরাজ!

সিন্দে আসিছে, সঙ্গে তাঁহার

ফিরিঙ্গি সেনাপতি,—

সাদরে তাঁদের ছাড়িবে দুর্গ,

আজ্ঞা তােমার প্রতি।

বিজয়লক্ষ্মী হয়েছে বিমুখ

বিজয়সিংহ পরে;

বিনা সংগ্রামে আজমীর গড়

দিবে মারাঠার করে।”

“প্রভুর আদেশে বীরের ধর্ম্মে

বিরােধ বাধিল আজ”

নিশ্বাস ফেলি কহিলা কাতরে

দুর্গেশ দুমরাজ।

মাড়ােয়ার দূত করিল ঘােষণা

“ছাড় ছাড় রণ সাজ।”

রহিল পাষাণ-মূরতি সমান

দুর্গেশ দুমরাজ।

বেলা যায়-যায়, ধূধূ করে মাঠ,

দূরে দূরে চরে ধেনু,

তরুতলছায়ে সকরুণ রবে

বাজে রাখালের বেণু।

“আজমীর গড় দিলা যবে মোরে

পণ করিলাম মনে

প্রভুর দুর্গ শত্রুর করে

ছাড়িব না এ জীবনে।

প্রভুর আদেশে সে সত্য হায়

ভাঙিতে হবে কি আজ!”

এতেক ভাবিয়া ফেলে নিশ্বাস

দুর্গেশ দুমরাজ।

রাজপুত সেনা সরােষে সরমে

ছাড়িল সমর সাজ।

নীরবে দাঁড়ায়ে রহিল তােরণে

দুর্গেশ দুমরাজ।

গেরুয়া-বসনা সন্ধ্যা নামিল

পশ্চিম মাঠ পারে;

মারাঠা সৈন্য ধূলা উড়াইয়া

থামিল দুর্গদ্বারে।

“দুয়ারের কাছে কে ওই শয়ান,

ওঠ ওঠ খােল দ্বার!”

নাহি শােনে কেহ,—প্রাণহীন দেহ

সাড়া নাহি দিল আর।

প্রভুর কর্ম্মে বীরের ধর্ম্মে

বিরােধ মিটাতে আজ

দুর্গ দুয়ারে ত্যজিয়াছে প্রাণ

দুর্গেশ দুমরাজ।

অগ্রহায়ণ, ১৩০৬

পরিশোধ

পরিশােধ

(মহাবস্ত্ববদান)

রাজকোষ হতে চুরি! ধরে আন্ চোর,

নহিলে, নগরপাল, রক্ষা নাহি তাের,

মুণ্ড রহিবে না দেহে!-রাজার শাসনে

রক্ষীদল পথে পথে ভবনে ভবনে

চোর খুঁজে খুঁজে ফিরে। নগর-বাহিরে

ছিল শুয়ে বজ্রসেন বিদীর্ণ মন্দিরে,

বিদেশী বণিক পান্থ তক্ষশিলাবাসী;

অশ্ব বেচিবার তরে এসেছিল কাশী,

দস্যুহস্তে খােয়াইয়া নিঃস্বরিক্ত শেষে

ফিরিয়া চলিতেছিল আপনার দেশে

নিরাশ্বাসে। তাহারে ধরিল চোর বলি’;

হস্তে পদে বাঁধি তার লােহার শিকল

লইয়া চলিল বন্দীশালে।

সেইক্ষণে

সুন্দরী-প্রধানা শ্যামা বসি বাতায়নে

প্রহর যাপিতেছিল আলস্যে কৌতুকে

পথের প্রবাহ হেরি’;—নয়নসম্মুখে

স্বপ্নসম লােকযাত্রা। সহসা শিহরি’

কাঁপিয়া কহিল শ্যামা,—আহা মরি মরি

মহেন্দ্রনিন্দিত কান্তি উন্নতদর্শন

কারে বন্দী করে আনে চোরের মতন

কঠিন শৃঙ্খলে! শীঘ্র যা’লো সহচরী

বলগে নগরপালে মাের নাম করি-

শ্যামা ডাকিতেছে তারে; বন্দী সাথে লয়ে

একবার আসে যেন এ ক্ষুদ্র আলয়ে

দয়া করি'।—শ্যামার নামের মন্ত্রগুণে

উতলা নগররক্ষী আমন্ত্রণ শুনে

রােমাঞ্চিত; সত্বর পশিল গৃহমাঝে

পিছে বন্দী বসেন নতশির লাজে

আরক্ত কপােল। কহে রক্ষী হাস্যভরে—

অতিশয় অসময়ে অভাজনপরে

অযাচিত অনুগ্রহ,—চলেছি সম্প্রতি

রাজকাজে,—সুদর্শনে, দেহ অনুমতি!

বজ্রসেন তুলি শির সহসা কহিলা—

একি লীলা, হে সুন্দরী, একি তব লীলা!

পথ হতে ঘরে আনি কিসের কৌতুকে

নির্দ্দোষী এ প্রবাসীর অবমানদুখে

করিতেছ অবমান।—শুনি শ্যামা কহে,

হায় গাে বিদেশী পান্থ কৌতুক এ নহে।

আমার অঙ্গেতে যত স্বর্ণ অলঙ্কার

সমস্ত সঁপিয়া দিয়া শৃঙ্খল তােমার

নিতে পারি নিজ দেহে; তব অপমানে

মাের অন্তরাত্মা আজি অপমান মানে।

এত বলি সিক্তপক্ষ দুটি চক্ষু দিয়া

সমস্ত লাঞ্ছনা যেন লইল মুছিয়া

বিদেশীর অঙ্গ হতে। কহিল রক্ষীরে

আমার যা আছে লয়ে নির্দ্দোষী বন্দীরে

মুক্ত করে দিয়ে যাও।—কহিল প্রহরী

তব অনুনয় আজি ঠেলিনু সুন্দরী

এত এ অসাধ্য কাজ। হৃত রাজকোষ,

বিনা কারাে প্রাণপাতে নৃপতির রােষ

শান্তি মানিবে না।—ধরি প্রহরীর হাত

কাতরে কহিল শ্যামা,—শুধু দুটি রাত

বন্দীরে বাঁচায়ে রেখো এ মিনতি করি!-

রাখিব তােমার কথা,কহিল প্রহরী।

দ্বিতীয় রাত্রির শেষে খুলি বন্দীশালা

রমণী পশিল কক্ষে, হাতে দীপ জ্বালা’,

লােহার শৃঙ্খলে বাঁধা যেথা বজ্রসেন-

মৃত্যুর প্রভাত চেয়ে মৌনী জপিছেন

ইষ্টনাম। রমণীর কটাক্ষ-ইঙ্গিতে

রক্ষী আসি খুলি দিল শৃঙ্খল চকিতে।

বিস্ময়-বিহ্বল নেত্রে বন্দী নিরখিল

সেই শুভ্র সুকোমল কমল-উন্মীল

অপরূপ মুখ। কহিল গদগদ স্বরে -

“বিকারের বিভীষিকারজনীর পরে

করবৃত শুকতারা শুভ্রঊষাসম

কে তুমি উদিলে আসি কারাকক্ষে মম—

মুমূর্ষুর প্রাণরূপা, মুক্তিরূপা অয়ি

নিষ্ঠুর নগরী মাঝে লক্ষ্মী দয়াময়ী।”—

“আমি দয়াময়ী!” রমণীর উচ্চহাসে

চকিতে উঠিল জাগি নব ভয়ত্রাসে

ভয়ঙ্কর কারাগার। হাসিতে হাসিতে

উন্মত্ত উৎকট হাস্য শােকাশ্রুরাশিতে

শতধা পড়িল ভাঙি। কাঁদিয়া কহিলা—

এ পুরীর পথমাঝে যত আছে শিলা

কঠিন শ্যামার মত কেহ নাহি আর!-

এত বলি দৃঢ়বলে ধরি হস্ত তার

বজ্রসেনে লয়ে গেল কারার বাহিরে।

তখন জাগিছে উষা বরুণার তীরে,

পূর্ব্ব বনান্তরে। ঘাটে বাঁধা আছে তরী।

“হে বিদেশী এস এস” কহিল সুন্দরী

দাঁড়ায়ে নৌকার পরে—“হে আমার প্রিয়

শুধু এই কথা মাের স্মরণে রাখিয়াে -

তােমা সাথে এক স্রোতে ভাসিলাম আমি

সকল বন্ধন টুটি’ হে হৃদয়স্বামী

জীবনমরণপ্রভু!—নৌকা দিল খুলি।

দুই তীরে বনে বনে গাহে পাখীগুলি

আনন্দ-উৎসব গান। প্রেয়সীর মুখ

দুই বাহু দিয়া তুলি ভরি নিজ বুক

বজ্রসেন শুধাইল–কহ মােরে প্রিয়ে,

আমারে করেছ মুক্ত কি সম্পদ দিয়ে।

সম্পূর্ণ জানিতে চাহি অয়ি বিদেশিনী

এ দীন দরিদ্রজন তব কাছে ঋণী

কত ঋণে?”—আলিঙ্গন ঘনতর করি

“সে কথা এখন নহে” কহিল সুন্দরী।

নৌকা ভেসে চলে যায় পূর্ণ বায়ুভরে

তূর্ণ স্রোতেবেগে। মধ্য গগনের পরে

উদিল প্রচণ্ড সূর্য। গ্রামবধূগণ।

গৃহে ফিরে গেছে করি স্নানসমাপন

সিক্তবস্ত্রে, কাংস্যঘটে লয়ে গঙ্গাজল।

ভেঙে গেছে প্রভাতের হাট; কোলাহল

থেমে গেছে দুই তীরে; জনপদ-বাট

পান্থহীন। বটতলে পাষাণের ঘাট,

সেথায় বাঁধিল নৌকা স্নানাহারতরে

কর্ণধার। বনচ্ছায়া স্তব্ধ শব্দহীন;

অলস পতঙ্গ শুধু গুঞ্জে দীর্ঘ দিন;

পক্কশস্যগন্ধহরা মধ্যাহ্নের বায়ে

শ্যামার ঘোমটা যবে ফেলিল খসায়ে

অকস্মাৎ,—পরিপূর্ণ প্রণয়পীড়ায়

ব্যথিত ব্যাকুল বক্ষ – কণ্ঠরুদ্ধপ্রায়

বজ্রসেন কানে কানে কহিল শ্যামারে—

“ক্ষণিক শৃঙ্খল মুক্ত করিয়া আমারে

বাঁধিয়াছ অনন্ত শৃঙ্খলে। কি করিয়া

সাধিলে দুঃসাধ্য ব্রত কহ বিবরিয়া।

মাের লাগি কি করেছ জানি যদি প্রিয়ে,

পরিশােধ দিব তাহা এ জীবন দিয়ে

এই মাের পণ।”—বস্ত্র টানি মুখপরি

সে কথা এখনাে নহে—কহিল সুন্দরী।

গুটায়ে সােনার পাল সুদূরে নীরবে

দিনের আলােকতরী চলি গেল যবে

অস্তঅচলের ঘাটে,—তীর-উপবনে

লাগিল শ্যামার নৌকা সন্ধ্যার পবনে।

শুক্ল চতুর্থীর চন্দ্র অস্তগত প্রায়,—

নিস্তরঙ্গ শান্ত জলে সুদীর্ঘ রেখায়

ঝিকিমিকি করে ক্ষীণ আলো; ঝিল্লিম্বনে

তরুমূল-অন্ধকার কাঁপিছে সঘনে

বীণার তন্ত্রীর মত। প্রদীপ নিবায়ে

তরীবাতায়নতলে দক্ষিণের বায়ে

ঘন-নিঃশ্বসিত মুখে যুবকের কাঁধে

হেলিয়া বসেছে শ্যামা; পড়েছে অবাধে

উন্মুক্ত সুগন্ধ কেশরাশি, সুকোমল

তরঙ্গিত তমােজালে ছেয়ে বক্ষতল।

বিদেশীর—সুনিবিড় তন্দ্রাজালসম।

কহিল অস্ফুটকণ্ঠে শ্যামা,—প্রিয়তম,

তােমা লাগি যা করেছি কঠিন সে কাজ

সুকঠিন— —তারো চেয়ে সুকঠিন আজ

সে কথা তােমারে বলা। সংক্ষেপে সে কব-

একবার শুনে মাত্র নন হতে তব

সে কাহিনী মুছে ফেলো।

বালক কিশাের

উত্তীয় তাহার নাম, ব্যর্থ প্রেমে মাের

উন্মত্ত অধীর। সে আমার অনুনয়ে

তব চুরিঅপবাদ নিজস্কন্ধে লয়ে

দিয়েছে আপন প্রাণ। এ জীবনে মম

সর্ব্বাধিক পাপ মাের, ওগো সর্ব্বোত্তম,

করেছি তােমার লাগি এ মাের গৌরব।—

ক্ষীণ চন্দ্র অস্ত গেল—অরণ্য নীরব

শত শত বিহঙ্গের সুপ্তি বহি শিরে

দাঁড়ায়ে রহিল স্তব্ধ। অতি ধীরে ধীরে

রমণীর কটি হতে প্রিয়বাহুডাের

শিথিল পড়িল খসে; বিচ্ছেদ কঠোর

নিঃশব্দে বসিল দোঁহা মাঝে; বাক্যহীন

বজ্রসেন চেয়ে রহে আড়ষ্ট কঠিন

পাষাণ পুত্তলি; মাথা রাখি তার পায়ে

ছিন্নলতাসম শ্যামা পড়িল লুটায়ে

আলিঙ্গনচ্যুতা; মসীকৃষ্ণ নদীনীরে

তীরের তিমিরপুঞ্জ ঘনাইল ধীরে।

সহসা যুবার জানু সবলে বাঁধিয়া

বাহুপাশে -আর্ত্তনারী উঠিল কাঁদিয়া

অশ্রুহারা শুককণ্ঠে—ক্ষমা কর নাথ,

এ পাপের যাহা দণ্ড সে অভিসম্পাত

হােক্ বিধাতার হাতে নিদারুণতর-

তােমা লাগি যা করেছি তুমি ক্ষমা কর।

চরণ কাড়িয়া লয়ে চাহি তার পানে

বজ্রসেন বলি উঠে—আমার এ প্রাণে

তােমার কি কাজ ছিল! এ জন্মের লাগি

তাের পাপ মূল্যে কেনা মহাপাপভাগী

এ জীবন করিলি ধিক্কৃত। কলঙ্কিনী,

ধিক্ এ নিশ্বাস মাের তাের কাছে ঋণী!

ধিক্ এ নিমেষপাত প্রত্যেক নিমেষে!

এত বলি উঠিল সবলে। নিরুদ্দেশে

নৌকা ছাড়ি চলি গেলা তীরে—অন্ধকারে

বনমাঝে। শুষ্কপত্ররাশি পদভারে

শব্দ করি বনানীরে করিল চকিত

প্রতিক্ষণে; ঘন গুল্মগন্ধ পুঞ্জীকৃত

বায়ুশূন্য বনতলে; তরুকাণ্ডগুলি

চারিদিকে আঁকাবাঁকা নানা শাখা তুলি

অন্ধকারে ধরিয়াছে অসংখ্য আকার

বিকৃত বিরূপ; রুদ্ধ হল চারিধার;

নিস্তব্ধ নিষেধসম প্রসারিল কর

লতশৃঙ্খলিত বন। শ্রান্তকলেবর

পথিক বসিল ভূমে। কে তার পশ্চাতে

দাঁড়াইল উপছায়াসম! সাথে সাথে

অন্ধকারে পদে পদে তারে অনুসরি

আসিয়াছে দীর্ঘ পথ মৌনী অনুচরী

রক্তসিক্ত পদে। দুই মুষ্টি বন্ধ করে’

গর্জ্জিল পথিক —“তবু ছাড়িবি না মােরে!”

রমণী বিদ্যুৎবেগে ছুটিয়া পড়িয়া

বন্যার তরঙ্গসম দিল আবরিয়া

আলিঙ্গনে কেশপাশে স্রস্ত বেশবাসে

আঘ্রাণে চুম্বনে স্পর্শে সঘন নিশ্বাসে

সর্ব্ব অঙ্গ তার; আর্দ্র গদগদ-বচনা

কণ্ঠরুদ্ধপ্রায়;—ছাড়িব না ছাড়িব না

কহে বারম্বার; তােমা লাগি পাপ নাথ,

তুমি শাস্তি দাও মােরে, কর মর্ম্ম-ঘাত,

শেষ করে দাও মাের দণ্ড পুরস্কার।-

অরণ্যের গ্রহতারাহীন অন্ধকার

অন্ধভাবে কি যেন করিল অনুভব

বিভীষিকা। লক্ষ লক্ষ তরুমূলসব

মাটির ভিতরে থাকি শিহরিল ত্রাসে

বারেক ধ্বনিল রুদ্ধ নিষ্পেষিত শ্বাসে

অন্তিম কাকুতি স্বর,-তারি পরক্ষণে

কে পড়িল ভূমিপরে অসাড় পতনে।

বজ্রসেন বন হতে ফিরিল যখন।

প্রথম ঊষার করে বিদ্যুৎ বরণ

মন্দির-ত্রিশূল-চূড়া জাহ্নবীর পারে।

জনহীন বালুতটে নদী ধারে ধারে।

কাটাইল দীর্ঘ দিন ক্ষিপ্তের মতন

উদাসীন। মধ্যাহ্নের জ্বলন্ত তপন

হানিল সর্ব্বাঙ্গে তার অগ্নিময়ী কশা।

ঘটকক্ষে গ্রামবধূ হেরি তার দশা

কহিল করুণ কণ্ঠে—“কে গো গৃহছাড়া

এস আমাদের ঘরে!” দিল না সে সাড়া।

তৃষায় ফাটিল ছাতি,-তবু স্পর্শিল না

সম্মুখের নদী হতে জল এককণা।

দিনশেষে জ্বরতপ্ত দগ্ধ কলেবরে

ছুটিয়া পশিল গিয়া তরণীর পরে

পতঙ্গ যেমন বেগে অগ্নি দেখে ধায়

উগ্র আগ্রহের ভরে। হেরিল শয্যায়

একটি নূপুর আছে পড়ি। শতবার

রাখিল বক্ষেতে চাপি। ঝঙ্কার তাহার

শতমুখ শরসম লাগিল বর্ষিতে

হৃদয়ের মাঝে। ছিল পড়ি একভিতে

নীলাম্বর বস্ত্রখানি,—রাশীকৃত করি

তারি পবে মুখ রাখি রহিল সে পড়ি-

সুকুমার দেহগন্ধ নিশ্বাসে নিঃশেষে।

লইল শােষণ করি অতৃপ্ত আবেশে।

শুক্ল পঞ্চমীর শশি অস্তাচলগামী

সপ্তপর্ণ তরুশিরে পড়িয়াছে নামি’

শাখাঅন্তরালে। দুই বাহু প্রসারিয়া

ডাকিতেছে বজ্রসেন—এস এস প্রিয়া-

চাহি অরণ্যের পানে। হেনকালে তীরে

বালুতটে ঘনকৃষ্ণ বনের তিমিরে

কার মূর্তি দেখা দিল উপচ্ছায়াসম —

“এস এস প্রিয়া!” “আসিয়াছি প্রিয়তম!”

চরণে পড়িল শ্যামা—“ক্ষম মােরে ক্ষম!

গেল না ত সুকঠিন এ পরাণ মম।

তােমার করুণ করে।” শুধু ক্ষণতরে

বজ্রসেন তাকাইল তার মুখপরে,—

ক্ষণতরে আলিঙ্গনলাগি বাহু মেলি,

চমকি উঠিল,—তারে দূরে দিল ঠেলি,

গরজিল—“কেন এলি, কেন ফিরে এলি!”

বক্ষ হতে নূপুর লইয়া—দিল ফেলি

জ্বলন্ত অঙ্গারসম-নীলাম্বরখানি

চরণের কাছ হতে ফেলে দিল টানি;

শয্যা যেন অগ্নিশষ্যা, পদতলে থাকি

লাগিল দহিতে তারে; মুদি দুই আঁখি

কহিল ফিরায়ে মুখ—“যাও যাও ফিরে

মােরে ছেড়ে চলে যাও!” নারী নতশিরে

ক্ষণতরে রহিল নীরবে। পরক্ষণে

ভূতলে রাখিয়া জানু যুবার চরণে।

প্রণমিল -তার পরে নামি নদীতীরে

আঁধার বনের পথে চলি গেল ধীরে—

নিদ্রাভঙ্গে ক্ষণিকের অপূর্ব্ব স্বপন।

নিশার তিমির মাঝে মিলায় যেমন।

২৩শে আশ্বিন, ১৩০৬

পূজারিণী

পূজারিণী

(অবদান শতক)

নৃপতি বিম্বিসার

নমিয়া বুদ্ধে মাগিয়া লইলা

পাদ-নখ-কণা তাঁর।

স্থাপিয়া নিভৃত প্রাসাদ-কাননে

তাহারি উপরে রচিলা যতনে

অতি অপরূপ শিলাময় স্তূপ

শিল্পশোভার সার।

সন্ধ্যাবেলায় শুচিবাস পরি

রাজবধূ রাজবালা

আসিতেন, ফুল সাজায়ে ডালায়,

স্তূপপদমূলে সােনার থালায়

আপনার হাতে দিতেন জ্বালায়ে

কনক প্রদীপমালা।

অজাতশত্রু রাজা হল যবে,

পিতার আসনে আসি

পিতার ধর্ম্ম শােণিতের স্রোতে

মুছিয়া ফেলিল রাজপুরী হতে,

সঁপিল যজ্ঞ-অনল-আলােতে

বৌদ্ধ-শস্ত্ররাশি।

কহিলা ডাকিয়া অজাতশত্রু

রাজপুরনারী সবে,—

বেদ ব্রাহ্মণ রাজা ছাড়া আর

কিছু নাই ভবে পূজা করিবার

এই ক’টি কথা জেনে মনে সার-

ভুলিলে বিপদ হবে।

সেদিন শারদ-দিবা-অবসান,—

শ্রীমতী নামে সে দাসী

পুণ্যশীতল সলিলে নাহিয়া

পুষ্প প্রদীপ থালায় বাহিয়া

রাজমহিষীর চরণে চাহিয়া

নীরবে দাঁড়াল আসি।

শিহরি সভয়ে মহিষী কহিলা—

এ কথা নাহি কি মনে

অজাতশত্রু করেছে রটনা-

স্তপে যে করিবে অর্ঘ্যরচনা

শূলের উপরে মরিবে সে জনা

অথবা নির্বাসনে!

সেথা হতে ফিরি গেল চলি ধীরি

বধূ অমিতার ঘরে।

সমূখে রাখিয়া স্বর্ণ-মুকুর

বাঁধিতেছিল সে দীর্ঘ চিকুর,

আঁকিতেছিল সে যত্নে সিঁদুর

সিঁথির সীমার পরে।

শ্রীমতীরে হেরি বাঁকি গেল রেখা

কাঁপি গেল তার হাত,—

কহিল, অবােধ, কি সাহস-বলে

এনেছিস পূজা, এখনি যা চলে’,

কে কোথা দেখিবে, ঘটিবে তাহলে

বিষম বিপদপাত।

অস্ত-রবির রশ্মি-আভায়

খােলা জানালার ধারে

কুমারী শুক্লা বসি একাকিনী

পড়িতে নিরত কাব্য-কাহিনী,

চমকি উঠিল শুনি কিঙ্কিণী

চাহিয়া দেখিল দ্বারে।

শ্রীমতীরে হেরি পুঁথি রাখি ভূমে

দ্রুতপদে গেল কাছে।

কহে সাবধানে তার কানে কানে

রাজার আদেশ আজি কে না জানে,

এমনি করে কি মরণের পানে

ছুটিয়া চলিতে আছে?

দ্বার হতে দ্বারে ফিরিল শ্রীমতী

লইয়া অর্ঘ্যথালি।

“হে পুরবাসিনী” সবে ডাকি কয়,

“হয়েছে প্রভুর পূজার সময়”—

শুনি ঘরে ঘরে কেহ পায় ভয়

কেহ দেয় তারে গালি।

দিবসের শেষ আলােক মিলল।

নগর সৌধপরে!

পথ জনহীন আঁধারে বিলীন,

কলকে’লাহল হয়ে এল ক্ষীণ,

আরতিঘণ্টা ধ্বনিল প্রাচীন

রাজ -দেবালয় ঘরে।

শারদ নিশির স্বচ্ছ তিমিরে

জ্বলে অগণ্য তারা।

সিংহদুয়ারে বাজিল বিষাণ,

বন্দীরা ধরে সন্ধ্যার তান,

"মন্ত্রণাসভা হল সমাধান”

দ্বারী ফুকারিয়া বলে।

এমন সময়ে হেরিলা চমকি

প্রাসাদে প্রহরী যত-

রাজার বিজন কানন মাঝারে

স্তূপপদমূলে গহন আঁধারে

জ্বলিতেছে কেন, যেন সারে সারে

প্রদীপমালার মত।

মুক্তকৃপাণে পুররক্ষক

তখনি ছুটিয়া আসি

শুধাল—“কে তুই ওরে দুর্ম্মতি,

মরিবার তরে করিস্ আরতি!”

মধুর কণ্ঠে শুনিল “শ্রীমতী

আমি বুদ্ধের দাসী।”

সেদিন শুভ্র পাষাণ-ফলকে

পড়িল রক্ত-লিখা।

সেদিন শারদ স্বচ্ছ নিশীথে

প্রাসাদ-কাননে নীরবে নিভৃতে

স্তূপপদমূলে নিবিল চকিতে

শেষ আরতির শিখা।

১৮ই আশ্বিন, ১৩০৬

প্রতিনিধি

প্রতিনিধি

বসিয়া প্রভাত কালে সেতারার দুর্গভালে

শিবাজি হেরিল। একদিন

রামদাস গুরু তাঁর ভিক্ষা মাগি দ্বার দ্বার

কিরিছেন যেন অন্নহীন।

ভাবিলা,—এ কি এ কাণ্ড! গুরুজির ভিক্ষাভাণ্ড!

ঘরে যার নাই দৈন্য লেশ!

সবই যার হস্তগত রাজেশ্বর পদানত

তাঁরো নাই বাসনার শেষ?

এ কেবল দিনে রাত্রে জল ঢেলে ফুটা পাত্রে

বৃথা চেষ্টা তৃষ্ণা মিটাবরে!

কহিলা, দেখিতে হবে কতখানি দিলে তবে

ভিক্ষা ঝুলি ভরে একেবারে।

তখনি লেখনী আনি কি লিখি দিল। কি জানি,

বালাজিরে কহিলা ডাকায়ে

গুরু যবে ভিক্ষা আসে আসিবেন দুর্গ-পাশে

এই লিপি দিয়ো তাঁর পায়ে।

গুরু চলেছেন গেয়ে, সম্মুখে চলেছে ধেয়ে

কত পান্থ, কত অশ্বরথ।—

“হে ভবেশ, হে শঙ্কর, সবারে দিয়েছ ঘর,

আমারে দিয়েছ শুধু পথ।

অন্নপূর্ণ। মা আমার লয়েছে বিশ্বের ভার,

সুখে আছে সর্ব্ব চরাচর,

মােরে তুমি হে ভিখারী মার কাছ হতে কাড়ি

করেছ আপন অনুচর।”

সমাপন করি গান সারিয়া মধ্যাহ্নস্নান

দুর্গদ্বারে আসিলা যখন-

বালাজি নমিয়া তাঁরে দাঁড়াইল একধারে

পদমূলে রাখিয়া লিখন।

গুরু কৌতূহলভরে তুলিয়া লইলা করে,

পড়িয়া দেখিলা পত্রখানি

বন্দি তাঁর পাদপদ্ম শিবাজি সঁপিছে অদ্য

তাঁরে নিজ রাজ্য-রাজধানী।

পর দিনে রামদাস গেলেন রাজার পাশ,

কহিলেন, “পুত্র কহ শুনি

রাজ্য যদি মােরে দেবে কি কাজে লাগিবে এবে

কোন্ গুণ আছে তব, গুণী?”

"তােমারি দাসত্বে প্রাণ আনন্দে করিব দান”

শিবাজি কহিলা নমি তাঁরে,—

গুরু কহে—“এই ঝুলি লহ তবে স্কন্ধে তুলি।

চল আজি ভিক্ষা করিবারে।”

শিবাজি গুরুর সাথে ভিক্ষাপাত্র লয়ে হাতে

ফিরিলেন পুরদ্বারে দ্বারে।

নৃপে হেরি ছেলে মেয়ে ভয়ে ঘরে যায় ধেয়ে

ডেকে আনে পিতারে মাতারে।

অতুল ঐশ্বর্য্যে রত, তার ভিখারীর ব্রত!

এ যে দেখি জলে ভাসে শিলা!

ভিক্ষা দেয় লজ্জাভরে, হস্ত কাঁপে থরথরে,

ভাবে, ইহা মহতের লীলা।

দুর্গে দ্বিপ্রহর বাজে, ক্ষান্ত দিয়া কর্ম্মকাজে

বিশ্রাম করিছে পুরবাসী।

একতারে দিয়ে তান রামদাস গাহে গান

আনন্দনয়নজলে ভাসি;—

“ওহে ত্রিভুবনপতি বুঝি না তােমার মতি,

কিছু ত অভাব তব নাহি,

হৃদয়ে হৃদয়ে তবু ভিক্ষা মাগি ফির প্রভু

সবার সর্ব্বস্বধন চাহি।”

অবশেষে দিবসান্তে নগরের এক প্রান্তে

নদীকূলে সন্ধ্যাস্নান সারি-

ভিক্ষা অন্ন রাঁধি সুখে গুরু কিছু দিলা মুখে

প্রসাদ পাইল শিষ্য তাঁরি।

রাজা তবে কহে হাসি “নৃপতির গর্ব্ব নাশি

করিয়াছ পথের ভিক্ষুক;

প্রস্তুত রয়েছে দাস,— আরো কিবা অভিলাষ,

গুরু কাছে লব গুরু দুখ।”

গুরু কহে “তবে শােন্, করিলি কঠিন পণ

অনুরূপ নিতে হবে ভার,

এই আমি দিমু কয়ে মাের নামে মাের হয়ে

রাজ্য তুমি লহ পুনর্ব্বার।

তোমারে করিল বিধি ভিক্ষুকের প্রতিনিধি,

রাজ্যেশ্বর দীন উদাসীন;

পালিবে যে রাজধর্ম্ম জেনো তাহা মাের কর্ম্ম,

রাজ্য লয়ে রবে রাজ্যহীন।—

বৎস, তবে এই সহ মাের আশীর্ব্বাদসহ

আমার গেরুয়া গাত্রবাস;

বৈরাগীর উত্তরীয় পতাকা করিয়া নিয়ো”

কহিলেন গুরু রামদাস।

নৃপশিষ্য নতশিরে বসি রহে নদীতীরে,

চিন্তারাশি ঘনায় ললাটে।

খামিল রাখাল-বেণু, গােঠে ফিরে গেল ধেনু

পরপারে সূর্য গেল পাটে।

পূরবীতে ধরি তান একমনে রচি গান

গাহিতে লাগিলা রামদাস,—

“আমারে রাজার সাজে বসায়ে সংসার মাঝে

কে তুমি আড়ালে কর বাস!

হে রাজা রেখেছি আনি তােমারি পাদুকাখানি,

আমি থাকি পাদপীঠতলে;

সন্ধ্যা হয়ে এল ওই, আর কত বসে রই!

তব রাজ্যে তুমি এস চলে।”

৬ই কার্তিক, ১৩০৪

অ্যাকওয়ার্থ সাহেব কয়েকটি মারাঠী গাথার যে ইংরাজি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছেন, তাহারই ভূমিকা হইতে বর্ণিত ঘটনা গৃহীত। শিবাজির গেরুয়া পতাকা “ভাগোয়া জেন্দা” নামে খ্যাত।

প্রার্থনাতীত দান

প্রার্থনাতীত দান

পাঠানেরা যবে বাঁধিয়া আনিল

বন্দী শিখের দল-

সুহিদগঞ্জে রক্ত-বরণ

হইল ধরণী তল।

নবাব কহিল–শুন তরুসিং

তােমারে ক্ষমিতে চাই।

তরুসিং কহে মাের কেন তব

এত অবহেলা ভাই?

নবাব কহিল, মহাবীর তুমি

তােমারে না করি ক্রোধ,

বেণীটি কাটিয়া দিয়ে যাও মােরে

এই শুধু অনুরােধ।

তরুসিং কহে করুণা তোমার

হৃদয়ে রহিল গাঁথা—

যা চেয়েছ তার কিছু বেশি দিব।

বেণীর সঙ্গে মাথা।

২রা কার্তিক, ১৩০৬

শিখের পক্ষে বেণীচ্ছেদন ধর্ম্ম পরিত্যাগের ন্যায় দূষনীয়।

বন্দীবীর

বন্দীবীর

পঞ্চ নদীর তীরে

বেণী পাকাইয়া শিরে

দেখিতে দেখিতে গুরুর মন্ত্রে

জাগিয়া উঠেছে শিখ,—

নির্ম্মম নির্ভীক।

হাজার কণ্ঠে গুরুজীর জয় -

ধ্বনিয়া তুলেছে দিক্‌।

নূতন জাগিয়া শিখ,

নূতন উষার সূর্য্যের পানে

চাহিল নির্ণিমিখ।

“অলখ নিরঞ্জন—”

মহারব উঠে বন্ধন টুটে

করে ভয়-ভঞ্জন।

বক্ষের পাশে ঘন উল্লাসে

অসি বাজে ঝঞ্জন।

পাঞ্জাব আজি গরজি উঠিল।

“অলথ নিরঞ্জন।”

এসেছে সে এক দিন

লক্ষ পরাণে শঙ্কা না জানে

না রাখে কাহারাে ঋণ।

জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য,

চিত্ত ভাবনা হীন।

পঞ্চ নদীর ঘিরি দশতীর

এসেছে সে এক দিন।

দিল্লী-প্রাসাদ-কূটে

হােথা বারবার বাদশাজাদার

তন্দ্রা যেতেছে ছুটে।

কাদের কণ্ঠে গগন মন্থে,

নিবিড় নিশীথ টুটে,

কাদের মশালে আকাশের ভালাে

আগুন উঠেছে ফুটে।

পঞ্চ নদীর তীরে

ভক্ত দেহের রক্তলহরী

মুক্ত হইল কিরে!

লক্ষ বক্ষ চিরে

ঝাঁকে ঝাঁকে প্রাণ পক্ষীসমান

ছুটে যেন নিজ নীড়ে।

বীরগণ জননীরে

রক্ত তিলক ললাটে পরাল

পঞ্চ নদীর তীরে।

মােগল শিখের রণে

মরণ-আলিঙ্গনে

কণ্ঠ পাকড়ি ধরিল আঁকড়ি

দুই জনা দুই জনে।

দংশন-ক্ষত শ্যেন বিহঙ্গ

যুঝে ভুজঙ্গ সনে।

সেদিন কঠিন রণে

“জয় গুরুজীর” হাঁকে শিখবীর

সুগভীর নিঃস্বনে।

মত্ত মােগল রক্তপাগল

“দীন দীন” গরজনে।

গুরুদাসপুর গড়ে

বন্দা যখন বন্দী হইল

তুরাণী সেনার করে

সিংহের মত শৃঙ্খলগত

বাঁধি লয়ে গেল ধরে

দিল্লী নগর পরে।

বন্দা সমরে বন্দী হইল

গুরুদাসপুর গড়ে।

সম্মুখে চলে মােগল সৈন্য

উড়ায়ে পথের ধূলি,

ছিন্ন শিখের মুণ্ড লইয়া

বর্ষাফলকে তুলি।

শিখ সাত শত চলে পশ্চাতে

বাজে শৃঙ্খলগুলি।

রাজপথ পরে লোক নাহি ধরে

বাতায়ন যায় খুলি।

শিখ গরজয় গুরুজীর জয়

পরাণের ভয় ভুলি।

মােগলে ও শিখে উড়াল আজিকে

দিল্লী-পথের ধূলি।

পড়ি গেল কাড়াকাড়ি,

আগে কেবা প্রাণ করিবেক দান।

তারি লাগি তাড়াতাড়ি।

দিন গেলে প্রাতে ঘাতকের হাতে

বন্দীরা সারি সারি

“জয় গুরুজীর” কহি শত বীর

শত শির দেয় ডারি।

সপ্তাহকালে সাত শত প্রাণ

নিঃশেষ হয়ে গেলে

বন্দার কোলে কাজি দিল তুলি

বন্দার এক ছেলে;

কহিল, ইহারে বধিতে হইবে

নিজ হাতে অবহেলে।

দিল তার কোলে ফেলে-

কিশাের কুমার বাঁধা বাহু তার

বন্দার এক ছেলে।

কিছু না কহিল বাণী,

বন্দা সুধীরে ছােট ছেলেটিরে

লইল বক্ষে টানি।

ক্ষণকালতরে মাথার উপরে

রাখে দক্ষিণপাণি,

শুধু একবার চুম্বিল তার

রাঙা উষ্ণীষখানি।

তার পরে ধারে কটিবাস হতে

ছুরিকা খসায়ে আনি-

বালকের মুখ চাহি

"গুরুজীর জয়” কানে কানে কয়—

“রে পুত্র, ভয় নাহি!”

নবীন বদনে অভয় কিরণ

জ্বলি উঠে উৎসাহি’-

কিশােরকণ্ঠে কাঁপে সভাতল

বালক উঠিল গাহি—

"গুরুজীর জয়, কিছু নাহি ভয়”

বন্দার মুখ চাহি।

বন্দা তখন বামবাহুপাশ

জড়াইল তার গলে,—

দক্ষিণ করে ছেলের বক্ষে

ছুরি বসাইল বলে-

গুরুজীর জয় কহিয়া বালক

লুটাল ধরণীতলে।

সভা হল নিস্তব্ধ।

বন্দার দেহ ছিঁড়িল ঘাতক

সাঁড়াশি করিয়ায় দগ্ধ।

স্থির হয়ে বীর মরিল, না করি

একটি কাতর শব্দ।

দর্শকজন মুদিল নয়ন,

সভা হল নিস্তব্ধ।

৩০শে আশ্বিন, ১৩০৬

বিচারক

বিচারক

পুণ্য নগরে রঘুনাথ রাও

পেশােয় নৃপতি বংশ;—

রাজাসনে উঠি কহিলেন বীর-

হরণ করিব ভার পৃথিবীর,

মৈসুরপতি হৈদরালির

দর্প করিব ধ্বংস।

দেখিতে দেখিতে পূরিয়া উঠিল।

সেনানী আশি সহস্র।

নানা দিকে দিকে নানা পথে পথে

মারাঠার যত গিরিদরী হতে

বীরগণ যেন শ্রাবণের স্রোতে

ছুটিয়া আসে অজস্র।

উড়িল গগনে বিজয়পতাকা

ধ্বনিল শতেক শঙ্খ।

হুলুরব করে অঙ্গনা সবে,

মারাঠা নগরী কঁপিল গরবে,

রহিয়া রহিয়া প্রলয় আরবে

বাজে ভৈরব ডঙ্ক।

ধূলার আড়ালে ধ্বজ-অরণ্যে

লুকাল প্রভাত সূর্য্য।

রক্ত অশ্বে রঘুনাথ চলে,

আকাশ বধির জয়-কোলাহলে;

সহসা যেন কি মন্ত্রের বলে

থেমে গেল রণ তুর্য্য।

সহসা কাহার চরণে ভূপতি

জানাল পরম দৈন্য?

সমরােন্মাদে ছুটিতে ছুটিতে

সহসা নিমেষে কার ইঙ্গিতে

সিংহদুয়ারে থামিল চকিতে

আশি সহস্র সৈন্য?

ব্রাহ্মণ আসি দাঁড়াল সমুখে

ন্যায়াধীশ রামশাস্ত্রী।

দুই বাহু তাঁর তুলিয়া উধাও

কহিলেন ডাকিঃ- রঘুনাথ রাও

নগর ছাড়িয়া কোথা চলে যাও

না লয়ে পাপের শাস্তি?

নীরব হইল জয়-কোলাহল,

নীরব সমর বাদ্য।

প্রভু কেন আজি—কহে রঘুনাথ,—

অসময়ে পথ রুধিলে হঠাৎ,

চলেছি করিতে যবন-নিপাত

যােগাতে যমের খাদ্য।

কহিলা শাস্ত্রী, বধিয়াছ তুমি

আপন ভ্রাতার পুত্রে।

বিচার তাহার না হয় য’দিন

ততকাল তুমি নহত স্বাধীন,

বন্দী রয়েছ অমােঘ কঠিন

ন্যায়ের বিধান সূত্রে।

রুষিয়া উঠিলা রঘুনাথ রাও,

কহিলা করিয়া হাস্য,—

নৃপতি কাহারাে বাঁধন না মানে,

চলেছি দীপ্ত মুক্ত কৃপাণে,

শুনিতে আসিনি পথমাঝখানে

ন্যায় বিধানের ভাষ্য।

কহিলা শাস্ত্রী, রঘুনাথরাও,

যাও কর গিয়ে যুদ্ধ।

আমিও দণ্ড ছাড়িনু এবার,

ফিরিয়া চলিনু গ্রামে আপনার,

বিচারশালার খেলাঘরে আর

না রহিব অবরুদ্ধ।

বাজিল শঙ্খ, বাজিল ডঙ্ক,

সেনানী ধাইল ক্ষিপ্র।

ছাড়ি দিয়া গেলা গৌরবপদ,

দূরে ফেলি দিল। সব সম্পদ,

গ্রামের কুটীরে চলি গেল। ফিরে

দীন দরিদ্র বিপ্র।

৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৩০৬

বিবাহ

বিবাহ

(রাজস্থান )

প্রহরখানেক রাত হয়েছে শুধু,

ঘন ঘন বেজে ওঠে শাঁখ।

বর-কন্যা যেন ছবির মত

আঁচল বাঁধা দাঁড়িয়ে আঁখি-নত,

জানলা খুলে পুরাঙ্গনা যত

দেখচে চেয়ে ঘােমটা করি ফাঁক।

বর্ষারাতে মেঘের গুরু গুরু

তারি সঙ্গে বাজে বিয়ের শাঁখ।

ঈশান কোনে থম্‌কে আছে হাওয়া,

মেঘে মেঘে আকাশ আছে যেরি।

সভাকক্ষে হাজার দীপালােকে

মণিমালায় ঝিলিক্ হানে চোখে;

সভার মাঝে হঠাৎ এল ও কে!

বাহির দ্বারে বেজে উঠল ভেরী।

চমকে ওঠে সভার যত লােকে,

উঠে দাঁড়ায় বর-কনেরে ঘেরি।

টোপর পরা মেত্রি-রাজকুমারে

কহে তখন মাড়ােয়ারের দূত-

“যুদ্ধ বাধে বিদ্রোহীদের সনে,

রাম সিংহ রাণা চলেন রণে,

তােমরা এস তাঁরি নিমন্ত্রণে

যে যে আছ মর্ত্তিয়া রাজপুত।”

জয় রাণ। রামসিঙের জয়-

গর্জ্জি উঠে মাড়ােয়ায়ের দূত।

জয় রাণা রামসিঙের জয়-

মেত্রিপতি উৰ্দ্ধস্বরে কয়।

কনের বক্ষ কেঁপে ওঠে ডরে,

দুটি চক্ষু ছল-ছল করে,

বরযাত্রী হাঁকে সমস্বরে

জয়রে রাণা রামসিঙের জয়।

“সময় নাহি মেত্রি রাজকুমার”

মহারাণার দূত উচ্চে কয়।

বৃথা কেন উঠে হুলুধ্বনি

বৃথা কেন বেজে ওঠে শাঁখ।

বাঁধা আচল খুলে ফেলে বর,

মুখের পানে চাহে পরম্পর,

কহে -“প্রিয়ে নিলেম অবসর,

এসেছে ঐ মৃত্যুসভার ডাক।”

বৃথা এখন ওঠে হুলুধ্বনি,

বৃথা এখন বেজে ওঠে শাঁখ।

বরের বেশে টোপর পরি শিরে

ঘােড়ায় চড়ি ছুটে রাজকুমার।

মলিনমুখে নম্র নতশিরে

কন্যা গেল অন্তঃপুরে ফিরে,

হাজার বাতি নিবল ধীরে ধীরে

রাজার সভা হল অন্ধকার।

গলায় মালা টোপর-পরা শিরে

ঘােড়ায় চড়ি ছুটে রাজকুমার।

মাতা কেঁদে কহেন—বধূ-বেশ

খুলিয়া ফেল্‌ হায় রে হতভাগী!

শান্তভাষে কন্যা কহে মায়ে-

কেঁদনা মা ধরি তােমার পায়ে!

বধূসজ্জা থাক্ মা আমার গায়ে

মেত্রি-পুরে যাইব তাঁর লাগি।

শুনে মাতা কপালে কর হানি

কেঁদে কহেন—হায় রে হতভাগী!

গ্রহবিপ্র আশীর্ব্বাদ করি

ধানদূর্ব্বা দিল তাহার মাথে।

চড়ে কন্যা চতুর্দ্দোলা পরে,

পুরনারী হুলুধ্বনি করে,

রঙীন বেশে কিঙ্করী কিঙ্করে

সারি সারি চলে বালার সাথে।

মাতা আসি চুমো খেলেন মুখে,

পিতা আসি হস্ত দিলেন মাথে।

নিশীথ রাতে আকাশ আলাে করি

কে এল রে মেত্রিপুর দ্বারে।

“থামাও বাঁশি” কহে “থামাও বাঁশি-

চতুর্দ্দোলা নামাও রে দাস দাসী,

মিলেছি আজ মেত্রি-পুরবাসী

মেত্রিপতির চিতা রচিবারে।

মেত্রিরাজা যুদ্ধে হত আজি

দুঃসময়ে কারা এলে দ্বারে!”

"বাজাও বাঁশি ওরে বাজাও বাঁশি"

চতুর্দ্দোলা হতে বধূ বলে।

এবার লগ্ন নাহি হবে পার,

আঁচলের গাঁঠ খুলবে নাক আর,

শেষমন্ত্র পড়িব এইবার

শ্মশান সভায় দীপ্ত চিতানলে।

বাজাও বাঁশি ওরে বাজাও বাঁশি

চতুর্দ্দোলা হতে বধু বলে।

বরের বেশে মােতির মালা গলে

মেত্রিপতি চিতার পরে শুয়ে।

দোলা হতে নামল আসি নারী,

আঁচল বাঁধি’ রক্তবাসে তাঁরি

শিয়র পরে বৈসে রাজকুমারী

বরের মাথা কোলের পরে থুয়ে।

নিশীথ রাতে বরসজ্জা পরা

মেত্রিপতি চিতার পরে শুয়ে।

ঘন ঘন করি হুলুধ্বনি

দলে দলে আসে পুরাঙ্গনা।

পুরুত কহে- ধন্য সুচরিতা,

গাহিছে ভাট—ধন্য মৃত্যুজিতা,—

ধূধূ করে জ্বলে উঠল চিতা,—

কন্যা বসে আছেন যোগাসনা।

জয়ধ্বনি উঠে শ্মশান মাঝে,

হুলুধ্বনি করে পুরাঙ্গনা।

১১ই কার্তিক, ১৩০৬

বিসর্জ্জন

বিসর্জ্জন

দুইটি কোলের ছেলে গেছে পর-পর

বয়স না হতে হতে পূরা দু’বছর।

এবার ছেলেটি তার জন্মিল যখন-

স্বামীরেও হারাল মল্লিকা। বন্ধুজন

বুঝাইল,—পূর্ব্বজন্মে ছিল বহু পাপ

এ জনমে তাই হেন দারুণ সন্তাপ।

শােকানলদগ্ধ নারী একান্ত বিনয়ে

অজ্ঞাত জন্মের পাপ শিরে বহি লয়ে

প্রায়শ্চিত্তে দিল মন।মন্দিরে মন্দিরে

যেথা সেথা গ্রামে গ্রামে পূজা দিয়া ফিরে;

ব্রতধ্যান উপবাসে আহ্নিকে তর্পণে

কাটে দিন ধূপে দীপে নৈবেদ্যে চন্দনে

পূজাগৃহে; কেশে বাঁধি রাখিল মাদুলি

কুড়াইয়া শত ব্রাহ্মণের পদধূলি;—

শুনে রামায়ণ কথা,—সন্যাসী সাধুরে

ঘরে আনি আশীর্ব্বাদ করায় শিশুরে।

বিশ্বমাঝে আপনারে রাখি সর্ব্বনীচে

সবার প্রসন্ন দৃষ্টি অভাগী মাগিছে

আপন সন্তান লাগি। সূর্য্য চন্দ্র হতে

পশু পক্ষী পতঙ্গ অবধি—কোন মতে

কেহ পাছে কোন অপরাধ লয় মনে

পাছে কেহ করে ক্ষোভ, অজানা কারণে

পাছে কারো লাগে ব্যথা—সকলের কাছে

আকুল বেদনাভরে দীন হয়ে আছে।

যখন বছর দেড় বয়স শিশুর-

যকৃতের ঘটিল বিকার; জ্বরাতুর

দেহখানি শীর্ণ হয়ে আসে। দেবালয়ে

মানিল মনৎ মাতা, পদামৃত লয়ে

করাইল পান, হরিসঙ্কীর্ত্তন গানে

কাঁপিল প্রাঙ্গণ। ব্যাধি শান্তি নাহি মানে।

কাঁদিয়া শুধাল নারী—ব্রাহ্মণ ঠাকুর,

এত দুঃখে তবু পাপ নাহি হল দূর?

দিনরাত্রি দেবতার মেনেছি দোহাই,

দিয়েছি এত যে পূজা তবু রক্ষা নাই?

তবু কি নেবেন তাঁরা আমার বাছারে?

এত ক্ষুধা দেবতার? এত ভারে ভারে

নৈবেদ্য নিলাম খেতে বেচিয়া গহনা,

সর্ব্বস্ব খাওয়ানু তবু ক্ষুধা মিটিল না?

ব্রাহ্মণ কহিল –“বাছা এযে ঘাের কলি!

অনেক করেছ বটে তবু এও বলি

আজকাল তেমন কি ভক্তি আছে কারো,

সত্যযুগে যা পারিত তা কি আজ পারো?

দানবীর কর্ণ কাছে ধর্ম্ম যবে এসে

পুত্রেরে চাহিল খেতে ব্রাহ্মণের বেশে

নিজহস্তে সন্তানে কাটিল। তখনি সে।

শিশুরে ফিরিয়া পেল চক্ষের নিমেষে।

শিবি রাজা শ্যেনরূপী ইন্দ্রের মুখেতে

আপন বুকের মাংস কাটি দিল খেতে-

পাইল অক্ষয় দেহ! নিষ্ঠা এরে বলে।

তেমন কি একালেতে আছে ভূমগুলে?

মনে আছে ছেলেবেলা গল্প শুনিয়াছি।

মার কাছে—তাঁদের গ্রামের কাছাকাছি

ছিল এক বন্ধ্যা নারী,—না পাইয়া পথ

প্রথম গর্ভের ছেলে করিল মানত

মা গঙ্গার কাছে; শেষে পুত্রজন্মপরে

অভাগী বিধবা হল; গেল সে সাগরে,

কহিল সে নিষ্ঠাভরে মা গঙ্গারে ডেকে-

মা, তােমারি কোলে আমি দিলাম ছেলেকে-

এ মাের প্রথম পুত্র, শেষ পুত্র এই,

এ জন্মের তরে আর পুত্রআশা নেই।

যেমনি জলেতে ফেলা, মাতা ভাগীরথী

মকবাহিনী রূপে হয়ে মূর্তিমতী

শিশুলয়ে আপনার পদ্মকরতলে

মার কোলে সমর্পিল! নিষ্ঠা এরে বলে।”

মল্লিকা ফিরিয়া এলো নতশির করে -

আপনারে ধিক্কারিল,—এতদিন ধরে

বৃথা ব্রত করিলাম, বৃথা দেবার্চ্চনা,—

নিষ্ঠাহীনা পাপিষ্ঠারে ফল মিলিল না।

ঘরে ফিরে এসে দেখে শিশু অচেতন

জরাবেশে। অঙ্গ যেন অগ্নির মতন;

ঔষধ গিলাতে যায় যত বারবার

পড়ে যায়—কণ্ঠ দিয়া নামিল না আর।

দন্তে দন্তে গেল আঁটি। বৈদ্য শির নাড়ি

ধীরে ধীরে চলি গেল রােগী-গৃহ ছাড়ি।

সন্ধ্যার আঁধারে শূন্য বিধবার ঘরে

একটি মলিন দীপ শয়নশিয়রে,

এক শােকাতুরা নারী। শিশু একবার

জ্যোতিহীন আঁখি মেলি যেন চারিধার

খুঁজিল কাহারে। নারী কাঁদিল কাতর-

ও মাণিক ওরে সোনা, এই যে মা তাের,

এই যে মায়ের কোল, ভয় কিরে বাপ!-

বক্ষে তারে চাপি ধরি তার জ্বর-তাপ

চাহিল কাড়িয়া নিতে অঙ্গে আপনার

প্রাণপণে। সহসা বাতাসে গৃহদ্বার।

খুলে গেল; ক্ষীণ দীপ নিবিল তখনি,—

সহসা বাহির হতে কল কলধ্বনি

পশিল গৃহের মাঝে। চমকিয়া নারী

দাঁড়ায়ে উঠিল বেগে শয্যাতল ছাড়ি,

কহিল, মায়ের ডাক ওই শুনা যায়—

ও মাের দুঃখীর ধন, পেয়েছি উপায়—

তাের মার কোল চেয়ে সুশীতল কোল

আছে ওরে বাছা!-জাগিয়াছে কলরােল

অদূরে জাহ্নবীজলে,—এসেছে জোয়ার

পূর্ণিমায়। শিশুর তাপিত দেহভার

বক্ষে লয়ে মাতা গেল শূন্য ঘাটপানে।

কহিল, না, মার ব্যথা যদি বাজে প্রাণে

তবে এ শিশুর তাপ দেগে মা জুড়ায়ে।

একমাত্র ধন মাের দিমু তাের পায়ে

একমনে।—এত বলি সমর্পিল জলে।

অচেতন শিশুটিরে লয়ে করতলে,

চক্ষু মুদি। বহুক্ষণ আঁখি মেলিল না।

ধ্যানে নিরখিল বসি, মকরবাহনা

জ্যোতির্ম্ময়ী মাতৃমূর্ত্তি ক্ষুদ্র শিশুটিরে

কোলে করে এসেছেন, রাখি তার শিরে

একটি পদ্মের দল; হাসিমুখে ছেলে

অনিন্দিত কান্তি ধরি, দেবীকোল ফেলে

মার কোলে আসিবারে বাড়ায়েছে কর।

কহে দেবী -রে দুঃখিনী এই তুই ধর

তাের ধন তাের দিনু।—রােমাঞ্চিতকায়

নয়ন মেলিয়া কহে—“কই মা!—কোথায়!”

পরিপূর্ণ চন্দ্রালােকে বিহ্বলা রজনী;

গঙ্গা বহি চলি যায় করি কলধ্বনি।

চীৎকারি উঠিল নারী—দিবিনে ফিরায়ে?

মর্মরিল বনভূমি দক্ষিণের বায়ে।

২৪শে আশ্বিন, ১৩০৬

মস্তক বিক্রয়

মস্তক বিক্রয়

(মহাবস্ত্ববদান )

কোশল নৃপতির তুলনা নাই,

জগৎ জুড়ি যশােগাথা;

ক্ষীণের তিনি সদা শরণ ঠাই,

দীনের তিনি পিতামাতা।

সে কথা কাশীরাজ শুনতে পেয়ে

জ্বলিয়া মরে অভিমানে;—

“আমার প্রজাগণ আমার চেয়ে

তাহারে বড় করি মানে!

আমার হতে যার আসন নীচে

তাহার দান হল বেশি!

ধর্ম্ম দয়া মায়ী সকলি মিছে,

এ শুধু তার রেষারেষি।”

কহিলা “সেনাপতি, ধর কৃপাণ,

সৈন্য কর সব জড়!

আমার চেয়ে হবে পুণ্যবান্,

স্পর্ধা বাড়িয়াছে বড়।”

চলিল কাশীরাজ যুদ্ধসাজে,

কোশলরাজ হারি রণে

রাজ্য ছাড়ি দিয়া ক্ষুব্ধ লাজে

পলায়ে গেল দূরবনে।

কাশীর রাজা হাসি কহে তখন

আপন সভাসদ মাঝে-

“ক্ষমতা আছে যার রাখিতে ধন

তারেই দাতা হওয়া সাজে।”

সকলে কাঁদি বলে—“দারুণ রাহু।

এমন চাঁদেরেও হানে!

লক্ষ্মী খোঁজে শুধু বলীর বাহু।

চাহে না ধর্ম্মের পানে।”-

“আমরা হইলাম পিতৃহারা”—

কাঁদিয়া কহে দশদিক্‌-

“সকল জগতের বন্ধু যারা।

তাঁদের শত্রুরে ধিক!”

শুনিয়া কাশীরাজ উঠিল রাগি’

“নগরে কেন এত শােক!

আমি ত আছি তবু কাহার লাগি

কাঁদিয়া মরে যত লােক!

আমার বাহুবলে হারিয়া তবু

আমারে করিবে সে জয়!

অরির শেষ নাহি রাখিবে কভু

শাস্ত্রে এই মত কয়।

মন্ত্রী রটি দাও নগর মাঝে,

ঘােষণা কর চারিধারে—

যে ধরি আনি দিবে কোশলরাজে

কনক শত দিব তারে।”

ফিরিয়া রাজদূত সকল বাটি

রটনা করে দিনরাত।

যে শােনে, আঁখি মুদি রসনা কাটি

শিহরি কানে দেয় হাত।

রাজ্যহীন রাজা গহনে ফিরে

মলিন চীর দীনবেশে।

পথিক একজন অশ্রুনীরে

একদা শুধাইল এসে,—

“কোথা গো বনবাসী বনের শেষ,

কোশলে যাব কোন্ মুখে!”

শুনিয়া রাজা কহে, “অভাগা দেশ,

সেথায় যাবে কোন্ দুখে?”

পথিক কহে “আমি বণিকজাতি,

ডুবিয়া গেছে মাের তরী।

এখন্ দ্বারে দ্বারে হস্ত পাতি

কেমনে রব প্রাণ ধরি।

করুণা-পারাবার কোশলপতি

শুনেছি নাম চারিধারে,

অনাথনাথ তিনি দীনের গতি,

চলেছে দীন তাঁরি দ্বারে।”

শুনিয়া নৃপসুত ঈষৎ হেসে

রুধিলা নয়নের বারি,

নীরবে ক্ষণকাল ভাবিয়া শেষে

কহিলা নিশ্বাস ছাড়ি,—

“পান্থ যেথা তব বাসনা পূরে

দেখায়ে দিব তারি পথ।

এসেছ বহু দুখে অনেক দূরে

সিদ্ধ হবে মনােরথ।”

বসিয়া কাশীরাজ সভার মাঝে;

দাঁড়াল জটাধারী এসে।

“হেথায় আগমন কিসের কাজে?”

নৃপতি শুধাইল হেসে।

“কোশলরাজ আমি, বন ভবন”

কহিলা বনবাসী ধীরে,—

“আমার ধরা পেলে যা দিবে পণ

দেহ তা মাের সাথীটিরে।”

উঠিল চমকিয়া সভার লােকে,

নীরব হল গৃহতল,

বর্ম্ম-আবরিত দ্বারীর চোখে

অশ্রু করে ছলছল।

মৌন রহি রাজা ক্ষণেক তরে

হাসিয়া কহে—“ওহে বন্দী,

মরিয়া হবে জয়ী আমার পরে

এমনি করিয়াছ ফন্দী!

তােমার সে আশায় হানিব বাজ,

জিনিব আজিকার রণে,

রাজ্য ফিরি দিব, হে মহারাজ,

হৃদয় দিব তারি সনে।”

জীর্ণ-চীর-পরা বনবাসীরে

বসাল নৃপ রাজাসনে,

মুকুট তুলি দিল মলিন শিরে,

ধন্য কহে পুরজনে।

২১শে কার্তিক, ১৩০৪

মানী

মানী

আরঙজেব ভারত যবে

করিতেছিল খান্-খান্-

মারব পতি কহিল আসি

করহ প্রভু অবধান-

গােপনরাতে অচলগড়ে

নহর যারে এনেছে ধরে’

বন্দী তিনি আমার ঘরে

সিরােহিপতি সুরতান,

কি অভিলাষ তাঁহার পরে

আদেশ মোরে কর দান।

শুনিয়া কহে আরঙজেব

কি কথা শুনি অদভূত।

এতদিনে কি পড়িল ধরা

অশনিভরা বিদ্যুৎ?

পাহাড়ী লয়ে কয়েক শত

পাহাড়ে বনে ফিরিতে রত,

মরুভূমির মরীচিমত

স্বাধীন ছিল রাজপুত।

দেখিতে চাহি,—আনিতে তারে

পাঠাও কোন রাজদূত।

মাড়োয়া-রাজ যশােবন্ত

কহিলা। তবে ষোড়কর,—

ক্ষত্রকুল-সিংহশিশু

লয়েছে আজি মাের ঘর,—

বাদশা তাঁরে দেখিতে চান।

বচন আগে করুন দান

কিছুতে কোন অসম্মান

হবে না কভু তাঁর পর,—

সভায় তবে আপনি তাঁয়ে

আনিব করি সমাদর।

আরঙজেব কহিলা হাসি

কেমন কথা কহ আজ।

প্রবীন তুমি প্রবল বীর

মাড়ােয়াপতি মহারাজ।

তােমার মুখে এমন বাণী

শুনিয়া মনে সরম মানি,

মানীর মান করিব হানি

মানীরে শােভে হেন কাজ?

কহিনু আমি, চিন্তা নাহি,

আনহ তাঁরে সভামাঝ।

সিরােহিপতি সভায় আসে

মাড়ােয়ারাজে লয়ে সাথ;

উচ্চশির উচ্চে রাখি

সমুখে কবে আঁখিপাত।

কহিল সবে বজ্রনাদে

“সেলাম কর বাদশাজাদে,”—

হেলিয়া যশােবন্ত-কাঁধে

কহিলা ধীরে নরনাথ,—

গুরুজনের চরণ ছাড়া

করিনে কারে প্রণিপাত।

কহিলা রােষে রক্ত আঁখি

বাদসাহের অনুচর-

“শিখাতে পারি কেমনে মাথা

লুটিয়া পড়ে ভূমিপর।”

হাসিয়া কহে সিরােহিপতি

“এমন যেন না হয় মতি

ভয়েতে কারে করিব নতি,

জানিনে কভু ভয় ডর।”

এতেক বলি দাঁড়াল রাজা

কৃপাণ পরে করি ভর।

বাদশা ধরি সুরতানেরে

বসায়ে নিল নিজপাশ।

কহিলা, বীর, ভারত মাঝে

কি দেশ পরে তব আশ?

কহিলা রাজা “অচলগড়

দেশের সেরা জগত-পর”,

সভার মাঝে পরস্পর

নীরবে উঠে পরিহাস।

বাশা কহে “অচল হয়ে

অচলগড় কর বাস।”

১লা কার্তিক, ১৩০৬

মূল্য প্রাপ্তি

মূল্য প্রাপ্তি

( অবদাতশতক)

অঘ্রাণে শীতের রাতে নিষ্ঠুর শিশিরঘাতে

পদ্মগুলি গিয়াছে মরিয়া।

সুদাস মালীর ঘরে কাননের সরােবরে

একটি ফুটেছে কি করিয়া।

তুলি লয়ে, বেচিবারে গেল সে প্রাসাদদ্বারে,

মাগিল রাজার দরশন,—

হেনকালে হেরি ফুল আনন্দে পুলকাকুল

পথিক কহিল একজন:—

অকালের পদ্ম তব আমি এটি কিনি লব

কত মূল্য লইবে ইহার?

বুদ্ধ ভগবান আজ এসেছেন পুরমাঝ

তাঁর পায়ে দিব উপহার।

মালী কহে এক মাষা স্বর্ণ পাব মনে আশা-

পথিক চাহিল তাহা দিতে,—

হেনকালে সমারােহে বহু পূজা অর্ঘ্য বহে

নৃপতি বাহিরে আচম্বিতে।

রাজেন্দ্র প্রসেনজিত উচ্চারি মঙ্গলগীত

চলেছেন বুদ্ধ দরশনে-

হেরি অকালের ফুল- শুধালেন, কত মুল?

কিনি দিব প্রভুর চরণে।

মালি কহে হে রাজন স্বর্ণ মাষা দিয়ে পণ

কিনিছেন এই মহাশয়।

দশ মাষা দিব আমি- কহিলা ধরণীস্বামী,

বিশ মাষা দিব পান্থ কয়।

দোঁহে কহে দেহ দেহ, হার নাহি মানে কেহ,

মূল্য বেড়ে ওঠে ক্রমাগত।

মালী ভাবে যার তরে এ দোঁহে বিবাদ করে

তাঁরে দিলে আরাে পাব কত?

কহিল সে কর মােড়ে দয়া করে ক্ষম মোরে-

এ ফুল বেচিতে নাহি মন।

এত বলি ছুটিল সে যেথা রয়েছেন ব’সে

বুদ্ধদেব উজলি কানন।

বসেছেন পদ্মাসনে প্রসন্ন প্রশান্তমনে,

নিরঞ্জন আনল মূরতি।

দৃষ্টি হতে শান্তি ঝরে স্ফুরিছে অধরপরে

করুণার সুধাহাস্যজ্যোতি।

সুদাস রহিল চাহি,— নয়নে নিমেষ নাহি,

মুখে তার বাক্য নাহি সরে।

সহসা ভুতলে পড়ি পদ্মটি রাখিল ধরি

প্রভুর চরণপদ্ম পরে।

বরষি অমৃতরাশি বুদ্ধ শুধালেন হাসি

কহ বৎস কি তব প্রার্থনা!

ব্যাকুল সুদাস কহে- প্রভু আর কিছু নহে,

চরণের ধূলি এককণা।

২৬শে আশ্বিন, ১৩০৬

রাজ-বিচার

রাজ-বিচার

(রাজস্থান)

বিপ্র কহে—“রমণী মাের

আছিল যেই ঘরে

নিশীথে সেথা পশিল চোর

ধর্ম্মনাশ তরে।

বেঁধেছি তারে, এখন কহ

চোরে কি দিব সাজা?”

“মৃত্যু” শুধু কহিলা তারে

রতনরাও রাজা।

ছুটিয়া আসি কহিল দূত-

“চোর সে যুবরাজ।

বিপ্র তাঁরে ধরেছে রাতে,

কাটিল প্রাতে আজ।

ব্রাহ্মণেরে এনেছি ধরে

কি তারে দিবে সাজা?”

“মুক্তি দাও” কহিলা শুধু

রতনরাও রাজা।

৪ঠা কার্তিক, ১৩০৬

শেষ শিক্ষা

শেষ শিক্ষা

একদিন শিখগুরু গােবিন্দ নির্জ্জনে

একাকী ভাবিতেছিলা আপনার মনে

শ্রান্ত দেহে সন্ধ্যাবেলা—হেনকালে এসে

পাঠান কহিল তাঁরে, যাব চলি দেশে,

ঘােড়া যে কিনেছ তুমি দেহ তার দাম।

কহিল গােবিন্দ গুরু—শেখজি সেলাম,

মূল্য কালি পাবে আজি ফিরে যাও ভাই।—

পাঠান কহিল রােষে, মূল্য আজই চাই।

এত বলি জোর করি ধরি তাঁর হাত-

চোর বলি দিল গালি। শুনি অকস্মাৎ

গােবিন্দ বিজুলি-বেগে খুলি নিল অসি,

পলকে সে পাঠানের মুণ্ড গেল খসি,

রক্তে ভেসে গেল ভূমি। হেরি নিজ কাজ

মাথা নাড়ি কহে গুরু, বুঝিলাম আজ

আমার সময় গেছে। পাপ তরবার

লঙ্ঘন করিল আজি লক্ষ্য আপনার

নিরর্থক রক্তপাতে। এ বাহুর পরে

বিশ্বাস ঘুচিয়া গেল চিরকাল তরে।

ধুয়ে মুছে যেতে হবে এ পাপ এ লাজ

আজ হতে জীবনের এই শেষ কাজ।

পুত্র ছিল পাঠানের বয়স নবীন

গােবিন্দ লইল তারে ডাকি। রাত্রি দিন

পালিতে লাগিল তারে সন্তানের মত

চোখে চোখে। শাস্ত্র আর শস্ত্রবিদ্যা যত

আপনি শিখাল তারে। ছেলেটির সাথে

বৃদ্ধ সেই বীরগুরু সন্ধ্যায় প্রভাতে

খেলিত ছেলের মত। ভক্তগণ দেখি

গুরুরে কহিল আসি—এ কি প্রভু এ কি?

আমাদের শঙ্কা লাগে। ব্যাঘ্র শাবকেরে

যত যত্ন কর তার স্বভাব কি ফেরে?

যখন সে বড় হবে তখন নখর।

গুরুদেব, মনে রেখো, হবে যে প্রখর।

গুরু কহে, তাই চাই, বাঘের বাচ্ছারে

বাঘ না করিনু যদি কি শিখানু তারে?

বালক যুবক হল গােবিন্দের হাতে

দেখিতে দেখিতে। ছায়াহেন ফিরে সাথে,

পুত্রহেন করে তাঁর সেবা। ভালবাসে

প্রাণের মতন-সদা জেগে থাকে পাশে

ডান হস্ত যেন। যুদ্ধে হয়ে গেছে গত

শিখগুরু গােবিনের পুত্র ছিল যত,—

আজি তাঁর প্রৌঢ়কালে পাঠান তনয়

জুড়িয়া বসিল আসি শূন্য সে হৃদয়

গুরুজীর। বাজে-পােড়া বটের কোটরে"

বাহির হইতে বীজ পডি বায়ুভরে

বৃক্ষ হয়ে বেড়ে বেড়ে কবে ওঠে ঠেলি,

বৃদ্ধ বটে ঢেকে ফেলে ডালপালা মেলি।

একদা পাঠান কহে নমি গুরু পায়,

শিক্ষা মাের সারা হল চরণকৃপায়,

এখন আদেশ পেলে নিজ ভুজবলে।

উপার্জন করি গিয়া রাজ সৈন্যদলে।

গােবিন কহিলা তার পিঠে হাত রাখি—

আছে তব পৌরুষের এক শিক্ষা বাকি।

পর দিন বেলা গেলে গােবিন্দ একাকী

বাহিরিলা,—পাঠানেরে কহিলেন ডাকি

অস্ত্র হাতে এস মােরা সাথে। ভক্তদল

সঙ্গে যাব সঙ্গে যাব করে কোলাহল—

গুরু কন, যাও সবে ফিরে। দুই জনে

কথা নাই, ধীরগতি চলিলেন বনে

নদীতীরে। পাথর-ছড়ানো উপকূলে,

বরষার জলধারা সহস্র আঙুলে

কেটে গেছে রক্তবর্ণ মাটি। সারি সারি

উঠেছে বিশাল শাল,—তলায় তাহারি

ঠেলাঠেলি ভিড় করে শিশু তরুদল

আকাশের অংশ পেতে। নদী হাঁটুজল

ফটিকের মত স্বচ্ছ –চলে একধারে

গেরুয়া বালির কিনারায়। নদীপারে

ইসারা করিল গুরু—পাঠান দাঁড়াল।

নিবে-আসা দিবসের দগ্ধ রাঙা আলো

বাদুড়ের পাখাসম দীর্ঘ ছায়া জুড়ি

পশ্চিম প্রান্তর পারে চলেছিল উড়ি

নিঃশব্দ আকাশে। গুরু কহিলা পাঠানে—

মামুদ হেথায় এস, খোঁড় এইখানে।—

উঠিল সে বালু খুঁড়ি একখণ্ড শিলা

অঙ্কিত লােহিত রাগে। গােবিন্দ কহিলা

পাষাণে এই যে রাঙা দাগ, এ তােমার

আপন বাপের রক্ত। এইখানে তার

মুণ্ড ফেলেছিনু কেটে, না শুধিয়া ঋণ,

না দিয়া সময়। আজ আসিয়াছে দিন,

রে পাঠান, পিতার সুপুত্র হও যদি

খোল তলবার,—পিতৃঘাতকেরে বধি

উষ্ণ রক্ত উপহারে করিবে তর্পণ

তৃষাতুর প্রেতাত্মার।বাঘের মতন

হুঙ্কারিয়া লম্ফ দিয়া রক্তনেত্র বীর

পড়িল গুরুর পরে; গুরু রহে স্থির

কাঠের মূর্তির মত। ফেলি অস্ত্রখান

তখনি চরণে তাঁর পড়িল পাঠান।

কহিল, হে গুরুদেব, লয়ে সয়তানে

কোরো না এমনতর খেলা। ধর্ম্ম জানে

ভুলেছিনু পিতৃরক্তপাত;—একাধারে

পিতা গুরু বন্ধু বলে জেনেছি তােমারে

এতদিন। ছেয়ে থাক্ মনে সেই স্নেহ,

ঢাকা পড়ে’ হিংসা যাক মরে’। প্রভু, দেহ

পদধূলি।—এত বলি বনের বাহিরে,

উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে গেল, না চাহিল ফিরে,

না থামিল একবার। দুটি বিন্দু জল

ভিজাইল গােবিনের নয়ন যুগল।

পাঠান সেদিন হতে থাকে দূরে দূরে।

নিরালা শয়নঘরে জাগাতে গুরুরে

দেখা নাহি দেয় ভোরবেলা। গৃহদ্বারে

অস্ত্র হাতে নাহি থাকে রাতে। নদীপারে

গুরু সাথে মৃগয়ায় নাহি যায় একা।

নির্জনে ডাকিলে গুরু দেয় না সে দেখা।

একদিন আরম্ভিল শতরঞ্চ খেলা

গগাবিন্দ পাঠান সাথে। শেষ হল বেলা

না জানিতে কেহ। হার মানি বারে বারে

মাতিছে মামুদ। সন্ধ্যা হয় রাত্রি বাড়ে।

সঙ্গীরা যে-যার ঘরে চলে গেল ফিরে।

ঝাঁ ঝাঁ করে রাতি। একমনে হেঁটশিরে

পাঠান ভাবিছে খেলা। কখন হঠাৎ

চতুরঙ্গ বল ছুঁড়ি করিল আঘাত

মামুদের শিরে গুরু,—কহে অট্টহাসি’-

পিতৃঘাতকের সাথে খেলা করে আসি

এমন যে কাপুরুষ-জয় হবে তার!-

তথনি বিদ্যুৎ-হেন ছুরি খরধার

খাপ হতে খুলি লয়ে গোবিন্দের বুকে

পাঠান বিঁধিয়া দিল। গুরু হাসি মুখে

কহিলেন—এতদিনে হল তাের বােধ

কি করিয়া অন্যায়ের লয় প্রতিশােধ।

শেষ শিক্ষা দিয়ে গেনু—আজি শেষবার

আশীৰ্বাদ করি তােরে হে পুত্র আমার।

৬ই কার্তিক, ১৩০৬

শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা

কথা

শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা

( অবদান শতক)

“প্রভু বুদ্ধ লাগি আমি ভিক্ষা মাগি,

ওগাে পুরবাসী কে রয়েছ জাগি”,—

অনাথ পিণ্ডদ কহিলা ‘অম্বুদ-

নিনাদে।

সদ্য মেলিতেছে তরুণ তপন

আলস্যে অরুণ সহাস্য লােচন।

শ্রাবন্তিপুরীর গগন-লগন-

প্রাসাদে।

বৈতালিকদল সুপ্তিতে শয়ান,

এখনো ধরেনি মাঙ্গলিক গান,

দ্বিধাভরে পিক মৃদু কুহুতান

কুহরে।

ভিক্ষু কহে ডাকি—“হে নিদ্রিত পুর,

দেহ ভিক্ষা মােরে, কর নিদ্রা দূর”—

সুপ্ত পৌরজন শুনি সেই সুর

শিহরে।

সাধু কহে,—“শুন, মেঘ বরিষার

নিজেরে নাশিয়া দেয় বৃষ্টিধার,

সব ধর্ম্মমাঝে ত্যাগ ধর্ম্ম সার

ভুবনে।”

কৈলাস শিখর হ’তে দূরাগত

ভৈরবের মহা-সঙ্গীতের মত

সে বাণী মন্দ্রিল সুখ তন্দ্রারত

ভবনে।

রাজা জাগি ভাবে বৃথা রাজ্য ধন,

গৃহী ভাবে মিছা তুচ্ছ আয়ােজন,

অশ্রু অকারণে করে বিসর্জন

বালিকা।

যে ললিত সুখে হৃদয় অধীর

মনে হল, তাহা গত যামিনীর

স্পলিত দলিত শুষ্ক কামিনীর

মালিকা।

বাতায়ন খুলে যায় ঘরে ঘরে,

ঘুম-ভাঙা আঁখি ফুটে থরে থরে,

অন্ধকার পথ কৌতূহল ভরে

নেহারি'।

“জাগ ভিক্ষা দাও!” সবে ডাকি ডাকি,

সুপ্ত সৌধে তুলি নিদ্রাহীন আঁখি,

শূন্য রাজবাটে চলেছে একাকী

ভিখারী।

ফেলি দিল পথে বণিক-ধনিকা

মুঠি মুঠি তুলি রতন-কণিকা,

কেহ কণ্ঠহার, মাথার মণিকা।

কেহ গো!

ধনী স্বর্ণ আনে থালি পূরে পূরে,

সাধু নাহি চাহে, পড়ে থাকে দুরে,

ভিক্ষু কহে—“ভিক্ষা আমার প্রভুরে

দেহ গাে!”

বসনে ভূষণে ঢাকি গেল ধূলি,

কনকে রতনে খেলিল বিজুলী,

সন্যাসী ফুকারে লয়ে শূন্য ঝুলি

সঘনে;—

“ওগাে পৌরজন, কর অবধান,

ভিক্ষুশ্রেষ্ঠ তিনি, বুদ্ধ ভগবান,

দেহ তাঁরে নিজ সর্ব্বশ্রেষ্ঠ দান

যতনে।”

ফিরে যায় রাজা, ফিরে যায় শেঠ,

মিলে না প্রভুর যােগ্য কোন ভেট,

বিশাল নগরী লাজে রহে হেঁট-

আননে।

রৌদ্র উঠে ফুটে, জেগে উঠে দেশ,

মহানগরীর পথ হল শেষ,

পুরপ্রান্তে সাধু করিলা প্রবেশ

কাননে।

দীন নারী এক ভূতল-শয়ন

না ছিল তাহার অশন ভূষণ,

সে আসি নমিল সাধুর চরণ-

কমলে।

অরণ্য-আড়ালে রহি কোন মতে

একমাত্র বাস নিল গাত্র হতে,

বাহুটি বাড়ায়ে ফেলি দিল পথে

ভূতলে।

ভিক্ষু উৰ্দ্ধভুজে করে জয়নাদ,

কহে “ধন্য মাতঃ, করি আশীর্ব্বাদ,

মহাভিক্ষুকের পূরাইলে সাধ

পলকে।”

চলিলা সন্যাসী ত্যজিয়া নগর

ছিন্ন চীরখানি লয়ে শিরােপর,

সঁপিতে বুদ্ধের চরণ-নখর-

আলােকে।

৫ই কার্তিক, ১৩১৪

অনাথ-পিণ্ডদ বুদ্ধের একজন প্রধান শিষ্য ছিলেন।

সামান্য ক্ষতি

সামান্য ক্ষতি

(দিব্যাবদান মালা)

বহে মাঘমাসে শীতের বাতাস

স্বচ্ছসলিলা বরুণা।

পুরী হতে দূরে গ্রামে নির্জ্জনে

শিলাময় ঘাট চম্পকবনে;

স্নানে চলেছেন শত সখীসনে

কাশীর মহিষী করুণা।

সে পথ সে ঘাট আজি এ প্রভাতে

জনহীন রাজশাসনে।

নিকটে যে ক’টি আছিল কুটীর

ছেড়ে গেছে লােক, তাই নদীতীর

স্তব্ধ গভীর, কেবল পাখীর

কূজন উঠিছে কাননে।

আজি উতরােল উত্তর বায়ে

উতলা হয়েছে তটিনী।

সােনার আলােক পড়িয়াছে জলে,

পুলকে উছলি ঢেউ ছলছলে,

লক্ষ মানিক ঝলকি আঁচলে

নেচে চলে যেন নটিনী।

কলকল্লোলে লাজ দিল আজ।

নারীকণ্ঠের কাকলী।

মৃণাল ভুজের ললিত বিলাসে

চঞ্চলা নদী মাতে উল্লাসে,

আলাপে প্রলাপে হাসি-উচ্ছাসে

আকাশ উঠিল আকুলি।

স্নান সমাপন করিয়া যখন

কূলে উঠে নারী সকলে—

মহিষী কহিলা উহু শীতে মরি!

সকল শরীর উঠিছে শিহরি!

জ্বেলেদে আগুন ওলো সহচরী,

শীত নিবারিব অনলে।

সখীগণ সবে কুড়াইতে কুটা

চলিল কুসুম কাননে।

কৌতুকরসে পাগল পরাণী

শাখা ধরি সবে করে টানাটানি;—

সহসা সবারে ডাক দিয়া রাণী

কহে সহাস্য আননে;—

ওলো তােরা আয়! ওই দেখা যায়

কুটীর কাহার অদূরে!

ওই ঘরে তােরা লাগাবি অনল,

তপ্ত করিব কর পদতল।

এত বলি রাণী রঙ্গে বিভল

হাসিয়া উঠিল মধুরে।

কহিল মালতী সকরুণ অতি

একি পরিহাস রাণী মা!

আগুন জ্বালায়ে কেন দিবে নাশি?

এ কুটীর কোন্ সাধু সন্যাসী

কোন্ দীনজন কোন্ পরবাসী

বাঁধিয়াছে নাহি জানি মা!

রাণী কহে রােষে—দূর করি দাও

এই দীনদয়াময়ীরে!-

অতি দুর্দ্দাম কৌতুকরত

যৌবনমদে নিষ্ঠুর যত

যুবতীরা মিলি পাগলের মত

আগুন লাগাল কুটীরে।

ঘন ঘাের ধুম ঘুরিয়া ঘুরিয়া

ফুলিয়া ফুলিয়া উড়িল।

দেখিতে দেখিতে সে ধূম বিদারি

ঝলকে ঝলকে উল্কা উগারি

শত শত লােল জিহ্বা প্রসারি

বহ্নি আকাশ জুড়িল।

পাতাল ফুঁড়িয়া উঠিল যেন রে

জ্বালাময়ী যত নাগিনী।

ফণা নাচাইয়া অম্বরপানে

মাতিয়া উঠিল গর্জ্জনগানে,

প্রলয়মত্ত রমণীর কানে

বাজিল দীপক রাগিণী।

প্রভাত পাখীর আনন্দগান

ভয়ের বিলাপে টুটিল;—

দলে দলে কাক করে কোলাহল,

উত্তর বায়ু হইল প্রবল,—

কুটীর হইতে কুটীরে অনল

উড়িয়া উড়িয়া ছুটিল।

ছােট গ্রামখানি লেহিয়া লইল

প্রলয়-লােলুপ রসনা।

জনহীন পথে মাঘের প্রভাতে

প্রমােদ ক্লান্ত শত সখী সাথে

ফিরে গেল রাণী কুবলয় হাতে

দীপ্ত অরুণ-বসনা।

তখন সভায় বিচার আসনে

বসিয়া ছিলেন ভূপতি।

গৃহহীন প্রজা দলে দলে আসে,

দ্বিধাকম্পিত গদগদ ভাষে

নিবেদিল দুখ সঙ্কোচে ত্রাসে।

চরণে করিয়া বিনতি।

সভাসন ছাড়ি উঠি গেল রাজা

রক্তিমমুখ সরমে।

অকালে পশিলা রাণীর আগার,—

কহিলা মহিষি, একি ব্যবহার?

গৃহ জ্বালাইলে অভাগা প্রজার

বল কোন্ রাজধরমে?

রুবিয়া কহিলা রাজার মহিলা

“গৃহ কহ তারে কি বােধে?

গেছে গুটীকত জীর্ণ কুটীর

কতটুকু ক্ষতি হয়েছে প্রাণীর?

কত ধন যায় রাজমহিষীর

এক প্রহরের প্রমোদে।”

কহিলেন রাজা উদ্যতরােষ

রুধিয়া দীপ্ত হৃদয়ে,—

যতদিন তুমি আছ রাজরাণী

দীনের কুটীরে দীনের কি হানি

বুঝিতে নারিবে জানি তাহা জানি-

বুঝব তােমারে নিদয়ে!

রাজার আদেশে কিঙ্করী আসি

ভূষণ ফেলিল খুলিয়া।

অরুণ বরণ অম্বরখানি

নির্ম্মম করে খুলে দিল টানি,

ভিখারী নারীর চীরবাস আনি

দিল রাণীদেহে তুলিয়া।

পথে লয়ে তারে কহিলেন রাজা।

‘মাগিবে দুয়ারে দুয়ারে;

এক প্রহরের লীলায় তােমার

যে ক’টি কুটীর হল ছারখার

যতদিনে পার সে ক’টি আবার

গড়ি দিতে হবে তােমারে।

বৎসর কাল দিলেম সময়।

তার পরে ফিরে আসিয়া

সভায় দাঁড়ায়ে করিয়া প্রণতি

সবার সমুখে জানাবে যুবতী

হয়েছে জগতে কতটুকু ক্ষতি

জীর্ণ কুটীর নাশিয়া।

২৫শে আশ্বিন, ১৩০৬

স্পর্শমণি

স্পর্শমণি

(ভক্তমাল )

নদীতীরে বৃন্দাবনে সনাতন একমনে

জপিছেন নাম।

হেনকালে দীনবেশে ব্রাহ্মণ চরণে এসে।

করিল প্রণাম।

শুধালেন সনাতন, কোথা হতে আগমন,

কি নাম ঠাকুর?

বিপ্র কহে, কিবা কব পেয়েছি দর্শন তব

ভ্রমি বহুদূর।

জীবন আমার নাম মানকরে মোর ধাম,

জিলা বর্দ্ধমানে,

এত বড় ভাগ্যহত দীনহীন মাের মত

নাই কোনখানে।

জমিজমা আছে কিছু, করে আছি মাথা নীচু,

অল্প স্বল্প পাই।

ক্রিয়াকর্ম্ম যজ্ঞ যাগে বহু খ্যাতি ছিল আগে

আজ কিছু নাই।

আপন-উন্নতি লাগি শিব কাছে বর মাগি

করি আরাধনা।—

এক দিন নিশিভোরে স্বপ্নে দেব কহে মােরে-

পূরিবে প্রার্থনা।

যাও যমুনার তীর, সনাতন গােস্বামীর

ধর দুটি পায়,

তাঁরে পিতা বলি মেনে, তাঁরি হাতে আছে জেনো

ধনের উপায়।

শুনি কথা সনাতন ভাবিয়া আকুল হন

কি আছে আমার।

যাহা ছিল সে সকলি ফেলিয়া এসেছি চলি

ভিক্ষামাত্র সার।

সহসা বিস্মৃতি ছুটে,— সাধু ফুকারিয়া উঠে-

ঠিক বটে ঠিক!

একদিন নদীতটে কুড়ায়ে পেয়েছি বটে

পরশ মাণিক।

যদি কভু লাগে দানে সেই ভেবে ওইখানে

পুঁতেছি বালুতে;

নিয়ে যাও হে ঠাকুর দুঃখ তব হােক দূর

ছুঁতে নাহি ছুঁতে।

বিপ্র তাড়াতাড়ি আসি খুঁড়িয়া বালুকারাশি

পাইল সে মণি,

লােহার মাদুলি দুটি সােনা হয়ে উঠে ফুটি

ছুঁইল যেমনি।

ব্রাহ্মণ বালুর পরে বিস্ময়ে বসিয়া পড়ে-

ভাবে নিজে নিজে।

যমুনা কল্লোল গানে চিন্তিতের কানে কানে

কত কি যে।

নদীপারে রক্তচ্ছবি দিনান্তের ক্লান্ত রবি

গেল অস্তাচলে,—

তখন ব্রাহ্মণ উঠে সাধুর চরণে লুটে

কহে অশ্রু জলে,—

যে ধনে হইয়া ধনী মণিরে মান না মণি

তাহারি খানিক

মাগি আমি নতশিরে! এত বলি নদীনীরে

ফেলিল মাণিক।—

২৯শে আশ্বিন, ১৩০৬

স্বামীলাভ

স্বামীলাভ

(ভক্তমাল)

একদা তুলসীদাস জাহ্নবীর তীরে

নির্জ্জন শ্মশানে

সন্ধ্যায় আপন মনে একা একা ফিরে

মাতি নিজ গানে।

হেরিলেন মৃত পতি-চরণের তলে

বসিয়াছে সতী;

তারি সনে এক সাথে এক চিতানলে

মরিবারে মতি।

সঙ্গীগণ মাঝে মাঝে আনন্দ চীৎকারে

করে জয়নাদ,

পুরােহিত ব্রাহ্মণের ঘেরি চারিধারে

গাইে সাধুবাদ।

সহসা সাধুরে নারী হেরিয়া সম্মুখে

করিয়া প্রণতি

কহিল বিনয়ে—প্রভো আপন শ্রীমুখে

দেহ অনুমতি।

তুলসী কহিল, মাতঃ যাবে কোনেখানে,

এত আয়ােজন।

সতী কহে—পতিসহ যাব স্বর্গপানে

করিয়াছি মন।

“ধরা ছাড়ি কেন নারী স্বর্গ চাহ তুমি”

সাধু হাসি কহে -

“হে জননী, স্বর্গ যার, এ ধরণীভূমি

তাঁহারি কি নহে?”

বুঝিতে না পারি কথা নারী রহে চাহি

বিস্ময়ে অবাক—

কহে কর ষোড় করি-স্বামী যদি পাই

স্বর্গ দূরে থাক্।

তুলসী কহিল হাসি—ফিরে চল ঘরে

কহিতেছি আমি

ফিরে পাবে আজ হতে মাসেকের পরে

আপনার স্বামী।

রমণী আশার বশে গৃহে ফিরে যায়

শ্মশান তেয়াগি';

তুলসী জাহ্নবীতীরে নিস্তব্ধ নিশায়।

রহিলেন জাগি।

নারী রহে শুদ্ধচিতে নির্জন ভবনে,

তুলসী প্রত্যহ

কি তাহারে মন্ত্র দেয়, নারী একমনে

ধ্যায় অহরহ।

এক মাস পূর্ণ হতে প্রতিবেশীদলে

আসি তার দ্বারে

শুধাইল, পেলে স্বামী?—নারী হাসি বলে

পেয়েছি তাঁহারে।

শুনি ব্যগ্র কহে তারা—কহ তবে কহ

আছে কোন ঘরে?

নারী কহে রয়েছেন প্রভু অহরহ

আমারি অন্তরে।

২৯শে আশ্বিন, ১৩০৬

হোরিখেলা

হােরিখেলা

(রাজস্থান)

পত্র দিল পাঠান কেসর খাঁরে

কেতুন হতে ভুনাগ রাজার রাণী,—

লড়াই করি আশ মিটেছে মিঞা?

বসন্ত যায় চোখের উপর দিয়া,

এস তােমার পাঠান সৈন্য নিয়া

হােরি খেলব আমরা রাজপুতানী।

যুদ্ধে হারি কোটা সহর ছাড়ি

কেতু হতে পত্র দিল রাণী।

পত্র পড়ি কেসর উঠে হাসি,

মনের সুখে গোঁফে দিল চাড়া।

রঙীন্ দেখে পাগড়ি পরে মাথে,

সুম্মা আঁকি দিল আঁখির পাতে,

গন্ধভরা রুমাল নিল হাতে

সহস্রবার দাড়ি দিল ঝাড়া।

পাঠান সাথে হােরি খেলবে রাণী

কেসর হাসি গোঁফে দিল চাড়া।

ফাগুন মাসে দখিন হতে হাওয়া

বকুলবনে মাতাল হয়ে এল।

বােল ধরেছে আম্র বনে বনে,

ভ্রমরগুলো কে কার কথা শােনে,

গুনগুনিয়ে আপন মনে মনে

ঘুরে ঘুরে বেড়ায় এলােমেলো।

কেতুন পুরে দলে দলে আজি

পাঠান সেনা হেরি খেলতে এল।

কেতুনপুরে রাজার উপবনে

তখন সবে ঝিকিমিকি বেলা।

পাঠানেরা দাঁড়ায় বনে আসি,

মূলতানেতে তান ধরেছে বাঁশি,

এল তখন একশো রাণীর দাসী

রাজপুতানী করতে হােরি-খেলা।

রবি তখন রক্তরাগে রাঙা,

সবে তখন ঝিকিমিকি বেলা।

পায়ে পায়ে ঘাগরা উঠে দুলে

ওড়না ওড়ে দক্ষিণে বাতাসে।

ডাহিন্ হাতে বহে ফাগের থারি,

নীবিবন্ধে ঝুলিছে পিচকারী,

বামহস্তে গুলাব, ভরা ঝারী।

সারি সারি রাজপুতানী আসে।

পায়ে পায়ে ঘাগরা উঠে দুলে,

ওড়না ওড়ে দক্ষিণে বাতাসে।

আঁখির ঠারে চতুর হাসি হেসে-

কেসর তবে কহে কাছে আসি,—

বেঁচে এলেম অনেক যুদ্ধ করি’-

আজকে বুঝি জানে-প্রাণে মরি!-

শুনে রাজার শতেক সহচরী

হঠাৎ সবে উঠল অট্ট হাসি।

রাঙা পাগড়ি হেলিয়ে কেসর খ।

রঙ্গভরে সেলাম করে আসি।

সুরু হল হােরির মাতামাতি,

উড়তেছে ফাগ, রাঙা সন্ধ্যাকাশে।

নব-বরণ ধরল বকুল ফুলে,

রক্তরেণু ঝরল তরুমূলে,

ভয়ে পাখী কূজন গেল ভুলে

রাজপুতানীর উচ্চ উপহাসে।

কোথা হতে রাঙা কুজ্ঝটিকা

লাগল যেন রাঙা সন্ধ্যাকাশে।

চোখে কেন লাগচে নাকো নেশা?—

মনে মনে ভাবচে কেসর খা।

বক্ষ কেন উঠচে নাকো দুলি?

নারীর পায়ে বাঁকা নূপুরগুলি

কেমন যেন বলচে বেসুর বুলি,

তেমন করে কাঁকন বাজচে না।

চোখে কেন লাগচে নাকো নেশা?

মনে মনে ভাবচে কেসর খাঁ।

পাঠান কহে-রাজপুতানীর দেহে

কোথাও কিছু নাই কি কোমলতা?

বাহু যুগল নয় মৃণালের মত,

কণ্ঠস্বরে বজ্র লজ্জাহত,

বড় কঠিন শুষ্ক স্বাধীন যত

মঞ্জরীহীন মরুভূমির লতা।

পাঠান ভাবে দেহে কিম্বা মনে

রাজপুতানীর নাইক কোমলতা।

তান ধরিয়া ইমন ভূপালিতে

বাঁশি বেজে উঠল দ্রুত তালে।

কুণ্ডলেতে দোলে মুক্তামালা,

কঠিন হাতে মােটা সােনার বালা,

দাসীর হাতে দিয়ে ফাগের থালা

রাণী বনে এলেন হেনকালে।

তান ধরিয়া ইমন্ ভূপালিতে

বাঁশি তখন বাজচে দ্রুত তালে।

কেসর কহে—তােমারি পথ চেয়ে

দুটি চক্ষু করেছি প্রায় কানা।—

রাণী কহে—আমারো সেই দশা!-

একশো সখী হাসিয়া বিবশা-,

পাঠানপতির ললাটে সহসা

মারেন রাণী কঁসার থালাখানা।

রক্তধারা গড়িয়ে পড়ে বেগে।

পাঠান পতির চক্ষু হল কানা।

বিনা মেঘে বজ্ররবের মত

উঠল বেজে কাড়া নাকাড়া।

জ্যোৎস্নাকাশে চমকে ওঠে শশি,

ঝনঝনিয়ে ঝিকিয়ে ওঠে অসি,

সানাই তখন দ্বারের কাছে বসি

গভীর সুরে ধরল কানাড়া।

কুঞ্জবনের তরু তলে তলে

উঠল বেজে কাড়া-নাকাড়া।

বাতাস বেয়ে ওড়না গেল উড়ে,

পড়ল খসে ঘাগরা ছিল যত।

মন্ত্রে যেন কোথা হতে কেরে

বাহির হল নারী-সজ্জা ছেড়ে,

এক শত বীর ঘিরল পাঠানেরে

পুষ্প হতে একশো সাপের মত।

স্বপ্ন সম ওড়না গেল উড়ে,

পড়ল খসে ঘাগরা ছিল যত।

যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল

সে পথ দিয়ে ফিরল নাকো তারা।

ফাগুন রাতে কুঞ্জ বিতানে

মত্ত কোকিল বিরাম না জানে,

কেতুনপুরে বকুল বাগানে

কেসর খাঁয়ের খেলা হল সারা।

যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল

সে পথ দিয়ে ফিরল নাকো তারা।

৯ই কার্তিক, ১৩০৬