লিপিকা
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯২২
প্রকাশনা-তথ্য
লিপিকা
লিপিকা
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
প্রকাশক
ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড্
এলাহাবাদ
১৯২২
মূল্য এক টাকা বারো আনা
প্রকাশক
শ্রীঅপূর্ব্বকৃষ্ণ বসু
ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড, এলাহাবাদ
প্রাপ্তিস্থান :
১। ইণ্ডিয়ান পাবলিশিং হাউস
২২।১, কর্ণোয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা
২। ইণ্ডিয়ান প্রেস লিমিটেড—এলাহাবাদ
কান্তিক প্রেস
২২ সুকিয়া ষ্ট্রীট, কলিকাতা
শ্রীকালাচাঁদ দালাল কর্ত্তৃক মুদ্রিত
সূচী
একটি চাউনি
একটি চাউনি
গাড়িতে ওঠ্বার সময় একটুখানি মুখ ফিরিয়ে সে আমাকে তার শেষ চাউনিটি দিয়ে গেছে।
এই মস্ত সংসারে ঐটুকুকে আমি রাখি কোন্খানে?
দণ্ডপলমুহূর্ত্ত অহরহ পা ফেল্বে না এমন একটু জায়গা আমি পাই কোথায়?
মেঘের সকল সোনার রঙ যে-সন্ধ্যায় মিলিয়ে যায় এই চাউনি কি সেই সন্ধ্যায় মিলিয়ে যাবে? নাগ-কেশরের সকল সোনালি রেণু যে-বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় এও কি সেই বৃষ্টিতেই ধুয়ে যাবে?
সংসারের হাজার জিনিসের মাঝখানে ছড়িয়ে থাক্লে এ থাক্বে কেন?—হাজার কথার আবর্জ্জনায়, হাজার বেদনার স্তূপে?
তার ঐ এক চকিতের দান সংসারের আর-সমস্তকে ছাড়িয়ে আমারই হাতে এসে পৌঁছেচে। এ’কে আমি রাখ্ব গানে গেঁথে, ছন্দে বেঁধে; আমি এ’কে রাখ্ব সৌন্দর্য্যের অমরাবতীতে।
পৃথিবীতে রাজার প্রতাপ ধনীর ঐশ্বর্য্য হয়েচে মরবারই জন্যে। কিন্তু চোখের জলে কি সেই অমৃত নেই যাতে একনিমেষের চাউনিকে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখ্তে পারে?
গানের সুর বল্লে, “আচ্ছা, আমাকে দাও! আমি রাজার প্রতাপকে স্পর্শ করিনে, ধনীর ঐশ্বর্য্যকেও না, কিন্তু ঐ ছোট জিনিসগুলিই আমার চিরদিনের ধন; ঐগুলি দিয়েই আমি অসীমের গলার হার গাঁথি।”
একটি দিন
একটি দিন
মনে পড়্চে সেই দুপুর বেলাটি। ক্ষণে ক্ষণে বৃষ্টিধারা ক্লান্ত হয়ে আসে, আবার দম্কা হাওয়া তাকে মাতিয়ে তোলে।
ঘরে অন্ধকার, কাজে মন যায় না। যন্ত্রটা হাতে নিয়ে বর্ষার গানে মল্লারের সুর লাগালেম।
পাশের ঘর থেকে একবার সে কেবল দুয়ার পর্য্যন্ত এল। আবার ফিরে গেল। আবার একবার বাইরে এসে দাঁড়াল। তার পরে ধীরে ধীরে ভিতরে এসে বস্ল। হাতে তার সেলাইয়ের কাজ ছিল, মাথা নীচু করে সেলাই কর্তে লাগ্ল। তার পরে সেলাই বন্ধ করে জান্লার বাইরে ঝাপ্সা গাছগুলোর দিকে চেয়ে রইল।
বৃষ্টি ধরে এল, আমার গান থাম্ল। সে উঠে চুল বাঁধ্তে গেল।
এইটুকু ছাড়া আর কিছুই না। বৃষ্টিতে গানেতে অকাজে আঁধারে জড়ানো কেবল সেই একটি দুপুর বেলা।
ইতিহাসে রাজা-বাদসার কথা, যুদ্ধবিগ্রহের কাহিনী, সস্তা হয়ে ছড়াছড়ি যায়। কিন্তু, একটি দুপুরবেলার ছোট একটু কথার টুকরো দুর্লভ রত্নের মতো কালের কৌটোর মধ্যে লুকোনো রইল, দুটি লোক তার খবর জানে।
কর্ত্তার ভূত
কর্ত্তার ভূত
বুড়ো কর্ত্তার মরণকালে দেশসুদ্ধ সবাই বলে উঠ্ল, “তুমি গেলে আমাদের কি দশা হবে?”
শুনে তারও মনে দুঃখ হল। ভাব্লে, “আমি গেলে এদের ঠাণ্ডা রাখ্বে কে?”
তা’ বলে মরণ ত এড়াবার জো নেই। তবু দেবতা দয়া করে বললেন, “ভাবনা কি? লোকটা ভূত হয়েই এদের ঘাড়ে চেপে থাক্ না। মানুষের মৃত্যু আছে, ভূতের ত মৃত্যু নেই।”
দেশের লোক ভারি নিশ্চিন্ত হল।
কেননা, ভবিষ্যৎকে মান্লেই তার জন্যে যত ভাবনা, ভূতকে মান্লে কোনো ভাবনাই নেই; সকল ভাবনা ভূতের মাথায় চাপে। অথচ তার মাথা নেই, সুতরাং কারো জন্যে মাথাব্যথাও নেই।
তবু স্বভাব-দোষে যারা নিজের ভাবনা নিজে ভাব্তে যায় তারা খায় ভূতের কানমলা। সেই কানমলা না যায় ছাড়ানো, তার থেকে না যায় পালানো, তার বিরুদ্ধে না চলে নালিশ, তার সম্বন্ধে না আছে বিচার।
দেশসুদ্ধ লোক ভূতগ্রস্ত হয়ে চোখ বুজে চলে। দেশের তত্ত্বজ্ঞানীরা বলেন, “এই চোখ বুজে চলাই হচ্চে জগতের সবচেয়ে আদিম চলা। এ’কেই বলে অদৃষ্টের চালে চলা। সৃষ্টির প্রথম চক্ষুহীন কীটাণুরা এই চলা চল্ত; ঘাসের মধ্যে গাছের মধ্যে আজও এই চলার আভাস প্রচলিত।”
শুনে ভূতগ্রস্ত দেশ আপন আদিম আভিজাত্য অনুভব করে। তাতে অত্যন্ত আনন্দ পায়।
ভূতের নায়েব ভূতুড়ে জেলখানার দারোগা। সেই জেলখানার দেয়াল চোখে দেখা যায় না। এই জন্যে ভেবে পাওয়া যায় না সেটাকে ফুটো করে কি উপায়ে বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।
এই জেলখানায় যে-ঘানি নিরন্তর ঘোরাতে হয় তার থেকে একছটাক তেল বেরোয় না যা হাটে বিকোতে পারে,—বেরোবার মধ্যে বেরিয়ে যায় মানুষের তেজ। সেই তেজ বেরিয়ে গেলে মানুষ ঠাণ্ডা হয়ে যায়। তা’তে করে’ ভূতের রাজত্বে আর কিচ্ছুই না থাক্,—অন্ন হোক্, স্বাস্থ্য হোক্,—শান্তি থাকে।
কত যে শান্তি তার একটা দৃষ্টান্ত এই যে, অন্য সব দেশে ভূতের বাড়াবাড়ি হলেই মানুষ অস্থির হয়ে ওঝার খোঁজ করে। এখানে সে চিন্তাই নেই। কেননা ওঝাকেই আগেভাগে ভূতে পেয়ে বসেচে।
এই ভাবেই দিন চল্ত, ভূতশাসনতন্ত্র নিয়ে কারো মনে দ্বিধা জাগ্ত না; চিরকালই গর্ব্ব কর্তে পার্ত যে এদের ভবিষ্যৎটা পোষা ভ্যাড়ার মত ভূতের খোঁটায় বাঁধা, সে ভবিষ্যৎ ভ্যা-ও করে না, ম্যা-ও করে না, চুপ করে পড়ে থাকে মাটিতে; যেন একেবারে চিরকালের মত মাটি!
কেবল অতি সামান্য একটা কারণে একটু মুস্কিল বাধ্ল। সেটা হচ্চে এই যে, পৃথিবীর অন্য দেশগুলোকে ভূতে পায় নি। তাই অন্য সব দেশে যত ঘানি ঘোরে তার থেকে তেল বেরোয় তাদের ভবিষ্যতের রথচক্রটাকে সচল করে রাখ্বার জন্যে, বুকের রক্ত পিষে ভূতের খর্পরে ঢেলে দেবার জন্যে নয়। কাজেই মানুষ সেখানে একেবারে জুড়িয়ে যায় নি। তারা ভয়ঙ্কর সজাগ আছে।
এদিকে দিব্যি ঠাণ্ডায় ভূতের রাজ্য জুড়ে “খোকা ঘুমোলো, পাড়া জুড়োলো।”
সেটা খোকার পক্ষে আরামের, খোকার অভিভাবকের পক্ষেও; আর পাড়ার কথা ত বলাই আছে।
কিন্তু “বর্গি এল দেশে।”
নইলে ছন্দ মেলে না, ইতিহাসের পদটা খোঁড়া হয়েই থাকে। দেশে যত শিরোমণি চূড়ামণি আছে সবাইকে জিজ্ঞাসা করা গেল “এমন হল কেন?”
তারা একবাক্যে শিখা নেড়ে বললে, “এটা ভূতের দোষ নয়, ভূতুড়ে দেশের দোষ নয়, একমাত্র বর্গিরই দোষ। বর্গি আসে কেন?”
শুনে সকলেই বল্লে, “তা ত বটেই!” অত্যন্ত সান্ত্বনা বোধ কর্লে।
দোষ যারই থাক্, খিড়্কির আনাচে-কানাচে ঘোরে ভূতের পেয়াদা, আর সদরের রাস্তায়-ঘাটে ঘোরে অভূতের পেয়াদা; ঘরে গেরস্তর টেঁকা দায়, ঘর থেকে বেরোবারও পথ নেই। একদিক থেকে এ হাঁকে, “খাজমা দাও” আরেক দিক থেকে ও হাঁকে “খাজনা দাও।”
এখন কথাটা দাঁড়িয়েছে, “খাজনা দেব কিসে?”
এতকাল উত্তর দক্ষিণ পূব পশ্চিম থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে নানা জাতের বুলবুলি এসে বেবাক ধান খেয়ে গেল, কারো হুঁস ছিল না। জগতে যারা হুঁশিয়ার এরা তাদের কাছে ঘেঁষতে চায় না, পাছে প্রায়শ্চিত্ত কর্তে হয়। কিন্তু তারা অকস্মাৎ এদের অত্যন্ত কাছে ঘেঁষে, এবং প্রায়শ্চিত্তও করে না। শিরোমণি চূড়ামণির দল পুঁথি খুলে বলেন, “বেহুঁস্ যারা তারাই পবিত্র, হুঁসিয়ার যারা তারাই অশুচি, অতএব হুঁসিয়ারদের প্রতি উদাসীন থেকো, প্রবুদ্ধমিব সুপ্তঃ।”
শুনে সকলের অত্যন্ত আনন্দ হয়।
কিন্তু তৎসত্ত্বেও এ প্রশ্নকে ঠেকানো যায় না; “খাজ্না দেব কিসে?”
শ্মশান থেকে মশান থেকে ঝোড়ো হাওয়ায় হাহা করে’ তার উত্তর আসে, “আব্রু দিয়ে, ইজ্জৎ দিয়ে, ইমান্ দিয়ে, বুকের রক্ত দিয়ে।”
প্রশ্নমাত্রেরই দোষ এই যে, যখন আসে এক আসে না। তাই আরো একটা প্রশ্ন উঠে পড়েছে; “ভূতের শাসনটাই কি অনন্তকাল চল্বে?”
শুনে ঘুম-পাড়ানী মাসি পিসি আর মাস্তুত পিস্তুতোর দল কানে হাত দিয়ে বলে, “কি সর্ব্বনাশ! এমন প্রশ্ন ত বাপের জন্মে শুনি নি। তা হলে সনাতন ঘুমের কি হবে, সেই আদিমতম, সকল জাগরণের চেয়ে প্রাচীনতম ঘুমের?”
প্রশ্নকারী বলে, “সে ত বুঝ্লুম, কিন্তু আধুনিকতম বুল্বুলির ঝাঁক, আর উপস্থিততম বর্গির দল, এদের কি করা যায়?”
মাসি পিসি বলে, “বুলবুলির ঝাঁককে কৃষ্ণনাম শোনাব, আর বর্গির দলকেও।”
অর্ব্বাচীনেরা উদ্ধত হয়ে বলে ওঠে, “যেমন করে পারি ভূত ছাড়াব।”
ভূতের নায়েব চোখ পাকিয়ে বলে, “চুপ! এখনো ঘানি অচল হয় নি।”
শুনে দেশের খোকা নিস্তব্ধ হয়, তারপরে পাশ ফিরে শোয়।
মোদ্দা কথাটা হচ্চে বুড়ো কর্ত্তা বেঁচেও নেই, মরেও নেই, ভূত হয়ে আছে। দেশটাকে সে নাড়েও না অথচ ছাড়েও না।
দেশের মধ্যে দুটো একটা মানুষ—যারা দিনের বেলা নায়েবের ভয়ে কথা কয় না,—তারা গভীর রাত্রে হাত জোড় করে বলে “কর্ত্তা, এখনো কি ছাড়্বার সময় হয় নি?”
কর্ত্তা বলেন, “ওরে অবোধ, আমার ধরাও নেই ছাড়াও নেই, তোরা ছাড়্লেই আমার ছাড়া।”
তারা বলে, “ভয় করে যে কর্ত্তা!”
কর্ত্তা বলেন, “সেইখানেই ত ভূত।”
কৃতঘ্ন শোক
কৃতঘ্ন শোক
ভোর বেলায় সে বিদায় নিলে।
আমার মন আমাকে বোঝাতে বস্ল, “সবই মায়া।”
আমি রাগ করে বল্লেম, “এইত টেবিলে সেলাইয়ের বাক্স, ছাতে ফুলগাছের টব, খাটের উপর নাম-লেখা হাতপাখখানি—সবই ত সত্য।”
মন বললে, “তবু ভেবে দেখ—”
আমি বললেম, “থাম তুমি। ঐ দেখনা, গল্পের বইখানি, মাঝের পাতায় একটি চুলের কাঁটা, সবটা পড়া শেষ হয়নি; এও যদি মায়া হয়, সে এর চেয়েও বেশি মায়া হ’ল কেন?”
মন চুপ কর্লে। বন্ধু এসে বল্লেন, “যা ভালো তা সত্য, তা কখনো যায় না; সমস্ত জগৎ তাকে রত্নের মতো বুকের হারে গেঁথে রাখে।”
আমি রাগ করে’ বল্লেম, “কী করে’ জান্লে? দেহ কি ভালো নয়? সে দেহ গেল কোনখানে?”
ছোটো ছেলে যেমন রাগ করে’ মাকে মারে তেমনি করেই বিশ্বে আমার যা-কিছু আশ্রয় সমস্তকেই মারতে লাগ্লেম। বল্লেম, “সংসার বিশ্বাসঘাতক!”
হঠাৎ চম্কে উঠ্লেম। মনে হল, কে বল্লে, “অকৃতজ্ঞ!”
জানলার বাইরে দেখি ঝাউগাছের আড়ালে তৃতীয়ার চাঁদ উঠচে, যে গেচে যেন তারি হাসির লুকোচুরি। তারা-ছিটিয়ে-দেওয়া অন্ধকারের ভিতর থেকে একটি ভর্ৎসনা এল, “ধরা দিয়েছিলেম সেটাই কি ফাঁকি, আর আড়াল পড়েচে, এইটেকেই এত জোরে বিশ্বাস?”
গলি
গলি
আমাদের এই শান-বাঁধানো গলি, বারে বারে ডাইনে বাঁয়ে এঁকে বেঁকে একদিন কি যেন খুঁজ্তে বেরিয়েছিল। কিন্তু সে যে দিকেই যায় ঠেকে যায়। এ দিকে বাড়ি, ও দিকে বাড়ি, সাম্নে বাড়ি।
উপরের দিকে যেটুকু নজর চলে তাতে সে একখানি আকাশের রেখা দেখ্তে পায়—ঠিক তার নিজেরই মতো সরু, তার নিজেরই মতো বাঁকা।
সেই ছাঁটা আকাশটাকে জিজ্ঞাসা করে, “বলো তো দিদি, তুমি কোন্ নীল সহরের গলি?”
দুপুরবেলায় কেবল একটু খনের জন্যে সে সূর্য্যকে দেখে আর মনে মনে বলে, “কিচ্ছুই বোঝা গেল না!”
বর্ষামেঘের ছায়া দুই সার বাড়ির মধ্যে ঘন হয়ে ওঠে, কে যেন গলির খাতা থেকে তার আলোটাকে পেন্সিলের আঁচড় দিয়ে কেটে দিয়েচে। বৃষ্টির ধারা শানের উপর দিয়ে গড়িয়ে চলে, বর্ষা ডমরু বাজিয়ে যেন সাপ খেলাতে থাকে। পিছল হয়, পথিকদের ছাতায় ছাতায় বেধে যায়, ছাদের উপর থেকে ছাতার উপরে হঠাৎ নালার জল লাফিয়ে পড়ে’ চম্কিয়ে দিতে থাকে।
গলিটা অভিভূত হয়ে বলে, “ছিল খট্খটে শুক্নো, কোনো বালাই ছিল না। কিন্তু কেন অকারণে এই ধারাবাহী উৎপাত?”
ফাল্গুনে দক্ষিণের হাওয়াকে গলির মধ্যে লক্ষ্ণীছাড়ার মতো দেখ্তে হয়; ধুলো আর ছেঁড়া কাগজগুলো এলোমেলো উড়্তে থাকে। গলি হতবুদ্ধি হয়ে বলে, “এ কোন্ পাগ্লা দেবতার মাৎলামি!’”
তার ধারে ধারে প্রতিদিন যে-সব আবর্জনা এসে জমে—মাছের আঁশ, চুলোর ছাই, তরকারির খোসা, মরা ইঁদুর—সে জানে এই সব হচ্চে বাস্তব। কোনোদিন ভুলেও ভাবে না, “এ সমস্ত কেন?”
অথচ, শরতের রোদ্দুর যখন উপরের বারান্দায় আড় হয়ে পড়ে, যখন পূজোর নহবত ভৈরবীতে বাজে, তখন ক্ষণকালের জন্যে তার মনে হয়, “এই শান-বাঁধা লাইনের বাইরে মস্ত একটা কিছু আছে বা!”
এ দিকে বেলা বেড়ে যায়; ব্যস্ত গৃহিণীর আঁচলটার মত বাড়িগুলোর কাঁধের উপর থেকে রোদ্দুরখানা গলির ধারে খসে পড়ে; ঘড়িতে ন’টা বাজে; ঝি কোমরে ঝুড়ি করে বাজার নিয়ে আসে; রান্নার গন্ধে আর ধোঁয়ায় গলি ভরে’ যায়; যারা আপিসে যায় তারা ব্যস্ত হতে থাকে।
গলি তখন আবার ভাবে, “এই শান-বাঁধা লাইনের মধ্যেই সব সত্য। আর, যাকে মনে ভাব্চি মস্ত একটা কিছু, সে মস্ত একটা স্বপ্ন।”
গল্প
গল্প
ছেলেটির যেম্নি কথা ফুট্ল অম্নি সে বল্লে, “গল্প বল!”
দিদিমা বল্তে শুরু কর্লেন, “এক রাজপুত্তুর, কোটালের পুত্তুর, সদাগরের পুত্তুর—”
গুরুমশায় হেঁকে বললেন, “তিন-চারে বারো।”
কিন্তু তখন তার চেয়ে বড় হাঁক দিয়েছে রাক্ষসটা, “হাঁউ মাউ খাঁউ—” নাম্তার হুঙ্কার ছেলেটার কানে পৌঁছয় না।
যারা হিতৈষী তারা ছেলেকে ঘরে বন্ধ করে গম্ভীর স্বরে বললে, “তিন-চারে বারো এটা হল সত্য; আর রাজপুত্তুর, কোটালের পুত্তুর, সওদাগরের পুত্তুর—ওটা হল মিথ্যে, অতএব—”
ছেলেটির মন তখন সেই মানসচিত্রের সমুদ্র পেরিয়ে গেছে, মানচিত্রে যার ঠিকানা মেলে না; তিন-চারে বারো তার পিছে পিছে পাড়ি দিতে যায়, কিন্তু সেখানে ধারাপাতের হালে পানি পায় না।
হিতৈষী মনে করে, নিছক দুষ্টমি, বেতের চোটে শোধন করা চাই।
দিদিমা গুরুমশায়ের গতিক দেখে চুপ। কিন্তু আপদ বিদায় হতে চায় না, এক যায় ত আর আসে। কথক এসে আসন জুড়ে বস্লেন। তিনি সুরু করে দিলেন এক রাজপুত্রের বনবাসের কথা।
যখন রাক্ষসীর নাক-কাটা চল্চে তখন হিতৈষী বল্লেন, ইতিহাসে এর কোনো প্রমাণ নেই; যার প্রমাণ পথে ঘাটে, সে হচ্চে তিন-চারে বারো।
ততক্ষণে হনুমান লাফ দিয়েচে আকাশে, অত ঊর্দ্ধে ইতিহাস তার সঙ্গে কিছুতেই পাল্লা দিতে পারে না। পাঠশালা থেকে ইস্কুলে, ইস্কুল থেকে কলেজে ছেলের মনকে পুটপাকে শোধন করা চল্তে লাগ্ল। কিন্তু যতই চোলাই করা যাক্, ঐ কথাটুকু কিছুতেই মর্তে চায় না, “গল্প বল!”
এর থেকে দেখা যায়, শুধু শিশুবয়সে নয়, সকল বয়সেই মানুষ গল্পপোষ্য জীব। তাই পৃথিবী জুড়ে মানুষের ঘরে ঘরে, যুগে যুগে, মুখে মুখে, লেখায় লেখায় গল্প যা জমে উঠেচে তা মানুষের সকল সঞ্চয়কেই ছাড়িয়ে গেছে।
হিতৈষী একটা কথা ভালো করে ভেবে দেখে না, গল্প রচনার নেশাই হচ্চে সৃষ্টিকর্ত্তার সব-শেষের নেশা; তাঁকে শোধন কর্তে না পার্লে মানুষকে শোধন করার আশা করা যায় না।
একদিন তিনি তাঁর কার্খানা-ঘরে আগুন থেকে জল, জল থেকে মাটি গড়্তে লেগে গিয়েছিলেন। সৃষ্টি তখন গলদ্ঘর্ম্ম, বাষ্পভারাকুল। ধাতু-পাথরের পিণ্ডগুলো তখন থাকে থাকে গাঁথা হচ্চে;—চারদিকে মালমসলা ছড়ানো আর দমাদম পিটনি। সেদিন বিধাতাকে দেখ্লে কোনোমতে মনে করা যেতে পার্ত না যে তাঁর মধ্যে কোথাও কিছু ছেলেমানুষী আছে। তখনকার কাণ্ডকার্খানা যাকে বলে “সারবান্।”
তার পরে কখন্ শুরু হল প্রাণের পত্তন। জাগ্ল ঘাস, উঠ্ল গাছ, ছুট্ল পশু, উড়্ল পাখী। কেউবা মাটিতে বাঁধা থেকে আকাশে অঞ্জলি পেতে দাঁড়াল, কেউবা ছাড়া পেয়ে পৃথিবীময় আপনাকে বহুধা বিস্তার করে চল্ল, কেউ বা জলের যবনিকাতলে নিঃশব্দনৃত্যে পৃথিবী প্রদক্ষিণ কর্তে ব্যস্ত, কেউ বা আকাশে ডানা মেলে সূর্য্যালোকের বেদীতলে গানের অর্ঘ্যরচনায় উৎসুক। এখন থেকেই ধরা পড়্তে লাগল বিধাতার মনের চাঞ্চল্য।
এমন করে বহু যুগ কেটে যায়। হঠাৎ এক সময়ে কোন্ খেয়ালে সৃষ্টিকর্ত্তার কারখানায় উনপঞ্চাশ পবনের তলব পড়্ল। তাদের সব-ক’টাকে নিয়ে তিনি মানুষ গড়্লেন। এতদিন পরে আরম্ভ হল তাঁর গল্পের পালা। বহুকাল কেটেচে তাঁর বিজ্ঞানে, কারু-শিল্পে; এইবার তাঁর সুরু হল সাহিত্য।
মানুষকে তিনি গল্পে গল্পে ফুটিয়ে তুলতে লাগ্লেন। পশুপাখির জীবন হল আহার নিদ্রা সন্তানপালন; মানুষের জীবন হল গল্প। কত বেদনা, কত ঘটনা; সুখদুঃখ রাগবিরাগ ভালোমন্দের কত ঘাতপ্রতিঘাত। ইচ্ছার সঙ্গে ইচ্ছার, একের সঙ্গে দশের, সাধনার সঙ্গে স্বভাবের, কামনার সঙ্গে ঘটনার সংঘাতে কত আবর্ত্তন। নদী যেমন জলস্রোতের ধারা, মানুষ তেমনি গল্পের প্রবাহ। তাই পরস্পর দেখা হতেই প্রশ্ন এই, “কী হল হে, কি খবর, তার পরে?” এই “তার-পরের” সঙ্গে “তার-পরে” বোনা হয়ে পৃথিবী জুড়ে মানুষের গল্প গাঁথা হচ্চে। তাকেই বলি জীবনের কাহিনী, তাকেই বলি মানুষের ইতিহাস।
বিধাতার রচা ইতিহাস আর মানুষের রচা কাহিনী, এই দুই কথায় মিলে মানুষের সংসার। মানুষের পক্ষে কেবল যে অশোকের গল্প, আক্বরের গল্পই সত্য তা নয়; যে রাজপুত্র সাত-সমুদ্র-পারে সাতরাজার-ধন-মাণিকের সন্ধানে চলে সেও সত্য; আর সেই ভক্তিবিমুগ্ধ হনুমানের সরল বীরত্বের কথাও সত্য যে-হনুমান গন্ধমাদনকে উৎপাটিত করে আন্তে সংশয় বোধ করে না। এই মানুষের পক্ষে আরঞ্জেব যেমন সত্য, দুর্যোধনও তেমনি সত্য। কোন্টার প্রমাণ বেশী, কোন্টার প্রমাণ কম সে হিসাবে নয়; কেবল গল্প হিসাবে কোন্টা খাঁটি, সেইটেই তার পক্ষে সবচেয়ে সত্য।
মানুষ বিধাতার সাহিত্য-লোকেই মানুষ—সুতরাং না সে বস্তুতে গড়া, না তত্ত্বে—অনেক চেষ্টা করে’ হিতৈষী কোনমতেই এই কথা মানুষকে ভোলাতে পারলে না। অবশেষে হয়রান হয়ে হিতকথার সঙ্গে গল্পের সন্ধি-স্থাপন করতে সে চেষ্টা করে, কিন্তু চিরকালের স্বভাবদোষে কিছুতে জোড়া মেলাতে পারে না। তখন গল্পও যায় কেটে হিতকথাও পড়ে খসে, আবর্জ্জনা জমে ওঠে।
ঘোড়া
ঘোড়া
সৃষ্টির কাজ প্রায় শেষ হয়ে যখন ছুটির ঘণ্টা বাজে বলে’, হেনকালে ব্রহ্মার মাথায় একটা ভাবোদয় হল।
ভাণ্ডারীকে ডেকে বললেন, “ওহে ভাণ্ডারী, আমার কারখানা ঘরে কিছু কিছু পঞ্চভূতের জোগাড় করে আন, আর একটা নতুন প্রাণী সৃষ্টি করব।”
ভাণ্ডারী হাত জোড় করে বললে, “পিতামহ, আপনি যখন উৎসাহ করে’ হাতি গড়লেন, তিমি গড়লেন, অজগর সর্প গড়লেন, সিংহ-ব্যাঘ্র গড়লেন, তখন হিসাবের দিকে আদৌ খেয়াল করলেন না। যতগুলো ভারী আর কড়া জাতের ভূত ছিল সব প্রায় নিকাশ হয়ে এল। ক্ষিতি অপ্ তেজ তলায় এসে ঠেকেচে। থাকবার মধ্যে আছে মরুৎ-ব্যোম, তা’ সে যত চাই।”
চতুর্ম্মুখ কিছুক্ষণ ধরে চার জোড়া গোঁফে তা’ দিয়ে বললেন, “আচ্ছা ভালো, ভাণ্ডারে যা আছে তাই নিয়ে এস, দেখা যাক্!” এবারে প্রাণীটিকে গড়বার বেলা ব্রহ্মা ক্ষিতি অপ্ তেজটাকে খুব হাতে রেখে খরচ করলেন। তাকে না দিলেন শিং, না দিলেন নখ; আর দাঁত যা দিলেন তা’তে চিবনো চলে, কামড়ানো চলে না। তেজের ভাণ্ড থেকে কিছু খরচ করলেন বটে, তাতে প্রাণীটা যুদ্ধক্ষেত্রের কোনো কোনো কাজে লাগ্বার মতো হল কিন্তু তার লড়াইয়ের সখ রইল না। এই প্রাণীটি হচ্ছে ঘোড়া। এ ডিম পাড়ে না তবু বাজারে তার ডিম নিয়ে একটা গুজব আছে, তাই এ’কে দ্বিজ বলা চলে।
আর যাই হোক্, সৃষ্টিকর্ত্তা এর গড়নের মধ্যে মরুৎ আর ব্যোম একেবারে ঠেসে দিলেন। ফল হল এই যে, এর মনটা প্রায় ষোলো-আনা গেল মুক্তির দিকে। এ হাওয়ার আগে ছুটতে চায়, অসীম আকাশকে পেরিয়ে যাবে বলে পণ করে বসে। অন্য সকল প্রাণী, কারণ উপস্থিত হলে, দৌড়য়; এ দৌড়য় বিনা কারণে; যেন তার নিজেই নিজের কাছ থেকে পালিয়ে যাবার একান্ত শখ। কিছু কাড়তে চায় না, কাউকে মারতে চায় না, কেবলই পালাতে চায়। পালাতে পালাতে একেবারে বূঁদ হয়ে যাবে, ঝিম্ হয়ে যাবে, ভোঁ হয়ে যাবে, তার পরে না হয়ে যাবে, এই তার মৎলব। জ্ঞানীরা বলেন, ধাতের মধ্যে মরুৎব্যোম যখন ক্ষিতি অপ্ তেজকে সম্পূর্ণ ছাড়িয়ে ওঠে তখন এই রকমই ঘটে।
ব্রহ্মা বড় খুসি হলেন। বাসার জন্যে তিনি অন্য জন্তুর কাউকে দিলেন বন, কাউকে দিলেন গুহা, কিন্তু এর দৌড় দেখ্তে ভালোবাসেন বলে এ’কে দিলেন খোলা মাঠ।
মাঠের ধারে থাকে মানুষ। কাড়াকুড়ি করে সে যা-কিছু জমায় সমস্তই মস্ত বোঝা হয়ে ওঠে। তাই যখন মাঠের মধ্যে ঘোড়াটাকে ছুটতে দেখে, মনে মনে ভাবে এটাকে কোন গতিকে বাঁধতে পারলে আমাদের হাট করার বড় সুবিধে।
ফাঁস লাগিয়ে ধরলে একদিন ঘোড়াটাকে। তার পিঠে দিলে জিন, মুখে দিলে কাঁটা-লাগাম। ঘাড়ে তার লাগায় চাবুক আর কাঁধে মারে জুতোর শেল। তা ছাড়া আছে দলামলা।
মাঠে ছেড়ে রাখ্লে হাতছাড়া হবে, তাই ঘোড়াটার চারিদিকে পাঁচিল তুলে দিলে। বাঘের ছিল বন, তার বনই রইল; সিংহের ছিল গুহা কেউ কাড়ল না। কিন্তু ঘোড়ার ছিল খোলা মাঠ, সে এসে ঠেকল আস্তাবলে। প্রাণীটাকে মরুৎব্যোম মুক্তির দিকে অত্যন্ত উসকে দিলে কিন্তু বন্ধন থেকে বাঁচাতে পারলে না।
যখন অসহ্য হল তখন ঘোড়া তার দেয়ালটার পরে লাথি চালাতে লাগল। তার পা যতটা জখম হল দেয়াল ততটা হল না; তবু, চুন বালি খসে’ দেয়ালের সৌন্দর্য নষ্ট হতে লাগ্ল।
এতে মানুষের মনে বড় রাগ হল। বললে, ‘একেই বলে অকৃতজ্ঞতা। দানাপানি খাওয়াই, মোটা মাইনের সইস আনিয়ে আট প্রহর ওর পিছনে খাড়া রাখি, তবু মন পাই নে।’
মন পাবার জন্যে সইসগুলো এমনি উঠেপড়ে ডাণ্ডা চালালে যে ওর আর লাথি চল্ল না। মানুষ তার পাড়াপড়শিকে ডেকে বললে, “আমার এই বাহনটির মতো এমন ভক্ত বাহন আর নেই।”
তারা তারিফ করে বল্লে, ‘তাইত, একেবারে জলের মতো ঠাণ্ডা! তোমারই ধর্ম্মের মতো ঠাণ্ডা!”
একে তো গোড়া থেকেই ওর উপযুক্ত দাঁত নেই, নখ নেই, শিঙ নেই, তার পরে দেয়ালে এবং তদভাবে শূন্যে লাথি ছোঁড়াও বন্ধ। তাই মনটাকে খোলসা করবার জন্যে আকাশে মাথা তুলে সে চিঁহি চিঁহি করতে লাগ্ল। তাতে মানুষের ঘুম ভেঙে যায় আর পাড়াপড়শিরাও ভাবে, আওয়াজটা তো ঠিক ভক্তি-গদ্গদ শোনাচ্ছে না। মুখ বন্ধ করবার অনেকরকম যন্ত্র বেরোল। কিন্তু, দম বন্ধ না করলে মুখ তো একেবারে বন্ধ হয় না। তাই চাপা আওয়াজ মুমূর্ষুর খাবির মত মাঝে মাঝে বেরতে থাকে।
একদিন সেই আওয়াজ গেল ব্রহ্মার কানে। তিনি ধ্যান ভেঙে একবার পৃথিবীর খোলা মাঠের দিকে তাকালেন। সেখানে ঘোড়ার চিহ্ন নেই।
পিতামহ যমকে ডেকে বললেন, “নিশ্চয় তোমারি কীর্ত্তি! আমার ঘোড়াটিকে নিয়েচ।”
যম বল্লেন “সৃষ্টিকর্ত্তা, আমাকেই তোমার যত সন্দেহ! একবার মানুষের পাড়ার দিকে তাকিয়ে দেখ!”
ব্রহ্মা দেখেন, অতি ছোট জায়গা, চারদিকে পাঁচিল তোলা; তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ক্ষীণস্বরে ঘোড়াটি চিঁহি চিঁহি করচে।
হৃদয় তার বিচলিত হল। মানুষকে বল্লেন, “আমার এই জীবকে যদি মুক্তি না দাও তবে বাঘের মত ওর নখ দন্ত বানিয়ে দেব, ও তোমার কোনো কাজে লাগ্বে না”
মানুষ বল্লে, “ছিছি তাতে হিংস্রতার বড় প্রশ্রয় দেওয়া হবে। কিন্তু যাই বল, পিতামহ, তোমার এই প্রাণীটি মুক্তির যোগ্যই নয়। ওর হিতের জন্যেই অনেক খরচে আস্তাবল বানিয়েচি। খাসা আস্তাবল।”
ব্রহ্মা জেদ করে বললেন “ওকে ছেড়ে দিতেই হবে।”
মানুষ বললে, আচ্ছা ছেড়ে দেব। কিন্তু সাত দিনের মেয়াদে, তার পরে যদি বল তোমার মাঠের চেয়ে আমার আস্তাবল ওর পক্ষে ভাল নয় তাহলে নাকে খৎ দিতে রাজি আছি।”
মানুষ করলে কি, ঘোড়াটাকে মাঠে দিলে ছেড়ে; কিন্তু তার সামনের দুটো পায়ে কসে রসি বাঁধ্ল। তখন ঘোড়া এমনি চল্তে লাগল যে ব্যাঙের চাল তার চেয়ে সুন্দর।
ব্রহ্মা থাকেন সুদূর স্বর্গে; তিনি ঘোড়াটার চাল দেখ্তে পান, তার হাঁটুর বাধন দেখ্তে পান না। তিনি নিজের কীর্ত্তির এই ভাঁড়ের মত চালচলন দেখে লজ্জায় লাল হয়ে উঠলেন। বল্লেন “ভুল করেচি ত!”
মানুষ হাত জোড় করে বললে, “এখন এটাকে নিয়ে করি কি? আপনার ব্রহ্মলোকে যদি মাঠ থাকে ত বরঞ্চ সেইখানে রওনা করে দিই।”
ব্রহ্মা ব্যাকুল হয়ে বল্লেন, “যাও, যাও, ফিরে নিয়ে যাও তোমার আস্তাবলে!”
মানুষ বল্লে, “আদিদেব, মানুষের পক্ষে এ যে এক বিষম বোঝা!”
ব্রহ্মা বল্লেন, “সেই ত মানুষের মনুষ্যত্ব।
নামের খেলা
নামের খেলা
প্রথম বয়সেই সে কবিতা লিখ্তে সুরু করে।
বহু যত্নে খাতায় সোনালী কালীর কিনারা টেনে তারি গায়ে লতা এঁকে, মাঝখানে লাল কালী দিয়ে কবিতাগুলি লিখে রাখ্ত। আর খুব সমারোহে মলাটের উপর লিখ্ত, শ্রীকেদারনাথ ঘোষ।
একে একে লেখাগুলিকে কাগজে পাঠাতে লাগ্ল। কোথাও ছাপা হ’ল না।
মনে মনে সে স্থির কর্লে, যখন হাতে টাকা জম্বে তখন নিজে কাগজ বের কর্বে।
বাপের মৃত্যুর পর গুরুজনেরা বার বার বললে, “একটা কোনো কাজের চেষ্টা কর, কেবল লেখা নিয়ে সময় নষ্ট কোরো না।”
সে একটুখানি হাস্লে আর লিখ্তে লাগ্ল। একটি দুটি তিনটি বই সে পরে পরে ছাপালে।
এই নিয়ে খুব আন্দোলন হবে আশা করেছিল। হ’ল না।
আন্দোলন হ’ল একটি পাঠকের মনে। সে হচ্চে, তার ছোট ভাগনেটি।
নতুন ক খ শিখে সে যে-বই হাতে পায় চেঁচিয়ে পড়ে।
একদিন একখানা বই নিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে মামার কাছে ছুটে এল। বললে, “দেখ দেখ, মামা, এ যে তোমারি নাম।”
মামা একটুখানি হাস্লে আর আদর ক’রে খোকার গাল টিপে দিলে।
মামা তার বাক্স খুলে আর-একখানি বই বের করে’ বললে, “আচ্ছা, এটা পড় দেখি।”
ভাগ্নে একটি একটি অক্ষর বানান করে’ করে’ মামার নাম পড়্ল। বাক্স থেকে আরও একটা বই বেরল, সেটাতেও পড়ে’ দেখে, মামার নাম।
পরে পরে যখন তিনটি বইয়ে মামার নাম দেখ্লে, তখন সে আর অল্পে সন্তুষ্ট হ’তে চাইল না। দুই হাত ফাঁক ক’রে’ জিজ্ঞেস কর্লে, “তোমার নাম আরো অনেক অনেক অনেক বইয়ে আছে; একশোটা, চব্বিশটা, সাতটা বইয়ে?”
মামা চোখ টিপে বল্লে, “ক্রমে দেখ্তে পাবি।”
ভাগ্নে বই তিনটে নিয়ে লাফাতে লাফাতে বাড়ির বুড়ি ঝিকে দেখাতে নিয়ে গেল।
ইতিমধ্যে মামা একখানা নাটক লিখেছে। ছত্রপতি শিবাজী তার নায়ক।
বন্ধুরা বললে, “এ নাটক নিশ্চয় থিয়েটারে চল্বে।”
সে মনে মনে স্পষ্ট দেখ্তে লাগল, রাস্তায় রাস্তায় গলিতে গলিতে তার নিজের নামে আর নাটকের নামে যেন শহরের গায়ে উল্কি পরিয়ে দিয়েছে।
আজ রবিবার। তার থিয়েটার-বিলাসী বন্ধু থিয়েটার-ওয়ালাদের কাছে অভিমত আন্তে গেছে। তাই সে পথ চেয়ে রইল।
রবিবারে তার ভাগ্নেরও ছুটি। আজ সকাল থেকে সে এক খেলা বের করেছে, অন্যমনস্ক হ’য়ে মামা তা লক্ষ্য করে নি।
ওদের ইস্কুলের পাশে ছাপাখানা আছে। সেখান থেকে ভাগ্নে নিজের নামের কয়েকটা সীসের অক্ষর জুটিয়ে এনেছে। তার কোনোটা ছোট, কোনোটা বড়।
যে-কোনো বই পায় এই সীসের অক্ষরে কালী লাগিয়ে তাতে নিজের নাম ছাপাচ্চে। মামাকে আশ্চর্য্য ক’রে দিতে হবে।
আশ্চর্য্য করে দিলে। মামা এক সময়ে বস্বার ঘরে এসে দেখে, ছেলেটি ভারী ব্যস্ত।
কি কানাই, কি কর্ছিস্?
ভাগ্নে খুব আগ্রহ করে’ই দেখালে সে কি কর্চে। কেবল তিনটি মাত্র বই নয়, অন্ততঃ পঁচিশখানা বইয়ে ছাপার অক্ষরে কানাইয়ের নাম!
এ কি-কাণ্ড। পড়া-শুনোর নাম নেই, ছোঁড়াটার কেবল খেলা! আর এ কি-রকম খেলা!
কানাইয়ের বহু-দুঃখে-জোটানো নামের অক্ষরগুলি হাত থেকে সে ছিনিয়ে নিলে।
কানাই শোকে চীৎকার করে’ কাঁদে, তার পরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদে, তার পরে থেকে থেকে দম্কায় দম্কায় কেঁদে ওঠে, কিছুতেই সান্ত্বনা মানে না।
বুড়ি ঝি ছুটে এসে জিজ্ঞেস কর্লে, “কি হ’য়েছে, বাবা?”
কানাই বল্লে, “আমার নাম।”
মা এসে বল্লে, “কি রে কানাই, কি হয়েছে?”
কানাই রুদ্ধকণ্ঠে বল্লে, “আমার নাম।”
ঝি লুকিয়ে তার হাতে আস্ত একটি ক্ষীরপুলি এনে দিলে, মাটিতে ফেলে দিয়ে সে বল্লে, “আমার নাম!”
মা এসে বল্লে, “কানাই, এই নে তোর সেই রেলগাড়ীটা।”
কানাই রেলগাড়ী ঠেলে ফেলে বল্লে, “আমার নাম।”
থিয়েটার থেকে বন্ধু এল।
মামা দরজার কাছে ছুটে গিয়ে জিজ্ঞেস কর্লে, “কী হ’ল?”
বন্ধু বল্লে, ‘ওরা রাজী হ’ল না।”
অনেকক্ষণ চুপ করে’ থেকে মামা বল্লে,”আমার সর্ব্বস্ব যায় সেও ভাল, আমি নিজে থিয়েটার খুল্ব।”
বন্ধু বল্লে, “আজ ফুটবল ম্যাচ দেখ্তে যাবে না?”
ও বল্লে, “না, আমার জ্বরভাব।”
বিকেলে মা এসে বল্লে, “খাবার ঠাণ্ডা হয়ে গেল।”
ও বল্লে, “খিদে নেই!”
সন্ধ্যের সময় স্ত্রী এসে বল্লে, “তোমার সেই নতুন লেখাটা শোনাবে না?”
ও বল্লে, “মাথা ধরেছে!”
ভাগ্নে এসে বল্লে, “আমার নাম ফিরিয়ে দাও!”
মামা ঠাস্ করে’ তার গালে এক চড় কষিয়ে দিলে।
পায়ে চলার পথ
লিপিকা
পায়ে চলার পথ
এই ত পায়ে চলার পথ।
এসেছে বনের মধ্যে দিয়ে মাঠে, মাঠের মধ্যে দিয়ে নদীর ধারে, খেয়া-ঘাটের পাশে বটগাছ-তলায়। তার পরে ওপারের ভাঙা ঘাট থেকে বেঁকে চলে গেছে গ্রামের মধ্যে; তার পরে তিসির ক্ষেতের ধার দিয়ে, আমবাগানের ছায়া দিয়ে, পদ্ম-দিঘির পাড় দিয়ে, রথতলার পাশ দিয়ে কোন্ গাঁয়ে গিয়ে পৌঁছেচে জানিনে।
এই পথে কত মানুষ কেউবা আমার পাশ দিয়ে চলে গেছে, কেউবা সঙ্গ নিয়েচে, কাউকে বা দূর থেকে দেখা গেল; কারো বা ঘোম্টা আছে, কারো বা নেই; কেউবা জল ভর্তে চলেছে, কে,বা জল নিয়ে ফিরে এল।
এখন দিন গিয়েছে, অন্ধকার হয়ে আসে।
একদিন এই পথকে মনে হয়েছিল আমারই পথ, একান্তই আমার; এখন দেখ্চি কেবল একটিবার মাত্র এই পথ দিয়ে চল্বার হুকুম নিয়ে এসেচি, আর নয়।
নেবুতলা উজিয়ে সেই পুকুরপাড়, দ্বাদশ দেউলের ঘাট, নদীর চর, গোয়াল-বাড়ি, ধানের গোলা পেরিয়ে সেই চেনা চাউনি, চেনা কথা, চেনা মুখের মহলে আর একটিবারও ফিরে গিয়ে বলা হবে না, “এই-যে!” এ পথ যে চলার পথ, ফেরার পথ নয়।
আজ ধূসর সন্ধ্যায় একবার পিছন ফিরে তাকালুম; দেখ্লুম, এই পথটি বহুবিস্মৃত পদচিহ্নের পদাবলী, ভৈরবীর সুরে বাঁধা।
যত কাল যত পথিক চলে গেছে তাদের জীবনের সমস্ত কথাকেই এই পথ আপনার একটি মাত্র ধূলিরেখায় সংক্ষিপ্ত করে এঁকেচে; সেই একটি রেখা চলেচে সূর্য্যোদয়ের দিক্ থেকে সূর্য্যাস্তের দিকে, এক সোনার সিংহদ্বার থেকে আরেক সোনার সিংহদ্বারে।
“ওগো পায়ে-চলার পথ, অনেক কালের অনেক কথাকে তোমার এই ধূলি-বন্ধনে বেঁধে নীরব করে রেখোনা। আমি তোমার ধুলোয় কান পেতে আছি, আমাকে কানে-কানে বলো।”
পথ নিশীথের কালো পর্দ্দার দিকে তর্জ্জনী বাড়িয়ে চুপ করে থাকে।
“ওগো পায়ে-চলার পথ, এত পথিকের এত ভাবনা, এত ইচ্ছা, সে-সব গেল কোথায়?”
বোবা পথ কথা কয় না। কেবল সূর্য্যোদয়ের দিক থেকে সূর্য্যাস্তের দিক পর্য্যন্ত ইসারা মেলে’ রাখে।
“ওগো পায়ে চলার পথ, তোমার বুকের উপর যেসমস্ত চরণপাত একদিন পুষ্পবৃষ্টির মতো পড়েছিল আজ তারা কি কোথাও নেই?”
পথ কি নিজের শেষকে জানে, যেখানে লুপ্ত ফুল আর স্তব্ধ গান পৌঁছল, যেখানে তারার আলোয় অনির্ব্বাণ বেদনার দেয়ালি-উত্সব হচ্চে?
পুনরাবৃত্তি
পুনরাবৃত্তি
সেদিন যুদ্ধের খবর ভাল ছিল না। রাজা বিমর্ষ হয়ে বাগানে বেড়াতে গেলেন।
দেখতে পেলেন প্রাচীরের কাছে গাছতলায় বসে খেলা কর্চে একটি ছোট ছেলে, আর একটি ছোট মেয়ে।
রাজা তাদের জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমরা কি খেল্চ?”
তারা বল্লে, “আমাদের আজকের খেলা রামসীতার বনবাস।”
রাজা সেখানে বসে গেলেন।
ছেলেটি বল্লে, “এই আমাদের দণ্ডক বন, এখানে কুটীর বাঁধচি।”
সে একরাশ ভাঙা ডালপালা খড় ঘাস জুটিয়ে এনেচে, ভারি ব্যস্ত।
আর মেয়েটি শাক-পাতা নিয়ে খেলার হাঁড়িতে বিনা আগুনে রাঁধচে; রাম খাবেন, তারি আয়োজনে সীতার একদণ্ড সময় নেই।
রাজা বললেন, “আর ত সব দেখচি, কিন্তু রাক্ষস কোথায়?”
ছেলেটীকে মানতে হল তাদের দণ্ডক বনে কিছু কিছু ত্রুটি আছে।
রাজা বললেন, “আচ্ছা, আমি হ’ব রাক্ষস।”
ছেলেটি তাঁকে ভাল করে দেখলে। তার পরে বললে, “তোমাকে কিন্তু হেরে যেতে হবে।”
রাজা বললেন, “আমি খুব ভাল হারতে পারি। পরীক্ষা করে দেখ।”
সেদিন রাক্ষসবধ এতই সুচারুরূপে হতে লাগল যে, ছেলেটি কিছুতে রাজাকে ছুটি দিতে চায় না। সেদিন এক বেলাতে তাকে দশ বারোটা রাক্ষসের মরণ একলা মর্তে হল। মর্তে মর্তে হাঁপিয়ে উঠলেন।
ত্রেতাযুগে পঞ্চবটীতে যেমন পাখী ডেকেছিল সেদিন সেখানে ঠিক তেমনি করেই ডাকতে লাগল। ত্রেতাযুগে সবুজ পাতায় পর্দ্দায় পর্দ্দায় প্রভাত আলো যেমন কোমল ঠাটে আপন সুর বেঁধে নিয়েছিল আজও ঠিক সেই সুরই বাঁধলে।
রাজার মন থেকে ভার নেমে গেল।
মন্ত্রীকে ডেকে তিনি জিজ্ঞাসা কর্লেন, “ছেলে মেয়ে দুটি কার?”
মন্ত্রী বললে, “মেয়েটি আমারই, নাম রুচিরা। ছেলের নাম কৌশিক, ওর বাপ গরীব ব্রাহ্মণ, দেবপূজা করে দিন চলে।”
রাজা বললেন, “যখন সময় হবে এই ছেলেটির সঙ্গে ঐ মেয়ের বিবাহ হয় এই আমার ইচ্ছা।”
শুনে মন্ত্রী উত্তর দিতে সাহস করলে না, মাথা হেঁট করে রইল।
দেশে সব চেয়ে যিনি বড় পণ্ডিত রাজা তার কাছে কৌশিককে পড়তে পাঠালেন। যত উচ্চ বংশের ছাত্র তার কাছে পড়ে। আর পড়ে রুচিরা।
কৌশিক যেদিন তাঁর পাঠশালায় এল সেদিন অধ্যাপকের মন প্রসন্ন হল না। অন্য সকলেও লজ্জা পেলে। কিন্তু রাজার ইচ্ছা।
সকলের চেয়ে সঙ্কট রুচিরার। কেন না, ছেলেরা কানাকানি করে। লজ্জায় তার মুখ লাল হয়, রাগে তার চোখ দিয়ে জল পড়ে।
কৌশিক যদি কখনো তাকে পুঁথি এগিয়ে দেয়, সে পুঁথি ঠেলে ফেলে। যদি তাকে পাঠের কথা বলে সে উত্তর করে না।
রুচির প্রতি অধ্যাপকের স্নেহের সীমা ছিল না। কৌশিককে সকল বিষয়ে সে এগিয়ে যাবে এই ছিল তাঁর প্রতিজ্ঞা, রুচিরও সেই ছিল পণ।
মনে হল সেটা খুব সহজেই ঘটবে, কারণ, কৌশিক পড়ে বটে কিন্তু এক মনে নয়। তার সাঁতার কাটতে মন, তার বনে বেড়াতে মন, সে গান করে, সে যন্ত্র বাজায়।
অধ্যাপক তাকে ভর্ৎসনা করে'’ বলেন, “বিদ্যায় তোমার অনুরাগ নেই কেন?”
সে বলে, “আমার অনুরাগ শুধু বিদ্যায় নয়, আরো নানা জিনিষে।”
অধ্যাপক বলেন, “সে সব অনুরাগ ছাড়।”
সে বলে, “তাহলে বিদ্যার প্রতিও আমার অনুরাগ থাকবে না।”
এমনি করে কিছুকাল যায়।
রাজা অধ্যাপককে জিজ্ঞাসা করলেন, “তোমার ছাত্রের মধ্যে শ্রেষ্ঠ কে?”
অধ্যাপক বললেন, “রুচিরা।”
রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, “আর কৌশিক?”
অধ্যাপক বললেন, “সে যে কিছুই শিখেচে এমন বোধ হয় না।”
রাজা বললেন, “আমি কৌশিকের সঙ্গে রুচির বিবাহ ইচ্ছা করি।”
অধ্যাপক একটু হাসলেন, বললেন, “এ যেন গোধূলীর সঙ্গে ঊষার বিবাহের প্রস্তাব।”
রাজা মন্ত্রীকে ডেকে বললেন, “তোমার কন্যার সঙ্গে কৌশিকের বিবাহে বিলম্ব উচিত নয়।”
মন্ত্রী বললে, “মহারাজ, আমার কন্যা এ বিবাহে অনিচ্ছুক।”
রাজা বললেন, “স্ত্রীলোকের মনের ইচ্ছা কি মুখের কথায় বোঝা যায়?”
মন্ত্রী বললে, “তার চোখের জলও যে সাক্ষ্য দিচ্চে।”
রাজা বললেন, “সে কি মনে করে কৌশিক তার অযোগ্য।”
মন্ত্রী বললেন, “হাঁ, সেই কথাই বটে।”
রাজা বললেন, “আমার সামনে দুজনের বিদ্যার পরীক্ষা হোক। কৌশিকের জয় হলে এই ৰিবাহ সম্পন্ন হবে।”
পরদিন মন্ত্রী রাজাকে এসে বললে, “এই পণে আমার কন্যার মত আছে।”
বিচারসভা প্রস্তুত। রাজ সিংহাসনে বসে’, কৌশিক র্তার সিংহাসনতলে।
স্বয়ং অধ্যাপক রুচিকে সঙ্গে করে উপস্থিত হলেন। কৌশিক আসন ছেড়ে উঠে’ তাকে প্রণাম ও রুচিকে নমস্কার করলে। রুচি দৃকপাত করল না।
কোনোদিন পাঠশালার রীতি পালনের জন্যেও কৌশিক রুচির সঙ্গে তর্ক করে নি। অন্ত ছাত্রেরাও অবজ্ঞা করে তাকে তর্কের অবকাশ দিত না। তাই আজ যখন তার যুক্তির মুখে তীক্ষ্ণ বিদ্রুপ তীরের ফলায় আলোর মত ঝিকমিক করে উঠল তখন গুরু বিস্মিত হলেন, এবং বিরক্ত হলেন। রুচির কপালে ঘাম দেখা দিল, সে বুদ্ধি স্থির রাখতে পারলে না। কৌশিক তাকে পরাভবের শেষ কিনারায় নিয়ে গিয়ে তবে ছেড়ে দিলে।
ক্রোধে অধ্যাপকের বাকরোধ হল, আর রুচির চোখ দিয়ে ধারা বেয়ে জল পড়তে লাগল।
রাজা মন্ত্রীকে বললেন, “এখন বিবাহের দিন স্থির কর।”
কৌশিক আসন ছেড়ে উঠে জোড় হাজে রাজাকে বললে, “ক্ষমা করবেন, এ বিবাহ আমি করব না।”
রাজা বিস্মিত হয়ে বললেন, “জয়লব্ধ পুরস্কার গ্রহণ করবে না?”
কৌশিক বললে, “জয় আমারই থাক পুরস্কার অন্তের হোক।”
অধ্যাপক বললেন, “মহারাজ আর এক বছর সময় তার পরে শেষ পরীক্ষা।”
সেই কথাই স্থির হল।
কৌশিক পাঠশালা ত্যাগ করে গেল। কোনোদিন সকালে তাকে বনের ছায়ায় কোনোদিন সন্ধ্যায় তাকে পাহাড়ের চূড়ার উপর দেখা যায়।
এদিকে রুচির শিক্ষায় অধ্যাপক সমস্ত মন দিলেন। কিন্তু রুচির সমস্ত মন কোথায়?
অধ্যাপক বিরক্ত হয়ে বললেন, “এখনো যদি সতর্ক না হও তবে দ্বিতীয় বার তোমাকে লজ্জা পেতে হবে।”
দ্বিতীয় বার লজ্জা পাবার জন্যেই যেন সে তপস্যা করতে লাগল। অপর্ণার তপস্যা যেমন অনশনের, রুচির তপস্যা তেমনি অনধ্যায়ের। ষড়দর্শনের পুঁথি তার বন্ধই রইল, এমন কি, কাব্যের পুথিও দৈবাৎ খোলা হয়।
অধ্যাপক রাগ করে’ বললেন, “কপিল কণাদের নামে শপথ করে’ বলচি আর কখনো স্ত্রীলোক ছাত্র নেব না। বেদবেদান্তের পার পেয়েচি, স্ত্রীজাতির মন বুঝতে পারলেম না।”
একদা মন্ত্রী এসে রাজাকে বললে, “ভবদত্তর বাড়ি থেকে কন্যার সম্বন্ধ এসেচে। কুলে শীলে ধনে মানে তারা অদ্বিতীয়। মহারাজের সম্মতি চাই।”
রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, “কন্যা কি বলে?”
মন্ত্রী বললে, “মেয়েদের মনের ইচ্ছা কি মুখের কথায় বোঝা যায়?”
রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, “তার চোখের জল আজ কি রকম সাক্ষ্য দিচ্চে?”
মন্ত্রী চুপ করে রইল।
রাজা তার বাগানে এসে বসলেন। মন্ত্রীকে বললেন, “তোমার মেয়েকে আমার কাছে পাঠিয়ে দাও।”
রুচিরা এসে রাজাকে প্রণাম করে দাঁড়ালে।
রাজা বললেন, “বৎসে, সেই রামের বনবাসের খেলা মনে আছে?”
রুচিরা স্মিতমুখে মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
রাজা বললে “আজ সেই রামের বনবাস খেলা আর একবার দেখ্তে আমার বড় সাধ।”
রুচিরা মুখের একপাশে আঁচল টেনে চুপ করে রইল।
রাজা বললেন, “বনও আছে রামও আছে, কিন্তু শুনচি, বৎসে, এবার সীতার অভাব ঘটেচে। তুমি মনে করলেই সে অভাব পূরণ হয়।”
রুচিরা কোন কথা না বলে’ রাজার পায়ের কাছে নত হয়ে প্রণাম করলে।
রাজা বল্লেন, “কিন্তু বৎসে, এবার আমি রাক্ষস সাজ্তে পারব না।”
রুচিরা স্নিগ্ধ চক্ষে রাজার মুখের দিকে চেয়ে রইল।
রাজা বললেন, “এবার রাক্ষস সাজ্বে তোমাদের অধ্যাপক।”
পুরোনো বাড়ি
পুরোনো বাড়ি
অনেক কালের ধনী গরিব হয়ে গেছে, তাদেরই ঐ বাড়ি।
দিনে দিনে ওর উপরে দুঃসময়ের আঁচড় পড়চে। দেয়াল থেকে বালি খসে পড়ে, ভাঙা মেঝে নখ দিয়ে খুঁড়ে চড়ুইপাখি ধুলোয় পাখা ঝাপট দেয়, চণ্ডীমণ্ডপে পায়রাগুলো বাদলের ছিন্ন মেঘের মতো দল বাঁধ্ল।
উত্তর দিকের এক পাল্লা দরজা কবে ভেঙে পড়েচে কেউ খবর নিলে না। বাকি দরজাটা—শোকাতুরা বিধবার মত—বাতাসে ক্ষণে ক্ষণে আছাড় খেয়ে পড়ে, কেউ তাকিয়ে দেখে না।
তিন মহল বাড়ি। কেবল পাঁচটি ঘরে মানুষের বাস, বাকি সব বন্ধ। যেন পঁচাশি বছরের বুড়ো, তার জীবনের সবখানি জুড়ে সেকালের কুলুপ-লাগানো স্মৃতি;—কেবল একখানিতে একালের চলাচল।
বালি-ধসা ইঁট-বের-করা বাড়িটা তালি-দেওয়া-কাঁথা-পরা উদাসীন পাগ্লার মত রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে;
আপনাকেও দেখে না, অন্যকেও না।
একদিন ভোর রাত্রে ঐদিকে মেয়ের গলায় কান্না উঠ্ল। শুনি, বাড়ির যেটি শেষ ছেলে, সখের যাত্রায় রাধিকা সেজে যার দিন চল্ত, সে আজ আঠারো বছরে মারা গেল।
ক’দিন মেয়েরা কাঁদ্ল, তার পরে তাদের আর খবর নেই।
তার পরে সকল দরজাতেই তালা পড়ল।
কেবল উত্তর দিকের সেই একখানা অনাথা দরজা ভাঙেও না, বন্ধও হয় না; ব্যথিত হৃৎপিণ্ডের মত বাতাসে ধড়াস্ ধড়াস্ করে আছাড় খায়।
একদিন সেই বাড়িতে বিকেলে ছেলেদের গোলমাল শোনা গেল।
দেখি, বারান্দা থেকে লালপেড়ে শাড়ি ঝুল্চে।
অনেকদিন পরে বাড়ির এক অংশে ভাড়াটে এসেচে। তার মাইনে অল্প, ছেলেমেয়ে বিস্তর। শ্রান্ত মা বিরক্ত হয়ে তাদের মারে, তারা মেঝেতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদে।
একটা আধা-বয়সী দাসী সমস্ত দিন খাটে, আর গৃহিণীর সঙ্গে ঝগড়া করে; বলে ‘“চল্লুম”, কিন্তু যায় না।
বাড়ির এই ভাগটায় রোজ একটু আধটু মেরামত চল্চে।
ফাটা সাসির উপর কাগজ আঁটা হল; বারান্দায় রেলিঙের ফাঁকগুলোতে বাঁখারি বেঁধে দিলে; শোবার ঘরে ভাঙা জান্লা ইঁট দিয়ে ঠেকিয়ে রাখ্লে; দেয়ালে চুনকাম হ’ল, কিন্তু কালো ছাপগুলোর আভাস্ ঢাকা পড়ল না।
ছাদে আল্সের পরে গামলায় একটা রোগা পাতাবাহারের গাছ হঠাৎ দেখা দিয়ে আকাশের কাছে লজ্জা পেলে। তার পাশেই ভিত ভেদ করে অশথ গাছটি সিধে দাঁড়িয়ে; তার পাতাগুলো এদের দেখে যেন খিল্ খিল্ করে হাস্তে লাগ্ল।
মস্ত ধনের মস্ত দারিদ্র্য। তাকে ছোট হাতের ছোট কৌশলে ঢাকা দিতে গিয়ে তার আবরু গেল।
কেবল উত্তর দিকের উজাড় ঘরটির দিকে কেউ তাকায় নি। তার সেই জোড়-ভাঙা দরজা আজো কেবল বাতাসে আছ্ড়ে পড়চে—হতভাগার বুক-চাপ্ড়ানির মত।
প্রথম শোক
প্রথম শোক
বনের ছায়াতে যে পথটি ছিল, সে আজ ঘাসে ঢাকা।
সেই নির্জ্জনে হঠাৎ পিছন থেকে কে বলে উঠ্ল, “আমাকে চিনতে পার না?”
আমি ফিরে তার মুখের দিকে তাকালেম। বললেম, “মনে পড়চে, কিন্তু ঠিক নাম করতে পারচিনে।”
সে বল্লে, “আমি তোমার সেই অনেক কালের, সেই পঁচিশ বছর বয়সের শোক।”
তার চোখের কোণে একটু ছল্ছলে আভা দেখা দিলে, যেন দিঘির জলে চাঁদের রেখা।
অবাক্ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেম। বল্লেম, “সেদিন তোমাকে শ্রাবণের মেঘের মতো কালো দেখেছি, আজ যে দেখি আশ্বিনের সোনার প্রতিমা। সেদিনকার সব চোখের জল কি হারিয়ে ফেলেচ?”
কোনো কথাটি না বলে সে একটু হাস্লে; বুঝলেম, সবটুকু রয়ে গেচে ঐ হাসিতে। বর্ষার মেঘ শরতে শিউলিফুলের হাসি শিখে নিয়েচে।
আমি জিজ্ঞাসা কর্লেম, “আমার সেই পঁচিশ বছরের যৌবনকে কি আজো তোমার কাছে রেখে দিয়েচ?”
সে বল্লে, “এই দেখনা আমার গলার হার।” দেখলেম, সেদিনকার বসন্তের মালার একটি পাপ্ড়িও খসে নি।
আমি বল্লেম, “আমার আর ত সব জীর্ণ হয়ে গেল, কিন্তু তোমার গলায় আমার সেই পঁচিশ বছরের যৌবন আজও ত ম্লান হয় নি।”
আস্তে আস্তে সেই মালাটি নিয়ে সে আমার গলায় পরিয়ে দিলে। বল্লে, “মনে আছে, সেদিন বলেছিলে, তুমি সান্ত্বনা চাও না, তুমি শোককেই চাও!”
লজ্জিত হয়ে বল্লেম, “বলেছিলেম। কিন্তু, তার পরে অনেক দিন হয়ে গেল, তার পরে কখন ভুলে গেলেম।”
সে বললে, “যে-অর্ন্তযামীর বর, তিনি ত ভোলেন নি। আমি সেই অবধি ছায়াতলে গোপনে বসে আছি। আমাকে বরণ করে নাও।”
আমি তার হাতখানি আমার হাতে তুলে নিয়ে বল্লেম, “একি তোমার অপরূপ মূর্ত্তি!”
সে বল্লে, “যা ছিল শোক, আজ তাই হয়েচে শান্তি।”
প্রশ্ন
প্রশ্ন
শ্মাশান হতে বাপ ফিরে এল।
তখন সাত বছরের ছেলেটি—গা খোলা, গলায় সোনার তাবিজ—একলা গলির উপরকার জান্লার ধারে।
কী ভাবচে তা সে আপ্নি জানেনা।
সকালের রৌদ্র সাম্নের বাড়ির নীম গাছটির আগডালে দেখা দিয়েছে;
কাঁচা-আমওয়ালা গলির মধ্যে এসে হাঁক দিয়ে দিয়ে ফিরে গেল।
বাবা এসে খোকাকে কোলে নিলে; খোকা জিজ্ঞাসা করলে, “মা কোথায়?”
বাবা উপরের দিকে মাথা তুলে বল্লে, “স্বর্গে।”
সে রাত্রে শোকে শ্রান্ত বাপ, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ক্ষণে ক্ষণে গুমরে উঠ্চে।
দুয়ারে লণ্ঠনের মিট্মিটে আলো, দেয়ালের গায়ে একজোড়া টিক্টিকি।
সাম্নে খোলা ছাদ, কখন্ খোকা সেইখানে এসে দাঁড়াল।
চারিদিকে আলো-নেবানো বাড়িগুলো যেন দৈত্যপুরীর পাহারা-ওয়ালা, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমুচ্চে।
উলঙ্গগায়ে খোকা আকাশের দিকে তাকিয়ে।
তার দিশাহারা মন কাকে জিজ্ঞাসা করচে, “কোথায় স্বর্গের রাস্তা?”
আকাশে তার কোনো সাড়া নেই;
কেবল তারায় তারায় বোবা অন্ধকারের চোখের জল।
বাঁশি
বাঁশি
বাঁশির বাণী চিরদিনের বাণী—শিবের জটা থেকে গঙ্গার ধারা, প্রতিদিনের মাটির বুক বেয়ে চলেচে; অমরাবতীর শিশু নেমে এল মর্ত্ত্যের ধূলি নিয়ে স্বর্গ-স্বর্গ খেলতে।
পথের ধারে দাঁড়িয়ে বাঁশি শুনি আর মন যে কেমন করে বুঝতে পারি নে। সেই ব্যথাকে চেনা সুখ-দুঃখের সঙ্গে মেলাতে যাই, মেলে না। দেখি, চেনা হাসির চেয়ে সে উজ্জ্বল, চেনা চোখের জলের চেয়ে সে গভীর।
আর, মনে হতে থাকে, চেনাটা সত্য নয়, অচেনাই সত্য। মন এমন সৃষ্টিছাড়া ভাব ভাবে কী করে? কথায় তার কোনো জবাব নেই।
আজ ভোরবেলাতেই উঠে শুনি, বিয়ে-বাড়িতে বাঁশি বাজ্চে।
বিয়ের এই প্রথম দিনের সুরের সঙ্গে প্রতিদিনের সুরের মিল কোথায়। গোপন অতৃপ্তি, গভীর নৈরাশ্য; অবহেলা, অপমান, অবসাদ; তুচ্ছ কামনার কার্পণ্য, কুশ্রী নীরসতার কলহ, ক্ষমাহীন ক্ষুদ্রতার সংঘাত, অভ্যস্ত জীবনযাত্রার ধুলিলিপ্ত দারিদ্র্য—বাঁশির দৈববাণীতে এসব বার্ত্তার আভাস কোথায়?
গানের সুর সংসারের উপর থেকে এই সমস্ত চেনা কথার পর্দ্দা একটানে ছিঁড়ে ফেলে দিলে। চিরদিনকার বর-কনের শুভদৃষ্টি হচ্চে কোন্ রক্তাংশুকের সলজ্জ অবগুণ্ঠনতলে, তাই তার তানে তানে প্রকাশ হয়ে পড়ল।
যখন সেখানকার মালা-বদলের গান বাঁশিতে বেজে উঠ্ল তখন এখানকার এই কনেটির দিকে চেয়ে দেখ্লেম; তার গলায় সোনার হার, তার পায়ে দু’গাছি মল, সে যেন কান্নার সরোবরে আনন্দের পদ্মটির উপরে দাঁড়িয়ে।
সুরের ভিতর দিয়ে তাকে সংসারের মানুষ বলে আর চেনা গেল না। সেই চেনা ঘরের মেয়ে অচিন্ ঘরের বউ হয়ে দেখা দিলে।
বাঁশি বলে, এই কথাই সত্য।
বাণী
বাণী
ফোঁটা ফোঁটা বৃষ্টি হয়ে আকাশের মেঘ নামে,—মাটির কাছে ধরা দেবে বলে’। তেমনি কোথা থেকে মেয়েরা আসে পৃথিবীতে বাঁধা পড়তে।
তাদের জন্য অল্প জায়গার জগত্, অল্প মানুষের। ঐটুকুর মধ্যে আপনার সবটাকে ধরানো চাই—আপনার সব কথা, সব ব্যথা, সব ভাবনা। তাই তাদের মাথায় কাপড়, হাতে কাঁকন, আঙিনায় বেড়া। মেয়েরা হল সীমাস্বর্গের ইন্দ্রাণী।
কিন্তু, কোন্ দেবতার কৌতুকহাস্যের মত অপরিমিত চঞ্চলতা নিয়ে আমাদের পাড়ায় ঐ ছোট মেয়েটির জন্ম? মা তাকে রেগে বলে “দস্যি,” বাপ তাকে হেসে বলে “পাগলী”।
সে পলাতকা ঝরণার জল, শাসনের পাথর ডিঙিয়ে চলে। তার মনটি যেন বেণুবনের উপরডালের পাতা, কেবলি ঝির্ ঝির্ করে কাঁপচে।
আজ দেখি সেই দুরন্ত মেয়েটি বারান্দায় রেলিঙে ভর দিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে—বাদলশেষের ইন্দ্রধনুটি বল্লেই হয়। তার বড় বড় দুটি কালো চোখ আজ অচঞ্চল, তমালের ডালে বৃষ্টির দিনে ডানা-ভেজা পাখীর মত।
ওকে এমন স্তব্ধ কখনো দেখিনি। মনে হল, নদী যেন চল্তে চল্তে একজায়গায় এসে থম্কে সরোবর হয়েচে।
কিছুদিন আগে রৌদ্রের শাসন ছিল প্রখর; দিগন্তের মুখ বিবর্ণ; গাছের পাতাগুলো শুক্নো, হল্দে, হতাশ্বাস।
এমন সময় হঠাত্ কাল আলুথালু পাগ্লা মেঘ আকাশের কোণে কোণে তাঁবু ফেললে। সূর্য্যাস্তের একটা রক্ত-রশ্মি খাপের ভিতর থেকে তলোয়ারের মতো বেরিয়ে এল।
অর্দ্ধেক রাত্রে দেখি দরজাগুলো খড়্খড়্ শব্দে কাঁপ্চে। সমস্ত সহরের ঘুমটাকে ঝড়ের হাওয়া ঝুঁটি ধরে ঝাঁকিয়ে দিলে।
উঠে দেখি, গলির আলোটা ঘন বৃষ্টির মধ্যে মাতালের ঘোলা চোখের মতো দেখতে। আর গির্জ্জের ঘড়ির শব্দ এল যেন বৃষ্টির শব্দের চাদর মুড়ি দিয়ে।
সকাল বেলায় জলের ধারা আরো ঘনিয়ে এল—রৌদ্র আর উঠ্ল না।
এই বাদলায় আমাদের পাড়ার মেয়েটি বারান্দায় রেলিঙ ধরে চুপ করে দাঁড়িয়ে।
তার বোন এসে তাকে বললে, ‘মা ডাক্চে’। সে কেবল সবেগে মাথা নাড়ল, তার বেণী দুলে উঠ্ল; কাগজের নৌকো নিয়ে তার ভাই তার হাত ধরে টান্লে। সে হাত ছিনিয়ে নিলে। তবু তার ভাই খেলার জন্যে টানাটানি করতে লাগ্ল। তাকে এক থাপড় বসিয়ে দিলে।
বৃষ্টি পড়ছে। অন্ধকার আরো ঘন হয়ে এল। মেয়েটি স্থির দাঁড়িয়ে।
আদি যুগে সৃষ্টির মুখে প্রথম কথা জেগেছিল জলের ভাষায়, হাওয়ার কণ্ঠে। লক্ষ কোটি বছর পার হয়ে সেই স্মরণ বিস্মরণের অতীত কথা আজ বাদ্লার কলস্বরে ঐ মেয়েটিকে এসে ডাক দিলে। ও তাই সকল বেড়ার বাইরে চলে গিয়ে হারিয়ে গেল।
কত বড় কাল, কত বড় জগত্, পৃথিবীতে কত যুগের কত জীবলীলা। সেই সুদূর সেই বিরাট, আজ এই দুরন্ত মেয়েটির মুখের দিকে তাকাল, মেঘের ছায়ায়, বৃষ্টির কলশব্দে।
ও তাই বড় বড় চোখ মেলে নিস্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল,—যেন অনন্তকালেরই প্রতিমা।
বিদূষক
বিদূষক
কাঞ্চীর রাজা কর্ণাট জয় করতে গেলেন। তিনি হলেন জয়ী। চন্দনে, হাতির দাঁতে, আর সোনামাণিকে হাতি বোঝাই হল।
দেশে ফেরবার পথে বলেশ্বরীর মন্দির বলির রক্তে ভাসিয়ে দিয়ে রাজা পূজো দিলেন।
পূজো দিয়ে চলে আস্চেন—গায়ে রক্তবস্ত্র, গলায় জবার মালা, কপালে রক্তচন্দনের তিলক—সঙ্গে কেবল মন্ত্রী আর বিদূষক।
একজায়গায় দেখ্লেন, পথের ধারে আমবাগানে ছেলেরা খেলা করচে।
রাজা তাঁর দুই সঙ্গীকে বল্লেন, “দেখে আসি, ওরা কি খেল্চে।”
ছেলেরা দুই সারি পুতুল সাজিয়ে যুদ্ধ-যুদ্ধ খেল্চে।
রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, “কার সঙ্গে কার যুদ্ধ?”
তারা বল্লে, “কর্ণাটের সঙ্গে কাঞ্চীর।”
রাজা জিজ্ঞাসা করলেন, “কার জিত, কার হার?”
ছেলেরা বুক ফুলিয়ে বল্লে, “কর্ণাটের জিৎ, কাঞ্চীর হার।”
মন্ত্রীর মুখ গম্ভীর হল, রাজার চক্ষু রক্তবর্ণ, বিদূষক হা হা করে হেসে উঠ্ল।
রাজা যখন তাঁর সৈন্য নিয়ে ফিরে এলেন, তখনো ছেলেরা খেল্চে।
রাজা হুকুম করলেন, “একেকটা ছেলেকে গাছের সঙ্গে বাঁধো, আর লাগাও বেত!”
গ্রাম থেকে তাদের মা-বাপ ছুটে এল। বল্লে, “ওরা অবোধ, ওরা খেলা কর্ছিল, ওদের মাপ কর।”
রাজা সেনাপতিকে ডেকে বল্লেন, “এই গ্রামকে শিক্ষা দেবে, কাঞ্চীর রাজাকে কোনো দিন যেন ভুল্তে না পারে।”
এই বলে শিবিরে চলে গেলেন।
সন্ধ্যে বেলায় সেনাপতি রাজার সমুখে এসে দাঁড়াল। প্রণাম করে বল্লে, “মহারাজ, শৃগাল কুকুর ছাড়া এ গ্রামের কারো মুখে শব্দ শুন্তে পাবে না।”
মন্ত্রী বল্লে, “মহারাজের মান রক্ষা হল।”
পুরোহিত বল্লে, “বিশ্বেশ্বরী মহারাজের সহায়।”
বিদূষক বল্লে, “মহারাজ, এবার আমাকে বিদায় দিন্।”
রাজা বললেন, “কেন?”
বিদূষক বললে, “আমি মার্তেও পারিনে, কাট্তেও পারিনে, বিধাতার প্রসাদে আমি কেবল হাস্তে পারি। মহারাজের সভায় থাক্লে আমি হাস্তে ভুলে যাব।”
ভুল স্বর্গ
ভুল স্বর্গ
লোকটি নেহাৎ বেকার ছিল।
তার কোনো কাজ ছিল না, কেবল সখ ছিল নানা রকমের।
ছোট ছোট কাঠের চৌকোয় মাটি ঢেলে তার উপরে সে ছোট ছোট ঝিনুক সাজাত। দূর থেকে দেখে মনে হত—যেন একটা এলোমেলো ছবি, তার মধ্যে পাখীর ঝাঁক; কিম্বা এব্ড়ো খেব্ড়ো মাঠ, সেখানে গোরু চর্চে, কিম্বা উঁচু নীচু পাহাড়, তার গা দিয়ে ওটা বুঝি ঝর্ণা হবে, কিম্বা পায়ে চলা পথ।
বাড়ীর লোকের কাছে তার লাঞ্ছনার সীমা ছিল না। মাঝে মাঝে পণ কর্ত পাগ্লামি ছেড়ে দেবে, কিন্তু পাগ্লামি তাকে ছাড়্ত না।
কোনো কোনো ছেলে আছে সারা বছর পড়ায় ফাঁকি দেয় অথচ পরীক্ষায় খামকা পাস করে ফেলে। এর সেই দশা হল।
সমস্ত জীবনটা অকাজে গেল অথচ মৃত্যুর পরে খবর পেলে যে, তার স্বর্গে যাওয়া মঞ্জুর।
কিন্তু নিয়তি স্বর্গের পথেও মানুষের সঙ্গ ছাড়ে না। দূতগুলো মার্কা ভুল করে’ তাকে কেজো লোকের স্বর্গে রেখে এল।
এই স্বর্গে আর সবই আছে, কেবল অবকাশ নেই।
এখানে পুরুষরা বল্চে, “হাঁফ ছাড়্বার সময় কোথা?” মেয়েরা বল্চে, “চল্লুম ভাই, কাজ রয়েচে পড়ে।” সবাই বলে, “সময়ের মূল্য আছে”; কেউ বলে না “সময় অমূল্য।” “আর ত পারা যায় না” বলে’ সবাই আক্ষেপ করে, আর ভারি খুসি হয়। “খেটে খেটে হয়রান হলুম” এই নালিশটাই সেখানকার সঙ্গীত।
এ বেচারা কোথাও ফাঁক পায় না, কোথাও খাপ খায় না। রাস্তায় অন্যমনস্ক হয়ে চলে, তাতে ব্যস্ত লোকের পথ আটক করে। চাদরটি পেতে যেখানেই আরাম করে’ বস্তে চায় শুন্তে পায় সেখানেই ফসলের ক্ষেত, বীজ পোঁতা হয়ে গেচে। কেবলি উঠে যেতে হয়, সরে’ যেতে হয়।
ভারি এক ব্যস্ত মেয়ে স্বর্গের উৎস থেকে রোজ জল নিতে আসে।
পথের উপর দিয়ে সে চলে’ যায় যেন সেতারের দ্রুত তালের গতের মত।
তাড়াতাড়ি সে এলো খোঁপা বেঁধে নিয়েচে। তবু দুচারটে দুরন্ত অলক কপালের উপর ঝুঁকে পড়ে’ তার চোখের কালো তারা দেখ্বে বলে উঁকি মার্চে।
স্বর্গীয় বেকার মানুষটি একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল, চঞ্চল ঝর্নার ধারে তমাল-গাছটির মত স্থির।
জান্লা থেকে ভিক্ষুককে দেখে রাজকন্যার যেমন দয়া হয়, এ’কে দেখে মেয়েটির তেম্নি দয়া হল।
“আহা, তোমার হাতে বুঝি কাজ নেই!”
নিশ্বাস ছেড়ে বেকার বল্লে, “কাজ কর্ব তার সময় নেই।”
মেয়েটি ওর কথা কিছুই বুঝ্তে পার্লে না। বল্লে, “আমার হাত থেকে কিছু কাজ নিতে চাও?”
বেকার বল্লে, “তোমার হাত থেকেই কাজ নেব বলে দাঁড়িয়ে আছি।”
“কী কাজ দেব?”
“তুমি যে ঘড়া কাঁখে করে জল তুলে নিয়ে যাও তারি একটি যদি আমাকে দিতে পার।”
“ঘড়া নিয়ে কী হবে? জল তুল্বে?”
“না, আমি তার গায়ে চিত্র কর্ব।”
মেয়েটি বিরক্ত হয়ে বল্লে, “আমার সময় নেই, আমি চল্লুম।”
কিন্তু বেকার লোকের সঙ্গে কাজের লোক পার্বে কেন? রোজ ওদের উৎসতলায় দেখা হয়, আর রোজ সেই একই কথা, “তোমার কাঁখের একটি ঘড়া দাও, তাতে চিত্র কর্ব।”
হার মানতে হল, ঘড়া দিলে।
সেইটিকে ঘিরে ঘিরে বেকার আঁক্তে লাগ্ল, কত রঙের পাক, কত রেখার ঘের।
আঁকা শেষ হলে মেয়েটি ঘড়া তুলে ধরে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখ্লে। ভুরু বাঁকিয়ে জিজ্ঞাসা কর্লে, “এর মানে?”
বেকার লোকটি বল্লে, “এর কোনো মানে নেই।”
ঘড়া নিয়ে মেয়েটি বাড়ি গেল।
সবার চোখের আড়ালে বসে’ সেটিকে সে নানা আলোতে নানারকমে হেলিয়ে ঘুরিয়ে দেখ্লে। রাত্রে থেকে-থেকে বিছানা ছেড়ে উঠে দীপ জ্বেলে চুপ করে’ বসে’ সেই চিত্রটা দেখ্তে লাগল। তার বয়সে এই সে প্রথম এমন কিছু দেখেচে যার কোনো মানে নেই।
তার পরদিন যখন সে উৎসতলায় এল, তখন তার দুটি পায়ের ব্যস্ততায় একটু যেন বাধা পড়েচে। পা দুটি যেন চল্তে চল্তে আন্-মনা হয়ে ভাব্চে— যা ভাব্চে তার কোনো মানে নেই।
সেদিনও বেকার মানুষ একপাশে দাঁড়িয়ে।
মেয়েটি বল্লে, “কি চাও?”
সে বল্লে, “তোমার হাত থেকে আরো কাজ চাই।”
“কি কাজ দেব?”
“যদি রাজি হও, রঙীন সুতো বুনে বুনে তোমার বেণী বাঁধ্বার দড়ি তৈরি করে’ দেব।”
“কি হবে?”
“কিছুই হবে না।”
নানা-রঙের নানা-কাজ-করা দড়ি তৈরি হল। এখন থেকে আয়না হাতে নিয়ে বেণী বাঁধ্তে মেয়ের অনেক সময় লাগে। কাজ পড়ে থাকে, বেলা বয়ে যায়।
এ দিকে দেখতে দেখতে কেজো স্বর্গে কাজের মধ্যে বড়ো বড়ো ফাঁক পড়্তে লাগল। কান্নায় আর গানে সেই ফাঁক ভরে উঠ্ল।
স্বর্গীয় প্রবীণেরা বড়ো চিন্তিত হল। সভা ডাক্লে। তারা বললে, “এখানকার ইতিহাসে কখনো এমন ঘটেনি।”
স্বর্গের দূত এসে অপরাধ স্বীকার কর্লে। সে বল্লে, “আমি ভুল লোককে ভুল স্বর্গে এনেচি।”
ভুল লোকটিকে সভায় আনা হল। তার রঙীন পাগ্ড়ি আর কোমরবন্ধের বাহার দেখেই সবাই বুঝ্লে, বিষম ভুল হয়েচে।
সভাপতি তাকে বল্লে, “তোমাকে পৃথিবীতে ফিরে যেতে হবে।”
সে তার রঙের ঝুলি আর তুলি কোমরে বেঁধে হাঁফ ছেড়ে বল্লে, “তবে চল্লুম।”
মেয়েটি এসে বল্লে, “আমিও যাব।”
প্রবীণ সভাপতি কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। এই সে প্রথম দেখ্লে এমন একটা কাণ্ড যার কোনো মানে নেই।
মীনু
মীনু
মীনু পশ্চিমে মানুষ হয়েচে। ছেলেবেলায় ইঁদারার ধারে তুঁতের গাছে লুকিয়ে ফল পাড়তে যেত; আর অড়র-ক্ষেতে যে বুড়ো মালী ঘাস নিড়োত তার সঙ্গে ওর ছিল ভাব।
বড় হয়ে জৌনপুরে হল ওর বিয়ে। একটি ছেলে হয়ে মারা গেল, তার পরে ডাক্তার বল্লে, “এও বাঁচে কি না বাঁচে।”
তখন তাকে কলকাতায় নিয়ে এল।
ওর অল্প বয়েস। কাঁচা ফলটির মত ওর কাঁচা প্রাণ পৃথিবীর বোঁটা শক্ত করে আঁক্ড়ে ছিল। যা-কিছু কচি, যা-কিছু সবুজ, যা-কিছু সজীব, তার পরেই ওর বড় টান।
আঙিনায় তার আট-দশ হাত জমি, সেইটুকুতে তার বাগান।
এই বাগানটি ছিল যেন তার কোলের ছেলে। তারই বেড়ার পরে যে ঝুম্কো লতা লাগিয়েছিল এইবার সেই লতায় কুঁড়ির আভাস দিতেই সে চলে এসেচে।
পাড়ার সমস্ত পোষা এবং না-পোষা কুকুরের অন্ন আর আদর ওরই বাড়িতে। তাদের মধ্যে সব-চেয়ে যেটিকে সে ভালোবাসত তার নাক ছিল খাঁদা, তার নাম ছিল ভোঁতা।
তারই গলায় পরাবে বলে মীনু রঙীন পুঁতির মালা গাঁথতে বসেছিল। সেটা শেষ হল না। যার কুকুর সে বল্লে, “বৌ-দিদি, এটিকে তুমি নিয়ে যাও।”
মীনুর স্বামী বল্লে, “বড় হাঙ্গাম, কাজ নেই।”
কলকাতার বাসায় দোতলার ঘরে মীনু শুয়ে থাকে। হিন্দুস্থানী দাই কাছে বসে কত কী বকে; সে খানিক শোনে, খানিক শোনে না।
একদিন সাররাত মীনুর ঘুম ছিল না। ভোরের আঁধার একটু যেই ফিকে হল সে দেখ্তে পেলে, তার জান্লার নীচেকার গোলক-চাঁপার গাছটি ফুলে ভরে উঠেচে। তার একটু মৃদু গন্ধ মীনুর জানলার কাছটিতে এসে যেন জিজ্ঞাসা করলে, “তুমি কেমন আছ?”
ওদের বাসা আর পাশের বাড়িটার অল্প একটুখানি ফাঁকের মধ্যে ঐ রৌদ্রের কাঙাল গাছটি, বিশ্বপ্রকৃতির এই হাবা ছেলে, কেমন-করে’ এসে পড়ে’ যেন বিভ্রান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ক্লান্ত মীনু বেলায় উঠ্ত। উঠেই সেই গাছটির দিকে চেয়ে দেখ্ত সেদিনের মত আর ত তেমন ফুল দেখা যায় না। দাইকে বলত, “আহা দাই, মাথা খা, এই গাছের তলাটি খুঁড়ে দিয়ে রোজ একটু জল দিস্।”
এই গাছে কেন যে ক’দিন ফুল দেখা যায় নি, একটু পরেই বোঝা গেল।
সকালের আলো তখন আধ-ফোটা পদ্মের মতো সবে জাগ্চে, এমন সময় সাজি-হাতে পূজারি ব্রাহ্মণ গাছটাকে ঝাঁকানি দিতে লাগ্ল, যেন খাজনা আদায়ের জন্যে বর্গির পেয়াদা।
মীনু দাইকে বল্লে, “শীঘ্র, ঐ ঠাকুরকে একবার ডেকে আন্।”
ব্রাহ্মণ আস্তেই মীনু তাকে প্রণাম করে বল্লে, “ঠাকুর, ফুল নিচ্চ কার জন্যে?”
ব্রাহ্মণ বল্লে, “দেবতার জন্যে।”
মীনু বললে, “দেবতা ত ঐ ফুল স্বয়ং আমাকে পাঠিয়েচেন।”
“তোমাকে?”
“হাঁ, আমাকে। তিনি যা দিয়েছেন সে ত ফিরিয়ে নেবেন বলে দেন নি।”
ব্রাহ্মণ বিরক্ত হয়ে চলে গেল।
পরের দিন ভোরে আবার সে যখন গাছ-নাড়া দিতে সুরু কর্লে তখন মীনু তার দাইকে বললে, “ও দাই, এ ত আমি চোখে দেখ্তে পারিনে। পাশের ঘরের জান্লার কাছে আমার বিছানা করে দে!”
পাশের ঘরের জান্লার সাম্নে রায়চৌধুরীদের চৌতলা বাড়ি। মীনু তার স্বামীকে ডাকিয়ে এনে বল্লে, “ঐ দেখ, দেখ, ওদের কি সুন্দর ছেলেটি! ওকে একটিবার আমার কোলে এনে দাও না!”
স্বামী বল্লে, “গরীবের ঘরে ছেলে পাঠাবে কেন?”
মীনু বল্লে, “শোন একবার! ছোট ছেলের বেলায় কি ধনী-গরীবের ভেদ আছে? সবার কোলেই ওদের রাজ-সিংহাসন।”
স্বামী ফিরে এসে খবর দিলে, “দরোয়ান বল্লে, বাবুর সঙ্গে দেখা হবে না।”
পরের দিন বিকেলে মীনু দাইকে ডেকে বল্লে, “ঐ চেয়ে দেখ্, বাগানে একলা বসে খেলচে। দৌড়ে যা, ওর হাতে এই সন্দেশটি দিয়ে আয়।”
সন্ধ্যাবেলায় স্বামী এসে বল্লে, “ওরা রাগ করেছে।”
“কেন, কী হয়েচে?”
“ওরা বলেচে, দাই যদি ওদের বাগানে যায় ত পুলিসে ধরিয়ে দেবে।”
এক মুহূর্ত্তে মীনুর দুই চোখ জলে ভেসে গেল। সে বল্লে, ‘আমি দেখেচি, দেখেচি, ওর হাত থেকে ওরা আমার সন্দেশ ছিনিয়ে নিলে। নিয়ে ওকে মার্লে! এখানে আমি বাঁচব না। আমাকে নিয়ে যাও।”
মেঘদূত
মেঘদূত
মিলনের প্রথম দিনে বাঁশি কী বলেছিল?
সে বলেছিল, “সেই মানুষ আমার কাছে এল, যে মানুষ আমার দূরের।”
আর বাঁশি বলেছিল, “ধর্লেও যাকে ধরা যায় না তাকে ধরেচি, পেলেও সকল-পাওয়াকে যে ছাড়িয়ে যায় তাকে পাওয়া গেল।”
তারপরে রোজ বাঁশি বাজে না কেন?
কেন না, আধখানা কথা ভুলেচি। শুধু মনে রইল, সে কাছে; কিন্তু সে যে দূরেও তা খেয়াল রইল না;
প্রেমের যে-আধখানায় মিলন সেইটেই দেখি, যে-আধখানায় বিরহ সে চোখে পড়ে না, তাই দূরের চিরতৃপ্তিহীন দেখাটা আর দেখা যায় না; কাছের পর্দ্দা আড়াল করেচে।
দুই মানুষের মাঝে যে-অসীম আকাশ সেখানে সব চুপ, সেখানে কথা চলে না। সেই মস্ত চুপকে বাঁশির সুর দিয়ে ভরিয়ে দিতে হয়। অনন্ত আকাশের ফাঁক না পেলে বাঁশি বাজে না।
সেই আমাদের মাঝের আকাশটি আঁধিতে ঢেকেচে, প্রতিদিনের কাজে কর্ম্মে কথায় ভরে গিয়েচে, প্রতিদিনের ভয়ভাবনা কৃপণতায়।
এক-একদিন জ্যোৎস্নারাত্রে হাওয়া দেয়, বিছানার পরে জেগে বসে বুক ব্যথিয়ে ওঠে, মনে পড়ে এই পাশের লোকটিকে তো হারিয়েচি।
এই বিরহ মিট্বে কেমন করে, আমার অনন্তের সঙ্গে তার অনন্তের বিরহ?
দিনের শেষে কাজের থেকে ফিরে এসে যার সঙ্গে কথা বলি সে কে? সে ত সংসারের হাজার লোকের মধ্যে একজন, তাকে তো জানা হয়েচে, চেনা হয়েচে, সে ত ফুরিয়ে গেচে।
কিন্তু ওর মধ্যে কোথায় সেই আমার অফুরান একজন, সেই আমার একটি মাত্র? ওকে আবার নূতন করে খুঁজে পাই কোন্ কূলহারা কামনার ধারে?
ওর-সঙ্গে আবার একবার কথা বলি সময়ের কোন্ ফাঁকে, বনমল্লিকার গন্ধে নিবিড় কোন্ কর্ম্মহীন সন্ধ্যার অন্ধকারে?
এমন সময় নববর্ষা ছায়া-উত্তরীয় উড়িয়ে পূর্ব্বদিগন্তে এসে উপস্থিত। উজ্জয়িনীর কবির কথা মনে পড়ে গেল। মনে হল, প্রিয়ার কাছে দূত পাঠাই।
আমার গান চলুক উড়ে, পাশে থাকার সুদূর দুর্গম নির্ব্বাসন পার হয়ে যাক।
কিন্তু, তা হলে তাকে যেতে হবে, কালের উজান পথ বেয়ে বাঁশির ব্যথায় ভরা আমাদের প্রথম মিলনের দিনে, সেই আমাদের যে-দিনটি বিশ্বের চিরবর্ষা ও চিরবসন্তের সকল গন্ধে সকল ক্রন্দনে জড়িয়ে রয়ে গেল, কেতকীবনের দীর্ঘশ্বাসে, আর শালমঞ্জরীর উতলা আত্মনিবেদনে।
নির্জ্জন দীঘির ধারে নারিকেলবনের মর্ম্মর-মুখরিত বর্ষার আপন কথাটিকেই আমার কথা করে নিয়ে প্রিয়ার কানে পৌঁছিয়ে দিক্, যেখানে সে তার এলোচুলে গ্রন্থি দিয়ে, আঁচল কোমরে বেঁধে সংসারের কাজে ব্যস্ত।
বহুদূরের অসীম আকাশ আজ বনরাজিনীলা পৃথিবীর শিয়রের কাছে নত হয়ে পড়্ল। কানে কানে বল্লে, “আমি তোমারি।”
পৃথিবী বল্লে, “সে কেমন করে হবে? তুমি যে অসীম, আমি যে ছোট।”
আকাশ বল্লে, “আমি তো চারদিকে আমার মেঘের সীমা টেনে দিয়েছি।”
পৃথিবী বল্লে, “তোমার যে কত জ্যোতিষ্কের সম্পদ, আমার ত আলোর সম্পদ নেই।”
আকাশ বললে, “আজ আমি আমার চন্দ্র সূর্য্য তারা সব হারিয়ে ফেলে এসেচি, আজ আমার একমাত্র তুমি আছ।”
পৃথিবী বল্লে, “আমার অশ্রুভরা হৃদয় হাওয়ায় হাওয়ায় চঞ্চল হয়ে কাঁপে, তুমি যে অবিচলিত।”
আকাশ বল্লে, “আমার অশ্রুও আজ চঞ্চল হয়েচে, দেখ্তে কি পাও নি? আমার বক্ষ আজ শ্যামল হ’ল তোমার ঐ শ্যামল হৃদয়টির মত।”
সে এই বলে’ আকাশ-পৃথিবীর মাঝখানকার চিরবিরহটাকে চোখের জলের গান দিয়ে ভরিয়ে দিলে।
সেই আকাশ-পৃথিবীর বিবাহ-মন্ত্র-গুঞ্জন নিয়ে নববর্ষা নামুক আমাদের বিচ্ছেদের পরে। প্রিয়ার মধ্যে যা অনির্ব্বচনীয় তাই হঠাৎ-বেজে-ওঠা বীণার তারের মত চকিত হয়ে উঠুক। সে আপন সিঁথির পরে তুলে দিক্ দূর বনান্তের রংটির মত তার নীলাঞ্চল। তার কালো চোখের চাহনিতে মেঘমল্লারের সব মিড়্গুলি আর্ত্ত হয়ে উঠুক। সার্থক হোক্ বকুলমালা তার বেণীর বাঁকে বাঁকে জড়িয়ে উঠে।
যখন ঝিল্লির ঝঙ্কারে বেণুবনের অন্ধকার থর্ থর্ কর্চে, যখন বাদল-হাওয়ায় দীপশিখা কেঁপে কেঁপে নিবে গেল, তখন সে তার অতি-কাছের ঐ সংসারটাকে ছেড়ে দিয়ে আসুক, ভিজে ঘাসের গন্ধে ভরা বনপথ দিয়ে, আমার নিভৃত হৃদয়ের নিশীথ রাত্রে।
মেঘলা দিনে
মেঘলা দিনে
রোজই থাকে সমস্ত দিন কাজ, আর চারদিকে লোকজন। রোজই মনে হয়, সেদিনকার কাজে সেদিনকার আলাপে সেদিনকার সব কথা দিনের শেষে বুঝি একেবারে শেষ করে দেওয়া হয়। ভিতরে কোন কথাটি যে বাকি রয়ে গেল তা বুঝে নেবার সময় পাওয়া যায় না।
আজ সকাল বেলা মেঘের স্তবকে স্তবকে আকাশের বুক ভেরে উঠেছে। আজও সমস্ত দিনের কাজ আছে সামনে, আর লোক আছে চারদিকে। কিন্তু, আজ মনে হচ্চে ভিতরে যা-কিছু আছে বাইরে তা সমস্ত শেষ করে দেওয়া যায় না।
মানুষ সমুদ্র পার হল, পর্ব্বত ডিঙিয়ে গেল, পাতালপুরীতে সিঁধ কেটে মণি-মানিক চুরি করে আনলে, কিন্তু একজনের অন্তরের কথা আরেকজনকে চুকিয়ে দিয়ে ফেলা, এ কিছুতেই পারলে না।
আজ মেঘলা দিনের সকালে সেই আমার বন্দী কথাটাই মনের মধ্যে পাখা ঝাপ্টে মরচে। ভিতরের মানুষ বল্চে; “আমার চিরদিনের সেই আররেকজনটি কোথায়, যে আমার হৃদয়ের শ্রাবণ মেঘকে ফতুর করে তার সকল বৃষ্টি কেড়ে নেবে!'”
আজ মেঘলা দিনের সকালে শুন্তে পাচ্চি সেই ভিতরের কথাটা কেবলি বন্ধ দরজার শিকল নাড়চে। ভাবছি, “কী করি! কে আছে যার ডাকে কাজের বেড়া ডিঙিয়ে এখনি আমার বাণী সুরের প্রদীপ হাতে বিশ্বের অভিসারে বেরিয়ে পড়বে? কে আছে যার চোখের একটি ইসারায় আমার সব ছড়ানো ব্যথা এক মুহূর্ত্তে এক আনন্দে গাঁথা হবে, এক আলোতে জ্বলে উঠবে? আমার কাছে ঠিক সুরটি লাগিয়ে চাইতে পারে যে, আমি তাকেই কেবল দিতে পারি। সেই আমার সর্ব্বনেশে ভিখারী রাস্তার কোন্ মোড়ে?”
আমার ভিতর মহলের ব্যথা আজ গেরুয়াবসন পরেচে। পথে বাহির হতে চায়, সকল কাজের বাহিরের পথে,—যে-পথ একটিমাত্র সরল তারের একতারার মত, কোন্ মনের মানুষের চলায় চলায় বাজ্চে।
রাজপুত্তুর
রাজপুত্তুর
রাজপুত্তুর চলেচে, নিজের রাজ্য ছেড়ে, সাতরাজার রাজ্য পেরিয়ে, যে দেশে কোনো রাজার রাজ্য নেই সেই দেশে।
সে হল যে-কালের কথা সে কালের আরম্ভও নেই শেষও নেই।
শহরে গ্রামে আর সকলে হাট বাজার করে, ঘর করে, ঝগড়া করে; যে আমাদের চিরকালের রাজপুত্তুর সে রাজ্য ছেড়ে ছেড়ে চলে যায়।
কেন যায়?
কুয়োর জল কুয়োতেই থাকে, খাল বিলের জল খাল বিলের মধ্যেই শান্ত। কিন্তু গিরিশিখরের জল গিরিশিখরে ধরে না, মেঘের জল মেঘের বাঁধন মানে না। রাজপুত্তুরকে তার রাজ্যটুকুর মধ্যে ঠেকিয়ে রাখ্বে কে? তেপান্তর মাঠ দেখে’ সে ফেরে না, সাতসমুদ্র তেরো নদী পার হয়ে যায়।
মানুষ বারেবারে শিশু হয়ে জন্মায় আর বারেবারে নতুন করে এই পুরাতন কাহিনীটি শোনে। সন্ধ্যা-প্রদীপের আলো স্থির হয়ে থাকে, ছেলেরা চুপ করে গালে হাত দিয়ে ভাবে, আমরা সেই রাজপুত্তুর।
তেপান্তর মাঠ যদিবা ফুরোয়, সাম্নে সমুদ্র। তারই মাঝখানে দ্বীপ, সেখানে দৈত্যপুরীতে রাজকন্যা বাঁধা আছে।
পৃথিবীতে আর সকলে টাকা খুঁজচে, নাম খুঁজচে, আরাম খুঁজচে, আর যে আমাদের রাজপুত্তুর সে দৈত্যপুরী থেকে রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে বেরিয়েচে। তুফান উঠ্ল, নৌকো মিল্লনা, তবু সে পথ খুঁজচে।
এইটেই হচ্চে মানুষের সব গোড়াকার রূপকথা, আর সব শেষের। পৃথিবীতে যারা নতুন জন্মেচে, দিদিমার কাছে তাদের এই চিরকালের খবরটি পাওয়া চাই যে, রাজকন্যা বন্দিনী, সমুদ্র দুর্গম, দৈত্য দুর্জ্জয়, আর ছোট মানুষটি একলা দাঁড়িয়ে পণ করচে বন্দিনীকে উদ্ধার করে আনব।
বাইরে বনের অন্ধকারে বৃষ্টি পড়ে, ঝিল্লি ডাকে, আর ছোটো ছেলেটি চুপ করে গালে হাত দিয়ে ভাবে, দৈত্যপুরীতে আমাকে পাড়ি দিতে হবে।
সামনে এল অসীম সমুদ্র, স্বপ্নের ঢেউ-তোলা নীল ঘুমের মতো। সেখানে রাজপুত্তুর ঘোড়ার উপর থেকে নেমে পড়ল।
কিন্তু, যেম্নি মাটিতে পা পড়া অম্নি এ কী হল? এ কোন্ জাদুকরের জাদু?
এ যে শহর। ট্র্যাম চলেচে। আপিস-মুখো গাড়ির ভিড়ে রাস্তা দুর্গম। তালপাতার বাঁশিওয়ালা গলির ধারে উলঙ্গ ছেলেদের লোভ দেখিয়ে বাঁশিতে ফুঁ দিয়ে চলেচে।
আর, রাজপুত্তুরের এ কি বেশ? এ কি চাল? গায়ে বোতাম-খোলা জামা, ধুতিটা খুব সাফ নয়, জুতোজোড়া জীর্ণ। পাড়াগাঁয়ের ছেলে, সহরে পড়ে, টিউশানি করে’ বাসা খরচ চালায়।
রাজকন্যা কোথায়?
তার বাসার পাশের বাড়িতেই।
চাঁপা ফুলের মতো রঙ নয়, হাসিতে তার মাণিক খসে না। আকাশের তারার সঙ্গে তার তুলনা হয় না, তার তুলনা নব বর্ষার ঘাসের আড়ালে যে নামহারা ফুল ফোটে তারি সঙ্গে।
মা-মরা মেয়ে বাপের আদরের ছিল। বাপ ছিল গরীব, অপাত্রে মেয়ের বিয়ে দিতে চাইল না, মেয়ের বয়স গেল বেড়ে, সকলে নিন্দে করলে।
বাপ গেচে মরে, এখন মেয়ে এসেচে খুড়োর বাড়ীতে।
পাত্রের সন্ধান মিল্ল। তার টাকাও বিস্তর, বয়সও বিস্তর, আর নাতি নাৎনীর সংখ্যাও অল্প নয়। তার দাব-রাবের সীমা ছিল না।
খুড়ো বললেন, মেয়ের কপাল ভাল।
এমন সময় গায়ে-হলুদের দিনে মেয়েটিকে দেখা গেল না, আর পাশের বাসার সেই ছেলেটিকে।
খবর এল, তারা লুকিয়ে বিবাহ করেচে। তাদের জাতের মিল ছিল না, ছিল কেবল মনের মিল। সকলেই নিন্দে করলে।
লক্ষপতি তাঁর ইষ্টদেবতার কাছে সোনার সিংহাসন মানৎ করে বল্লেন, “এ ছেলেকে কে বাঁচায়!”
ছেলেটিকে আদালতে দাঁড় করিয়ে বিচক্ষণ সব উকীল, প্রবীণ সব সাক্ষী দেবতার কৃপায় দিনকে রাত করে তুললে। সে বড়ো আশ্চর্য্য।
সেই দিন ইষ্টদেবতার কাছে জোড়া পাঁটা কাটা পড়ল, ঢাক ঢোল বাজ্ল, সকলেই খুসি হল। বল্লে, কলিকাল বটে, কিন্তু ধর্ম্ম এখনো জেগে আছেন।
তার পরে অনেক কথা। জেল থেকে ছেলেটি ফিরে এল। কিন্তু দীর্ঘপথ আর শেষ হয় না। তেপান্তর মাঠের চেয়েও সে দীর্ঘ এবং সঙ্গিহীন। কতবার অন্ধকারে তাকে শুন্তে হল, হাঁউমাউ খাঁউ, মানুষের গন্ধ পাঁউ। মানুষকে খাবার জন্যে চারিদিকে এত লোভ।
রাস্তার শেষ নেই কিন্তু চলার শেষ আছে। একদিন সেই শমে এসে সে থাম্ল।
সেদিন তাকে দেখবার লোক কেউ ছিল না। শিয়রে কেবল একজন দয়াময় দেবতা জেগে ছিলেন। তিনি যম।
সেই যমের সোনার কাঠি যেম্নি ছোঁয়ানো অম্নি এ কী কাণ্ড! সহর গেল মিলিয়ে, স্বপন গেল ভেঙে।
মুহূর্ত্তে আবার দেখা দিল সেই রাজপুত্তুর। তার কপালে অসীমকালের রাজটীকা। দৈত্যপুরীর দ্বার সে ভাঙবে, রাজকন্যার শিকল সে খুলবে।
যুগে যুগে শিশুরা মায়ের কোলে বসে খবর পায়,—সেই ঘরছাড়া মানুষ তেপান্তর মাঠ দিয়ে কোথায় চল্ল। তার সাম্নের দিকে সাত সমুদ্রের ঢেউ গর্জ্জন করচে।
ইতিহাসের মধ্যে তার বিচিত্র চেহারা; ইতিহাসের পরপারে তার একই রূপ,—সে রাজপুত্তুর।
সতেরো বছর
সতেরো বছর
আমি তার সতেরো বছরের জানা।
কত আসা-যাওয়া, কত দেখাদেখি, কত বলাবলি;
তারি আশেপাশে কত স্বপ্ন, কত অনুমান, কত ইসারা; তারি সঙ্গে সঙ্গে কখনো বা ভোরের ভাঙাঘুমে শুকতারার আলো, কখনো বা আষাঢ়ের ভর-সন্ধ্যায় চামেলি ফুলের গন্ধ, কখনো বা বসন্তের শেষ প্রহরে ক্লান্ত নহবতের পিলু-বারোয়াঁ, সতেরো বছর ধরে’ এই সব গাঁথা পড়েছিল তার মনে।
আর, তারি সঙ্গে মিলিয়ে সে আমার নাম ধরে ডাক্ত। ঐ নামে যে-মানুষ সাড়া দিত সেত একা বিধাতার রচনা নয়। সে যে তারই সতেরো বছরের জানা দিয়ে গড়া; কখনো আদরে কখনো অনাদরে, কখনো কাজে কখনো অকাজে, কখনো সবার সাম্নে কখনো এক্লা আড়ালে, কেবল একটি লোকের মনে-মনে জানা দিয়ে গড়া সেই মানুষ।
তার পরে আরও সতেরো বছর যায়। কিন্তু এর দিনগুলি এর রাতগুলি সেই নামের রাখি-বন্ধনে আর ত এক হয়ে মেলে না,—এরা ছড়িয়ে পড়ে।
তাই এরা রোজ আমাকে জিজ্ঞাসা করে, “আমরা থাক্ব কোথায়? আমাদের ডেকে নিয়ে ঘিরে রাখ্বে কে?”
আমি তার কোনো জবাব দিতে পারিনে, চুপ করে বসে থাকি আর ভাবি। আর ওরা বাতাসে উড়ে চলে যায়। বলে, “আমরা খুঁজতে বেরলেম।”
“কা’কে?”
কা’কে সে এরা জানে না। তাই কখনো যায় এদিকে, কখনো যায় ওদিকে; সন্ধ্যাবেলাকার খাপছাড়া মেঘের মতো অন্ধকারে পাড়ি দেয়, আর দেখ্তে পাইনে।
সন্ধ্যা ও প্রভাত
সন্ধ্যা ও প্রভাত
এখানে নাম্ল সন্ধ্যা। সূর্য্যদেব, কোন্ দেশে কোন্ সমুদ্রপারে তোমার প্রভাত হ’ল?
অন্ধকারে এখানে কেঁপে উঠ্চে রজনীগন্ধা, বাসরঘরের দ্বারের কাছে অবগুণ্ঠিতা নববধূর মত; কোন্খানে ফুটল ভোরবেলাকার কনকচাঁপা?
জাগ্ল কে? নিবিয়ে দিল সন্ধ্যায় জ্বালানো দীপ, ফেলে দিল রাত্রে-গাঁথা সেঁউতিফুলের মালা।
এখানে একে একে দরজায় আগল পড়ল, সেখানে জান্লা গেল খুলে। এখানে নৌকো ঘাটে বাঁধা, মাঝি ঘুমিয়ে; সেখানে পালে লেগেচে হাওয়া।
ওরা পান্থশালা থেকে বেরিয়ে পড়েচে, পুবের দিকে মুখ করে চলেচে; ওদের কপালে লেগেচে সকালের আলো, ওদের পারাণীর কড়ি এখানে ফুরোয়-নি; ওদের জন্যে পথের ধারের জান্লায় জান্লায় কালো চোখের করুণ কামনা অনিমেষ চেয়ে আছে; রাস্তা ওদের সামনে নিমন্ত্রণের রাঙা চিঠি খুলে ধরলে, বললে, “তোমাদের জন্যে সব প্রস্তুত।” ওদের হৃৎপিণ্ডে রক্তের তালে তালে জয়ভেরী বেজে উঠ্ল।
এখানে সবাই ধূসর আলোয় দিনের শেষ খেয়া পার হ’ল।
পান্থশালার আঙিনায় এরা কাঁথা বিছিয়েচে; কেউ বা এক্লা, কারো বা সঙ্গী ক্লান্ত; সাম্নের পথে কী আছে অন্ধকারে দেখা গেল না, পিছনের পথে কী ছিল কানে কানে বলাবলি করচে; বলতে বলতে কথা বেধে যায়, তার পরে চুপ করে থাকে; তার পরে আঙিনা থেকে উপরে চেয়ে দেখে, আকাশে উঠেচে সপ্তর্ষি।
সূর্য্যদেব, তোমার বামে এই সন্ধ্যা, তোমার দক্ষিণে ঐ প্রভাত, এদের তুমি মিলিয়ে দাও। এর ছায়া ওর আলোটিকে একবার কোলে তুলে নিয়ে চুম্বন করুক, এর পূরবী ওর বিভাসকে আশীর্ব্বাদ করে চলে যাক্।
সুয়োরাণীর সাধ
সুয়োরাণীর সাধ
সুয়োরাণীর বুঝি মরণকাল এল।
তার প্রাণ হাঁপিয়ে উঠ্চে, তার কিছুই ভালো লাগ্চে না। বদ্দি বড়ি নিয়ে এল। মধু দিয়ে মেড়ে বল্লে, “খাও।” সে ঠেলে ফেলে দিলে।
রাজার কানে খবর গেল। রাজা তাড়াতাড়ি সভা ছেড়ে এল। পাশে বসে জিজ্ঞাসা করলে, “তোমার কী হয়েছে, কী চাই?”
সে গুম্রে উঠে বল্লে, “তোমরা সবাই যাও; একবার আমার স্যাঙাৎনীকে ডেকে দাও।”
স্যাঙাৎনী এল। রানী তার হাত ধরে বল্লে, “সই, বস। কথা আছে।”
স্যাঙাৎনী বল্লে, “প্রকাশ করে বল।”
সুয়োরাণী বল্লে, “আমার সাতমহলা বাড়ির একধারে তিনটে মহল ছিল দুয়োরাণীর। তারপরে হল দুটো, তারপরে হল একটা। তারপরে রাজবাড়ী থেকে সে বের হয়ে গেল।
তার পরে দুয়োরাণীর কথা আমার মনেই রইল না।
তারপরে একদিন দোলযাত্রা। নাটমন্দিরে যাচ্চি ময়ূরপংখী চড়ে। আগে লোক, পিছে লশকর। ডাইনে বাজে বাঁশি, বাঁয়ে বাজে মৃদঙ্গ।
এমন সময় পথের পাশে নদীর ধারে ঘাটের উপরটিতে দেখি একখানি কুঁড়ে ঘর, চাঁপা গাছের ছায়ায়। বেড়া বেয়ে অপরাজিতার ফুল ফুটেচে, দুয়োরের সাম্নে চালের গুড়ো দিয়ে শঙ্খচক্রের আলপনা। আমার ছত্রধারিণীকে শুধোলেম, “আহা, ঘরখানি কার?” সে বল্লে, দুয়োরাণীর।
তারপরে ঘরে ফিরে এসে সন্ধ্যের সময় বসে আছি, ঘরে প্রদীপ জ্বালিনি, মুখে কথা নেই।
রাজা এসে বললে, “তোমার কি হয়েচে, কি চাই?”
আমি বল্লেম্, “এ ঘরে আমি থাক্ব না।”
রাজা বল্লে, “আমি তোমার কোঠাবাড়ি বানিয়ে দেব গজদন্তের দেওয়াল দিয়ে। শঙ্খের গুঁড়োয় মেঝেটি হবে দুধের ফেনার মতো শাদা, মুক্তোর ঝিনুক দিয়ে তার কিনারে এঁকে দেব পদ্মের মালা।”
আমি বললেম, “আমার বড়ো সাধ গিয়েচে, কুঁড়ে ঘর বানিয়ে থাকি তোমার বাহির বাগানের একটি ধারে।”
রাজা বললে, “আচ্ছা বেশ, তার আর ভাবনা কী?”
কুঁড়ে ঘর বানিয়ে দিলে। সে ঘর যেন তুলে-আনা বনফুল। যেম্নি তৈরি হল অম্নি যেন মুষড়ে গেল। বাস করতে গেলেম, কেবল লজ্জা পেলেম।
তারপরে একদিন স্নানযাত্রা।
নদীতে নাইতে গেছি। সঙ্গে একশো সাতজন সঙ্গিনী। জলের মধ্যে পাল্কী নামিয়ে দিলে, স্নান হল।
পথে ফিরে আস্চে, পাল্কীর দরজা একটু ফাঁক করে দেখি, ও কোন্ ঘরের বউ গা! যেন নির্ম্মাল্যের ফুল। হাতে সাদা শাঁখা, পরনে লালপেড়ে শাড়ি। স্নানের পর ঘড়ায় করে জল তুলে আন্চে, সকালের আলো তার ভিজে চুলে আর ভিজে ঘড়ার উপর ঝিকিয়ে উঠ্চে।
ছত্রধারিণীকে শুধোলেম, “মেয়েটি কে, কোন্ দেবমন্দিরে তপস্যা করে?”
ছত্রধারিণী হেসে বললে, “চিন্তে পারলে না? ঐ ত দুয়োরাণী।”
তারপরে ঘরে ফিরে একলা বসে আছি, মুখে কথা নেই। রাজা এসে বল্লে, “তোমার কী হয়েছে, কী চাই?’
আমি বল্লেম, “আমার বড় সাধ, রোজ সকালে নদীতে নেয়ে মাটির ঘড়ায় জল তুলে আন্ব বকুলতলার রাস্তা দিয়ে।”
রাজা বল্লে, “আচ্ছা বেশ, তার আর ভাবনা কি?”
রাস্তায় রাস্তায় পাহারা বস্ল, লোকজন গেল সরে।
সাদা শাঁখা পরলেম, আর লালপেড়ে সাড়ি। নদীতে স্নান সেরে ঘড়ায় করে জল তুলে আন্লেম। দুয়োরের কাছে এসে মনের দুঃখে ঘড়া আছড়ে ভাঙলেম। যা ভেবেছিলেম তা হল না, শুধু লজ্জা পেলেম।
তারপরে সেদিন রাসযাত্রা।
মধুবনে জ্যোৎস্নারাতে তাঁবু পড়ল। সমস্ত রাত নাচ হল গান হল।
পরদিন সকালে হাতির উপর হাওদা চড়ল। পর্দার আড়ালে বসে ঘরে ফিরচি, এমন সময় দেখি বনের পথ দিয়ে কে চলেচে, তার নবীন বয়েস। চূড়ায় তার বনফুলের মালা। হাতে তার ডালি; তাতে শালুক ফুল, তাতে বনের ফল, তাতে ক্ষেতের শাক।
ছত্রধারিণীকে শুধোলেম, “কোন্ ভাগ্যবতীর ছেলে পথ আলো করেচে?”
ছত্রধারিণী বল্লে, “জান না? ঐ ত দুয়োরানীর ছেলে। ওর মা’র জন্যে নিয়ে চলেচে, শালুক ফুল, বনের ফল, ক্ষেতের শাক।”
তারপরে ঘরে ফিরে একলা বসে আছি, মুখে কথা নেই।
রাজা এসে বল্লে, “তোমার কী হয়েচে, কি চাই?”
আমি বল্লেম, “আমার বড় সাধ রোজ খাব শালুক ফুল, বনের ফল, ক্ষেতের শাক, আমার ছেলে নিজের হাতে তুলে আন্বে।”
রাজা বললে, “আচ্ছা বেশ, তার আর ভাবনা কি?”
সোনার পালঙ্কে বসে আছি, ছেলে ডালি নিয়ে এল। তার সর্ব্বাঙ্গে ঘাম, তার মুখে রাগ। ডালি পড়ে রইল, লজ্জা পেলেম।
তার পরে আমার কি হল কি জানি।
একলা বসে থাকি, মুখে কথা নেই। রাজা রোজ এসে আমাকে শুধোয়, “তোমার কী হয়েছে, কি চাই?”
সুয়োরানী হয়েও কি চাই সে কথা লজ্জায় কাউকে বল্তে পারি নে। তাই তোমাকে ডেকেচি স্যাঙাৎনী। আমার শেষ কথাটি বলি তোমার কানে, “ঐ দুয়োরানীর দুঃখ আমি চাই।”
স্যাঙাৎনী গালে হাত দিয়ে বল্লে, “কেন বল ত?”
সুয়োরানী বল্লে, “ওর ঐ বাঁশের বাঁশীতে সুর বাজ্ল, কিন্তু আমার সোনার বাঁশী কেবল বয়েই বেড়ালেম, আগ্লে বেড়ালেম, বাজাতে পারলেম না।”