মহুয়া (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ১৯২৯)
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯২৯
প্রকাশনা-তথ্য
মহুয়া
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়
২১০ নং কর্নওয়ালিস স্ট্রীট, কলিকাতা
বিশ্বভারতী গ্রন্থালয়
২১০নং কর্ণওয়ালিস ষ্ট্রীট, কলিকাতা।
প্রকাশক—কিশোরীমোহন সাঁতরা।
মহুয়া
প্রথম সংস্করণ (২১০০) আশ্বিন, ১৩৩৬
মূল্য-২৲, বাঁধাই—২।৶, ২৸০
আর্ট প্রেস, ৩১নং সেণ্টাল এভিনিউ, কলিকাতা
নরেন্দ্রনাথ মুখার্জি বি-এ কর্তৃক মুদ্রিত।
পাঠ পরিচয়
“মহুয়া”র অধিকাংশ কবিতা ১৩৩৫ সালের শ্রাবণ হইতে পৌষ মাসের মধ্যে লেখা। সেই সময়ে কথা হয়-যে রবীন্দ্রনাথের কাব্য- গ্রন্থাবলী হইতে প্রেমের কবিতাগুলি সংগ্রহ করিয়া বিবাহ উপলক্ষ্যে উপহার দেওয়া যায় এইরূপ একখানি বই বাহির করা হইবে, এবং কবি এই বইয়ের উপযোগী কয়েকটি নূতন কবিতা লিখিয়া দিবেন। কিন্তু অল্প দিনের মধ্যে কয়েকটির জায়গায় অনেকগুলি নূতন কবিতা লেখা হইয়া গেল; সেই সব কবিতাই এখন “মহুয়া” নামে বাহির হইতেছে।
ইহার কিছু পূর্ব্বে, ১৩৩৫ সালের আষাঢ় মাসে, “শেষের কবিতা” নামে উপন্যাসের জন্য কয়েকটি কবিতা লেখা হয়। ভাবের মিল হিসাবে সেই কবিতাগুলিও এই সঙ্গে ছাপা হইল।
“পূরবী” (শ্রাবণ, ১৩৩২) বাহির হওয়ার পরে এই ৪ বৎসরে আরও অনেক কবিতা লেখা হইয়াছে, কিন্তু সে সব কবিতা “মহুয়া”য় স্থান পায় নাই। তাহার কারণ কবি নিজে সম্প্রতি একখানি চিঠিতে লিখিয়াছেন:—
“লেখার বিষষটা ছিল সংকল্প করা—প্রধানতঃ প্রজাপতির উদ্দেশে—আর তারই দালালী করেন যে-দেবতা তাঁকেও মনে রাখ্তে হ’য়েছিলো। অতএব “মহুয়া’র কবিতাকে ঠিক আমার হালের কবিতা ব’লে শ্রেণীবদ্ধ করা চলে না। ভেবে দেখ্তে গেলে এটা কোনো কাল-বিশেষের নয়, এটা আকস্মিক। আমার সত্যিকার আধুনিক কবিতার সঙ্গে যদি এদের এক পংক্তিতে বসাও তা’হলে তাদের বর্ণভেদ অত্যন্ত পরিস্ফুট হ’য়ে উঠ্বে। কিন্তু আমার সন্দেহ হ’চ্ছে কিছু যেন অত্যুক্তি করা হ’লো। ফরমাস ব্যাপারটা মোটর গাড়ির ষ্টার্টার-এর মতো। চালনাটা শুরু ক’রে দেয় কিন্তু তার প’রে মোটরটা চলে আপন মোটরিক্ প্রকৃতির তাপে। প্রথম ধাক্কাটা একেবারেই ভুলে যায়। মহুয়ার কবিতাগুলিও লেখবার বেগে ফরমাসের ধাক্কা নিঃসন্দেহই সম্পূর্ণ ভুলেছে—কল্পনার আন্তরিক তড়িৎ-শক্তি আপন চিরন্তনী প্রেরণায় তাদের চালিয়ে নিয়ে গেছে। প্রথম হাতল ঘোরানো হতেও পারে বাইরের থেকে, কিন্তু সচলতা সুরু হবা-মাত্রই লেখবার আনন্দই সারথী হ’য়ে বসে। এই জন্য আমার বিশ্বাস তোমরা এই লেখার মধ্যে নতুন কিছু পাবে, আকারে এবং প্রকারে। নতুন লেখার ঝোঁক যখন চিত্তের মধ্যে এসে পড়ে তখন তা’রা পূর্ব্বদলের পুরানো পরিত্যক্ত বাসায় আশ্রয় নিতে চায় না, নতুন বাসা না বাঁধতে পারলে তাদের মানায় না, কুলোয় না। ক্ষণিকার বাসা আর বলাকার বাসা এক নয়।”
“আমি নিজে মহুয়ার কবিতার মধ্যে দুটো দল দেখ্তে পাই। একটি হ’চ্ছে নিছক গীতি-কাব্য, ছন্দ ও ভাষার ভঙ্গীতেই তা’র লীলা। তাতে প্রণয়ের প্রসাধনকলা মুখ্য। আর-একটিতে ভাবের আবেগ প্রধান স্থান নিয়েছে, তাতে প্রণয়ের সাধন-বেগই প্রবল।”
“মহুয়ার “মায়া” নামক কবিতায় প্রণয়ের এই দুই ধারার পরিচয় দেওয়া হ’য়েছে। প্রেমের মধ্যে সৃষ্টি-শক্তির ক্রিয়া প্রবল। প্রেম সাধারণ মানুষকে অসাধারণ ক’রে রচনা করে—নিজের ভিতরকার বর্ণে রসে রূপে। তা’র সঙ্গে যোগ দেয় বাইরের প্রকৃতি-থেকে নানা গান গন্ধ, নানা আভাস। এম্নি ক’রে অন্তরে বাহিরের মিলনে চিত্তের নিভৃত- লোকে প্রেমের অপরূপ প্রসাধন নির্ম্মিত হ’তে থাকে— সেখানে ভাবে ভঙ্গীতে সাজে সজ্জায় নূতন নূতন প্রকাশের জন্য ব্যাকুলতা, সেখানে অনির্ব্বচনীয়ের নানা ছন্দ, নানা ব্যঞ্জনা। একদিকে এই প্রসাধনের বৈচিত্র্য, আর একদিকে এই উপলব্ধির নিবিড়তা ও বিশেষত্ব। মহুয়ার কবিতা চিত্তেব সেই মায়ালোকের কাব্য; তা’র কোনো অংশে ছন্দে ভাষায় ভঙ্গীতে এই প্রসাধনেব আয়োজন, কোনো অংশে উপলব্ধির প্রকাশ।”
“এই দুয়ের মধ্যে নূতনের বাসন্তিক স্পর্শ নিশ্চয় আছে—নইলে লিখ্তে আমার উৎসাহ থাক্তো না। তুমি তো জানোই কত অল্প সময়ের মধ্যে এগুলি সমাধা ক’রেছি। তা’র কারণ প্রবর্তনার বেগ মনে সতেজ ছিল। তাই অন্যমনস্কভাবে এই পত্রের পূর্ব্বাংশে তোমাকে যা লিখেছি অপরাংশে তা’র প্রতিবাদ ক’র্তে হ’লো। ব’লেছিলুম এ লেখাগুলি আকস্মিক। ভুলেছিলুম সব কবিতাই যখনি লেখা যায় তখনি আকস্মিক। সব কবিতা ব’ল্লে হয়তো বেশি বলা হয়। এক একটা সময়ের এক একটা নতুন ঝাঁকের কবিতা। বারো মাসে পৃথিবীর ছয় ঋতু বাঁধা, তাদের পুনরাবর্ত্তন ঘটে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, একবার আমার মন থেকে যে-ঋতু যায় সে আর-এক অপরিচিত ঋতুর জন্যে জায়গা ক’রে বিদায় গ্রহণ করে। পূর্ব্বকালের সঙ্গে কিছু মেলে না এ হ’তেই পারে না, কিন্তু সে যেন শরতের সঙ্গে শীতের মিলের মতো। মনের যে-ঋতুতে মহুয়া লেখা সে আকস্মিক ঋতুই, ফরমাসের ধাক্কায় আকস্মিক নয়, স্বভাবতই আকস্মিক। এগুলি যখন লিখ্ছিলুম অপূর্ব্বকুমার প্রায় রোজ এসে শুনে যেতো, সে যে- উত্তেজনা প্রকাশ ক’র্তো সেটা অপূর্ব্বতায়ই উত্তেজনা। রূপের দিকে বা ভাবের দিকে একটা কিছু নতুন পাচ্ছে ব’লেই তা’র আগ্রহ—তখন সুধীন্দ্র দত্তও ছিল তা’র সঙ্গী। তা’র থেকে আমার বিশ্বাস আপনার এই সমর্থন পেতো যে, মনের মধ্যে রচনার একটি বিশেষ ঋতুর সমাগম হ’য়েছে—তাকে পূরবীর ঋতু বা বলাকার ঋতু ব’ল্লে চ’ল্বেনা।”
“পূরবী ও মহুয়ার মাঝখানে আর-একদল কবিতা আছে,— সেগুলি অন্য জাতের। তাদের মধ্যে নটরাজ ও ঋতুরঙ্গই প্রধান। নৃত্যা- ভিনয়ের উপলক্ষ্য নিয়ে এগুলি রচিত হ’য়েছিলো কিন্তু এরাও স্বভাবতই উপলক্ষ্যকে অতিক্রম ক’রেছে। আর কোনোখানেই শান্তিনিকেতনের মতো ঋতুর লীলারঙ্গ দেখিনি—তা’রই সঙ্গে মানব-ভাষায় উত্তর প্রত্যুত্তর কিছুকাল থেকে আমার চ’লছে। তা’র রীতিমতো শুরু হ’য়েছে শারদোৎসবে—তা’রপরে ঋতুগীতির প্রবাহ বেয়ে এসে প’ড়েছিলে। ঋতু-রঙ্গে। বিষয় এক তবু প্রভেদ যথেষ্ট। সেই প্রভেদ যদি না থাক্তো তা’হলে লেখবার উৎসাহই থাক্তো না। মহুয়ার কবিতা যখন প’ড়্বে তখন আমার স্বভাবের এই কথাটা মনে রেখো। এই বইয়ের প্রথমে ও সব শেষে যে-গুটিকয়েক কবিতা আছে সেগুলি মহুয়া পর্য্যায়ের নয়। সেগুলি ঋতু-উৎসব পর্য্যায়ের। দোল-পূর্ণিমায় আবৃত্তির জন্যেই এদের রচনা করা হ’য়েছিলো। কিন্তু নব-বসন্তের আবির্ভাবই মহুয়া কবিতার উপযুক্ত ভূমিকা বলে নকীবের কাজে ওদের এই গ্রন্থে আহ্বান করা হ’য়েছে।”
“মহুয়া নামটা নিয়ে তোমার মনে একটা দ্বিধা হ’য়েছিলো জানি। কাব্যের বা কাব্য-সংকলন গ্রন্থের নামটাকে ব্যাখ্যামূলক ক’র্তে আমার প্রবৃত্তি হয় না। নামের দ্বারা আগে-ভাগে কবিতার পরিচয়কে সম্পূর্ণ বেঁধে দেওয়াকে আমি অত্যাচার মনে করি। কবিতার অতি- নির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রায়ই দেওয়া চলে না। আমি ইচ্ছা ক’রেই মহুয়া নামটি দিয়েছি, নাম পাছে ভাষ্যরূপে কর্ত্তৃত্ব করে এই ভয়ে। অথচ কবিতাগুলির সঙ্গে মহুয়া নামের একটুখানি সঙ্গতি আছে—মহুয়া বসন্তেরই অনুচর, আর ওর রসের মধ্যে প্রচ্ছন্ন আছে উন্মাদনা। যাই হোক্ অর্থের অত্যন্ত বেশি সুসঙ্গতি নেই ব’লেই কাব্যগ্রন্থের পক্ষে এ নামটি উপযুক্ত ব’লে আমি বিশ্বাস করি।”
বইয়ের আরম্ভে বসন্তের আগমনী সম্বন্ধে ৫ টি কবিতা, আর বইয়ের শেষে বসন্তের বিদায় সম্বন্ধে ৪টি কবিতা ১৩৩৩-১৩৩৪ সালের লেখা। ঐ সময়ের আর একটি মাত্র কবিতা “সাগরিকা” এই বইতে স্থান পাইয়াছে।
প্রত্যেক কবিতার নীচে লেখার তারিখ দেওয়া হইয়াছে। যেখানে ঠিক তারিখ জানা নাই অথচ মোটামুটিভাবে নির্দ্ধারণ করা যায় সেখানে একটি প্রশ্নসূচক (?) চিহ্ণ দেওয়া হইল। “শুধায়োনা কবে কোন্ গান” কবিতাটি ১৩৩৫ সালের ভাদ্র অথবা আশ্বিন মাসে লেখা।
শব্দের আদিতে “্যা”-উচ্চারণ দেখাইবার জন্য রবীন্দ্রনাথের নির্দ্দেশ অনুসারে “ে”-চিহু ব্যবহার করা হইয়াছে। যেমনঃ— ‘দেখো’ (= দেখিও) আর ‘দেখো’ (দ্যাখো =দেখহ); ‘ফেলো’ (=ফেলিও) আর ‘ফেলো’ (ফ্যালো =ফেলহ) ইত্যাদি।
অ-কারের ও-ধ্বনি ’ চিহ্ণ (ইলেক-চিহ) দ্বারা নির্দেশ করা হইয়াছে। যেমনঃ— “করে” আর “ক’রে” (= কোরে, অসমাপিকা করিয়া অর্থে); “বলে” আর “ব’লে” (=বোলে, বলিয়া অর্থে) ইত্যাদি।
আর একটি কথা উল্লেখযোগ্য—নাম-পত্রখানি কবির স্বহস্ত-অঙ্কিত।
শ্রী প্রশান্তচন্দ্র মহলানবিশ
কলিকাতা
৯ই আশ্বিন, ১৩৩৬
“শেষের কবিতা”র জন্য লেখা কবিতাগুলিকে সুচিপত্রে তারকা (*) চিহ্নিত করা হইয়াছে। ইহাদের মধ্যে ২টি কবিতা “বিচ্ছেদ” (১৫৪ পৃঃ) আর “বিরহ” (১৬৫ পৃঃ) “শেষের কবিতা”র জন্য লেখা হইলেও ঐ উপস্যাসে ব্যবহার করা হয় নাই।
বর্ণানুক্রমিক সূচি
অচেনা
অচেনা
রে অচেনা, মোর মুষ্টি ছাড়াবি কী ক’রে,
যতক্ষণ চিনি নাই তোরে?
কোন্ অন্ধক্ষণে
বিজড়িত তন্দ্রাজাগরণে
রাত্রি যবে সবে হয় ভোর,
মুখ দেখিলাম তোর।
চক্ষু’পরে চক্ষু রাখি শুধালেম, কোথা সঙ্গোপনে
আছ আত্ম-বিস্মৃতির কোণে?
তোর সাথে চেনা
সহজে হবে না,
কানে কানে মৃত্যু কণ্ঠে নয়।
ক’রে নেবো জয়
সংশয়-কুষ্ঠিত তোর বাণী;
দৃপ্ত বলে লবো টানি’
শঙ্কা হ’তে, লজ্জা হ’তে, দ্বিধাদ্বন্দ্ব হ’তে
নির্দ্দয় আলোতে।
জাগিয়া উঠিবি অশ্রুধারে,
মুহূর্ত্তে চিনিবি আপনারে;
ছিন্ন হবে ডোর,
তোমার মুক্তিতে তবে মুক্তি হবে মোর।
হে অচেনা,
দিন যায়, সন্ধ্যা হয়, সময় র’বে না;
মহা আকস্মিক
বাধাবন্ধ ছিন্ন করি’ দিক্
তোমারে চেনার অগ্নি দীপ্তশিখা উঠুক্ উজ্জ্বলি’,
দিব তা’রে জীবন অঞ্জলি॥
* আষাঢ়, ১৩৩৫
অন্তর্দ্ধান
অন্তর্দ্ধান
তব অন্তর্দ্ধান পটে হেরি তব রূপ চিরন্তন।
অন্তরে অলক্ষ্যলােকে তােমার পরম আগমন।
লভিলাম চিরস্পর্শমণি;
তােমার শূন্যতা তুমি পরিপূর্ণ ক’রেছাে আপনি॥
জীবন আঁধার হ’লো, সেইক্ষণে পাইনু সন্ধান
সন্ধ্যার দেউল দীপ, অন্তরে রাখিয়া গেছে দান।
বিচ্ছেদেরি হােমবহ্ণি হ’তে
পূজামূর্ত্তি ধরে প্রেম, দেখা দেয় দুঃখের আলােতে॥
২৬ আষাঢ়, ১৩৩৫
অপরাজিত
অপরাজিত
ফিরাবে তুমি মুখ,
ভেবেছো মনে আমারে দিবে দুখ?
আমি কি করি ভয়?
জীবন দিয়ে তোমারে, প্রিয়ে, করিব আমি জয়।
বিঘ্ন-ভাঙা যৌবনের ভাষা,
অসীম তা’র আশা,
বিপুল তা’র বল,
তোমার আঁখি-বিজুলি-ঘাতে হবে না নিষ্ফল।
বিমুখ মেঘ ফিরিয়া যায় বৈশাখের দিনে,
অরণ্যেরে যেন সে নাহি চিনে।
ধরে না কুঁড়ি কানন জুড়ি’, ফোটে না বটে ফুল,
মাটির তলে তৃষিত তরুমূল।
ঝরিয়া পড়ে পাতা,
বনস্পতি তবুও তোলে মাথা।
নিঠুর তপে মন্ত্র জপে নীরব আনিমেষে
দহনজয়ী সন্ন্যাসীর বেশে।
দিনের পরে যায় রে দিন, রাতের পরে রাতি,
শ্রবণ রহে পাতি।
কঠিনতর যবে সে-পণ দারুণ উপবাসে
এমন কালে হঠাৎ কবে আসে
উদার অকৃপণ
আষাঢ় মাসে সজল শুভখণ;
পূর্ব্বগিরি-আড়াল হ’তে বাড়ায় তা’র পাণি,
করিয়ো ক্ষমা, করিয়ো ক্ষমা, গুমরি’ উঠে বাণী,
নমিয়া পড়ে নিবিড় মেঘরাশি,
অশ্রুবারি বন্যা নামে ধরণ যায় ভাসি’॥
ফিরালে মোরে মুখ!
এ শুধু মোরে ভাগ্য করে ক্ষণিক কৌতুক।
তোমার প্রেমে আমার অধিকার
অতীত যুগ হ’তে সে জেনে লিখন বিধাতার।
অচল গিরিশিখর ’পরে সাগর করে দাবী,
ঝরনা পড়ে নাবি’।
সুদূর দিক্-রেখার পানে চায়,
অকূল অজানায়
শঙ্কাভরে তরল স্বরে কহে,
নহে গো, নহে নহে।
এড়ায়ে যাবে বলি’
কত না আঁকা-বাঁকার পথে চলে সে ছলছলি’।
বিপুলতর হয় সে ধারা, গভীরতর সুরে,
যতই আসে দূরে।
উদার-হাসি সাগর সহে অবুঝ অবহেলা,—
একদা শেষে পলাতকার খেলা
বক্ষে তা’র মিলায় কবে, মিলনে হয় সারা
পূর্ণ হয় নিবেদনের ধারা॥
২৮ শ্রাবণ, ১৩৩৫
অবশেষ
অবশেষ
বাহির পথে বিবাগী হিয়া
কিসের খোঁজে গেলি,
আয়রে ফিরে আয়।
পুরানো ঘরে দুয়ার দিয়া,
ছেঁড়া আসন মেলি’
বসিবি নিরালায়।
সারাটা বেলা সাগর ধারে
কুড়ালি যত নুড়ি,
নানারঙের শামুক ভারে
বোঝাই হ’লো ঝুড়ি,
লবণ পারাবারের পারে
প্রখর তাপে পুড়ি’
মরিলি পিপাসায়;
ঢেউয়ের দোল তুলিল রোল
অকূলতল জুড়ি’,
কহিল বাণী কী জানি কী ভাষায়।
আয়রে ফিরে আয়॥
বিরাম হ’লো আরামহীন
যদিরে তোর ঘরে,
না যদি রয় সাথী,
সন্ধ্যা যদি তন্দ্রা-লীন
মৌন অনাদরে,
না যদি জ্বালে বাতি;
তবু তো আছে আঁধার কোণে
ধ্যানের ধনগুলি,
একেলা বসি আপনমনে
মুছিবি তা’র ধূলি,
গাঁথিবি তা’রে রতনহারে
বুকেতে নিবি তুলি’
মধুর বেদনায়।
কানন-বীথি ফুলের রীতি
না হয় গেছে ভুলি,
তারকা আগে গগন কিনারায়
আয়রে ফিরে আয়॥
১৯ চৈত্র, ১৩৩৪
অর্ঘ্য
অর্ঘ্য
সূর্য্যমুখীর বর্ণে বসন
লই রাঙায়ে,
অরুণ আলোর ঝঙ্কার মোর
লাগ্লো গায়ে।
অঞ্চলে মোর কদম ফুলের ভাষা
বক্ষে জড়ায় আসন্ন কোন্ আশা,
কৃষ্ণকলির হেমাঞ্জলির
চঞ্চলতা
কঞ্চুলিকার স্বর্ণলিখায়
মিলায় কথা।
আজ যেন পায় নয়ন আপন
নতুন জাগা।
আজ আসে দিন প্রথম দেখার
দোলন লাগা।
এই ভুবনের একটি অসীম কোণ,
যুগল প্রাণের গোপন পদ্মাসন,
সেথায় আমায় ডাক দিয়ে যায়
নাই জানা কে,
সাগরপারের পান্থপাখীর
ডানার ডাকে॥
চ’ল্বো ডালায় আলোকমালায়
প্রদীপ জ্বেলে,
ঝিল্লি-ঝনন অশোকতলায়
চমক মেলে।
আমার প্রকাশ নতুন বচন ধ’রে,
আপ্নাকে আজ নতুন রচন ক’রে,
ফাগুন-বনের গুপ্ত ধনের
আভাস-ভরা;
রক্তদীপন প্রাণের আভায়
রঙীন করা॥
চক্ষে আমার জ্ব’ল্বে আদিম
অগ্নি-শিখা,
প্রথম ধরায় সেই যে পরায়
আলোর টীকা।
নীরব হাসির সোনার বাঁশির ধ্বনি
ক’র্বে ঘোযণ প্রেমের উদ্বোধনী,
প্রাণ-দেবতার মন্দির দ্বার
যাক্ রে খুলে,
অঙ্গ আমার অর্ঘ্যের থাল
অরূপ ফুলে॥
২৩ শ্রাবণ, ১৩৩৫
অশ্রু
অশ্রু
সুন্দর, তুমি চক্ষু ভরিয়া
এনেছো অশ্রুজল।
এনেছো তােমার বক্ষে ধরিয়া
দুঃসহ হােমানল।
দুঃখ-যে তাই উজ্জ্বল হ’য়ে উঠে,
মুগ্ধ প্রাণের আবেশ বন্ধ টুটে,
এ তাপে শ্বসিয়া উঠে বিকশিয়া
বিচ্ছেদ শতদল॥
* আষাঢ়, ১৩৩৫
অসমাপ্ত
অসমাপ্ত
বোলো তা’রে, বোলো,
এতদিনে তা’রে দেখা হ’লো।
তখন বর্ষণ শেষে
ছুঁয়েছিলো রৌদ্র এসে
উন্মীলিত গুল্-মোরের থোলো।
বনের মন্দির মাঝে
তরুর তম্বুরা বাজে,
অনন্তের উঠে স্তবগান,
চক্ষে জল ব’হে যায়,
নম্র হ’লো বন্দনায়
আমার বিস্মিত মনপ্রাণ॥
দেবতার বর
কত জন্ম কত জন্মান্তর
অব্যক্ত ভাগ্যের রাতে
লিখিছে আকাশ পাতে
এ-দেখার আশ্বাস-অক্ষর।
অস্তিত্বের পারে পারে
এ-দেখার বারতারে
বহিয়াছি রক্তের প্রবাহে।
দূর শূন্য দৃষ্টি রাখি’
আমার উন্মনা আঁখি
এ-দেখার গূঢ় গান গাহে॥
বোলো আজি তা’রে,
চিনিলাম তোমারে আমারে।
হে অতিথি, চুপে চুপে
বারম্বার ছায়ারূপে
এসেছো কম্পিত মোর দ্বারে।
কত রাত্রে চৈত্রমাসে,
প্রচ্ছন্ন পুষ্পের বাসে
কাছে-আসা নিঃশ্বাস তোমার
স্পন্দিত ক’রেছে জানি
আমার গুণ্ঠন খানি,
কাঁদায়েছে সেতারের তার॥
বোলো তা’রে আজ,
“অন্তরে পেয়েছি বড়ো লাজ।
কিছু হয় নাই বলা,
বেধে গিয়েছিলো গলা,
ছিল না দিনের যোগ্য সাজ।
আমার বক্ষের কাছে
পূর্ণিমা লুকানো আছে,
সেদিন দেখেছো শুধু অমা।
দিনে দিনে অর্ঘ্য মম
পূর্ণ হবে, প্রিয়তম,
আজি মোর দৈন্য করো ক্ষমা॥”
২৭ শ্রাবণ, ১৩৩৫
আশীর্ব্বাদ
আশীর্ব্বাদ
জ্বলিল অরুণরশ্মি আজি ওই তরুণ প্রভাতে
হে নবীনা, নব রাগ-রক্তিম শোভাতে।
সীমন্তে সিন্দূর বিন্দু তব
জ্যোতি আজি পেলো অভিনব,
চেলাঞ্চলে উদ্ভাসিল অন্তরের দীপ্যমান প্রভা,
সরমের বৃন্তে তুমি আনন্দের বিকশিত জবা॥
সাহানা রাগিণীরসে জড়িত আজি এ পুণ্যতিথি,
তোমার ভুবনে আসে পরম অতিথি।
আনো আনো মাঙ্গল্যের ভার,
দাও বধূ, খুলে দাও দ্বার,
তোমার অঙ্গনে হের সগৌরবে ওই রথ আসে,
সেই বার্ত্তা আজি বুঝি উদ্ঘোষিল আকাশে বাতাসে॥
নবীন জীবনে তব নব বিশ্ব-রচনার ভাষা
আজি বুঝি পূর্ণ হ’লো ল’য়ে নব আশা।
সৃষ্টির সে আনন্দ উৎসবে
তব শ্রেষ্ঠধন দিতে হবে,
সেই সৃষ্টি সাধনায় আপনি করিবে আবিষ্কার
তোমার আপনা মাঝে লুকানো যে ঐশ্বর্য-ভাণ্ডার॥
পথ কে দেখালো এই পথিকেরে তাহা আমি জানি,
ওই চক্ষুতারা তা’রে দ্বারে দিল আনি’।
যে-সুর নিভৃতে ছিল প্রাণে
কেমনে তা শুনেছিলো কানে,
তোমার হৃদয়কুঞ্জে যে-ফুল ছায়ায় ছিল ফুটে’,
তাহার অমৃতগন্ধ গিয়েছিলো বন্ধ তা’র টুটে॥
যদি পারিতাম আজি অলকার দ্বারীরে ভুলায়ে
হরিয়া অমূল্য মণি অলকেতে দিতাম দুলায়ে।
তবু মোর মন মোরে কহে
সে-দান তোমার যোগ্য নহে,
তোমার কমলবনে দিব আনি’ রবির প্রসাদ,
তোমার মিলনক্ষণে সঁপিব কবির আশীর্ব্বাদ॥
আশ্বিন (?), ১৩৩৫
আহ্বান
আহ্বান
কোথা আছ? ডাকি আমি। শােনাে শােনাে আছে প্রয়ােজন
একান্ত আমারে তব। আমি নহি তােমার বন্ধন;
পথের সম্বল মাের প্রাণে। দুর্গমে চ’লেছ তুমি
নীরস নিষ্ঠুর পথে—উপবাস-হিংস্র সেই ভূমি
আতিথ্যবিহীন; উদ্ধৃত নিষেধ-দণ্ড রাত্রিদিন
উদ্যত করিয়া আছে ঊর্দ্ধপানে। আমি ক্লান্তিহীন
সেই সঙ্গ দিতে পারি, প্রাণবেগে বহন যে করে
শুশ্রূষার পূর্ণশক্তি আপনার নিঃশঙ্ক অন্তরে,
যথা রুক্ষ রিক্তবৃক্ষ শৈলবক্ষ ভেদি অহরহ
দুর্দ্দাম নির্ঝরে ঢালে দুর্ণিবার সেবার আগ্রহ;
শুকায় না রসবিন্দু প্রখর নির্দ্দয় সূর্য্যতেজে;
নীরস প্রস্তরতলে দৃঢ়বলে রেখে দেয় সে-যে
অক্ষয় সম্পদরাশি। সহাস্য উজ্জ্বল গতি তা’র
দুর্য্যোগে অপরাজিত, অবিচল বীর্য্যের আধার॥
১৬ ভাদ্র, ১৩৩৫
উজ্জীবন
উজ্জীবন
ভস্ম-অপমান শয্যা ছাড়ো, পুষ্পধনু,
রুদ্র-বহ্ণি হ’তে লহো জ্বলদর্চ্চি তনু।
যাহা স্মরণীয় যাক্ ম’রে,
জাগো অবিস্মরণীয় ধ্যানমূর্ত্তি ধ’রে।
যাহা রূঢ়, যাহা মূঢ় তব
যাহা স্থূল, দগ্ধ হোক্, হও নিত্য নব।
মৃত্যু হ’তে জাগো, পুস্পধনু,
হে অতনু, বীরের তনুতে লহো তনু।
মৃত্যুঞ্জয় তব শিরে মৃত্যু দিলা হানি’,
অমৃত সে-মৃত্যু হ’তে দাও তুমি আনি’।
সেই দিব্য দীপ্যমান দাহ,
উন্মুক্ত করুক্ অগ্নি-উৎসের প্রবাহ।
মিলনেরে করুক্ প্রখর
বিচ্ছেদের ক’রে দিক্ দুঃসহ সুন্দর।
মৃত্যু হ’তে জাগো, পুষ্পধনু,
হে অতনু বীরের তনুতে লহো তনু॥
দুঃখে সুখে বেদনায় বন্ধুর যে-পথ,
সে-দুর্গমে চলুক্ প্রেমের জয়রথ।
তিমির তোরণে রজনীর
মন্দ্রিবে সে রথচক্র নির্ঘোষ গম্ভীর।
উল্লঙ্ঘিয়া তুচ্ছ লজ্জা ত্রাস
উচ্ছলিবে আত্মহারা উদ্বেল উল্লাস।
মৃত্যু হ’তে ওঠো, পুষ্পধনু,
হে অতনু, বীরের তনুতে লহো তনু॥
ভাদ্র, ১৩৩৬
উদ্ঘাত
উদ্ঘাত
অজানা জীবন বাহিনু,
রহিনু আপন মনে,
গোপন করিতে চাহিনু
ধরা দিনু দুনয়নে।
কী বলিতে পাছে কী বলি
তাই দূরে ছিনু কেবলি,
তুমি কেন এসে সহসা
দেখে গেলে আঁখি কোণে
কী আছে আমার মনে?
গভীর তিমির গহনে
আছিনু নীরব বিরহে,
হাসির তড়িৎ দহনে
লুকানো সে আর কি রহে?
দিন কেটেছিলো বিজনে
ধেয়ানের ছবি সৃজনে,
আনমনে যেই গেয়েছি
শুনে গেছো সেইখনে
কী আছে আমার মনে॥
প্রবেশিলে মোর নিভৃতে,
দেখে নিলে মোরে কী ভাবে,
যে-দীপ জ্বেলেছি নিশীথে
সে-দীপ কি তুমি নিভাবে?
ছিল ভরি’ মোর থালিকা,
ছিঁড়িব কি সেই মালিকা?
সরম দিবে কি তাহারে,
অকথিত নিবেদনে
যা আছে আমার মনে?
২৭ শ্রাবণ, ১৩৩৫
উপহার
উপহার
মণিমালা হাতে নিয়ে
দ্বারে গিয়ে
এসেছিনু ফিরে
নতশিরে।
ক্ষণতরে বুঝি
বাহিরে ফিরেছি খুঁজি’
হায়রে বৃথাই
বাহিরে যা’ নাই।
ভীরু মন চেয়েছিলো ভুলায়ে জিনিতে,
হীরা দিয়ে হৃদয় কিনিতে।
এই পণ মোর,
সমস্ত জীবন ভোর
দিনে দিনে দিব তা’র হাতে তুলি’
স্বর্গের দাক্ষিণ্য হ’তে আসিবে যে-শ্রেষ্ঠ ক্ষণগুলি;
কণ্ঠহারে
গেঁথে দিব তা’রে
যে-দুর্লভ রাত্রি মম
বিকশিবে ইন্দ্রাণীর পারিজাত সম
পায়ে দিব তা’র
যে এক-মুহূর্ত্ত আনে প্রাণের অনন্ত উপহার।
২৩ শ্রাবণ, ১৩৩৫
ঊষসী
ঊষসী
ভোরের আগের যে-প্রহরে
স্তব্ধ অন্ধকার ’পরে
সুপ্তি-অন্তরাল হ’তে দূর সূর্য্যোদয়
বনময়
পাঠায় নূতন জাগরণী,
অতি মৃদু শিহরণী
বাতাসের গায়ে;
পাখীর কুলায়ে
অস্পষ্ট কাকলি ওঠে আধো-জাগা স্বরে;
স্তম্ভিত আগ্রহভরে
অব্যক্ত বিরাট আশা ধ্যানে মগ্ন দিকে দিগন্তরে,—
ও কোন্ তরুণ প্রাণে করিয়াছে ভর,
অন্তর্গূঢ় সে প্রহর
আত্ম-অগোচর।
চিত্ত তা’র আপনার গভীর অন্তরে
নিঃশব্দে প্রতীক্ষা করে
পবিপূর্ণ সার্থকতা লাগি’।
সুপ্তিমাঝে প্রতীক্ষিয়া আছে জাগি’
নির্ম্মল নির্ভয়
কোন্ দিব্য অভ্যুদয়!
কোন্ সে পরমা মুক্তি, কোন্ সেই আপনার
দীপ্যমান মহা আবিষ্কার!
প্রভাত-মহিমা ওর সম্বৃত র’য়েছে নিশ্চেতনে,
তাহারি আভাস পাই মনে।
আমি ওই রথশব্দ শুনি,
সোনার বীণার তারে সঙ্গীত আনিছে কোন্ গুণী!
জাগিবে হৃদয়,
ভুবন তাহার হবে বাণীময়;
মানস-কমল একমনা
নবোদিত তপনের করিবে প্রথম অভ্যর্থনা।
জাগিবে নূতন দিবা উজ্জ্বল উল্লাসে
বর্ণে গন্ধে গানে প্রাণে মহোৎসবে তা’র চারিপাশে।
নিরুদ্ধ চেতন হ’তে হবে চ্যুত
লালসা-আবেশে জড়ীভূত
স্বপ্নের শৃঙ্খলপাশ।
বিলুপ্ত করিবে দূরে উন্মুক্ত বাতাস
দুর্ব্বল দীপের গাঢ় বিষতপ্ত কলুষ-নিশ্বাস।
আলোকের জয়ধ্বনি উঠিবে উচ্ছ্বসি’,—
—নাম কি ঊষসী?
নাম্নী, আশ্বিন-ভাদ্র, ১৩৩৫
একাকী
একাকী
চন্দ্রমা আকাশতলে পরম একাকী,—
আপন নিঃশব্দগানে আপনারি শূন্য দিল ঢাকি’।
অয়ি একাকিনী,
অলিন্দে নিশীথরাত্রে শুনিছ সে জ্যোৎস্নার রাগিণী
চেয়ে শূন্যপানে,
যে-রাগিণী অসীমের উৎস হ’তে আনে
অনাদি বিরহরস, তাই দিয়ে ভরিয়া আঁধার
কোন্ বিশ্ববেদনার মহেশ্বরে দেয় উপহার।
তারি সাথে মিলায়েছ তব দৃষ্টিখানি,
চোখে অনির্ব্বচনীয় বাণী,
মিলায়েছ যেন তব জন্মান্তর হ’তে নিয়ে-আসা
দীর্ঘনিঃশ্বাসের ভাষা।
মিলায়েছ, সুগম্ভীর দুঃখের মাঝারে
যে-মুক্তি র’য়েছে লীন বন্ধহীন শান্ত অন্ধকারে।
অরণ্যে অরণ্যে আজি সাগরে সাগরে,
জনশূন্য তুষার শিখরে
কোন্ মহাশ্বেতা, কোন্ তপস্বিনী, বিছাল অঞ্চল,
স্তব্ধ অচঞ্চল,
অনন্তেরে সম্বোধিয়া কহিল সে ঊর্দ্ধে তুলি’ আঁখি,
“তুমিও একাকী।”
১৮ আশ্বিন, ১৩৩৫
করুণী
করুণী
তরুলতা
যে-ভাষায় কয় কথা
সে-ভাষা সে জানে,—
তৃণ তা’র পদক্ষেপ দয়া বলি’ মানে।
পুষ্পপল্লবের ’পরে তা’র আঁখি
অদৃশ্য প্রাণের হর্ষ দিয়ে যায় রাখি’।
স্নেহ তা’র আকাশের আলোর মতন
কাননের অন্তর-বেদন
দূর করিবার লাগি’
নিত্য আছে জাগি’।
শিশু হ’তে শিশুতর
গাছগুলি বোবা প্রাণে ভর-ভর;
বাতাসে বৃষ্টিতে
চঞ্চলিয়া জাগে তা’রা অর্থহীন গীতে,
ধরণীর যে-গভীরে চির রসধারা
সেইখানে তা’রা
কাঙাল প্রসারি’ ধরে তৃষিত অঞ্জলি,
বিশ্বের করুণারাশি শাখায় শাখায় উঠে ফলি’;—
সে তরুলতারি মতো স্নিগ্ধ প্রাণ তা’র;
শ্যামল উদার
সেবা যত্ন সরল শান্তিতে
ঘনচ্ছায়া বিস্তারিয়া আছে চারিভিতে;
তাহার মমতা
সকল প্রাণীর ’পরে বিছায়েছে স্নেহের সমতা;
পশু পাখী তা’র আপনার;
জীববৎসলার
স্নেহ ঝরে শিশুপরে, বনে যেন নত মেঘভার
ঢালে বারিধার।
তরুণ প্রাণের ’পরে করুণায় নিত্য সে তরুণী,—
—নাম কি করুণী?
কাকলী
কাকলী
কলছন্দে পূর্ণ তা’র প্রাণ,—
নিত্য বহমান
ভাষার কল্লোলে
জাগাইয়া তোলে
চারিধারে
প্রত্যহের জড়তারে;
সঙ্গীতে তরঙ্গ তুলি’,
হাসিতে ফেনিল তা’র ছোটে দিনগুলি।
আঁখি তা’র কথা কয়, বাহুভঙ্গী কত কথা বলে,
চরণ যখন চলে
কথা ক’য়ে যায়—
যে-কথাটি অরণ্যের পাতায় পাতায়,
যে-কথাটি ঢেউ তোলে
আশ্বিনে ধানের ক্ষেতে—প্রান্ত হ’তে প্রান্তে যায় চ’লে,
যে-কথাটি নিশীথ-তিমিরে
তারায় তারায় কাঁপে অধীর মির্ম্মিরে,
যে-কথাটি মহুয়ার বনে
মধুপগুঞ্জনে
সারাবেলা উঠিছে চঞ্চলি’,—
—নাম কি কাকলি?
কাজলী
কাজলী
প্রচ্ছন্ন দাক্ষিণ্যভারে চিত্ত তা’র নত
স্তম্ভিত মেঘের মতো,
তৃষ্ণাহরা
আষাঢ়ের আত্মদান-প্রত্যাশায় ভরা।
সে যেন গো তমালের ছায়াখানি,
অবগুণ্ঠনের তলে পথ-চাওয়া আতিথ্যের বাণী।
যে-পথিক একদিন আসিবে দুয়ারে
ক্লিষ্ট ক্লান্তিভারে,
সেই অজানার লাগি’ গৃহকোণে আনত-নয়ন
বুনিছে শয়ন।
সে যেন গো কাকচক্ষু স্বচ্ছ দীঘিজল
অচঞ্চল,
কানায় কানায় ভরা,
শীতল অতল মাঝে প্রসন্ন কিরণ দেয় ধরা।
কালো চক্ষুপল্লবের কাছে
থমকিয়া আছে
স্তব্ধ ছায়া পাতি’
হাসির খেলার সাথী
সুগম্ভীর স্নিগ্ধ অশ্রুবারি;
যেন তাহা দেবতারি
করুণা-অঞ্জলি,—
—নাম কি কাজলী?
খেয়ালী
খেয়ালী
মধ্যাহ্নে বিজন বাতায়নে
সুদূর গগনে
কী দেখে সে ধানের ক্ষেতের পরপারে,—
নিরালা নদীর পথে দিগন্তে সবুজ অন্ধকারে
যেখানে কাঁঠাল জাম নারিকেল বেত
প্রসারিয়া চ’লেছে সঙ্কেত
অজানা গ্রামের,
সুখ দুঃখ জন্ম মৃত্যু অখ্যাত নামের।
অপরাহ্ণে ছাদে বসি’,
এলোচুল বুকে পড়ে খসি’,
গ্রন্থ নিয়ে হাতে
উদাস হ’য়েছে মন সে-যে কোন্ কবি-কল্পনাতে।
সুদূরের বেদনায়
অতীতের অশ্রুবাষ্প হৃদয়ে ঘনায়।
বীরের কাহিনী
না-দেখা জনের লাগি’ তা’রে যেন করে বিরহিণী।
পূর্ণিমা-নিশীথে
স্রোতে-ভাসা একা তরী যবে সকরুণ সারি-গীতে
ছায়াঘন তীরে তীরে সুপ্তিতে সুরের ছবি আঁকে,
উৎসুক আকাঙ্ক্ষা জেগে থাকে
নিষুপ্ত প্রহরে,
অহৈতুক বারিবিন্দু ঝরে
আঁখি-কোণে;
যুগান্তরপার হ’তে কোন্ পুরাণের কথা শোনে।
ইচ্ছা করে সেই রাতে
লিপিখানি লেখে ভূর্জ্জপাতে
লেখনীতে ভরি’ ল’য়ে দুঃখে-গলা কাজলের কালী,—
—নাম কি খেয়ালী?
গুপ্তধন
গুপ্তধন
আরো কিছুখন না হয় বসিয়ো পাশে,
আরো যদি কিছু কথা থাকে তাই বলো
শরৎ আকাশ হেরো ম্লান হ’য়ে আসে,
বাষ্প আভাসে দিগন্ত ছলোছলো।
জানি তুমি কিছু চেয়েছিলে দেখিবারে,
তাই তো প্রভাতে এসেছিলে মোর দ্বারে,
দিন না ফুরাতে দেখিতে পেলে কি তা’রে
হে পথিক, বলো বলো,—
সে মোর অগম অন্তর পারাবারে
রক্তকমল তরঙ্গে টলোমলো।
দ্বিধাভরে আজো প্রবেশ করোনি ঘরে,
বাহির আঙনে করিলে সুরের খেলা,
জানিনা কী নিয়ে যাবে-যে দেশান্তরে,
হে অতিথি, আজি শেষ-বিদায়ের বেলা।
প্রথম প্রভাতে সব কাজ তব ফেলে,
যে-গভীর বাণী শুনিবারে কাছে এলে,
কোনোখানে কিছু ইসারা কি তা’র পেলে
হে পথিক, বলো বলো,—
সে-বাণী আপন গোপন প্রদীপ জ্বেলে
রক্ত-আগুনে প্রাণে মোর জ্বলোজ্বলো
১৪ কার্ত্তিক, ১৩৩৫
ছায়া
ছায়া
আঁখি চাহে তব মুখপানে,
তোমারে জেনেও নাহি জানে।
কিসের নিবিড় ছায়া
নিয়েছে স্বপন কায়া
তোমার মর্ম্মের মাঝখানে॥
হাসি কাঁপে অধরের শেষে
দূরতর অশ্রুর আবেশে।
বসন্ত কূজিত রাতে
তোমার বাণীর সাথে
অশ্রুত কাহার বাণী মেশে॥
মনে তব গুপ্ত কোন্ নীড়ে
অব্যক্ত ভাবনা এসে ভিড়ে।
বসন্ত পঞ্চম রাগে
বিচ্ছেদের ব্যথা লাগে
সুগভীর ভৈরবীর মীড়ে॥
তোমার শ্রাবণ পূর্ণিমাতে
বাদল র’য়েছে সাথে সাথে।
হে করুণ ইন্দ্রধনু,
তোমার মানসী তনু
জন্ম নিল আলোতে ছায়াতে
অদৃশ্যের বরণের ডালা,
প্রচ্ছন্ন প্রদীপ তাহে জ্বালা।
মিলন নিকুঞ্জ-তলে
দিয়েছো আমার গলে
বিরহের সূত্রে গাঁথা মালা॥
তব দানে, ওগো আনমনা
দিয়ো মোরে তোমার বেদনা
যে-বন কুয়াষা-ছাওয়া
ঝরা ফুল সেথা পাওয়া,
থাক তাহে শিশিরের কণা॥
৫ ভাদ্র, ১৩৩৬
ছায়ালোক
ছায়া লােক
যেথায় তুমি গুণী জ্ঞানী, যেথায় তুমি মানী,
যেথায় তুমি তত্ত্ববিদের সেরা,
আমি সেথায় লুকিয়ে যেতে পথ পাব না জানি,
সেথায় তুমি লোকের ভিড়ে ঘেরা।
সেথায় তোমার বুদ্ধি সদাই জাগে,
চক্ষে তোমার আবেশ নাহি লাগে,
আমার ভীরু হৃদয় ছায়া মাগে,
তোমার সেথায় আলোক খরতর,
যখন সেথা চাহ আমার বাগে
সঙ্কোচে প্রাণ কাঁপে থর থর॥
মোহ-ভাঙা দৃষ্টি তোমার যখন আঘাত হানে,
যায় নিখিলের রহস্য দ্বার টুটে,
এক নিমেষে অপরূপের রূপের মধ্যখানে
অন্ত্র যন্ত্র প্রকাশ পেয়ে উঠে।
বসুন্ধরার শ্যামল প্রাণের ঢাকা
রূঢ় পাথর গোপন ক’রে রাখা,
ভিতরে তার কতই আঁকাবাঁকা
কতকালের দাহন ইতিহাসে,
ফাটল-ধরা কত-যে দাগ আঁকা
তোমার চোখে বাহির হয়ে আসে॥
তেমনি ক’রে যখন কভু আমার পানে চাবে,
মর্ম্মভেদী কৌতূহলের আঁখি,
বিধাতা যা লুকান লাজে দেখতে-যে তাই পাবে
মোর রচনায় যা আছে তাঁর বাকী।
আমার মাঝে তোমার অগোচরে
আদিম যুগের গোপন গভীর স্তরে
অপূর্ণতা রয়েছে অন্তরে,
সৃষ্টি আমার অসমাপ্ত আছে,
সামনে এলে মরি-যে সেই ডরে
ভাঙাচোরা চক্ষে পড়ে পাছে।
তোমার প্রাণে কোনোখানে নাই কি মায়ার ঠাঁই
মত্ততাহীন তত্ত্ব পরপারে,
যেথায় তীক্ষ্ণ চোখের কোনো প্রশ্ন জেগে নাই
অসতর্ক মুক্ত হৃদয় দ্বারে?
যেথায় তুমি দৃষ্টিকর্ত্তা নহ,
সৃষ্টিকর্ত্তা সৃষ্টি লয়ে বহ,
যেথা নানা বর্ণের সংগ্রহ,
যেথা নানা মূর্ত্তিতে মন মাতে,
যেথা তোমার অতৃপ্ত আগ্রহ
আপন-ভোলা রসের রচনাতে॥
সেথায় আমি যাব যখন চৈত্র রজনীতে
বনের বাণী হওয়ায় নিরুদ্দেশা,
চাঁদের আলোয় ঘুম হারানো পাখীর কলগীতে
পথ হারানো ফুলের রেণু মেশা।
দেখ্বে আমায় স্বপন-দেখা চোখে,
চম্কে উঠে বল্বে তুমি, “ও কে,
কোন্ দেবতার ছিল মানস-লোকে
এল আমার গানের ডাকে ডাকা”।
সে-রূপ আমার দেখবে ছায়ালোকে
যে-রূপ তোমার পরাণ দিয়ে আঁকা।
৯ আশ্বিন, ১৩৩৫
জয়তী
জয়তী
যেন তা’র চক্ষুমাঝে
উদ্যত বিরাজে
মহেশের তপােবনে নন্দীর তর্জ্জনী।
ইন্দ্রের অশনি
মৌনে তা’র ঢাকা;
প্রাণ তা’র অরুণের পাখা
মেলিল দিনের বক্ষে তীব্র অতৃপ্তিতে
দুঃসহ দীপ্তিতে।
সাধক দাঁড়ায় তা’র কাছে
সহসা সংশয় লাগে যােগ্যতা কি আছে;
দুঃসাধ্য সাধন তরে
পথ খুঁজে মরে।
তুচ্ছতারে দাহে তা’র অবজ্ঞা-দহন;
এনেছে সে করিয়া বহন
ইন্দ্রাণীর গাঁথা মাল্য; দিবে কণ্ঠে তা’র
কার্ম্মুকে যে দিয়েছে টঙ্কার,
কাপট্যেরে হানিয়াছে, সত্যে যার ঋণী বসুমতী,-
—নাম কি জয়তী?
ঝামরী
ঝামরী
সে যেন খসিয়া-পড়া তারা,
মর্ত্ত্যের প্রদীপে নিল মৃত্তিকার কারা।
নগরে জনতামরু,
সে যেন তাহার মাঝে পথপ্রান্তে সঙ্গিহীন তরু,
তা’রে ঢেকে আছে নিতি
অরণ্যের সুগভীর স্মৃতি।
সে যেন অকালে-ফোটা কুবলয়,
শিশিরে কুষ্ঠিত হ’য়ে রয়।
মন পাখা মেলিবারে চায়
চারিদিকে ঠেকে যায়,
জানে না কিসের বাধা তা’র;
অদৃষ্টের মায়াদুর্গদ্বার
কোন্ রাজপুত্র এসে
মন্ত্রবলে ভেঙে দেবে শেষে?
আকাশে আলোতে
নিমন্ত্রণ আসে যেন কোথা হ’তে,
পথ রুদ্ধ চারিধারে,
মুখ ফুটে বলিতে না পারে
অলক্ষ্য কী আচ্ছাদনে কেন সে আবৃতা।
সে যেন অশোকবনে সীতা
চারিদিকে যারা আছে কেহ তা’র নহেক স্বকীয়;
কে তা’রে পাঠাবে অঙ্গুরীয়
বিচ্ছেদের অতল সমুদ্র পারে?
আঁখি তুলে তাই বারে বারে
চেয়ে দেখে নিরুত্তর নিঃশব্দ গগনে।
কোন্ দেব নিত্য নির্ব্বাসনে
পাঠালো তাহারে!
স্বর্গের বীণার তারে
সঙ্গীতে কী ক’রেছিলো ভুল;
মহেন্দ্রের-দেওয়া ফুল
নৃত্যকালে খসে’ গেলে অন্যমনে দ’লেছিলো কভু?
আজো তবু
মন্দারের গন্ধ যেন আছে তা’র বিষাদে জড়ানো,
অধরে র’য়েছে তা’র ম্লান
—সন্ধ্যার গোলাপসম—
মাঝখানে ভেঙে-যাওয়া অমরার গীতি অনুপম।
অদৃশ্য যে-অশ্রুধারা
আবিষ্ট ক’রেছে তা’র চক্ষুতারা
তাহা দিব্য বেদনার করুণা-নির্ঝরী,—
—নাম কি ঝামরী?
দর্পণ
দর্পণ
দর্পণ লইয়া তা’রে কী প্রশ্ন শুধাও একমনে
হে সুন্দরী, কী সংশয় জাগে তব উদ্বিগ্ন নয়নে?
নিজেরে দেখিতে চাও বাহিরে রাখিয়া আপনারে
যেন আর কারাে চোখে; আর কারাে জীবনের দ্বারে
খুঁজিছ আপন স্থান। প্রেমের অর্ঘ্যের কোনাে ত্রুটি
দেখাে কি মুখের কোনােখানে? তাই তব আঁখি দুটি
নিজেরে কি করিছে ভর্ৎসনা? সাজায়ে লইয়া সর্ব্বদেহে
স্বর্গের গর্ব্বের ধন, তবে যেতে চাও তা’র গেহে?
জানাে না কি, হে রমণী, দর্পণে যা দেখিছ তা ছায়া,
পারে না রচিতে কভু তাই দিয়ে চিরস্থায়ী মায়া।
তিলােত্তমা অনুপমা সুরেন্দ্রের প্রমােদ প্রাঙ্গণে
কঙ্কণঝঙ্কারে আর নৃত্যলােল নূপুর নিক্কণে
নাচিয়া বাহিরে চ’লে যায়। ল’য়ে আত্মনিবেদন
গৌরবে জিনিল শচী ইন্দ্রলােকে নন্দন আসন॥
১৫ আশ্বিন, ১৩৩৫
দায়-মোচন
দায়-মােচন
চিরকাল র’বে মোর প্রেমের কাঙাল
এ কথা বলিতে চাও বোলো।
এই ক্ষণটুকু হোক্ সেই চিরকাল;
তা’র পরে যদি তুমি ভোলো
মনে করাবো না আমি শপথ তোমার,
আসা যাওয়া দুদিকেই খোলা র’বে দ্বার,
যাবার সময় হ’লে যেয়ো সহজেই,
আবার আসিতে হয় এসো।
সংশয় যদি রয় তাহে ক্ষতি নেই,
তবু ভালোবাসো যদি বেসো
বন্ধু, তোমার পথ সম্মুখে জানি,
পশ্চাতে আমি আছি বাঁধা
অশ্রু-নয়নে বৃথা শিরে কর হানি’
যাত্রায় নাহি দিব বাধা।
আমি তব জীবনের লক্ষ্য তো নহি,
ভুলিতে ভুলিতে যাবে, হে চিরবিরহী;
তোমার যা দান তাহা রহিবে নবীন
আমার স্মৃতির আঁখিজলে,
আমার যা দান সেও জেনো চিরদিন
র’বে তব বিস্মৃতিতলে॥
দূরে চ’লে যেতে যেতে দ্বিধা করি’ মনে
যদি কভু চেয়ে দেখো ফিরে
হয়তো দেখিবে আমি শূন্য শয়নে
নয়ন সিক্ত আঁখিনীরে।
মার্জ্জনা করো যদি পাবে তবে বল,
করুণা করিলে নাহি ঘোচে আঁখিজল,
সত্য যা দিয়েছিলে থাক্ মোর তাই,
দিবে লাজ তা’র বেশি দিলে
দুঃখ বাঁচাতে যদি কোনোমতে চাই
দুঃখের মূল্য না মিলে॥
দুর্ব্বল ম্লান করে নিজ অধিকার
বরমাল্যের অপমানে।
যে পারে সহজে নিতে যোগ্য সে তা’র,
চেয়ে নিতে সে কভু না জানে
প্রেমেরে বাড়াতে গিয়ে মিশাবো না ফাঁকি,
সীমারে মানিয়া তা’র মর্য্যাদা রাখি,
যা পেয়েছি সেই মোর অক্ষয় ধন,
যা পাইনি বড়ো সেই নয়।
চিত্ত ভরিয়া র’বে ক্ষণিক মিলন
চির বিচ্ছেদ করি’ জয়॥
৭ ভাদ্র, ১৩৩৫
দিনান্তে
দিনান্তে
বাহিরে তুমি নিলে না মোরে, দিবস গেল ব’য়ে,
তাহাতে মোর যা-হয় হোক্ ক্ষতি
অন্তরে যা দিবার ছিল মিলিছে এক হ’য়ে,
চরণে তব গোপনে তা’র গতি।
লুকায়ে ছিল ছায়াতে ফুল, ভরিল তব ডালি,
গন্ধভরা বন্দনাতে দিয়েছি ধূপ জ্বালি’,
প্রদীপ ছিল মলিন-শিখা, ধোঁয়াতে ছিল কালী,
দীপ্ত হ’য়ে উঠিছে তা’র জ্যোতি।
বাহির হ’তে না যদি লও পূজার এই ডালি
চরণে তব গোপনে তা’র গতি॥
না-হয় তুমি ওপারে থাকো, এপারে আমি থাকি,
নীরব এই নীরস মরুতীরে
অন্ধকারে সন্ধ্যাতারা নয়নে দেয় আঁকি’
সুদূর তব উদার আঁখিটিরে।
ব্যথায় মম তোমারি ছায়া পড়িছে মোর প্রাণে,
বিরহ হানি’ তোমারি বাণী মিলিছে মোর গানে,
অলখ্ স্রোতে ভাবনা ধায় তোমার তটপানে
এপার হ’তে বহিয়া মোর নতি
যে-বীণা তব মন্দিরেতে বাজেনি তানে তানে
চরণে তব নীরবে তা’র গতি॥
১ শ্রাবণ, ১৩৩৪
দিয়ালী
দিয়ালী
জনতার মাঝে
দেখিতে পাইনে তা’রে থাকে তুচ্ছ সাজে।
ললাটে ঘোম্টা টানি’
দিবসে লুকায়ে রাখে নয়নের বাণী।
রজনীর অন্ধকার
তুলে দেয় আবরণ তা’র।
রাজ-রাণী-বেশে
অনায়াস-গৌরবের সিংহাসনে বসে মৃদু হেসে।
বক্ষে হার ঝলমলে,
সীমন্তে অলকে জ্বলে
মাণিক্যের সীঁথি।
কী যেন বিস্মৃতি
সহসা ঘুচিয়া যায়, টুটে দীনতার ছদ্মসীমা,
মনে পড়ে আপন মহিমা।
ভক্তেরে সে দেয় পুরস্কার
বরমাল্য তা’র
আপন সহস্র দীপ জ্বালি’,—
—নাম কি দিয়ালী?
দীনা
দীনা
তোমারে সম্পূর্ণ জানি হেন মিথ্যা কখনো কহিনি,
প্রিয়তম, আমি বিরহিণী
পরিপূর্ণ মিলনের মাঝে।
মোর স্পর্শে বাজে
যে তন্ত্রটি তোমার বীণায়,
তাহারি পঞ্চম স্বরে তোমারে কি নিঃশেষে চিনায়
তোমার বসন্ত রাগে,
নিদ্রাহীন রজনীর পরজে বেহাগে?
সে তন্ত্র সোনার বটে,—বিভাসে ললিতে
যে কথা সে চেয়েছে বলিতে
তাইতে হ’য়েছে পূর্ণ এ আমার জীবন অঞ্জলি।
তবু সত্য ক’রে বলি,
ব্যথা লাগে বুকে
যখন সহসা আসি তোমার সম্মুখে
নিভৃত তোমার ঘরে
স্বপ্নভাঙা প্রথম প্রহরে,
—যখন জাগেনি পাখী, রক্তিম আকাশে
আসন্ন অরণ্যগাথা নব সূর্য্যোদয় আশে
র’য়েছে স্তম্ভিত,
পিঙ্গল আভায় দীপ্ত জটা বিলম্বিত
অরুণ সন্ন্যাসী
করজোড়ে আছে স্থির আলোক-প্রত্যাশী,—
তখন তোমার মুখ চেয়ে দেখিয়াছি ভয়ে ভয়ে
জেনেছি হৃদয়ে
তুমিই অচেনা।
কোনো দিন ফুরাবে না
পরিচয়, তোমারে বুঝিব আমি করি না সে আশা,
কথায় যা বলো নাই, আমি যে জানিনা তার ভাষা।
ভয় হয় পাছে
যে-সম্পদ চেয়েছিলে মোর কাছে
সে-যে মোর নাই, তাই শেষে পড়ে ধরা,
দেখো দূর হ’তে এসে জলাশয়ে জল নাই ভরা।
তখন নিয়ো না যেন অপরাধ মোর,
হ’য়ো না কঠোর,
তুমি যদি মুগ্ধ মনে ভুলে থাকো, তবু
গভীর দীনতা মোর গোপন করিনি আমি কভু।
মোর দ্বারে যবে এলে অন্যমনা,
সে কি মোর কিছু নিয়ে পূরাতে কামনা?
নহে নহে, হে রাজন, তোমার অনেক ধন আছে,
তাই তুমি আসো মোর কাছে
দেবার আনন্দ তব পূর্ণ করিবার লাগি
যদি তাই পূর্ণ হয়, তবে আমি নহি তো অভাগী॥
১৯ ভাদ্র, ১৩৩৫
দূত
দূত
ছিনু আমি বিষাদে মগনা
অন্যমনা
তোমার বিচ্ছেদ-অন্ধকারে।
হেনকালে নিৰ্জ্জন কুটীর দ্বারে
অকস্মাৎ
কে করিল করাঘাত,
কহিল গম্ভীর কণ্ঠে, অতিথি এসেছি দ্বার খোলো।
মনে হ’লো
ঐ যেন তোমারি স্বর শুনি,
ঐ যেন দক্ষিণ বায়ু দূরে ফেলি’ মদির ফাল্গুনী
দিগন্তে আসিল পূর্ব্বদ্বারে,
পাঠালে নির্ঘোষ তা’র বজ্রধ্বনি-মন্দ্রিত মল্লারে।
কেঁপেছিলো বক্ষতল
বিলম্ব করিনি তবু অৰ্দ্ধ পল।
মুহূর্ত্তে মুছিনু অশ্রুবারি,
বিরহিণী নারী,
ছাড়িনু ধেয়ান তব তোমারি সম্মানে,
ছুটে গেনু দ্বারপানে।
শুধালেম তুমি দূত কার?
সে কহিল আমি তো সবার।
যে-ঘরে তোমার শয্যা একদিন পেতেছি আদরে
ডাকিলাম তারে সেই ঘরে।
আনিলাম অর্ঘ্যথালি,
দীপ দিনু জ্বালি।
দেখিলাম বাঁধা তারি ভালে
যে-মালা পরায়েছিনু তোমারেই বিদায়ের কালে॥
৪ ভাদ্র, ১৩৩৫
দ্বৈত
দ্বৈত
আমি যেন গোধূলি গগন
ধেয়ানে মগন,
স্তব্ধ হ’য়ে ধরাপানে চাই;
কোথা কিছু নাই,
শুধু শূন্য বিরাট প্রান্তর ভূমি।
তারি প্রান্তে নিরালা পিয়াল তরু তুমি,
বক্ষে মোর বাহু প্রসারিয়া
স্তব্ধ হিয়া
শ্যামল স্পর্শনে আত্মহারা,
বিস্মরিল আপনার সূর্য্যচন্দ্রতারা।
তোমার মঞ্জরী
কভু ফোটে, কভু পড়ে ঝরি’;
তোমার পল্লবদল
কভু স্তব্ধ, কভুবা চঞ্চল।
একেলার খেলা তব
আমার একেলা বক্ষে নিত্যনব।
কিশলয়গুলি
—কম্পমান করুণ অঙ্গুলি—
চায় সন্ধ্যারক্তরাগ,
আলোর সোহাগ;
চায় নক্ষত্রের কথা,—
চায় বুঝি মোর নিঃসীমতা।
২৩ শ্রাবণ, ১৩৩৫
নন্দিনী
নন্দিনী
প্রথম সৃষ্টির ছন্দখানি
অঙ্গে তা’র নক্ষত্রের নৃত্য দিল আনি’।
বর্ষাঅন্তে ইন্দ্রধনু
মর্ত্ত্যে নিল তনু।
দিগ্বধূর মায়াবী অঙ্গুলি
চঞ্চল চিন্তায় তার বুলায়েছে বর্ণ-আঁকা তুলি।
সরল তাহার হাসি, সুকুমার মুঠি
যেন শুভ্র কমল-কলিকা;
আঁখি দুটি
যেন কালাে আলােকের সচকিত শিখা।
অবসাদবন্ধ ভাঙা মুক্তির সে ছবি,
সে আনিয়া দেয় চিত্তে
কলনৃত্যে
দুস্তর-প্রস্তর-ঠেলা ফেনােচ্ছল আনন্দ-জাহ্নবী।
বীণার তন্ত্রের মতাে গতি তা’র সঙ্গীত-স্পন্দিনী,-
—নাম কি নন্দিনী?
নববধূ
নববধূ
চ’লেছে উজান ঠেলি’ তরণী তোমার,
দিক্প্রান্তে নামে অন্ধকার।
কোন্ গ্রামে যাবে তুমি, কোন্ ঘাটে, হে বধূবেশিনী,
ওগো বিদেশিনী!
উৎসবের বাঁশিখানি কেন-যে কে জানে
ভ’রেছে দিনান্তবেলা ম্লান মূলতানে,
তোমারে পরালো সাজ মিলি সখীদল
গোপনে মুছিয়া চক্ষুজল॥
মৃদুস্রোত নদীখানি ক্ষীণ কলকলে
স্তিমিত বাতাসে যেন বলে—
“কত বধূ গিয়েছিলো কতকাল এই স্রোত বাহি’
তীর পানে চাহি’।
ভাগ্যের বিধাতা কোনো কহেন নি কথা,
নিস্তব্ধ ছিলেন চেয়ে লজ্জাভয়ে নতা
তরুণী কন্যার পানে, তরী ’পরে ছিলেন গোপনে
তরণীর কাণ্ডারীর সনে॥”
কোন্ টানে জানা হ’তে অজানায় চলে
আধো হাসি আধো অশ্রুজলে।
ঘর ছেড়ে দিয়ে তবে ঘরখানি পেতে হয় তা’রে
অচেনার ধারে।
ওপারের গ্রাম দেখো আছে ঐ চেয়ে,
বেলা ফুরাবার আগে চলো তরী বেয়ে,
ওই ঘাটে কত বধূ কত শত বর্ষ বর্ষ ধরি’
ভিড়ায়েছে ভাগ্য-ভীরু তরী॥
জনে জনে রচি’ গেল কালের কাহিনী,
অনিত্যের নিত্য প্রবাহিনী।
জীবনের ইতিবৃত্তে নামহীন কর্ম্ম উপহার
রেখে গেল তা’র।
আপনার প্রাণসূত্রে যুগযুগান্তর
গেঁথে গেঁথে চ’লে গেল না রাখি স্বাক্ষর,
ব্যথা যদি পেয়ে থাকে না রহিল কোনো তা’র ক্ষত,
লভিল মৃত্যুর সদাব্রত॥
তাই আজি গোধূলির নিস্তব্ধ আকাশ
পথে তব বিছাল আশ্বাস।
কহিল সে কানে কানে, প্রাণ দিয়ে ভরা যার বুক
সেই তা’র সুখ।
রয়েছে কঠোর দুঃখ, র’য়েছে বিচ্ছেদ,
তবু দিন পূর্ণ হবে, রহিবে না খেদ,
যদি ব’লে যাও, বধূ, আলো দিয়ে জ্বেলেছিনু আলো,
সব দিয়ে বেসেছি ভালো॥
১৯ আশ্বিন, ১৩৩৫
নাগরী
নাগরী
ব্যঙ্গ-সুনিপুণা,
শ্লেষবাণ-সন্ধান-দারুণা!
অনুগ্রহ-বর্ষণের মাঝে
বিদ্রুপ-বিদ্যুৎঘাত অকস্মাৎ মর্ম্মে এসে বাজে।
সে যেন তুফান
যাহারে চঞ্চল করে সে তরীকে করে খান্খান্
অট্টহাস্য আঘাতিয়া এপাশে ওপাশে
প্রশ্রয়ের বীথিকায় ঘাসে ঘাসে
রেখেছে সে কণ্টক-অঙ্কুর বুনে বুনে;
অদৃশ্য আগুনে
কুঞ্জ তা’র বেড়িয়াছে;
যারা আসে কাছে
সব থেকে তা’রা দূরে রয়;
মোহমন্ত্রে যে-হৃদয়
করে জয়
তারি ’পরে অবজ্ঞায় দারুণ নির্দ্দয়।
আপন তপস্যা ল’য়ে যে-পুরুষ নিশ্চল সদাই,
যে উহারে ফিরে চাহে নাই,
জানি সেই উদাসীন
একদিন
জিনিয়াছে ওরে,
জ্বালাময়ী তারি পায়ে দীপ্ত দীপ দিল অর্ঘ্য ভ’রে!
বিদুষী নিয়েছে বিদ্যা শুধু চিত্তে নয়,
আপন রূপের সাথে ছন্দ তা’রে দিল অঙ্গময়;
বুদ্ধি তা’র ললাটিকা,
চক্ষুর তারায় বুদ্ধি জ্বলে দীপশিখা;
বিদ্যা দিয়ে রচে নাই পণ্ডিতের স্থূল অহঙ্কার,
বিদ্যারে ক’রেছে অলঙ্কার।
প্রসাধন-সাধনে চতুরা,
জানে সে ঢালিতে সুরা
ভূষণ ভঙ্গীতে,
অলক্তের আরক্ত ইঙ্গিতে।
জাদুকরী বচনে চলনে;
গোপন সে নাহি করে আপন ছলনে;
অকপট মিথ্যারে সে নানা রসে করিয়া মধুর
নিন্দা তা’র করি’ দেয় দূর;
জ্যোৎস্নার মতন
গোপনেও নহে সে গোপন।
আঁধার আলোরি কোলে র’য়েছে জাগরি’—
—নাম কি নাগরী?
নিবেদন
নিবেদন
অজানা খণির নূতন মণির
গেঁথেছি হার,
ক্লান্তিবিহীনা নবীনা বীণায়
বেঁধেছি তার।
যেমন নূতন বনের দুকূল,
যেমন নূতন আমের মুকুল,
মাঘের অরুণে খোলে স্বর্গের
নূতন দ্বার—
তেমনি আমার নবীন রাগের
নব যৌবনে নব সোহাগের
রাগিণী রচিয়া উঠিল নাচিয়া
বীণার তার॥
যে-বাণী আমার কখনো করেও
হয়নি বলা
তাই দিয়ে গানে রচিব নূতন
নৃত্যকলা।
আজি অকারণ মুখর বাতাসে
যুগান্তরের সুর ভেসে আসে,
মর্ম্মরস্বরে বনের ঘুচিল
মনের ভার,—
যেমনি ভাঙিল বাণীর বন্ধ,
উচ্ছ্বসি’ উঠে নূতন ছন্দ,
সুরের সাহসে আপনি চকিত
বীণার তার॥
২৭ শ্রাবণ, ১৩৩৫
নির্ঝরিণী
নির্ঝরিণী
ঝর্না, তোমার স্ফটিক জলের
স্বচ্ছধারা,
তাহারি মাঝারে দেখে আপনারে
সূর্য্যতারা!
তারি একধারে আমার ছায়ারে
আনি মাঝে মাঝে, দুলায়ো তাহারে,
তারি সাথে তুমি হাসিয়া মিলায়ো
কলধ্বনি,—
দিয়ে তা’রে বাণী যে-বাণী তোমার
চিরন্তনী॥
আমার ছায়াতে তোমার হাসিতে
মিলিত ছবি,
তাই নিয়ে আজি পরাণে আমার
মেতেছে কবি।
পদে পদে তব আলোর ঝলকে
ভাষা আনে প্রাণে পলকে পলকে,
মোর বাণী রূপ দেখিলাম আজি
নির্ঝরিণী।
তোমার প্রবাহে মনেরে জাগায়,
নিজেরে চিনি॥
আষাঢ়, ১৩৩৫
নির্ভয়
নির্ভয়
আমরা দুজনা স্বৰ্গ-খেলনা
গড়িব না ধরণীতে,
মুগ্ধ ললিত অশ্রু গলিত গীতে।
পঞ্চশরের বেদনা-মাধুরী দিয়ে
বাসর রাত্রি রচিব না মোরা, প্রিয়ে;
ভাগ্যের পায়ে দুর্ব্বল প্রাণে
ভিক্ষা না যেন যাচি।
কিছু নাই ভয়, জানি নিশ্চয়
তুমি আছ, আমি আছি।
উড়াবো উর্দ্ধে প্রেমের নিশান
দুর্গম পথ মাঝে
দুর্দ্দম বেগে, দুঃসহতম কাজে।
রুক্ষ দিনের দুঃখ পাই তো পাবো,
চাই না শান্তি, সান্ত্বনা নাহি চাবো
পাড়ি দিতে নদী হাল ভাঙে যদি,
ছিন্ন পালের কাছি,
মৃত্যুর মুখে দাঁড়ায়ে জানিব
তুমি আছ, আমি আছি।
দুজনের চোখে দেখেছি জগৎ,
দোঁহারে দেখেছি দোঁহে,—
মরু পথ তাপ দুজনে নিয়েছি স’হে
ছুটিনি মোহন মরীচিকা পিছে পিছে,
ভুলাইনি মন সত্যেরে করি’ মিছে—
এই গৌরবে চলিব এ ভবে
যত দিন দোঁহে বাঁচি।
এ-বাণী প্রেয়সী হোক্ মহীয়সী
তুমি আছ, আমি আছি।
৩১ শ্রাবণ, ১৩৩৫
নৈবেদ্য
নৈবেদ্য
তােমারে দিইনি সুখ, মুক্তির নৈবেদ্য গেনু রাখি’
রজনীর শুভ্র অবসানে; কিছু আর নাহি বাকি,
নাইকো প্রার্থনা, নাই প্রতি মুহূর্ত্তের দৈন্যরাশি,
নাই অভিমান, নাই দীন কান্না, নাই গর্ব্ব হাসি,
নাই পিছে ফিরে দেখা। শুধু সে মুক্তির ডালিখানি
ভরিয়া দিলাম আজি আমার মহৎ মৃত্যু আনি’॥
* আষাঢ়, ১৩৩৫
পথবর্ত্তী
পথবর্ত্তী
দূর মন্দিরে সিন্ধু কিনারে
পথে চলিয়াছ তুমি।
আমি তরু মোর ছায়া দিয়ে তা’রে
মৃত্তিকা তা’র চুমি।
হে তীর্থগামী, তব সাধনার
অংশ কিছু-বা রহিল আমার,
পথপাশে আমি তব যাত্রার
রহিব সাক্ষীরূপে।
তোমার পুজায় মোর কিছু যায়
ফুলের গন্ধধূপে॥
তব আহ্বানে বরণ করিয়া
নিয়েছি দুর্গমেরে।
ক্লান্তি কিছু-বা নিলাম হরিয়া
মোর অঞ্চল-ঘেরে।
যা ছিল কঠোর, যাহা নিষ্ঠুর
তা’র সাথে কিছু মিলাই মধুর,
যা ছিল অজানা, যাহা ছিল দূর
আমি তারি মাঝে থেকে
দিনু পথপরে শ্যাম অক্ষরে
জানার চিহ্ণ এঁকে॥
মোর পরিচয়ে তোমার পথের
কিছু রহে পরিচয়।
তব রচনায় তব ভকতের
কিছু বাণী মিশে রয়।
তোমার মধ্যদিবসের তাপে
আমার স্নিগ্ধ কিশলয় কাঁপে,
মোর পল্লব সে-মন্ত্র জপে
গভীর যা তব মনে,
মোর ফলভার মিলানু তোমার
সাধন-ফলের সনে॥
বেলা চ’লে যাবে, একদা যখন
ফুরাবে যাত্রা তব,—
শেষ হবে যবে মোর প্রয়োজন
হেথাই দাঁড়ায়ে রবো
এই পথখানি রবে মোর প্রিয়,
এই হবে মোর চির বরণীয়,
তোমারি স্মরণে রবো স্মরণীয়
না মানিব পরাভব।
তব উদ্দেশে অর্পিব হেসে
যা-কিছু আমার সব॥
১১ ভাদ্র, ১৩৩৫
পথের বাঁধন
পথের বাঁধন
পথ বেঁধে দিল বন্ধনহীন গ্রন্থি,
আমরা দুজন চ’ল্তি হাওয়ার পন্থী।
রঙীন্ নিমেষ ধূলার দুলাল
পরাণে ছড়ায় আবীর গুলাল,
ওড়্না ওড়ায় বর্ষার মেঘে
দিগঙ্গনার নৃত্য,
হঠাৎ-আলোর ঝলকানি লেগে
ঝলমল করে চিত্ত॥
নাই আমাদের কনকচাঁপার কুঞ্জ।
বন-বীথিকায় কীর্ণ বকুল পুঞ্জ।
হঠাৎ কখন্ সন্ধেবেলায়
নামহারা ফুল গন্ধ এলায়,
প্রভাতবেলায় হেলাভরে করে
অরুণ কিরণে তুচ্ছ
উদ্ধত যত শাখার শিখরে
রডোডেনড্রন্ গুচ্ছ॥
নাই আমাদের সঞ্চিত ধন-রত্ন,
নাই রে ঘরের লালন-ললিত যত্ন।
পথ পাশে পাখী পুচ্ছ নাচায়,
বন্ধন তা’রে করি না খাঁচায়,
ডানা-মেলে-দেওয়া মুক্তিপ্রিয়ের
কূজনে দুজনে তৃপ্ত।
আমরা চকিত অভাবনীয়ের
ক্কচিৎ কিরণে দীপ্ত॥
* আষাঢ়, ১৩৩৫
পরিচয়
পরিচয়
তখন বর্ষণহীন অপরাহ্ণ মেঘে
শঙ্কা ছিল জেগে;
ক্ষণে ক্ষণে তীক্ষ্ণ ভর্ৎসনায়
বায়ু হেঁকে যায়;
শূন্যে যেন মেঘচ্ছিন্ন রৌদ্ররাগে পিঙ্গল জটায়
নারদ হানিছে ক্রোধ রক্তচক্ষু কটাক্ষচ্ছটায়
সে-দুর্য্যোগে এনেছিনু তোমার বৈকালী,
কদম্বের ডালি
বাদলের বিষন্নছায়াতে
গীতহারা প্রাতে
নৈরাশ্যজয়ী সে ফুল রেখেছিলো কাজল প্রহরে
রৌদ্রের স্বপনছবি রোমাঞ্চিত কেশরে কেশরে॥
মন্থর মেঘেরে যবে দিগন্তে ধাওয়ায়
পূবন হওয়ায়,
কাঁদে বন শ্রাবণের রাতে
প্লাবনের ঘাতে,
তখনো নির্ভীক নীপ গন্ধ দিল পাখীর কুলায়ে,
বৃন্ত ছিল ক্লান্তিহীন, তখনো সে পড়ে নি ধূলায়।
সেই ফুলে দৃঢ় প্রত্যাশার
দিনু উপহার॥
সজল সন্ধ্যায় তুমি এনেছিলে, সখী,
একটি কেতকী।
তখনো হয়নি দীপ জ্বালা,
ছিলাম নিরালা।
সারি দেওয়া সুপারির আন্দোলিত সঘন সবুজে
জোনাকি ফিরিতেছিল অবিশ্রান্ত কা’রে খুঁজে খুঁজে’
দাঁড়াইলে দুয়ারের বাহিরে আসিয়া,
গোপনে হাসিয়া।
শুধালেম আমি কৌতূহলী,
“কী এনেছো” বলি’।
পাতায় পাতায় বাজে ক্ষণে ক্ষণে বারিবিন্দুপাত,
গন্ধঘন প্রদোষের অন্ধকারে বাড়াইনু হাত।
ঝঙ্কারি’ উঠিল মোর অঙ্গ আচম্বিতে
কাঁটার সঙ্গীতে।
চমকিনু কী তীব্র হরষে
পরুষ পরশে!
সহজ-সাধন-লব্ধ নহে সে মুগ্ধের নিবেদন,
অন্তরে ঐশ্বর্য্য রাশি, আচ্ছাদনে কঠোর বেদন
নিষেধে নিরুদ্ধ যে-সম্মান
তাই তব দান॥
৪ ভাদ্র, ১৩৩৫
পরিণয়
পরিণয়
শুভখন আসে সহসা আলো জ্বেলে,
মিলনের সুধা পরম ভাগ্যে মেলে।
একার ভিতরে একের দেখা না পাই,
দুজনার যোগে পরম একের ঠাঁই,
সে-একের মাঝে আপনারে খুঁজে পেলে॥
আপনারে দান সেই তো চরম দান,
আকাশে আকাশে তারি লাগি আহ্বান।
ফুলবনে তাই রূপের তুফান লাগে,
নিশীথে তারায় আলোর ধেয়ান জাগে,
উদয় সূর্য গাহে জাগরণী গান॥
নীরবে গোপনে মর্ত্ত্যভুবন ’পরে
অমরাবতীর সুর-সুরধুনী ঝরে।
যখনি হৃদয়ে পশিল তাহার ধারা
নিজেরে জানিলে সীমার বাঁধন হারা,
স্বর্গের দীপ জ্বলিল মাটির ঘরে॥
আজি বসন্ত চিরবসন্ত হোক্,
চিরসুন্দরে মজুক্ তোমার চোখ।
প্রেমের শান্তি চিরশান্তির বাণী
জীবনের ব্রতে দিনে রাতে দিক্ আনি’,
সংসারে তব নামুক্ অমৃতলোক॥
আশ্বিন (?), ১৩৩৫
পিয়ালী
পিয়ালী
চাহনি তাহার, সব কোলাহল হ’লে সারা
সন্ধ্যার তিমিরে ভাসা তারা।
মৌনখানি সুমধুর মিনতিরে
লতায়ে লতায়ে যেন মনের চৌদিকে দেয় ঘিরে,
নির্ব্বাক চাহিয়া থাকে নাহি পায় ভেবে
কেমন করিয়া কী-যে দেবে।
দুয়ার-বাহিরে
আসে ধীরে,
ক্ষণেক নীরব থেকে চ’লে যায় ফিরে।
নাও যদি কয় কথা
মনে যেন ভরি’ দেয় সুস্নিগ্ধ মমতা।
পায়ের চলায়
কিছু যেন দান করে ধূলির তলায়
তা’রে কিছু করিলে জিজ্ঞাসা,
কিছু বলে, কিছু তবু বাকি থাকে ভাষা।
নিঃশব্দে খুলিয়া দ্বার
অঞ্চলে আড়াল করি’ সে যেন কাহার
আনিয়াছে সৌভাগ্যের থালি,—
—নাম কি পিয়ালী?
পুরাতন
পুরাতন
যে-গান গাহিয়াছিনু কবেকার দক্ষিণ বাতাসে
সে-গান আমার কাছে কেন আজ ফিরে ফিরে আসে
শরতের অবসানে? সেদিনের সাহানার সুব
আজি অসময়ে এসে অকারণে করিছে বিধুর
মধ্যাহ্ণের আকাশেরে; দিগন্তের অরণ্য রেখায়
দূর অতীতের বাণী লিপ্ত আছে অস্পষ্ট লেখায়,
তাহারে ফুটাতে চাহে। পথভ্রান্ত করুণ গুঞ্জনে
মধু আহরিতে ফিরে, সেদিনের অকৃপণ বনে
যে-চামেলি বল্লী ছিল তারি শূন্য দানসত্র হ’তে।
ছায়াতে যা লীন হ’লো তা’রে খোঁজে নিষ্ঠুর আলোতে
শীতরিক্ত শাখা ছেড়ে পাখী গেছে সিন্ধুপারে চলি’
তারি কুলায়ের কাছে সে-কালের বিস্মৃত কাকলী
বৃথাই জাগাতে আসে। যে-তারকা অস্তে গেল দূরে
তাহারি স্পন্দন ও-যে ধরিয়া এনেছে নিজ সুরে॥
পৌষ?, ১৩৩৫
প্রকাশ
প্রকাশ
আচ্ছাদন হ’তে
ডেকে লহো মোরে তব চক্ষুর আলোতে।
অজ্ঞাত ছিলাম এত দিন
পরিচয়হীন,—
সেই অগোচর-দুঃখ ভার
বহিয়া চ’লেছি পথে; শুধু আমি অংশ জনতার
উদ্ধার করিয়া আনো,
আমারে সম্পূর্ণ করি’ জানো!
যেথা আমি একা
সেথায় নামুক্ তব দেখা!
সে মহা নির্জ্জন,
যে-গহনে অন্তর্যামী পাতেন আসন,
সেইখানে আনো আলো
দেখো মোর সব মন্দ ভালো,
যাক্ লজ্জা ভয়,
আমার সমস্ত হোক্ তব দৃষ্টিময়॥
ছায়া আমি সবা কাছে, অস্ফুট আমি-যে,
তাই আমি নিজে
তাহাদের মাঝে
নিজেরে খুঁজিয়া পাই না-যে।
তা’রা মোর নাম জানে, নাহি জানে মান,
তা’রা মোর কর্ম্ম জানে, নাহি জানে মর্ম্মগত প্রাণ।
সত্য যদি হই তোমা কাছে
তবে মোর মূল্য বাঁচে,—
তোমার মাঝারে
বিধির স্বতন্ত্র সৃষ্টি জানিব আমারে।
প্রেম তব ঘোষিবে তখন
অসংখ্য যুগের আমি একান্ত সাধন।
তুমি মোরে করো আবিষ্কার,
পূর্ণ ফল দেহো মোরে আমার আজন্ম প্রতীক্ষার।
বহিতেছি অজ্ঞাতের বন্ধন সদাই,
মুক্তি চাই
তোমার জানার মাঝে
সত্য তব যেথায় বিরাজে॥
২৪ শ্রাবণ, ১৩৩৫
প্রচ্ছন্না
প্রচ্ছন্না
বিদেশে ঐ সৌধশিখর ’পরে
ক্ষণকালের তরে
পথ হ’তে-যে দেখেছিলেম, ওগো আধেক দেখা,
মনে হ’লো তুমি অসীম একা।
দাঁড়িয়েছিলে যেন আমার একটি বিজন খনে
আর কিছু নাই সেথায় ত্রিভুবনে।
সামনে তোমার মুক্ত আকাশ, অরণ্যতল নীচে,
ক্ষণে ক্ষণে ঝাউএর শাখা প্রলাপ মর্ম্মরিছে।
মুখ দেখা না যায়,
পিঠের ’পরে বেণীটি লুটায়।
থামের পাশে হেলান-দেওয়া ঈষৎ দেখি আধখানি ঐ দেহ,
অসম্পূর্ণ কয়টি রেখায় কী যেন সন্দেহ।
বন্দিনী কি ভোগের কারাগারে,
ভাবনা তোমার উড়ে চলে দূর দিগন্তপারে?
সোনার বরণ শস্যক্ষেতে, কোন্-সে নদীতীরে
পূজারীদের চলার পথে, উচ্চ চূড়া দেবতামন্দিরে
তোমার চিরপরিচিত প্রভাত আলোখানি,
তারি স্মৃতি চক্ষে তোমার জল কি দিল আনি’?
কিম্বা তুমি রাজেন্দ্রসোহাগী,
সেই বহুবল্লভের প্রেমে দ্বিধার দুঃখ হৃদয়ে রয় জাগি’,
প্রশ্ন কি তাই শুধাও নক্ষত্রেরে
সপ্তঋষির কাছে তোমার প্রণামখানি সেরে।
হয়তো বৃথাই সাজো,
তৃপ্তিবিহীন চিত্ততলে তৃষ্ণা-অনল দহন করে আজো;
তাই কি শূন্য আকাশপানে চাও
উপেক্ষিত যৌবনেরি ধিক্কার জানাও?
কিম্বা আছ চেয়ে
আস্বে সে কোন্ দুঃসাহসী গোপন পন্থা বেয়ে,
বক্ষ তোমার দোলে,
রক্ত নাচে ত্রাসের উতরোলে।
স্তব্ধ আছে তরুশ্রেণী মরণছায়া ঢাকা,
শূন্যে ওড়ে অদৃশ্য কোন্ পাখা।
আমি পথিক যাবো-যে কোন্ দূরে;
তুমি রাজার পুরে
মাঝে মাঝে কাজের অবসরে
বাহির হয়ে আসবে হোথায় ঐ অলিন্দ ’পরে,
দেখবে চেয়ে অকারণে স্তব্ধ নেত্রপাতে
গোধূলি বেলাতে
বনের সবুজ তরঙ্গ পারায়ে
নদীর প্রান্ত-রেখায় যে-পথ গিয়েছে হারায়ে।
তোমার ইচ্ছা চ’ল্বে কল্পনাতে
সুদূর পথে আভাসরূপী সেই অজানার সাথে
পান্থ যেজন নিত্য চ’লে যায়।
আমি পথিক হায়
পিছনপানে এই বিদেশের সুদূর সৌধশিরে
ইচ্ছা আমার পাঠাই ফিরে ফিরে
ছায়ায় ঢাকা আধেক-দেখা তোমার বাতায়নে,—
যে-মুখ তোমার লুকিয়ে ছিল সে-মুখ আঁকি মনে॥
১০ আশ্বিন, ১৩৩৫
প্রণতি
প্রণতি
কত ধৈর্য্য ধরি’
ছিলে কাছে দিবস শর্ব্বরী।
তব পদ-অঙ্কন গুলিরে
কতবার দিয়ে গেছো মোর ভাগ্য-পথের ধূলিরে
আজ যবে
দূরে যেতে হবে
তোমারে করিয়া যাবো দান
তব জয় গান।
কতবার ব্যর্থ আয়োজনে
এ জীবনে
হোমাগ্নি উঠেনি জ্বলি’,
শূন্যে গেছে চলি’
হতাশ্বাস ধূমের কুণ্ডলী।
কতবার ক্ষণিকের শিখা
আঁকিয়াছে ক্ষীণ টীকা
নিশ্চেতন নিশীথের ভালে।
লুপ্ত হ’য়ে গেছে তাহা চিহ্ণহীন কালে
এবার তোমার আগমন
হোম হুতাশন
জ্বেলেছে গৌরবে।
যজ্ঞ মোর ধন্য হবে।
আমার আহুতি দিনশেষে
করিলাম সমর্পণ তোমার উদ্দেশে।
লহো এ প্রণাম
জীবনের পূর্ণ পরিণাম।
এ প্রণতি ’পরে
স্পর্শ রাখো স্নেহভরে।
তোমার ঐশ্বর্য মাঝে
সিংহাসন যেথায় বিরাজে,
করিয়ো আহ্বান,
সেথা এ প্রণতি মোর পায় যেন স্থান॥
আষাঢ়, ১৩৩৫
প্রতিমা
প্রতিমা
চতুর্দ্দশী এলো নেমে
পূর্ণিমার প্রান্তে এসে গেল থেমে।
অপূর্ণের ঈষৎ আভাসে
আপন বলিতে তা’রে মর্ত্ত্যভূমি শঙ্কা নাহি বাসে
এ ধরার নির্ব্বাসনে
কুণ্ঠার গুণ্ঠন নাই, ভীরুতা নাইকো তা’র মনে,
সংসার-জনতামাঝে।
আপনাতে আপনি বিরাজে।
দুঃখে শোকে অবিচল, ধৈর্য্য তা’র প্রফুল্লতাভরা,
সকল উদ্বেগভার-হরা!
রোগ যদি আসে রুখে
সকরুণ শান্ত হাসি লেগে থাকে গ্লানিহীন মুখে
দুর্য্যোগ মেঘের মতো
নীচে দিয়ে ব’হে যায় কত
বারেবারে,
প্রভা তা’র মুছিতে না পারে।
তবু তা’র মহিমায় কিছু আছে বাকি,
সেইখানে রাখে ঢাকি’
অশ্রুজল
বিষাদ-ইঙ্গিতে ছোঁওয়া ঈষৎ বিহ্বল।
কণামাত্র সে ক্ষীণতা
নাহি কহে কথা,
কেহ না দেখিতে পায়
নিত্য যারা ঘিরে আছে তায়।
অমরার অসীমতা মাটিতে নিয়েছে সীমা,—
—নাম কি প্রতিমা?
প্রতীক্ষা
প্রতীক্ষা
তোমার প্রত্যাশা ল’য়ে আছি, প্রিয়তমে,
চিত্ত মোর তোমারে প্রণমে!
অয়ি অনাগতা, অয়ি নিত্য প্রত্যাশিতা,
হে সৌভাগ্যদায়িনী দয়িতা।
সেবাকক্ষে করি না আহ্বান;—
শুনাও তাহারি জয়গান
যে-বীর্য্য বাহিরে ব্যর্থ, যে-ঐশ্বর্য্য ফিরে অবাঞ্ছিত,
চাটুলুব্ধ জনতায় যে-তপস্যা নির্ম্মম লাঞ্ছিত।
দীর্ঘ এ দুর্গম পথ মধ্যাহ্ণ-তাপিত,
অনিদ্রায় রজনী যাপিত।
শুষ্কবাক্য বালুকার ঘূর্ণিপাক ঝড়ে
পথিক ধূলায় শুয়ে পড়ে।
নাহি চাহি মধুর শুশ্রূষা,
হে কল্যাণী, তুমি নিষ্কলুষা,
তোমার প্রবল প্রেম প্রাণভরা সৃষ্টির নিশ্বাস,
উদ্দীপ্ত করুক্ চিত্তে ঊর্দ্ধশিখা বিপুল বিশ্বাস।
ধূসর প্রদোষে আজি অস্ত পথ জুড়ে’
নিশাচর মিথ্যা চলে উড়ে।
আলো আঁধারের পাকে না মিলে কিনারা,
দীর্ঘ যে দেখায় হ্রস্ব যারা।
যাচে দেশ মোহের দীক্ষারে,
কাঁদে দিক্ বিধির ধিক্কারে,
ভাগ্যের ভিক্ষুক চাহে কুটিল সিদ্ধির আশীর্ব্বাদ,
ধূলিতে খুঁটিয়া-তোলা বহুজন-উচ্ছিষ্ট প্রসাদ।
কুৎসায় বিস্তারি’ দেয় পঙ্কে ক্লিন্ন গ্লানি,
কলহেরে শৌর্য্য ব’লে জানি,
ভাবি, দুর্যোগের সিন্ধু তরিব হেলায়
বঞ্চনার ভঙ্গুর ভেলায়।
বাহিরে মুক্তিরে ব্যর্থ খুঁজি,
অন্তরে বন্ধন করি পুঁজি,
অশক্তি মজ্জায় রক্তে, শক্তি বলি’ জানি ছলনাকে,
মর্ম্মগত খর্ব্বতায় সর্ব্বকালে খর্ব্ব করি’ রাখে॥
হে বাণীরূপিনী, বাণী জাগাও অভয়,
কুজ্ঝটিকা চিরসত্য নয়।
চিত্তেরে তুলুক্ ঊর্দ্ধে মহত্ত্বের পানে
উদাত্ত তোমার আত্মদানে।
হে নারী, হে আত্মার সঙ্গিনী,
অবসাদ হ’তে লহো জিনি’,—
স্পর্দ্ধিত কুশ্রীতা নিত্য যতই করুক্ সিংহনাদ,
হে সতী সুন্দরী আনো তাহার নিঃশব্দ প্রতিবাদ॥
ভাদ্র, ১৩৩৫
প্রত্যাগত
প্রত্যাগত
দূরে গিয়েছিলে চলি’; বসন্তের আনন্দ ভাণ্ডার
তখনো হয়নি নিঃস্ব; আমার বরণ পুষ্পহার
তখনো অম্লান ছিল ললাটে তোমার। হে অধীর,
কোন্ অলিখিত লিপি দক্ষিণের উদ্ভ্রান্ত সমীর
এনেছিলো চিত্তে তব। তুমি গেলে বাঁশি ল’য়ে হাতে,
ফিরে দেখোনাই চেয়ে আমি ব’সে আপন বীণাতে
বাঁধিতেছিলাম সুর গুঞ্জরিয়া বসন্ত পঞ্চমে;
আমার অঙ্গনতলে আলো আর ছায়ার সঙ্গমে
কম্পমান আম্রতরু ক’রেছিলো চাঞ্চল্য বিস্তার
সৌরভ বিহ্বল শুক্লরাতে। সেই কুঞ্জ গৃহদ্বার
এতকাল মুক্ত ছিল। প্রতিদিন মোর দেহলিতে
আঁকিয়াছে আলিপনা। প্রতি সন্ধ্যা বরণডালিতে
গন্ধ তৈলে জ্বালায়েছি দীপ। আজি কতকাল পরে
যাত্রা তব হ’লো অবসান। হেথা ফিরিবার তরে
হেথা হ’তে গিয়েছিলে। হে পথিক, ছিল এ-লিখন
আমারে আড়াল ক’রে আমারে করিবে অন্বেষণ;
সুদূরের পথ দিয়ে নিকটেরে লাভ করিবারে
আহ্বান লভিয়াছিলে সখা। আমার প্রাঙ্গণ দ্বারে
যে-পথ করিলে সুরু সে-পথের এখানেই শেষ।
হে বন্ধু, কোরোনা লজ্জা, মোর মনে নাই ক্ষোভ লেশ,
নাই অভিমান তাপ। করিব না ভর্ৎসনা তোমায়;
গভীর বিচ্ছেদ আজি ভরিয়াছি অসীম ক্ষমায়।
আমি আজি নবতর বধূ; আজি শুভদৃষ্টি তব
বিরহ গুণ্ঠন তলে দেখে যেন মোরে অভিনব
অপূর্ব আনন্দরূপে, আজি যেন সকল সন্ধান
প্রভাতে নক্ষত্রসম শুভ্রতায় লভে অবসান।
আজি বাজিবে না বাঁশি, জ্বলিবে না প্রদীপের মালা,
পরিব না রক্তাম্বর; আজিকার উৎসব নিরালা
সর্ব্ব আভরণহীন। আকাশেতে প্রতিপদ চাঁদ
কৃষ্ণপক্ষ পার হ’য়ে পূর্ণতার প্রথম প্রসাদ
লভিয়াছে। দিক্প্রান্তে তারি ওই ক্ষীণ নম্র কলা
নীরবে বলুক আজি আমাদের সব কথা বলা।
২৭ পৌষ, ১৩৩৫
প্রত্যাশা
প্রত্যাশা
প্রাঙ্গণে মোর শিরীষশাখায় ফাগুন মাসে
কী উচ্ছ্বাসে
ক্লান্তিবিহীন ফুল-ফোটানোর খেলা!
ক্ষান্ত-কূজন শান্ত বিজন সন্ধ্যাবেলা
প্রত্যহ সেই ফুল্ল শিরীষ প্রশ্ন শুধায় আমায় দেখি’-
“এসেছে কি?”
আর বছরেই এম্নি দিনেই ফাগুন মাসে
কী উচ্ছ্বাসে
নাচের মাতন লাগ্লো শিরীষ ডালে,
স্বর্গপুরের কোন্ নূপুরের তালে!
প্রত্যহ সেই চঞ্চল প্রাণ শুধিয়েছিলো,—“শুনাও দেখি,
আসেনি কি?”
আবার কখন্ এম্নি দিনেই ফাগুন মাসে
কী আশ্বাসে
ডালগুলি তা’র রইবে শ্রবণ পেতে
অলখ জনের চরণশব্দে মেতে!
প্রত্যহ তা’র মর্মর স্বর ব’ল্বে আমায় কী বিশ্বাসে
“সে কি আসে?”
প্রশ্ন জানাই পুষ্প-বিভোর ফাগুন মাসে
কী আশ্বাসে,
হায় গো আমার ভাগ্যরাতের তারা,
নিমেষ-গণন হয় না কি মোর সারা?
প্রত্যহ বয় প্রাঙ্গণময় বনের বাতাস এলোমেলো,
“সে কি এলো?”
২৩ শ্রাবণ, ১৩৩৫
বন্দিনী
বন্দিনী
তুমি বনের পূব পবনের সাথী,
বাদল মেঘের পথে তোমার ডানার মাতামাতি।
ওগো পাখী, বাঁধনহারা পাখী,
খাঁচার কোণে এই বিজনে আপন মনে থাকি।
হায় অজানা, জানিনা সে
উধাও তুমি কোন্ আকাশে,
কোন্ তমালের কাননতলে মধ্যদিনের তাপে
বনচ্ছায়ার শিরায় শিরায় তোমারি সুর কাঁপে॥
কোন্ রঙনে রঙীন্ তোমার পাখা?
তোমার সোনার বরণখানি ভাবনাতে মোর আঁকা
ওগো পাখী, বাঁধনহারা পাখী,
মুক্ত রূপের ধ্যানের ছায়ায় মগ্ন আমার আঁখি।
বন্দী মনের বদ্ধ ডানা,
চতুর্দ্দিকে কঠোর মানা,
তোমার সাথে উড়ে চলার মিলন মাগি মনে,—
শূন্যে সদাই গান ফেরে তাই অসীম অন্বেষণে॥
গান গাওয়া মোর সেই মিলনের খেলা,
তোমার গানের ছন্দে আমার স্বপন পাখা মেলা।
ওগো পাখী, বাঁধনহারা পাখী,
মনে মনে তোমায় পরাই গানের গাঁথন রাখী।
আজি আমার সুরের মাঝে
দূরের ডানার শব্দ বাজে,
মেঘের পথিক গানে আমার এলো প্রাণের কূলে,
বিরহেরি আকাশতলে নিল আমায় তুলে॥
গানের হাওয়ায় নিকট মিলায় দূরে—
দূর আসে সেই হাওয়ায় প্রাণের নিকট অন্তঃপুরে।
ওগো পাখী, বাঁধনহারা পাখী,
তোমার গানের মরীচিকায় শূন্য যে দাও ঢাকি’।
বাঁধনে তাই জাদু লাগে,
বীণার তারে মূর্ত্তি জাগে,
রাগিণীতে মুক্তি সে দেয়, ওগো আমার দূর,
তোমার দেওয়া না-শোনা গান বাঁধে-যে তা’র সুর॥
৫ কার্ত্তিক, ১৩৩৫
বরণ
বরণ
পুরাণে ব’লেছে
একদিন নিয়েছিলো বেছে
স্বয়ম্বর সভাঙ্গনে দময়ন্তী সতী
নর-নরপতি,—
ছদ্মবেশী দেবতার মাঝে।
অর্ঘ্যহারা দেবতারা চ’লে গেল লাজে।
দেবমূর্ত্তি চিনেছে সে দিন,
তা’রা-যে ফেলে না ছায়া, তা’রা অমলিন।
সেদিন স্বর্গের ধৈর্য্য গেল টুটি’,
ইন্দ্রলোক করিল ভ্রূকুটি॥
তাই শুনে কত দিন একা ব’সে ব’সে
ভেবেছিনু বালিকা বয়সে,
আমি হবো স্বয়ম্বরা বিশ্ব সভাতলে,—
দেবতারি গলে
দিব মালা তপস্বিনী,
মানবের মাঝখানে একদিন লবো তা’রে চিনি’
তারি লাগি সর্ব্ব দেহে মনে
দিনে দিনে বরমাল্য গাঁথিব যতনে॥
কঠিন সে পণ,
ভাবিনি কেমনে তা’রে করিব সাধন।
মানুষ-যে দেশে দেশে
কত ফেরে দেবতার ছদ্মবেশে;
ললাটে তিলক কারো লেখা,
দেখিতে দেখিতে তা’র কালো হ’য়ে ওঠে স্বর্ণরেখা।
কারো বা কটিতে বাঁধা শরশূন্য তূণ,
কেহ করে বজ্রধ্বনি, নাহি তাহে বজ্রের আগুন।
বাতায়নে ব’সে থাকি,
কতদিন কী দেখিয়া আশ্বাসে চমকি’ উঠে আঁখি;
চেয়ে চেয়ে দ্বিধা লাগে শেষে
বৃষ্টি হ’তে হ’তে দেখি শিলা পড়ে এসে॥
একদিন রৌদ্রের বেলায়
মধ্যাহ্ণের জনতার মুখর মেলায়
রাজপথ পাশে
দাঁড়াইনু,—দেখিলাম যারা যায় আসে
তাহাদের কায়া
সম্মুখে ফেলিয়া চলে দীর্ঘতর ছায়া।
শুনিলাম স্পৰ্দ্ধা-তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর
ছিন্ন ক’রে দিতে চাহে দেবতার অখণ্ড অম্বর।
উজ্জ্বল সজ্জায়
দীন অঙ্গ সমাচ্ছন্ন ধনের লজ্জায়।
ছুটে চলে অশ্বরথ
তা’র চেয়ে আড়ম্বরে সঙ্গে ওড়ে ধূলির পর্ব্বত
যখন সেদিন সেই ঊৰ্দ্ধশ্বাস লুব্ধ ঠেলাঠেলি
নানাশকে উঠিছে উদ্বেলি’
তুমি দেখি পথ প্রান্তে একা হাস্যমুখে
নিঃশব্দ কৌতুকে
চেয়ে আছ—হৃদয় আছিল জনস্রোতে,
মন ছিল দূরে সবা হ’তে।
তুমি যেন মহাকাল-সমুদ্রের তটে
নিত্যের অসীম চিত্রপটে
দেখেছিলে চঞ্চলের চলমান ছবি,
শুনেছিলে ভৈরবের ধ্যানমাঝে উমার ভৈরবী।
ব’হে গেল জনতার ঢেউ,—
কে-যে তুমি কোথা আছ দেখে নাই কেউ
একা আমি দেখেছি তোমারে—
তুমিই ফেলোনি ছায়া ছায়ার মাঝারে।
মালা হাতে গেনু ধেয়ে,
হাসিলে আমার পানে চেয়ে।
মোর স্বয়ম্বরে
সেদিন মর্ত্ত্যের মুখ ভ্রূকুটিল অবজ্ঞার ভরে।
১০ ভাদ্র, ১৩৩৫
বরণডালা
বরণডালা
আজি এ নিরালা কুঞ্জে, আমার
অঙ্গমাঝে
বরণের ডালা সেজেছে আলোক-
মালার সাজে
নব বসন্তে লতায় লতায়
পাতায় ফুলে
বাণী হিল্লোল উঠে প্রভাতের
স্বর্ণকূলে,
আমার দেহের বাণীতে সে-দোল
উঠিছে দুলে,
এ বরণ-গান নাহি পেলে মান
মরিব লাজে,
ওহে প্রিয়তম, দেহে মনে মম
ছন্দ বাজে॥
অর্ঘ্য তোমার আনিনি ভরিয়া
বাহির হ’তে,
ভেসে আসে পূজা পূর্ণ প্রাণের
আপন স্রোতে।
মোর তনুময় উছলে হৃদয়
বাঁধনহারা,
অধীরতা তারি মিলনে তোমারি
হোক্ না সারা!
ঘন যামিনীর আঁধারে যেমন
ঝলিছে তারা,
দেহ ঘেরি মম প্রাণের চমক
তেমনি রাজে।
সচকিত আলো নেচে ওঠে মোর
সকল কাজে॥
২৫ শ্রাবণ, ১৩৩৫
বরযাত্রা
বরযাত্রা
পবন দিগন্তের দুয়ার নাড়ে,
চকিত অরণ্যের সুপ্তি কাড়ে।
যেন কোন্ দুর্দ্দম
বিপুল বিহঙ্গম
গগনে মুহুর্মুহু পক্ষ ঝাড়ে॥
পথপাশে মল্লিকা দাঁড়ালো আসি’,
বাতাসে সুগন্ধের বাজালো বাঁশি।
ধরার স্বয়ম্বরে
উদার আড়ম্বরে
আসে বর, অম্বরে ছড়ায়ে হাসি॥
অশোক রোমাঞ্চিত মঞ্জরিয়া
দিল তা’র সঞ্চয় অঞ্জলিয়া।
মধুকর-গুঞ্জিত
কিশলয়-পুঞ্জিত
উঠিল বনাঞ্চল চঞ্চলিয়া॥
কিংশুক-কুঙ্কুমে বসিল সেজে,
ধরণীর কিঙ্কিণী উঠিল বেজে।
ইঙ্গিতে সঙ্গীতে
নৃত্যের ভঙ্গীতে
নিখিল তরঙ্গিত উৎসবে-যে॥
দোল পূর্ণিমা, ১৩৩৪
বসন্ত
বসন্ত
ওগো বসন্ত, হে ভুবনজয়ী,
বাজে বাণী তব মাভৈঃ মাভৈঃ,
বন্দীরা পেলো ছাড়া।
দিগন্ত হ’তে শুনি’ তব সুর
মাটি ভেদ করি’ উঠে অঙ্কুর,
কারাগারে দিল নাড়া।
জীবনের রণে নব অভিযানে
ছুটিতে হবে-যে নবীনেরা জানে,
দলে দলে আসে আমের মুকুল
বনে বনে দেয় সাড়া॥
কিশলয়-দল হ’লো চঞ্চল,
উতল প্রাণের কল-কোলাহল
শাখায় শাখায় উঠে।
মুক্তির গানে কাঁপে চারিধার,
কাণা দানবের মানা-দেওয়া দ্বার
আজ গেল সব টুটে।
মরু-যাত্রার পাথেয়-অমৃতে
পাত্র ভরিয়া আসে চারিভিতে
অগণিত ফুল, গুঞ্জন-গীতে
জাগে মৌমাছি-পাড়া॥
ওগো বসন্ত, হে ভুবনজয়ী,
দুর্গ কোথায়, অস্ত্র বা কই,
কেন সুকুমার বেশ?
মৃত্যুদমন শৌর্য আপন
কী মায়ামন্ত্রে করিলে গোপন,
তূর্ণ তব নিঃশেষ।
বর্ম্ম তোমার পল্লবদলে,
আগ্নেয় বাণ বনশাখাতলে
জ্বলিছে শ্যামল শীতল অনলে
সকল তেজের বাড়া॥
জড় দৈত্যের সাথে অনিবার
চির সংগ্রাম ঘোষণা তোমার
লিখিছ ধূলির পটে,
মনোহর রঙে লিপি ভূমিতলে
যুদ্ধের বাণী বিস্তারি’ চলে
সিন্ধুর তটে তটে।
হে অজেয়, তব রণভূমি ’পরে
সুন্দর তা’র উৎসব করে,
দক্ষিণ বায়ু মর্ম্মর স্বরে
বাজায় কাড়া নাকাড়া॥
দোল পূর্ণিমা, ১৩৩৪
বাপী
বাপী
একদা বিজনে যুগল তরুর মূলে
তৃষ্ণার জল তুমি দিয়েছিলে তুলে।
আর কোনোখানে ছায়া নাহি দেখি,
শুধালেম, কাছে বসিতে দিবে কি?
সেদিন তোমার ঘরে ফিরিবার বেলা
ব’হে গেল বুঝি, কাজে হ’য়ে গেল হেলা॥
অদূরে হোথায় ভাঙা দেউলের ধারে
পূর্ব্বযুগের পূজাহীন দেবতারে
প্রভাত অরুণ প্রতিদিন খোঁজে,
শূন্য বেদীর অর্থ না বোঝে,
দিন শেষ হ’লে সন্ধ্যাতারার আলো
যে-পূজারী নাই তা’রে বলে “দীপ জ্বালো”॥
একদিন বুঝি দূরে কোন্ রাজধানী
রচনা ক’রেছে দীর্ঘ এ পথখানি।
আজি তা’র নাম নাই ইতিহাসে,
জীর্ণ হ’য়েছে বালুকার গ্রাসে,
প্রান্তর-শেষে শীর্ণ বনের কোলে
জনপদবধূ জল নিয়ে যায় চ’লে॥
লুপ্তকালের শুষ্ক সাগর ধারে
বহু বিস্মৃতি যেথা হয় স্তূপাকারে,
অতি পুরাতন কাহিনী যেথায়
রুদ্ধ কণ্ঠে শূন্যে তাকায়,
হারানো ভাষার নিশার স্বপ্ন ছায়ে
হেরিনু তোমায় আসিনু ক্লান্ত পায়ে॥
শুধু দুটি তরু মরুর প্রাণের কথা,
লুকানো কী রসে বাঁচে তা’র শ্যামলতা।
সেদিন তাহারি মর্ম্মের সনে
কী ব্যথা মিশানু, জানে দুইজনে;
মাথার উপরে উড়ে গেল কোন্ পাখী
হতাশ পাখার হাহাকার রেখা আঁকি’॥
তপ্ত বালুরে ভর্ৎসিয়া মুহু মুহু
তাপিত বাতাস চিৎকারি’ উঠে হুহু;
ধূলির ঘূর্ণি, যেন বেঁকে বেঁকে
শাপ-লাগা প্রেত নাচে থেকে থেকে;
রূঢ় রুদ্র রিক্তের মাঝখানে
দুইটি প্রহর ভ’রেছিনু প্রাণে গানে॥
দিন শেষ হ’লো, চ’লে যেতে হ’লো একা,
বলিনু তোমারে, আরবার হবে দেখা,
শুনে হেসেছিলে হাসিখানি ম্লান,
তরুণ হৃদয়ে যেন তুমি জানো
অসীমের বুকে অনাদি বিষাদখানি
আছে সারাখন মুখে আবরণ টানি’॥
তার পরে কত দিন চ’লে গেল মিছে
একটি দিনের দলিয়া পায়ের নীচে।
বহু পরে যবে ফিরিলাম, প্রিয়ে,
এ-পথে আসিতে দেখি চমকিয়ে
আছে সেই কূপ, আছে সে যুগলতরু
তুমি নাই, আছে তৃষিত স্মৃতির মরু॥
এ কূপের তলে মোর যক্ষের ধন
একটি দিনের দুর্লভ সেইক্ষণ
চিরকাল ভরি’ রহিল লুকানো,
ওগো অগোচরা জানো নাহি জানো;
আর কোনো দিনে অন্য যুগের প্রিয়া
তা’রে আর কারে দিবে কি উদ্ধারিয়া?
১৬ ভাদ্র, ১৩৩৫
বাসর ঘর
বাসর ঘর
তােমারে ছাড়িয়ে যেতে হবে
রাত্রি যবে
উঠিবে উন্মনা হ’য়ে প্রভাতের রথচক্র-রবে।
হায়রে বাসর ঘর,
বিরাট বাহির সে-যে বিচ্ছেদের দস্যু ভয়ঙ্কর।
তবু সে যতই ভাঙে চোরে
মালা-বদলের হার যত দেয় ছিন্ন ছিন্ন ক’রে,
তুমি আছ ক্ষয় হীন
অনুদিন;
তােমার উৎসব
বিচ্ছিন্ন না হয় কভু না হয় নীরব।
কে বলে তােমারে ছেড়ে গিয়েছে যুগল
শূন্য করি’ তব শয্যাতল?
যায় নাই, যায় নাই,
নব নব যাত্রী মাঝে ফিরে ফিরে আসিছে তা’রাই
তােমার আহ্বানে
উদার তােমার দ্বার পানে।
হে বাসর ঘর,
বিশ্বে প্রেম মৃত্যুহীন, তুমিও অমর॥
* আষাঢ়, ১৩৩৫
বিচ্ছেদ
বিচ্ছেদ
রাত্রি যবে সাঙ্গ হ’লো, দূরে চলিবারে
দাঁড়াইলে দ্বারে।
আমার কণ্ঠের যত গান
করিলাম দান।
তুমি হাসি’
মাের হাতে দিলে তব বিরহের বাঁশি।
তা’র পরদিন হ’তে
বসন্তে শরতে
আকাশে বাতাসে উঠে খেদ,
কেঁদে কেঁদে ফিরে বিশ্বে বাঁশি আর গানের বিচ্ছেদ
৯ আষাঢ়, ১৩৩৫
বিজয়ী
বিজয়ী
বিবশ দিন, বিরস কাজ,
কে কোথা ছিনু দোঁহে,
সহসা প্রেম আসিলে আজ
কী মহা সমারােহে!
নীরবে রয় অলস মন,
আঁধারময় ভবনকোণ,
ভাঙিলে দ্বার কোন্ সে ক্ষণ
অপরাজিত ওহে!
সহসা প্রেম আসিলে আজ
বিপুল বিদ্রোহে।
কাননপর ছায়া বুলায়
ঘনায় ঘনঘটা।
গঙ্গা যেন হেসে দুলায়
ধূর্জ্জটীর জটা।
যে যেথা রয় ছাড়িল পথ,
ছুটালে ঐ বিজয়-রথ,
আঁখি তােমার তড়িৎবৎ
ঘন ঘুমের মােহে।
সহসা প্রেম আসিলে আজ
বেদনা-দান ব’হে॥
বৈশাখ, ১৩৩৩
বিদায়
বিদায়
কালের যাত্রার ধ্বনি শুনিতে কি পাও
তারি রথ নিত্যই উধাও
জাগাইছে অন্তরীক্ষে হৃদয়-স্পন্দন,
চক্রে পিষ্ট আঁধারের বক্ষ-ফাটা তারার ক্রন্দন
ওগো বন্ধু,
সেই ধাবমান কাল
জড়ায়ে ধরিল মোরে ফেলি’ তা’র জাল,—
তুলে নিল দ্রুতরথে
দুঃসাহসী ভ্রমণের পথে
তোমা হ’তে বহু দূরে।
মনে হয় অজস্র মৃত্যুরে
পার হ’য়ে আসিলাম
আজি নবপ্রভাতের শিখরচূড়ায়,
রথের চঞ্চল বেগ হাওয়ায় উড়ায়
আমার পুরানো নাম।
ফিরিবার পথ নাহি;
দূর হ’তে যদি দেখো চাহি’
পারিবে না চিনিতে আমায়
হে বন্ধু, বিদায়॥
কোনোদিন কর্ম্মহীন পূর্ণ অবকাশে,
বসন্ত বাতাসে
অতীতের তীর হ’তে যে-রাত্রে বহিবে দীর্ঘশ্বাস,
ঝরা বকুলের কান্না ব্যথিবে আকাশ,
সেইক্ষণে খুঁজে দেখো, কিছু মোর পিছে রহিল সে
তোমার প্রাণের প্রান্তে; বিস্মৃতপ্রদোষে
হয়তো দিবে সে জ্যোতি,
হয়তো ধরিবে কভু নামহারা স্বপ্নের মূরতি।
তবু সে তো স্বপ্ন নয়,
সব চেয়ে সত্য মোর, সেই মৃত্যুঞ্জয়,
সে আমার প্রেম।
তা’রে আমি রাখিয়া এলেম
অপরিবর্ত্তন অর্ঘ্য তোমার উদ্দেশে।
পরিবর্ত্তনের স্রোতে আমি যাই ভেসে
কালের যাত্রায়।
হে বন্ধু, বিদায়॥
তোমার হয়নি কোনো ক্ষতি
মর্ত্ত্যের মৃত্তিকা মোর, তাই দিয়ে অমৃত মূরতি
যদি সৃষ্টি ক’রে থাকো, তাহারি আরতি
হোক্ তব সন্ধ্যাবেলা,
পূজার সে খেলা
ব্যাঘাত পাবে না মোর প্রত্যহের ম্লান স্পর্শ লেগে;
তৃষার্ত্ত আবেগ-বেগে
ভ্রষ্ট নাহি হবে তা’র কোনো ফুল নৈবেদ্যের থালে।
তোমার মানস-ভোজে সযত্নে সাজালে
যে-ভাব-রসের পাত্র বাণীর তৃষায়,
তা’র সাথে দিব না মিশায়ে
যা মোর ধূলির ধন, যা মোর চক্ষের জলে ভিজে।
আজো তুমি নিজে
হয়তো বা করিবে রচন
মোর স্মৃতিটুকু দিয়ে স্বপ্নবিষ্ট তোমার বচন।
ভার তা’র না রহিবে, না রহিবে দায়।
হে বন্ধু, বিদায়॥
মোর লাগি’ করিয়ো না শোক,
আমার র’য়েছে কর্ম্ম, আমার র’য়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যেরে করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।
উৎকণ্ঠ আমার লাগি’ কেহ যদি প্রতীক্ষিয়া থাকে
সেই ধন্য করিবে আমাকে।
শুক্লপক্ষ হ’তে আনি’
রজনীগন্ধার বৃন্তখানি
যে পারে সাজাতে
অর্ঘ্যথালা কৃষ্ণপক্ষ রাতে,
যে আমারে দেখিবারে পায়
অসীম ক্ষমায়
ভালোমন্দ মিলায়ে সকলি,
এবার পূজায় তারি আপনারে দিতে চাই বলি।
তোমারে যা দিয়েছিনু, তা’র
পেয়েছো নিঃশেষ অধিকার।
হেথা মোর তিলে তিলে দান,
করুণ মুহূর্তগুলি গণ্ডূষ ভরিয়া করে পান
হৃদয়-অঞ্জলি হ’তে মম
ওগো তুমি নিরুপম,
হে ঐশ্বর্য্যবান,
তোমারে যা দিয়েছিনু সে তোমারি দান;
গ্রহণ ক’রেছো যত ঋণী তত ক’রেছো আমায়,
হে বন্ধু, বিদায়॥
* আষাঢ়, ১৩৩৫
বিদায় সম্বল
বিদায় সম্বল
যাবার দিকের পথিকের ’পরে
ক্ষণিকের স্নেহখানি
শেষ উপহার করুণ অধরে
দিল কানে কানে আনি’।
“ভুলিব না কভু র’বে মনে মনে”
এই মিছে আশা দেয় খনে খনে,
ছলছল ছায়া নবীন নয়নে
বাধোবাধো মৃদু বাণী॥
যাবার দিকের পথিক সে-কথা
ভরি’ লয় তা’র প্রাণে।
পিছনের এই শেষ আকুলতা
পাথেয় বলি’ সে জানে।
যখন আঁধারে ভরিবে সরণী,
ভুলে-ভরা ঘুমে নীরব ধরণী,
“ভুলিব না কভু”-এই ক্ষীণধ্বনি
তখনো বাজিবে কানে॥
যাবার দিকের পথিক সে বোঝে,
যে যায় সে যায় চ’লে,
যারা থাকে তা’রা এ উহারে খোঁজে,
যে যায় তাহারে ভোলে।
তবুও নিজেরে ছলিতে ছলিতে
বাঁশি বাজে মনে চলিতে চলিতে,
“ভুলিব না কভু” বিভাসে ললিতে
এই কথা বুকে দোলে॥
৩ ভাদ্র, ১৩৩৪
বিরহ
বিরহ
শঙ্কিত আলোক নিয়ে দিগন্তে উদিল শীর্ণ শশী,
অরণ্যে শিরীষশাখে অকস্মাৎ উঠিল উচ্ছ্বসি’
বসন্তের হাওয়ার খেয়াল,
ব্যথায় নিবিড় হ’লো শেষবাক্য বলিবার কাল।
গোধূলির গীতিশূন্য স্তম্ভিত প্রহরখানি বেয়ে
শান্ত হ’লো শেষ দেখা,—নির্নিমেষ রহিলাম চেয়ে।
ধীরে ধীরে বনান্তে মিলালো
প্রান্তরের প্রান্ততটে অস্তশেষ ক্ষীণ পাংশু আলো॥
যে-দ্বার খুলিয়া গেলে রুদ্ধ সে হবে না কোনোমতে
কান পাতি র’বে তব ফিরিবার প্রত্যাশার পথে,
তোমার অমূর্ত্ত আসা-যাওয়া
যে-পথে চঞ্চল করে দিগ্বালার অঞ্চলের হাওয়া॥
বসন্তে মাঘের অন্তে আম্রবনে মুকুল-মত্ততা
মধুর গুঞ্জনে মিশি’ আনে কোন্ কানে কানে কথা।
মোর নাম তব কণ্ঠে ডাকা
শান্ত আজি তাপক্লান্ত দিনান্তের মৌন দিয়ে ঢাকা॥
সঙ্গহীন স্তব্ধতার সুগম্ভীর নিবিড় নিভৃতে
বাক্যহারা চিত্তে মোর এতদিনে পাইনু শুনিতে,
তুমি কবে মর্ম্মমাঝে পশি’
আপন মহিমা হ’তে রেখে গেলে বাণী মহীয়সী॥
২৬ আষাঢ়, ১৩৩৫
বোধন
বােধন
মাঘের সূর্য্য উত্তরায়ণে
পার হ’য়ে এলো চলি’,
তা’র পানে হায় শেষ চাওয়া চায়
করুণ কুন্দকলি।
উত্তর বায় একতারা তা’র
তীব্র নিখাদে দিল ঝঙ্কার,
শিথিল যা ছিল তা’রে ঝরাইল
গেল তা’রে দলি’ দলি’
শীতের রথের ঘূর্ণি ধূলিতে
গোধুলিরে করে ম্লান।
তাহারি আড়ালে নবীন কালের
কে আসিছে সে কি জানো?
বনে বনে তাই আশ্বাসবাণী
করে কানাকানি “কে আসে কি জানি,”
বলে মর্ম্মরে “অতিথির তরে
অর্ঘ্য সাজায়ে আনো।”
নির্ম্মম শীত তারি আয়োজনে
এসেছিলো বনপারে।
মার্জ্জিয়া দিল শ্রান্তি ক্লান্তি,
মার্জ্জনা নাহি কারে।
ম্লান চেতনার আবর্জ্জনায়
পান্থের পথে বিঘ্ন ঘনায়,
নবযৌবনদূতরূপী শীত
দূর করি দিল তা’রে
ভরা পাত্রটি শূন্য করে সে
ভরিতে নূতন করি’।
অপব্যয়ের ভয় নাহি তা’র
পূর্ণের দান স্মরি’।
অলসভোগের গ্লানি সে ঘুচায়,
মৃত্যুর স্নানে কালিমা মুছায়,
চির-পুরাতনে করে উজ্জ্বল
নূতন চেতনা ভরি’॥
নিত্যকালের মায়াবী আসিছে
নব পরিচয় দিতে।
নবীন রূপের অপরূপ জাদু
আনিবে সে ধরণীতে।
লক্ষ্মীর দান নিমেষে উজাড়ি’
নির্ভয় মনে দূরে দেয় পাড়ি,
নব বর সেজে চাহে লক্ষ্মীরে
ফিরে জয় ক’রে নিতে
বাঁধন ছেঁড়ার সাধন তাহার
সৃষ্টি তাহার খেলা।
দস্যুর মতো ভেঙে চুরে দেয়
চিরাভ্যাসের মেলা।
মূল্যহীনেরে সোনা করিবার
পরশপাথর হাতে আছে তা’র,
তাইতো প্রাচীন সঞ্চিত ধনে
উদ্ধত অবহেলা॥
বলো “জয় জয়,” বলো “নাহি ভয়”;—
কালের প্রয়াণপথে
আসে নির্দ্দয় নবযৌবন
ভাঙনের মহারথে।
চিরন্তনের চঞ্চলতায়
কাঁপন লাগুক লতায় লতায়,
থর থর করি’ উঠুক পরাণ
প্রান্তরে পর্ব্বতে॥
বার্ত্তা ব্যাপিল পাতায় পাতায়
“করো ত্বরা, করো ত্বরা।
সাজাক পলাশ আরতিপাত্র
রক্ত প্রদীপে ভরা।
দাড়িম্ববন প্রচুর পরাগে
হোক প্রগল্ভ রক্তিমরাগে,
মাধবিকা হোক সুরভি সোহাগে
মধুপের মনোহরা॥”
কে বাঁধে শিথিল বীণার তন্ত্র
কঠোর যতন ভরে,
ঝঙ্কারি’ উঠে অপরিচিতার
জয়সঙ্গীতস্বরে।
নগ্ন শিমূলে কার ভাণ্ডার,
রক্ত দুকূল দিল উপহার,
দ্বিধা না রহিল বকুলের আর
রিক্ত হবার তরে॥
দেখিতে দেখিতে কী হ’তে কী হ’লো
শূন্য কে দিল ভরি’।
প্রাণবন্যায় উঠিল ফেনায়ে
মাধুরীর মঞ্জরী।
ফাগুনের আলো সোনার কাঠিতে
কী মায়া লাগালো, তাইতো মাটিতে
নবজীবনের বিপুল ব্যথায়
জাগো শ্যামাসুন্দরী॥
দোল পূর্ণিমা, ১৩৩৪
ভাবিনী
ভাবিনী
ভাবিছ যে-ভাবনা একা-একা
দুয়ারে বসি’ চুপে চুপে
সে যদি সম্মুখে দিত দেখা
মূর্ত্তি ধরি’ কোনো রূপে—
হয়তো দেখিতাম শুকতারা
দিবস পার হ’য়ে দিশাহারা
এসেছে সন্ধ্যার কিনারাতে
সাঁঝের তারাদের দলে,
উদাস স্মৃতিভরা আঁখিপাতে
উষার হিমকণা জ্বলে।
হয়তো দেখিতাম বাদলে যে
এনেছিলো শ্রাবণে বাণী
শরতে জলভার এলো ত্যেজে
শুভ্র সেই মেঘখানি।
চলে সে সন্ন্যাসী দিশে দিশে
রবির আলোকের পিয়াসী সে;
আকাশ আপনারি লিপি লিখে’
পড়িতে দিল যেন তা’রে,
সে তাই চেয়ে চেয়ে অনিমিখে
বুঝিতে বুঝি নাহি পারে।
হয়তো দেখিতাম রজনীতে
সে যেন সুরহারা বীণা
বিজন দীপহীন দেহলিতে
মৌন মাঝে আছে লীনা।
একদা বেজেছিলো যে-রাগিণী
তা’রে সে ফিরে যেন নিল চিনি’
তারার কিরণের কম্পনে
নীরব আকাশের মাঝে,
সুদুর সুরসভা-অঙ্গনে
সুরের স্মৃতি যেথা বাজে!
১৫ আশ্বিন, ১৩৩৫
মহুয়া
মহুয়া
বিরক্ত আমার মন কিংশুকের এত গর্ব্ব দেখি’।
নাহি ঘুচিবে কি
অশোকের অতি-খ্যাতি, বকুলের মুখর সম্মান?
ক্লান্ত কি হবে না কবি গান
মালতীর মল্লিকার
অভ্যর্থনা রচি’ বারম্বার?
রে মহুয়া, নামখানি গ্রাম্য তোর, লঘুধ্বনি তা’র,
উচ্চশিরে তবু রাজকুল-বণিতার
গৌরব রাখিস্ ঊর্দ্ধে ধ’রে।
আমি তো দেখেছি তোরে
বনস্পতি গোষ্ঠীমাঝে অরণ্যসভায়
অকুণ্ঠিত মর্য্যাদায়
আছিস্ দাঁড়ায়ে;
শাখা যত আকাশে বাড়ায়ে
শাল তাল সপ্তপর্ণ অশ্বত্থের সাথে
প্রথম প্রভাতে
সূর্য্য অভিনন্দনের তুলেছিস্ গম্ভীর বন্দন
অপ্রসন্ন আকাশের ভ্রূভঙ্গে যখন
অরণ্য উদ্বিগ্ন করি’ তোলে,
সেই কালবৈশাখীর ক্রুদ্ধ কলরোলে
শাখাব্যূহে ঘিরে
অশ্বাস করিস্ দান শঙ্কিত বিহঙ্গ অতিথিরে
অনাবৃষ্টি-ক্লিষ্ট দিনে,
বিশীর্ণ বিপিনে,
বন্যবুভুক্ষুর দল রিক্ত পথে,
দুর্ভিক্ষের ভিক্ষাঞ্জলি ভরে তা’রা তোর সদাব্রতে॥
বহুদীর্ঘ সাধনায় সুদৃঢ় উন্নত
তপস্বীর মতো
বিলাসের চাঞ্চল্যবিহীন,
সুগম্ভীর সেই তোরে দেখিয়াছি অন্যদিন
অন্তরে অধীরা
ফাল্গুনের ফুলদোলে কোথা হ’তে জাগাস্ মদিরা
পুষ্পপুটে;
বনে বনে মৌমাছিরা চঞ্চলিয়া উঠে।
তোর সুরাপাত্র হ’তে বন্যনারী
সম্বল সংগ্রহ করে পূণিমার নৃত্য-মত্ততারি।
রে অটল, রে কঠিন,
কেমনে গোপনে রাত্রিদিন
তরল যৌবনবহ্ণি মজ্জায় রাখিয়াছিলি ভ’রে!
কানে কানে কহি তোরে
বধূরে যেদিন পাবো, ডাকিব মহুয়া নাম ধ’রে
১৮ ভাদ্র, ১৩৩৫
মাধবী
মাধবী
বসন্তের জয়রবে
দিগন্ত কাঁপিল যবে
মাধবী করিল তা’র সজ্জা।
মুকুলের বন্ধ টুটে
বাহিরে আসিল ছুটে
ছুটিল সকল তা’র লজ্জা।
অজানা পান্থের লাগি’
নিশি নিশি ছিল জাগি’
দিনে দিনে ভ’রেছিলাে অর্ঘ্য
কাননের এক ভিতে
নিভৃত পরাণটিতে
রেখেছিলো মাধবীর স্বর্গ।
ফাল্গুন পবন-রথে
যখন বনের পথে
জাগালো মর্ম্মর কলছন্দ
মাধবী সহসা তা’র
সঁপি দিল উপহার,
রূপ তা’র, মধু তা’র, গন্ধ॥
দোলপূর্ণিমা, ১৩৩৪
মায়া
মায়া
চিত্তকোণে ছন্দে তব
বাণীরূপে
সঙ্গোপনে আসন লবো
চুপে চুপে।
সেইখানেতেই আমার অভিসার,
যেথায় অন্ধকার
ঘনিয়ে আছে চেতন বনের
ছায়াতলে,
যেথায় শুধু ক্ষীণ জোনাকির
আলো জ্বলে॥
সেথায় নিয়ে যাবো আমার
দীপশিখা,
গাঁথ্বো আলো-আঁধার দিয়ে
মরীচিকা।
মাথা থেকে খোঁপার মালা খুলে
পরিয়ে দেবো চুলে;
গন্ধ দিবে সিন্ধুপারের
কুঞ্জবীথির,
আন্বে ছবি কোন্ বিদেশের
কী বিস্মৃতির॥
পরশ মম লাগ্বে তোমার
কেশে বেশে,
অঙ্গে তোমার রূপ নিয়ে গান
উঠ্বে ভেসে।
ভৈরবীতে উচ্ছল গান্ধার,
বসন্ত বাহার,
পূরবী কি ভীমপলাশী
রক্তে দোলে—
রাগরাগিণী দুঃখে সুখে,
যায়-যে গ’লে॥
হাওয়ায় ছায়ায় আলোয় গানে
আমরা দোঁহে
আপন মনে র’চ্বো ভুবন
ভাবের মোহে।
রূপের রেখায় মিল্বে রসের রেখা,
মায়ার চিত্রলেখা,—
বস্তু-চেয়ে সেই মায়া তো
সত্যতর,
তুমি আমায় আপ্নি র’চে
আপন করো॥
২৪ শ্রাবণ, ১৩৩৫
মালিনী
মালিনী
হাসি-মুখ নিয়ে যায় ঘরে ঘরে,
সখীদের অবকাশ মধু দিয়ে ভরে।
প্রসন্নতা তা’র অন্তহীন
রাত্রিদিন
গভীর কী উৎস হ’তে
উচ্ছলিছে আলাে-ঝলা কথা-বলা স্রোতে।
মর্ত্ত্যের ম্লানতা তা’রে
পারেনি তাে স্পর্শ করিবারে।
প্রভাতে সে দেখা দিলে মনে হয় যেন সূর্য্যমুখী
রক্তারুণ উল্লাসে কৌতুকী।
মধ্যাহ্নের স্থলপদ্ম অমলিন রাগে
প্রফুল্ল সে সূর্য্যের সােহাগে,
সায়াহ্নের জুঁই সে-যে,
গন্ধে যার প্রদোষের শূন্যতায় বাঁশি ওঠে বেজে।
মৈত্রী-সুধাময় চোখে
মাধুরী মিশায়ে দেয় সন্ধ্যা-দীপালােকে।
রজনীগন্ধা সে রাতে, দেয় পরকাশি’
আনন্দ-হিল্লোল রাশি রাশি;
সঙ্গহীন আঁধারের নৈরাশ্যক্ষালিনী,—
—নাম কি মালিনী?
মিলন
মিলন
সৃষ্টির প্রাঙ্গণে দেখি বসন্তে অরণ্যে ফুলে ফুলে
দুটিরে মিলানো নিয়ে খেলা।
রেণুলিপি বহি’ বায়ু প্রশ্ন করে মুকুলে মুকুলে
কবে হবে ফুটিবার বেলা?
তাই নিয়ে বর্ণচ্ছটা, চঞ্চলতা শাখায় শাখায়,
সুন্দরের ছন্দ বহে প্রজাপতি পাখায় পাখায়,
পাখীর সঙ্গীত সাথে বন হ’তে বনান্তরে ধায়
উচ্ছ্বসিত উৎসবের মেলা॥
সৃষ্টির সে-রঙ্গ আজি দেখি মানবের লোকালয়ে
দুজনায় গ্রন্থির বাঁধন।
অপূর্ব্ব জীবন তাহে জাগিবে বিচিত্র রূপ ল’য়ে
বিধাতার আপন সাধন।
ছেড়েছে সকল কাজ, রঙীন বসনে ওরা সেজে
চলেছে প্রান্তর বেয়ে, পথে পথে বাঁশি চলে বেজে,
পুরানো সংসার হ’তে জীর্ণতার সব চিহ্ণ মেজে
রচিল নবীন আচ্ছাদন॥
যাহা সব-চেয়ে সত্য সব-চেয়ে খেলা যেন তাই,
যেন সে ফাল্গুন কলোল্লাস।
যেন তাহা নিঃসংশয়, মর্ত্ত্যের ম্লানতা যেন নাই,
দেবতার যেন সে উচ্ছ্বাস।
সহজে মিশেছে তাই আত্মভোলা মানুষের সনে
আকাশের আলো আজি গোধূলির রক্তিম লগনে,
বিশ্বের রহস্যলীলা মানুষের উৎসব প্রাঙ্গণে
লভিয়াছে আপন প্রকাশ॥
বাজা তোরা বাজা বাঁশি, মৃদঙ্গ উঠুক্ তালে মেতে
দুরন্ত নাচের নেশা-পাওয়া।
নদীপ্রান্তে তরুগুলি ঐ দেখ্ আছে কান পেতে,
ঐ সূর্য্য চাহে শেষ চাওয়া।
নিবি তোরা তীর্থবারি সে-অনাদি উৎসের প্রবাহে
অনন্তকালের বক্ষ নিমগ্ন করিতে যাহা চাহে
বর্ণে গন্ধে রূপে রসে, তরঙ্গিত সঙ্গীত উৎসাহে
জাগায় প্রাণের মত্ত হাওয়া॥
সহস্র দিনের মাঝে আজিকার এই দিনখানি
হ’য়েছে স্বতন্ত্র চিরন্তন।
তুচ্ছতার বেড়া হ’তে মুক্তি তা’রে কে দিয়েছে আনি’
প্রত্যহের ছিঁড়েছে বন্ধন।
প্রাণ-দেবতার হাতে জয় টীকা প’রেছে সে ভালে,
সূর্য্য তারকার সাথে স্থান সে পেয়েছে সমকালে,
সৃষ্টির প্রথম বাণী যে-প্রত্যাশা আকাশে জাগালে
তাই এলো করিয়া বহন॥
২০ আশ্বিন, ১৩৩৫
মুক্তরূপ
মুক্তরূপ
তোমারে আপন কোণে স্তব্ধ করি যবে
পূর্ণরূপে দেখিনা তোমায়,
মোর রক্ততরঙ্গের মত্ত কলরবে।
বাণী তব মিশে ভেসে যায়।
তোমার পাখারে আমি রুদ্ধ করি বুঝি,
সে-বন্ধনে তোমাবেই পাই না তো খুঁজি’,
তুমি তো ছায়ার নহ, প্রভাত-বিলাসী,
আলোতেই তোমার প্রকাশ,
তোমার ডানার ছন্দে তব উচ্চ হাসি
যাক্ চ’লে ভেদিয়া আকাশ॥
জানি, যদি লুব্ধ মনে কৃপণতা করি,
ঐশ্বর্য্যেও দৈন্য না ঘুচায়,
ব্যর্থ ভাণ্ডারের তবে রহিব প্রহরী,
বঞ্চনা করিব আপনায়।
আত্মা যেথা লুপ্ত থাকে সেথা উপচ্ছায়া
মুগ্ধ চেতনার ’পরে রচে তা’র মায়া,
তাই নিয়ে ভুলাবে কি আমার জীবন?
গাঁথিব কি বুদ্বুদের হার?
তোমারে আড়াল ক’রে তোমার স্বপন
মিটাবে কি আকাঙ্ক্ষা আমার?
বিরাজে মানব-শৌর্য্যে সূর্য্যের মহিমা,
মর্ত্ত্যে সে তিমির-জয়ী প্রভু,
অজেয় আত্মার রশ্মি, তা’রে দিবে সীমা
প্রেমের সে ধর্ম্ম নহে কভু।
যাও চলি রণক্ষেত্রে, লও শঙ্খ তুলি’,
পশ্চাতে উডুক্ তব রথচক্রধূলি,
নির্দয় সংগ্রাম অন্তে মৃত্যু যদি আসি’
দেয় ভালে অমৃতের টীকা
জানি যেন সে-তিলকে উঠিল প্রকাশি’
আমারো জীবন-জয়-লিখা॥
আমার প্রাণের শক্তি প্রাণে তব লহো;
মোর দুঃখ-যজ্ঞের শিখায়
জ্বলিবে মশাল তব, আতঙ্ক-দুঃসহ।
রাত্রিরে দহি’ সে যেন যায়।
তোমারে করিনু দান শ্রদ্ধার পাথেয়,
যাত্রা তব ধন্য হোক্, যাহা কিছু হেয়
ধূলিতলে হোক্ ধূলি, দ্বিধা যাক্ মরি’,
চরিতার্থ হোক্ ব্যর্থতাও,
তোমার বিজয়মাল্য হ’তে ছিন্ন করি’
আমারে একটি পুষ্প দাও॥
১৩ ভাদ্র, ১৩৩৫
মুক্তি
মুক্তি
ভোরের পাখী নবীন আঁখি দুটি
পুরানো মোর স্বপন-ডোর
ছিঁড়িল কুটি কুটি।
রুদ্ধ মন গগনে গেল খুলি’,
বিজুলি হানি’ দৈববাণী
বক্ষে উঠে দুলি’।
ঘাসের ছোঁওয়া তৃণশয়ন ছায়ে
মাটির যেন মর্ম্মকথা বুলায়ে দিল গায়ে
আমের বোল, ঝাউয়ের দোল,
ঢেউয়ের লুটোপুটি
মিলি সকলে কী কোলাহলে
বক্ষে এলো জুটি’॥
ভোরের পাখী নবীন আঁখি দুটি
গুহাবিহারী ভাবনা যত
নিমেষে নিল লুটি’।
কী ইঙ্গিতে আচম্বিতে
ডাকিল লীলাভরে
দুয়ার-খোলা পুরানো খেলা-ঘরে।
যেখানে ব’সে সবার কাছাকাছি।
অজানা ভাবে অবুঝ গান
একদা গাহিয়াছি।
প্রাণের মাঝে ছুটে-চলার
ক্ষ্যাপামি এলো ছুটি’,
লাভের লোভ, ক্ষতির ক্ষোভ
সকলি গেল টুটি’॥
ভোরের পাখী নবীন আঁখি দুটি
শুকতারাকে যেমনি ডাকে
প্রাণে সে উঠে ফুটি’।
অরুণ-রাঙা চেতনা জাগে চিতে—
ঝুম্কো-লতা জানায় কথা
রঙীন রাগিণীতে।
মনের ’পরে খেলায় বায়ুবেগে
কত-যে মায়া রঙের ছায়া
খেয়ালে-পাওয়া মেঘে;
বুলায় বুকে ম্যাগ্নোলিয়া
কৌতূহলী মুঠি,
অতি বিপুল ব্যাকুলতায়
নিখিলে জেগে উঠি’॥
২৭ শ্রাবণ, ১৩৩৫
মূরতী
মুরতী
যে-শক্তির নিত্যলীলা নানা বর্ণে আঁকা;
যে-গুণী প্রজাপতির পাখা
যুগ যুগ ধ্যান করি’ একদা কী খনে
রচিল অপূর্ব্ব চিত্রে বিচিত্র লিখনে—
এই নারী
রচনা তাহারি।
এ শুধু কালের খেলা,
এর দেহ কী আলস্যে বিধাতা একেলা
রচিলেন সন্ধ্যাকালে
আপনার অর্থহীন ক্ষণিক খেয়ালে—
যে-লগনে
কর্ম্মহীন ক্লান্তক্ষণে
মেঘের মহিমা-মায়া মুহূর্তেই মুগ্ধ করি’ আঁখি
অন্ধরাত্রে বিনা ক্ষোভে যায় মুখ ঢাকি’,
শরতে নদীর জলে যে-ভঙ্গিমা,
বৈশাখে দাড়িম্ব-বনে যে রাগ-রঙ্গিমা
যৌবনের দাপে
অবজ্ঞা-কটাক্ষ হানে মধ্যাহ্নের তাপে,
শ্রাবণের বন্যাতলে হারা
ভেসে-যাওয়া শৈবালের যে-নৃত্যের ধারা,
মাঘশেষে অশ্বত্থের কচি পাতাগুলি
যে-চাঞ্চল্যে উঠে দুলি’,
হেমন্তের প্রভাত-বাতাসে
শিশিরে যে-ঝিলিমিলি ঘাসে ঘাসে,
প্রথম আষাঢ়-দিনে গুরু গুরু রবে
ময়ুরের পুচ্ছপুঞ্জ উল্লসিয়া উঠে যে-গৌরবে
তাই দিয়ে রচিত সুন্দরী;
লতা যেন নারী হ’য়ে দিল চক্ষু ভরি’।
রঙীন বুদ্বুদ সে কি, ইন্দ্রধনু বুঝি,
অন্তর না পাই খুঁজি’—
সকলি বাহির,
চিত্ত অগভীর।
কারো পথ চেয়ে নাহি থাকে,
কারে না-পাওয়ার দুঃখ মনে নাহি রাখে।
মুগ্ধ প্রাণ-উপহার
অনায়াসে নেয়, আর অনায়াসে ভোলে দায় তা’র
সরস্বতী রচিলেন মন তা’র কোন্ অবসরে
রাগহীন বাণীহীন গুঞ্জনের স্বরে;
অমৃতে মাটিতে মেশা সৃজনের এ কোন্ সুরতি,—
—নাম কি মূরতি?
রাখী-পূর্ণিমা
রাখী-পূর্ণিমা
কাহারে পরাবে রাখী যৌবনের রাখী-পূর্ণিমায়,
হে মোর ভাগ্যের দেব! লগ্ন যেন ব’হে নাহি যায়।
মেঘে আজি আবিষ্ট অম্বর, ঘন বৃষ্টি আচ্ছাদনে
অস্পষ্ট আলোর মন্ত্র আকাশ নিবিষ্ট হ’য়ে শোনে,
বুঝিতে পারে না ভালো। আমি ভাবিতেছি একা ব’সে
আমার বাঞ্ছিত কবে বাহিরিল প্রচ্ছন্ন প্রদোষে
চিহ্ণহীন পথে। এসেছিলো দ্বারের সম্মুখে মোর
ক্ষণতরে। তখনো রজনী মম হয় নাই ভোর,
হৃদয় অস্ফুট ছিল অর্দ্ধ জাগরণে। ডাকেনি সে
নাম ধ’রে, দুয়ারে করে নি করাঘাত, গেছে মিশে
সমুদ্র-তরঙ্গ-রবে তাহার অশ্বের হ্রেষাধ্বনি।
হে বীর অপরিচিত, শেষ হ’লো আমার রজনী,
জানা তো হ’লো না কোন্ দুঃসাধ্যের সাধন লাগিয়া
অস্ত্র তব উঠিল ঝঞ্ঝনি’। আমি রহিনু জাগিয়া॥
১৫ ভাদ্র, ১৩৩৫
লগ্ন
লগ্ন
প্রথম মিলনদিন, সে কি হবে নিবিড় আষাঢ়ে,
যেদিন গৈরিকবস্ত্র ছাড়ে
আসন্নের আশ্বাসে সুন্দরা
বসুন্ধরা?
প্রাঙ্গণের চারিধার ঢাকিয়া সজল আচ্ছাদনে
যে দিন সে বসে প্রসাধনে
ছায়ার আসন মেলি’;
পরি’ লয় নূতন সবুজ-রঙা চেলি,
চক্ষুপাতে লাগায় অঞ্জন,
বক্ষে করে কদম্বের কেশর রঞ্জন।
দিগন্তের অভিষেকে
বাতাস অরণ্যে ফিরি’ নিমন্ত্রণ যায় হেঁকে হেঁকে।
যেদিন প্রণয়ী বক্ষতলে
মিলনের পাত্রখানি ভরে অকারণ অশ্রুজলে,
কবির সঙ্গীত বাজে গভীর বিরহে,—
নহে, নহে, সেদিন তো নহে॥
সে কি তবে ফাল্গুনের দিনে,
যেদিন বাতাস ফিরে গন্ধ চিনে চিনে
সবিস্ময়ে বনে বনে,
শুধায় সে মল্লিকারে কাঞ্চন রঙ্গনে
তুমি কবে এলে!
নাগকেশরের কুঞ্জ কেশর ধূলায় দেয় ফেলে
ঐশ্বর্য্য গৌরবে।
কলরবে
অজস্র মিশায় বিহঙ্গম
ফুলের বর্ণের রঙ্গে ধ্বনির সঙ্গম;
অরণ্যের শাখায় শাখায়
প্রজাপতি-সঙ্ঘ আনে পাখায় পাখায়
চিত্রলিপি, কুসুমেরি বিচিত্র অক্ষরে;
ধরণী যৌবনগর্ব্বভরে
আকাশের নিমন্ত্রণ করে যবে
উদ্দাম উৎসবে;
কবির বীণার তন্ত্র যে-বসন্তে ছিঁড়ে যেতে চাহে
প্রমত্ত উৎসাহে।
আকাশে বাতাসে
বর্ণের গন্ধের উচ্চহাসে
ধৈর্য্য নাহি রহে,—
নহে, নহে, সেদিন তো নহে॥
যেদিন আশ্বিনে শুভক্ষণে
আকাশের সমারোহ ধরণীতে পূর্ণ হয় ধনে।
প্রাচুর্য্য-প্রশান্ত তট পেয়েছে সঙ্গিনী
তরঙ্গিনী—
তপস্বিনী সে-যে, তা’র গম্ভীর প্রবাহে—
সমুদ্র-বন্দনা গান গাহে।
মুছিয়াছে নীলাম্বর বাষ্পসিক্ত চোখ,
বন্ধ-মুক্ত নির্ম্মল আলোক।
বনলক্ষ্মী শুভব্রত।
শুভ্রের ধেয়ানে তা’র মেলিয়াছে অম্লান শুভ্রতা
আকাশে আকাশে
শেফালি মালতী কুন্দে কাশে।
অপ্রগল্ভধরিত্রী-সে প্রণামে লুণ্ঠিত,
পূজারিণী নিরবগুণ্ঠিত,
আলোকের আশীর্ব্বাদে শিশিরের স্নানে
দাহহীন শান্তি তা’র প্রাণে।
দিগন্তের পথ বাহি’
শূন্যে চাহি’
রিক্তবিত্ত শুভ্র মেঘ সন্ন্যাসী উদাসী
গৌরীশঙ্করের তীর্থে চলিয়াছে ভাসি’।
সেই স্নিগ্ধক্ষণে, সেই স্বচ্ছ সূর্য্যকরে,
পূর্ণতায় গম্ভীর অম্বরে
মুক্তির শান্তির মাঝখানে
তাহারে দেখিব যারে চিত্ত চাহে, চক্ষু নাহি জানে॥
ভাদ্র, ১৩৩৫
শুকতারা
শুকতারা
সুন্দরী তুমি শুকতারা
সুদূর শৈলশিখরান্তে,
শর্ব্বরী যবে হবে সারা
দর্শন দিয়ো দিক্ভ্রান্তে।
ধরা যেথা অম্বরে মেশে
আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র,
আঁধারের বক্ষের পরে
আধেক আলোকরেখা রন্ধ্র
আমার আসন রাখে পেতে
নিদ্রাগহন মহাশূন্য,
তন্ত্রী বাজাই স্বপনেতে
তন্দ্রা ঈষৎ করি ক্ষুন্ন।
মন্দ চরণে চলি পারে,
যাত্রা হ’য়েছে মোর সাঙ্গ।
সুর থেমে আসে বারে বারে,
ক্লান্তিতে আমি অবশাঙ্গ।
সুন্দরী ওগো শুকতারা,
রাত্রি না যেতে এসো তূর্ণ!
স্বপ্নে যে-বাণী হ’লো হারা
জাগরণে করো তা’রে পূর্ণ।
নিশীথের তল হ’তে তুলি’
লহো তা’রে প্রভাতের জন্য।
আঁধারে নিজেরে ছিল ভুলি’
আলোকে তাহারে করো ধন্য।
যেখানে সুপ্তি হ’লো লীনা,
যেথা বিশ্বের মহামন্দ্র,
অপিনু সেথা মোর বীণা
আমি আধো-জাগ্রত চন্দ্র॥
আষাঢ়, ১৩৩৫
শুভযোগ
শুভযােগ
যে-সন্ধ্যায় প্রসন্ন লগনে
পূর্ণচন্দ্রে হেরিল গগনে
উৎসুক ধরণী,
সর্বাঙ্গ বেষ্টিয়া তা’র তরঙ্গের ধন্য ধন্য ধ্বনি
মন্দ্রিয়া উঠিল কূলে কূলে;
নদীর গদগদ বাণী অশ্রুবেগে উঠে ফুলে’ ফুলে’
কোটালের বানে,
কী চেয়েছে কী ব’লেছে আপনি না জানে,
সে-সন্ধ্যায় প্রসন্ন লগনে
তোমারে প্রথম দেখা দেখেছি জীবনে॥
যে-বসন্তে উৎকণ্ঠিত দিনে
সাড়া এলো চঞ্চল দক্ষিণে;
পলাশের কুঁড়ি
একরাত্রে বর্ণবহ্ণি জ্বালিল সমস্ত বন জুড়ি’;
শিমূল পাগল হ’য়ে মাতে,
অজস্র ঐশ্বর্যভার ভ’রে তা’র দরিদ্র শাখাতে,
পাত্র করি’ পূরা
আকাশে আকাশে ঢালে রক্ত-ফেন সুরা।
উচ্ছ্বসিত সে-এক নিমেষে
যা-কিছু বলার ছিল ব’লেছি নিঃশেষে॥
২৪ শ্রাবণ, ১৩৩৫
শেষ মধু
শেষ মধু
বসন্ত বায় সন্ন্যাসী হায়
চৈৎ-ফসলের শূন্য ক্ষেতে—
মৌমাছিদের ডাক দিয়ে যায়
বিদায় নিয়ে যেতে যেতেঃ—
আয়রে, ওরে, মৌমাছি, আয়
চৈত্র-যে যায় পত্র-ঝরা,
গাছের তলায় আঁচল বিছায়
ক্লান্তি-অলস বসুন্ধরা॥
সজ্নে ঝুলায় ফুলের বেণী,
আমের মুকুল সব ঝরেনি,
কুঞ্জবনের প্রান্ত ধারে
আকন্দ রয় আসন পেতে।
আয়রে তোরা মৌমাছি, আয়,
আস্বে কখন শুক্নো খরা,
প্রেতের নাচন নাচ্বে তখন
রিক্ত নিশার শীর্ণ জরা॥
শুনি যেন কানন-শাখায়
বেলা-শেষের বাজায় বেণু।
মাখিয়ে নে আজ পাখায় পাখায়
স্মরণভরা গন্ধরেণু।
কাল যে-কুসুম পড়ে ঝ’রে
তাদের কাছে নিস্গো ভ’রে
ওই বছরের শেষের মধু
—এই বছরের মৌচাকেতে॥
নূতন দিনের মৌমাছি, আয়,
নাইরে দেরী, করিস্ ত্বরা,
শেষের দানে ঐ রে বাজায়
বিদায়-দিনের দানের ভরা।
চৈত্র মাসের হাওয়ায় কাঁপা
দোলন-চাঁপার কুঁড়িখানি
প্রলয়-দাহের রৌদ্র তাপে
বৈশাখে আজ ফুট্বে, জানি॥
যা-কিছু তা’র আছে দেবার
শেষ ক’রে সব নিবি এবার
যাবার বেলায় যাক্ চ’লে যাক্
বিলিয়ে দেবার নেশায় মেতে।
আয়রে ওরে মৌমাছি আয়,
আয়রে গোপন মধুহরা,
চরম দেওয়া সঁপিতে চায়
ঐ মরণের স্বয়ম্বরা॥
চৈত্র?, ১৩৩৩
শ্যামলী
নাম্নী
শ্যামলী
সে যেন গ্রামের নদী
বহে নিরবধি
মৃদুমন্দ কলকলে;
তরঙ্গের ভঙ্গী নাই, আবর্ত্তের ঘূর্ণি নাই জলে;
নুয়ে-পড়া তটতরু ঘনচ্ছায়া-ঘেরে
ছোটো ক’রে রাখে আকাশেরে।
জগৎ সামান্য তা’র, তারি ধূলি ’পরে
বনফুল ফোটে অগোচরে,
মধু তা’র নিজমূল্য নাহি জানে,
মধুকর তা’রে না বাখানে।
গৃহকোণে ছোটো দীপ জ্বালায় নেবায়,
দিন কাটে সহজ সেবায়।
স্নান সাঙ্গ করি’ এলোচুলে
অপরাজিতার ফুলে
প্রভাতে নীরব নিবেদনে
স্তব করে একমনে।
মধ্যদিনে বাতায়নতলে
চেয়ে দেখে নিম্নে দীঘিজলে
শৈবালের ঘনস্তর,
পতঙ্গের খেলা তারি ’পর
আব্ছায়া কল্পনায়
ভাষাহীন ভাবনায়
মন তা’র ভরে
মধ্যাহ্নের অব্যক্ত মর্ম্মরে।
সায়াহ্নের শান্তিখানি নিয়ে ঘোমটায়
নদীপথে যায়
ঘট কাঁখে
বেণুবীথিকার বাঁকে বাঁকে
ধীর পায়ে চলি’,—
—নাম কি শামলী?
সন্ধান
সন্ধান
আমার নয়ন তব নয়নের নিবিড় ছায়ায়
মনের কথার কুসুম-কোরক খোঁজে।
সেথায় কখন্ অগম গোপন গহন মায়ায়
পথ হারাইল ও-যে।
আতুর দিঠিতে শুধায় সে নীরবেরে,—
নিভৃত বাণীর সন্ধান নাই যে রে;
অজানার মাঝে অবুঝের মতো ফেরে
অশ্রুধারায় ম’জে॥
আমার হৃদয়ে যে-কথা লুকানো, তা’র আভাষণ
ফেলে কভু ছায়া তোমার হৃদয় তলে?
দুয়ারে এঁকেছি রক্ত রেখায় পদ্ম-আসন,
সে তোমারে কিছু বলে?
তব কুঞ্জের পথ দিয়ে যেতে যেতে
বাতাসে বাতাসে ব্যথা দিই মোর পেতে,
বাঁশি কী আশায় ভাষা দেয় আকাশেতে
সে কি কেহ নাহি বোঝে?
শ্রাবণ?, ১৩৩৫
সবলা
সবলা
নারীকে আপন ভাগ্য জয় করিবার
কেন নাহি দিবে অধিকার,
হে বিধাতা?
পথপ্রান্তে কেন রবে জাগি’
ক্লান্ত ধৈর্য প্রত্যাশার পূরণের লাগি’
দৈবাগত দিনে?
শুধু শূন্যে চেয়ে রবো? কেন নিজে নাহি লবো চিনে
সার্থকের পথ?
কেন না ছুটাবো তেজে সন্ধানের রথ
দুর্দ্ধর্ষ অশ্বেরে বাঁধি’ দৃঢ় বল্গা পাশে?
দুর্জ্জয় আশ্বাসে
দুর্গমের দুর্গ হ’তে সাধনার ধন
কেন নাহি করি আহরণ
প্রাণ করি’ পণ?
যাবো না বাসর কক্ষে বধূবেশে বাজায়ে কিঙ্কিণী,—
আমারে প্রেমের বীর্যে করো অশঙ্কিণী।
বীর হস্তে বরমাল্য লবো একদিন
সে-লগ্ন কি একান্তে বিলীন
ক্ষীণদীপ্তি গোধূলিতে?
কভু তা’রে দিব না ভুলিতে
মোর দৃপ্ত কঠিনতা।
বিনম্র দীনতা
সম্মানের যোগ্য নহে তা’র,—
ফেলে দেবো আচ্ছাদন দুর্ব্বল লজ্জার।
দেখা হবে ক্ষুব্ধ সিন্ধুতীরে;
তরঙ্গ গর্জ্জনোচ্ছ্বাস, মিলনের বিজয়ধ্বনিরে
দিগন্তের বক্ষে নিক্ষেপিবে।
মাথার গুণ্ঠন খুলি’ কবো তা’রে, মর্ত্ত্যে বা ত্রিদিবে
একমাত্র তুমিই আমার।
সমুদ্র পাখীর পক্ষে সেইক্ষণে উঠিবে হুঙ্কার
পশ্চিম পবন হানি’,
সপ্তর্ষি আলোকে যবে যাবে তা’রা পন্থা অনুমানি’।
হে বিধাতা আমারে রেখো না বাক্যহীনা
রক্তে মোর জাগে রুদ্র বীণা!
উত্তরিয়া জীবনের সর্ব্বোন্নত মুহূর্ত্তের ’পরে
জীবনের সর্ব্বোত্তম বাণী যেন ঝরে
কণ্ঠ হ’তে
নির্ব্বারিত স্রোতে।
যাহা মোর অনির্ব্বচনীয়
তা’রে যেন চিত্ত মাঝে পায় মোর প্রিয়।
সময় ফুরায় যদি, তবে তা’র পরে
শান্ত হোক্ সে-নির্ঝর নৈঃশব্দ্যের নিস্তব্ধ সাগরে।
৭ ভাদ্র, ১৩৩৫
সাগরিকা
সাগরিকা
সাগরজলে সিনান করি’ সজল এলোচুলে
বসিয়াছিলে উপল-উপকূলে।
শিথিল পীতবাস
মাটির ’পরে কুটিল—রেখা লুটিল চারি পাশ।
নিরাবরণ বক্ষে তব, নিরাভরণ দেহে
চিকন সোনা-লিখন ঊষা আঁকিয়া দিল স্নেহে।
মকর-চূড় মুকুটখানি পরি’ ললাট ’পরে
ধনুক-বাণ ধরি’ দখিন করে,
দাঁড়ানু রাজবেশী,—
কহিনু, “আমি এসেছি পরদেশী।”
চমকি’ ত্রাসে দাঁড়ালে উঠি’ শিলা-আসন ফেলে,
শুধালে, “কেন এলে?”
কহিনু আমি, “রেখো না ভয় মনে,
পূজার ফুল তুলিতে চাহি তোমার ফুল-বনে।”
চলিলে সাথে, হাসিলে অনুকূল,
তুলিনু যূথী, তুলিনু জাতী, তুলিনু চাঁপা ফুল।
দুজনে মিলি’ সাজায়ে ডালি বসিনু একাসনে,
নটরাজেরে পূজিনু এক মনে।
কুহেলি গেল, আকাশে আলো দিল-যে পরকাশি’
ধূর্জ্জটির মুখের পানে পার্ব্বতীর হাসি।
সন্ধ্যাতারা উঠিল যবে গিরি-শিখর ’পরে,
একেলা ছিলে ঘরে।
কটিতে ছিল নীল দুকূল, মালতী-মালা মাথে,
কাঁকন দুটী ছিল দুখানি হাতে।
চলিতে পথে বাজায়ে’ দিনু বাঁশি,
“অতিথি আমি,” কহিনু দ্বারে আসি’।
তরাস-ভরে চকিত-করে প্রদীপখানি জ্বেলে,
চাহিলে মুখে, কহিলে, “কেন এলে?”
কহিনু আমি, “রেখো না ভয় মনে,
তনু দেহটী সাজাবো তব আমার আভরণে।”
চাহিলে হাসি-মুখে,
আধো-চাঁদের কনক-মালা দোলানু তব বুকে।
মকর-চূড় মুকুটখানি কবরী তব ঘিরে
পরায়ে দিনু শিরে।
জ্বালায়ে বাতি মাতিল সখীদল,
তোমার দেহে রতন-সাজ করিল ঝলমল।
মধুর হ’লো বিধুর হ’লো মাধবী নিশীথিনী,
আমার তালে তোমার নাচে মিলিল রিনিঝিনি
পূর্ণ-চাঁদ হাসে আকাশ-কোলে,
আলোক-ছায়া শিব-শিবানী সাগর-জলে দোলে
ফুরালো দিন কখন নাহি জানি,
সন্ধ্যা-বেলা ভাসিল জলে আবার তরী-খানি।
সহসা বায়ু বহিল প্রতিকূলে,
প্রলয় এলো সাগর-তলে দারুণ ঢেউ তুলে’।
লবণ-জলে ভরি’
আঁধার রাতে ডুবালো মোর রতন-ভরা তরী।
আবার ভাঙা ভাগ্য নিয়ে দাঁড়ানু দ্বারে এসে,
ভূষণ-হীন মলিন দীন বেশে।
দেখিনু আমি নটরাজের দেউল-দ্বার খুলি’
তেমনি ক’রে র’য়েছে ভ’রে ডালিতে ফুলগুলি
হেরিনু রাতে, উতল উৎসবে
তরল কলরবে
আলোর নাচ নাচায় চাঁদ সাগর-জলে যবে,
নীরব তব নম্র নত মুখে
আমারি আঁকা পত্রলেখা, আমারি মালা বুকে
দেখিনু চুপে-চুপে
আমারি বাঁধা মৃদঙ্গের ছন্দ রূপে রূপে
অঙ্গে তব হিল্লোলিয়া দোলে
ললিত-গীত-কলিত-কল্লোলে॥
মিনতি মম-শুন হে সুন্দরী,
আরেক বার সমুখে এসো প্রদীপ-খানি ধরি’।
এবার মোর মকর-চূড় মুকুট নাহি মাথে,
ধনুক-বাণ নাহি আমার হাতে;
এবার আমি আনিনি ডালি দখিন সমীরণে
সাগর-কূলে তোমার ফুল-বনে।
এনেছি শুধু বীণা,
দেখো তো চেয়ে আমারে তুমি চিনিতে পারো কি না।
আশ্বিন, ১৩৩৪
সাগরী
সাগরী
বাহিরে সে দুরন্ত আবেগে
উচ্ছলিয়া উঠে জেগে,—
উচ্চহাস্য-তরঙ্গ সে হানে
সূর্য্য চন্দ্র পানে।
পাঠায় অস্থির চোখ—
আলােকের উত্তরে আলােক।
কভু অন্ধকার-পুঞ্জে দেখা দেয় ঝঙ্কার ভ্রুকুটি,
ক্ষণে ক্ষণে
আন্দোলনে
প্রচণ্ড অধৈর্যবেগে তটের মর্যাদা ফেলে টুটি’।
গভীর অন্তর তা’র নিস্তব্ধ গম্ভীর,
কোথা তল, কোথা তীর;
অগাধ তপস্যা যেন রেখেছে সঞ্চিত করি’,—
—নাম কি সাগরী?
সৃষ্টি-রহস্য
সৃষ্টি রহস্য
সৃষ্টির রহস্য আমি তােমাতে ক’রেছি অনুভব,
নিখিলের অস্তিত্ব-গৌরব।
তুমি আছ, তুমি এলে,
এ বিস্ময় মাের পানে আপনারে নিত্য আছে মেলে
অলৌকিক পদ্মের মতন।
অন্তহীন কাল আর অসীম গগন
নিদ্রাহীন আলো
কী অনাদি মন্ত্রে তা’রা অঙ্গ ধরি’ তােমাতে মিলালাে
যুগে যুগে কী অক্লান্ত সাধনায়,
অগ্নিময়ী বেদনায়,
নিমেষে হ’য়েছে ধন্য শক্তির মহিমা
পেয়ে আপনার সীমা
ওই মুখে, ওই চক্ষে, ওই হাসিটিতে।
সেই সৃষ্টি-তপস্যার সার্থক আনন্দ মাের চিতে
স্পর্শ করে, যবে তব মুখে মেলি আঁখি
সম্মুখে তােমার ব’সে থাকি॥
২০ ভাদ্র, ১৩৩৬
স্পর্দ্ধা
স্পর্দ্ধা
শ্লথ প্রাণ দুর্ব্বলের স্পর্দ্ধা আমি কভু সহিব না।
লোলুপ সে লালায়িত, প্রেমেরে সে করে বিড়ম্বনা,
ক্লেদঘন চাটুবাক্যে বাষ্পে বিজড়িত দৃষ্টি তা’র,
কলুষ-কুণ্ঠিত অঙ্গে লিপ্ত করে গ্লানি লালসার,
আবেশে মন্থর কণ্ঠে গদ্গদ সে প্রার্থনা জানায়,
আলোক-বঞ্চিত তা’র অন্তরের কানায় কানায়
দুষ্ট ফেন উঠে বুদ্বুদিয়া,—ফেটে যায়, দেয় খুলি’
রুদ্ধ বিষবায়ু। গলিত মাংসের যেন ক্রিমিগুলি
কল্পনা বিকার তা’র শিথিল চিন্তার তলে তলে
আকুলিতে থাকে কিলিবিলি।—প্রাণপণ বলে
মন তা’রে করে কষাঘাত। জীর্ণমজ্জা কাপুরুষে
নারী যদি গ্রাহ্য করে, লজ্জিত দেবতা তা’রে দূষে
অসহ্য সে অপমানে। নারী সে-যে মহেন্দ্রের দান,
এসেছে ধরিত্রীতলে পুরুষেরে সঁপিতে সম্মান॥
১৪ ভাদ্র, ১৩৩৫
হেঁয়ালী
হেঁয়ালী
যারে সে বেসেছে ভালো তা’রে সে কাঁদায়।
নূতন ধাঁধায়
ক্ষণে ক্ষণে চমকিয়া দেয় তা’রে,
কেবলি আলো-আঁধারে
সংশয় বাঁধায়;—
ছল-করা অভিমানে বৃথা সে সাধায়।
সে কি শরতের মায়া
উড়ো মেঘে নিয়ে আসে বৃষ্টিভরা ছায়া?
অনুকূল চাহনির তলে
কী বিদ্যুৎ ঝলে!
কেন দয়িতের মিনতিকে
অভাবিত উচ্চ হাস্যে উড়াইয়া দেয় দিকে দিকে?
তা’র পরে আপনার নির্দ্দয় লীলায়
আপনি সে ব্যথা পায়,
ফিরে যে গিয়েছে তা’রে ফিরায়ে ডাকিতে কাঁদে প্রাণ;
আপনার অভিমানে করে খানখান।
কেন তা’র চিত্তাকাশে সারা বেলা
পাগল হাওয়ার এই এলোমেলো খেলা!
আপনি সে পারে না বুঝিতে
যেদিকে চলিতে চায় কেন তা’র চলে বিপরীতে!
গভীর অন্তরে
যেন আপনার অগোচরে
আপনার সাথে তা’র কি আছে বিরোধ,
অন্যেরে আঘাত করে আত্মঘাতী ক্রোধ;
মুহূর্ত্তেই বিগলিত করুণায়
অপমানিতের পায়
প্রাণমন দেয় ঢালি,—
—নাম কি হেঁয়ালি?