PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৮৯৫

চিত্রা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৮৯৫

প্রকাশনা-তথ্য

চিত্রা।

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

মূল্য ১৷৷৹ টাকা।

কলিকাতা

আদি ব্রাহ্ম সমাজ যন্ত্রে

কালিদাস চক্রবর্তী দ্বারা মুদ্রিত ও

প্রকাশিত।

ফাল্গুন, ১৩০২।

৫৫নং অপার চিৎপুর রোড।

সূচীপত্র।

অন্তর্যামী

অন্তর্যামী।

এ কি কৌতুক নিত্য-নুতন

ওগো কৌতুকময়ী!

আমি যাহা কিছু চাহি বলিবারে

বলিতে দিতেছ কই?

অন্তরমাঝে বসি অহরহ

মুখ হতে তুমি ভাষা কেড়ে লহ,

মোর কথা লয়ে তুমি কথা কহ

মিশায়ে আপন সুরে।

কি বলিতে চাই সব ভুলে যাই,

তুমি যা বলাও আমি বলি তাই,

সঙ্গীতস্রোতে কূল নাহি পাই,

কোথা ভেসে যাই দূরে!

বলিতেছিলাম বসি একধারে

আপনার কথা আপন জনারে,

শুনাতে ছিলাম ঘরের দুয়ারে

ঘরের কাহিনী যত;

তুমি সে ভাষারে দহিয়া অনলে,

ডুবায়ে ভাসায়ে নয়নের জলে,

নবীন প্রতিমা নব কৌশলে

গড়িলে মনের মত।

সে মায়া মুরতি কি কহিছে বাণী!

কোথাকার ভাব কোথা নিলে টানি!

আমি চেয়ে আছি বিস্ময় মানি’

রহস্যে নিমগন!

এ যে সঙ্গীত কোথা হতে উঠে,

এ যে লাবণ্য কোথা হতে ফুটে,

এ যে ক্রন্দন কোথা হতে টুটে

অন্তর-বিদারণ!

নূতন ছন্দ অন্ধের প্রায়

ভরা আনন্দে ছুটে চলে যায়,

নূতন বেদনা বেজে উঠে তায়

নূতন রাগিণী ভরে।

যে কথা ভাবিনি বলি সেই কথা,

যে ব্যথা বুঝি না জাগে সেই ব্যথা,

জানি না এনেছি কাহার বারতা

কারে শুনাবার তরে!

কে কেমন বোঝে অর্থ তাহার,

কেই এক বলে কেহ বলে আর,

আমারে শুধায় বৃথা বারবার,—

দেখে’ তুমি হাস বুঝি!

কে গো তুমি, কোথা রয়েছ গোপনে,

আমি মরিতেছি খুঁজি।

এ কি কৌতুক নিত্য-নূতন

ওগো কৌতুকময়ী!

যে দিকে পান্থ চাহে চলিবারে

চলিতে দিতেছ কই?

গ্রামের যে পথ ধায় গৃহপানে,

চাষীগণ ফিরে দিবা-অবসানে,

গোঠে ধায় গরু, বধূ জল আনে

শতবার যাতায়াতে,

একদা প্রথম প্রভাত বেলায়

সে পথে বাহির হইনু হেলায়,

মনে ছিল, দিন কাজে ও খেলায়

কাটায়ে ফিরিব রাতে।

পদে পদে তুমি ভুলাইলে দিক্‌,

কোথা যাব আজি নাহি পাই ঠিক,

ক্লান্ত হৃদয় ভ্রান্ত পথিক

এসেছি,নূতন দেশে।

কখনো উদার গিরির শিখরে,

কভু বেদনার তমোগহ্বরে

চিনি না যে পথ সে পথের পরে

চলেছি পাগল বেশে।

কভু বা পন্থ গহন জটিল,

কভু পিচ্ছল ঘন পঙ্কিল,

কভু সংকট-ছায়া-শঙ্কিল,

বঙ্কিম দুরগম,—

ধর কণ্টকে ছিন্ন চরণ,

ধূলায় রৌদ্রে মলিন বরণ,

আশে পাশে হতে তাকায় মরণ,

সহসা লাগায় ভ্রম!

তারি মাঝে বাঁশি বাজিছে কোথায়,

কাঁপিছে বক্ষ সুখের ব্যথায়,

তীব্র তপ্ত দীপ্ত নেশায়

চিত্ত মাতিয়া উঠে!

কোথা হতে আসে ঘন সুগন্ধ,

কোথা হতে বায়ু বহে আনন্দ,

চিন্তা ত্যজিয়া পরাণ অন্ধ

মৃত্যুর মুখে ছুটে!

ক্ষ্যাপার মতন কেন এ জীবন?

অর্থ কি তার, কোথা এ ভ্রমণ?

চুপ করে থাকি শুধায় যখন

দেখে তুমি হাস বুঝি!

কে তুমি গোপনে চালাইছ মোরে!

আমি যে তোমারে খুঁজি!

রাখ কৌতুক নিত্য-নূতন

ওগো কৌতুকময়ী!

আমার অর্থ, তোমার তত্ত্ব

বলে দাও মোরে অয়ি!

আমি কি গো বীণা-যন্ত্র তোমার?

বাথায় পীড়িয়া হৃদয়ের তার

মুর্চ্ছনাভরে গীতঝঙ্কার

ধ্বনিছ মর্ম্মমাঝে!

আমার মাঝারে করিছ রচনা

অসীম বিরহ, অপার বাসনা,

কিসের লাগিয়া বিশ্ববেদনা

মোর বেদনায় বাজে?

মোর প্রেমে দিয়ে তোমার রাগিণী

কহিতেছ কোন্ অনাদি কাহিনী,

কঠিন আঘাতে ওগো মায়াবিনী

জাগাও গভীর সুর!

হবে যবে তব লীলা অবসান,

ছিঁড়ে যাবে তার, থেমে যাবে গান,

আমারে কি ফেলে করিবে প্রয়াণ

তব রহস্যপুর?

জ্বেলেছ কি মোরে প্রদীপ তোমার

করিবারে পূজা কোন্ দেবতার

রহস্য-ঘেরা অসীম আঁধার

মহা মন্দিরতলে?

নাহি জানি, তাই কার্‌ লাগি প্রাণ

মরিছে দহিয়া নিশি দিনমান,

যেন সচেতন বহ্নি সমান

নাড়ীতে নাড়ীতে জ্বলে?

অর্ধনিশীথে নিভৃতে নীরবে

এই দীপখানি নিবে যাবে যবে,

বুঝিব কি, কেন এসেছিনু ভবে,

কেন জ্বলিলাম প্রাণে?

কেন নিয়ে এলে তব মায়ারথে

তোমার বিজন নূতন এ পথে,

কেন রাখিলে না সবার জগতে

জনতার মাঝখানে?

জীবন-পোড়ানো এ হোম-অনল

সে দিন কি হবে সহসা সফল?

সেই শিখা হতে রূপ নির্ম্মল

বাহিরি’ আসিবে বুঝি!

সব জটিলতা হইবে সরল

তোমারে পাইব খুঁজি!

ছাড়ি কৌতুক নিত্য-নুতন

ওগো কৌতুকময়ী

জীবনের শেষে কি নুতন বেশে

দেখা দিবে মোরে অয়ি?

চির দিবসের মর্ম্মের ব্যথা,

শত জনমের চির সফলতা,

আমার প্রেয়সী, আমার দেবতা,

আমার বিশ্বরূপী,

মরণ-নিশায় উষা বিকাশিয়া

শ্রান্ত জনের শিয়রে আসিয়া

মধুর অধরে করুণ হাসিয়া

দাঁড়াবে কি চুপি চুপি?

ললাট আমার চুম্বন করি

নব চেতনায় দিবে প্রাণ ভরি,

নয়ন মেলিয়া উঠিব শিহরি’

জানি না চিনিব কি না!

শূন্য গগন নীল নির্ম্মল,

নাহি রবিশশি গ্রহমণ্ডল,

না বহে পবন, নাই কোলাহল,

বাজিছে নীরব বীণা!

অচল আলোকে রয়েছ দাঁড়ায়ে,

কিরণ-বসন অঙ্গ জড়ায়ে

চরণের তলে পড়িছে গড়ায়ে

ছড়ায়ে বিবিধ ভঙ্গে।

গন্ধ তোমার ঘিরে চারিধার,

উড়িছে আকুল কুন্তলভার,

নিখিল গগন কাঁপিছে তোমার

পরশ-রস-তরঙ্গে!

হাসিমাখা তব আনত দৃষ্টি,

আমারে করিছে নূতন সৃষ্টি,

অঙ্গে অঙ্গে অমৃত-বৃষ্টি

বরষি’ করুণাভরে।

নিবিড় গভীর প্রেম আনন্দ

বাহুবন্ধনে করেছে বন্ধ,

মুগ্ধ নয়ন হয়েছে অন্ধ

অশ্রু বাষ্প থরে।

নাহিক অর্থ, নাহিক তত্ত্ব,

নাহিক মিথ্যা, নাহিক সত্য,

আপনার মাঝে আপনি মত্ত,—

দেখিয়া হাসিবে বুঝি?

আমি হতে তুমি বাহিরে আসিবে,

ফিরিতে হবে না খুঁজি!

যদি কৌতুক রাখ চিরদিন

ওগো কৌতুকময়ী,

যদি অন্তরে লুকায়ে বসিয়া

হবে অন্তরজয়ী

তবে তাই হোক্‌! দেবি অহরহ

জনমে জনমে রহ তবে রহ,

নিত্য মিলনে নিত্য বিরহ

জীবনে জাগাও প্রিয়ে!

নব নব রূপে গুগো রূপময়

লুণ্ঠিয়া লহ আমার হৃদয়,

কাঁদাও আমারে, ওগো নির্দ্দয়,

চঞ্চল প্রেম দিয়ে।

কখন হৃদয়ে, কখন বাহিরে,

কখনো আলোকে, কখন তিমিরে,

কভু বা স্বপনে, কভু সশরীরে

পরশ করিয়া যাবে।

বক্ষ বীণায় বেদনার তার

এইমত পুনঃ বাঁধিব আবার,

পরশমাত্রে গীতঝঙ্কার

উঠিবে নুতন ভাবে।

এমনি টুটিয়া মর্ম্ম-পাথর

ছুটিবে আবার অশ্রু-নিঝর,

জানি না খুঁজিয়া কি মহাসাগর

বহিয়া চলিবে দূরে।

বরষ বরষ দিবস রজনী

অশ্রু-নদীর আকুল সে ধ্বনি

রহিয়া রহিয়া মিশিবে এমনি

আমার গানের সুরে!

যত শত ভুল করেছি এবার

সেই মত ভূল ঘটিবে আবার,

ওগো মায়াবিনী কত ভুলবার

মন্ত্র তোমার আছে!

আবার তোমারে ধরিবার তরে

ফিরিয়া মরিব বনে প্রান্তরে,

পথ হতে পথে, ঘর হতে ঘরে

দুরাশার পাছে পাছে।

এবারের মত পূরিয়া পরাণ

তীব্র বেদনা করিয়াছি পান;

সে সুর তরল অগ্নি সমান

তুমি ঢালিতেছ বুঝি!

আবার এমনি বেদনার মাঝে

তোমারে কিরিব খুঁজি!

ভাদ্র,

১৩০১।

আবেদন

আবেদন।

ভৃত্য। জয় হোক্‌ মহারাণী! রাজরাজেশ্বরী,

দীন ভূত্যে কর দয়া!

রাণী। সভা ভঙ্গ করি’

সকলেই গেল চলি’ যথাযোগ্য কাজে

আমার সেবকবৃন্দ বিশ্বরাজ্য মাঝে,

মোর আজ্ঞা মোর মান লয়ে শীর্ষদেশে

জয়শঙ্খ সগর্ব্বে বাজায়ে। সভাশেষে

তুমি এলে নিশান্তের শশাঙ্ক সমান

ভক্ত ভৃত্য মোর? কি প্রার্থনা?

ভৃত্য। মোর স্থান

সর্ব্বশেষে, আমি তব সর্ব্বাধম দাস

মহোত্তমে! একে একে পরিতৃপ্ত আশ

সবাই আনন্দে যবে ঘরে ফিরে যায়

সেইক্ষণে আমি আসি নির্জ্জন সভায়;

একাকী আসীনা তব চরণতলের

প্রান্তে বসে’ ভিক্ষা মাগি শুধু সকলের

সর্ব্ব অবশেষটুকু!

রাণী। অবোধ ভিক্ষুক,

অসময়ে কি তোরে মিলিবে?

ভৃত্য। হাসি মুখ

দেখে চলে’ যাব। আছে দেবী, আরো আছে;—

নানা কর্ম নানা পদ নিল তোর কাছে

নানা জনে,—এক কর্ম্ম কেহ চাহে নাই-

ভৃত্য পরে দয়া করে’ দেহ মোরে তাই,—

আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর!

রাণী। মালাকর?

ভৃত্য। ক্ষুদ্র মালাকর। অবসর

লব সব কাজে। যুদ্ধ-অস্ত্র ধনুঃশর

ফেলিনু ভূতলে; এ উষ্ণীষ রাজসাজ

রাখিনু চরণে তব,—যত উচ্চ কাজ

সব ফিরে লও দেবী! তব দূত করি

মোরে আর পাঠায়োনা, তব স্বর্ণতরী

দেশে দেশান্তরে লয়ে; জয়ধ্বজা তব

দিদিগন্তে করিয়া প্রচার, নব নব

দিগ্বিজয়ে পাঠায়োনা মোরে! পর পারে

তব রাজ্য কর্ম যশ ধন জন ভারে

অসীমবিস্তৃত,—কত নগর নগরী,

কত লোকালয়, বন্দরেতে কত তরী,

বিপণীতে কত পণ্য;—ওই দেখ দূরে

মন্দির শিখরে আর কত হর্ম্ম্যচূড়ে

দিগন্তেরে করিছে দংশন; কলোচ্ছ্বাস

শ্বসিয়া উঠিছে শূন্যে করিবারে গ্রাস

নক্ষত্রের নিত্য নীরবতা। বহু ভৃত্য

আছে হোথা, বহু সৈন্য তব, জাগে নিত্য

কতই প্রহরী! এ পারে নির্জ্জন তীরে

একাকী উঠেছে ঊর্দ্ধে উচ্চ গিরিশিরে

রঞ্জিত মেঘের মাঝে তুষারধবল

তোমার প্রাসাদ-সৌধ,—অনিন্দ্য নির্ম্মল

চন্দ্রকান্ত মণিময়। বিজনে বিরলে

হেথা তব দক্ষিণের বাতায়ন তলে

মঞ্জরিত ইন্দুমল্লী বল্লরী বিতানে,

ঘনচ্ছায়ে, নিভৃত কপোত-কলগানে

একান্তে কাটিবে বেলা; স্ফটিক প্রাঙ্গণে

জলযন্ত্রে উৎসধারা কল্লোল-ক্রন্দনে

উচ্ছসিবে দীর্ঘ দিন ছল ছল ছল-

মধ্যাহূেরে করি দিবে বেদনা-বিহ্বল

করুণা-কাতর; অদূরে অলিন্দপরে

পুঞ্জ পুচ্ছ বিস্ফারিয়া স্ফীত গর্ব্বভরে

নাচিবে ভবন শিখী-রাজহংসদল

চরিবে শৈবাল বনে করি কোলাহল

বাঁকায়ে ধবলগ্রীবা; পাটলা হরিণী

ফিরিবে শ্যামল ছায়ে; অয়ি একাকিনী,

আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর!

রাণী। ওরে তুই কর্ম্মভীরু অলস কিঙ্কর,

কি কাজে লাগিবি?

ভৃত্য। অকাজের কাজ যত,

আলস্যের সহস্র সঞ্চয়। শত শত

আনন্দের আয়োজন। যে অরণ্যপথে

কর তুমি সঞ্চরণ বসন্তে শরতে

প্রত্যুষে অরুণোদয়ে- শ্লথ অঙ্গ হতে

তপ্ত নিদ্রালসখানি সিগ্ধ বায়ুস্রোতে

করি দিয়া বিসর্জ্জন—সে বন-বীথিকা

রাখিব নবীন করি; পুষ্পাক্ষরে লিখা

তব চরণের স্তুতি প্রত্যহ উষায়

বিকশি উঠিবে তব পরশ তৃষায়

পুলকিত তৃণপুঞ্জতলে। সন্ধ্যাকালে

যে মঞ্জু মালিকাখানি জড়াইবে ভালে

কবরী বেষ্টন করি,আমি নিজ করে

রচি’ সে বিচিত্র মালা সান্ধ্য যূথীস্তরে,

সাজায়ে সুবর্ণ পাত্রে তোমার সম্মুখে

নিঃশব্দে ধরিব আসি অবনত মুখে,—

যেথায় নিভৃত কক্ষে, ঘন কেশ পাশ,

তিমির নির্ঝরসম উন্মুক্ত-উচ্ছ্বাস

তরঙ্গ-কুটিল, এলাইয়া পৃষ্ঠ পরে,

কনক মুকুর অঙ্কে, শুভ্র পদ্ম করে

বিনাইবে বেণী। কুমুদ সরসী কূলে

বসিবে যখন, সপ্তপর্ণ তরুমূলে

মালতী দোলায়-পত্রচ্ছেদ-অবকাশে

পড়িবে ললাটে চক্ষে বক্ষে বেশবাসে

কৌতূহলী চন্দ্রমার সহস্র চুম্বন;—

আনন্দিত তনুখানি করিয়া বেষ্টন

উঠিবে বনের গন্ধ বাসনা-বিভোল

মৃদু মন্দ সমীরের মত। অনিমেষে

যে প্রদীপ জ্বলে তব শয্যা শিরোদেশে

সারা সুপ্তনিশি, সুরনরস্বপ্নাতীত

নিদ্রিত অঙ্গপানে স্থির অকম্পিত

নিদ্রাহীন আঁখি মেলি -সে প্রদীপখানি

আমি জালাইয়া দিব গন্ধতৈল আনি।

শেফালির বৃন্ত দিয়া রাঙাইব, রাণী,

বসন বাসন্তী রঙে; পাদপীঠখানি

নব ভাবে নব রূপে শুভ আলিম্পনে

প্রত্যহ রাখিব অঙ্কি কুঙ্কুমে চন্দনে

কল্পনার লেখা! নিকুঞ্জের অনুচর,

আমি তব মালঞ্চের হব মালাকর!

রাণী। কি লইবে পুরস্কার?

ভৃত্য। প্রত্যহ প্রভাতে

ফুলের কঙ্কণ গড়ি, কমলের পাতে

আনিব যখন,—পদ্মের কলিকাসম

ক্ষুদ্র তব মুষ্টিখানি করে ধরি মম

আপনি পরায়ে দিব, এই পুরস্কার।

প্রতি সন্ধ্যাবেলা, অশোকের রক্তকান্তে

চিত্রি’ পদতল, চরণ-অঙ্গুলি-প্রান্তে

লেশমাত্র রেণু-চুম্বিয়া মুছিয়া লব

এই পুরস্কার!

রাণী। ভৃত্য, আবেদন তব

করিনু গ্রহণ। আছে মোর বহু মন্ত্রী

বহু সৈন্য বহু সেনাপতি,বহু যন্ত্রী

কর্ম্মযন্ত্রে রত,—তুই থাক্ চিরদিন

স্বেচ্ছাবন্দী দাস, খ্যাতিহীন কর্ম্মহীন!

রাজসভা বহিঃপ্রান্তে রবে তোর ঘর-

তুই মোর মালঞ্চের হবি মালাকর!

২২ অগ্রহায়ণ,

১৩০২।

উৎসব

উৎসব।

মোর অঙ্গে অঙ্গে যেন আজি বসন্ত উদয়

কত পত্র পুষ্পময়!

যেন মধুপের মেলা

গুঞ্জরিছে সারাবেলা,

হেলাভরে করে খেলা

অলস মলয়।

ছায়া আলো অশ্রু হাসি

নৃত্য গীত বীণা বাঁশি,

যেন মোর অঙ্গে আসি

বসন্ত উদয়

কত পত্র পুস্পময়!

তাই মনে হয় আমি আজি পরম সুন্দর,

আমি অমৃত-নির্ঝর!

সুখসিক্ত নেত্র মম

শিশিরিত পুষ্পসম,

ওষ্ঠে হাসি নিরুপম

মাধুরী-মন্থর।

মোর পুলকিত হিয়া

সর্ব্বদেহে বিলসিয়া

বক্ষে উঠে বিকশিয়া

পরম সুন্দর,

নব অমৃত নির্ঝর।

ওগো যে-তুমি আমার মাঝে নূতন নবীন

সদা আছ নিশিদিন,

তুমি কি বসেছ আজি

নব বরবেশে সাজি

কুন্তলে কুসুমরাজি

অঙ্কে লয়ে বীণ?

ভরিয়া আরতি থালা

জ্বালায়েছ দীপমালা

সাজায়েছ পুষ্প ডালা

নূতন নবীন,

আজি বসন্তের দিন।

ওগো তুমি কি উতলাসম বেড়াইছ ফিরে

মোর হৃদয়ের তীরে?

তোমারি কি চারিপাশ

কাঁপে শত অভিলাষ,

তোমারি কি পট্টবাস

উড়িছে সমীরে?

নব গান তব মুখে

ধ্বনিছে আমার বুকে,

উচ্ছ্বাসিয়া সুখে দুখে

হৃদয়ের তীরে

তুমি বেড়াইছ ফিরে!

আজি তুমি কি দেখিছ এই শোভা রাশি রাশি

ওগো মনোবনবাসী!

আমার নিঃশ্বাসবায়

লাগিছে কি তব গায়?

বাসনার পুষ্প পা’য়

পড়িছে কি আসি?

উঠিছে কি কলতান

মর্ম্মর গুঞ্জর গান,

তুমি কি করিছ পান

মোর সুধারাশি

ওগো মনোবনবাসী!

আজি এ উৎসব কলরব কেহ নাহি জানে,

শুধু আছে তাহা প্রাণে।

শুধু এ বক্ষের কাছে

কি জানি কাহারা নাচে,

সর্ব্বদেহ মাতিয়াছে

শব্দহীন গানে।

যৌবন-লাবণ্যধারা

অঙ্গে অঙ্গে পথহারা,

এ আনন্দ তুমি ছাড়া

কেহ নাহি জানে,—

তুমি আছ মোর প্রাণে।

২২ মাব,

১৩০২।

ঊর্ব্বশী

ঊর্ব্বশী।

নহ মাতা, নহ কন্যা, নহ বধু, সুন্দরি রূপসি,

হে নন্দনবাসিনী ঊর্ব্বশি।

গোষ্ঠে যবে সন্ধ্যা নামে শ্রান্ত দেহে স্বর্ণাঞ্চল টানি’,

তুমি কোনো গৃহপ্রান্তে নাহি জ্বাল সন্ধ্যাদীপখানি;

দ্বিধায় জড়িত পদে, কম্প্রবক্ষে নম্র নেত্রপাতে

স্মিতহাস্যে নাহি চল সলজ্জিত বাসর শয্যাতে

স্তব্ধ অর্দ্ধরাতে।

উষার উদয় সম অনবগুণ্ঠিতা

তুমি অকুণ্ঠিতা

বৃন্তহীন পুষ্পসম আপনাতে আপনি বিকশি

কবে তুমি ফুটিলে ঊর্ব্বশি!

আদিম বসন্তপ্রাতে উঠেছিলে মন্থিত সাগরে,

ডানহাতে সুধাপাত্র, বিষভাণ্ড লয়ে বাম করে;

তরঙ্গিত মহাসিন্ধু মন্ত্রশান্ত ভুজঙ্গের মত

পড়েছিল পদপ্রান্তে, উচ্ছ্বসিত ফণা লক্ষ শত

করি অবনত।

কুন্দশুভ্র নগ্নকান্তি সুরেন্দ্রবন্দিতা,

তুমি অনিন্দিতা।

কোনোকালে ছিলে না কি মুকুলিকা বালিকা বয়সী

হে অনন্ত যৌবনা ঊর্ব্বশি!

আঁধার পাথারতলে কার ঘরে বসিয়া একেলা

মাণিক মুকুতা লয়ে করেছিলে শৈশবের খেলা,

মণিদীপ দীপ্তকক্ষে সমুদ্রের কল্লোল সঙ্গীতে

অকলঙ্ক হাস্যমুখে প্রবাল পালঙ্কে ঘুমাইতে

কার অঙ্কটিতে?

যখনি জাগিলে বিশ্বে, যৌবনে গঠিতা

পূর্ণ প্রস্ফুটিতা।

যুগ যুগান্তর হতে তুমি শুধু বিশ্বের প্রেয়সী

হে অপূর্ব্ব শোভনা ঊর্ব্বশি!

মুনিগণ, ধ্যান ভাঙ্গি দেয় পদে তপস্যার ফল,

তোমারি কটাক্ষঘাতে ত্রিভুবন যৌবনচঞ্চল,

তোমার মদির গন্ধ অন্ধবায়ু বহে চারিভিতে,

মধুমত্ত ভৃঙ্গসম মুগ্ধ কবি ফিরে লুব্ধ চিতে,

উদ্দাম সঙ্গীতে।

নূপুর গুঞ্জরি’ যাও আকুল-অঞ্চলা

বিদ্যুৎ-চঞ্চলা।

সুরসভাতলে যবে নৃত্য কর পুলকে উল্লসি’

হে বিলোল-হিল্লোল ঊর্ব্বশী!

ছন্দে ছন্দে নাচি উঠে সিন্ধুমাঝে তরঙ্গের দল,

শস্যশীর্ষে শিহরিয়া কাঁপি উঠে ধরার অঞ্চল,

তব স্তনহার হতে নভস্তলে খসি পড়ে তারা,

অকস্মাৎ পুরুষের বক্ষোমাঝে চিত্ত আত্মহারা,

নাচে রক্তধারা।

দিগন্তে মেখলা তব টুটে আচম্বিতে

অয়ি অসম্বৃতে!

স্বর্গের উদয়াচলে মূর্ত্তিমতী তুমি হে উষসী,

হে ভুবনমোহিনী উর্ব্বশী।

জগতের অশ্রুধারে ধৌত তব তনুর তনিমা,

ত্রিলোকের হৃদিরক্তে আঁকা তব চরণ-শোণিমা,

মুক্তবেণী বিবসনে, বিকশিত বিশ্ব-বাসনার

অরবিন্দ মাঝখানে পাদপদ্ম রেখেছ তোমার

অতি লঘুভার।

অখিল মানসস্বর্গে অনন্ত রঙ্গিণী,

হে স্বপ্ন সঙ্গিনি!

ওই শুন দিশে দিশে তোমা-লাগি কাঁদিছে ক্রন্দসী-

হে নিষ্ঠুরা বধিরা ঊর্ব্বশি!

আদিযুগ পুরাতন এ জগতে ফিরিবে কি আর,—

অতল অকূল হতে সিক্তকেশে উঠিবে আবার?

প্রথম সে তনুখানি দেখা দিবে প্রথম প্রভাতে,

সর্ব্বাঙ্গ কাঁদিবে তব নিখিলের নয়ন আঘাতে

বারি বিন্দুপাতে!

অকস্মাৎ মহাম্বুধি অপূর্ব্ব সঙ্গীতে

রবে তরঙ্গিতে।

ফিরিবেনা ফিরিবেনা-অস্ত গেছে সে গৌরব শশী,

অস্তাচলবাসিনী উর্ব্বশী।

তাই আজি ধরাতলে বসন্তের আনন্দ-উচ্ছাসে

কার চিরবিরহের দীর্ঘশ্বাস মিশে বহে আসে,

পূর্ণিমা নিশীথে যবে দশদিকে পরিপূর্ণ হাসি,

দুরস্মৃতি কোথা হতে বাজায় ব্যাকুল-করা বাঁশি,

ঝরে অশ্রু-রাশি!

তবু আশা জেগে থাকে প্রাণের ক্রন্দনে

অয়ি অবন্ধনে!

২৩ অগ্রহায়ণ,

১৩০২।

এবার ফিরাও মোরে

এবার ফিরাও মোরে!

সংসারে সবাই যবে সারাক্ষণ শত কর্ম্মে রত

তুই শুধু ছিন্নবাধা পলাতক বালকের মত

মধ্যাহ্নে মাঠের মাঝে একাকী বিষন্ন তরুচ্ছায়ে

দূর-বনগন্ধবহ মন্দগতি ক্লান্ত তপ্তবায়ে

সারাদিন বাজাইলি বাঁশি!—ওরে তুই ওঠ আজি!

আগুন লেগেছে কোথা? কার শঙ্খ উঠিয়াছে বাজি

জাগাতে জগৎ-জনে? কোথা হতে ধ্বনিছে ক্রন্দনে

শূন্যতল? কোন্ অন্ধকারা মাঝে জর্জ্জর বন্ধনে

অনাথিনী মাগিছে সহায়? স্ফীতকায় অপমান

অক্ষমের বক্ষ হতে রক্ত শুষি করিতেছে পান

লক্ষমুখ দিয়া! বেদনারে করিতেছে পরিহাস

স্বার্থোদ্ধত অবিচার! সঙ্কুচিত ভীত ক্রীতদাস

লুকাইছে ছদ্মবেশে! ওই যে দাঁড়ায়ে নতশির

মূক সবে-ম্লানমুখে লেখা শুধু শত শতাব্দীর

বেদনার করুণ কাহিনী; স্কন্ধে যত চাপে ভার-

বহি চলে মন্দগতি, যতক্ষণ থাকে প্রাণ তার,—

তার পরে সন্তানেরে দিয়ে যায় বংশ বংশ ধরি’;

নাহি ভর্তসে অদৃষ্টেরে, নাহি নিন্দে দেবতারে স্মরি,

মানবেরে নাহি দেয় দোষ, নাহি জানে অভিমান,

শুধু দুটি অন্ন খুঁটি কোন মতে কষ্টক্লিষ্ট প্রাণ

রেখে দেয় বাঁচাইয়া! সে অন্ন যখন, কেহ কাড়ে,

সে প্রাণে আঘাত দেয় গর্ব্বাদ্ধ নিষ্ঠুর অত্যাচারে,

নাহি জানে কার দ্বারে দাঁড়াইবে বিচারের আশে,

দরিদ্রের ভগবানে বারেক ডাকিয়া দীর্ঘশ্বাসে,

মরে সে নীরবে! এই সব মূঢ় ম্লান মূক মুখে

দিতে হবে ভাষা, এই সব শ্রান্ত শুষ্ক ভগ্ন বুকে

ধ্বনিয়া তুলিতে হবে আশা; ডাকিয়া বলিতে হবে-

মুহূর্ত্ত তুলিয়া শির একত্র দাড়াও দেখি সবে!

যার ভয়ে তুমি ভীত, সে অন্যায় ভীরু তোমা চেয়ে,

যখনি জাগিবে তুমি তখনি সে পলাইবে ধেয়ে;

যখনি দাঁড়াবে তুমি সম্মুখে তাহার,—তখনি সে

পথ-কুকুরের মত সঙ্কোচে সত্রাসে যাবে মিশে;

দেবতা বিমুখ তারে, কেহ নাহি সহায় তাহায়,

মুখে করে আস্ফালন, জানে সে হীনতা আপনার

মনে মনে!-

কবি, তবে উঠে এস,যদি থাকে প্রাণ

তবে তাই লহ সাখে,—তবে তাই কর আজি দান!

বড় দুঃখ, বড় ব্যথা,—সম্মুখেতে কষ্টের সংসার

বড়ই দরিদ্র, শূন্য, বড় ক্ষুদ্র, বদ্ধ অন্ধকার!-

অন্ন চাই, প্রাণ চাই, আলো চাই, চাই মুক্ত বায়ু,

চাই বল, চাই স্বাস্থ্য, আনন্দ-উজ্জ্বল পরমায়ু,

সাহসবিস্তৃত বক্ষপট! এ দৈন্য-মাঝারে, কবি,

একবার নিয়ে এস স্বর্গ হতে বিশ্বাসের ছবি!

এবার ফিরাও মরে, লয়ে যাও সংসারের তীরে

হে কল্পনে, রঙ্গময়ি! দুলায়ো না সমীরে সমীরে

তরঙ্গে তরঙ্গে আর! ভুলায়ো না মোহিনী মায়ায়!

বিজন বিষাদবন অন্তরের নিকুঞ্জচ্ছায়ায়

রেখো না বসায়ে আর! দিন যায়, সন্ধ্যা হয়ে আসে!

অন্ধকারে ঢাকে দিশি, নিরাশ্বাস উদাস বাতাসে

নিঃশ্বসিয়া কেঁদে ওঠে বন! বাহিরিনু হেথা হতে

উন্মুক্ত অম্বরতলে, ধূসরপ্রসর রাজপথে,

জনতার মাঝখানে! কোথা যাও, পান্থ, কোথা যাও,

আমি নহি পরিচিত, মোর পানে ফিরিয়া তাকাও!

বল মোরে নাম তবু, আমারে কোরো না অবিশ্বাস!

সৃষ্টিছাড়া সৃষ্টিমাঝে বহুকাল করিয়াছি বাস

সঙ্গীহীন রাত্রিদিন; তাই মোর অপরূপ বেশ,

আচার নুতনতর; তাই মোর চক্ষে স্বপ্নাবেশ,

বক্ষে জলে ক্ষুধানল!-যে দিন জগতে চলে আসি,

কোন্ মা আমারে দিলি শুধু এই খেলাবার বাঁশি!

বাজাতে বাজাতে তাই মুগ্ধ হয়ে আপনার সুরে

দীর্ঘ দিন দীর্ঘ রাত্রি চলে গেনু একান্ত সুদূরে

ছাড়ায়ে সংসারসীমা! -সে বাঁশিতে শিখেছি যে সুর

তাহারি উল্লাসে যদি গীতশূন্য অবসাদপুর

ধ্বনিয়া তুলিতে পারি, মৃত্যুঞ্জয়ী আশার সঙ্গীতে

কর্ম্মহীন জীবনের একপ্রান্ত পারি তরঙ্গিতে

শুধু মুহূর্ত্তের তরে, দুঃখ যদি পায় তার ভাষা,

সুপ্তি হতে জেগে ওঠে অন্তরের গভীর পিপাসা

স্বর্গের অমৃত লাগি, -তবে ধন্য হবে মোর গান,

শত শত অসন্তোষ মহাগীতে লভিবে নির্ব্বাণ।

কি গাহিবে, কি শুনাবে!-বল, মিথ্যা আপনার সুখ,

মিথ্যা আপনার দুঃখ! স্বার্থমগ্ন যে জন বিমুখ

বৃহৎ জগত হতে, সে কখনো শেখে নি বাঁচিতে।

মহা বিশ্বজীবনের তরঙ্গেতে নাচিতে নাচিতে

নির্ভয়ে ছুটিতে হবে, সত্যেরে করিয়া ধ্রুবতারা!

মৃত্যুরে করি না শঙ্কা! দুর্দ্দিনের অশ্রুজলধারা

মস্তকে পড়িবে ঝরি-তারি মাঝে যাব অভিসারে

তার কাছে,—জীবনসর্ব্বস্বধন অর্পিয়াছি যারে

জন্ম জন্ম ধরি! কে সে? জানিনা কে! চিনি নাই তারে-

শুধু এইটুকু জানি-তারি লাগি রাত্রি-অন্ধকারে

চলেছে মানবযাত্রী যুগ হতে যুগান্তর পানে

ঝড়ঝঞ্চা বজ্রপাতে, জ্বালায়ে ধরিয়া সাবধানে

অন্তর প্রদীপখানি! শুধু জানি—যে শুনেছে কানে

তাহার আহ্বানগীত-ছুটেছে সে নির্ভীক পরাণে

সঙ্কট আবর্ত্তমাঝে, দিয়েছে সে বিশ্ব বিসর্জ্জন,

নির্যাতন লয়েছে সে বক্ষ পাতি; মৃত্যুর গর্জ্জন

শুনেছে সে সঙ্গীতের মত। দহিয়াছে অগ্নি তারে,

বিদ্ধ করিয়াছে শূল, ছিন্ন তারে করেছে কুঠারে,

সর্ব্ব প্রিয়বস্তু তার অকাতরে করিয়া ইন্ধন

চিরজন্ম তারি লাগি জ্বেলেছে সে হোম-হুতাশন;—

হৃৎপিণ্ড করিয়া ছিন্ন রক্তপদ্ম অর্ঘ্য উপহারে

ভক্তিভরে জন্মশোধ শেষ পুজা পূজিয়াছে তারে

মরণে কৃতার্থ করি প্রাণ! শুনিয়াছি, তারি লাগি

রাজপুত্র পরিয়াছে ছিন্ন কন্থা, বিষয়ে বিরাগী

পথের ভিক্ষুক! মহাপ্রাণ সহিয়াছে পলে পলে

সংসারের ক্ষুদ্র উৎপীড়ন, বিধিয়াছে পদতলে

প্রত্যহের কুশাঙ্কুর, করিয়াছে তারে অবিশ্বাস

মূঢ় বিজ্ঞ জনে, প্রিয়জন করিয়াছে পরিহাস

অতিপরিচিত অবজ্ঞায়, গেছে সে করিয়া ক্ষমা

নীরবে করুণনেত্রে-অন্তরে বহিয়া নিরুপমা

সৌন্দর্য্যপ্রতিমা! তারি পদে, মানী সঁপিয়াছে মান,

ধনী সঁপিয়াছে ধন, বীর সঁপিয়াছে আত্মপ্রাণ,

তাহারি উদ্দেশে কবি বিরচিয়া লক্ষ লক্ষ গান

ছড়াইছে দেশে দেশে!- শুধু জানি তাহারি মহান্

গম্ভীর মঙ্গলধ্বনি শুনা যায় সমুদ্রে সমীরে,

তাহারি অঞ্চলপ্রান্ত লুটাইছে নীলাম্বর ঘিরে,

তারি বিশ্ববিজয়িনী পরিপূর্ণ প্রেমমূর্ত্তিখানি

বিকাশে পরমক্ষণে প্রিয়জনমুখে! শুধু জানি

সে বিশ্বপ্রিয়ার প্রেমে ক্ষুদ্রতারে দিয়া বলিদান

বর্জিতে হইবে দূবে জীবনের সর্ব্ব অসম্মান,

সম্মুখে দাড়াতে হবে উন্নতমস্তক উচ্চে তুলি

যে মস্তকে ভয় লেখে নাই লেখা, দাসত্বের ধূলি

আঁকে নাই কলঙ্ক-তিলক! তাহারে অন্তরে রাখি

জীবনকণ্টকপথে যেতে হবে নীরবে একাকী,

সুখে দুঃখে ধৈর্য্য ধরি, বিরলে মুছিয়া অশ্রু-আঁখি,

প্রতিদিবসের কর্ম্মে প্রতিদিন নিরলস থাকি

সুখী করি সর্ব্বজনে! তার পরে দীর্ঘ পথশেষে

জীবযাত্রা অবসানে ক্লান্তপদে রক্তসিত বেশে

উত্তরিব একদিন শ্রান্তিহরা শান্তির উদ্দেশে

দুঃখহীন নিকেতনে! প্রসন্নবদনে মন্দ হেসে

পরাবে মহিমালক্ষ্মী ভক্তকণ্ঠে বরমাল্যখানি,

করপদ্ম পরশনে শান্ত হবে সর্ব্ব দুঃখ গ্লানি

সর্ব্ব অমঙ্গল! লুটাইয়া রক্তিম চরণতলে

ধৌত করি দিব পদ আজন্মের রুদ্ধ অশ্রুজলে।

সুচিরসঞ্চিত আশা সম্মুখে করিয়া উদঘাটন

জীবনের অক্ষমতা কাঁদিয়া করিব নিবেদন,

মাগিব অনন্তক্ষমা! হয় ত ঘুচিরে দুঃখনিশা,

তৃপ্ত হবে এক প্রেমে জীবনের সর্ব্বপ্রেমতৃষা!

২৩ ফাল্গুন,

১৩০০ সাল।

গৃহ-শত্রু

গৃহ-শত্রু।

আমি একাকিনী যবে চলি রাজ পথে

নব-অভিসার সাজে,

নিশীথে নীরব নিখিল ভুবন,

না গাহে বিহগ, না চলে পবন,

মৌন সকল পৌর ভবন

সুপ্ত নগর মাঝে,

শুধু আমার নুপুর আমারি চরণে

বিমরি বিমরি বাজে;

অধীর মুখর শুনিয়া সে স্বর

পদে পদে মরি লাজে!

আমি চরণ শব্দ শুনিব বলিয়া

বসি বাতায়ন কাছে,—

অনিমেষ তারা নিবিড় নিশায়,

লহরীর লেশ নাহি যমুনায়,

জনহীন পথ আঁধারে মিশায়,

পাতাটি কাঁপে না গাছে;

শুধু আমারি উরসে আমারি হৃদয়

উলসি বিলসি নাচে,

উতলা পাগল করে কলরোল

বাঁধন টুটিলে বাঁচে।

আমি কুসুম শয়নে মিলাই সরমে,—

মধুর মিলন রাতি;

স্তব্ধ যামিনী ঢাকে চারিধার,

নির্ব্বাণ দীপ, রুদ্ধ দুয়ার,

শ্রাবণ গগন করে হাহাকার

তিমির শয়ন পাতি’;

শুধু আমার মাণিক আমারি বক্ষে

জ্বালায়ে রেখেছে বাতি;

কোথায় লুকাই, কেমনে নিবাই

নিলাজ ভূষণ ভাতি।

আমি আমার গোপন মরমের কথা

রেখেছি মরম তলে।

মলয় কহিছে আপন কাহিনী,

কোকিল গাহিছে আপন রাগিণী,

নদী বহি চলে কাঁদি একাকিনী

আপনার কলকলে।

শুধু আমার কোলের আমারি বীণাটি

গীত ঝঙ্কার ছলে

যে কথা যখন করিব গোপন

সে কথা তখনি বলে।

১৫ ই মাঘ,

১৩০২।

চিত্রা

চিত্রা।

জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে

তুমি বিচিত্র রূপিণী!

অযুত আলোকে ঝলসিছ নীল গগনে,

আকুল পুলকে উলসিছ ফুল-কাননে,

দ্যুলোকে ভূলোকে বিলসিছ চল-চরণে,

তুমি চঞ্চল-গামিনী।

মুখর নূপুর বাজিছে সুদূর আকাশে,

অলকগন্ধ উড়িছে মন্দ বাতাসে,

মধুর নৃত্যে নিখিল চিত্তে বিকাশে

কত মঞ্জুল রাগিণী।

কত না বর্ণে কত না স্বর্ণে গঠিত,

কত যে ছন্দে কত সঙ্গীতে রটিত,

কত না গ্রন্থে কত না কণ্ঠে পঠিত,

তব অসংখ্য কাহিনী!

জগতের মাঝে কত বিচিত্র তুমি হে

তুমি বিচিত্র রূপিণী!

অন্তর মাঝে শুধু তুমি একা একাকী

তুমি অন্তর ব্যাপিনী!

একটি স্বপ্ন মুগ্ধ সজল নয়নে,

একটি পদ্ম হৃদয় বৃন্ত-শয়নে,

একটি চন্দ্র অসীম হৃদয়-গগনে,

চারিদিকে চির-যামিনী।

অকুল শান্তি, সেথায় বিপুল বিরতি,

একটি ভক্ত করিছে নিত্য আরতি,

নাহি কাল দেশ, তুমি অনিমেষ মুরতি,

তুমি অচপল দামিনী।

ধীর গম্ভীর গভীর মৌন-মহিমা,

স্বচ্ছ অতল মিগ্ধ নয়ন-নীলিমা,

স্থির হাসিখানি উষালোক সম অসীমা,

অয়ি প্রশান্ত হাসিনী!

অন্তর মাঝে তুমি শুধু একা একাকী

তুমি অন্তরবাসিনী।

১৮ই অগ্রহায়ণ,

১৩০২।

জীবন দেবতা

জীবন দেবতা।

ওহে অন্তরতম,

মিটেছে কি তব সকল তিয়াষ,

আসি অন্তরে মম?

দুঃখ সুখের লক্ষ ধারায়

পাত্র করিয়া দিয়েছি তোমায়,

নিঠুর পীড়নে নিঙাড়ি বক্ষ

দলিত দ্রাক্ষাসম!

কত যে বরণ, কত যে গন্ধ,

কত যে রাগিণী, কত যে ছন্দ,

গাঁথিয়া গাঁথিয়া করেছি বয়ন

বাসর শয়ন তব,—

গলায়ে গলায়ে বাসনার সোনা

প্রতিদিন আমি করেছি রচনা

তোমার ক্ষণিক খেলার লাগিয়া

মুরতি নিত্যনব!

আপনি বরিয়া লয়েছিলে মোরে

না জানি কিসের আশে!

লেগেছে কি ভাল হে জীবননাথ

আমার রজনী আমার প্রভাত,

আমার নর্ম্ম, আমার কর্ম্ম

তোমার বিজন বাসে?

বরষা শরতে বসন্তে শীতে

ধ্বনিয়াছে হিয়া যত সঙ্গীতে

শুনেছ কি ভাহা একেলা বসিয়া

আপন সিংহাসনে?

মানস কুসুম তুলি অঞ্চলে

গেঁথেছ কি মালা, পরেছ কি গলে,

আপনার মনে করেছ ভ্রমণ

মম যৌবনবনে?

কি দেখিছ বঁধু মরম-মাঝারে

রাখিয়া নয়ন দুটি?

করেছ কি ক্ষমা যতেক আমার

স্খলন পতন ত্রুটি?

পূজাহীন দিন, সেবাহীন রাত

কত বারবার ফিরে গেছে নাথ,

অর্ঘ্যকুসুম ঝরে পড়ে গেছে

বিজন বিপিনে যুটি।

যে সুরে বাঁধিলে এ বীণার তার

নামিয়া নামিয়া গেছে বারবার,

হে কবি, তোমার রচিত রাগিণী

আমি কি গাহিতে পারি?

তোমার কাননে সেচিবারে গিয়া

ঘুমায়ে পড়েছি ছায়ায় পড়িয়া,

সন্ধ্যাবেলায় নয়ন ভরিয়া

এনেছি অশ্রুবারি!

এখন কি শেষ হয়েছে প্রাণেশ

যা কিছু আছিল মোর?

যত শোভা যত গান যত প্রাণ,

জাগরণ, ঘুমঘোর?

শিথিল হয়েছে বাহুবন্ধন,

মদিরাবিহীন মম চুম্বন,

জীবনকুঞ্জে অভিসার-নিশা

আজি কি হয়েছে ভোর?

ভেঙ্গে দাও তব আজিকার সভা,

আন নব রূপ, আন নব শোভা,

নূতন করিয়া লহ আরবার

চির-পুরাতন মোরে।

নূতন বিবাহে বাঁধিবে আমায়

নবীন জীবন ভোরে।

২৯ মাঘ,

১৩০২।

জ্যোৎস্না রাত্রে

জ্যোৎস্না রাত্রে।

শান্ত কর শান্ত কর এ ক্ষুব্ধ হৃদয়

হে নিস্তব্ধ পূর্ণিমা যামিনী! অতিশয়

উদ্ভ্রান্ত বাসনা বক্ষে করিছে আঘাত

বারম্বার, তুমি এস স্নিগ্ধ অশ্রুপাত

দগ্ধ বেদনার পরে। শুভ্র সুকোমল

মোহভরা নিদ্রাতরা কর-পদ্মদল,

আমার সর্বাঙ্গে মনে দাও বুলাইয়া

বিভাবরী, সর্ব্ব ব্যথা দাও ভুলাইয়া।

বহু দিন পরে আজি দক্ষিণ বাতাস

প্রথম বহিছে। মুগ্ধ হৃদয় দুরাশ

তমার চরণপ্রান্তে রাখি তপ্ত শির

নিঃশব্দে ফেলিতে চাহে রুদ্ধ অশ্রনীর

হে মৌন রজনী! পাণ্ডুর অম্বর হতে

ধীরে ধীরে এস নামি’ লঘু জ্যোৎস্নাস্রোতে

মৃদু হাস্যে নতনেত্রে দাঁড়াও আসিয়া

নির্জন শিয়রতলে। বেড়াক্‌ ভাসিয়া

রজনীগন্ধার গন্ধ মদির লহরী

সমীর-হিল্লোলে; স্বপ্নে বাজুক্‌ বাঁশরী

চন্দ্রলোক প্রান্ত হতে; তোমার অঞ্চল

বায়ুভরে উড়ে এসে পুলকচঞ্চল

করুক আমার তনু; অধীর মর্ম্মরে

শিহরি উঠুক্‌ বন; মাথার উপরে

চকোর ডাকিয়া যাক্ দূরশ্রুত তান;

সম্মুখে পড়িয়া থাক তটান্ত-শয়ান

-সুপ্ত নটিনীর মত-নিস্তব্ধ তটিনী

স্বপ্নালসা!

হের আজি নিদ্রিতা মেদিনী,

ঘরে ঘরে রুদ্ধ বাতায়ন। আমি একা

আছি জেগে, তুমি একাকিনী দেহ দেখা

এই বিশ্বসুপ্তি মাঝে!অসীম সুন্দর

ত্রিলোকনন্দনমূর্ত্তি! আমি যে কাতর

অনন্ত তৃষায়, আমি নিত্য নিদ্রাহীন,

সদা উৎকণ্ঠিত, আমি চিররাত্রিদিন

আনিতেছি অর্ঘ্যভার অন্তর-মন্দিরে

অজ্ঞাত দেবতা লাগি,—বাসনার তীরে

একা বসে গড়িতেছি কত যে প্রতিমা

আপন হৃদয় ভেঙ্গে, নাহি তার সীমা!

আজি মোরে কর দয়া, এস তুমি, অয়ি,

অপার রহস্য তব হে রহস্যময়ী,

খুলে ফেল,—আজি ছিন্ন করে ফেল ওই

চিরস্থির আচ্ছাদন অনন্ত অম্বর!

মহামৌন অসীমতা নিশ্চল সাগর,

তারি মাঝখান হতে উঠে এস ধীরে

তরুণী লক্ষ্মীর মত হৃদয়ের তীরে

আঁখির সম্মুখে! সমস্ত প্রহরগুলি

ছিন্নপুষ্পদল সম পড়ে যা খুলি

তব চারিদিকে,—বিদীর্ণ নিশীথখানি

খসে যাক্‌ নীচে! বক্ষ হতে লহ টানি’

অঞ্চল তোমার, দাও অবারিত করি’

শুভ্র ভাল, আঁখি হতে লহ অপসরি’

উন্মুক্ত অলক! কোন মর্ত্ত্য দেখে নাই

যে দিব্য মূরতি, আমারে দেখাও তাই

এ বিশ্রব্ধ রজনীতে নিস্তব্ধ বিরলে।

উৎসুক উন্মুখ চিত্ত চরণের তলে

চকিতে পরশ কর;—একটি চুম্বন

ললাটে রাখিয়া যাও-একান্ত নির্জ্জন

সন্ধ্যার তারার মত; আলিঙ্গন-স্মৃতি

অঙ্গে তরঙ্গিয়া দাও, অনন্তের গীতি

বাজায়ে শিরার তন্ত্রে! ফাটুক হৃদয়

ভূমানন্দে-ব্যাপ্ত হয়ে যাক্ শূন্যময়

গানের তানের মত! একরাত্রি তরে

হে অমরী, অমর করিয়া দাও মোরে।

তোমাদের বাসরকুঞ্জের বহির্দ্বারে

বসে আছি,—কানে আসিতেছে বারে বারে

মৃদুমন্দ কথা, বাজিতেছে সুমধুর

রিনিঝিনি রুনুঝুনু সোনার নুপুর,—

কার কেশপাশ হতে খসি’ পুষ্পদল

পড়িছে আমার বক্ষে, করিছে চঞ্চল

চেতনা প্রবাহ! কোথায় গাহিছ গান।

তোমরা কাহারা মিলি করিতেছ পান

কিরণ কনকপাত্রে সুগন্ধি অমৃত-

মাথায় জড়ায়ে মালা পূর্ণ-বিকশিত

পারিজাত;—গন্ধ তারি আসিছে ভাসিয়া

মন্দ সমীরণে,—উন্মাদ করিছে হিয়া

অপূর্ব্ব বিরহে! খোল দ্বার, খোল দ্বার!

তোমাদের মাঝে মোরে লহ একবার

সৌন্দর্য্য সভায়! নন্দনবনের মাঝে

নির্জন মন্দিরখানি,—সেথায় বিরাজে

একটি কুসুমশয্যা, রত্ন দীপালোকে

একাকিনী বসি আছে নিদ্রাহীন চোখে

বিশ্বসোহাগিনী লক্ষ্মী, জ্যোতির্ম্ময়ী বালা;

আমি কবি তারি তরে আনিয়াছি মালা!

৬ মাঘ,

১৩০০ সাল।

দিনশেষে

দিনশেষে।

দিন শেষ হয়ে এল, আঁধারিল ধরণী;

আর বেয়ে কাজ নাই তরণী।

“হাঁগো এ কাদের দেশে

বিদেশী নামিনু এসে,”

তাহারে শুধানু হেসে যেমনি-

অমনি কথা না বলি’

ভরা ঘট ছলছলি’

নতমুখে গেল চলি তরুণী!

এ ঘাটে বাঁধিব মোর তরণী।

নামিছে নীরব ছায়া ঘন বন-শয়নে,

এদেশ লেগেছে ভাল নয়নে।

স্থির জলে নাহি সাড়া,

পাতাগুলি গতিহারা,

পাখী যত ঘুমে সারা কাননে,—

শুধু এ সোনার সাঁঝে

বিজনে পথের মাঝে

কলস কাঁদিয়া বাজে কাঁকণে।

এদেশ লেগেছে ভাল নয়নে।

ঝলিছে মেঘের আলো কনকের ত্রিশূলে,

দেউটি জ্বলিছে দূরে দেউলে।

শ্বেত পাথরেতে গড়া

পথখানি ছায়া-করা,

ছেয়ে গেছে ঝরে’-পড়া বকুলে।

সারি সারি নিকেতন,

বেড়া দেওয়া উপবন,

দেখে পথিকের মন আকুলে।

দেউটি জ্বলিছে দূরে দেউলে।

রাজার প্রাসাদ হতে অতি দূর বাতাসে

ভাসিছে পূরবী গীতি আকাশে।

ধরণী সমুখপানে

চলে গেছে কোন্‌খানে,

পরাণ কেন কে জানে উদাসে!

ভাল নাহি লাগে আর

আসা যাওয়া বারবার

বহু দূর দুরাশার প্রবাসে।

পূরবী রাগিণী বাজে আকাশে।

কাননে প্রাসাদচূড়ে নেমে আসে রজনী,

আর বেয়ে কাজ নাই তরণী!

যদি হোথা খুঁজে পাই

মাথা রাখিবার ঠাঁই,

বেচাকেনা ফেলে যাই এখনি,—

যেখানে পথের বাঁকে

গেল চলি নত আঁখে

ভরা ঘট লয়ে কাঁধে তরুণী!

এই ঘাটে বাঁধ মোর তরণী!

২৮ অগ্রহায়ণ,

১৩০২।

দুই বিঘা জমি

দুই বিঘা জমি।

শুধু বিঘে দুই ছিল মোর ভুঁই, আর সবি গেছে ঋণে।

বাবু বলিলেন “বুঝেছ উপেন, এ জমি লইব কিনে।”

কহিলাম আমি “তুমি ভূস্বামী, ভূমির অন্ত নাই।

চেয়ে দেখ মোর আছে বড়জোর মরিবার মত ঠাঁই।”

শুনি রাজা কহে “বাপু, জানত হে, করেছি বাগানখানা,

পেলে দুই বিঘে প্রস্থে ও দীঘে সমান হইবে টানা,—

ওটা দিতে হবে।”-কহিলাম তবে বক্ষে জুড়িয়া পাণি

সজল চক্ষে, “করুন্ রক্ষে গরীবের ভিটেখানি!

সপ্তপুরুষ যেথায় মানুষ সে মাটি সোণার বাড়া,

দৈন্যের দায়ে বেচিব সে মায়ে এমনি লক্ষ্মীছাড়া”!

আঁখি করি লাল রাজা ক্ষণকাল রহিল মৌনভাবে,

কহিলেন শেষে ক্রুর হাসি হেসে, “আচ্ছা সে দেখা যাবে”!

পরে মাস দেড়ে ভিটেমাটি ছেড়ে বাহির হইনু পথে-

করিল ডিক্রি, সকলি বিক্রি মিথ্যা দেনার খতে।

এ জগতে, হায়, সেই বেশি চায় আছে যার ভুরি ভুরি!

রাজার হস্ত করে সমস্ত কাঙালের ধন চুরি!

মনে ভাবিলাম মোরে ভগবান রাখিবে না মোহগর্ত্তে,

তাই লিখি দিল বিশ্ব-নিখিল দু বিঘার পরিবর্ত্তে!

সন্ন্যাসীবেশে ফিরি দেশে দেশে হইয়া সাধুর শিষ্য,

কত হেরিলাম মনোহর ধাম, কত মনোরম দৃশ্য।

ভূধরে সাগরে বিজনে নগরে যখন যেখানে ভ্রমি,

তবু নিশিদিনে ভূলিতে পারিনে সেই বিঘা দুই জমি!

হাটে মাঠে বাটে এই মত কাটে বছর পনেরো ষোলো,

একদিন শেষে ফিরিবারে দেশে বড়ই বাসনা হোলো।

নমোনমো নমঃ, সুন্দরী মম জননী বঙ্গভূমি!

গঙ্গার তীর স্নিগ্ধ সমীর জীবন জুড়ালে তুমি!

অবারিত মাঠ, গগন-ললাট চুমে তব পদ-ধূলি,

ছায়া-সুনিবিড় শান্তির নীড় ছোট ছোট গ্রামগুলি।

পল্লবঘন আম্রকানন, রাখালের খেলাগেহ।

স্তব্ধ অতল দীঘি-কালোজল, নিশীথশীতল স্নেহ।

বুকভরা মধু বঙ্গের বধূ জল লয়ে যায় ঘরে,

মা বলিতে প্রাণ করে অনচান, চখে আসে জল ভরে’।

দুই দিন পরে দ্বিতীয় প্রহরে প্রবেশিনু নিজগ্রামে।

কুমোরের বাড়ি দক্ষিণে ছাড়ি, রথ-তলা করি বামে

রাখি হাটখোলা নন্দীর গোলা, মন্দির করি পাছে

তৃষাতুর শেষে পঁহুছিনু এসে আমার বাড়ির কাছে।

ধিক্ ধিক ওরে, শতধিক্ তোর, নিলাজ কুলটা ভূমি!

যখনি যাহার তখনি তাহার, এই কি জননী তুমি!

সে কি মনে হবে একদিন যবে ছিলে দরিদ্র-মাতা,

আঁচল ভরিয়া রাখিতে ধরিয়া ফলফুল শাকপাতা!

আজ কোন্ রীতে কারে ভুলাইতে ধরেছ বিলাস-বেশ,

পাঁচরঙা পাতা অঞ্চলে গাঁথা, পুষ্পে খচিত কেশ!

আমি তোর লাগি ফিরেছি বিবাগী গৃহহারা সুখহীন,

তুই হেথা বসি ওরে রাক্ষসী হাসিয়া কাটাস্‌ দিন!

ধনীর আদরে গরব না ধরে!-এতই হয়েছ ভিন্ন

কোন খানে লেশ নাহি অবশেষ সে দিনের কোন চিহ্ন!

কল্যাণময়ী ছিলে তুমি অয়ি, ক্ষুধাহরা সুধারাশি;

যত হাস আজ, যত কর সাজ, ছিলে দেবী, হলে দাসী।

বিদীর্ণহিয়া ফিয়িয়া ফিরিয়া চারিদিকে চেয়ে দেখি;

প্রাচীরের কাছে এখনো যে আছে, সেই আম গাছ এ কি!

বসি তার তলে নয়নের জলে শান্ত হইল ব্যথা,

একে একে মনে উদিল স্মরণে বালক কালের কথা।

সেই মনে পড়ে জ্যৈষ্ঠের ঝড়ে রাত্রে নাহিক ঘুম,

অতি ভোরে উঠি তাড়াতাড়ি ছুটি আম কুড়াবার ধুম।

সেই সুমধুর স্তব্ধ দুপুর, পাঠশালা-পলায়ন,—

ভাবিলাম হায় আর কি কোথায় ফিরে পাব সে জীবন!

সহসা বাতাস ফেলি গেল শ্বাস শাখা দুলাইয়া গাছে;

দুটি পাকা ফল লভিল ভূতল আমার কোলের কাছে।

ভাবিলাম মনে বুঝি এতখনে আমারে চিনিল মাতা!

স্নেহের সে দানে বহু সম্মানে বারেক ঠেকানু মাথা।

হেনকালে হায় যমদূত প্রায় কোথা হতে এল মালী!

ঝুটি-বাঁধা উড়ে সপ্তম সুয়ে পাড়িতে লাগিল গালী।

কহিলাম তবে, “আমিত নীরবে দিয়েছি আমার সব,

দুটি ফল তার করি অধিকার, এত তারি কলরব”!

চিনিল না মোরে নিয়ে গেল ধরে’ কাঁধে তুলি লাঠিগাছ,

বাবু ছিপ হাতে পারিষদ সাথে ধরিতেছিলেন মাছ।

শুনি বিবরণ ক্রোধে তিনি কন্ “মারিয়া করিব খুন"!

বাবু যত বলে, পারিষদদলে বলে তার শতগুণ!

আমি কহিলাম, “শুধু দুটি আম ভীখ্‌ মাগি মহাশয়”!

বাবু কহে হেসে “বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়”!

আমি শুনে হাসি, আঁখিজলে ভাসি, এই ছিল মোর ঘটে!

তুমি মহারাজ সাধু হলে আজ, আমি আজ চোর বটে!

৩১ শে জ্যৈষ্ঠ,

১৩০২।

দুরাকাঙ্ক্ষা

দুরাকাঙ্ক্ষা।

কেন নিবে গেল বাতি?

আমি অধিক যতনে ঢেকেছিনু তারে

জাগিয়া বাসররাতি,

তাই নিবে গেল বাতি।

কেন ঝরে গেল ফুল?

আমি বক্ষে চাপিয়া ধরেছিনু তারে

চিন্তিত ভয়াকুল,

তাই ঝরে গেল ফুল।

কেন মরে গেল নদী?

আমি বাঁধ বাঁধি তারে চাহি ধরিবারে

পাইবারে নিরবধি-

তাই মরে গেল নদী।

কেন ছিঁড়ে গেল তার?

আমি অধিক আবেগে প্রাণপণ বলে

দিয়েছিনু ঝঙ্কার-

তাই ছিঁড়ে গেল তার।

৪ ফাল্গুন,

১৩০২।

ধূলি

ধূলি।

অয়ি ধূলি, অয়ি তুচ্ছ, অয়ি দীনহীনা,

সকলের নিয়ে থাক নীচতম জনে

বক্ষে বাঁধিবার তরে;—সহি’ সর্ব্ব ঘৃণা

কারে নাহি কর ঘৃণা। গৈরিক বসনে

হে ব্রতচারিণী তুমি সাজি উদাসীন

বিশ্বজনে পালিতেছ আপন ভবনে।

নিজেরে গোপন করি’, অয়ি বিমলিনা,

সৌন্দর্য্য বিকশি তোল বিশ্বের নয়নে;—

বিস্তারিছ কোমলতা, হে শুষ্ক কঠিনা,

হে দরিদ্রা, পূর্ণা তুমি রত্নে ধান্যে ধনে!

হে আত্মবিস্মৃতা, বিশ্ব-চরণ-বিলীনা,

বিস্মৃতেরে ঢেকে রাখ অঞ্চল বসনে।

নূতনেরে নির্ব্বিচারে কোলে লহ তুলি,

পুরাতনে বক্ষে ধর, হে জননী ধূলি!

১৫ ফাল্গুন,

১৩০২।

নগর-সংগীত

নগর-সংগীত।

কোথা গেল সেই মহান্ শান্ত

নব নির্ম্মল শ্যামলকান্ত

উজ্জ্বলনীল বসনপ্রান্ত

সুন্দর শুভ ধরণী!

আকাশ আলোক-পুলকপুঞ্জ,

ছায়াসুশীতল নিভৃত কুঞ্জ,

কোথা সে গভীর ভ্রমরগুঞ্জ,

কোথা নিয়ে এল তরণী!

ওইরে নগরী, জনতারণ্য,

শত রাজপথ, গৃহ অগণ্য,

কতই বিপণি, কতই পণ্য

কত কোলাহল-কাকলি!

কত না অর্থ, কত অনর্থ

আবিল করিছে স্বর্গমর্ত্ত্য,

তপনতপ্ত ধূলি-আবর্ত্ত

উঠিছে শূন্য আকুলি।’

সকলি ক্ষণিক, খণ্ড, ছিন্ন,

পশ্চাতে কিছু রাখেনা চিহ্ন,

পলকে মিলিছে, পলকে ভিন্ন

ছুটিছে মৃত্যু-পাথারে।

করুণ রোদন, কঠিন হাস্য,

প্রভূত দম্ভ, বিনীত দাস্য,

ব্যাকুল প্রয়াস, নিঠুর ভাষ্য,

চলিছে কাতারে কাতারে।

স্থির নহে কিছু নিমেষ মাত্র,

চাহেনাক পিছু প্রবাসযাত্র,

বিরামবিহীন দিবসরাত্র

চলিছে আঁধারে আলোকে।

কোন্ মায়ামৃগ কোথায় নিত্য

স্বর্ণ-ঝলকে করিছে নৃত্য,

তাহারে বাঁধিতে লোলুপচিত্ত

ছুটিছে বৃদ্ধ বালকে।

এ যেন বিপুল যজ্ঞকুণ্ড,

আকাশে আলোড়ি’ শিখার শুণ্ড

হোমের অগ্নি মেলিছে তুণ্ড

ক্ষুধার দহন জ্বালিয়া।

নরনারী সবে আনিয়া তূর্ণ,

প্রাণের পাত্র করিয়া চূর্ণ

বহ্নির মুখে দিতেছে পূর্ণ

জীবন আহুতি ঢালিয়া।

চারিদিকে ঘিরি যতেক ভক্ত

-স্বর্ণবরণ-মরণাসক্ত-

দিতেছে-অস্থি, দিতেছে রক্ত,

সকল শক্তি সাধনা।

জ্বলি’ উঠে শিখা ভীষণ মন্দ্রে,

ধুমায়ে শূন্য রন্ধ্রে রন্ধ্রে;

লুপ্ত করিছে সূর্য্য চন্দ্রে

বিশ্বব্যাপিনী দাহনা।

বায়ু দলবল হইয়া ক্ষিপ্ত

ঘিরি ঘিরি সেই অনল দীপ্ত

কাঁদিয়া ফিরিছে অপরিতৃপ্ত,

ফুঁসিয়া উষ্ণ শ্বসনে।

যেন প্রসারিয়া কাতর পক্ষ

কেঁদে উড়ে আসে লক্ষ লক্ষ

পক্ষী জননী, করিয়া লক্ষ্য

খাণ্ডব-হুত-অশনে!

বিপ্র ক্ষত্র বৈশ্য শূদ্র,

মিলিয়া সকলে মহৎ ক্ষুদ্র

খুলেছে জীবন-যজ্ঞ রুদ্র

আবাল-বৃদ্ধ রমণী।

হেরি এ বিপুল দহন-রঙ্গ

আকুল হৃদয় যেন পতঙ্গ,

চলিবারে চাহে আপন অঙ্গ

কাটিবারে চাহে ধমনী

হে নগরী, তব ফেনিল মদ্য

উছসি’ উছলি’ পড়িছে সদ্য,

আমি তাহা পান করিব অদ্য,

বিস্মৃত হব আপনা!

অয়ি মানবের পাষাণী-ধাত্রী,

আমি হব তব মেলার যাত্রী,

সুপ্তিবিহীন মত্তরাত্রি

জাগরণে করি’ যাপনা!

ঘূর্ণ্যচক্র জনতা-সংঘ,

বন্ধনহীন মহা-আসঙ্গ,

তারি মাঝে আমি করিব ভঙ্গ

আপন গোপন স্বপনে।

ক্ষুদ্র শান্তি করিব তুচ্ছ,

পড়িব নিম্নে, চড়িব উচ্চ,

ধরিব ধূম্রকেতুর পুচ্ছ

বাহু বাড়াইব তপনে।

নব নব খেলা খেলে অদৃষ্ট,

কখনো ইষ্ট, কভু অনিষ্ট,

কখনো তিক্ত, কখনো মিষ্ট,

যখন যা’ দেয় তুলিয়া।

সখের দুখের চক্রমধ্যে

কখনো উঠিব উধাও পদ্যে,

কখনো লুটিব গভীর গদ্যে,

নাগর-দোলায় দুলিয়া।

হাতে তুলি লব বিজয়বাদ্য,

আমি অশান্ত, আমি অবাধ্য,

যাহা কিছু আছে অতি অসাধ্য

তাহারে ধরিব সবলে!

গামি নির্ম্মম, আমি নৃশংস,

সবেতে বসাব নিজের অংশ,

পরমুখ হতে করিয়া ভ্রংশ

তুলিব আপন কবলে।

মনেতে জানিব সকল পৃথ্বী

আমারি চরণ-আসন-ভিত্তি,

রাজার রাজ্য, দস্যুবৃত্তি,

কোন ভেদ নাহি উভয়ে।

ধনসম্পদ করিব নস্য,

লুণ্ঠন করি আনিব শস্য,

অশ্বমেধের মুক্ত অশ্ব

ছুটাব বিশ্বে অভয়ে!

নব নব ক্ষুধা, নূতন তৃষ্ণা,

নিত্যনুতন কর্ম্মনিষ্ঠা,

জীবনগ্রন্থে নুতন পৃষ্ঠা

উলটিয়া যাব ত্বরিতে।

জটিল কুটিল চলেছে পন্থ,

নাহি তার আদি, নাহিক অন্ত,

উদ্দামবেগে ধাই তুরন্ত,

সিন্ধু শৈল সরিতে।

শুধু সম্মুখ চলেছি লক্ষ্যি’

আমি নীড়হারা নিশার পক্ষী,

তুমিও ছুটিছ চপলা লক্ষ্মী

আলেয়া-হাস্যে ধাঁধিয়া;

পূজা দিয়া পদে করি না ভিক্ষা,

বসিয়া করি না তব প্রতীক্ষা,

কে কারে জিনিবে হবে পরীক্ষা,

আনিব তোমারে বাঁধিয়া!

মানবজন্ম নহে ত নিত্য

ধনজনমান খ্যাতি ও বিত্ত

নহে তারা কারো অধীন ভৃত্য,

কাল-নদী ধায় অধীরা!

তবে দাও ঢালি’,—কেবল মাত্র

দু চারি দিবস, দু চারি রাত্র,—

পূর্ণ করিয়া জীবনপাত্র

জন-সংঘাত মদিরা!

নারীর দান

নারীর দান।

একদা প্রাতে কুঞ্জ তলে

অন্ধ বালিকা

পত্রপুটে আনিয়া দিল

পুষ্প মালিকা।

কণ্ঠে পরি অশ্রু জল

ভরিল নয়নে;

বক্ষে লয়ে চুমিনু তার

স্নিগ্ধ বয়নে।

কহিনু তারে “অন্ধকারে

দাঁড়ায়ে রমণী

কি ধন তুমি করিছ দান

না জান আপনি!

পুষ্পসম অন্ধ তুমি

অন্ধ বালিকা,

দেখনি নিজে মােহন কি যে

তােমার মালিকা!”

২৫ মাঘ,

১৩০২।

নীরব তন্ত্রী

নীরব তন্ত্রী।

“তোমার বীণায় সব তার বাজে,

ওহে বীণ্‌-কার,

তারি মাঝে কেন নীরব কেবল

একখানি তার”?

“ভব-নদীতীরে হৃদি মন্দিরে

দেবতা বিরাজে,

পুজা সমাপিয়া এসেছি ফিরিয়া

আপনার কাজে।

বিদায়ের ক্ষণে শুধাল পূজারী,—

দেবীরে কি দিলে?

তব জুনমের শ্রেষ্ঠ কি ধন

ছিল এ নিখিলে?—

কহিলাম আমি-সঁপিয়া এসেছি

পূজা-উপহার

আমার বীণায় ছিল যে একটি

সুবর্ণ তার;

যে তারে আমার হৃদয়বনের

যত মধুকর

ক্ষণেকে ক্ষণেকে ধ্বনিয়া তুলিত

গুঞ্জন স্বর,—

যে তারে আমার কোকিল গাহিত

বসন্ত গান-

সেইখানি আমি দেবতা চরণে

করিয়াছি দান।

তাই এ বীণায় বাজেনা কেবল

একখানি তার,—

আছে তাহা শুধু মৌন মহৎ

পুজা-উপহার।”

৪ ফাল্গুন,

১৩০২।

পুরাতন ভৃত্য

পুরাতন ভৃত্য।

ভূতের মতন চেহারা যেমন,

নির্ব্বোধ অতি ঘোর!

যা কিছু হারায়, গিন্নি বলেন

কেষ্টা বেটাই চোর!

উঠিতে বসিতে করি বাপান্ত,

শুনেও শোনে না কানে।

যত পায় বেত না পায় বেতন

তবু না চেতন মানে।

বড় প্রয়োজন, ডাকি প্রাণপণ

চীৎকার করি’ “কেষ্টা,”-

যত করি তাড়া, নাহি পাই সাড়া,

খুজে ফিরি সারা দেশ্‌টা!

তিনখানা দিলে একখানা রাখে,

বাকি কোথা নাহি জানে।

একখানা দিলে নিমেষ ফেলিতে

তিনখানা করে আনে!

যেখানে সেখানে দিবসে দুপরে

নিদ্রাটি আছে সাধা।

মহা কলরবে গালি দেই যবে

পাজি হতভাগা গাধা,

দরজার পাশে দাঁড়িয়ে সে হাসে

দেখে’ জ্বলে’ যায় পিত্ত!

তবু মায়া তার ত্যাগ করা ভার

বড় পুরাতন ভৃত্য!

ঘরের কর্ত্রী রুক্ষ মূর্ত্তি

বলে, “আর পারি না কো!

“রহিল তোমার এ ঘর দুয়ার

কেষ্টারে লয়ে থাকো!

“না মানে শাসন, বসন বাসন

অশন আসন যত

“কোথায় কি গেলো, শুধু টাকাগুলো

যেতেছে জলের মত!

“গেলে সে বাজার, সারাদিনে আর

দেখা পাওয়া তার ভার!

“করিলে চেষ্টা কেষ্টা ছাড়া কি

ভত্য মেলে না আর!”

শুনে মহা রেগে ছুটে যাই বেগে,

আনি তার টিকি ধরে,’-

বলি তারে “পাজি, বেরো তুই আজই,

দূর করে দিনু তোরে!”

ধীরে চলে যায়, ভাবি, গেল দায়;—

পরদিনে উঠে দেখি

হুঁকাটি বাড়ায়ে রয়েছে দাঁড়ায়ে

বেটা বুদ্ধির ঢেঁকি!

প্রসন্ন মুখ, নাহি কোন দুখ,

অতি অকাতর চিত্ত!

ছাড়ালে না ছাড়ে, কি করিব তারে,

মোর পুরাতন ভৃত্য!

সে বছরে ফাঁকা পেনু কিছু টাকা

করিয়া দালাল-গিরি।

করিলাম মন শ্রীবৃন্দাবন

বারেক আসিব ফিরি।

পরিবার তার সাথে যেতে চায়,—

বুঝায়ে বলিনু তারে-

পতির পুণ্যে সতীর পুণ্য;—

নহিলে খরচ বাড়ে!

লয়ে রশারশি করি কশাকশি

পোঁটলা পুঁটুলি বাঁধি’

বলয় বাজায়ে বাক্স সাজায়ে

গৃহিণী কহিল কাঁদি,—

“পরদেশে গিয়ে কেষ্টারে নিয়ে

কষ্ট অনেক পাবে!”

আমি কহিলাম “আরে রাম রাম!

নিবারণ সাথে যাবে!”

রেলগাড়ি ধায়;—হেরিলাম হায়

নামিয়া বর্দ্ধমানে-

কৃষ্ণকান্ত অতি প্রশান্ত

তামাক্ সাজিয়া আনে!

স্পর্ধা তাহার হেন মতে আর

কত বা সহিব নিত্য!

যত তারে দুষি’ তবু হনু খুসি

হেরি পুরাতন ভৃত্য!

নামিনু শ্রীধামে; দক্ষিণে বামে

পিছনে সমুখে যত

লাগিল পাণ্ডা, নিমেষে প্রাণ্‌টা

করিল কণ্ঠাগত!

জন ছয় সাতে মিলি একসাথে

পরম বন্ধুভাবে

করিলাম বাসা, মনে হল আশা

আরামে দিবস যাবে!

কোথা ব্রজবালা, কোথা বনমালা,

কোথা বনমালী হরি!

কোথা, হা হন্ত, চিরবসন্ত!

আমি বসন্তে মরি!

বন্ধু যে যত স্বপ্নের মত

বাসা ছেড়ে দিল ভঙ্গ।

আমি একা ঘরে, ব্যাধি-খরশরে

ভরিল সকল অঙ্গ!

ডাকি নিশিদিন সকরুণ ক্ষীণ-

“কেষ্ট আয় রে কাছে!

এতদিনে শেষে আসিয়া বিদেশে

প্রাণ বুঝি নাহি বাঁচে!”

হেরি তার মুখ ভরে’ ওঠে বুক,

সে যেন পরম বিত্ত!

নিশিদিন ধরে’ দাঁড়ায়ে শিয়রে

মোর পুরাতন ভৃত্য!

মুখে দেয় জল, শুধায় কুশল,

শিরে দেয় মোর হাত;

দাঁড়ায়ে নিঝুম, চোখে নাই ঘুম,

মুখে নাই তার ভাত।

বলে বার বার, “কর্ত্তা, তোমার

কোন ভয় নাই, শুন,

“যাবে দেশে ফিরে, মা-ঠাকুরাণীরে

দেখিতে পাইবে পুন।”

লভিয়া আরাম আমি উঠিলাম;

তাহারে ধরিল জ্বরে;

নিল সে আমার কাল-ব্যাধিভার

আপনার দেহ পরে!

হয়ে জ্ঞানহীন কাটিল দুদিন

বন্ধ হইল নাড়ি।

এতবার তারে গেনু ছাড়াবারে,

এতদিনে গেল ছাড়ি’!

বহুদিন পরে আপনার ঘরে

ফিরিনু সারিয়া তীর্থ।

আজ সাথে নেই চিরসাথী সেই

মোর পুরাতন ভৃত্য।

১২ ফাল্গুন,

১৩০১।

পূর্ণিমা

পূর্ণিমা।

পড়িতেছিলাম গ্রন্থ বসিয়া একেলা,

সঙ্গীহীন প্রবাসের শুন্য সন্ধ্যাবেলা

করিবারে পরিপূর্ণ। পণ্ডিতের লেখা

সমালোচনার তত্ত্ব; পড়ে’ হয় শেখা

সৌন্দর্য্য কাহারে বলে—আছে কি কি বীজ

কবিত্ব কলায়;—শেলি, গেটে, কোল্‌রীজ

কান্ কোন্ শ্রেণী! পড়ি’ পড়ি’ বহুক্ষণ

তাপিয়া উঠিল শির, শ্রান্ত হল মন,

মনে হল সব মিথ্যা, কবিত্ব কল্পনা

সৌন্দর্য্য সুরুচি রস সকলি জল্পনা

লিপি-বণিকের;—অন্ধ গ্রন্থকীটগণ

বহু বর্ষ ধরি’ শুধু করিছে রচন

শব্দ মরীচিকা জাল, আকাশের পরে

অকর্ম্ম আলস্যাবেশে দুলিবার তরে

দীর্ঘ রাত্রি দিন!

অবশেষে শ্রান্তি মানি

তন্দ্রাতুর চোখে, বন্ধ করি গ্রন্থখানি

ঘড়িতে দেখিনু চাহি দ্বিপ্রহর রাতি,

চমকি আসন ছাড়ি নিবাইনু বাতি।

যেমনি নিবিল আলো, উচ্ছ্বসিত স্রোতে

মুক্ত দ্বারে, বাতায়নে, চতুর্দ্দিক হতে

চকিতে পড়িল কক্ষে বক্ষে চক্ষে আসি

ত্রিভুবন বিপ্লাবিনী মৌন সুধাহাসি!

হে সুন্দরী হে প্রেয়সী, হে পূর্ণ পূর্ণিমা,

অনন্তের অন্তরশায়িনী! নাহি সীমা

তব রহস্যের! এ কি মিষ্ট পরিহাসে

সংশয়ীর শুষ্ক চিত্ত সৌন্দর্য্য উচ্ছ্বাসে

মুহূর্ত্তে ডুবালে? কখন্ দুয়ারে এসে

মুখানি বাড়ায়ে, অভিসারিকার বেশে

আছিলে দাঁড়ায়ে, এক প্রান্তে, সুররাণী,

সুদূর নক্ষত্র হতে সাথে করে’ আনি’

বিশ্বতরা নীরবতা! আমি গৃহকোণে

তর্কজালবিজড়িত ঘন বাক্যবনে

শুষ্কপত্রপরিকীর্ণ অক্ষরের পথে

একাকী ভ্রমিতেছিনু শূন্য মনোরথে,

তোমারি সন্ধানে! উদ্ভ্রান্ত এ ভকতেরে

এতক্ষণ ঘুরাইলে ছলনার ফেরে!

কি জানি কেমন করে’ লুকায়ে দাঁড়ালে

একটি ক্ষণিক ক্ষুদ্র দীপের আড়ালে

হে বিশ্বব্যাপিনী লক্ষ্মী! মুগ্ধ কর্ণপুটে

গ্রন্থ হতে গুটিকত বৃথা বাক্য উঠে’

আচ্ছন্ন করিয়াছিল কেমনে না জানি

লোকলোকান্তরপূর্ণ তব মৌন বাণী!

১৬ অগ্রহায়ণ,

পূর্ণিমা।

১৩০২।

প্রস্তর মূর্ত্তি

প্রস্তর মূর্ত্তি।

হে নির্ব্বাক্‌ অচঞ্চল পাষাণ-সুন্দরী,

দাঁড়ায়ে রয়েছ তুমি কত বর্ষ ধরি’

অনম্বরা অনাসক্তা চির একাকিনী

আপন সৌন্দর্য্য ধ্যানে দিবস যামিনী

তপস্যা-মগনা। সংসারের কোলাহল

তােমারে আঘাত করে নিয়ত নিস্ফল,-

জন্ম মৃত্যু দুঃখ সুখ অন্ত অভ্যুদয়

তরঙ্গিত চারিদিকে চরাচরময়,

তুমি উদাসিনী! মহাকাল পদতলে

মুগ্ধনেত্রে ঊর্দ্ধমুখে রাত্রিদিন বলে

“কথা কও, কথা কও, কথা কও প্রিয়ে,

কথা কও, মৌন বধু, রয়েছি চাহিয়ে!”

তুমি চির বাক্যহীন, তব মহাবাণী

পাষাণে আবদ্ধ, ওগাে সুন্দরী পাষাণী!

২৪ মাঘ,

১৩০২।

প্রেমের অভিষেক

প্রেমের অভিষেক।

তুমি মোরে করেছ সম্রাট্‌! তুমি মোরে

পরায়েছ গৌরব-মুকুট! পুষ্পড়োরে

সাজায়েছ কণ্ঠ মোর; তব রাজটীকা

দীপিছে ললাটমাঝে মহিমার শিখা

অহর্নিশি! আমার সকল দৈন্য লাজ,

আমার ক্ষুদ্রতা যত, ঢাকিয়াছ আজ

তব রাজ-আস্তরণে! হৃদিশয্যাতল

শুভ্র দুগ্ধফেননিভ, কোমল শীতল,

তারি মাঝে বসায়েছ; সমস্ত জগৎ

বাহিরে দাঁড়ায়ে আছে, নাহি পায় পথ

সে অন্তর-অন্তঃপুরে! নিভৃত সভায়

আমারে চৌদিকে ঘিরি সদা গান গায়

বিশ্বের কবিরা মিলি; অমরবীণায়

উঠিয়াছে কি ঝঙ্কার! নিত্য শুনা যায়

দূর দূরান্তর হতে দেশবিদেশের

ভাষা, যুগযুগান্তের কথা, দিবসের

নিশীথের গান, মিলনের বিরহের

গাথা, তৃপ্তিহীন শ্রান্তিহীন আগ্রহের

উৎকণ্ঠিত তান!-

প্রেমের অমরাবতী,

প্রদোষ-আলোকে যেথা দময়ন্তী সতী

বিচরে নলের সনে, দীর্ঘনিঃশ্বসিত

অরণ্যের বিষাদ-মর্ম্মের; বিকশিত

পুষ্পবীথিতলে, শকুন্তলা আছে বসি

কর-পদ্মতল-লীন স্নান মুখশশি

ধ্যানরতা; পুরুরবা ফিরে অহরহ

বনে বনে, গীতস্বরে দুঃসহ বিরহ

বিস্তারিয়া বিশ্বমাঝে; মহারণ্যে যেথা,

বীণা হস্তে লয়ে, তপস্বিনী মহাশ্বেতা

মহেশ-মন্দিরতলে বসি একাকিনী

অন্তরবেদনা দিয়ে গড়িছে রাগিণী

সান্তনা-সিঞ্চিত; গিরিতটে শিলাতলে

কানে কানে প্রেমবার্ত্তা কহিবার ছলে

সুভদ্রার লজ্জারুণ কুসুমকপোল

চুম্বিছে ফাল্গুণী; ভিখারী শিবের কোল

সদা আগলিয়া আছে প্রিয়া পার্ববতীরে

অনন্ত ব্যগ্রতাপাশে; সুখদুঃখনীরে

বহে অশ্রু-মন্দাকিনী, মিনতির স্বরে

কুসুমিত বনানীরে ম্লানমুখী করে

করুণায়; বাঁশরীর ব্যথাপূর্ণ তান

কুঞ্জে কুঞ্জে তরুচ্ছায়ে করিছে সন্ধান

হৃদয়সাথীরে;—হাত ধরে’ মোরে তুমি

লয়ে গেছ সৌন্দর্যের সে নন্দনভূমি

অমৃত-আলয়ে! সেথা আমি জ্যোতিষ্মান্

অক্ষয় যৌবনময় দেবতাসমান,

সেথা মোর লাবণ্যের নাহি পরিসীমা,

সেথা মোরে অর্পিয়াছে আপন মহিমা

নিখিল প্রণয়ী; সেথা মোর সভাসদ্‌

রবিচন্দ্রতারা, পরি’ নব পরিচ্ছদ

শুনায় আমারে তারা নব নব গান

নব অর্থভরা; চির-সুহৃদ্‌সমান

সর্ব্ব চরাচর! হেথা আমি কেহ নহি,

সহস্রের মাঝে একজন,—সদা বহি

সংসারের ক্ষুদ্র ভার,—কত অনুগ্রহ

কত অবহেলা সহিতেছি অহরহ;

সেই শত সহস্রের পরিচয়হীন

প্রবাহ হইতে, এই তুচ্ছ কর্ম্মাধীন

মোরে তুমি লয়েছ তুলিয়া, নাহি জানি

কি কারণে! অয়ি মহীয়সী মহারাণী

তুমি মোরে করিয়াছ মহীয়ান্‌! আজি

এই যে আমারে ঠেলি চলে জনরাজি

না তাকায়ে মোর মুখে, তাহারা কি জানে

নিশিদিন তোমার সোহাগ সুধাপানে

অঙ্গ মোর হয়েছে অমর? তাহারা কি

পায় দেখিবারে-নিত্য মোরে আছে ঢাকি

মন তব অভিনব লাবণ্য বসনে?

তব স্পর্শ তব প্রেম রেখেছি যতনে,

তব সুধাকণ্ঠবাণী, তোমার চুম্বন,

তোমার আঁখির দৃষ্টি, সর্ব্ব দেহ মন

পূর্ণ করি; রেখেছে যেমন সুধাকর

দেবতার গুপ্ত সুধা যুগ যুগান্তর

আপনারে সুধাপাত্র করি; বিধাতার

পুণ্য অগ্নি জ্বালায়ে রেখেছে অনিবার

সবিতা যেমন সযতনে; কমলার

চরণ কিরণে যথা পরিয়াছে হার

সুনির্মল গগনের অনন্ত ললাট!

হে মহিমাময়ী মোরে করেছ সম্রাট!

১৪ মাঘ,

১৩০০ সাল।

প্রৌঢ়

প্রৌঢ়।

যৌবন নদীর স্রোতে তীব্র বেগভরে

একদিন ছুটেছিনু; বসন্ত পবন

উঠেছিল উচ্ছ্বসিয়া;—তীর-উপবন

ছেয়েছিল ফুল্লফুলে;—তরুশাখা পরে

গেয়েছিল পিককুল,—আমি ভাল করে’

দেখি নাই শুনি নাই কিছু-অনুক্ষণ

দুলেছিনু আলোড়িত তরঙ্গ শিখরে

মত্ত সন্তরণে। আজি দিবা অবসানে

সমাপ্ত করিয়া খেলা উঠিয়াছি তীরে

বসিয়াছি আপনার নিভৃত কুটীরে,—

বিচিত্র কল্লোল গীত পশিতেছে কানে,—

কত গন্ধ আসিতেছে সায়াহ্ণ সমীরে;

বিস্মিত নয়ন মেলি হেরি শূন্য পানে

গগনে অনন্তলোক জাগে ধীরে ধীরে।

৭ ফাল্গুন,

১৩০২।

বিজয়িনী

বিজয়িনী।

অচ্ছোদ সরসীনীরে রমণী যেদিন

নামিলা স্নানের তরে, বসন্ত নবীন

সেদিন ফিরিতেছিল ভুবন ব্যাপিয়া

প্রথম প্রেমের মত কাঁপিয়া কাঁপিয়া

ক্ষণে ক্ষণে শিহরি শিহরি! সমীরণ

প্রলাপ বকিতেছিল প্রচ্ছায় সঘন

পল্লবশয়ন তলে, মধ্যাহের জ্যোতি

মুর্চ্ছিত বনের কোলে; কপোত দম্পতি

বসি শান্ত অকম্পিত চম্পকের ডালে

ঘন চঞ্চ-চুম্বনের অবসর কালে

নিভৃতে করিতেছিল বিহ্বল কূজন।

তীরে শ্বেত শিলাতলে সুনীল বসন

লুঠাইছে একপ্রান্তে স্খলিত-গৌরব

অনাদৃত,—শ্রীঅঙ্গের উত্তপ্ত সৌরভ

এখনো জড়িত তাহে,— আয়ু-পরিশেষ

মুর্চ্ছান্বিত দেহে যেন জীবনের লেশ,—

লুটায় মেখলাখানি ত্যজি কটিদেশ

মৌন অপমানে;—নুপুর রয়েছে পড়ি;

বক্ষের নিচোল বাস যায় গড়াগড়ি

ত্যজিয়া যুগল স্বর্গ কঠিন পাষাণে।

কনক দর্পণ খানি চাহে শূন্যপানে

কার মুখ স্মরি! স্বর্ণপাত্রে সুসজ্জিত

চন্দন কুঙ্কুমপঙ্ক, লুণ্ঠিত লজ্জিত

দুটি রক্ত শতদল, অম্লান সুন্দর

শ্বেত করবীর মাল,—ধৌত শুক্লাম্বর

লঘু স্বচ্ছ, পূর্ণিমার আকাশের মত।

পরিপূর্ণ নীল নীর স্থির অনাহত-

কুলে কুলে প্রসারিত বিহ্বল গভীর

বুকভরা আলিঙ্গন রাশি! সারসীর

প্রান্তদেশে, বকুলের ঘনচ্ছায়া তলে

শ্বেত শিলাপটে, আবক্ষ ডুবায়ে জলে

বসিয়া সুন্দরী,—সকম্পিত ছায়াখানি

প্রসারিয়া স্বচ্ছনীরে-বক্ষে লয়ে টানি

সযত্নপালিত শুভ্র রাজহংসীটিরে

করিছে সোহাগ,—নগ্ন বাহুপাশে ঘিরে

সুকোমল ডানা দুটি, লম্ব গ্রীবা তার

রাখি স্কন্ধ পরে, কহিতেছে বারম্বার

স্নেহের প্রলাপ বাণী—কোমল কপোল

বুলাইছে হংসপৃষ্ঠে পরশ-বিভোল।

চৌদিকে উঠিতেছিল মধুর রাগিণী

জলে স্থলে নভস্তলে; সুন্দর কাহিনী

কে যেন রচিতেছিল ছায়া রৌদ্রকরে

অরণ্যের সুপ্তি আর পাতার মর্ম্মরে

বসন্ত দিনের কত স্পন্দনে কম্পনে

নিঃশ্বাসে উচ্ছ্বাসে ভাষে আভাসে গুঞ্জনে

চমকে ঝলকে। যেন আকাশ-বীণার

রবি-রশ্মী-তন্ত্রীগুলি সুরবালিকার

চম্পক অঙ্গলিঘাতে সঙ্গীত ঝঙ্কারে

কাঁদিয়া উঠিতেছিল—মৌন স্তব্ধতারে

বেদনায় পীড়িয়া মুর্চ্ছিয়া। তরুতলে

স্খলিয়া পড়িতেছিল নিঃশব্দে বিরলে

বিবশ বকুলগুলি; কোকিল কেবলি

অশ্রান্ত গাহিতেছিল,—বিফল কাকলী

কাঁদিয়া ফিরিতেছিল বনান্তর ঘুরে

উদাসিনী প্রতিধ্বনি; ছায়ায় অদূরে

সরোবর প্রান্তদেশে ক্ষুদ্র নির্ঝরিণী

কলনৃত্যে বাজাইয়া মাণিক্য কিঙ্কিণী

কল্লোলে মিশিতেছিল;—তৃণাঞ্চিত তীরে

জল কলকল স্বরে মধ্যাহ্ণ সমীরে

সারস ঘুমায়েছিল দীর্ঘ গ্রীবাখানি

ভঙ্গীভরে বাঁকাইয়া পৃষ্ঠে লয়ে টানি’

ধূসর ডানার মাঝে; রাজহংসদল

আকাশে বলাকা বাঁধি সত্বর-চঞ্চল

ত্যজি কোন্ দূর নদী-সৈকত-বিহার

উড়িয়া চলিতেছিল গলিত-নীহার

কৈলাসের পানে। বহু বনগন্ধ বহে’

অকস্মাৎ শ্রান্ত বায়ু উত্তপ্ত আগ্রহে

লুটায়ে পড়িতেছিল সুদীর্ঘ নিঃশ্বাসে

মুগ্ধ সরসীর বক্ষে স্নিগ্ধ বাহুপাশে।

মদন, বসন্তসখা, ব্যগ্র কৌতুহলে

লুকায়ে বসিয়াছিল বকুলের তলে

পুষ্পাসনে, হেলায় হেলিয়া তরুপরে

প্রসারিয়া পদযুগ নব তৃণস্তরে,

পীত উত্তরীয় প্রান্ত লুষ্ঠিত ভূতলে,

গ্রস্থিত মালতী মালা কুঞ্চিত কুন্তলে,

গৌর কণ্ঠতটে,—সহাস্য কটাক্ষ করি

কৌতুকে হেরিতেছিল মোহিনী সুন্দরী

তরুণীর স্নানলীলা-অধীর চঞ্চল

উৎসুক অঙ্গুলি তার, নির্ম্মল কোমল

বক্ষস্থল লক্ষ্য করি লয়ে পুষ্পশর

প্রতীক্ষা করিতেছিল নিজ অবসর।

গুঞ্জরি ফিরিতেছিল লক্ষ মধুকর

ফুলে ফুলে; ছায়াতলে সুপ্ত হরিণীরে

ক্ষণে ক্ষণে লেহন করিতেছিল ধীরে

বিমুগ্ধ-নয়ন মৃগ; বসন্ত পরশে

পূর্ণ ছিল বনচ্ছায়া আলসে লালসে।

জলপ্রান্তে ক্ষুব্ধ ক্ষুন্ন কম্পন রাখিয়া,

সজল চরণচিহ্ণ আঁকিয়া আঁকিয়া

সোপানে সোপানে, তীরে উঠিলা রূপসী;

মুক্ত কেশভার পৃষ্ঠে পড়ি গেল খসি’।

অঙ্গে অঙ্গে যৌবনের তরঙ্গ উচ্ছ্বল

লাবণ্যের মায়ামন্ত্রে স্থির অচঞ্চল

বন্দী হয়ে আছে-তারি শিখরে শিখরে

পড়িল মধ্যাহ্ণ রৌদ্র-ললাটে অধরে

উপরে কটিতটে স্তনাগ্র চূড়ায়

বাহুযুগে,—সিক্ত দেহে রেখায় রেখায়

ঝলকে ঝলকে। ঘিরি তার চারিপাশ

নিখিল বাতাস আর অনন্ত আকাশ

যেন এক ঠাঁই এসে আগ্রহে সন্নত

সর্ব্বাঙ্গ চুম্বিল তার,—সেবকের মত

সিক্ত তনু মুছি নিল আতপ্ত অঞ্চলে

সযতনে,—ছায়াখানি রক্ত পদতলে

চ্যুত বসনের মত রহিল পড়িয়া;—

অরণ্য রহিল স্তব্ধ, বিস্ময়ে মরিয়া!

ত্যজিয়া বকুলমূল মৃদুমন্দ হাসি’

উঠিল অনঙ্গদেব।

সম্মুখেতে আসি

থমকিয়া দাঁড়াল সহসা। মুখপানে

চাহিল নিমেষহীন নিশ্চল নয়ানে

ক্ষণকাল তরে। পরক্ষণে ভূমিপরে

জানু পাতি’ বসি, নির্ব্বাক্‌ বিস্ময়ভরে

নতশিরে, পুষ্পধনু পুষ্পশর ভার

সমর্পিল পদ প্রান্তে পূজা-উপচার

তৃণ শূন্য করি। নিরস্ত্র মদনপানে

চাহিলা সুন্দরী শান্ত প্রসন্ন বয়ানে।

১ মাঘ,

১৩০২।

ব্রাহ্মণ

ব্রাহ্মণ।

(ছান্দোগ্যোপনিষৎ। ৪ প্রপাঠক। ৪ অধ্যায়।)

অন্ধকার বনচ্ছায়ে সরস্বতীতীরে

অস্ত গেছে সন্ধ্যাসূর্য্য; আসিয়াছে ফিরে

নিস্তব্ধ আশ্রমমাঝে ঋষিপুত্রগণ

মস্তকে সমিধ্‌ভার করি আহরণ

বনান্তর হতে; ফিরায়ে এনেছে ডাকি

তপোবন-গোষ্ঠগৃহে স্নিগ্ধশান্ত-আঁখি

শ্রান্ত হোমধেনুগণে; করি’ সমাপন

সন্ধ্যাস্নান, সবে মিলি লয়েছে আসন

গুরু গৌতমেরে ঘিরি কুটীর-প্রাঙ্গণে

হোমাগ্নি আলোকে। শূন্যে অনন্ত গগনে

ধ্যানমগ্ন মহাশাস্তি; নক্ষত্রমণ্ডলী

সারি সারি বসিয়াছে স্তব্ধ কুতূহলী

নিঃশব্দ শিষ্যের মত। নিভৃত আশ্রম

উঠিল চকিত হয়ে,—মহর্ষি গৌতম

কহিলেন—বৎসগণ, ব্রহ্মবিদ্যা কহি,

কর অবধান!

হেনকালে অর্ঘ্য বহি’

করপুট ভরি, পশিলা প্রাঙ্গণতলে

তরুণ বালক; বন্দি ফলফুলদলে

ঋষির চরণ-পদ্ম, নমি’ ভক্তিভরে

কহিলা কোকিলকণ্ঠে সুধাস্নিগ্ধস্বরে,—

ভগবন্‌, ব্রহ্মবিদ্যাশিক্ষা-অভিলাষী

আসিয়াছি দীক্ষাতরে কুশক্ষেত্রবাসী

সত্যকাম নাম মোর!

শুনি স্মিতহাসে

ব্রহ্মর্ষি কহিলা তারে স্নেহশান্ত ভাষে-

কুশল হউক্‌ সৌম্য! গোত্র কি তোমার?

বৎস, শুধু ব্রাহ্মণের আছে অধিকার

ব্রহ্মবিদ্যালাভে।—

বালক কহিলা ধীরে,—

ভগব্‌ন, গোত্র নাহি জানি। জননীরে

শুধায়ে আসিব কল্য কর অনুমতি!-

এত কহি ঋষিপদে করিয়া প্রণতি

গেলা চলি সত্যকাম, ঘন অন্ধকার

বন-বীথি দিয়া-পদব্রজে হয়ে পার

ক্ষীণ স্বচ্ছ শান্ত সরস্বতী, বালুতীরে

সুপ্তিমৌন গ্রামপ্রান্তে জননী-কুটীরে

করিলা প্রবেশ।

ঘরে সন্ধ্যাদীপ জ্বালা’;

দাঁড়ায়ে দুয়ার ধরি জননী জবালা

পুত্রপথ চাহি; হেরি তারে বক্ষে টানি’

আঘ্রাণ করিয়া শির কহিলেন বাণী

কল্যাণ কুশল। শুধাইলা সত্যকাম-

কহ গো জননী মোর পিতার কি নাম,

কি বংশে জনম? গিয়াছিনু দীক্ষাতরে

গৌতমের কাছে;— গুরু কহিলেন মোরে,—

বৎস, শুধু ব্রাহ্মণের আছে অধিকার

ব্রহ্মবিদ্যালাভে।—মাতঃ, কি গোত্র আমার?

শুনি কথা, মৃদুকণ্ঠে অবনতমুখে

কহিল জননী,—যৌবনে দারিদ্র্যদুখে

বহু-পরিচর্য্যা করি পেয়েছিনু তোরে,

জন্মেছিস্ ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে,

গোত্র তব নাহি জানি, তাত!

পরদিন

তপোবন-তরুশিরে প্রসন্ন নবীন

জাগিল প্রভাত। যত তাপস বালক,

শিশির-সুস্নিগ্ধ যেন তরুণ আলোক,

ভক্তি-অশ্রু-ধৌত যেন নব পুণ্যচ্ছটা,—

প্রাতঃস্নাত স্নিগ্ধচ্ছবি আর্দ্রসিক্ত জটা,

শুচিশোভা সৌম্যমূর্ত্তি সমুজ্জ্বলকায়

বসেছে বেষ্টন করি বৃদ্ধ বটচ্ছায়

গুরু গৌতমেরে। বিহঙ্গকাকলীগান,

মধুপ-গুঞ্জনগীতি, জলকলতান,

তারি সাথে উঠিতেছে গম্ভীর মধুর

বিচিত্র তরুণ কণ্ঠে সম্মিলিত সুর

শান্ত সামগীতি।

হেন কালে সত্যকাম

কাছে আসি ঋষিপদে করিলা প্রণাম,—

মেলিয়া উদার আঁখি রহিল নীরবে।

আচার্য্য আশিষ করি শুধাইলা তবে,—

কি গোত্র তোমার, সৌম্য, প্রিয়-দরশন?—

তুলি শির কহিলা বালক-ভগবন,

নাহি জানি কি গোত্র আমার। পুছিলাম

জননীরে;—কহিলেন তিনি,—সত্যকাম,

বহু-পরিচর্য্যা করি পেয়েছিনু তোরে,

জন্মেছি ভর্তৃহীনা জবালার ক্রোড়ে-

গোত্র তব নাহি জানি।

শুনি সে বারতা

ছাত্রগণ মৃদুস্বরে আরম্ভিল কথা,—

মধুচক্রে লোষ্ট্রপাতে বিক্ষিপ্ত চঞ্চল

পতঙ্গের নত-সবে বিস্ময়-বিকল,

কেহ বা হাসিল, কেহ করিল ধিক্কার

লজ্জাহীন অনার্য্যের হেরি অহঙ্কার।

উঠিলা গৌতম ঋষি ছাড়িয়া আসন

বাহু মেলি,—বালকেরে করি আলিঙ্গন

কহিলেন-অব্রাহ্মণ নহ তুমি, তাত।

তুমি দ্বিজোত্তম, তুমি সত্যকুলজাত!

৭ ফাল্গুন,

১৩০১

মরীচিকা

মরীচিকা।

কেন আসিতেছ মুগ্ধ মোর পানে ধেয়ে

ও গো দিকভ্রান্ত পান্থ, তৃষার্ত্ত নয়ানে

লুব্ধ বেগে! আমি যে তৃষিত তোমা চেয়ে!

আমি চির দিন থাকি এ মরু শয়ানে

সঙ্গীহারা। এ ত নহে পিপাসার জল,

এ ত নহে নিকুঞ্জের ছায়া,—পক্ক ফল

মধুরসে ভরা, এ ত নহে উৎসধারে

সিঞ্চিত সরস স্নিগ্ধ নবীন শাদ্বল

নয়ন নন্দন শ্যাম। পল্লব মাঝারে

কোথায় বিহঙ্গ, কোথা মধুর দল!

শুধু জেনো, একখানি বহ্ণিসম শিখা

তপ্ত বাসনার তুলি আমার সম্বল,—

অনন্ত পিপাসা পটে এ কেবল লিখা

চির তৃষার্ত্তের স্বপ্ন মায়া-মরীচিকা।

১৬ই মাঘ,

১৩০২।

মৃত্যুর পরে

মৃত্যুর পরে।

আজিকে হয়েছে শান্তি

জীবনের ভুলভ্রান্তি

সব গেছে চুকে!

রাত্রিদিন ধুক্‌ধুক্‌

তরঙ্গিত দুঃখ সুখ

থামিয়াছে বুকে!

যত কিছু ভালমন্দ,

যত কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব

কিছু আর নাই!

বল শান্তি, বল শান্তি,

দেহসাথে সব ক্লান্তি

হয়ে যাক্ ছাই!

গুঞ্জরি’ করুণ তান

ধীরে ধীরে কর গান

বসিয়া শিয়রে!

যদি কোথা থাকে লেশ

জীবন-স্বপ্নের শেষ

তাও যাক্‌ মরে!

তুলিয়া অঞ্চলখানি

মুখ পরে দাও টানি,

ঢেকে দাও দেহ!

করুণ মরণ যথা

ঢাকিয়াছে সব ব্যথা,

সকল সন্দেহ!

বিশ্বের আলোেক যত

দিগ্বিদিকে অবিরত

যাইতেছে বয়ে’,

শুধু ওই আঁখি পরে

নামে তাহা স্নেহভরে

অন্ধকার হয়ে।

জগতের তন্ত্রীরাজি

দিনে উচ্চে উঠে বাজি

রাত্রে চুপে চুপে,

সে শব্দ তাহার পরে

চুম্বনের মত পড়ে

নীরবতা রূপে!

মিছে আনিয়াছ আজি

বসন্ত কুসুমরাজি

দিতে উপহার!

নীরবে আকুল চেখে

ফেলিতেছ বৃথা শোকে

নয়নাশ্রুধার!

ছিলে যারা রোষভরে

বৃথা এত দিন পরে

করিছ মার্জ্জনা!

অসীম নিস্তব্ধ দেশে

চিররাত্রি পেয়েছে সে

অনন্ত সান্ত্বনা!

গিয়েছে কি আছে বসে,

জাগিল কি ঘুমাল সে

কে দিবে উত্তর?

পৃথিবীর শ্রান্তি তারে

ত্যজিল কি একেবারে,

জীবনের জ্বর?

এখনি কি দুঃখ সুখে

কর্ম্মপথ অভিমুখে

চলেছে আবার?

অস্তিত্বের চক্রতলে

একবার বাঁধা পলে

পায় কি নিস্তার?

বসিয়া আপন দ্বারে

ভালমন্দ বল তারে

যাহা ইচ্ছা তাই!

অনন্ত জনম মাঝে

গেছে সে অনন্ত কাজে,

সে আর সে নাই।

আর পরিচিত মুখে

তোমাদের দুখে সুখে

আসিবে না ফিরে,

তবে তার কথা থাক্‌,

যে গেছে সে চলে যাক্‌

বিস্মৃতির তীরে!

জানিনা কিসের তরে

যে যাহার কাজ করে

সংসারে আসিয়া,

ভাল মন্দ শেষ করি

যায় জীর্ণ জন্মতরী

কোথায় ভাসিয়া!

দিয়ে যায় যত যাহা

রাখ তাহা ফেল তাহা

যা ইচ্ছা তোমার!

সে ত নহে বেচা-কেনা,

ফিরিবে না ফেরাবে না

জন্ম-উপহার!

কেন এই আনা গোনা,

কেন মিছে দেখাশোনা

দুদিনের তরে;

কেন বুকভরা আশা,

কেন এত ভালবাসা

অন্তরে অন্তরে;

আয়ু যার এতটুক্‌,

এত দুঃখ এত সুখ

কেন তার মাঝে;

অকস্মাৎ এ সংসারে

কে বাঁধিয়া দিল তারে

শত লক্ষ কাজে;

হেথায় যে অসম্পূর্ণ,

সহস্র আঘাতে চূর্ণ

বিদীর্ণ বিকৃত

কোথাও কি একবার

সম্পূর্ণতা আছে তার

জীবিত কি মৃত;

জীবনে যা প্রতিদিন

ছিল মিথ্যা অর্থহীন

ছিন্ন ছড়াছড়ি

মৃত্যু কি ভরিয়া সাজি

তারে গাঁথিয়াছে আজি

অর্থ পূর্ণ করি;

হেথা যারে মনে হয়

শুধু বিফলতাময়

অনিত্য চঞ্চল

সেথায় কি চুপে চুপে

অপূর্ব্ব নুতনরূপে

হয় সে সফল;

চিরকাল এই সব

রহস্য আছে নীরব

রুদ্ধ ওষ্ঠাধর,

জন্মান্তের নব প্রাতে

সে হয় ত আপনাতে

পেয়েছে উত্তর!

সে হয় ত দেখিয়াছে

পড়ে যাহা ছিল পাছে

আজি তাহা আগে;

ছোট যাহা চিরদিন

ছিল অন্ধকারে লীন,

বড় হয়ে জাগে;

যেথায় ঘৃণার সাথে

মানুষ আপন হাতে

লেপিয়াছে কালী

নূতন নিয়মে সেথা

জ্যোতির্ময় উজ্জ্বলতা

কে দিয়াছে জ্বালি!

কত শিক্ষা পৃথিবীর

খসে’ পড়ে জীর্ণচীর,

জীবনের সনে,

সংসারের লজ্জাভয়

নিমেষেতে দগ্ধ হয়

চিতা-হুতাশনে;

সকল অভ্যাস-ছাড়া

সর্ব্ব আবরণ হারা

সদ্য শিশুসম

নগ্নমূর্তি মরণের

নিষ্কলঙ্ক চরণের

সম্মুখে প্রণম’!

আপন মনের মত

সঙ্কীর্ণ বিচার যত

রেখে দাও আজ!

ভুলে যাও কিছুক্ষণ

প্রত্যহের আয়োজন,

সংসারের কাজ!

আজি ক্ষণেকের তরে

বসি বাতায়ন পরে

বাহিরেতে চাহ!

অসীম আকাশ হতে

বহিয়া আসুক্‌ স্রোতে

বৃহৎ প্রবাহ!

উঠিছে ঝিল্লির গান,

তরুর মর্ম্মর তান,

নদী কলস্বর,

প্রহরের আনাগোনা

যেন রাত্রে যায় শোনা

আকাশের পর!

উঠিতেছে চরাচরে

অনাদি অনন্তস্বরে

সঙ্গীত উদার

সে নিত্য-গানের সনে

মিশাইয়া লহ মনে

জীবন তাহার!

ব্যাপিয়া সমস্ত বিশ্বে

দেখ তারে সর্ব্বদৃশ্যে

বৃহৎ করিয়া;

জীবনের খুলি ধুয়ে

দেখ তারে দুরে থুয়ে

সম্মুখে ধরিয়া!

পলে পলে দণ্ডে দণ্ডে

ভাগ করি খণ্ডে খণ্ডে

মাপিয়ো না তারে!

থাক্‌ তব ক্ষুদ্র মাপ

ক্ষুদ্র পুণ্য, ক্ষুদ্র পাপ

সংসারের পারে!

আজ বাদে কাল যারে

ভুলে যাবে একেবারে

পরের মতন

তারে লয়ে আজি কেন

বিচার বিরোধ হেন,

এত আলাপন!

যে বিশ্ব কোলের পরে

চির দিবসের তরে

তুলে নিল তারে

তার মুখে শব্দ নাহি,

প্রশান্ত সে আছে চাহি

ঢাকি আপনারে!

বৃথা তারে প্রশ্ন করি,

বৃথা তার পায়ে ধরি,

বৃথা মরি কেঁদে;—

খুঁজে ফিরি অশ্রুজলে-

কোন্ অঞ্চলের তলে

নিয়েছে সে বেঁধে;

ছুটিয়া মৃত্যুর পিছে

ফিরে নিতে চাহি মিছে;—

সে কি আমাদের?

পলেক বিচ্ছেদে হায়

তখনি ত বুঝা যায়

সে যে অনন্তের!

চক্ষের আড়ালে তাই

কত ভয় সংখ্যা নাই;

সহস্র ভাবনা!

মুহূর্ত্ত মিলন হলে

টেনে নিই বুকে কোলে,

অতৃপ্ত কামনা!

পার্শ্বে বসে ধরি মুঠি,

শব্দমাত্রে কেঁপে উঠি,

চাহি চারিভিতে,

অনন্তের ধনটিরে

আপনার বুক চিরে

চাহি লুকাইতে!

হায়রে নির্ব্বোধ নর,

কোথা তোর আছে ঘর,

কোথা তোর স্থান!

শুধু তোর ওইটুক

অতিশয় ক্ষুদ্র বুক

ভয়ে কম্পমান!

ঊর্দ্ধে ওই দেখ চেয়ে

সমস্ত আকাশ ছেয়ে

অনন্তের দেশ,

সে যখন একধারে

লুকায়ে রাখিবে তারে

পাবি কি উদ্দেশ?

ওই হের সীমাহারা

গগনেতে গ্রহতারা

অসংখ্য জগৎ,

ওরি মাঝে পরিভ্রান্ত

হয় ত সে একা পান্থ

খুঁজিতেছে,পথ!

ওই দূর দূরান্তরে

অজ্ঞাত ভুবন পরে

কভু কোন খানে

আর কি গো দেখা হবে,

আর কি সে কথা কবে,

কেহ নাহি জানে!

যা হবার তাই হোক্‌,

ঘুচে যাক্‌ সর্ব্বশোক,

সর্ব্ব মরীচিকা!

নিবে যাক্ চিরদিন

পরিশ্রান্ত পরিক্ষীণ

মর্ত্ত্য জন্ম-শিখা!

সব তর্ক হোক্ শেষ,

সব রাগ সব দ্বেষ,

সকল বালাই!

বল শান্তি বল শান্তি

দেহ সাথে সব ক্লান্তি

পুড়ে হোক্‌ ছাই!

রাত্রে ও প্রভাতে

রাত্রে ও প্রভাতে।

কালি মধু যামনীতে জ্যোৎস্না নিশীথে

কুঞ্জকাননে সুখে

ফেনিলোচ্ছ্বল যৌবন সুরা

ধরেছি তোমার মুখে।

তুমি চেয়ে মোর আঁখিপরে

ধীরে পাত্র লুয়েছ করে,

হেসে করিয়াছ পান চুম্বনভরা

সরস বিম্বাধরে,

কালি মধু যামিনীতে জ্যোৎস্না নিশীথে

মধুর আবেশ ভরে।

তব অবগুণ্ঠন খানি

আমি খুলে ফেলেছিনু টানি’;

আমি কেড়ে রেখেছিনু বক্ষে, তোমার

কমল-কোমল পাণি।

ভাবে নিমীলিত তব যুগল নয়ন

মুখে নাহি ছিল বাণী!

আমি শিথিল করিয়া পাশ

খুলে দিয়েছিনু কেশরাশ,

তব আনমিত মুখখানি

সুখে থুয়েছিনু বুকে আনি,

তুমি সকল সোহাগ সয়েছিলে, সখি,

হাসি-মুকুলিত মুখে,

কালি মাধুবামিনীতে জ্যোৎস্না-নিশীথে

নবীন মিলন সুখে।

আজি নির্ম্মলবায়ু শান্ত ঊষায়

নির্জ্জন নদীতীরে

স্নান অবসানে শুভ্রবসনা

চলিয়াছ ধীরে ধীরে!

তুমি বামকরে লয়ে সাজি

কত তুলিছ পুষ্প রাজি,

দূরে দেবালয় তলে উষার রাগিণী

বাঁশিতে উঠিছে বাজি,

এই নির্ম্মলবায় শান্ত উষায়

জাহ্নবী তীরে আজি!

দেবি, তব সীঁথিমুলে লেখা

নব অরুণ সিঁদূর রেখা,

তব বাম বাহু বেড়ি শঙ্খ বলয়

তরুণ ইন্দুলেখা।

একি মঙ্গলময়ী মুরতি বিকাশি’

প্রভাতে দিয়েছ দেখা।

রাতে প্রেয়সীর রূপ ধরি

তুমি এসেছ প্রাণেশ্বরি,

প্রাতে কখন্ দেবীর বেশে

তুমি সমুখে উদিলে হেসে!

আমি সন্ত্রমভরে রয়েছি দাঁড়ায়ে

দূরে অবনত শিরে

আজি নির্ম্মলবায় শান্ত উষায়

নির্জ্জন নদীতীরে!

১ ফাল্গুন,

১৩০২।

শীতে ও বসন্তে

শীতে ও বসন্তে।

প্রথম শীতের মাসে

শিশির লাগিল ঘাসে,

হুহু করে হাওয়া আসে,

হিহি করে কাঁপে গাত্র।

আমি ভাবিলাম মনে,

এবার মাতিব রণে,

বৃথা কাজে অকারণে

কেটে গেছে দিনরাত্র।

লাগিব দেশের হিতে

গরমে বাদলে শীতে,

কবিতা নাটকে গীতে

করিব না অনাসৃষ্টি;

লেখা হবে সারবান্,

অতিশয় ধার-বান,

খাড়া র’ব দ্বারবান

দশদিকে রাখি দৃষ্টি।

এত বলি গৃহকোণে

বসিলাম দৃঢ় মনে

লেখকের যোগাসনে,

পাশে লয়ে মসীপাত্র।

নিশিদিন রুধি দ্বার,

স্বদেশের শুধি ধার,

নাহি হাঁফ ছাড়িবার

অবসর তিলমাত্র।

রাশি রাশি লিখে লিখে

একেবারে দিকে দিকে

মাসিকে ও সাপ্তাহিকে

করিলাম লেখাবৃষ্টি।

ঘরেতে জ্বলে না চূলো,

শরীরে উড়িছে ধূলো,

আঙ্গুলের ডগাগুলো

হয়ে গেল কালীকৃষ্টি!

খুঁটিয়া তারিখ মাস

করিলাম রাশ রাশ,

গাঁখিলাম ইতিহাস,

রচিলাম পুরাতত্ত্ব।

গালি দিয়া মহারাগে

দেখালেম দাগে দাগে

যে যাহা বলেছে আগে

কিছু তার নহে সত্য।

পুরাণে বিজ্ঞানে গোটা

করিয়াছি সিদ্ধি-ঘোঁটা,

যাহা কিছু ছিল মোটা

হয়ে গেছে অতি সূক্ষ্ম।

করেছি সমালোচনা,

আছে তাহে গুণপণা,

কেহ তাহা বুঝিল না,

মনে রয়ে গেল দুঃখ।

মেঘদূত-লোকে যাহা

কাব্যভ্রমে বলে “আহা,”-

আমি দেখায়েছি, তাহা

দর্শনের নব সূত্র।

নৈষধের কবিতাটি

ডারুয়িন-তত্ত্ব খাঁটি,

মোর আগে এ কথাটি

বল কে বলেছে কুত্র?

কাব্য কহিবার ভাণে

নীতি বলি কানে কানে

সে কথা কেহ না জানে,

বুঝে হতেছে ইষ্ট।

নভেল লেখার ছলে

শিখায়েছি সুকৌশলে

শাদাটিরে শাদা বলে,

কালো যাহা তাই কৃষ্ণ।

কত মাস এই মত

একে একে হ’ল গত,

আমি দেশহিতে রত

সব দ্বার করি বন্ধ।

হাসি গীত গল্পগুলি

ধূলিতে হইল ধূলি,

বেঁধে দিয়ে চোখে ঠুলি

কল্পনারে করি অন্ধ।

নাহি জানি চারি পাশে

কি ঘটিছে কোন্ মাসে,

কোন্ ঋতু কবে আসে,

কোন্ রাতে উঠে চন্দ্র।

আমি জানি, কুশিয়াণ

কতদুরে আগুয়ান,

বজেটের খতিয়ান্‌

কোথা তার আছে রন্ধ্র।

আমি জানি কোন দিন

পাশ হল কি আইন,

কুইনের বেহাইন্

বিধবা হইল কল্য;

জানি সব আটঘাট;—

গেজেটে করেছি পাঠ

আমাদের ছোটলাট

কোথা হতে কোথা চল্ল।

একদিন বসে বসে

লিখিয়া যেতেছি কসে’

এদেশেতে কার দোষে

ক্রমে কমে’ আসে শস্য;

কেনই বা অপঘাতে

মরে লোক দিবারাতে,

কেন ব্রাহ্মণের পাতে

নাহি পড়ে চর্ব্ব্য চোষ্য।

হেনকালে দুদ্দাড়,

খুলে গেল সব দ্বার,

চারিদিকে তোলপাড়

বেধে গেছে মহাকাণ্ড!

নদীজলে, বনে, গাছে

কেহ গাহে কেহ নাচে,

উলটিয়া পড়িয়াছে

দেবতার সুধাভাণ্ড।

উতলা পাগল-বেশে

দক্ষিণে বাতাস এসে

কোথা হতে হাহা হেসে

প’ল যেন মদমত্ত!

লেখাপত্র কেড়েকুড়ে-

কোথা কি যে গেল উড়ে,—

ওই রে আকাশ জুড়ে

ছড়ায় “সমাজ-তত্ত্ব!”

“রুশিয়ার অভিপ্রায়”

ওই কোথা উড়ে যায়,

গেল বুঝি হায় হায়

"আমিরের ষড়যন্ত্র!”

“প্রাচীন ভারত” বুঝি

আর পাইব না খুঁজি,

কোথা গিয়ে হল পুঁজি

“জাপানের রাজতন্ত্র"!

গেল গেল, ও কি কর,

আরে আরে ধর ধর!-

হাসে বন মর্‌-মর,

হাসে বায়ু কলহাস্যে!

উঠে হাসি নদীজলে

ছলছল কলকলে,

ভাসায়ে লইয়া চলে

“মনুর নূতন ভায্যে"।

বাদ প্রতিবাদ যত

শুক্‌নো পাতার মত

কোথা হল অপগত,—

কেহ তাহে নহে ক্ষুন্ন!

ফুলগুলি অনায়াসে

মুচকি মুচকি হাসে,

সুগভীর পরিহাসে

হাসিতেছে নীল শূন্য!

দেখিতে দেখিতে মোর

লাগিল নেশার ঘোর,

কোথা হতে মন-চোর

পশিল অমার বক্ষে;

যেমনি সমুখে চাওয়া

অমনি সে ভূতে-পাওয়া

লাগিল হাসির হাওয়া

আর বুঝি নাহি রক্ষে!

প্রথমে প্রাণের কূলে

শিহরি শিহরি দুলে,

ক্রমে সে মরম-মূলে

লহরী উঠিল চিত্তে।

তার পরে মহা হাসি

উছসিল রাশি রাশি,

হৃদয় বাহিরে আসি

মাতিল জগৎ-নৃত্যে!

এস এস বঁধু এস,

আধেক আঁচরে বস,

অবাক অধরে হাস

ভুলাও সকল তত্ত্ব!

তুমি শুধু চাহ ফিরে,—

ডুবে যাক ধীরে ধীরে

সুধাসাগরের নীরে

যত মিছা যত সত্য!

আনগো যৌবনগীতি,

দুরে চলে যাক্ নীতি,

আন পরাণের প্রীতি,

থাকু প্রবীণের ভাষ্য!

এসহে আপনাহারা,

প্রভাত সন্ধ্যার তারা,

বিষাদের আঁখিধারা

প্রমোদের মধুহাস্য!

আন বাসনার ব্যথা,

অকারণ চঞ্চলতা,

আন কানে-কানে কথা,

চোখে চোখে লাজ-দৃষ্টি!

অসম্ভব, আশাতীত,

অনাবশ্য, অনাদৃত,

এনে দাও অযাচিত

যত কিছু অনাসৃষ্টি!

হৃদয়-নিকুঞ্জমাঝ

এস আজি ঋতুরাজ,

ভেঙ্গে দাও সব কাজ

প্রেমের মোহন মন্ত্রে!

হিতাহিত হোক্‌ দুর,—

গাব গীত সুমধুর,

ধর তুমি ধর সুর

সুধাময়ী বীণাযন্ত্রে!

১৮ আষাঢ়,

১৩০২।

শেষ উপহার

শেষ উপহার।

যাহা কিছু ছিল সব দিনু শেষ করে’

ডালাখানি ভরে,—

কাল কি আনিয়া দিব যুগল চরণে

তাই ভাবি মনে।

বসন্তে সকল ফুল নিঃশেষে ফুটায়ে দিয়ে

তরু তার পরে

একদিনে দীনহীন, শূন্যে দেবতার পানে

চাহে রিক্ত করে!

আজি দিন শেষ হলে যদি মোর গান

হয় অবসান,

কাল প্রাতে এ গানের স্মৃতিসুখ লেশ

রবে না কি শেষ?

শূন্য থালে মৌনকণ্ঠে নতমুখে আসি যদি

তোমার সম্মুখে,

তখন্ কি অগৌরবে চাহিবে না একবার

ভকতের মুখে?

দিই নি কি প্রাণপূর্ণ হৃদিপদ্মখানি

পাদপদ্মে আনি?

দিইনি কি কোনো ফুল অমর করিয়া

অশ্রুতে ভরিয়া?

এত গান গাহিয়াছি, তার মাঝে নাহি কি গো

হেন কোনো গান

আমি চলে গেলে তবু বহিবে যে চিরদিন

অনন্ত পরাণ?

সেই কথা মনে করে দিবে না কি, নব

বরমাল্য তব,

ফেলিবে না আঁখি হতে একবিন্দু জল

করুণা-কোমল,

আমার বসন্তশেষে রিক্তপুষ্প দীনবেশে

নীরবে যে দিন

ছলছল আঁখিজলে দাঁড়াইব সভাতলে

উপহারহীন?

১ পৌষ,

১৩০২।

সন্ধ্যা

সন্ধ্যা।

ক্ষান্ত হও, ধীরে কও কথা! ওরে মন,

নত কর শির! দিবা হল সমাপন,

সন্ধ্যা আসে শান্তিময়ী। তিমিরের তীরে

অসংখ্য-প্রদীপ-জ্বালা’ এ বিশ্বমন্দিরে

এল আরতির বেলা। ওই শুন বাজে

নিঃশব্দ গম্ভীর মন্দ্রে অনন্তের মাঝে

শখঘণ্টাধ্বনি। ধীরে নামাইয়া আন’

বিদ্রোহের উচ্চ কণ্ঠ পুরবীর ম্লান-

মন্দ স্বরে। রাখ রাখ অভিযোগ তব,—

মৌন কর বাসনার নিত্য নব নব

নিস্ফল বিলাপ! হের, মৌন নভস্তল,

ছায়াচ্ছন্ন মৌন বন, মৌন জলস্থল

স্তম্ভিত বিষাদে নম্র! নির্ব্বাক্‌ নীরব

দাঁড়াইয়া সন্ধ্যাসতী-নয়ন পল্পব

নত হয়ে ঢাকে তার নয়ন যুগল,—

অনন্ত আকাশপূর্ণ অশ্রু ছলছল

করিয়া গোপন। বিষাদের মহাশান্তি

ক্লান্ত ভুবনের ভালে করিছে একান্তে

সান্ত্বনা পরশ। আজি এই শুভক্ষণে,

শান্ত মনে, সন্ধি কর অনন্তের সনে

সন্ধ্যার আলোকে! বিন্দু দুই অশ্রুজলে

দাও উপহার-অসীমের পদতলে

জীবনের স্মৃতি! অন্তরের যত কথা

শান্ত হয়ে গিয়ে মর্ম্মান্তিক নীরবতা

করুক্‌ বিস্তার।

হের ক্ষুদ্র নদীতীরে

সুপ্তপ্রায় গ্রাম। পক্ষীরা গিয়েছে নীড়ে,

শিশুরা খেলে না; শূন্য মাঠ জনহীন;

ঘরে ফেরা শ্রান্ত গাভী গুটি দুই তিন

কুটীর অঙ্গনে বাঁধা, ছবির মতন

স্তব্ধপ্রায়। গৃহকার্য্য হল সমাপন,—

কে ওই গ্রামের বধূ ধরি বেড়াখানি

সম্মুখে দেখিছে চাহি, ভাবিছে কি জানি

ধূসর সন্ধ্যায়।

অমনি নিস্তব্ধ প্রাণে

বসুন্ধরা, দিবসের কর্ম্ম অবসানে,

দিনান্তের বেড়াটি ধরিয়া, আছে চাহি

দিগন্তের পানে; ধীরে যেতেছে প্রবাহি

সম্মুখে আলোকস্রোত অনন্ত-অম্বরে

নিঃশব্দ চরণে; আকাশের দূরান্তরে

একে একে অন্ধকারে হতেছে বাহির

একেকটি দীপ্ততারা, সুদূর পল্লীর

প্রদীপের মত! ধীরে যেন উঠে ভেসে

ম্লানচ্ছবি ধরণীর নয়ন-নিমেষে

কত যুগযুগান্তের অতীত আভাস,

কত জীব-জীবনের জীর্ণ ইতিহাস।

যেন মনে পড়ে সেই বাল্য নীহারিকা,

তার পরে প্রজ্জলন্ত যৌবনের শিখা,

তার পরে স্নিগ্ধতাম অন্নপূর্ণালয়ে

জীবধাত্রী জননীর কাজ, বক্ষে লয়ে

লক্ষ কোটি জীব—কত দুঃখ, কত ক্লেশ,

কত যুদ্ধ, কত মৃত্যু, নাহি তার শেষ!

ক্রমে ঘনতর হয়ে নামে অন্ধকার,

গাঢ়তর নীরবতা,—বিশ্ব-পরিবার

সুপ্ত নিশ্চেতন। নিঃসঙ্গিনী ধরণীর

বিশাল অন্তর হতে উঠে সুগম্ভীর

একটি ব্যথিত প্রশ্ন-ক্লিষ্ট ক্লান্ত সুর

শূন্যপানে-“আরো কোথা?” “আরো কত দূর?”

৯ ফাল্গুন,

১৩০০ সাল।

সাধনা

সাধনা।

দেবি! অনেক ভক্ত এসেছে তোমার চরণ তলে

অনেক অর্ঘ্য আনি;

আমি অভাগ্য এনেছি বহিয়া নয়ন জলে

ব্যর্থ সাধন খানি।

তুমি জান মোর মনের বাসনা,

যত সাধ ছিল সাধ্য ছিল না,

তবু বহিয়াছি কঠিন কামনা

দিবস নিশি।

মনে যাহা ছিল হয়ে গেল আর,

গড়িতে ভাঙ্গিয়া গেল বার বার,

ভালর মন্দে আলোয় আঁধার

গিয়েছে মিশি।

তবু ওগো, দেবি, নিশিদিন করি পরাণপণ,

চরণে দিতেছি আনি

মোর জীবনের সকল শ্রেষ্ঠ সাধনের ধন

ব্যর্থ সাধন খানি।

ওগো ব্যর্থ সাধন খানি

দেখিয়া হাসিছে সার্থকফল

সকল ভক্ত প্রাণী।

তুমি যদি দেবি পলকে কেবল

কর কটাক্ষ স্নেহ-সুকোমল,

একটি বিন্দু ফেল আঁখি জল

করুণা মানি’

সব হতে তবে সার্থক হবে

ব্যর্থ সাধন খানি।

দেবি! আজি আসিয়াছে অনেক যন্ত্রী শুনাতে গান

অনেক যন্ত্র আনি।

আমি আনিয়াছি ছিন্নতন্ত্রী নীরব ম্লান

এই দীন বীণা খানি।

তুমি জান ওগো করি নাই হেলা,

পথে প্রান্তরে করি নাই খেলা,

শুধু সাধিয়াছি বসি সারাবেলা

শতেক বার।

মনে যে গানের আছিল আভাস,

যে তান সাধিতে করেছিনু আশ,

সহিল না সেই কঠিন প্রয়াস,

ছিঁড়িল তার।

স্তবহীন তাই রয়েছি দাঁড়ায়ে সারাটি ক্ষণ,

আনিয়াছি গীতহীনা

আমার প্রাণের একটি যন্ত্র বুকের ধন

ছিন্নতন্ত্রী বীণা!

ওগো ছিন্নতন্ত্রী বীণা

দেখিয়া তোমার গুণীজন সবে

হাসিছে করিয়া ঘৃণা।

তুমি যদি এরে লহ কোলে তুলি,

তোমার শ্রবণে উঠিবে আকুলি

সকল অগীত সঙ্গীত গুলি,

হৃদয়াসীনা!

ছিল যা আশায় ফুটাবে ভাষায়

ছিন্নতন্ত্রী বীণা।

দেবি! এ জীবনে আমি গাহিয়াছি বসি অনেক গান,

পেয়েছি অনেক ফল;

সে আমি সবারে বিশ্বজনারে করেছি দান,

ভরেছি ধরণীতল।

যার ভাল লাগে সেই নিয়ে যাক,

যত দিন থাকে ততদিন থাক্‌,

যশ অপযশ কুড়ায়ে বেড়াক্‌

ধূলার মাঝে।

বলেছি যে কথা করেছি যে কাজ

আমার সে নয়, সবার সে আজ,

ফিরিছে ভ্রমিয়া সংসার মাঝ

বিবিধ সাজে!

যা কিছু আমার আছে আপনার শ্রেষ্ঠধন

দিতেছি চরণে আসি-

অকৃত কার্য্য, অকথিত বাণী, অগীত গান,

বিফল বাসনা রাশি।

ওগো বিফল বাসনা রাশি

হেরিয়া আজিকে ঘরে পরে সবে

হাসিছে হেলার হাসি।

তুমি যদি দেবি লহ কর পাতি,

আপনার হাতে রাখ মালা গাঁথি,

নিত্য নবীন রবে দিনরাতি

সুবাসে ভাসি,

সফল করিবে জীবন আমার

বিফল বাসনা রাশি!

৪ কার্ত্তিক,

১৩০১।

সান্ত্বনা

সান্ত্বনা।

কোথা হতে দুই চক্ষে ভরে’ নিয়ে এলে জল

হে প্রিয় আমার!

হে ব্যথিত, হে অশান্ত, বল আজি গাব গান

কোন্ সান্ত্বনার?

হেথায় প্রান্তর পারে

নগরীর এক ধারে

সায়াহ্নের অন্ধকারে

জ্বালি দীপখানি

শূন্য গৃহে অন্য মনে

একাকিনী বাতায়নে

বসে আছি পুষ্পাসনে

বাসরের রাণী;—

কোথা বক্ষে বিধি কাঁটা কিরিলে আপন নীড়ে

হে আমার পাখী!

ওরে কিষ্ট, ওরে ক্লান্ত, কোথা তোর বাজে ব্যথা,

কোথা তোরে রাখি?

চারিদিকে তমস্বিনী রজনী দিয়েছে টানি

মায়ামন্ত্র-ঘের;

দুয়ার রেখেছি রুধি, চেয়ে দেখ কিছু হেথা

নাহি বাহিরের।

এ যে দুজনের দেশ,

নিখিলের সব শেষ,

মিলনের রসাবেশ

অনন্ত ভবন;

শুধু এই এক ঘরে

দুখানি হৃদয় ধরে,

দুজনে সৃজন করে

নুতন ভুবন।

একটি প্রদীপ শুধু এ আঁধারে যতটুকু

আলো করে রাখে

সেই আমাদের বিশ্ব, তাহার বাহিরে আর

চিনি না কাহাকে!

একখানি বীণা আছে, কভু বাজে মোর বুকে

কভু তব কোরে,

একটি রেখেছি মালা, তোমারে পায়ে দিলে

তুমি দিবে মোরে।

এই শয্যা রাজধানী,

আধেক আঁচলখানি

বক্ষ হতে লয়ে টানি

পাতিব শয়ন,

একটি চুম্বন গড়ি

দোঁহে লব ভাগ করি,

এ রাজত্বে, মরি মরি,

এত আয়োজন!

একটি গোলাপ ফুল রেখেছি বক্ষের মাঝে,

তব ঘ্রাণ শেষে

আমারে ফিরায়ে দিলে অধরে পরশি’ তাহা

পরি লব কেশে!

আজ করেছিনু মনে তোমারে করিব রাজা

এই রাজ্যপাটে,

এ অমর বরমাল্য আপনি যতনে তব

জড়াব ললাটে।

মঙ্গল প্রদীপ ধরে’

লইব বরণ করে’,

পুষ্প-সিংহাসন পরে

বসাব তোমায়,

তাই গাঁথিয়াছি হার,

আনিয়াছি ফুলভার,

দিয়েছি নূতন তার

কনক বীণায়;

আকাশে নক্ষত্রসভা নীরবে বসিয়া আছে

শান্ত কৌতুহলে-

আজি কি এ মালাখানি সিক্ত হবে, হে রাজ্‌ন,

নয়নের জলে?

রুদ্ধকণ্ঠ, গীতহারা! কহিয়োনা কোনো কথা,

কিছু শুধাবনা!

নীরবে লইব প্রাণে তোমার হৃদয় হতে

নীরব বেদনা!

প্রদীপ নিবায়ে দিব,

বক্ষে মাথা তুলি নিব,

স্নিগ্ধ করে পরশিব

সজল কপোল,—

বেণীমুক্ত কেশজাল

স্পর্শিবে তাপিত ভাল

কোমল বক্ষের তাল

মৃদুমন্দ দোল!

নিঃশ্বাস বীজনে মোর কাঁপিবে কুন্তল তব,

মুদিবে নয়ন-

অর্দ্ধরাতে শান্তবায়ে নিদ্রিত ললাটে দিব

একটি চুম্বন।

২৯ অগ্রহায়ণ,

১৩০২।

সিন্ধু পারে

সিন্ধু পারে।

পউষ প্রখর শীতে জর্জ্জর, ঝিল্লি-মুখর রাতি;

নিদ্রিত পুরী, নির্জ্জন ঘর, নির্ব্বাণ দীপ-বাতি।

অকাতর দেহে আছিনু মগন সুখ নিদ্রার ঘোরে-

তপ্ত শষ্যা প্রিয়ার মতন সোহগে ঘিরেছে মোরে।

হেনকালে হায় বাহির হইতে কে ডাকিল মোর নাম,—

নিদ্রা টুটিয়া সহসা চকিতে চমকিয়া বসিলাম।

তীক্ষ্ণ শাণিত তীরের মতন মর্ম্মে বাজিল স্বর,—

ঘর্ম্ম বহিল ললাট বাহিয়া রোমাঞ্চ কলেবর।

ফেলি আবরণ, ত্যজিয়া শয়ন, বিরল-বসন বেশে

দুরু দুরু বুকে খুলিয়া দুয়ার বাহিরে দাঁড়ানু এসে।

দূর নদীপারে শুন্য শ্মশানে শৃগাল উঠিল ডাকি,

মাথার উপরে কেঁদে উড়ে গেল কোন্ নিশাচর পাখী।

দেখিনু দুয়ারে রমণীমুরতি অবগুণ্ঠনে ঢাকা,—

কৃষ্ণ অশ্বে বসিয়া রয়েছে, চিত্রে যেন সে আঁকা।

আরেক অশ্ব দাঁড়ায়ে রয়েছে পুচ্ছ ভুতল চুমে,

ধূম্রবরণ, যেন দেহ তার গঠিত শ্মশান ধূমে।

নড়িল না কিছু আমারে কেবল হেরিল আঁখির পাশে,

শিহরি শিহরি সর্ব্ব শরীর কঁপিয়া উঠিল ত্রাসে।

পাণ্ডু আকাশে খণ্ড চন্দ্র হিমানীর গ্লানি মাখা;

পল্লবহীন বৃদ্ধ অশথ শিহরে নগ্ন শাখা।

নীরব রমণী অঙ্গুলি তুলি দিল ইঙ্গিত করি’-

মন্ত্রমুগ্ধ অচেতন সম চড়িনু অশ্ব’ পরি।

বিদ্যুৎবেগে ছুটে যায় ঘোড়া,বারেক চাহিনু পিছে,

ঘরদ্বার মোর বাষ্প সমান, মনে হল সব মিছে।

কাতর রোদন জাগিয়া উঠিল সকল হৃদয় ব্যেপে,

কণ্ঠের কাছে সুকঠিন বলে কে তারে ধরিল চেপে।

পথের দুধারে রুদ্ধ দুয়ারে দাঁড়ায়ে সৌধ সারি,

ঘরে ঘরে হায় সুখ শয্যায় ঘুমাইছে নরনারী।

নির্জ্জন পথ চিত্রিতবৎ, সাড়া নাই সারা দেশে।

রাজার দুয়ারে দুইটি প্রহরী ঢুলিছে নিদ্রাবেশে।

শুধু থেকে থেকে ডাকিছে কুকুর সুদুর পথের মাঝে,—

গম্ভীর স্বরে প্রাসাদ শিখরে প্রহর ঘণ্টা বাজে।

অফুরান পথ, অফুরান রাতি, অজানা নূতন ঠাঁই,

অপরূপ এক স্বপ্ন সমান, অর্থ কিছুই নাই।

কি যে দেখেছিনু মনে নাহি পড়ে, ছিল নাকো আগা গোড়া,—

লক্ষ্যবিহীন তীরের মতন ছুটিয়া চলেছে ঘোড়া।

চরণে তাদের শব্দ বাজে না, উড়ে নাকো ধূলিরেখা,

কঠিন ভূতল নাই যেন কোথা, সকলি বাষ্পে লেখা।

মাঝে মাঝে যেন চেনা চেনা মত মনে হয় থেকে থেকে,—

নিমেষ ফেলিতে দেখিতে না পাই কোথা পথ যায় বেঁকে।

মনে হল মেঘ, মনে হল পাখী, মনে হল কিশলয়,

ভাল করে যেই দেখিবারে যাই মনে হল কিছু নয়।

দুই ধারে এ কি প্রাসাদের সারি? অথবা তরুর মূল?

অথবা এ শুধু আকাশ জুড়িয়া আমারি মনের ভুল?

মাঝে মাঝে চেয়ে দেখি রমণীর অবগুণ্ঠিত মুখে,—

নীরব নিদয় বসিয়া রয়েছে, প্রাণ কেঁপে ওঠে বুকে!

ভয়ে ভুলে যাই দেবতার নাম, মুখে কথা নাহি ফুটে;

হুহু রবে বায়ু বাজে দুই কানে ঘোড়া চলে যায় ছুটে’!

চন্দ্র যখন অস্তে নামিল তখনো রয়েছে রাতি,

পূর্ব্বদিকের অলস নয়নে মেলিছে রক্ত ভাতি।

জনহীন এক সিন্ধু পুলিনে অশ্ব খামিল আসি,—

সমুখে দাঁড়ায়ে কৃষ্ণ শৈল গুহামুখ পরকাশি’।

সাগরে না শুনি জল কলরব না গাহে উষার পাখী,

বহিল না মৃদু প্রভাত পবন বনের গন্ধ মাখি।

অশ্ব হইতে নামিল রমণী, আমিও নানি নীচে,

আঁধার-ব্যাদান গুহার মাঝারে চলিনু তাহার পিছে।

ভিতরে খোদিত উদার প্রাসাদ শিলাস্তস্ত পরে,

কনক শিকলে সোনার প্রদীপ জ্বলিতেছে থরে থরে।

ভিত্তির কায়ে পাষাণ মূর্ত্তি চিত্রিত আছে কত

অপরূপ পাখী, অপরূপ নারী, লতাপাতা নানা মত।

মাঝখানে আছে চাঁদোয়া খাটানো, মুলা ঝালরে গাঁথা,—

তারিতলে মণি-পালঙ্ক পরে অমল শয়ন পাতা।

তারি দুই ধারে ধূপধার হতে উঠিছে গন্ধধুপ,

সিংহবাহিনী নারীর প্রতিমা দুই পাশে অপরূপ।

নাহি কোনো লোক, নাহিক প্রহরী, নাহি হেরি দাস দাসী।

গুহাগৃহতলে তিলেক শব্দ হয়ে উঠে রাশি রাশি।

নীরবে রমণী আবৃত বদনে বসিলা শয্যাপরে,

অঙ্গুলি তুলি ইঙ্গিত করি’ পাশে বসাইল মোরে।

হিম হয়ে এল সর্ব্ব শরীর শিহরি উঠিল প্রাণ;—

শোণিত প্রবাহে ধ্বনিতে লাগিল ভয়ের ভীষণ তান।

সহসা বাজিয়া বাজিয়া উঠিল দশ দিকে বীণা বেণু,

মাথার উপরে ঝরিয়া ঝরিয়া পড়িল পুষ্প রেণু।

দ্বিগুণ আভায় জ্বলিয়া উঠিল দীপের আলোক রাশি,—

ঘোমটা ভিতরে হাসিল রমণী মধুর উচ্চ হাসি।

সে হাসি ধ্বনিয়া ধ্বনিয়া উঠিল বিজন বিপুল ঘরে,—

শুনিয়া চমকি ব্যাকুল হৃদয়ে কহিলাম যোড় করে,—

“আমি যে বিদেশী অতিথি, আমায় ব্যথিয়ো না পরিহাসে,

কে তুমি নিদয় নীরব ললনা কোথায় আনিলে দাসে”!

অমনি রমণী কনক দণ্ড আঘাত করিল ভূমে,

আঁধার হইয়া গেল সে ভবন রাশি রাশি ধূপ ধূমে।

বাজিয়া উঠিল শতেক শঙ্খ হুলু কলরব সাথে,—

প্রবেশ করিল বৃদ্ধ বিপ্র ধান্য দুর্ব্বা হাতে।

পশ্চাতে তার বাঁধি দুই সার কিরাত নারীর দল

কেহ বহে মালা, কেহবা চামর, কেহ বা তীর্থ জল।

নীরবে সকলে দাঁড়ায়ে রহিল,—বৃদ্ধ আসনে বসি

নীরবে গণনা করিতে লাগিল গৃহতলে থড়ি কসি’।

আঁকিতে লাগিল কত না চক্র, কত না রেখার জাল,

গণনার শেষে কহিল, “এখন হয়েছে লগ্ন কাল!”

শয়ন ছাড়িয়া উঠিলা রমণী বদন করিয়া নত,

আমিও উঠিয়া দাঁড়াইনু পাশে মন্ত্র-চালিত মত!

নারীগণ সবে ঘেরিয়া দাঁড়াল একটি কথা না বলি,

দোঁহাকার মাথে ফুলদল সাথে বরষি লাজাঞ্জলি।

পুরোহিত শুধু মন্ত্র পড়িল আশিষ করিয়া দোঁহে,—

কি ভাষা কি কথা কিছু না বুঝি, দাড়ায়ে রহিনু মোহে।

অজানিত বধু নীরবে সঁপিল–শিহরিয়া কলেবর–

হিমের মতন মোর করে, তার তপ্ত কোমল কর।

চলি গেল ধীরে বৃদ্ধ বিপ্র;—পশ্চাতে বাঁধি সার

গেল নারীদল মাথায় কক্ষে মঙ্গল-উপচার।

শুধু এক সখী দেখাইল পথ হাতে লয়ে দীপখানি,—

মোরা দোঁহে পিছে চলিনু তাহার, কারো মুখে নাহি বাণী!

কত না দীর্ঘ আঁধার কক্ষ সভয়ে হইয়া পার

সহসা দেখিনু সমুখে কোথায় খুলে গেল এক দ্বার।

কি দেখিনু ঘরে কেমনে কহিব হয়ে যায় মনোভুল,

নানা বরণের আলোক সেথায়, নানা বরণের ফুল।

কনকে রজতে রতনে জড়িত বসন বিছানো কত!

মণি বেদিকায় কুসুম শয়ন স্বপ্ন-রচিত মত।

পাদপীঠ পরে চরণ প্রসারি’ শয়নে বসিলা বধূ–

আমি কহিলাম–“সব দেখিলাম, তোমারে দেখিনি শুধু”!

চারিদিক হতে বাজিয়া উঠিল শত কৌতুক হাসি!

শত ফোয়ারায় উছসিল যেন পরিহাস রাশি রাশি।

সুধীরে রমণী দুবাহু তুলিয়া,–অবগুণ্ঠন খানি

উঠায়ে ধরিয়া মধুর হাসিল মুখে না কহিয়া বাণী।

চকিত নয়ানে হেরি মুখপানে পড়িনু চরণ তলে–

“এখানেও তুমি জীবন দেবতা”! কহিনু নয়ন জলে!

সেই মধুমুখ, সেই মৃদুহাসি সেই সুধাভরা আঁখি–

চির দিন মোরে হাসল কাঁদাল, চির দিন দিল ফাঁকি!

খেলা করিয়াছে নিশি দিন মোর সব সুখে সব দুখে,

এ অজানাপুরে দেখা দিল পুন সেই পরিচিত মুখে!

অমল কোমল চরণ কমলে চুমিনু বেদনাভরে–

বাঁধা না মানিয়া ব্যাকুল অশ্রু পড়িতে লাগিল ঝরে’;–

অপরূপ তানে ব্যথা দিয়ে প্রাণে বাজিতে লাগিল বাঁশি।

বিজন বিপুল ভবনে রমণী হাসিতে লাগিল হাসি।

২০ শে ফাল্গুন,

১৩০২।

সম্পূর্ণ।

সুখ

সুখ।

আজি মেঘমুক্ত দিন; প্রসন্ন আকাশ

হাসিছে বন্ধুর মত; সুমন্দ বাতাস

মুখে চক্ষে বক্ষে আসি লাগিছে মধুর,—

অদৃশ্য অঞ্চল যেন সুপ্ত দিগ্বধুর

উড়িয়া পড়িছে গায়ে; ভেসে যায় তরী

প্রশান্ত পদ্মার স্থির বক্ষের উপরি

তরল কল্লোলে; অর্দ্ধমগ্ন বালুচর

দূরে আছে পড়ি’, যেন দীর্ঘ জলচর

রৌদ্র পোহাইছে; ভাঙ্গা উচ্চতীর;

ঘনচ্ছায়াপূর্ণ তরু; প্রচ্ছন্ন কুটীর;

বক্র শীর্ণ পথখানি দুর গ্রাম হতে

শস্যক্ষেত্র পার হয়ে নামিয়াছে স্রোতে

তৃষার্ত্ত জিহ্বার মত; গ্রামবধূগণ

অঞ্চল ভাসায়ে জলে আকণ্ঠ-মগন

করিছে কৌতুকালাপ; উচ্চ মিষ্ট হাসি

জলকলস্বরে মিশি’ পশিতেছে আসি’

কর্ণে মোর; বসি এক বাঁধা নৌকা পরি’

বৃদ্ধ জেলে গাঁথে জাল নতশির করি’

রৌদ্রে পিঠ দিয়া; উলঙ্গ বালক তার

আনন্দে ঝাঁপায়ে জলেপড়ে বারম্বার

কলহাস্যে; ধৈর্য্যময়ী মাতার মতন

পদ্মা সহিতেছে তার স্নেহজ্বালাতন।

তরী হতে সম্মুখেতে দেখি দুই পার;

স্বচ্ছতম নীলাভ্রের নির্মল বিস্তার;

মধ্যাহ্ন-আলোকপ্লাবে জলে স্থলে বনে

বিচিত্র বর্ণের রেখা; আতপ্ত পবনে

তীর-উপবন হতে কভু আসে বহি’

আম্রমুকুলের গন্ধ, কভু রহি’ রহি’

বিহঙ্গের শ্রান্ত স্বর।

আজি বহিতেছে

প্রাণে মোর শান্তিধারা; মনে হইতেছে

সুখ অতি সহজ সরল, কাননের

প্রস্ফুট ফুলের মত, শিশু-আননের

হাসির মতন,—পরিব্যাপ্ত, বিকশিত;

উন্মুখ অধরে ধরি’ চুম্বন-অমৃত

চেয়ে আছে সকলের পানে, বাক্যহীন

শৈশব-বিশ্বাসে, চিররাত্রি চিরদিন।

বিশ্ব-বীণা হতে উঠি’ গানের মতন

রেখেছে নিমগ্ন করি নিথর গগন;

সে সঙ্গীত কি ছন্দে গাঁথিব; কি করিয়া

শুনাইব, কি সহজ ভাষায় ধরিয়া

দিব তারে উপহার ভালবাসি যারে,

রেখে দিব ফুটাইয়া কি হাসি আকারে

নয়নে অধরে, কি প্রেমে জীবনে তারে

করিব বিকাশ? সহজ আনন্দখানি

কেমনে সহজে তারে তুলে ঘরে আনি

প্রফুল্ল সরস?—কঠিন আগ্রহভরে

ধরি তারে প্রাণপণে,—মুঠির ভিতরে

টুটি যায়;—হেরি তারে তীব্রগতি ধাই,—

অন্ধবেগে বহুদূরে লতি’ চলি’ যাই

আর তার না পাই উদ্দেশ।

চারিদিকে

দেখে’ আজি পূর্ণপ্রাণে মুগ্ধ অনিমিখে

এই স্তব্ধ নীলাম্বর স্থির শান্ত জল,

মনে হল সুখ অতি সহজ সরল!

১৩ই চৈত্র,

১২৯৯।

স্বর্গ হইতে বিদায়

স্বর্গ হইতে বিদায়।

ম্লান হয়ে এল কণ্ঠে মন্দার মালিকা,

হে মহেন্দ্র, নির্ব্বাপিত জ্যোতির্ম্ময় টীকা

মলিন ললাটে;—পুণ্যবল হল ক্ষীণ,

আজি মোর স্বর্গ হতে বিদায়ের দিন

হে দেব হে দেবীগণ! বর্ষ লক্ষশত

যাপন করেছি হর্ষে দেবতার মত

দেবলোকে। আজি শেষ বিচ্ছেদের ক্ষণে

লেশমাত্র অশ্রুরেখা স্বর্গের নয়নে

দেখে যাব এই আশা ছিল! শোকহীন

হৃদিহীন সুখস্বর্গভূমি, উদাসীন

চেয়ে আছে; লক্ষ লক্ষ বর্ষ তার

চক্ষের পলক নহে;— অশ্বত্থ শাখার

প্রান্ত হতে খসি গেলে জীর্ণতম পাতা

যতটুকু বাজে তার, ততটুকু ব্যখা

স্বর্গে নাহি লাগে, যবে মোরা শত শত

গৃহচ্যুত হতজ্যোতি নক্ষত্রের মত

মুহূর্ত্তে খসিয়া পড়ি দেবলোক হতে

ধরিত্রীর অন্তহীন জন্মমৃত্যু স্রোতে।

সে বেদনা বাজিত যদ্যপি, বিরহের

ছায়ারেখা দিত দেখা, তবে স্বরগের

চিরজ্যোতি ম্লান হত মর্ত্ত্যের মতন

কোমল শিশিরবাষ্পে;—নন্দনকানন

মর্ম্মরিয়া উঠিত নিঃশ্বসি’, মন্দাকিনী

কূলে কূলে গেয়ে যেত করুণ কাহিনী

কলকণ্ঠে, সন্ধ্যা আসি দিবা অবসানে

নির্জ্জন প্রান্তর পারে দিগন্তের পানে

চলে যেত উদাসিনী; নিস্তব্ধ নিশীথ

ঝিল্লিমন্ত্রে শুনাইত বৈরাগ্য সঙ্গীত

নক্ষত্র সভায়! মাঝে মাঝে সুরপুরে

নৃত্যপরা মেনকার কনক নূপুরে

তালভঙ্গ হত। হেলি উর্ব্বশীর স্তনে

স্বর্ণবীণা থেকে থেকে যেন অন্য মনে

অকস্মাৎ ঝঙ্কারিত কঠিন পীড়নে

নিদারুণ করুণ মুর্চ্ছনা! দিত দেখা

দেবতার অশ্রুহীন চোখে জলরেখা

নিষ্কারণে। পতিপাশে বসি একাসনে

সহসা চাহিত শচী ইন্দ্রের নয়নে

যেন খুঁজি পিপাসার বারি! ধরা হতে

মাঝে মাঝে উচ্ছ্বসি আসিত বায়ু স্রোতে

ধরণীর সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস-খনি ঝরি’

পড়িত নন্দনবনে কুসুম মঞ্জরী!

থাক স্বর্গ হাস্য মুখে, কর সুধাপান

দেবগণ! স্বর্গ তোমাদেরি সুখস্থান-

মোরা পরবাসী। মর্ত্তভূমি স্বর্গ নহে,

সে যে মাতৃভূমি—তাই তার চক্ষে বহে

অশ্রু জলধারা, যদি দুদিনের পরে

কেহ তারে ছেড়ে যায় দুদণ্ডের তরে!

যত ক্ষুদ্র যত ক্ষীণ যত অভাজন

যত পাপী তাপী, মেলি’ ব্যর্থ আলিঙ্গন

সবারে কোমলবক্ষে বাঁধিবারে চায়-

ধূলিমাখা তনুষ্পর্শে হৃদয় জুড়ায়

জননীর। স্বর্গে তব বহুক্‌ অমৃত,

মর্ত্ত্যে থাক্ সুখে দুঃখে অনন্ত মিশ্রিত

প্রেমধারা-অশ্রু জলে চিরশ্যাম করি

ভূতলের স্বর্গখণ্ডগুলি!

হে অপ্সরি,

তোমার নয়নজ্যোতি প্রেমবেদ নায়

কভু না হউক্‌ ম্লান-লইনু বিদায়;

তুমি কারে করনা প্রার্থনা-কানো তরে

নাহি শোক! ধরাতলে দীনতম ঘরে

যদি জন্মে প্রেয়সী আমার, নদী তীরে

কোনো এক গ্রামপ্রান্তে প্রচ্ছন্ন কুটীরে

অশ্বখছায়ায়, সে বালিকা বক্ষে তার

রাখিবে সঞ্চয় করি সুধার ভাণ্ডার

আমারি লাগিয়া সযতনে। শিশুকালে

নদীকুলে শিবমূর্ত্তি গড়িয়া সকালে

আমারে মাগিয়া লবে বর। সন্ধ্যা হলে

জ্বলন্ত প্রদীপখানি ভাসাইয়া জলে

শঙ্কিত কম্পিত বক্ষে চাহি একমনা

করিবে সে আপনার সৌভাগ্য গণনা

একাকী দাঁড়ায়ে ঘাটে। একদা সুক্ষণে

আসিবে আমার ঘরে সন্নত নয়নে

চন্দনচর্চ্চিত ভালে রক্ত পট্টাম্বরে,

উৎসবের বাঁশরী সঙ্গীতে। তার পরে

সুদিনে দুর্দ্দিনে, কল্যাণ কঙ্কণ করে,

সীমন্ত সীমায় মঙ্গল সিন্দুর বিন্দু,

গৃহ লক্ষ্মী দুঃখে সুখে, পূর্ণিমার ইন্দু

সংসারের সমুদ্র শিয়রে! দেবগণ,

মাঝে মাঝে এই স্বর্গ হইবে স্মরণ

দুর স্বপ্ন সম-যবে কোনো অর্দ্ধরাতে

সহসা হেরিব জাগি’ নির্ম্মল শষ্যাতে

পড়েছে চন্দ্রের আলো, নিদ্রিতা প্রেয়সী,

লুণ্ঠিত শিথিল বাহু, পড়িয়াছে খসি’

গ্রন্থি সরমের;—মৃদু সোহাগ চুম্বনে

সচকিতে জাগি উঠি গাঢ় আলিঙ্গনে

লতাইবে বক্ষে মোর-দক্ষিণ অনিল

আনিবে ফুলের গন্ধ, জাগ্রত কোকিল

গাহিবে সুদুর শাখে।

অয়ি দীনহীনা,

অশ্রুআঁখি দুঃখাতুরা জননী মলিনা,

অয়ি মর্ত্ত্যভূমি! আজি বহুদিন পরে

কাঁদিয়া উঠেছে মোর চিত্ত তোর তরে।

যেমনি বিদায় দুঃখে শুষ্ক দুই চোখ

অশ্রুতে পূরিল—অমনি এ স্বর্গলোক

অলস কল্পনা প্রায় কোথায় মিলালো

ছায়াচ্ছবি! তব নীলাকাশ, তব আলো,

তব জনপূর্ণ লোকালয়—সিন্ধুতীরে

সুদীর্ঘ বালুকাতট, নীল গিরি শিরে

শুভহিমরেখা, তরুশ্রেণীর মাঝারে

নিঃশব্দ অরুণোদয়, শূন্য নদীপারে

অবনতমুখী সন্ধ্যা-বিন্দু অশ্রুজলে

যত প্রতিবিম্ব যেন দর্পনের তলে

পড়েছে আসিয়া।

হে জননী পুত্রহারা,

শেষ বিচ্ছেদের দিনে যে শোকাশ্রুধারা

চক্ষু হতে ঝরি পড়ি তব মাতৃস্তন

করেছিল অভিষিক্ত-আজি এতক্ষণ

সে অশ্রু শুকায়ে গেছে; তবু জানি মনে

যখনি ফিরিব পুনঃ তব নিকেতনে

তখনি দুখানি বাহু ধরিবে আমায়,

বাজিবে মঙ্গলশঙ্খ, স্নেহের ছায়ায়

দুঃখে সুখে ভয়ে ভরা প্রেমের সংসারে

তব গেহে, তব পুত্র কন্যার মাঝারে,

আমারে লইবে চির পরিচিত সম,—

তার পর দিন হতে শিয়রেতে মম

সারাক্ষণ জাগি রবে কম্পমান প্রাণে,

শঙ্কিত অন্তরে, ঊর্দ্ধে দেবতার পানে

মেলিয়া করুণ দৃষ্টি—চিন্তিত সদাই

যাহারে পেয়েছি তারে কখন্ হারাই!

২৪ অগ্রহায়ণ,

১৩০২।

১৪০০ শাল

১৪০০ শাল।

আজি হতে শত বর্ষ পরে

কে তুমি পড়িছ বসি আমার কবিতাখানি

কৌতুহল ভরে

আজি হতে শতবর্ষ পরে।

আজি নব বসন্তের প্রভাতের আনন্দের

লেশমাত্র ভাগ-

আজিকার কোনো ফুল, বিহঙ্গের কোনো গান,

আজিকার কোনো রক্তরাগ-

অনুরাগে সিক্ত করি পারিব না পাঠাইতে

তোমাদের করে

আজি হতে শতবর্ষ পরে!

তবু তুমি একবার খুলিয়া দক্ষিণ দ্বার

বসি বাতায়নে

সুদূর দিগন্তে চাহি কল্পনায় অবগাহি

ভেবে দেখো মনে-

এক দিন শতবর্ষ আগে

চঞ্চল পুলক রাশি কোন্ স্বর্গ হতে ভাসি

নিখিলের মর্ম্মে আসি লাগে,—

নবীন ফাল্গুন দিন সকল বন্ধন হীন

উন্মত্ত অধীর-

উড়ায়ে চঞ্চল পাখা পুষ্পরেণুগন্ধমাখা

দক্ষিণ সমীর,—

সহসা আসিয়া ত্বরা রাঙায়ে দিয়েছে ধরা

যৌবনের রাগে

তোমাদের শতবর্ষ আগে!

সে দিন উতলা প্রাণে, হৃদয় মগন গানে

কবি এক জাগে,—

কত কথা, পুষ্প প্রায় বিকশি তুলিতে চায়

কত অনুরাগে

একদিন শতবর্ষ আগে!

আজি হতে শত বর্ষ পরে

এখন্ করিছে গান সে কোন্ নূতন কবি

তোমাদের ঘরে?

আজিকার বসন্তের আনন্দ অভিবাদন

পাঠায়ে দিলাম তাঁর করে!

আমার বসন্তগান তোমার বসন্ত দিনে

ধ্বনিত হউক্ ক্ষণতরে

হৃদয় স্পন্দনে তব, ভ্রমর গুঞ্জনে নব,

পল্লব মর্ম্মরে

আজি হতে শত বর্ষ পরে।

২ ফাল্গুন,

১৩০২।