PREPROD — e2e.shangkhachil.com. Not the live site. shangkhachil.com →
← লাইব্রেরি

১৯১৫

কাব্যগ্রন্থ (পঞ্চম খণ্ড)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯১৫

প্রকাশনা-তথ্য

কাব্যগ্রন্থ

পঞ্চম খণ্ড

প্রাপ্তিস্থান-

ইণ্ডিয়ান প্রেস-এলাহাবাদ

ইণ্ডিয়ান পাব্‌লিশিং হাউস্

২২নং কর্ণওয়ালিস্ স্ট্রীট কলিকাতা।

কাব্যগ্রন্থ

শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পঞ্চম খণ্ড

প্রকাশক

ইণ্ডিয়ান প্রেস—এলাহাবাদ

১৯১৫

কথা ও কাহিনী · অপমান-বর

অপমান-বর

(ভক্তমাল)

ভক্ত কবীর সিদ্ধপুরুষ খ্যাতি রটিয়াছে দেশে,

কুটীর তাহার ঘিরিয়া দাঁড়াল লাখাে নরনারী এসে।

কেহ কহে, মাের রােগ দূর করি মন্ত্র পড়িয়া দেহ,—

সন্তান লাগি করে কাঁদাকাটি বন্ধ্যা রমণী কেহ।

কেহ বলে, তব দৈবক্ষমতা চক্ষে দেখাও মােরে,

কেহ কয়, ভবে আছেন বিধাতা বুঝাও প্রমাণ করে'।

কাঁদিয়া ঠাকুরে কাতর কবীর কহে দুই জোড়করে—

দয়া করে’ হরি জন্ম দিয়েছ নীচ যবনের ঘরে,

ভেবেছিনু কেহ আসিবে না কাছে অপার কৃপায় তব,

সবার চোখের আড়ালে কেবল তােমায় আমায় র’ব।

একি কৌশল খেলেছ মায়াবী, বুঝি দিলে মােরে ফাঁকি!

বিশ্বের লােক ঘরে ডেকে এনে তুমি পালাইবে না কি?

ব্রাহ্মণ যত নগরে আছিল উঠিল বিষম রাগি’

লােক নাহি ধরে যবন জোলার চরণধূলার লাগি।

চারিপােওয়া কলি পূরিয়া আসিল পাপের বােঝায় ভরা,

এর প্রতিকার না করিলে আর রক্ষা না পায় ধরা।

ব্রাহ্মণদল যুক্তি করিল নষ্ট নারীর সাথে,

গােপনে তাহারে মন্ত্রণা দিল, টাকা দিল তা’র হাতে।

বসন বেচিতে এসেছে কবীর একদা হাটের বারে,

সহসা কামিনী সবার সামনে কাঁদিয়া ধরিল তা’রে।

কহিল, রে শঠ নিঠুর কপট, কহিনে কাহারাে কাছে

এমনি করে’ কি সরলা নারীরে ছলনা করিতে আছে?

বিনা অপরাধে আমারে ত্যজিয়া সাধু সাজিয়াছ ভালাে,

অন্নবসনবিহনে আমার বরণ হয়েছে কালাে।

কাছে ছিল যত ব্রাহ্মণদল করিল কপট কোপ—

ভণ্ড তাপস, ধর্ম্মের নামে করিছ ধর্ম্মলােপ!

তুমি সুখে বসে’ ধূলা ছড়াইছ সরল লােকের চোখে,

অবলা অখলা পথে পথে আহা ফিরিছে অম্নশােকে।

কহিল কবীর—অপরাধী আমি, ঘরে এস, নারী, তবে,

আমার অন্ন রহিতে কেন বা তুমি উপবাসী র’বে?

দুষ্টা নারীরে আনি গৃহমাঝে বিনয়ে আদর করি

কবীর কহিল—দীনের ভবনে তােমারে পাঠাল হরি।

কাঁদিয়া তখন কহিল রমণী লাজে ভয়ে পরিতাপে-

লােভে পড়ে’ আমি করিয়াছি পাপ, মরিব সাধুর শাপে।

কহিল কবীর, ভয় নাই মাতঃ, লইব না অপরাধ;—

এনেছ আমার মাথার ভূষণ অপমান অপবাদ।

ঘুচাইল তা’র মনের বিকার, করিল চেতনা দান,

সঁপি দিল তা’র মধুর কণ্ঠে হরিনামগুণগান।

রটি গেল দেশে কপট কবীর, সাধুতা তাহার মিছে।

শুনিয়া কবীর কহে নতশির—আমি সকলের নীচে।

যদি কূল পাই, তরণী-গরব রাখিতে না চাহি কিছু,

তুমি যদি থাক আমার উপরে, আমি র’ব সব-নীচু।

রাজার চিত্তে কৌতুক হ’ল শুনিতে সাধুর গাথা,

দূত আসি তাঁরে ডাকিল যখন, সাধু নাড়িলেন মাথা।

কহিলেন, থাকি সবা হ’তে দূরে, আপন হীনতা মাঝে;

আমার মতন অভাজনজন রাজার সভায় সাজে?

দূত কহে, তুমি না গেলে ঘটিবে আমাদের পরমাদ,—

যশ শুনে তব হয়েছে রাজার সাধু দেখিবার সাধ।

রাজা বসে’ ছিল সভার মাঝারে, পারিষদ সারি সারি,

কবীর আসিয়া পশিল সেথায় পশ্চাতে ল’য়ে নারী।

কেহ হাসে কেহ করে ভুরুকুটী, কেহ রহে নতশিরে,

রাজা ভাবে এটা কেমন নিলাজ, রমণী লইয়া ফিরে!

ইঙ্গিতে তাঁর, সাধুরে, সভার বাহির করিল দ্বারী,

বিনয়ে কবীর চলিল কুটীরে সঙ্গে লইয়া নারী।

পথমাঝে ছিল ব্রাহ্মণদল, কৌতুকভরে হাসে;

শুনায়ে শুনায়ে বিরূপবাণী কহিল কঠিন ভাষে

তখন রমণী কাঁদিয়া পড়িল সাধুর চরণমূলে-

কহিল, পাপের পক্ষ হইতে কেন নিলে মােরে তুলে?

কেন অধমারে রাখিয়া দুয়ারে সহিতেছ অপমান?

কহিল কবীর, জননী তুমি যে, আমার প্রভুর দান।

২৮শে আশ্বিন, ১৩০৬

কথা ও কাহিনী · অভিসার

অভিসার

(বােধিসত্ত্বাবদান-কল্পলতা)

সন্ন্যাসী উপগুপ্ত

মথুরাপুরীর প্রাচীরের তলে

একদা ছিলেন সুপ্ত;—

নগরীর দীপ নিবেছে পবনে,

দুয়ার রুদ্ধ পৌর ভবনে,

নিশীথের তারা শ্রাবণ-গগনে

ঘন মেঘে অবলুপ্ত।

কাহার নূপুরশিঞ্জিত পদ

সহসা লাগিল বক্ষে।

সন্ন্যাসীবর চমকি জাগিল,

স্বপ্নজড়িমা পলকে ভাগিল,

রূঢ় দীপের আলোেক লাগিল

ক্ষমা-সুন্দর চক্ষে।

নগরীর নটী চলে অভিসারে

যৌবনমদে মত্তা।

অঙ্গে আঁচল সুনীল বরণ,

রুনুঝুনু রবে বাজে আভরণ;

সন্ন্যাসী-গায়ে পড়িতে চরণ

থামিল বাসবদত্তা।

প্রদীপ ধরিয়া হেরিল তাঁহার

নবীন গৌর-কান্তি।

সৌম্য সহাস তরুণ বয়ান,

করুণা-কিরণে বিকচ নয়ান,

শুভ্র ললাটে ইন্দু সমান

ভাতিছে স্নিগ্ধ শান্তি।

কহিল রমণী ললিত কণ্ঠে,

নয়নে জড়িত লজ্জা;—

“ক্ষমা কর মােরে কুমার কিশাের,

দয়া কর যদি গৃহে চল মাের,

এ ধরণীতল কঠিন কঠোর,

এ নহে তােমার শয্যা।”

সন্ন্যাসী কহে করুণ বচনে,

“অয়ি লাবণ্যপুঞ্জে,

এখনাে আমার সময় হয়নি,

যেথায় চলেছ, যাও তুমি ধনী,

সময় যেদিন আসিবে, আপনি

যাইব তােমার কুঞ্জে।”

সহসা ঝঞ্ঝা তড়িৎশিখায়

মেলিল বিপুল আস্য।

রমণী কাঁপিয়া উঠিল তরাসে,

প্রলয়শঙ্খ বাজিল বাতাসে,

আকাশে বজ্র ঘাের পরিহাসে

হাসিল অট্টহাস্য।

বর্ষ তখনাে হয় নাই শেষ,

এসেছে চৈত্রসন্ধ্যা।

বাতাস হয়েছে উতলা আকুল,

পথ-তরুশাখে ধরেছে মুকুল,

রাজার কাননে ফুটেছে বকুল

পারুল রজনীগন্ধা।

অতি দূর হ’তে আসিছে পবনে

বাঁশির মদির-মন্দ্র।

জনহীন পুরী, পুরবাসী সবে

গেছে মধুবনে ফুল-উৎসবে,

শূন্য নগরী নিরখি নীরবে

হাসিছে পূর্ণচন্দ্র।

নির্জন পথে জ্যোৎস্না আলােতে

সন্ন্যাসী একা যাত্রী।

মাথার উপরে তরুবীথিকার

কোকিল কুহরি উঠে বারবার,

এতদিন পরে এসেছে কি তাঁর

আজি অভিসার রাত্রি?

নগর ছাড়ায়ে গেলেন দণ্ডী

বাহির প্রাচীরপ্রান্তে।

দাঁড়ালেন আসি পরিখার পারে,

আম্রবনের ছায়ার আঁধারে;

কে ওই রমণী পড়ে’ একধারে

তাঁহার চরণােপান্তে!

নিদারুণ রােগে মারী-গুটিকায়

ভরে’ গেছে তা’র অঙ্গ।

রােগমসী ঢালা কালী তনু তা’র

ল’য়ে প্রজাগণে, পুর-পরিখার

বাহিরে ফেলেছে, করি পরিহার

বিষাক্ত তা’র সঙ্গ।

সন্ন্যাসী বসি আড়ষ্ট শির

তুলি নিল নিজ অঙ্কে।

ঢালি দিল জল শুষ্ক অধরে,

মন্ত্র পড়িয়া দিল শিরপরে,

লেপি দিল দেহ আপনার করে

শীত চন্দনপঙ্কে।

ঝরিছে মুকুল, কূজিছে কোকিল,

যামিনী জোছনামত্তা।

“কে এসেছ তুমি ওগাে দয়াময়”

শুধাইল নারী, সন্ন্যাসী কয়

“আজি রজনীতে হয়েছে সময়

এসেছি বাসবদত্তা।”

১৯ আশ্বিন, ১৩০৬

নাট্য কবিতা · কর্ণ-কুন্তী-সংবাদ

কর্ণ-কুন্তী-সংবাদ

কর্ণ

পুণ্য জাহ্নবীর তীরে সন্ধ্যা-সবিতার

বন্দনায় আছি রত। কর্ণ নাম যার,

অধিরথসূতপুত্র, রাধাগর্ভজাত

সেই আমি,—কহ মােরে তুমি কে গাে মাতঃ!

কুন্তী

বৎস, তাের জীবনের প্রথম প্রভাতে

পরিচয় করায়েছি তােরে বিশ্ব সাথে,

সেই আমি, আসিয়াছি ছাড়ি সর্ব্ব লাজ

তােরে দিতে আপনার পরিচয় আজ।

কর্ণ

দেবী তব নত-নেত্র-কিরণ-সম্পাতে

চিত্ত বিগলিত মাের, সূর্যকরঘাতে

শৈল তুষারের মত। তব কণ্ঠস্বর

যেন পূর্ব্বজন্ম হ’তে পশি কর্ণপর

জাগাইছে অপূর্ব্ব বেদনা। কহ মােরে

জন্ম মাের বাঁধা আছে কি রহস্য-ডােরে

তােমা সাথে হে অপরিচিতা!

কুন্তী

ধৈর্য্য ধর

ওরে বৎস, ক্ষণকাল। দেব দিবাকর

আগে যাক অস্তাচলে। সন্ধ্যার তিমির

আসুক নিবিড় হ’য়ে।—কহি তােরে বীর

কুন্তী আমি।

কর্ণ

তুমি কুন্তী! অৰ্জ্জুন-জননী!

কুন্তী

অৰ্জ্জুন-জননী বটে! তাই মনে গণি’

দ্বেষ করিয়াে না বৎস! আজো মনে পড়ে

অস্ত্র-পরীক্ষার দিন হস্তিনানগরে।

তুমি ধীরে প্রবেশিলে তরুণকুমার

রঙ্গস্থলে, নক্ষত্রখচিত পূর্ব্বাশার

প্রান্তদেশে নবােদিত অরুণের মত।

যবনিকা-অন্তরালে নারী ছিল যত

তা’র মধ্যে বাক্যহীনা কে সে অভাগিনী

অতৃপ্ত স্নেহ-ক্ষুধার সহস্র নাগিনী

জাগায়ে জর্জ্জর বক্ষে; কাহার নয়ন

তােমার সর্ব্বাঙ্গে দিল আশিষ-চুম্বন?

অৰ্জ্জুন-জননী সে যে! যবে কৃপ আসি

তােমারে পিতার নাম শুধালেন হাসি,

কহিলেন, “রাজকুলে জন্ম নহে যার

অর্জ্জুনের সাথে যুদ্ধে নাহি অধিকার”,—

আরক্ত আনত মুখে না রহিল বাণী,

দাঁড়ায়ে রহিলে,—সেই লজ্জা-আভাখানি

দহিল যাহার বক্ষ অগ্নিসম তেজে,

কে সে অভাগিনী? অৰ্জ্জুন-জননী সে যে!

পুত্র দুর্য্যোধন ধন্য, তখনি তােমারে

অঙ্গরাজ্যে কৈল অভিষেক। ধন্য তা’রে!

মাের দুই নেত্র হ’তে অশ্রুবারিরাশি

উদ্দেশে তােমারি শিরে উচ্ছ্বসিল আসি’

অভিষেক সাথে। হেন কালে করি পথ

রঙ্গমঝে পশিলেন সূত অধিরথ

আনন্দ-বিহ্বল। তখনি সে রাজসাজে

চারিদিকে কুতূহলী জনতার মাঝে

অভিষেকসিক্ত শির লুটায়ে চরণে

সূতবৃদ্ধে প্রণমিলে পিতৃ-সম্ভাষণে!

ক্রুর হাস্যে পাণ্ডবের বন্ধুগণ সবে

ধিক্কারিল; সেইক্ষণে পরম গরবে

বীর বলি’ যে তােমারে ওগাে বীরমণি

আশীষিল, আমি সেই অৰ্জ্জুন-জননী।

কর্ণ

প্রণমি তােমারে আর্য্যে! রাজমাতা তুমি,

কেন হেথা একাকিনী? এ যে রণভূমি,

আমি কুরুসেনাপতি।

কুন্তী

পুত্র, ভিক্ষা আছে,—

বিফল না ফিরি যেন।

কর্ণ

ভিক্ষা, মাের কাছে?

আপন পৌরুষ ছাড়া, ধর্ম্ম ছাড়া আর

যাহা আজ্ঞা কর, দিব চরণে তােমার।

কুন্তী

এসেছি তােমারে নিতে।

কর্ণ

কোথা ল’বে মােরে?

তৃষিত বক্ষের মাঝে—লব মাতৃক্রোড়ে

কর্ণ

পঞ্চপুত্রে ধন্য তুমি, তুমি ভাগ্যবতী,

আমি কুলশীলহীন, ক্ষুদ্র নরপতি,

মােরে কোথা দিবে স্থান?

কুন্তী

সর্ব্ব উচ্চভাগে,

তােমারে বসাব মাের সর্ব্বপুত্র আগে

জ্যেষ্ঠ পুত্র তুমি।

কর্ণ

কোন্ অধিকার-মদে

প্রবেশ করিব সেথা? সাম্রাজ্য-সম্পদে

বঞ্চিত হয়েছে যারা, মাতৃস্নেহধনে

তাহাদের পূর্ণ অংশ খণ্ডিব কেমনে

কহ মােরে? দ্যূতপণে না হয় বিক্রয়,

বাহুবলে নাহি হারে মাতার হৃদয়-

সে যে বিধাতার দান!

কুন্তী

পুত্র মাের, ওরে,

বিধাতার অধিকার ল’য়ে এই ক্রোড়ে

এসেছিলি একদিন—সেই অধিকারে

আয় ফিরে সগৌরবে, আয় নির্ব্বিচারে,

সকল ভ্রাতার মাঝে মাতৃঅঙ্কে মম

লহ আপনার স্থান।

কর্ণ

শুনি স্বপ্নসম

হে দেবি তােমার বাণী! হের অন্ধকার

ব্যাপিয়াছে দিগ্বিদিকে, লুপ্ত চারিধার—

শব্দহীনা ভাগীরথী। গেছ মােরে ল’য়ে

কোন্ মায়াচ্ছন্ন লােকে, বিস্মৃত আলয়ে,

চেতনা-প্রত্যুষে। পুরাতন সত্যসম

তব বাণী স্পর্শিতেছে মুগ্ধচিত্ত মম।

অস্ফুট শৈশবকাল যেন রে আমার,

যেন মাের জননীর গর্ভের আঁধার

আমারে ঘেরিছে আজি। রাজমাতঃ অয়ি

সত্য হােক স্বপ্ন হোক, এস স্নেহময়ী

তােমার দক্ষিণহস্ত ললাটে চিবুকে

রাখ ক্ষণকাল। শুনিয়াছি লােকমুখে

জননীর পরিত্যক্ত আমি! কতবার

হেরেছি নিশীথস্বপ্নে, জননী আমার

২২৫

এসেছেন ধীরে ধীরে দেখিতে আমায়,

কাঁদিয়া কহেছি তাঁরে কাতর ব্যথায়

জননী গুণ্ঠন খোল দেখি তব মুখ-

অমনি মিলায় মূর্ত্তি তৃষার্ত্ত উৎসুক

স্বপনেরে ছিন্ন করি। সেই স্বপ্ন আজি

এসেছে কি পাণ্ডব-জননী-রূপে সাজি

সন্ধ্যাকালে, রণক্ষেত্রে, ভাগীরথীতীরে?

হের দেবী পরপারে পাণ্ডব-শিবিরে

জ্বলিয়াছে দীপালােক,—এপারে অদূরে

কৌরবের মন্দুরায় লক্ষ অশ্বখুরে

খর শব্দ উঠিছে বাজিয়া। কালি প্রাতে

আরম্ভ হইবে মহারণ। আজ রাতে

অৰ্জ্জুন-জননী-কণ্ঠে কেন শুনিলাম

আমার মাতার স্নেহস্বর? মাের নাম

তাঁর মুখে কেন হেন মধুর সঙ্গীতে

উঠিল বাজিয়া—চিত্ত মাের আচম্বিতে

পঞ্চপাণ্ডবের পানে ভাই বলে’ ধায়।

কুন্তী

তবে চলে’ আয় বৎস, তবে চলে’ আয়।

কর্ণ

যাব মাতঃ চলে’ যাব, কিছু শুধাব না-

করি সংশয় কিছু না করি ভাবনা!-

দেবি, তুমি মাের মাতা! তােমার আহ্বানে

অন্তরাত্মা জাগিয়াছে-নাহি বাজে কানে

যুদ্ধভেরী জয়শঙ্খ -মিথ্যা মনে হয়

রণহিংসা, বীরখ্যাতি জয়পরাজয়।

কোথা যাব, ল’য়ে চল।

কুন্তী

ওই পরপারে

যেথা জ্বলিতেছে দীপ স্তব্ধ চন্দ্রাবারে

পাণ্ডুর বালুকাতটে।

কর্ণ

হােথা মাতৃহারা

মা পাইবে চিরদিন! হােথা ধ্রুবতারা

চিররাত্রি র’বে জাগি সুন্দর উদার

তােমার নয়নে! দেবি, কহ আরবার

আমি পুত্র তব!

কুন্তী

পুত্র মাের!

কর্ণ

কেন তবে

আমারে ফেলিয়া দিলে দূরে অগৌরবে

কুলশীলমানহীন মাতৃনেত্রহীন

অন্ধ এ অজ্ঞাত বিশ্বে? কেন চিরদিন

ভাসাইয়া দিলে মােরে অবজ্ঞার স্রোতে,

কেন দিলে নির্ব্বাসন ভ্রাতৃকুল হ’তে?

রাখিলে বিচ্ছিন্ন করি অর্জ্জুনে আমারে?—

তাই শিশুকাল হ’তে টানিছে দোঁহারে

নিগূঢ় অদৃশ্য পাশ হিংসার আকারে

দুর্ণিবার আকর্ষণে। মাতঃ, নিরুত্তর?

লজ্জা তব, ভেদ করি অন্ধকার স্তর

পরশ করিছে মােরে সর্ব্বাঙ্গে নীরবে-

মুদিয়া দিতেছে চক্ষু।—থাক্ থাক্ তবে।

কহিয়াে না, কেন তুমি ত্যজিলে আমারে।

বিধির প্রথম দান এ বিশ্বসংসারে

মাতৃস্নেহ, কেন সেই দেবতার ধন

আপন সন্তান হ’তে করিলে হরণ

সে কথার দিয়ো না উত্তর। কহ মােরে,

আজি কেন ফিরাইতে আসিয়াছ ক্রোড়ে?

কুন্তী

হে বৎস, ভৎসনা তাের শত বজ্রসম

বিদীর্ণ করিয়া দিক্ এ হৃদয় মম

শত খণ্ড করি। ত্যাগ করেছিনু তােরে

সেই অভিশাপে, পঞ্চপুত্র বক্ষে করে’

তবু মাের চিত্ত পুত্রহীন,—তবু হায়

তাের লাগি বিশ্বমাঝে বাহু মাের ধায়

খুঁজিয়া বেড়ায় তােরে। বঞ্চিত যে ছেলে

তারি তরে চিত্ত মাের দীপ্ত দীপ জ্বেলে

আপনারে দগ্ধ করি’ করিছে আরতি

বিশ্ব-দেবতার।—আমি আজি ভাগ্যবতী

পেয়েছি তােমার দেখা।—যবে মুখে তাের

একটি ফুটেনি বাণী, তখন কঠোর

অপরাধ করিয়াছি—বৎস, সেই মুখে

ক্ষমা কর কুমাতায়! সেই ক্ষমা, বুকে

ভৎসনার চেয়ে তেজে জ্বালুক অনল

পাপ দগ্ধ করে’ মােরে করুক্‌ নির্ম্মল।

কর্ণ

মাতঃ দেহ পদধূলি, দেহ পদধূলি,

লহ অশ্রু মাের।

কুন্তী

তােরে ল’ব বক্ষে তুলি

সে সুখ-আশায় পুত্র আসি নাই দ্বারে।

ফিরাতে এসেছি তােরে নিজ অধিকারে।—

সূতপুত্র নহ তুমি, রাজার সন্তান,

দূর করি দিয়া বৎস সর্ব্ব অপমান

এস চলি যেথা আছে তব পঞ্চ ভ্রাতা।

কর্ণ

মাতঃ সূতপুত্র আমি, রাধা মাের মাতা,

তা’র চেয়ে নাহি মাের অধিক গৌরব।

পাণ্ডব পাণ্ডব থাক, কৌরব কৌরব-

ঈর্ষ্যা নাহি করি কারে।—

রাজ্য আপনার

বাহুবলে করি লহ হে বৎস উদ্ধার।

দুলাবেন ধবল ব্যজন যুধিষ্ঠির,

ভীম ধরিবেন ছত্র, ধনঞ্জয় বীর

সারথি হবেন রথে, ধৌম্য পুরােহিত

গাহিবেন বেদমন্ত্র—তুমি শত্রুজিৎ

অখণ্ড প্রতাপে র’বে বান্ধবের সনে

নিঃসপত্ন রাজ্যমাঝে রত্ন-সিংহাসনে।

কর্ণ

সিংহাসনে? যে ফিরাল মাতৃ-স্নেহ-পাশ-

তাহারে দিতেছ মাতঃ রাজ্যের আশ্বাস!

একদিন যে সম্পদে করেছ বঞ্চিত

সে আর ফিরায়ে দেওয়া তব সাধ্যাতীত।—

মাতা মাের, ভ্রাতা মাের, মাের রাজকুল

এক মুহূর্ত্তেই মাতঃ করেছ নির্ম্মূল

মাের জন্মক্ষণে। সূত-জননীরে ছলি’

আজ যদি রাজ-জননীরে মাতা বলি,—

কুরুপতি কাছে বদ্ধ আছি যে বন্ধনে

ছিন্ন করে’ ধাই যদি রাজসিংহাসনে

তবে ধিক মােরে!

কুন্তী

বীর তুমি, পুত্র মাের,

ধন্য তুমি! হায় ধর্ম্ম, একি সুকঠোর

দণ্ড তব! সেইদিন কে জানিত হায়

ত্যজিলাম যে শিশুরে ক্ষুদ্র অসহায়,

সে কখন বলবীর্য্য লভি কোথা হ’তে

ফিরে আসে একদিন অন্ধকার পথে

আপনার জননীর কোলের সন্তানে

আপন নির্ম্মম হস্তে অস্ত্র আসি হানে।

একি অভিশাপ!

কর্ণ

মাতঃ করিয়াে না ভয়।

কহিলাম, পাণ্ডবের হইবে বিজয়।

আজি এই রজনীর তিমির-ফলকে

প্রত্যক্ষ করিনু পাঠ নক্ষত্র-আলােকে

ঘাের যুদ্ধ-ফল। এই শান্ত স্তব্ধক্ষণে

অনন্ত আকাশ হ’তে পশিতেছে মনে

জয়হীন চেষ্টার সঙ্গীত,—আশাহীন

কর্ম্মের উদ্যম, হেরিতেছি শান্তিময়

শূন্য পরিণাম। যে পক্ষের পরাজয়

সে পক্ষ ত্যজিতে মােরে কোরাে না আহ্বান।

জয়ী হােক রাজা হােক্ পাণ্ডব-সন্তান-

আমি রব নিস্ফলের, হতাশের দলে।

জন্মরাত্রে ফেলে গেছ মােরে ধরাতলে

নামহীন গৃহহীন—আজিও তেমনি

আমারে নির্ম্মম চিত্তে তেয়াগ’ জননী

দীপ্তিহীন কীর্ত্তিহীন পরাভব পরে।

শুধু এই আশীর্বাদ দিয়ে যাও মােরে

জয়লােভে যশােলােভে রাজ্যলােভে, অয়ি,

বীরের সদগতি হ’তে ভ্রষ্ট নাহি হই।

১৫ই ফাল্গুন, ১৩০৬।

নাট্য কবিতা · গান্ধারীর আবেদন

নাট্য-কবিতা

গান্ধারীর আবেদন

দুর্য্যোধন

প্রণমি চরণে তাত!

ধৃতরাষ্ট্র

ওরে দুরাশয়

অভীষ্ট হয়েছে সিদ্ধ?

দুর্য্যোধন

লভিয়াছি জয়।

ধৃতরাষ্ট্র

এখন হয়েছ সুখী?

দুর্য্যোধন

হয়েছি বিজয়ী।

ধৃতরাষ্ট্র

অখণ্ড রাজত্ব জিনি সুখ তাের কই

রে দুর্ম্মতি?

দুর্য্যোধন

সুখ চাহি নাই মহারাজ।

জয়, জয় চেয়েছিনু, জয়ী আমি আজ।

ক্ষুদ্র সুখে ভরেনাকো ক্ষত্রিয়ের ক্ষুধা

কুরুপতি,—দীপ্তজ্বালা অগ্নিঢালা সুধা

জয়রস—ঈর্ষাসিন্ধুমন্থনসঞ্জাত-

সদ্য করিয়াছি পান,—সুখী নহি, তাত,

অদ্য আমি জয়ী। পিতঃ, সুখে ছিনু, যবে

একত্রে আছিনু বদ্ধ পাণ্ডবে কৌরবে,

কলঙ্ক যেমন থাকে শশাঙ্কের বুকে

কর্ম্মহীন গর্ব্বহীন দীপ্তিহীন সুখে।

সুখে ছিনু, পাণ্ডবের গাণ্ডীব টঙ্কারে

শঙ্কাকুল শত্রুদল আসিত না দ্বারে,

সুখে ছিনু, পাণ্ডবেরা জয়দৃপ্ত করে

ধরিত্রী দোহন করি, ভ্রাতৃপ্রীতি ভরে

দিত অংশ তা’র -নিত্য নব ভােগসুখে

আছিনু নিশ্চিন্ত চিত্তে অনন্ত কৌতুকে।

সুখে ছিনু পাণ্ডবের জয়ধ্বনি যবে

হানিত কৌরব-কর্ণ প্রতিধ্বনিরবে;

পাণ্ডবের যশােবিম্ব-প্রতিবিম্ব আসি

উজ্জ্বল অঙ্গুলি দিয়া দিত পরকাশি’

মলিন-কৌরবকক্ষ। সুখে ছিনু পিতঃ

আপনার সর্ব্বতেজ করি নির্ব্বাপিত

পাণ্ডব-গৌরবতলে স্নিগ্ধশান্তরূপে

হেমন্তের ভেক যথা জড়ত্বের কূপে।

আজি পাণ্ডুপুত্রগণে পরাভব বহি

বনে যায় চলি,—আজ আমি সুখী নহি,

আজ আমি জয়ী।

ধৃতরাষ্ট্র

ধিক্ তাের ভ্রাতৃদ্রোহ!

পাণ্ডবের কৌরবের এক পিতামহ

সে কি ভুলে গেলি?

দুর্য্যোধন

ভুলিতে পারিনে সে যে,

এক পিতামহ তবু ধনে মানে তেজে

এক নহি। -যদি হ’ত দূরবর্ত্তী পর

নাহি ছিল ক্ষোভ; শর্ব্বরীর শশধর

মধ্যাহ্নের তপনেরে দ্বেষ নাহি করে,—

কিন্তু প্রাতে এক পূর্ব্ব-উদয়-শিখরে

দুই ভ্রাতৃ-সূর্য্যলােক কিছুতে না ধরে।

আজ দ্বন্দ্ব ঘুচিয়াছে, আজি আমি জয়ী,

আজি আমি একা।

ধৃতরাষ্ট্র

ক্ষুদ্র ঈর্ষ্যা! বিষময়ী

ভুজঙ্গিনী।

দুর্য্যোধন

ক্ষুদ্র নহে, ঈর্ষ্যা সুমহতী।

ঈর্ষ্যা বৃহতের ধর্ম্ম। দুই বনস্পতি

মধ্যে রাখে ব্যবধান,—লক্ষ লক্ষ তৃণ

একত্রে মিলিয়া থাকে বক্ষে বক্ষে লীন;

নক্ষত্র অসংখ্য থাকে সৌভ্রাত্র-বন্ধনে,—

এক সূর্য এক শশী। মলিন কিরণে

দূর বন-অন্তরালে পাণ্ডু চন্দ্রলেখা

আজি অস্ত গেল,—আজি কুরুসূর্য্য একা,

আজি আমি জয়ী।

ধৃতরাষ্ট্র

আজি ধর্ম্ম পরাজিত।

দুর্য্যোধন

লােকধর্ম্ম রাজধর্ম্ম এক নহে পিতঃ!

লােকসমাজের মাঝে সমকক্ষজন

সহায় সুহৃদরূপে নির্ভর বন্ধন,—

কিন্তু রাজা একেশ্বর, সমকক্ষ তা’র

মহাশত্রু, চিরবিঘ্ন, স্থান দুশ্চিন্তার,

সম্মুখের অন্তরাল, পশ্চাতের ভয়,

অহর্নিশি যশঃশক্তিগৌরবের ক্ষয়,

ঐশ্বর্য্যের অংশ-অপহারী। ক্ষুদ্রজনে

বলভাগ করে’ ল’য়ে বান্ধবের সনে

রহে বলী; রাজদণ্ডে যত খণ্ড হয়

তত তা’র দুর্ব্বলতা, তত তা’র ক্ষয়।

একা সকলের উর্দ্ধে মস্তক আপন

যদি না রাখিবে রাজা, যদি বহুজন

বহুদূর হ’তে তাঁর সমুদ্ধত শির

নিত্য না দেখিতে পায় অব্যাহত স্থির,

তবে বহুজন পরে বহুদূরে তাঁর

কেমনে শাসন দৃষ্টি রহিবে প্রচার?

রাজধর্ম্মে ভ্রাতৃধর্ম্ম বন্ধুধর্ম্ম নাই,

শুধু জয়ধর্ম্ম আছে, মহারাজ, তাই

আজি আমি চরিতার্থ, আজি জয়ী আমি,—

সম্মুখের ব্যবধান গেছে আজি নামি’

পাণ্ডব-গৌরবগিরি পঞ্চচূড়াময়।

ধৃতরাষ্ট্র

জিনিয়া কপটদ্যূতে তা’রে কোস্ জয়?

লজ্জাহীন অহঙ্কারী!

দুর্য্যোধন

যার যাহা বল

তাই তা’র অস্ত্র পিতঃ, যুদ্ধের সম্বল।

ব্যাঘ্রসনে নখেদন্তে নহিক সমান

তাই বলে’ ধনুঃশরে বধি তা’র প্রাণ

কোন্ নর লজ্জা পায়? মূঢ়ের মতন

ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুমাঝে আত্মসমর্পণ

যুদ্ধ নহে,—জয়লাভ এক লক্ষ্য তা’র,—

আজি আমি জয়ী পিতঃ, তাই অহঙ্কার।

ধৃতরাষ্ট্র

আজি তুমি জয়ী তাই তব নিন্দাধ্বনি

পরিপূর্ণ করিয়াছে অম্বর অবনী

সমুচ্চ ধিক্কারে।

দুর্য্যোধন

নিন্দা আর নাহি ডরি,

নিন্দারে করিব ধ্বংস কণ্ঠরুদ্ধ করি।

নিস্তব্ধ করিয়া দিব মুখরা নগরী

স্পর্দ্ধিত রসনা তা’র দৃঢ়বলে চাপি

মাের পাদপীঠতলে। “দুর্য্যোধন পাপী”

“দুর্য্যোধন ক্রুরমনা” “দুর্য্যোধন হীন”

নিরুত্তরে শুনিয়া এসেছি এতদিন,

রাজদণ্ড স্পর্শ করি কহি মহারাজ

আপামর জনে আমি কহাইব আজ

“দুর্য্যোধন রাজা!—দুর্য্যোধন নাহি সহে

রাজনিন্দা-আলােচনা, দুর্যোধন বহে

নিজহস্তে নিজনাম।”

ধৃতরাষ্ট্র

ওরে বৎস শােন্

নিন্দারে রসনা হ’তে দিলে নির্ব্বাসন

নিম্নমুখে অন্তরের গূঢ় অন্ধকারে

গভীর জটিল মূল সুদূরে প্রসারে,

নিত্য বিষতিক্ত করি রাখে চিত্ততল।

রসনায় নৃত্য করি’ চপল চঞ্চল

নিন্দা শ্রান্ত হ’য়ে পড়ে,—দিয়াে না তাহারে

নিঃশব্দে আপন শক্তি বৃদ্ধি করিবারে

গােপন হৃদয়দুর্গে। প্রতিমন্ত্রবলে

শান্ত কর বন্দী কর নিন্দা সর্পদলে

বংশীরবে হাস্যমুখে।—

দুর্য্যোধন

অব্যক্ত নিন্দায়

কোনাে ক্ষতি নাহি করে রাজ-মর্যাদায়,

ভ্রুক্ষেপ না করি তাহে। প্রীতি নাহি পাই

তাহে খেদ নাহি—কিন্তু স্পর্দ্ধা নাহি চাই

মহারাজ!—প্রতিদান স্বেচ্ছার অধীন,—

প্রীতিভিক্ষা দিয়ে থাকে দীনতম দীন,—

সে প্রীতি বিলাক্ তা’রা পালিত মার্জ্জারে,

দ্বারের কুকুরে, আর পাণ্ডবভ্রাতারে,

তাহে মাের নাহি কাজ। আমি চাহি ভয়

সেই মাের রাজপ্রাপ্য,—আমি চাহি জয়

দপিতের দর্প নাশি'। শুন নিবেদন

পিতৃদেব,—এতকাল তব সিংহাসন

আমার নিন্দুকদল নিত্য ছিল ঘিরে,

কণ্টক তরুর মত নিষ্ঠুর প্রাচীরে

তােমার আমার মধ্যে রচি ব্যবধান;

শুনায়েছে পাণ্ডবের নিত্য গুণগান

আমাদের নিত্য নিন্দা,—এই মতে পিতঃ

পিতৃস্নেহ হ’তে মােরা চির নির্ব্বাসিত।

এই মতে পিতঃ মােরা শিশুকাল হ’তে

হীনবল,—উৎসমুখে পিতৃস্নেহস্রোতে

পাষাণের বাধা পড়ি মােরা পরিক্ষীণ

শীর্ণ নদ, নষ্টপ্রাণ, গতিশক্তিহীন,

পদে পদে প্রতিহত; পাণ্ডবেরা স্ফীত

অখণ্ড অবাধগতি;—অদ্য হ’তে পিতঃ

যদি সে নিন্দুকদলে নাহি কর দূর

সিংহাসনপার্শ্ব হ’তে, সঞ্জয় বিদুর

ভীষ্ম পিতামহে,—“যদি তা’রা বিজ্ঞবেশে

হিতকথা ধর্ম্মকথা সাধু উপদেশে

নিন্দায় ধিক্কারে তর্কে নিমেষে নিমেষে

ছিন্ন ছিন্ন করি দেয় রাজকর্ম্মডাের,

ভারাক্রান্ত করি রাখে রাজদণ্ড মাের,

পদে পদে দ্বিধা আনে রাজশক্তিমাঝে,

মুকুট মলিন করে অপমানে লাজে,

তবে ক্ষমা দাও পিতৃদেব,নাহি কাজ

সিংহাসন-কণ্টকশয়নে,—মহারাজ

বিনিময় করে’ লই পাণ্ডবের সনে

রাজ্য দিয়ে বনবাস, যাই নির্ব্বাসনে।

ধৃতরাষ্ট্র

হায় বৎস অভিমানী! পিতৃস্নেহ মাের

কিছু যদি হ্রাস হ’ত শুনি সুকঠোর

সুহৃদের নিন্দাবাক্য,—হইত কল্যাণ।

অধর্ম্মে দিয়েছি যােগ, হারায়েছি জ্ঞান,

এত স্নেহ! করিতেছি সর্ব্বনাশ তাের,

এত স্নেহ! জ্বালাতেছি কালানল ঘাের

পুরাতন কুরুবংশ-মহারণ্যতলে,—

তবু পুত্র দোষ দিস্ স্নেহ নাই বলে’!

মণিলােভে কালসর্প করিলি কামনা,

দিনু তােরে নিজহস্তে ধরি তা’র ফণা

অন্ধ আমি!–অন্ধ আমি অন্তরে বাহিরে

চিরদিন,—তােরে ল’য়ে প্রলয়-তিমিরে

চলিয়াছি,—বন্ধুগণ হাহাকার-রবে

করিছে নিষেধ,—নিশাচর গৃধ্রুসবে

করিতেছে অশুভ চীৎকার,—পদে পদে

সঙ্কীর্ণ হতেছে পথ,–আসন্ন বিপদে

কণ্টকিত কলেবর,তবু দৃঢ়করে

ভয়ঙ্কর স্নেহে বক্ষে বাঁধি ল’য়ে তােরে

বায়ুবলে অন্ধবেগে বিনাশের গ্রাসে

ছুটিয়া চলেছি মূঢ় মত্ত অট্টহাসে

উল্কার আলােকে,—শুধু তুমি আর আমি,—

আর সঙ্গী বজ্রহস্ত দীপ্ত অন্তর্যামী,—

নাই সম্মুখের দৃষ্টি, নাই নিবারণ

পশ্চাতের, শুধু নিম্নে ঘাের আকর্ষণ

নিদারুণ নিপাতের সহসা একদা

চকিতে চেতনা হবে, বিধাতার গদা

মুহূর্ত্তে পড়িবে শিরে,—আসিবে সময়,

ততক্ষণ পিতৃস্নেহে কোরাে না সংশয়,

আলিঙ্গন কোরাে না শিথিল,—ততক্ষণ

দ্রুত হস্তে লুটি লও সর্ব্ব স্বার্থধন,

হও জয়ী, হও সুখী, হও তুমি রাজা

একেশ্বর।—ওরে তােরা জয়বাদ্য বাজা।

জয়ধ্বজা তােল শূন্যে। আজি জয়ােৎসবে

ন্যায় ধর্ম্ম বন্ধু ভ্রাতা কেহ নাহি র’বে,—

না র’বে বিদুর ভীষ্ম না র’বে সঞ্জয়,

নাহি র’বে লােকনিন্দা লােকলজ্জা ভয়,

কুরুবংশ-রাজলক্ষী নাহি র’বে আর,

শুধু র’বে অন্ধ পিতা, অন্ধ পুত্র তা’র

আর কালান্তক যম,—শুধু পিতৃস্নেহ

আর বিধাতার শাপ-আর নহে কেহ।

( চরের প্রবেশ )

চর

মহারাজ, অগ্নিহােত্র, দেব-উপাসনা,

ত্যাগ করি বিপ্রগণ, ছাড়ি সন্ধ্যার্চ্চনা,

দাঁড়ায়েছে চতুষ্পথে, পাণ্ডবের তরে

প্রতীক্ষিয়া;—পৌরগণ কেহ নাহি ঘরে,

পণ্যশালা রুদ্ধ সব; সন্ধ্যা হ’ল তবু

ভৈরব-মন্দির মাঝে নাহি বাজে প্রভু

শঙ্খঘণ্টা সন্ধ্যাভেরী, দীপ নাহি জ্বলে;—

শােকাতুর নরনারী সবে দলে দলে

চলিয়াছে নগরের সিংহদ্বার পানে

দীন বেশে সজল নয়নে।

দুর্য্যোধন

নাহি জানে,

জাগিয়াছে দুর্য্যোধন। মুঢ় ভাগ্যহীন।

ঘনায়ে এসেছে আজি তােমার দুর্দ্দিন।

রাজায় প্রজায় আজি হবে পরিচয়

ঘনিষ্ঠ কঠিন। দেখি কতদিন রয়

প্রজার পরম স্পর্দ্ধা,—নির্ব্বিষ সর্পের

ব্যর্থ ফণা-আস্ফালন,——নিরস্ত্র দর্পের

হুহুঙ্কার।

(প্রতিহারীর প্রবেশ )

প্রতিহারী

মহারাজ, মহিষী গান্ধারী

দর্শনপ্রার্থিনী পদে।

ধৃতরাষ্ট্র

রহিনু তাঁহারি

প্রতীক্ষায়।

দুর্যোধন

পিতঃ আমি চলিলাম তবে।

(প্রস্থান)

ধৃতরাষ্ট্র

কর পলায়ন। হায় কেমনে বা সবে

সাধ্বী জননীর দৃষ্টি সমুদ্যত বাজ

ওরে পুণ্যভীত! মােরে তাের নাহি লাজ!

( গান্ধারীর প্রবেশ)

গান্ধারী

নিবেদন আছে শ্রীচরণে। অনুনয়

রক্ষা কর নাথ।

ধৃতরাষ্ট্র

কভু কি অপূর্ণ রয়

প্রিয়ার প্রার্থনা?

গান্ধারী

ত্যাগ কর এইবার-

ধৃতরাষ্ট্র

কারে হে মহিষী?

গান্ধারী

পাপের সংঘর্ষে যার

পড়িছে ভীষণ শাণ ধর্ম্মের কৃপাণে

সেই মূঢ়ে।

ধৃতরাষ্ট্র

কে সে জন? আছে কোন্ খানে?

শুধু কহ নাম তা’র।

গান্ধারী

পুত্র দুর্য্যোধন।

ধৃতরাষ্ট্র

তাহারে করিব ত্যাগ?

গান্ধারী

এই নিবেদন

তব পদে।

ধৃতরাষ্ট্র

দারুণ প্রার্থনা হে গান্ধারী

রাজমাতা!

গান্ধারী

এ প্রার্থনা শুধু কি আমারি

হে কৌরব? কুরুকুল-পিতৃ-পিতামহ

স্বর্গ হ’তে এ প্রার্থনা করে অহরহ

নরনাথ! ত্যাগ কর ত্যাগ কর তা’রে—

কৌরব-কল্যাণলক্ষী যার অত্যাচারে

অশ্রুমুখী প্রতীক্ষিছে বিদায়ের ক্ষণ

রাত্রি দিন।

ধৃতরাষ্ট্র

ধর্ম্ম তা’রে করিবে শাসন

ধর্ম্মেরে যে লঙ্ঘন করেছে,—আমি পিতা-

গান্ধারী

মাতা আমি নহি? গর্ভভার-জর্জ্জরিতা

জাগ্রত হৃৎপিণ্ডতলে বহি নাই তা’রে?

স্নেহ-বিগলিত চিত্ত শুভ্র দুগ্ধধারে

উচ্ছ্বসিয়া উঠে নাই দুই স্তন বাহি’

তা’র সেই অকলঙ্ক শিশুমুখ চাহি?

শাখাবন্ধে ফল যথা, সেই মত করি

বহু বর্ষ ছিল না সে আমারে আঁকড়ি

দুই ক্ষুদ্র বাহুবৃন্ত দিয়ে,—ল’য়ে টানি

মাের হাসি হ’তে হাসি, বাণী হতে বাণী

প্রাণ হ’তে প্রাণ?—তবু কহি, মহারাজ,

সেই পুত্র দুর্যোধনে ত্যাগ কর আজ।

ধৃতরাষ্ট্র

কি রাখিব তা’রে ত্যাগ করি?

গান্ধারী

ধর্ম্ম তব।

ধৃতরাষ্ট্র

কি দিবে তােমারে ধর্ম্ম?

গান্ধারী

দুঃখ নবনব।

পুত্রসুখ রাজ্যসুখ অধর্ম্মের পণে

জিনি ল’য়ে চিরদিন বহিব কেমনে

দুই কাঁটা বক্ষে আলিঙ্গিয়া?

ধৃতরাষ্ট্র

হায় প্রিয়ে,

ধর্ম্মবশে একবার দিলু ফিরাইয়ে

দ্যূতবদ্ধ পাণ্ডবের হৃত রাজ্যধন।

পরক্ষণে পিতৃস্নেহ করিল গুঞ্জন

শতবার কর্ণে মোর-“কি করিলি ওরে!

এককালে ধর্ম্মাধর্ম্ম দুই তরী পরে

পা দিয়ে বাঁচে না কেহ। বারেক যখন

নেমেছে পাপের স্রোতে কুরুপুত্রগণ

তখন ধর্ম্মের সাথে সন্ধি করা মিছে,

পাপের দুয়ারে পাপ সহায় মাগিছে।

কি করিলি, হতভাগ্য, বৃদ্ধ, বুদ্ধিহত,

দুর্ব্বল দ্বিধায় পড়ি। অপমান-ক্ষত

রাজ্য ফিরে দিলে তবু মিলাবে না আর

পাণ্ডবের মনে—শুধু নব কাষ্ঠভার

হুতাশনে দান। অপমানিতের করে

ক্ষমতার অস্ত্র দেওয়া মরিবার তরে।

সক্ষমে দিয়াে না ছাড়ি দিয়ে স্বল্প পীড়া,—

করহ দলন। কোরাে না বিফল ক্রীড়া

পাপের সহিত; যদি ডেকে আন তা’রে,

বরণ করিয়া তবে লহ একেবারে।”-

এই মত পাপবুদ্ধি পিতৃস্নেহরূপে

বিঁধিতে লাগিল মাের কর্ণে চুপে চুপে

কত কথা তীক্ষ্ণ সূচিসম। পুনরায়

ফিরানু পাণ্ডবগণে,—দ্যূতছলনায়

বিসর্জ্জিনু দীর্ঘ বনবাসে। হায় ধর্ম্ম,

হায় রে প্রবৃত্তিবেগ! কে বুঝিবে মর্ম্ম

সংসারের।

গান্ধারী

ধর্ম্ম নহে সম্পদের হেতু

মহারাজ, নহে সে সুখের ক্ষুদ্র সেতু,—

ধর্ম্মেই ধর্ম্মের শেষ। মূঢ় নারী আমি,

ধর্ম্মকথা তােমারে কি বুঝাইব স্বামী,

জান ত সকলি। পাণ্ডবেরা যাবে বনে

ফিরাইলে ফিরিবে না, বদ্ধ তা’রা পণে,—

এখন এ মহারাজ্য একাকী তােমার

মহীপতি,—পুত্রে তব ত্যজ এইবার,—

নিষ্পপেরে দুঃখ দিয়ে নিজে পূর্ণ সুখ

লইয়াে না,ন্যায়ধর্ম্মে কোরাে না বিমুখ

পৌরব-প্রাসাদ হ’তে,দুঃখ সুদুঃসহ

আজ হ’তে ধর্ম্মরাজ লহ তুলি’ লহ

দেহ তুলি’ মাের শিরে।

ধৃতরাষ্ট্র

হায় মহারাণী,

সত্য তব উপদেশ, তীব্র তব বাণী।

গান্ধারী

অধর্ম্মের মধুমাখা বিষফল তুলি

আনন্দে নাচিছে পুত্র;—স্নেহমমাহে ভুলি

সে ফল দিয়ে না তা’রে ভােগ করিবারে,

কেড়ে লও, ফেলে দাও, কাঁদাও তাহারে।

ছললব্ধ পাপস্ফীত রাজ্যধনজনে

ফেলে রাখি’ সেও চলে’ যাক্‌ নির্ব্বাসনে,

বঞ্চিত পাণ্ডবদের সমদুঃখভার

করুক বহন।

ধৃতরাষ্ট্র

ধর্ম্মবিধি বিধাতার,—

জাগ্রত আছেন তিনি, ধর্ম্মদণ্ড তাঁর

রয়েছে উদ্যত নিত্য,—অয়ি মনস্বিনী,

তাঁর রাজ্যে তাঁর কার্য্য করিবেন তিনি।

আমি পিতা-

গান্ধারী

তুমি রাজা, রাজ-অধিরাজ,

বিধাতার বামহস্ত; -ধর্ম্মরক্ষা কাজ

তােমা পরে সমর্পিত। শুধাই তােমারে

যদি কোনাে প্রজা তব, সতী অবলারে

পরগৃহ হ’তে টানি করে অপমান

বিনা দোষে—কি তাহার করিবে বিধান?

ধৃতরাষ্ট্র

নির্ব্বাসন।

গান্ধারী

তবে আজ রাজ-পদতলে

সমস্ত নারীর হ’য়ে নয়নের জলে

বিচার প্রার্থনা করি। পুত্র দুর্য্যোধন

অপরাধী প্রভু! তুমি আছ, হে রাজন,

প্রমাণ আপনি। পুরুষে পুরুষে দ্বন্দ্ব

স্বার্থ ল’য়ে বাধে অহরহ,—ভালো মন্দ

নাহি বুঝি তা’র,—দণ্ডনীতি, ভেদনীতি,

কূটনীতি কতশত,—পুরুষের রীতি

পুরুষেই জানে। বলের বিরোধে বল,

ছলের বিরোধে কত জেগে উঠে ছল,

কৌশলে কৌশল হানে,—মোরা থাকি দূরে

আপনার গৃহকর্ম্মে শান্ত অন্তঃপুরে।

যে সেথা টানিয়া আনে বিদ্বেষ অনল

বাহিরের দ্বন্দ হ’তে,পুরুষেরে ছাড়ি

অন্তঃপুরে প্রবেশিয়া নিরুপায় নারী

গৃহধর্ম্মচারিণীর পুণ্যদেহ পরে

কলুষ-পরুষ স্পর্শে অসম্মানে করে

হস্তক্ষেপ,—পতি সাথে বাধায়ে বিরোধ

যে নর পত্নীরে হানি লয় তা’র শোধ

সে শুধু পাষণ্ড নহে, সে যে কাপুরুষ।

মহারাজ, কি তা’র বিধান? অকলুষ

পুরুবংশে পাপ যদি জন্মলাভ করে

সেও সহে,—কিন্তু প্রভু, মাতৃগর্ব্বভরে

ভেবেছিনু গর্ভে মাের বীরপুত্রগণ

জন্মিয়াছে,—হায় নাথ, সে দিন যখন

অনাথিনী পাঞ্চালীর আর্ত্তকণ্ঠরব

প্রাসাদ-পাষাণ-ভিত্তি করি দিল দ্রব

লজ্জা ঘৃণা করুণার তাপে,—ছুটি গিয়া

হেরিনু গবাক্ষে, তা’র বস্ত্র আকর্ষিয়া

খল খল হাসিতেছে সভামাঝখানে

গান্ধারীর পুত্র পিশাচেরা,—ধর্ম্ম জানে

সে দিন চূর্ণিয়া গেল জন্মের মতন

জননীর শেষ গর্ব্ব। কুরুরাজগণ!

পৌরুষ কোথায় গেছে ছাড়িয়া ভারত?

তােমরা, হে মহারথী জড়মূর্ত্তিবৎ

বসিয়া রহিলে সেথা চাহি মুখে মুখে

কেহ বা হাসিলে, কেহ করিলে কৌতুকে

কানাকানি,—কোষমাঝে নিশ্চল কৃপাণ

বজ্র-নিঃশেষিত লুপ্ত বিদ্যুৎ সমান

নিদ্রাগত।—মহারাজ, শুন মহারাজ

এ মিনতি। দূর কর জননীর লাজ,

বীরধর্ম্ম করহ উদ্ধার, পদাহত

সতীত্বের ঘুচাও ক্রন্দন, অবনত

ন্যায়ধর্ম্মে করহ সম্মান,—ত্যাগ কর

দুর্য্যোধনে।

ধৃতরাষ্ট্র

পরিতাপ-দহনে জর্জ্জর

হৃদয়ে করিছ শুধু নিস্ফল আঘাত

হে মহিষী!

গান্ধারী

শতগুণ বেদনা কি, নাথ,

লাগিছে না মােরে? প্রভু, দণ্ডিতের সাথে

দণ্ডদাতা কাঁদে যবে সমান আঘাতে

সর্ব্বশ্রেষ্ঠ সে বিচার। যার তরে প্রাণ

কোনাে ব্যথা নাহি পায় তা’রে দণ্ডদান

প্রবলের অত্যাচার। যে দণ্ডবেদনা

পুত্রেরে পার না দিতে সে কারে দিয়াে না,—

যে তােমার পুত্র নহে তারাে পিতা আছে,

মহা অপরাধী হবে তুমি তা’র কাছে

বিচারক। শুনিয়াছি বিশ্ববিধাতার

সবাই সন্তান মােরা,—পুত্রের বিচার

নিয়ত করেন তিনি আপনার হাতে

নারায়ণ; ব্যথা দেন, ব্যথা পান সাথে,

নতুবা বিচারে তাঁর নাই অধিকার,—

মূঢ় নারী লভিয়াছি অন্তরে আমার

এই শাস্ত্র।—পাপী পুত্রে ক্ষমা কর যদি

নির্ব্বিচারে, মহারাজ, তবে নিরবধি

যত দণ্ড দিলে তুমি যত দোষী জনে

ফিরিয়া লাগিবে আসি দণ্ডদাতা ভূপে,—

ন্যায়ের বিচার তব নির্ম্মমতারূপে

পাপ হ’য়ে তােমারে দাগিবে। ত্যাগ কর

পাপী দুর্য্যোধনে।

ধৃতরাষ্ট্র

প্রিয়ে, সংহর, সংহর,

তব বাণী। ছিঁড়িতে পারিনে মােহডাের,

ধর্ম্মকথা শুধু আসি হানে সুকঠোর

ব্যর্থ ব্যথা। পাপী পুত্র ত্যাজ্য বিধাতার,

তাই তা’রে ত্যজিতে না পারি,—আমি তা’র

একমাত্র; উন্মত্ত তরঙ্গ মাঝখানে

যে পুত্র সঁপেছে অঙ্গ তা’রে কোন্ প্রাণে

ছাড়ি যাব।—উদ্ধারের আশা ত্যাগ করি,

তবু তা’রে প্রাণপণে বক্ষে চাপি ধরি,

তারি সাথে এক পাপে ঝাঁপ দিয়া পড়ি,

এক বিনাশের তলে তলাইয়া মরি

অকাতরে,—অংশ লই তা’র দুর্গতির,—

অর্ধ ফল ভােগ করি তা’র দুর্ম্মতির,—

সেই ত সান্ত্বনা মাের,—এখন ত আর

বিচারের কাল নাই—নাই প্রতিকার,

নাই পথ,—ঘটেছে যা ছিল ঘটিবার,

ফলিবে যা ফলিবার আছে।

( প্রস্থান)

গান্ধারী

হে আমার

অশান্ত হৃদয়, স্থির হও। নতশিরে

প্রতীক্ষা করিয়া থাক বিধির বিধিরে

ধৈর্য্য ধরি। যে দিন সুদীর্ঘ রাত্রি পরে

সদ্য জেগে উঠে কাল, সংশােধন করে

আপনারে, সেদিন দারুণ দুঃখদিন।

দুঃসহ উত্তাপে যথা স্থির গতিহীন

ঘুমাইয়া পড়ে বায়ু-জাগে ঝঞ্ঝাঝড়ে

অকস্মাৎ, আপনার জড়ত্বের পরে

করে আক্রমণ, অন্ধ বৃশ্চিকের মত

ভীমপুচ্ছে আত্মশিয়ে হানে অবিরত

দীপ্ত বজ্রশূল, সেই মত কাল যবে

জাগে, তা’রে সভয়ে অকাল কহে সবে।

লুটাও লুটাও শির, প্রণম, রমণী,

সেই মহাকালে; তা’র রথচক্রধ্বনি

দূর রুদ্রলােক হ’তে বজ্র-ঘর্ঘরিত

ওই শুনা যায়। তাের আর্ত্ত জর্জ্জরিত

হৃদয় পাতিয়া রাখ তা’র পদতলে।

ছিন্ন সিক্ত হৃৎপিণ্ডের রক্ত শতদলে

অঞ্জলি রচিয়া থাক্‌ জাগিয়া নীরবে

চাহিয়া নিমেষহীন।—তা’র পরে যবে

গগনে উড়িবে ধূলি, কঁপিবে ধরণী,

সহসা উঠিবে শূন্যে ক্রন্দনের ধ্বনি-

হায় হায় হা রমণী, হায় রে অনাথা,

হায় হায় বীরবধূ, হায় বীরমাতা,

হায় হায় হাহাকার—তখন সুধীরে

ধূলায় পড়িস লুটি’ অবনত শিরে

মুদিয়া নয়ন। -তা’র পরে নমাে নমঃ

সুনিশ্চিত পরিণাম, নির্ব্বাক্‌ নির্ম্মম

দারুণ করুণ শাস্তি; নমাে নমাে নমঃ

কল্যাণ কঠোর কান্ত, ক্ষমা স্নিগ্ধতম।

নমাে নমাে বিদ্বেষের ভীষণা নির্ব্বৃতি,

শ্মশানের ভস্মমাখা পরমা নিষ্কৃতি।

(দুর্য্যোধন-মহিষী ভানুমতীর প্রবেশ)

ভানুমতী

( দাসীগণের প্রতি)

ইন্দুমুখি! পরভৃতে! লহ তুলি শিরে

মাল্যবস্ত্র অলঙ্কার।

গান্ধারী

বৎসে, ধীরে! ধীরে

পৌরব ভবনে কোন্ মহােৎসব আজি?

কোথা যাও নব বস্ত্রঅলঙ্কারে সাজি

বধূ মাের?

ভানুমতী

শত্রুপরাভব-শুভক্ষণ

সমাগত।

গান্ধারী

শত্রু যার আত্মীয় স্বজন

আত্মা তা’র নিত্য শত্রু, ধর্ম্ম শত্রু তা’র,

অজেয় তাহার শত্রু। নব অলঙ্কার

কোথা হ’তে, হে কল্যাণি?

ভানুমতী

জিনি বসুমতী

ভুজবলে, পাঞ্চালীরে তা’র পঞ্চপতি

দিয়েছিল যত রত্ন মণি অলঙ্কার,

যজ্ঞদিনে যাহা পরি ভাগ্য-অহঙ্কার

ঠিকরিত’ মাণিক্যের শত সূচীমুখে

দ্রৌপদীর অঙ্গ হ’তে,—বিদ্ধ হ’ত বুকে

কুরুকুলকামিনীর—সে রত্নভূষণে

আমারে সাজায়ে তা’রে যেতে হ’ল বনে।

গান্ধারী

হা রে মূঢ়ে, শিক্ষা তবু হ’ল না তােমার,

সেই রত্ন নিয়ে তবু এত অহঙ্কার।

একি ভয়ঙ্করী কান্তি, প্রলয়ের সাজ।

যুগান্তের উল্কাসম দহিছে না আজ

এ মণি-মঞ্জীর তােরে? রত্ন-ললাটিকা

এ যে তাের সৌভাগ্যের বজ্রানলশিখা।

তােরে হেরি অঙ্গে মাের ত্রাসের স্পন্দন

সঞ্চারিছে,—চিত্তে মাের উঠিছে ক্রন্দন,—

আনিছে শঙ্কিত কর্ণে, তাের অলঙ্কার

উন্মাদিনী শঙ্করীর তাণ্ডব-ঝঙ্কার।

ভানুমতী

মাতঃ মােরা ক্ষত্রনারী! দুর্ভাগ্যের ভয়

নাহি করি। কভু জয়, কভু পরাজয়,—

মধ্যাহ্ন গগনে কভু, কভু অস্তধামে

ক্ষত্রিয়মহিমা সূর্য্য উঠে আর নামে।

ক্ষত্রবীরাঙ্গনা মাতঃ সেই কথা স্মরি

শঙ্কার বক্ষেতে থাকি সঙ্কটে না ডরি

ক্ষণকাল। দুর্দ্দিন-দুর্য্যোগ যদি আসে,

বিমুখ ভাগ্যেরে তবে হানি’ উপহাসে

কেমনে মরিতে হয় জানি তাহা দেবি,

কেমনে বাঁচিতে হয়, শ্রীচরণ সেবি’

সে শিক্ষাও লভিয়াছি।

গান্ধারী

বৎসে, অমঙ্গল

একেলা তােমার নহে। ল’য়ে দলবল

সে যবে মিটায় ক্ষুধা উঠে হাহাকার

কত বীর-রক্তস্রোতে কত বিধবার

অশ্রুধারা পড়ে আসি-রত্নঅলঙ্কার

বধূহস্ত হ’তে খসি পড়ে শত শত

চুতলতা-কুঞ্জবনে মঞ্জরীর মত

ঝাঞ্ঝাবাতে। বৎসে, ভাঙিয়াে না বদ্ধ সেতু!

ক্রীড়াচ্ছলে তুলিয়াে না বিপ্লবের কেতু

গৃহমাঝে। আনন্দের দিন নহে আজি।

স্বজন-দুর্ভাগ্য ল’য়ে সর্ব্ব অঙ্গে সাজি

গর্ব্ব করিয়াে না মাতঃ! হ’য়ে সুসংযত

আজ হ’তে শুদ্ধচিত্তে উপবাসব্রত

কর আচরণ,—বেণী করি উন্মােচন

শান্ত মনে কর বৎসে দেবতা-অৰ্চ্চন।

এ পাপ-সৌভাগ্য দিনে গর্ব্ব-অহঙ্কারে

প্রতিক্ষণে লজ্জা দিয়ােনাক বিধাতারে।

খুলে ফেল অলঙ্কার, নব রক্তাম্বর,

থামাও উৎসববাদ্য, রাজআড়ম্বর,

অগ্নিগৃহে যাও, পুত্রি, ডাক পুরােহিতে,

কালেরে প্রতীক্ষা কর শুদ্ধসত্ত্ব চিতে।

(ভানুমতীর প্রস্থান)

(দ্রৌপদীসহ পঞ্চপাণ্ডবের প্রবেশ)

যুধিষ্ঠির

আশীর্ব্বাদ মাগিবারে এসেছি জননী

বিদায়ের কালে।

গান্ধারী

সৌভাগ্যের দিনমণি।

দুঃখরাত্রি-অবসানে দ্বিগুণ উজ্জ্বল

উদিবে হে বৎসগণ! বায়ু হ’তে বল,

সূর্য্য হ’তে তেজ, পৃথ্বী হ’তে ধৈর্য্যক্ষমা

কর লাভ, দুঃখব্রত পুত্র মাের! রমা

দৈন্যমাঝে গুপ্ত থাকি দীন ছদ্মরূপে

ফিরুন্ পশ্চাতে তব, সদা চুপে চুপে।

দুঃখ হ’তে তােমা তরে করুন্ সঞ্চয়

অক্ষয় সম্পদ। নিত্য হউক্‌ নির্ভয়

নির্ব্বাসনবাস।—বিনা পাপে দুঃখভােগ

অন্তরে জ্বলন্ত তেজ করুক সংযােগ-

বহ্নিশিখাদগ্ধ দীপ্ত সুবর্ণের প্রায়।

সেই মহাদুঃখ হবে মহৎ সহায়

তােমাদের। -সেই দুঃখে রহিবেন ঋণী

ধর্ম্মরাজ বিধি,—যবে শুধিবেন তিনি

নিজহস্তে আত্মঋণ, তখন জগতে

দেবনর কে দাঁড়াবে তােমাদের পথে।

মাের পুত্র করিয়াছে যত অপরাধ

খণ্ডন করুক সব মাের আশীর্ব্বাদ

পুত্রাধিক পুত্রগণ! অন্যায় পীড়ন

গভীর কল্যাণসিন্ধু করুক্‌ মন্থন।

(দ্রৌপদীকে আলিঙ্গন পূর্ব্বক)

ভূলুণ্ঠিতা স্বর্ণলতা, হে বৎসে আমার,

হে আমার রাহুগ্রস্ত শশী! একবার

তােল শির, বাক্য মাের কর অবধান।

যে তােমারে অবমানে তারি অপমান

জগতে রহিবে নিত্য, কলঙ্ক অক্ষয়।

তব অপমান রাশি বিশ্বজগন্ময়

ভাগ করে’ লইয়াছে সর্ব্ব কুলাঙ্গনা

কাপুরুষতার হস্তে সতীর লাঞ্ছনা।

যাও বৎসে, পতি সাথে অমলিন মুখ,

অরণ্যেরে কর স্বর্গ, দুঃখে কর সুখ।

বধূ মাের, সুদুঃসহ পতিদুঃখব্যথা

বক্ষে ধরি, সতীত্বের লভ সার্থকতা।

রাজগৃহে আয়ােজন দিবস যামিন

সহস্র সুখের; বনে তুমি একাকিনী

সর্ব্বসুখ, সর্ব্বসঙ্গ, সর্ব্বৈশ্বর্য্যময়,

সকল সান্ত্বনা একা সকল আশ্রয়,

ক্লান্তির আরাম, শান্তি, ব্যাধির শুশ্রূষা,

দুর্দ্দিনের শুভলক্ষী, তামসীর ভূষা

উষা মূর্ত্তিমতী। তুমি হবে একাকিনী

সর্ব্বপ্রীতি, সর্ব্বসেবা, জননী, গেহিনী,—

সতীত্বের শ্বেতপদ্ম সম্পূর্ণ সৌরভে

শতদলে প্রস্ফুটিয়া জাগিবে গৌরবে।

চিত্রাঙ্গদা

চিত্রাঙ্গদা

অনঙ্গ-আশ্রম

চিত্রাঙ্গদা, মদন ও বসন্ত

চিত্রাঙ্গদা

তুমি পঞ্চশর?

মদন

আমি সেই মনসিজ,

নিখিলের নরনারী হিয়া টেনে আনি

বেদনা বন্ধনে।

চিত্রাঙ্গদা

কি বেদনা কি বন্ধন

জানে তাহা দাসী। প্রণমি তোমার পদে

প্রভু, তুমি কোন্‌ দেব?

বসন্ত

আমি ঋতুরাজ।

জর মৃত্যু দুই দৈত্য নিমেষে নিমেষে

বাহির করিতে চাহে বিশ্বের কঙ্কাল;

আমি পিছে পিছে ফিরে’ পদে পদে তা’রে

করি আক্রমণ; রাত্রিদিন সে সংগ্রাম।

আমি অখিলের সেই অনন্ত যৌবন।

চিত্রাঙ্গদা

প্রণাম তোমারে ভগবন্। চরিতার্থ

দাসী দেব-দরশনে।

মদন

কল্যাণি, কি লাগি’

এ কঠোর ব্রত তব? তপস্যার তাপে

করিছ মলিন খিন্ন যৌবন-কুসুম,

অনঙ্গ পূজার নহে এমন বিধান।

কে তুমি, কি চাও ভদ্রে!

চিত্রাঙ্গদা

দয়া কর যদি,

শোন মোর ইতিহাস। জানাব প্রার্থনা

তা’র পরে।

মদন

শুনিবারে রহিমু উৎসুক।

চিত্রাঙ্গদা

আমি চিত্রাঙ্গদা। মণিপুর-রাজ-সুতা।

মোর পিতৃবংশে কভু কন্যা জন্মিবে না—

দিয়াছিলা হেন বর দেব উমাপতি

তপে তুষ্ট হ’য়ে। আমি সেই মহাবর

ব্যর্থ করিয়াছি। অমোঘ দেবতা-বাক্য

মাতৃগর্ভে পশি, দুর্বল প্রারম্ভ মোর

পারিল না পুরুষ করিতে শৈবতেজে,

এমনি কঠিন নারী আমি।

মদন

শুনিয়াছি

বটে। তাই তব পিতা পুত্রের সমান

পালিয়াছে তোমা। শিখায়েছে ধনুর্ব্বিদ্যা

রাজদণ্ডনীতি।

চিত্রাঙ্গদা

তাই পুরুষের

বেশে, যুবরাজরূপে, করি রাজকাজ,

ফিরি স্বেচ্ছামতে; নাহি জানি লজ্জা ভয়,

অন্তঃপুরবাস; নাহি জানি হাব ভাব,

বিলাস-চাতুরী; শিখিয়াছি ধনুর্ব্বিদ্যা,

শুধু শিখি নাই, দেব, তব পুষ্পধনু

কেমনে বাকাতে হয় নয়নের কোণে।

বসন্ত

সুনয়নে, সে বিদ্যা শিখে না কোনো নারী;

নয়ন আপনি করে আপনার কাজ,

বুকে যার বাজে সেই বোঝে।

চিত্রাঙ্গদা

একদিন

গিয়েছিনু মৃগ-অন্বেষণে একাকিনী

ঘন বনে, পূর্ণ নদীতীরে। তরুমূলে

বাঁধি’ অশ্ব, দুর্গম কুটিল বনপথে

পশিলাম মৃগপদচিহ্ন অনুসরি’।

ঝিল্লিমন্দ্রমুখরিত নিত্যঅন্ধকার

লতাগুল্মে-গহন গম্ভীর মহারণ্যে,

কিছুদূর অগ্রসরি’ দেখিনু সহসা

রুধিয়া সঙ্কীর্ণ পথ রয়েছে শয়ান

ভূমিতলে, চীরধারী মলিন পুরুষ।

উঠিতে কহিনু তা’রে অবজ্ঞার স্বরে

সরে যেতে,—নড়িল না, চাহিল না ফিরে’

উদ্ধত অধীর রোষে ধনু-অগ্রভাগে

করিমু তাড়না;—সরল সুদীর্ঘ দেহ

মুহূর্ত্তেই তীরবেগে উঠিল দাঁড়ায়ে

সম্মুখে আমার,—ভস্মসুপ্ত অগ্নি যথা

ঘৃতাহুতি পেয়ে শিখারূপে উঠে উর্দ্ধে

চক্ষের নিমেষে। শুধু ক্ষণেকের তরে

চাহিল আমার মুখপানে,—রােষদৃষ্টি

পলকে মিলায়ে গেল; গুপ্ত কৌতুকের

মৃদুহাস্যরেখা নাচিল অধরপ্রান্তে,

বুঝি সে বালক-মূর্তি হেরিয়া আমার।

শিখে’ পুরুষের বিদ্যা, পরে’ পুরুষের

বেশ, পুরুষের সাথে থেকে, এতদিন

ভুলে ছিনু যাহা, সেই মুখে চেয়ে, সেই

আপনাতে-আপনি-অটলমূর্তি হেরি,

সেই মুহূর্তেই জানিলাম মনে, নারী

আমি। সেই মুহূর্তেই প্রথম দেখিনু

সম্মুখে পুরুষ মাের।

মদন

সে শিক্ষা আমারি

সুলক্ষণে! আমিই চেতন করে’ দিই

একদিন জীবনের শুভ পুণ্যক্ষণে

নারীরে হইতে নারী, পুরুষে পুরুষ।

কি ঘটিল পরে?

চিত্রাঙ্গদা

সভয় বিস্ময়কণ্ঠে

শুধানু “কে তুমি?” শুনিনু উত্তর “আমি

পার্থ, কুরুবংশধর।”

রহিনু দাঁড়ায়ে

চিত্রপ্রায়, ভুলে’ গেনু প্রণাম করিতে।

এই পার্থ? আজন্মের বিস্ময় আমার?

শুনেছিনু বটে, সত্য পালনের তরে

দ্বাদশ বৎসর বনে বনে ব্রহ্মচর্য্য

পালিছে অৰ্জ্জুন। এই সেই পার্থবীর!

বাল্য-দুরাশায় কতদিন করিয়াছি

মনে, পার্থকীর্ত্তি করিব নিস্প্রভ আমি

নিজ ভুজবলে; সাধিব অব্যর্থ লক্ষ্য;

পুরুষের ছদ্মবেশে মাগিব সংগ্রাম

তাঁর সাথে, বীরত্বের দিব পরিচয়।

হারে মুগ্ধে, কোথায় চলিয়া গেল সেই

স্পর্দ্ধা তাের! যে ভূমিতে আছেন দাঁড়ায়ে

সে ভূমির তৃণদল হইতাম যদি,

শৌর্য্যবীর্য্য যাহা কিছু ধূলায় মিলায়ে

দিয়ে, লভিতাম দুর্লভ মরণ, সেই

চরণের তলে!-

কি ভাবিতেছিনু, মনে

নাই। দেখিনু চাহিয়া, ধীরে চলি’ গেলা

বীর বন-অন্তরালে। উঠিনু চমকি;

সেইক্ষণে জন্মিল চেতনা; আপনারে

দিলাম ধিক্কার শতবার। ছি ছি মূঢ়ে,

না করিলি সম্ভাষণ, না শুধালি কথা,

না চাহিলি ক্ষমা ভিক্ষা,—বর্ব্বরের মত

রহিলি দাঁড়ায়ে—হেলা করি’ চলি’ গেলা

বীর। বাঁচিতাম, সে মুহূর্তে মরিতাম

যদি।—

পরদিন প্রাতে দূরে ফেলে দিনু

পুরুষের বেশ। পরিলাম রক্তাম্বর,

কঙ্কণ কিঙ্কিণী কাঞ্চি। অনভ্যস্ত সাজ

লজ্জায় জড়ায়ে অঙ্গ রহিল একান্ত

সসঙ্কোচে।

গােপনে গেলাম সেই বনে।

অরণ্যের শিবালয়ে দেখিলাম তাঁরে।—

মদন

বলে’ যাও বালা। মাের কাছে করিয়াে না

লাজ। আমি মনসিজ; মানসের

সকল রহস্য জানি।

চিত্রাঙ্গদা

মনে নাই ভালাে,

তা’র পরে কি কহিনু আমি, কি উত্তর

শুনিলাম। আর শুধায়াে না, ভগবন্!

মাথায় পড়িল ভেঙে লজ্জা বজ্ররূপে

তবু মােরে পারিল না শতধা করিতে-

নারী হ’য়ে এমনি পুরুষপ্রাণ মাের!

নাহি জানি কেমনে এলেম ঘরে ফিরে’

দুঃস্বপ্নবিহ্বলসম। শেষ কথা তাঁর

কর্ণে মাের বাজিতে লাগিল তপ্ত শূল-

“ব্রহ্মচারীব্রতধারী আমি। পতিযােগ্য

নহি বরাঙ্গনে।”

পুরুষের ব্রহ্মচর্য্য!

ধিক্ মােরে, তাও আমি নারিনু টলাতে।

তুমি জান, মীনকেতু, কত ঋষি মুনি

করিয়াছে বিসৰ্জ্জন নারীপদতলে

চিরার্জ্জিত তপস্যার ফল। ক্ষত্রিয়ের

ব্রহ্মচর্য্য!–গৃহে গিয়ে ভাঙিয়ে ফেলিনু

ধনুঃশর যাহা কিছু ছিল; -কিণাঙ্কিত

এ কঠিন করতল—ছিল যা’ গর্ব্বের

ধন এতকাল—লাঞ্ছনা করিনু তা’রে

নিষ্ফল আক্রোশভরে। এতদিন পরে

বুঝিলাম, নারী হ’য়ে পুরুষের মন

যদি জিনিতে পারি বৃথা বিদ্যা যত।

অবলার কোমল মৃণাল বাহুদুটি

এ বাহুর চেয়ে ধরে শতগুণ বল।

ধন্য সেই মুগ্ধ মূর্খ ক্ষীণ-তনুলতা

পরাবলম্বিতা, লজ্জাভয়ে লীনাঙ্গিনী

সামান্য ললনা, যার ত্রস্ত নেত্রপাতে

মানে পরাভব বীর্য্যবল, তপস্যার

তেজ!—হে অনঙ্গদেব, সব দম্ভ মাের

একদণ্ডে লয়েছ ছিনিয়া—সব বিদ্যা

সব বল করেছ তােমার পদানত।

এখন তােমার বিদ্যা শিখাও আমায়,

দাও মােরে অবলার বল, নিরস্ত্রের

অস্ত্র যত।

মদন

আমি হ’ব সহায় তােমার।

অয়ি শুভে, বিশ্বজয়ী অর্জ্জুনে করিয়া

জয়, বন্দী করি’ আনিব সম্মুখে তব।

রাজ্ঞী হ’য়ে দিয়ে তা’রে দণ্ড পুরস্কার

যথা ইচ্ছা! বিদ্রোহীরে করিয়াে শাসন।

চিত্রাঙ্গদা

সময় থাকিত যদি একাকিনী আমি

তিলে তিলে হৃদয় তাঁহার করিতাম

অধিকার, নাহি চাহিতাম দেবতার

সহায়তা। সঙ্গীরূপে থাকিতাম সাথে,

রণক্ষেত্রে হতেম সারথি, মৃগয়াতে

রহিতাম অনুচর, শিবিরের দ্বারে

জাগিতাম রাত্রির প্রহরী, ভৃত্যরূপে

করিতাম সেবা, ক্ষত্রিয়ের আর্ত্তত্রাণ-

মহাব্রতে হইতাম সহায় তাঁহার।

একদিন কৌতূহলে দেখিতেন চাহি,

ভাবিতেন মনে মনে “এ কোন্ বালক,

পূর্ব্বজনমের কোন্ চিরদাস, সঙ্গ

লইয়াছে এ জনমে সুকৃতির মত।”

ক্রমে খুলিতাম তাঁর হৃদয়ের দ্বার,

চিরস্থান লভিতাম সেথা। জানি আমি

এ প্রেম আমার শুধু ক্রন্দনের নহে;

যে নারী নির্ব্বাক্ ধৈর্য্যে চিরমর্ম্মব্যথা

নিশীথনয়নজলে করয়ে পালন,

দিবালােকে ঢেকে রাখে ম্লান হাসিতলে,

আজন্মবিধবা, আমি সে রমণী নহি;

আমার কামনা কভু না নিস্ফল হবে!

আপনারে একবার দেখাইতে পারি

যদি, নিশ্চয় সে দিবে ধরা। হায় বিধি,

সেদিন কি দেখেছিল! সরমে কুঞ্চিত

এক শঙ্কিত কম্পিত নারী, আত্মহারা

প্রলাপবাদিনী। কিন্তু আমি যথার্থ কি

তাই? যেমন সহস্র নারী পথে গৃহে

চারিদিকে, শুধু ক্রন্দনের অধিকারী,

তা’র চেয়ে বেশি নই আমি? কিন্তু হায়

আপনার পরিচয় দেওয়া, বহু ধৈর্য্যে

বহুদিনে ঘটে, চিরজীবনের কাজ,

জন্মজন্মান্তের ব্রত। তাই আসিয়াছি

দ্বারে তােমাদের, করেছি কঠোর তপ।

হে ভুবনজয়ী দেব, হে মহাসুন্দর

ঋতুরাজ, শুধু এক দিবসের তরে

ঘুচাইয়া দাও, জন্মদাতা বিধাতার

বিনাদোষে অভিশাপ, নারীর কুরূপ।

কর মােরে অপূর্ব্ব সুন্দরী। দাও মােরে

সেই এক দিন—তা’র পরে চির দিন

রহিল আমার হাতে।—যখন প্রথম

তা’রে দেখিলাম, যেন মুহূর্তের মাঝে

অনন্ত বসন্ত পশিল হৃদয়ে। বড়

ইচ্ছা হয়েছিল, সে যৌবন-সমীরণে

সমস্ত শরীর যদি দেখিতে দেখিতে

অপূর্ব্ব পুলকভরে উঠে প্রস্ফুটিয়া

লক্ষীর চরণশায়ী পদ্মের মতন।

হে বসন্ত, হে বসন্তসখে! সে বাসনা

পূরাও আমার শুধু দিনেকের তরে!

মদন

তথাস্তু!

বসন্ত

তথাস্তু। শুধু একদিন নহে,

এক বর্ষ ধরি’ বসন্তের পুষ্পশােভা

ঘেরিয়া তােমার তনু রহিবে বিকশি'।

মণিপুর—অরণ্যে শিবালয়

অর্জ্জুন

অর্জ্জুন

কাহারে হেরিনু? সে কি সত্য, কিম্বা মায়া?

নিবিড় নির্জ্জন বনে নির্ম্মল সরসী;—

এমনি নিভৃত নিরালয়, মনে হয়

নিস্তব্ধ মধ্যাহ্নে সেথা বনলক্ষীগণ

স্নান করে’ যায়; গভীর পূর্ণিমারাত্রে,

সেই সুপ্ত সরসীর স্নিগ্ধ শস্পতটে

শয়ন করেন সুখে নিঃশঙ্ক বিশ্রামে

ঙ্খলিত অঞ্চলে।

সেথা বনঅন্তরালে

অপরাহ্ন বেলা, ভাবিতেছিলাম কত

আশৈশব জীবনের কথা; সংসারের

মূঢ় খেলা দুঃখ সুখ উলটি পালটি;

জীবনের অসন্তোষ; অসম্পূর্ণ আশা

অনন্ত দারিদ্র এই মর্ত্ত্য মানবের।

হেন কালে ঘনতরু অন্ধকার হ’তে

ধীরে ধীরে বাহিরিয়া, কে আসি দাঁড়াল,

সরােবর-সােপানের শ্বেত শিলাপটে।

কি অপূর্ব্ব রূপ! কোমল চরণতলে

ধরাতল কেমনে নিশ্চল হ’য়ে ছিল?

ঊষার কনক মেঘ, দেখিতে দেখিতে

যেমন মিলায়ে যায়, পূর্ব্ব পর্ব্বতের

শুভ্র শিরে অকলঙ্ক নগ্ন শােভা করি’

বিকাশিত, তেমনি বসনখানি তা’র

অঙ্গের লাবণ্যে মিলাতে চাহিতেছিল

মহাসুখে। নামি’ ধীরে সরােবরতীরে

কৌতূহলে দেখিল সে নিজ মুখচ্ছায়া;

উঠিল চমকি’। ক্ষণপরে মৃদু হাসি’

হেলাইয়া বাম বাহুখানি, হেলাভরে

এলাইয়া দিল কেশপাশ; মুক্তকেশ

পড়িল বিহ্বল হয়ে চরণের কাছে।

অঞ্চল খসায়ে দিয়ে হেরিল আপন

অনিন্দিত বাহুখানি—পরশের রসে

কোমল কাতর, প্রেমের করুণামাখা।

নিরখিলা নত করি’ শির, পরিস্ফুট

দেহতটে যৌবনের উন্মুখ বিকাশ।

দেখিলা চাহিয়া নব গৌরতনুতলে

আরক্তিম আলজ্জ আভাস; সরােবরে

পা দুখানি ডুবাইয়া দেখিলা আপন

চরণের আভা।—বিস্ময়ের নাই সীমা।

সেই যেন প্রথম দেখিল আপনারে।

শ্বেত শতদল যেন কোরক বয়স

যাপিল নয়ন মুদি’,—যেদিন প্রভাতে

প্রথম লভিল পূর্ণ শােভা, সেইদিন

হেলাইয়া গ্রীবা, নীল সরােবরজলে

প্রথম হেরিল আপনারে, সারাদিন

রহিল চাহিয়া সবিস্ময়ে। ক্ষণপরে,

কি জানি কি দুখে, হাসি মিলাইল মুখে,

ম্লান হ’ল দুটি আঁখি; বাঁধিয়া তুলিল

কেশপাশ; অঞ্চলে ঢাকিল দেহখানি;

নিশ্বাস ফেলিয়া, ধীরে ধীরে চলে’ গেল;

সােনার সায়াহ্ন যথা ম্লান মুখ করি’

আঁধার রজনীপানে ধায় মৃদুপদে।

ভাবিলাম মনে, ধরণী দেখায়ে দিল

ঐশ্বর্য্য আপন। কামনার সম্পূর্ণতা

ক্ষণতরে দেখা দিয়ে গেল।—ভাবিলাম

কত যুদ্ধ, কত হিংসা, কত আড়ম্বর,

পুরুষের পৌরুষগৌরব, বীরত্বের

নিত্য কীর্ত্তিতৃষা, শান্ত হ’য়ে লুটাইয়া

১৭

পড়ে ভূমে, ওই পূর্ণ সৌন্দর্য্যের কাছে;

পশুরাজ সিংহ যথা সিংহবাহিনীর

ভুবনবাঞ্ছিত অরুণ-চরণতলে।

আর একবার যদি -কে দুয়ার ঠেলে!

( দ্বার খুলিয়া )

এ কি! সেই মূর্তি! শান্ত হও হে হৃদয়

কোনাে ভয় নাই মােরে বরাননে! আমি

ক্ষত্রকুলজাত, ভয়ভীত দুর্ব্বলের

ভয়হারী।

চিত্রাঙ্গদা

আর্য্য, তুমি অতিথি আমার।

এ মন্দির আমার আশ্রম। নাহি জানি

কেমনে করিব অভ্যর্থনা, কি সৎকারে

তােমারে তুষিব আমি।

অর্জ্জুন

অতিথিসৎকার

তব দরশনে, হে সুন্দরি! শিষ্টবাক্য

সমূহ সৌভাগ্য মাের। যদি নাহি লহ

অপরাধ, প্রশ্ন এক শুধাইতে চাহি,

চিত্ত মাের কুতূহলী।

চিত্রাঙ্গদা

শুধাও নির্ভয়ে।

অর্জ্জুন

শুচিস্মিতে, কোন্ সুকঠোর ব্রত লাগি’

হেন রূপরাশি জনহীন দেবালয়ে

হেলায় দিতেছ বিসর্জ্জন, হতভাগ্য

মর্ত্ত্যজনে করিয়া বঞ্চিত।

চিত্রাঙ্গদা

গুপ্ত এক

কামনা সাধনাতরে, এক মনে করি

শিবপূজা।

অর্জ্জুন

হায়, কারে করিছে কামনা

জগতের কামনার ধন।—সুদর্শনে,

উদয়শিখর হ’তে অস্তাচলভূমি

ভ্রমণ করেছি আমি; সপ্তদ্বীপ মাঝে

যেখানে যা কিছু আছে দুর্লভ সুন্দর,

অচিন্ত্য মহান, সকলি দেখেছি চোখে;

কি চাও, কাহারে চাও, যদি বল মোরে

মাের কাছে পাইবে বারতা।

চিত্রাঙ্গদা

ত্রিভুবনে

পরিচিত তিনি, আমি যারে চাহি।

অর্জ্জুন

নর কে আছে ধরায়! কার যশােরাশি

অমরকাঙিক্ষত তব মনোেরাজ্যমাঝে

করিয়াছে অধিকার দুর্লভ আসন।

কহ নাম তা’র, শুনিয়া কৃতার্থ হই।

চিত্রাঙ্গদা

জন্ম তাঁর সর্ব্বশ্রেষ্ঠ নরপতিকূলে,

সর্ব্বশ্রেষ্ঠ বীর।

অর্জ্জুন

মিথ্যা খ্যাতি বেড়ে ওঠে

মুখে মুখে কথায় কথায়; ক্ষণস্থায়ী

বাষ্প যথা ঊষারে ছলনা করে’ ঢাকে

যতক্ষণ সূর্য নাহি ওঠে। হে সরলে,

মিথ্যারে কোরাে না উপাসনা, এ দুর্লভ

সৌন্দর্যসম্পদে। কহ শুনি সর্ব্বশ্রেষ্ঠ

কোন্ বীর, ধরণীর সর্ব্বশ্রেষ্ঠ কুলে।

চিত্রাঙ্গদা

পরকীর্ত্তি-অসহিষ্ণু কে তুমি সন্যাসি!

কে না জানে এ ভুবনে কুরুবংশ সর্বব-

রাজবংশচূড়া।

অর্জ্জুন

কুরুবংশ!

চিত্রাঙ্গদা

সেই বংশে

কে আছে অক্ষয়যশ বীরেন্দ্রকেশরী

নাম শুনিয়াছ?

অর্জ্জুন

বল, শুনি তব মুখে।

চিত্রাঙ্গদা

অর্জ্জুন, গাণ্ডীবধনু, ভুবনবিজয়ী।

সে অক্ষয় নাম, সমস্ত জগৎ হ’তে

করিয়া লুণ্ঠন, লুকায়ে রেখেছি যত্নে

কুমারী-হৃদয় পূর্ণ করি। ব্রহ্মচারি,

কেন এ অধৈর্য তব?

তবে মিথ্যা এ কি

মিথ্যা সে অৰ্জ্জুন নাম? কহ এই বেলা

মিথ্যা যদি হয় তবে হৃদয় ভাঙিয়া

ছেড়ে দিই তা’রে, বেড়াক সে উড়ে উড়ে

মুখে মুখে বাতাসে বাতাসে, তা’র স্থান

নহে নারীর অন্তরাসনে।

অর্জ্জুন

বরাঙ্গনে,

সে অৰ্জ্জুন, সে পাণ্ডব, সে গাণ্ডীবধনু,

সেই ভাগ্যবান চরণে শরণাগত।

নাম তা’র, খ্যাতি তা’র, বীর্য তা’র, মিথ্যা

হােক সত্য হােক, যে দেবদুর্লভ লোকে

করেছ তাহারে স্থান দান, সেথা হ’তে

আর তা’রে কোরাে না বিচ্যুত, ক্ষীণপুণ্য

হৃতস্বর্গ হতভাগ্যসম।

চিত্রাঙ্গদা

তুমি পার্থ?

আমি পার্থ, দেবি, তােমার হৃদয়দ্বারে

প্রেমার্ত্ত অতিথি।

চিত্রাঙ্গদা

শুনেছিনু ব্রহ্মচর্য্য

পালিছে অৰ্জ্জুন দ্বাদশবরষব্যাপী।

সেই বীর কামিনীরে করিছে কামনা

ব্রত ভঙ্গ করি’! হে সন্ন্যাসি, তুমি পার্থ?

অর্জ্জুন

তুমি ভাঙিয়াছ ব্রত মাের। চন্দ্র উঠি’

যেমন নিমেষে ভেঙে দেয় নিশীথের

যােগনিদ্রা-অন্ধকার।

চিত্রাঙ্গদা

ধিক্‌, পার্থ, ধিক্!

কে আমি, কি আছে মোর, কি দেখেছ তুমি,

কি জান আমারে। কার লাগি আপনারে

হতেছ বিস্মৃত। মুহূর্ত্তেকে সত্য ভঙ্গ

করি’, অৰ্জ্জুনেরে করিতেছ অনৰ্জ্জুন

কার তরে? মাের তরে নহে। এই দুটি

নীলােৎপল নয়নের তরে; এই দুটি

নবনীনিন্দিত বাহুপাশে সব্যসাচী

অর্জ্জুন দিয়াছে ধরা দুই হস্তে ছিন্ন

করে’ ফেলে’ সত্যের বন্ধন। কোথা গেল

প্রেমের মর্যাদা? কোথায় রহিল পড়ে’

নারীর সম্মান? হায়, আমারে করিল

অতিক্রম আমার এ তুচ্ছ দেহখানা,

মৃত্যুহীন অন্তরের এই ছদ্মবেশ

ক্ষণস্থায়ী। এতক্ষণে পারিনু জানিতে

মিথ্যা খ্যাতি, বীরত্ব তােমার।

অর্জ্জুন

খ্যাতি মিথ্যা,

বীর্য্য মিথ্যা আজ বুঝিয়াছি। আজ মােরে

সপ্তলােক স্বপ্ন মনে হয়।শুধু একা

পূর্ণ তুমি সর্ব্ব তুমি, বিশ্বের ঐশ্বর্য্য

তুমি, এক নারী সকল দৈন্যের তুমি

মহা অবসান, সকল কর্মের তুমি

বিশ্রামরূপিণী। কেন জানি অকস্মাৎ

তােমারে হেরিয়া—বুঝিতে পেরেছি আমি

কি আনন্দকিরণেতে প্রথম প্রত্যুষে

অন্ধকার মহার্ণবে সৃষ্টিশতদল

দিগ্বিদিকে উঠেছিল উন্মােষিত হ’য়ে

এক মুহূর্তের মাঝে। আর সকলের

পলে পলে তিলে তিলে তবে জানা যায়

বহুদিনে;—তােমাপানে যেমনি চেয়েছি

অমনি সমস্ত তব পেয়েছি দেখিতে

তবু পাই নাই শেষ। -কৈলাসশিখরে

একদা মৃগয়াশ্রান্ত তৃষিত তাপিত

গিয়েছিনু দ্বিপ্রহরে কুসুমবিচিত্র

মানসের তীরে। যেমনি দেখিনু চেয়ে

সেই সুর-সরসীর সলিলের পানে

অমনি পড়িল চোখে অনন্ত অতল।

স্বচ্ছ জল, যত নিম্নে চাই। মধ্যাহ্নের

রবিরশ্মিরেখাগুলি স্বর্ণনলিনীর

সুবর্ণ মৃণাল সাথে মিশি’ নেমে গেছে

অগাধ অসীমে কাঁপিতেছে; আঁকিবাঁকি

জলের হিল্লোলে, লক্ষকোটি অগ্নিময়ী

নাগিনীর মত। মনে হ’ল ভগবান

সূর্য্যদেব সহস্র অঙ্গুলি নির্দ্দেশিয়া

দিলেন দেখায়ে, জন্মশ্রান্ত কর্ম্মক্লান্ত

মর্ত্ত্যজনে, কোথা আছে সুন্দর মরণ

অনন্ত শীতল। সেই স্বচ্ছ অতলতা

দেখেছি তােমার মাঝে। চারিদিক হতে

দেবের অঙ্গুলি যেন দেখায়ে দিতেছে

মােরে, ওই তব অলােক আলােকমাঝে

কীর্ত্তিক্লিষ্ট জীবনের পূর্ণনির্ব্বাপন।

চিত্রাঙ্গদা

আমি নহি, আমি নহি, হায়, পার্থ, হায়

কোন্ দেবের ছলনা! যাও যাও ফিরে

যাও, ফিরে যাও বীর! মিথ্যারে কোরাে না

উপাসনা। শৌর্য্য বীর্য্য মহত্ত্ব তােমার

দিয়াে না মিথ্যার পদে। যাও, ফিরে যাও!

তরুতলে চিত্রাঙ্গদা

চিত্রাঙ্গদা

হায়, হায়, সে কি ফিরাইতে পারি! সেই

থরথর ব্যাকুলতা বীর হৃদয়ের,

তৃষ্ণার্ত্ত কম্পিত এক স্ফুলিঙ্গনিশ্বাসী

হােমাগ্নিশিখার মত; সেই, নয়নের

দৃষ্টি যেন অন্তরের বাহু হ’য়ে, কেড়ে

নিতে আসিছে আমায়; উত্তপ্ত হৃদয়

ছুটিয়া আসিতে চাহে সর্ব্বাঙ্গ টুটিয়া,

তাহার ক্রন্দনধ্বনি প্রতিঅঙ্গে শুনা

যায় যেন! এ তৃষ্ণা কি ফিরাইতে পারি?

(বসন্ত ও মদনের প্রবেশ)

হে অনঙ্গদেব, এ কি রূপ-হুতাশনে

ঘিরেছ আমারে, দগ্ধ হই, দগ্ধ করে’

মারি।

মদন

বল, তম্বি, কালিকার বিবরণ।

মুক্ত পুষ্পশর মাের কোথা কি সাধিল

কাজ শুনিতে বাসনা।

চিত্রাঙ্গদা

কাল সন্ধ্যাবেলা,

সরসীর তৃণপুঞ্জ তীরে, পেতেছিনু

পুষ্পশয্যা, বসন্তের ঝরা ফুল দিয়ে।

শ্রান্ত কলেবরে, শুয়েছিনু আপনার

মনে, বাম বাহুপরে রাখিয়া অলস

শির; ভাবিতেছিলাম দিবসের কথা,

শুনেছিনু যেই স্তুতি অর্জ্জুনের মুখে

স্মরিতেছিলাম তা’র প্রতি ক্ষুদ্র কথা

একাকিনী শুয়ে শুয়ে; পূর্ণ দিবসের

সঞ্চিত অমৃত হ’তে বিন্দু বিন্দু ল’য়ে

করিতেছিলাম পান; ভুলিতেছিলাম

পূর্ব ইতিহাস, গতজন্মকথাসম;

যেন আমি রাজকন্যা নহি; যেন মাের

নাই পূর্ব্বপর; যেন আমি ধরাতলে

একদিনে উঠেছি ফুটিয়া, অরণ্যের

পিতৃমাতৃহীন ফুল; একটি প্রভাত

শুধু পরমায়ু, তারি মাঝে শুনে নিতে

হবে—ভ্রমর গুঞ্জনগীতি, বনান্তের

আনন্দমর্ম্মর; তার পরে নীলাম্বর

হ’তে নামাইয়া আঁখি, নুমাইয়া গ্রীবা,

বায়ুস্পর্শভরে টুটিয়া লুটিয়া যাব

ক্রন্দনবিহীন, মাঝখানে ফুরাইবে

কুসুমকাহিনীটুকু আদি অন্তহারা।

বসন্ত

একটি প্রভাতে ফুটে অনন্ত জীবন,

হে সুন্দরি!

মদন

সঙ্গীতে যেমন, ক্ষণিকের

তানে, গুঞ্জরি কাঁদিয়া উঠে অন্তহীন

কথা। তা’র পরে বল।

চিত্রাঙ্গদা

ভাবিতে ভাবিতে

সর্ব্বাঙ্গে হানিতেছিল ঘুমের হিল্লোল

দক্ষিণের বায়ু। সপ্তপর্ণশাখা হ’তে

ফুল্ল মালতীর লতা টুপটাপ করি’

মাের গৌরতনুপরে পাঠাইতেছিল

শত নিঃশব্দ চুম্বন; ফুলগুলি কেহ

চুলে, কেহ পদমূলে, কেহ স্তনতটে

বিছাইল আপনার মরণশয়ন।

অচেতনে গেল কতক্ষণ। হেনকালে

জানি না কখন্ ঘুমঘােরে, অনুভব

হ’ল, যেন কার মুগ্ধ নয়নের দৃষ্টি

দশ অঙ্গুলির মত পরশ করিছে

রভস-লালসে মাের নিদ্রালস তনু।

চমকি’ উঠিমু জাগি'।

দেখিনু, সন্ন্যাসী

পদপ্রান্তে নির্ণিমেষ দাঁড়ায়ে রয়েছে

স্থির প্রতিমূর্ত্তি সম। পূর্ব্বাচল হ’তে

ধীরে ধীরে সরে’ এসে পশ্চিমে হেলিয়ে

দ্বাদশীর শশী সমস্ত হিমাংশুরাশি

দিয়াছে ঢালিয়া, ঙ্খলিতবসন মাের

অম্লাননূতন শুভ্র সৌন্দর্য্যের পরে।

পুষ্পগন্ধে পূর্ণ তরুতল; ঝিল্লিরবে

তন্দ্রামগ্ন-নিশীথিনী; স্বচ্ছ সরােবরে

অকম্পিত চন্দ্রকরচ্ছায়া; সুপ্ত বায়ু;

শিরে ল’য়ে জ্যোৎস্নলােকে মসৃণ চিক্কণ

রাশি রাশি অন্ধকার পল্লবের ভার

স্তম্ভিত অটবী। সেই মত চিত্রার্পিত

দাঁড়াইয়া দীর্ঘকায় বনস্পতিসম,

দণ্ডধারী ব্রহ্মচারী ছায়াসহচর।

প্রথম সে নিদ্রাভঙ্গে চারিদিক চেয়ে

মনে হ’ল, কবে কোন্ বিস্মৃত প্রদোষে

জীবন ত্যজিয়া, স্বপ্নজন্ম করিয়াছি

লাভ, কোন্ এক অপরূপ নিদ্রালােকে,

জনশূন্য ম্লানজ্যোৎস্না বৈতরণীতীরে।

দাঁড়ানু উঠিয়া। মিথ্যা সরম সঙ্কোচ

খসিয়া পড়িল শ্লথ বসনের মত

পদতলে। শুনিলাম, “প্রিয়ে, প্রিয়তমে!”

গম্ভীর আহ্বানে, জন্ম জন্ম শত জন্ম

মোর, উঠিল জাগিয়া এক দেহ মাঝে।

কহিলাম, “লহ, লহ, যাহা আছে, সব

লহ জীবনবল্লভ।” দিলাম বাড়ায়ে,

দুই বাহু।—চন্দ্র অস্ত গেল বনান্তরে,

অন্ধকারে ঝাঁপিল মেদিনী। স্বর্গ মর্ত্ত্য

দেশকাল দুঃখসুখ জীবন মরণ

অচেতন হ’য়ে গেল অসহ্য পুলকে।

প্রভাতের প্রথম কিরণে, বিহঙ্গের

প্রথম সঙ্গীতে, বাম করে দিয়া ভর

ধীরে ধীরে উঠিয়া বসিনু শয্যাতলে।

দেখিনু চাহিয়া, সুখসুপ্ত বীরবর।

শ্রান্ত হাস্য লেগে আছে ওষ্ঠপ্রান্তে তাঁর

প্রভাতের চন্দ্রকলাসম, রজনীর

আনন্দের শীর্ণ অবশেষ। নিপতিত

উন্নত ললাট-পটে অরুণের আভা;

মর্ত্ত্যলােকে যেন নব উদয়পর্ব্বতে

নবকীর্ত্তি-সূর্যোদয় পাইবে প্রকাশ।

নিশ্বাস ফেলিয়া, উঠিনু শয়ন ছাড়ি';

মালতীর লতাজাল দিলাম নামায়ে

সাবধানে, রবিকর করি’ অন্তরাল

সুপ্তমুখ হ’তে। দেখিলাম চতুর্দ্দিকে

সেই পূর্ব্বপরিচিত প্রাচীন পৃথিবী।

আপনারে আরবার মনে পড়ে’ গেল,

ছুটিয়া পলায়ে এনু, নব প্রভাতের

শেফালি-বিকীর্ণ-তৃণ বনস্থলী দিয়ে,

আপনার ছায়াত্রস্তা হরিণীর মত।

বিজন বিতানতলে বসি’, করপুটে

মুখ আবরিয়া, কাঁদিবারে চাহিলাম,

এল না ক্রন্দন।

মদন

হায়, মানবনন্দিনি,

স্বর্গের সুখের দিন স্বহস্তে ভাঙিয়া

ধরণীর একরাত্রি পূর্ণ করি’ তাহে

যত্নে ধরিলাম তব অধরসম্মুখে;

শচীর প্রসাদসুধা, রতির চুম্বিত,

নন্দনবনের গন্ধে মােদিত-মধুর,

তােমারে করানু পান, তবু এ ক্রন্দন!

চিত্রাঙ্গদা

কারে, দেব, করাইলে পান? কার তৃষা

মিটাইলে? সে চুম্বন, সে প্রেমসঙ্গম

এখনাে উঠিছে কাঁপি যে অঙ্গ ব্যাপিয়া

বীণার ঝঙ্কার সম, সে ত মাের নহে!

বহুকাল সাধনায় এক দণ্ড শুধু

পাওয়া যায় প্রথম মিলন, সে মিলন

কে লইল লুটি’, আমারে বঞ্চিত করি।

সে চিরদুর্লভ মিলনের সুখস্মৃতি

সঙ্গে করে’ ঝরে’ পড়ে যাবে, অতিস্ফুট

পুস্পদলসম, এ মায়া-লাবণ্য মাের;

অন্তরের দরিদ্র রমণী, রিক্তদেহে

বসে’ র’বে চিরদিনরাত। মীনকেতু,

কোন্ মহারাক্ষসীরে দিয়াছ বাঁধিয়া

অঙ্গসহচরী করি’ ছায়ার মতন-

কি অভিসম্পাত? চিরন্তন তৃষ্ণাতুর

লােলুপ ওষ্ঠের কাছে আসিল চুম্বন,

সে করিল পান। সেই প্রেমদৃষ্টিপাত

এমনি আগ্রহপূর্ণ, যে অঙ্গেতে পড়ে

সেথা যেন অঙ্কিত করিয়া রেখে যায়

বাসনার রাঙা চিহ্নরেখা, সেই দৃষ্টি

রবিরশ্মিসম, চিররাত্রিতাপসিনী

কুমারীহৃদয়পদ্মপানে ছুটে এল,

সে তাহারে লইল ভুলায়ে।

মদন

কল্য নিশি

ব্যর্থ গেছে তবে! শুধু, কূলের সম্মুখে

এসে আশার তরণী গেছে ফিরে’ ফিরে’

তরঙ্গ-আঘাতে?

চিত্রাঙ্গদা

কাল রাত্রে কিছু নাহি

মনে ছিল দেব! সুখস্বর্গ এত কাছে

দিয়েছিল ধরা, পেয়েছি কি না পেয়েছি

করিনি গণনা আত্মবিস্মরণসুখে।

আজ প্রাতে উঠে,' নৈরাশ্যধিক্কারবেগে

অন্তরে অন্তরে টুটিছে হৃদয়। মনে

পড়িতেছে একে একে রজনীর কথা,

বিদ্যুৎবেদনাসহ হতেছে চেতনা

অন্তরে বাহিরে মাের হয়েছে সতীন,

আর তাহা নারিব ভুলিতে। সপত্নীরে

স্বহস্তে সাজায়ে সযতনে প্রতিদিন

পাঠাইতে হবে, আমার আকাঙ্ক্ষা-তীর্থ

বাসরশয্যায়; অবিশ্রাম সঙ্গে রহি’

প্রতিক্ষণ দেখিতে হইবে চক্ষু মেলি’

৩৩

তাহার আদর। ওগো, দেহের সােহগে

অন্তর জ্বলিবে হিংসানলে, হেন শাপ

নরলােকে কে পেয়েছে আর? হে অতনু

বর তব ফিরে’ লও।

মদন

যদি ফিরে’ লই,—

ছলনার আবরণ খুলে’ ফেলে’ দিয়ে

কাল প্রাতে কোন্ লাজে দাঁড়াইবে আসি’

পার্থের সম্মুখে, কুসুমপল্লবহীন

হেমন্তের হিমশীর্ণ লতা? প্রমােদের

প্রথম আস্বাদটুকু দিয়ে, মুখ হ’তে

সুধাপাত্র কেড়ে নিয়ে চূর্ণ করে’ ফেল

যদি ভূমিতলে, কি আঘাতে উঠিবে সে

চমকিয়া, কি আক্রোশে হেরিবে তােমায়!

চিত্রাঙ্গদা

সেও ভালো দেব! এই ছদ্মরূপিণীর

চেয়ে শ্রেষ্ঠ আমি শতগুণে। আপনারে

করিব প্রকাশ; ভালো যদি নাই লাগে,

ঘৃণাভরে চলে’ যান যদি, বুক ফেটে

মরি যদি আমি, তবু আমি, আমি র’ব

সেও ভালো ইন্দ্রসখা!

বসন্ত

শােন মাের কথা।

ফুলের ফুরায় যবে ফুটিবার কাজ

তখন প্রকাশ পায় ফল। যথাকালে

আপনি ঝরিয়া পড়ে’ যাবে, তাপক্লিষ্ট

লঘু লাবণ্যের দল; আপন গৌরবে

তখন বাহির হবে; হেরিয়া তােমারে

নূতন সৌভাগ্য বলি’ মানিবে ফাল্গুনী।

যাও, ফিরে’ যাও, বৎসে, যৌবন-উৎসবে!

অৰ্জ্জুন ও চিত্রাঙ্গদা

চিত্রাঙ্গদা

কি দেখিছ বীর!

অৰ্জ্জুন

দেখিতেছি পুষ্পবৃন্ত

ধরি’, কোমল অঙ্গুলিগুলি রচিতেছে

মালা; নিপুণতা চারুতায় দুই বােনে

মিলি, খেলা করিতেছে যেন, সারাবেলা

চঞ্চল উল্লাসে, অঙ্গুলির আগে আগে।

দেখিতেছি, আর ভাবিতেছি।

চিত্রাঙ্গদা

কি ভাবিছ?

অৰ্জ্জুন

ভাবিতেছি অমনি সুন্দর করে’ ধরে’

সরসিয়া ওই রাঙা পরশের রসে

প্রবাস-দিবসগুলি গেঁথে গেঁথে প্রিয়ে

অমনি রচিবে মালা; মাথায় পরিয়া

অক্ষয় আনন্দহার গৃহে ফিরে’ যাব।

চিত্রাঙ্গদা

এ প্রেমের গৃহ আছে?

অর্জ্জুন

গৃহ নাই?

চিত্রাঙ্গদা

নাই

গৃহে নিয়ে যাবে? বােলাে না গৃহের কথা।

গৃহ চির বরষের; নিত্য যাহা থাকে তাই

গৃহ নিয়ে যেয়াে। অরণ্যের ফুল যবে

শুকাইবে, গৃহে কোথা ফেলে’ দিবে তা’রে,

অনাদরে পাষাণের মাঝে? তা’র চেয়ে

অরণ্যের অন্তঃপুরে, নিত্য নিত্য যেথা

মরিছে অঙ্কুর, পড়িছে পল্লবরাশি,

ঝরিছে কেশর, খসিছে কুসুমদল,

ক্ষণিক জীবনগুলি ফুটিছে টুটিছে

প্রতি পলে পলে,—দিনান্তে আমার খেলা

সাঙ্গ হ’লে ঝরিব সেথায়, কাননের

শত শত সমাপ্ত সুখের সাথে। কোনাে

খেদ রহিবে না কারাে মনে।

অর্জ্জুন

এই শুধু?

চিত্রাঙ্গদা

শুধু এই। আর কিছু নয়। বীরবর

তাহে দুঃখ কেন! আলস্যের দিনে যাহা

ভালাে লাগে, আলস্যের দিনে তাহা শেষ

করে’ ফেল। সুখেরে রাখিলে ধরে’-বেঁধে’

তা’র বেশি একদণ্ড কাল, দুঃখ হ’য়ে

ওঠে। যাহা আছে তাই লও, যতক্ষণ

আছে ততক্ষণ রাখ। কামনার কালে

যতটুকু চেয়েছিলে, তৃপ্তির সন্ধ্যায়

তা’র বেশি আশা করিয়াে না।

দিন গেল।

এই মালা পর গলে। শ্রান্ত মাের তনু

ওই তব বাহুপরে টেনে লও বীর।

সন্ধি হােক অধরের সুখ-সম্মিলনে

ক্ষান্ত করি’ মিথ্যা অসন্তোষ। বাহুবন্ধে

এস বন্দী করি দোঁহে দোঁহা, প্রণয়ের

সুধাময় চির-পরাজয়ে।

অর্জ্জুন

ওই শােন

প্রিয়তমে, বনান্তের দূর লােকালয়ে

আরতির শান্তিশঙ্খ উঠিল বাজিয়া।

মদন ও বসন্ত

মদন

আমি পঞ্চশর, সখা; এক শরে হাসি,

অশ্রু এক শরে; এক শরে আশা, অন্য

শরে ভয়; এক শরে বিরহ-মিলন-

আশা-ভয়-দুঃখ-সুখ এক নিমিষেই।

বসন্ত

শ্রান্ত আমি, ক্ষান্ত দাও সখা! হে অনঙ্গ,

সাঙ্গ কর রণরঙ্গ তব। রাত্রিদিন

সচেতন থেকে, তব হুতাশনে আর

কতকাল করিব ব্যজন। মাঝে মাঝে

নিদ্রা আসে চোখে, নত হয়ে পড়ে পাখা,

ভস্মে ম্লান হ’য়ে আসে তপ্তদীপ্তিরাশি।

চমকিয়া জেগে, আবার নূতনশ্বাসে

জাগাইয়া তুলি তা’র নব-উজ্জ্বলতা।

এবার বিদায় দাও সখা!

মদন

জানি তুমি

অনন্ত অস্থির, চিরশিশু। নিত্য তুমি

বন্ধনবিহীন হ’য়ে দ্যুলােকে ভূলােকে

করিতেছ খেলা। একান্ত যতনে যারে

তুলিছ সুন্দর করি’ বহুকাল ধরে’

নিমেষে যেতেছ তা’রে ফেলি’ ধূলিতলে

পিছে না ফিরিয়া। আর বেশি দিন নাই;

আনন্দচঞ্চল দিনগুলি, লঘুবেগে,

তব পক্ষ-সমীরণে, হুহু করি’ কোথা

যেতেছে উড়িয়া, চ্যুত পল্লবের মত।

হর্ষঅচেতন বর্ষ শেষ হ’য়ে এল।

অরণ্যে অৰ্জ্জুন

অৰ্জ্জুন

আমি যেন পাইয়াছি, প্রভাতে জাগিয়া

ঘুম হ’তে, স্বপ্নলব্ধ অমূল্য রতন।

রাখিবার স্থান তা’র নাহি এ ধরার

মৃত্তিকায়; ধরে’ রাখে এমন কিরীট

নাই, গেঁথে’ রাখে হেন সূত্র নাই, ফেলে’

যাই হেন নরাধম নহি; তা’রে ল’য়ে

চিররাত্রি চিরদিন ক্ষত্রিয়ের বাহু

বন্ধ হ’য়ে পড়ে’ আছে কর্ত্তব্যবিহীন।

( চিত্রাঙ্গদার প্রবেশ)

চিত্রাঙ্গদা

কি ভাবিছ?

অৰ্জ্জুন

ভাবিতেছি মৃগয়ার কথা।

ওই দেখ বৃষ্টিধারা আসিয়াছে নেমে

পর্ব্বতের পরে; অরণ্যেতে ঘনঘাের

ছায়া; নির্ঝরিণী উঠেছে দুরন্ত হ’য়ে,

কলগর্ব্ব-উপহাসে তটের তর্জ্জন

করিতেছে অবহেলা; মনে পড়িতেছে

এমনি বর্ষার দিনে, পঞ্চভ্রাতা মিলে

চিত্রক অরণ্যতলে যেতেম শিকারে।

সারাদিন রৌদ্রহীন স্নিগ্ধ অন্ধকারে

কাটিত উৎসাহে; গুরু গুরু মেঘমন্দ্রে

নৃত্য করি’ উঠিত হৃদয়; ঝরঝর

বৃষ্টিজলে, মুখর নির্ঝরকলোল্লাসে

সাবধান পদশব্দ শুনিতে পেত না

মৃগ; চিত্রব্যাঘ্র পঞ্চনখচিহ্নরেখা

রেখে যেত পথপঙ্কপরে, দিয়ে যেত

আপনার গৃহের সন্ধান। কেকারবে

ধ্বনিত’ অরণ্যভূমি। শিকার সমাধা

হ’লে পঞ্চসঙ্গী পণ করি’ সন্তরণে

হইতাম পার, বর্ষার সৌভাগ্যগর্ব্বে

স্ফীত তরঙ্গিণী। সেই মত বাহিরিব

মৃগয়ায়, করিয়াছি মনে।

চিত্রাঙ্গদা

হে শিকারি,

যে মৃগয়া আরম্ভ করেছ, আগে তাই

হােক্ শেষ। তবে কি জেনেছ স্থির

এই স্বর্ণ মায়ামৃগ তােমারে দিয়েছে

ধরা? নহে, তাহা নহে। এ বন্য-হরিণী

আপনি রাখিতে নারে আপনারে ধরি’!

চকিতে ছুটিয়া যায় কে জানে কখন

স্বপনের মত। ক্ষণিকের খেলা সহে,

চিরদিবসের পাশ বহিতে পারে না।

ওই চেয়ে দেখ, যেমন করিছে খেলা

বায়ুতে বৃষ্টিতে,—শ্যাম বর্ষা হানিতেছে

নিমেষে সহস্র শর বায়ুপৃষ্ঠপরে,

তবু সে দুরন্ত মৃগ মাতিয়া বেড়ায়

অক্ষত অজেয়;—তােমাতে আমাতে, নাথ,

সেই মত খেলা, আজি বরষার দিনে;—

চঞ্চলারে করিবে শিকার প্রাণপণ

করি’; যত শর, যত অস্ত্র আছে তূণে

একাগ্র আগ্রহভরে করিবে বর্ষণ।

কভু অন্ধকার, কভু বা চকিত আলো

চমকিয়া হাসিয়া মিলায়, কভু স্নিগ্ধ

বৃষ্টিবরিষণ, কভু দীপ্ত বজ্রজ্বালা।

মায়ামৃগী ছুটিয়া বেড়ায়, মেঘাচ্ছন্ন

জগতের মাঝে, বাধাহীন চিরদিন।

মদন ও চিত্রাঙ্গদা

চিত্রাঙ্গদা

হে মন্মথ, কি জানি কি দিয়েছ মাখায়ে

সর্ব্বদেহে মাের। তীব্র মদিরার মত

রক্তসাথে মিশে’ উন্মাদ করেছে মােরে।

আপনার গতিগর্ব্বে মত্ত মৃগী আমি,

ধাইতেছি মুক্তকেশে, উচ্ছ্বসিত বেশে

পৃথিবী লঙ্ঘিয়া। ধনুর্দ্ধর ঘনশ্যাম

ব্যাধেরে আমার, করিয়াছি পরিশ্রান্ত

আশাহতপ্রায়, ফিরাতেছি পথে পথে

বনে বনে তা’রে। নির্দয় বিজয়সুখে

হাসিতেছি কৌতুকের হাসি। এ খেলায়

ভঙ্গ দিতে হইতেছে ভয়, একদণ্ড

স্থির হলে পাছে, ক্রন্দনে হৃদয় ভরে

ফেটে পড়ে যায়।

মদন

থাক! ভাঙিয়াে না খেলা।

এ খেলা আমার। ছুটুক ফুটুক বাণ,

টুটুক্ হৃদয়। আমার মৃগয়া আজি

অরণ্যের মাঝখানে নবীন বর্ষায়।

দাও দাও শ্রান্ত করে’ দাও; কর তা’রে

পদানত; বাঁধ তারে দৃঢ়পাশে; দয়া

করিয়াে না, হাসিতে জর্জ্জর করে’ দাও,

অমৃতে-বিষেতে-মাখা খর বাক্যবাণ

হান বুকে। শিকারে দয়ার বিধি নাই।

অৰ্জ্জুন ও চিত্রাঙ্গদা

অৰ্জ্জুন

কোনাে গৃহ নাই তব প্রিয়ে, যে ভবনে

কাঁদিছে বিরহে তব প্রিয় পরিজন?

নিত্য স্নেহ-সেবা দিয়ে যে আনন্দপুরী

রেখেছিলে সুধাময় করে’, যেথাকার

প্রদীপ নিয়ে দিয়ে এসেছ চলিয়া

অরণ্যের মাঝে? আপন শৈশবস্মৃতি

যেথায় কাঁদিতে যায় হেন স্থান নাই?

চিত্রাঙ্গদা

প্রশ্ন কেন? তবে কি আনন্দ মিটে গেছে?

যা’ দেখিছ তাই আমি, আর কিছু নাই

পরিচয়। প্রভাতে এই যে দুলিতেছে

কিংশুকের একটি পল্লব প্রান্তভাগে

একটি শিশির, এর কোনাে নাম ধাম

আছে? এর কি শুধায় কেহ পরিচয়?

তুমি যারে ভালবাসিয়াছ, সে এমনি

শিশিরের কণা, নামধামহীন।

অর্জ্জুন

কিছু

তা’র নাই কি বন্ধন পৃথিবীতে? এক

বিন্দু স্বর্গ শুধু ভূমিতলে ভুলে’ পড়ে’

গেছে?

চিত্রাঙ্গদা

তাই বটে। শুধু নিমেষের তরে

দিয়েছে আপন উজ্জ্বলতা অরণ্যের

কুসুমেরে।

অর্জ্জুন

তাই সদা হারাই হারাই

করে প্রাণ, তৃপ্তি নাহি পাই, শান্তি নাহি

মানি। সুদুর্লভ, আরো কাছাকাছি এস।

মানুষের মত, নামধামগােত্রগৃহ-

দেহমনবাক্যে, সহস্র বন্ধনে দাও

ধরা। চারিপার্শ্ব হ’তে পরশি তােমারে,

নির্ভয়নির্ভরে করি বাস! নাম নাই?

তবে কোন্ প্রেমমন্ত্রে জপিব তােমারে

হৃদয়মন্দিরমাঝে? গােত্র নাই? তবে

কি মৃণালে এ কমল ধরিয়া রাখিব?

চিত্রাঙ্গদা

নাই, নাই, নাই।—যারে বাঁধিবারে চাও

কখনাে সে বন্ধন জানেনি। সে কেবল

মেঘের সুবর্ণছটা, গন্ধ কুসুমের,

তরঙ্গের গতি।

অর্জ্জুন

তাহারে যে ভালবাসে

অভাগা সে। প্রিয়ে, দিয়াে না প্রেমের হাতে

আকাশকুসুম। বুকে রাখিবার ধন

দাও তা’রে সুখে দুঃখে সুদিনে দুর্দ্দিনে।

চিত্রাঙ্গদা

এখনাে যে বর্ষ যায় নাই, শ্রান্তি এরি

মাঝে? হায় হায় এখন বুঝিনু, পুষ্প

স্বল্প-পরমায়ু দেবতার আশীর্ব্বাদে।

গতবসন্তের যত মৃতপুষ্পসাথে

ঝরিয়া পড়িত যদি এ মােহন তনু

আদরে মরিত হবে। বেশি দিন নহে

পার্থ! যে ক’দিন আছে, আশা মিটাইয়া

কুতুহলে, আনন্দের মধুটুকু তা’র

নিঃশেষ করিয়া কর পান। এর পরে

বারবার আসিয়াে না স্মৃতির কুহকে

ফিরে’ ফিরে’, গত সায়াহ্নের চ্যুতবৃন্ত

মাধবীর আশে, তৃষিত ভূঙ্গের মত।

৪৯

বনচরগণ ও অর্জ্জুন

বনচর

হায় হায় কে রক্ষা করিবে?

অর্জ্জুন

কি হয়েছে

বনচর

উত্তর পর্ব্বত হ’তে আসিছে ছুটিয়া

দস্যুদল, বরষার পার্ব্বত্য বন্যার

মত বেগে, বিনাশ করিতে লােকালয়।

অর্জ্জুন

এ রাজ্যে রক্ষক কেহ নাই?

বনচর

রাজকন্যা

চিত্রাঙ্গদা আছিলেন দুষ্টের দমন;

তাঁর ভয়ে রাজ্যে নাহি ছিল কোনাে ভয়,

যমভয় ছাড়া। শুনেছি গেছেন তিনি

তীর্থপর্যটনে, অজ্ঞাত ভ্রমণব্রত।

অর্জ্জুন

এ রাজ্যের রক্ষক রমণী?

বনচর

এক দেহে

তিনি পিতামাতা অনুরক্ত প্রজাদের।

স্নেহে তিনি রাজমাতা, বীর্য্যে যুবরাজ।

(প্রস্থান)

( চিত্রাঙ্গদার প্রবেশ)

চিত্রাঙ্গদা

কি ভাবিছ নাথ?

অর্জ্জুন

রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা

কেমন না জানি তাই ভাবিতেছি মনে।

প্রতিদিন শুনিতেছি শতমুখ হ’তে

তারি কথা, নব নব অপূর্ব্ব কাহিনী।

চিত্রাঙ্গদা

কুৎসিত, কুরূপ! এমন বঙ্কিম ভুরু

নাই তা’র, এমন নিবিড় কৃষ্ণতারা।

কঠিন সবল বাহু বিঁধিতে শিখেছে

লক্ষ্য, বাঁধিতে পারে না বীরতনু, হেন

সুকোমল নাগপাশে।

অর্জ্জুন

কিন্তু শুনিয়াছি,

স্নেহে নারী বীর্য্যে সে পুরুষ।

চিত্রাঙ্গদা

ছি ছি, সেই

তা’র মন্দভাগ্য। নারী যদি নারী হয়

শুধু, শুধু ধরণীর শােভা, শুধু আলাে,

শুধু ভালবাসা, শুধু সুমধুর ছলে,

শতরূপ ভঙ্গিমায় পলকে পলকে

লুটায়ে জড়ায়ে বেঁকে বেঁধে হেসে কেঁদে

সেবায় সােহাগে ছেয়ে চেয়ে থাকে সদা

তবে তা’র সার্থক জনম। কি হইবে

কর্ম্মকীর্ত্তি বীর্য্যবল শিক্ষা দীক্ষা তা’র।

হে পৌরব, কাল যদি দেখিতে তাহারে

এই বনপথপার্শ্বে, এই পূর্ণাতীরে,

ওই দেবালয় মাঝে-হেসে চলে’ যেতে।

হায় হায়, আজ এত হয়েছে অরুচি

নারীর সৌন্দর্য্যে, নারীতে খুঁজিতে চাও

পৌরুষের স্বাদ।

এস নাথ, ওই দেখ

গাঢ়চ্ছায়া শৈলগুহামুখে, বিছাইয়া

রাখিয়াছি আমাদের মধ্যাহ্ন-শয়ন,

কচি কচি পীতশ্যাম কিশলয় তুলি’

আর্দ্র করি’ ঝরণার শীকরনিকরে।

গভীর পল্লবছায়ে বসি’, ক্লান্তকণ্ঠে

কঁদিছে কপােত, “বেলা যায়” “বেলা যায়”

বলি'। কুলুকুলু বহিয়া চলেছে নদী

ছায়াতল দিয়া। শিলাখণ্ডে স্তরে স্তরে

সরস সুস্নিগ্ধ সিক্ত শ্যামল শৈবাল

নয়ন চুম্বন করে কোমল অধরে।

এস নাথ বিরল বিরামে।

অৰ্জ্জুন

আজ নহে

প্রিয়ে!

চিত্রাঙ্গদা

কেন নাথ?

অর্জ্জুন

শুনিয়াছি দস্যুদল

আসিছে নাশিতে জনপদ। ভীতজনে

করিব রক্ষণ।

চিত্রাঙ্গদা

কোনাে ভয় নাই প্রভু!

তীর্থযাত্রাকালে, রাজকন্যা চিত্রাঙ্গদা

স্থাপন করিয়া গেছে সতর্ক প্রহরী

দিকে দিকে; বিপদের যত পথ ছিল

বন্ধ করে’ দিয়ে গেছে বহু তর্ক করি'।

অর্জ্জুন

তবু আজ্ঞা কর, প্রিয়ে স্বল্পকালতরে

করে’ আসি কর্ত্তব্যসন্ধান। বহুদিন

রয়েছে অলস হ’য়ে ক্ষত্রিয়ের বাহু।

সুমধ্যমে, ক্ষীণকীর্ত্তি এই ভুজদ্বয়

পুনর্ব্বার নবীন গৌরবে ভরি’ আনি’

তােমার মস্তকতলে যতনে রাখিয়া

দিব, হবে তব যােগ্য উপধান।

চিত্রাঙ্গদা

যদি

নাই যেতে দিই? যদি বেঁধে রাখি? ছিন্ন

করে’ যাবে? তাই যাও। কিন্তু মনে রেখাে

ছিন্ন লতা জোড়া নাহি লাগে। যদি তৃপ্তি

হ’য়ে থাকে, তবে যাও, করিব না মানা;

যদি তৃপ্তি নাহি হ’য়ে থাকে, তবে মনে

রেখাে, চঞ্চলা সুখের লক্ষী কারাে তরে

বসে’ নাহি থাকে; সে কাহারাে সেবাদাসী

নহে; তা’র সেবা করে নরনারী, অতি

ভয়ে ভয়ে নিশিদিন রাখে চোখে চোখে

যতদিন প্রসন্ন সে থাকে। রেখে যাবে।

যারে সুখের কলিকা, কর্মক্ষেত্র হ’তে

ফিরে এসে সন্ধ্যাকালে দেখিবে তাহার

দলগুলি ফুটে’ ঝরে’ পড়ে’ গেছে ভূমে;

সব কর্ম্ম ব্যর্থ মনে হবে। চিরদিন

রহিবে জীবনমাঝে জীবন্ত অতৃপ্তি

ক্ষুধাতুরা। এস, নাথ, বস'। কেন আজি

এত অন্যমন? কার কথা ভাবিতেছ?

চিত্রাঙ্গদা? আজ তা’র এত ভাগ্য কেন?

অর্জ্জুন

ভাবিতেছি বীরাঙ্গনা কিসের লাগিয়া

ধরেছে দুষ্কর ব্রত? কি অভাব তা’র?

চিত্রাঙ্গদা

কি অভাব তা’র? কি ছিল সে অভাগীর?

বীর্য্য তা’র অভ্রভেদী দুর্গ সুদুর্গম

রেখেছিল চতুর্দ্দিকে অবরুদ্ধ করি’

রুদ্যমান রমণীহৃদয়। রমণী ত

সহজেই অন্তরবাসিনী; সঙ্গোপনে

থাকে আপনাতে; কে তা’রে দেখিতে পায়,

হৃদয়ের প্রতিবিম্ব দেহের শােভায়

প্রকাশ না পায় যদি। কি অভাব তা’র?

অরুণ-লাবণ্য-লেখা-চিরনির্ব্বাপিত

ঊষার মতন, যে রমণী আপনার

শতস্তর তিমিরের তলে বসে’ থাকে

বীর্য্যশৈলশৃঙ্গপরে নিত্য-একাকিনী

কি অভাব তা’র? থাক থাক, তা’র কথা।

পুরুষের শ্রুতি-সুমধুর নহে, তা’র

ইতিহাস!

অর্জ্জুন

বল বল। শ্রবণলালসা

ক্রমশঃ বাড়িছে মাের। হৃদয় তাহার

করিতেছি অনুভব হৃদয়ের মাঝে।

যেন পান্থ আমি, প্রবেশ করেছি গিয়া

কোন্ অপরূপ দেশে অর্দ্ধ রজনীতে।

নদীগিরিবনভূমি সুপ্তিনিমগন,

শুভ্রসৌধকিরীটিনী উদার নগরী

ছায়াসম অর্দ্ধস্ফুট দেখা যায়, শুনা

যায় সাগরগর্জ্জন; প্রভাতআকাশে

বিচিত্র বিস্ময়ে যেন ফুটিবে চৌদিক;

প্রতীক্ষা করিয়া আছি উৎসুক হৃদয়ে

তারি তরে। বল বল শুনি তা’র কথা।

চিত্রাঙ্গদা

কি আর শুনিবে?

অর্জ্জুন

দেখিতে পেতেছি তা’রে

অশ্বারােহী, অবহেলে বাম করে বল্লা

ধরি’, দক্ষিণেতে শরাসন, নগরের

বিজয়লক্ষনীর মত, আর্ত্ত প্রজাগণে

করিছেন বরাভয়দান। দরিদ্রের

সঙ্কীর্ণ দুয়ারে, রাজার মহিমা যেথা

নত হয় প্রবেশ করিতে, মাতৃরূপ

ধরি’ সেথা, করিছেন দয়াবিতরণ।

সিংহিনীর মত, চারিদিকে আপনার

বৎসগণে রয়েছেন আগলিয়া, শত্রু

কেহ কাছে নাহি আসে ডরে। ফিরিছেন

মুক্তলজ্জা, ভয়হীনা, প্রসন্নহাসিনী,

বীর্য্যসিংহ পরে চড়ি’ জগদ্ধাত্রী দয়া।

রমণীর কমনীয় দুই বাহু পরে

স্বাধীন সে অসঙ্কোচ বল, ধিক্ থাক

তা’র কাছে রুনুঝুনু কঙ্কণ কিঙ্কিণী।

অয়ি বরারোহে, বহুদিন কর্ম্মহীন

এ পরাণ মাের, উঠিছে অশান্ত হ’য়ে

দীর্ঘ শীত-সুপ্তোথিত ভুজঙ্গের মত।

এস এস দোঁহে দুই মত্ত অশ্ব ল’য়ে

পাশাপাশি ছুটে চলে’ যাই, মহাবেগে

দুই দীপ্ত জ্যোতিষ্কের মত। বাহিরিয়া

যাই, এই রুদ্ধ সমীরণ, এই তিক্ত

পুষ্পগন্ধমদিরায় নিদ্রাঘনঘাের

অরণ্যের অন্ধগর্ভ হ’তে।

চিত্রাঙ্গদা

হে কৌন্তেয়,

যদি এ লালিত্য, এই কোমল ভীরুতা,

স্পর্শক্লেশসকাতর শিরীষপেলব

এই রূপ, ছিন্ন করে’ ঘৃণাভরে ফেলি’

পদতলে, পরের বসনখণ্ড সম,—

সে ক্ষতি কি সহিতে পারিবে? কামিনীর

ছলাকলা মায়ামন্ত্র দূর করে’ দিয়ে

উঠিয়া দাঁড়াই যদি সরল উন্নত

বীর্য্যমন্ত অন্তরের বলে, পর্ব্বতের

তেজস্বী তরুণ তরুসম, বায়ুভরে

আনম্রসুন্দর, কিন্তু লতিকার মত

নহে নিত্য কুণ্ঠিত লুণ্ঠিত,—সেকি ভালাে

লাগিবে পুরুষচোখে?—থাক থাক, তা’র

চেয়ে এই ভালো। আপন যৌবনখানি,

দুদিনের বহুমূল্য ধন, সাজাইয়া

সযতনে, পথচেয়ে বসিয়া রহিব;

অবসরে আসিবে যখন, আপনার

সুধাটুকু দেহপাত্রে আকর্ণ পূরিয়া

করাইব পান; সুখস্বাদে শ্রান্তি হ’লে

চলে’ যাবে কর্ম্মের সন্ধানে; পুরাতন

হ’লে, যেথা স্থান দিবে, সেথায় রহিব

পার্শ্বে পড়ি। যামিনীর নর্ম্মসহচরী

যদি হয় দিবসের কর্ম্মসহচরী,

সতত প্রস্তুত থাকে বামহস্তসম

দক্ষিণ হস্তের অনুচর, সে কি ভালাে

লাগিবে বীরের প্রাণে?

অৰ্জ্জুন

বুঝিতে পারিনে

আমি রহস্য তােমার। এতদিন আছি,

তবু যেন পাইনি সন্ধান। তুমি যেন

বঞ্চিত করিছ মােরে গুপ্ত থেকে সদা;

তুমি যেন দেবীর মতন, প্রতিমার

অন্তরালে থেকে, আমারে করিছ দান

অমূল্য চুম্বন রত্ন, আলিঙ্গন সুধা;

নিজে কিছু চাই না, লহ না। অঙ্গহীন

ছন্দোহীন প্রেম প্রতিক্ষণে পরিতাপ

জাগায় অন্তরে। তেজস্বিনী, পরিচয়

পাই তব মাঝে মাঝে কথায় কথায়।

তা’র কাছে এ সৌন্দর্যরাশি, মনে হয়

মৃত্তিকার মূর্ত্তি শুধু, নিপুণ চিত্রিত

শিল্প যবনিকা। মাঝে মাঝে মনে হয়

তােমারে তােমার রূপ ধরিতে পারে না

আর, তাই সদা কাঁপিতেছে টলমল

করি'। নিত্যদীপ্ত হাসিটির মাঝে

ভরা অশ্রু করিতেছে বাস, মাঝে মাঝে

ছলছল করে’ ওঠে, মুহূর্ত্তের মাঝে

ফাটিয়া পড়িবে যেন আবরণ টুটি'।

সাধকের কাছে, প্রথমেতে ভ্রান্তি আসে

মনােহর মায়াকায়া ধরি’; তা’র পরে

সত্য দেখা দেয়, ভূষণ-বিহীনরূপে

আলাে করি’ অন্তর বাহির। সেই সত্য

কোথা আছে তােমার মাঝারে, দাও তা’রে।

আমার যে সত্য তাই লও। শ্রান্তিহীন

সে মিলন চিরদিবসের। অশ্রু কেন

প্রিয়ে? বাহুতে লুকায়ে মুখ কেন এই

ব্যাকুলতা? বেদনা দিয়েছি প্রিয়তমে?

তবে থাক, তবে থাক্। ওই মনােহর

রূপ পুণ্যফল মাের। এই যে সঙ্গীত

শােনা যায় মাঝে মাঝে বসন্তসমীরে

এ যৌবন যমুনার পরপার হ’তে,

এই মাের বহুভাগ্য। এ বেদনা মাের

সুখের অধিক সুখ, আশার অধিক

আশা, হৃদয়ের চেয়ে বড়, তাই তা’রে

হৃদয়ের ব্যথা বলে’ মনে হয় প্রিয়ে।

মদন, বসন্ত ও চিত্রাঙ্গদা

মদন

শেষ রাত্রি আজি।

বসন্ত

আজ রাত্রিঅবসানে

তব অঙ্গ-শােভা, ফিরে’ যাবে বসন্তের

অক্ষয়ভাণ্ডারে। পার্থের চুম্বনস্মৃতি

ভুলে’ গিয়ে, তব ওষ্ঠ-রাগ, দুটি নব

কিশলয়ে মঞ্জরি’ উঠিবে লতিকায়।

অঙ্গের বরণ তব, শত শ্বেত ফুলে

ধরিয়া নূতন তনু, গতজন্মকথা

ত্যজিবে স্বপ্নের মত নব জাগরণে।

চিত্রাঙ্গদা

হে অনঙ্গ, হে বসন্ত, আজ রাত্রে তবে

এ মুমূর্ষুরূপ মাের, শেষ রজনীতে

শ্রান্ত প্রদীপের অন্তিম শিখার মত-

আচম্বিতে উঠুক উজ্জ্বলতম হ’য়ে।

মদন

তবে তাই হােক। সখা, দক্ষিণ পবন

দাও তবে নিশ্বাসিয়া প্রাণপূর্ণ বেগে।

অঙ্গে অঙ্গে উচুক উচ্ছ্বসি পুনর্ব্বার

নবােল্লাসে যৌবনের ক্লান্ত মন্দ স্রোত

আজি মাের পঞ্চ পুষ্পশরে, নিশীথের

নিদ্রাভেদ করি’, ভােগবতী তটিনীর

তরঙ্গউচ্ছ্বাসে, প্লাবিত করিয়া দিব

বাহুপাশে বদ্ধ দুটি প্রেমিকের তনু।

শেষ রাত্রি

অর্জ্জুন ও চিত্রাঙ্গদা

চিত্রাঙ্গদা

প্রভু, মিটিয়াছে সাধ? এই সুললিত

সুগঠিত নবনী-কোমল সৌন্দর্য্যের

যত গন্ধ যত মধু ছিল, সকলি কি

করিয়াছ পান! আর কিছু বাকি আছে?

আর কিছু চাও? আমার যা কিছু ছিল

সব হয়ে গেছে শেষ?—হয় নাই প্রভু!

ভালাে হােক, মন্দ হােক, আরাে কিছু বাকি

আছে, সে আজিকে দিব।

প্রিয়তম, ভালাে

লেগেছিল বলে’ করেছিনু নিবেদন

এ সৌন্দর্য-পুষ্পরাশি চরণকমলে—

নন্দনকানন হ’তে তুলে’ নিয়ে এসে

বহু সাধনায়। যদি সাঙ্গ হ’ল পূজা

তবে আজ্ঞা কর প্রভু, নির্ম্মাল্যের ডালি

ফেলে দিই মন্দির বাহিরে। এইবার

প্রসন্ন নয়নে চাও সেবিকার পানে।

যে ফুলে করেছি পূজা, নহি আমি কভু

সে ফুলের মত প্রভু এত সুমধুর,

এত সুকোমল, এত সম্পূর্ণ সুন্দর।

দোষ আছে, গুণ আছে, পাপ আছে, পুণ্য

আছে; কত দৈন্য আছে; আছে আজন্মের

কত অতৃপ্ত তিয়াষা। সংসার-পথের

পান্থ, ধূলিলিপ্ত বাস, বিক্ষত চরণ;

কোথা পাব কুসুম-লাবণ্য, দুদণ্ডের

জীবনের অকলঙ্ক শােভা! কিন্তু আছে

অক্ষয় অমর এক রমণী-হৃদয়?

দুঃখ সুখ আশা ভয় লজ্জা দুর্ব্বলতা

ধূলিময়ী ধরণীর কোলের সন্তান,

তা’র কত ভ্রান্তি, তা’র কত ব্যথা,

কত ভালবাসা, মিশ্রিত জড়িত হ’য়ে

আছে এক সাথে।—আছে এক সীমাহীন

অপূর্ণতা, অনন্ত মহৎ। কুসুমের

সৌরভ মিলায়ে থাকে যদি, এইবার

সেই জন্ম-জন্মান্তের সেবিকার পানে

চাও।

সূর্য্যোদয়

( অবগুণ্ঠন খুলিয়া)

আমি চিত্রাঙ্গদা। রাজেন্দ্রনন্দিনী:

হয় ত পড়িবে মনে, সেই একদিন

সেই সরােবরতীরে, শিবালয়ে, দেখা

দিয়েছিল এক নারী, বহু আবরণে

ভারাক্রান্ত করি’ তা’র রূপহীন তনু।

কি জানি কি বলেছিল নির্লজ্জ মুখরা,

পুরুষেরে করেছিল পুরুষ-প্রথায়

আরাধনা; প্রত্যাখ্যান করেছিলে তা’রে।

ভালোই করেছ। সামান্য সে নারীরূপে

গ্রহণ করিতে যদি তা’রে, অনুতাপ

বিঁধিত তাহার বুকে আমরণ কাল।

প্রভু, আমি সেই নারী। তবু আমি সেই

নারী নহি; সে আমার হীন ছদ্মবেশ।

তার পরে পেয়েছিনু বসন্তের বরে

বর্ষকাল অপরূপ রূপ। দিয়েছিনু

শ্রান্ত করি’ বীরের হৃদয়, ছলনার

ভারে। সেও আমি নহি।

আমি চিত্রাঙ্গদা।

দেবী নহি, নহি আমি সামান্যা রমণী।

পূজা করি’ রাখিবে মাথায়, সেও আমি

নই, অবহেলা করি’ পুষিয়া রাখিবে

পিছে সেও আমি নহি। যদি পার্শ্বে রাখ

মােরে সঙ্কটের পথে, দুরূহ চিন্তার

যদি অংশ দাও, যদি অনুমতি কর’

৬৫

কঠিন ব্রতের তব সহায় হইতে,

যদি সুখে দুখে মােরে কর সহচরী,

আমার পাইবে তবে পরিচয়। গর্ভে

আমি ধরেছি যে সন্তান তােমার, যদি

পুত্র হয়, আশৈশব বীরশিক্ষা দিয়ে

দ্বিতীয় অর্জ্জুন করি’ তা’রে একদিন

পাঠাইয়া দিব যবে পিতার চরণে,

তখন জানিবে মােরে প্রিয়তম!

আজ

শুধু নিবেদি চরণে, আমি চিত্রাঙ্গদা,

রাজেন্দ্রনন্দিনী।

প্রিয়ে, আজ ধন্য আমি

কথা ও কাহিনী · দেবতার গ্রাস

দেবতার গ্রাস

গ্রামে গ্রামে সেই বার্ত্তা রটি গেল ক্রমে

মৈত্র মহাশয় যাবে সাগরসঙ্গমে

তীর্থস্নান লাগি। সঙ্গীদল গেল জুটি

কত বালবৃদ্ধ নরনারী; নৌকা দুটি

প্রস্তুত হইল ঘাটে।

পুণ্যলােভাতুর

মােক্ষদা কহিল আসি “হে দাদাঠাকুর,

আমি তব হব সাথী!”-বিধবা যুবতী,

দু’খানি করুণ আঁখি মানে না যুকতি,

কেবল মিনতি করে,—অনুরােধ তা’র

এড়ানাে কঠিন বড়!—“স্থান কোথা আর”

মৈত্র কহিলেন তা’রে। “পায়ে ধরি তব”

বিধবা কহিল কাঁদি “স্থান করি লব

কোনােমতে এক ধারে।” ভিজে গেল মন

তবু দ্বিধাভরে তা’রে শুধাল ব্রাহ্মণ

“নাবালক ছেলেটির কি করিবে তবে?”

উত্তর করিলা নারী-“রাখাল? সে র’বে

আপন মাসীর কাছে। তা’র জন্মপরে

বহুদিন ভুগেছিনু সূতিকার জ্বরে

বাঁচিব ছিল না আশা; অন্নদা তখন

আপন শিশুর সাথে দিয়ে তা’রে স্তন

মানুষ করেছে যত্নে,—সেই হ’তে ছেলে

মাসীর আদরে আছে মা’র কোল ফেলে।

দুরন্ত মানে না কারে, করিলে শাসন

মাসী আসি অশ্রুজলে ভরিয়া নয়ন

কোলে তা’রে টেনে লয়। সে থাকিবে সুখে

মা’র চেয়ে আপনার মাসীমার বুকে।

সম্মত হইল বিপ্র। মােক্ষদা সত্বর

প্রস্তুত হইল-বাঁধি জিনিষপত্তর,

প্রণমিয়া গুরুজনে,—সখীদলবলে

ভাসাইয়া বিদায়ের শােকঅশ্রুজলে।

ঘাটে আসি দেখে, সেথা আগেভাগে ছুটি

রাখাল বসিয়া আছে তরী পরে উঠি’

নিশ্চিন্ত নীরবে। “তুই হেথা কেন ওরে?”

মা শুধাল,—সে কহিল, “যাইব সাগরে।”

“যাইবি সাগরে, আরে, ওরে দস্যু ছেলে,

নেমে আয়!”—পুনরায় দৃঢ় চক্ষু মেলে’

সে কহিল দুটি কথা—“যাইব সাগরে।”

যত তা’র বাহু ধরি টানাটানি করে

রহিল সে তরণী আঁকড়ি। অবশেষে

ব্রাহ্মণ করুণ স্নেহে কহিলেন হেসে

“থাক্ থাক্‌ সঙ্গে যা।” মা রাগিয়া বলে

“চল্ তােরে দিয়ে আসি সাগরের জলে।”

যেমনি সে কথা গেল আপনার কানে

অমনি মায়ের বক্ষে অনুতাপবাণে

বিঁধিয়া কাঁদিয়া উঠে। মুদিয়া নয়ন

“নারায়ণ নারায়ণ” করিল স্মরণ।

পুত্রে নিল কোলে তুলি,—তা’র সর্ব্বদেহে

করুণ কল্যাণ হস্ত বুলাইল স্নেহে।

মৈত্র তা’রে ডাকি ধীরে চুপি চুপি কয়

“ছি ছি ছি, এমন কথা বলিবার নয়।”

রাখাল যাইবে সাথে স্থির হ’ল কথা,—

অন্নদা লােকের মুখে শুনি সে বারতা,

ছুটে আসি বলে “বাছা, কোথা যাবি ওরে?”

রাখাল কহিল হাসি “চলিনু সাগরে,

আবার ফিরিব মাসী।” পাগলের প্রায়

অনুদা কহিল ডাকি “ঠাকুর মশায়,

বড় যে দুরন্ত ছেলে রাখাল আমার,—

কে তাহারে সামালিবে? জন্ম হ’তে তা’র

মাসী ছেড়ে বেশিক্ষণ থাকেনি কোথাও,

কোথা এরে নিয়ে যাবে? ফিরে দিয়ে যাও।’

রাখাল কহিল-“মাসী যাইব সাগরে

আবার ফিরিব আমি।” বিপ্র স্নেহস্বরে

কহিলেন—“যতক্ষণ আমি আছি ভাই,

তােমার রাখাল লাগি কোনাে ভয় নাই।

এখন শীতের দিন শান্ত নদীনদ,

অনেক যাত্রীর মেলা,—পথের বিপদ

কিছু নাই,—যাতায়াতে মাস দুই কাল,—

তােমারে ফিয়ায়ে দিব তােমার রাখাল।”

শুভক্ষণে দুর্গা স্মরি’ নৌকা দিল ছাড়ি।

দাঁড়ায়ে রহিল ঘাটে যত কুলনারী

অশ্রুচোখে। হেমন্তের প্রভাত-শিশিরে

ছল ছল করে গ্রাম চূর্ণী নদীতীরে।

যাত্রীদল ফিরে আসে; সাঙ্গ হ’ল মেলা।

তরণী তীরেতে বাঁধা অপরাহ্ণ বেলা

জোয়ারের আশে। কৌতূহল অবসান,

কাঁদিতেছে রাখালের গৃহগত প্রাণ

মাসীর কোলের লাগি।—জল শুধু জল

দেখে দেখে চিত্ত তা’র হয়েছে বিকল।

মসৃণ চিক্কণ কৃষ্ণ কুটিল নিষ্ঠুর,

লােলুপ লেলিহজিহব সর্পসম ক্রূর

খল জল ছলভরা, তুলি লক্ষ ফণা

ফুঁসিছে গর্জ্জিছে, নিত্য করিছে কামনা

মৃত্তিকার শিশুদের, লালায়িত মুখ।

হে মাটি, হে স্নেহময়ী, অয়ি মৌনমুক,

অয়ি স্থির, অয়ি ধ্রুব, অয়ি পুরাতন,

সর্ব্ব-উপদ্রবসহা আনন্দভবন

শ্যামল কোমলা, যেথা যে কেহই থাকে

অদৃশ্য দুবাহু মেলি টানিছ তাহাকে

অহরহ, অয়ি মুগ্ধে, কি বিপুল টানে

দিগন্ত বিস্তৃত তব শান্ত বক্ষপানে।

চঞ্চল বালক আসি প্রতি ক্ষণে ক্ষণে

অধীর উৎসুককণ্ঠে শুধায় ব্রাহ্মণে

“ঠাকুর, কখন্ আজি আসিবে জোয়ার?”

সহসা স্তিমিত জলে আবেগ সঞ্চার

দুই কূল চেতাইল আশার সংবাদে।

ফিরিল তরীর মুখ; মৃদু আর্ত্তনাদে

কাছিতে পড়িল টান,—কলশব্দগীতে

সিন্ধুর বিজয়রথ পশিল নদীতে,—

আসিল জোয়ার।—মাঝি দেবতারে স্মরি

ত্বরিত উত্তরমুখে খুলে দিল তরী।

রাখাল শুধায় আসি ব্রাহ্মণের কাছে

“দেশে পঁহুছিতে আর কতদিন আছে?”

সূর্য অস্ত না যাইতে, ক্রোশ দুই ছেড়ে

উত্তর বায়ুর বেগ ক্রমে উঠে বেড়ে।

রূপনারাণের মুখে পড়ি বালুচর

সঙ্কীর্ণ নদীর পথে বাধিল সমর

জোয়ারের স্রোতে আর উত্তরসমীরে

উত্তাল উদ্দাম। তরণী ভিড়াও তীরে

উচ্চকণ্ঠে বারম্বার কহে যাত্রীদল।

কোথা তীর? চারিদিকে ক্ষিপ্তোন্মত্তজল

আপনার রুদ্রনৃত্যে দেয় করতালি

লক্ষ লক্ষ হাতে। দিগন্তরে যায় দেখা

অতি দূর তীরপ্রান্তে নীল বনরেখা;—

অন্য দিকে লুব্ধ ক্ষুব্ধ হিংস্র বারিরাশি

প্রশান্ত সূর্যাস্ত পানে উঠিছে উচ্ছ্বাসি

উদ্ধত বিদ্রোহভরে। নাহি মানে হাল,

ঘুরে টলমল তরী অশান্ত মাতাল

মূঢ়সম। তীব্র শীতপবনের সনে

মিশিয়া ত্রাসের হিম নরনারীগণে

কাঁপাইছে থরহরি। কেহ হতবাক,

কেহ বা ক্রন্দন করে ছাড়ি ঊর্দ্ধডাক,

ডাকি আত্মজনে। মৈত্র শুষ্ক পাংশুমুখে

চক্ষু মুদি’ করে জপ। জননীর বুকে

রাখাল লুকায়ে মুখ কাঁপিছে নীরবে।

তখন বিপন্ন মাঝি ডাকি কহে সবে-

“বাবারে দিয়েছে ফাঁকি তােমাদের কেউ,

যা মেনেছে দেয় নাই তাই এত ঢেউ,

অসময়ে এ তুফান। শুন এই বেলা,

করহ মান রক্ষা -করিয়াে না খেলা,

ক্রুদ্ধ দেবতার সনে।”—যার যত ছিল

অর্থ বস্ত্র যাহা কিছু জলে ফেলি দিল

না করি বিচার। তবু তখনি পলকে

তরীতে উঠিল জল দারুণ ঝলকে।

মাঝি কহে পুনর্ব্বার—“দেবতার ধন

কে যায় ফিরায়ে ল’য়ে এই বেলা শোন্।”

ব্রাহ্মণ সহসা উঠি কহিলা তখনি

মােক্ষদারে লক্ষ্য করি—“এই সে রমণী

দেবতারে সঁপি দিয়া আপনার ছেলে

চুরি করে’ নিয়ে যায়।”-“দাও তা’রে ফেলে”

একবাক্যে গর্জ্জি উঠে তরাসে নিষ্ঠুর

যাত্রী সবে। কহে নারী “হে দাদাঠাকুর

রক্ষা কর, রক্ষা কর।” দুই দৃঢ় করে

রাখালেরে প্রাণপণে বক্ষে চাপি ধরে।

ভৎসিয়া গর্জ্জিয়া উঠি কহিলা ব্রাহ্মণ

“আমি তাের রক্ষাকর্ত্তা? রোষে নিশ্চেতন

মা হ’য়ে আপন পুত্র দিলি দেবতারে,

শেষকালে আমি রক্ষা করিব তাহারে?

শােধ দেবতার ঋণ। সত্য ভঙ্গ করে’

এতগুলি প্রাণী তুই ভুবাবি সাগরে?”

মােক্ষদা কহিল “অতি মূর্খ নারী আমি,

কি বলেছি রােষবশে,—ওগাে অন্তর্যামী

সেই সত্য হ’ল? সে যে মিথ্যা কতদূর

তখনি শুনে কি তুমি বােঝনি ঠাকুর?

শুধু কি মুখের বাক্য শুনেছ দেবতা?

শােননি কি জননীর অন্তরের কথা?”

বলিতে বলিতে যত মিলি মাঝি দাঁড়ি

বল করি রাখালেরে নিল ছিঁড়ি কাড়ি

মা’র বক্ষ হ’তে। মৈত্র মুদি দুই আঁখি

ফিরায়ে রহিল মুখ কানে হাত ঢাকি,

দন্তে দন্ত চাপি বলে। কে তাঁরে সহসা

মর্ম্মে মর্ম্মে আঘাতিল বিদ্যুতের কশা,

দংশিল বৃশ্চিকদংশ।–“মাসী, মাসী, মাসী”

বিন্ধিল বহ্নির শলা রুদ্ধ কর্ণে আসি

নিরুপায় অনাথের অন্তিমের ডাক।

চীৎকারি উঠিল বিপ্র—“রাখ, রাখ, রাখ!”

চকিতে হেরিলা চাহি মূর্চ্ছি আছে পড়ে’

মােক্ষদা চরণে তাঁর।—মুহূর্ত্তের তরে

ফুটন্ত তরঙ্গ মাঝে মেলি আর্ত্ত চোখ

মাসী বলি ফুকারিয়া মিলাল বালক

অনন্ত তিমির-তলে;—শুধু ক্ষীণ মুঠি

বারেক ব্যাকুলবলে উৰ্দ্ধপানে উঠি

আকাশে আশ্রয় খুঁজি ডুবিল হতাশে।

“ফিরায়ে আনিব তােরে” কহি ঊর্ধ্বশ্বাসে

ব্রাহ্মণ মুহূর্ত্তমাঝে ঝাঁপ দিল জলে।

আর উঠিল না। সূর্য গেল অস্তাচলে।—

১৩ই কার্তিক, ১৩৪।

কথা ও কাহিনী · নকল গড়

নকল গড়

(রাজস্থান)

জলস্পর্শ করব না আর—

চিতোর-রাণার পণ—

বুঁদির কেল্লা মাটির পরে

থাক‍্বে যতক্ষণ।—

কি প্রতিজ্ঞা, হায় মহারাজ,

মানুষের যা’ অসাধ্য কাজ

কেমন করে’ সাধ‍্বে তা আজ?—

কহেন মন্ত্রিগণ।

কহেন রাজা, সাধ্য না হয়

সাধব আমার পণ।

বুঁদির কেল্লা চিতোর হ’তে

যোজন তিনেক দূর।

সেথায় হারাবংশী সবাই

মহা মহা শূর।

হামু রাজা দিচ্চে থানা

ভয় কারে কয় নাইক জানা,

তাহার সদ্য প্রমাণ রাণা

পেয়েছেন প্রচুর।

হারাবংশীর কেল্লা বুঁদি

যোজন তিনেক দূর।

মন্ত্রী কহে যুক্তি করি—

আজকে সারারাতি

মাটি দিয়ে বুঁদির মত

নকল কেল্লা পাতি।

রাজা এসে আপন করে

দিবেন ভেঙে ধূলির পরে,

নইলে শুধু কথার তরে।

হবেন আত্মঘাতী।—

মন্ত্রী দিল চিতোর মাঝে

নকল কেল্লা পাতি।

কুম্ভ ছিল রাণার ভৃত্য

হারাবংশী বীর

হরিণ মেরে আস‍্চে ফিরে

স্কন্ধে ধনু তীর।

খবর পেয়ে কহে—কেরে

নকল বুঁদি কেল্লা মেরে

হারাবংশী রাজপুতেরা

করবে নতশির?

নকল বুঁদি রাখব আমি

হারাবংশী বীর।

মাটির কেল্লা ভাঙতে আসেন

রাণা মহারাজ।

দূরে রহ—কহে কুম্ভ,

গর্জ্জে যেন বাজ।

বুঁদির নামে করবে খেলা,

সইব না সে অবহেলা,

নকল গড়ের মাটির ঢেলা

রাখব আমি আজ।

কহে কুন্ত—দূরে রহ

রাণা মহারাজ!

ভূমির পরে জানু পাতি’

তুলি’ ধনুঃ শর

একা কুম্ভ রক্ষা করে

নকল বুঁদিগড়।

রাণার সেনা ঘিরি তা’রে

মুণ্ড কাটে তরবারে,

খেলা গড়ের সিংহদ্বারে

পড়ল ভূমিপর।

রক্তে তাহার ধন্য হ’ল

নকল বুঁদিগড়।

৭ই কার্ত্তিক, ১৩০৬

কথা ও কাহিনী · নগরলক্ষ্মী

নগর-লক্ষ্মী

(কল্পদ্রুমাবদান)

দুর্ভিক্ষ শ্রারস্তিপুরে যবে

জাগিয়া উঠিল হাহারবে,—

বুদ্ধ নিজ ভক্তগণে শুধালেন জনে জনে-

ক্ষুধিতেরে অন্নদানসেবা

তােমরা লইবে বল কেবা!

শুনি তাহা রত্নাকর শেঠ

করিয়া রহিল মাথা হেঁট।

কহিল সে কর জুড়ি- ক্ষুধার্ত্ত বিশালপুরী,

এর ক্ষুধা মিটাইব আমি

এমন ক্ষমতা নাই স্বামী!

কহিল সামন্ত জয়সেন-

যে আদেশ প্রভু করিছেন

তাহা লইতাম শিরে যদি মাের বুক চিরে

রক্ত দিলে হ’ত কোনাে কাজ,

মাের ঘরে অন্ন কোথা আজ?

নিশ্বাসিয়া কহে ধর্ম্মপাল-

কি কব, এমন দগ্ধ ভাল,—

আমার সােনার ক্ষেত শুষিছে অজন্মা প্রেত,

রাজকর যােগানাে কঠিন,

হয়েছি অক্ষম দীনহীন।

রহে সবে মুখে মুখে চাহি,

কাহারাে উত্তর কিছু নাহি।

নির্ব্বাক্ সে সভাঘরে, ব্যথিত নগরীপরে

বুদ্ধের করুণ আঁখি দুটি

সন্ধ্যাতারাসম রহে ফুটি।

তখন উঠিল ধীরে ধীরে

রক্ত ভাল লাজনম্রশিরে

অনাথ-পিণ্ডদ-সুতা বেদনায় অশ্রুপ্লুতা

বুদ্ধের চরণরেণু ল’য়ে

মধুকণ্ঠে কহিল বিনয়ে:—

ভিক্ষুণীর অধম সুপ্রিয়া

তব আজ্ঞা লইল বহিয়া।

কাঁদে যারা খাদ্যহারা আমার সন্তান তা’রা

নগরীরে অন্ন বিলাবার

আমি আজি লইলাম ভার।

বিস্ময় মানিল সবে শুনি:—

ভিক্ষুকন্যা তুমি যে ভিক্ষুণী—

কোন্ অহঙ্কারে মাতি লইলে মস্তক পাতি

এ হেন কঠিন গুরু কাজ?

কি আছে তােমার, কহ আজ।

কহিল সে নমি সবা কাছে-

শুধু এই ভিক্ষাপাত্র আছে।

আমি দীনহীন মেয়ে অক্ষম সবার চেয়ে,

তাই তােমাদের পাব দয়া

প্রভু আজ্ঞা হইবে বিজয়া।

আমার ভাণ্ডার আছে ভরে’

তােমা সবাকার ঘরে ঘরে।

তােমরা চাহিলে সবে এ পাত্র অক্ষয় হবে

ভিক্ষা-অন্নে বাঁচাব বসুধা-

মিটাইব দুর্ভিক্ষের ক্ষুধা।

২৭শে আশ্বিন, ১৩০৬

নাট্য কবিতা · নরক-বাস

নরক-বাস

নেপথ্যে

কোথা যাও মহারাজ!

সোমক

কে ডাকে আমারে

দেবদূত? মেঘলােকে ঘন অন্ধকারে

দেখিতে না পাই কিছু,—হেথা ক্ষণকাল

রাখ তব স্বর্গরথ।

নেপথ্যে

ওগাে নরপাল

নেমে এস! নেমে এস হে স্বর্গ-পথিক!

সােমক

কে তুমি কোথায় আছ?

নেপথ্যে

আমি সে ঋত্বিক

মর্ত্ত্যে তব ছিনু পুরােহিত।

সােমক

ভগবন,

নিখিলের অশ্রু যেন করেছে সৃজন

বাষ্প হ’য়ে এই মহা অন্ধকার লােক,—

সূর্য্যচন্দ্রতারাহীন ঘনীভূত শােক

নিঃশব্দে রয়েছে চাপি দুঃস্বপ্ন মতন

নভস্তল,—হেথা কেন তব আগমন?

প্রেতগণ

স্বর্গের পথের পার্শ্বে এ বিষাদ লােক,

এ নরকপুরী। নিত্য নন্দন-আলােক

দূর হ’তে দেখা যায়,—স্বর্গযাত্রিগণে

অহােরাত্রি চলিয়াছে, রথচক্রস্বনে

নিদ্রাতন্দ্রা দূর করি ঈর্ষ্যা-জর্জ্জরিত

আমাদের নেত্র হ’তে। নিম্নে মর্ম্মরিত

ধরণীর বনভূমি-সপ্ত পারাবার

চিরদিন করে গান—কলধ্বনি তা’র

হেথা হ’তে শুনা যায়।

ঋত্বিক

মহারাজ, নাম’

তব দেবরথ হ’তে।

প্রেতগণ

ক্ষণকাল থাম’

আমাদের মাঝখানে। ক্ষুদ্র এ প্রার্থনা

হতভাগ্যদের! পৃথিবীর অশ্রুকণা

এখনাে জড়ায়ে আছে তােমার শরীর,

সদ্যছিন্ন পুষ্পে যথা বনের শিশির।

মাটির তৃণের গন্ধ, ফুলের পাতার

শিশুর নারীর হায়, বন্ধুর ভ্রাতার

বহিয়া এনেছ তুমি। ছয়টি ঋতুর

বহুদিনরজনীর বিচিত্র মধুর

সুখের সৌরভ রাশি।

সােমক

গুরুদেব, প্রভাে,

এ নরকে কেন তব বাস?

ঋত্বিক

পুত্রে তব

যজ্ঞে দিয়েছিনু বলি—সে পাপে এ গতি

মহারাজ!

প্রেতগণ

কহ সে কাহিনী, নরপতি,

পৃথিবীর কথা! পাতকের ইতিহাস

এখনাে হৃদয়ে হানে কৌতুক উল্লাস।

রয়েছে তােমার কণ্ঠে মর্ত্ত্যরাগিণীর

সকল মূর্চ্ছনা, সুখদুঃখকাহিনীর

করুণ কম্পন। কহ তব বিবরণ

মানবভাষায়।

সােমক

হে ছায়া-শরীরিগণ),

সােমক আমার নাম, বিদেহ-ভূপতি।

বহু বর্ষ আরাধিয়া দেব দ্বিজ যতি

বহু যাগ যজ্ঞ করি, প্রাচীন বয়সে

এক পুত্র লভেছিনু, -তারি স্নেহবশে

রাত্রিদিন আছিলাম আপনা-বিস্মৃত।

সমস্ত সংসার-সিন্ধু-মথিত-অমৃত

ছিল সে আমার শিশু। মাের বৃন্ত ভরি

একটি সে শ্বেতপদ্ম, সম্পূর্ণ আবরি

ছিল সে আমারে। আমার হৃদয়

ছিল তারি মুখ পরে—সূর্য্য যথা রয়

ধরণীর পানে চেয়ে। হিমবিন্দুটিরে

পদ্মপত্র যত ভয়ে ধরে’ রাখে শিরে

সেই মত রেখেছিনু তা’রে। সুকঠোর

ক্ষাত্রধর্ম্ম রাজধর্ম্ম স্নেহপানে মাের

চাহিত সরােষচক্ষে; দেবী বসুন্ধরা

অবহেলা-অবমানে হইত কাতরা,

রাজলক্ষী হ’ত লজ্জামুখী।

সভামাঝে

একদা অমাত্যসাথে ছিনু রাজকাজে

হেনকালে অন্তঃপুরে শিশুর ক্রন্দন

পশিল আমার কর্ণে। ত্যজি’ সিংহাসন

দ্রুত ছুটে চলি গেনু ফেলি সর্ব্বকাজ।

ঋত্বিক

সে মুহূর্ত্তে প্রবেশিনু রাজসভামাঝে

আশিষ করিতে নৃপে ধান্যদূর্ব্বাকরে

আমি রাজ-পুরােহিত। ব্যগ্রতার ভরে

আমারে ঠেলিয়া রাজা গেলেন চলিয়া,

অর্ঘ্য পড়ি গেল ভূমে। উঠিল জ্বলিয়া

ব্রাহ্মণের অভিমান। ক্ষণকাল পরে

ফিরিয়া আসিলা রাজা লজ্জিত অন্তরে।

আমি শুধালেম তাঁরে, কহ হে রাজন্

কি মহা অনর্থপাত দুর্দ্দৈব ঘটন

ঘটেছিল, যার লাগি ব্রাহ্মণেরে ঠেলি

অন্ধ অবজ্ঞার বশে,—রাজকর্ম্ম ফেলি,

না শুনি বিচারপ্রার্থী প্রজাদের যত

আবেদন, পররাষ্ট্র হ’তে সমাগত

রাজদূতগণে নাহি করি সম্ভাষণ,

সামন্ত রাজন্যগণে না দিয়া আসন,

প্রধান অমাত্য সবে রাজ্যের বারতা

না করি জিজ্ঞাসাবাদ, না করি শিষ্টতা

অতিথি সজ্জন গুণিজনে -অসময়ে

ছুটে গেলা অন্তঃপুরে মত্তপ্রায় হ’য়ে

শিশুর ক্রন্দন শুনি? ধিক্ মহারাজ,

লজ্জায় আনত শির ক্ষত্রিয় সমাজ

তব মুগ্ধব্যবহারে, শিশু-ভুজপাশে

বন্দী হ’য়ে আছ পড়ি দেখে সবে হাসে

শত্রুদল দেশে দেশে,—নীরব সঙ্কোচে

বন্ধুগণ সঙ্গোপনে অশ্রুজল মােছে।

সোমক

ব্রাহ্মণের সেই তীব্র তিরস্কার শুনি

অবাক্ হইল সভা। -পাত্রমিত্র গুণী

রাজগণ প্রজাগণ রাজদূত সবে

আমার মুখের পানে চাহিল নীরবে

ভীত কৌতূহলে। রোষাবেশ ক্ষণতরে

উত্তপ্ত করিল রক্ত; -মুহূর্ত্তের পরে

লজ্জা আসি করি দিল দ্রুত পদাঘাত

দৃপ্ত রােষসর্পশিরে। করি প্রণিপাত

গুরুপদে-কহিলাম বিনম্র বিনয়ে—

ভগবন, শান্তি নাই এক পুত্র ল’য়ে,

ভয়ে ভয়ে কাটে কাল! মােহবশে তাই

অপরাধী হইয়াছি-ক্ষমা ভিক্ষা চাই।

সাক্ষী থাক মন্ত্রী সবে, হে রাজন্যগণ

রাজার কর্ত্তব্য কভু করিয়া লঙ্ঘন

খর্ব্ব করিব না আর ক্ষত্রিয়-গৌরব।

ঋত্বিক

ত আনন্দে সভা রহিল নীরব।

আমি শুধু কহিলাম বিদ্বেষের তাপ

অন্তরে পােষণ করি-এক-পুত্র-শাপ

দূর করিবারে চাও—পন্থা আছে তারাে,—

কিন্তু সে কঠিন কাজ, পার কি না পার

ভয় করি। শুনিয়া সগর্ব্বে মহারাজ

কহিলেন—নাহি হেন সুকঠিন কাজ

পারি না করিতে যাহা ক্ষত্রিয়-তনয়-

কহিলাম স্পর্শি তব পাদপদ্মদ্বয়।

শুনিয়া কহিনু মৃদু হাসি’,—হে রাজন

শুন তবে। আমি করি যজ্ঞ-আয়ােজন,

তুমি হােম কর দিয়ে আপন সন্তান।

তারি মেদ-গন্ধ-ধূম করিয়া আঘ্রাণ

মহিষীরা হইবেন শত পুত্রবতী-

কহিনু নিশ্চয়।—শুনি নীরব নৃপতি

রহিলেন নত শিরে। সভাস্থ সকলে

উঠিল ধিক্কার দিয়া উচ্চ কোলাহলে।

কর্ণে হস্ত রুধি কহে যত বিপ্রগণ

ধিক্ পাপ এ প্রস্তাব।—নৃপতি তখন

কহিলেন ধীরস্বরে—তাই হবে প্রভু,

ক্ষত্রিয়ের পণ মিথ্যা হইবে না কভু।

তখন নীরব আর্ত্ত বিলাপে চৌদিক

কাঁদি উঠে,—প্রজাগণ করে ধিক্ ধিক্‌,

বিদ্রোহ জাগাতে চায় যত সৈন্যদল

ঘৃণাভরে। নৃপ শুধু রহিলা অটল।

জ্বলিল যজ্ঞের বহ্নি। যজন সময়ে

কেহ নাই,কে আনিবে রাজার তনয়ে

অন্তঃপুর হ’তে বহি। রাজভৃত্য সবে

আজ্ঞা মানিল না কেহ। রহিল নীরবে

মন্ত্রীগণ। দ্বাররক্ষী মুছে চক্ষুজল,

অস্ত্র ফেলি চলি গেল যত সৈন্যদল।

আমি ছিন্নমােহপাশ, সর্ব্বশাস্ত্র-জ্ঞানী,

হৃদয়-বন্ধন সব মিথ্যা বলে’ মানি,—

প্রবেশিনু অন্তঃপুরমাঝে। মাতৃগণ

শত-শাখা-অন্তরালে ফুলের মতন

রেখেছেন অতিযত্নে বালকেরে ঘেরি

কাতর উৎকণ্ঠাভরে। শিশু মােরে হেরি

হাসিতে লাগিল উচ্চে দুই বাহু তুলি;—

জানাইল অৰ্ধস্ফুট কাকলী আকুলি’—

মাতৃব্যুহ ভেদ করে’ নিয়ে যাও মােরে।

বহুক্ষণ বন্দী থাকি খেলাবার তরে

ব্যগ্র তা’র শিশুহিয়া। কহিলাম হাসি

মুক্তি দিব এ নিবিড় স্নেহবন্ধ নাশি’,

আয় মোর সাথে। এত বলি বল করি

মাতৃগণ-অঙ্ক হ’তে লইলাম হরি’

সহাস্য শিশুরে। পায়ে পড়ি দেবীগণ

পথ রুধি আর্ত্তকণ্ঠে করিল ক্রন্দন-

আমি চলে’ এনু বেগে। বহ্নি উঠে জ্বলি-

দাঁড়ায়ে রয়েছে রাজা পাষাণপুত্তলি।

কম্পিত প্রদীপ্ত শিখা হেরি হর্ষ ভরে

কলহাস্যে নৃত্য করি’ প্রসারিত করে

ঝাঁপাইতে চাহে শিশু। অন্তঃপুর হ’তে

শতকণ্ঠে উঠে আর্ত্তস্বর। রাজপথে

অভিশাপ উচ্চারিয়া যায় বিপ্রগণ

নগর ছাড়িয়া। কহিলাম, হে রাজন

আমি করি মন্ত্রপাঠ, তুমি এরে লও,

দাও অগ্নিদেবে।

সোমক

ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও

কহিয়াে না আর।

প্রেতগণ

থাম থাম ধিক্ ধিক

পূর্ণ মােরা বহু পাপে, কিন্তু রে ঋত্বিক

শুধু একা তাের তরে একটি নরক

কেন সৃজে নাই বিধি! খুঁজি যমলােক

তব সহবাসযােগ্য নাহি মিলে পাপী।

দেবদূত

মহারাজ এ নরকে ক্ষণকাল যাপি’

নিষ্পপে সহিছ কেন পাপীর যন্ত্রণা

উঠ স্বর্গরথে—থাক্ বৃথা আলােচনা

নিদারুণ ঘটনার।

সােমক

রথ যাও ল’য়ে

দেবদূত! নাহি যাব বৈকুণ্ঠ আলয়ে।

তব সাথে মাের গতি নরক মাঝারে

হে ব্রাহ্মণ! মত্ত হ’য়ে ক্ষাত্র-অহঙ্কারে

নিজ কর্ত্তব্যের ক্রটি করিতে ক্ষালন

নিস্পাপ শিশুরে মাের করেছি অর্পণ

হুতাশনে, পিতা হ’য়ে। বীর্য্য আপনার

নিন্দুকসমাজমাঝে করিতে প্রচার

নরধর্ম্ম রাজধর্ম্ম পিতৃধর্ম্ম হায়

অনলে করেছি ভস্ম। সে পাপ-জ্বালায়

জ্বলিয়াছি আমরণ,—এখনাে সে তাপ

অন্তরে দিতেছে দাগি’ নিত্য অভিশাপ।

হায় পুত্র, হায় বৎস নবনী-নির্ম্মল,

করুণ কোমলকান্ত, হা মাতৃবৎসল,

একান্ত নির্ভরপর পরম দুর্ব্বল

সরল চঞ্চল শিশু পিতৃ-অভিমানী

অগ্নিরে খেলনাসম পিতৃদান জানি’

ধরিলি দু’হাত মেলি বিশ্বাসে নির্ভয়ে।

তা’র পরে কি ভৎসনা ব্যথিত বিস্ময়ে

ফুটিল কাতর চক্ষে বহ্নিশিখাতলে

অকস্মাৎ। হে নরক, তােমার অনলে

হেন দাহ কোথা আছে যে জিনিতে পারে

এ অন্তরতাপ। আমি যাব স্বর্গদ্বারে?

দেবতা ভুলিতে পারে এ পাপ আমার,

আমি কি ভুলিতে পারি সে দৃষ্টি তাহার,

সে অন্তিম-অভিমান? দগ্ধ হ’ব আমি

নরক-অনলমাঝে নিত্য দিনযামী

তবু বৎস তাের সেই নিমেষের ব্যথা,

আচম্বিত বহ্নিদাহে ভীত কাতরতা

পিতৃ-মুখপানে চেয়ে,—পরম বিশ্বাস

চকিত হইয়া ভঙ্গ মহা নিরাশ্বাস,

তা’র নাহি হবে পরিশােধ।

( ধর্ম্মের প্রবেশ)

ধর্ম্ম

মহারাজ,

স্বর্গ অপেক্ষিয়া আছে তােমা তরে আজ,

চল ত্বরা করি।

সােমক

সেথা মাের নাহি স্থান

ধর্ম্মরাজ। বধিয়াছি আপন সন্তান

বিনা পাপে।

ধর্ম্ম

করিয়াছ প্রায়শ্চিত্ত তা’র

অন্তর নরকানলে। সে পাপের ভার

ভস্ম হ’য়ে ক্ষয় হ’য়ে গেছে। যে ব্রাহ্মণ

বিনা চিত্ত-পরিতাপে পরপুত্রধন

স্নেহবন্ধ হ’তে ছিঁড়ি করেছে বিনাশ

শাস্ত্রজ্ঞান-অভিমানে, তারি হেথা বাস

সমুচিত।

ঋত্বিক

যেয়াে না যেয়াে না তুমি চলে’

মহারাজ! সপশীর্ষ তীব্র ঈর্ষ্যানলে

আমারে ফেলিয়া রাখি যেয়াে না যেয়াে না

একাকী অমরলােকে। নূতন বেদনা

বাড়ায়াে না বেদনায় তীব্র দুর্ব্বিষহ,

সৃজিয়াে না দ্বিতীয় নরক। রহ রহ

মহারাজ, রহ হেথা।

সােমক

র’ব তব সহ

হে দুর্ভাগা! তুমি আমি মিলি অহরহ

করিব দারুণ হােম, সুদীর্ঘ যজন

বিরাট নরক-হুতাশনে। ভগবন্

যতকাল ঋত্বিকের আছে পাপভােগ

ততকাল তা’র সাথে কর মােরে যােগ-

নরকের সহবাসে দাও অনুমতি।

ধর্ম্ম

মহান্ গৌরবে হেথা রহ মহীপতি।

ভালের তিলক হােক্ দুঃসহ দহন,

নরকাগ্নি হােক তব স্বর্গ-সিংহাসন।

প্রেতগণ

জয় জয় মহারাজ, পুণ্যফলত্যাগী!

নিস্পাপ নরকবাসী! হে মহা বৈরাগী!

পাপীর অন্তরে কর গৌরব সঞ্চার

তব সহবাসে। কর নরক উদ্ধার।

বস’ আসি দীর্ঘ যুগ মহা শত্রু সনে

প্রিয়তম মিত্রসম এক দুঃশাসনে।

অতি উচ্চ বেদনার আগ্নেয় চূড়ায়

জ্বলন্ত মেঘের সাথে দীপ্ত সূর্য্যপ্রায়

দেখা যাবে তােমাদের যুগল মূরতি

নিত্যকাল উদ্ভাসিত অনির্ব্বাণ জ্যোতি।

৭ই অগ্রহায়ণ, ১৩০৪।

কথা ও কাহিনী · পণরক্ষা

পণরক্ষা

মারাঠা দস্যু আসিছে রে ঐ

কর কর সবে সাজ।—

আজমীর গড়ে কহিলা হাঁকিয়া

দুর্গেশ দুমরাজ।

বেলা দু-পহরে যে-যাহার ঘরে

সেঁকিছে জোয়ারী-রুটি,

দুর্গ-তোরণে নাকাড়া বাজিতে

বাহিরে আসিল ছুটি’।

প্রাকারে চড়িয়া দেখিল চাহিয়া

দক্ষিণে বহুদূরে

আকাশ জুড়িয়া উড়িয়াছে ধূলা

মারাঠি অশ্বখুরে।

মারাঠার যত পতঙ্গপাল

কৃপাণ-অনলে আজ

ঝাঁপ দিয়া পড়ি ফিরেনাকো যেন—

গর্জ্জিলা দুমরাজ।

মাড়োয়ার হ’তে দূত আসি বলে—

বৃথা এ সৈন্যসাজ।

হের এ প্রভুর আদেশপত্র,

দুর্গেশ দুমরাজ!

সিন্দে আসিছে, সঙ্গে তাহার

ফিরিঙ্গি সেনাপতি,—

সাদরে তাঁদের ছাড়িবে দুর্গ,

আজ্ঞা তোমার প্রতি।

বিজয়লক্ষ্মী হয়েছে বিমুখ

বিজয়সিংহ পরে;

বিনা সংগ্রামে আজমীর গড়

দিবে মারাঠার করে।—

প্রভুর আদেশে বীরের ধর্ম্মে

বিরোধ বাধিল আজ—

নিশ্বাস ফেলি কহিলা কাতরে

দুর্গেশ দুমরাজ।

মাড়োয়ার দূত করিল ঘোষণা

ছাড় ছাড় রণ-সাজ!

রহিল পাষাণ-মূরতি সমান

দুর্গেশ দুমরাজ।

বেলা যায়-যায়, ধূধূ করে মাঠ,

দূরে দূরে চরে ধেনু,

তরুতলছায়ে সকরুণ রবে।

বাজে রাখালের বেণু।

আজমীর গড় দিলা যবে মোরে

পণ করিলাম মনে

প্রভুর দুর্গ শত্রুর করে

ছাড়িব না এ জীবনে।

প্রভুর আদেশে সে সত্য হায়

ভাঙিতে হবে কি আজ?

এতেক ভাবিয়া ফেলে নিশ্বাস

দুর্গেশ দুমরাজ।

রাজপুত সেনা সরোষে সরমে

ছাড়িল সমর-সাজ

নীরবে দাঁড়ায়ে রহিল তোরণে

দুর্গেশ দুমরাজ।

গেরুয়া-বসনা সন্ধ্যা নামিল

পশ্চিম মাঠ পারে;

মারাঠা সৈন্য ধূল উড়াইয়া

থামিল দুর্গদ্বারে।

দুয়ারের কাছে কে ওই শয়ান,

ওঠ ওঠ খোল দ্বার!—

নাহি শোনে কেহ,—প্রাণহীন দেহ

সাড়া নাহি দিল আর।

প্রভুর কর্ম্মে বীরের ধর্ম্মে

বিরোধ মিটাতে আজ

দুর্গ দুয়ারে ত্যজিয়াছে প্রাণ

দুর্গেশ দুমরাজ।

অগ্রহায়ণ, ১৩০৬

কথা ও কাহিনী · পতিতা

পতিতা

ধন্য তোমারে হে রাজমন্ত্রী,

চরণপদ্মে নমস্কার।

লও ফিরে তব স্বর্ণমুদ্রা,

লও ফিরে তব পুরস্কার।

ঋষ্যশৃঙ্গ ঋষিরে ভুলাতে

পাঠাইলে বনে যে কয়জনা

সাজায়ে যতনে ভূষণে রতনে,—

আমি তারি এক বারাঙ্গনা।

দেবতা ঘুমালে আমাদের দিন,

দেবতা জাগিলে মোদের রাতি,

ধরার নরক-সিংহদুয়ারে

জ্বালাই আমরা সন্ধ্যাবাতি।

তুমি অমাত্য রাজ-সভাসদ

তোমার ব্যবসা ঘৃণ্যতর,

সিংহাসনের আড়ালে বসিয়া

মানুষের ফাঁদে মানুষ ধর।

আমি কি তোমার গুপ্ত অস্ত্র,

হৃদয় বলিয়া কিছু কি নেই?

ছেড়েছি ধরম, তা বলে’ ধরম

ছেড়েছে কি মোরে একেবারেই?

নাহিক করম, লজ্জা সরম,

জানিনে জনমে সতীর প্রথা,

তা বলে’ নারীর নারীত্বটুকু

ভুলে যাওয়া সে কি কথার কথা?

সে যে তপোবন, স্বচ্ছ পবন,

অদূরে সুনীল শৈলমালা,

কলগান করে পুণ্য তটিনী,

সে কি নগরীর নাট্যশালা?

মনে হ’ল সেথা অন্তর-গ্লানি

বুকের বাহিরে বাহিরি’ আসে।—

ওগো বনভূমি মোরে ঢাক তুমি

নবনির্ম্মল শ্যামল বাসে।

অয়ি উজ্জ্বল উদার আকাশ

লজ্জিত জনে করুণা করে’

তোমার সহজ অমলতাখানি।

শতপাকে ঘেরি পরাও মোরে।

স্থান আমাদের রুদ্ধ নিলয়ে

প্রদীপের পীত আলোক জ্বালা’,

যেথায় ব্যাকুল বদ্ধ বাতাস

ফেলে নিশ্বাস হুতাশ-ঢালা।

রতন নিকরে কিরণ ঠিকরে,

মুকুতা ঝলকে অলকপাশে,

মদির-শীকর-সিক্ত আকাশ

ঘন হ’য়ে যেন ঘেরিয়া আসে।

মোরা গাঁথা মালা প্রমোদ-রাতের,

গেলে প্রভাতের পুষ্পবনে

লাজে ম্লান হ’য়ে মরে’ ঝরে’ যাই,

মিশাবারে চাই মাটির সনে।

তবু তবু ওগো কুসুম-ভগিনী

এবার বুঝিতে পেরেছি মনে

ছিল ঢাকা সেই বনের গন্ধ

অগোচরে কোন্ প্রাণের কোণে

সেদিন নদীর নিকষে অরুণ

আঁকিল প্রথম সোনার লেখা;

স্নানের লাগিয়া তরুণ তাপস

নদীতীরে ধীরে দিলেন দেখা।

পিঙ্গল জটা ঝলিছে ললাটে

পূর্ব্ব অচলে উষার মত,

তনু দেহখানি জ্যোতির লতিকা

জড়িত স্নিগ্ধ তড়িৎ শত।

মনে হ’ল মাের নব-জনমের

উদয়শৈল উজল করি’

শিশির-ধৌত পরম প্রভাত

উদিল নবীন জীবন ভরি'।

তরুণীরা মিলি তরণী বাহিয়া

পঞ্চমসুরে ধরিল গান,

ঋষির কুমার মােহিত চকিত

মৃগশিশুসম পাতিল কান।

সহসা সকলে ঝাঁপ দিয়া জলে

মুনি-বালকেরে ফেলিয়া ফাঁদে

ভুজে ভুজে বাঁধি ঘিরিয়া ঘিরিয়া

নৃত্য করিল বিবিধ ছাঁদে।

নূপুরে নূপুরে দ্রুত তালে তালে

নদীজলতলে বাজিল শিলা,

ভগবান ভানু-রক্ত-নয়নে

হেরিলা নিলাজ নিঠুর লীলা।

প্রথমে চকিত দেবশিশু সম

চাহিলা কুমার কৌতুহলে,—

৪৩৩

কোথা হ’তে যেন অজানা আলােক

পড়িল তাঁহার পথের তলে।

দেখিতে দেখিতে ভক্তি-কিরণ

দীপ্তি সঁপিল শুভ্র ভালে,—

দেবতার কোন্ নূতন প্রকাশ

হেরিলেন আজি প্রভাতকালে।

বিমল বিশাল বিস্মিত চোখে

দুটি শুকতারা উঠিল ফুটি’,

বন্দনা-গান রচিলা কুমার

জোড় করি কর-কমল দুটি।

করুণ কিশাের কোকিল কণ্ঠে

সুধার উৎস পড়িল টুটে,

স্থির তপােবন শান্তি মগন

পাতায় পাতায় শিহরি উঠে।

যে গাথা গাহিল সে কখনাে আর

হয় নি রচিত নারীর তরে,

সে শুধু শুনেছে নির্ম্মলা ঊষা

নির্জ্জন গিরিশিখর পরে।

সে শুধু শুনেছে নীরব সন্ধ্যা

নীল নির্ব্বাক সিন্ধুতলে

শুনে গলে’ যায় আর্দ্র হৃদয়

শিশির শীতল অশ্রুজলে।

হাসিয়া উঠিল পিশাচীর দল

অঞ্চলতল অধরে চাপি।

ঈষৎ ত্রাসের তড়িৎ-চমক

ঋষির নয়নে উঠিল কাঁপি।

ব্যথিত চিত্তে ত্বরিত চরণে

করজোড়ে পাশে দাঁড়ানু আসি,

কহিনু,—হে মাের প্রভু তপােধন

চরণে আগত অধম দাসী।

তীরে ল’য়ে তাঁরে, সিক্ত অঙ্গ

মুছানু আপন পট্টবাসে।

জানু পাতি বসি যুগল চরণ

মুছিয়া লইনু এ কেশপাশে।

তা’র পরে মুখ তুলিয়া চাহিনু

ঊর্ধ্বমুখীন ফুলের মত,—

তাপস কুমার চাহিলা, আমার

মুখপানে করি বদন নত।

প্রথম-রমণী-দরশ-মুগ্ধ

সে দুটি সরল নয়ন হেরি

হৃদয়ে আমার নারীর মহিমা

বাজায়ে উঠিল বিজয়-ভেরী।

ধন্য রে আমি, ধন্য বিধাতা

সৃজেছ আমারে রমণী করি।

তাঁর দেহময় উঠে মাের জয়,

উঠে জয় তাঁর নয়ন ভরি।

জননীর স্নেহ রমণীর দয়া

কুমারীর নব নীরব প্রীতি

আমার হৃদয় বীণার-তন্ত্রে

বাজায়ে তুলিল মিলিত গীতি।

কহিলা কুমার চাহি মাের মুখে-

কোন্ দেব আজি আনিলে দিবা?

তােমার পরশ অমৃত-সরস,

তােমার নয়নে দিব্য বিভা।

হেসাে না মন্ত্রী হেসাে না হেসাে না,

ব্যথায় বিঁধো না ছুরির ধার

ধূলিলুণ্ঠিতা অবমানিতারে

অবমান তুমি কোরাে না আর।

মধুরাতে কত মুগ্ধহৃদয়

স্বর্গ মেনেছে এ দেহখানি,—

তখন শুনেছি বহু চাটুকথা,

শুনিনি এমন সত্যবাণী।

সত্য কথা এ, কহিনু আবার,

স্পর্দ্ধা আমার কভু এ নহে,—

ঋষির নয়ন মিথ্যা হেরে না,

ঋষির রসনা মিছে না কহে।

বৃদ্ধ, বিষয়-বিষ-জর্জ্জর,

হেরিছ বিশ্ব দ্বিধার ভাবে,

নগরীর ধূলি লেগেছে নয়নে,

আমারে কি তুমি দেখিতে পাবে?

আমিও দেবতা, ঋষির আঁখিতে

এনেছি বহিয়া নূতন দিবা,

অমৃত-সরস আমার পরশ,

আমার নয়নে দিব্য বিভা।

আমি শুধু নহি সেবার রমণী

মিটাতে তােমার লালসাক্ষুধা।

তুমি যদি দিতে পূজার অর্ঘ্য

আমি সঁপিতাম স্বর্গসুধা।

দেবতারে মাের কেহ ত চাহেনি,

নিয়ে গেল সবে মাটির ঢেলা,

দূর দুর্গম মনােবনবাসে

পাঠাইল তাঁরে করিয়া হেলা।

সেইখানে এল আমার তাপস,

সেই পথহীন বিজন গেহ,—

স্তব্ধ নীরব গহন গভীর

যেথা কোনােদিন আসেনি কেহ।

সাধকবিহীন একক দেবতা

ঘুমাতেছিলেন সাগরকূলে,—

ঋষির বালক পুলকে তাঁহারে

পূজিলা প্রথম পূজার ফুলে।

আনন্দে মাের দেবতা জাগিল,

জাগে আনন্দ ভকত-প্রাণে,

এ বারতা মাের দেবতা তাপস

দোঁহে ছাড়া আর কেহ না জানে।

কহিলা কুমার চাহি মাের মুখে

আনন্দময়ী মূরতি তুমি,

ফুটে আনন্দ বাহুতে তােমার,

ছুটে আনন্দ চরণ চুমি'।—

শুনি সে বচন, হেরি সে নয়ন,

দুই চোখে মাের ঝরিল বারি।

নিমেষে ধৌত নির্ম্মল রূপে

বাহিরিয়া এল কুমারী নারী।

বহুদিন মাের প্রমােদ-নিশীথে

যত শত দীপ জ্বলিয়াছিল

দূর হ’তে দূরে,—এক নিশ্বাসে

কে যেন সকলি নিয়ে দিল।

প্রভাত-অরুণ-ভা’য়ের মতন

সঁপি দিল কর আমার কেশে

আপনার করি নিল পলকেই

মােরে তপােবন-পবন এসে।

মিথ্যা তােমার জটিল বুদ্ধি,

বৃদ্ধ তােমার হাসিরে ধিক্‌!

চিত্ত তাহার আপনার কথা

আপন মর্ম্মে ফিরায়ে নিক।

তােমার পামরী পাপিনীর দল

তা’রাও অমনি হাসিল হাসি,—

আবেশে বিলাসে ছলনার পাশে

চারিদিক্‌ হ’তে ঘেরিল আসি।

বসনাঞ্চল লুটায় ভূতলে,

বেণী খসি পড়ে কবরী টুটি’

ফুল ছুঁড়ে ছুঁড়ে মারিল কুমারে

লীলায়িত করি হস্ত দুটি।

হে মাের অমল কিশাের তাপস

কোথায় তােমারে আড়ালে রাখি

আমার কাতর অন্তর দিয়ে

ঢাকিবারে চাই তােমার আঁখি।

হে মাের প্রভাত, তােমারে ঘেরিয়া

পারিতাম যদি, দিতাম টানি

ঊষার রক্ত মেঘের মতন

আমার দীপ্ত সরমখানি।

ও আহুতি তুমি নিয়াে না নিয়ে না

হে মাের অনল, তপের নিধি,

আমি হ’য়ে ছাই তােমারে লুকাই

এমন ক্ষমতা দিল না বিধি।

ধিক রমণীরে ধিক্‌ শতবার,

হতলাজ বিধি তােমারে ধিক।

রমণীজাতির ধিক্কার গানে

ধ্বনিয়া উঠিল সকল দিক্‌।

ব্যাকুল সরমে অসহ ব্যথায়

লুটায়ে ছিন্নালতিকাসমা

কহিনু তাপসে—পুণ্যচরিত,

পাতকিনীদের করিয়াে ক্ষমা।

আমারে ক্ষমিয়ো, আমারে ক্ষমিয়াে,

আমারে ক্ষমিয়াে করুণানিধি।—

হরিণীর মত ছুটে চলে’ এনু

সরমের শর মর্ম্মে বিঁধি।

কাঁদিয়া কহিনু কাতরকণ্ঠে

আমারে ক্ষমিয়াে পুণ্যরাশি।—

চপলভঙ্গে লুটায়ে রঙ্গে

পিশাচীরা পিছে উঠিল হাসি।

ফেলি দিল ফুল মাথায় আমার

তপােবন-তরু করুণা মানি,

দূর হ’তে কানে বাজিতে লাগিল

বাঁশির মতন মধুর বাণী,—

আনন্দময়ী মূরতি তােমার,

কোন্ দেব তুমি আনিলে দিবা?

অমৃতসরস তােমার পরশ,

তােমার নয়নে দিব্য বিভা।—

দেবতারে তুমি দেখেছ, তােমার

সরল নয়ন করেনি ভুল।

দাও মাের মাথে, নিয়ে যাই সাথে

তােমার হাতের পূজার ফুল।

তােমার পূজার গন্ধ আমার

মনােমন্দির ভরিয়া র’বে-

সেথায় দুয়ার রুধিনু এবার,

যতদিন বেঁচে রহিব ভবে।

মন্ত্রী, আবার সেই বাঁকা হাসি?

না হয় দেবতা আমাতে নাই-

মাটি দিয়ে তবু গড়ে ত প্রতিমা,

সাধকেরা পূজা করে ত তাই।

একদিন তা’র পূজা হ’য়ে গেলে

চিরদিন তার বিসর্জ্জন,

খেলার পুতলি করিয়া তাহারে

আর কি খেলিবে পৌরজন?

পূজা যদি মাের হ’য়ে থাকে শেষ

হ’য়ে গেছে শেষ আমার খেলা।

দেবতার লীলা করি সমাপন

জলে ঝাঁপ দিবে মাটির ঢেলা।

হাস হাস তুমি হে রাজমন্ত্রী

ল’য়ে আপনার অহঙ্কার-

ফিরে লও তব স্বর্ণমুদ্রা

ফিরে লও তব পুরস্কার।

বহু কথা বৃথা বলেছি তােমায়

তা লাগি হৃদয় ব্যথিছে মােরে।

অধম নারীর একটি বচন

রেখাে হে প্রাজ্ঞ স্মরণ করে’,

বুদ্ধির বলে সকলি বুঝেছ,

দুয়েকটি বাকি রয়েছে তবু,

দৈবে যাহারে সহসা বুঝায়

সে ছাড়া সে কেহ বােঝে না কভু।

৯ই কার্তিক, ১৩০৪

কথা ও কাহিনী · পরিশোধ

পরিশােধ

(মহাবস্তৃবদান)

রাজকোষ হ’তে চুরি! ধরে’ আন চোর,

নহিলে, নগরপাল, রক্ষা নাহি তাের,

মুণ্ড রহিবে না দেহে!—রাজার শাসনে

রক্ষিদল পথে পথে ভবনে ভবনে

চোর খুঁজে খুঁজে ফিরে। নগর বাহিরে

ছিল শুয়ে বজ্রসেন বিদীর্ণ মন্দিরে,

বিদেশী বণিক পান্থ তক্ষশিলাবাসী;

অশ্ব বেচিবার তরে এসেছিল কাশী,

দস্যুহস্তে খােয়াইয়া নিঃস্বরিক্ত শেষে

ফিরিয়া চলিতেছিল আপনার দেশে

নিরাশ্বাসে। তাহারে ধরিল চোর বলি’

হস্তে পদে বাঁধি তা’র লােহার শিকলি

লইয়া চলিল বন্দীশালে।

সেইক্ষণে

সুন্দরী-প্রধানা শ্যামা বসি বাতায়নে

প্রহর যাপিতেছিল আলস্যে কৌতুকে

পথের প্রবাহ হেরি’;—নয়নসম্মুখে

স্বপ্নসম লােকযাত্রা। সহসা শিহরি’

কাঁপিয়া কহিল শ্যামা,—“আহা মরি মরি

মহেন্দ্রনিন্দিত কান্তি উন্নতদর্শন

কারে বন্দী করে’ আনে চোরের মতন

কঠিন শৃঙ্খলে? শীঘ্র যা’লাে সহচরী

বল্‌গে নগরপালে মোর নাম করি-

শ্যামা ডাকিতেছে তা’রে; বন্দী সাথে ল’য়ে

একবার আসে যেন এ ক্ষুদ্র আলয়ে

দয়া করি।”-শ্যামার নামের মন্ত্রগুণে

উতলা নগররক্ষী আমন্ত্রণ শুনে

রােমাঞ্চিত; সত্বর পশিল গৃহমাঝে

পিছে বন্দী বজ্রসেন নতশির লাজে

আরক্ত কপােল। কহে রক্ষী হাস্যভরে—

“অতিশয় অসময়ে অভাজনপরে

অযাচিত অনুগ্রহ,—চলেছি সম্প্রতি

রাজকাজে,—সুদর্শনে, দেহ অনুমতি।”

বজ্রসেন তুলি শির সহসা কহিলা-

“একি লীলা, হে সুন্দরী, একি তব লীলা?

পথ হ’তে ঘরে আনি কিসের কৌতুকে

নির্দ্দোষী এ প্রবাসীর অবমানদুখে

করিতেছ অবমান?”-শুনি শ্যামা কহে,

“হায় গাে বিদেশী পান্থ কৌতুক এ নহে।

আমার অঙ্গেতে যত স্বর্ণ অলঙ্কার

সমস্ত সঁপিয়া দিয়া শৃঙ্খল তােমার

নিতে পারি নিজ দেহে; তব অপমানে

মোর অন্তরাত্মা আজি অপমান মানে।”

এত বলি সিক্তপক্ষ্ম দুটি চক্ষু দিয়া

সমস্ত লাঞ্ছনা যেন লইল মুছিয়া

বিদেশীর অঙ্গ হ’তে। কহিল রক্ষীরে

“আমার যা আছে ল’য়ে নির্দ্দোষী বন্দীরে

মুক্ত করে’ দিয়ে যাও।”—কহিল প্রহরী,

“তব অনুনয় আজি ঠেলিনু সুন্দরী

এত এ অসাধ্য কাজ। হৃত রাজকোষ,

বিনা কারাে প্রাণপাতে নৃপতির রােষ

শান্তি মানিবে না।” ধরি প্রহরীর হাত

কাতরে কহিল শ্যামা,—“শুধু দুটি রাত

বন্দীরে বাঁচায়ে রেখাে এ মিনতি করি!”

“রাখিব তােমার কথা,”—কহিল প্রহরী।

দ্বিতীয় রাত্রির শেষে খুলি বন্দীশালা

রমণী পশিল কক্ষে, হাতে দীপ জ্বালা’,

লােহার শৃঙ্খলে বাঁধা যেথা বজ্রসেন—

মৃত্যুর প্রভাত চেয়ে মৌনী জপিছেন

ইষ্টনাম। রমণীর কটাক্ষ-ইঙ্গিতে

রক্ষী আসি খুলি দিল শৃঙ্খল চকিতে।

বিস্ময়-বিহ্বল নেত্রে বন্দী নিরখিল

সেই শুভ্র সুকোমল কমল-উন্মীল

অপরূপ মুখ। কহিল গদগদ স্বরে-

“বিকারের বিভীষিকারজনীর পরে

করধৃত শুকতারা শুভ্রউষাসম

কে তুমি উদিলে আসি কারাকক্ষে মম-

মুমূর্ষর প্রাণরূপা, মুক্তিরূপা অয়ি

নিষ্ঠুর নগরী মাঝে লক্ষী দয়াময়ী।”-

“আমি দয়াময়ী!” রমণীর উচ্চহাসে

চকিতে উঠিল জাগি নব ভয়ত্রাসে

ভয়ঙ্কর কারাগার। হাসিতে হাসিতে

উন্মত্ত উৎকট হাস্য শােকাশ্রুরাশিতে

শতধা পড়িল ভাঙি। কাঁদিয়া কহিলা-

“এ পুরীর পথমাঝে যত আছে শিলা

কঠিন শ্যামার মত কেহ নাহি আর।”-

এত বলি দৃঢ়বলে ধরি হস্ত তা’র

বজ্রসেনে ল’য়ে গেল কারার বাহিরে।

তখন জাগিছে ঊষা বরুণার তীরে,

পূর্ব্ব বনান্তরে। ঘাটে বাঁধা আছে তরী।

“হে বিদেশী এস এস” কহিল সুন্দরী

দাঁড়ায়ে নৌকার পরে—“হে আমার প্রিয়

শুধু এই কথা মাের স্মরণে রাখিয়াে-

তােমা সাথে এক স্রোতে ভাসিলাম আমি

সকল বন্ধন টুটি’ হে হৃদয়স্বামী

জীবনমরণপ্রভু।”—নৌকা দিল খুলি।

দুই তীরে বনে বনে গাহে পাখীগুলি

আনন্দ-উৎসব গান। প্রেয়সীর মুখ

দুই বাহু দিয়া তুলি ভরি নিজ বুক

বজ্রসেন শুধাইল-“কহ মােরে প্রিয়ে,

আমারে করেছ মুক্ত কি সম্পদ দিয়ে?

সম্পূর্ণ জানিতে চাহি অয়ি বিদেশিনী

এ দীন দরিদ্রজন তব কাছে ঋণী

কত ঋণে?”-আলিঙ্গন ঘনতর করি

“সে কথা এখন নহে” কহিল সুন্দরী।

নৌকা ভেসে চলে’ যায় পূর্ণ বায়ুভরে

তূর্ণ স্রোতােবেগে। মধ্য গগনের পরে

উদিল প্রচণ্ড সূর্য্য। গ্রামবধুগণ

গৃহে ফিরে গেছে করি স্নানসমাপন

সিক্তবস্ত্রে, কাংস্যঘটে ল’য়ে গঙ্গাজল।

ভেঙে গেছে প্রভাতের হাট; কোলাহল

থেমে গেছে দুই তীরে; জনপদ-বাট

পান্থহীন। বটতলে পাষাণের ঘাট,

সেথায় বাঁধিল নৌকা স্নানাহারতরে

কর্ণধার। বনচ্ছায়া স্তব্ধ শব্দহীন;

অলস পতঙ্গ শুধু গুঞ্জে দীর্ঘ দিন,

পক্কশস্যগন্ধহরা মধ্যাহ্নের বায়ে

শ্যামার ঘােমটা যবে ফেলিল খসায়ে

অকস্মাৎ,—পরিপূর্ণ প্রণয়পীড়ায়

ব্যথিত ব্যাকুল বক্ষ-কণ্ঠরুদ্ধপ্রায়

বজ্রসেন কানে কানে কহিল শ্যামারে—

“ক্ষণিক শৃঙ্খলমুক্ত করিয়া আমারে

বাঁধিয়াছ অনন্ত শৃঙ্খলে। কি করিয়া

সাধিলে দুঃসাধ্য ব্রত কহ বিবরিয়া।

মাের লাগি কি করেছ জানি যদি প্রিয়ে

পরিশােধ দিব তাহা এ জীবন দিয়ে

এই মাের পণ।”—বস্ত্র টানি মুখপরি

“সে কথা এখনাে নহে”—কহিল সুন্দরী।

গুটায়ে সােনার পাল সুদূরে নীরবে

দিনের আলােকতরী চলি গেল যবে

অস্তঅচলের ঘাটে,—তীর-উপবনে

লাগিল শ্যামার নৌকা সন্ধ্যার পবনে।

শুক্ল চতুর্থীর চন্দ্র অস্তগত প্রায়,—

নিস্তরঙ্গ শান্ত জলে সুদীর্ঘ রেখায়

ঝিকিমিকি করে ক্ষীণ আলাে; ঝিল্লিম্বনে

তরুমূল-অন্ধকার কাঁপিছে সঘনে

বীণার তন্ত্রীর মত। প্রদীপ নিবায়ে

তরীবাতায়নতলে দক্ষিণের বায়ে

ঘন-নিশ্বসিত মুখে যুবকের কাঁধে

হেলিয়া বসেছে শ্যামা; পড়েছে অবাধে

উন্মুক্ত সুগন্ধ কেশরাশি, সুকোমল

তরঙ্গিত তমােজালে ছেয়ে বক্ষতল

বিদেশীর—সুনিবিড় তন্দ্রাজালসম।

কহিল অস্ফুটকণ্ঠে শ্যামা,—“প্রিয়তম,

তােমা লাগি যা করেছি কঠিন সে কাজ

সুকঠিন—তারাে চেয়ে সুকঠিন আজ

সে কথা তােমারে বলা। সংক্ষেপে সে কব

একবার শুনে মাত্র মন হ’তে তব

সে কাহিনী মুছে ফেলাে।

বালক কিশাের

উত্তীয় তাহার নাম, ব্যর্থ প্রেমে মাের

উন্মত্ত অধীর। সে আমার অনুনয়ে

তব চুরিঅপবাদ নিজস্কন্ধে ল’য়ে

দিয়েছে আপন প্রাণ। এ জীবনে মম

সর্ব্বাধিক পাপ মাের, ওগাে সর্ব্বোত্তম,

৩৫৩

করেছি তােমার লাগি এ মাের গৌরব।—

ক্ষীণ চন্দ্র অস্ত গেল-অরণ্য নীরব

শত শত বিহঙ্গের সুপ্তি বহি শিরে

দাঁড়ায়ে রহিল স্তব্ধ। অতি ধীরে ধীরে

রমণীর কটি হ’তে প্রিয়বাহুডাের

শিথিল পড়িল খসে’; বিচ্ছেদ কঠোর

নিঃশব্দে বসিল দোঁহা মাঝে; বাক্যহীন

বজ্রসেন চেয়ে রহে আড়ষ্ট কঠিন

পাষাণপুত্তলি; মাথা রাখি তা’র পায়ে

ছিন্নলতাসম শ্যামা পড়িল লুটায়ে

আলিঙ্গনচ্যুতা; মসীকৃষ্ণ নদীনীরে

তীরের তিমিরপুঞ্জ ঘনাইল ধীরে।

সহসা যুবার জানু সবলে বাঁধিয়া

বাহুপাশে—আর্ত্তনারী উঠিল কাঁদিয়া

অশ্রুহারা শুষ্ককণ্ঠে—“ক্ষমা কর নাথ,

এ পাপের যাহা দণ্ড সে অভিসম্পাত

হােক বিধাতার হাতে নিদারুণতর-

তােমা লাগি যা করেছি তুমি ক্ষমা কর।”

চরণ কাড়িয়া ল’য়ে চাহি তা’র পানে

বজ্রসেন বলি উঠে—“আমার এ প্রাণে

তােমার কি কাজ ছিল! এ জন্মের লাগি

তাের পাপ-মূল্যে কেনা মহাপাপভাগী

এ জীবন করিলি ধিক্কৃত। কলঙ্কিনী,

ধিক্ এ নিশ্বাস মাের তাের কাছে ঋণী!

ধিক্ এ নিমেষপাত প্রত্যেক নিমেষে!”

এত বলি উঠিল সবলে। নিরুদ্দেশে

নৌকা ছাড়ি চলি গেলা তীরে—অন্ধকারে

বনমাঝে। শুষ্কপত্ররাশি পদভারে

শব্দ করি বনানীরে করিল চকিত

প্রতিক্ষণে; ঘন গুল্মগন্ধ পুঞ্জীকৃত

বায়ুশূন্য বনতলে; তরুকাণ্ডগুলি

চারিদিকে আঁকাবাঁকা নানা শাখা তুলি

অন্ধকারে ধরিয়াছে অসংখ্য আকার

বিকৃত বিরূপ; রুদ্ধ হ’ল চারিধার;

নিস্তব্ধ নিষেধসম প্রসারিল কর

লতাশৃঙ্খলিত বন। শ্রান্তকলেবর

পথিক বসিল ভূমে। কে তা’র পশ্চাতে

দাঁড়াইল উপচ্ছায়াসম! সাথে সাথে

অন্ধকারে পদে পদে তা’রে অনুসরি

আসিয়াছে দীর্ঘ পথ মৌনী অনুচরী

রক্তসিক্ত পদে। দুই মুষ্টি বদ্ধ করে’

গর্জ্জিল পথিক—“তবু ছাড়িবি না মােরে!”

রমণী বিদ্যুৎবেগে ছুটিয়া পড়িয়া

বন্যার তরঙ্গসম দিল আবরিয়া

আলিঙ্গনে কেশপাশে স্রস্ত বেশবাসে

আঘ্রাণে চুম্বনে স্পর্শে সঘন নিশ্বাসে

সর্ব্ব অঙ্গ তা’র; আর্দ্র গদগদ-বচনা

কণ্ঠরুদ্ধপ্রায়;—“ছাড়িব না ছাড়িব না”

কহে বারম্বার; “তােমা লাগি পাপ নাথ,

তুমি শাস্তি দাও মােরে, কর মর্ম্ম-ঘাত,

শেষ করে দাও মাের দণ্ড পুরস্কার।”-

অরণ্যের গ্রহতারাহীন অন্ধকার

অন্ধভাবে কি যেন করিল অনুভব

বিভীষিকা। লক্ষ লক্ষ তরুমূলসব

মাটির ভিতরে থাকি শিহরিল ত্রাসে।

বারেক ধ্বনিল রুদ্ধ নিষ্পেষিত শ্বাসে

অন্তিম কাকুতি স্বর,—তারি পরক্ষণে

কে পড়িল ভূমিপরে অসাড় পতনে।

বসেন বন হ’তে ফিরিল যখন

প্রথম উষায় ঝলে বিদ্যুৎ বরণ

মন্দির-ত্রিশূল-চূড়া জাহ্নবীর পারে

জনহীন বালুতটে নদী ধারে ধারে

কাটাইল দীর্ঘ দিন ক্ষিপ্তের মতন

উদাসীন। মধ্যাহ্নের জ্বলন্ত তপন

হানিল সর্ব্বাঙ্গে তা’র অগ্নিময়ী কশা।

ঘটকক্ষে গ্রামবধূ হেরি তা’র দশা

কহিল করুণ কণ্ঠে—“কে গাে গৃহছাড়া

এস আমাদের ঘরে!” দিল না সে সাড়া

তৃষায় ফাটিল ছাতি,—তবু স্পর্শিল না

সম্মুখের নদী হ’তে জল এক কণা।

দিনশেষে জ্বরতপ্ত দগ্ধ কলেবরে

ছুটিয়া পশিল গিয়া তরণীর পরে

পতঙ্গ যেমন বেগে অগ্নি দেখে ধায়

উগ্র আগ্রহের ভরে। হেরিল শয্যায়

একটি নূপুর আছে পড়ি। শতবার

রাখিল বক্ষেতে চাপি। ঝঙ্কার তাহার

শতমুখ শরসম লাগিল বর্ষিতে

হৃদয়ের মাঝে। ছিল পড়ি একভিতে

নীলাম্বর বস্ত্রখানি,—রাশীকৃত করি

তারি পরে মুখ রাখি রহিল সে পড়ি-

সুকুমার দেহগন্ধ নিশ্বাসে নিঃশেষে

লইল শােষণ করি অতৃপ্ত আবেশে।

শুক্ল পঞ্চমীর শশী অস্তাচলগামী

সপ্তপর্ণ তরুশিরে পড়িয়াছে নামি’

শাখাঅন্তরালে। দুই বাহু প্রসারিয়া

ডাকিতেছে বজ্রসেন—“এস এস প্রিয়া”—

চাহি অরণ্যের পানে। হেনকালে তীরে

বালুতটে ঘনকৃষ্ণ বনের তিমিরে

কার মূর্ত্তি দেখা দিল উপচ্ছায়াসম-

“এস এস প্রিয়া!” “আসিয়াছি প্রিয়তম!”

চরণে পড়িল শ্যামা—“ক্ষম মোরে ক্ষম!

গেল না ত সুকঠিন এ পরাণ মম

তােমার করুণ করে।” শুধু ক্ষণতরে

বজসেন তাকাইল তা’র মুখপরে,—

ক্ষণতরে আলিঙ্গনলাগি বাহু মেলি,

চমকি উঠিল,—তা’রে দূরে দিল ঠেলি,

গরজিল-“কেন এলি, কেন ফিরে এলি!”

বক্ষ হতে নূপুর লইয়া -দিল ফেলি

জ্বলন্ত অঙ্গারসম-নীলাম্বরখানি

চরণের কাছ হ’তে ফেলে দিল টানি;

শয্যা যেন অগ্নিশয্যা, পদতলে থাকি

লাগিল দহিতে তা’রে; মুদি দুই আঁখি

কহিল ফিরায়ে মুখ—“যাও যাও ফিরে

মােরে ছেড়ে চলে’ যাও!” নারী নতশিরে

ক্ষণতরে রহিল নীরবে। পরক্ষণে

ভূতলে রাখিয়া জানু যুবার চরণে

প্রণমিল-তা’র পরে নামি নদীতীরে

আঁধার বনের পথে চলি গেল ধীরে—

নিদ্রাভঙ্গে ক্ষণিকের অপূর্ব্ব স্বপন

নিশার তিমির মাঝে মিলায় যেমন।

২৩শে আশ্বিন, ১৩০৬।

কথা ও কাহিনী · পূজারিণী

পূজারিণী

( অবদানশতক)

নৃপতি বিম্বিসার

নমিয়া বুদ্ধে মাগিয়া লইলা

পাদ-নখ-কণা তাঁর।

স্থাপিয়া নিভৃত প্রাসাদ-কাননে

তাহারি উপরে রচিলা যতনে

অতি অপরূপ শিলাময় স্তূপ

শিল্পশােভার সার।

সন্ধ্যাবেলায় শুচিবাস পরি

রাজবধূ রাজবালা

আসিতেন, ফুল সাজায়ে ডালায়,

স্তূপপদমূলে সােনার থালায়

আপনার হাতে দিতেন জ্বালায়ে

কনকপ্রদীপমালা।

অজাতশত্রু রাজা হ’ল যবে,

পিতার আসনে আসি

পিতার ধর্ম্ম শােণিতের স্রোতে

মুছিয়া ফেলিল রাজপুরী হ’তে,

৩৩৭

সঁপিল যজ্ঞ-অনল-আলােতে

বৌদ্ধ-শাস্ত্ররাশি।

কহিলা ডাকিয়া অজাতশত্রু

রাজপুরনারী সবে,—

“বেদ ব্রাহ্মণ রাজা ছাড়া আর

কিছু নাই ভবে পূজা করিবার

এই ক’টি কথা জেনাে মনে সার-

ভুলিলে বিপদ হবে।”

সেদিন শারদ-দিবা-অবসান,—

শ্রীমতী নামে সে দাসী

পুণ্যশীতল সলিলে নাহিয়া

পুষ্পপ্রদীপ থালায় বাহিয়া

রাজমহিষীর চরণে চাহিয়া

নীরবে দাঁড়াল আসি।

শিহরি সভয়ে মহিষী কহিলা-

“এ কথা নাহি কি মনে

অজাতশত্রু করেছে রটনা-

স্তূপে যে করিবে অর্ঘ্যরচনা

“শূলের উপরে মরিবে সে জনা

অথবা নির্ব্বাসনে।”

সেথা হ’তে ফিরি গেল চলি ধীরি

বধূ অমিতার ঘরে।

সমুখে রাখিয়া স্বর্ণ-মুকুর

বাঁধিতেছিল সে দীর্ঘ চিকুর

আঁকিতেছিল সে যত্নে সিঁদুর

সিঁথির সীমার পরে।

শ্রীমতীরে হেরি বাঁকি গেল রেখা

কাঁপি গেল তা’র হাত,—

কহিল, “অবােধ, কি সাহস-বলে

এনেছিস্ পূজা, এখনি যা চলে’,

কে কোথা দেখিবে, ঘটিবে তাহ’লে

বিষম বিপদপাত।”

অস্ত-রবির রশ্মি-আভায়

খােলা জানালার ধারে

কুমারী শুক্লা বসি একাকিনী

পড়িতে নিরত কাব্য-কাহিনী,

চমকি উঠিল শুনি কিঙ্কিণী

চাহিয়া দেখিল দ্বারে।

শ্রীমতীরে হেরি পুঁথি রাখি ভূমে

দ্রুতপদে গেল কাছে।

কহে সাবধানে তা’র কানে কানে

“রাজার আদেশ আজি কে না জানে,

এমনি করে’ কি মরণের পানে

ছুটিয়া চলিতে আছে?”

দ্বার হ’তে দ্বারে ফিরিল শ্রীমতী

লইয়া অর্ঘ্যথালি।

“হে পুরবাসিনী” সবে ডাকি কয়,—

“হয়েছে প্রভুর পূজার সময়”-

শুনি ঘরে ঘরে কেহ পায় ভয়

কেহ দেয় তা’রে গালি।

দিবসের শেষ আলােক মিলাল

নগর-সৌধপরে।

পথ জনহীন আঁধারে বিলীন,

কলকোলাহল হ’য়ে এল ক্ষীণ,

আরতিঘণ্টা ধ্বনিল প্রাচীন

রাজ-দেবালয় ঘরে।

শারদ নিশির স্বচ্ছ তিমিরে

জ্বলে অগণ্য তারা।

সিংহদুয়ারে বাজিল বিষাণ,

বন্দীরা ধরে সন্ধ্যার তান,

“মন্ত্রণসভা হ’ল সমাধান"

দ্বারী ফুকারিয়া বলে।

এমন সময়ে হেরিলা চমকি

প্রাসাদে প্রহরী যত-

রাজার বিজন কানন মাঝারে

স্তূপপদমূলে গহন আঁধারে

জ্বলিতেছে কেন, যেন সারে সারে

প্রদীপমালার মত।

মুক্তকৃপাণে পুররক্ষক।

তখনি ছুটিয়া আসি

শুধাল—“কে তুই ওরে দুর্ম্মতি,

মরিবার তরে করিস্ আরতি?”

মধুর কণ্ঠে শুনিল “শ্রীমতী

আমি বুদ্ধের দাসী।”

সেদিন শুভ্র পাষাণ-ফলকে

পড়িল রক্ত-লিখা।

সেদিন শারদ স্বচ্ছ নিশীথে

প্রাসাদ-কাননে নীরবে নিভৃতে

পপদমূলে নিবিল চকিতে

শেষ আরতির শিখা।

১৮ই আশ্বিন, ১৩০৬।

কথা ও কাহিনী · প্রতিনিধি

প্রতিনিধি

বসিয়া প্রভাতকালে সেতারার দুর্গভালে

শিবাজি হেরিলা একদিন—

রামদাস গুরু তাঁর ভিক্ষা মাগি দ্বার দ্বার

ফিরিছেন যেন অন্নহীন।

ভাবিলা, —এ কি এ কাণ্ড, গুরুজির ভিক্ষাভাণ্ড

ঘরে যাঁর নাই দৈন্য লেশ?

সবই যাঁর হস্তগত রাজ্যেশ্বর পদানত

তাঁরো নাই বাসনার শেষ?

এ কেবল দিনে রাত্রে জল ঢেলে ফুটা পাত্রে

বৃথা চেষ্টা তৃষ্ণা মিটাবারে;

কহিলা, দেখিতে হবে কতখানি দিলে তবে

ভিক্ষা বুলি ভরে একেবারে।

তখনি লেখনী আনি কি লিখি দিলা কি জানি

বালাজিরে কহিলা ডাকায়ে

গুরু যবে ভিক্ষা আশে আসিবেন দুর্গ-পাশে

এই লিপি দিয়ে তাঁর পায়ে।

গুরু চলেছেন গেয়ে, সম্মুখে চলেছে ধেয়ে

কত পান্থ, কত অশ্বরথ। —

“হে ভবেশ, হে শঙ্কর, সবারে দিয়েছ ঘর,

আমারে দিয়েছ শুধু পথ।

অন্নপূর্ণা মা আমার লয়েছে বিশ্বের ভার,

সুখে আছে সর্ব্ব চরাচর,

মোরে তুমি হে ভিখারী মা’র কাছ হ’তে কাড়ি

করেছ আপন অনুচর।”

সমাপন করি গান সারিয়া মধ্যাহ্নস্নান

দুর্গদ্বারে আসিলা যখন—

বালাজি নমিয়া তাঁরে দাঁড়াইল একধারে

পদমূলে রাখিয়া লিখন।

গুরু কৌতুহলভরে তুলিয়া লইলা করে,

পড়িয়া দেখিলা পত্রখানি

বন্দি তাঁর পাদপদ্ম শিবাজি সঁপিছে অদ্য

তাঁরে নিজ রাজ্য-রাজধানী।

পর দিনে রামদাস গেলেন রাজার পাশ,

কহিলেন, “পুত্র কহ শুনি

রাজ্য যদি মোরে দেবে কি কাজে লাগিবে এবে

কোন্ গুণ আছে তব, গুণী?”

“তােমারি দাসত্বে প্রাণ। আনন্দে করিব দান”

শিবাজি কহিলা নমি তাঁরে,—

গুরু কহে-“এই ঝুলি লহ তবে স্কন্ধে তুলি

চল আজি ভিক্ষা করিবারে।”

শিবাজি গুরুর সাথে ভিক্ষাপাত্র ল’য়ে হাতে

ফিরিলেন পুরদ্বারে দ্বারে।

নৃপে হেরি ছেলে মেয়ে ভয়ে ঘরে যায় ধেয়ে

ডেকে আনে পিতারে মাতারে।

অতুল ঐশ্বর্য্যে রত তাঁর ভিখারীর ব্রত,

এ যে দেখি জলে ভাসে শিলা!

ভিক্ষা দেয় লজ্জাভরে, হস্ত কাঁপে থরথরে,

ভাবে, ইহা মহতের লীলা।

দুর্গে দ্বিপ্রহর বাজে, ক্ষান্ত দিয়া কর্ম্মকাজে

বিশ্রাম করিছে পুরবাসী।

একতারে দিয়ে তান রামদাস গাহে গান

আনন্দনয়নজলে ভাসি;—

“ওহে ত্রিভুবনপতি বুঝি না তােমার মতি

কিছু ত অভাব তব নাহি,

হৃদয়ে হৃদয়ে তবু ভিক্ষা মাগি ফির প্রভু

সবার সর্ব্বস্বধন চাহি।”

অবশেষে দিবসান্তে নগরের একপ্রান্তে

নদীকূলে সন্ধ্যাস্নান সারি—

ভিক্ষা-অন্ন রাঁধি সুখে গুরু কিছু দিলা মুখে

প্রসাদ পাইল শিষ্য তাঁরি।

রাজা তবে কহে হাসি “নৃপতির গর্ব্ব নাশি

করিয়াছ পথের ভিক্ষুক;

প্রস্তুত রয়েছে দাস,— আরাে কিবা অভিলাষ,

গুরু কাছে ল’ব গুরু দুখ।”

গুরু কহে “তবে শােন্, করিলি কঠিন পণ

অনুরূপ নিতে হবে ভার,

এই আমি দিনু ক’য়ে মাের নামে মাের হ’য়ে

রাজ্য তুমি লহ পুনর্ব্বার।

তােমারে করিল বিধি ভিক্ষুকের প্রতিনিধি,

রাজ্যেশ্বর দীন উদাসীন;

পালিবে যে রাজধর্ম্ম জেনাে তাহা মাের কর্ম্ম,

রাজ্য ল’য়ে র’বে রাজ্যহীন।—

“বৎস, তবে এই লহ মাের আশীর্ব্বাদসহ

আমার গেরুয়া গাত্রবাস;

বৈরাগীর উত্তরীয় পতাকা করিয়া নিয়াে”

কহিলেন গুরু রামদাস।

৩২১

নৃপশিষ্য নতশিরে বসি রহে নদীতীরে,

চিন্তারাশি ঘনায় ললাটে।

থামিল রাখাল-বেণু, গােঠে ফিরে গেল ধেনু

পরপারে সূর্য্য গেল পাটে।

পূরবীতে ধরি তান একমনে রচি গান

গাহিতে লাগিলা রামদাস,—

“আমারে রাজার সাজে বসায়ে সংসার মাঝে

কে তুমি আড়ালে কর বাস?

হে রাজা রেখেছি আনি তােমারি পাদুকাখানি

আমি থাকি পাদপীঠতলে;

সন্ধ্যা হ’য়ে এল ওই, আর কত বসে’ রই

তব রাজ্যে তুমি এস চলে।”*

৬ই কার্তিক, ১৩০৪

*অ্যাওয়ার্থ সাহেব কয়েকটি মারাঠী গাথার যে ইংরাজি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশ করিয়াছিলেন, তাহারই ভুমিকা হইতে বর্ণিত ঘটনা গৃহীত। শিবাজির গেরুয়া পতাকা “তাগোয়া জেন্দা” নামে খ্যাত।

কথা ও কাহিনী · প্রার্থনাতীত দান

প্রার্থনাতীত দান

পাঠানেরা যবে বাঁধিয়া আনিল

বন্দী শিখের দল-

সুহিগঞ্জে রক্ত-বরণ

হইল ধরণীতল।

নবাব কহিল,—শুন তরুসিং

তােমারে ক্ষমিতে চাই।

তরুসিং কহে, মােরে কেন তব

এত অবহেলা ভাই?

নবাব কহিল, মহাবীর তুমি

তােমারে না করি ক্রোধ,

বেণীটি কাটিয়া দিয়ে যাও মােরে

এই শুধু অনুরােধ।

তরুসিং কহে, করুণা তােমার

হৃদয়ে রহিল গাঁথা-

যা চেয়েছ তা’র কিছু বেশি দিব

বেণীর সঙ্গে মাথা।

২র কার্তিক, ১৩০৬

শিখের পক্ষে বেণীচ্ছেদন ধর্ম্ম পরিত্যাগের ন্যায় দূষণীয়।

কথা ও কাহিনী · বন্দী বীর

বন্দীবীর

পঞ্চ নদীর তীরে

বেণী পাকাইয়া শিরে

দেখিতে দেখিতে গুরুর মন্ত্রে

জাগিয়া উঠেছে শিখ-

নির্ম্মম নির্ভীক।

হাজার কণ্ঠে গুরুজীর জয়

ধ্বনিয়া তুলেছে দিক।

নূতন জাগিয়া শিখ,

নূতন ঊষার সূর্য্যের পানে

চাহিল নির্ণিমিখ।

অলখ নিরঞ্জন-

মহারব উঠে বন্ধন টুটে

করে ভয়-ভঞ্জন।

বক্ষের পাশে ঘন উল্লাসে

অসি বাজে ঝঞ্ঝন্।

পাঞ্জাব আজি গরজি উঠিল

অলখ নিরঞ্জন।

এসেছে সে এক দিন

লক্ষ পরাণে শঙ্কা না জানে

না রাখে কাহারাে ঋণ।

জীবন মৃত্যু পায়ের ভৃত্য,

চিত্ত ভাবনাহীন।

পঞ্চ নদীর ঘিরি দশতীর

এসেছে সে একদিন।

দিল্লী-প্রাসাদ-কূটে

হােথা বারবার বাদশাজাদার

তন্দ্রা যেতেছে ছুটে।

কাদের কণ্ঠে গগন মন্থে,

নিবিড় নিশীথ টুটে,

কাদের মশালে আকাশের ভালে

আগুন উঠেছে ফুটে?

পঞ্চ নদীর তীরে

ভক্ত দেহের রক্তলহরী

মুক্ত হইল কিরে?

লক্ষ বক্ষ চিরে

ঝাঁকে ঝাঁকে প্রাণ পক্ষীসমান

ছুটে যেন নিজ নীড়ে।

বীরগণ জননীরে

রক্ত-তিলক ললাটে পরাল

পঞ্চ নদীর তীরে।

মােগল শিখের রণে

মরণ-আলিঙ্গনে

কণ্ঠ পাকড়ি ধরিল আঁকড়ি

দুই জনা দুই জনে।

দংশন-ক্ষত শ্যেন বিহঙ্গ

যুঝে ভুজঙ্গ সনে।

সেদিন কঠিন রণে

জয় গুরুজীর-হাঁকে শিখবীর

সুগভীর নিঃস্বনে।

মত্ত মােগল রক্তপাগল

দীন্ দীন্ গরজনে।

গুরুদাসপুর গড়ে

বন্দা যখন বন্দী হইল

তুরাণী সেনার করে

সিংহের মত শৃঙ্খলগত

বাঁধি ল’য়ে গেল ধরে

নগর পরে।

বন্দা সমরে বন্দী হইল

গুরুদাসপুর গড়ে।

সম্মুখে চলে মােগল সৈন্য

উড়ায়ে পথের ধূলি,

ছিন্ন শিখের মুণ্ড লইয়া

বর্ষাফলকে তুলি।

শিখ সাত শত চলে পশ্চাতে

বাজে শৃঙ্খলগুলি।

রাজপথ পরে লোক নাহি ধরে

বাতায়ন যায় খুলি।

শিখ গরজয় গুরুজীর জয়

পরাণের ভয় ভুলি'।

মােগলে ও শিখে উড়াল আজিকে

দিল্লী-পথের ধূলি।

পড়ি গেল কাড়াকাড়ি,

আগে কেবা প্রাণ করিবেক দান

তারি লাগি তাড়াতাড়ি।

দিন গেলে প্রাতে ঘাতকের হাতে,

বন্দীরা সারি সারি

জয় গুরুজীর-কহি শত বীর

শত শির দেয় ডারি

সপ্তাহকালে সাত শত প্রাণ

নিঃশষ হ’য়ে গেলে

বন্দার কোলে কাজি দিল তুলি

বন্দার এক ছেলে;

কহিল, ইহারে বধিতে হইবে

নিজ হাতে অবহেলে।—

দিল তা’র কোলে ফেলে-

কিশাের কুমার বাঁধা বাহু তা’র

বন্দার এক ছেলে।

কিছু না কহিল বাণী,

বন্দা সুধীরে ছােট ছেলেটিরে

লইল বক্ষে টানি।

ক্ষণকালতরে মাথার উপরে

রাখে দক্ষিণপাণি,

শুধু একবার চুম্বিল তা’র

রাঙা উষ্ণীষখানি।

তা’র পরে ধীরে কটিবাস হ’তে

ছুরিকা খসায়ে আনি-

বালকের মুখ চাহি

গুরুজীর জয়-কানে কানে কয়-

রে পুত্র, ভয় নাহি!

নবীন বদনে অভয় কিরণ

জ্বলি উঠে উৎসাহি’—

কিশােরকণ্ঠে কাঁপে সভাতল

বালক উঠিল গাহি-

গুরুজীর জয়, কিছু নাহি ভয়-

বন্দার মুখ চাহি।

বন্দা তখন বামবাহুপাশ

জড়াইল তা’র গলে,—

দক্ষিণ করে ছেলের বক্ষে

ছুরি বসাইল বলে-

গুরুজীর জয় কহিয়া বালক

লুটাল ধরণীতলে।

সভা হ’ল নিস্তব্ধ।

বন্দার দেহ ছিঁড়িল ঘাতক

সাঁড়াশি করিয়া দগ্ধ।

স্থির হ’য়ে বীর মরিল, না করি

একটি কাতর শব্দ।

দর্শকজন মুদিল নয়ন,

সভা হ’ল নিস্তব্ধ।

৩০শে আশ্বিন, ১৩০৬

কথা ও কাহিনী · বিচারক

বিচারক

পুণ্য নগরে রঘুনাথ রাও

পেশোয়া নৃপতি বংশ;—

রাজাসনে উঠি কহিলেন বীর—

হরণ করিব ভার পৃথিবীর,

মৈসুরপতি হৈদরালির

দর্প করিব ধ্বংস।

দেখিতে দেখিতে পূরিয়া উঠিল

সেনানী আশি সহস্র।

নানা দিকে দিকে নানা পথে পথে

মারাঠার যত গিরিদরী হ’তে

বীরগণ যেন শ্রাবণের স্রোতে

ছুটিয়া আসে অজস্র।

উড়িল গগনে বিজয়পতাকা

ধ্বনিল শতেক শঙ্খ।

হুলুরব করে অঙ্গন সবে,

পুণ্য নগরী কাঁপিল গরবে,

রহিয়া রহিয়া প্রলয় আরবে

বাজে ভৈরব ডঙ্ক।

ধূলার আড়ালে ধ্বজ-অরণ্যে

লুকাল প্রভাত সূর্য্য।

রক্ত অশ্বে রঘুনাথ চলে,

আকাশ বধির জয়-কোলাহলে;

সহসা যেন কি মন্ত্রের বলে

থেমে গেল রণ-তূর্য্য।

সহসা কাহার চরণে ভূপতি

জানাল পরম দৈন্য?

সমরোন্মাদে ছুটিতে ছুটিতে

সহসা নিমেষে কার ইঙ্গিতে

সিংহদুয়ারে থামিল চকিতে

আশি সহস্র সৈন্য?

ব্রাহ্মণ আসি দাঁড়াল সম্মুখে

ন্যায়াধীশ রামশাস্ত্রী।

দুই বাহু তাঁর তুলিয়া উধাও

কহিলেন ডাকি:—রঘুনাথ রাও

নগর ছাড়িয়া কোথা চলে’ যাও

না ল’য়ে পাপের শাস্তি?

নীরব হইল জয়-কোলাহল,

নীরব সমর-বাদ্য।

প্রভু কেন আজি-কহে রঘুনাথ,—

অসময়ে পথ রুধিলে হঠাৎ,

চলেছি করিতে যবন-নিপাত

যোগাতে যমের খাদ্য।

কহিলা শাস্ত্রী, বধিয়াছ তুমি

আপন ভ্রাতার পুত্রে।

বিচার তাহার না হয় য’দিন

ততকাল তুমি নহ ত স্বাধীন,

বন্দী রয়েছ অমোঘ কঠিন,

ন্যায়ের বিধান সূত্রে।

রুষিয়া উঠিলা রঘুনাথ রাও,

কহিলা করিয়া হাস্য,—

নৃপতি কাহারো বাঁধন না মানে,

চলেছি দীপ্ত মুক্ত কৃপাণে,

শুনিতে আসিনি পথমাঝখানে

ন্যায় বিধানের ভাষ্য।

কহিলা শাস্ত্রী, রঘুনাথ রাও,

যাও কর গিয়ে যুদ্ধ।

আমিও দণ্ড ছাড়িনু এবার,

ফিরিয়া চলিনু গ্রামে আপনার,

বিচারশালার খেলাঘরে আর

না রহিব অবরুদ্ধ।

বাজিল শঙ্খ, বাজিল ডঙ্ক,

সেনানী ধাইল ক্ষিপ্র।

ছাড়ি দিয়া গেলা গৌরবপদ,

দূরে ফেলি দিয়া সব সম্পদ

গ্রামের কুটীরে চলি গেল ফিরে

দীন দরিদ্র বিপ্র।

৪ঠা অগ্রহায়ণ, ১৩০৬

বিদায়-অভিশাপ

বিদায়-অভিশাপ

বিদায়-অভিশাপ

[দেবগণ কর্ত্তৃক আদিষ্ট হইয়া বৃহস্পতিপুত্র কচ দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের নিকট হইতে সঞ্জীবনী বিদ্যা শিখিবার নিমিত্ত তৎসমীপে গমন করেন। সেখানে সহস্র বৎসর অতিবাহন করিয়া এবং নৃত্যগীতবাদ্য দ্বারা শুক্রদুহিতা দেবযানীর মনোরঞ্জনপূর্ব্বক সিদ্ধকাম হইয়া কচ দেবলোকে প্রত্যাগমন করেন। দেবযানীর নিকট হইতে বিদায়কালীন ব্যাপার পরে বিবৃত হইল।]

কচ ও দেবযানী

কচ

দেহ আজ্ঞা, দেবযানী, দেবলোকে দাস

করিবে প্রয়াণ। আজি গুরুগৃহবাস

সমাপ্ত আমার। আশীর্ব্বাদ কর মোরে

যে বিদ্যা শিখিনু তাহা চিরদিন ধরে’

অন্তরে জাজ্জ্বল্য থাকে উজ্জ্বল রতন,

সুমেরুশিখরশিরে সূর্য্যের মতন,

অক্ষয় কিরণ।

দেবযানী

মনােরথ পূরিয়াছে,

পেয়েছ দুর্লভ বিদ্যা আচার্য্যের কাছে,

সহস্রবর্ষের তব দুঃসাধ্য সাধনা

সিদ্ধ আজি; আর কিছু নাহি কি কামনা

ভেবে দেখ মনে মনে!

কচ

আর কিছু নাহি।

দেবযানী

কিছু নাই? তবু আরবার দেখ চাহি

অবগাহি হৃদয়ের সীমান্ত অবধি

করহ সন্ধান; অন্তরের প্রান্তে যদি

কোনাে বাঞ্ছা থাকে, কুশের অঙ্কুরসম

ক্ষুদ্র দৃষ্টি-অগােচর, তবু তীক্ষ্ণতম।

কচ

আজি পূর্ণ কৃতার্থ জীবন। কোনাে ঠাই

মাের মাঝে কোনাে দৈন্য কোনাে শূন্য নাই

সুলক্ষণে!

দেবযানী

তুমি সুখী ত্রিজগৎ মাঝে।

যাও তবে ইন্দ্রলােকে আপনার কাজে

উচ্চশিরে গৌরব বহিয়া। স্বর্গপুরে

উঠিবে আনন্দধ্বনি, মনােহর সুরে

বাজিবে মঙ্গল-শঙ্খ, সুরাঙ্গনাগণ

করিবে তােমার শিরে পুষ্প বরিষণ

সদ্যছিন্ন নন্দনের মন্দার-মঞ্জরী।

স্বর্গপথে কলকণ্ঠে অপ্সরী কিন্নরী

দিবে হুলুধ্বনি। আহা, বিপ্র, বহুক্লেশে

কেটেছে তােমার দিন বিজনে বিদেশে

সুকঠোর অধ্যয়নে। নাহি ছিল কেহ

স্মরণ করায়ে দিতে সুখময় গেহ,

নিবারিতে প্রবাস-বেদনা। অতিথিরে

যথাসাধ্য পূজিয়াছি দরিদ্রকুটীরে

যাহা ছিল দিয়ে। তাই বলে’ স্বর্গসুখ

কোথা পাব, কোথা হেথা অনিন্দিত মুখ

সুরললনার। বড় আশা করি মনে

আতিথ্যের অপরাধ র’বে না স্মরণে

ফিরে গিয়ে সুখলােকে।

কচ

সুকল্যাণ হাসে

প্রসন্ন বিদায় আজি দিতে হবে দাসে।

দেবযানী

হাসি? হায় সখা, এ ত স্বর্গপুরী নয়!

পুষ্পে কীটসম হেথা তৃষ্ণা জেগে রয়

মর্ম্মমাঝে, বাঞ্ছা ঘুরে বাঞ্ছিতেরে ঘিরে,

লাঞ্ছিত ভ্রমর যথা বারম্বার ফিরে

মুদিত পদ্মের কাছে। হেথা সুখ গেলে

স্মৃতি একাকিনী বসি দীর্ঘশ্বাস ফেলে

শূন্যগৃহে; হেথায় সুলভ নহে হাসি।

যাও বন্ধু, কি হইবে মিথ্যা কাল নাশি,'

উৎকণ্ঠিত দেবগণ।—

যেতেছ চলিয়া?

সকলি সমাপ্ত হ’ল দু’কথা বলিয়া!

দশশত বর্ষ পরে এই কি বিদায়?

কচ

দেবযানী, কি আমার অপরাধ?

দেবযানী

হায়!

সুন্দরী অরণ্যভূমি সহস্র বৎসর

দিয়েছে বল্লভ ছায়া, পল্লবমর্ম্মর,

শুনায়েছে বিহঙ্গকূজন,—তা’রে আজি

এতই সহজে ছেড়ে যাবে? তরুরাজি

ম্লান হ’য়ে আছে যেন, হের আজিকার

বনচ্ছায় গাঢ়তর শােকে অন্ধকার,

কেঁদে ওঠে বায়ু, শুষ্ক পত্র ঝরে’ পড়ে,

তুমি শুধু চলে’ যাবে সহাস্য অধরে

নিশান্তের সুখস্বপ্নসম?

কচ

দেবযানী,

এ বনভূমিরে আমি মাতৃভূমি মানি,

হেথা মাের নবজন্মলাভ। এর পরে

নাহি মাের অনাদর,—চির প্রীতিভরে

চিরদিন করিব স্মরণ।

দেবযানী

এই সেই

বটতল, যেথা তুমি প্রতি দিবসেই

গােধন চরাতে এসে পড়িতে ঘুমায়ে

মধ্যাহ্নের খরতাপে; ক্লান্ত তব কায়ে

অতিথিবৎসল তরু দীর্ঘ ছায়াখানি

দিত বিছাইয়া, সুখসুপ্তি দিত আনি

ঝর্ঝর পল্লবদলে করিয়া বীজন

মৃদুস্বরে;—যেয়াে সখা, তবু কিছুক্ষণ

পরিচিত তরুতলে বস’ শেষবার

নিয়ে যাও সম্ভাষণ এ স্নেহছায়ার-

দুই দণ্ড থেকে যাও, সে বিলম্বে তব

স্বর্গের হবে না কোনাে ক্ষতি।

কচ

অভিনব

বলে’ যেন মনে হয় বিদায়ের ক্ষণে

এই সব চিরপরিচিত বন্ধুগণে;

পলাতক প্রিয়জনে বাঁধিবার তরে

করিছে বিস্তার সবে ব্যগ্র স্নেহভরে

নূতন বন্ধনজাল, অন্তিম মিনতি,

অপূর্ব্ব সৌন্দর্য্যরাশি। ওগাে বনস্পতি,

আশ্রিতজনের বন্ধু, করি নমস্কার।

কত পান্থ বসিবেক ছায়ায় তােমার,

কত ছাত্র কত দিন আমার মতন

প্রচ্ছন্ন প্রচ্ছায়তলে নীরব নির্জ্জন

তৃণাসনে, পতঙ্গের মৃদুগুঞ্জস্বরে,

করিবেক অধ্যয়ন; প্রাতঃস্নান পরে

ঋষিবালকেরা আসি সজল বল্কল

শুকাবে তােমার শাখে; রাখালের দল

মধ্যাহ্নে করিবে খেলা, ওগাে তারি মাঝে

এ পুরানাে বন্ধু যেন স্মরণে বিরাজে।

দেবযানী

মনে রেখাে আমাদের হােমধেনুটিরে;

স্বর্গসুধা পান করে’ সে পুণ্য গাভীরে

ভুলাে না গরবে।

কচ

সুধা হ’তে সুধাময়

দুগ্ধ তা’র; দেখে তারে পাপক্ষয় হয়,

মাতৃরূপা, শান্তিস্বরূপিণী, শুভ্রকান্তি

পয়স্বিনী। না মানিয়া ক্ষুধাতৃষ্ণা শ্রান্তি

তা’রে করিয়াছি সেবা; গহন কাননে

শ্যামশস্প স্রোতস্বিনী তীরে, তারি সনে

ফিরিয়াছি দীর্ঘ দিন; পরিতৃপ্তিভরে

স্বেচ্ছামতে ভােগ করি’ নিম্নতট পরে

অপর্যাপ্ত তৃণরাশি সুস্নিগ্ধ কোমল-

আলস্য-মন্থর তনু লভি’ তরুতল

রােমন্থ করেছে ধীরে শুয়ে তৃণাসনে

সারাবেলা; মাঝে মাঝে বিশাল নয়নে

সকৃতজ্ঞ শান্তদৃষ্টি মেলি’, গাঢ়স্নেহ

চক্ষু দিয়া লেহন করেছে মাের দেহ।

মনে র’বে সেই দৃষ্টি স্নিগ্ধ অচঞ্চল,

পরিপুষ্ট শুভ্র তনু চিক্কণ পিচ্ছল।

দেবযানী

আর মনে রেখাে, আমাদের কলস্বনা

স্রোতস্বিনী বেণুমতী।

কচ

তা’রে ভুলিব না।

বেণুমতী, কত কুসুমিত কুঞ্জ দিয়ে

মধুকণ্ঠে অনিন্দিত কলগান নিয়ে

আসিছে শুশ্রূষা বহি গ্রামবধূসম

সদা ক্ষিপ্রগতি, প্রবাসসঙ্গিনী মম

নিত্য শুভব্রতা।

দেবযানী

হায় বন্ধু, এ প্রবাসে

আরাে কোনাে সহচরী ছিল তব পাশে,

পরগৃহবাসদুঃখ ভুলাবার তরে

যত্ন তা’র ছিল মনে রাত্রি দিন ধরে';—

হায় রে দুরাশা!

কচ

চিরজীবনের সনে

তা’র নাম গাঁথা হ’য়ে গেছে।

দেবযানী

আছে মনে

যেদিন প্রথম তুমি আসিলে হেথায়

কিশাের ব্রাহ্মণ, তরুণ অরুণপ্রায়

গৌরবর্ণ তনুখানি স্নিগ্ধ দীপ্তিঢালা,

চন্দনে চর্চ্চিত ভাল, কণ্ঠে পুষ্পমালা,

পরিহিত পট্টবাস, অধরে নয়নে

প্রসন্ন সরল হাসি, হােথা পুষ্পবনে

দাঁড়ালে আসিয়া-

কচ

তুমি সদ্য স্নান করি

দীর্ঘ আর্দ্র কেশজালে, নব শুক্লাম্বরী

জ্যোতিস্নাত মূর্ত্তিমতী ঊষা, হাতে সাজি

একাকী তুলিতেছিলে নব পুষ্পরাজি

পূজার লাগিয়া। কহিনু করি বিনতি

“তােমারে সাজে না শ্রম, দেহ অনুমতি

ফুল তুলে দিব দেবী।”

দেবযানী

আমি সবিস্ময়

সেই ক্ষণে শুধানু তােমার পরিচয়।

বিনয়ে কহিলে,—আসিয়াছি তব দ্বারে

তােমার পিতার কাছে শিষ্য হইবারে

আমি বৃহস্পতিসুত।

কচ

শঙ্কা ছিল মনে

পাছে দানবের গুরু স্বর্গের ব্রাহ্মণে

দেন ফিরাইয়া।

দেবযানী

আমি গেনু তাঁর কাছে।

হাসিয়া কহিনু-পিতা, ভিক্ষা এক আছে

চরণে তােমার।—স্নেহে বসাইয়া পাশে

শিরে মাের দিয়ে হাত শান্ত মৃদু ভাষে

কহিলেন—কিছু নাহি অদেয় তােমারে।

কহিলাম—বৃহস্পতিপুত্র তব দ্বারে

এসেছেন, শিষ্য করি লহ তুমি তাঁরে

এ মিনতি। সে আজিকে হ’ল কত কাল

তবু মনে হয় যেন সেদিন সকাল।

কচ

ঈর্ষ্যাভরে তিনবার দৈত্যগণ মােরে

করিয়াছে বধ, তুমি দেবী দয়া করে’

ফিরায়ে দিয়েছ মাের প্রাণ, সেই কথা

হৃদয়ে জাগায়ে র’বে চির-কৃতজ্ঞতা।

দেবযানী

কৃতজ্ঞতা! ভুলে যেয়াে, কোনাে দুঃখ নাই।

উপকার যা করেছি হ’য়ে যাক ছাই—

নাহি চাই দান প্রতিদান। সুখস্মৃতি

নাহি কিছু মনে? যদি আনন্দের গীতি

কোনাে দিন বেজে থাকে অন্তরে বাহিরে,

যদি কোনাে সন্ধ্যাবেলা বেণুমতী-তীরে

অধ্যয়ন-অবসরে বসি পুষ্পবনে

অপূর্ব্ব পুলকরাশি জেগে থাকে মনে;

ফুলের সৌরভসম হৃদয়-উচ্ছ্বাস

ব্যাপ্ত করে’ দিয়ে থাকে সায়াহ্ন আকাশ,

ফুটন্ত নিকুঞ্জতল, সেই সুখকথা

মনে রেখাে -দূর হ’য়ে যাক্ কৃতজ্ঞতা।

যদি সখা হেথা কেহ গেয়ে থাকে গান

চিত্তে যাহা দিয়েছিল সুখ; পরিধান

১৪৫

করে’ থাকে কোনাে দিন হেন বস্ত্রখানি

যাহা দেখে মনে তব প্রশংসার বাণী

জেগেছিল, ভেবেছিলে প্রসন্ন অন্তর

তৃপ্ত চোখে, আজি এরে দেখায় সুন্দর;

সেই কথা মনে কোনাে অবসরক্ষণে

সুখস্বর্গধামে। কতদিন এই বনে

দিক্‌ দিগন্তরে, আষাঢ়ের নীল জটা,

শ্যামস্নিগ্ধ বরষার নবঘনঘটা

নেবেছিল, অবিরল বৃষ্টিজলধারে

কর্ম্মহীন দিনে সঘন কল্পনাভারে

পীড়িত হৃদয়; এসেছিল কতদিন

অকস্মাৎ বসন্তের বাধাবন্ধহীন

উল্লাস-হিল্লোলাকুল যৌবন-উৎসাহ,

সঙ্গীত-মুখর সেই আবেগ প্রবাহ

লতায় পাতায় পুষ্পে বনে বনান্তরে

ব্যাপ্ত করি’ দিয়াছিল লহরে লহরে

আনন্দপ্লাবন; ভেবে দেখ একবার

কত ঊষা, কত জ্যোৎস্না, কত অন্ধকার

পুষ্পগন্ধঘন অমানিশা, এই বনে

গেছে মিশে সুখে দুঃখে তােমার জীবনে,—

তারি মাঝে হেন প্রাতঃ, হেন সন্ধ্যাবেলা,

হেন মুগ্ধরাত্রি, হেন হৃদয়ের খেলা,

হেন সুখ, হেন মুখ দেয় নাই দেখা

যাহা মনে আঁকা র’বে চির চিত্ররেখা

চিররাত্রি চিরদিন? শুধু উপকার!

শােভা নহে, প্রীতি নহে, কিছু নহে আর?

কচ

আর যাহা আছে তাহা প্রকাশের নয়

সখি! বহে যাহা মর্ম্মমাঝে রক্তময়

বাহিরে তা কেমনে দেখাব?

দেবযানী

জানি সখে,

তােমার হৃদয় মাের হৃদয়-আলােকে

চকিতে দেখেছি কতবার, শুধু যেন

চক্ষের পলকপাতে; তাই আজি হেন

স্পর্দ্ধা রমণীর। থাকো তবে, থাকো তবে,

যেওনাকো। সুখ নাই যশের গৌরবে।

হেথা বেণুমতী-তীরে মােরা দুই জন

অভিনব স্বর্গলােক করিব সৃজন

এ নির্জ্জন বনচ্ছায়া সাথে মিশাইয়া

নিভৃত বিশ্রব্ধ মুগ্ধ দুইখানি হিয়া

নিখিল-বিস্মৃত। ওগাে বন্ধু, আমি জানি

রহস্য তােমার।

কচ

নহে, নহে, দেবযানী।

দেবযানী

নহে? মিথ্যা প্রবঞ্চনা! দেখি নাই আমি

মন তব? জান না কি প্রেম অন্তর্যামী?

বিকশিত পুষ্প থাকে পল্লবে বিলীন,

গন্ধ তা’র লুকাবে কোথায়? কতদিন

যেমনি তুলেছ মুখ, চেয়েছ যেমনি,

যেমনি শুনেছ তুমি মোর কণ্ঠধ্বনি

অমনি সর্ব্বাঙ্গে তব কম্পিয়াছে হিয়া,—

নড়িলে হীরক যথা পড়ে ঠিকরিয়া

আলোেক তাহার। সে কি আমি দেখি নাই?

ধরা পড়িয়াছ বন্ধু বন্দী তুমি তাই

মাের কাছে। এ বন্ধন নারিবে কাটিতে।

ইন্দ্র আর তব ইন্দ্র নহে।

কচ

শুচিস্মিতে,

সহস্র বৎসর ধরি এ দৈত্যপুরীতে

এরি লাগি করেছি সাধনা?

দেবযানী

কেন নহে?

বিদ্যারি লাগিয়া শুধু লােকে দুঃখ সহে

এ জগতে? করেনি কি রমণীর লাগি

কোনাে নর মহাতপ? পত্নীবর মাগি

করেন নি সম্বরণ তপতীর আশে

প্রখর সূর্য্যের পানে তাকায়ে আকাশে

অনাহারে কঠোর সাধনা কত? হায়,

বিদ্যাই দুর্লভ শুধু, প্রেম কি হেথায়

এতই সুলভ? সহস্র বৎসর ধরে’

সাধনা করেছ তুমি কি ধনের তরে

আপনি জান না তাহা। বিদ্যা একধারে

আমি একধারে-কভু মােরে কভু তা’রে

চেয়েছ সােৎসুকে; তব অনিশ্চিত মন

দোঁহারেই করিয়াছে যত্নে আরাধন

সঙ্গোপনে। আজ মােরা দোঁহে একদিনে

আসিয়াছি ধরা দিতে। লহ সখা চিনে

যারে চাও! বল যদি সরল সাহসে

“বিদ্যায় নাহিক সুখ, নাহি সুখ যশে,

দেবযানী, তুমি শুধু সিদ্ধি মূর্ত্তিমতী,

তােমারেই করিনু বরণ”, নাহি ক্ষতি

নাহি কোনাে লজ্জা তাহে। রমণীর মন

সহস্রবর্ষেরই সখা সাধনার ধন।

কচ

দেব-সন্নিধানে শুভে করেছিনু পণ

মহাসঞ্জীবনী বিদ্যা করি’ উপাৰ্জ্জন

দেবলােকে ফিরে যাব; এসেছিনু তাই,

সেই পণ মনে মাের জেগেছে সদাই,

পূর্ণ সেই প্রতিজ্ঞা আমার, চরিতার্থ

এতকাল পরে এ জীবন; কোনাে স্বার্থ

করি না কামনা আজি।

দেবযানী

ধিক্ মিথ্যাভাষী

শুধু বিদ্যা চেয়েছিলে? গুরুগৃহে আসি’

শুধু ছাত্ররূপে তুমি আছিলে নির্জ্জনে

শাস্ত্র গ্রন্থে রাখি আঁখি রত অধ্যয়নে

অহরহ? উদাসীন আর সবা পরে?

ছাড়ি অধ্যয়নশালা বনে বনান্তরে

ফিরিতে পুষ্পের তরে, গাঁথি মাল্যখানি

সহাস্য প্রফুল্ল মুখে কেন দিতে আনি

এ বিদ্যাহীনারে? এই কি কঠোর ব্রত?

এই তব ব্যবহার বিদ্যার্থীর মত?

প্রভাতে রহিতে অধ্যয়নে, আমি আসি

শূন্য সাজি হাতে ল’য়ে দাঁড়াতেম হাসি,

তুমি কেন গ্রন্থ রাখি উঠিয়া আসিতে,

প্রফুল্ল শিশিরসিক্ত কুসুমরাশিতে

করিতে আমার পূজা? অপরাহুকালে

জলসেক করিতাম তরু-আলবালে,

আমারে হেরিয়া শ্রান্ত কেন দয়া করি’

দিতে জল তুলে? কেন পাঠ পরিহরি

পালন করিতে মোর মৃগশিশুটিকে?

স্বর্গ হ’তে যে সঙ্গীত এসেছিলে শিখে

কেন তাহা শুনাইতে, সন্ধ্যাবেলা যবে

নদীতীরে অন্ধকার নামিত নীরবে

প্রেমনত নয়নের স্নিগ্ধচ্ছায়াময়

দীর্ঘ পল্লবের মত? আমার হৃদয়

বিদ্যা নিতে এসে কেন করিলে হরণ

স্বর্গের চাতুরীজালে? বুঝেছি এখন,

আমারে করিয়া বশ পিতার হৃদয়ে

চেয়েছিলে পশিবারে—কৃতকার্য্য হ’য়ে

আজ যাবে মােরে কিছু দিয়ে কৃতজ্ঞতা;

লৰূমনােরথ অর্থ রাজদ্বারে যথা

দ্বারীহস্তে দিয়ে যায় মুদ্রা দুই চারি

মনের সন্তোষে?—

কচ

হা অভিমানিনী নারী;

সত্য শুনে কি হইবে সুখ? ধর্ম্ম জানে,

প্রতারণা করি নাই; অকপট প্রাণে

আনন্দ অন্তরে তব সাধিয়া সন্তোষ,

সেবিয়া তােমারে যদি করে’ থাকি দোষ

তা’র শাস্তি দিতেছেন বিধি। ছিল মনে

কব না সে কথা! বল কি হইবে জেনে

ত্রিভুবনে কারাে যাহে নাই উপকার,

একমাত্র শুধু যাহা নিতান্ত আমার

আপনার কথা। ভালবাসি কি না আজ

সে তর্কে কি ফল? আমার যা আছে কাজ

সে আমি সাধিব। স্বর্গ আর স্বর্গ বলে’

যদি মনে নাহি লাগে, দূর বনতলে

যদি ঘুরে মরে চিত্ত বিদ্ধমৃগসম,

চিরতৃষ্ণা লেগে থাকে দগ্ধ প্রাণে মম

সর্ব্বকার্য্য মাঝে—তবু চলে’ যেতে হবে

সুখশূন্য সেই স্বর্গধামে। দেব সবে

এই সঞ্জীবনী বিদ্যা করিয়া প্রদান

নূতন দেবত্ব দিয়া তবে মাের প্রাণ

সার্থক হইবে; তার পূর্ব্বে নাহি মানি

আপনার সুখ। ক্ষম মােরে, দেবযানী,

ক্ষম অপরাধ।

দেবযানী

ক্ষমা কোথা মনে মাের?

করেছ এ নারীচিত্ত কুলিশ-কঠোর

হে ব্রাহ্মণ! তুমি চলে’ যাবে স্বর্গলােকে

সগৌরবে, আপনার কর্ত্তব্য-পুলকে

সর্ব্ব দুঃখশােক করি দূর-পরাহত;

আমার কি আছে কাজ, কি আমার ব্রত?

আমার এ প্রতিহত নিষ্ফল জীবনে

কি রহিল, কিসের গৌরব? এই বনে

বসে’ র’ব নতশিরে নিঃসঙ্গ একাকী

লক্ষ্যহীনা। যে দিকেই ফিরাইব আঁখি

সহস্র স্মৃতির কাঁটা বিঁধিবে নিষ্ঠুর;

লুকায়ে বক্ষের তলে লজ্জা অতি ক্রূর

বারম্বার করিবে দংশন। ধিক্ ধিক,

কোথা হ’তে এলে তুমি, নির্ম্মম পথিক,

বসি’ মাের জীবনের বনচ্ছায়াতলে

দণ্ড দুই অবসর কাটাবার ছলে

জীবনের সুখগুলি-ফুলের মতন

ছিন্ন করে’ নিয়ে-মালা করেছ গ্রন্থন

একখানি সূত্র দিয়ে; যাবার বেলায়

সে মালা নিলে না গলে, পরম হেলায়

সেই সূক্ষম সূত্রখানি দুই ভাগ করে’

ছিঁড়ে দিয়ে গেলে। লুটাইল ধূলিপরে

এ প্রাণের সমস্ত মহিমা। তােমা পরে

এই মাের অভিশাপ-যে বিদ্যার তরে

মােরে কর অবহেলা, সে বিদ্যা তােমার

সম্পূর্ণ হ’বে না বশ;—তুমি শুধু তা’র

ভারবাহী হ’য়ে র’বে, করিবে না ভােগ,

শিখাইবে, পারিবে না করিতে প্রয়ােগ।

কচ

আমি বর দিনু, দেবী, তুমি সুখী হবে।

ভুলে যাবে সর্ব্বগ্লানি বিপুল গৌরবে।

কথা ও কাহিনী · বিবাহ

বিবাহ

(রাজস্থান)

প্রহরখানেক রাত হয়েছে শুধু,

ঘন ঘন বেজে ওঠে শাঁখ।

বর-কন্য যেন ছবির মত

আঁচল-বাঁধা দাঁড়িয়ে আঁখি নত,

জান‍্লা খুলে পুরাঙ্গনা যত

দেখ‍্চে চেয়ে ঘোমটা করি ফাঁক।

বর্ষারাতে মেঘের গুরু গুরু

তারি সঙ্গে বাজে বিয়ের শাঁখ।

ঈশান কোণে থম‍্কে আছে হাওয়া,

মেঘে মেঘে আকাশ আছে ঘেরি।

সভাকক্ষে হাজার দীপালোকে

মণিমালায় ঝিলিক্ হানে চোখে;

সভার মাঝে হঠাৎ এল ও কে,

বাহির দ্বারে বেজে উঠল ভেরী।

চম‍্কে ওঠে সভার যত লোকে,

উঠে দাঁড়ায় বর-কনেরে ঘেরি।

টোপর-পরা মেত্রি-রাজকুমারে

কহে তখন মাড়োয়ারের দূত—

যুদ্ধ বাধে বিদ্রোহীদের সনে,

রাম সিংহ রাণা চলেন রণে,

তোমরা এস তাঁরি নিমন্ত্রণে

যে যে আছ মর্ত্তিয়া রাজপুত

জয় রাণা রামসিঙের জয়—

গর্জ্জি উঠে মাড়োয়ারের দূত

জয় রাণী রামসিঙের জয়—

মেত্রিপতি উর্দ্ধস্বরে কয়।

কনের বক্ষ কেঁপে ওঠে ডরে,

দুটি চক্ষু ছল-ছল করে,

বরযাত্রী হাঁকে সমস্বরে

জয়রে রাণা রামসিঙের জয়।

সময় নাহি মেত্রিরাজকুমার—

মহারাণার দূত উচ্চে কয়।

বৃথা কেন উঠে হুলুধ্বনি

বৃথা কেন বেজে ওঠে শাঁখ।

বাঁধা আচল খুলে ফেলে বর,

মুখের পানে চাহে পরস্পর,

কহে—প্রিয়ে নিলেম অবসর,

এসেছে ঐ মৃত্যুসভার ডাক।

বৃথা এখন ওঠে হুলুধ্বনি,

বৃথা এখন বেজে ওঠে শাঁখ।

বরের বেশে টোপর পরি শিরে

ঘোড়ায় চড়ি ছুটে রাজকুমার।

মলিনমুখে নম্র নতশিরে

কন্যা গেল অন্তঃপুরে ফিরে

হাজার বাতি নিব‍্ল ধীরে ধীরে

রাজার সভা হ’ল অন্ধকার।

গলায় মালা টোপর-পরা শিরে

ঘোড়ায় চড়ি ছুটে রাজকুমার।

মাতা কেঁদে কহেন-বধূ-বেশ

খুলিয়া ফেল্‌ হায় রে হতভাগী!

শান্তভাবে কন্যা কহে মায়ে—

কেঁদ না মা ধরি তোমার পায়ে,

বধূসজ্জা থাক্ মা আমার গায়ে

মেত্রি-পুরে যাইব তাঁর লাগি।

শুনে মাতা কপালে কর হানি

কেঁদে কহেন—হায় রে হতভাগী!

গ্রহবিপ্র আশীর্বাদ করি

ধানদূর্ব্বা দিল তাহার মাথে।

চড়ে কন্যা চতুর্দ্দোলা পরে

পুরনারী হুলুধ্বনি করে,

রঙীন্ বেশে কিঙ্করী কিঙ্করে

সারি সারি চলে বালার সাথে

মাতা আসি চুমো খেলেন মুখে,

পিতা আসি হস্ত দিলেন মাথে

নিশীথ রাতে আকাশ আলো করি

কে এল রে মেত্রিপুর-দ্বারে।

থামাও বাঁশি—কহে, থামাও বাঁশি—

চতুর্দ্দোলা নামাও রে দাসদাসী,

মিলেছি আজ মেত্রি-পুরবাসী

মেত্রিপতির চিতা রচিবারে।

মেত্রিরাজা যুদ্ধে হত আজি

দুঃসময়ে কারা এলে দ্বারে?

বাজাও বাঁশি ওরে বাজাও বাঁশি—

চতুর্দোলা হ’তে বধু বলে।

এবার লগ্ন নাহি হবে পার,

আঁচলের গাঁঠ খুল‍বেনাকো আর,

শেষমন্ত্র পড়িব এইবার

শ্মশান-সভায় দীপ্ত চিতানলে।

বাজাও বাঁশি ওরে বাজাও বাঁশি—

চতুর্দ্দোলা হতে বধূ বলে।

বরের বেশে মোতির মালা গলে

মেত্রিপতি চিতার পরে শুয়ে।

দোলা হ’তে নাম‍্ল আসি নারী,

আঁচল বাঁধি রক্তবাসে তারি

শিয়র পরে বৈসে রাজকুমারী

বরের মাথা কোলের পরে থুয়ে।

নিশীথ রাত্রে বরসজ্জা-পরা

মেত্রিপতি চিতার পরে শুয়ে।

ঘন ঘন করি হুলুধ্বনি

দলে দলে আসে পুরাঙ্গনা।

পুরুত কহে—ধন্য সুচরিতা,

গাহিছে ভাট—ধন্য মৃত্যুজিতা,—

ধূধূ করে’ জ্বলে উঠ‍্ল চিতা,—

কন্যা বসে’ আছেন যোগাসনা।

জয়ধ্বনি উঠে শ্মশান মাঝে,

হুলুধ্বনি করে পুরাঙ্গনা।

১১ই কার্ত্তিক, ১৩০৬।

কথা ও কাহিনী · বিসর্জ্জন

বিসর্জ্জন

দুইটি কোলের ছেলে গেছে পর-পর

বয়স না হ’তে হ’তে পূরা দু’বছর।

এবার ছেলেটি তা’র জন্মিল যখন-

স্বামীরেও হারাল মল্লিকা। বন্ধুজন

বুঝাইল,—পূর্ব্বজন্মে ছিল বহু পাপ

এ জনমে তাই হেন দারুণ সন্তাপ।

শােকানলদগ্ধ নারী একান্ত বিনয়ে

অজ্ঞাত জন্মের পাপ শিরে বহি ল’য়ে

প্রায়শ্চিত্তে দিল মন। মন্দিরে মন্দিরে

যেথা সেথা গ্রামে গ্রামে পূজা দিয়ে ফিরে;

ব্রতধ্যান উপবাসে আহ্নিকে তর্পণে

কাটে দিন ধূপে দীপে নৈবেদ্যে চন্দনে

পূজাগৃহে; কেশে বাঁধি রাখিল মাদুলি

কুড়াইয়া শত ব্রাহ্মণের পদধূলি;—

শুনে রামায়ণ-কথা,—সন্ন্যাসী সাধুরে

ঘরে আনি আশীর্ব্বাদ করায় শিশুরে।

বিশ্বমাঝে আপনারে রাখি সর্ব্বনীচে

সবার প্রসন্ন দৃষ্টি অভাগী মাগিছে

আপন সন্তান লাগি। সূর্য্য চন্দ্র হ’তে

পশু পক্ষী পতঙ্গ অবধি—কোনােমতে

কেহ পাছে কোনাে অপরাধ লয় মনে

পাছে কেহ করে ক্ষোভ, অজানা কারণে

পাছে কারাে লাগে ব্যথা—সকলের কাছে

আকুল বেদনাভরে দীন হ’য়ে আছে।

যখন বছর দেড় বয়স শিশুর-

যকৃতের ঘটিল বিকার; জুরাতুর

দেহখানি শীর্ণ হ’য়ে আসে। দেবালয়ে

মানিল মানৎ মাতা, পদামৃত ল’য়ে

করাইল পান, হরিসঙ্কীর্ত্তন গানে

কাঁপিল প্রাঙ্গণ। ব্যাধি শান্তি নাহি মানে

কাঁদিয়া শুধাল নারী—“ব্রাহ্মণ ঠাকুর,

এত দুঃখে তবু পাপ নাহি হ’ল দূর?

দিনরাত্রি দেবতার মেনেছি দোহাই,

দিয়েছি এত যে পূজা তবু রক্ষা নাই?

তবু কি নেবেন তাঁরা আমার বাছারে?

এত ক্ষুধা দেবতার? এত ভারে ভারে

নৈবেদ্য দিলাম খেতে বেচিয়া গহনা,

সর্ব্বস্ব খাওয়ানু তবু ক্ষুধা মিটিল না?”

ব্রাহ্মণ কহিল-“বাছা এযে ঘাের কলি!

অনেক করেছ বটে তবু এও বলি

আজকাল তেমন কি ভক্তি আছ কারাে,

সত্যযুগে যা পারিত তা কি আজ পারো?

দানবীর কর্ণ কাছে ধর্ম্ম যবে এসে

পুত্রেরে চাহিল খেতে ব্রাহ্মণের বেশে

নিজহস্তে সন্তানে কাটিল। তখনি সে

শিশুরে ফিরিয়া পেল চক্ষের নিমিষে।

শিবি রাজা শ্যেনরূপী ইন্দ্রের মুখেতে

আপন বুকের মাংস কাটি দিল খেতে-

পাইল অক্ষয় দেহ! নিষ্ঠা এরে বলে।

তেমন কি একালেতে আছে ভূমণ্ডলে?

মনে আছে ছেলেবেলা গল্প শুনিয়াছি

মা’র কাছে—তাঁদের গ্রামের কাছাকাছি

ছিল এক বন্ধ্যা নারী,—না পাইয়া পথ

প্রথম গর্ভের ছেলে করিল মানত

মা গঙ্গার কাছে; শেষে পুত্রজন্মপরে

অভাগী বিধবা হ’ল; গেল সে সাগরে,

কহিল সে নিষ্ঠাভরে মা গঙ্গারে ডেকে-

‘মা, তােমারি কোলে আমি দিলাম ছেলেকে-

এ মাের প্রথম পুত্র, শেষ পুত্র এই,

এ জন্মের তরে আর পুত্রআশা নেই।

যেমনি জলেতে ফেলা, মাতা ভাগীরথী

মকরবাহিনী রূপে হ’য়ে মূর্ত্তিমতী

শিশু ল’য়ে আপনার পদ্মকরতলে

মা’র কোলে সমর্পিল। নিষ্ঠা এরে বলে।”

মল্লিকা ফিরিয়া এলাে নতশির করে’-

আপনারে ধিক্কারিল,—এতদিন ধরে’

বৃথা ব্রত করিলাম, বৃথা দেবার্চনা,—

নিষ্ঠহীনা পাপিষ্ঠারে ফল মিলিল না।

ঘরে ফিরে এসে দেখে শিশু অচেতন

জ্বরাবেশে। অঙ্গ যেন অগ্নির মতন;

ঔষধ গিলাতে যায় যত বারবার

পড়ে’ যায়—কণ্ঠ দিয়া নামিল না আর।

দন্তে দন্তে গেল আঁটি। বৈদ্য শির নাড়ি

ধীরে ধীরে চলি গেল রােগি-গৃহ ছাড়ি।

সন্ধ্যার আঁধারে শূন্য বিধবার ঘরে

একটি মলিন দীপ শয়নশিয়রে,

একা শােকাতুরা নারী। শিশু একবার

জ্যোতিহীন আঁখি মেলি যেন চারিধার

খুঁজিল কাহারে। নারী কাঁদিল কাতর-

“ও মাণিক ওরে সােনা, এই যে মা তাের,

এই যে মায়ের কোল, ভয় কিরে বাপ!”—

বক্ষে তা’রে চাপি ধরি তা’র জ্বর-তাপ

চাহিল কাড়িয়া নিতে অঙ্গে আপনার

প্রাণপণে। সহসা বাতাসে গৃহদ্বার

খুলে গেল; ক্ষীণ দীপ নিবিল তখনি,—

সহসা বাহির হ’তে কল কলধ্বনি

পশিল গৃহের মাঝে। চমকিয়া নারী

দাঁড়ায়ে উঠিল বেগে শয্যাতল ছাড়ি,

কহিল, “মায়ের ডাক ওই শুনা যায়—

ও মাের দুঃখীর ধন, পেয়েছি উপায়-

তাের মা’র কোল চেয়ে সুশীতল কোল

আছে ওরে বাছা।”—জাগিয়াছে কলরােল

অদূরে জাহ্নবীজলে,— এসেছে জোয়ার

পূর্ণিমায়। শিশুর তাপিত দেহভার

বক্ষে ল’য়ে মাতা গেল শূন্য ঘাটপানে।

কহিল, “মা, মা’র ব্যথা যদি বাজে প্রাণে

তবে এ শিশুর তাপ দেগাে মা জুড়ায়ে।

একমাত্র ধন মাের দিনু তাের পায়ে

একমনে।”—এত বলি সমর্পিল জলে,

অচেতন শিশুটিরে ল’য়ে করতলে,

চক্ষু মুদি। বহুক্ষণ আঁখি মেলিল না।

ধ্যানে নিরখিল বসি, মকরবাহনা

জ্যোতির্ম্ময়ী মাতৃমূর্ত্তি ক্ষুদ্র শিশুটিরে

কোলে করে’ এসেছেন, রাখি তা’র শিরে

একটি পদ্মের দল; হাসিমুখে ছেলে

অনিন্দিত কান্তি ধরি, দেবীকোল ফেলে

মা’র কোলে আসিবারে বাড়ায়েছে কর।

কহে দেবী-“রে দুঃখিনী এই তুই ধর

তাের ধন তোরে দিনু।” -রােমাঞ্চিতকায়

নয়ন মেলিয়া কহে-“কই মা, কোথায়?”

পরিপূর্ণ চন্দ্রালােকে বিহ্বলা রজনী;

গঙ্গা বহি চলি যায় করি কলধ্বনি।

চীৎকারি উঠিল নারী-দিবিনে ফিরায়ে?

মর্ম্মরিল বনভূমি দক্ষিণের বারে।

২৫শে আশ্বিন, ১৩০৬

কথা ও কাহিনী · ভাষা ও ছন্দ

ভাষা ও ছন্দ

যেদিন হিমাদ্রিশৃঙ্গে নামি আসে আসন্ন আষাঢ়,

মহানদ ব্রহ্মপুত্র, অকস্মাৎ দুর্দ্দাম দুর্ব্বার

দুঃসহ অন্তরবেগে তীরতরু করিয়া উন্মূল

মাতিয়া খুঁজিয়া ফিরে আপনার কূল-উপকূল

তট-অরণ্যের তলে তরঙ্গের ডম্বরু বাজায়ে

ক্ষিপ্ত ধূর্জ্জটির প্রায়; সেই মত বনানীর ছায়ে

স্বচ্ছ শীর্ণ ক্ষিপ্রগতি স্রোতস্বতী তমসার তীরে

অপূর্ব্ব উদ্বেগভরে সঙ্গীহীন ভ্রমিছেন ফিরে

মহর্ষি বাল্মীকি কবি,—রক্তবেগ-তরঙ্গিত বুকে

গম্ভীর জলদমন্দ্রে বারম্বার আবর্ত্তিয়া মুখে

নব ছন্দ; বেদনায় অন্তর করিয়া বিদারিত

মুহূর্ত্তে নিল যে জন্ম পরিপূর্ণ বাণীর সঙ্গীত,

তা’রে ল’য়ে কি করিবে, ভাবে মুনি কি তা’র উদ্দেশ,—

তরুণ গরুড়সম কি মহৎ ক্ষুধার আবেশ

পীড়ন করিছে তা’রে, কি তাহার দুরন্ত প্রার্থনা,

অমর বিহঙ্গশিশু কোন্ বিশ্বে করিবে রচনা

আপন বিরাট নীড়?—অলৌকিক আনন্দের ভার

বিধাতা যাহারে দেয়, তা’র বক্ষে বেদনা অপার,

তা’র নিত্য জাগরণ; অগ্নিসম দেবতার দান

উর্দ্ধশিখা জ্বালি চিত্তে অহােরাত্র দগ্ধ করে প্রাণ।

অস্তে গেল দিনমণি। দেবর্ষি নারদ সন্ধ্যাকালে

শাখাসুপ্ত পাখীদের সচকিয়া জটারশ্মিজালে,

স্বর্গের নন্দনগন্ধে অসময়ে শ্রান্ত মধুকরে

বিস্মিত ব্যাকুল করি, উত্তরিলা অপােভূমি পরে।

নমস্কার করি কবি, শুধাইলা সঁপিয়া আসন—

কি মহৎ দৈবকার্য্যে দেব, তব মর্ত্ত্যে আগমন?

নারদ কহিলা হাসি-করুণার উৎসমুখে, মুনি,

যে ছন্দ উঠিল উর্দ্ধে, ব্রহ্মলােকে ব্রহ্মা তাহা শুনি

আমারে কহিলা ডাকি, যাও তুমি তমসার তীরে,

বাণীর বিদ্যুৎ-দীপ্ত ছন্দোবাণবিদ্ধ বাল্মীকিরে

বারেক শুধায়ে এস,—বােলো তা’রে, ওগো ভাগ্যবান্,

এ মহা সঙ্গীতধন কাহারে করিবে তুমি দান।

এই ছন্দে গাঁথি ল’য়ে কোন্ দেবতার যশঃকথা

স্বর্গের অমরে কবি মর্ত্ত্যলােকে দিবে অমরতা?

কহিলেন শির নাড়ি ভাবােন্মত্ত মহামুনিবর,

দেবতার সামগীতি গাহিতেছে বিশ্বচরাচর,

ভাষাশূন্য অর্থহারা। বহ্নি ঊর্দ্ধে মেলিয়া অঙ্গুলি

ইঙ্গিতে করিছে স্তব; সমুদ্র তরঙ্গবাহু তুলি

কি কহিছে স্বর্গ জানে; অরণ্য উঠায়ে লক্ষশাখা

মর্ম্মরিছে মহামন্ত্র; ঝটিকা উড়ায়ে রুদ্র পাখা

গাহিছে গর্জ্জন গান; নক্ষত্রের অক্ষৌহিণী হ’তে

অরণ্যের পতঙ্গ অবধি, মিলাইছে এক স্রোতে

সঙ্গীতের তরঙ্গিণী বৈকুণ্ঠের শান্তিসিন্ধু পারে।

মানুষের ভাষাটুকু অর্থ দিয়ে বদ্ধ চারিধারে,

ঘুরে মানুষের চতুর্দ্দিকে। অবিরত রাত্রিদিন

মানবের প্রয়ােজনে প্রাণ তা’র হ’য়ে আসে ক্ষীণ।

পরিস্ফুট তত্ত্ব তার সীমা দেয় ভাবের চরণে;

ধূলি ছাড়ি একেবারে উর্দ্ধমুখে অনন্তগমনে

উড়িতে সে নাহি পারে সঙ্গীতের মতন স্বাধীন

মেলি দিয়া সপ্তসুর সপ্তপক্ষ অর্থভারহীন।

প্রভাতের শুভ্র ভাষা বাক্যহীন প্রত্যক্ষ কিরণ

জগতের মর্ম্মদ্বার মুহূর্ত্তেকে করি উদঘাটন

নির্ব্বারিত করি দেয় ত্রিলােকের গীতের ভাণ্ডার;

যামিনীর শান্তিবাণী ক্ষণমাত্রে অনন্ত সংসার

আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে, বাক্যহীন পরম নিষেধ

বিশ্বকর্ম্ম-কোলাহল মন্ত্রবলে করি দিয়া ভেদ

নিমেষে নিবায়ে দেয় সর্ব্ব খেদ সকল প্রয়াস,

জীবলােক মাঝে আনে মরণের বিপুল আভাস;

নক্ষত্রের ধ্রুব ভাষা অনির্ব্বাণ অনলের কণা

জ্যোতিষ্কের সূচিপত্রে আপনার করিছে সূচনা

নিত্যকাল মহাকাশে; দক্ষিণের সমীরের ভাষা

কেবল নিশ্বাসমাত্রে নিকুঞ্জে জাগায় নব আশা,

দুর্গম পল্লবদুর্গে অরণ্যের ঘন অন্তঃপুরে

নিমেষে প্রবেশ করে, নিয়ে যায় দূর হ’তে দূরে

যৌবনের জয়গান;—সেই মত প্রত্যক্ষ প্রকাশ

কোথা মানবের বাক্যে, কোথা সেই অনন্ত আভাস,

কোথা সেই অর্থভেদী অভ্রভেদী সঙ্গীত উচ্ছ্বাস,

আত্মবিদারণকারী মর্ম্মান্তিক মহান্ নিশ্বাস?

মানবের জীর্ণ বাক্যে মাের ছন্দ দিবে নব সুর,

অর্থের বন্ধন হ’তে নিয়ে তা’রে যাবে কিছু দূর

ভাবের স্বাধীন লােকে, পক্ষবান্ অশ্বরাজ সম

উদ্দাম সুন্দর গতি,—সে আশ্বাসে ভাসে চিত্ত মম।

সূর্য্যেরে বহিয়া যথা ধায় বেগে দিব্য অগ্নিতরী

মহাব্যোম-নীলসিন্ধু প্রতিদিন পারাপার করি;

ছন্দ সেই অগ্নিসম বাক্যেরে করিব সমর্পণ

যাবে চলি মর্ত্ত্যসীমা অবাধে করিয়া সন্তরণ,

গুরুভার পৃথিবীরে টানিয়া লইবে উৰ্দ্ধপানে,

কথারে ভাবের স্বর্গে, মানবের দেবপীঠস্থানে।

মহাম্বুধি যেইমত ধ্বনিহীন স্তব্ধ ধরণীরে

বাঁধিয়াছে চতুর্দ্দিকে অন্তহীন নৃত্য গীতে ঘিরে,—

তেমনি আমার ছন্দ, ভাষারে ঘেরিয়া আলিঙ্গনে

গাবে যুগে যুগান্তরে সরল গম্ভীর কলম্বনে

দিক্‌ হ’তে দিগন্তরে মহামানবের স্তবগান,—

ক্ষণস্থায়ী নরজন্মে মহৎ মর্যাদা করি দান।

হে দেবর্ষি, দেবদূত, নিবেদিয়াে পিতামহ-পায়ে

স্বর্গ হ’তে যাহা এল স্বর্গে তাহা নিয়াে না ফিরায়ে।

দেবতার স্তবগীতে দেবেরে মানব করি আনে,

তুলিব দেবতা করি মানুষেরে মাের ছন্দে গানে।

ভগবন, ত্রিভুবন তােমাদের প্রত্যক্ষে বিরাজে

কহ মােরে কার নাম অমর বীণার ছন্দে বাজে।

কহ মােরে বীর্য্য কার ক্ষমারে করে না অতিক্রম,

কাহার চরিত্র ঘেরি সুকঠিন ধর্ম্মের নিয়ম

ধরেছে সুন্দর কান্তি মাণিক্যের অঙ্গদের মত,

মহৈশ্বর্যে আছে নম্র, মহা দৈন্যে কে হয়নি নত,

সম্পদে কে থাকে ভয়ে, বিপদে কে একান্ত নির্ভীক,

কে পেয়েছে সব চেয়ে, কে দিয়েছে তাহার অধিক,

কে ল’য়েছে নিজ শিরে রাজভালে মুকুটের সম

সবিনয়ে সগৌরবে ধরামাঝে দুঃখ মহত্তম,—

কহ মােরে সর্ব্বদর্শী হে দেবর্ষি তাঁর পুণ্য নাম।

নারদ কহিলা ধীরে-অযযাধ্যার রঘুপতি রাম।

জানি আমি জানি তাঁরে, শুনেছি তাহার কীর্ত্তিকথা,

কহিলা বাল্মীকি, তবু নাহি জানি সমগ্র বারতা,

সকল ঘটনা তাঁর-ইতিবৃত্ত রচিব কেমনে?

পাছে সত্যভ্রষ্ট হই, এই ভয় জাগে মাের মনে।—

নারদ কহিলা হাসি, সেই সত্য, যা’ রচিবে তুমি,

ঘটে যা’ তা সব সত্য নহে। কবি, তব মনােভূমি

রামের জনমস্থান, অযােধ্যার চেয়ে সত্য জেনো।—

এত বলি দেবদূত মিলাইল দিব্য-স্বপ্ন-হেন

সুদূর সপ্তর্ষি লােকে। বাল্মীকি বসিলা ধ্যানাসনে,

তমসা রহিল মৌন, স্তব্ধতা জাগিল তপােবন।

কথা ও কাহিনী · মস্তক বিক্রয়

মস্তক বিক্রয়

(মহাবত্ত্ববদান )

কোশল নৃপতির তুলনা নাই,

জগৎ জুড়ি যশােগাথা;

ক্ষীণের তিনি সদা শরণ ঠাঁই,

দীনের তিনি পিতামাতা।

সে কথা কাশীরাজ শুনিতে পেয়ে

জ্বলিয়া মরে অভিমানে;—

আমার প্রজাগণ আমার চেয়ে

তাহারে বড় করি মানে?

আমার হ’তে যার আসন নীচে

তা’র দান হ’ল বেশি?

ধর্ম্ম দয়া মায়া সকলি মিছে,

এ শুধু তা’র রেষারেষি।”

কহিলা “সেনাপতি, ধর কৃপাণ,

সৈন্য কর সব জড়।

আমার চেয়ে হবে পুণ্যবান্,

স্পর্দ্ধা বাড়িয়াছে বড়।”

চলিল কাশীরাজ যুদ্ধসাজে,—

কোশলরাজ হারি রণে

রাজ্য ছাড়ি দিয়া ক্ষুব্ধ লাজে

পলায়ে গেল দূরবনে।

কাশীর রাজা হাসি কহে তখন

আপন সভাসদ মাঝে-

“ক্ষমতা আছে যার রাখিতে ধন

তা’রেই দাতা হওয়া সাজে।”

সকলে কাঁদি বলে—“দারুণ রাহু

এমন চাঁদেরেও হানে?

লক্ষী খোঁজে শুধু বলীর বাহু

চাহে না ধর্ম্মের পানে।”

“আমরা হইলাম পিতৃহারা”-

কাঁদিয়া কহে দশদিক-

“সকল জগতের বন্ধু যাঁরা

তাঁদের শত্রুরে ধিক্।”

শুনিয়া কাশীরাজ উঠিল রাগি’

“নগরে কেন এত শােক?

আমি ত আছি তবু কাহার লাগি

কাঁদিয়া মরে যত লােক?

আমার বাহুবলে হারিয়া তবু

আমারে করিবে সে জয়?

অরির শেষ নাহি রাখিবে কভু

শাস্ত্রে এই মত কয়।

মন্ত্রী রটি দাও নগর মাঝে,

ঘােষণা কর চারিধারে—

যে ধরি আনি দিবে কোশলরাজে

কনক শত দিব তা’রে।”

ফিরিয়া রাজদূত সকল বাটি

রটনা করে দিনরাত।

যে শোনে, আঁখি মুদি রসনা কাটি

শিহরি কানে দেয় হাত।

রাজ্যহীন রাজা গহনে ফিরে

মলিন চীর দীনবেশে।

পথিক একজন অশ্রুনীরে

একদা শুধাইল এসে,—

“কোথা গাে বনবাসী বনের শেষ,

কোশলে যাব কোন্ মুখে?”

শুনিয়া রাজা কহে, “অভাগা দেশ,

সেথায় যাবে কোন্ দুখে?”

পথিক কহে “আমি বণিকজাতি,

ডুবিয়া গেছে মাের তরী।

এখন্ দ্বারে দ্বারে হস্ত পাতি

কেমনে র’ব প্রাণ ধরি।

করুণা-পারাবার কোশলপতি

শুনেছি নাম চারিধারে,

অনাথনাথ তিনি দীনের গতি,

চলেছে দীন তাঁরি দ্বারে।”

শুনিয়া নৃপসুত ঈষৎ হেসে

রুধিলা নয়নের বারি,

নীরবে ক্ষণকাল ভাবিয়া শেষে

কহিলা নিশ্বাস ছাড়ি,—

“পান্থ যেথা তব বাসনা পূরে

দেখায়ে দিব তারি পথ।

এসেছ বহু দুখে অনেক দূরে

সিদ্ধ হবে মনােরথ।”

বসিয়া কাশীরাজ সভার মাঝে;

দাঁড়াল জটাধারী এসে।

“হেথায় আগমন কিসের কাজে

নৃপতি শুধাইল হেসে।

“কোশলরাজ আমি, বন-ভবন”

কহিল বনবাসী ধীরে,—

“আমার ধরা পেলে যা দিবে পণ

দেহ তা মাের সাথীটিরে।”

উঠিল চমকিয়া সভার লােকে,

নীরব হ’ল গৃহতল,

বর্ম্ম-আবরিত দ্বারীর চোখে

অশ্রু করে ছলছল।

মৌন রহি রাজা ক্ষণেক তরে

হাসিয়া কহে—“ওহে বন্দী,

মরিয়া হবে জয়ী আমার পরে

এমনি করিয়াছ ফন্দী?

তােমার সে আশায় হানিব বাজ,

জিনিব আজিকার রণে,

রাজ্য ফিরি দিব, হে মহারাজ,

হৃদয় দিব তারি সনে।”

জীর্ণ-চীর-পরা বনবাসীরে

বসাল নৃপ রাজাসনে,

মুকুট তুলি দিল মলিন শিরে,

ধন্য কহে পুরজনে।

২১শে কার্তিক, ১৩০৪।

কথা ও কাহিনী · মানী

মানী

আরঙজেব ভারত যবে

করিতেছিল খান্-খান্-

মারব-পতি কহিলা আসি—

করহ প্রভু অবধান—

গােপনরাতে অচলগড়ে

নহ যারে এনেছে ধরে’

বন্দী তিনি আমার ঘরে

সিরােহিপতি সুরতান,

কি অভিলাষ তাঁহার পরে

আদেশ মােরে কর দান।

শুনিয়া কহে আরঙজেব

কি কথা শুনি অদ্ভুত।

এতদিনে কি পড়িল ধরা

অশনিভরা বিদ্যুৎ?

পাহাড়ী ল’য়ে কয়েক শত

পাহাড়ে বনে ফিরিতে রত,

মরুভূমির মরীচিমত

স্বাধীন ছিল রাজপুত।

দেখিতে চাহি,—আনিতে তা’রে

পাঠাও কোনাে রাজদূত।

মাড়ােয়া-রাজ যশােবন্ত

কহিলা তবে জোড়কর,—

ক্ষত্রকুল-সিংহশিশু

লয়েছে আজি মাের ঘর,—

বাদশা তাঁরে দেখিতে চান

বচন আগে করুন দান

কিছুতে কোনাে অসম্মান

হবে না কভু তাঁর পর,—

সভায় তবে আপনি তাঁরে

আনিব করি সমাদর।

আরঙজেব কহিলা হাসি

কেমন কথা কহ আজ।

প্রবীণ তুমি প্রবল বীর

মড়োয়াপতি মহারাজ।

তােমার মুখে এমন বাণী

শুনিয়া মনে সরম মানি,

মানীর মান করিব হানি

মানীরে শােভে হেন কাজ!

কহিনু আমি, চিন্তা নাহি,

আনহ তাঁরে সভামাঝ।

সিরোহিপতি সভায় আসে

মাড়ােয়ারাজে ল’য়ে সাথ;

উচ্চশির উচ্চে রাখি

সমুখে করে আঁখিপাত।

কহিল সবে বজ্রনাদে—

সেলাম কর বাদশাজাদে,—

হেলিয়া যশােবন্ত-কাঁধে

কহিলা ধীরে নরনাথ,—

গুরুজনের চরণ-ছাড়া

করিনে কারে প্রণিপাত।

কহিলা রােষে রক্ত আঁখি

বাদসাহের অনুচর-

শিখাতে পারি কেমনে মাথা

লুটিয়া পড়ে ভূমিপর।

হাসিয় কহে সিরােহিপতি

এমন যেন না হয় মতি

ভয়েতে কারে করিব নতি,

জানিনে কভু ভয় ডর।

এতেক বলি দাঁড়াল রাজা

কৃপাণ পরে করি ভর।

বাদশা ধরি সুরতানেরে

বসায়ে নিল নিজপাশ।

কহিলা, বীর, ভারত মাঝে

কি দেশ পরে তব আশ?

কহিলা রাজা, অচলগড়

দেশের সেরা জগত-পর,—

সভার মাঝে পরস্পর

নীরবে উঠে পরিহাস।

বাদশা কহে অচল হ’য়ে

অচলগড়ে কর বাস।

১লা কার্তিক, ১৩০৬

মালিনী

মালিনী

মালিনী

প্রথম দৃশ্য

রাজান্তঃপুর

মালিনী ও কাশ্যপ

কাশ্যপ

ত্যাগ কর, বৎসে, ত্যাগ কর, সুখআশা,

দুঃখভয়; দূর কর বিষয়-পিপাসা;

ছিন্ন কর সংসারবন্ধন; পরিহর

প্রমোদপ্রলাপ চঞ্চলতা; চিত্তে ধর

ধ্রুবশান্ত সুনির্ম্মল প্রজ্ঞার আলোক

রাত্রিদিন;–মোহশোক পরাভূত হোক।

মালিনী

ভগবন্ রুদ্ধ আমি, নাহি হেরি চোখে;

সন্ধ্যায় মুদ্রিতদল পদ্মের কোরকে

আবদ্ধ ভ্রমরী,স্বর্ণরেণুরাশিমাঝে

মৃত জড়প্রায়। তবু কানে এসে বাজে

মুক্তির সঙ্গীত, তুমি কৃপা কর যবে।

কাশ্যপ

আশীর্বাদ করিলাম, অবসান হ’বে

বিভাবরী, -জ্ঞানসূর্য-উদয়-উৎসবে

জাগ্রত এ জগতের জয়জয়রবে

শুভলগ্নে সুপ্রভাতে হবে উদঘাটন

পুষ্পকারাগার তব। সেই মহাক্ষণ

এসেছে নিকটে। আমি তবে চলিলাম

তীর্থ পর্য্যটনে।

মালিনী

লহ দাসীর প্রণাম।

(কাশ্যপের প্রস্থান)

মহাক্ষণ আসিয়াছে! অন্তর চঞ্চল

যেন বারিবিন্দুসম করে টলমল

পদ্মদলে। নেত্র মুদি’ শুনিতেছি কানে

আকাশের কোলাহল; কাহারা কে জানে

কি করিছে আয়ােজন আমারে ঘিরিয়া,

আসিতেছে যাইতেছে ফিরিয়া ফিরিয়া

অদৃশ্য মুরতি। কভু বিদ্যুতের মত

চমকিছে আলাে; বায়ুর তরঙ্গ যত

শব্দ করি’ করিছে আঘাত। ব্যথাসম

কি যেন বাজিছে আজি অন্তরেতে মম

বারম্বার—কিছু আমি নারি বুঝিবারে

জগতে কাহারা আজি ডাকিছে আমারে।

রাজমহিষীর প্রবেশ

মহিষী

মা গাে মা, কি করি তােরে ল’য়ে! ওরে বাছা,

এ সব কি সাজে তােরে কভু, এই কাঁচা

নবীন বয়সে? কোথা গেল বেশভূষা

কোথা আভরণ? আমার সােনার ঊষা

স্বর্ণপ্রভাহীনা; এও কি চোখের পরে

সহ্য হয় মার?

মালিনী

কখনাে রাজার ঘরে

জন্মে না কি ভিখারিণী? দরিদ্রের কুলে

তুই যে মা জন্মেছিস্ সে কি গেলি ভুলে

রাজেশ্বরী? তাের সে বাপের দরিদ্রতা

জগৎবিখ্যাত, বল্ মা সে যাবে কোথা?

তাই আমি ধরিয়াছি অলঙ্কারসম

তমার বাপের দৈন্য সর্ব্বঅঙ্গে মম

মা আমার।

মহিষী

ও গাে, আপন বাপের গর্ব্বে

আমার বাপেরে দাও খোঁটা? তাই গর্ভে

ধরেছিনু তােরে, ওরে অহঙ্কারী মেয়ে?

জানিস, আমার পিতা তাের পিতাচেয়ে

শতগুণে ধনী, তাই ধনরত্ন পানে

এত তাঁর হেলা!

মালিনী

সে ত সকলেই জানে।

যেদিন পিতৃব্য তব, পিতৃধনলােভে

বঞ্চিলেন পিতারে তােমার, মনক্ষোভে

ছাড়িলেন গৃহ তিনি। সর্ব্ব ধনজন

সম্পদসহায় করিলেন বিসর্জ্জন

অকাতর মনে; শুধু সযত্নে আনিলা

পৈতৃক দেবতামূর্ত্তি, শালগ্রাম শিলা,

দরিদ্রকুটীরে। সেই তাঁর ধর্ম্মখানি

মাের জন্মকালে মােরে দিয়েছ মা আনি’

আর কিছু নহে। থাক্ না মা সর্ব্বক্ষণ

তব পিতৃভবনের দরিদ্রের ধন

তােমারি কন্যার হৃদে। আমার পিতার

যা কিছু ঐশ্বর্য আছে ধনরত্নভার

থাক্‌ রাজপুত্র তরে।

মহিষী

কে তােমারে বােঝে

মা আমার। কথা শুনে জানি না কেন যে

চক্ষে আসে জল। যেদিন আসিলি কোলে

বাক্যহীন মূঢ় শিশু, ক্রন্দনকল্লোলে

মায়েরে ব্যাকুল করি, কে জানিত তবে

সেই ক্ষুদ্র মুগ্ধ মুখ এত কথা ক’বে

দুই দিন পরে! থাকি তাের মুখ চেয়ে,

ভয়ে কাঁপে বুক। ও মোর সোনার মেয়ে

এ ধর্ম্ম কোথায় পেলি, কি শাস্ত্রবচন?

আমার পিতার ধর্ম্ম সে ত পুরাতন

অনাদি কালের। কিন্তু মাগাে, এ যে তব

সৃষ্টিছাড়া বেদছাড়া ধর্ম্ম অভিনব

আজিকার গড়া। কোথা হ’তে ঘরে আসে

বিধর্ম্মী সন্ন্যাসী? দেখে’ আমি মরি ত্রাসে।

কি মন্ত্র শিখায় তা’রা, সরল হৃদয়

জড়ায় মিথ্যার জালে? লােকে না কি কয়

বৌদ্ধেরা পিশাচপন্থী, যাদুবিদ্যা জানে,

প্রেতসিদ্ধ তা’রা। মাের কথা লহ কানে

বাছারে আমার। -ধর্ম্ম কি খুঁজিতে হয়?

সূর্যের মতন ধর্ম্ম চিরজ্যোতির্ম্ময়

চিরকাল আছে। ধর তুমি সেই ধর্ম্ম,

সরল সে পথ। লহ ব্রতক্রিয়াকর্ম্ম

ভক্তিভরে। শিবপূজা কর দিনযামী,

বর মাগি’ লহ বাছা তাঁরি মত স্বামী।

সেই পতি হবে তাের সমস্ত দেবতা,

শাস্ত্র হবে তাঁরি বাক্য, সরল এ কথা।

শাস্ত্রজ্ঞানী পণ্ডিতেরা মরুক ভাবিয়া

সত্যাসত্য ধর্ম্মাধর্ম্ম কর্ত্তাকর্ম্মক্রিয়া

অনুস্বর চন্দ্রবিন্দু ল’য়ে! পুরুষের

দেশভেদে কালভেদে প্রতিদিবসের

স্বতন্ত্র নূতন ধর্ম্ম; সদা হাহা করে’

ফিরে তা’রা শান্তি লাগি’ সন্দেহ-সাগরে,

শাস্ত্র ল’য়ে করে কাটাকাটি। রমণীর

ধর্ম্ম থাকে বক্ষে কোলে চিরদিন স্থির

পতিপুত্ররূপে!

রাজার প্রবেশ

রাজা

কন্যা, ক্ষান্ত হও এবে,

কিছুদিনতরে। উপরে আসিছে নেবে

ঝটিকার মেঘ।

মহিষী

কোথা হ’তে মিথ্যা ভয়

আনিয়াছ মহারাজ?

রাজা

বড় মিথ্যা নয়।

হায়রে অবােধ মেয়ে, নবধর্ম্ম যদি

ঘরেতে আনিতে চাস্, সে কি বর্ষানদী

একেবারে তট ভেঙে হইবে প্রকাশ

দেশবিদেশের দৃষ্টিপথে? লজ্জাত্রাস

নাহি তা’র? আপনার ধর্ম্ম আপনারি,

থাকে যেন সঙ্গোপনে, সর্ব্বনরনারী

দেখে’ যেন নাহি করে দ্বেষ, পরিহাস

না করে কঠোর। ধর্ম্মেরে রাখিতে চাস

রাখ মনেমনে।

মহিষী

ভর্তসনা করিছ কেন

বাছারে আমার মহারাজ? কত যেন

অপরাধী। কি শিক্ষা শিখাতে এলে আজ

রাজনীতিকুটিলতা? লুকায়ে করিবে কাজ,

ধর্ম্ম দিবে চাপা! সে মেয়ে আমার নয়।

সাধু সন্ন্যাসীর কাছে উপদেশ লয়,

শুনে পুণ্যকথা, করে সজ্জনের সেবা,

আমি ত বুঝি না তাহে দোষ দিবে কেবা,

ভয় বা কাহারে!

রাজা

মহারাণী, প্রজাগণ

ক্ষুব্ধ অতিশয়। চাহে তা’রা নির্বাসন

মালিনীর?

মহিষী

কি বলিলে! নির্ব্বাসন কারে!

মালিনীরে? মহারাজ, তােমার কন্যারে?

রাজা

ধর্ম্মনাশ আশঙ্কায় ব্রাহ্মণের দল

এক হ’য়ে—

মহিষী

ধর্ম্ম জানে ব্রাহ্মণে কেবল?

আর ধর্ম নাই? তাদেরি পুঁথিতে লেখা

সর্ব্ব সত্য, অন্য কোথা নাহি তা’র রেখা

এ বিশ্বসংসারে? ব্রাহ্মণেরা কোথা আছে।

ডেকে নিয়ে এস। আমার মেয়ের কাছে

শিখে নি ধর্ম্ম কারে বলে। ফেলে দিক

কীটে কাটা ধর্ম্ম তা’র ধিক্‌, ধিক্ ধিক্!

ওরে বাছা, আমি লব নবমন্ত্র তাের,

আমি ছিন্ন করে’ দেব’ জীর্ণ শাস্ত্রডাের

ব্রাহ্মণের। তােমারে পাঠাবে নির্ব্বাসনে?

নিশ্চিন্ত রয়েছ মহারাজ? ভাব মনে

এ কন্যা তোমার কন্যা, সামান্য বালিকা,

ওগাে তাহা নহে। এ যে দীপ্ত অগ্নিশিখা।

আমি কহিলাম আজি শুনি লহ কথা—

এ কন্যা মানবী নহে, এ কোন্ দেবতা,

এসেছে তােমার ঘরে। করিয়াে না হেলা,

কোন দিন অকস্মাৎ ভেঙে দিয়ে খেলা

চলে যাবে-তখন করিবে হাহাকার-

রাজ্যধন সব দিয়ে পাইবে না আর।

মালিনী

প্রজাদের পূরাও প্রার্থনা। মহাক্ষণ

এসেছে নিকটে। দাও মােরে নির্ব্বাসন

পিতা।

রাজা

কেন বৎসে, পিতার ভবনে তাের

কি অভাব? বাহিরের সংসার কঠোর

দয়াহীন, সে কি বাছা পিতৃমাতৃক্রোড়?

মালিনী

শােন পিতা,—যারা চাহে নির্ব্বাসন মাের

তা’রা চাহে মােরে। ওগাে মা, শােন্ মা কথা!

বােঝাতে পারিনে মোর চিত্তব্যাকুলতা।

আমারে ছাড়িয়া দে মা বিনা দুঃখশােকে,

শাখা হ’তে চ্যুতপত্রসম। সর্ব্বলােকে

যাব আমি -রাজদ্বারে মােরে যাচিয়াছে

বাহির সংসার। জানি না কি কাজ আছে,

আসিয়াছে মহাক্ষণ।

রাজা

ওরে শিশুমতি

কি কথা বলিস্!

মালিনী

পিতা, তুমি নরপতি,

রাজার কর্ত্তব্য কর। জননী আমার,

আছে তাের পুত্রকন্যা, এ ঘরসংসার,

আমারে ছাড়িয়া দে মা। বাঁধিসনে আর

স্নেহপাশে।

মহিষী

শােন কথা শােন একবার।

বাক্য নাহি সরে মুখে, চেয়ে তাের পানে

রয়েছি বিস্মিত। হাঁ গাে, জন্মিলি যেখানে

সেখানে কি স্থান নাই তাের? মা আমার,

তুই কি জগৎলক্ষী, জগতের ভার

পড়েছে কি তােরি পরে? নিখিল সংসার

তুই বিনা মাতৃহীনা, যাবি তারি কাছে

নূতন আদরে;—আমাদের মা কে আছে

তুই চলে’ গেলে?

মালিনী

আমি স্বপ্ন দেখি জেগে,

শুনি নিদ্রাঘােরে, যেন বায়ু বহে বেগে,

নদীতে উঠিছে ঢেউ, রাত্রি অন্ধকার,

নৌকাখানি তীরে বাঁধা—কে করিবে পার,

কর্ণধার নাই-গৃহহীন যাত্রী সবে

বসে’ আছে নিরাশ্বাস—মনে হয় তবে

আমি যেন যেতে পারি—আমি যেন জানি

তীরের সন্ধান-মাের স্পর্শে নৌকাখানি

পাবে যেন প্রাণ—যাবে যেন আপনার

পূর্ণ বলে;—কোথা হ’তে বিশ্বাস আমার

এল মনে? রাজকন্যা আমি,—দেখি নাই

বাহির সংসার—বসে’ আছি এক ঠাই

জন্মাবধি, চতুর্দ্দিকে সুখের প্রাচীর,

আমারে কে করে’ দেয় ঘরের বাহির

কে জানে গাে। বন্ধ কেটে দাও মহারাজ,

ওগাে ছেড়ে দে মা, কন্যা আমি নহি আজ,

নহি রাজসুতা,—যে মাের অন্তরযামী

অগ্নিময়ী মহাবাণী, সেই শুধু আমি।

মহিষী

শুনিলে ত মহারাজ? এ কথা কাহার?

শুনিয়া বুঝিতে নারি! এ কি বালিকার?

এই কি তােমার কন্যা? আমি কি আপনি

ইহারে ধরেছি গর্ভে?

রাজা

যেমন রজনী

উষারে জনম দেয়। কন্যা জ্যোতির্ম্ময়ী

রজনীর কেহ নহে, সে যে বিশ্বজয়ী

বিশ্বে দেয় প্রাণ।

মহিষী

মহারাজ তাই বলি,

খুঁজে দেখ কোথা আছে মায়ার শিকলি

যাহে বাঁধা পড়ে’ যায় আলোকপ্রতিমা।

( কন্যার প্রতি)

মুখে খুলে পড়ে কেশ, একি বেশ! ছি মা!

আপনারে এত অনাদর। আয় দেখি

ভালাে করে বেঁধে দিই। লােকে বলিবে কি

দেখে তােরে?—নির্ব্বাসন! এই যদি হয়

ধর্ম্ম ব্রাহ্মণের—তবে হােক মা উদয়

নব ধর্ম্ম-শিখে নিক তােরি কাছ হ’তে

বিপ্রগণ। দেখি মুখ, আয় মা আলােতে।

( মহিষী ও মালিনীর প্রস্থান)

সেনাপতির প্রবেশ

সেনাপতি

মহারাজ, বিদ্রোহী হয়েছে প্রজাগণ

ব্রাহ্মণবচনে! তা’রা চায় নির্ব্বাসন

রাজকুমারীর।

রাজা

যাও তবে সেনাপতি

সামন্তনৃপতি সবে আন দ্রুতগতি।

(রাজা ও সেনাপতির প্রস্থান)

দ্বিতীয় দৃশ্য

মন্দিরপ্রাঙ্গণে ব্রাহ্মণগণ

ব্রাহ্মণগণ

নির্ব্বাসন, নির্ব্বাসন, রাজ-দুহিতার

নির্ব্বাসন।

ক্ষেমঙ্কর

বিপ্রগণ, এই কথা সার।

এ সংকল্প দৃঢ় রেখাে মনে। জেনাে ভাই

অন্য অরি নাহি ডরি নারীরে ডরাই।

তা’র কাছে অস্ত্র যায় টুটে; পরাহত

তর্কযুক্তি, বাহুবল করে শির নত—

নিরাপদে হৃদয়ের মাঝে করে বাস

রাজ্ঞীসম মনােহর মহাসর্ব্বনাশ।

চারুদত্ত

চল সবে রাজদ্বারে, বল, “রক্ষ রক্ষ

মহারাজ, আর্য্যধর্ম্মে করিতেছে লক্ষ্য

তব নীড় হ’তে সর্প।”

সুপ্রিয়

ধর্ম্ম? মহাশয়,

মূঢ়ে উপদেশ দেহ ধর্ম্ম কারে কয়।

ধর্ম্ম নির্দ্দোষীর নির্ব্বাসন?

চারুদত্ত

তুমি দেখি

কুলশত্রু বিভীষণ। সকল কাজে কি

বাধা দিতে আছ?

সােমাচার্য্য

মােরা ব্রাহ্মণ-সমাজে

একত্রে মিলেছি সবে ধর্ম্মরক্ষাকাজে;

তুমি কোথা হ’তে এসে মাঝে দিলে দেখা

অতিশয় সুনিপুণ বিচ্ছেদের রেখা,

সূক্ষম সর্ব্বনাশ।

সুপ্রিয়

ধর্ম্মাধর্ম সত্যাসত্য

কে করে বিচার! আপন বিশ্বাসে মত্ত

করিয়াছ স্থির, শুধু দল বেঁধে সবে

সত্যের মীমাংসা হবে, শুধু উচ্চরবে?

যুক্তি কিছু নহে?

চারুদত্ত

দস্ত তব অতিশয়

হে সুপ্রিয়।

সুপ্রিয়

প্রিয়ম্বদ, মাের দম্ভ নয়;—

আমি অজ্ঞ অতি-দম্ভ তারি যে আজিকে

শতার্থক শাস্ত্র হ’তে দুটো কথা শিখে

নিস্পাপ নিরপরাধ রাজকুমারীরে

টানিয়া আনিতে চাহে ঘরের বাহিরে

ভিক্ষুকের পথে,—তাঁর শাস্ত্রে মাের শাস্ত্রে

দু অক্ষর প্রভেদ বলিয়া।

ক্ষেমঙ্কর

বচনাস্ত্রে

কে পারে তােমারে বন্ধুবর!

সােমাচার্য্য

দূর করে’

দাও সুপ্রিয়েরে। বিপ্রগণ কর ওরে

সভার বাহির।

চারুদত্ত

মােরা নির্ব্বাসন চাহি

রাজকুমারীর। যার অভিমত নাহি

যাক সে বাহিরে।

ক্ষেমঙ্কর

ক্ষান্ত হও বন্ধুগণ।

সুপ্রিয়

ভ্রমক্রমে আমারে করেছে নির্ব্বাচন

ব্রাহ্মণমণ্ডলী। আমি নহি একজন

তােমাদের ছায়া। প্রতিধ্বনি নহি আমি

শাস্ত্রবচনের। যে শাস্ত্রের অনুগামী

এ ব্রাহ্মণ, সে শাস্ত্রে কোথাও লেখে নাই

শক্তি যার ধর্ম্ম তা’র।

(ক্ষেমঙ্করের প্রতি) চলিলাম ভাই!

আমারে বিদায় দাও।

ক্ষেমঙ্কর

দিব না বিদায়।

তর্কে শুধু দ্বিধা তব, কাজের বেলায়

দৃঢ় তুমি পর্বতের মত। বন্ধু মাের,

জান না কি আসিয়াছে দুঃসময় ঘাের,

আজ মৌন থাক।

সুপ্রিয়

বন্ধু, জন্মেছে ধিক্কার।

মূঢ়তার দুর্ব্বিনয় নাহি সহে আর।

যাগযজ্ঞ ক্রিয়াকর্ম্ম ব্রত উপবাস

এই শুধু ধর্ম্ম বলে’ করিবে বিশ্বাস

নিঃসংশয়ে? বালিকারে দিয়া নির্ব্বাসনে

সেই ধর্ম্ম রক্ষা হবে? ভেবে দেখ মনে

মিথ্যারে সে সত্য বলি করেনি প্রচার,—

সেও বলে সত্য ধর্ম্ম, দয়া ধর্ম্ম তা’র,

সর্ব্বজীবে প্রেম;—সর্ব্বধর্ম্মে সেই সার,—

তা’র বেশি যাহা আছে, প্রমাণ কি তা’র!

ক্ষেমঙ্কর

স্থির হও ভাই। মূল ধর্ম্ম এক বটে,

বিভিন্ন আধার। জল এক, ভিন্ন তটে

ভিন্ন জলাশয়। আমরা যে সরােবরে

মিটাই পিপাসা পিতৃপিতামহ ধরে’

সেথা যদি অকস্মাৎ নবজলােচ্ছ্বাস

বন্যার মত আসে, ভেঙে করে নাশ

তটভূমি তার,—সে উচ্ছ্বাস হ’লে গত

বাঁধ-ভাঙা সরােবরে জলরাশি যত

বাহির হইয়া যাবে। তোমার অন্তরে

উৎস আছে, প্রয়ােজন নাহি সরােবরে,—

তাই বলে’ ভাগ্যহীন সর্ব্বজনতরে

সাধারণ জলাশয় রাখিবে না তুমি,—

পৈতৃককালের বাঁধা দৃঢ় তটভূমি,

বহুদিবসের প্রেমে সতত লালিত

সৌন্দর্য্যের শ্যামলতা, সযত্নপালিত

পুরাতন ছায়াতরুগুলি, পিতৃধর্ম্ম,

প্রাণপ্রিয় প্রথা, চির-আচরিত কর্ম্ম,

চিরপরিচিত নীতি? হারায়ে চেতন

সত্য জননীর কোলে নিদ্রায় মগন

কত মূঢ় শিশু, নাহি জানে জননীরে,—

তাদের চেতনা দিতে মাতার শরীরে

কোরাে না আঘাত। ধৈর্য্য সদা রাখ, সখে,

ক্ষমা কর ক্ষমাযােগ্য জনে, জ্ঞানালােকে

আপন কর্ত্তব্য কর।

সুপ্রিয়

তব পথগামী

চিরদিন এ অধীন। রেখে দিব আমি

তব বাক্য শিরে করি'। তর্ক-সূচি পরে

সংসারকর্ত্তব্যভার কভু নাহি ধরে।

উগ্রসেনের প্রবেশ

উগ্রসেন

কার্য্য সিদ্ধ ক্ষেমঙ্কর! হয়েছে চঞ্চল

ব্রাহ্মণের বাক্য শুনে রাজসৈন্যদল,

আজি বাঁধ ভাঙে-ভাঙে!

সােমাচার্য্য

সৈন্যদল!

চারুদত্ত

সে কি!

একি কাণ্ড, ক্রমে এযে বিপরীত দেখি

বিদ্রোহের মত!

সােমাচার্য্য

এতদূর ভালাে নয়

ক্ষেমঙ্কর।

চারুদত্ত

ধর্ম্মবলে ব্রাহ্মণের জয়,

বাহুবলে নহে। যজ্ঞযাগে সিদ্ধি হবে;

দ্বিগুণ উৎসাহভরে এস বন্ধু সবে

করি মন্ত্র পাঠ। শুদ্ধাচারে যােগাসনে

ব্রহ্মতেজ করি উপার্জ্জন। একমনে

পৃজি ইষ্টদেবে।

সােমাচার্য্য

তুমি কোথা আছ দেবি,

সিদ্ধিদাত্রী জগদ্ধাত্রী! তব পদ সেবি’

ব্যর্থকাম কভু নাহি হবে ভক্তজন।

তুমি কর নাস্তিকের দর্পসংহরণ,

সশরীরে প্রত্যক্ষ দেখায়ে দাও আজি

বিশ্বাসের বল। সংহারের বেশে সাজি’

এখনি দাঁড়াও সর্ব্বসম্মুখেতে আসি

মুক্তকেশে খড়গহস্তে, অট্টহাস হাসি’

পাষণ্ডদলনী। এস সবে একপ্রাণ

ভক্তিভরে সমস্বরে করহ আহবান

প্রলয়শক্তিরে।

ব্রাহ্মণগণ

(সমস্বরে) সবে করযােড়ে যাচি-

আয় মা প্রলয়ঙ্করী।

মালিনীর প্রবেশ

মালিনী

আমি আসিয়াছি।

(ক্ষেমঙ্কর ও সুপ্রিয় ব্যতীত সমস্ত ব্রাহ্মণের

ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম)

সােমাচার্য্য

এ কি দেবী, এ কি বেশ? দয়াময়ী এ যে

এসেছেন ম্লানবস্ত্রে নরকন্যা সেজে।

এ কি অপরূপ রূপ। এ কি স্নেহজ্যোতি

নেত্রযুগে? এ ত নহে সংহারমূরতি!

কোথা হ’তে এলে মাতঃ? কি ভাবিয়া মনে,

কি করিতে কাজ?

মালিনী

আসিয়াছি নির্ব্বাসনে,

তােমরা ডেকেছ বলে’ ওগাে বিপ্রগণ।

সােমাচার্য্য

নির্ব্বাসন! স্বর্গ হ’তে দেব-নির্ব্বাসন

ভক্তের আহ্বানে!

চারুদত্ত

হায়, কি করিব মাতঃ!

তােমার সহায় বিনা আর রহে না ত

এ ভ্রষ্ট সংসার!

মালিনী

আমি ফিরিব না আর।

জানিতাম, জানিতাম তােমাদের দ্বার

মুক্ত আছে মাের তরে। আমারি লাগিয়া

আছ বসে’ তাই আমি উঠেছি জাগিয়া

সুখসম্পদের মাঝে, তােমরা যখন

সবে মিলি যাচিলে আমার নির্ব্বাসন

রাজদ্বারে।

ক্ষেমঙ্কর

রাজকন্যা?

সকলে

রাজার দুহিতা!

সুপ্রিয়

ধন্য ধন্য!

মালিনী

আমারে করেছ নির্ব্বাসিতা?

তাই আজি মাের গৃহ তােমাদের ঘরে।

তবু একবার মােরে বল সত্য করে’

সত্যই কি আছে কোনাে প্রয়ােজন মােরে,

চাহ কি আমায়? সত্যই কি নাম ধরে’

বাহিরসংসার হ’তে ডেকেছিলে সবে

আপন নির্জ্জনঘরে বসে ছিনু যবে

সমস্ত জগৎ হ’তে অতিশয় দূরে

শতভিত্তিঅন্তরালে রাজঅন্তঃপুরে

একাকী বালিকা। তবে সে ত স্বপ্ন নয়!

তাই ত কাঁদিয়াছিল আমার হৃদয়

না বুঝিয়া কিছু!

চারুদত্ত

এস মা জননী,

শত চিত্তশতদলে দাঁড়াও অমনি

করুণামাখানাে মুখে।

মালিনী

আসিয়াছি আজ-

প্রথমে শিখাও মােরে কি করিব কাজ

তােমাদের। জন্ম লভিয়াছি রাজকুলে,

রাজকন্যা আমি,—কখনাে গবাক্ষ খুলে

চাহিনি বাহিরে; দেখি নাই এ সংসার

বৃহৎ বিপুল,—কোথায় কি ব্যথা তা’র

জানি না ত কিছু। শুনিয়াছি দুঃখময়

বসুন্ধরা, সে দুঃখের লব পরিচয়

তােমাদের সাথে।

দেবদত্ত

ভাসি নয়নের জলে

মা তােমার কথা শুনে।

সকলে

আমরা সকলে

পাষণ্ড পামর।

মালিনী

আজি মাের মনে হয়

অমৃতের পাত্র যেন আমার হৃদয়—

যেন সে মিটাতে পারে এ বিশ্বের ক্ষুধা

যত দুঃখ যেথা আছে সকলের পরে

অনন্ত প্রবাহে।–দেখ দেখ নীলাম্বরে

মেঘ কেটে গিয়ে চাঁদ পেয়েছে প্রকাশ।

কি বৃহৎ লােকালয়—কি শান্ত আকাশ-

একজ্যোৎস্না বিস্তারিয়া সমস্ত জগৎ

কে নিল কুড়ায়ে বক্ষে —ওই রাজপথ,

ওই গৃহশ্রেণী, ওই উদার মন্দির-

স্তব্ধচ্ছায়া তরুরাজি—দূরে নদীতীর,

বাজিছে পূজার ঘণ্টা—আশ্চর্য্য পুলকে

পূরিছে আমার অঙ্গ— -জল আসে চোখে,

কোথা হ’তে এমু আমি আজি জ্যোৎস্নালােকে

তােমাদের এ বিস্তীর্ণ সর্বজনলােকে।

চারুদত্ত

তুমি বিশ্বদেবী।

সােমাচার্য্য

ধিক্ পাপ রসনায়!

শত ভাগে ফাটিয়া গেল না বেদনায়,—

চাহিল তােমার নির্ব্বাসন!

দেবদত্ত

চল সবে

বিপ্রগণ, জননীরে জয়জয়রবে

রেখে আসি রাজগৃহে।

সমবেত কণ্ঠে

জয় জননীর।

জয় মা লক্ষীর! জয় করুণাময়ীর!

(মালিনীকে ঘিরিয়া লইয়া সুপ্রিয় ক্ষেমঙ্কর ব্যতীত সকলের প্রস্থান)

ক্ষেমঙ্কর

দূর হােক্ মােহ, দূর হােক! কোথা যাও

হে সুপ্রিয়?

সুপ্রিয়

ছেড়ে দাও, মােরে ছেড়ে দাও।

ক্ষেমঙ্কর

স্থির হও। তুমি ও কি, বন্ধু, অন্ধভাবে

জনস্রোতে সর্ব্বসাথে ভেসে চলে’ যাবে?

সুপ্রিয়

এ কি স্বপ্ন ক্ষেমঙ্কর?

ক্ষেমঙ্কর

স্বপ্নে মগ্ন ছিলে

এতক্ষণ,—এখন সবলে চক্ষু মিলে

জেগে চেয়ে দেখ।

সুপ্রিয়

মিথ্যা তব স্বর্গধাম,

মিথ্যা দেবদেবী ক্ষেমঙ্কর-ভ্রমিলাম

বৃথা এ সংসারে এতকাল। পাই নাই

কোনাে তৃপ্তি কোনাে শাস্ত্রে, অন্তর সদাই

কেঁদেছে সংশয়ে। আজ আমি লভিয়াছি

ধর্ম্ম মাের, হৃদয়ের বড় কাছাকাছি।

সবার দেবতা তব, শাস্ত্রের দেবতা,

আমার দেবতা নহে। প্রাণ তা’র কোথা,

আমার অন্তরমাঝে কই কহে কথা,

কি প্রশ্নের দেয় সে উত্তর–কি ব্যথার

দেয় সে সান্ত্বনা! আজি, তুমি কে আমার

জীবন-তরণীপরে রাখিলে চরণ

সমস্ত জড়তা তা’র করিয়া হরণ

এ কি গতি দিলে তা’রে! এতদিনপরে

এ মর্ত্যধরণীমাঝে মানবের ঘরে

পেয়েছি দেবতা মাের।

ক্ষেমঙ্কর

হায় হায় সখে,

আপন হৃদয় যবে ভুলায় কুহকে

আপনারে, বড় ভয়ঙ্কর সে সময়-

শাস্ত্র হয় ইচ্ছা আপনার, ধর্ম্ম হয়

আপন কল্পনা। এই জ্যোৎস্নাময়ী নিশি

সে সৌন্দর্য্যে দিকে দিকে রহিয়াছে মিশি

ইহাই কি চিরস্থায়ী? কাল প্রাতঃকালে

শতলক্ষ ক্ষুধাগুলা শত কর্ম্মজালে

ঘিরিবে না ভবসিন্ধু—মহাকোলাহলে

হবে না কঠিন রণ বিশ্বরণস্থলে?

তখন এ জ্যোৎস্নাসুপ্তি স্বপ্নময়া বলে’

মনে হ’বে—অতি ক্ষীণ, অতি ছায়াময়।

যে সৌন্দর্য্যমোহ তব ঘিরেছে হৃদয়,

সেও সেই জ্যোৎস্নাসম-ধর্ম্ম বল তা’রে?

একবার চক্ষু মেলি চাও চারিধারে

কত দুঃখ, কত দৈন্য, বিকট নিরাশা!

ওই ধর্ম্মে মিটাইবে মধ্যাহ্নপিপাসা

তৃষ্ণাতুর জগতের? সংসারের মাঝে

ওই তব ক্ষীণ মােহ লাগিবে কি কাজে?

খররৌদ্রে দাঁড়াইয়া রণরঙ্গভূমে

তখনাে কি মগ্ন হ’য়ে র’বে এই ঘুমে

ভুলে র’বে স্বপ্নধর্ম্মে-আর কিছু নাহি?

নহে সখে।

সুপ্রিয়

নহে নহে।

ক্ষেমঙ্কর

তবে দেখ চাহি

সম্মুখে তােমার। বন্ধু, আর রক্ষা নাই।

এবার লাগিল অগ্নি। পুড়ে হবে ছাই

পুরাতন অট্টালিকা, উন্নত উদার,

সমস্ত ভারতখণ্ড কক্ষে কক্ষে যার

হয়েছে মানুষ। এখনাে যে দুনয়নে

স্বপ্ন লেগে আছে তব।

খাণ্ডবদহনে

সমস্ত বিহঙ্গকুল গগনে গগনে

উড়িয়া ফিরিয়াছিল করুণ ক্রন্দনে

স্বর্গ সমাচ্ছন্ন করি’ -বক্ষে রক্ষণীয়

অক্ষম শাবকগণে স্মরি। হে সুপ্রিয়,

সেই মত উদ্বেগ-অধীর পিতৃকুল

নানা স্বর্গ হ’তে আসি’ আশঙ্কা-ব্যাকুল

ফিরিছেন শূন্যে শূন্যে আর্ত্ত কলস্বরে

আসন্ন সঙ্কটাতুর ভারতের পরে।

তবু স্বপ্নে মগ্ন সখে।

দেখ মনে স্মরি,

আর্য্যধর্ম্ম মহাদুর্গ এ তীর্থনগরী

পুণ্যকাশী। দ্বারে হেথা কে আছে প্রহরী?

৯৭

সে কি আজ স্বপ্নে র’বে কর্ত্তব্য পাশরি

শত্রু যবে সমাগত, রাত্রি অন্ধকার,

মিত্র যবে গৃহদ্রোহী, পৌর পরিবার

নিশ্চেতন।—হে সুপ্রিয়, তুলে চাও আঁখি।

কথা কও। বল তুমি, আমারে একাকী

ফেলিয়া কি চলে’ যাবে মায়ার পশ্চাতে

বিশ্বব্যাপী এ দুর্য্যোগে, প্রলয়ের রাতে?

সুপ্রিয়

কভু নহে, কভু নহে। নিদ্রাহীন চোখে

দাঁড়াইব পার্শ্বে তব।

ক্ষেমঙ্কর

শুন তবে, সখে,

আমি চলিলাম।

সুপ্রিয়

কোথা যাবে?

ক্ষেমঙ্কর

দেশান্তরে,

হেথা কোনাে আশা নাহি আর। ঘরে পরে

ব্যাপ্ত হ’য়ে গেছে বহ্নি। বাহির হইতে

রক্তস্রোত মুক্ত করি হবে নিবাইতে।

যাই, সৈন্য আনি।

সুপ্রিয়

হেথাকার সৈন্যগণ

রয়েছে প্রস্তুত।

ক্ষেমঙ্কর

মিথ্যা আশা; এতক্ষণ

মুগ্ধ পঙ্গপালসম তা’রাও সকলে

দগ্ধপক্ষ পড়িয়াছে সব দলেবলে

হুতাশনে। জয়ধ্বনি ওই শুনা যায়।

উন্মত্তা নগরী আজ ধর্ম্মের চিতায়

জ্বালায় উৎসবদীপ।

সুপ্রিয়

যদি যাবে ভাই,

প্রবাসে কঠিনপণে, আমি সঙ্গে যাই।

ক্ষেমঙ্কর

তুমি কোথা যাবে বন্ধু? তুমি হেথা থেকো

সদা সাবধানে; সকল সংবাদ রেখাে

রাজভবনের। লিখাে পত্র। দেখাে সখে,

তুমিও ভুলাে না শেষে নূতন কুহকে,

ছেড়াে না আমায়। মনে রেখাে সর্ব্বক্ষণ

প্রবাসী বন্ধুরে।

সুপ্রিয়

সখে, কুহক নূতন,

আমি ত নূতন নহি। তুমি পুরাতন,

আর আমি পুরাতন।

ক্ষেমঙ্কর

দাও আলিঙ্গন।

সুপ্রিয়

প্রথম বিচ্ছেদ আজি। ছিনু চিরদিন

এক সাথে। বক্ষে বক্ষে বিরহবিহীন

চলেছিনু দোঁহে-আজ তুমি কোথা যাবে,

আমি কোথা র’ব!

ক্ষেমঙ্কর

আবার ফিরিয়া পাবে

বন্ধুরে তােমার। শুধু মনে ভয় হয়

আজি বিপ্লবের দিন বড় দুঃসময়;—

ছিন্নভিন্ন হ’য়ে যায় ধ্রুববন্ধচয়,

ভ্রাতারে আঘাত করে’ ভ্রাতা, বন্ধু হয়

বন্ধুর বিরােধী। বাহিরিনু অন্ধকারে,

অন্ধকারে ফিরিয়া আসিব গৃহদ্বারে;

দেখিব কি দীপ জ্বালি বসি’ আছ ঘরে

বন্ধু মাের? সেই আশা রহিল অন্তরে।

তৃতীয় দৃশ্য

অন্তঃপুরে মহিষী

মহিষী

এখানেও নাই! মাগাে, কি হবে আমার।

কেবলি এমনি করে’ কতদিন আর

চোখে চোখে রাখি তা’রে, ভয়ে ভয়ে থাকি,

রজনীতে ঘুম ভেঙে নাম ধরে’ ডাকি,

জেগে জেগে উঠি। চোখের আড়াল হ’লে

মনে শঙ্কা হয় কোথা গেল বুঝি চলে’

আমার সে স্বপ্নস্বরূপিণী। যাই, খুজি,

কোথা সে লুকায়ে আছে।

(প্রস্থান)

যুবরাজের সহিত রাজার প্রবেশ

রাজা

অবশেষে বুঝি

দিতে হ’ল নির্ব্বাসন।

যুবরাজ

না দেখি উপায়।

ত্বরা যদি নাহি কর রাজ্য তবে যায়

মহারাজ। সৈন্যগণ নগরপ্রহরী

হয়েছে বিদ্রোহী। স্নেহমােহ পরিহরি

কর্ত্তব্য সাধন কর—দাও মালিনীরে

অবিলম্বে নির্ব্বাসন!

রাজা

ধীরে, বৎস, ধীরে।

দিব তা’রে নির্ব্বাসন,—পূরাব প্রার্থনা-

সাধিব কর্ত্তব্য মাের।—মনে করিয়াে না

বৃদ্ধ আমি মােহমুগ্ধ, অন্তর দুর্ব্বল,

রাজধর্ম্ম তুচ্ছ করি ফেলি অশ্রুজল।

মহিষীর পুনঃপ্রবেশ

মহিষী

মহারাজ, মহারাজ, বল সত্য করে’

কোথা লুকায়েছ তা’রে কাঁদাইতে মােরে?

কোথায় সে?

রাজা

কে মহিষী?

মহিষী

মালিনী আমার।

রাজা

কোথায় সে? চলে’ গেছে? নাই ঘরে তা’র?

মহিষী

ওগাে নাই। যাও তুমি সৈন্যদল ল’য়ে

খোঁজ তা’রে পথে পথে আলয়ে আলয়ে,

কর ত্বরা। ওগাে তা’রে করিয়াছে চুরি

তােমার প্রজারা মিলে। নিষ্ঠুর চাতুরী

তাহাদের। দূর করে দাও সর্ব্বজনে।

শূন্য করে’ দাও এ নগরী, যতক্ষণে

ফিরে নাহি দেয় মালিনীরে।

রাজা

গেছে চলে’?

প্রতিজ্ঞা করিনু আমি ফিরাইব কোলে

কোলের কন্যারে মাের। রাজ্যে ধিক্ থাক!

ধিক ধর্ম্মহীন রাজনীতি! ডাক, ডাক্

সৈন্যদলে।

( যুবরাজের প্রস্থান)

মালিনীকে লইয়া সৈন্যগণ ও প্রজাগণের মশাল ও

সমারােহ সহকারে প্রবেশ

ব্রাহ্মণগণ

জয় জয় শুভ্র পুণ্যরাশি,

বিগ্রহিণী দয়া।

মহিষী

(ছুটিয়া গিয়া) ওমা, ওমা, সর্ব্বনাশী,

ও রাক্ষসী মেয়ে, আমার হৃদয়বাসী

নির্দ্দয় পাষাণী, এক পল করি না গাে

বুকের বাহির—তবু ফাঁকি দিয়ে মা গাে

কোথা গিয়েছিল?

প্রজাগণ

কোরাে না গাে তিরস্কার

মহারাণী। আমাদের ঘরে একবার

গিয়েছিল আমাদের মাতা।

চারুদত্ত

কেহ নই

আমরা কি, ও গাে রাণী? দেবী দয়াময়ী

শুধু তােমাদেরি?

দেবদত্ত

ফিরে ত এনেছি পুনঃ

পুণ্যবতী প্রাসাদলক্ষীরে।

সােমাচার্য্য

মা গাে শুন

আমাদের ভুলিয়াে না আর। মাঝে মাঝে

শুনি যেন শ্রীমুখের বাণী, শুভকাজে

পাই আশীর্ব্বাদ; তা হ’লে পরাণ-তরী

পথ পাবে পারাবারে ধ্রুবতারা ধরি

যাবে মুক্তিপারে।

মালিনী

তােমরা যেয়াে না দূরে

এসেছ যাহারা। প্রতিদিন রাজপুরে

দেখা দিয়ে যেয়াে। সকলেরে এনাে ডাকি,

সবারে দেখিতে চাহি আমি। হেথা থাকি

র’ব আমি তােমাদেরি ঘরে পুরবাসী।

সকলে

মােরা আজি ধন্য সবে-ধন্য আজি কাশী!

(প্রস্থান)

মালিনী

ওগাে পিতা, আজ আমি হয়েছি সবার।

কি আনন্দ উচ্ছ্বসিল, জয়জয়কার

উঠিল ধ্বনিয়া যবে, সহস্র হৃদয়

মুহূর্ত্তে বিদীর্ণ করি।

রাজা

কি সৌন্দর্য্যময়

আজিকার ছবি। সমুদ্রমন্থনে যবে

লক্ষ্মী উঠিলেন-তাঁরে ঘেরি কলরবে

মাতিল উন্মাদনৃত্যে উর্ম্মিগুলি সবে,

সেই মত উচ্ছ্বসিত জনপারাবার,

মাঝে তুমি লােকলক্ষ্মী মাতা।

মালিনী

মা আমার

এ প্রাচীরে মােরে আর নারিবে লুকাতে,

তব অন্তঃপুরে আমি আনিয়াছি সাথে

সর্ব্বলােক,—দেহ নাই মাের, বাধা নাই,

আমি যেন এ বিশ্বের প্রাণ।

মহিষা

থাক তাই,

বিশ্বপ্রাণ হ’য়ে। আপন করিয়া সবে

থাক মা’র কাছে। বাহিরে যেতে না হবে,

হেথা নিয়ে আয় তাের বৃহৎ সংসার,

মাতা কন্যা দোঁহে মিলি সেবা করি তা’র।

অনেক হয়েছে রাত, বােস মা এখানে,

শান্ত কর আপনারে—জ্বলিছে নয়ানে

উদ্দীপ্ত প্রাণের জ্যোতি নিদ্রার আরাম

দগ্ধ করি'। একটুকু কর মা বিশ্রাম।

মালিনী

( মাতাকে আলিঙ্গন করিয়া)

মাগাে, শ্রান্ত এবে আমি। কাঁপিতেছে দেহ।

কোথা গিয়েছিনু চলে’ ছাড়ি মার’ স্নেহ

প্রকাণ্ড পৃথিবীমাঝে। মাগাে, নিদ্রা আন্

চক্ষে মাের। ধীরে ধীরে কর তুই গান

শিশুকালে শুনিতাম যাহা; আজি মাের

চক্ষে আসিতেছে জল, বিষাদের ঘাের

ঘনাইছে প্রাণে।

মহিষী

বসুগণ, রুদ্রগণ,

বিশ্বদেবগণ, সবে করহ রক্ষণ

কন্যারে আমার। মর্ত্ত্যলােক, স্বর্গলােক

হও অনুকূল—শুভ হােক, শুভ হােক

কন্যার আমার। হে আদিত্য, হে পবন,

করি প্রণিপাত, সর্ব্ব দিকপালগণ

কর দূর মালিনীর সর্ব্ব অকল্যাণ।—

দেখিতে দেখিতে আহা শ্রান্ত দুনয়ান

মুদিয়া এসেছে ঘুমে। আহা, মরে’ যাই,

দূর হাে দূর হােক্ সকল বালাই।—

ভয়ে অঙ্গ কাঁপে মাের। কন্যার তােমার

একি খেলা মহারাজ? সমস্ত সংসার

খেলার সামগ্রী তা’র,—তা’রে রেখে দিবে

আপনার গৃহকোণে, ঘুম পাড়াইবে

পদ্মহস্ত পরশিয়া ললাটে তাহার।

অবাক হয়েছি দেখে’ কাণ্ড বালিকার।

যেমন খেলেনাখানি, তেমনি এ খেলা।

মহারাজ, সাবধান হও এই বেলা।

নবধর্ম্ম নবধর্ম্ম, কারে বল তুমি

কে আনিল নবধর্ম্ম, কোথা তা’র ভূমি

আকাশকুসুম? কোন্ মত্ততার স্রোতে

ভেসে এল-কন্যারে মায়ের কোল হ’তে

টানিয়া লইয়া যায়-ধর্ম্ম বলে তায়?

তুমিও দিয়াে না যােগ কন্যার খেলায়

মহারাজ। বলে’ দাও, গ্রহবিপ্রগণ

করুক সকলে মিলে শান্তিস্বস্ত্যয়ন

দেবার্চ্চনা। স্বয়ম্বরসভা আন ডেকে’

মালিনীর তরে। মনােমত বর দেখে’

খেলা ভেঙে যােগ্যকণ্ঠে দিক বরমালা—

দূর হ’বে নবধর্ম্ম, জুড়াইবে জ্বালা।

চতুর্থ দৃশ্য

রাজ উপবন

মালিনী, পরিচারিকাবর্গ ও সুপ্রিয়

মালিনী

হায়, কি বলিব! তুমিও কি মাের দ্বারে

আসিয়াছ দ্বিজোত্তম? কি দিব তােমারে?

কি তর্ক করিব? কি শাস্ত্র দেখাব আনি?

তুমি যাহা নাহি জান, আমি কি তা জানি?

সুপ্রিয়

শাস্ত্রসাথে তর্ক করি, নহে তােমাসনে।

সভার পণ্ডিত আমি তােমার চরণে

বালকের মত। দেবি, লহ মাের ভার।

যে পথে লইয়া যাবে, জীবন আমার

সাথে যাবে, সর্ব্ব তর্ক করি পরিহার,

নীরব ছায়ার মত দীপবর্ত্তিকার।

মালিনী

হে ব্রাহ্মণ, চলে’ যায় সকল ক্ষমতা

তুমি যবে প্রশ্ন কর, নাহি পাই কথা।

বড়ই বিস্ময় লাগে মনে। হে সুপ্রিয়,

মাের কাছে কি জানিতে এসেছ তুমিও?

সুপ্রিয়

জানিবার কিছু নাই, নাহি চাহি জ্ঞান।

সব শাস্ত্র পড়িয়াছি, করিয়াছি ধ্যান

শত তর্ক শত মত। ভুলাও, ভুলাও,

যত জানি সব জানা দূর করে’ দাও।

পথ আছে শতলক্ষ, শুধু আলাে নাই

ওগাে দেবী জ্যোতির্ম্ময়ী-তাই আমি চাই

একটি আলাের রেখা উজ্জ্বল সুন্দর

তােমার অন্তর হ’তে।

মালিনী

হায় বিপ্রবর,

যত তুমি চাহিতেছ আমি যেন তত

আপনারে হেরিতেছি দরিদ্রের মত।

যে দেবতা মর্ম্মে মাের বজ্রালােক হানি

বলেছিল একদিন বিদ্যুন্ময়ী বাণী

সে আজি কোথায় গেল। সেদিন, ব্রাহ্মণ,

কেন তুমি আসিলে না—কেন এতক্ষণ

সন্দেহে রহিলে দূরে? বিশ্বে বাহিরিয়া

আজি মাের জাগে ভয়—কেঁপে ওঠে হিয়া,

কি করিব কি বলিব বুঝিতে না পারি-

মহাধর্ম্ম-তরণীর বালিকা কাণ্ডারী

নাহি জানি কোথা যেতে হবে। মনে হয়

বড় একাকিনী আমি, সহস্র সংশয়,

বৃহৎ সংসার, অসংখ্য জটিল পথ,

নানা প্রাণী, দিব্যজ্ঞান ক্ষণপ্রভাবৎ

ক্ষণিকের তরে আসে। তুমি মহাজ্ঞানী

হবে কি সহায় মাের?

সুপ্রিয়

বহু ভাগ্য মানি

যদি চাহ মােরে।

মালিনী

মাঝে মাঝে নিরুৎসাহ

রুদ্ধ করে’ দেয় যেন সমস্ত প্রবাহ

অন্তরের—অকারণ অশ্রুজলে ভাসে

দুনয়ন, কি জানি কি বেদনায়। অকস্মাৎ

আপনার পরে যেন পড়ে দৃষ্টিপাত

সহস্র লােকের মাঝে, সেই দুঃসময়ে

তুমি মাের বন্ধু হবে? মন্ত্রগুরু হ’য়ে

দিবে নবপ্রাণ?

সুপ্রিয়

প্রস্তুত রাখিব নিত্য

এ ক্ষুদ্র জীবন। আমার সকল চিত্ত

সবল নির্ম্মল করি’, বুদ্ধি করি’ শান্ত

সমৰ্পণ করি দিব নিয়ত একান্ত

তব কাজে।

প্রতিহারীর প্রবেশ

প্রতিহারী

প্রজাগণ দরশন যাচে।

মালিনী

আজ নহে, আজ নহে। সকলের কাছে

মিনতি আমার; আজি মাের কিছু নাহি

রিক্তচিত্ত মাঝে মাঝে ভরিবারে চাহি-

বিশ্রাম প্রার্থনা করি ঘুচাতে জড়তা।

(প্রতিহারীর প্রস্থান)

যে কথা শুনতেছিলে কহ সেই কথা,

আপন কাহিনী। শুনিয়া বিস্ময় লাগে,

নূতন বারতা পাই, নবদৃশ্য জাগে

চক্ষে মাের। তােমাদের সুখদুঃখ যত,

গৃহের বারতা সব আত্মীয়ের মত

সকলি প্রত্যক্ষ যেন জানিবারে পাই।

ক্ষেমঙ্কর বান্ধব তােমার?

সুপ্রিয়

বন্ধু, ভাই,

প্রভু। সূর্য্য সে আমার, আমি রাহু,

আমি তা’র মহামােহ; বলিষ্ঠ সে বাহু,

আমি তাহে লৌহপাশ। বাল্যকাল হ’তে

দৃঢ় সে অটলচিত্ত, সংশয়ের স্রোতে

আমি ভাসমান। তবু সে নিয়ত মােরে

বন্ধুমােহে বক্ষেমাঝে রাখিয়াছে ধরে’

প্রবল অটল প্রেমপাশে, নিঃসন্দেহে

বিনা পরিতাপে; চন্দ্রমা যেমন স্নেহে

সহাস্যে বহন করে কলঙ্ক অক্ষয়

অনন্ত ভ্রমণপথে। ব্যর্থ নাহি হয়

বিধির নিয়ম কভু; লৌহময় তরী

হােক না যতই দৃঢ়, যদি রাখে ধরি’

বক্ষতলে ক্ষুদ্র ছিদ্রটিরে, একদিন

সঙ্কটসমুদ্রমাঝে উপায়বিহীন

ডুবিতে হইবে তা’রে। বন্ধুচিরন্তন,

তােমারে ডুবাব আমি, ছিল এ লিখন।

মালিনী

ডুবায়েছ তা’রে?

১১৩

সুপ্রিয়

দেবি, ডুবায়েছি তা’রে।

জীবনের সব কথা বলেছি তােমারে,

শুধু সেই কথা আছে বাকি।

যেই দিন

বিদ্বেষ উঠিল গর্জ্জি দয়াধর্ম্মহীন,

তােমারে ঘেরিয়া চারিদিকে,—একাকিনী

দাঁড়াইয়া পূর্ণ মহিমায়, কি রাগিণী

বাজাইলে বংশীরবে যেন মন্ত্রাহত

বিদ্রোহ করিল তা’র ফণা অবনত

তব পদতলে। শুধু বিপ্র ক্ষেমঙ্কর

রহিল পাষাণচিত্ত, অটল অন্তর।

একদা ধরিয়া কর কহিল সে মােরে

“বন্ধু, আমি চলিলাম দূর দেশান্তরে।

আনিয়া বিদেশী সৈন্য বরুণার কূলে

নবধর্ম্ম উৎপাটন করিব সমূলে

পুণ্য কাশী হ’তে।”—চলি গেল রিক্ত হাতে

অজ্ঞাত ভুবনে। শুধু ল’য়ে গেল সাথে

আমার হৃদয়, আর, প্রতিজ্ঞা কঠোর।

তা’র পরে জান তুমি কি ঘটিল মাের।

লভিলাম যেন আমি নবজন্মভূমি

যেদিন এ শুষ্কচিত্তে বরষিলে তুমি

সুধাবৃষ্টি। “সর্ব্ব জীবে দয়া”—জানে সবে

অতি পুরাতন কথা— তবু এই ভবে

এই কথা বসি’ আছে লক্ষবর্ষ ধরি’

সংসারের পরতীরে। তা’রে পার করি’

তুমি আজি আনিয়াছ সােনার তরীতে

সবার ঘরের দ্বারে। হৃদয়-অমৃতে

স্তন্যদান করিয়াছ সে দেবশিশুরে,

লয়েছে সে নবজন্ম মানবের পুরে

তােমারে মা বলে'।—স্বর্গ আছে কোন্ দূরে

কোথায় দেবতা -কেবা সে সংবাদ জানে।

শুধু জানি বলি দিয়া আত্ম অভিমানে

বাসিতে হইবে ভালো—বিশ্বের বেদনা

আপন করিতে হ’বে,—যে কিছু বাসনা

শুধু আপনার তরে তাই দুঃখময়।

যজ্ঞে যাগে তপস্যায় কভু মুক্তি নয়-

মুক্তি শুধু বিশ্বকাজে। ফিরে গিয়ে ঘরে

সে নিশীথে কাঁদিয়া কহিনু উচ্চস্বরে—

-বন্ধু বন্ধু কোথা গেছ বহু বহু দূরে

অসীম ধরণীতলে মরিতেছ ঘুরে।—

ছিনু তা’র পত্রআশেপত্র-নাহি পাই

না জানি সংবাদ। আমি শুধু আসি যাই

রাজগৃহমাঝে;—চারিদিকে দৃষ্টি রাখি,

শুধাই বিদেশিজনে, ভয়েভয়ে থাকি-

নাবিক যেমন দেখে চকিত নয়নে

সমুদ্রের মাঝে—গগনের কোন্ কোণে

ঘনাইছে ঝড়।—এলাে ঝড় অবশেষে

একখানি ছােট পত্ররূপে। লিখেছে সে-

রত্নবতী নগরীর রাজগৃহ হ’তে

সৈন্য ল’য়ে আসিছে সে শােণিতের স্রোতে

ভাসাইতে নবধর্ম্ম—ভিড়াইতে তীরে

পিতৃধর্ম্ম মগ্নপ্রায়, রাজকুমারীরে

প্রাণদণ্ড দিতে।—প্রচণ্ড আঘাতে সেই

ছিঁড়িল প্রাচীন পাশ এক নিমেষেই।

রাজারে দেখানু পত্র। মৃগয়ার ছলে

গােপনে গেছেন রাজা সৈন্যদলবলে

আক্রমিতে তা’রে। আমি হেথা লুটাতেছি

পৃথ্বীতলে—আপনার মর্ম্মে ফুটাতেছি

দন্ত আপনার।

মালিনী

হায়, কেন তুমি তা’রে

আসিতে দিলে না হেথা মাের গৃহদ্বারে

সৈন্যসাথে? এ ঘরে সে প্রবেশিত আসি’

পূজ্য অতিথির মত—সুচিরপ্রবাসী

ফিরিত স্বদেশে তা’র।

রাজার প্রবেশ

রাজা

এস আলিঙ্গনে

হে সুপ্রিয়! গিয়েছিনু অনুকূলক্ষণে

বার্ত্তা পেয়ে। বন্দী করিয়াছি ক্ষেমঙ্করে

বিনাক্লেশে। তিলেক বিলম্ব হ’লে পরে

সুপ্তরাজগৃহশিরে বজ্র ভয়ঙ্কর

পড়িত ঝঞ্ঝনি’, জাগিবার অবসর

পেতেম না কভু। এস আলিঙ্গনে মম

বান্ধব, আত্মীয় তুমি।

সুপ্রিয়

ক্ষম মােরে ক্ষম

মহারাজ!

রাজা

শুধু নহে শূন্য আত্মীয়তা

প্রিয়বন্ধু! মনে আনিয়াে না হেন কথা

শুধু রাজ-আলিঙ্গনে পুরস্কার তব।

কি ঐশ্বর্য্য চাহ? কি সম্মান অভিনব

করিব সৃজন তােমা’তরে? কহ মােরে!

সুপ্রিয়

কিছু নহে, কিছু নহে, খাব ভিক্ষা করে’

দ্বারে দ্বারে।

রাজা

সত্য কহ, রাজ্যখণ্ড লবে?

সুপ্রিয়

রাজ্যে ধিক্ থাক!

রাজা

অহো! বুঝিলাম তবে

কোন্ পণ চাহ জিনিবারে, কোন্ চাঁদ

পেতে চাও হাতে? ভালাে, পূরাইব সাধ,

দিলাম অভয়। কোন্ অসম্ভব আশা

আছে মনে, খুলে বল! কোথা গেল ভাষা।

বেশি দিন নহে, বিপ্র, সে কি মনে পড়ে

এই কন্যা মালিনীর নির্ব্বাসনতরে

অগ্রবর্ত্তী ছিলে তুমি। আজি আরবার

করিবে কি সে প্রার্থনা? রাজদুহিতার

নির্ব্বাসন পিতৃগৃহ হ’তে? সাধনার

অসাধ্য কিছুই নাই—বাঞ্ছা সিদ্ধ হবে—

ভরসা বাঁধহ বক্ষোমাঝে।—শুন তবে-

জীবন-প্রতিমে বৎসে—যে তােমার প্রাণ

রক্ষা করিয়াছে—সেই বিপ্র গুণবান্

সুপ্রিয় সবার প্রিয়, প্রিয়দরশন,

তা’রে-

সুপ্রিয়

ক্ষান্ত হও, ক্ষান্ত হও হে রাজন্!

অয়ি দেবি, আজন্মের ভক্তিউপহারে

পেয়েছে আপন ঘরে ইষ্টদেবতারে

কত অকিঞ্চন-তেমনি পেতেম যদি

আমার দেবীরে—রহিতাম নিরবধি

ধন্য হ’য়ে। রাজহস্ত হ’তে পুরস্কার।

কি করেছি? আশৈশববন্ধুত্ব আমার

করেছি বিক্রয়—আজি তারি বিনিময়ে

ল’য়ে যাব শিরে করি’ আপন আলয়ে

পরিপূর্ণ সার্থকতা? তপস্যা করিয়া

মাগিব পরমসিদ্ধি জন্মান্ত ধরিয়া—

জন্মান্তরে পাই যদি তবে তাই হােক-

বন্ধুর বিশ্বাস ভাঙি সপ্ত স্বর্গলােক

চাহি না লভিতে।—পূর্ণকাম তুমি দেবী,

আপনার অন্তরের মহত্ত্বেরে সেবি’

পেয়েছ অনন্ত শান্তি,—আমি দীনহীন

পথে পথে ফিরে মরি অদৃষ্ট অধীন

শ্রান্ত নিজভারে। আর কিছু চাহিব না-

দিতেছ নিখিলময় যে শুভকামনা

মনে করে’ অভাগারে তারি এক কণা

দিয়ো মনে মনে।

মালিনী

ওরে রমণীর মন

কোথা বক্ষোমাঝে বসে’ করিস্ ক্রন্দন

মধ্যাহ্নে নির্জ্জননীড়ে প্রিয়বিরহিতা

কপােতীর প্রায়?—কি করেছ বল পিতা

বন্দীর বিচার?

রাজা

প্রাণদণ্ড হবে তা’র।

মালিনী

ক্ষমা কর। একান্ত এ প্রার্থনা আমার

তব পদে।

রাজা

রাজদ্রোহী, ক্ষমিব তাহারে

বৎসে?

সুপ্রিয়

কে কার বিচার করে এ সংসারে

সে কি চেয়েছিল তব সসাগরা মহী

মহারাজ? সে জানিত তুমি ধর্ম্মদ্রোহী

তাই সে আসিতেছিল তােমার বিচার

করিতে আপন বলে। বেশি বল যার

সেই বিচারক। সে যদি জিনিত আজি

দৈবক্রমে—সে বসিত বিচারক সাজি’

তুমি হ’তে অপরাধী।

মালিনী

রাখ প্রাণ তা’র

মহারাজ! তা’র পরে স্মরি উপকার

হিতৈষী বন্ধুরে তব যাহা ইচ্ছা দিয়াে

লবে সে আদর করি।

রাজা

কি বল সুপ্রিয়।

বন্ধুরে করিব বন্ধুদান?

সুপ্রিয়

চিরদিন

স্মরণে রহিবে তব অনুগ্রহঋণ

নরপতি।

রাজা

কিন্তু তা’র পূর্ব্বে একবার

দেখিব পরীক্ষা করি’ বীরত্ব তাহার।

দেখিব মরণভয়ে টলে কি না টলে

কর্ত্তব্যের বল। মহত্ত্বের শিখা জ্বলে

নক্ষত্রের মত,—দীপ নিবে যায় ঝড়ে,

তারা নাহি নিবে।—সে কথা হইবে পরে।

তােমার বন্ধুরে তুমি পাবে, মাঝখানে

উপলক্ষ্য আমি। সে দানে তৃপ্তি না মানে

মন।—আরাে দিব।—পুরস্কার বলে’ নয়,—

রাজার হৃদয় তুমি করিয়াছ জয়-

সেথা হ’তে লহ তুলি’ রত্ন সর্ব্বোত্তম

হৃদয়ের।–কন্যা, কোথা ছিল এ সরম

এতদিন! বালিকার লজ্জাভয়শােক

দূর করি দীপ্তি পেত অম্লানআলােক

দুঃসহউজ্জ্বল। কোথা হ’তে এল আজ

অশ্রুবাপে ছলছল কম্পমান লাজ-

যেন দীপ্ত হােমহুতাশনশিখা ছাড়ি

সদ্য বাহিরিয়া এল স্নিগ্ধ সুকুমারী

দ্রুপদদুহিতা।

( সুপ্রিয়ের প্রতি)

উঠ, ছাড়, পদতল।

বৎস, বক্ষে, এস। সুখ করিছে বিহ্বল

দুর্ভর দুঃখেরি মত। দাও অবসর,

হেরি প্রাণপ্রতিমার মুখশশধর,

বিরলে আনন্দভরে শুধু ক্ষণকাল।

( সুপ্রিয়ের প্রস্থান)

(স্বগত) বহুদিন পরে মাের মালিনীর ভাল

লজ্জার আভায় রাঙা। কপােল ঊষার

যখনি রাঙিয়া উঠে বুঝা যায়, তা’র

তপন উদয় হ’তে দেরী নাই আর।

এ রাঙা আভাস দেখে আনন্দে আমার

হৃদয় উঠিছে ভরি—বুঝিলাম মনে

আমাদের কন্যাটুকু বুঝি এতক্ষণে

বিকশি উঠিল—দেবী নারে, দয়া নারে,

ঘরের সে মেয়ে।

প্রতিহারীর প্রবেশ

প্রতিহারী

জয় মহারাজ, দ্বারে

উপনীত বন্দী ক্ষেমঙ্কর।

রাজা

আন তা’রে।

শৃঙ্খলবদ্ধ ক্ষেমঙ্করের প্রবেশ

নেত্র স্থির, ঊর্দ্ধশির, ভ্রূকুটির পরে

ঘনায়ে রয়েছে ঝড়, হিমাদ্রিশিখরে

স্তম্ভিত শ্রাবণ সম।

মালিনী

লােহার শৃঙ্খল

ধিক্কার মানিছে যেন লজ্জায় বিকল

ওই অঙ্গপরে। মহত্ত্বের অপমান

মরে অপমানে। ধন্য মানি এ পরাণ

ইন্দ্রতুল্য হেন মুর্ত্তি হেরি।

রাজা

(বন্দীর প্রতি) কি বিধান

হয়েছে শুনেছ?

ক্ষেমঙ্কর

মৃত্যুদণ্ড।

রাজা

যদি প্রাণ

ফিরে দিই, যদি ক্ষমা করি?

ক্ষেমঙ্কর

পুনর্ব্বার

তুলিয়া লইতে হ’বে কর্ত্তব্যের ভার,—

যে পথে চলিতেছিনু আবার সে পথে

যেতে হ’বে।

রাজা

বাঁচিতে চাহ না কোনােমতে!

ব্রাহ্মণ, প্রস্তুত হও মমতা তেয়াগি’

জীবনের। এই বেলা লহ তবে মাগি

প্রার্থনা যা কিছু থাকে।

ক্ষেমঙ্কর

আর কিছু নাহি

বন্ধু সুপ্রিয়েরে শুধু দেখিবারে চাহি।

রাজা

(প্রতিহারীর প্রতি)

ডেকে আন তা’রে।

মালিনী

হৃদয় কাঁপিছে বুকে।

কি যেন পরমাশক্তি আছে ওই মুখে

বজ্রসম ভয়ঙ্কর। রক্ষা কর পিতঃ,

আনিয়াে না সুপ্রিয়েরে।

রাজা

কেন মা শঙ্কিত

অকারণে? কোনাে ভয় নাই।

ক্ষেমঙ্করের নিকট সুপ্রিয়ের আগমন

ক্ষেমঙ্কর

(আলিঙ্গন প্রত্যাখ্যান করিয়া) থাক্ থাক,

যাহা বলিবার আছে আগে হ’য়ে যাক-

পরে হবে প্রণয়সম্মান।—এস হেথা।

জান সখে, বাক্যদীন আমি-বেশি কথা

যােগায় না মুখে। সময় অধিক নাই,

আমার বিচার হ’ল শেষ—আমি চাই

তােমার বিচার এবে। বল মাের কাছে

এ কাজ করেছ কেন?

সুপ্রিয়

বন্ধু এক আছে

শ্রেষ্ঠতম, সে আমার আত্মার নিশ্বাস,

সব ছেড়ে রাখিয়াছি তাহারি বিশ্বাস,

প্রাণসখে, ধর্ম্ম সে আমার।

ক্ষেমঙ্কর

জানি জানি

ধর্ম্ম কে তােমার। ওই স্তব্ধ মুখখানি

অন্তর্জ্যোতির্ম্ময়, মূর্ত্তিমতী দৈববাণী

রাজকন্যারূপে, চতুর্ব্বেদ হ’তে সখে

কেড়ে ল’য়ে পিতৃধর্ম্ম ওই নেত্রালোকে

দিয়েছ আহুতি তুমি। ধর্ম্ম ওই তব।

ওই প্রিয়মুখে তুমি রচিয়াছ নব

ধর্ম্মশাস্ত্র আজি।—

সুপ্রিয়

সত্য বুঝিয়াছ সখে।

মাের ধর্ম্ম অবতীর্ণ দীন মর্ত্ত্যলােকে

ওই নারীমূর্ত্তি ধরি'। শাস্ত্র এতদিন

মাের কাছে ছিল অন্ধ জীবন-বিহীন;

ওই দুটি নেত্রে জ্বলে যে উজ্জ্বল শিখা

সে আলােকে পড়িয়াছি বিশ্বশাস্ত্রে লিখা

যেথা দয়া সেথা ধর্ম্ম, যেথা প্রেমস্নেহ,

যেথায় মানব, যেথা মানবের গেহ।

বুঝিলাম, ধর্ম্ম দেয় স্নেহ মাতারূপে,

পুত্ররূপে স্নেহ লয় পুনঃ;—দাতারূপে

করে দান, দীনরূপে করে তা’ গ্রহণ,—

শিষ্যরূপে করে ভক্তি, গুরুরূপে করে

আশীর্ব্বাদ; প্রিয় হ’য়ে পাষাণঅন্তরে

প্রেম-উৎস লয় টানি’, অনুরক্ত হ’য়ে

করে সর্ব্বসমর্পণ। ধর্ম্ম বিশ্বলােকালয়ে

ফেলিয়াছে চিত্তজাল,—নিখিল ভুবন

টানিতেছে প্রেমক্রোড়ে,—সে মহাবন্ধন

ভরেছে অন্তর মাের আনন্দবেদনে

চাহি ওই ঊষারুণ করুণ বদনে।

ওই ধর্ম্ম মোর।

ক্ষেমঙ্কর

আমি কি দেখিনি ওরে?

আমিও কি ভাবি নাই মুহূর্ত্তের ঘােরে

এসেছে অনাদি ধর্ম্ম নারীমূর্ত্তি ধরে’

কঠিন পুরুষমন কেড়ে নিয়ে যেতে

স্বর্গপানে? ক্ষণতরে মুগ্ধ হৃদয়েতে

জন্মেনি কি স্বপ্নাবেশ? অপূর্ব্ব সঙ্গীতে

বক্ষের পঞ্জর মাের লাগিল কাঁদিতে

সহস্র বংশীর মত,—সর্ব্ব সফলতা,

জীবনের যৌবনের আশাকল্পলতা

জড়ায়ে জড়ায়ে মাের অন্তরে অন্তরে

মুঞ্জরি উঠিল যেন পত্রপুষ্পভরে

এক নিমেষের মাঝে। তবু কি সবলে

ছিঁড়িনি মায়ার বন্ধ, যাইনি কি চলে’

দেশে দেশে দ্বারে দ্বারে, ভিক্ষুকের মত

লইনি কি শিরে ধরি অপমান শত

হীন হস্ত হ’তে-সহিনি কি অহরহ

আজন্মের বন্ধু তুমি তােমার বিরহ।—

সিদ্ধি যবে লব্ধপ্রায়—তুমি হেথা বসে’

কি করেছ—রাজগৃহমাঝে সুখালসে

কি ধর্ম্ম মনের মত করেছ সৃজন

দীর্ঘ অবসরে?—

সুপ্রিয়

ওগাে বন্ধু, এ ভুবন

নহে কি বৃহৎ? নাই কি অসংখ্য জন,

বিচিত্র স্বভাব? কাহার কি প্রয়ােজন

তুমি কি তা জান? গগনে অগণ্য তারা,

নিশিনিশি বিবাদ কি করিছে তাহারা

ক্ষেমঙ্কর? তেমনি জ্বালায়ে নিজ জ্যোতি

কত ধর্ম্ম জাগিতেছে তাহে কোন্ ক্ষতি।

ক্ষেমঙ্কর

মিছে আর কেন বন্ধু। ফুরাল সময়,

বাক্য ল’য়ে মিথ্যা খেলা, তর্ক আর নয়।

সত্যমিথ্যা পাশাপাশি নির্ব্বিরােধে র’বে

এত স্থান নাহি নাহি অনন্ত এ ভবে।

অন্নরূপে ধান্য যেথা উঠে চিরদিন

রােপিবে তাহারি মাঝে কণ্টক নবীন

হে সুপ্রিয়, প্রেম এত সর্ব্বপ্রেমী নয়।

ছিল চিরদিবসের বিশ্রব্ধ প্রণয়

আনিবে বিশ্বাসঘাত বক্ষোমাঝে তা’র

বন্ধু মাের, উদারতা এত কি উদার।

কেহ বা ধর্ম্মের লাগি সহি নির্য্যাতন

অকালে অস্থানে মরে চোরের মতন,

কেহ বা ধর্ম্মের ব্রত করিয়া নিস্ফল

বাঁচিবে সম্মানে সুখে, এ ধরণীতল

হেন বিপরীত ধর্ম্ম এক বক্ষে বহে—

এত বড় এত দৃঢ় কভু নহে নহে।

১২৯

সুপ্রিয়

(মালিনীর প্রতি ফিরিয়া)

হে দেবি, তােমারি জয়! নিজ পদ্মকরে

যে পবিত্র শিখা তুমি আমার অন্তরে

জ্বালায়েছ-আজি হ’ল পরীক্ষা তাহার-

তুমি হ’লে জয়ী। সর্ব্ব অপমানভার

সকল নিষ্ঠুরঘাত করিনু গ্রহণ।

রক্ত উচ্ছ্বসিয়া উঠে উৎসের মতন

বিদীর্ণ হৃদয় হতে,—তবু সমুজ্জ্বল

তব শান্তি, তব প্রীতি, তব সুমঙ্গল

অম্লান অচল দীপ্তি করিছে বিরাজ

সর্ব্বোপরি। ভক্তের পরীক্ষা হ’ল আজ,

জয় দেবি।—ক্ষেমঙ্কর, তুমি দিবে প্রাণ,—

আমার ধর্ম্মের লাগি করিয়াছি দান

প্রাণের অধিক প্রিয় তােমার প্রণয়,

তােমার বিশ্বাস। তা’র কাছে প্রাণভয়

তুচ্ছ শতবার।

ক্ষেমঙ্কর

ছাড় এ প্রলাপ বাণী।

মৃত্যু যিনি তাঁহারেই ধর্ম্মরাজ জানি,—

ধর্ম্মের পরীক্ষা তাঁরি কাছে। বন্ধুবর,

এস তবে কাছে, এস ধর মাের কর,

চল মােরা যাই সেথা দোঁহে এক সনে,—

যেমন সে বাল্যকালে—সে কি পড়ে মনে-

কত দিন সারারাত্রি তর্ক করি’, শেষে

প্রভাতে যেতেম দোঁহে গুরুর উদ্দেশে

কে সত্য কে মিথ্যা তাহা করিতে নির্ণয়।

তেমনি প্রভাত হােক! সকল সংশয়

আজিকে লইয়া চলি অসংশয় ধামে,

দাঁড়াই মৃত্যুর পাশে দক্ষিণে ও বামে

দুই সখা, ল’য়ে দুজনের প্রশ্ন যত।

সেথায় প্রত্যক্ষ সত্য উজ্জ্বল উন্নত;—

মূহূর্ত্তে পর্ব্বতপ্রায় বিচার বিরােধ

বাষ্পসম কোথা যা’বে! দুইটি অবােধ

আনন্দে হাসিব চাহি দোঁহে দোঁহাকারে।

সব চেয়ে বড় আজি মনে কর যারে

তাহারে রাখিয়া দেখ মৃত্যুর সম্মুখে।

সুপ্রিয়

বন্ধু, তাই হােক।

ক্ষেমঙ্কর

এস তবে, এস বুকে।

বহুদূরে গিয়েছিলে এস কাছে তবে

যেথায় অনন্তকাল বিচ্ছেদ না হ’বে।

লই তবে বন্ধুহস্তে করুণ বিচার-

এই লহ।

(শৃঙ্খল দ্বারা সুপ্রিয়ের মস্তকে আঘাত ও তাহার পতন )

সুপ্রিয়

দেবী, তব জয়। (মৃত্যু)

ক্ষেমাঙ্কর

(মৃতদেহের উপর পড়িয়া) এইবার

ডাক, ডাক ঘাতকেরে।

রাজা

(সিংহাসন ছাড়িয়া) কে আছিস্ ওরে!

আন্ খড়গ।

মালিনী

মহারাজ ক্ষম ক্ষেমঙ্করে।

( মূর্চ্ছিতা )

কথা ও কাহিনী · মূল্যপ্রাপ্তি

মূল্যপ্রাপ্তি

( অবদানশতক)

অঘ্রাণে শীতের রাতে নিষ্ঠুর শিশিরঘাতে

পদ্মগুলি গিয়াছে মরিয়া।

সুদাস মালীর ঘরে কাননের সরােবরে

একটি ফুটেছে কি করিয়া।

তুলি ল’য়ে, বেচিবারে গেল সে প্রাসাদদ্বারে,

মাগিল রাজার দরশন,—

হেনকালে হেরি ফুল আনন্দে পুলকাকুল

পথিক কহিল একজনঃ-

অকালের পদ্ম তব আমি এটি কিনি লব

কত মূল্য লইবে ইহার?

বুদ্ধ ভগবান আজ এসেছেন পুরমাঝ

তাঁর পায়ে দিব উপহার।

মালী কহে এক মাষা স্বর্ণ পাব মনে আশা-

পথিক চাহিল তাহা দিতে,—

হেনকালে সমারােহে বহু পূজা অর্ঘ্য বহে’

নৃপতি বাহিরে আচম্বিতে।

রাজেন্দ্র প্রসেনজিত উচ্চারি মঙ্গলগীত

চলেছেন বুদ্ধ দরশনে-

হেরি অকালের ফুল- শুধালেন, কত মূল?

কিনি দিব প্রভুর চরণে।

মালী কহে, হে রাজন স্বর্ণ মাষা দিয়ে পণ

কিনিছেন এই মহাশয়।

দশ মাষা দিব আমি- কহিলা ধরণীস্বামী,

বিশ মাষা দিব—পান্থ কয়।

দোঁহে কহে, দেহ দেহ, হার নাহি মানে কেহ,

মূল্য বেড়ে ওঠে ক্রমাগত।

মালী ভাবে যার তরে এ দোঁহে বিবাদ করে

তাঁরে দিলে আরো পাব কত?

কহিল সে করজোড়ে দয়া করে’ ক্ষম মােরে-

এ ফুল বেচিতে নাহি মন।

এত বলি ছুটিল সে যেথা রয়েছেন বসে’

বুদ্ধদেব উজলি কানন।

বসেছেন পদ্মাসনে প্রসন্ন প্রশান্তমনে,

নিরঞ্জন আনন্দ মূরতি।

দৃষ্টি হ’তে শান্তি ঝরে স্ফুরিছে অধরপরে

করুণার সুধাহাস্যজ্যোতি।

সুদাস রহিল চাহি,— নয়নে নিমেষ নাহি,

মুখে তা’র বাক্য নাহি সরে।

সহসা ভূতলে পড়ি পদ্মটি রাখিল ধরি

প্রভুর চরণপদ্মপরে।

বরষি অমৃতরাশি বুদ্ধ শুধালেন হাসি

কহ বৎস, কি তব প্রার্থনা!

ব্যাকুল সুদাস কহে- প্রভু, আর কিছু নহে,

চরণের ধূলি এককণা।

২৬শে আশ্বিন ১৩০৬।

নাট্য কবিতা · লক্ষ্মীর পরীক্ষা

লক্ষ্মীর পরীক্ষা

ক্ষীরাে

ধনী সুখে করে ধৰ্মকর্ম্ম

গরীবের পড়ে মাথার ঘর্ম্ম

তুমি রাণী, আছে টাকা শত শত,

খেলাছলে কর দান ধ্যান ব্রত;

তােমার ত শুধু হুকুম মাত্র,

খাটুনি আমারি দিবসরাত্র।

তবুও তােমারি সুযশ, পুণ্য,

আমার কপালে সকলি শূন্য।

নেপথ্যে

ক্ষীরি, ক্ষীরি, ক্ষীরাে!

ক্ষীরাে

কেন ডাকাডাকি,

নাওয়া খাওয়া সব ছেড়ে দেব’ না কি?

(রাণী কল্যাণীর প্রবেশ )

কল্যাণী

হ’ল কি! তুই যে আছিস্ রেগেই।

ক্ষীরাে

কাজ যে পিছনে রয়েছে লেগেই।

কতই বা সয় রক্তমাংসে,

কত কাজ করে একটা মানুষে।

দিনে দিনে হ’ল শরীর নষ্ট।

কল্যাণী

কেন, এত তাের কিসের কষ্ট!

ক্ষীরাে

যেথা যত আছে বামী ও বামী

সকলেরি যেন গেলাম আমি।

হােক ব্রাহ্মণ, যােক শূদ্দুর,

সেবা করে’ মরি পাড়াসুদ্ধর।

ঘরেতে কারাে ত চড়ে না অন্ন,

তােমারি ভাঁড়ারে নিমন্তন্ন।

হাড় বের হ’ল বাসন মেজে

সৃষ্টির পান তামাক সেজে।

একা একা এত খেটে যে মরি

মায়া দয়া নেই?

কল্যাণী

সে দোষ তােরি।

চাকর দাসী কি টিকিতে পারে

তােমার প্রখর মুখের ধারে?

লােক এলে তুই তাড়াবি তাদের

লােক গেলে শেষে আর্ত্তনাদের

ধূম পড়ে’ যাবে,–এর কি পথ্যি

আছে কোনােরূপ?

ক্ষীরাে

সে কথা সত্যি

সয় না আমার,—তাড়াই সাধে?

অন্যায় দেখে পরাণ কাঁদে।

কোথা থেকে যত ডাকাত জোটে,

টাকাকড়ি সব দুহাতে লোটে।

আমি না তাদের তাড়াই যদি

তােমারে তাড়াত আমারে বধি'।

কল্যাণী

ডাকাত মাধবী, ডাকাত মাধু,

সবাই ডাকাত, তুমিই সাধু!

ক্ষীরো

আমি সাধু! মাগাে, এমন মিথ্যে

মুখেও আনিনে, ভাবিনে চিত্তে।

নিই থুই খাই দু’হাত ভরি,

দুবেলা তােমায় আশিষ করি;

কিন্তু তবু সে দু’হাত পরে

দু মুঠোর বেশি কতই ধরে।

ঘরে যত আন মানুষ জনকে

তত বেড়ে যায় হাতের সংখ্যে।

হাত যে সৃজন করেছে বিধি,

নেবার জন্যে, জান ত দিদি!

পাড়াপড়শির দৃষ্টি থেকে

কিছু আপনার রাখ ত ঢেকে,

তার পরে বেশি রহিলে বাকি

চাকর বাকর আনিয়াে ডাকি।

কল্যাণী

একা বটে তুমি! তােমার সাথী

ভাইপাে, ভাইঝি, নাতিনী নাতি,

হাট বসে’ গেছে সােনার চাঁদের,

দুটো করে’ হাত নেই কি তাঁদের?

তাের কথা শুনে কথা না সরে,

হাসি পায় ফের রাগও ধরে।

ক্ষীরাে

বেশি রেগে যদি কম হাসি পেত

স্বভাব আমার শুধরিয়ে যেত।

কল্যাণী

মলেও যাবে না স্বভাবখানি

নিশ্চয় জেনাে।

ক্ষীরাে

সে কথা মানি।

তাইত ভরসা মরণ মােরে

নেবে না সহসা সাহস করে'।

ঐ যে তােমার দরজা জুড়ে

বসে’ গেছে যত দেশের কুঁড়ে।

কারাে বা স্বামীর জোটে না খাদ্য,

কারাে বা বেটার মামীর শ্রাদ্ধ।

মিছে কথা ঝুড়ি ভরিয়া আনে,

নিয়ে যায় ঝুড়ি ভরিয়া দানে।

নিতে চায় নিক, কত যে নিচ্চে,

চোখে ধূলাে দেবে, সেটা কি ইচ্ছে?

কল্যাণী

কেন তুই মিছে মরিস্ বকে?

ধূলাে দেয়, ধূলাে লাগে না চোখে।

বুঝি আমি সব,—এটাও জানি

তা’রা যে গরীব, আমি যে রাণী।

ফাঁকি দিয়ে তা’রা ঘােচায় অভাব,

আমি দিই, সেটা আমার স্বভাব।

তাদের সুখ সে তা’রাই জানে,

আমার সুখ সে আমার প্রাণে।

ক্ষীরাে

নুন খেয়ে গুণ গাহিত কভু,

দিয়ে থুয়ে সুখ হইত তবু।

সামনে প্রণাম পদারবিন্দে,

আড়ালে তােমার করে যে নিন্দে!

কল্যাণী

সামনে যা পাই তাই যথেষ্ট,

আড়ালে কি ঘটে জানেন কেষ্ট।

সে যাই হােকগে, শুধাই তােরে

কাল বৈকালে বলত মােরে

অতিথি-সেবায় অনেকগুলি

কম পড়েছিল চন্দ্রপুলি,—

কেন বা ছিল না রসকরা!

ক্ষীরাে

কেন কর মিছে মসকরা

দিদি ঠাকরুণ! আপন হাতে

গুণে দিয়েছিনু সবার পাতে

দুটো দুটো করে'।

কল্যাণী

আপন চোখে

দেখেছি পায়নি সকল লােকে,

খালি পাত-

ক্ষীরাে

ওমা তাই ত বলি

কোথায় তলিয়ে যায় যে চলি

যত সামিগ্রি দিই আনিয়ে।

ভােলা ময়রার সয়তানী এ।

কল্যাণী

এক বাটি করে’ দুধ বরাদ্দ,

আধ বাটি তাও পাওয়া অসাধ্য।

ক্ষীরাে

গয়লা ত নন যুধিষ্ঠির।

যত বিষ তব কুদৃষ্টির

পড়েছে আমারি পােড়া অদৃষ্টে,

যত ঝাঁটা সব আমারি পৃষ্ঠে,

হায় হায়-

কল্যাণী

ঢের হয়েছে, আর না,

রেখে দাও তব মিথ্যে কান্না।

সত্যি কান্না কাঁদেন যারা

ঐ আসচেন ঝেটিয়ে পাড়া।

(প্রতিবেশিনীগণের প্রবেশ)

প্রতিবেশিনীগণ

জয় জয় রাণী হও চিরজয়ী!

কল্যাণী তুমি কল্যাণময়ী।

ক্ষীরাে

ওগাে রাণীদিদি, শােন্ ওই শােন,

পাতে যদি কিছু হ’ত অকুলােন

এত গলা ছেড়ে এত খুলে প্রাণ

উঠিত কি তবে জয় জয় তান?

যদি দু-চারটে চন্দ্রপুলি

দৈবগতিকে দিতে না ভুলি

তাহ’লে কি আর রক্ষে থাকত,

হজম করতে বাপকে ডাকত।

কল্যাণী

আজ ত খাবার হয় নি কষ্ট?

প্রথমা

কত পাতে পড়ে’ হয়েছে নষ্ট,—

লক্ষ্মীর ঘরে খাবার ত্রুটি?

কল্যাণী

হ্যাঁগো, কে তােমার সঙ্গে উটি?

আগে ত দেখিনি!-

দ্বিতীয়া

আমার মধু

তারি উটি হয় নতুন বধূ

এনেছি দেখাতে তােমার চরণে

মা জননী।

২৪১

ক্ষীরাে

সেটা বুঝেছি ধরণে।

দ্বিতীয়া

(বধূর প্রতি) প্রণাম করিবে এস ইদিকে

এই যে তােমার রাণী দিদিকে।

কল্যাণী

এস কাছে এস, লজ্জা কাদের?

(আংটি পরাইয়া) আহা মুখখানি দিব্যি ছাদের

চেয়ে দেখ, ক্ষীরি!

ক্ষীরাে

মুখটি ত বেশ,

তা চেয়ে তােমার আংটি সরেশ।

দ্বিতীয়া

শুধু রূপ নিয়ে কি হবে অঙ্গে

সােনা দানা কিছু আনেনি সঙ্গে।

ক্ষীরাে

যাহা এনেছিল সবি সিন্দুকে

রেখেছ যতনে, বলে নিন্দুকে।

কল্যাণী

এস ঘরে এস।

ক্ষীরাে

যাও গাে ঘরে

সােনা পাবে শুধু বাণীর দরে।

(কল্যাণী ও বধূসহ দ্বিতীয়ার প্রস্থান)

প্রথমা

দেখলি মাগীর কাণ্ড এ কি!

ক্ষীরাে

কারে বাদ্ দিয়ে কারে বা দেখি।

তৃতীয়া

তা বলে’ এতটা সহ্য হয় না।

ক্ষীরাে

অন্যের বউ পরলে গয়না

অন্যের তা’তে জ্বলে যে অঙ্গ।

তৃতীয়া

মাসী জান তুমি কতই রঙ্গ,

এত ঠাট্টাও আছে তাের পেটে,

হাসতে হাসতে নাড়ী যায় ফেটে

প্রথমা

কিন্তু যা বল, আমাদের মাতা

নাই তাঁর মত এত বড় দাতা।

ক্ষীরাে

অর্থাৎ কি না এত বড় হাবা

জন্ম দেয়নি আর কারাে বাবা।

তৃতীয়া

সে কথা মিথ্যে নয় নিতান্ত।

দেখ না সেদিন কুশী ও ক্ষান্ত

কি ঠকানটাই ঠকালে, মাগাে!

আহা মাসী তুমি সাধে কি রাগাে!

আমাদেরি গায়ে হয় অসহ্য।

চতুর্থী

বুড়াে মহারাজা যে ঐশ্বর্য্য

রেখে গেছে সে কি এমনি ভাবে

পাঁচ ভূতে শুধু ঠকিয়ে খাবে!

প্রথমা

দেখলি ত ভাই কানা আন্দি

কত টাকা পেলে।

তৃতীয়া

বুড়ি ঠানদি

জুড়ে দিলে তা’র কান্না অস্ত্র

নিয়ে গেল কত শীতের বস্ত্র।

চতুর্থী

বুড়ি মাগী তা’র শীত কি এতই?

কাঁথা হ’লে চলে নিয়ে গেল লুই।

আছে সেটা শেষে চোরের ভাগ্যে,

এ যে বাড়াবাড়ি।

প্রথমা

সে কথা যাগগে।

চতুর্থী

না না তাই বলি হওনাকো দাতা,

তা বলে’ খাবে কি বুদ্ধির মাথা?

যত রাজ্যের দুঃখী কাঙাল

যত উড়ে মেড়া খােট্টা বাঙাল

কানা খোঁড়া নুলাে যে আসে মরতে

বাচ বিচার কি হবে না করতে?

তৃতীয়া

দেখ না ভাই সে গােপালের মাকে

দু টাকা দিলেই খেয়ে পরে’ থাকে

পাঁচ টাকা তা’র মাসে বরাদ্দ

এ যে মিছিমিছি টাকার শ্রাদ্ধ।

চতুর্থী

আসল কথা কি, ভালাে নয় থাকা

মেয়ে মানষের এতগুলাে টাকা।

তৃতীয়া

কত লােকে কত করে যে রটনা,—

প্রথমা

সেগুলাে ত সব মিথ্যে ঘটনা।

চতুর্থী

সত্যি মিথ্যে দেবতা জানে

রটেছে ত কথা পাঁচের কানে

সেটা যে ভালাে না।

প্রথমা

যা বলি ভাই

এমন মানুষ ভূভারতে নাই।

ছােট বড় বােধ নাইক মনে,

মিষ্টি কথাটি সবার সনে।

ক্ষীরাে

টাকা যদি পাই বাকস ভরে’

আমার গলাও গলাবে তােরে।

বাপু বল্লেই মিলবে স্বর্গ,

বাছা বল্লেই বলবি ধরগাে।

মনে ঠিক জেনাে আসল মিষ্টি,

কথার সঙ্গে রূপাের বৃষ্টি।

চতুর্থী

তাও বলি বাপু, এটা কিছু বেশি,

সবার সঙ্গে এত মেশামেশি।

বড় লােক তুমি ভাগ্যিমন্ত,

সেই মত চাই চাল চলন্ ত?

তৃতীয়া

দেখলি সেদিন শশীর বাঁ গালে

আপনার হাতে ওষুধ লাগালে!

চতুর্থী

বিধু খোঁড়া সেটা নেহাৎ বাঁদর

তা’রে কেন এত যত্ন আদর?

তৃতীয়া

এত লােক আছে কেদারের মা’কে

কেন বল দেখি দিনরাত ডাকে!

গয়লাপাড়ার কেষ্টদাসী

তারি সাথে কত গল্প হাসি,

যেন সে কতই বন্ধু পুরােনাে!

চতুর্থী

ও গুলাে লােকের আদর কুড়ােনাে।

ক্ষীরাে

এ সংসারের ঐত প্রথা,

দেওয়া নেওয়া ছাড়া নেইক কথা।

ভাত তুলে দেন মােদের মুখে

নাম তুলে নেন পরম সুখে।

ভাত মুখে দিলে তখনি ফুরোয়

নাম চিরদিন কর্ণ জুড়ােয়।

চতুর্থী

ঐ বউ নিয়ে ফিরে এল নেকী।

(বধূসহ দ্বিতীয়ার প্রবেশ)

প্রথমা

কি পেলি লাে বিধু দেখি দেখি দেখি!

দ্বিতীয়া

শুধু এক জোড়া রতনচক্র।

তৃতীয়া

বিধি আজ তােরে বড়ই বক্র।

এত ঘটা করে’ নিয়ে গেল ডেকে

ভেবেছিনু দেবে গয়না গা ঢেকে।

চতুর্থী

মেয়ের বিয়েতে পেয়ারী বুড়ি

পেয়েছিল হার তা ছাড়া চুড়ি।

দ্বিতীয়া

আমি যে গরীব নই যথেষ্ট

গরিবীয়ানায় সে মাগী শ্রেষ্ঠ।

অদৃষ্টে যার নেইক গয়না

গরীব হয়ে সে গরীব হয় না।

চতুর্থী

বড় মানষের বিচার ত নেই।

কারেও বা তাঁর ধরে না মনেই

কেউ বা আবার মাথার ঠাকুর!

প্রথমা

টাকাটা সিকেটা কুমড়াে কাঁকুড়

যা পাই সে ভালাে, কে দেয় তাই বা!

দ্বিতীয়া

অবিচারে দান দিলেন নাই বা।

মাথাবাঁধা রেখে পায়ের নীচে

ভরি কত সােনা পেলেম মিছে।

ক্ষীরাে

মা লক্ষনী যদি হতেন সদয়

দেখিয়ে দিতেম দাতা কারে কয়।

দ্বিতীয়া

আহা তাই হােক লক্ষ্মীর বরে

তাের ঘরে যেন টাকা নাহি ধরে।

প্রথমা

ওলো থাম্ তােরা, রাখ, বকুনি-

রাণীর পায়ের শব্দ শুনি!

চতুর্থী

(উচ্চৈঃস্বরে) আহা জননীর অসীম দয়া।

ভগবতী যেন কমলালয়া।

দ্বিতীয়া

হেন নারী আর হয়নি সৃষ্টি,

সবা পরে তাঁর সমান দৃষ্টি।

তৃতীয়া

আহা মরি, তাঁরি হস্তে আসি

সার্থক হ’ল অর্থরাশি।

কল্যাণীর প্রবেশ

কল্যাণী

রাত হ’ল তবু কিসের কমিটি?

ক্ষীরাে

সবাই তােমার যশের জমিটি

নিড়োতেছিলেন, চষতেছিলেন,

মই দিয়ে কসে’ ঘষতেছিলেন,

আমি মাঝে মাঝে বীজ ছিটিয়ে

বুনেছি ফসল আশ মিটিয়ে।

কল্যাণী

রাত হ’ল আজ যাও সবে ঘরে,

এই ক’টি কথা রেখাে মনে করে'।

আশার অন্ত নাইক বটে,

আর সকলেরি অন্ত ঘটে।

সবার মনের মতন ভিক্ষে

দিতে যদি হ’ত, কল্পবৃক্ষে

ঘুণ ধরে’ যেত, আমি ত তুচ্ছ।

নিন্দে করলে যাব না মুচ্ছে,

তবু এ কথাটা ভেবে দেখাে দিখি—

ভালাে কথা বলা শক্ত বেশি কি?

( প্রস্থান)

চতুর্থী

কি বলছিলেম ছিল সেই খোঁজে!

ক্ষীরাে

না গাে না তা নয়, এটুকু সে বােঝে-

সামনে তােমরা যেটুকু বাড়ালে

সেটুকু কমিয়ে আনবে আড়ালে।

উপকার যেন মধুর পাত্র,

হজম করতে জ্বলে যে গাত্র,

তাই সাথে চাই ঝালের চাটনি

নিন্দে বান্দা কান্না কাটনি।

যার খেয়ে মশা ওঠেন ফুলে,

জ্বালা তা’রেই গােপন হুলে।

দেবতারে নিয়ে বানাবে দত্যি

কলিকাল তবে হবে ত সত্যি!

চতুর্থী

মিথ্যে না ভাই! সামলে চলিস্।

যাই মুখে আসে তাই যে বলিস্।

পালন যে করে সে হ’ল মা বাপ,

তাহারি নিন্দে, সে যে মহাপাপ।

এমন লক্ষ্মী এমন সতী

কোথা আছে হেন পুণ্যবতী।

যেমন ধনের কপাল মস্ত

তেমনি দানের দরাজ হস্ত,

যেমন রূপসী তেমনি সাধ্বী,

খুঁত ধরে তাঁর কাহার সাধ্যি।

দিনেকে দোষ তাহার নামে।

তৃতীয়া

তুমি থামলে যে অনেক থামে।

দ্বিতীয়া

আহা কোথা হ’তে এলেন গুরু,

হিতকথা আর কোরাে না সুরু।

হঠাৎ ধর্ম্মকথার পাঠটা

তােমার মুখে যে শােনায় ঠাট্টা।

ক্ষীরাে

ধর্ম্মও রাখাে, ঝগড়াও থাক,

গলা ছেড়ে আর বাজিয়াে না ঢাক।

পেট ভরে’ খেলে, করলে নিন্দে,

বাড়ি ফিরে গিয়ে ভজ গােবিন্দে।

(প্রতিবেশিনীগণের প্রস্থান

ওরে বিনি, ওরে কিনি, ওরে কাশি!

বিনি, কিনি ও কাশীর প্রবেশ

কাশী

কেন দিদি!

কিনি

কেন খুড়ি!

বিনি

কেন মাসী!

ক্ষীরাে

ওরে খাবি আয়।

বিনি

কিছু নেই ক্ষিধে।

ক্ষীরাে

খেয়ে নিতে হয় পেলেই সুবিধে।

কিনি

রসকরা খেয়ে পেট বড় ভার।

ক্ষীরাে

বেশি কিছু নয়, শুধু গােটাচার

ভােলাময়রার চন্দ্রপুলি

দেখদেখি ঐ ঢাকনা খুলি;—

তাই মুখে দিয়ে, দু’বাটি-খানিক

দুধ খেয়ে শােও লক্ষ্মী মাণিক।

কাশী

কত খাব দিদি সমস্ত দিন?

ক্ষীরাে

খাবার ত নয় ক্ষিদের অধীন;

পেটের জ্বালায় কত লোক ছােটে

খাবার কি তা’র মুখে এসে জোটে?

দুঃখী গরীব কাঙাল ফতুর

চাষাভূষাে মুটে অনাথ অতুর

কারাে ত ক্ষিদের অভাব হয় না,

চন্দ্রপুলিটা সবার হয় না।

মনে রেখে দিস্ যেটার যা’ দর,

ক্ষিদের চাইতে খাবার আদর।

হ্যাঁরে বিনি তাের চিরুণী রূপাের

দেখচিনে কেন খোঁপার উপর?

বিনি

সেটা ওপাড়ার ক্ষেতুর মেয়ে

কেঁদেকেটে কাল নিয়েছে চেয়ে।

ক্ষীরাে

ঐরে হয়েছে মাথাটি খাওয়া!

তােমারে লেগেছে দাতার হাওয়া?

বিনি

আহা কিছু তা’র নেই যে মাসী!

ক্ষীরাে

তােমারি কি এত টাকার রাশি?

গরীব লােকের দয়ামায়া রোগ

সেটা যে একটা ভারি দুর্য্যোগ।

না না, যাও তুমি মায়ের বাড়িতে,

হেথাকার হাওয়া স’বে না নাড়িতে।

রাণী যত দেয় ফুরােয় না, তাই

দান করে’ তার কোনাে ক্ষতি নাই।

তুই যেটা দিলি রইল না তাের

এতেও মনটা হয় না কাতর?

ওরে বােকা মেয়ে আমি আরাে তােরে

আনিয়ে নিলেম এই মনে করে’

কি করে’ কুড়ােতে হইবে ভিক্ষে

মাের কাছে তাই করবি শিক্ষে।

কে জানত তুই পেট না ভরতে

উলটো বিদ্যে শিখবি মরতে?

—দুধ যে রইল বাটির তলায়

ঐটুকু বুঝি গলে না গলায়?

আমি মরে’ গেলে যত মনে আশ

কোরাে দান ধ্যান আর উপবাস।

যতদিন আমি রয়েছি বর্ত্তে

দেব’ না কর্ত্তে আত্মহত্যে।

খাওয়া দাওয়া হ’ল’ এখন তবে

রাত ঢের হ’ল শােওগে সবে।

(কিনি বিনি কাশীর প্রস্থান)

কল্যাণীর প্রবেশ

ওগাে দিদি আমি বাঁচিনে ত আর।

কল্যাণী

সেটা বিশ্বাস হয় না আমার।

তবু কি হয়েছে শুনি ব্যাপারটা।

ক্ষীরাে

মাইরি দিদি এ নয়ক ঠাট্টা!

দেশ থেকে চিঠি পেয়েছি মামার

বাঁচে কি না বাঁচে খুড়ীটি আমার,—

শক্ত অসুখ হয়েছে এবার

টাকাকড়ি নেই ওষুধ দেবার।

কল্যাণী

এখনাে বছর হয়নি গত,

খুড়ীর শ্রাদ্ধে নিলি যে কত।

ক্ষীরাে

হাঁ হাঁ বটে বটে মরেছে বেটী,

খুড়ী গেছে তবু আছে ত জ্যেঠী।

আহা রাণী দিদি ধন্য তােরে

এত রেখেছিস্ স্মরণ করে'।

এমন বুদ্ধি আর কি আছে?

এড়ায় না কিছু তােমার কাছে?

ফাঁকি দিয়ে খুড়ী বাঁচবে আবার

সাধ্য কি আছে সে তাঁর বাবার?

কিন্তু কখনাে আমার জ্যেঠী

মরেনি পূর্ব্বে মনে রেখ সেটি।

কল্যাণী

মরেওনি বটে জন্মেওনি কভু।

ক্ষীরাে

এমন বুদ্ধি দিদি তাের, তবু

সে বুদ্ধিখানি কেবলি খেলায়

অনুগত এই আমারি বেলায়?

কল্যাণী

চেয়ে নিতে তাের মুখে ফোটে কাঁটা

না বল্লে নয় মিথ্যে কথাটা?

ধরা পড়’ তবু হও না জব্দ?

ক্ষীরাে

“দাও দাও” ও ত একটা শব্দ,

ওটা কি নিত্যি শােনায় মিষ্টি?

মাঝে মাঝে তাই নতুন সৃষ্টি

কর্ত্তেই হয় খুড়ী জেঠীমার।

জান ত সকলি তবে কেন আর

লজ্জা দিচ্চ?

কল্যাণী

অমনি চেয়ে কি

পাসনি কখনাে তাই বল্ দেখি?

ক্ষীরাে

মরা পাখীরেও শিকার করে’

তবে ত বিড়াল মুখেতে পােরে।

সহজেই পাই তবু দিয়ে ফাঁকি

স্বভাবটাকে যে শাণ দিয়ে রাখি।

বিনা প্রয়ােজনে খাটাও যাকে

প্রয়ােজনকালে ঠিক সে থাকে।

সত্যি বলচি মিথ্যে কথায়

তােমারাে কাছেতে ফল পাওয়া যায়।

কল্যাণী

এবার পাবে না।

ক্ষীরাে

আচ্ছ। বেশ ত

সেজন্যে আমি নইক ব্যস্ত।

আজ না হয় ত কাল ত হবে,

ততখন মাের সবুর সবে।

গা ছুঁয়ে কিন্তু বলচি তােমার

খুড়ীটার কথা তুলব না আর।

(কল্যাণীর হাসিয়া প্রস্থান)

হরি বল মন! পরের কাছে

আদায় করার সুখও আছে,

দুঃখও ঢের! হে মা লক্ষ্মীটি

তােমার বাহন পেঁচা পক্ষীটি

এত ভালবাসে এ বাড়ির হাওয়া,

এত কাছাকাছি করে আসা-যাওয়া

ভুলে কোনাে দিন আমার পানে

তােমারে যদি সে বহিয়া আনে

মাথায় তাহার পরাই সিঁদুর,

জলপান দিই আশীটা ইঁদুর,

খেয়ে দেয়ে শেষে পেটের ভারে

পড়ে’ থাকে বেটা আমারি দ্বারে;

সােনা দিয়ে ডানা বাঁধাই, তবে

ওড়বার পথ বন্ধ হবে।

লক্ষ্মীর আবির্ভাব

কে আবার রাতে এসেছ জ্বালাতে,

দেশ ছেড়ে শেষে হবে কি পালাতে,

আর ত পারিনে!

লক্ষী

পালাব তবে কি?

যেতে হ’বে দূরে।

ক্ষীরাে

রােস রােস দেখি!

কি পরেছ ওটা মাথার ওপর,

দেখাচ্ছে যেন হীরের টোপর।

হাতে কি রয়েছে সােনার বাক্সে

দেখতে পারি কি? আচ্ছা, থাক্ সে।

এত হীরে সােনা কারাে ত হয় না,—

ও গুলাে ত নয় গিল্টি গয়না?

এগুলি ত সব সাঁচ্চা পাথর?

গায়ে কি মেখেছ, কিসের আতর?

ভুর ভুর করে পদ্মগন্ধ;

মনে কত কথা হতেছে সন্ধ।

বস’ বাছা, কেন এলে এত রাতে?

আমারে ত কেউ আসনি ঠকাতে?

যদি এসে থাক ক্ষীরিকে তাহ’লে

চিনতে পারনি সেটা রাখি বলে'।

নাম কি তােমার বল দেখি খাঁটি!

মাথা খাও বােলাে সত্য কথাটি।

লক্ষ্মী

একটা ত নয়, অনেক যে নাম।

ক্ষীরাে

হাঁ হাঁ থাকে বটে স্বনাম বেনাম

ব্যবসা যাদের ছলনা করা।

কখনাে কোথাও পড়নি ধরা?

লক্ষ্মী

ধরা পড়ি বটে দুই দশ দিন

বাঁধন কাটিয়ে আবার স্বাধীন।

ক্ষীরাে

হেঁয়ালিটা ছেড়ে কথা কও সিধে,

অমন কল্লে হবে না সুবিধে।

নামটি তােমার বল অকপটে!

লক্ষ্মী

লক্ষ্মী।

ক্ষীরাে

তেমনি চেহারাও বটে।

লক্ষ্মী ত আছে অনেকগুলি,

তুমি কোথাকার বল ত খুলি!

লক্ষ্মী

সত্যি লক্ষ্মী একের অধিক

নাই ত্রিভুবনে।

ক্ষীরাে

ঠিক ঠিক ঠিক!

তাই বল মাগাে, তুমিই কি তিনি?

আলাপ ত নেই চিন্‌তে পারিনি।

চিনতেম যদি চরণ জোড়া

কপাল হ’ত কি এমন পােড়া?

এস, বস’, ঘর কর’সে আলাে।

পেঁচা দাদা মাের আছে ত ভালাে?

এসেছ যখন, তখন মাতঃ

তাড়াতাড়ি যেতে পারবে না ত!

যােগাড় করচি চরণ সেবার;

সহজ হস্তে পড়নি এবার।

সেয়ানা লােকেরে কর না মায়া

কেন যে জানি তা বিষ্ণুজায়া।

না খেয়ে মরে না বুদ্ধি থাকলে,

বােকারি বিপদ তুমি না রাখলে।

লক্ষী

প্রতারণা করে’ পেটটি ভরাও,

ধর্ম্মেরে তুমি কিছু না ডরাও?

ক্ষীরাে

বুদ্ধি দেখলে এগােও না গাে,

তাের দয়া নেই, কাজেই মাগাে,

বুদ্ধিমানেরা পেটের দায়ে

লক্ষ্মীমানেরে ঠকিয়ে খায়।

লক্ষ্মী

সরল বুদ্ধি আমার প্রিয়,

বাঁকা বুদ্ধিরে ধিক্‌ জানিয়ো।

ক্ষীরাে

ভালাে তলােয়ার যেমন বাঁকা,

তেমনি বক্র বুদ্ধি পাকা।

ও জিনিস বেশি সরল হ’লে

নির্ব্বুদ্ধিত তা’রেই বলে।

ভালাে মাগাে, তুমি দয়া কর যদি,

বােকা হ’য়ে আমি র’ব নিরবধি।

লক্ষ্মী

কল্যাণী তাের অমন প্রভু

তা’রেও দস্যু ঠকাও তবু।

ক্ষীরাে

অদৃষ্টে শেষে এই ছিল মাের

যার লাগি চুরি সেই বলে চোর।

ঠকাতে হয় যে কপালদোষে

তােরে ভালবাসি বলেই ত সে।

আর ঠকাব না আরামে ঘুমিয়াে;

আমারে ঠকিয়ে যেও না তুমিও।

লক্ষ্মী

স্বভাব তােমার বড়ই রুক্ষী।

ক্ষীরাে

তাহার কারণ আমি যে দুঃখী।

তুমি যদি কর রসের বৃষ্টি

স্বভাবটা হবে আপনি মিষ্টি।

লক্ষ্মী

তােরে যদি আমি করি আশ্রয়

যশ পাব কি না সন্দেহ হয়।

ক্ষীরাে

যশ না পাও ত কিসের কড়ি?

তবে ত আমার গলায় দড়ি।

দশের মুখেতে দিলেই অন্ন

দশমুখে উঠে ধন্য ধন্য।

লক্ষ্মী

প্রাণ ধরে’ দিতে পারবি ভিক্ষে?

ক্ষীরাে

একবার তুমি কর পরীক্ষে।

পেট ভরে’ গেলে যা থাকে বাকি

সেটা দিয়ে দিতে শক্তটা কি!

দানের গরবে যিনি গরবিনী

তিনি হােন্ আমি, আমি হই তিনি,

দেখবে তখন তাঁহার চালটা,

আমারি বা কত উল্টো পাল্টা।

দাসী আছি, জানি দাসীর যা রীতি,

রাণী কর, পাব রাণীর প্রকৃতি।

তাঁরো যদি হয় মাের অবস্থা

সুযশ হবে না এমন সস্তা।

তাঁর দয়াটুকু পাবে না অন্যে

ব্যয় হবে সেটা নিজেরি জন্যে।

কথার মধ্যে মিষ্টি অংশ

অনেকখানিই হবেক ধ্বংস।

দিতে গেলে, কড়ি কভু না সরবে,

হাতের তেলােয় কামড়ে ধরবে।

ভিক্ষে করতে ধরতে দু’পায়

নিত্যি নতুন উঠবে উপায়।

লক্ষ্মী

তথাস্তু, রাণী করে’ দিমু তােকে,

দাসী ছিলি তুই ভুলে যাবে লােকে

কিন্তু সদাই থেকে সাবধান

আমার না যেন হয় অপমান।

দ্বিতীয় দৃশ্য

রাণীবেশে ক্ষীরাে ও তাহার পারিষদবর্গ

ক্ষীরাে

বিনি!

বিনি

কেন মাসী!

ক্ষীরাে

মাসী কিরে মেয়ে!

দেখিনি ত আমি বােকা তাের চেয়ে।

কাঙাল ভিখিরি কলু মালী চাষী

তা’রাই মাসীরে বলে শুধু মাসী;

রাণীর বােনঝি হয়েছ ভাগ্যে,

জান না আদব! মালতী,

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

রাণীর বােনঝি রাণীরে কি ডাকে

শিখিয়ে দে ঐ বােকা মেয়েটাকে।

মালতী

ছিছি শুধু মাসী বলে কি রাণীকে?

রাণী মাসী বলে রেখে দিয়াে শিখে।

ক্ষীরাে

মনে থাকবে ত? কোথা গেল কাশী!

কাশী

কেন রাণী দিদি।

ক্ষীরাে

চার চার দাসী

নেই যে সঙ্গে?

কাশী

এত লােক মিছে

কেন দিনরাত লেগে থাকে পিছে?

ক্ষীরাে

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

এই মেয়েটাকে

শিখিয়ে দে কেন এত দাসী থাকে।

মালতী

তােমরা ত নও জেলেনী তাঁতিনী,

তােমরা হও যে রাণীর নাতিনী।

যে নবাববাড়ি এনু আমি ত্যেজি

সেথা বেগমের ছিল পােষা বেজি

তারি একেকটা ছােট বাচ্ছার

পিছনেতে ছিল দাসী চার চার

তা ছাড়া সেপাই।

ক্ষীরাে

শুনলি ত কাশী।

কাশী

শুনেছি।

ক্ষীরাে

তাহ’লে ডাক তোর দাসী।

কিনি পােড়ামুখী!

কিনি

কেন রাণী খুড়ী?

ক্ষীরাে

হাই তুল্লেম দিলিনে যে তুড়ি?

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

শেখাও কায়দা।

মালতী

এত বলি তবু হয় না ফায়দা।

বেগম সাহেব যখন হাঁচেন

তুড়ি ভুল হ’লে কেহ না বাঁচেন।

তখনি শূলেতে চড়িয়ে তা’রে

নাকে কাটি দিয়ে হাঁচিয়ে মারে।

ক্ষীরাে

সােনার বাটায় পান দে তারিণী!

কোথা গেল মাের চামরধারিণী।

তারিণী

চলে’ গেছে ছুড়ি, সে বলে মাইনে

চেয়ে চেয়ে তবু কিছুতে পাইনে।

ক্ষীরাে

ছােট লােক বেটী হারামজাদী

রাণীর ঘরে সে হয়েছে বাঁদি

তবু মনে তা’র নেই সন্তোষ

মাইনে পায় না বলে’ দেয় দোষ।

পিঁপড়ের পাখা কেবল মরতে।

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

মাগীরে ধরতে

পাঠাও আমার ছ-ছয় পেয়াদা,

না না যাবে আরাে দুজন জেয়াদা।

কি বল মালতী!

মালতী

দস্তুর তাই।

ক্ষীরাে

হাতকড়ি দিয়ে বেঁধে আনা চাই।

তারিণী

ওপাড়ার মতি রাণীমাতাজির

চরণ দেখতে হয়েছে হাজির।

ক্ষীরাে

মালতী।

২৭৩

মালতী

আজ্ঞে।

ক্ষীরাে

নবাবের ঘরে

কোন্ কায়দায় লােকে দেখা করে।

মালতী

কুর্ণিস করে’ ঢােকে মাথা নুয়ে,

পিছু হটে’ যায় মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে।

ক্ষীরাে

নিয়ে এস সাথে, যাও ত মালতী,

কুর্ণিস করে’ আসে যেন মতি।

(মতিকে লইয়া মালতীর পুনঃপ্রবেশ)

মালতী

মাথা নীচু কর। মাটি ছোঁও হাতে,

লাগাও হাতটা নাকের ডগাতে।

তিন পা এগােও, নীচু কর মাথা।

মতি

আর ত পারিনে, ঘাড়ে হ’ল ব্যথা।

মালতী

তিনবার নাকে লাগাও হাতটা।

মতি

টন্ টন্ করে পিঠের বাতটা।

মালতী

তিন পা এগােও, তিনবার ফের

ধূলাে তুলে নেও ডগায় নাকের।

মতি

ঘাট হয়েছিল এসেছি এ পথ,

এর চেয়ে সিধে নাকে দেওয়া খৎ।

জয় রাণীমার, একাদশী আজি।

ক্ষীরাে

রাণীর জ্যোতিষী শুনিয়েছে পাঁজি।

কবে একাদশী, কবে কোন্ বার

লােক আছে মাের তিথি গােরবার।

মতি

টাকাটা সিকেটা যদি কিছু পাই

জয় জয় বলে’ বাড়ি চলে’ যাই।

ক্ষীরাে

যদি নাই পাও তবু যেতে হবে,

কুর্ণিস করে’ চলে’ যাও তবে।

মতি

ঘড়া ঘড়া টাকা ঘরে গড়াগড়ি

তবু কড়াকড় দিতে কড়াকড়ি।

ক্ষীরাে

ঘরের জিনিস ঘরেরি ঘড়ায়

চিরদিন যেন ঘরেই গড়ায়।

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

এবার মাগীরে

কুর্ণিস করে’ নিয়ে যাও ফিরে।

মতি

চল্লেম তবে।

মালতী

রোস, ফিরােনাকো,

তিনবার মাটি তুলে নাকে মাখাে।

তিন পা কেবল হটে’ যাও পিছু,

পােড়ো না উল্টে, মাথা কর নীচু।

মতি

হায়, কোথা এনু, ভরল না পেট,

বারে বারে শুধু মাথা হ’ল হেঁট।

আহা কল্যাণী রাণীর ঘরে

কর্ণ জুড়ােয় মধুর স্বরে,—

কড়ি যদি দেন অমূল্য তাই,—

হেথা হীরে মােতি সেও অতি ছাই।

ক্ষীরাে

সে-ছাই পাবার ভরসা কোরাে না।

মালতী

সাবধানে হঠ, উল্টে পােড় না।

(মতির প্রস্থান)

ক্ষীরাে

বিনি!

বিনি

রাণী মাসী!

ক্ষীরাে

একগাছি চুড়ি

হাত থেকে তাের গেছে না কি চুরি?

বিনি

চুরি ত যায় নি।

ক্ষীরাে

গিয়েছে হারিয়ে?

বিনি

হারায় নি।

ক্ষীরাে

কেউ নিয়েছে ভাঁড়িয়ে?

বিনি

না গাে রাণী মাসী!

ক্ষীরাে

এটা ত মানিস্

পাখা নেই তা’র! একটা জিনিস

হয় চুরি যায়, নয় ত হারায়,

নয় মারা যায় ঠগের দ্বারায়;

তা না হ’লে থাকে, এ ছাড়া তাহার

কি যে হ’তে পারে জানিনে ত আর।

বিনি

দান করেছি সে।

ক্ষীরাে

দিয়েছিস্ দানে?

ঠকিয়েছে কেউ, তারি হ’ল মানে।

কে নিয়েছে বল?

বিনি

মল্লিকা দাসী।

এমন গরীব নেই রাণী মাসী।

ঘরে আছে তা’র সাত ছেলে মেয়ে

মাস পাঁচছয় মাইনে না পেয়ে

খরচ পত্র পাঠাতে পারে না

দিনে দিনে তা’র বেড়ে যায় দেনা,

কেঁদে কেঁদে মরে, তাই চুড়িগাছি

নুকিয়ে তাহারে দান করিয়াছি।

অনেক ত চুড়ি আছে মাের হাতে

একখানা গেলে কি হবে তাহাতে।

ক্ষীরাে

বােকা মেয়েটার শােন ব্যাখ্যানা।

একখানা গেলে গেল একখানা,

সে যে একেবারে ভারি নিশ্চয়।

কে না জানে যেটা রাখ সেটা রয়,

যেটা দিয়ে ফেল সেটা ত রয় না,

এর চেয়ে কথা সহজ হয় না।

অল্পস্বল্প যাদের আছে।

দানে যশ পায় লােকের কাছে;

ধনীর দানেতে ফল নাহি ফলে,

যত দেও তত পেট বেড়ে চলে,

কিছুতে ভরে না লােকের স্বার্থ,

ভাবে, আরাে ঢের দিতে যে পারত।

অতএব বাছা হ’বি সাবধান,

বেশি আছে বলে’ করিসনে দান।

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

বােকা মেয়েটি এ,

এরে দুটো কথা দাও সমজিয়ে।

মালতী

রাণীর বােনঝি রাণীর অংশ,

তফাতে থাকবে উচ্চ বংশ;

দান করা-টরা যত হয় বেশি

গরীবের সাথে তত ঘেঁসাঘেঁসি।

পুরােনাে শাস্ত্রে লিখেছে শােলােক,

গরীবের মত নেই ছোটলােক।

ক্ষীরাে

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

মল্লিকাটারে

আর ত রাখা না।

মালতী

তাড়াব তাহারে;

ছেলেমেয়েদের দয়ার চর্চ্চা

বেড়ে গেলে, সাথে বাড়বে খরচা।

ক্ষীরাে

তাড়াবার বেলা হ’য়ে আনমনা

বালাটা সুদ্ধ যেন তাড়িয়াে না।

বাহিরের পথে কে বাজায় বাঁশি

দেখে আয় মাের ছয় ছয় দাসী।

(তারিণীর প্রস্থান ও পুনঃপ্রবেশ)

তারিণী

মধুদত্তর পৌত্রের বিয়ে

ধুম করে’ তাই চলে পথ দিয়ে।

ক্ষীরাে

রাণীর বাড়ির সামনের পথে

বাজিয়ে যাচ্ছে কি নিয়মমতে?

বাঁশির বাজনা রাণী কি সইবে?

মাথা ধরে’ যদি থাকত দৈবে?

যদি ঘুমােতেন, কাঁচা ঘুমে জেগে

অসুখ করত যদি রেগেমেগে?

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

নবাবের ঘরে

এমন কাণ্ড ঘটলে কি করে?

মালতী

যার বিয়ে যায় তা’রে ধরে’ আনে,

দুই বাঁশিওয়ালা তা’র দুই কানে

কেবলি বাজায় দুটো দুটো বাঁশি;

তিন দিন পরে দেয় তা’রে ফাঁসি।

ক্ষীরাে

ডেকে দাও কোথা আছে সর্দ্দার,

নিয়ে যাক দশ জুতোবর্দ্দার,

ফি লােকের পিঠে দশ ঘা চাবুক

সপাসপ বেগে সজোরে নাবুক।

মালতী

তবু যদি কারাে চেতনা না হয়,

বন্দুক দিলে হবে নিশ্চয়।

প্রথমা

ফাঁসি হ’ল মাপ, বড় গেল বেঁচে,

জয় জয় বলে’ বাড়ি যাবে নেচে।

দ্বিতীয়া

প্রসন্ন ছিল তাদের গ্রহ

চাবুক ক’ঘা ত অনুগ্রহ।

তৃতীয়া

বলিস্ কি ভাই ফাঁড়া গেল কেটে,

আহা এত দয়া রাণীমার পেটে!

ক্ষীরাে

থাম্ তােরা, শুনে নিজে গুণগান

লজ্জায় রাঙা হ’য়ে ওঠে কান।

বিনি!

বিনি

রাণী মাসী!

ক্ষীরো

স্থির হয়ে র’বি

ছট্‌ফট্ করা বড় বে-আদবী।

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

মেয়েরা এখনো

শেখেনি আমিরী দস্তুর কোনাে।

মালতী

(বিনির প্রতি) রাণীর ঘরের ছেলেমেয়েদের

ছটফট করা ভারি নিন্দের।

ইতর লােকেরি ছেলেমেয়েগুলাে

হেসে খুসে ছুটে করে খেলাধূলাে।

রাজা রাণীদের পুত্রকন্যে

অধীর হয় না কিছুরি জন্যে।

হাত পা সামলে খাড়া হ’য়ে থাক

রাণীর সামনে নােড়ো চোড়োনাক।

ক্ষীরাে

ফের গােলমাল করচে কাহারা?

দরজায় মাের নাই কি পাহারা?

তারিণী

প্রজারা এসেছে নালিশ করতে।

ক্ষীরাে

আর কি জায়গা ছিল না মরতে?

মালতী

প্রজার নালিশ শুনবে রাজ্ঞী

ছােটলােকদের এত কি ভাগ্যি!

প্রথমা

তাই যদি হবে তবে অগণ্য

নােকর চাকর কিসের জন্য?

দ্বিতীয়া

নিজের রাজ্যে রাখতে দৃষ্টি

রাজা রাণীদের হয় নি সৃষ্টি

তারিণী

প্রজারা বল্‌চে কর্ম্মচারী

পীড়ন তাদের করচে ভারী।

নাই মায়া দয়া নাইক ধর্ম্ম,

বেচে নিতে চায় গায়ের চর্ম্ম।

বলে তা’রা, হায় কি করেছি পাপ,

এত ছোট মােরা, এত বড় চাপ।

ক্ষীরাে

শর্সেও ছােট, তবু সে তােগায়,

চাপ না পেলে কি তৈল যােগায়?

টাকা জিনিসটা নয় পাকা ফল,

টুপ করে’ খসে’ ভরে না আঁচল;

ছিঁড়ে নাড়া দিয়ে ঠেঙার বাড়িতে

তবে ও জিনিস হয় যে পাড়িতে।

তারিণী

সেজন্যে না মা,—তােমার খাজনা

বঞ্চনা করা তাদের কাজ না।

তারা বলে যত আমলা তােমার

মাইনে না পেয়ে হয়েছে গােঙার।

লুটু পাট করে’ মারচে প্রজা,

মাইনে পেলেই থাকবে সােজা।

ক্ষীরাে

রাণী বটি, তবু নইক বােকা,

পারবে না দিতে মিথ্যে ধোঁকা;

করবেই তা’রা দস্যুবৃত্তি,

মাইনেটা দেওয়া মিথ্যে মিথ্যি।

প্রজাদের ঘরে ডাকাতি করে

তা বলে’ করবে রাণীরো ঘরে?

তারিণী

তা’রা বলে রাণী কল্যাণী যে

নিজের রাজ্য দেখেন নিজে।

নালিশ শােনেন নিজের কানেই,

প্রজাদের পরে জুলুমটা নেই।

ক্ষীরাে

ছােটমুখে বলে বড় কথাগুলা,

আমার সঙ্গে অন্যের তুলা?

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

কি কর্ত্তব্য?

মালতী

জরিমানা দিক্‌ যত অসভ্য

একশাে একশাে।

ক্ষীরাে

গরীব ওরা যে,

তাই একেবারে একশাের মাঝে

নব্বই টাকা করে’ দিনু মাপ।

প্রথমা

আহ গরীবের তুমিই মা বাপ।

দ্বিতীয়া

কার মুখ দেখে উঠেছিল প্রাতে,

নব্বই টাকা পেলে হাতে হাতে।

তৃতীয়া

নব্বই কেন, যদি ভেবে দেখে,

আরাে ঢের টাকা নিয়ে গেল ট্যাঁকে।

হাজার টাকার নশাে নব্বই

চখের পলকে পেল সর্ব্বই।

চতুর্থী

একদমে ভাই এত দিয়ে ফেলা,

অন্য কে পারে, এ ত নয় খেলা!

ক্ষীরাে

বলিসনে আর মুখের আগে,

নিজগুণ শুনে সরম লাগে।

বিনি!

বিনি

রাণী মাসি!

ক্ষীরাে

হঠাৎ কি হ’ল!

ফোঁস ফোঁস করে’ কাঁদিস্ কেন লাে?

দিন রাত আমি বকে’ বকে’ খুন,

শিখলিনে কিছু কায়দা কানুন?

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

এই মেয়েটাকে

শিক্ষা না দিলে মান নাহি থাকে।

মালতী

রাণীর বােনঝি জগতে মান্য,

বােঝ না এ কথা অতি সামান্য।

২৮৯

সাধারণ যত ইতর লােকেই

সুখে হাসে, কাঁদে দুঃখ শােকেই।

তােমাদেরাে যদি তেমনি হবে,

বড়লােক হ’য়ে হ’ল কি তবে?

(একজন দাসীর প্রবেশ)

দাসী

মাইনে না পেলে মিথ্যে চাকরী,

বাঁধা দিয়ে এনু কানের মাকড়ি।

ধার করে’ খেয়ে পরের গােলামী

এমন কখনাে শুনিনি ত আমি।

মাইনে চুকিয়ে দাও, তা না হ’লে

ছুটি দাও আমি ঘরে যাই চলে'।

ক্ষীরাে

মাইনে চুকোনাে নয়ক মন্দ,

তবু ছুটিটাই মাের পছন্দ।

বড় ঝঞ্ঝাট মাইনে বাঁটতে,

হিসেব কিতেব হয় যে ঘাঁটতে।

ছুটি দেওয়া যায় অতি সত্বর,

খুলতে হয় না খাতা পত্তর।

ছ-ছয় পেয়াদা ধরে আসি কেশ,

নিমেষ ফেলতে কর্ম্ম নিকেশ।

মালতী।

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

সাথে যাও ওর

ঝেড়ে ঝুড়ে নিয়ে কাপড় চোপড়,

ছুটি দেয় যেন দরােয়ান যত

হিন্দুস্থানী দস্তুর মত।

মালতী

বুঝেছি রাণীজি!

ক্ষীরাে

আচ্ছা তাহ’লে

কুর্ণিস করে’ যাক বেটী চলে'।

(কুর্ণি করাইয়া দাসীকে বিদায়)

দাসী

দুয়ারে রাণী মা দাঁড়িয়ে আছে কে

বড় লােকের ঝি মনে হয় দেখে।

ক্ষীরাে

এসেছে কি হাতী কিম্বা রথে?

দাসী

মনে হ’ল যেন হেঁটে এল পথে।

ক্ষীরাে

কোথা তবে তা’র বড়লােকত্ব?

দাসী

রাণীর মতন মুখটি সত্য।

ক্ষীরাে

মুখে বড়লোক লেখা নাহি থাকে,

গাড়ি ঘােড়া দেখে চেনা যায় তা’কে

(মালতীর প্রবেশ )

মালতী

রাণী কল্যাণী এসেছেন দ্বারে

রাণীজির সাথে দেখা করিবারে।

ক্ষীরাে

হেঁটে এসেছেন?

মালতী

শুনচি তাইত!

ক্ষীরাে

তাহ’লে হেথায় উপায় নাই ত।

সমান আসন কে তাহারে দেয়?

নীচু আসনটা সেও অন্যায়!

এ এক বিষম হ’ল সমিস্যে,

মীমাংসা এর কে করে বিশ্বে?

প্রথমা

মাঝখানে রেখে রাণীজির গদি

তাহার আসন দূরে রাখি যদি!

দ্বিতীয়া

ঘুরায়ে যদি এ আসনখানি

পিছন ফিরিয়া বসেন রাণী!

তৃতীয়া

যদি বলা যায় ফিরে যাও আজ,

ভাললা নেই বড় রাণীর মেজাজ

ক্ষীরাে

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

কি করি উপায়?

মালতী

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যদি সারা যায়

দেখা শােনা, তবে সব গােল মেটে।

ক্ষীরাে

এত বুদ্ধিও আছে তাের পেটে!

সেই ভালাে। আগে দাঁড়া সার বাঁধি

আমার একশাে পঁচিশটে বাঁদী।

ও হ’ল না ঠিক,—পাঁচ পাঁচ করে’

দাঁড়া ভাগে ভাগে,—তােরা আয় সরে,'-

না না এই দিকে,—না না কাজ নেই,

সারি সারি তােরা দাঁড়া সামনেই,—

না না তাহ’লে যে মুখ যাবে ঢেকে

কোনাকুনি তােরা দাঁড়া দেখি বেঁকে।

আচ্ছা তাহ’লে ধরে’ হাতে হাতে

খাড়া থাক্ তােরা একটু তফাতে।

শশি, তুই সাজ ছত্রধারিণী,

চামরটা নিয়ে দোলাও তারিণী!

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

এইবার তা’রে

ডেকে নিয়ে আয় মাের দরবারে।

(মালতীর প্রস্থান)

কিনি বিনি কাশী স্থির হ’য়ে থাকো,

খবর্দ্দার কেউ নােড়াে চোড়ােনাকো।

মাের দুই পাশে দাঁড়াও সকলে

দুই ভাগ করি।

(কল্যাণী ও মালতীর প্রবেশ)

কল্যাণী

আছ ত কুশলে?

ক্ষীরাে

আমার চেষ্টা কুশলেই থাকি,

পরের চেষ্টা দেবে মােরে ফাঁকি

এই ভাবে চলে জগৎ সুদ্ধ

নিজের সঙ্গে পরের যুদ্ধ।

কল্যাণী

ভাল আছ বিনি?

বিনি

ভালােই আছি মা,

ম্লান কেন দেখি সােনার প্রতিমা?

ক্ষীরাে

বিনি করিসনে মিছে গােলযােগ,

ঘুচল না তাের কথা-কওয়া রােগ?

কল্যাণী

রাণী, যদি কিছু না কর মনে,

কথা আছে কিছু কব গােপনে।

ক্ষীরাে

আর কোথা যাব, গােপন এই ত,

তুমি আমি ছাড়া কেহই নেই ত।

এরা সব দাসী, কাজ নেই কিছু,

রাণীর সঙ্গে ফেরে পিছু পিছু।

হেথা হ’তে যদি করে দিই দূর

হবে না ত সেটা ঠিক দস্তুর।

কি বল মালতী?

মালতী

আজ্ঞে তাইত।

দস্তুর মত চলাই চাই ত।

ক্ষীরাে

সােনার বাটাটা কোথায় কে জানে!

খুঁজে দেখ দেখি।

দাসী

এই যে এখানে।

ওটা নয়, সেই মুক্তো-বসানাে

আরেকটা আছে সেইটেই আনন।

(অন্য বাটা আনয়ন)

খয়েরের দাগ লেগেছে ডালায়,

বাঁচিনে ত আর তােদের জ্বালায়!

তবে নিয়ে আয় চুনীর সে বাটা,

না না নিয়ে আয় পান্না-দেওয়াটা।

কল্যাণী

কথাটা আমার নিই তবে বলে'।

পাঠান বাদশা অন্যায় ছলে

রাজ্য আমার নিয়েছেন কেড়ে,—

ক্ষীরাে

বল কি! তাহ’লে গেছে ফুলবেড়ে,

গিরিধরপুর, গােপালনগর,

কানাইগঞ্জ-

কল্যাণী

সব গেছে মাের।

ক্ষীরাে

হাতে আছে কিছু নগদ টাকা কি?

কল্যাণী

সব নিয়ে গেছে, কিছু নেই বাকি।

ক্ষীরাে

অদৃষ্টে ছিল এত দুখ তোের!

গয়না যা ছিল হীরে মুক্তোর,

সেই বড় বড় নীলার কষ্টি

কানবালা যােড়া বেড়ে গড়নটি,

সেই যে চুনীর পাঁচনলীহার

হীরে-দেওয়া সীঁথি লক্ষ টাকার,

সেগুলা নিয়েছে বুঝি লুটে পুটে?

কল্যাণী

সব নিয়ে গেছে সৈন্যেরা জুটে।

ক্ষীরাে

আহা তাই বলে, ধনজনমান

পদ্মপত্রে জলের সমান।

দামী তৈজস ছিল যা পুরােনাে

চিহ্নও তা’র নেই বুঝি কোনাে?

সেকালের সব জিনিসপত্র

আসাসােটাগুলাে চামরছত্র

চাঁদোয়া কানাৎ, গেছে বুঝি সব?

শাস্ত্রে যে বলে ধন বৈভব

তড়িৎ সমান, মিথ্যে সে নয়!

এখন তাহ’লে কোথা থাকা হয়?

বাড়িটা ত আছে?

কল্যাণী

ফৌজের দল

প্রাসাদ আমার করেছে দখল।

ক্ষীরাে

ওমা ঠিক এ যে শােনায় কাহিনী,

কাল ছিল রাণী আজ ভিখারিণী।

শাস্ত্রে তাই ত বলে সব মায়া,

ধনজন তালবৃক্ষের ছায়া।

কি বল মালতী?

মালতী

তাই ত বটেই

বেশি বাড় হ’লে পতন ঘটেই।

কল্যাণী

কিছু দিন যদি হেথায় তােমার

আশ্রয় পাই, করি উদ্ধার

আবার আমার রাজ্যখানি;

অন্য উপায় নাহিক জানি

ক্ষীরাে

আহা, তুমি র’বে আমার হেথায়

এ ত বেশ কথা, সুখেরি কথা এ।

প্রথমা

আহা কত দয়া।

দ্বিতীয়া

মায়ার শরীর।

তৃতীয়া

আহা, দেবী তুমি, নও পৃথিবীর।

চতুর্থী

হেথা ফেরেনাক অধম পতিত,

আশ্রয় পায় অনাথ অতিথ।

ক্ষীরাে

কিন্তু একটা কথা আছে বােন!

বড় বটে মাের প্রাসাদ ভবন,

তেমনি যে ঢের লােকজন বেশি

কোনােমতে তা’রা আছে ঠেসাঠেসি।

এখানে তােমার জায়গা হবে না

সে একটা মহা রয়েছে ভাবনা।

তবে কিছু দিন যদি ঘর ছেড়ে

বাইরে কোথাও থাকি তাঁবু পেড়ে-

প্রথমা

ওমা সে কি কথা!

দ্বিতীয়া

তাহ’লে রাণীমা

র’বে না তােমার কষ্টের সীমা।

তৃতীয়া

যে-সে তাঁবু নয়, তবু সে তাঁবুই,

ঘর থাকতে কি ভিজবে বাবুই?

পঞ্চমী

দয়া করে’ কত নাববে নাবােতে,

রাণী হ’য়ে কি না থাকবে তাঁবুতে?

ষষ্ঠী

তােমার সে দশা দেখলে চক্ষে

অধীনগণের বাজবে বক্ষে।

কল্যাণী

কাজ নেই রাণী সে অসুবিধায়,

আজকের তরে লইনু বিদায়।

ক্ষীরাে

যাবে নিতান্ত! কি করব ভাই

ছুঁচ ফেলবার জায়গাটি নাই।

জিনিসপত্র লােক-লস্করে

ঠাসা আছে ঘর-কারে ফস্ করে’

বসতে বলি যে তা’র যাে-টি নেই।

ভালো কথা! শােন, বলি গােপনেই,—

গয়নাপত্র কৌশলে রাতে

দু-দশটা যাহা পেরেছ সরাতে

মাের কাছে দিলে র’বে যতনেই।

কল্যাণী

কিছুই আনিনি, শুধু হের এই

হাতে দুটি চুড়ি, পায়েতে নূপুর।

ক্ষীরাে

আজ এস তবে বেজেছে দুপুর;

শরীর ভালাে না, তাইতে সকালে

মাথা ধরে’ যায় অধিক বকালে।

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

জানে না কানাই

স্নানের সময় বাজবে শানাই?

মালতী

বেটারে উচিত করব শাসন।

(কল্যাণীর প্রস্থান)

ক্ষীরাে

তুলে রাখ মাের রত্ন আসন,—

আজকের মত হ’ল দরবার।

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরাে

নাম করবার

সুখ ত দেখলি।

মালতী

হেসে নাহি বাঁচি,—

ব্যাং থেকে কেঁচে হলেন ব্যাঙাচি।

ক্ষীরাে

আমি দেখ বাছা নাম-করাকরি,

যেখানে সেখানে টাকা-ছড়াছড়ি,

জড় করে’ দল ইতর লােকের

জাঁকজমকের লােক-চমকের

যত রকমের ভণ্ডামি আছে

ঘেঁসিনে কখনাে ভুলে তা’র কাছে।

প্রথমা

রাণীর বুদ্ধি যেমন সারালাে,

তেমনি ক্ষুরের মতন ধারালাে।

দ্বিতীয়া

অনেক মূর্খে করে দান ধ্যান,

কার আছে হেন কাণ্ডজ্ঞান।

তৃতীয়া

রাণীর চক্ষে ধূলাে দিয়ে যাবে

হেন লােক হেন ধূলাে কোথা পাবে?

ক্ষীরো

থাম্ থাম্ তােরা রেখে দে বকুনি

লজ্জা করে যে নিজগুণ শুনি।

মালতী!

মালতী

আজ্ঞে!

ক্ষীরো

ওদের গয়না

ছিল যা এমন কারাে ত হয় না।

দুখানি চুড়িতে ঠেকেচে শেষে

দেখে আমি আর বাঁচিনে হেসে।

তবু মাথা যেন নুইতে চায় না,

ভিখ নেবে তবু কতই বায়না।

পথে বের হ’ল পথের ভিখিরী

ভুলতে পারে না তবু রাণীগিরি।

নত হয় লোক বিপদে ঠেকলে

পিত্তি জ্বলে যে দেমাক্ দেখলে।

আবার কিসের শুনি কোলাহল?

মালতী

দুয়ারে এসেছে ভিক্ষুকদল।

আকাল পড়েছে, চালের বস্তা

মনের মতন হয়নি সস্তা,

তাইতে চেঁচিয়ে খাচ্চে কানটা

বেতটি পড়লে হবেন ঠাণ্ডা।

৩০৫

ক্ষীরো

রাণী কল্যাণী আছেন দাতা,

মাের দ্বারে কেন হস্ত পাতা!

বলে দে আমার পাঁড়েজি বেটাকে

ধরে’ নিয়ে যাক সকল কটাকে

দাতা কল্যাণী রাণীর ঘরে,

সেথায় আসুক্ ভিক্ষে করে'।

সেখানে যা পাবে এখানে তাহার

আরাে পাঁচ গুণ মিবে আহার।

প্রথমা

হা হা হা! কি মজা হবেই না জানি।

দ্বিতীয়া

হাসিয়ে হাসিয়ে মারলেন রাণী।

তৃতীয়া

আমাদের রাণী এতও হাসান্।

চতুর্থী

দু-চোখ চক্ষু-জলেতে ভাসান।

( দাসীর প্রবেশ)

দাসী

ঠাকরুণ এক এসেছেন দ্বারে

হুকুম পেলেই তাড়াই তাঁহারে।

ক্ষীরাে

না না ডেকে দে না! আজ কি জন্য

মন আছে মাের বড় প্রসন্ন।

( ঠাকুরাণীর প্রবেশ)

ঠাকুরাণী

বিপদে পড়েছি তাই এনু চলে'।

ক্ষীরাে

সে ত জানা কথা! বিপদে না প’লে

শুধু যে আমার চাঁদ মুখখানি

দেখতে আসনি সেটা বেশ জানি।

ঠাকুরাণী

চুরি হ’য়ে গেছে ঘরেতে আমার-

ক্ষীরাে

মাের ঘরে বুঝি শােধ নেবে তা’র।

ঠাকুরাণী

দয়া করে’ যদি কিছু কর দান

এ যাত্রা তবে বেঁচে যায় প্রাণ।

ক্ষীরাে

তােমার যা কিছু নিয়েছে অন্যে

দয়া চাও তুমি তাহার জন্যে!

আমার যা তুমি নিয়ে যাবে ঘরে

তা’র তরে দয়া আমায় কে করে?

ঠাকুরাণী

ধনসুখ আছে যার ভাণ্ডারে

দানসুখে তা’র সুখ আরাে বাড়ে।

গ্রহণ যে করে তারি হেঁট মুখ,

দুঃখের পরে ভিক্ষার দুখ।

তুমি সক্ষম আমি নিরুপায়

অনায়াসে পার ঠেলিবারে পায়;

ইচ্ছা না হয় নাই কোরাে দান

অপমানিতেরে কেন অপমান?

চলিলাম তবে, বল দয়া করে’

বাসনা পূরিবে গেলে কার ঘরে?

ক্ষীরো

রাণী কল্যাণী নাম শােন নাই?

দাতা বলে’ তার বড় যে বড়াই!

এইবার তুমি যাও তাঁরি ঘরে

ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে এস ভরে’,

পথ না জান ত মাের লােকজন।

পেঁছিয়ে দেবে রাণীর ভবন।

ঠাকুরাণী

তবে তথাস্তু! যাই তাঁরি কাছে।

তাঁর ঘর মাের খুব জানা আছে।

আমি সে লক্ষ্মী, তাের ঘরে এসে

অপমান পেয়ে ফিরিলাম শেষে।

এই কথা ক’টি করিয়াে স্মরণ-

ধনে মানুষের বাড়েনাকো মন।

আছে বহু ধনী আছে বহু মানী

সবাই হয় না রাণী কল্যাণী।

ক্ষীরো

যাবে যদি তবে ছেড়ে যাও মােরে

দস্তুরমত কুর্ণিস করে'।

মালতী! মালতী! কোথায় তারিণী!

কোথা গেল মাের চামরধারিণী!

আমার একশাে পঁচিশটে দাসী!

তােরা কোথা গেলি বিনি কিনি কাশী!

(কল্যাণীর প্রবেশ )

কল্যাণী

পাগল হ’লি কি! হয়েছে কি তোর?

এখনাে যে রাত হয়নিক ভোর!

বল্ দেখি কি যে কাণ্ড কল্লি?

ডাকাডাকি করে’ জাগালি পল্লী?

ক্ষীরাে

ওমা তাই ত গা! কি জানি কেমন

সারারাত ধরে’ দেখেছি স্বপন।

বড় কুস্বপ্ন দিয়েছিল বিধি,

স্বপনটা ভেঙে বাঁচলেম দিদি।

একটু দাঁড়াও, পদধূলি ল’ব;

তুমি রাণী আমি চিরদাসী তব।

২৯শে অগ্রহায়ণ, ১৩০৪

কথা ও কাহিনী · শেষ শিক্ষা

শেষ শিক্ষা

একদিন শিখগুরু গোবিন্দ নির্জ্জনে

একাকী ভাবিতেছিলা আপনার মনে

শ্রান্ত দেহে সন্ধ্যাবেলা—হেনকালে এসে

পাঠান কহিল তাঁরে, যাব চলি দেশে,

ঘোড়া যে কিনেছ তুমি দেহ তা’র দাম।

কহিল গোবিন্দ গুরু—শেখজি সেলাম,

মূল্য কালি পাবে আজি ফিরে যাও ভাই।—

পাঠান কহিল রোষে, মূল্য আজই চাই।

এত বলি জোর করি ধরি তাঁর হাত—

চোর বলি দিল গালি। শুনি অকস্মাৎ

গোবিন্দ বিজুলি বেগে খুলি নিল অসি,

পলকে সে পাঠানের মুণ্ড গেল খসি,

রক্তে ভেসে গেল ভূমি। হেরি নিজ কাজ

মাথা নাড়ি কহে গুরু, বুঝিলাম আজ

আমার সময় গেছে। পাপ তরবার

লঙ্ঘন করিল আজি লক্ষ্য আপনার

নিরর্থক রক্তপাতে। এ বাহুর পরে

বিশ্বাস ঘুচিয়া গেল চিরকাল তরে।

ধুয়ে মুছে যেতে হবে এ পাপ এ লাজ

আজ হতে জীবনের এই শেষ কাজ।

পুত্র ছিল পাঠানের বয়স নবীন

গোবিন্দ লইলা তা’রে ডাকি। রাত্রি দিন

পালিতে লাগিল তা’রে সন্তানের মত

চোখে চোখে। শাস্ত্র আর শস্ত্রবিদ্যা যত

আপনি শিখাল তা’রে। ছেলেটির সাথে

বৃদ্ধ সেই বীরগুরু সন্ধ্যায় প্রভাতে

খেলিত ছেলের মত। ভক্তগণ দেখি

গুরুরে কহিল আসি—এ কি প্রভু এ কি?

আমাদের শঙ্কা লাগে। ব্যাঘ্র-শাবকেরে

যত যত্ন কর তা’র স্বভাব কি ফেরে?

যখন সে বড় হবে তখন নখর

গুরুদেব, মনে রেখাে, হবে যে প্রখর।—

গুরু কহে, তাই চাই, বাঘের বাচ্ছারে

বাঘ না করিনু যদি কি শিখানু তা’রে?

বালক যুবক হ’ল গােবিন্দের হাতে

দেখিতে দেখিতে। ছায়াহেন ফিরে সাথে,

পুত্রহেন করে তাঁর সেবা। ভালবাসে

প্রাণের মতন—সদা জেগে থাকে পাশে

ডান হস্ত যেন। যুদ্ধে হ’য়ে গেছে গত

শিখগুরু গােবিন্দের পুত্র ছিল যত,—

আজি তাঁর প্রৌঢ়কালে পাঠান তনয়

জুড়িয়া বসিল আসি শূন্য সে হৃদয়

গুরুজীর। বাজে-পােড়া বটের কোটরে

বাহির হইতে বীজ পড়ি বায়ুভরে

বৃক্ষ হ’য়ে বেড়ে বেড়ে কবে ওঠে ঠেলি,

বৃদ্ধ বটে ঢেকে ফেলে ডালপালা মেলি।

একদা পাঠান কহে নমি গুরু পায়,

শিক্ষা মাের সারা হ’ল চরণকৃপায়,

এখন আদেশ পেলে নিজ ভুজবলে

উপার্জ্জন করি গিয়া রাজ-সৈন্যদলে।

গােবিন্দ কহিলা তা’র পিঠে হাত রাখি’—

আছে তব পৌরুষের এক শিক্ষা বাকি।

পর দিন বেলা গেলে গােবিন্দ একাকী

বাহিরিলা,—পাঠানেরে কহিলেন ডাকি

অস্ত্র হাতে এস মাের সাথে। ভক্তদল

সঙ্গে যাব সঙ্গে যাব করে কোলাহল—

গুরু কন, যাও সবে ফিরে।— দুই জনে

কথা নাই, ধীরগতি চলিলেন বনে।

নদীতীরে। পাথর-ছড়ানো উপকূলে,

বরষার জলধারা সহস্র আঙুলে

কেটে গেছে রক্তবর্ণ মাটি। সারি সারি

উঠেছে বিশাল শাল,—তলায় তাহারি

ঠেলাঠেলি ভিড় করে শিশু তরুদল

আকাশের অংশ পেতে। নদী হাঁটুজল

ফটিকের মত স্বচ্ছ—চলে একধারে

গেরুয়া বালির কিনারায়। নদীপারে

ইসারা করিলা গুরু—পাঠান দাঁড়ালো।

নিবে-আসা দিবসের দগ্ধ রাঙা আলো।

বাদুড়ের পাখাসম দীর্ঘ ছায়া জুড়ি।

পশ্চিম প্রান্তর পারে চলেছিল উড়ি

নিঃশব্দ আকাশে। গুরু কহিলা পাঠানে—

মামুদ হেথায় এস, খোঁড় এইখানে।—

উঠিল সে বালু খুঁড়ি একখণ্ড শিলা

অঙ্কিত লোহিত-রাগে। গোবিন্দ কহিলা

পাষাণে এই যে রাঙা দাগ, এ তোমার

আপন বাপের রক্ত। এইখানে তা’র

মুণ্ড ফেলেছিনু কেটে, না শুধিয়া ঋণ,

দিয়া সময়। আজ আসিয়াছে দিন,

রে পাঠান, পিতার সুপুত্র হও যদি

খোল তলবার, —পিতৃঘাতকেরে বধি

উষ্ণ রক্ত উপহারে করিবে তর্পণ

তৃষাতুর প্রেতাত্মার।—বাঘের মতন

হুঙ্কারিয়া লম্ফ দিয়া রক্তনেত্র বীর

পড়িল গুরুর পরে; গুরু রহে স্থির

কাঠের মূর্ত্তির মত। ফেলি অস্ত্রখান

তখনি চরণে তাঁর পড়িল পাঠান।

কহিল, হে গুরুদেব, ল’য়ে সয়তানে

কোরো না এমনতর খেলা। ধর্ম্ম জানে

ভুলেছিনু পিতৃরক্তপাত;—একাধারে

পিতা গুরু বন্ধু বলে’ জেনেছি তোমারে

এতদিন। ছেয়ে থাক্ মনে সেই স্নেহ,

ঢাকা পড়ে হিংসা যাক্ মরে’। প্রভু, দেহ

পদধূলি।—এত বলি বনের বাহিরে,

উর্দ্ধশ্বাসে ছুটে গেল, না চাহিল ফিরে

না থামিল একবার। দুটি বিন্দু জল

ভিজাইল গোবিন্দের নয়ন-যুগল।

পাঠান সেদিন হ’তে থাকে দূরে দূরে।

নিরালা শয়নঘরে জাগাতে গুরুরে।

দেখা নাহি দেয় ভোরবেলা। গৃহদ্বারে

অস্ত্র হাতে নাহি থাকে রাতে। নদীপারে

গুরু সাথে মৃগয়ায় নাহি যায় একা।

নির্জ্জনে ডাকিলে গুরু দেয় না সে দেখা।

একদিন আরম্ভিল শতরঞ্চ খেলা

গোবিন্দ পাঠান সাথে। শেষ হ’ল বেলা

না জানিতে কেহ। হার মানি বারে বারে

মাতিছে মামুদ। সন্ধ্যা হয় রাত্রি বাড়ে।

সঙ্গীরা যে-যার ঘরে চলে গেল ফিরে।

ঝাঁঝাঁ করে রাতি। একমনে হেঁটশিরে

পাঠান ভাবিছে খেলা। কখন্ হঠাৎ

চতুরঙ্গ বল ছুঁড়ি করিল আঘাত

মামুদের শিরে গুরু,—কহে অট্টহাসি’—

পিতৃঘাতকের সাথে খেলা করে আসি

এমন যে কাপুরুষ—জয় হবে তা’র?—

তখনি বিদ্যুৎ-হেন ছুরি খরধার

খাপ হ’তে খুলি ল’য়ে গোবিন্দের বুকে

পাঠান বিঁধিয়া দিল। গুরু হাসি মুখে

কহিলেন—এতদিনে হ’ল তোর বোধ

কি করিয়া অন্যায়ের লয় প্রতিশোধ।

শেষ শিক্ষা দিয়ে গেনু—আজি শেষবার

আশীর্ব্বাদ করি তোরে হে পুত্র আমার।

৬ই কার্ত্তিক, ১৩০৬।

কথা ও কাহিনী · শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা

কথা ও কাহিনী

শ্রেষ্ঠ ভিক্ষা

(অবদানশতক)

“প্রভু বুদ্ধ লাগি আমি ভিক্ষা মাগি,

ওগো পুরবাসী কে রয়েছ জাগি”,—

অনাথ-পিণ্ডদ কহিলা অম্বুদ-

নিনাদে।

সদ্য মেলিতেছে তরুণ তপন

আলস্যে অরুণ সহাস্য লোচন

শ্রাবস্তিপুরীর গগন-লগন-

প্রাসাদে

বৈতালিকদল সুপ্তিতে শয়ান,

এখনো ধরেনি মাঙ্গলিক গান,

দ্বিধাভরে পিক মৃদু কুহুতান

কুহরে।

ভিক্ষু কহে ডাকি—“হে নিদ্রিত পুর,

দেহ ভিক্ষা মোরে, কর নিদ্রা দূর”—

সুপ্ত পৌরজন শুনি সেই সুর

শিহরে।

সাধু কহে,—“শুন, মেঘ বরিষার

নিজেরে নাশিয়া দেয় বৃষ্টিধার,

সর্ব্ব ধর্ম্মমাঝে ত্যাগ ধর্ম্ম সার

ভুবনে।”

কৈলাস শিখর হ’তে দূরাগত

ভৈরবের মহা-সঙ্গীতের মত

সে বাণী মন্দ্রিল স্থখ তন্দ্রারত

ভবনে।

রাজা জাগি ভাবে বৃথা রাজ্য ধন,

গৃহী ভাবে মিছা তুচ্ছ আয়োজন,

অশ্রু অকারণে করে বিসর্জন

বালিকা।

যে ললিত সুখে হৃদয় অধীর

মনে হ’ল, তাহা গত যামিনীর

স্খলিত দলিত শুষ্ক কামিনীর

মালিকা।

বাতায়ন খুলে যায় ঘরে ঘরে,

ঘুম-ভাঙা আঁখি ফুটে থরে থরে

অন্ধকার পথ কৌতুহল ভরে

নেহারি’।

“জাগ ভিক্ষা দাও!” সবে ডাকি ডাকি,

সুপ্ত সৌধে তুলি নিদ্রাহীন আঁখি,

শূন্য রাজবাটে চলেছে একাকী

ভিখারী।

ফেলি দিল পথে বণিক-ধনিকা

মুঠি মুঠি তুলি রতন-কণিকা,

কেহ কণ্ঠহার, মাথার মণিকা

কেহ গো!

ধনী স্বর্ণ আনে থালি পূরে পূরে,

সাধু নাহি চাহে, পড়ে’ থাকে দূরে,

ভিক্ষু কহে—“ভিক্ষা আমার প্রভুরে

দেহ গো!”

বসনে ভূষণে ঢাকি গেল ধূলি,

কনকে রতনে খেলিল বিজুলী,

সন্ন্যাসী ফুকারে ল’য়ে শূন্য ঝুলি

সঘনে;–

“ওগো পৌরজন, কর অবধান,

ভিক্ষুশ্রেষ্ঠ তিনি, বুদ্ধ ভগবান,

দেহ তাঁরে নিজ সর্ববশ্রেষ্ঠ দান

যতনে ৷”

ফিরে যায় রাজা, ফিরে যায় শেঠ,

মিলে না প্রভুর যোগ্য কোনো ভেট,

বিশাল নগরী লাজে রহে হেঁট-

আননে।

রৌদ্র উঠে ফুটে, জেগে উঠে দেশ,

মহানগরীর পথ হ’ল শেষ,

পুরপ্রান্তে সাধু করিলা প্রবেশ

কাননে;

দীন নারী এক ভূতল-শয়ন

না ছিল তাহার অশন ভূষণ,

সে আসি নমিল সাধুর চরণ-

কমলে।

অরণ্য-আড়ালে রহি কোনোমতে

একমাত্র বাস নিল গাত্র হ’তে,

বাহুটি বাড়ায়ে ফেলি দিল পথে

ভূতলে

ভিক্ষু উৰ্দ্ধভুজে করে জয়নাদ,

কহে “ধন্য মাতঃ, করি আশীর্ব্বাদ,

মহাভিক্ষুকের পূরাইলে সাধ

পলকে ৷”

চলিলা সন্ন্যাসী ত্যজিয়া নগর

ছিন্ন চীরখানি ল’য়ে শিরোপর,

সঁপিতে বুদ্ধের চরণ-নখর-

আলোকে।

{{smaller|৫ই কার্ত্তিক, ১৩১৪

অনাথ-পিণ্ডদ বুদ্ধের একজন প্রধান শিষ্য ছিলেন।

নাট্য কবিতা · সতী

সতী

রণক্ষেত্র

অমাবাই ও বিনায়ক রাও

অমাবাই

পিতঃ!

বিনায়ক রাও

পিতা? আমি তাের পিতা? পাপীয়সি

স্বাতন্ত্র্যচারিণী! যবনের গৃহে পশি

ম্লেচ্ছগলে দিলি মালা কুলকলঙ্কিনী!

আমি তাের পিতা?

অমাবাই

অন্যায় সমরে জিনি

স্বহস্তে বধিলে তুমি পতিরে আমার,

হায় পিতা, তবু তুমি পিতা! বিধাতার

অশ্রুপাতে পাছে লাগে মহা অভিশাপ

তব শিরে, তাই আমি দুঃসহ সন্তাপ

রুদ্ধ করি রাখিয়াছি এ বক্ষপঞ্জরে।

তুমি পিতা, আমি কন্যা, বহুদিন পরে

হয়েছে সাক্ষাৎ দোঁহে সমর-অঙ্গনে

দারুণ নিশীথে। পিতঃ, আমি প্রণমি’ চরণে

পদধূলি তুলি’ শিরে লইব বিদায়।

আজ যদি নাহি পার ক্ষমিতে কন্যায়

আমি তবে ভিক্ষা মাগি বিধাতার ক্ষমা

তােমা লাগি পিতৃদেব!

বিনায়ক রাও

কোথা যাবি অমা?

ধিক অশ্রুজল! ওরে দুর্ভাগিনী নারী

যে বৃক্ষে বাঁধিলি নীড় ধর্ম্ম না বিচারি’

সে ত বজ্রাহত দগ্ধ, যাবি কার কাছে

ইহকাল-পরকাল-হারা?

অমাবাই

পুত্র আছে-

বিনায়ক রাও

থাক পুত্র! ফিরে আর চাসনে পশ্চাতে

পাতকের ভগ্নশেষ পানে। আজ রাতে

শোণিত-তর্পণে তাের প্রায়শ্চিত্ত শেষ,—

যবনের গৃহে তাের নাহিক প্রবেশ

আর কভু। বল্ তবে কোথা যাবি আজ?

অমাবাই

হে নির্দ্দয়। আছে মৃত্যু, আছে যমরাজ,

পিতা হ’তে স্নেহময়, মুক্তদ্বারে যার

আশ্রয় মাগিয়া কেহ ফিরে নাই আর।

বিনায়ক রাও

মৃত্যু? বৎসে! হা দুর্বৃত্তে! পরম পাবক

নির্ম্মল উদার মৃত্যু—সকল পাতক

করে গ্রাস-সিন্ধু যথা সকল নদীর

সব পঙ্করাশি। সেই মৃত্যু সুগভীর

তাের মুক্তি গতি। কিন্তু মৃত্যু আজ না সে,

নহে হেথা। চল্ তবে দূর তীর্থবাসে

সলজ্জ স্বজন আর সক্রোধ সমাজ

পরি হরি; বিসর্জ্জি কলঙ্ক ভয় লাজ

জন্মভূমি ধূলিতলে। সেথা গঙ্গাতীরে

নবীন নির্ম্মল বায়ু;—স্বচ্ছ পুণ্যনীরে

তিন সন্ধ্যা স্নান করি’, নির্জ্জন কুটীরে

শিব শিব শিব নাম জপি শান্ত মনে,

সুদূর মন্দির হ’তে সায়াহ্ন পবনে

শুনিয়া আরতিধ্বনি,একদিন কবে

আয়ুশেষে মৃত্যু তােরে লইবে নীরবে-

পতিত কুসুমে ল’য়ে পঙ্ক ধুয়ে তা’র

গঙ্গা যথা দেয় তা’রে পূজা-উপহার

সাগরের পদে।

অমাবাই

পুত্র মাের!

বিনায়ক রাও

তা’র কথা

দূর কর। অতীত-নির্ম্মুক্ত পবিত্রতা

ধৌত করে’ দিক্ তােরে। সদ্য শিশুসম

আরবার আয় বৎসে পিতৃকোলে মম

বিস্মৃতি মাতার গর্ভ হ’তে।নব দেশে,

নব তরঙ্গিণীতীরে, শুভ্র হাসি হেসে

নবীন কুটীরে মাের জ্বালাবি আলােক

কন্যার কল্যাণ করে।

অবাবাই

জ্বলে পতিশােক,

বিশ্ব হেরি ছায়াসম; তােমাদের কথা

দূর হতে আনে কানে ক্ষীণ অস্ফুটতা,

পশে না হৃদয়মাঝে। ছেড়ে দাও মােরে,

ছেড়ে দাও! পতিরক্তসিক্ত স্নেহভডারে

বেঁধাে না আমায়।

বিনায়ক রাও

কন্যা নহেক পিতার।

শাখাচ্যুত পুষ্প শাখে ফিরেনাক আর।

কিন্তু রে শুধাই তােরে কারে ক’স পতি

লজ্জাহীনা! কাড়ি নিল যে ম্লেচ্ছ দুর্ম্মতি

জীবাজির প্রসারিত বরহস্ত হ’তে

বিবাহের রাত্রে তােরে-বঞ্চিয়া কপােতে

শ্যেন যথা ল’য়ে যায় কপােত-বধূরে

আপনার ম্লেচ্ছ নীড়ে,—সে দুষ্ট দস্যুরে

পতি ক’স তুই!—সে রাত্রি কি মনে পড়ে?

বিবাহ-সভায় সবে উৎসুক অন্তরে

বসে’ আছি,—শুভলগ্ন হ’ল গতপ্রায়,—

জীবাজি আসে না কেন সবাই শুধায়,

চায় পথপানে। দেখা দিল হেনকালে

মশালের রক্তরশ্মি নিশীথের ভালে,

শুনা গেল বাদ্যরব। হর্ষে উচ্ছ্বসিল

অন্তঃপুরে হুলুধ্বনি। দুয়ারে পশিল

শতেক শিবিকা; কোথা জীবাজি কোথায়

শুধাতে না শুধাতেই, ঝটিকার প্রায়

অকস্মাৎ কোলাহলে হতবুদ্ধি করি

মুহূর্ত্তের মাঝে তােরে বলে অপহরি

কে কোথা মিলাল। ক্ষণপরে নতশিরে

জীবাজি বন্ধনমুক্ত এল ধীরে ধীরে-

শুনিনু কেমনে তা’রে বন্দী করি পথে,

ল’য়ে তা’র দীপমালা, চড়ি তা’র রথে,

কাড়ি ল’য়ে পরি তা’র বর-পরিচ্ছদ

বিজাপুর যবনের রাজসভাসদ

দস্যুবৃত্তি করি গেল। সে দারুণরাতে

হােমাগ্নি করিয়া স্পর্শ জীবাজির সাথে

প্রতিজ্ঞা করিনু আমি—দস্যরক্তপাতে

লব এর প্রতিশােধ। বহুদিন পরে

হয়েছি সে পণমুক্ত। নিশীথ সমরে

জীবাজি ত্যজিয়া প্রাণ বীরের সদ্গতি

লভিয়াছে। রে বিধবা, সেই তাের পতি,—

দস্য সে ত ধর্ম্মনাশী!

অমাবাই

ধিক্ পিতা, ধিক!

বধেছ পতিরে মাের-আরাে মর্ম্মান্তিক

এই মিথ্যা বাক্যশেল। তব ধর্ম্ম কাছে

পতিত হয়েছি, তবু মম ধর্ম্ম আছে

সমুজ্জ্বল। পত্নী আমি, নহি সেবাদাসী।

বরমাল্যে বরেছিনু তাঁরে ভালবাসি

শ্রদ্ধাভরে; ধরেছিনু পতির সন্তান

গর্ভে মাের,—বলে করি নাই আত্মদান,

মনে আছে দুই পত্র একদিন রাতে

পেয়েছিনু অন্তঃপুরে গুপ্তদূতী হাতে।

তুমি লিখেছিলে শুধু,—“হান তা’রে ছুরি,”

মাতা লিখেছিল, “পত্রে বিষ দিনু পূরি

কর তাহা পান।” যদি বলে পরাজিত

অসহায় সতীধর্ম্ম কেহ কেড়ে নিত

তা হ’লে কি এতদিন হ’ত না পালন

তোমাদের সে আদেশ? হৃদয় অর্পণ

করেছিনু বীরপদে। যবন ব্রাহ্মণ

সে ভেদ কাহার ভেদ? ধর্ম্মের সে নয়।

অন্তরের অন্তর্যামী যেথা জেগে রয়

সেথায় সমান দোঁহে। মাঝে মাঝে তবু

সংস্কার উঠিত জাগি;—কোনাে দিন কভু

নিগূঢ় ঘৃণার বেগ শিরায় অধীর

হানিত বিদ্যুৎকম্প,—অবাধ্য শরীর

সঙ্কোচে কুঞ্চিত হ’ত;—কিন্তু তারো পরে

সতীত্ব হয়েছে জয়ী। পূর্ণ ভক্তিভরে

করেছি পতির পূজা; হয়েছি যবনী

পবিত্র অন্তরে; নহি পতিতা রমণী,—

পরিতাপে অপমানে অবনতশিরে

মাের পতিধর্ম্ম হ’তে নাহি যাব ফিরে

ধর্ম্মান্তরে অপরাধীসম।—এ কি, এ কি!

নিশীথের উল্কাসম এ কাহারে দেখি

ছুটে আসে মুক্তকেশে!

( রমাবাইয়ের প্রবেশ)

জননী আমার!

কখনাে যে দেখা হবে এ জনমে আর

হেন ভাবি নাই মনে। মাগাে, মা জননি

দেহ তব পদধূলি।

রমাবাই

ছুঁসনে যবনী

পাতকিনী!

অমাবাই

কোনাে পাপ নাই মাের দেহে,—

নির্ম্মল তােমারি মত।

রমাবাই

যবনের গেহে

কার কাছে সমর্পিলি ধর্ম্ম আপনার?

অমাবাই

পতি কাছে।

রমাবাই

পতি? ম্লেচ্ছ, পতি সে তােমার?

জানিস্ কাহারে বলে পতি? নষ্টমতি,

ভ্রষ্টাচার! রমণীর সে যে এক গতি,

একমাত্র ইষ্টদেব। স্লেচ্ছ মুসলমান,

ব্রাহ্মণ কন্যার পতি? দেবতা সমান?

অমাবাই

উচ্চ বিপ্রকুলে জন্মি’ তবুও যবনে

ঘৃণা করি নাই আমি, কায়বাক্যেমনে

পূজিয়াছি পতি বলি’; মােরে করে ঘৃণা

এমন কে সতী আছে? নহি আমি হীনা

জননী তােমার চেয়ে,—হবে মাের গতি

সতীস্বর্গলােকে।

রমাবাই

সতী তুমি?

অমাবাই

আমি সতী।

রমাবাই

জানিস্ মরিতে অসঙ্কোচে?

অমাবাই

জানি আমি।

রমাবাই

তবে জ্বাল চিতানল! ওই তাের স্বামী

পড়িয়া সমরভূমে।

অমাবাই

জীবাজি?

রমাবাই

জীবাজি।

বাক্‌দত্ত পতি তাের। তারি ভস্মে আজি

ভস্ম মিলাইতে হবে। বিবাহ রাত্রির

বিফল হােমাগ্নিশিখা শ্মশানভূমির

ক্ষুধিত চিতাগ্নিরূপে উঠেছে জাগিয়া;

আজি রাত্রে সে রাত্রির অসমাপ্ত ক্রিয়া

হবে সমাপন।

বিনায়ক

যাও বৎসে, যাও ফিরে

তব পুত্র কাছে, তব শােকতপ্ত নীড়ে।

দারুণ কর্ত্তব্য মাের নিঃশেষ করিয়া

করেছি পালন,—যাও তুমি।—অয়ি প্রিয়া

বৃথা করিতেছ ক্ষোভ। যে নব শাখারে

আমাদের বৃক্ষ হ’তে কঠিন কুঠারে

ছিন্ন করি নিয়ে গেল বনান্তর ছায়ে,

সেথা যদি বিশীর্ণা সে মরিত শুকায়ে

অগ্নিতে দিতাম তা’রে; সে যে ফলেফুলে

নব প্রাণে বিকশিত, নব নব মূলে

নূতন মৃত্তিকা ছেয়ে। সেথা তা’র প্রীতি,

সেথাকার ধর্ম্ম তা’র, সেথাকার রীতি।

অন্তরের যােগসূত্র ছিঁড়েছে যখন

তােমার নিয়মপাশ নির্জ্জীব বন্ধন

ধর্ম্মে বাঁধিছে না তা’রে, বাঁধিতেছে বলে।

ছেড়ে দাও, ছেড়ে দাও!–যাও বৎসে চলে’,

যাও তব গৃহকর্ম্মে ফিরে,—যাও তব

স্নেহপ্রীতিজড়িত সংসারে,—অভিনব

ধর্ম্মক্ষেত্র মাঝে। এস প্রিয়ে, মােরা দোঁহে

চলে’ যাই তীর্থধামে কাটি মায়ামােহে

সংসারের দুঃখ সুখ চক্র আবর্ত্তন

ত্যাগ করি’,—

রমাবাই

তা’র আগে করিব ছেদন

আমার সংসার হ’তে পাপের অঙ্কুর

যতগুলি জন্মিয়াছে। করি যাব দূর

আমার গর্ভের লজ্জা। কন্যার কুযশে

মাতার সতীত্বে যেন কলঙ্ক পরশে।

অনলে অঙ্গারসম সে কলঙ্ককালী

তুলিব উজ্জ্বল করি চিতানল জ্বালি'।

সতীখ্যাতি রটাইব দুহিতার নামে

সতী মঠ উঠাইব এ শ্মশানধামে

কন্যার ভস্মের পরে।

অমাবাই

ছাড় লােকলাজ

লােকখ্যাতি,—হে জননী এ নহে সমাজ,

এ মহাশ্মশানভূমি। হেথা পুণ্যপাপ

লােকের মুখের বাক্যে করিয়াে না মাপ,—

সত্যেরে প্রত্যক্ষ কর মৃত্যুর আলােকে।

সতী আমি। ঘৃণা যদি করে মােরে লােকে

তবু সতী আমি। পরপুরুষের সনে

মাতা হ’য়ে বাঁধ যদি মৃত্যুর মিলনে

নির্দ্দোষ কন্যারে—লােকে তােরে ধন্য কবে—

কিন্তু মাতঃ নিত্যকাল অপরাধী র’বে

শশ্মশানের অধীশ্বর পদে।

রমাবাই

জ্বাল চিতা,

সৈন্যগণ! ঘের’ আসি বন্দিনীরে।

অমাবাই

পিতা!

বিনায়ক

ভয় নাই, ভয় নাই! হায় বৎসে হায়

মাতৃহস্ত হ’তে আজি রক্ষিতে তােমায়

পিতারে ডাকিতে হ’ল। -যেই হস্তে তােরে

বক্ষে বেঁধে রেখেছিনু, কে জানিত ওরে

ধর্ম্মেরে করিতে রক্ষা, দোষীরে দণ্ডিতে

সেই হস্তে একদিন হইবে খণ্ডিতে

তােমারি সৌভাগ্যসূত্র হে বৎসে আমার!

অমাবাই

পিতা!

বিনায়ক

আয় বৎসে! বৃথা আচার বিচার।

পুত্রে ল’য়ে মাের সাথে আয় মাের মেয়ে

আমার আপন ধন। সমাজের চেয়ে

হৃদয়ের নিত্যধর্ম্ম সত্য চিরদিন।

পিতৃস্নেহ নির্ব্বিচার বিকারবিহীন

দেবতার বৃষ্টিসম,—আমার কন্যারে

সেই শুভ স্নেহ হ’তে কে বঞ্চিতে পারে

কোন্ শাস্ত্র, কোন্ লোক, কোন্ সমাজের

মিথ্যা বিধি, তুচ্ছ ভয়?

রমাবাই

কোথা যাস্! ফের।

রে পাপিষ্ঠে, ওই দেখ তাের লাগি প্রাণ

যে দিয়েছে রণভূমে,—তা’র প্রাণদান

নিস্ফল হবে না,—তােরে লইবে সে সাথে

বরবেশে, ধরি তাের মৃত্যুপূত হাতে

শূরস্বর্গ মাঝে। শুন, যত আছ বীর

তােমরা সকলে ভক্ত ভৃত্য জীবাজির,—

এই তাঁর বাকদত্তা বধূ,—চিতানলে

মিলন ঘটায়ে দাও মিলিয়া সকলে

প্রভুকৃত্য শেষ কর।

সৈন্যগণ

ধন্য পুণ্যবতী!

অমাবাই

পিতা!

বিনায়ক রাও

ছাড় তােরা!

সৈন্যগণ

যিনি এ নারীর পতি

তাঁর অভিলাষ মােরা করিব পূরণ।

বিনায়ক

পতি এঁর স্বধর্ম্মী যবন।

সেনাপতি

সৈন্যগণ,

বাঁধ বৃদ্ধ বিনায়কে।

অমাবাই

মাতঃ! পাপীয়সি!

পিশাচিনি!

রমাবাই

মূঢ় তােরা কি করিস বসি’!

বাজা বাদ্য, কর জয়ধ্বনি।

সৈন্যগণ

জয় জয়।

অমাবাই

নারকিনী!

সৈন্যগণ

জয় জয়।

রমাবাই

রটা বিশ্বময়

সতী অমা।

অমাবাই

জাগ, জাগ, জাগ, ধর্ম্মরাজ!

শ্মশানের অধীশ্বর, জাগ তুমি আজ।

হের তব মহারাজ্যে করিছে উৎপাত

ক্ষুদ্র শত্রু,—জাগ’, তা’রে কর বজ্রাঘাত

দেবদেব! তব নিত্যধর্ম্মে কর জয়ী

ক্ষুদ্র ধর্ম্ম হ’তে।

রমাবাই

বল্ জয় পুণ্যময়ী,

বল্ জয় সতী।

সৈন্যগণ

জয় জয় পুণ্যবতী।

অমাবাই

পিতা, পিতা, পিতা মাের!

সৈন্যগণ

ধন্য ধন্য সতী!

২০শে কার্তিক, ১৩০৪।

মিস্‌ম্যানিং সম্পাদিত ন্যাশনাল ইণ্ডিয়ান অ্যাসােসিয়েশনের পত্রিকায় মারাঠি গাথা সম্বন্ধে অ্যাকওয়র্থ্‌ সাহেব-রচিত প্রবন্ধ বিশেষ হইতে বর্ণিত ঘটনা সংগৃহীত।

কথা ও কাহিনী · সামান্য ক্ষতি

সামান্য ক্ষতি

( দিব্যাবদানমালা)

বহে মাঘমাসে শীতের বাতাস

স্বচ্ছসলিলা বরুণা।

পুরী হ’তে দূরে গ্রামে নিৰ্জ্জনে

শিলাময় ঘাট চম্পকবনে;

স্নানে চলেছেন শত সখীসনে

কাশীর মহিষী করুণা।

সে পথ সে ঘাট আজি এ প্রভাতে

জনহীন রাজশাসনে।

নিকটে যে ক’টি আছিল কুটীর

ছেড়ে গেছে লােক, তাই নদীতীর

স্তব্ধ গভীর, কেবল পাখীর

কূজন উঠিছে কাননে।

আজি উতরােল উত্তর বায়ে

উতলা হয়েছে তটিনী।

সােনার আলোেক পড়িয়াছে জলে,

পুলকে উছলি ঢেউ ছলছলে,

লক্ষ মাণিক ঝলকি আঁচলে

নেচে চলে যেন নটিনী।

কলকল্লোলে লাজ দিল আজ

নারীকণ্ঠের কাকলী।

মৃণাল ভুজের ললিত বিলাসে

চঞ্চলা নদী মাতে উল্লাসে,

আলাপে প্রলাপে হাসি-উচ্ছ্বাসে

আকাশ উঠিল আকুলি।

স্নান সমাপন করিয়া যখন

কূলে উঠে নারী সকলে-

মহিষী কহিলা “উহু শীতে মরি,

সকল শরীর উঠিছে শিহরি,

জেলেদে আগুন ওলাে সহচরী,

শীত নিবারিব অনলে।”

সখীগণ সবে কুড়াইতে কুটা

চলিল কুসুম-কাননে।

কৌতুকরসে পাগল পরাণী

শাখা ধরি সবে করে টানাটানি;—

সহসা সবারে ডাক দিয়া রাণী

কহে সহাস্য আননে;—

“ওলাে তােরা আয়, ওই দেখা যায়

কুটীর কাহার অদূরে।

ওই ঘরে তােরা লাগাবি অনল,

তপ্ত করিব কর পদতল,”

এত বলি রাণী রঙ্গে বিভল

হাসিয়া উঠিল মধুরে।

কহিল মালতী সকরুণ অতি

“একি পরিহাস রাণী মা!

আগুন জ্বালায়ে কেন দিবে নাশি?

এ কুটীর কোন্ সাধু সন্ন্যাসী

কোন্ দীনজন কোন্ পরবাসী

বাঁধিয়াছে নাহি জানি মা।”

রাণী কহে রোষে—“দূর করি দাও

এই দীনদয়াময়ীরে।”-

অতি দুর্দ্দাম কৌতুকরত

যৌবনমদে নিষ্ঠুর যত

যুবতীরা মিলি পাগলের মত

আগুন লাগাল কুটীরে।

ঘন ঘাের ধূম ঘুরিয়া ঘুরিয়া

ফুলিয়া ফুলিয়া উড়িল।

দেখিতে দেখিতে সে ধূম বিদারি

ঝলকে ঝলকে উল্কা উগারি

শত শত লােল জিহবা প্রসারি

বহ্নি আকাশ জুড়িল।

পাতাল ফুঁড়িয়া উঠিল যেন রে

জ্বালাময়ী যত নাগিনী।

ফণা নাচাইয়া অম্বরপানে

মাতিয়া উঠিল গর্জ্জনগানে,

প্রলয়মত্ত রমণীর কানে

বাজিল দীপক রাগিণী।

প্রভাত পাখীর আনন্দগান

ভয়ের বিলাপে টুটিল;—

৩৬৯

দলে দলে কাক করে কোলাহল,

উত্তর বায়ু হইল প্রবল,—

কুটীর হইতে কুটীরে অনল

উড়িয়া উড়িয়া ছুটিল।

ছােট গ্রামখানি লেহিয়া লইল

প্রলয়-লােলুপ রসনা।

জনহীন পথে মাঘের প্রভাতে

প্রমােদক্লান্ত শত সখী সাথে

ফিরে গেল রাণী কুবলয় হাতে

দীপ্ত অরুণ-বসনা।

তখন সভায় বিচার আসনে

বসিয়াছিলেন ভূপতি।

গৃহহীন প্রজা দলে দলে আসে,

দ্বিধাকম্পিত গদগদ ভাষে

নিবেদিল দুখ সঙ্কোচে ত্রাসে

চরণে করিয়া বিনতি।

সভাসন ছাড়ি উঠি গেল রাজা

রক্তিমমুখ সরমে।

অকালে পশিলা রাণীর আগার,—

কহিলা, “মহিষ, একি ব্যবহার?

গৃহ জ্বালাইলে অভাগা প্রজার

বল কোন্ রাজধরমে?”

রুষিয়া কহিলা রাজার মহিলা,

“গৃহ কহ তা’রে কি বােধে?

গেছে গুটিকত জীর্ণ কুটীর

কতটুকু ক্ষতি হয়েছে প্রাণীর?

কত ধন যায় রাজমহিষীর

এক প্রহরের প্রমােদে।”

কহিলেন রাজা উদ্যতরােষ

রুধিয়া দীপ্ত হৃদয়ে,—

“যতদিন তুমি আছ রাজরাণী

দীনের কুটীরে দীনের কি হানি

বুঝিতে নারিবে জানি তাহা জানি-

বুঝব তােমারে নিদয়ে!”

রাজার আদেশে কিঙ্করী আসি

ভূষণ ফেলিল খুলিয়া।

অরুণবরণ অম্বরখানি

নির্ম্মম করে খুলে দিল টানি,

ভিখারী নারীর চীরবাস আনি

দিল রাণীদেহে তুলিয়া।

পথে ল’য়ে তা’রে কহিলেন রাজা,

“মাগিবে দুয়ারে দুয়ারে;

এক প্রহরের লীলায় তােমার

যে ক’টি কুটীর হ’ল ছারখার

যতদিনে পার সে ক’টি আবার

গড়ি দিতে হবে তােমারে।

“বৎসর কাল দিলেম সময়

তা’র পরে ফিরে আসিয়া,

সভায় দাঁড়ায়ে করিয়া প্রণতি

সবার সমুখে জানাবে যুবতী

হয়েছে জগতে কতটুকু ক্ষতি

জীর্ণ কুটীর নাশিয়া।”

২৫শে আশ্বিন, ১৩০৬।

কথা ও কাহিনী · স্পর্শমণি

স্পর্শমণি

( ভক্তমাল)

নদীতীরে বৃন্দাবনে সনাতন একমনে

জপিছেন নাম।

হেনকালে দীনবেশে ব্রাহ্মণ চরণে এসে

করিল প্রণাম।

শুধালেন সনাতন, কোথা হ’তে আগমন,

কি নাম ঠাকুর?

বিপ্র কহে, কিবা কব পেয়েছি দর্শন তব

ভ্রমি’ বহুদূর।

জীবন আমার নাম মানকরে মাের ধাম,

জিলা বর্দ্ধমানে,

এত বড় ভাগ্যহত দীনহীন মাের মত

নাই কোনােখানে।

জমিজমা আছে কিছু, করে’ আছি মাথা নীচু,

অল্প স্বল্প পাই।

ক্রিয়াকর্ম্ম যজ্ঞ যাগে বহু খ্যাতি ছিল আগে

আজ কিছু নাই।

আপন-উন্নতি লাগি শিব কাছে বর মাগি

করি আরাধনা।—

এক দিন নিশিভােরে স্বপ্নে দেব কহে মােরে-

পূরিবে প্রার্থনা।

যাও যমুনার তীর, সনাতন গােস্বামীর

ধর দুটি পায়,

তাঁরে পিতা বলি মেনো, তাঁরি হাতে আছে জেনাে

ধনের উপায়।—

শুনি কথা সনাতন ভাবিয়া আকুল হন।

কি আছে আমার।

যাহা ছিল সে সকলি ফেলিয়া এসেছি চলি

ভিক্ষামাত্র সার।

সহসা বিস্মৃতি ছুটে,— সাধু ফুকারিয়া উঠে—

ঠিক বটে ঠিক!

একদিন নদীতটে কুড়ায়ে পেয়েছি বটে

পরশ মাণিক।

যদি কভু লাগে দানে সেই ভেবে ওইখানে

পুঁতেছি বালুতে;

নিয়ে যাও হে ঠাকুর দুঃখ তব হােক দূর

ছুঁতে নাহি ছুঁতে।

বিপ্র তাড়াতাড়ি আসি খুঁড়িয়া বালুকারাশি

পাইল সে মণি,

লােহার মাদুলি দুটি সােনা হ’য়ে উঠে ফুটি

ছুঁইল যেমনি।

ব্রাহ্মণ বালুর পরে বিস্ময়ে বসিয়া পড়ে-

ভাবে নিজে নিজে।

যমুনা কল্লোল গানে চিন্তিতের কানে কানে

কহে কত কি যে।

নদীপারে রক্তচ্ছবি দিনান্তের ক্লান্ত রবি

গেল অস্তাচলে,—

তখন ব্রাহ্মণ উঠে সাধুর চরণে লুটে

কহে অশ্রুজলে,—

যে ধনে হইয়া ধনী মণিরে মান না মণি

তাহারি খানিক

মাগি আমি নতশিরে!- এত বলি নদীনীরে

ফেলিল মাণিক।—

২৯শে আশ্বিন, ১৩০৬

কথা ও কাহিনী · স্বামি-লাভ

স্বামিলাভ

( ভক্তমাল)

একদা তুলসীদাস জাহ্নবীর তীরে

নির্জ্জন শ্মশানে

সন্ধ্যায় আপন মনে একা একা ফিরে

মাতি নিজ গানে।

হেরিলেন মৃত পতি-চরণের তলে

বসিয়াছে সতী;

তারি সনে এক সাথে এক চিতানলে

মরিবারে মতি।

সঙ্গীগণ মাঝে মাঝে আনন্দ চীৎকারে

করে জয়নাদ,

পুরােহিত ব্রাহ্মণেরা ঘেরি চারিধারে

গাহে সাধুবাদ।

সহসা সাধুরে নারী হেরিয়া সম্মুখে

করিয়া প্রণতি

কহিল বিনয়ে—প্রভাে আপন মুখে

দেহ অনুমতি।

তুলসী কহিল, মাতঃ যাবে কোন্‌খানে,

এত আয়ােজন?

সতী কহে—পতিসহ যাব স্বর্গপানে

করিয়াছি মন।

ধরা ছাড়ি কেন নারী স্বর্গ চাহ তুমি?

সাধু হাসি কহে-

হে জননী, স্বর্গ যাঁর, এ ধরণীভূমি

তাঁহারি কি নহে?

বুঝিতে না পারি কথা নারী রহে চাহি

বিস্ময়ে অবাক-

কহে করজোড় করি—স্বামী যদি পাই

স্বর্গ দূরে থাক্।

তুলসী কহিল হাসি—ফিরে চল ঘরে

কহিতেছি আমি

ফিরে পাবে আজ হ’তে মাসেকের পরে

আপনার স্বামী।

রমণী আশার বশে গৃহে ফিরে যায়

শ্মশান তেয়াগি’;

তুলসী জাহ্নবীতীরে নিস্তব্ধ নিশায়

রহিলেন জাগি।

নারী রহে শুদ্ধচিতে নির্জ্জন ভবনে,

তুলসী প্রত্যহ

কি তাহারে মন্ত্র দেয়, নারী একমনে

ধ্যায় অহরহ।

এক মাস পূর্ণ হ’তে প্রতিবেশীদলে

আসি তা’র দ্বারে

শুধাইল, পেলে স্বামী?—নারী হাসি বলে

পেয়েছি তাঁহারে।

শুনি ব্যগ্র কহে তা’রা——কহ তবে কহ

আছে কোন্ ঘরে?

নারী কহে, রয়েছেন প্রভু অহরহ

আমারি অন্তরে।

২৯শে আশ্বিন, ১৩০৬

৩৮৫

কথা ও কাহিনী · হোরিখেলা

হোরিখেলা

(রাজস্থান)

পত্র দিল পাঠান কেসর্ খাঁরে

কেতুন্ হ’তে ভূনাগ রাজার রাণী,—

লড়াই করি আশ মিটেছে মিঞা?

বসন্ত যায় চোখের উপর দিয়া,

এস তোমার পাঠান সৈন্য নিয়া

হোরি খেল‍্ব আমরা রাজপুতানী।—

যুদ্ধে হারি কোটা সহর ছাড়ি

কেতুন্ হ’তে পত্র দিল রাণী।

পত্র পড়ি কেসর উঠে হাসি,

মনের সুখে গোঁফে দিল চাড়া।

রঙীন্ দেখে’ পাগ‍্ড়ি পরে মাথে,

সুর্ম্মা আঁকি দিল আঁখির পাতে,

গন্ধভরা রুমাল নিল হাতে

সহস্রবার দাড়ি দিল ঝাড়া।

পাঠান সাথে হোরি খেল‍্বে রাণী

কেসর হাসি গোঁফে দিল চাড়া।

ফাগুন মাসে দখিন হ’তে হাওয়া

বকুলবনে মাতাল হ’য়ে এল।

বোল্ ধরেছে আম্র বনে বনে,

ভ্রমরগুলো কে কার কথা শোনে,

গুন‍্গুনিয়ে আপন মনে মনে

ঘুরে ঘুরে বেড়ায় এলোমেলো।

কেতুনপুরে দলে দলে আজি

পাঠান সেনা হোরি খেলতে এল

কেতুনপুরে রাজার উপবনে

তখন সবে ঝিকিমিকি বেলা।

পাঠানের দাঁড়ায় বনে আসি,

মূলতানেতে তান ধরেছে বাঁশি,

এল তখন একশো রাণীর দাসী

রাজপুতানী কর‍্তে হোরি-খেলা।

রবি তখন রক্তরাগে রাঙা,

সবে তখন ঝিকিমিকি বেলা।

পায়ে পায়ে ঘাগ‍রা উঠে দুলে

ওড়না ওড়ে দক্ষিণে বাতাসে।

ডাহিন্ হাতে বহে ফাগের থারি,

নীবিবন্ধে ঝুলিছে পিচ‍্কারী,

বামহস্তে গুলাব্-ভরা ঝারী

সারি সারি রাজপুতানী আসে।

পায়ে পায়ে ঘাগ‍রা উঠে দুলে,

ওড়না ওড়ে দক্ষিণে বাতাসে।

আঁখির ঠারে চতুর হাসি হেসে—

কেসর তবে কহে কাছে আসি,—

বেঁচে এলেম অনেক যুদ্ধ করি’—

আজকে বুঝি জানে-প্রাণে মরি।–

শুনে রাজার শতেক সহচরী

হঠাৎ সবে উঠল অট্ট হাসি।

রাঙা পাগড়ি হেলিয়ে কেসর খাঁ

রঙ্গভরে সেলাম করে আসি।

সুরু হ’ল হোরির মাতামাতি,

উড়তেছে ফাগ্ রাঙা সন্ধ্যাকাশে।

নব-বরণ ধরল বকুল ফুলে,

রক্তরেণু ঝর‍্ল তরুমূলে,

ভয়ে পাখী কূজন গেল ভুলে

রাজপুতানীর উচ্চ উপহাসে।

কোথা হ’তে রাঙা কুজ‍্ঝটিকা

লাগল যেন রাঙা সন্ধ্যাকাশে।

চোখে কেন লাগচেনাকো নেশা?—

মনে মনে ভাবচে কেসর খাঁ।

বক্ষ কেন উঠ‍্চেনাকো দুলি?

নারীর পায়ে বাঁকা নূপুরগুলি

কেমন যেন বল‍্চে বেসুর বুলি,

তেমন করে’ কাঁকণ বাজে না।

চোখে কেন লাগচেনাকো নেশা?

মনে মনে ভাবচে কেসর খাঁ।

পাঠান কহে—রাজপুতানীর দেহে

কোথাও কিছু নাই কি কোমলতা?

বাহুযুগল নয় মৃণালের মত,

কণ্ঠস্বরে বজ্র লজ্জাহত,

বড় কঠিন শুস্ক স্বাধীন যত

মঞ্জরীহীন মরুভূমির লতা।—

পাঠান ভাবে দেহে কিম্বা মনে

রাজপুতানীর নাইক কোমলতা।

তান ধরিয়া ইমন্ ভূপালিতে।

বাঁশি বেজে উঠ‍্ল দ্রুত তালে।

কুণ্ডলেতে দোলে মুক্তামালা,

কঠিন হাতে মোটা সোনার বালা,

দাসীর হাতে দিয়ে ফাগের থালা

রাণী বনে এলেন হেনকালে।

তান ধরিয়া ইমন্ ভূপালিতে

বাঁশি তখন বাজচে দ্রুত তালে

কেসর কহে—তোমারি পথ চেয়ে

দুটি চক্ষু করেছি প্রায় কানা।—

রাণী কহে—আমারো সেই দশা!—

একশো সখী হাসিয়া বিবশা,—

পাঠানপতির ললাটে সহসা

মারেন রাণী কাঁসার থালাখানা।

রক্তধারা গড়িয়ে পড়ে বেগে

পাঠানপতির চক্ষু হ’ল কানা।

বিনা মেঘে বজ্ররবের মত

উঠল বেজে কাড়া-নাকাড়া।

জ্যোৎস্নাকাশে চম‍্কে ওঠে শশী,

ঝন‍্ঝনিয়ে ঝিকিয়ে ওঠে অসি,

সানাই তখন দ্বারের কাছে বসি

গভীর সুরে ধর‍্ল কানাড়া।

কুঞ্জবনের তরু তলে তলে

উঠল বেজে কাড়া-নাকাড়া।

বাতাস বেয়ে ওড়না গেল উড়ে,

পড়ল খসে ঘাগরা ছিল যত।

মন্ত্রে যেন কোথা হ’তে কেরে

বাহির হ’ল নারী-সজ্জা ছেড়ে,

এক শত বীর ঘিরল পাঠানেরে

পুষ্প হ’তে একশো সাপের মত।

স্বপ্ন সম ওড়না গেল উড়ে,

পড়ল খসে’ ঘাগরা ছিল যত।

যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল

সে পথ দিয়ে ফিরলনাকে তা’রা।

ফাগুন রাতে কুঞ্জবিতানে

মত্ত কোকিল বিরাম না জানে,

কেতুনপুরে বকুল বাগানে

কেসর খাঁয়ের খেলা হ’ল সারা।

যে পথ দিয়ে পাঠান এসেছিল

সে পথ দিয়ে ফিরলনাকো তা’রা।

৯ই কার্ত্তিক, ১৩০৬