গড্ডলিকা
রাজশেখর বসু
উৎস: bn.wikisource · পাবলিক ডোমেইন · প্রকাশ ১৯২৪
প্রকাশনা-তথ্য
গড্ডলিকা
পরশুরাম
রচিত
শ্রীযতীন্দ্রকুমার সেন বিচিত্রিত
প্রকাশক
শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়
১৪, পার্শীবাগান, কলিকাতা
১৩৩১
মূল্য পাঁচ সিকা
সর্ব্বস্বত্ব সংরক্ষিত
সূচী
চিত্র
চিকিৎসা-সঙ্কট
সন্ধ্যা হব হব। নন্দবাবু হগ সাহেবের বাজার হইতে ট্রামে বাড়ী ফিরিতেছেন। বীর্ডন ষ্ট্রীট পার হইয়া গাড়ি আস্তে আস্তে চলিতে লাগিল। সম্মুখে গরুর গাড়ি। আর একটু গেলেই নন্দবাবুর বাড়ীর মোড়। এমন সময় দেখিলেন পাশের একটি গলি হইতে তাঁর বন্ধু বঙ্কু বাহির হইতেছেন। নন্দবাবু উৎফুল্ল হইয়া ডাকিলেন—“দাঁড়াও হে বঙ্কু, আমি নাবচি।” নন্দর দু বগলে দুই বাণ্ডিল, ব্যস্ত হইয়া চলন্ত গাড়ি হইতে যেমন নামিবেন, অমনি কোঁচায় পা বাধিয়া নীচে পড়িয়া গেলেন।
গাড়িতে একটা সোরগোল উঠিল এবং ঘ্যাচাং করিয়া গাড়ি থামিল। জনকতক যাত্রী নামিয়। নন্দকে ধরিয়া তুলিলেন। যাঁরা গাড়ির মধ্যে ছিলেন, তাঁরা গলা বাড়াইয়া নানা প্রকারে সহানুভূতি জানাইতে লাগিলেন। “আহা হা বড্ড লেগেচে—থোড়া গরম দুধ পিলা দোও —দুটো পা-ই কি কাটা গেছে?” একজন সিদ্ধান্ত করিল মৃগী। আর একজন বলিল ভীর্ম্মি। কেউ বলিল মাতাল, কেউ বলিল বাঙাল, কেউ বলিল পাড়াগেঁয়ে ভূত।
বাস্তবিক নন্দবাবুর মোটেই আঘাত লাগে নাই। কিন্তু কে তা শোনে। “লাগেনি কি মশায়, খুব লেগেচে—দু মাসের ধাক্কা—বাড়ী গিয়ে টের পাবেন।” নন্দ বারবার করযোড়ে নিবেদন করিলেন যে প্রকৃতই তাঁর কিছুমাত্র চোট লাগে নাই। একজন বৃদ্ধ ভদ্রলোক বলিলেন—“আরে মোলো, করলে মন্দ হয়। পষ্ট দেখলুম লেগেচে তবু বলে লাগেনি।”
এমন সময় বঙ্কুবাবু আসিয়া পড়ায় নন্দবাবু পরিত্রাণ শাইলেন, মনঃক্ষুণ্ণ যাত্রিগণসহ ট্রাম গাড়িও ছাড়িয়া গেল।
বন্ধু বলিলেন—“মাথাটা হঠাৎ ঘুরে গিয়েছিল আর কি। যা হোক, বাড়ীর পথটুকু আর হেঁটে গিয়ে কাজ নেই। এই রিক্শ—”
রিকশ নন্দবাবুকে আস্তে আস্তে লইয়া গেল, বঙ্কু পিছনে হাঁটিয়া চলিলেন।
নন্দবাবুর বয়স চল্লিশ, শ্যামবর্ণ, বেঁটে গোলগাল চেহারা। তাঁর পিতা পশ্চিমে কমিশারিয়টে চাকরী করিয়া বিস্তর টাকা উপার্জ্জন করিয়াছিলেন এবং মৃত্যুকালে একমাত্র সন্তান নন্দর জন্য কলিকাতায় একটি বড় বাড়ী, বিস্তর আসবাব এবং মস্ত এক গোছা কোম্পানির কাগজ রাখিয়া যান। নন্দর বিবাহ অল্পবয়সেই হইয়াছিল, কিন্তু এক বৎসর পরেই তিনি বিপত্নীক হন এবং তারপর আর বিবাহ করেন নাই। মাতা বহুদিন মৃতা, —বাড়ীতে একমাত্র স্ত্রীলোক এক বৃদ্ধা পিসি! তিনি ঠাকুর-সেবা লইয়। বিব্রত, সংসারের কাজ ঝি-চাকররাই দেখে। নন্দবাবুর দ্বিতীয়বার বিবাহ করিতে আপত্তি নাই, কিন্তু এ পর্যন্ত তাহা হইয়া উঠে নাই। প্রধান কারণ— আলস্য। থিয়েটার, সিনেমা, ফুটবল ম্যাচ, রেস এবং বন্ধুবর্গের সংসর্গ—ইহাতে নির্ব্বিবাদে দিন কাটিয়া যায়, বিবাহের ফুরসৎ কোথা? তারপর ক্রমেই বয়স বাড়িয়া যাইতেছে, আর এখন না করাই ভাল। মোটের উপর নন্দ নিরীহ, গোবেচারী, অল্পভাষী, উদ্যমহীন, আরামপ্রিয় লোক।
নন্দবাবুর বাড়ীর নীচে সুবৃহৎ ঘরে সান্ধ্য-আড্ডা বসিয়াছে। নন্দ আজ কিছু আক্লান্ত বোধ করিতেছেন; সে জন্য বালাপোষ গায়ে দিয়া লম্বা হইয়া শুইয়া আছেন। বন্ধুগণের চা এবং পাঁপরভাজা শেষ হইয়াছে, এখন পান সিগারেট এবং গল্প চলিতেছে।
গুপীবাবু বলিতেছিলেন—“উহু। শরীরের ওপর অত অযত্ন কোরোনা নন্দ। এই শীতকালে মাথা ঘুরে পড়ে যাওয়া ভাল লক্ষণ নয়।”
নন্দ। মাথা ঠিক ঘোরেনি, কেবল কোঁচার কাপড়টা বেধে—
গোপী। আরে না, না। ঘুরেছিল বৈকি। শরীরটা কাহিল হয়েছে। এই ত কাছাকাছি ডাক্তার তফাদার রয়েচেন। অত বড় ফিজিশিয়ান আর সহরে পাবে কোথা? যাও না কাল সকালে একবার তাঁর কাছে।
বন্ধু বলিলেন—“আমার মতে একবার নেপালবাবুকে দেখালেই ভাল হয়। অমন বিচক্ষণ হোমিওপ্যাথ আর দুটি নেই। মেজাজটা একটু তিরিক্ষি বটে, কিন্তু বুড়োর বিদ্যে অসাধারণ।”
ষষ্ঠিবাবু মুড়িগুড়ি দিয়া এক কোণে বসিয়াছিলেন। তাঁর মাথায় বালাক্লাভা টুপি, গলায় দাড়ি এবং তার উপর কম্ফর্টার। বলিলেন—“বাপ্, এই শীতে অবেলায় কখনো ট্রাম চড়ে? শরীর অসাড় হলে আছাড় খেতেই হবে। নন্দর শরীর একটু গরম রাখা দরকার।”
নিধু বলিল,—“নন্-দা, মোটা চাল ছাড়। সেই এক বিরিঞ্চির আমোলের ফরাস তাকিয়া, লক্কড় পাল্কি গাড়ি আর পক্ষীরাজ ঘোড়া, এতে গায়ে গত্তি লাগবে কিসে? তোমার পয়হার অভাব কি বাওয়া? একটু ফুর্ত্তি করতে শেখ।”
সাব্যস্ত হইল কাল সকালে নন্দবাবু ডাক্তার তফাদারের বাড়ী যাইবেন।
ডাক্তার তফাদার M. D., M. R. AS গ্রে ষ্ট্রীটে থাকেন। প্রকাণ্ড বাড়ী, দুখানা মোটর, একটা ল্যাণ্ড। খুব পসার, রোগীরা ডাকিয়া সহজে পায় না। দেড় ঘণ্টা পাশের কামরায় অপেক্ষা করার পর নন্দবাবুর ডাক পড়িল। ডাক্তার সাহেবের ঘরে গিয়া দেখিলেন এখনো একটি রোগীর পরীক্ষা চলিতেছে। একজন
‘এখন জিভ টেনে নিতে পারেন’
স্থূলকায় মাড়োয়ারি নগ্নগাত্রে দাঁড়াইয়া আছে। ডাক্তার ফিতা দিয়া তাহার ভুঁড়ির পরিধি মাপিয়া বলিলেন—“বস্ সওয়| ইঞ্চি বঢ়্ গিয়া।” রোগী খুশী হইয়া বলিল, “নবজ্ তো দেখিয়ে।” ডাক্তার রোগীর মণিবন্ধে নাড়ীর উপর একটি মোটর-কারের স্পার্কিং প্লগ ঠেকাইয়া বলিলেন—“বহুৎ মজেসে চল্ রহা।” রোগী বলিল—“জবান ত দেখিয়ে।” রোগী হাঁ করিল, ডাক্তার ঘরের অপর দিকে দাঁড়াইয়া অপেরা গ্লাস দ্বারা তাহার জিভ দেখিয়া বলিলেন—“থোড়েসি কসর্ হ্যায়। কল্ ফিন্ আনা।”
রোগী চলিয়া গেলে তফাদার নন্দর দিকে চাহিয়া বলিলেন—“ওয়েল?”
নন্দ বলিলেন—“আজ্ঞে বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে এসেচি। কাল হঠাৎ ট্রাম থেকে—”
তফাদার। কম্পাউণ্ড ফ্রাক্চার? হাড় ভেঙেচে?
নন্দবাবু আনুপূর্ব্বক তাঁর অবস্থা বর্ণনা করিলেন। বেদনা নাই, জ্বর হয় না, পেটের অসুখ, সর্দ্দী, হাঁপানি নাই। ক্ষুধা কাল হইতে একটু কমিয়াছে। রাত্রে দুঃস্বপ্ন দেখিয়াছেন। মনে বড় আতঙ্ক।
ডাক্তার তাঁহার বুক, পেট, মাথা, হাত, পা, নাড়ী পরীক্ষা করিয়া বলিলেন—“জিভ দেখি।” নন্দবাবু জিভ বাহির করিলেন।
ডাক্তার ক্ষণকাল মুখ বাঁকাইয়া কলম ধরিলেন। প্রেস্কৃপ্শন লেখা শেষ হইলে নন্দর দিকে চাহিয়া বলিলেন—“আপনি এখন জিভ টেনে নিতে পারেন। এই ওষুধ রোজ তিনবার খাবেন।”
নন্দ। কি রকম বুঝচেন?
তফাদার।ভেরি ব্যাড।
নন্দ সভয়ে বলিলেন— “কি হয়েচে?”
তফাদার। আরো দিন-কতক ওয়াচ না করলে ঠিক বলা যায় না। তবে সন্দেহ কচ্চি cerebral tumour with strangulated ganglia. ট্রিফাইন্ করে মাথার খুলি ফুটো করে অস্ত্র করতে হবে, আর ঘাড় চিরে নার্ভের জট ছাড়াতে হবে। শর্ট সার্কিট হয়ে গেছে।?
নন্দ। বাঁচব ত?
তফাদার। দমে যাবেন না, তা হলে সারাতে পারবো না। সাতদিন পরে ফের আসবেন। মাই ফ্রেণ্ড মেজর গোঁসাই-এর সঙ্গে একটা কন্সল্টেশনের ব্যবস্থা করা যাবে। ভাত-ডাল বড় একটা খাবেন না। এগ ফ্লিপ, বোনম্যারো সুপ, চিকেন ষ্টু, এই সব। বিকেলে একটু বর্গণ্ডি খেতে পারেন। বরফ-জল খুব খাবেন। হ্যাঁ, বত্রিশ টাকা। থ্যাঙ্ক ইউ।
নন্দবাবু কম্পিত পদে প্রস্থান করিলেন।
সন্ধ্যাবেলা বন্ধুবাবু বলিলেন—“আরে ওখনি আমি বারণ করেছিলুম ওর কাছে যেও না। ব্যাটা মেড়োর পেটে হাত বুলিয়ে খায়। এঃঁ, খুলির ওপর তুরপুন চালাবেন!”
ষষ্ঠিবাবু। আমাদের পাড়ার তারিণী কবিরাজকে দেখালে হয় না?
গুপীবাবু। না না, যদি বাস্তবিকই নন্দর মাথার ভেতর ওলট-পালট হয়ে গিয়ে থাকে, তবে হাতুড়ে বদ্দির কম্ম নয়। হোমিওপ্যাথিই ভাল।
নিধু। আমার কথা ত শুনবে না বাওয়া। ডাক্তারি তোমার ধাতে না সয় ত একটু কোবরেজি করতে শেখ। দরওয়ানজি দিব্বি একলোটা বানিয়েচে। বল ত একটু চেয়ে আনি।
হোমিওপ্যাথিই স্থির হইল।
পরদিন খুব ভোরে নন্দবাবু নেপাল ডাক্তারের বাড়ী আসিলেন। রোগীর ভিড় তখনো আরম্ভ হয় নাই, অল্পক্ষণ পরেই তাঁর ডাক পড়িল। একটি প্রকাণ্ড ঘরের মেঝেতে ফরাস-পাতা। চারিদিকে স্তুূপাকারে বহি সাজানো। বহির দেওয়ালের মধ্যে গল্পবর্ণিত শেয়ালের মত বৃদ্ধ নেপালবাবু বসিয়া আছেন। মুখে গড়গড়ার নল, ঘরটি ধোঁয়ায় ঝাপসা হইয়া গিয়াছে।
নন্দবাবু নমস্কার করিয়া দাঁড়াইয়া রহিলেন। নেপাল ডাক্তার কট্মট্ দৃষ্টিতে চাহিয়া বলিলেন—“বস্বার যায়গা আছে।” নন্দ বসিলেন।
নেপাল। শ্বাস উঠেচে?
নন্দ। আজ্ঞে?
নেপাল। রুগীর শেষ অবস্থা না হলে ত আমায় ডাকা হয় না, তাই জিজ্ঞেস করচি।
নন্দ সবিনয়ে জানাইলেন তিনিই রোগী।
নেপাল। ডাকাত ব্যাটারা ছেড়ে দিলে যে বড়? তোমার হয়েচে কি?
নন্দবাবু তাঁহার ইতিবৃত্ত বর্ণনা করিলেন।
নেপাল। তফাদার কি বলেচে?
নন্দ। বল্লেন আমার মাথায় টিউমার আছে।
নেপাল। তফাদারের মাথায় কি আছে জানো? গোবর। আর টুপীর ভেতর শিং, জুতোর ভেতর খুর, পাৎলুনের ভেতর ল্যাজ। খিদে হয়?
নন্দ। দুদিন থেকে একবারে হয় না।
নেপাল। ঘুম হয়?
নন্দ। না।
নেপাল। মাথা ধরে?
নন্দ। কাল সন্ধ্যাবেলা ধরেছিল।
নেপাল। বাঁদিক?
নন্দ। আজ্ঞে হাঁ।
নেপাল। না ডান দিক?
নন্দ। আজ্ঞে হাঁ।
নেপাল ধমক দিয়া বলিলেন—“ঠিক করে বল।”
নন্দ। আজ্ঞে ঠিক মধ্যিখানে।
নেপাল। পেট কামড়ায়?
নন্দ। সেদিন কামড়েছিল। নিধে কাব্লী মটরভাজা এনেছিল তাই খেয়ে—
নেপাল। পেট কামড়ায় না মোচড় দেয় তাই বল।
নন্দ বিব্রত হইয়া বলিলেন—“হাঁচোড়-পাঁচোড় করে।”
ডাক্তার কয়েকটি মোটা-মোটা বহি দেখিলেন, তারপর অনেকক্ষণ চিন্তা করিয়া বলিলেন—“হুঁ”। একটা ওষুধ দিচ্চি নিয়ে যাও। আগে শরীর থেকে এলোপাথিক বিষ তাড়াতে হবে। পাঁচ বছর বয়সে আমায় খুনে ব্যাটারা দু গ্রেণ কুইনীন দিয়েছিল, এখনো বিকেলে মাথা টিপ্ টিপ্ করে। সাতদিন পরে ফের এস। তখন আসল চিকিৎসা শুরু হবে।”
‘হাচোড় পাঁচোড় করে’
নন্দ। ব্যারামটা কি আন্দাজ করচেন?
ডাক্তার ভ্রুকুটি করিয়া বলিলেন—“তা জেনে তোমার চারটে হাত বেরুবে নাকি? যদি বলি তোমার পেটে differential calculus হয়েচে, কিছু বুঝবে? ভাত খাবে না, দুবেলা রুটি, মাছ মাংস বারণ, শুধু মুগের ডালের যুস, স্নান বন্ধ, গরম জল একটু খেতে পার। তামাক খাবে না, ধোঁয়া লাগলে ওষুধের গুণ নষ্ট হবে। ভাবচো আমার আলমারীর ওষুধ নষ্ট হয়ে গেছে? সে ভয় নেই, আমার তামাকে সলফর থার্টি মেশান থাকে। ফি কত তাও বলে দিতে হবে নাকি? দেখচো না দেওয়ালে নোটিস লট্কানো রয়েচে বত্রিশ টাকা? আর ওষুধের দাম চার টাকা”
নন্দবাবু টাকা দিয়া বিদায় হইলেন।
নিধু বলিল—“কেন বাওয়া কাঁচা পয়হা নষ্ট করচ? থাকলে পাঁচ রাত বক্সে বসে ঠিয়াটার দেখা চল্ত। ও নেপাল বুড়ো মস্ত ঘুঘু, নন্-দাকে ভালমানুষ পেয়ে জেরা করে থ করে দিয়েচে। পোড়্তো আমার পাল্লায় বাছাধন, কত বড় হোমিওফাঁক দেখে নিতুম। এক চুমুকে তার আলমারী-শুদ্ধ ওষুধ সাব্ড়ে না দিতে পারি ত আমার নাক কেটে দিও।”
গুপী। আজ আপিসে শুনছিলুম কে একজন বড় হাকিম ফরক্বাবাদ থেকে এখানে এসেচে। খুব নামডাক, রাজা-মহারাজারা সব চিকিৎসা করাচ্চে। একবার দেখালে হয় না?
ষষ্ঠি। এই শীতে হাকিমি ওষুধ? বাপ্, সরবৎ খাইয়েই মারবে। তার চেয়ে তারিণী কোবরেজ ভাল।
অতঃপর কবিরাজী চিকিৎসাই সাব্যস্ত হইল।
পরদিন সকালে নন্দবাবু তারিণী কবিরাজের বাড়ী উপস্থিত হইলেন। কবিরাজ মহাশয়ের বয়স ষাট, ক্ষীণ শরীর, দাড়ি-গোঁফ কামানো। তেল মাখিয়া আটহাতি ধুতি পরিয়া একটি চেয়ারের উপর উবু হুইয়া বসিয়া তামাক খাইতেছেন। এই অবস্থাতেই ইনি প্রত্যহ রোগী দেখেন। ঘরে একটি তক্তপোষ, তাহার উপর তেলচিটে পাটি এবং কয়েকটি মলিন তাকিয়া। দেওয়ালের কোলে দুটি ঔষধের আলমারী।
নন্দবাবু নমস্কার করিয়া তক্তপোষে বসিলে কবিরাজ জিজ্ঞাসা করিলেন—“বাবুর কন্থে আসা হচ্চে?” নন্দবাবু নিজের নাম ও ঠিকানা বলিলেন।
তারিণী। রুগীর ব্যামো ডা কি?
নন্দবাবু জানাইলেন তিনিই রোগী এবং সমস্ত ইতিহাস বিবৃত করিলেন।
তারিণী। মাথার খুলী ছেঁদা করে দিয়েচে নাকি?
নন্দ। আজ্ঞে না, নেপালবাবু বল্লেন পাথুরি, তাই আর মাথায় অস্তর করাই নি।
তারিণী। নেপাল? সে আবার কেডা?
নন্দ। জানেন না? চোরবাগানের নেপালচন্দ্র রায় M. B., F. T. S.—মস্ত হোমিওপ্যাথ।
তারিণী। অঃ, ন্যাপ্লা, তাই কও। সেডা আবার ডাগদর হল কবে? বলি, পাড়ায় এমন বিচক্ষণ কোবরেজ থাকৃতি ছেলে-ছোকরার কাছে যাও কেন?
নন্দ। আজ্ঞে, বন্ধু-বান্ধবরা বল্লে ডাক্তারের মতটা আগে নেওয়া দরকার, যদিই অস্ত্র-চিকিৎসা করতে হয়।
তারিণী। যন্তিবাবু-রি চেন? খুল্নের উকীল যন্তিবাবু?
নন্দ ঘাড় নাড়িলেন।
তারিণী। তাঁর মামার হয় উরুস্তম্ভ। সিবিল সার্জন পা কাট্লে। তিনদিন অচৈতন্নি। জ্ঞান হলি পর কইলেন, আমার ঠ্যাং কই? ডাক্ তারিণী স্যানরে। দেলাম ঠুকে এক দলা চ্যবনপ্রাশ। তারপর কি হল কও দিকি?
‘হয়, Zান্তি পার না।’
নন্দ। আবার পা গজিয়েচে বুঝি?
“ওরে অ ক্যাব্লা, দেখ, দেখ, বিড়েলে সবডা ছাগলাদ্য ঘৃত খেয়ে গেল”—বলিতে বলিতে কবিরাজ মহাশয় পাশের ঘরে ছুটিলেন। একটু পরে ফিরিয়া আসিয়া যথাস্থানে বসিয়া বলিলেন—“দ্যাও নাড়ীড়া একবার দেখি। হঃ, যা ভাবছিলাম তাই। ভারি ব্যামো হয়েছিল দেখি। কখনো?”
নন্দ। অনেকদিন আগে টাইফয়েড হয়েছিল।
তারিণী। ঠিক্ ঠাউরেচি। পাচ বছর আগে?
নন্দ। প্রায় সাড়ে সাত বছর হল।
তারিণী। একই কথা, পাচ দেরা সারে সাত। প্রাতিক্কালে বোমি হয়?
নন্দ। আজ্ঞে না।
তারিণী। হয়, Zান্তি পার না। নিদ্রা হয়?
নন্দ। ভাল হয় না।
তারিণী। হবেই না ত। ঊর্দ্ধু হয়েছে কি না! দাত কন্কন্ করে?
নন্দ। আজ্ঞে না।
তারিণী। করে, Zান্তি পার না। যা হোক, তুমি চিন্তা কোরোনি বাবা। আরাম হয়ে যাবানে। আমি ওষুধ দিচ্চি।
কবিরাজ মহাশয় আলমারী হইতে একটা শিশি বাহির করিলেন এবং তাহার মধ্যস্থিত বড়ির উদ্দেশে বলিলেন—“লাফাস্ নি, থাম্ থাম্। আমার সব জীয়ন্ত ওষুধ, ডাক্লি ডাক শোনে। এই বড়ি সকাল সন্ধ্যি একটা করি খাবা। আবার তিনদিন পরে আস্বা। বুজেচ?
নন্দ। আজ্ঞে হাঁ।
তারিণী। ছাই বুজেচ। অনুপান দিতি হবে না? ট্যাবা লেবুর রস আর মধুর সাথি মাড়ি খাবা। ভাত খাবা না। ওলসিদ্ধ, কচুসিদ্ধ এই সব খাবা। নুন ছোবা না। মাগুর মাছের ঝোল একটু চ্যানি দিয়ে রাঁধি খাতি পার। গরম জল ঠাণ্ডা করি খাবা।
নন্দ। ব্যারামটা কি?
তারিণী। যারে কয় উদুরি। উর্দ্ধুশ্লেষ্মাও কইতি পার।
নন্দবাবু কবিরাজের দর্শনী ও ঔষধের মূল্য দিয়া বিমর্ষ চিত্তে বিদায় হুইলেন।
নিধু বলিল— “কি দাদা, বোকরেজির, সাধ মিটল?
গুপী। নাঃ, এ সব বাজে চিকিৎসার কাজ নয়। কোথাও চেঞ্জে চল।
বন্ধু। আমি বলি কি, নন্দ বে-থা করে ঘরে পরিবার আনুক। এ রকম দামড়া হয়ে থাকা কিছু নয়।
নন্দ চিঁ চিঁ রবে বলিলেন—“আর পরিবার। কোন্ দিন আছি, কোন্ দিন নেই। এই বয়সে একটা কচি বউ এনে মিথ্যে জঞ্জাল জোটানো।”
নিধু বলিল—“নন্-দা, একটা মটোর কেন মাইরি। দুদিন হাওয়া খেলেই চাঙ্গা হয়ে উঠবে। সেভেন সিটার হুড্সন। ষেটের কোলে আমরাও ত পাঁচজন আছি।”
ষষ্ঠি। তা যদি বল্লে, তবে আমার মতে মোটরকারও যা, পরিবারও তা। ঘরে আনা সোজা, কিন্তু মেরামতি খরচ যোগাতে প্রাণাস্ত। আজ টায়ার ফাট্লো, কাল গিন্নির অম্বলশূল, পরশু ব্যাটারী খারাপ, তরশু ছেলেটা ঠাণ্ডা লেগে জ্বর। অমন কাজ কোরোনা নন্দ। জেরবার হবে। এই শীতকালে কোথা দুদণ্ড লেপের মধ্যে ঘুমুব মশায়, তা নয়, সারারাত প্যান্ প্যান্ ট্যাঁ ট্যাঁ।
নিধু। ষষ্ঠি খুড়ো যে রকম হিসেবী লোক, একটি মোটাসোটা রোঁওলা ভাল্লুকের মেয়ে বে কল্লে ভাল করতেন। লেপ-কম্বলের খরচা বাঁচত।
গুপী। যাঁহা বাহান্ন তাঁহা তিপ্পান্ন। কাল সকালে নন্দ একবার হাকিম সাহেবের কাছে যাও। তারপর যা হয় করা যাবে।
নন্দবাবু অগত্যা রাজি হইলেন।
হাজিক্-উল-মুল্ক্ বিন্ লোকমান নুরুল্লা গজন ফরুল্লা অল্ হকিম উনানী লোয়ার চিৎপুর রোডে বাসা লইয়াছেন। নন্দবাবু তেতলায় উঠিলে একজন লুঙ্গীপরা ফেজধারী লোক তাঁকে বলিল—“আসেন বাবুমশয়। আমি হাকিম সাহেবের মীরমুন্সী। কি বেমারি বোলেন, আমি লিখে হুজুরকে এত্তেলা ভেজিয়ে দিব।”
নন্দ। বেমারি কি সেটা জানতেই ত আসা বাপু।
মুন্সী। তব্ ভি কুছু ত বোলেন। না-তাকৃতি, বুখার, পিল্লি, চেচক্, ঘেঘ, বাওয়াসির, রাত-অন্ধি—
নন্দ। ও সব কিছু বুঝলুম না বাপু। আমার প্রাণটা ধড়ফড় করচে।
মুন্সী। সো হি বোলেন। দিল্ ভড়প্না। মোহর এনেছেন?
নন্দ। মোহর?
মুন্সী। হাকিম সাহেব চাঁদি ছোন না। নজরানা দো মোহর। না থাকে হামি দিচ্চি। পয়তালিশ টাকা, আর বাট্টা দো টাকা, আর রেশমী রুমাল দো টাকা। দরবারে যেয়ে আগে হুজুরকে ‘বন্দেগী জনাব’ বোলবেন, তারপর রুমালের ওপর মোহর রেখে সামনে ধরবেন।
মুন্সী নন্দবাবুকে তালিম দিয়া দরবারে লইয়া গেল। একটি বৃহৎ ঘরে গালিচা-পাতা, একপার্শ্বে মস্নদের উপর তাকিয়া হেলান দিয়া হাকিম সাহেব ফরসীতে ধূমপান করিতেছেন। বয়স পঞ্চান্ন, বাবরি চুল, গোঁফ খুব ছোট করিয়া ছাঁটা। আবক্ষলম্বিত দাড়ির গোড়ার দিক্ সাদা, মধ্যে লাল, ডগায় নীল। পরিধান সাটিনের চুড়িদার ইজার, কিংখাপের জোব্বা, জরির তাজ। সম্মুখে ধূপদানে মুসব্বর এবং রুমী মস্তগী জ্বলিতেছে, পাশে পিকদান, পানদান, আতরদান ইত্যাদি। চারপাঁচজন পারিষদ্ হাঁটু মুড়িয়া বসিয়া আছে এবং হাকিমের প্রতি কথায় ‘কেরামৎ’ বলিতেছে। ঘরের কোণে একজন ঝাঁক্ড়া চুলো চাপ-দেড়ে লোক সেতার লইয়া পিড়িং পিড়িং এবং বিকট অঙ্গভঙ্গী করিতেছে।
নন্দবাবু অভিবাদন করিয়া মোহর নজর দিলেন।
‘হড্ডি পিল্পিলায় গয়া’
হাকিম ঈষৎ হাসিয়া আতরদান হইতে কিঞ্চিৎ তুলা লইয়া নন্দর কাণে গুঁজিয়া দিলেন। মুন্সী বলিল—“আপনি বাংলায় বাতচিত বোলেন। হামি হুজুরকে সম্ঝিয়ে দিব।”
নন্দবাবুর ইতিবৃত্ত শেষ হইলে হাকিম ঋষভকণ্ঠে বলিলেন—“শির লাও।”
নন্দ শিহরিয়া উঠিলেন। মুন্সী আশ্বাস দিয়া বলিল— “ডর্বেন না মশয়। জনাবকে আপনার মাথা দেখ্লান।”
নন্দর মাথা টিপিয়া হাকিম বলিলেন—“হড্ডি পিল্পিলায় গয়া।”
মুন্সী। শুনছেন? মাথার হাড় বিল্কুল লরম হয়ে গেছে।
হাকিম তিনরঙা দাড়িতে আঙুল চালাইয়া বলিলেন —“সুর্ম্মা সুর্খ্।”
একজন একটা লাল গুঁড়া নন্দর চোখের পল্লবে লাগাইয়া দিল। মুন্সী বুঝাইল—“আঁখ ঠাণ্ডা থাকবে, নিদ হবে।” হাকিম আবার বলিলেন—“রোগন্ বব্বর।” মুন্সী হাঁকিল—এ জি বাল্বর, অস্তুরা লাও।”
নন্দবাবু “হাঁ-হাঁ। আরে তুম্ করে। কি—” বলিতে বলিতে নাপিত চট করিয়া তাঁহার ব্রহ্মতালুর উপর দুইঞ্চি সমচতুষ্কোণ কামাইয়া দিল, আর একজন তাহার উপর একটা দুর্গন্ধ প্রলেপ লাগাইল। মুন্সী বলিল— “ঘব্ড়ান কেন মশয়, এ হচ্চে বব্বরী সিংগির মাথার ঘি। ‘বহুৎ কিম্মৎ। মাথার হাড্ডি শকৎ হবে।”
নন্দবাবু কিয়ৎক্ষণ হতভম্ব অবস্থায় রহিলেন। তারপর প্রকৃতিস্থ হুইয়া বেগে ঘর হইতে পলায়ন করিলেন। মুন্সী পিছনে ছুটিতে ছুটিতে বলিল— “আমার দপ্তরী?” নন্দ একটা টাকা ফেলিয়া দিয়া তিন লাফে নীচে নামিয়া গাড়িতে উঠিয়া কোচমানকে বলিলেন— “হাঁকাও।”
সন্ধ্যাকালে বন্ধুগণ আসিয়া দেখিলেন বৈঠকখানার দরজা বন্ধ। চাকর বলিল, বাবুর বড় অসুখ, দেখা হইবে না। সকলে বিষণ্ণ চিত্তে ফিরিয়া গেলেন।
সমস্ত রাত বিছানায় ছট্ফট্ করিয়া ভোর চারটার সময় নন্দবাবু ভীষণ প্রতিজ্ঞা করিলেন যে আর বন্ধুগণের পরামর্শ শুনিবেন না, নিজের ব্যবস্থা নিজেই করিবেন।
বেলা আটটার সময় নন্দ বাড়ী হইতে বাহির হইলেন এবং বড় রাস্তায় ট্যাক্সি ধরিয়া বলিলেন—“সিধা চলো।” সঙ্কল্প করিয়াছেন, মিটারে এক টাকা উঠিলেই ট্যাক্সি হইতে নামিয়া পড়িবেন, এবং কাছাকাছি যে চিকিৎসক পান, তাহারই মতে চলিবেন, —তা সে এলোপ্যাথ, হোমিওপ্যাথ, কবিরাজ, হাতুড়ে, অবধূত, মান্দ্রাজী বা চাঁদসীর ডাক্তার যে-ই হোক
বউবাজারে নামিয়া একটি গলিতে ঢুকিতেই সাইনবোর্ড নজরে পড়িল— “ডাক্তার মিস্ বি, মল্লিক।”. নন্দবাবু “মিস্” কথাটি লক্ষ্য করেন নাই, নতুবা হয় ত ইতস্ততঃ করিতেন। একবারে সোজা পরদা ঠেলিয়া একটি ঘরের ভিতর প্রবেশ করিলেন।
মিস্ বিপুলা মল্লিক তখন বাহিরে যাইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া কাঁধের উপর সেফটি-পিন আঁটিতেছিলেন। নন্দকে দেখিয়া মৃদুম্বরে বলিলেন—“কি চাই আপনার?”
নন্দবাবু প্রথমটা অপ্রস্তুত হইলেন, তারপর মরিয়া হইয়া ভাবিলেন—দূর হোক্ না হয় লেডি ডাক্তারের পরামর্শই নোবো। বলিলেন—“বড় বিপদে পড়ে, আপনার কাছে এসেছি।”
মিস্ মল্লিক। পেন আরম্ভ হয়চে?
নন্দ। পেন ত কিছু টের পাচ্ছি না
মিস্। ফার্স্ট কনফাইন্মেণ্ট?
নন্দ। আজ্ঞে।
মিস্। প্রথম পোয়াতী?
নন্দ অপ্রতিভ হইয়া বলিলেন-“আমি নিজের চিকিৎসার জন্যই এসেচি।”
মিস্ মল্লিক আশ্চর্য হইয়া বলিলেন—“নিজের জন্য? ব্যাপার কি?”
সমগ্র ইতিহাস বর্ণনা শেষ হইলে মিস্ মল্লিক নন্দবাবুর স্বাস্থ্য সম্বন্ধে দু’চারিটি প্রশ্ন করিয়া কহিলেন—“আপনার নামটি জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?”
নন্দ। শ্রীনন্দদুলাল মিত্র।
মিস্। বাড়ীতে কে আছেন?
নন্দ জানাইলেন তিনি বহুদিন বিপত্নীক, বাড়ীতে এক বৃদ্ধা পিসি ছাড়া কেউ নাই।
মিস্। কাজকর্ম্ম কি করা হয়?
নন্দ। তো কিছু করি না। পৈত্রিক সম্পত্তি আছে।
মিস্। মোটর-কার আছে?
নন্দ। নেই, তবে কেনবার ইচ্ছা আছে।
মিস্ মল্লিক আরো নানা প্রকার প্রশ্ন করিয়া কিছুক্ষণ ঠোঁটে হাত দিয়া চিন্তা করিলেন, তারপর ধীরে ধীরে বামে দক্ষিণে ঘাড় নাড়িলেন।
নন্দ ব্যাকুল হইয়া বলিলেন—“দোহাই আপনার, সত্যি করে বলুন আমার কি হয়েছে। টিউমার, না পাথুরী, না উদরী, না কালাজ্বর, না হাইড্রোফোবিয়া?”
মিস্ মল্লিক হাসিয়া বলিলেন—“কেন আপনি ভাবচেন? ও-সব কিছুই হয় নি। আপনার শুধু একজন অভিভাবক দরকার।”
নন্দ অধিকতর কাতরকণ্ঠে বলিলেন—“তবে কি আমি পাগল হয়েচি?”
মিস্ মল্লিক মুখে রুমাল দিয়া খিল্ খিল্ করিয়া হাসিয়া বলিলেন—“ও ডিয়ার ডিয়ার নো। পাগল হবেন কেন? আমি বল্ছিলুম, আপনার যত্ন নেবার জন্য বাড়ীতে উপযুক্ত লোক থাকা দরকার।”
নন্দ। কেন, পিসি-মা ত আছেন।
মিস্ মল্লিক পুনরায় হাসিয়া বলিলেন—“দি আইডিয়া! মাসি-পিসির কাজ নয়। যাক, আপাতক একটা ওষুধ দিচ্চি, খেয়ে দেখবেন। বেশ মিষ্টি, এলাচের গন্ধ। এক হপ্তা পরে আবার আসবেন।”
নন্দবাবু সাতদিন পরে পুনরায় মিস্ বিপুলা মল্লিকের কাছে গেলেন। তারপর দুদিন পরে আবার গেলেন। তারপর প্রত্যহ।
তারপর একদিন নন্দবাবু পিসিমাতাকে ৺কাশীধামে
‘দি আইডিয়া!’
রওনা করাইয়া দিয়া মস্ত বাজার করিলেন এক ঝুড়ি গল্দা চিংড়ি, এক ঝুড়ি মটন, তদনুযায়ী ঘি, ময়দা, দই, সন্দেশ ইত্যাদি। বন্ধুবর্গ খুব খাইলেন। নন্দবাবু জরিপাড় সূক্ষ্ম ধুতির উপর সিল্কের পাঞ্জাবী পরিয়া, সলজ্জ সম্মিতমুখে সকলকে আপ্যায়িত করিলেন।
বিপুলানন্দ
মিসেস্ বিপুলা মিত্র এখন আর স্বামী ভিন্ন অপর রোগীর চিকিৎসা করেন না। তবে নন্দবাবু ভালই আছেন। মোটর-কার কেনা হইয়াছে। দুঃখের বিষয়, সান্ধ্য আড্ডাটি ভাঙিয়া গিয়াছে।
* William Caine's Among the Doctors নামক গল্পের ছায়া অবলম্বনে।
ভুশণ্ডীর মাঠে
শিবু ভট্টাচার্য্যের নিবাস পেনেটী গ্রামে। একটি স্ত্রী, তিনটি গরু, একতলা পাকা বাড়ী, ছাব্বিশ ঘর যজমান, কিছু ব্রহ্মোত্তর জমি, কয়েক ঘর প্রজা,—ইহাতেই স্বচ্ছন্দে সংসার চলিয়া যায়। শিবুর বয়স বত্রিশ। ছেলেবেলায় স্কুলে যা একটু লেখাপড়া শিখিয়াছিল এবং বাপের কাছে সামান্য যেটুকু সংস্কৃত পড়িয়াছিল, তাহা সম্পত্তি এবং যজমানরক্ষার পক্ষে যথেষ্ট। কিন্তু শিবুর মনে সুখ ছিল না। তার স্ত্রী নৃত্যকালীর বয়স আন্দাজ পঁচিশ, আঁটো-সাঁটো মজবুত গড়ন, দুর্দ্দান্ত স্বভাব। স্বামীর প্রতি তার যত্নের ত্রুটি ছিল না, কিন্তু শিবু সে যত্নের মধ্যে রস খুঁজিয়া পাইত না। সামান্য খুঁটিনাটি লইয়া স্বামি-স্ত্রীতে তুমুল ঝগড়া বাধিত। পাঁচ মিনিট বকাবকির পরেই শিবুর দম ফুরাইয়া যাইত, কিন্তু নৃত্যকালীর রসনা একবার ছুটিতে আরম্ভ করিলে সহজে নিরস্ত হইত না। প্রতিবারে শিবুরই পরাজয় ঘটিত। স্ত্রীকে বশে রাখিতে না পারায় পাড়ার লোকে শিবুকে কাপুরুষ, ভেড়ো, মেনীমুখো প্রভৃতি আখ্যা দিয়াছিল। ঘরে বাহিরে এইরূপে লাঞ্ছিত হওয়ায় শিবুর অশান্তির সীমা ছিল না।
একদিন নৃত্যকালী গুজব শুনিল তার স্বামীর চরিত্রদোষ ঘটিয়াছে। সেদিনকার বচসা চরমে পৌঁছিল,—নৃত্যকালীর ঝাঁটা শিবুর পৃষ্ঠ স্পর্শ করিল। শিবু বেচারা ক্রোধে, ক্ষোভে, কষ্টে চোখের জল রোধ করিয়া কোনোগতিকে রাত কাটাইয়া পরদিন ভোর ছ’টার ট্রেনে কলিকাতা যাত্রা করিল।
শিয়ালদহ হইতে সোজা কালীঘাটে গিয়া শিবু নানা উপচারে পাঁচ টাকার পূজা দিয়া মানত করিল—“হে মা কালি, মাগীকে ওলাউঠোয় টেনে নাও মা। আমি জোড়া পাঁঠার নৈবিদ্যি দোবো। আর যে বরদাস্ত হয় না। একটা সুরাহা করে দাও মা যাতে আবার নতুন করে সংসার পাত্তে পারি। মাগীর ছেলেপুলে হল না, সেটাও ত দেখতে হবে। দোহাই মা।”
মন্দির হইতে ফিরিয়া শিবু বড় এক ঠোঙা তেলেভাজা খাবার, আধ সের দই এবং আধ সের অমৃতি খাইল। তারপর সমস্ত দিন জন্তুর বাগান, যাদুঘর, হগ সাহেবের বাজার, হাইকোর্ট ইত্যাদি দেখিয়া সন্ধ্যাবেলা বীডন স্ট্রীটের হোটেল-ডি-অর্থোডক্সে এক প্লেট কারী, দু প্লেট রোষ্ট ফাউল এবং আটখানা ডেভিল জলযোগ করিল। তারপর সমস্ত রাত থিয়েটার দেখিয়া ভোরে পেনেটী ফিরিয়া গেল।
মা কালী কিন্তু উল্টা বুঝিয়াছিলেন! বাড়ী আসিয়াই শিবুর ভেদবমী আরম্ভ হইল। ডাক্তার আসিল, কবিরাজ আসিল, ফলে কিছুই হইল না।—আট্ ঘণ্টা রোগে ভুগিয়া স্ত্রীকে পায়ে ধরাইয়া কাঁদাইয়া শিবু ইহলোক পরিত্যাগ করিল।
গ্রামে আর মন টিকিল না। শিবু সেই রাত্রেই গঙ্গা পার হইল। পেনেটীর আড়পার কোন্নগর। সেখান হইতে উত্তর মুখ হইয়া ক্রমে রিশ ড়া, শ্রীরামপুর, বৈদ্যবাটীর হাট, চাঁপদানীর চটকল ছাড়াইয়া আরো দু’তিন ক্রোশ দূরে ভুশণ্ডীর মাঠে পৌঁছিল। মাঠটি বহুদূর বিস্তৃত, জনমানবশূন্য। এককালে এখানে ইঁট্খোলা ছিল সেজন্য সমতল নয়, কোথাও গর্ত্ত, কোথাও মাটির ঢিবি। মাঝে মাঝে আস্শেওড়া, ঘেঁটু, বুনোওল, বাবলা প্রভৃতির ঝোপ। শিবুর বড়ই পছন্দ হইল। একটা বহুকালের পরিত্যক্ত ইঁটের পাঁজার এক পাশে একটা লম্বা তালগাছ সোজা হইয়া উঠিয়াছে, আর একদিকে একটা নেড়া বেলগাছ ত্রিভঙ্গ হইয়া দাঁড়াইয়া আছে। শিবু সেই বেলগাছে ব্রহ্মদৈত্য হইয়া বাস করিতে লাগিল।
ষাঁরা স্পিরিচুয়ালিজম্ বা প্রেততত্ত্বের খবর রাখেন না তাঁহাদিগকে ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝাইয়া দিতেছি। মানুষ মরিলে ভূত হয় ইহা সকলেই শুনিয়াছেন। কিন্তু এই থিওরীর সঙ্গে স্বর্গ, নরক, পুনর্জন্ম খাপ খায় কিরূপে? প্রকৃত তথ্য এই।—নাস্তিকদের আত্মা নাই। তাঁরা মরিলে অম্লজান, উজান, যবক্ষারজান প্রভৃতি গ্যাসে পরিণত হন। সাহেবদের মধ্যে যাঁরা আস্তিক, তাঁদের আত্মা আছে বটে, কিন্তু পুনর্জন্ম নাই। তাঁরা মৃত্যুর পর ভূত হইয়া প্রথমতঃ একটি বড় ওয়েটিং-রূমে জমায়েৎ হন। তথায় কল্পবাসের পর তাঁদের শেষ বিচার হয়। রায় বাহির হইলে কতকগুলি ভূত অনন্ত স্বর্গে এবং অবশিষ্ট সকলে অনন্ত নরকে আশ্রয়লাভ করেন। সাহেবরা জীবদ্দশায় যে স্বাধীনতা ভোগ করেন, ভূতাবস্থায় তাহা অনেকটা কমিয়া যায়। বিলাতী প্রেতাত্মা বিনা পাশে ওয়েটিং-রূম ছাড়িতে পারে না। যাঁরা seance দেখিয়াছেন, তাঁরা জানেন বিলাতী ভূত নামানো কি রকম কঠিন কাজ। হিন্দুর জন্য অন্যরূপ বন্দোবস্ত, কারণ আমরা পুনর্জন্ম, স্বর্গ, নরক, কর্ম্মফল, ত্বয়া হৃষিকেশ, নির্ব্বাণ, মুক্তি, সবই মানি। হিন্দু মরিলে প্রথমে ভূত হয় এবং যত্র তত্র স্বাধীনভাবে বাস করিতে পারে,——আবশ্যক-মত ইহলোকের সঙ্গে কারবারও করিতে পারে। এটা একটা মস্ত সুবিধা কিন্তু এই অবস্থা বেশী দিন স্থায়ী নয়। কেহ কেহ দু’চার দিন পরেই পুনর্জন্ম লাভ করে, কেউ বা দশ-বিশ বৎসর পরে, কেউ বা দু’তিন শতাব্দী পরে। ভূতদিগকে মাঝে মাঝে চেঞ্জের জন্য স্বর্গে ও নরকে পাঠানো হয়। এটা তাদের স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল, কারণ স্বর্গে খুব ফূর্তিতে থাকা যায় এবং নরকে গেলে পাপ ক্ষয় হইয়া সুক্ষ্ম শরীর বেশ হাল্কা ঝরঝরে হয়, তা ছাড়া সেখানে অনেক ভাল ভাল লোকের সঙ্গে দেখা হইবার সুবিধা আছে। কিন্তু যাঁদের ভাগ্যক্রমে ৺কাশীলাভ হয়, অথবা নেপালে পশুপতিনাথ বা রথের উপর বামন-দর্শন ঘটে,—কিংবা যাঁরা স্বকৃত পাপের বোঝা হৃষিকেশের উপর চাপাইয়া নিশ্চিন্ত হইতে পারেন,—তাঁদের পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে— একেবারেই মুক্তি।
দুতিন মাস কাটিয়া গিয়াছে। শিবু সেই বেলগাছেই থাকে। প্রথম প্রথম দিনকতক নূতন স্থানে নূতন অবস্থায় বেশ আনন্দে কাটিয়াছিল, কিন্তু এখন শিবুর বড়ই ফাঁকা ফাঁকা ঠেকে। মেজাজটা যতই বদ্ হোক, নৃত্যর একটা আন্তরিক টান ছিল, শিবু এখন তাহা মর্ম্মে মর্ম্মে অনুভব করিতেছে। একবার ভাবিল—দূর হোক্, না হয় পেনেটীতেই আড্ডা গাড়ি। তারপর মনে হইল— লোকে বলিবে বেটা ভূত হইয়াও স্ত্রীর আঁচল ছাড়িতে পারে নাই। নাঃ, এইখানেই একটা পছন্দমত উপদেবীর যোগাড় দেখিতে হইল।
ফাল্গুন মাসের শেষবেলা। গঙ্গার বাঁকের উপর দিয়া দক্ষিণা হাওয়া ঝির ঝির করিয়া বহিতেছে। সূর্য্যদেব জলে হাবুডুবু খাইয়া এইমাত্র তলাইয়া গিয়াছেন। ঘেঁটুফুলের গন্ধে ভুশণ্ডীর মাঠ ভরিয়া গিয়াছে। শিবুর বেলগাছে নূতন পাতা গজাইয়াছে। দূরে আকন্দ-ঝোপে গোটাকতক পাকা ফল ফট্ করিয়া ফাটিয়া গেল, একরাশ তুলার আঁশ হাওয়ায় উড়িয়া মাকশার কঙ্কালের মত ঝিক্মিক্ করিয়া শিবুর গায়ে পড়িতে লাগিল। একটা হলদে রঙের প্রজাপতি শিবুর সূক্ষ্ম শরীর ভেদ করিয়া উড়িয়া গেল। একটা কালো গুবরে পোকা ভরর করিয়া শিবুকে প্রদক্ষিণ করিতে লাগিল। অদূরে বাবলা গাছে এক জোড়া দাঁড়কাক বসিয়া আছে। কাক গলায় সুড়সুড়ি দিতেছে, কাকিনী চোখ মুদিয়া গদগদ স্বরে মাঝে মাঝে ক-অ-অ করিতেছে। একটা কট্কটে ব্যাং সদ্য ঘুম হইতে উঠিয়া গুটিগুটি পা ফেলিয়া বেলগাছের কোটর হইতে বাহিরে আসিল, এবং শিবুর দিকে ড্যাব্-ডেবে চোখ মেলিয়া টিট্কারী দিয়া উঠিল একদল ঝিঁ ঝিঁ পোকা সন্ধ্যার আসরের জন্য যন্ত্রে সুর বাঁধিতেছিল, এতক্ষণে সঙ্গৎ ঠিক হওয়ায় সমস্বরে রি রি-রি-রি করিয়া উঠিল।
‘লজ্জায় জিভ কাটিয়াছিল।’
শিবুর যদিও রক্ত-মাংসের শরীর নাই, কিন্তু মরিলেও অভাব যাইবে কোথা। শিবুর মনটা খাঁ খাঁ করিতে লাগিল। যেখানে হৃৎপিণ্ড ছিল সেখানটা ভরাট হইয়া ধড়াক্ ধড়াক্ করিতে লাগিল। মনে পড়িল,—ভূশণ্ডীর মাঠের প্রান্তস্থিত পিটুলী বিলের ধারে শ্যাওড়া গাছে একটি পেত্নী বাস করে। শিবু তাকে অনেকবার সন্ধ্যাবেলা পলো হাতে মাছ ধরিতে দেখিয়াছে। তার আপাদমস্তক ঘেরাটোপ দিয়া ঢাকা, একবার কেবল সে ঢাকা খুলিয়া শিবুর দিকে চাহিয়া লজ্জায় জিভ কাটিয়াছিল। পেত্নীর বয়স হইয়াছে, কারণ তার গাল একটু তোবড়াইয়াছে, এবং সাম্নের দুটা দাঁত নাই। তার সঙ্গে ঠাট্টা চলিতে পারে, কিন্তু প্রেম হওয়া অসম্ভব।
একটি শাঁকচুন্নী কয়েকবার শিবুর নজরে পড়িয়াছে। সে একটা গামছা পরিয়া আর একটা গামছা মাথায় দিয়া এলোচুলে বকের মত লম্বা পা ফেলিয়া হাতের হাঁড়ি হইতে গোবর-গোলা জল ছড়াইতে ছড়াইতে চলিয়া যায়। তার বয়স তেমন বেশী বোধ হয় না। শিবু একবার রসিকতার চেষ্টা করিয়াছিল, কিন্তু শাঁকচুন্নী ক্রুদ্ধ বিড়ালের মত ফ্যাঁচ্ করিয়া উঠে, অগত্যা শিবুকে ভয়ে চম্পট দিতে হয়।
শিবুর মন সবচেয়ে হরণ করিয়াছে এক ডাকিনী। ভুশণ্ডীর মাঠের পূর্ববদিকে গঙ্গার ধারে ক্ষীরি-বাম্নীর পরিত্যক্ত ভিটায় যে জীর্ণ ঘরখানি আছে, তাহাতেই সে অল্পদিন হইল আশ্রয় লইয়াছে। শিবু তাকে মাত্র
‘গোবর-গোলা জল ছড়াইয়া চলিয়া যায়’
একবার দেখিয়াছে এবং দেখিয়াই মজিয়াছে। ডাকিনী তখন একটা খেজুরের ডাল দিয়া র’ক ঝাঁট দিতেছিল। পরনে সাদা থান। শিবুকে দেখিয়া নিমেষের তরে ঘোমটা সরাইয়া ফিক্ করিয়া হাসিয়াই সে হাওয়ার সঙ্গে মিলাইয়া যায়। কি দাঁত! কি মুখ! কি রঙ! নৃত্যকালীর রঙ ছিল পানতুয়ার মত। কিন্তু এই ডাকিনীর রঙ যেন পানতুয়ার শাঁস।
শিবু একটি সুদীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়িয়া গান ধরিল
আহা, শ্রীরাধিকে চন্দ্রাবলী
কারে রেখে কারে ফেলি।
সহসা প্রান্তর প্রকম্পিত করিয়া নিকটবর্ত্তী তালগাছের মাথা হইতে তীব্রকণ্ঠে শব্দ উঠিল—
চা রা রা রা রা রা
আরে ভজুয়াকে বহিনিয়া ভগ্লুকে বিটিয়া
কেকরাসে সাদিয়া হো কেকরাসে হো-ও-ও-ও—
শিবু চমকাইয়া উঠিয়া ডাকিল—“তালগাছে কে রে?”
উত্তর আসিল—“কারিয়া পিরেত বা।”
শিবু। কেলে ভূত? নেমে এস বাবা।
মাথায় পাগ্ড়ি, কালো লিক্লিকে চেহারা, কাঁকলাসের মত একটি জীবাত্মা সড়াক্ করিয়া তালগাছের মাথা হইতে নামিয়া ভূমিষ্ঠ হইয়া প্রণাম করিয়া বলিল —“গোড় লাগি বরম্দেওজি।”
শিবু। জিতা রহো বেটা। একটু তামাক খাওয়াতে পারিস?
কারিয়া পিরেত। ছিলম্ বা?
শিবু। তামাকই নেই তা ছিলিম। যোগাড় কর না।
‘খেজুরের ডাল দিয়া র’ক ঝাঁট দিতেছিল’
প্রেত ঊর্দ্ধে উঠিল এবং অল্পক্ষণ-মধ্যে বৈদ্যবাটীর বাজার হইতে তামাক, টিকা, কলিকা আনিয়া ‘আগ্ শুল্গাইয়া’ শিবুর হাতে দিল। শিবু একটা কচুর ডাঁটার উপর কলিকা বসাইয়া টান দিতে দিতে বলিল —“তারপর, এলি কবে? তোর হাল-চাল সব বল্।”
কারিয়া পিরেত যে ইতিহাস বলিল তার সারমর্ম্ম এই।—তার বাড়ী ছাপরা জিলা। দেশে এককালে তার জরু, গরু, জমি, জেরাৎ সবই ছিল। তার স্ত্রী মুংরী অত্যন্ত মুখরা ও বদ্মেজাজী, বনিবনাও কখনো হইত না। একদিন প্রতিবেশী ভজুয়ার ভগ্নীকে উপলক্ষ করিয়া স্বামি-স্ত্রীতে বিষম ঝগড়া হয়, এবং স্ত্রীর পিঠে এক ঘা লাঠি কশাইয়া স্বামী দেশ ছাড়িয়া কলিকাতায় চলিয়া আসে। সে আজ ত্রিশ বৎসরের কথা। কিছুদিন পরে সংবাদ আসে মুংরী বসন্ত রোগে মরিয়াছে। স্বামী আর দেশে ফিরিল না, বিবাহও করিল না। নানা স্থানে চাকরী করিয়া অবশেষে চাঁপদানীর মিলে কুলীর কাজে ভর্ত্তি হয় এবং কয়েক বৎসরের মধ্যে সর্দ্দারের পদ পায়। কিছুদিন পূর্বের একটি লোহার কড়ি ‘হাফিজ’ অর্থাৎ কপিকলে উত্তোলন করিবার সময় তার মাথায় চোট লাগে। তারপর একমাস হাঁসপাতালে শয্যাশায়ী হইয়া থাকে। সম্প্রতি পঞ্চত্ব প্রাপ্ত হইয়া প্রেতরূপে এই তালগাছে বিরাজ করিতেছে।
শিবু একটা লম্বা টান মারিয়া কলিকাটি কারিয়া
‘সড়াক করিয়া নামিরা আসিল’
পিরেতকে দিবার উপক্রম করিতেছিল, এমন সময় মাটির ভিতর হইতে ভাঙা কাঁসরের মত আওয়াজ আসিল—“ভায়া, কল্কেটায় কিছু আছে না কি?”
বেলগাছের কাছে যে ইঁটের পাঁজা ছিল তাহা হইতে খানকতক ইঁট খসিয়া গেল এবং ফাঁকের ভিতর হইতে হামাগুড়ি দিয়া একটি মূর্ত্তি বাহির হুইল। স্থুল খর্ব্ব দেহ, থেলো হুঁকার খোলের উপর একজোড়া পাকা গোঁফ গজাইলে যে-রকম হয় সেই প্রকার মুখ, মাথায় টাক, গলায় রুদ্রাক্ষের মালা, গায়ে ঘুণ্টি-দেওয়া মের্জাই, পরনে গরদের ধুতি, পায়ে তালতলার চটি আগন্তুক শিবুর হাত হইতে কলিকাটি লইয়া বলিলেন—
“ব্রাহ্মণ? দণ্ডবৎ হই। কিছু সম্পত্তি ছিল, এইখানে পৌঁতা আছে। তাই যক্ষি হয়ে আগ্লাচ্চি। বেশী কিছু নয়—এই দু-পাঁচশো। সব বন্ধকী তমসুক দাদা—ইষ্টাম্বর কাগজে লেখা,—নগদ সিক্কা একটিও পাবে না। খবরদার, ওদিকে নজর দিও না—হাতে হাতকড়ি পড়বে। থুঃ থুঃ”
শিবুর মেঘদূত একটু আধটু জানা ছিল। সসম্ভ্রমে জিজ্ঞাসা করিল—“যক্ষ মশায়, আপনিং কি কালিদাসের—”
যক্ষ। ভায়রাভাই। ‘কালিদাস আমার মাস্তুতো
‘সব বন্ধকী তমসুক দাদা’
শালীকে বে করে। ছোকরা হিজ্লিতে নিম্কির গোমস্তা ছিল, অনেক দিন মারা গেছে। তুমি তার নাম জান্লে কিসে হ্যা?
শিবু। আপনার এখানে কতদিন আগমন হয়েচে?
যক্ষ। আমার আগমন? হ্যা, হ্যা। আমি বলে গিয়ে সাড়ে তিন কুড়ি বচ্ছর এখানে আছি। কত এল দেখলুম, কত গেল তাও দেখলুম। আরে তুমি ত সেদিন এলে, কাটপিঁপড়ে তাড়িয়ে তিনবার হোঁচট্ খেয়ে গাছে উঠলে। সব দেখেচি আমি। তোমার গানের সক্ আছে দেখচি,—বেশ বেশ। ক্যালোয়াতি শিখতে যদি চাও ত আমার সারেদ হও দাদা। এখন আওয়াজটা যদিচ একটু খোনা হয়ে গেছে, তবু মরা হাতি লাখ টাকা।
শিবু। মশায়ের ভূতপূর্ব্ব পরিচয়টা জিজ্ঞাসা করতে পারি কি?
যক্ষ। বিলক্ষণ। আমার নাম ৺নদের চাঁদ মল্লিক, পদরী বসু, জাতি কায়স্থ, নিবাস রিশ্ড়ে, হাল সাকিন এই পাঁজার মধ্যে। সাবেক পেশা দারোগাগিরি, এলাকা রিশ্ড়ে ইস্তক ভদ্রেশ্বর। জর্জ্জটি সাহেবের নাম শুনেচ? হুগলীর কালেক্টার,—ভারি ভালবাসত আমাকে। মুল্লুকের শাসনটা তামাম আমার হাতেই ছেড়ে দিয়েছিল। নাদু মল্লিকের দাপটে লোকে ত্রাহি ত্রাহি ডাক ছাড়ত।
শিবু। মহাশয়ের পরিবারাদি কি?
যক্ষ দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন—“সব সুখ কি কপালে হয় রে দাদা। ঘর-সংসার সবই ত ছিল, কিন্তু গিন্নিটি ছিলেন খাণ্ডার। বলব কি মশায়, আমি হলুম গিয়ে নাদু মল্লিক,—কোম্পানির দেওয়ানী, ফৌজদারী, নিজামৎ আদালত যার মুঠোর মধ্যে,— আমারই পিঠে দিলে কিনা এক ঘা চেলা-কাঠ কশিয়ে। তারপরেই পালালো বাপের বাড়ী। তিনশ চব্বিশ ধারায় ফেল্তুম, কিন্তু কেলেঙ্কারীর ভয়ে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা আর ছাড়লুম না। কিন্তু যাবে কোথা? গুরু আছেন, ধর্ম্ম আছেন। সাতচল্লিশ সনের মড়কে মাগী ফৌত হল। সংসার-ধর্ম্মে আর মন বস্ল না। জর্জ্জটি সাহেব বিলেত গেলে আমিও পেন্সন্ নিয়ে এক সখের যাত্রা খুল্লুম। তারপর পরমাই ফুরুলে এই হেথা আড্ডা গেড়েচি। ছেলেপুলে হয়নি তাতে দুঃখু নেই দাদা। আমি করব রোজগার, আর কোন্ আবাগের বেটা ভূত মানুষ হয়ে আমার ঘরে জন্ম নিয়ে সম্পত্তির ওয়ারিশ হবে—সেটা আমার সইত না। এখন তোফা আছি, নিজের বিষয় নিজে আগ্লাই, গঙ্গার হাওয়া খাই আর বব বম্ করি। যাক্, আমার কথা ত সব শুনলে, এখন তোমার কেচ্ছা বল।”
শিবু নিজের ইতিহাস সমস্ত বিবৃত করিল, কারিয়া পিরেতের পরিচয়ও দিল। যক্ষ বলিলেন—“সব স্যাঙাতের একই হাল দেখ্চি। পুরানো কথা ভেবে মন খারাপ করে ফল নেই, এখন একটু গাওনা-বাজনা করি এস। পাখোয়াজ নেই,— তেমন জুৎ হবে না। আচ্ছা, পেট চাপ্ড়েই ঠেকা দিই। উহুঁ—ঢন্ ঢন্ কচ্চে। বাবা ছাতুখোর, একটু এঁটেল-মাটি চট্কে এই মধ্যিখানে থাব্ড়ে দে ত। ঠিক হয়েচে। চৌতাল বোঝো? ছ মাত্রা, চার তাল, দুই ফাঁক্। বোল্ শোনো—
ধা ধা ধিন্ তা কৎ তা গে, গিন্নি ঘা দেন কর্ত্তা কে।
ধরে তাড়া কোরে খিট্খিটে কথা কয়
ধূর্ত্তা গিন্নি কর্ত্তা গাধা রে।
ঘাড়ে ধরে ঘন ঘন ঘা কত ধুম্ ধুম্ দিতে থাকে
টুঁটি টিপে ঝুঁটি ধরে উল্টে পাল্টে ফ্যালে
গিন্নি ঘুঘুটির ক্ষমতা কম নয়।
ধাক্কা ধুক্কি দিতে ত্রুটি ধনি করে না
নগণ্য নির্ধন কর্ত্তা গাধা—
‘ধা’ এর ওপর সোম। ধিন্ তা তেরে কেটে গদি ঘেনে ধা। এই ‘ধা’ ফস্কালেই সব মাটি। গলাটা ধরে আস্চে। বাবা খোট্টাভূত, আর এক ছিলিম সাজ্ বেটা।”
উদ্যোগী পুরুষের লক্ষ্মীলাভ অনিবার্য্য। অনেক কাকুতি-মিনতির পরে ডাকিনী শিবুর ঘর করিতে রাজি হইয়াছে। কিন্তু সে এখনো কথা বলে নাই, ঘোমটাও খোলে নাই, তবে ইসারায় সম্মতি জানাইয়াছে। আজ ভৌতিক পদ্ধতিতে শিবুর বিবাহ। সূর্য্যাস্ত হইবামাত্র শিবু সর্ববাঙ্গে গঙ্গা-মৃত্তিকা মাখিয়া স্নান করিল, গাবের আঠা দিয়া পৈতা মাজিল, ফনি-মনসার বুরুষ দিয়া চুল আঁচড়াইল, টিকিতে একটি পাকা তেলাকুচা বাঁধিল। ঝোপে ঝোপে বন-জঙ্গলে ঘুরিয়া ঘুরিয়া এক রাশ ঘেঁটুফুল, বৈঁচি, কয়েকটি পাকা নোনা ও বেল সংগ্রহ করিল। তারপর সন্ধ্যায় শেয়ালের ঐকতান আরম্ভ হইতেই সে ক্ষীরি-বাম্নীর ভিটায় যাত্রা করিল।
সেদিন শুক্লপক্ষের চতুর্দ্দশী। ঘরের দাওয়ায় কচুপাতার আসনে ডাকিনীর সম্মুখে বসিয়া শিবু মন্ত্রপাঠের উদ্যোগ করিয়া উৎসুক চিত্তে বলিল—“এইবার ঘোম্টাটা খুল্তে হচ্চে।”
ডাকিনী ঘোমটা সরাইল। শিবু চমকিত হইয়া সভয়ে বলিল—অ্যাঁ! তুমি নেত্য?”
নৃত্যকালী বলিল—“হ্যাঁরে মিন্সে। মনে করেছিলে মরে আমার কবল থেকে বাঁচ্বে। পেত্নী শাঁকচুন্নীর পিছু পিছু ঘুরতে বড় মজা, না?”
শিবু। এলে কি করে? ওলাউঠোয় নাকি?
নৃত্যকালী। ওলাউঠো শত্তুরের হোক্। কেন, ঘরে কি কেরাসিন ছিল না?
শিবু। তাই চেহারাটা ফর্সাপানা দেখাচ্চে। পোড় খেলে সোণার জলুস বাড়ে। ধাতটাও একটু নরম হয়েছে নাকি?
শুভকর্ম্মে বাধা পড়িল। বাহিরে ও কিসের গোলযোগ? যেন একপাল শকুনি গৃধিনী ঝুটোপটি কাড়াকাড়ি ছেঁড়াছিঁড়ি করিতেছে। সহসা উল্কার মত ছুটিয়া আসিয়া পেত্নী ও শাকচুন্নী উঠানের বেড়ার আগড় ঠেলিয়া ভীষণ চেঁচামেচি আরম্ভ করিল। (ছাপাখানার দেবতাগণের সুবিধার জন্য চন্দ্রবিন্দু বাদ দিলাম, পাঠকগণ ইচ্ছামত বসাইয়া লইবেন)
পেত্নী। আমার সোয়ামী তোকে দেব কেন?
শাকচুন্নী। অ মর বুড়ি, ও যে তোর নাতির বয়সি।
পেত্নী। আহা, কি আমার কনে-বউ গা!
শাঁকচুন্নী। দূর্ মেছোপেত্নী, আমি যে ওর দুজন্ম আগেকার বউ।
পেত্নী। দূর্ গোবরচুন্নি, আমি যে ওর তিন জন্ম আগেকার বউ।
শাকচুন্নী। মর্ চেঁচিয়ে, ওদিকে ডাইনী মাগী মিন্সেকে নিয়ে উধাও হোক্।
তখন পেত্নী বিড় বিড় করিয়া মন্ত্র পড়িয়া আগড় বন্ধ করিয়া বলিল——“আগে তোর ঘাড় মট্কাবো তারপর ডাইনী বেটীকে খাবো।”
কাম্ড়া কাম্ড়ি চুলোচুলি আরম্ভ হইল। একা নৃত্যকালীতেই রক্ষা নাই, তার উপর পূর্ববর্তন দুই জন্মের আরো দুই পত্নী হাজির। শিবু হাতে পৈতা জড়াইয়া ইষ্টমন্ত্র জপিতে লাগিল। নৃত্যকালী রাগে ফুলিতে লাগিল।
এমন সময় নেপথ্যে যক্ষের গলা শোনা গেল—
ধনি, গুন্চ কিবা আন্মনে
ভাব্চ বুঝি শ্যামের বাঁশী ডাক্চে তোমায় বাঁশবনে।
ওটা যে খ্যাঁক্শেয়ালী, দিওনা কুলে কালি
রাত-বিরেতে শ্যাল্কুকুরের ছুঁচোপ্যাঁচার ডাক্ শুনে।
যক্ষ বেড়ার কাছে আসিয়া বলিলেন—“ভায়া এখানে। হচ্চে কি? অত গোল কিসের?”
কারিয়া পিরেত হাঁকিল—“এ বরম্ পিচাস, আরে দর্বাজা ত খোল।” শিবুর সাড়া নাই।
প্রচণ্ড ধাক্কা পড়িল, কিন্তু মন্ত্রবদ্ধ আগড় খুলিল না, বেড়াও ভাঙিল না। তখন কারিয়া পিরেত তারস্বরে উৎপাটন-মন্ত্র পড়িল—
মারে জ্ জুয়ান্—হেঁইয়া
আউর ভি থোড়া—হেঁইয়া
পর্ব্বত তোড়ি—হেঁইয়া
চলে ইঞ্জন—হেঁইয়া
ফটে বয়লট —হেঁইয়া
খবরদার—হা-ফিজ্।
মড় মড় করিয়া ঘরের চাল, দেওয়াল, বেড়া, আগড় সমস্ত আকাশে উঠিয়া দূরে নিক্ষিপ্ত হইল।
ডাকিনী, অর্থাৎ নৃত্যকালীকে দেখিয়া যক্ষ বলিলেন —“একি, গিন্নি এখানে! বেম্মদত্যিটার সঙ্গে! ছি ছি —লজ্জার মাথা খেয়েচ?” ডাকিনী ঘোমটা টানিয়া কাঠ হইয়া বসিয়া রহিল।
কারিয়া পিরেত বলিল—“আরে মুংরি, তোহর্ সরম নেহি বা?”
তারপর যে ব্যাপার আরম্ভ হইল, তাহা মনে করিলেও কলমের কালি শুখাইয়া যায়। শিবুর তিন জন্মের তিন. স্ত্রী এবং নৃত্যকালীর তিন জন্মের তিন স্বামী,—এই ডবল ত্র্যহস্পর্শযোগে ভুশণ্ডীর মাঠে যুগপৎ জলস্তম্ভ, দাবানল ও ভূমিকম্প সুরু হইল। ভূত, প্রেত, দৈত্য, পিশাচ, তাল, বেতাল প্রভৃতি দেশী উপদেবতা যে যেখানে ছিল, তামাশা দেখিতে আসিল। স্পুক, পিক্সি, নোম, গব্লিন্ প্রভৃতি গোঁফ-কামানো বিলাতী ভূত বাঁশী বাজাইয়া নাচিতে লাগিল। জিন্, জান্, আফ্রিদ, মারীদ প্রভৃতি লম্বা দাড়িওয়ালা কাবুলী ভূত দাপাদাপি আরম্ভ করিল। চিং, চ্যাং, ফ্যাচাং ইত্যাদি মাকুন্দে চীনে-ভূত ডিগবাজী খাইতে লাগিল।
রাম রাম রাম। জয় হাড়িঝি চণ্ডি, আজ্ঞা কর মা! কে এই উৎকট দাম্পত্য সমস্যার সমাধান করিবে? আমার কম্ম নয়। ভূত জাতি অতি নাছোড়বান্দা, ন্যায্যগণ্ডা ছাড়িবে না। পুরুষের পুরুষত্ব, নারীর নারীত্ব, ভূতের ভূতত্ত্ব, পেত্নীর পেত্নীত্ব,—এ সব তারা বিলক্ষণ, বোঝে। অতএব সনির্ব্বন্ধ অনুরোধ করিতেছি— শ্রযুক্ত শরৎ চাটুয্যে, চারু বাঁড়ু ষ্যে, নরেশ সেন এবং যতীন সিংহ মহাশয়গণ যুক্তি করিয়া একটা বিলি-ব্যবস্থা করিয়া দিন—যাতে এই ভূতের সংসারটি ছারেখারে না যায় এবং কোনোরকম নীতি-বিগর্হিত বিদ্কুটে ব্যাপার না ঘটে। নিতান্ত যদি না পারেন, তবে চাঁদা তুলিয়া গয়ায় পিণ্ড দিবার চেষ্টা দেখুন, যাতে বেচারারা অতঃপর শান্তিতে থাকিতে পারে।
মহাবিদ্যা
বক্তৃতা-গৃহ। উচ্চ বেদীর উপর আচার্য্যের আসন। বেদীর নীচে ছাত্রদের জন্য শ্রেণীবদ্ধ চেয়ার ও বেঞ্চ।
প্রথম শ্রেণীতে আছেন—
হোমরাও সিং
চোমরাও আলি
খুদীন্দ্রনারায়ণ
মিষ্টার গ্র্যাব
মিষ্টার হাউলার
মহারাজা
নবাব
জমিদার
বণিক
সম্পাদক ইত্যাদি
দ্বিতীয় শ্রেণীতে—
মিষ্টার গুহা
নিতাইবাবু
প্রফেসার গুঁই
রূপচাঁদ
লুটবেহারী
গাঁট্টালাল
তেওয়ারী
রাজনীতিজ্ঞ
সম্পাদক
অধ্যাপক
বণিক
ইনসল্ভেণ্ট
গেঁড়াতলার সর্দার
জমাদার ইত্যাদি
তৃতীয় শ্রেণীতে—
মিষ্টার গুপ্টা
সরেশচন্দ্র
নিরেশচন্দ্র
দীনেশচন্দ্র
বিশেষজ্ঞ
নূতন গ্রাজুয়েট
কেরাণী ইত্যাদি
চতুর্থ শ্রেণীতে—
পাঁচু মিয়া
গবেশ্বর
কাঙালীচরণ
আরো অনেক লোক।
মজুর
মাষ্টার
নিষ্কর্ম্মা
প্রথম শ্রেণীর কথা
মিষ্টার গ্র্যাব। হ্যাল্লো মহারাজা, আপনিও দেখচি ক্লাসে জয়েন করেচেন।
হোমরাও সিং। হ্যাঁ, ব্যাপারটা জানবার জন্য বড়ই কৌতূহল হয়েচে। আচ্ছা, এই জগদ্গুরু লোকটি কে?
গ্র্যাব। কিছুই জানি না। কেউ বলে, এঁর নাম ভ্যাণ্ডারল্যুট্, আমেরিকা থেকে এসেছেন; আবার কেউ বলে, ইনিই প্রফেসার ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন্। ফাদার ও’ব্রায়েন্ সেদিন বল্ছিলেন, লোকটি devil himself—সয়তান স্বয়ং। অথচ রেভারেণ্ড ফিগস্ বলেন, ইনি পৃথিবীর বিজ্ঞতম ব্যক্তি, একজন superman. একটা কমপ্লিমেণ্টারি টিকিট পেয়েছি, তাই মজা দেখতে এলুম।
মিষ্টার হাউলার। আমিও একখান পেয়েচি।
হোমরাও। বটে? আমরা ত টাকা দিয়ে কিনেচি, তাও অতি কষ্টে। হয় ত জগদ্গুরু জানেন যে আপনাদের শেখবার কিছু নেই, তাই কমপ্লিমেণ্টারি টিকিট দিয়েছেন।
খুদীন্দ্রনারায়ণ। শুনেচি লোকটি না কি বাঙালি, বিলাত থেকে ভোল ফিরিয়ে এসেচে। আচ্ছা,বলশেভিক নয় ত?
চোমরাও আলি। না না, তা হলে গভমেণ্ট এ লেক্চার বন্ধ করে দিতেন। আমার মনে হয়, জগদ্গুরু তুর্কি থেকে এসেচেন।
হাউলার। দেখাই যাবে লোকটি কে।
দ্বিতীয় শ্রেণীর কথা
নিতাইবাবু। জগদ্গুরু কোথা উঠেচেন জানেন কি? একবার ইণ্টারভিউ করতে যাব।
মিষ্টার গুহা। শুনেচি, বেঙ্গল ক্লাবে আছেন।
রূপচাঁদ। না—না, আমি জানি, পগেয়াপটিতে বাসা নিয়েচেন।
লুটবেহারী। আচ্ছা, উনি যে মহাবিদ্যার ক্লাস খুল্চেন, সেটা কি? ছেলেবেলায় ত পড়েছিলুম—কালী, তারা, মহাবিদ্যা—
প্রফেসার গুঁই। আরে, সে বিদ্যা নয়। মহাবিদ্যা—কি না সকল বিদ্যার সেরা বিদ্যা, যা আয়ত্ত হলে মানুষের অসীম ক্ষমতা হয়, সকলের উপর প্রভুত্ব লাভ হয়।
রূপচাঁদ। এখানে ত দেখচি হাজারো লোক লেক্চার শুন্তে এসেচে। সকলেরই যদি প্রভুত্ব লাভ হয়, তবে ফরমাস খাটবে কে?
গাঁট্টালাল। এইজন্যে ভাবচেন? আপনি হুকুম দিন, আমি আর তেওয়ারী দুই দোস্ত্ মিলে সবাইকে হাঁকিয়ে দিচ্চি। কিছু পান খেতে দেবেন—
তেওয়ারী। না—না, এখন গগুগোল বাধিও না,— সাহেবরা রয়েছেন।
তৃতীয় শ্রেণীর কথা
সরেশ। আপনিও বুঝি এই বৎসর পাশ করেচেন? কোন্ লাইনে যাবেন, ঠিক করলেন?
নিরেশ। তা কিছুই ঠিক করিনি। সেজন্যই ত মহাবিদ্যার ক্লাসে ভর্তি হয়েচি,—যদি একটা রাস্তা পাওয়া যায়। আচ্ছা, এই কোর্স অফ লেকচার্স আয়োজন করলে কে?
সরেশ। কি জানি মশায়। কেউ বলে, বিলাতের কোন দয়ালু ক্রোরপতি জগদ্গুরুকে পাঠিয়েচেন। আবার শুনতে পাই, ইউনিভার্সিটিই না কি লুকিয়ে এই লেক্চারের খরচ জোগাচ্চে।
মিষ্টার গুপ্টা। ইউনিভার্সিটির টাকা কোথা? যেই টাকা দিক, মিথ্যে অপব্যয় হচ্ছে। এ রকম লেক্চারে দেশের উন্নতি হবে না। ক্যাপিট্যাল চাই, ব্যবসা চাই।
দীনেশ। তবে আপনি এখানে এলেন কেন? এই সব রাজা-মহারাজারাই বা কিজন্য ক্লাস অ্যাটেণ্ড করচেন? নিশ্চয়ই একটা লাভের প্রত্যাশা আছে। এই দেখুন না, আমি সামান্য মাইনে পাই তবু ধার করে লেক্চারের ফি জমা দিয়েচি। যদি কিছু অবস্থার উন্নতি করতে পারি।
সরেশ। জগদ্গুরু আসবেন কখন? ঘণ্টা যে কাবার হয়ে এল।
চতুর্থ শ্রেণীর কথা
গবেশ্বর। কিহে পাঁচুমিয়া, এখানে কি মনে করে?”
পাঁচুমিয়া। বাবুজি, এক টাকা রোজে আর দিন চলে না। তাই থারিয়া-লোটা বেচে একটা টিকিট কিনেচি, যদি একটা হদিস পাই। তা আপনারা এত পিছে বসেচেন কেন হুজুর? সাম্নে গিয়ে বাবুদের সাথ বসুন না।
কাঙালীচরণ ভয় করে।
গবেশ্বর। আমরা বেশ নিরিবিলিতে আছি। পাঁচু, তুমি যদি বক্তৃতার কোনো যায়গা বুঝতে না পার, ত আমাকে জিজ্ঞেসা কোরো।
ঘণ্টাধ্বনি। জগদ্গুরুর প্রবেশ। মাথায় সোনার মুকুট, মুখে মুখোস, গায়ে গেরুয়া আলখাল্লা। তিনি আসিয়া বহির্ব্বাস খুলিয়া ফেলিলেন। মাথা কামানো, গায়ে তেল, পরনে লেংটি, ডানহাতে বরাভয়, বাঁ-হাতে সিঁদকাঠি। পট্-পট হাততালি।
হোমরাও। লোকটির চেহারা কি বীভৎস! চেনেন নাকি মিষ্টার গ্র্যাব?
গ্র্যাব। চেনা চেনা বোধ হচ্চে।
জগদ্গুরু। হে ছাত্রগণ, তোমাদের আশীর্ববাদ করচি, জগজ্জয়ী হও। আমি যে বিদ্যা শেখাতে এসেচি, তার জন্য অনেক সাধনা দরকার,—তোমরা একদিনে সব বুঝতে পারবে না। আজ আমি কেবল ভূমিকা মাত্র বল্ব। হে বালকগণ, তোমরা মন দিয়ে শোনো,—যেখানে খট্কা ঠেকবে, আমাকে নির্ভয়ে জিজ্ঞাসা করবে।
প্রফেসার গুঁই। আমি strongly আপত্তি করচি—জগদ্গুরু কেন আমাদের ‘বালকগণ—তোমরা’ বলবেন; ‘আমরা কি স্কুলের ছোকরা? এটা একটা respectable gathering. এই মহারাজা হোমরাও সিং, নবার চোমরাও আলি রয়েছেন। পদমর্যাদা যদি না ধরেন, বয়সের একটা সম্মান ত আছে। আমাদের মধ্যে অনেকের বয়স ষাট পেরিয়েচে।
হাউলার। আপনাদের বাংলা ভাষার দোষ। জগদ্গুরু বিদেশী লোক, ‘আপনি’ ‘তুমি’ গুলিয়ে ফেলেচেন। আর ‘বালক’ কথাটা কিছু নয়, ইংরাজির ওল্ড বয়।
খুদীন্দ্র। বাংলা ভাল না জানেন ত ইংরাজিতে বলুন না।
গুৎই। যাই হোক, আমি আপত্তি করচি।
মিষ্টার গুহা। আমি আপত্তির সমর্থন করচি।
জগদ্গুরু সহাস্যে। বৎস, উতলা হয়ো না। আমি বাংলা ভালই জানি। বাংলা, ইংরাজি, ফরাসী, জাপানী, সবই আমার মাতৃভাষা। আমি প্রবীণ লোক, দশ-বিশ হাজার বৎসর ধরে এই মহাবিদ্যা শেখাচ্চি। তোমরা আমার স্নেহের পাত্র, ‘তুমি’ বল্বার অধিকার আমার আছে।
লুটবেহারী। নিশ্চয় আছে। আপনি আমাদের ‘তুমি-তুই’ যা খুশী বলুন। আমি ওসব গ্রাহ্য করি না। মোদ্দা, শেষকালে ফাঁকি দেবেন না।
জগদ্গুরু। বাপু, আমি কোনো জিনিষ দিই না, শুধু শেখাই মাত্র। যা হোক, তোমাদের দেখে আমি বড়ই প্রীত হয়েচি। এমন সব সোণার চাঁদ ছেলে,—কেবল শিক্ষার অভাবে উন্নতি করতে পারচ না।
মিষ্টার গুপ্টা। ভণিতা ছেড়ে কাজের কথা বলুন।
জগদ্গুরু। হে ছাত্রগণ, মহাবিদ্যা না জানলে মানুষ সুসভ্য, ধনী, মানী হতে পারে না, —তাকে চিরকাল কাঠ কাটতে, আর জল তুল্তে হয়। কিন্তু এটা মনে রেখো যে, সাধারণ বিদ্যা আর মহাবিদ্যা এক জিনিষ নয়। তোমরা পদ্যপাঠে পড়েচ—
এই ধন কেহ নাহি নিতে পারে কেড়ে,
যতই করিবে দান তত যাবে বেড়ে।
এই কথা সাধারণ বিদ্যা সম্বন্ধে খাটে, কিন্তু মহাবিদ্যার বেলা নয়। মহাবিদ্যা কেবল নিতান্ত অন্তরঙ্গ-জনকে অতি সন্তর্পণে শেখাতে হয় বেশী প্রচার হলে সমূহ ক্ষতি। বিদ্বানে-বিদ্বানে সঙ্ঘর্ষ হলে একটু বাক্যব্যয় হয় মাত্র; কিন্তু মহাবিদ্বানুদের ভিতর ঠোকাঠুকি বাধলে সব চুরমার। তার সাক্ষী এই ইউরোপের যুদ্ধ। অতএব মহাবিদ্বান্দের একজোট হয়েই কাজ করতে হবে।
হাউলার। আমি এই লেকচারে আপত্তি করচি। এ দেশের লোকে এখনো মহাবিদ্যা লাভের উপযুক্ত হয় নি। আর আমাদের মহাবিদ্বারা দেশী মহাবিদ্বান্দের সঙ্গে বনিয়ে চলতে পারবে না। মিথ্যা একটা অশান্তির সৃষ্টি হবে।
গ্র্যাব। চুপ কর হাউলার। মহাবিদ্যা শেখা কি এ দেশের লোকের কর্ম্ম? লেক্চার শুনে হুজুকে পড়ে যদি মহাবিদ্যা নিয়ে লোকে একটু ছেলেখেলা আরম্ভ করে, মন্দ কি? একটু অন্যদিকে distraction হওয়া দেশের পক্ষে এখন দরকার হয়েচে।
হাউলার। সাধারণ বিদ্যা যখন এদেশে প্রথম চালানো হয়, তখনো আমরা ব্যাপারটাকে ছেলেখেলা মনে করেছিলুম। এখন দেখচ ত ঠেলা? জোর করে টেক্সট্ বুক থেকে এটা সেটা বাদ দিয়ে কি আর সাম্লানো যাচ্চে?
খুদীন্দ্র। মিষ্টার হাউলার ঠিক বল্চেন। আমারো ভাল ঠেকচে না।
চোমরাও আলি। ভাল-মন্দ গভর্মেণ্ট বিচার করবেন। তবে মহাবিদ্যা যদি শেখাতেই হয়, মুসলমানদের জন্য একটা আলাদ—
হোমরাও। অর্ডার, অর্ডার।
জগদ্গুরু। সাধারণ বিদ্য! মোটামুটি জানা না থাকলে, মহাবিদ্যায় ভাল রকম ব্যুৎপত্তি লাভ হয় না। পাশ্চাত্য দেশে দুই বিদ্যার মণিকাঞ্চন যোগ হয়েচে। দেশেও যে মহাবিদ্বান্ নেই, তা নয়—
গাঁট্টালাল। হুঁ—হুঁ, গুরুজি আমাকে মালুম কচ্চেন।
রূপচাঁদ। দূর, তোকে কে চেনে? আমার দিকে চাইচেন।
জগদ্গুরু। তবে মূর্খ লোকে মহাবিদ্যার প্রয়োগটা আত্মসম্ভ্রম বাঁচিয়ে করতে পারে না। পাশ্চাত্য দেশ এ বিষয়ে অত্যন্ত উন্নত। জরির খাপের ভিতর যেমন তলোয়ার ঢাকা থাকে, মহাবিদ্যাকেও তেম্নি সাধারণ বিদ্যা দিয়ে ঢেকে রাখতে হয়। মহাবিদ্যার মূল সূত্রই হচ্চে—যদি না পড়ে ধরা।
প্রফেসার গুঁই। আপনি কি-সব খারাপ কথা বল্চেন?
অনেকে। শেম্, শেম্।
জগদ্গুরু। বৎস, লজ্জিত হয়ো না। তোমাদেরই এক পণ্ডিত বলেন—একাং লজ্জাং পরিত্যজ্য ত্রিভুবনবিজয়ী ভব। যদি মহাবিদ্যা শিখতে চাও, তবে সত্যের উলঙ্গ মূর্ত্তি দেখে ডরালে চলবে না। যা বলছিলুম শোনো।—এই মহাবিদ্যা যখন মানুষ, প্রথমে শেখে, তখন সে আনাড়ী শিকারীর মত এ বিদ্যার অপপ্রয়োগ করে। যেখানে ফাঁদ পেতে কার্যসিদ্ধি হতে পারে, সেখানে সে কুস্তি লড়ে বাঘ মারতে যায়। দু’চারটে বাঘ হয় ত মরে; কিন্তু শিকারীও শেষে ঘাল হয়। বিদ্যাগুপ্তির অভাবেই এই বিপদ হয়। মানুষ যখন আর একটু চালাক হয়, তখন সে ফাঁদ পাত্তে আরম্ভ করে, নিজে লুকিয়ে থাকে। কিন্তু গোটাকতক বাঘ ফাঁদে পড়লেই, আর সব বাঘ ফাঁদ চিনে ফেলে, আর সে দিকে আসে না, আড়াল থেকে টিট্কারী দেয়, শিকারীরও ব্যবসা বন্ধ হয়। ফাঁদটা এমন হওয়া চাই, যেন কেউ ধরে না ফেলে। মহাবিদ্যাও সেই রকম গোপন রাখা দরকার। তোমাদের মধ্যে অনেকেই হয় ত নিজের অজ্ঞাতসারে, কেবল সংস্কারবশে মহাবিদ্যার প্রয়োগ কর। এতে কখনো উন্নতি হবে না। পরের কাছে প্রকাশ করা নিষেধ; কিন্তু নিজের কাছে লুকোলে মহাবিঘায় মর্চে পড়বে। সজ্ঞানে ফলাফল বুঝে মহাবিদ্য। চালাতে হয়।
গুঁই। বড়ই গোলমেলে কথা।
লুটবেহারী। কিছু না, কিছু না। জগদ্গুরু নূতন কথা আর কি কচেন। প্র্যাক্টিস আমার সবই জানা আছে, তবে থিওরিটা শেখ্বার তেমন সময় পাই নি।
গুহা। এতদিন ছিলে কোথা হে?
লুটবেহারী। শ্বশুরবাড়ী। সেদিন খালাস পেয়েচি।
গুহা। নাঃ, তোমার দ্বারা কিছু হবে না। এই ত ধরা দিয়ে ফেল্লে।
লুটবেহারী। আপনাকে বলতে আর দোষ কি দুজনেই মহাবিদ্বান্—অন্তরঙ্গ মাস্তুতো ভাই।
হোমরাও। অর্ডার, অর্ডার।
গুহা। আচ্ছা গুরুদেব, মহাবিদ্যা শিখ্লে কি আমাদের দেশের সকলেরই উন্নতি হবে?
জগদ্গুরু। দেখ বাপু, পৃথিবীর ধনসম্পদ্ যা দেখচ, তার একটা সীমা আছে, বেশী বাড়ানো যায় না। সকলেই যদি সমান ভাগে পায়, তবে কারোই পেট ভরে না। যে জিনিষ সকলেই অবাধে ভোগ করতে পারে, সেটা আর সম্পত্তি বলে গণ্য হয় না। কাজেই, জগতের ব্যবস্থা এই হয়েছে যে, জনকতক ভোগদখল করবে, বাকী সবাই যুগিয়ে দেবে। চাই গুটিকতক মহাবিদ্বান, আর একগাদা মহামুর্খ।
খুদীন্দ্র। শুন্চেন মহারাজা? এই কথাই ত আমরা বারাবর বলে আসচি। আরিষ্টোক্রাসি না হলে সমাজ টিকবে কিসে? লোকে আবার আমাদের বলে মূর্খ—অযোগ্য। হুঁঃ!
জগদ্গুরু। ভুল বুঝলে, বৎস। তোমার পূর্ব্বপুরুষই মহাবিদ্বান্ ছিলেন, তুমি নও। তুমি কেবল অতীতে অর্জ্জিত বিদ্যার রোমন্থন করচ। তোমার আশে-পাশে মহাবিদ্বানরা ওৎ পেতে বসে আছেন। যদি তাঁদের সঙ্গে পাল্লা দিতে না শেখ, তবে শীঘ্রই গাদায় গিয়ে পড়বে।
প্রফেসার গুঁই। পরিষ্কার করেই বলুন না, মহাবিদ্যাটা কি।
তৃতীয় শ্রেণী হইতে। বলে ফেলুন সার, বলে ফেলুন। ঘণ্টা বাজতে বেশী দেরি নেই।
জগদ্গুরু। তবে বলচি শোনো। মহাবিদ্যায় মানুষের জন্মগত অধিকার; কিন্তু একে ঘষে-মেজে, পালিশ করে, সভ্যসমাজের উপযোগী করে নিতে হয়। ক্রমোন্নতির নিয়মে মহাবিদ্যা এক স্তর হতে উচ্চতর স্তরে পৌঁছেচে। জানিয়ে-শুনিয়ে সোজাসুজি কেড়ে নেওয়ার নাম ডাকাতি—
ছাত্রগণ। সেটা মহাপাপ,—চাই না, চাই না।
জগদ্গুরু। দেশের জন্য যে ডাকাতি, তার নাম বীরত্ব—
ছাত্রগণ। তা আমাদের দিয়ে হবে না, হবে না।
হাউলার। Bally rot.
জগদ্গুরু। নিজে লুকিয়ে থেকে কেড়ে নেওয়ার নাম চুরি—
ছাত্রগণ। ছ্যা—হ্যা, আমরা তাতে নেই, তাতে নেই।
লুটবেহারী। কিহে গাঁট্টালাল, চুপ করে কেন? সায় দাও না।
জগদ্গুরু। ভালমানুষ সেজে কেড়ে নিয়ে, শেষে ধরা পড়ার নাম জুয়াচুরি—
ছাত্রগণ। রাম কহ, তোবা, থুঃ।
গুহা। কি লুটবেহারী চোখ বুঁজে কেন?
জগদ্গুরু। আর যাতে ঢাক পিটিয়ে কেড়ে নেওয়া যায়, অথচ শেষ পর্যন্ত নিজের মান-সম্ভ্রম রজায় থাকে,—লোকে জয়জয়কার করে, সেটা মহাবিদ্যা।
ছাত্রগণ। জগদ্গুরু কি জয়! আমরা তাই চাই, তাই চাই।
গুঁই। কিন্তু ঐ কেড়ে নেওয়া কথাটা একটু আপত্তিজনক।
লুটবেহারী। আপনার মনে পাপ আছে, তাই খট্কা বাধ্চে। কেড়ে নেওয়া পছন্দ না হয়, বলুন ভোগা দেওয়া।
গুঁই। কে হে বেহায়া তুমি? তোমার conscience নেই?
জগদ্গুরু। বৎস, কেড়ে নেওয়াটা রূপকমাত্র। সাদা কথায় এর মানে হচ্চে—সংসারের মঙ্গলের জন্য লোককে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে কিছু আদায় করা।
লুটবেহারী। আমার ত সবে একটি সংসার। কিছু আদায় করতে পারলেই ছছল বছল। নবাব-সাহেবের বরঞ্চ—
হোমরাও। অর্ডার, অর্ডার।
গুঁই। দেখুন জগদ্গুরু, আমার দ্বারা বিবেক-বিরুদ্ধ কাজ হবে না। কিন্তু ঐ যে আপনি বল্লেন—সংসারের মঙ্গলের জন্য, সেটা খুব মনে লেগেচে। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি—
লুটবেহারী। মশায়, ভগবান বেচারাকে নিয়ে যখনতখন টানাটানি করবেন না,—চটে উঠবেন।
নিতাই। আচ্ছা, সকলেই যদি মহাবিদ্যা শিখে ফেলে, তা হলে কি হবে?
জগদ্গুরু। সে ভয় নেই। তোমরা প্রত্যেকে যদি প্রাণপণে চেষ্টা কর, তা’হলেও মাত্র দু’চারজন ওৎরাতে পার।
সরেশ। সার, একবার টেষ্ট করে নিন না।
জগদ্গুরু। এখন পরীক্ষা করলে বিশেষ ভাল ফল পাওয়া যাবে না। অনেক সাধনা দরকার।
নিরেশ। কিছু মার্কও কি পাব না?
জগদ্গুরু। কিছু-কিছু পাবে বৈ কি। কিন্তু তাতে এখন করে-খেতে পারবে না।
নিরেশ। তবে না হয় আমাদের কিছু হোম-এক্সারসাইজ দিন।
জগদ্গুরু। বাড়ীতে ত সুবিধা হবে না বাছা। এখন তোমরা নিতান্ত অপোগণ্ড। দিনকতক দল বেঁধে মহাবিদ্যার চর্চা কর।
খুদীন্দ্র। ঠিক বলেচেন। আসুন মহারাজা, আপনি, আমি আর নবাব-সাহেব মিলে একটা অ্যাসোসিয়েশন্ করা যাক।
প্রফেসার গুঁই। আমাকেও নেবেন,—আমি স্পীচ্ লিখে দোবো।
মিষ্টার গুহা। নিতাইবাবু, আমি ভাই তোমার সঙ্গে আছি।
লুটবেহারী। আমি একাই এক শ। তবে রূপচাঁদবাবু যদি দয়া করে সঙ্গে নেন।
রূপচাঁদ। খবরদার, তুমি তফাৎ থাক।
লুটবেহারী। বটে? তোমার মত ঢের-ঢের বড়লোক দেখেচি।
গাঁট্টালাল। আমরা কারে| তোয়াক্বা রাখি না— কি বল তেওয়ারিজি?
মিষ্টার গুপ্টা। ভাবনা কি সরেশবাবু, নিরেশবাবু। আমি টেক্নিক্যাল ক্লাস খুলচি, ভর্ত্তি হোন। তরল আলতা, গোলাবী বিড়ি, ঘড়ি-মেরামত, ঘুড়ি-মেরামত, দাঁত-বাঁধানো, ধামা বাঁধানো—সব শিখিয়ে দেবো।
দীনেশ। গুরুদেব, চুপি-চুপি একটা নিবেদন করতে পারি কি?
জগদ্গুরু। বল বৎস।
দীনেশ। দেখুন, আমি নিতান্তই মুরুব্বিহীন। মহাবিদ্যার একটা সোজা তুকতাক্— বেশী নয়, যাতে লাখখানেক টাকা আসে,—যদি দয়া করে গরীবকে শিখিয়ে দেন।
জগদ্গুরু। বাপু, তোমার গতিক ভাল বোধ হচ্চে না। মহাবিদ্বান অপরকেই তুকতাক্ শেখায়,—নিজে ওসবে বিশ্বাস করে না।
দীনেশ। টিকিটের টাকাটাই নষ্ট। তার চেয়ে ডার্ব্বির টিকিট কিনলে বরং কিছুদিন আশায় আশায় কাটাতে পারতুম।
গবেশ্বর। আমার কি হবে প্রভু? কেউ যে দলে নিচ্চে না।
জগদ্গুরু। তুমি ছেলে তৈরি কর। তাদের শেখাও —মহাবিদ্যা শেখে যে, গাড়ি ঘোড়া চড়ে সে।
পাঁচুমিয়া। আমার কি করলেন ধর্মাবতার?
জগদ্গুরু। তুমি এখানে এসে ভাল করনি বাপু। তোমার গুরু রুষিয়া থেকে আসবেন, এখন ধৈর্য্য ধরে থাক।
গুহা। দশ হাজার টাকা চাঁদা তুলতে পারিস? ইউনিয়ন্ খুলে এমন হুড়ো লাগাব যে, এখনি তোদের পাঁচগুণ মজুরী হয়ে যাবে।
মিষ্টার গ্র্যাব। সাবধান, আমার চটকলের ত্রিসীমানার মধ্যে যেন এস না।
গুহ। (চুপি-চুপি) তবে আপনার বাড়ী গিয়ে দেখা করব কি?
কাঙালীচরণ। দেবতা, আমি একটা কথা জিজ্ঞাসা করতে পারি?
জগদ্গুরু। তোমার আবার কি চাই? বলে ফেল।
কাঙালী। যদি কখনো মহাবিদ্যা ধরা পড়ে যায়, তখন অবস্থাটা কি রকম হবে?
জগদ্গুরু। (ঈষৎ হাসিয়া বেদী হইতে নামিয়া পড়িলেন)
ঘণ্টা ও কোলাহল
লম্বকর্ণ
রায় বংশলোচন ব্যানার্জি বাহাদুর জমিন্দার এণ্ড অনারারি ম্যাজিষ্ট্রেট, বেলেঘাটা-বেঞ্চ, প্রত্যহ বৈকালে খালের ধারে হাওয়া খাইতে যান। চল্লিশ পার হইয়া ইনি একটু মোটা হইয়া পড়িয়াছেন; সেজন্য ডাক্তারের উপদেশে হাঁটিয়া এক্সারসাইজ করেন, এবং ভাত ও লুচি বর্জ্জন করিয়া দুবেলা কচুরী খাইয়া থাকেন।
কিছুক্ষণ পায়চারি করিয়া বংশলোচনবাবু ক্লান্ত হইয়া খালের ধারে একটা ঢিবির উপর রুমাল বিছাইয়া বসিয়া পড়িলেন। ঘড়ি দেখিলেন—সাড়ে ছ’টা বাজিয়া গিয়াছে। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষ। সিলোনে মনসুন্ পৌঁছিয়াছে। এখানেও যে কোনোদিন হঠাৎ ঝড়জল হওয়া বিচিত্র নয়। বংশলোচন উঠিবার জন্য প্রস্তুত হইয়া হাতের বর্ম্মাচুরুটে একবার জোরে টান দিলেন। এমন সময় বোধ হইল, কে যেন পিছু হইতে তাঁর জামার প্রান্ত ধরিয়া টানিতেছে এবং মিহি-সুরে বলিতেছে —হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ। ফিরিয়া দেখিলেন—একটি ছাগল।
বেশ হৃষ্টপুষ্ট ছাগল। কুচ্কুচে কালো নধর দেহ, বড় বড় লট্পটে কাণের উপর কচি পটোলের মত দুটি শিং বাহির হইয়াছে। বয়স বেশী নয়, এখনো অজাতশ্মশ্রু। বংশলোচন বলিলেন—“আরে এটা কোথা থেকে এল? কার পাঁঠা? কাকেও ত দেখচি না।”
ছাগল উত্তর দিল না। কাছে ঘেঁসিয়া লোলুপনেত্রে তাঁহাকে পর্যবেক্ষণ করিতে লাগিল। বংশলোচন তার মাথায় ঠেলা দিয়া বলিলেন—“যাঃ পালা, ভাগো হিঁয়াসে।” ছাগল পিছনের দু পায়ে ভর দিয়া দাঁড়াইয়া উঠিল, এবং সাম্নের দু পা মুড়িয়া ঘাড় বাঁকাইয়া রায়-বাহাদুরকে ঢুঁ মারিল।
রায়-বাহাদুর কৌতুক বোধ করিলেন। ফের ঠেলা দিলেন। ছাগল আবার খাড়া হইল এবং খপ্ করিয়া তাঁর হাত হইতে চুরুটটি কাড়িয়া লইল। আহারান্তে বলিল—“অর্-র্-র্”, অর্থাৎ আর আছে?
বংশলোচনের সিগার-কেসে আর একটিমাত্র চুরুট ছিল। তিনি সেটি বাহির করিয়া দিলেন। ছাগলের মাথা-ঘোরা, গা-বমি বা অপর কোনো ভাব-বৈলক্ষণ্য প্রকাশ পাইল না। দ্বিতীয় চুরুট নিঃশেষ করিয়া পুনরায় জিজ্ঞাসা করিল—“অর্-র্-র্?” বংশলোচন বলিলেন— “আর নেই। তুই এইবার যা। আমিও উঠি।”
ছাগল বিশ্বাস করিল না, পকেট তল্লাস করিতে লাগিল। বংশলোচন নিরুপায় হইয়া চামড়ার সিগারকেসটি খুলিয়া ছাগলের সম্মুখে ধরিয়া বলিলেন—“না বিশ্বাস হয়, এই দেখ্ বাপু।” ছাগল এক লম্ফে সিগার-কেস কাড়িয়া লইয়া চর্ববণ আরম্ভ করিল। রায়বাহাদুর রাগিবেন কি হাসিবেন স্থির করিতে না পারিয়া বলিয়া ফেলিলেন—“শ্-শালা।”
অন্ধকার হইয়া আসিতেছে। আর দেরি করা উচিত নয়। বংশলোচন গৃহাভিমুখে চলিলেন। ছাগল কিন্তু তাঁর সঙ্গ ছাড়িল না। বংশলোচন বিব্রত হইলেন। কার ছাগল কি বৃত্তান্ত তিনি কিছুই জানেন না, নিকটে কোনো লোক নাই যে জিজ্ঞাসা করেন। ছাগলটাও নাছোড়বান্দা, তাড়াইলে যায় না। অগত্যা বাড়ী লইয়া যাওয়। ভিন্ন গত্যন্তর নাই। পথে যদি মালিকের সন্ধান পান ভালই, নতুবা কাল সকালে যা হোক একটা ব্যবস্থা করিবেন।
বাড়ী ফিরিবার পথে বংশলোচন অনেক খোঁজ লইলেন; কিন্তু কেহই ছাগলের ইতিবৃত্ত বলিতে পারিল না। অগত্যা তিনি হতাশ হইয়া স্থির করিলেন যে আপাততঃ নিজেই উহাকে প্রতিপালন করিবেন।
হঠাৎ বংশলোচনের মনে একটা কাঁটা খচ্ করিয়া উঠিল। তাঁর যে এখন পত্নীর সঙ্গে কলহ চলিতেছে। আজ পাঁচদিন হইল কথাবন্ধ। ইঁহাদের দাম্পত্য কলহ বিনা আড়ধরে নিষ্পন্ন হয়। সামান্য একটা উপলক্ষ্য, দু-চারটি নাতিতীক্ষ্ণ বাক্যবাণ, তারপর দিনকতক অহিংস অসহযোগ, বাক্যালাপ বন্ধ,—পরিশেষে হঠাৎ একদিন সন্ধিস্থাপন ও পুনর্ম্মিলন। এ রকম প্রায়ই হয়, বিশেষ উদ্বেগের কারণ নাই। কিন্তু আপাততঃ অবস্থাটি সুবিধাজনক নয়। গৃহিণী জন্তু-জানোয়ার মোটেই পছন্দ করেন না। বংশলোচনের একবার কুকুরপোষার সখ হইয়াছিল, কিন্তু গৃহিণীর প্রবল আপত্তিতে তাহা সফল হয় নাই। আজ একে কলহ চলিতেছে, তার উপর ছাগল লইয়া গেলে আর রক্ষা থাকিবে না। একে মনসা তায় ধূনার গন্ধ।
চলিতে চলিতে রায়-বাহাদুর পত্নীর সহিত কাল্পনিক বাকযুদ্ধ আরম্ভ করিলেন। একটা পাঁঠা পুষিবেন তাতে কার কি বলিবার আছে? তাঁর কি স্বাধীনভাবে একটা সখ মিটাইবার ক্ষমতা নাই? তিনি একজন মান্যগণ্য সম্ভ্রান্ত ব্যক্তি, বেলেঘাটা রোডে তাঁর প্রকাণ্ড অট্টালিকা, বিস্তর ভূ-সম্পত্তি। তিনি একজন খেতাবধারী অনারারি হাকিম,—পঞ্চাশ টাকা পর্যন্ত জরিমানা, একমাস পর্য্যন্ত জেল দিতে পারেন। তাঁর কিসের দুঃখ, কিসের লজ্জা, কিসের নারভস্নেস্? বংশলোচন বারবার মনকে প্রবোধ দিলেন—তিনি কাহারো তোয়াক্কা রাখেন না।
বংশলোচনবাবুর বৈঠকখানায় যে সান্ধ্য আড্ডা বসে, তাহাতে নিত্য বহুসংখ্যক রাজা-উজির বধ হইয়া থাকে। লাটসাহেব, সুরেন বাঁড়ুয্যে, মোহনবাগান, পরমার্থ-তত্ত্ব, প্রতিবেশী অধর বুড়োর শ্রাদ্ধ, আলিপুরের নূতন কুমীর,—কোনো প্রসঙ্গই বাদ যায় না। সম্প্রতি সাত দিন ধরিয়া বাঘের বিষয় আলোচিত হইতেছিল। এই সূত্রে গতকল্য বংশলোচনের শ্যালক নগেন এবং দূর-সম্পর্কের ভাগিনেয় উদয়ের মধ্যে হাতাহাতির উপক্রম হয়। অন্যান্য সভ্য অনেক কষ্টে তাহাদিগকে নিরস্ত করেন।
বংশলোচনের বৈঠকখানা ঘরটি বেশ বড় ও সুসজ্জিত; অর্থাৎ অনেকগুলি ছবি, আয়না, আলমারি, চেয়ার, ইত্যাদি জিনিষপত্রে ভর্ত্তি। প্রথমেই নজরে পড়ে একটি কার্পেটে-বোনা ছবি, কালো জমির উপর আসমানি রঙের বিড়াল। যুদ্ধের সময় বাজারে সাদা পশম ছিল না, সুতরাং বিড়ালটির এই দশা হইয়াছে। ছবির নীচে সর্ব্বসাধারণের অবগতির জন্য বড় বড় ইংরাজি অক্ষরে লেখা আছে— CAT. তার নীচে রচয়িত্রীর,নাম—মানিনী দেবী। ইনিই গৃহকর্ত্রী। ঘরের অপর দিকের দেওয়ালে একটি রাধাকৃষ্ণের তৈলচিত্র। কৃষ্ণ রাধাকে লইয়া কদমতলায় দাঁড়াইয়া আছেন,—একটি প্রকাণ্ড সাপ তাহাদিগকে পাক দিয়া পিষিয়া ফেলিবার চেষ্টা করিতেছে, কিন্তু রাধাকৃষ্ণের ভ্রুক্ষেপ নাই; কারণ, সাপটি বাস্তবিক সাপ নয়, ওঁ-কার মাত্র। তাছাড়া কতকগুলি মেমের ছবি আছে, তাদের অঙ্গে সিল্কের ব্রাহ্মসাড়ী এবং মাথায় কালো সুতার আলুলায়িত পরচুল! ময়দার কাই দিয়া আটিয়ে দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু তাতেও তাদের মুখের দুরন্ত মেম-মেম-ভাব ঢাকা পড়ে নাই, সেজন্য জোর করিয়া নাক বিধাইয়া দেওয়া হইয়াছে। ঘরে দুটি দেওয়াল- আলমারিতে চিনামাটির পুতুল এবং কাচের খেলনা ঠাসা। উপরের শুইবার ঘরের চারটি আলমারি বোঝাই হইয়া যাহা বাড়তি হইয়াছে, তাহাই নীচে স্থান পাইয়াছে। ইহা ভিন্ন আরো নানা প্রকার আসবাব, যথা রাজা-রাণীর ছবি, রায়-বাহাদুরের পরিচিত ও অপরিচিত ছোট-বড় সাহেবের ফটোগ্রাফ, গিল্টির ক্রেমে বাঁধানো আয়না, আলমানাক্, ঘড়ি, রায়-বাহাদুরের সনদ, কয়েকটি অভিনন্দন-পত্র ইত্যাদি।
আজও যথাসময়ে আড্ডা বসিয়াছে। বংশলোচন এখনো বেড়াইয়া ফেরেন নাই। তার অন্তরঙ্গ বন্ধু বিনোদ উকীল ফরাসের উপর তাকিয়া ঠেস দিয়া খবরের কাগজ পড়িতেছেন। বৃদ্ধ চাটুয্যে মহাশয় হুঁকো হাতে ঝিমাইতেছেন। নগেন ও উদয় অতি কষ্টে ক্রোধ রুদ্ধ করিয়া ওৎ পাতিয়া বসিয়া আছে, একটা ছুতা পাইলেই পরস্পরকে আক্রমণ করিবে।
আর চুপ করিয়া থাকিতে না পারিয়া উদয় বলিল- “যাই বল, বাঘের মাপ কখনই ল্যাজ-শুদ্ধ হতে পারে না। তা হলে মেয়েছেলেদের মাপও চুল-শুদ্ধ হবে না" কেন? আমার বোয়ের বিনুনীটাই ত তিন ফুট হবে। তবে কি বল্তে চাও, বউ আট ফুট লম্বা?”
নগেন বলিল-“দেখ উদো, তোর বোয়ের বর্ণন! আমরা মোটেই শুন্তে চাই না। বাঘের কথা বলতে হয় বল্।”
চাটুয্যে মহাশয়ের তন্দ্রী ছুটিয়া গেল। বলিলেন- “আঃ হা, তোমাদের এখানে কি বাঘ ছাড়া অন্য জানোয়ার নেই?”
এমন সময় বংশলোচন ছাগল লইয়া ফিরিলেন। বিনোদবাবু বলিলেন-বাহবা, বেশ পাঁঠাটি ত। কত, দিয়ে কিন্লে হে?”
বংশলোচন সমস্ত ঘটন? বিবৃত করিলেন। বিনোদ
‘দিব্বি পুরুষ্টু পাঁঠা’
বলিলেন—“বেওয়ারিস মাল, বেশীদিন ঘরে না রাখাই ভাল। সাবাড় করে ফেল,—কাল রবিবার আছে, লাগিয়ে দাও।”
চাটুয্যে মহাশয় ছাগলের পেট টিপিয়া বলিলেন—দিব্বি পুরুষ্টু পাঁঠা। খাসা কালিয়া হবে।”
নগেন ছাগলের ঊরু টিপিয়া বলিল— “উঁহু, হাঁড়িকাবাব। একটু বেশী করে আদা-বাঁটা আর প্যাজ।”
উদয় বলিল—“ওঃ, আমার বউ অ্যায়সা গুলি কাবাব করতে জানে!”
নগেন ভ্রূকুটি করিয়া বলিল— “উদো, আবার?”
বংশলোচন বিরক্ত হইয়া বলিলেন—“তোমাদের কি জন্তু দেখ্লেই খেতে ইচ্ছে করে? একটা নিরীহ অনাথ প্রাণী আশ্রয় নিয়েচে, তা কেবল কালিয়া আর কাবাব।”
ছাগলের সংবাদ শুনিয়া বংশলোচনের সপ্তম-বর্ষীয়া কন্যা টেঁপী এবং সর্ব্বকনিষ্ঠ পুত্র ঘেণ্টু ছুটিয়া আসিল। ঘেণ্টু বলিল—“ও বাবা, আমি পাঁঠা খাবো। পাঁঠার ম-ম-ম—"
বংশলোচন বলিলেন—“যা যাঃ, শুনে শুনে কেবল খাই খাই শিখ্চেন।”
ঘেণ্টু হাত-পা ছুড়িয়া বলিল— “হ্যাঁ আমি ম-ম-ম মেটুলী খাবো।”
টেঁপী বলিল—“বাবা, আমি পাঁঠাটাকে পুষবো একটু লাল ফিতে দাও না।”
বংশলোচন। বেশ ত একটু খাওয়া-দাওয়া করুক, তারপর নিয়ে খেলা করিস এখন।
টেঁপী। পাঁঠার নাম কি বল না?
বিনোদ বলিলেন—“নামের ভাবনা কি। ভাসুরক, দধিমুখ, মসীপুচ্ছ, লম্বকর্ণ—”
চাটুয্যে বলিলেন—“লম্বকর্ণ ই ভাল।”
বংশলোচন কন্যাকে একটু অন্তরালে লইয়া গিয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“টেঁপু, তোর মা এখন কি কচ্চে
টেঁপী। এক্ষুনি ত কল-ঘরে গেছে।
বংশলোচন। ঠিক জানিস্? তা হলে এখন এক ঘণ্টা নিশ্চিন্দি। দেখ্, ঝিকে বল্, চট্ করে ঘোড়ার ভেজানো-ছোলা চাট্টি এনে এই বাইরের বারান্দায় যেন ছাগলটাকে খেতে দেয়। আর দেখ্, বাড়ীর ভেতর নিয়ে যাস্নি যেন।
উৎসাহের আতিশয্যে টেঁপী পিতার আদেশ ভুলিয়া গেল। ছাগলের গলায় লাল ফিতা বাঁধিয়া টানিতে টানিতে অন্দর মহলে লইয়া গিয়া বলিল— “ও মা, শীগৃগির এস, লম্বকর্ণ দেখবে এস।”
মানিনী মুখ মুছিতে মুছিতে স্নানের ঘর হইতে বাহির হুইয়া বলিলেন—“আ মর্, ওটাকে কে আন্লে? দূর্ দূর্—ও ঝি, ও বাতাসি, শীগ্গির ছাগলটাকে বার করে দে,—ঝাঁটা মার্, ঝাঁটা মার্।”
টেঁপী বলিল—“বা রে, ওকে ত বাবা এনেচে, আমি পুষ্বো।”
ঘেণ্টু বলিল—“ঘোড়া ঘোড়া খেল্ব।”
মানিনী বলিলেন—“খেলা বার করে দিচ্চি। ভদ্দর লোকে আবার ছাগল পোষে! বেরো, বেরো—ও দরওয়ান, ও চুকন্দর সিং—”
“হজৌর” বলিয়া হাঁক দিয়া চুকন্দর সিং হাজির হইল। শীর্ণ খর্ব্বাকৃতি বৃদ্ধ, গালপাট্টা দাড়ি, পাকানে। গোঁফ, জাঁকালো গলা এবং ততোধিক জাঁকাল নাম,— ইহারই জোরে সে চোট্টা এবং ডাকুর আক্রমণ হইতে দেউড়ি রক্ষা করে।
অন্দরের মধ্যে হট্টগোল শুনিয়া রায়-বাহাদুর বুঝিলেন, যুদ্ধ অনিবার্য্য। মনে মনে তাল ঠুকিয়া বাড়ীর ভিতরে আসিলেন। গৃহিণী তাঁর প্রতি দৃক্পাত না করিয়া দরওয়ানকে বলিলেন—“ছাগলটাকে আভি নিকাল দেও, একদম ফটকের বাইরে। নেই ত এক্ষুনি ছিষ্টি নোংরা করেগা।”
চুকন্দর বলিল—“বহুৎ আচ্ছা।”
বংশলোচন পাল্টা হুকুম দিলেন—“দেখো চুকন্দর সিং, ‘এই বক্ড়ি গেটের বাইরে যাগা ত তোম্রা নোকরি ভি যাগা।”
‘হজৌর!’
চুকদর বলিল—“বহুৎ আচ্ছা।”
মানিনী স্বামীর প্রতি একটি অগ্নিময় নয়ন-বাণ হানিয়া বলিলেন—“হ্যাঁলা টেঁপী হতচ্ছাড়ি, রাত্তির হয়ে গেল —গিলতে হবে না? থাকিস্ তুই ছাগল নিয়ে, কাল যাচ্ছি আমি হাটখোলায়।” হাটখোলায় গৃহিণীর পিত্রালয়।
বংশলোচন বলিলেন—“টেঁপু, ঝিকে বলে দে, বৈঠকখানা ঘরে আমার শোবার বিছানা করে দেবে। আর সিঁড়ি ভাঙতে পারি না। আর দেখ্, ঠাকুরকে বল্ আমি মাংস খাব না। শুধু খানকতক কচুরি, একটু ডাল আর পটলভাজা।”
পুরাকালে বড়লোকদের বাড়ীতে একটি করিয়া গোসা-ঘর থাকিত। ক্রুদ্ধা আর্য্যনারীগণ সেখানে আশ্রয় লইতেন। কিন্তু আর্যাপুত্রদের জন্য সে-রকম কোনো পাকা বন্দোবস্ত ছিল না, অগত্যা তাঁরা এক পত্নীর সহিত মতান্তর হইলে অপর এক পত্নীর দ্বারস্থ হুইতেন। আজকাল খরচ-পত্র বাড়িয়া ধাওয়ায় এই সকল সুন্দর প্রাচীন প্রথা লোপ পাইয়াছে। এখন মেয়েদের ব্যবস্থা শুইবার ঘরের মেঝের উপর মাদুর, অথবা তেমন তেমন হইলে বাপের বাড়ী। আর ভদ্রলোকদের একমাত্র আশ্রয় বৈঠকখানা।
আহারান্তে বংশলোচন বৈঠকখানা ঘরে একাকী শয়ন করিলেন। অন্ধকারে তাঁর ঘুম হয় না, এজন্য ঘরের এক কোণে পিলসুজের উপর একটা রেড়ির তেলের প্রদীপ জ্বলিতেছে। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করিয়া বংশলোচন উঠিয়া ইলেক্ট্রিক লাইট জ্বালিলেন এবং একখানি গীতা লইয়া পড়িতে বসিলেন। এই গীতাটি তাঁর দুঃসময়ের সম্বল,—পত্নীর সহিত অসহযোগ হইলে তিনি এটি লইয়া নাড়াচাড়া করেন এবং সংসারের অনিত্যতা উপলব্ধি করিতে চেষ্টা করেন। কর্ম্মযোগ পড়িতে পড়িতে বংশলোচন ভাবিতে লাগিলেন—তিনি কি এমন অন্যায় কাজ করিয়াছেন, যার জন্য মানিনী এরূপ ব্যবহার করেন? বাপের বাড়ী যাবেন,—ইস্, ভারি তেজ! তিনি ফিরাইয়া আনিবার নামটি করিবেন না, যখন হইবে আপনিই ফিরিবে। গৃহিণী সখ করিয়া যে-সব জঞ্জাল ঘরে পোরেন, তাহা ত বংশলোচন নীরবে বরদাস্ত করেন। এই ত সেদিন পনরটা জলচৌকি, তেইশটা বঁটি এবং আড়াই শ টাকার খাগ্ড়াই বাসন কেনা হইয়াছে, আর দোষ হইল কেবল ছাগলের বেলা? হুঁঃ, যতো সব—। বংশলোচন গীতাখানি সরাইয়া রাখিয়া আলোর সুইচ্ বন্ধ করিলেন এবং ক্ষণকাল পরে নাসিকাধ্বনি করিতে লাগিলেন।
লম্বকর্ণ বারান্দায় শুইয়া রোমন্থন করিতেছিল। দুটা বর্ম্মা চুরুট খাইয়া তার ঘুম চটিয়া গিয়াছে। রাত্রি একটা আন্দাজ জোরে হাওয়া উঠিল। ঠাণ্ডা লাগায় সে বিরক্ত হইয়া উঠিয়া পড়িল। বৈঠকখানা ঘর হইতে মিট্মিটে আলো দেখা যাইতেছে। লম্বকর্ণ তার বন্ধন-রজ্জু চিবাইয়া কাটিয়া ফেলিল, এবং দরজা খোলা পাইয়া নিঃশব্দে বৈঠকখানায় প্রবেশ করিল।
আবার তার ক্ষুধা পাইয়াছে। ঘরের চারিদিকে ঘুরিয়া একবার তদারক করিয়া লইল। ফরাসের এক কোণে একগোছা খবরের কাগজ রহিয়াছে। চিরাইয়া দেখিল, অত্যন্ত নীরস। অগত্যা সে গীতার তিন অধ্যায় উদরস্থ করিল। গীতা খাইয়া গলা শুখাইয়া গেল। একটা উঁচু তেপায়ার উপর এক কুঁজা জল আছে; কিন্তু তাহা নাগাল পাওয়া যায় না। লম্বকর্ণ তখন প্রদীপের কাছে গিয়া রেড়ির তেল চাখিয়া দেখিল, বেশ সুস্বাদু। চক্ চক্ করিয়া সবটা খাইল। নিবিল।
বংশলোচন স্বপ্ন দেখিতেছেন, সন্ধিস্থাপন হইয়া গিয়াছে। হঠাৎ পাশ ফিরিতে তাঁর একটা নরম গরম স্পন্দনশীল স্পর্শ অনুভব হইল। নিদ্রা-বিজড়িত স্বরে বলিলেন—“কখন এলে?” উত্তর পাইলেন—“হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ।”
হুলস্থুল কাণ্ড। চোর চোর—বাঘ হ্যায়—এই চুকন্দর সিং—জল্দি আও— নগেন—উদো—শীগ্গির আয়— মেরে ফেল্লে।
চুকন্দর তার মুঙ্গেরী বন্দুকে বারুদ ভরিতে লাগিল। নগেন ও উদয় লাঠি ছাতা টেনিস ব্যাট যা পাইল তাই লইয়া ছুটিল। মানিনী ব্যাকুল হইয়া হাঁপাইতে হাঁপাইতে নামিয়া আসিলেন। বংশলোচন ক্রমে প্রকৃতিস্থ হইলেন। লম্বকর্ণ দু’এক ঘা মার খাইয়া ব্যা ব্যা করিতে লাগিল। বংশলোচন ভাবিলেন, বাঘ বরঞ্চ ছিল ভাল। মানিনী ভাবিলেন, ঠিক হয়েচে।
ভোর বেলা বংশলোচন চুকন্দরকে পাড়ায় খোঁজ লইতে বলিলেন—কোনো ভালা আদমি ছাগল পুষিতে রাজি আছে কি না। যে-সে লোককে তিনি ছাগল দিবেন না। এমন লোক চাই, যে যত্ন করিয়া প্রতিপালন করিবে, টাকার লোভে বেচিবে না, মাংসের লোভে মারিবে না।
আটটা বাজিয়াছে। বংশলোচন বহির্ব্বাটীর বারান্দায় চেয়ারে বসিয়া আছেন, নাপিত কামাইয়া দিতেছে। বিনোদবাবু ও নগেন অমৃতবাজারে ড্যালহাউসি ভার্সস্ মোহনবাগান পড়িতেছেন। উদয় ল্যাংড়া আমের দর করিতেছে। এমন সময় চুকন্দর আসিয়া সেলাম করিয়া বলিল—“লাটুবাবু আয়ে হেঁ।”
তিনজন সহচরের সহিত লাটুবাবু বারান্দায় আসিয়া নমস্কার করিলেন। তাঁহাদের প্রত্যেকের বেশভূষা প্রায় একই প্রকার,—ঘাড়ের চুল আমুল ছাঁটা, মাথার উপর পর্ব্বতাকার তেড়ি, রগের কাছে দু গোছা চুল ফণা ধরিয়া আছে। হাতে রিষ্ট-ওয়াচ, গায়ে আগুল্ফলম্বিত পাতলা পাঞ্জাবী, তার ভিতর দিয়া গোলাবী গেঞ্জির আভা দেখা যাইতেছে। পায়ে লপেটা, কাণে অর্দ্ধদগ্ধ সিগারেট।
বংশলোচন বলিলেন—“আপনাদের কোত্থেকে আসা হচ্চে?”
লাটুবাবু বলিলেন—“আমরা বেলেঘাটা কেরাসিন ব্যাণ্ড। ব্যাণ্ড-মাষ্টার লটবর লন্দী —অধীন। লোকে লাটুবাবু বলে ডাকে। শুন্লুম, আপনি একটি পাঁঠা বিলিয়ে দেবেন, তাই সঠিক খবর লিতে এসেচি।”
বিনোদ বলিলেন—“আপনারা বুঝি কানেস্তারা বাজান?”
লাটু। কালেস্তারা কি মশায়? দস্তুরমত কল্সাট। এই ইনি লবীন লিয়োগী ক্লারিয়লেট,—এই লরহরি লাগ ফুলোট,—এই লবকুমার লন্দন ব্যায়লা। তা ছাড়া কর্লেট, পিক্লু, হারমোনিয়া, ঢোল, কত্তাল সব লিয়ে ঊলিশজন আছি। বর্ম্মা অয়েল কোম্পানির ডিপোয় আমরা কাজ করি। ছোট-সাহেবের সেদিন বে হল, ফিষ্টি দিলে, আমরা বাজালুম, সাহেব খুশী হয়ে টাইটিল দিলে—কেরাসিন ব্যাণ্ড।
বংশলোচন। দেখুন, আমার একটি ছাগল আছে, সেটি আপনাকে দিতে পারি, কিন্তু—
লাটু। আমরা হলুম ঊলিশটি প্রালী, একটা পাঁঠায় কি হবে মশায়? কি বল হে লরহরি?
নরহরি। লস্যি, লস্যি।
বংশলোচন। আমি এই সর্ত্তে দিতে পারি যে, ছাগলটিকে আপনি যত্ন করে মানুষ করবেন, বেচতে পারবেন না, মারতে পারবেন না।
লাটু। এ যে আপনি লতুন কথা বল্চেন মশায়। ভদ্দর লোকে কখনো ছাগল পোষে?
নরহরি। পাঁঠি নয় যে দুধ দেবে।
নবীন। পাখী লয় যে পড়বে।
নবকুমার। ভেড়া লয় যে কম্বল হবে।
বংশলোচন। সে যাই হোক। বাজে কথা বলবার আমার সময় নেই। নেবেন কি না বলুন।
লাটুবাবু ঘাড় চুলকাইতে লাগিলেন। নরহরি বলিলেন—“লিয়ে লাও হে লাটুবাবু লিয়ে লাও। ভদ্দর নোক বলচেন অভ করে।”
বংশলোচন। কিন্তু মনে থাকে যেন, বেচতে পারবে না, কাটতে পারবে না।
লাটু। সে আপনি ভাববেন না। লাটুলন্দীর কথার লড়চড় লেই।
লম্বকর্ণকে লইয়া বেলেঘাটা কেরাসিন ব্যাণ্ড চলিয়া গেল। বংশলোচন বিমর্ষচিত্তে বলিলেন—“ব্যাটাদের দিয়ে ভরসা হচ্চে না।” বিনোদ আশ্বাস দিয়া বলিলেন —“ভেবো না হে, তোমার পাঁঠা গন্ধর্ব্বলোকে বাস করবে। ফাঁকে পড়লুম আমরা।”
সন্ধ্যার আড্ডা বসিয়াছে। আজও বাঘের গল্প চলিতেছে। চাটুয্যে মহাশয় বলিতেছিলেন—“সেটা তোমাদের ভুল ধারণা। বাঘ ব’লে একটা ভিন্ন জানোয়ার নেই। ও একটা অবস্থার ফের, আরসোলা হতে যেমন কাঁচপোকা। আজই তোমরা ডারউইন্ শিখেচ,— আমাদের ওসব ছেলেবেলা থেকেই জানা আছে। আমাদের রায় বাহাদুর ছাগলটা বিদেয় করে খুব ভাল কাজ করেচেন। কেটে খেয়ে ফেলতেন ত কথা ছিল না, কিন্তু বাড়ীতে রেখে বাড়তে দেওয়া,—উহু।”
বংশলোচন একখানি নূতন গীতা লইয়া নিবিষ্টচিত্তে অধ্যয়ন করিতেছেন—নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভূয়ঃ, অর্থাৎ কিনা আত্মা একবার হইয়া আর যে হুইবে না তা নয়। অজো নিত্যঃ—অজো কিনা—ছাগলং। ছাগলটা যখন বিদায় হইয়াছে, তখন আজ সন্ধিস্থাপনা হইলেও হইতে পারে।
বিনোদ বংশলোচনকে বলিলেন—“হে কৌন্তেয়, তুমি শ্রীভগবানকে একটু থামিয়ে রেখে একবার চাটুয্যে মশায়ের কথাটা শোনো। মনে বল পাবে।”
উদয় বলিল—“আমি সেবার যখন সিমলেয় যাই—”
নগেন। মিছে কথা বলিস্ নি উদো। তোর দৌড় আমার জানা আছে, লিলুয়া অব্ধি।
উদয়। বাঃ, আমার দাদাশ্বশুর যে সিমলেয় থাকতেন। বউ ত সেইখানেই বড় হয়। তাই ত রং অত—
নগেন। খবরদার উদো।
চাটুয্যে। যা বল্ছিলুম শোনো। আমাদের মজিলপুরের চরণ ঘোষের এক ছাগল ছিল, তার নাম ভুটে। ব্যাটা খেয়ে খেয়ে হল ইয়া লাস, ইয়া শিং, ইয়া দাড়ি। একদিন চরণের বাড়ীতে ভোজ,—লুচি, পাঁঠার কালিয়া, এই সব। আঁচাবার সময় দেখি, ভুটে পাঁঠার মাংস খাচ্চে। বল্লুম—দেখ্চ কি চরণ, এখুনি ছাগলটাকে বিদেয় কর,—কাচ্চাবাচ্ছা নিয়ে ঘর কর, প্রাণে ভয় নেই? চরণ শুনলে না। গরীবের কথা বাসি হলে ফলে। তার পরদিন থেকে ভুটে নিরুদ্দেশ। খোঁজ খোঁজ কোথা গেল। এক বচ্ছর পরে —মশায় সেই ছাগল সোঁদর-বনে পাওয়া গেল। শিং নেই বল্লেই হয়, দাড়ি প্রায় খসে গেছে, মুখ একবারে হাঁড়ি, বর্ণ হয়েচে যেন কাঁচা হলুদ, আর তার ওপর দেখা দিয়েচে মশায় —আঁজি আঁজি ডোরা ডোরা। ডাক! হল—ভুটে,
‘ভুটে বল্লে—হালুম্’
ভুটে। ভুটে বল্লে—হালুম্। লোকজন দূর থেকে নমস্কার ফরে ফিরে এল।
“লাটুবাবু আয়ে হেঁ।”
সপারিষদ্ লাটুবাবু প্রবেশ করিলেন। লম্বকর্ণও সঙ্গে আছে। বিনোদ বলিলেন—“কি ব্যাণ্ড-মাষ্টার, আবার কি মনে করে?”
লাটুবাবুর আর সে লাবণ্য নাই। চুল উস্ক খুস্ক, চোখ বসিয়া গিয়াছে, জামা ছিঁড়িয়া গিয়াছে। সজলনয়নে হাঁউ মাউ করিয়া বলিলেন—“সর্ব্বনাশ হয়েচে মশায়, ধনে প্রাণে মেরেচে। ও হোঃ হোঃ হো।”
নরহরি বলিলেন—“আঃ কি কর লাটুবাবু একটু থির হও। হুজুর যখন রয়েচেন, তখন একটা বিহিত করবেনই।”
বংশলোচন ভীত হইয়া বলিলেন—“কি হয়েচে—ব্যাপার কি?”
লাটু। মশায়, ওঁই পাঁঠাটা—
চাটুয্যে বলিলেন—“হুঁ, বলেছিলুম কি না?”
লাটু। ঢোলের চামড়া কেটেচে, ব্যায়লার তাঁত খেয়েচে, হারমোনিয়ার চাবী সমস্ত চিবিয়েচে। আর —আর—আমার পাঞ্জাবীর পকেট কেটে লব্বই টাকার লোট—ও হো হো হো।
নরহরি। গিলে ফেলেচে। পাঁঠা নয় হুজুর
‘মরচি টাকার শোকে, আর আপনি বল্চেন জোলাপ খেতে?’
সয়তান। সর্ব্বস্ব গেছে, লাটুর প্রাণটি কেবল আপনার ভরসায় এখনো ধুক্পুক্ করচে।
বংশলোচন। ফ্যাসাদে ফেল্লে দেখচি।
নরহরি। দোহাই হুজুর, লাটুর দশাটা একবার দেখুন, একটা ব্যবস্থা করে দিন,—বেচারা মারা যায়।
বংশলোচন ভাবিয়া বলিলেন—“একটা জোলাপ দিলে হয় না?”
লাটুবাবু উচ্ছ্বসিতকণ্ঠে বলিলেন—“মশায়, এই কি আপনার বিবেচনা হল? মরচি টাকার শোকে, আর আপনি বলচেন জোলাপ খেতে?”
বংশলোচন। আরে তুমি খাবে কেন,—ছাগলটাকে দিতে বল্চি।
নরহরি। হায় হায়, হুজুর এখনো ছাগল চিন্লেন না। কোন্ কালে হজম করে ফেলেচে। লোট ত লোট,—ব্যায়লার তাঁত, ঢোলের চামড়া, হারমোনিয়ার চাবী, মায় ইষ্টিলের কত্তাল।
বিনোদ। লাটুবাবুর মাথাটি কেবল আস্ত রেখেচে।
বংশলোচন বলিলেন—“যা হবার তা ত হয়েছে। এখন বিনোদ, তুমিই একটা খেসারৎ ঠিক করে দাও। (বেচারার লোকসান যাতে না হয়, আর আমার ওপর বেশী জুলুমও না হয়।’ ছাগলটা বাড়ীতেই থাকুক, কাল যা হয় করা যাবে।”
অনেক দরদস্তুরের পর এক শ টাকায় রফা হইল। বংশলোচন বেশী কষাকষি করিতে দিলেন না। লাটুবাবুর দল টাকা লইয়া চলিয়া গেল।
লম্বকর্ণ ফিরিয়াছে শুনিয়া টেঁপী ছুটিয়া আসিল। বিনোদ বলিলেন—“ও ঢেঁপুরাণী, শীগ্গির গিয়ে তোমার মাকে ব’ল কাল আমরা এখানে খাবো, —লুচি, পোলাও, মাংস—”
টেঁপী। বাবা আর মাংস খায় না।
বিনোদ। বল কি! হ্যাঁ হে বংশু, প্রেমটা একটা পাঁঠা থেকে বিশ্ব-পাঁঠায় পৌঁছেচে না কি? আচ্ছা, তুমি না খাও, আমরা আছি। যাও ত টেঁপু, মাকে বল সব যোগাড় করতে।
টেঁপী। সে এখন হচ্চে না। মা বাবার ঝগড়া চলচে, কথাটি নেই।
বংশলোচন ধমক দিয়া বলিলেন—“হ্যাঁ হ্যাঁ—কথাটি নেই,—তুই সব জানিস। যা যাঃ, ভারি জ্যাঠা হয়েছিস।”
টেঁপী। বা-রে, আমি বুঝি কিছু টের পাই না? তবে কেন মা খালি খালি আমাকে ব’লে —টেঁপী, পাখাটা মেরামত করাতে হবে, —টেঁপী, এমাসে আরো দু’শ টাকা চাই। তোমাকে বলে না কেন?
বংশলোচন। থাম্ থাম্, বকিস্ নি।
বিনোদ। হে রায় বাহাদুর, কন্যাকে বেশী ঘাঁটিও না, অনেক কথা ফাঁস করে দেবে। অবস্থাটা সঙীন হয়েচে বল?
বংশলোচন। আরে এতদিন ত সব মিটে যেত, ঐ ছাগলটাই মুস্কিল বাধালে।
বিনোদ। ব্যাটা ঘরভেদী বিভীষণ। তোমারই বা অত মায়। কেন? খেতে না পার বিদেয় করে দাও। জলে বাস কর, কুমীরের সঙ্গে বিবাদ কোরো না।
বংশলোচন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলিয়া বলিলেন—“দেখি, কাল যা হয় করা যাবে।”
এ রাত্রিও বংশলোচন বৈঠকখানায় বিরহ-শয়নে যাপন করিলেন। ছাগলটা আস্তাবলে বাঁধা ছিল, উপদ্রব করিবার সুবিধা পায় নাই।
পরদিন বৈকালে সাড়ে পাঁচটার সময় বংশলোচন বেড়াইবার জন্য প্রস্তুত হইয়া একবার এদিক ওদিক চাহিয়া দেখিলেন, কেহ তাঁকে লক্ষ্য করিতেছে কি না। গৃহিণী ও ছেলেমেয়েরা উপরে আছে। ঝি-চাকর অন্দরে কাজকর্ম্মে ব্যস্ত। চুকন্দর সিং তার ঘরে বসিয়া আটা সানিতেছে। লম্বকর্ণ আস্তাবলের কাছে বাঁধা আছে এবং দড়ির সীমার মধ্যে যথাসম্ভব লম্ফঝম্ফ করিতেছে। বংশলোচন দড়ি হাতে করিয়া ছাগলকে লইয়া আস্তে আস্তে বাহির হইলেন।
পাছে পরিচিত লোকের সঙ্গে দেখা হয় সেজন্য বংশলোচন সোজা রাস্তায় না গিয়া গলি-ঘুঁজির ভিতর দিয়া চলিলেন। পথে এক ঠোঙা জিলিপী কিনিয়া পকেটে রাখিলেন। ক্রমে লোকালয় হইতে দূরে আসিয়া জনশূন্য খালধারে পৌঁছিলেন।
আজ তিনি স্বহস্তে লম্বকর্ণকে বিসর্জ্জন দিবেন, যেখানে পাইয়াছিলেন আবার সেখানেই ছাড়িয়া দিবেন, —যা থাকে তার কপালে। যথাস্থানে আসিয়া বংশলোচন জিলিপীর ঠোঙাটি ছাগলকে খাইতে দিলেন। পকেট হইতে এক টুকরা কাগজ বাহির করিয়া তাহাতে লিখিলেন
এই ছাগল বেলেঘাটা খালের ধারে কুড়াইয়া পাইয়াছিলাম। প্রতিপালন করিতে না পারায় আবার সেখানেই ছাড়িয়া দিলাম। আল্লা কালী যিশুর দিব্য ইহাকে কেহ মারিবেন না।
লেখার পর কাগজ ভাঁজ করিয়া একটা ছোট টিনের —কৌটায় ভরিয়া লম্বকর্ণের গলায় ভাল করিয়া বাঁধিয়া দিলেন। তারপর বংশলোচন শেষবার ছাগলের গায়ে হাত বুলাইয়া আস্তে আস্তে সরিয়া পড়িলেন। লম্বকর্ণ তখন আহারে ব্যস্ত।
দূরে আসিয়াও বংশলোচন বারবার পিছু ফিরিয়া দেখিতে লাগিলেন। লম্বকর্ণ আহার শেষ করিয়া এদিক ওদিক চাহিতেছে। যদি তাঁহাকে দেখিয়া ফেলে এখনি পশ্চাদ্ধাবন করিবে। এদিকে আকাশের অবস্থাও ভাল নয়। বংশলোচন জোরে জোরে চলিতে লাগিলেন।
আর পারা যায় না, হাঁফ ধরিতেছে। পথের ধারে একটা তেঁতুল গাছের তলায় বংশলোচন বসিয়া পড়িলেন। লম্বকর্ণকে আর দেখা যায় না। এইবার তাঁর মুক্তি,— আর কিছুদিন দেরি করিলে জড়ভরতের অবস্থা হইত। ঐ হতভাগা কৃষ্ণের জীবকে আশ্রয় দিতে গিয়া তিনি নাকাল হইয়াছেন। গৃহিণী তার উপর মর্মান্তিক রুষ্ট, আত্মীয়স্বজন তাকে খাইবার জন্য হাঁ করিয়া আছে,— তিনি একা কাঁহাতক সামলাইবেন? হায় রে সত্যযুগ, যখন শিবিরাজা শরণাগত কপোতের জন্য প্রাণ দিতে গিয়াছিলেন,—মহিষীর ক্রোধ, সভাসদ্বর্গের বেয়াদবি, কিছুই তাঁকে ভোগ করিতে হয় নাই।
দ্রুম দুদ্দুড়ূ দুড়ূ জুড় দড়ড়ড় ড়। আকাশে কে ঢেঁটরা পিটিতেছে? বংশলোচন চমকিত হইয়া উপরে চাহিয়া দেখিলেন, অন্তরীক্ষের গম্বুজে এক পোঁচ সীসা-রঙের অস্তর মাখাইয়া দিয়াছে। দূরে এক ঝাঁক সাদা বক জোরে পাখা চালাইয়া পলাইতেছে। সমস্ত চুপ,— গাছের পাতাটি নড়িতেছে না। আসন্ন দুর্যোগের ভয়ে স্থাবর জঙ্গম হতভম্ব হইয়া গিয়াছে। বংশলোচন উঠিলেন, কিন্তু আবার বসিয়া পড়িলেন। জোরে হাঁটার ফলে তাঁর বুক ধড়ফড় করিতেছিল।
সহসা আকাশ চিড় খাইয়া ফাটিয়া গেল। এক ঝলক বিদ্যুৎ, —কড় কড় কড়াৎ,—ফাটা আকাশ আবার বেমালুম জুড়িয়া গেল। ঈশানকোণ হইতে একটা ঝাপসা পর্দ্দা তাড়া করিয়া আসিতেছে। তার পিছনে যা কিছু সমস্ত মুছিয়া গিয়াছে, সামনেও আর দেরি নাই। ঐ এল, ঐ এল! গাছপালা শিহরিয়া উঠিল। লম্বা লম্বা তালগাছগুলা প্রবল বেগে মাথা নাড়িয়া আপত্তি জানাইল। কাকের দল আর্ত্তনাদ করিয়া উড়িবার চেষ্টা করিল, কিন্তু ঝাপ্টা খাইয়া আবার গাছের ডাল আঁকড়াইয়া ধরিল। প্রচণ্ড ঝড়, প্রচণ্ডতর বৃষ্টি। যেন এই নগণ্য উইঢিবি,—এই ক্ষুদ্র কলিকাতা সহরকে ডুবাইবার জন্য স্বর্গের তেত্রিশ কোটি দেবতা সার বাঁধিয়া বড় বড় ভৃঙ্গার হইতে তোড়ে জল ঢালিতেছেন। মোটা নিরেট জলধারা, তার ফাঁকে ফাঁকে ছোট ছোট ফোঁটা। সমস্ত শূন্য ভরাট হইয়া গিয়াছে।
মান-ইজ্জৎ কাপড়-চোপড় সবই গিয়াছে, এখন প্রাণটা রক্ষা পাইলে হয়। হা রে হতভাগা ছাগল, কি কুক্ষণে,
বংশলোচনের চোখের সামনে একটা উগ্র বেগুনি আলো খেলিয়া গেল— সঙ্গে সঙ্গে আকাশের সঞ্চিত বিশ লক্ষ ভোল্ট, ইলেক্ট্রিসিটি অদূরবর্ত্তী একটা নারিকেল গাছের ব্রহ্মরন্ধ্র ভেদ করিয়া বিকট নাদে ভূগর্ভে প্রবেশ। করিল।
রাশি রাশি সরিষার ফুল। জগৎ লুপ্ত, তুমি নাই, আমি নাই। বংশলোচন সংজ্ঞা হারাইয়াছেন।
বৃষ্টি থামিয়াছে কিন্তু এখনো সোঁ সোঁ করিয়া হাওয়া চলিতেছে। ছেঁড়া মেঘের পর্দ্দা ঠেলিয়া দেবতারা দু’চারটা মিট্মিটে তারার লণ্ঠন লইয়া নীচের অবস্থা তদারক করিতেছেন।
বংশলোচন কর্দ্দম-শয্যায় শুইয়া ধীরে ধীরে সংজ্ঞা লাভ করিলেন। তিনি কে? রায় বাহাদুর। কোথায়? খালের নিকট। ও কিসের শব্দ? সোনাব্যাং। তাঁর নষ্টস্মৃতি ফিরিয়া আসিয়াছে ছাগলটা?
‘লুচি ক’খানি খেতেই হবে’
মানুষের স্বর কাণে আসিতেছে। কে তাঁকে ডাকিতেছে? “মামা-জামাইবাবু—বংশু আছ?— হজৌর—"
অদূরে একটা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়াইয়া আছে। জনকতক লোক লণ্ঠন লইয়া ইতস্ততঃ ঘুরিতেছে এবং তাঁহাকে ডাকিতেছে। একটি পরিচিত নারীকণ্ঠে ক্রন্দনধ্বনি উঠিল।
রায় বাহাদুর চাঙ্গা হইয়া বলিলেন—“এই যে আমি এখানে আছি—ভয় নেই—”
মানিনী বলিলেন—“আজ আর দোতলায় উঠে কাজ নেই। ও ঝি, এই বৈঠকখানা ঘরেই বড় করে বিছানা করে দে ত। আর দেখ, আমার বালিসটাও দিয়ে যা। আঃ, চাটুয্যে মিন্সে নড়ে না। ও কি—সে হবে না, এই গরম লুচি ক’খানি খেতেই হবে, মাথা খাও। তোমার সেই বোতলটায় কি আছে— তাই একটু চায়ের সঙ্গে মিশিয়ে দেব নাকি?”
হুঁ হুঁ হুঁ হুঁ—”
বংশলোচন লাফাইয়া উঠিয়া বলিলেন—“অ্যাঁ, ওটা আবার এসেচে? নিয়ে আয় ত লাঠিটা—”
মানিনী বলিলেন—“আহা করো কি, মেরো না। ও বেচারা বৃষ্টি থাম্তেই ফিরে এসে তোমার খবর দিয়েচে। তাইতেই তোমায় ফিরে পেলুম। ওঃ, হরি মধুসূদন!”
লম্বকর্ণ বাড়ীতেই রহিয়া গেল, এবং দিন দিন শশিকলার ন্যায় বাড়িতে লাগিল। ক্রমে তার আধ হাত দাড়ি গজাইল। রায়-বাহাদুর আর বড়-একটা খোঁজখবর করেন না, তিনি এখন ইলেকশন্ লইয়া ব্যস্ত। মানিনী লম্বকর্ণের শিং কেমিক্যাল সোণা দিয়া বাঁধাইয়া দিয়াছেন। তার জন্য সাবান ও ফিনাইল ব্যবস্থা হইয়াছে, কিন্তু বিশেষ ফল হয় নাই। লোকে দূর হইতে তাকে বিদ্রূপ করে। লম্বকর্ণ গম্ভীরভাবে সমস্ত শুনিয়া যায়,—নিতান্ত বাড়াবাড়ি করিলে বলে—“ব-ব-ব”—অর্থাৎ, যত ইচ্ছা হয় বকিয়া যাও, আমি ও-সব গ্রাহ্য করি না।
শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড
শ্রী শ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড
মাঘ মাস, ১৩২৬ সাল। এইমাত্র আর্ম্মানি গির্জ্জার ঘড়িতে বেলা এগারটা বাজিয়াছে। শ্যামবাবু চামড়ার ব্যাগ হাতে ঝুলাইয়া জুডাস্ লেনের একটি তেতলা বাটীতে প্রবেশ করিলেন। বাড়ীটি বহু পুরাতন,—ক্রমাগত চূণ ও রংএর প্রলেপে লোলচর্ম্ম কলপিতকেশ বৃদ্ধের দশা প্রাপ্ত হইয়াছে। নীচের তলায় অন্ধকারময় মালের গুদাম। উপরতলায় সম্মুখভাগে অনেকগুলি ব্যবসায়ীর অফিস, পশ্চাতে বিভিন্ন জাতীয় কয়েকটি পরিবার পৃথক-পৃথক অংশে বাস করেন। প্রবেশ-দ্বারের সম্মুখেই তেতলা পর্যন্ত বিস্তৃত কাঠের সিঁড়ি। সিঁড়ির পাশের দেওয়াল আগাগোড়া তাম্বুলরাগচর্চ্চিত,—যদিও নিষেধের নোটিস লম্বিত আছে। কতিপয় নেংটে ইঁদুর ও আরসোলা পরস্পর অহিংসভাবে স্বচ্ছন্দে ইতস্ততঃ বিচরণ করিতেছে। ইহারা আশ্রম-মৃগের ন্যায় নিঃশঙ্ক,— সিঁড়ির যাত্রিগণকে গ্রাহ্য করে না। অন্তরালবর্ত্তী সিন্ধি পরিবারের রান্নাঘর হইতে নির্গত হিংএর তীব্র গন্ধের সহিত নরদামার গন্ধ মিলিত হইয়া সমস্ত স্থান আমোদিত করিয়াছে। অফিস-সমূহের মালিকগণ তুচ্ছ বিষয়ে নির্লিপ্ত থাকিয়া, কেনা-বেচা, তেজী-মন্দী, আদায়উসুল, ইত্যাদি মহৎ ব্যাপারে ব্যতিব্যস্ত হইয়া দিন যাপন করিতেছেন।
শ্যামবাবু তেতলায় উঠিয়া একটি ঘরের তালা খুলিলেন। ঘরের দরজার পাশে কাষ্ঠফলকে লেখা আছে—‘ব্রহ্মচারী এণ্ড ব্রাদার-ইন্-ল, জেনারেল মার্চ্চেণ্টস্।’ এই কারবারের স্বত্বাধিকারী স্বয়ং শ্যামবাবু (শ্যামলাল গাঙ্গুলী) এবং তাঁহার শ্যালক বিপিন চৌধুরী, বি-এস্সি। ঘরে কয়েকটি পুরাতন টেবিল, চেয়ার, আলমারী, প্রভৃতি অফিস-সরঞ্জাম। টেবিলের উপর নানা প্রকার খাতা, বিতরণের জন্য ছাপানো বিজ্ঞাপনের স্তূপ, একটি পুরাতন থ্যাকার্স ডিরেক্টরি, একখণ্ড ইণ্ডিয়ান কোম্পানিজ য়্যাক্ট্, কয়েকটি বিভিন্ন কোম্পানির নিয়মাবলি বা articles, এবং অন্যবিধ কাগজপত্র। দেওয়ালে সংলগ্ন তাকের উপর কতকগুলি ধূলি-ধূসর কাগজমোড়া শিশি এবং শূন্যগর্ভ মাদুলী। একালে শ্যামবাবু পেটেণ্ট ও স্বপ্নাদ্য ঔষধের কারবার করিতেন, এগুলি তাহারই নিদর্শন।
শ্যামবাবুর বয়স, পঞ্চাশের কাছাকাছি,—গাঢ় শ্যামবর্ণ, কাঁচা-পাকা দাড়ি,—আকণ্ঠলম্বিত কেশ, স্থূল লোমশ বপু। অল্পবয়স হইতেই তাঁহার স্বাধীন ব্যবসায়ে ঝোঁক; কিন্তু এ পর্য্যন্ত নানাপ্রকার কারবার করিয়াও বিশেষ সুবিধা করিতে পারেন নাই। ই-বি-রেলওয়ে অডিট অফিসে চাকরীই তাঁহার জীবিকা-নির্বাহের প্রধান উপায়। দেশে কিছু দেবোত্তর সম্পত্তি এবং একটি জীর্ণ কালীমন্দির আছে; কিন্তু তাহার আয় সামান্য। চাকরীর অবকাশে ব্যবসায়ের চেষ্টা করেন,— এ বিষয়ে শ্যালক বিপিনই তাঁহার প্রধান সহায়। সন্তানাদি নাই, কলিকাতার বাসায় পত্নী এবং শ্যালকসহ বাস করেন। ব্যবসায়ের কিছু উন্নতি হইলেই চাকরী ছাড়িয়া দিবেন, এইরূপ সঙ্কল্প আছে। সম্প্রতি ছয় মাসের ছুটি লইয়া, নূতন উদ্যমে ‘ব্রহ্মচারী এণ্ড ব্রাদার-ইন্-ল’ নামে অফিস প্রতিষ্ঠা করিয়াছেন।
শ্যামবাবু ধর্ম্মভীরু লোক, পঞ্জিকা দেখিয়া জীবনযাত্রা নির্ব্বাহ করেন এবং অবসর-মত তান্ত্রিক সাধনা করিয়া থাকেন। বৃথা—অর্থাৎ ক্ষুধা না থাকিলে— মাংস-ভোজন, এবং অকারণে কারণ পান করেন না। কোন্ সন্ন্যাসী সোণা করিতে পারে, কাহার নিকট বামাবর্ত্ত শঙ্খ বা একমুখী রুদ্রাক্ষ আছে, কে পারদ ভস্ম করিতে জানে, এ সকল সন্ধান প্রায়ই লইয়া থাকেন। কয়েক মাস হইতে বাটীতে গৈরিক বাস পরিধান করিতেছেন এবং কতকগুলি অনুরক্ত শিষ্যও সংগ্রহ করিয়াছেন। শ্যামবাবু আজকাল মধ্যে-মধ্যে নিজেকে ‘শ্রীমৎ শ্যামানন্দ ব্রহ্মচারী’ আখ্যা দিয়া থাকেন, এবং অচিরে এই নামে সর্ব্বত্র পরিচিত হইবেন এরূপ আশা করেন।
শ্যামবাবু তাঁহার অফিস-ঘরে প্রবেশ করিয়া, একটি সার্দ্ধ-ত্রিপাদ ইজিচেয়ারে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করিয়া ডাকিলেন—“বাঞ্ছা, ওরে বাঞ্ছা।” বাঞ্ছা শ্যামবাবুর অফিসের বেহারা,—এতক্ষণ পাশের গলিতে টুলে বসিয়া ঢুলিতেছিল,—প্রভুর ডাকে তাড়াতাড়ি উঠিয়া আসিল। শ্যামবাবু বলিলেন, “গঙ্গাজলের বোতলটা আন্—আর খাতাপত্রগুলো একটু ঝেড়ে-মুছে রাখ্, যা ধূলো হয়েচে।” বাঞ্ছা একটা তামার কুপী আনিয়া দিল। শ্যামবাবু তাহা হইতে কিঞ্চিৎ গঙ্গোদক লইয়া মন্ত্রোচ্চারণপূর্ব্বক গৃহমধ্যে ছিটাইয়া দিলেন। তারপর টেবিলের দেরাজ হইতে একটি সিন্দুরচর্চ্চিত রবার ষ্ট্যাম্পের সাহায্যে ১০৮ বার দুর্গানাম লিখিলেন। ষ্ট্যাম্পে ১২ লাইন ‘শ্রীশ্রীদুর্গা’ খোদিত আছে; সুতরাং ৯বার ছাপিলেই কার্যোদ্ধার হয়। এই শ্রমহারক যন্ত্রটির আবিষ্কর্ত্তা শ্রীমান বিপিন। তিনি ইহার নাম দিয়াছেন—‘দি অটোম্যাটিক শ্রীদুর্গাগ্রাফ’ এবং পেটেণ্ট লইবার চেষ্টায় আছেন।
উক্ত প্রকার নিত্যক্রিয়া সমাধা করিয়া, শ্যামবাবু প্রসন্নচিত্তে ব্যাগ হইতে ছাপাখানার একটি ভিজা প্রুফ বাহির করিয়া লইয়া সংশোধন করিতে লাগিলেন। কিছুক্ষণ পরে জুতার মশ্-মশ্ শব্দ করিতে করিতে অটলবাবু ঘরে আসিয়া বলিলেন—“এই যে শ্যাম-দা, অনেকক্ষণ এসেচেন বুঝি? বড় দেরী হয়ে গেল,—কিছু মনে করবেন না,—হাইকোর্টে একটা মোশন ছিল। ব্রাদার-ইন্-ল কোথায়?”
শ্যামবাবু। বিপিন গেছে বাগবাজারে তিনকড়ি বাঁড়ুয্যের কাছে। আজ পাকা কথা নিয়ে আসবে। এই এল বলে।
অটলবাবু চাপকান-চোগাধারী সদ্যোজাত এটর্নি। পিতার অফিসে সম্প্রতি জুনিয়ার পার্ট্নার-রূপে যোগ দিয়াছেন। গৌরবর্ণ, সুপুরুষ,—বিপিনের বাল্যবন্ধু। বয়সে নবীন হইলেও চাতুর্য্যে পরিপক্ব। জিজ্ঞাসা করিলেন—“বুড়ো রাজি হ’ল? আচ্ছা ওকে ধরলেন কি করে?”
শ্যাম। আরে তিনকড়িবাবু হলেন গে শরতের খুড়শ্বশুর। বিপিনের মাস্তুতো ভাই শরৎ। ঐ শরতের সঙ্গে গিয়ে তিনকড়িবাবুকে ধরি। সহজে কি রাজি হয়? বুড়ো যেমন কঞ্জুষ, তেম্নি সন্দিগ্ধ। বলে—আমি হলুম রায়-সাহেব, রিটায়ার্ড ডেপুটি, গবরমেণ্টের কাছে কত মান। কোম্পানির ডিরেক্টর হয়ে কি শেষে পেন্শন্ খোয়াব? তখন নজীর দিয়ে বোঝালুম-কত রিটায়ার্ড বড় বড় অফিসার ত ডিরেক্টরি কচ্ছেন,—আপনার কিসের ভয়? শেষে যখন শুনলে যে, প্রতি মিটিংএ ৩২ টাকা ফি পাবে, তখন একটু ভিজ্ল।
অটল। কত টাকার শেয়ার নেবে?
শ্যাম। তাতে বড় হুঁসিয়ার। বলে—তোমার ব্রহ্মচারী কোম্পানি যে লুঠ করবে না, তার জামিন কে? তোমরা শালা-ভগ্নিপতি মিলে ম্যানেজিং এজেণ্ট হয়ে কোম্পানিকে ফেল করলে, আমার টাকা কোথায় থাকবে? বল্লুম—মশায়, আপনার মত বিচক্ষণ সাবধানী ডিরেক্টর থাকতে কার সাধ্য লুঠ করে। খরচপত্র ত আপনাদের চোখের সামনেই হবে। ফেল হতে দেবেন কেন? মন্দটা যেমন ভাবচেন, ভালর দিকটাও দেখুন। কি রকম লাভের ব্যবসা। খুব কম করেও যদি ৫০ পার্সেণ্ট ডিভিডেণ্ড পান, তবে দু’বছরের মধ্যেই ত আপনার ঘরের টাকা ঘরে ফিরে এল। শেষে অনেক তর্কাতর্কির পর বল্লে—আচ্ছা, আমি শেয়ার নোবো, কিন্তু বেশী নয়; ডিরেক্টর হতে হ’লে যে টাকা দেওয়া দরকার, তার বেশী দোবো না। আজ মত স্থির করে জানাবেন; তাই বিপিনকে পাঠিয়েচি।
অটল। অমন খুঁতখুঁতে লোক নিয়ে ভাল করলেন না শ্যাম-দা। আচ্ছা, মহারাজাকে ধল্লেন না কেন?
শ্যাম। মহারাজাকে ধরতে বড় শিকারী চাই,— তোমার আমার কর্ম্ম নয়। তা’ ছাড়া, পাঁচ ভূতে তাঁকে শুষে নিয়েচে,—কিছু আর পদার্থ রাখে নি।
অটল। খোট্টাটা ঠিক আছে ত? আস্বে কখন?
শ্যাম। সে ঠিক আছে, এই রকম দাঁও মারতেই ত সে চায়। এতক্ষণ তার আসা উচিত ছিল। প্রস্পেক্টস্টা তোমাদের শুনিয়ে আজই ছাপাতে দিতে চাই। তিনকড়িবাবুকে আসতে বলেছিলুম,—বাতে ভুগচেন, আস্তে পারবে না জানিয়েচেন।
রাম রাম বাবুসাহেব!
আগন্তুক মধ্যবয়স্ক, শ্যামবর্ণ, পরিধানে সাদা ধুতি, লম্বা কাল বনাতের কোট, পায়ে বার্ণিস-করা জুতা, মাথায় পীতবর্ণ ভাঁজ-করা মল্মলের পাগড়ি, হাতে অনেকগুলি আংটি, কাণে পান্নার মাকড়ি, কপালে ফোঁটা।
শ্যামবাবু বলিলেন—“আসুন, আসুন— ওরে বাঞ্ছা, আর একটা চেয়ার দে। এই ইনি হচ্চেন অটলবাবু
‘রাম রাম বাবুসাহেব’
আমাদের সলিসিটর দত্ত কোম্পানির পার্টনার। আর ইনি হলেন আমার বিশেষ বন্ধু—বাবু গণ্ডেরীরাম বাট্পারিয়া।”
গণ্ডেরী। নোমোস্কার, আপনের নাম শুনা আছে, জান পহ্চান হয়ে বড় খুশ্ হ’ল।
অটল। নমস্কার, এই আপনার জন্যই আমরা বসে আছি। আপনার মত লোক যখন আমাদের সহায়, তখন কোম্পানির আর ভাবনা কি?
গণ্ডেরী। হেঁ হেঁ—সোকোলি ভগবানের হিঞ্ছা। হামি একেলা কি করতে পারি? কুছু না।
শ্যাম। ঠিক, ঠিক। যা করেন মা তারা দীনতারিণী। দেখ অটল, গণ্ডেরীবাবু যে কেবল পাকা ব্যবসাদার, তা মনে কোরো না। ইংরিজি ভাল না জানলেও, ইনি বেশ শিক্ষিত লোক, আর শাস্ত্রেও বেশ দখল আছে।
অটল। বাঃ, আপনার মত লোকের সঙ্গে আলাপ হওয়ায় বড় সুখী হলুম। আচ্ছা মশায়, আপনি এমন সুন্দর বাংলা বল্তে শিখলেন কি করে?
গণ্ডেরী। বহুত বঙ্গালীর সঙে হামি মিলা মিশা করি। বংলা কিতাব ভি অন্হেক পঢ়েচি। বঙ্কিমচন্দ রবীন্দরনাথ, আউর ভি সব।
এমন সময় বিপিনবাবু আসিয়া পৌঁছিলেন। ইনি একটু সাহেবী মেজাজের লোক,—এককালে বিলাত যাইবার চেষ্টা করিয়াছিলেন। পরিধানে সাদা প্যাণ্ট, কাল কোট, লাল নেকটাই, হাতে সবুজ ফেল্ট্ হ্যাট। উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ, ক্ষীণকায়, গোঁফের দুই প্রান্ত কামানো। শ্যামবাবু ব্যস্ত হইয়া জিজ্ঞাসা করিলেন—“কি হল?”
বিপিন। ডিরেক্টর হবেন বলেচেন; কিন্তু মাত্র দু’হাজার টাকার শেয়ার নেবেন। তোমাকে, অটলকে, আমাকে পরশু সকালে ভাত খাবার নিমন্ত্রণ করেচেন। এই নাও চিঠি।
অটল। তিনকড়িবাবু হঠাৎ এত সদয় যে?
শ্যাম। বুঝলুম না। বোধ হয় ফেলো ডিরেক্টরদের একবার বাজিয়ে যাচাই করে নিতে চান।
অটল। যাক্, এবার কাজ আরম্ভ করুন। আমি মেমোরাণ্ডম্ আর আর্টিকেল্সের মুসবিদা এনেচি। শ্যাম-দা প্রস পেক্টস টা কি রকম লিখলেন পড়ুন।
শ্যাম। হাঁ, সকলে মন দিয়ে শোনো। কিছু বদলাতে হয় ত এই বেলা। দুর্গা—দুর্গা—
জয় সিদ্ধিদাতা গণেশ।
১৯১৩ সালের ৭ আইন অনুসারে রেজিষ্টৃত।
শ্রীশ্রীসিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড।
মুলধন—দশ লক্ষ টাকা, ১০৲ হিসাবে ১০০,০০০ অংশে বিভক্ত। আবেদনের সঙ্গে অংশ-পিছু ২৲ প্রদেয়। বাকী টাকা ৪ কিস্তিতে তিন মাসের নোটিসে প্রয়োজন-মত দিতে হইবে।
অনুষ্ঠান-পত্র
ধর্মই হিন্দুগণের প্রাণস্বরূপ। ধর্মকে বাদ দিয়া এ জাতির কোন কর্ম্ম সম্পন্ন হয় না। অনেকে বলেন— ধর্ম্মের ফল পরলোকে লভ্য। ইহা আংশিক সত্য মাত্র। বস্তুতঃ ধর্ম্মবৃত্তির উপযুক্ত প্রয়োগে ইহলৌকিক ও পারলৌকিক উভযবিধ উপকার হইতে পারে। এতদর্থে সদ্য সদ্য চতুর্ব্বর্গ লাভের উপায়- স্বরূপ এই বিরাট্ ব্যাপারে দেশবাসীকে আহ্বান করা হইতেছে।
ভারতবর্ষের বিখ্যাত দেবমন্দিরগুলির কিরূপ বিপুল আয়, তাহা সাধারণে জ্ঞাত নহেন। রিপোর্ট হইতে জান গিয়াছে যে, বঙ্গদেশের একটি দেবমন্দিরের দৈনিক যাত্রীসংখ্যা গড়ে ১৫ হাজার। যদি লোক-পিছু চারআনা মাত্র আয় ধরা যায়, তাহা হইলে বাৎসরিক আয় প্রায় সাড়ে তের লক্ষ টাকা ঠড়ায়। খরচ যতই হউক, যথেষ্ট টাকা উদ্বৃত্ত থাকে। কিন্তু সাধারণে এই লাভের অংশ হইতে বঞ্চিত।
দেশের এই মহৎ অভাব দুরীকরণার্থ “শ্রীশ্রী সিদ্ধেশ্বরী লিমিটেড” নামে একটি জয়েণ্ট ষ্টক কোম্পানি স্থাপিত হইতেছে। ধর্ম্মপ্রাণ শেয়ার-হোল্ডার-গণের অর্থে একটি মহা তীর্ঘক্ষেত্রের প্রতিষ্ঠা হইবে, এবং জাগ্রত দেখী সম্বিত বৃহৎ মন্দির নির্ম্মিত হইবে। উপযুক্ত ম্যানেজিং এজেণ্টের হস্তে কার্য্য-নির্ব্বাহের ভার ন্যস্ত হইয়াছে। কোনো প্রকার অপবায়ের সম্ভাবনা নাই। শেয়ার-হোল্ডারগণ আশাতীত দক্ষিণা বা ডিভিডেণ্ড পাইবেন এবং একাধারে ধর্ম্ম, অর্থ, মোক্ষ লাভ করিয়া ধন্য হইবেন।
ডিরেক্টরগণ।—(১) অবসরপ্রাপ্ত প্রবীণ বিচক্ষণ ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট রায় সাহেব শ্রীযুক্ত তিনকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়। (২) বিখ্যাত ব্যবসাদার ও ক্রৌরপতি শ্রীযুক্ত গণ্ডেরীরাম বাট্পারিয়া। (৩) সলিসিটল দত্ত এণ্ড কোম্পানির অংশীদার শ্রীযুক্ত অটলবিহারী দত্ত, M.A., B.L. (৪) বিখ্যাত বৈজ্ঞানিক মিস্টার বি, সি চৌধুরী, B. Sc., A. S. S. (U.S.A) (৫) কালী-পদাশ্রিত সাধক ব্রহ্মচারী শ্রীমৎ শ্যামানন্দ (ex-officio)।
অটলবাবু বাধা দিয়া বলিলেন—“বিপিন আবার নূতন টাইটেল পেলে কবে?”
শ্যাম। আরে বল কেন। পঞ্চাশ টাকা খরচ করে আমেরিকা না কামস্কাট্কা কোত্থেকে তিনটে হরফ আনিয়েচে।
বিপিন। বা, আমার কোয়ালিফিকেশন না জেনেই বুঝি তারা শুধু শুধু একটা ডিগ্রি দিলে? ডিরেক্টর হতে গেলে একটা পদবী থাকা ভাল নয়?
গণ্ডেরী। ঠিক বাত। ভেক বিনা ভিখ মিলে না। শ্যামবাবু, অপ্নিও এখন্সে ধোতি উতি ছোড়ে লঙোটি পিন্হুন।
শ্যাম। আমি ত আর নাগা সন্ন্যাসী নই। আমি হলুম শক্তিমন্ত্রের সাধক,— পরিধেয় হল রক্তাম্বর। বাড়ীতে ত গৈরিকই ধারণ করি। তবে অফিসে প’রে আসি না; কারণ, ব্যাটারা সব হা ঁকরে চেয়ে থাকে। আর একটু লোকের চোখ-সহা হয়ে গেলে, সর্ব্বদাই গৈরিক পর্ব। যাক্, পড়ি শোনো—
মেসার্স ব্রহ্মচারী এণ্ড ব্রাদার-ইন্-ল এই কোম্পানির ম্যানেজিং এজেন্সি লইতে স্বীকৃত হইয়াছেন—ইহা পরম সৌভাগ্যের বিষয় তাঁহারা লাভের উপর শতকরা দুই টাকা মাত্র কমিশন লইবেন, এবং যতদিন না—
অটলাবু বলিলেন—“কমিশনের রেট অত কম ধরলেন কেন? দশ পার্সেণ্ট অনায়াসে ফেলতে পারেন।”
গণ্ডেরী। কুছু দরকার নেই। শ্যামবাবুর পর্বস্তি অপ্নেসে হোয়ে যাবে। কমিশনের ইরাদা থোড়াই করেন।
এবং যতদিন না কমিশনে মাসিক ১০০০ টাকা পোষায়, ততদিন
শেষোক্ত টাকা এলাউন্স রূপে পাইবেন।
গণ্ডেরী! শুনেন, অটলবাবু, শুনেন। আপনি শ্যামবাবুকে কি শিখ্লাবেন?
হুগলী জেলার অন্তঃপাতী গোবিন্দপুর গ্রামে ৺সিদ্ধেশ্বরী দেবী বহু শতাব্দী
যাবৎ প্রতিষ্ঠিতা আছেন। দেবীমন্দির ও তৎসংলগ্ন দেবোত্তর সম্পত্তির স্বত্বাধিকারিণী শ্রীমতী নিস্তারিণী দেবী সম্প্রতি স্বপ্নাদেশ পাইয়াছেন যে,
উক্ত গোবিন্দপুর গ্রামে অধুনা সর্ব্বপীঠের সমন্বয় হইয়াছে এবং মাতা তাঁহার
মাহাত্ম্যের উপযোগী সুবৃহৎ মন্দিরে বাস করিতে ইচ্ছা করেন। শ্রীমতী
নিস্তারিণী দেবী অবলা বিধায়, এবং উক্ত দৈবাদেশ স্বয়ং পালন করিতে অপারগা বিধায়, উক্ত দেবোত্তর সম্পত্তি মায় মন্দির, বিগ্রহ, জমি, আওলাত
আদি এই লিমিটেড কোম্পানিকে সমর্পণ করিতেছেন।
অটল। নিস্তারিণী দেবী আবার কোত্থেকে এলেন? সম্পত্তি ত আপনার বলেই জান্তুম।
শ্যাম। উনি আমার স্ত্রী। সেদিন তাঁর নামেই সব লেখাপড়া করে দিয়েচি। আমি আর এ সব বৈষয়িক ব্যাপারে লিপ্ত থাকতে চাই না।
গণ্ডেরী। ভাল বন্দ্বস্ত্ কিয়েচেন। অপনেকো কোই দুস্বে না। নিস্তার্নী দেবীকো কোন্ পহ্চানে। দাম কেতো লিচ্চেন?
অতঃপর তীর্থ-প্রতিষ্ঠা, মন্দির-নির্মাণ. দেবসেবাদি কোম্পানি কর্ত্তৃক সম্পন্ন হইবে; এবং এতদর্থে কোম্পানি মাত্র ১৫,০০০৲ টাকা পণে সমস্ত সম্পত্তি খরিদার্থে বয়ান করিয়াছেন।
গণ্ডেরী। হদ্দ্ কিয়া শ্যামবাবু। জঙ্গল কি ভিতর পুরানা মন্দিল, উস্মে দো চার শোও ছুছুন্দর, ছটাক ভর জমীন, উস্পর দোঁ—চার বাঁশ ঝাড়,— বস্, ইসিকা দাম পন্দ্র হাজার!
শ্যাম। কেন, অন্যায়টা কি হল? স্বপ্নাদেশ, একান্ন পীঠ এক ঠাঁই, জাগ্রত দেবী,—এ সব বুঝি কিছু নয়? গুড্-উইল হিসেবে পনর হাজার টাকা খুবই কম।
গণ্ডেরী। অচ্ছা। যদি কোই শেয়ার—হোল্ডার হাইকোট মে দরখাস্ত্ পেশ করে—সপন উপন জব ঝুট্, ছকলায়কে রুপেয়া লিয়া,—তব্?
অটল। সে একটা কথা বটে, কিন্তু এ সব আধিদৈবিক ব্যাপার বোধ হয় অরিজিনেল সাইডের জুরিসুডিক্শনে পড়ে না। আইন বলে— caveat emptor অর্থাৎ ক্রেতা, সাবধান! সম্পত্তি কেনবার সময় যাচাই করনি কেন? যা হোক একবার expert opinion নোবো।
শীঘ্রই নূতন দেবালয় আরম্ভ হইবে। তৎসংলগ্ন প্রশস্ত নাটমন্দির, নহবৎখানা, ভোগশালা, ভাণ্ডার প্রভৃতি আনুষঙ্গিক গৃহাদিও থাকিবে। আপাততঃ দশ হাজার যাত্রীর উপযোগী অতিথিশালা নির্ম্মিত হইবে। শেয়ার হোল্ডারগণ বিনা খরচায় সেখানে সপরিবারে বাস করিতে পারিবেন। হাট, বাজার, যাত্রা, থিয়েটার, বায়োস্কোপ ও অন্যান্য আমোদ-প্রমোদের আয়োজন যথেষ্ট থাকিবে। যাহারা দৈবাদেশ বা ঔষধপ্রাপ্তির জন্য হত্যা দিবেন, তাঁহাদের জন্য বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা থাকিবে। মোট কথা, তীর্থযাত্রী আকর্ষণ করিবার সর্ব্বপ্রকার উপায়ই অবলম্বিত হইবে। স্বয়ং শ্রীমৎ শ্যামানন্দ ব্রহ্মচারী ৺সেবার ভার লইবেন।
যাত্রিগণের নিকট হইতে যে দর্শনী ও প্রণামী আদায় হইবে, তাহা ভিন্ন আরও নানা উপায়ে অর্থাগম হইবে। দোকান, হাট, বাজার, অতিথিশীলা, মহাপ্রসাদ বিক্রয়, প্রভৃতি হইতে প্রচুর আয় হইবে। এতদ্ভিন্ন by-product recovery-র ব্যবস্থা খাকিবে। ৺সেবার ফুল হইতে সুগন্ধি তৈল প্রস্তুত হইবে, এবং প্রসাদী বিল্বপত্র মাদুলীতে ভরিয়া বিক্রীত হইবে। চরণামৃতও বোতলে প্যাঁক করা হইবে। বলির জন্য নিহত ছাগসমূহের চর্ম্ম ট্যান করিয়া উৎকৃষ্ট কিড-স্কিন্ প্রস্তুত হইবে এবং বহুমূল্যে বিলাতে চালান যাইবে। হাড় হইতে বোতাম হইবে। কিছুই ফেলা যাইবে না।
গণ্ডেরী। বকড়ি মারবেন? হামি ইস্মে নেহি, রামজি কিরিয়া। হামার নাম কাটিয়ে দিন।
শ্যাম। আপনি ত আর নিজে বলি দিচ্চেন না। আচ্ছা, না হয় কুম্ড়ো-বলির ব্যবস্থা করা যাবে।
অটল। কুমড়োর চামড়া ত ট্যান হবে না। আয় কমে যাবে। কিহে বৈজ্ঞানিক, কুমড়োর খোসার একটা গতি করতে পার?
বিপিন। কষ্টিক পটাশ দিয়ে বয়েল কল্লে বোধ হয় ভেজিটেব্ল্ শু হ’তে পারে। এক্সপেরিমেণ্ট করে দেখ্ব।
গণ্ডেরী। যো খুশী করে। হামার কি আছে। হামি থোড়া রোজ বাদ অপ্না শেয়ার বিলকুল বেচে দিব।
হিসাব করিয়া দেখা হইয়াছে যে, কোম্পানির লাভ বাৎসরিক অন্ততঃ ১২ লক্ষ টাকা হইবে; এবং অনায়াসে ১০০ পার্সেণ্ট ডিভিডেণ্ড দেওয়া যাইবে। ৩০ হাজার শেয়ারের আবেদন পাইলেই allotment হইবে। সত্বর শেয়ারের জন্য আবেদন করুন। নইলে এই স্বর্ণ-সুযোগ হইতে বঞ্চিত হইবেন।
গণ্ডেরী। লিখে লিন—ঢাঁই লাখ টাকার শেয়ার বিক্রি হয়ে গেছে। হামি এক লাখ লিব, বাকী দেড় লাখ শ্যামবাবু, বিপিনবাবু, অটলবাবু সমান হিসসা লিবেন।
শ্যাম। পাগল আর কি। আমি আর বিপিন কোথা থেকে পঞ্চাশ-পঞ্চাশ হাজার বার করব? আপনারা না-হয় বড় লোক আছেন।
গগুেরী। হামি শালা রুপেয়া ডালবো আর তুমি লোগ্ মৌজ করবে? সো হোবে না। সব্কো ঝোঁখি লেনা পড়েগা। শ্যামবাবু মতলব সমঝলেন না? টাকা কোই দিব না। সবু হাওলাতি থাকবে। মানেজিং এজিণ্ট মহাজন হোবে।
অটল। বুঝলেন শ্যাম-দা? আমরা সকলে যেন ম্যানেজিং এজেণ্টস্দের কাছ থেকে কর্জ্জ করে নিজের নিজের শেয়ারের টাকা কোম্পানিকে দিচ্চি; আবার কোম্পানি ঐ টাকা ম্যানেজিং এজেণ্টসের কাছে গচ্ছিত রাখচে। গাঁট থেকে এক পয়সাও কেউ দিচ্ছেন না, টাকাটা কেবল খাতাপত্রেই জমা থাকবে।
শ্যাম। তারপর তাল সামলাবে কে? কোম্পানি ফেল হ’লে আমি মারা যাই আর কি! বাকী কলের টাকা দোবো কোথা থেকে?
গণ্ডেরী। ডরেন কেনো? শেয়ার পিছ্ তো অভি দো টাকা দিতে হবে। ঢাই লাখ টাকার শেয়ারে স্রিফ্ পঁচাশ হাজার দেনা হোয়। প্রিমিয়ম্ মে সব্ বেচে দিব—সুবিস্তা হোয় ত, আউর ভি শেয়ার ধরে রাখবো। বহুত মুনাফা মিল্বে। চিম্ড়িমল্ ব্রোকারসে হামি বন্দোবস্ত কিয়েছি। দো চার দফে হম্ লোগ অপ্না অপ্নি
‘ঐসী গতি সন্সারমে’
শেয়ার লেকে খেল্বো, হাঁথ বদ্লাবো, দাম চঢ়বে০, বাজার গরম হোবে। তখন সব্ কোই শেয়ার মাংবে, দাম কা বিচার করবে না। কবীরজি কি বচন শুনিয়ে—
ঐসী গতি সন্সারমে যো গাড়র কি ঠাট।
এক পড়া যব্ গাড়মে সবৈ যাত তেহি বাট॥
মানি হচ্ছে—সন্সারের লোক সব্ যেন ভেড়ার পাল। এক ভেড়া যদি খাদ্দেমে গির্ পড়ে তো সব্ কোই উসিমে ঘুসে।
শ্যামবাবু দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়িয়া বলিলেন—“তারা ব্রহ্মময়ি, তুমিই জান। আমি ত নিমিত্ত মাত্র। তোমার কাজ তুমিই উদ্ধার ক’রে দাও মা—অধম সন্তানকে যেন মের না।”
গণ্ডেরী। শ্যামবাবু, মন্দিল উন্দিল কা কোম্পনি যো কর্ণা হ্যায় কিজিয়ে। উস্কি সাথ ঘই-এর কারবার ভি লাগায় দিন। টাকায় টাকা লাভ।
অটল। ঘই কি চিজ্?
গণ্ডেরী। ঘই জানেন না? ঘিউ হোচ্ছে অস্লি চিজ,—যো গায় ভইস বকড়িকা দুধসে বনে। আউর নক্লি যো হ্যায় সো ঘই কহ্লাতা চর্ব্বি, চীনাবাদাম তেল ওগায়রহ মিল কর্ বনায়া যাতা। পর্ সাল হামি ঘই-এর কামে পচিশ হাজার লাগাই, সাঢ়ে চৌত্রিশ হাজার মুনাফা মিলে।
অটল। উঃ বিস্তর সাপ মেরেছিলেন বলুন!
গণ্ডেরী। আরে সাঁপ কাঁহাসে মিল্বে? উ সব ঝুট বাত।
অটল। আচ্ছা গণ্ডারজি—
গণ্ডেরী। গণ্ডার নেহি, গণ্ডেরী।
অটল। হাঁ হাঁ, গণ্ডেরীজি। বেগ্ ইওর পার্ডন। আচ্ছা, আপনি ত নিরামিষ খান, ফোঁটা কাটেন, ভজনপূজনও করেন।
গণ্ডেরী। কেনো করবো না? হামি হর্ রোজ গীতা আউর রাম-চরিত-মানস পঢ়ি, রাম-ভজনভি করি।
অটল। তবে অমন পাপের ব্যবসাটা করলেন কি বলে? .
গণ্ডেরী। পাঁপ? হামার কেনো পাঁপ হোবে? বেব্সা ত করে কাসেম আলি। হামি রহি কলকত্তা, ঘই বনে হাথরস্মে! হামি ন আঁখ্সে দেখি—ন নাকসে শুংখি—হলুমানজি কিরিয়া। হামি ত স্রিফ্ মহাজন আছি—রুপেয়া দে কর্ খালাস। সুদ লি, মুনাফার আধা হিস্সা ভি লি। যদি হামি টাকা না দি, কাসেম আলি দুসরা ধনিসে লিবে। পাঁপ হোবে ত শালা কাসেম আলিকা হোবে। হামার কি? যদি ফিন্ কুছ দোষ লাগে,—জানে রণ্ছোড়জি—হামার গুণ্ভি থোড়া বহুত জমা আছে। একাদ্সি, শিউরাত, রামনওমীমে উপবাস, দান-খয়রাত ভি কুছু করি। আট আটঠো ধরমশালা বানোআয়া,—লিলুয়ামে, বালিমে, শেওড়াফুলিমে—
অটল। লিলুয়ার ধর্ম্মশালা ত আসর্ফিলাল ঠুনঠুনওয়ালা করেচে।
গণ্ডেরী। কিয়েছে ত কি হইয়েছে। সভিত ওহি কিয়েছে। লেকিন্ বানিয়ে দিয়েছে কোন্? তদারক কোন্ কিয়েছে? ঠিকাদার কোন লাগিয়েছে? সব হামি। আসর্ফি হামার চাচেরা ভাই লাগে। হামি সলাহ্, দিয়েছি তব না রুপেয়া খরচ কিয়েছে।
অটল। মন্দ নয়,—টাকা ঢাললে আসর্ফি, পুণ্য হ’ল গণ্ডেরীর।
গণ্ডেরী। কেনো হোবে না? দো দো লাখ রুপেয়া হর্ জগেমে খরচ কিয়া। জোড়িয়ে ত কেত্না হোয়। উস্ পর কম্সে কম্ সয়কড়া পাঁচ রুপেয়া দস্তুরী ত হিসাব কিজিয়ে। হাম্ ত বিলকুল ছোড় দিয়া। আসর্ফিলালক। পুণ্ যদি সোলহ্ লাখকা হোয়, মেরাভি অস্সি হজার মোতাবেক হোনা চাহ্তা।
অটল। চমৎকার ব্যবস্থা! পুণ্যেরও দেখচি দালালী পাওয়া যায়। আমাদের শ্যাম-দা গণ্ডেরী-দা যেন মাণিকজোড়।
গণ্ডেরী। অটলবাবু, আপ্নি দো চার কিতাব পঢ়িয়ে হামাকে ধরম কি শিখ্লাবেন? বঙ্গালি ধরম জানে না। কিস রুপেয়ার নোকরি করবে, পাঁচ পইসার হরিলুঠ দিবে। হামার জাত রুপেয়া ভি কামায় হিসাব্সে, পুণ্ ভি করে হিসাব্সে। অপ্নেদের রবীন্দরনাথ কি লিখচেন—
বৈরাগ্ সাধন মুক্তি সো হমার নেহি।
হামি এখন চল্তি, বেস খেল্নে। কোণ্ট্রি গেরিল ঘোড়ে পর্ আজ দো চারশও লাগাওয়েঙ্গে।
অটল। আমিও উঠি শ্যাম-দা। আর্টিকেলের মুসবিদ রেখে যাচ্ছি, দেখে রাখবেন। প্রস্পেক্টস্ ত দিব্বি হয়েচে। একটু-আধটু বদলে দেবো এখন। পরশু আবার দেখা হবে। নমস্কার!
বাগবাজারে গলির ভিতর রায়-সাহেব তিনকড়িবাবুর বাড়ী। নীচের তলায় রাস্তার সম্মুখে নাতিবৃহৎ বৈঠকখানা ঘরে গৃহকর্ত্তা বং নিমন্ত্রিতগণ গল্পে নিরত; —অন্দর হইতে কখন্ ভোজনের ডাক আসিবে, তাহারই প্রতীক্ষা করিতেছেন। আজ রবিবার তাড়া নাই, বেলা অনেক হইয়াছে।
তিনকড়িবাবুর বয়স ষাট বৎসর, ক্ষীণ দেহ, দাড়ি কামানো। শীর্ণ গোঁফে তামাকের ধোঁয়ায় পাকা খেজুরের রং ধরিয়াছে,—কথা কহিবার সময় আরসোলার দাড়ার মত নড়ে। তিনি দৈব-ব্যাপারে বড়-একটা বিশ্বাস করেন না। প্রথম পরিচয়ে শ্যামবাবুকে বুজরুক সাব্যস্ত করিয়াছিলেন, কেবল লাভের কোম্পানিতে যোগ দিয়াছেন। কিন্তু আজ কালীঘাট হইতে প্রত্যাগত সদ্যঃ স্নাত শ্যামবাবুর অভিনব মুর্ত্তি দেখিয়া কিঞ্চিৎ আকৃষ্ট হইয়াছেন। শ্যামবাবুর পরিধানে লাল চেলী, গেরুয়া রংএর আলোয়ান, পায়ে বাঘের চামড়ার শিং-তোলা জুতা। দাড়ি এবং চুল সাজিমাটি দ্বারা যথাসম্ভব ফাঁপানো্, এবং কপালে মস্ত একটি সিন্দুরের ফোঁটা।
তিনকড়িবাবু তামাক-টানার অন্তরালে বলিতেছিলেন—“দেখুন স্বামিজি, হিসেবই হল ব্যবসার সব। ডেবিট ক্রেডিট যদি ঠিক থাকে, আর ব্যালান্স যদি মেলে, তবে সে বিজ্নেসের কোনো ভয় নেই।”
শ্যামবাবু। আজ্ঞে, বড় যথার্থ কথা বলেচেন। সে জন্যই তা আমরা আপনাকে চাই। আপনাকে আমরা মধ্যে মধ্যে এসে বিরক্ত করব, হিসেব সম্বন্ধে পরামর্শ নোবো—
তিনকড়ি। বিলক্ষণ, বিরক্ত হব কেন। আমি সমস্ত accounts ঠিক করে দোবো। মিটিংগুলো একটু ঘন ঘন করবেন। না হয় ডিরেক্টর্স্ ফি বাবদ কিছু বেশী খরচ হবে। দেখুন, অডিটার ফডিটার আমি বুঝি না। আরে বাপু, নিজের জমা-খরচ যদি নিজে না বুঝলি, তবে বাইরের একটা অর্ব্বাচীন ছোকরা এসে তার কি বুঝবে? ভারি আজকাল সব বুক-কিপিং শিখেছেন। সে কি জানেন,—একটা গোলকধাঁধাঁ, কেউ যাতে না বোঝে তারই চেষ্টা। আমি বুঝি— রোজ কত টাকা এল, কত খরচ হল, আর আমার মজুদ রইল কত। আমি যখন আমড়াগাছি সবডিভিশনের ট্রেজারির চার্জে, তখন এক নতুন কলেজে-পাশ গোঁফ-কামানো ডেপুটি এলেন আমার কাছে কাজ শিখতে। সে ছোকরা কিছুই বোঝে না, অথচ অহঙ্কারে আমার কাজে গলদ ধরবার আম্পর্দ্ধা। শেষে ভরা। লিখলম কোল্ডহ্যাম সাহেবকে, যে হুজুর, তোমরা রাজার, জাত, দু’ঘা দাও তাও সহ্য হয়, কিন্তু দিশি ব্যাঙাচির লাথি বরদাস্ত করব না। তখন সাহেব ‘নিজে এসে, সমস্ত বুঝে নিয়ে, আড়ালে ছোকরাকে ধমকালেন। আমাকে পিঠ চাপড়ে হেঁসে বল্লেন—ওয়েল তিনকড়িবাবু, তুমি হলে কত কালের সিনিয়র অফিসর, একজন ইয়ং চ্যাপ তোমার কদর কি বুঝবে? তারপর দিলেন আমাকে নওগাঁয়ে গাঁজা-গোলার চার্জে বদলী করে। যাক্ সে কথা। দেখুন, আমি বড় কড়া লোক। জবরদস্ত হাকিম বলে আমার নাম ছিল। মন্দির-টন্দির আমি বুঝি না,—কিন্তু একটি আধলাও কেউ আমাকে ফাঁকি দিতে পারবে না। রক্ত-জল-করা টাকা আপনার জিম্মায় দিচ্ছি, দেখবেন যেন—
শ্যাম। সে কি কথা! আপনার টাকা আপনারই থাকবে, আর শতগুণ বাড়বে। এই দেখুন না—আমি আমার যথাসর্ব্বস্ব পৈত্রিক পঞ্চাশ হাজার টাকা এতে ফেলেচি। আমি না হয় সর্ববত্যাগী সন্ন্যাসী,—অর্থে প্রয়োজন নেই, —লাভ যা হবে মায়ের সেবাতেই ব্যয় করব। বিপিন, আর এই অটল ভায়াও প্রত্যেকে পঞ্চাশ হাজার ফেলেচেন। গণ্ডেরী এক লাখ টাকার শেয়ার নিয়েচে। সে মহা হিসেবী লোক, —লাভ নিশ্চিত না জান্লে কি নিত?
তিনকড়ি। বটে, বটে? শুনে আশ্বাস হচ্চে। আচ্ছা, একবার কোল্ডহ্যাম সাহেবকে কনসল্ট্ করলে হয় না? অমন সাহেব আর হয় না।
“ঠাঁই হয়েচে”—চাকর আসিয়া খবর দিল।
“উঠতে আজ্ঞা হোক ব্রহ্মচারী মশায়, আসুন অটলবাবু, চলহে বিপিন।” তিনকড়িবাবু সকলকে অন্দরের বারান্দায় আনিলেন।
শ্যামবাবু বলিলেন —“ক’রছেন কি রায় সাহেব, এযে রাজসূয় যজ্ঞ। কই, আপনি বস্লেন না?”
তিনকড়ি। বাতে ভুগ্চি, ভাত খাইনে, দুখান সুজির রুটি বরাদ্দ।
শ্যাম। আমি একটি ফেৎকারিণী তন্ত্রোক্ত কবচ পাঠিয়ে দোবো, ধারণ করে দেখবেন। শাক-ভাজা, কড়াইএর ডাল—এটা কি দিয়েছ ঠাকুর, এঁচোড়ের ঘণ্ট? বেশ, বেশ। শোধন করে নিতে হবে। সুপক্ক কদলী আর গবাঘৃত বাড়াতে হবে কি? আয়ুর্ব্বেদে আছে—পনসে কদলং কদলে ঘৃতং। কদলী ভক্ষণে পনসের দোষ নষ্ট হয়, আবার ঘৃতের দ্বারা কদলীর শৈত্যগুণ দূর হয়। পুঁটিমাছ—ভাজা,—বাঃ। রোহিতাদপি, রোচকাঃ, পুণ্টিকা: সদ্যভজ্জিতাঃ ওটা কিসের অম্বল বল্লে,—কামরাঙা? সর্বনাশ, তুলে নিয়ে যাও। গত বৎসর শ্রীক্ষেত্রে গিয়ে ঐ ফলটি জগন্নাথ প্রভুকে, দান করেচি। অম্বল জিনিষটা আমার সয়ও না, — শ্লেষ্মার ধাত কি না। উস্প, উস্প, উস্প। প্রাণায় অপানায় সোপানায় স্বাহা। শয়নে পদ্মনাভঞ্চ ভোজনেতু জনার্দ্দনঃ। আরম্ভ কর হে অটল।
অটল। (জনান্তিকে) আরম্ভের ব্যবস্থা যা দেখচি, তাতে বাড়ী গিয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করতে হবে।
তিনকড়ি। আচ্ছা ঠাকুর-মশায়, আপনাদের তন্ত্রশাস্ত্রে এমন কোনো প্রক্রিয়া নেই, যার দ্বারা লোকের —ইয়ে—মানমর্য্যাদা বৃদ্ধি পেতে পারে?
শ্যাম। অবশ্য আছে! যথা কুলার্ণবে— অমানিনাং মানদেন। অর্থাৎ কুলকুণ্ডলিনী জাগ্রতা হলে অমানী ব্যক্তিকেও মান দেন। কেন বলুন ত?
তিনকড়ি। হাঃ হাঃ, সে একটা তুচ্ছ কথা। কি জানেন, কোল্ডহ্যাম সাহেব বলেছিলেন, সুবিধা পেলেই লাট সাহেবকে ধরে আমায় বড় খেতাব দেওয়াবেন। বারবার ত রিমাইণ্ড করা ভাল দেখায় না, তাই ভাবছিলুম, যদি তন্ত্রে-মন্ত্রে কিছু হয়। মানিনে যদিও, তবু—
শ্যাম। মানতেই হবে। শাস্ত্র মিথ্যা হতে পারে না। আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন, এ বিষয়ে আমার সমস্ত সাধনা নিয়োজিত করব। তবে সদ্গুরু প্রয়োজন, দীক্ষা ভিন্ন এ সব কাজ হয় না। গুরুও আবার যে সে হলে চলবে না। খরচ—তা আমি যথাসম্ভব অল্পেই নির্ব্বাহ করতে পারব।
তিনকড়ি। হুঁ। দেখা যাবে এখন। আচ্ছা, আপনাদের অফিসে ত বিস্তর লোকজন দরকার হবে, তা—আমার একটি শালীপো আছে, তার একটা হিল্লে লাগিয়ে দিতে পারেন না? বেকার বসে-বসে আমার অন্ন ধ্বংস করচে,—লেখাপড়া শিখলে না,—কুসঙ্গে মিশে বিগ্ড়ে গেছে। একটা চাকরী জুটলে বড় ভাল হয়। ছোকরা বেশ চটপটে আর স্বভাব-চরিত্রও বড় ভাল।
শ্যাম। আপনার শালীপো? কিছু বলতে হবে না। আমি তাকে মন্দিরের হেড পাণ্ডা করে দোবো। এখনি গোটা-পনর দরখাস্ত এসেছে— তার মধ্যে পাঁচজন গ্রাজুয়েট। তা আপনার আত্মীয়ের ক্লেম সবার ওপর।
তিনকড়ি। আর একটি অনুরোধ। আমার বাড়ীতে একটি পুরানো কাঁসর আছে,—একটু ফেটে গেছে, কিন্তু আদত খাঁটি কাঁসা। এ জিনিসটা মন্দিরের কাজে লাগানো যায় না? সস্তায় দোবো।
শ্যাম। নিশ্চয়ই নেবো। ওসব সেকেলে জিনিষ কি এখন সহজে মেলে?
গণ্ডেরীর ভবিষ্যদ্বাণী সফল হইয়াছে। বিজ্ঞাপনের জোরে এবং প্রতিষ্ঠাতৃগণের চেষ্টায় সমস্ত শেয়ারই বিলি হুইয়া গিয়াছে। লোকে শেয়ার লইবার জন্য অস্থির, বাজারে চড়া দামে বেচা-কেনা হইতেছে।
অটলবাবু বলিলেন—“আর কেন শ্যাম-দা, এইবার নিজের শেয়ার সব ঝেড়ে দেওয়া যাক। গণ্ডেরী ত খুব একচোট মারলে। আজকে ডবল দর। দুদিন পরে কেউ ছোঁবেও না।”
শ্যাম। বেচতে হয় বেচ, মোদ্দা কিছু ত হাতে রাখতেই হবে, নইলে ডিরেক্টর হবে কি করে?
অটল। ডিরেক্টরি আপনি করুন গে। আমি আর হাঙ্গামায় থাকতে চাইনে। সিদ্ধেশ্বরীর কৃপায় আপনার ত কার্য্যসিদ্ধি হয়েচে।
শ্যাম। এই ত সবে আরম্ভ। মন্দির, ঘরদোর, হাট-বাজার সবই ত বাকী। তোমাকে কি এখন ছাড়া যায়!
অটল। থেকে আমার লাভ? পেটে খেলে পিঠে সয়। এখন ত ব্রাদার-ইন্-ল কোম্পানির মরশুম চল্ল। আমাদের এইখানেই শেষ।
শ্যাম। আরে ব্যস্ত হও কেন, এক যাত্রায় কি পৃথক
‘আ—আ—আমি জান্তে চাই’
ফল হয়? সন্ধ্যেবেলা যাব এখন তোমাদের বাড়ীতে, —গণ্ডেরীকেও নিয়ে যাব।
দেড় বৎসর কাটিয়া গিয়াছে। ব্রহ্মচারী এণ্ড ব্রাদার-ইন্-ল কোম্পানির অফিসে ডিরেক্টরগণের সভা বসিয়াছে।
সভাপতি তিনকড়িবাবু টেবিলে ঘুসি মারিয়া বলিতেছিলেন—“আ—আ—আমি জান্তে চাই, টাকা সব গেল কোথা। আমার ত বাড়ীতেই টেকা ভার,—সবাই এসে তাড়া দিচ্চে। কয়লাগুলা বলে তার পঁচিশ হাজার টাকা পাওনা,—ইঁটখোলার ঠিকাদার বলে বারো হাজার,—তারপর ছাপাখানাওলা, শার্পার কোম্পানি, কুণ্ডু মুখুয্যে, আরো কত কে আছে। বলে আদালতে যাব। মন্দিরের কোথা কি তার ঠিক নেই—এর মধ্যে দু’লাখ টাকা ফুঁকে গেল? সে ভণ্ড জোচ্চোরটা গেল কোথা? শুন্তে পাই ডুব মেরে আছে, অফিসে বড় একটা আসে না।
অটল। ব্রহ্মচারী বলেন, মা তাঁকে অন্য কাজে ডাকচেন, —এদিকে আর তেমন মন নেই। আজ ত মিটিংএ আসবেন বলেচেন।
বিপিন বলিলেন—“ব্যস্ত হচ্ছেন কেন সার, এই ত ফর্দ্দ রয়েচে, দেখুন না— জমি কেনা, শেয়ারের দালালী, preliminary expense, ইঁট-তৈরি, establishment, বিজ্ঞাপন, অফিস-খরচ—
তিনকড়ি। চোপরও ছোকরা। চোরের সাক্ষী গাঁটকাটা।
এমন সময় শ্যামবাবু আসিয়া উপস্থিত হইলেন। বলিলেন—“ব্যাপার কি?”
তিনকড়ি। ব্যাপার আমার মাথা। আমি হিসেক চাই।
শ্যাম। বেশ ত, দেখুন না হিসেব। বরঞ্চ একদিন গোবিন্দপুরে নিজে গিয়ে কাজকর্ম্ম তদারক করে আসুন।
তিনকড়ি। হ্যাঁঃ, আমি এই বাতের শরীর নিয়ে তোমার ধ্যাধ্যেড়ে গোবিন্দপুরে গিয়ে মরি আর কি। সে হবে না, —আমার টাকা ফেরৎ দাও। কোম্পানি ত যেতে বসেছে। শেয়ার-হোল্ডাররা মার-মার কাটকাট করচে।
শ্যামবাবু কপালে যুক্তকর ঠেকাইয়া বলিলেন— “সকলি জগন্মাতার ইচ্ছা। মানুষ ভাবে এক, হয় আর এক। এতদিন ত মন্দির শেষ হওয়ারই কথা। গুলো অজ্ঞাতপূর্ব্ব কারণে খরচ বেশী হয়ে গিয়ে টাকার অনাটন হয়ে পড়ল,—তাতে আমাদের আর অপরাধ কি? কিন্তু চিন্তার কোনো কারণ নেই, ক্রমশঃ সব ঠিক হয়ে যাবে। আর একটা callএর টাকা তুললেই সমস্ত দেনা শোধ হয়ে যাবে, কাজও এগ্রেবে।”
গণ্ডেরী বলিলেন—“আউর টাকা কোই দিবে না। আপনোকা থোড়াই বিশোয়াস্ করবে।”
শ্যাম। বিশ্বাস না করে, নাচার্। আমি দায়মুক্ত,—মা যেমন করে পারেন নিজের কাজ চালিয়ে নিন। আমাকে বাবা বিশ্বনাথ কাশীতে টানচেন,সেখানেই আশ্রয় নোবো।
তিনকড়ি। তবে কি বলতে চাও, কোম্পানি ডুব্লো?
গণ্ডেরী। বিশ হাঁথ পানি।
শ্যাম। আচ্ছা তিনকড়িবাবু, আমাদের ওপর যখন লোকের এতই অবিশ্বাস, বেশ ত, আমরা না নয় ম্যানেজিং এজেন্সি ছেড়ে দিচ্চি। আপনার নাম আছে, সম্ভ্রম আছে, লোকেও শ্রদ্ধা করে; আপনিই ম্যানেজিং ডিরেক্টর হয়ে কোম্পানি চালান না?
অটল। এইবার পাকা কথা বলেচেন।
তিনকড়ি। হ্যাঁঃ, আমি বদ্নামের বোঝা ঘাড়ে নিই, আর ঘরের খেয়ে বুনো মোষ তাড়াই।
শ্যাম। বেগার খাটবেন কেন? আমিই এই মিটিংএ প্রস্তাব করচি যে, রায়-সাহেব শ্রীযুক্ত তিনকড়ি ব্যানার্জি মহাশয়কে মাসিক ১০০০৲ পারিশ্রমিক দিয়ে কোম্পানি চালাবার ভার অর্পণ করা হোক। এমন উপযুক্ত কর্ম্মদক্ষ লোক আর কোথা? আর আমরা যদি ভুলচুক করেই থাকি, তার দায়ী ত আর আপনি হবেন না।
তিনকড়ি। তা—তা—আমি এখন চট্ করে কথা দিতে পারি নে। ভেবে চিন্তে দেখব।
অটল। আর দ্বিধা করবেন না রায়-সাহেব। আপনিই এখন ভরসা।
শ্যাম। যদি অভয় দেন ত আর একটি নিবেদন করি। আমি বেশ বুঝেচি, অর্থ হচ্চে সাধনের অন্তরায়। আমার সমস্ত সম্পত্তিই বিলিয়ে দিয়েচি—কেবল এই কোম্পানির ষোলশ-খানেক শেয়ার আমার হাতে আছে। তাও সৎপাত্রে অর্পণ করতে চাই। আপনিই সেটা নিয়ে নিন। প্রিমিয়ম চাই না— আপনি কেনা দাম ৩২০০৲ মাত্র দিন।
তিনকড়ি। হ্যাঁঃ, ভাল করে আমার ঘাড় ভাংবার মতলব।
শ্যাম। ছি ছি। আপনার ভালই হবে। না হয় কিছু কম দিন,—চব্বিশ শ—দু’হাজার —হাজার—
তিনকড়ি। এক কড়াও নয়।
শ্যাম। দেখুন, ব্রাহ্মণ হতে ব্রাহ্মণের দান প্রতিগ্রহ নিষেধ, নৈলে আপনার মত লোককে আমার অমনিই দেবার কথা। আপনি যৎকিঞ্চিৎ মূল্য ধরে দিন। ধরুন—পাঁচশ টাকা। Transfer form আমার প্রস্তুতই আছে,—নিয়ে এস ত বিপিন।
তিনকড়ি। আমি এ—এ—আশী টাকা দিতে পারি।
শ্যাম। তথাস্তু। বড়ই লোকসান হল, কিন্তু সকলি মায়ের ইচ্ছা।
গণ্ডেরী। বাহবা তিনকৌড়িবাবু, বহুৎ কিফায়ৎ হুয়া।
তিনকড়িবাবু পকেট হইতে মনিব্যাগ বাহির করিয়া সদ্যোপ্রাপ্ত পেন্শনের টাকা হইতে আটখানা আন্কোরা দশ টাকার নোট সন্তর্পণে গণিয়া দিলেন। শ্যামবাবু পকেটস্থ করিয়া বলিলেন—“তবে এখন আমি আসি। বাড়ীতে সত্যনারায়ণের পূজা আছে। আপনিই কোম্পানির ভার নিলেন এই কথা স্থির। শুভমস্ত—মা দশভুজা আপনার মঙ্গল করুন।”
শ্যামবাবু প্রস্থান করিলে, তিনকড়িবাবু ঈষৎ হাসিয়া বলিলেন—“লোকটা দোষে-গুণে মানুষ। এদিকে যদিও হম্বগ্, কিন্তু মেজাজটা দিলদরিয়া। কোম্পানির ঝক্কিটা ত এখন আমার ঘাড়ে পড়ল। ক’মাস বাতে পঙ্গু হয়ে পড়েছিলুম, কিছুই দেখতে পারি নি, —নৈলে কি কোম্পানির অবস্থা এমন হয়? যা হোক, উঠে পড়ে লাগতে হল, —আমি লেফাফা-দুরস্ত কাজ চাই, আমার কাছে কারো চালাকী চলবে না।”
গণ্ডেরী। আপ্নের কুছু তক্লিফ করতে হোবে না কম্প্নি ত ডুব গিয়া। অপ্কোভি ছুট্টি।
‘কুছ্, ভি নেহি’
তিনকড়ি। তা হলে কি বলতে চাও আমার মাসহারাটা—
গণ্ডেরী। হাঃ হাঃ, তুম্ভি রূপেয়া লেওগে? কাঁহাসে মিল্বে বাত্লাও। তিনকৌড়িবাবু, শ্যামবাবুকে কার্বাই নহি সমঝা? নব্বে হজার রূপেয়া কম্পনিকা দেনা। রোজ বাদ লিকুইডিশন। লিকুইডেটর সিকিণ্ড কল আদায় করবে, তব্ দেনা শুধবে।
তিনকড়ি। অ্যাঁ, বল কি? আমি আর পয়সাও দিচ্চি না।
গণ্ডেরী। আলবৎ দিবেন। গবরমিণ্ট কাণ পকড়্কে আদায় করবে। আইন এইসি হ্যায়।
তিনকড়ি। আরও টাকা যাবে? সে কত?
অটল। আপনার একলার নয়। প্রত্যেক অংশীদারকেই শেয়ার-পিছু ফের দু’টাকা দিতে হবে। আপনার পূর্ব্বের ২০০ শেয়ার ছিল, আর শ্যাম-দার ১৬০০ আজ নিয়েচেন। এই ১৮০০ শেয়ারের উপর আপনাকে ছত্রিশ শ টাকা দিতে হবে। দেনা শোধ, লিকুইডেশনের খরচা—সমস্ত চুকে গেলে, শেষে সামান্য কিছু ফেরৎ পেতে পারেন।
তিনকড়ি। তোমাদের কত গেল?
গণ্ডেরী বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ সঞ্চালন করিয়া বলিলেন—“কুছ ভি নেহি, কুছ, ভি নেহি! আরে হামাদের ঝড়তি-পড়তি শেয়ার ত সব্ শ্যামবাবু লিয়েছিল—আজ আপনেকে বিক্করি কিয়েছে।”
তিনকড়ি। চোর—চোর—চোর। আমি এখনি বিলেতে কোল্ডহ্যাম সাহেবকে চিঠি লিখচি।
অটল। তবে আমরা এখন উঠি। আমাদের ত আর শেয়ার নেই, কাজেই আমরা এখন ডিরেক্টর নই। আপনি কাজ করুন। চল গণ্ডেরী।
তিনকড়ি। অ্যাঁ—
গণ্ডেরী। রাম রাম!